h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Archive for the ‘ঝাপসা চোখে’ Category

IMG_1624 [1600x1200]
.
| যুদ্ধাপরাধ ও শাহবাগ : হতাশা-মোড়ানো যে স্ট্যাটাসটির জন্য এখন লজ্জিত আমি !
রণদীপম বসু

০৫ ফেব্রুয়ারি যথারীতি অফিসে গিয়েছি সকাল ১০টায়। তারপর থেকেই একটা রোমাঞ্চকর অস্থিরতায় অপেক্ষা করছিলাম, কখন মানবতাবিরোধী কুলাঙ্গার অপরাধী কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা শুরু হবে ! কাজের ফাঁকে মোবাইলে অনলাইন আপডেট খুঁজছিলাম থেকে থেকে। পৌনে এগারটায় শুরু হলো দীর্ঘ বয়ানের রায়। রহস্যময় বিতর্কিত চরিত্রের সহকর্মীদের মুখ প্রয়োজনাতিরিক্ত নিরব ও থমথমে। ভেতরে ভেতরে আমার প্রস্তুতি কিভাবে এতোদিনের পুষে রাখা বিজয়ানন্দটা যথাযথভাবে প্রকাশ করবো। ফাঁসির রায় শুনবো খুব নিশ্চিত হয়ে আছি।
. Read the rest of this entry »

Goa-04

তাঁর কথা মনে এলে…
রণদীপম বসু

.
বিষণ্ন পঙক্তিমালা

‘একবার উঠেছিল, তবু মাঝপথে/ যেন থেমেছে করাত,/ শুধু গুঁড়ো পড়ে আছে।/ অর্ধেক খেলার পরে সমস্ত পুতুল গেছে উঠোন পেরিয়ে;/ অর্ধেক প্রেমের পর রোদ পড়ে এসেছে শরীরে/ অর্ধেক ঘুমের পর তুমি চলে গেছ।’……
-(অসমাপ্ত/ কাব্যগ্রন্থ:সদর স্ট্রিটের বারান্দা/ প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত)

এমন বিষণ্ন অসমাপ্তিই বুঝি জড়িয়ে থাকে মানুষের প্রতিটি জীবনে; জীবনের প্রতিটি কাণায়। ভিন্নতা হয়তো আকারে, প্রকারে আর উপলব্ধির সঘন বাস্তবতায়। তবু বিষণ্নতা তো বিষণ্নতাই। যাঁকে নিয়ে বলতে চাই, রক্ত-মাংসের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা নিয়ে যিনি এই আলো হাওয়া জল মাটিতে একদিন ঘুরে বেড়িয়েছেন, আজ এক আলোকিত মুখচ্ছবি! তাঁকে নিয়ে বলার কীইবা সুযোগ ও সংগতি রয়েছে আমার? খ্যাতিমান ব্যক্তিকে সবাই চেনেন, কাছে বা দূরে নিজ নিজ অবস্থান থেকে। কিন্তু আমার চেনাটা কি আদৌ চেনা? গ্রহ বা নক্ষত্রকে জয় করেন যিনি, তিনি জানেন এর নাড়ির খবর। ছোঁয়ার দূরত্ব পেরোনো হয় না যার, তার তো শুধুই চলার ইতিহাস। আমাকেও বলতে হলে সেই চলার ইতিহাসই তো বলতে হবে। Read the rest of this entry »

34

কখনো লাল কখনো কালো…
রণদীপম বসু

(০১)
ঝনঝন করে মোবাইলটা বেজে ওঠলো অসময়ে। আচমকা গভীর কাচা-ঘুম ভেঙে স্থান-কাল-পাত্র সচেতন হতে হতে কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো। ফোনটা বেজেই চলছে।
সকাল আটটা হয় হয়। শুক্রবার। ‘অফ ডে’-তে নরমালি দেরীতেই বিছানা ছাড়ি। মফস্বলের কর্মময় শাখা-জীবনে ‘অফিস ডে’-তে ভোর ছ’টা বা তারও আগে থেকেই গোটা দিনের ঘড়ি-ধরা যান্ত্রিক রুটিনেই অভ্যস্থ আমরা। ‘ন্যাচার অব জব’টাই এমন যে, তার ব্যত্যয় হওয়ার কোন উপায় নেই, সুযোগও নেই। কিন্তু আমরা তো যন্ত্র নই। রক্ত-মাংশের এই শরীরটা যে মেশিন বা যন্ত্র নয়, তা তাকে বুঝিয়ে দিতে হয় মাঝে মাঝে। তাই ছুটির দিনগুলোকে ব্যক্তিগত জীবনাচারে অনিয়মের কারখানা বানিয়ে সেটা দেখিয়ে দিতে কখনোই কার্পন্য করি নি আমি। হয়তো আগের দিন রাত তিনটে বা চারটে পর্যন্ত পড়াশোনা লেখালেখি করলাম, ঘুম থেকে ওঠলাম সাড়ে এগারোটা বাজিয়ে, সকালের নাস্তা সারলাম দুপুর সাড়ে বারোয় (যদি তা নসিবে থাকে) ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই অনিয়মের সুযোগও কি সব সময় জুটে? কখনো বা পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রামে আষ্ঠেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকি, আবার কখনো কখনো অনির্ধারিত প্রোগ্রাম এসে হামলে পড়ে, সব গড়বড় করে দেয়।

দূর্গোৎসবের দশমীর সরকারি ছুটিটা রোববার হওয়ায় উইক-এণ্ডে তিনটে দিন হাতে পেয়ে একেবারে মুক্তকচ্ছ। বেশ রিলাক্স মুডে ছিলাম। ইতিপূর্বে কখনোই যা বাস্তবায়নের সুযোগ হয় নি, পরিকল্পনা নিলাম, এবার সত্যি সত্যি স্ত্রী সন্তানকে কাছে কোথাও পূঁজো দেখাতে নিয়ে যাবো। অতএব রিলাক্স মুড তো বটেই। আর আমার রিলাক্স মুড মানেই অনিয়মের আখড়াটাকে চলমান করে দেয়া। নির্ঘাৎ সাড়ে এগারোর আগে চোখের পাতা ফাঁক হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তীব্র রিং-টোনের ধাক্কায় একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আচ্ছন্ন হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা টেনে ঘুম-জড়িত চোখে মনিটরে তাকাতেই সচকিত হয়ে ওঠলাম। নিভা-জ্বলা আলোয় কলার আইডি ভেসে ওঠছে, ইংরেজি হরফে- ‘যোনাল অফিস নোয়াখালী’। যোনাল ম্যানেজারের নম্বরটা এভাবেই সেভ করা ছিলো। ঘুমের রেশ কেটে গেছে ততক্ষণে। খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলে এই অফ-ডে তে একজন যোনাল ম্যানেজার এরিয়া ম্যানেজারকে বাদ দিয়ে তাঁর অধীনস্থ কোন ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে এভাবে সরাসরি কল করার কথা নয়। ‘ও-কে’ বাটন চেপে কানে ধরতেই আমার সালাম সম্ভাষণের মাঝেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, বাবু, আপনি কোথায় ? ‘এই তো স্যার আমি বাসায়।’ আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই সেই উদ্বিগ্নতা নিয়েই বললেন, আপনি এক্ষুনি রাজাপুর শাখায় যান; আপনার এরিয়া ম্যানেজারকে ফোনে পাচ্ছি না; গিয়েই আমাকে ফোন করতে বলবেন। আমি ‘জ্বী স্যার’ বললাম ঠিকই; মনে হলো তার আগেই ফোনটা কেটে গেছে।

আকস্মিক অস্বাভাবিক অভিঘাতে তাৎক্ষণিক সচেতন-বোধ ঠিক থাকে না। আমার অবস্থাও খানিকটা সে রকমই। কয়েক মুহূর্ত থিতু হয়ে ভাবতে লাগলাম। কিন্তু সবকিছুই হেঁয়ালির মতো মনে হলো। ছুটির দিনের এই সাত-সকালে এরিয়া ম্যানেজারকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না; আমাকে রাজাপুর শাখায় গিয়ে এরিয়া ম্যানেজারকে কল ব্যাক করার জন্য বলতে হবে ! একেবারে এলোমেলো অবস্থা। মাথায় ততক্ষণে যুক্তিবোধের বারোটা বেজে গেছে। যাক্ কী আর করা। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। যোনাল ম্যানেজারের নির্দেশ; অতএব বিছানা ছেড়ে টুথব্রাশ মুখে চেপে বাথরুমে ঢুকলাম।

আমার জন্যে এই অসময়ে নাস্তা রেডি থাকার কথা নয়। হয়তো মিনিট দশেক পেরিয়েছে। নাস্তার তাড়া দিয়ে গোসলে ঢুকবো, আবার ফোন বেজে ওঠলো- যোনাল ম্যানেজার নোয়াখালী। ‘বাবু, কোথায় ?’ ‘এইতো বেরুচ্ছি স্যার।’ ‘এখনো যান নি !’ ফোন কেটে গেলো। বুঝলাম, অবস্থা গুরুতর। কীসের নাস্তা, কীসের গোসল ! ঝটপট পোশাক পাল্টে মটর সাইকেলে স্টার্ট নিলাম। পেছন থেকে রূপা, অর্থাৎ আমার নিরূপায় স্ত্রী, কী সব তেল নুন সব্জী মাছের ফর্দ আওড়ে যাচ্ছে। কে শোনে কার কথা! একশ’ সিসি হোণ্ডার স্পীডোমিটার পারলে এক মোচড়ে হান্ড্রেড-টেন’এ উঠিয়ে দিই।

(০২)
রাজাপুর শাখাটি তখনো নোয়াখালী যোনের আওতায় দাগনভূঁইয়া এরিয়ার অন্যতম শাখা। আমার কর্মস্থল জায়লস্কর শাখার পার্শ্ববর্তী। সমস্যাবহুল শাখা হিসেবে একই এরিয়াধীন পার্শ্ববর্তী শাখাসমূহের ম্যানেজারদেরকে বিশেষ প্রোগ্রামে প্রায়ই যেতে হতো ওখানে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে। তাই ওখানকার রাস্তাঘাট এলাকার পরিবেশ আমার অত্যন্ত পরিচিত এবং শাখার সহকর্মীদের সাথে অন্তরঙ্গতাও অনেকটা ঘনিষ্ঠ। নিজস্ব বিল্ডিং শাখা। অফিসের গেটে গিয়ে হোন্ডায় ব্রেক কষেই টের পেলাম পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে, ভারাক্রান্ত। শাখার সহকর্মী যারা কর্মস্থলে রয়েছেন তাদের সাথে কুশল সম্ভাষণের মধ্যে খবরটা শুনেই একেবারে হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম- কী ! কী বলছে এরা ! ইউছুফ সাহেব খুন হয়েছে ! এরকম খবরের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত নই। লম্বাচূঁড়া শক্তসমর্থ কালো শরীরের হাসিখুশি মায়াবী তরুণ মুখের তুখোড় সহকর্মী সেই ইউছুফ, খুন হয়েছে ! কোথায়, কীভাবে, কেন ? এতো সব প্রশ্নের উত্তর শাখার জীবিত সহকর্মীরাও জানে না তখনো। শুধু এটুকুই বললো- গতকাল অর্থাৎ বৃহষ্পতিবার অফিস টাইম শেষে ইউছুফ পূর্বানুমতি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ি তার চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার চর আলগি ইউনিয়নে। মেঘনার প্রত্যন্ত চর এলাকা। কিন্ত ভোর বেলা বিভিন্ন মাধ্যম হয়ে শাখায় খবর এলো- নরসিংদীর কাছে কোথায় যেন তার লাশ পাওয়া গেছে। একেবারে ভিন্ন দিগন্তে ! ‘এরিয়া স্যার কই ?’ উত্তরে সহকর্মীরা জানালেন, কর্মচারি সমিতির নেতা তৈয়ব সাহেবকে নিয়ে যোনাল অফিসে গেছেন। এরই মধ্যে আবার ফোন বেজে ওঠলো; এরিয়া ম্যানেজার দাগনভূঁইয়া- ‘এই বাবু, আপনি কোথায় ?’ অবস্থান জানালাম তাঁকে। ‘শাখায় চলে আসেন; দ্রুত রেডি হন, নরসিংদী যেতে হবে। দশ মিনিটের মধ্যে রওয়ানা দিচ্ছি আমরা।’ আবার রিটার্ন ব্যাক, আমার শাখার উদ্দেশ্যে; সিলোনীয়ায়। যেখানের আমার ব্র্যাঞ্চ অফিস, জায়লস্কর শাখা।

মাথায় অস্থিরতা। হোন্ডার হ্যান্ডেল রাস্তা ছেড়ে পাশের ঢালের দিকেই নজর টানছে বেশি। সতর্ক হতে চেষ্টা করলাম। বাসায় ফিরে ঘরে হোন্ডাটা ওঠাতে না ওঠাতেই আবার এরিয়া ম্যানেজারের ফোন- ‘বাবু, আমরা আপনার অফিসে; এক্ষুনি আসেন, সময় নাই।’ যুগপৎ অস্থিরতা আর বিভ্রান্তি। রূপা’র বাড়িয়ে দেয়া নাস্তার প্লেটটা কখন কীভাবে মুখে ঢুকিয়েছি বলতে পারবো না। হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়ছি। তাঁর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে খুব কষ্ট হলো। শুধু বঞ্চিতই করে গেছি তাঁকে; কথা দিয়ে কোন কথাই রাখা হয় নি আমার। তাঁর নিজের প্রিপেইড মোবাইলটা আমার দিকে বাড়িয়ে বললো- এটা নাও, অফিসেরটা রেখে যাও। তখনও মাথায় কাজ করছিলো না যে, পল্লীফোনের রোমিং-বার অনুযায়ী নরসিংদীতে অফিসের এই ফোন আদৌ কার্যকর থাকবে না । গোটা দেশে গ্রামীণের পল্লীফোনের রোমিং সুবিধা নিশ্চিৎভাবেই এই ঘটনার সন অর্থাৎ ২০০৪ সালের পরেই চালু হয়েছে। আউলা মাথায় অফিসের ফোন নিয়ে বেরুলে মাঝপথে সম্পূণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে কী যে মহা ফাপড়ে পড়তে হতো, তা ভাবতেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে ওঠলো ! লাইফ-পার্টনার হিসেবে আবারো কৃতজ্ঞ হলাম তাঁর প্রতি।

(০৩)
অফিসে ঢোকার আগেই এরিয়া ম্যানেজার বোরহান আলী বেগ এবং কর্মচারি সমিতির সভাপতি তৈয়ব উল্লাহ বেরিয়ে এলেন। তখন প্রায় এগারোটা। সিলোনীয়া বাজার থেকে একটা চলতি গাড়িতে উঠে গেলাম তিন জন। ঢাকার অদূরে কাচপুরে নেমে ফের নরসিংদীর গাড়িতে উঠতে হবে। দীর্ঘ ভ্রমন। এই ভ্রমনকালীন সময়ে যোগাযোগের জন্য যোনাল ম্যানেজারকে নতুন কনটাক্ট নাম্বারটা জানিয়ে রাখলাম ফোনে। একে তো রমজান মাস, পথের ভোগান্তি তো আছেই; শেষ বিকেলে নরসিংদীর শিবপুর শাখার ম্যানেজার সাহেবের কনটাক্ট মোতাবেক নরসিংদী হাসপাতালে পৌঁছলাম। এমনিতেই স্নান খাওয়া বিশ্রাম নেই, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থাপনার কথা আর না-ই বা বললাম। ওদিকটা সামলেছেন শিবপুরের ম্যানেজার সাহেব, তাঁর ব্যক্তিগত পারদর্শিতা দিয়েই বলা যায় (এ মুহূর্তে তাঁর নামটা মনে নেই)। লাশবাহী পিক-আপ ভ্যান ভাড়া ও কফিন ক্রয় করে অন্যান্য ফর্মালিটিজ সেরে হাসপাতাল মর্গে গেলাম- লাশ বুঝে নিতে হবে।

সরকারি নথিপত্রে যদিও তখনো অজ্ঞাত-পরিচয়, তবু দেখেই চিনে ফেললাম- এইতো দুরন্ত আত্মবিশ্বাসী যুবক মোঃ ইউছুফ শুয়ে আছে! কিন্তু নির্জীব। পোস্টমর্টেম-উত্তর সেলাই করা মানুষের লাশ, তাও যদি হয় অতি পরিচিত কারো, তার দিকে অভাবিত চেয়ে থাকা, এ কী চাট্টিখানি কথা! মুহূর্তেই বুঝে গেলাম, এরকম দৃশ্য আমার জন্য নয়, এতে মোটেও অভ্যস্ত নই আমি। বেরিয়ে এলাম। চোখ থেকে এমন বীভৎস লাশের ছবি তাড়াতে পারছি না কিছুতেই। দূরে গিয়ে হাসপাতাল চত্বরেই ঘাঁসের উপর মাথা গুঁজে বসে রইলাম থ হয়ে। সাদা কাফনের কাপড়ে গোটা লাশটাকে ভালোভাবে মুড়িয়ে কশে বেঁধে কফিন বন্দী করে বরফ আর চাপাতার গুড়ো দিয়ে প্যাক করে ফেলা হলো। ধারেকাছে ঘেষার অবস্থাও নেই আমার। এ দৃশ্য দেখার মতো মানসিক অপ্রস্তুত আমি, তবু দূর থেকে বারে বারে চোখ তুলে দেখছিলামও তা। এদিকে ইফতারের টাইম আসন্ন। সেই সকালের পর থেকে এক ফোঁটা পানিও মুখে পড়ে নি। সে সুযোগ, রুচি বা অবস্থাও ছিলো না। তবু লাশবাহী গাড়ির স্টার্ট নেয়া হলো। কীভাবে কত দ্রুত এ লাশ যথাযথ হস্তে গছিয়ে দেয়া যায় কেবল সে চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো। তারপর পরবর্তী বারোটি ঘণ্টা, খাওয়া নেই ঘুম নেই বিশ্রাম নেই, এক অবিচ্ছিন্ন ঘোরের মধ্যেই কাটতে লাগলো। কাদের সাথে যেন ইফতারিতে কিঞ্চিৎ ভাগ বসিয়েছিলাম, এতটুকুই।

(০৪)
ড্রাইভারের পাশে এরিয়া ম্যানেজারকে বসিয়ে কফিন-বদ্ধ লাশ ঘিরে খোলা পিক-আপ ভ্যানে আমরা দু’জন। সন্ধ্যার বাতাস কেটে শা শা ছুটছে গাড়ি। বাতাসের কানতালি শব্দের সাথে ঠাণ্ডাও টের পাচ্ছি বেশ। কুয়াশার আর্দ্রতা আর ধূলো-বালিতে শরীরের অনাবৃত অংশে চামড়ায় একটা আঠালো ভাব চেটচেটে হয়ে ওঠছে। চারপাশের গুঞ্জন কোলাহল ইত্যাদির মধ্যেও কেমন একটা গভীর নির্জনতার উপলব্ধি সব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠছে। এরকম পরিস্থিতিতে মানুষের ভাবনাগুলো বোধ হয় মৃত্যুচিন্তার গভীর উপলব্ধিতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আহা মৃত্যু, এর কাছে কত অসহায় মানুষ! কোথাকার কোন্ মানুষ কোথায় যে পড়ে থাকে!

কাঁচপুরে এসে ব্রেক কষলো গাড়ি। মোবাইল কনটাক্টের মাধ্যমেই এখানে এসে ইউছুফের ক’জন আত্মীয় এবং তাঁর বাড়ির পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর শাখার ম্যানেজার সাহেব আমাদের সঙ্গী হলেন। খবর পেয়ে বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে পথেই সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। এরাই মূলত পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন আমাদের। সবার চোখে মুখেই এক বিপণ্নতা, বিষাদের ছায়া। আবার ছাড়লো গাড়ি। সওয়ারি আমরা ক’জন জীবিত মানুষ আর একজন মৃতের অসময়ে ফেলে যাওয়া প্রিয়তম শরীরটা। গাড়ি ছুটছে। অপেক্ষায় আছে ইউছুফের প্রিয়জনেরা। একদিন আগেও যাকে ঘিরে এদের কত চাওয়া পাওয়া মান অভিমান স্বপ্ন কষ্ট, এখন এ সবই বাহুল্য; এক চিরায়ত অতীতের গর্ভে। সব ঠিকঠাক থাকলে কুমিল্লার কচুয়ার পেট কেটে আড়াআড়ি ছুটে চাঁদপুরে ইছলি ফেরী পেরিয়ে মধ্যরাতের ভ্রমন শেষ হবে চর আলগির কোন এক নিঝুম গ্রামে। রাত দু’টোয় তাঁকে শেষবারের মতো শুইয়ে দেয়া হবে মাটির প্রিয় গভীর কোলে।

আজ যে ইউছুফকে নিয়ে গাড়িটা ছুটে যাচ্ছে তাঁর বাড়ির দিকে, গতকালও ঠিক এ সময়ে সে গাড়িতেই ছিলো। অন্য কোন গাড়িতে। অন্য কোন লক্ষ্যে। কী ছিলো লক্ষ্যটা তাঁর? আমরা কেউ কি জানি? না কেউ জানতো? হয়তো ইউছুফও জানতো না তাঁর গন্তব্য। ফেনীর মহিপালে ইফতার শেষে যে গাড়িটাতে চড়েছিলো, সেটাই নরসিংদীর শিবপুরের কাছাকাছি এসে ডাকাতের কবলে পড়ে। এ গাড়ি তো তার বাড়ি যাবার সঠিক গন্তব্যের গাড়ি ছিলো না ! এটাতে কেন উঠলো সে ! কোথায় যাচ্ছিলো ? কর্তব্যরত পেট্রোল পুলিশ রাস্তার পাশে পড়ে থাকা যে অজ্ঞাত পরিচয় লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়, দেখতে নাকি অনেকটাই ইউছুফের মতো। লাশবাহী রিক্সাভ্যান চালক, দৈবক্রমে যিনি ইউছুফকে চিনতেন, থানায় লাশ নামিয়ে রেখে তৎক্ষণাৎ ছুটে গেছেন শিবপুর শাখায়, তাঁর বাড়ি ওখানেই। তিন চার মাস আগেও ইউছুফ এ শাখায় কর্মরত ছিলো। চিৎকার চেচামেচিতে শাখার ম্যানেজার সাহেব বেরিয়ে এসে বিস্তারিত শুনেই তড়িঘড়ি থানার দিকে ছুটলেন প্রাক্তন সহকর্মীকে সনাক্ত করার জন্যে, সত্যিই ইউছুফ কি না। অতঃপর নিশ্চিৎ হওয়ার জন্য তিনিই যোগাযোগ করলেন নোয়াখালীতে। আর তাঁরই তৎপরতায় সেই অজ্ঞাত পরিচয় লাশের পরিচিতি পুনঃস্থাপন হতে হতে ছুটে চলছে প্রিয় জন্মভিটার পাশে, হয়তোবা আবাল্যের প্রিয় গাছটার নীচে।

(০৫)
পদ্মা আর মেঘনার চাঁদপুর সঙ্গম পেরিয়ে মধ্যরাতের অন্ধকার ছিঁড়ে ফেঁড়ে গাড়িটা তীব্রবেগে ছুটছে নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে। তারই মধ্যে অন্ধকারে একটা মৃতদেহের গভীর নীরবতা ঘিরে জনা কয়েক আপাত জীবিত মানুষ অনিশ্চিৎ চেয়ে আছে নিজ নিজ কাল্পনিক দূরত্বের দিকে- অনিবার্য গন্তব্যে…
(২৯/০৯/২০০৮)

[sachalayatan]

ChittagongUniversity5

শাটল ট্রেন
রণদীপম বসু

.
সোহরাওয়ার্দী হলের নিয়মিত বোর্ডার হওয়া সত্ত্বেও ‘অভিজ্ঞতা মানেই জ্ঞান’ এই আত্মদর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে উদ্দেশ্যহীন আমি মাঝেমধ্যে শাটল ট্রেনটাতে চড়ে বসতাম, তার পেছনে কি কোনই উদ্দেশ্য ছিলো না ! ভাষা ব্যবহারের অভ্যস্ততায় ব্যবহার করা ‘বসতাম’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ বেশিরভাগেক্ষেত্রেই এর আদি অর্থে ঠিক থাকতো না। কখনো হতো ‘দাঁড়াতাম’, কখনো ঝুলতাম, কখনো লটকাতাম, কখনো বা মাইনকা চিপায় পড়তাম ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনকার শামসুন্নাহার হল নামের নতুন ও পুরনো লেডিস হল দুটোর তাবৎ সৌন্দর্য্যের অহঙ্কারকে এতিম বানিয়ে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব সুন্দরীরা কেনই বা চট্টগ্রাম শহর থেকে আসা যাওয়া করবে, এর সুলুকসন্ধান নেয়াটাও ওই বয়সের জন্য অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ ছিলো বৈ কি। সব দেশে সব কালেই তারুণ্যের মজমা হয়তো একই রকম। তবু সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনকার মতো এতোটা ঝলমলে চকমকে হয়ে উঠেনি তখনো। অনেকগুলো পাহাড় তখনো আড়াআড়ি কাটা হয়ে বড় বড় লিঙ্ক রোড এবং আরো ছাত্রছাত্রী হলগুলো তৈরি হয়ে ওঠেনি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অহঙ্কার ‘অপরাজেয় বাংলা’র স্থপতি সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ এর গড়া সেই দুর্দান্ত স্বাধীন শহীদ মিনারটার জায়গায় অন্য এক শহীদ মিনার তখনো আমাদের চিন্তার অগম্যে ছিলো। আরো অনেক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও নাকি হয়ে গেছে এখন। কিন্তু সেই চারদিকে চেনাঅচেনা বুনো ঝোপঝাড় লতাগুল্ম গাছগাছালি জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে একেবেঁকে চলে যাওয়া কালো সাপের মতো সরু রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো প্রাকৃতিক জীবন, সে এক অন্য জীবন ! কতকাল আগে ফেলে এসেছি ! আর যাইনি কখনোই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনগুলোর এখনকার অবস্থা কেমন জানি না, তবে কুড়ি বাইশ বছর আগেও যে ওটাকে আমরা মানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের বাড়ির আঙ্গিনাই ভাবতাম তাতে কোন ভুল ছিলো না। চট্টগ্রাম শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, এই নির্ধারিত যাতায়াতে ছাত্রছাত্রী ছাড়া অন্য কোন যাত্রী খুব একটা উঠতো কি না তা ভালো করে খেয়াল করে দেখিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকরাও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় বাস সার্ভিস তো ছিলোই। তবু ছাত্রছাত্রীদের পছন্দের শাটল সার্ভিসটার বৈশিষ্ট্যই আলাদা। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও আগাপাছ মুরগীবোঝাই এই শাটল ট্রেনটাকে যদি চলন্ত অবস্থায় অলৌকিকভাবে অনেকগুলো টুকরো টুকরো করে কেটে নেয়াও যেতো, তাহলেও প্রতিটা টুকরোতেই হয়তো দেখা যেতো এক বা একাধিক বিচিত্র সব জটলা বিচিত্রতর হৈ হুল্লোড়ে ব্যস্ত আর একেকটা বৈচিত্র্যময় গ্রুপ হয়ে গান বাদ্য নৃত্য অভিনয় কী নয় ইত্যাদির উচ্ছ্বল তারুণ্যের আড্ডায় মুখর হয়ে আছে। ছেলেতে মেয়েতে কোন বিভেদ নেই। কেউ সীটে কেউ হাতলে কেউ জানলায় কেউ মেঝেয় কেউবা সিঁড়িতে। বগির বাইরে ছাদও বাকি নেই। এই মুখরতার মধ্যে ট্রেনটা কি সত্যি সত্যি নির্ধারিত গন্তব্যে যাচ্ছে না কি পাতালের রাস্তা ধরেছে, অথবা প্রকৃতির মহাজাগতিক নিয়মগুলোর দু-একটা ওলোটপালট হয়ে আচমকা আকাশে উড়াল দিলেও বোধ করি এরা টের পেতো কি না সন্দেহ !

আর পাবেই বা কী করে ? প্রকৃতি তার কৃত্রিমতাবর্জিত আদি সৌন্দর্যকে অসংখ্য পাহাড় টিলা ঢাল বন বাগান আর হারিয়ে যাবার মতো অপরূপ গাঢ় সবুজ দিয়ে যেভাবে এক বুনো সৌম্যতায় ঘিরে রেখেছে গোটা ক্যাম্পাস, প্রকৃতির মতোই ওখানে বেড়ে ওঠা তারুণ্যে এর গভীর প্রভাব যাবে কোথায় ! ফলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রকৃতির সহজ সরল বিশ্বাসের বন্ধন তাদেরকে বহু অসভ্য জটিলতা থেকে মুক্ত রেখে প্রাণিত সবুজ করে রেখেছিলো। এই সহজীয়া বন্ধনটাই একদিন নষ্ট হয়ে গেলো ছিয়াশির নভেম্বরে গোটা দেশ থেকে এনে জড়ো করা বহিরাগত জেহাদি ক্যাডার দিয়ে ঘটানো ইসলামী ছাত্র শিবিরের এক সশস্ত্র জংলী অভ্যুত্থানে।

দৃশ্যমান আলোর জগৎ থেকে একটা অদৃশ্য অন্ধকারে ডুব দিয়ে ওঠে আমাদের স্নিগ্ধ চোখটা অতীত হয়ে গেলো ঠিকই, কিন্তু নতুন দৃষ্টির অভিনবত্বে চমকে ওঠলাম ! এতোদিন না বুঝলেও এবার চিনতে পারছি, আমাদের মধ্যে কেউ মুসলমান, কেউ বেদ্বীন, কেউ নাজায়েজ নাফরমান, কেউ নাস্তিক জালেম ! আর কী আশ্চর্য, পাখির মতো স্বাধীন চঞ্চল নিরাপদ মেয়েগুলো দেখতে দেখতে কীভাবে যেনো আমাদের মগজের ভেতরে অচেনা গ্রহের একেকটা বিপজ্জনক সেক্সি প্রাণীতে পরিণত হয়ে গেলো ! নিষ্পাপ আল্লাহওয়ালা ছেলেগুলোকে এরা জাহান্নামের দরজায় টেনে নিতে একপায়ে খাড়া হয়ে রইলো ! জুড়ে বসা ধর্মীয় সংস্কৃতির তুলাদণ্ডে এতোদিনের বেদ্বীন চোখে দেখা ন্যাচারাল সৌন্দর্য আর সহজবোধ্যতা কী অবলীলায় নাপাক হয়ে গেলো !

দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, রোববার ও সমমনা পত্রিকাগুলোর সাথে প্রিণ্ট মিডিয়ায় নতুন ডাইমেনশান আনা সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, বিচিন্তা, আগামী, যায়যায়দিন এর মতো প্রগতিশীল ম্যাগাজিনগুলো নিষিদ্ধ হলো ক্যাম্পাসে। বন্ধ হয়ে গেলো ভাষা শহিদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এর মতো শহিদ মিনার ছোঁয়া অনুষ্ঠানগুলোর সাথে সাথে ক্যাম্পাসের সাহিত্য সংস্কৃতির যাবতীয় কর্মকাণ্ডও।

এবং বিংশ শতাব্দির শেষ লগ্নে দাঁড়িয়ে মধ্যযুগীয় এক ধর্মীয় রাজনৈতিক আবহে আমরাও একেকজন প্রাগৈতিহাসিক অশ্লীল প্রাণীতে পরিণত হতে লাগলাম… !
(১৬/০৮/২০০৮)
.
[sachalayatan]
[somewherein]
[pechali]
[amarblog]

mthumb.php

লোকটা নাকি পাগল ছিলো…!
রণদীপম বসু

টোনা কহিলো- টুনি পিঠা করো। টুনি কহিলো- চাল আনো, তেল আনো, নুন আনো, গুড় আনো ইত্যাদি ইত্যাদি। টোনা কহিলো- ঠিক আছে, আমি যাইতেছি, তুমি রান্নার বুঝ-ব্যবস্থা করো। এইভাবে টুনি ঘরের কাজে আটকা পড়িলো। আর টোনা ফুড়ুৎ কইরা উড়াল দিয়া গেলোগা। এবং অন্য আরেক টুনির সঙ্গে পুটুর-পাটুর করিতে লাগিলো।
এই গল্প থেকে থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই ? শিক্ষা পাই- ছাগল দুই ধরনের। দেশি ছাগল আর রাম-ছাগল। দেশি ছাগল হইলো ব্ল্যাক বেঙ্গল। কান দুইটা ছোট ছোট। আর রামছাগল ? কান দুইটা এই লম্বা লম্বা ! বদমাইশি কইরা কইরা জীবনে বহুৎ কানমলা খাইছে তো, শরীরটা মাশাল্লা হৃষ্টপুষ্ট হইছে ! কিন্তু কানগুলা আমার চ্যাঙ্গের মতো ঝুইল্যা গেছে !

কী বুঝলি ?

আমার প্রথম কৈশোরের অভিজ্ঞতা তখনো এতো হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে নি। লোকটির সঙ্গতিহীন কথা আর আচানক ধরনের শব্দগুলোর অর্থ খুঁজতে খুঁজতে আমার অনভ্যস্ত কান দুটো গরম আর সম্ভবত লাল হয়ে ওঠছে। অতএব আমি আর কী বুঝবো !
আমাকে নিরুত্তর দেখে ফের প্রশ্ন- কিছুই বুঝস নাই ?
হ, বুঝছি !
কী বুঝছস ?
আপনি একটা পাগল !

উত্তর শুনে কটমট করে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। আমি ইতস্ততবোধ করছি। হঠাৎ হৈ হৈ করে ওঠলেন- তুই তো বড়ো সত্যিবাদী পোলা রে !
বলেই হেঁচকা টানে নিজের লুঙ্গিটা খুলে ফেললেন। আচম্বিতে এই অভুতপূর্ব ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি আতঙ্কিত নাক মুখ কুঁকড়ে অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো। লাঞ্চিত হবার সমূহ আশঙ্কা সত্য হয় নাই দেখে আশ্বস্ত হলাম ঠিকই। কিন্তু এই বিব্রতকর অবস্থা কিভাবে সামাল দেবো ভাবতে ভাবতে কুচকানো বন্ধ চোখ দুটো আস্তে একটু একটু করে খুলতে লাগলাম। ধুয়াশা নজরে দেখছি সামনেটা ফাঁকা, কেউ নেই ! ঝট করে পুরো চোখ খুললাম।

লুঙ্গিটাকে কপালে বেঁধে রাস্তার রাজা শাহেনশাহের মতো নির্বিকার তিনি উন্মুক্ত নিম্নাঙ্গে ফুটপাত ধরে হেঁটে চলেছেন ! আমি একইসাথে বিস্মিত, বিব্রত এবং মনে মনে কুঞ্চিতও ! আশ্চর্যের ব্যাপার ! আশপাশ দিয়ে আনমনা পথচারী নারী-পুরুষগুলো আচমকা এমন এক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েও কেন যেন একটু না চমকিয়েই নির্দ্বিধায় পার হয়ে যাচ্ছে সবাই ! কেউ কেউ আবার লোকটির বিশেষ কোন জায়গায় হ্যাংলার মতো দৃষ্টি ফেলে অনায়াসে কৌতুক করতেও ছাড়ছে না !

একটু একটু করে অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হতে হতে আমাদের বোকা কৈশোরটা তারুণ্য কিংবা যৌবন পেরিয়ে যেতে যেতে অবাক হবার ক্ষমতাটা হয়তো হারিয়েই ফেলে ! তবু মানুষের বুকে কোন কোন কৈশোর বোধ করি চিরকাল থেকে যায়। অন্য অনেক ঘটনার মতোই কৈশোরের ওই ঘটনাটা আমাকে কতোটা প্রভাবিত করেছে জানি না। তবে মন-ভুলে সেই কথাটা কখনো মনে এলেই একটা প্রশ্ন এখনো আমাকে তাড়া করে-
লোকটা কি সত্যিই পাগল ছিলো ?
একটা শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে লোকটা নিজেই নাকি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরে যায় একদিন।

[sachalayatan]
[somewherein|alternative]

ট্যাগ সমুহঃ , , , ,

hhh

ছাই…
রণদীপম বসু

‘যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ মিলিলে মিলিতে পারে/ অমূল্য রতন…।’ কে লিখেছিলেন ? রামনিধি গুপ্ত ? ঈশ্বর গুপ্ত ? না কি অন্য কেউ ? এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে এই চরণগুলো সেই শৈশব-কৈশোরে স্তোত্রের মতো ঠোটস্থ করেই কি ক্ষান্ত হয়েছিলাম ? মোটেই না। স্তোত্র বা শ্লোক কি আর মিথ্যে হতে পারে !

আজ থেকে ত্রিশোধিক বছর পূর্বে মফস্বল শহরগুলোতে এখনকার মতো তো আর প্রাকৃতিক জ্বালানী গ্যাসের কায়কারবার ছিলো না। লাকড়ি, খড়ি, তুষ, শুকনো লতা-পাতা খড় নির্ভর চুলাসমৃদ্ধ বাঙালির রান্নাঘরের বাইপ্রোডাক্ট বর্জ্য হিসেবে ছাইয়ের চেয়ে হীন তুচ্ছ পদার্থ আমাদের ইহলৌকিক জীবনে আর কিছু ছিলো বলে জানা ছিলো না। পরিবারের সবচেয়ে অকর্মণ্য অপদার্থ ছেলেটিকেও যখন বলা হতো ‘তোর পাতে ছাই দেবো’, শতকরা নিরানব্বইভাগ সম্মানবোধহীন ছেলেটিরও বাকি একভাগ সম্মানবোধ ধপ করে জ্বলে উঠতো অপমানে ! দেশ-গাঁয়ের বাক্যবাণ সমৃদ্ধ ঝগড়াটে দুই প্রতিবেশিনীর ঝগড়ার চূড়ান্ত অস্ত্র প্রয়োগ হতো ‘তোর মুখে ছাই পড়ুক’ বলে। অতএব এতো হীনমানের বস্তুটি যে হাটেমাঠেঘাটে পথে গলিতে যত্রতত্র অতি সহজলভ্য হবে তাতে আর বিচিত্র কি !

আজ যারা অগ্নিমূল্যে ক্রয়কৃত মাছের সাথে মহার্ঘ গিফট হিসেবে এক পুটলি ছাই পেয়ে খুশিতে আটখানা হয়ে উঠেন, তাদের কথা ভেবেই সেই যুগের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি উপরোক্ত চরণগুলো রচনা করেছিলেন কিনা কে জানে। তবে অতি তুচ্ছ এই ছাইয়ের মধ্যে অমূল্য রতনের এতো সহজলভ্য উৎসের খোঁজ পেয়ে আমাদের সেই বালকবেলার রত্নপ্রাপ্তির প্রেরণা যে কোথায় গিয়ে ছুঁয়েছিলো তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে ! আশে পাশে কাছে দূরের যতো টাই করা ছাই আর ছাইয়ের ডিপো ছিলো প্রতিদিন সেগুলোর দশমদশারও দফারফা ঘটতে লাগলো। ঘাটাঘাটির চূড়ান্ত আর উড়ানো প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করে ব্যর্থ অনুসন্ধান শেষে প্রতি ত্রিসন্ধ্যায় যে ভস্মমূর্তি ঘরে ফিরে আসতো তার বর্ণনা আর না-ই দিলাম। এই ত্রিকালমূর্তি দশায় ‘ওরে মুখপোড়া, ওই ছাইভস্মের মধ্যে পড়ে না থেকে আমার হাড় জ্বালাতে এখানে এলি কেন ! যা হতভাগা ওই ছাইভস্মে যা!’ মায়ের অনিবার্য বর্ষণে তোয়াক্কা না করলেও ছাই সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞানতার করুণ হাল দেখে বিস্মিত হতাম বৈ কি। এতে অবশ্য পরের দিনের উদ্যমে কিছু মাত্র ভাটা পড়তো না। মা না জানতে পারে, তাই বলে ইস্কুলের বইয়ে কি আর মিথ্যে লিখেছে !

আহা, কি দিনগুলো চলে গেছে ! হঠাৎ করে আয়নায় একদিন দেখি আমি বড় হয়ে গেছি ! আসলেই কি বড় হয়েছি ? অমূল্যের সন্ধান না পেয়েই সেই রত্ন-সন্ধানী শৈশব আর কৈশোর কি সত্যিই হারিয়ে গেছে ? এক বিশাল শূণ্যতা বুকে নিয়ে এখনো ছাই খুঁজে ফিরি আমি। অথচ আশেপাশে তাকিয়ে মনে হয়, কী ভীষণ ছাইভস্মের মধ্যে এই জীবনটাকে নিয়ে গড়িয়েই যাচ্ছি কেবল ! কিন্তু কোথাও আর আমার সে-ই ছাই দেখি না…!
(১৯/১১/২০০৮)

[sachalayatan]

ট্যাগ সমুহঃ , , ,

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 172,436 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুন 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check