h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Posts Tagged ‘শঙ্কর

2016 - 1[1]

শিব ও লিঙ্গ, উপাসনার ক্রমবিকাশ-০১ : ভূমিকা
রণদীপম বসু

ভূমিকা

শুরুতেই স্মরণে রাখা ভালো যে, হিন্দু সভ্যতায় বহুদেবতাবাদ প্রচলিত থাকলেও হিন্দু সমাজ মূলত পঞ্চদেবতার উপাসক। এই পঞ্চোপাসক সম্প্রদায় হলো– শৈব, শাক্ত, সৌর, গাণপত্য ও বৈষ্ণব। আবার সম্প্রদায়গতভাবে ভগবান শ্রীবিষ্ণু ও শিব ঠাকুরের পূজা মূর্ত ও অমূর্ত বা বিমূর্তরূপে শালগ্রাম শিলায় ও শিবলিঙ্গে বহুল প্রচলিত। এর মধ্যে শিবলিঙ্গ পূজা সমাজ জীবনে এতটাই জনপ্রিয় যে, জনমানসে তাঁর মূর্তিরূপই ক্রমবিলীয়মান। বিদ্যেশ্বর সংহিতার মতে– Read the rest of this entry »

Advertisements

11014894_595803560557702_6645515568049066554_n

তন্ত্র-সাধনা-১৬ : তন্ত্রের জ্ঞানতত্ত্ব
রণদীপম বসু

তন্ত্র বিষয়ে এ পর্যন্ত যা আলোচনা করা হয়েছে তার সবই তান্ত্রিক সাধনার কর্ম-কাণ্ড বা সাধন-কাণ্ড বিষয়ক। এবার তন্ত্র-শাস্ত্রের জ্ঞান-কাণ্ড বা দার্শনিক ভাগেরও কিছুটা আলোকপাতের প্রয়োজন রয়েছে।
কর্ম-কাণ্ডের প্রকরণে দেখা যায়, অতি নিম্ন স্তরের উপাসক যেমন দেখতে পান তাঁর উপযোগী উপাসনার পদ্ধতি তন্ত্র-শাস্ত্রে রয়েছে, তেমনি অতি উচ্চ স্তরের সাধকও দেখতে পান যে তাঁর উপযোগী উপদেশও তন্ত্রে কম নেই। হিন্দুশাস্ত্রের অভিনবত্ব এখানেই যে তা কখনও কাউকেও নিরাশ করে না। সব-ধরনের অধিকারীকেই কোলে স্থান দেয়। অধিকারী-ভেদে শাস্ত্রের বিভিন্ন অনুশাসন প্রযুক্ত হয়ে থাকে। অতি সাধারণের ইতু-পুজা, সুবচনীর ব্রত প্রভৃতি কর্ম থেকে কৌল জ্ঞানীর ব্রহ্ম-তত্ত্ব পর্যন্ত সবকিছুই অধিকারী-ভেদে গ্রাহ্য হয়ে থাকে। হিন্দুর তেত্রিশ কোটি দেবতার তাৎপর্যও বোধকরি এখানেই। কেননা, হিন্দুর বহু-দেবতাবাদ ও একেশ্বরবাদকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, অসংখ্য দেবতাকে স্বীকার করেও চরম তত্ত্ব অর্থাৎ ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ শ্রুতির সাথে কোন বিরোধ ঘটে না। একইভাবে এই সমন্বয় বুদ্ধিকে বিবেচনায় নিয়ে তন্ত্র-শাস্ত্রের উপাসনা-প্রণালীর বিচার করলেও সেই চরম তত্ত্বের অন্যথা হয় না। উপাসনা-প্রণালীর মধ্যে পঞ্চোপাসক তথা শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, সৌর ও গাণপত্য সাধকের ভেদ কল্পিত-মাত্র বলেই মনে হয়। পথের বিভিন্নতায় গন্তব্য স্থল ভিন্ন হয়ে যায় না। সবারই চরম উপেয় এক, অর্থাৎ অভিন্ন। ব্যবহারিক ভেদের দ্বারা তাত্ত্বিক অভেদ কখনও ক্ষুন্ন হয় না। Read the rest of this entry »

403276_529995207014701_1121282821_n

| চার্বাক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা-১০ : দেহাত্মবাদ বা ভূত-চৈতন্যবাদ |
রণদীপম বসু

২.০ : দেহাত্মবাদ বা ভূতচৈতন্যবাদ

চার্বাকেতর দর্শন সম্প্রদায়গুলির পরবর্তীকালের প্রায় সকল দার্শনিকেরাই চার্বাকমত হিসেবে প্রচারিত প্রধানত দুটি দাবি খণ্ডন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। এই প্রধান দুটি চার্বাক-মত হলো–
এক : প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। অতএব অনুমানের কোনো প্রামাণ্য নেই।
দুই : দেহাত্মবাদ। অর্থাৎ দেহ ভিন্ন আত্মা বলে স্বতন্ত্র কিছু নেই। আত্মা বলে একান্তই যদি কোনো শব্দ ব্যবহার করতে হয় তাহলে এই দেহকেই আত্মা বলে মানতে হয়।

ইতোমধ্যে প্রথম দাবির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রাপ্ত যুক্তি-তথ্য অনুসারে দৃঢ়ভাবে মনে হয়েছে যে, প্রকৃত চার্বাকমতের সঙ্গে ন্যায়-বৈশেষিক মতের এবং আয়ুর্বেদশাস্ত্রের আকরগ্রন্থ ‘চরক-সংহিতা’য় স্বীকৃত বিজ্ঞানের খুব একটা তফাৎ থাকে না। বরং চার্বাক-প্রতিপক্ষরা চার্বাকদের প্রত্যক্ষ-সংক্রান্ত আরোপিত যে-কোন দাবিকে প্রতিষ্ঠার যত চেষ্টাই করুন না কেন সেগুলিকে অতিরঞ্জিত বিকৃত-প্রয়াস বলেই মনে হয়। বর্তমান আলোচনা চার্বাক-সংক্রান্ত দ্বিতীয় দাবি দেহাত্মবাদ প্রসঙ্গে।
Read the rest of this entry »

247249_538972072783681_2043413948_n

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০৬ : অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের পার্থক্য|
রণদীপম বসু

৬.০ : অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের পার্থক্য

ব্রহ্মবাদী বেদান্ত সূত্রকার মহর্ষি বাদরায়ণের একই ব্রহ্মসূত্র গ্রন্থের ভাষ্য রচনা করলেও দৃষ্টিভঙ্গিগত কিছু মৌলিক পার্থক্যের কারণে ব্যাখ্যার ভিন্নতায় আচার্য শঙ্করের শারীরকভাষ্যকে কেন্দ্র করে অদ্বৈত-বেদান্ত এবং আচার্য রামানুজের শ্রীভাষ্যকে কেন্দ্র করে বিশিষ্টাদ্বৈত-বেদান্ত সম্প্রদায়ের উদ্ভব। যদিও উভয় সম্প্রদায়ই দাবি করেন যে মহর্ষি বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রে তাদেরই নিজস্ব মতবাদ তথা দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁদের এই দাবিকে বহাল রেখেও এক্ষেত্রে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদের সঙ্গে রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন-

(১) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম নির্গুণ ও নির্বিশেষ। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সগুণ ও সবিশেষ।
(২) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয়। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সক্রিয়, জগৎ-স্রষ্টা।
(৩) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সকল প্রকার ভেদরহিত। বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম স্বগতভেদযুক্ত, স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদরহিত।
(৪) অদ্বৈতমতে ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, এই সত্যের কোন পরিমাণগত ও প্রকারগত ভেদ নেই। অপরদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম, জীব ও জগৎ সমানভাবে সত্য। এই পরিমাণগত ভেদ নেই, কিন্তু প্রকারগত ভেদ আছে।
(৫) অদ্বৈতমতে ব্রহ্মের মায়াশক্তি মিথ্যা বা অবিদ্যাপ্রসূত। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্মের মায়াশক্তি যথার্থই ব্রহ্মের শক্তি।
(৬) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সৎ, চিৎ ও আনন্দস্বরূপ। আর বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সৎ ও সত্তাবান, চিৎ ও চৈতন্যময়, আনন্দ ও আনন্দময়।
(৭) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম ও জীব অভিন্ন। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম ও জীব ভিন্নও বটে, অভিন্নও বটে।
(৮) অদ্বৈতমতে মুক্তজীব অভোক্তা ও অকর্তা। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে মুক্তজীব ভোক্তা ও কর্তা।
(৯) অদ্বৈত মতানুযায়ী মোক্ষে জীব ব্রহ্মে বিলুপ্ত হয় অর্থাৎ মুক্তজীব ব্রহ্ম-সাযুজ্য লাভ করে। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈত মতানুযায়ী মোক্ষে জীব ব্রহ্মে লীন হয় না, বরং ব্রহ্ম-সদৃশ হয় অর্থাৎ, ব্রহ্ম-স্বারূপ্য লাভ করে।
(১০) অদ্বৈতমতে জীবিত অবস্থায় মুক্তি বা জীবন্মুক্তি সম্ভব। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে জীবন্মুক্তি অসম্ভব।
(১১) অদ্বৈতমতে শুদ্ধজ্ঞানই মুক্তির উপায়। বিশিষ্টাদ্বৈতমতে জ্ঞান, ভক্তি ও ঈশ্বরকরুণার সমন্বয় এবং প্রপত্তি ও শরণাগতি মুক্তির উপায়।
(১২) অদ্বৈতমতে আত্মা বিভুপরিমাণ। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে আত্মা অণুপরিমাণ।
(১৩) অদ্বৈতমতে জহৎ-অজহৎ লক্ষণার সাহায্যে ‘তত্ত্বমসি’ মহাবাক্যের তাৎপর্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে বিশেষ্য-বিশেষণভাবজনিত সামানাধিকরণ্যের দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ মহাবাক্যের তাৎপর্য প্রতিপাদিত হয়।
(১৪) অদ্বৈতমতে জগৎ মিথ্যা। অথচ বিশিষ্টাদ্বৈতমতে জগৎ সত্য।

[আগের পর্ব : রামানুজের মতে জীবের বন্ধন ও মোক্ষ] [*] [শেষ]

images_12

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০১ : ভূমিকা- রামানুজ|
রণদীপম বসু

১.০ : ভূমিকা

ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাধারায় বেদান্তের প্রভাব সহজেই পরিলক্ষিত হয়। তাদের নিকট সত্য বহুমুখী। বেদান্তীরা এই বহুমুখী সত্যকে বহুরূপে উপলব্ধির কথা ঘোষণা করেছেন। তাই বেদান্ত চিন্তা বহুমুখী। উপনিষদীয় ভাবধারায় পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্তগুলিকে প্রয়োজনীয় মীমাংসার মাধ্যমে মহর্ষি বাদরায়ণ যেমন ব্রহ্মসূত্র রচনা করে অভিন্ন লক্ষ্যাভিমুখী করার উদ্যোগ নিয়ে একটি পরমতত্ত্বের মধ্যে সমন্বয়কৃত  ব্রহ্মবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, আবার এই ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য রচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন বেদান্তী দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যহেতু পরবর্তীকালে বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন মতবাদেরও সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে আচার্য শঙ্কর প্রবর্তিত অদ্বয় পরমব্রহ্মের ভাবনাপ্রসূত বিশুদ্ধাদ্বৈতবাদ যেমন অদ্বৈতবেদান্তের প্রতিষ্ঠা করেছে, তেমনি এই ব্রহ্মসূত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা-ভাষ্যে জ্ঞানকাণ্ড-প্রধান অদ্বৈতবেদান্তের প্রতিক্রিয়ারূপে উদ্ভূত হয়েছে রামানুজাচার্য-প্রবর্তিত ভক্তিপ্রধান বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ।

শঙ্করের অদ্বৈতবাদ ও রামনুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ এই উভয় বেদান্ত-চিন্তাই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরস্পর-নিরপেক্ষ। অদ্বৈতবেদান্তের জ্ঞানপ্রধান, নির্বিশেষ, বিমূর্তচিন্তা দার্শনিক বিচারে অতি উচ্চস্তরের হলেও এইমত সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক-তৃপ্তি সাধনে সক্ষম হয়নি। এই অক্ষমতাই হয়তো ভক্তিবাদী রামানুজাচার্যকে ভক্তিমার্গ অনুসরণ করে ‘বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ’ নামে একটি স্বতন্ত্র বেদান্তমত প্রবর্তনে উদ্বুদ্ধ করেছে। রামানুজের মতবাদও অদ্বৈত মতবাদ, তবে তা নির্বিশেষ নয়। আচার্য শঙ্কর তাঁর অদ্বৈতমতে এক অদ্বয় পরমব্রহ্ম ছাড়া পরমার্থত আর দ্বিতীয় কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। কিন্তু আচার্য রামানুজ বহুর অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদকে নির্গুণ ব্রহ্মবাদের সঙ্গে ঈশ্বরবাদের সমন্বয়ের প্রচেষ্টারূপে গণ্য করা যায়।

বলা বাহুল্য যে, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তা ভারতীয় চিন্তাধারায় কোন অভিনব বা নতুন সংযোজন নয়। নির্গুণ ব্রহ্মবাদ ও ঈশ্বরবাদ বহু প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিলো। রামানুজাচার্যের বহুপূর্বে ভাগবতের ঈশ্বরবাদে, উপনিষদের সপ্রপঞ্চ-ব্রহ্মবাদে, মহাভারতের নারায়ণীয় অধ্যায়ে, ভগবদ্গীতায় ও বিষ্ণুপুরাণে এই চিন্তাধারার আভাস পাওয়া যায়। প্রাচীন বৈষ্ণব তামিল-কবি আলবারদের নানা গাথা ও গ্রন্থ, ভাস্কর, যাদবপ্রকাশ ও যমুনাচার্য’র চিন্তাধারা, ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত, ভাগবত ও মহাভারতের বৈষ্ণবপাদ রামানুজের চিন্তাধারাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হয়। বিশিষ্টাদ্বৈত মতবাদ যে তাঁর পূর্বেকার লেখক যথা বোধায়ন, টঙ্ক, কপরদিন, ভারুচী প্রমুখের মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, বেদান্তসূত্রভাষ্য ‘শ্রীভাষ্য’-এ রামানুজ তা স্বীকার করেছেন।

দর্শনের পরমব্রহ্মকে ভক্তের ভগবানরূপে কল্পনা করে রামানুজ বেদান্ত দর্শনে ভক্তিবাদের অপূর্ব সমাবেশ করেছেন। বাস্তবভাব সমন্বয়ের দ্বারা একটি ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করা এবং ঈশ্বরকে লাভ করার জন্য  মানুষের যে প্রবল বাসনা তার প্রতিষ্ঠা করাই রামানুজের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শিক্ষার সঙ্গে রামানুজের মতে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এ কারণেই রামানুজ প্রচারিত দার্শনিক ভাবনা ও ধর্মমত সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলো।

রামানুজ (১০১৭-১১৩৭ খ্রিঃ)
আচার্য রামানুজ ১০১৭ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের শ্রীপেরম্বুদুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ১২০ বছর জীবনধারণ করে ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বাল্য নাম লক্ষ্মণ। পিতার নাম কেশব ভট্ট এবং মাতার নাম কান্তিমতি। শৈশবে তিনি পিতৃহীন হন। যমুনাচার্য তাঁর মাতামহ এবং মহাপূর্ণ তাঁর মাতুল। বাল্যকালে তিনি কাঞ্চিপুরীতে আচার্য যাদবপ্রকাশের কাছে বেদান্ত অধ্যয়ন শুরু করেন, কিন্তু পরে মতবিরোধ-হেতু তিনি গুরু কর্তৃক বিতাড়িত হন। তারপর তিনি মাতামহ যমুনাচার্যের কাছে বেদান্তের পাঠ গ্রহণ করেন এবং শঙ্কর, ভাস্কর ও যাদবপ্রকাশের মতবাদ খণ্ডন করে বিশিষ্টাদ্বৈত মতবাদ প্রচার করেন।

আচার্য রামানুজ ছিলেন অতীব ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর পাণ্ডিত্য সম্বন্ধে নানা অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। মহর্ষি বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রের উপর তিনি যে ব্রহ্মসূত্রভাষ্য রচনা করেন তা ‘শ্রীভাষ্য’ নামে সমধিক পরিচিত। এছাড়াও তিনি ‘গীতাভাষ্য’, ‘বেদান্তদীপ’, ‘বেদান্তসংগ্রহ’, ‘শরণাগতিগদ্য’, ‘শ্রীরঙ্গগদ্য’, ‘আগমপ্রামাণ্য’, ‘সিদ্ধিত্রয়’, ‘মহাপুরুষনির্ণয়’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।

রামানুজের পরেও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের সমর্থনে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। রামানুজের পরবর্তীকালের রামানুজ-শিষ্য সুদর্শন সূরি’র শ্রীভাষ্যের ‘শ্রুতপ্রকাশিকাটীকা’, বেঙ্কটনাথ-এর ‘শতদূষণী’, ‘ন্যায়পরিশুদ্ধি’, ‘তত্ত্বটীকা’, মেঘনাদারির ‘ন্যায়দ্যুমণি’, আচার্য শ্রীনিবাস-এর ‘যতীন্দ্রমতদীপিকা’, লোকাচার্য’র ‘তত্ত্বত্রয়’ প্রভৃতি গ্রন্থ বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের উপর অতি মূল্যবান গ্রন্থ।

রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের এক অপূর্ব সমাবেশ দেখা যায়। পরম সদ্ববস্তুই পরম কল্যাণ এবং পরম অন্বিষ্ট সত্তা, কল্যাণ এবং পুরুষার্থ আত্যন্তিক অর্থে সমন্বিত, এই সত্যটিকে বিশিষ্টাদ্বৈত মতে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। রামানুজের মতে ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়। তবে-
বিশিষ্টাদ্বৈত মতে যদিও ব্রহ্মই চূড়ান্ত সত্য, তবুও ব্রহ্মকে নির্গুণ আখ্যা দেয়া ভুল। বরং ব্রহ্মকে অনন্ত-কল্যাণগুণের আধার মনে করতে হবে। তিনিই ঈশ্বর; উপাসনা সৎকর্মের সাহায্যে তাঁর করুণার উদ্রেক করতে পারলেই জীবের মুক্তি। পরিদৃশ্যমান জড়জগৎ এবং জীবাত্মার স্বাতন্ত্র্য মিথ্যা নয়। কেননা, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের মধ্যেই চিৎ এবং অচিৎ- চেতনা এবং জড়- উভয় বৈশিষ্ট্যই বর্তমান। চিৎ বৈশিষ্ট্য থেকেই জীবাত্মার সৃষ্টি, অচিৎ থেকে জড়জগতের। ব্রহ্ম চিৎ-অচিৎবিশিষ্ট। জীবাত্মার সঙ্গে জড়দেহের সম্পর্কই বন্ধনের স্বরূপ এবং তার মূলে রয়েছে জন্মজন্মান্তরের কৃতকর্মজনিত অজ্ঞান। ঈশ্বরের করুণায় জীবাত্মা এই অজ্ঞান কাটিয়ে মুক্তিলাভ করবে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭)

ঈশ্বর, চিৎ-শক্তি এবং অচিৎ-শক্তি এই ত্রিতত্ত্বে রামানুজ বিশ্বাস করেন। তার মতে ঈশ্বরই পরমতত্ত্ব। ঈশ্বর বিশেষ্য, চিৎ ও অচিৎ তার বিশেষণ। প্রমাণ ও প্রমেয় বিচারে রামানুজের মতে বিশিষ্ট ব্রহ্মই একমাত্র জ্ঞেয় বস্তু। প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ জ্ঞানের ত্রিবিধ উপায়। তবে আচার্য রামানুজও শাস্ত্র বা শব্দপ্রমাণকেই প্রত্যক্ষ ও অনুমানের উপরে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন, ব্রহ্মবাদী বাদরায়ণের সূত্রগ্রন্থ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যগ্রন্থ শ্রীভাষ্যে রামানুজ বলেছেন- 
Read the rest of this entry »

IMG_1050_1 [1600x1200]

|বেদান্তদর্শন-অদ্বৈতবেদান্ত-০৮ : অদ্বৈত জ্ঞানতত্ত্ব|
রণদীপম বসু

৩.০ : অদ্বৈত জ্ঞানতত্ত্ব

যথার্থ জ্ঞান বুদ্ধির অধীন নয় বস্তুর অধীন, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞান বস্তুর অধীন। যে বস্তু যেমন, সেরূপ জ্ঞানই তত্ত্বজ্ঞান। অদ্বৈতমতে পরমাত্মা ব্রহ্মই হলো নিত্য, আর জগৎ অনিত্য। একমাত্র ব্রহ্মেরই পারমার্থিক সত্তা আছে এবং পরাবিদ্যার সাহায্যেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। ব্রহ্মজ্ঞানই সত্যজ্ঞান বা পরাবিদ্যা। এ জ্ঞান নিরপেক্ষ জ্ঞান যাকে অনুভব করা যায়। বিচারবুদ্ধি অনুভবের একটি উপায়।

অদ্বৈতবেদান্তের প্রধান প্রবক্তা আচার্য শঙ্কর তাঁর শারীরকভাষ্যে পারমার্থিক সত্তা ও ব্যবহারিক সত্তার মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। তাঁর মতে অবিদ্যার জন্যই জীব অনাত্মাকে আত্মার সঙ্গে অভিন্ন মনে করে। অবিদ্যা হলো ব্যবহারিক জ্ঞান। অবিদ্যায় জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতার পারস্পরিক ভেদ বর্তমান থাকে। শঙ্করের মতে ব্রহ্মেরই একমাত্র সত্তা আছে, ব্রহ্মের বাহিরে বা ভেতরে ব্রহ্ম ছাড়া আর কোন সত্তা নেই। ব্রহ্মের কোন প্রকার ভেদ নেই। পরাবিদ্যা সব রকমের ভেদরহিত জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ জ্ঞান। আর অপরাবিদ্যা আপেক্ষিক জ্ঞান হলেও শঙ্করের মতে এ জ্ঞান পরাবিদ্যা বা অনপেক্ষ জ্ঞান লাভের সোপান স্বরূপ।

এই মতে, শ্রুতি থেকে ব্রহ্মের জ্ঞান হয়, তারপর যুক্তি-তর্কের সাহায্যে তার যৌক্তিকতা উপলব্ধ হয় এবং সর্বশেষ অনুভবের মাধ্যমে ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার হয়। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার জন্য শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন হলো তিনটি উপায়। শ্রুতি ছাড়া অন্য কোন কিছু থেকে জীব ও ব্রহ্মের অভেদ জ্ঞান লাভ হয় না। শ্রুতির প্রামাণ্য নিরপেক্ষ। বেদান্তসূত্রে মহর্ষি বাদরায়ণও বলেছেন-
Read the rest of this entry »

424125_3575296946790_1404066892_3467713_1689835290_n_nurun_nabi_munna

|বেদান্তদর্শন-অদ্বৈতবেদান্ত-০৪ : অদ্বৈতমতে জগৎ|
রণদীপম বসু

২.২ : অদ্বৈতমতে জগৎ

বেদান্তদর্শনের সূত্রগ্রন্থ ব্রহ্মসূত্র বা শারীরকসূত্রের দ্বিতীয় সূত্রটি হলো-


‘জন্মাদ্যস্য যতঃ’।। (ব্রহ্মসূত্র-১/১/২)
ভাবার্থ : জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় যা থেকে হয় (তাহাই ব্রহ্ম)।


এই সূত্রটির ভাষ্য রচনা করতে গিয়ে অদ্বৈতবেদান্তের প্রধান প্রবর্তক শঙ্করাচার্য বলেন-
Read the rest of this entry »


রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 279,567 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 108 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুন 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
Advertisements