h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Posts Tagged ‘কবি

1908473_744382928977158_9020559613900978247_n

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৮ : ঋগ্বেদের সমাজ |
রণদীপম বসু

৩.১ : ঋগ্বেদের সমাজ

যে-কোনো সমাজ-সংগঠনের পরিপ্রেক্ষিতেই সেই সমাজের চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, সভ্যতার বিবর্তন ধারায় সব দেশে সব মানুষের উন্নতি সমান তালে ঘটেনি। আধুনিক সভ্য মানুষের পূর্বপুরুষেরা বহু যুগ আগে যে-অবস্থায় বাস করতো কোনো কোনো পিছিয়ে পড়া মানবগোষ্ঠী সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সেই অবস্থায় আটকে থেকেছে। আর এই কারণেই আধুনিক পৃথিবীর ওই পিছিয়ে-পড়ে থাকা মানুষদের পরীক্ষা করে নৃতত্ত্ববিদরা প্রাগৈতিহাসিক অতীতের কথা অন্তত আংশিকভাবে অনুমান করে থাকেন। সে-বিচারে নৃ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে-কোনো আদিম পর্যায়ের সমাজ-সংগঠনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এক স্বতঃস্ফূর্ত গোষ্ঠীগত ঐক্য। এ-ঐক্য এমনই গভীর যে তাদের মধ্যে ব্যক্তি-স্বার্থ ও ব্যক্তি-বোধেরও ঐকান্তিক অভাব পরিলক্ষিত হয়। গোষ্ঠীর সামগ্রিক স্বার্থই প্রত্যেকের নিজস্ব স্বার্থ, প্রত্যেকের সম্পদই গোষ্ঠির সামগ্রিক সম্পদ। প্রাচীন বৈদিক মানুষদের ক্ষেত্রে এরকম কোনো পর্যায় অনুমান করতে হলে এ-ক্ষেত্রেও অনুমানের অবকাশ থাকে যে, বৈদিক সমাজ-বিবর্তনের কোনো-এক পর্যায়েও এ-জাতীয় গোষ্ঠী-চেতনা ও সাম্য-ব্যবস্থার পরিচয় থাকা স্বাভাবিক। তার মানে অবশ্য এই নয় যে বৈদিক সাহিত্য রচনার সমগ্র যুগ ধরে আগাগোড়াই ওই আদিম সাম্য-সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিলো। উপনিষদের সমাজ, ব্রাহ্মণের সমাজ, এমনকি ঋগ্বেদে সংকলিত অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন অংশে প্রতিফলিত সমাজও নিশ্চয়ই আদিম সাম্য-সমাজ নয়। বস্তুত– Read the rest of this entry »

Advertisements
.
| সমতলে বক্ররেখা…০১ : লেখা ও লেখক কিংবা পাঠকের দীর্ঘশ্বাস |
-রণদীপম বসু
ফেসবুকের চ্যাটবক্সে ঢুকে একজন প্রশ্ন করলেন, আপনার প্রিয় লেখক কে ? নির্দ্বিধায় উত্তর দিলাম, আমার কোন প্রিয় লেখক নেই। তার মানে ! হয়তো আমার উত্তর তাঁর পছন্দ হয়নি, কিংবা এর অর্থটা ঠিকমতো ধরতে পারেন নি তিনি। বললাম, আমি তো কোনো পীরবাদে বিশ্বাসী নই। ঠিক বুঝলাম না, আপনি কি ঠাট্টা করছেন ! হতে পারে তাঁর প্রশ্নের সাপেক্ষে আমার উত্তরটা টুইস্ট হয়ে যাচ্ছে ভেবে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করছেন। তাঁর এই বিস্ময়কে পাশ কাটিয়ে এবার আমিই প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, লেখক বলতে আপনি কী বোঝেন ? এবার আর তাৎক্ষণিক উত্তর এলো না। কে জানে, এমন অদ্ভুত প্রশ্নে তিনি হতাশ হলেন কিনা। একটা বাচ্চা ছেলেরও যে উত্তরটা অজানা থাকার কথা নয়, সেরকম একটা অপরিপক্ক প্রশ্নে হয়তো অপমানও বোধ করতে পারেন। তাঁর আগ্রহ চুপসে গেলেও আমার বক্তব্যটা কিন্তু পরিষ্কার করার দরকার ছিলো। হঠাৎ আবার তাঁর আবির্ভাব। তবে এবার মনে হয় আমাকে টুইস্ট করতেই বললেন, হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী ? Read the rest of this entry »

| কবি ও শিশুসাহিত্য এবং আমাদের দায়বদ্ধতা…|
-রণদীপম বসু

কবি কিংবা শিল্পী, হওয়া না-হওয়ায় কী এসে যায় ?
সমাজে একজন ব্যক্তির কবি বা শিল্পী হওয়া না-হওয়ায় আদৌ কি কিছু এসে যায় ? অত্যন্ত বিরল-ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের বর্তমান আর্থিক মানদণ্ড প্রধান সমাজে একজন কবি বা শিল্পীকে কোন অবহেলিত গোত্রের প্রতিনিধি বলেই মনে হয়। তাই একজন ব্যক্তির কবি কিংবা শিল্পী তথা একজন স্রষ্টা হয়ে ওঠায় ব্যক্তির লাভ-ক্ষতির হিসাবের জবেদা টানার চেয়ে সমাজে এর কী প্রভাব অভিযোজিত হয় তা-ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল একজন ব্যক্তিই, যে পর্যন্ত না তাঁর কোন কাজ বা উদ্যোগ সমাজে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। এই বিশিষ্ট হয়ে ওঠার সাথেই ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটা মাত্রিক পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ ব্যক্তি তখন ব্যক্তিত্বের পর্যায়ে উন্নীত হন। মানে দাঁড়ালো, ব্যক্তি যখন বিশিষ্ট বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয়ে ওঠেন তখনই তিনি ব্যক্তিত্বের পর্যায়ভুক্ত। এখন প্রশ্ন আসবে, তাহলে ব্যক্তি কি কোন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নয় ? আমরা তো জানি যে, জগতের প্রতিটা মানুষই ভিন্ন এবং কোন না কোনভাবে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। সেক্ষেত্রে প্রতিটা ব্যক্তিই তো একেকজন ব্যক্তিত্ব হবার কথা। অতি সত্য কথা। আর এজন্যেই সমাজের মধ্যে বিশিষ্ট হয়ে ওঠার কথা এসেছে। অর্থাৎ সমাজকে প্রভাবিত করার মতো বিশিষ্টতা যিনি অর্জন করেছেন, তিনিই ব্যক্তিত্ব। এলাকার সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী ব্যক্তিটিও সমাজকে কোনোভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে হয়তো। তাকেও কি আমরা ব্যক্তিত্ব বলবো ? অবশ্যই না। কেন বলবো না ? কারণ সন্ত্রাসীকে কেউ অনুকরণ করে না। বাধ্য হয়ে উপরে উপরে আনুগত্য প্রদর্শন আর আদর্শ বা ‘রোল-মডেল’ হিসেবে মেনে নিয়ে অনুকরণ বা অনুসরণ এক কথা নয়। তাছাড়া যে কর্মকাণ্ড সমাজের জন্য যে-কোন বিচারেই ক্ষতিকারক, তাকে গুণবাচক অর্থে বিবেচনা করার কোন যৌক্তিকতা আছে কি ? অতএব, যিনি তাঁর বৈশিষ্ট্যসূচক কর্মকাণ্ড বা উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে ধরে নেই, তাঁকেই আমরা ব্যক্তিত্ব বলতে পারি। এই বৈশিষ্ট্যসূচক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। রাজনীতিক, ক্রিড়াবিদ, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী, চলচ্চিত্রকার, সমাজসেবী, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, শিল্প-উদ্যোক্তা, লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিক ইত্যাদি। আমাদের আলোচ্য কবি বা শিল্পী হয়ে ওঠাও তা-ই। এই ব্যক্তিত্বদের মধ্যে কেউ হয়তো মহান সংগঠক, সাহসের প্রতীক, কেউ অভূতপূর্ব সৃজনশীলতার প্রতীকী স্রষ্টা।

42b

| ঘড়ায়-ভরা উৎবচন…| ৪১-৫০ |
রণদীপম বসু


(৪১)
কবি হবার প্রথম শর্তই হলো নির্লজ্জ হওয়া ;
লজ্জা নিয়ে কোন জননক্রিয়া হয় না।

(৪২)
কাউকে চিনতে হলে, তাকে বিপজ্জনকভাবে রাগিয়ে দাও ;

জিহ্বায় তার যেটুকু পোশাক অবশিষ্ট থাকবে, সেটুকুই সভ্য সে।

(৪৩)
শিক্ষা সেই মুখোশ, যা পরে মানুষ
সামাজিকতার ভাঁড়ামি আর নিখুঁত ভণ্ডামি করে।

(৪৪)
স্তনপিণ্ডে পাথরের আগ্রহ থাকে না;
কারণ সে নিজেকেও প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে।

(৪৫)
একটা অশ্লীল ও হাস্যকর রণত্রেকে সবাই ঠাট্টা করে দাম্পত্য বলে, যেখানে
দু’পক্ষেই অপেক্ষা করে নোংরা পরাজয়।

(৪৬)
জগতের জটিলতম কূহকের নাম- সন্তানের চোখ;
শেষপর্যন্ত যার পাঠোদ্ধার হয় না।

(৪৭)
চরিত্র হলো স্বভাবের শৃঙ্খলে বাঁধা নিজস্ব কারাগার;
এ থেকে মুক্তি পায় না কেউ, শৃঙ্খলের ধরন পাল্টায় কেবল।

(৪৮)
মানুষের যে আদিম প্রহসনটি আশ্চর্যজনকভাবে টিকে আছে এখনো,
তা হলো ‘নাম’-পরিচয়। অথচ নাম কোন পরিচয়ই বহন করে না। আর
মানুষের অদ্ভুত রসবোধের উৎকৃষ্ট ঠাট্টাটি হচ্ছে ‘নামকরণ’।

(৪৯)
নারী এক অদ্ভুত যন্ত্র,
সহজ বিষয়কে যে অনায়াসে জটিল বস্তুতে প্রক্রিয়াজাত করে।

(৫০)
পুরুষ হচ্ছে লোকাল বাস,
কখনোই যাত্রীক্ষুধা মেটে না।

[৩১-৪০][*][৫১-৬০]

[sachalayatan]

[somewherein | alternative]

waiting_for_spring_velvetta

গুপ্ত সমুদ্র

-রণদীপম বসু

.

[মুমূর্ষু কবি সমুদ্র গুপ্তের জন্য এলিজি]

ঘুটঘুটে অন্ধকার বলে আদৌ কি আছে কিছু ?
অন্ধ চোখের ফ্রেমে ভাঙা অক্ষরে মাখা
টুকরো জানালা দিয়ে
আমি তো পষ্টই দেখছি সব-
চারদিকে ঘিরে থাকা অলৌকিক অক্ষমতা,
আলোহীন দৈবিক পৌরুষ
ছিটেফোটা বেদনার কৌটা পোরা টুপটাপ বৃষ্টি
আর ওল্টে পড়ে ভিজে যাওয়া চেনা চেনা নাম
যাকে নাকি কেউ কেউ ভালোবাসা বলেই ডাকে !
বাতাসের বিপরীতে কী নিঃস্ব ফুসফুসগুলো
খিল এঁটে বুঝে নেয় বাতাসের দাম্পত্য কলহ !
আমি তো দেখছি সবই-
ঘুটঘুটে অন্ধকার বলে আদৌ কি আছে কিছু ?

নদীটা কখন যে লুকিয়েছিলো বুকে
উৎস থেকে নিয়েছে সে বিনাশের জল
গুপ্ত সমুদ্র হয়ে ফুঁসলো কখন ! বুকের নিথর পাড়
কী এমোন এসে যায় তাতে ! নদীর গন্তব্য থাকে,
ল্ক্ষ্যহীন সমুদ্র যদি খুঁজে ফেরে পাখির আবাস
লোকালয় নতজানু হলোই না হয় !
পাড়ে বসে কাঁহার আরোগ্য চাও ? পাখিদের হাসপাতাল নেই
থাকেনা আরোগ্যের আগাম চিকিৎসার বিল !
ওগুলো মানুষের যাপনের অংশীদার কেবল ;
কবি তো মানুষ নয়, অন্য কিছু,
অন্যকোন অনুষঙ্গেই মানানসই এরা !

তবু
অমরত্বের এই অসহ নির্বাসন
কবিকেই কেন পোহাতে হয় বার বার !
(০১/০৬/২০০৮)

.

[somewherein]

ORPHEUS

কবি
-রণদীপম বসু

.
সম্ভোগে সন্তান চায় কবিই প্রথম, প্রতিবার ;
দিব্যকান্তি সন্তানের বাৎসল্য-লিপ্সায় নেমে
উপগত হতে হতে-
গর্ভধারী দেহলিও ছেড়ে যায় তাকে।
এবং কাম-নগ্ন নির্বোধ মোহের শেষে
নির্বিকার ফেঁসে যায় যে-
কবি কি জন্মাতে পারে সেইসব জন্মচক্র উপেক্ষার
অন্ধ-কাব্য-শোক ?

অবশেষে স্বমেহনে লিপ্ত হন যিনি,
তিনি কোন কবি নন-
জনৈক উজবুক।
(২০/০৭/২০০৭)

কবি-কবিতা-ছড়া-শিল্প-বিভ্রম…
রণদীপম বসু


গুরুচণ্ডালিকা
আলোচনার কান ধরে টান দিলে কবিতা  (poem)  এসে যেতেই পারে। তাই প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে এটা কোন কবিতার কাশ বা কাব্য আলোচনা নয়। স্রেফ অভিজ্ঞতা বিনিময়। আপ্তজনদের গপ্পোসপ্পো থেকে শিক্ষার্থী হিসেবে কিছু শিখতে চাওয়াজনিত যে বদহজমের সূত্রপাত, সেটাকে খালাস না করা অব্দি স্বাচ্ছন্দ্যের দেখা পাচ্ছি কই ! তাছাড়া শেখা বা জানার প্রক্রিয়াগত ভিন্নতা ব্যক্তিমাত্রেই স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব মেধা, বোধ ও সীমাবদ্ধতার স্কেলে নিয়ন্ত্রিত বলে রহিমকে রাম বানিয়ে ফেলা বা শিল্পের কলা’কে হস্তী-ভক্ষ্য কদলীবৃক্ষ বানিয়ে গিলে ফেলার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়ার নয়। এমন দুর্যোগ ঘনীভূত হলে হাত তোলে জানান দেয়ার স্বাধীনতা সবারই রয়েছে, যে, আর্ট  (art) আর অষ্টকদলী একই বস্তু নয় !

দুর্দান্ত সব কবিতা উপহার দিয়েও বোহেমিয়ান শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো শক্তিমান কবি  (poet) যখন নিজেকে পদ্যকার হিসেবে ঘোষণা দেয়ার কৌতুক আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন, তখন সত্যিকারের কবিরা নিজ নিজ কৃতকর্মগুলো হাতে নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসেন বৈ কি। কবি শব্দের আগে একটা ‘সত্যিকারের’ শব্দ বসানো মানেই যুক্তিবিদ্যার আরোহী পদ্ধতি অনুযায়ী কাল্পনিকভাবে হলেও প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্টো স্বভাবের আরেকটা সত্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়া হয়। তাহলে কি মিথ্যাকারের কবিও রয়েছে ! রয়েছে বৈ কি ! নইলে কবি জীবনানন্দ দাশ কেনই বা সাধ করে ‘কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি’ উক্তি করে এমন ল্যাঙ মারতে গেলেন !

জীবনানন্দের এই উক্তিটাতে যে অবশ্যই জটিল একটা বিভ্রম লুকিয়ে আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। তাই উক্তিটাকে খুব সরলভাবে নেয়ারও উপায় নেই। এ কারণেই কৌতুহলটা উচ্চকিত হয়ে ওঠে, বিভ্রমটা কী ? তাঁর উক্তির প্রথম অংশটা আবারো আমরা খেয়াল করি, ‘কবিতা লিখে অনেকেই…’। হাঁ, লিখতেই পারে ! তাতে কী হয়েছে ? হয়েছে বা হচ্ছে অনেক কিছুই, আবার কিছুই না। যে কোনো কাজের অনিবার্য ফলাফলের মতোই কিছু সম্ভাব্যতাকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এদের ‘কেউ কেউ কবি’ বলে। কিন্তু উক্তির প্রথম অংশে কাজের ডিটেইলসটা কিন্তু স্পষ্ট নয়। এখানেও কতকগুলো সম্ভাব্যতার অনির্দেশ্যতা দেখতে পাই আমরা। যেহেতু অনেকেই কবিতা লিখেন, তাহলে অনেকে আবার অকবিতাও লিখেন। আবার অনেকে কবিতাই লিখেন না। অকবিতা লিখলে কবি হওয়া যায় কিনা, সে বিষয়টা এখানে অপ্রযোজ্য হয়ে আছে। অকবিতা লিখা এবং কবিতা না লিখা আবার দুটো ভিন্ন বিষয়। আমাদের অনেকেই যে প্রশ্নটি করতে দ্বিধা করেন তা হলো, কবিতা না লিখলে কি কবি হওয়া যায় না ? প্রশ্নটাকে অর্থহীন ভেবে উড়িয়ে দেয়ার কোন কারণ নেই। জীবনানন্দের ভাষায় কেবল কবিতা লিখলেই যদি কবি হওয়া না যায়, তাহলে উল্টো যুক্তিতে যদি বলি, কবিতা না লিখেও কেউ কেউ কবি, এটাকে কি ফ্যালাসি বলবো ? মোটেও ফ্যালাসি নয় তা।

যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় ফ্যালাসি হচ্ছে অর্থহীন প্রতিতুলনা দিয়ে কোন উদ্ভট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। যেমন, আমার দাঁড়ি আছে, ছাগলেরও দাঁড়ি আছে, অতএব আমি ছাগল এইরকম। তাই বিষয়টা ফ্যালাসি না হলেও ফ্যালাসির মতো মনে হতে পারে। কেননা জীবনানন্দের উক্তি থেকে এটা অন্তত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কবিতা লেখাটা কবি হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন ফ্যাক্টর বা শর্ত নয়। তাহলে কী সেই শর্ত ? আলোচনার এই উন্মুক্ততায় এসে এখানেই আমরা থমকে যাই। সেরকম কোন শর্ত এখনো স্বতঃসিদ্ধতা পায় নি বলেই অনুমিত একটা ধারণা থেকে আমরা এটা বুঝে নেই যে, কবি একটি অন্তর্গত সত্তার নাম। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে গেলে যে সব সৎ-গুণাবলী ও সুকৃতি থাকতে হয়, একজন কবির সত্তায় তা তো থাকবেই, বরং মেধা মনন আর সৃজনশীলতায় মাখানো আরো কিছু উপলব্ধির অনুরণনও সেখানে থাকতে হয়।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসবে, আমরা কী করে বুঝবো ‘তিনি’ একজন কবি ? বুঝার কি কোনো কায়দা আছে ? এ ক্ষেত্রে আবারো যুক্তির সিঁড়িকেই মাধ্যম করে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। একবাক্যে যেহেতু জগতের সবাইকে বাছবিচারহীনভাবে কবি বলে স্বীকৃতি দেয়াটা বালখিল্য উদ্ভটতা হিসেবে গণ্য হবে, তাই উল্টোভাবে ‘কেউ কবি নয়’ থেকে পর্যায়ক্রমে সামনে কবি হওয়ার দিকে আগানোটাই যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া বলে মনে হয়। অর্থাৎ ধীরে ধীরে একজন কবি তৈরি হয়ে ওঠেন। সুকৃতি আর মানবিক গুণাবলীর সমন্বয়েই এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা আগাতে থাকে। যাঁর মধ্যে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার মানবিক গুণাবলীরই ঘাটতি রয়েছে, তিনি যদি মানুষই হয়ে ওঠতে না পারলেন, কবি হবেন কী করে ! এখানে আবার প্রশ্ন, মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ একজন পরিপূর্ণ মানুষ আর কবির মধ্যে তফাৎটা কোথায় তাহলে ? পরিপূর্ণ একজন মানুষ হওয়ার পরও কবি হয়ে ওঠতে বাকি যে মেধা মনন বোধ উপলব্ধি ও সৃজনশীল সুকৃতিটুকু দরকার, মূলতঃ সেটাই তফাৎ। এবং খুব সঙ্গতভাবেই, যেহেতু প্রসঙ্গ কবি হওয়ার, তাই শেষ পর্যন্ত কবিতা বা কাব্যবোধের বিষয়টা অনিবার্যভাবে চলে আসাটাই তো স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত।

জীবনানন্দের কথাতেই ফিরে যাই আবার- কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি। এখন মনে হয় কথাটার অন্তর্গত ভাবের আরেকটু কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা। আমাদের উপলব্ধিবোধটাকে একটু অন্তর্মুখী করে কয়েকটা বিষয় এবার মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। ধরে নেই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় অগ্রগামী, ব্যক্তিক স্বভাব, রুচি, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সার্বিক জীবনাচারে মানবিক বিবেচনাবোধে উত্তীর্ণ একজন ‘তিনি’ যে চমৎকার একজন মানুষ হিসেবে স্বীকৃত হতেই পারেন তাতে আমাদের দ্বিমত নেই। কিন্তু স্রষ্টা হিসেবে তাঁর রচনায় যদি সৃজনশীল কাব্যবোধের প্রকাশ না ঘটে, তাহলে কবি পরিচয়ের প্রাসঙ্গিকতা এখানে কতোটা প্রযোজ্য হবে ?

আবার অন্যদিকে একটি রচনা কবিতা হয়ে ওঠতে যে সব শর্তাবলী প্রয়োগ আবশ্যক, সেই সব কিছু ঠিক রেখেই ‘তিনি’ উৎকর্ষ কাব্যসাধনায় মগ্ন রয়েছেন ঠিকই। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে তিনি অসৎ, সামাজিক জীবনে অসদাচারী এবং সামষ্টিকভাবে তিনি মানবতার বিরুদ্ধ অবস্থানে নিজেকে জড়িত রেখেছেন বা পশ্চাৎপদ মানসিকতায় তিনি প্রগতির বিপক্ষ-কাতারে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, তাঁকে কি আমরা কবি বলতে পারি ?

‘কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি ’, জীবনানন্দের কথাটিকে এসব শ্রেয়বোধ দিয়ে যদি বিশ্লেষণ করি আমরা, তাহলেই হয়তো অনেকগুলো বিভ্রমের পর্দা আমাদের চোখের সামনে থেকে নির্দ্বিধায় অপসৃত হয়ে যাবে। আমরা কি আদৌ করবো তা ? গুটিকয় পঙক্তি বা বাক্য রচনা করেই আমরা বুঝে না বুঝে নিজের বা অন্যের নামের আগে ‘কবি’ উপাধীর সুদৃশ্য যে তকমাটি অনায়াসে বসিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করছি না, এটা কি আমাদের বাছবিচারহীন উদারতার মূর্খামী, না কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বুদ্ধিবৃত্তিক বালখিল্যতা, এই আত্মবিশ্লেষণটা কি এখন জরুরি নয় ?


অতঃপর ছড়াকার-ছড়াশিল্পী সমাচার
ছড়াসাহিত্যেও ইদানিং মনে হয় একটা পরিচিতি সংকট ক্রমেই দৃষ্ট হয়ে ওঠছে। রচনার মূল যে অভিক্ষেপ ছড়া, সেটা কি হচ্ছে নাকি হচ্ছে না সে বিষয়টা খুব সচেতনভাবে আমরা এড়িয়ে তো যাচ্ছিই, বরং কেউ কেউ আবার এতদিনকার ‘ছড়াকার’ পরিচয়টাকে নিজের জন্য অতি অপ্রতুল বিবেচনায় আকর্ষণীয় নতুন তকমা ধারণ করতে চাচ্ছি ‘ছড়াশিল্পী’ নামে ! ছড়াকে যেনতেন একটা আকার হয়তো দিয়ে দিচ্ছি আমরা, কিন্তু এই ছড়াকে  (rhyme)  শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে নিজস্ব মন ও মননে কতটুকু সৃজনশীল শিল্পসত্তা ধারণ করতে হয়, তা কি আদৌ ভাবি আমরা ?

যারা এই অল্পতে তুষ্ট নন, তাঁদেরকে বিনীতভাবে বলি, একজন ব্যক্তি ক্রমে ক্রমে শিল্পী হয়ে ওঠলে এটা সমাজের জন্য সংস্কৃতির জন্য অবশ্যই গৌরবের ব্যাপার। এতে সমাজ সংস্কৃতি ঋদ্ধ হয়ে ওঠে। আমরাও তো এই উত্তরণই চাই। কিন্তু চিন্তাভাবনায় ঘাটতি রেখে এমন স্বেচ্ছামুকুট ধারণ করার আগে অন্ততঃ এক হাজারবার ভাবা জরুরি নয় কি যে, অন্যের কথা বাদ দিলেও নিজের কাছেই নিজেকে যেন জবাবদিহিতায় পড়তে না হয় ? কারণ তিনিই শিল্পী যিনি নিজের মধ্যে শিল্পের কলাকৈবল্যসমেত এক মহৎ কবিসত্তা ধারণ করেন।

আমাদের লোকছড়া নিয়ে ব্যাপক সন্ধান ও গবেষণা থাকলেও আধুনিক ছড়া সাহিত্যের গবেষণাকর্ম খুঁজতে এখনো আমাদেরকে দূরবীণ আর অনুবীক্ষণযন্ত্র হতে নিয়েই বেরোতে হয়। ঘাড় ফেরালেই যেদিন এই চর্মচক্ষে আধুনিক ছড়াসাহিত্যের প্রয়োজনীয় গবেষণাকর্ম অনায়াসলব্ধ হয়ে ওঠবে, সেদিনই হয়তো ছড়াসাহিত্যের এরকম বহু অনর্থক সংকটও অনেকাংশে কেটে যাবে। আমাদেরকে সেদিনের প্রতীক্ষায়ই থাকতে হবে বৈ কি…।
(১৭/০১/২০০৯)

(Image:Sculpture ‘the thinker’ by Rodin)


রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 412,070 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 122 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 1 month ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements