h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Posts Tagged ‘জাতীয়

35tw7

‘স্বভাব যায় না মইলে’
রণদীপম বসু

.

(১৮ নভেম্বর ২০০৮)
আমাদের দেশে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা কতো ? আট কোটি ? সঠিক সংখ্যাটি এ মুহূর্তে হাতে নেই আমার। আট কোটির ধারে কাছে হবে হয়তো। সেক্ষেত্রে কতজন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন বা করার সুযোগ পান ? এই হিসাবটা হয়তো চলে আসে নির্বাচনের ফলাফল থেকে। আমাদের জাতীয় নির্বাচনগুলোর বিগত ইতিহাস অনুযায়ী মোট ভোটারের ষাট থেকে পঁয়ষট্টি ভাগ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেই মোটামুটি সফল নির্বাচন হয়েছে বলে সরকারীভাবে ধরে নেয়া হয়। এখানে যে ভোটগুলো অধিকার প্রয়োগ করা সত্তেও প্রক্রিয়াগত ভুলে নষ্ট হয়ে যায় তা বাদ দিলে মোটা দাগে আমরা ধরে নিতে পারি যে ন্যুনতম শতকরা পঁয়ত্রিশ ভাগ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন নি। এদের কত ভাগ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চেয়েছেন বা চান, কিন্তু তাঁদের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ বা সামর্থ না থাকায় তা প্রয়োগ করতে পারেন নি বা পারছেন না, এ বিষয়টা নিয়ে কোন জরিপ হয়েছে কিনা জানা নেই। কিন্তু অধিকার সুরক্ষার প্রসঙ্গ এলে এ বিষয়টি কি বিবেচনায় না এসে পারে ? দেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতায় বহুপাক্ষিক ধস্তাধস্তির মধ্যে হঠাৎ করে আনুমানিক চল্লিশ হাজার পবিত্র হজযাত্রীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি রাজনৈতিক এজেণ্ডায় চলে আসায় বিষয়টাকে আর খাটো করে দেখার কোন উপায় নেই।

হজযাত্রীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেবার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে যারা সোচ্চার হয়ে উঠেছেন তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপাত দু’টো সম্ভাবনা আমরা ধারণা করতে পারি। আট কোটি ভোটারের স্বাপেক্ষে যে বিপুল অংশ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন না, তাদের কথা বেমালুম চেপে গিয়ে শতকরা হারে অতিনগন্য পরিমাণ হজযাত্রী ভোটারের ইস্যুকে সংবেদনশীল করে তুলে এরা হয় খুব হীন রাজনৈতিক খেলায় বিপজ্জনকভাবে মেতে উঠতে চাচ্ছেন। নয়তো খুব যৌক্তিকভাবে সবার ভোট দেয়ার অধিকার সমুন্নত রেখে অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টির দাবীতে সোচ্চার হতে চাচ্ছেন। কোনটা ঠিক ? রাষ্ট্র পরিচালনায় আগ্রহী দল বা ব্যক্তিবর্গ প্রথমোক্ত সম্ভাবনায় সংশ্লিষ্ট থাকতে পারেন এমনটা আমরা বিশ্বাস করতে চাইবো কেন ? তাহলে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের আগ্রহ ও যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন এসে যায়, আদৌ তাঁরা এর যোগ্য কিনা। স্বকল্পিতভাবে আমরা কেন তাঁদেরকে এতোটা অযোগ্য ভাববো ? তার চেয়ে বরং দ্বিতীয় সম্ভাবনাকেই বিবেচনায় নিতে পারি। অর্থাৎ আগ্রহী ভোটারদের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতেই তাঁরা সোচ্চার হয়েছেন বলে ধরে নেবো। সত্যি কি তাই ? ‘মাগো মা, তোরে আমি বেঁইচা দিমু। তয় এমন দাম চামু, কেউ কিনতেই পারবো না !’

গোটা দেশের ছড়ানো ছিটানো চল্লিশ হাজার হজযাত্রীরা ইহলৌকিক হিসাব নিকাশগুলো আপাতত স্থগিত রেখে এক পরম আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে যখন পবিত্র হজের প্রতি তাদের দেহমন উৎসর্গ করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেদেরকে সমর্পিত করেন, তখন ভোটের মতো জাগতিক বিষয়ে তাঁদের আদৌ কোন মনোযোগ থাকে কিনা সেদিকে আমরা না-ই গেলাম। বিষয়টা যখন অধিকার প্রয়োগের, আমাদেরকে নৈতিকভাবে মানতে হবে যে চল্লিশ হাজার না হয়ে কেবল চল্লিশ জন হলেও এ অধিকার প্রয়োগের সুযোগ অবশ্যই সবারই প্রাপ্য। আর তখনই আমাদেরকে দেখতে হয় এই সমানাধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে কিনা। এখন প্রশ্ন, তাঁদেরকে অধিকার প্রয়োগে কেউ বাধাদান করছে কিনা। কেউ কি বাধাদান করছে ? তাঁরা তো তাঁদের স্বেচ্ছাকৃত পথটাই বেছে নিয়েছেন। এখানে পাল্টা কোন প্রশ্ন উত্থাপনের আগে খুব সমান্তরালভাবে আমাদের অন্যুন পঞ্চাশ লাখ প্রবাসী ভোটারদের অধিকার প্রয়োগের বিষয়টাকেও উত্থাপন করতে পারি। এখন কেউ হয়তো বলতে পারেন, তাঁদেরকে কেউ কি তাঁদের অধিকার প্রয়োগে বাধা দিয়েছে ? তাঁরাই তো তাঁদের স্বেচ্ছাকৃত পথটাকে বেছে নিয়েছেন। তাহলেও প্রশ্ন দাঁড়ায় তাঁদের সংখ্যা কিন্তু পঞ্চাশ হাজার নয়, পঞ্চাশ লাখ ! তাঁদের অধিকার প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে কোন দল বা গোষ্ঠী কি কখনো জোরালো আগ্রহ দেখিয়েছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন ? অথচ এই প্রবাসীদের প্রেরিত বৈদেশিক মূদ্রা আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে যথারীতি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে এবং আগামীতেও রাখবে।

এখানেও কেউ কেউ পুনরায় প্রশ্ন উঠাতে পারেন, আমাদের পবিত্র হজযাত্রীরা হজকালীন সময়টাতে চাইলেই ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ছুটে আসতে পারবেন না। আগামী আঠারো ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে হজ শেষ হয়ে গেলেও প্রক্রিয়াগত কারণেই ধরে নিচ্ছি অর্ধেকের মতো হাজী দেশে ফেরার সুযোগ পাবেন না। তাহলে বাকি বিশ হাজার হাজী চাইলেও তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। এ বিষয়টা নিয়ে যারা সোচ্চার হয়েছেন তাঁদের জন্য ভিন্ন একটি পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারি আমরা। নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে সরকারী বেসরকারী কর্মচারীরা চাইলেও তাঁদের অমূল্য ভোটটা দিতে পারবেন না, তাঁরা কি এ দেশের নাগরিক নন ? তাঁদের কি ভোটাধিকার নেই ? এদের সংখ্যা তো কম নয়, বেশ কয়েক লাখ ! এবং আমাদের রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় তাঁদেরকেই কেবল তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ থেকে বাধ্যগতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। কই, তাঁদের জন্য তো কোন দল বা গোষ্ঠীকে কখনো কোন দাবী নিয়ে সোচ্চার হতে দেখা যায় নি ! অথচ এই বেশ কয়েক লাখ নাগরিকরা তাদের দেহমনের সামর্থ ও তাদের কর্মক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রের সেবা করে যাচ্ছেন।

রাজনৈতিক কূটচাল যখন ধর্মকে লেবাস হিসেবে জড়িয়ে নেয়, তা যে কতো সংবেদনশীল বিপজ্জনক হয়ে উঠে, এই ভূখণ্ডের নাগরিকরা বহুবার হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। যারা এই বিপজ্জনক খেলায় মেতে উঠেন তারা যে এই পবিত্র হজযাত্রীদের বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখেছেন তাই বা বলি কী করে ? তাহলে আমাদের দেশে কতগুলো হাসপাতাল কিনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি রয়েছে ? গড়ে কী পরিমাণ গুরুতর রোগী এখানে ভর্তি থাকেন যারা কিছুতেই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হবেন না ? এবং সাথে থাকা রোগীর আত্মীয় পরিজন যারা রোগীকে সাময়িক সময়ের জন্যও ফেলে যাওয়া সম্ভব নয় বিধায় তাদেরও ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব হবে না, তাদের সংখ্যা কতো ? নিশ্চয়ই অনেক ? বেশ কয়েক লাখ তো অবশ্যই। নির্বাচনের তারিখে গোটা দেশে আমাদের কতজন অন্তসত্ত্বা মা-বোন রয়েছেন যারা গর্ভাবস্থার সর্বশেষ পর্যায়ে রয়েছেন এবং ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার মতো শারীরিক সক্ষম অবস্থায় থাকবেন না ? তারা তাদের ভোটাধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবেন ? এই বিপুল সংখ্যক ভোটাররা কি তাহলে মানবিক বিবেচনায় আসার যোগ্যতা রাখেন না ? জেলখানায় আটক দাগী আসামী ও অভিযুক্ত অপরাধীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি যদি আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের যথাযোগ্য মাথায় জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের সুযোগ্য নিরপরাধ অসুস্থ নাগরিকদের কথা এরা ভাববেন না তা কী করে হয় ?

উপরোক্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা যে ধারণায় এসে পৌঁছে যাই, তাতে আমাদের আদর্শহীন রাজনীতির আরেকটি পুরনো চর্চিত অধ্যায়ই উন্মোচিত হয়ে পড়ে। খুব বিসদৃশভাবেই একটি সেনসেটিভ ধর্মীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে এই রাজনৈতিক হীনমনষ্কতা আমাদেরকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে বৈ কি। পবিত্র হাজীদের বিশ হাজার ছড়ানো ছিটানো ভোট নির্বাচনে আদৌ কোন প্রভাব ফেলবে কিনা জানি না। যদি প্রভাব ফেলতোই, তাহলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চলতি ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে দশ লক্ষ দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির যে প্রক্রিয়া চলমান তাতে কম করে হলেও গড়ে পঁচাত্তর হাজার সুস্থ কর্মক্ষম নাগরিক যে প্রতি মাসে দেশ ত্যাগ করছেন তাদের হিসাবটাও মাথায় থাকতো। কেননা নির্বাচন একমাস পিছিয়ে যাওয়া মানে পঁচাত্তর হাজার করে নিশ্চিত ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়া। কিন্তু কই, এ নিয়ে তো কেউ টু শব্দটি করছেন না !

পরিবর্তনের আওয়াজ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাবহুল নির্বাচনে যখন এবার সে দেশের নীতিনির্ধারকরা বিপুল পরিমাণ নিষ্ক্রিয় ভোটারকে ভোট কেন্দ্রে এনে গোটা দুনিয়াকে চমক উপহার দিলো, তার রেশ অব্যহত থাকলেও আমরা যে আসলে অন্ধতা ছাড়া কিছুই শিখি না, একটা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে আবারো তা প্রমাণীত হলো। ছোট্ট এই গরীব রাষ্ট্রের অসহায় নাগরিক হিসেবে তাই আমাদেরকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতেই হয়, ‘কয়লা যায় না ধুইলে স্বভাব যায় না মইলে !’ আমাদের স্বভাব কি কখনোই পরিবর্তনযোগ্য নয় !
(১৮/১১/২০০৮)
.
[khabor.com]
[muktangon:nirmaan]
[mukto-mona]
[sa7rong]

Advertisements

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 440,797 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements