h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Archive for the ‘রম্যকথা’ Category

| বোরকা…[রম্য-রচনা]
রণদীপম বসু
(১)
মনজু সাহেব সদ্য রংপুর বদলি হইয়া আসিয়াছেন। পেশায় সরকারি গোয়েন্দা পুলিশ বলিয়া প্রথম প্রথম পাবলিকের নিকট হইতে ব্যাপক সমীহ পাইলেও ইদানিং পরিস্থিতি কী রকম যেন বদলাইয়া গেছে ! সন্দেহের টোটকা ফুকিয়া অপরাধী ধরিবার কলা-কৌশলও আর কাজ করিতেছে না। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় কতোরকমের অপরাধ কাহিনী প্রকাশ পাইতেছে, অথচ তিনি এইসব কিছুই টের পাইতেছেন না। আর ওইসব বিচ্ছু সাংবাদিকগুলা কী করিয়া যেন আগেভাগেই টের পাইয়া যায়। নিশ্চয়ই তাহাদেরও যোগসাজশ রহিয়াছে! তাহাদের প্রতি তিনি একটু একটু করিয়া নাখোশ হইতে লাগিলেন। এবং হঠাৎ করিয়া আবিষ্কার করিলেন, নালায়েক পাবলিকই উল্টা তাহাকে সন্দেহ করিতে লাগিয়াছে। ইহা যে এইহাত-ওইহাত বাণিজ্যের জন্য কিছুতেই শুভ ঘটনা নয় তাহা বুঝিতে পারিয়া তিনি আকুল হইয়া পড়িলেন। ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করিতে এইবার মরিয়া হইয়া উঠিলেন, কিছু একটা তাহাকে করিতেই হইবে। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত লইলেন, তিনি ভালো হইয়া যাইবেন। Read the rest of this entry »
ট্যাগ সমুহঃ ,

MadScientistSmiling

নাথিং ইজ সামথিং বাট সামথিং ইজ নাথিং… !
রণদীপম বসু

.

মানুষের ব্যস্ততা দু’ধরনের। হয় বিজি ফর সামথিং, নয়তো বিজি ফর নাথিং। কাজের ভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় সামথিং এবং নাথিং এই শব্দ দুটোকে বেশ ঘোরালো বলেই মনে হয় আমার কাছে। কীভাবে ? সেটাই বলছি।

সামথিং মানে কী ? যদি হয় কোনো কিছু বা বিশেষ কিছু, সেই বিশেষ কিছুটা কী, তা কিন্তু নির্দেশ করে না। বরং একটা দার্শনিক বিভ্রম জড়িয়ে থাকে শব্দটার মধ্যে। আসলেই কি কিছু ? কী সেটা ? জগতের অনন্ত সম্ভাবনার সম্ভাব্য যে কোনো কিছুই হতে পারে। এই হতে পারে মানে, হতে পারে। অর্থাৎ সন্দেহ ! কোনটা ফেলে কোনটা ; একটা ধারণাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত একটা সন্দেহমূলক অনিশ্চয়তাবাচক শব্দ হিসেবেই সামথিং শব্দটা চিহ্ণিত হয়ে পড়ে। তাছাড়া মানুষের সামর্থগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টাকে বিবেচনায় রাখলে এটা তো সত্য যে, একজন মানুষ অভিন্ন স্থান কাল পাত্রগত অবস্থায় জাগতিক সমস্ত সম্ভাবনার মধ্যে একই সময়ে একইভাবে অবস্থান করতে পারে না। তা একান্তই অসম্ভব এবং কাল্পনিক। তাহলে সামথিং এর মানে কী দাঁড়ালো ? একটা অনিশ্চিৎ সম্ভাব্যতা, যা হতেও পারে, না-ও হতে পারে। এই হতে পারাটা কী ? যতক্ষণ পর্যন্ত ‘কী’ শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্ণিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ‘কী’ মানে কিছুই না। অর্থাৎ নাথিং !

অন্যদিকে নাথিং শব্দটি কিন্তু পুরোপুরি নির্দিষ্টবাচক, মানে কিছুই না। এখানে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। সমস্ত সম্ভাবনার অবস্থান বা অস্থিত্বকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। ‘হতে পারে’ বলতে এখানে কিছু নেই। আসলে কি তাই ? এখন প্রশ্ন, মানুষ বা এই চরাচর বিশ্বে বস্তুগত বা ধারণাগত যেভাবেই হোক, কোন সম্ভাবনাহীন পরিপূর্ণ শূন্যাবস্থা থাকা কি সম্ভব ? ধারণাগতভাবে কোন সম্ভাবনাহীন শূন্যাবস্থার অস্তিত্ব থাকার সত্যতা মেনে নিলে আমাদের এই সৃষ্টিজগতের অস্তিত্বটাকে কি অস্বীকার করতে হয় না ? তাহলে নাথিং মানে কী দাঁড়ালো ? সত্যি সত্যিই অস্তিত্বহীন ‘কিছুই না’ ? না কি কোন সম্ভাবনা সৃষ্টির পূর্বের স্থিতাবস্থাকে বুঝাবে ? ধারণাগতভাবে দ্বিতীয়টাই সম্ভব। এর অর্থ কিছু একটা হবার সম্ভাবনা। মানে সামথিং !

এটা যুক্তিবিদ্যার ফ্যালাসি নয়। তবু সামগ্রিকভাবে কী দাঁড়ালো বিষয়টা ? যদি এভাবে বলি, নাথিং ইজ সামথিং, বাট সামথিং ইজ নাথিং ! তাহলে কি ভুল হবে ?

এখানে বলে রাখা ভালো, আমি কোন দর্শনের ছাত্র নই। তারপরেও মাঝেমধ্যে এই দর্শনের হামলায় এমনই নাজেহাল অবস্থায় পড়ে যাই যে, ইদানিং দর্শনের নাম শুনলেই রীতিমতো আঁতকে ওঠি ! এবং কীভাবে তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা যায় তার উপায় হিসেবে সব সময় একটা না একটা ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেই সচেষ্ট থাকি। যাতে দর্শন বাবাজী সহজে আর এমুখো না হতে পারে। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত ! হাহ্ ! পেছনের যমের তাড়া খেয়ে পালিয়ে লুকোলাম এসে সেই যমের ঘরে !

নাহ্, কিছুতেই আর দর্শন নয়। তারচে’ সোজা নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যেই ডুব দেই এবার।

সেদিন চেয়ারটায় চিৎ হয়ে প্রায়, নতুন কোন কবিতার ভাবদশায় কী এক গভীর মগ্নতায় ডুবে হয়তো অনেকক্ষণ যাবৎই দূর আকাশের দিকে চেয়ে আছি। আসলে কি চেয়ে ছিলাম ? কী ব্যাপার, চেয়ারের মধ্যে এমন কষ্ট না করে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে নিলেই তো পারো ! আমার অর্ধাঙ্গিনী স্ত্রীর মাস্টারনীসুলভ এমন কটাক্ষে একটু নড়েচড়ে বসলাম। অতিশয় গৃহস্থ এবং সংসারীটাইপ সুখী আত্মীয় স্বজনের ভীড়ে এমন আহাম্মক ও অপদার্থ স্বামী পাবার দুর্ভাগা রমণী আমার স্ত্রী কখন যে আমাকে কাজে দেখতে ভালোবাসেন, আর কখন যে কাজে দেখতে ভালোবাসেন না, বিগত এক দাম্পত্য-দশকেও তা বুঝে ওঠতে পারলাম না। আর আমার কাজ মানে যে কী, এটার ব্যাখ্যা দিতে গেলে ফের দর্শনাক্রান্ত হবার আশঙ্কাই প্রবল। তাই সে দিকে না গিয়ে এক কথায় বললে, আমার কাজ মানেই তো এককালের কাগজ কলম আর ইদানিং পিসি’র কীবোর্ডে হাত রেখে গুঁজো হয়ে টেবিলে বসে থাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ! তাও না হয় হলো। তবু বেকার চোখ দুটোকে তাঁর ওই বহুবর্ণীল শ্রীমুখে ফেলে রাখলেও কথা ছিলো। কিন্তু তা যদি পড়ে থাকে জানলা গলে ঐ বিশ্রী রাস্তাটায় চড়ে বেড়ানো যতো সব গরু ছাগল কুকুর বেড়াল আর লাইটপোস্টে ঝুলে থাকা কাক বা বাদুড়ের বীভৎস শরীরের উপর, তাহলে কোন্ রমণী সেটা সহ্য করবে ?

অতএব এরকম সম্ভ্রান্ত কুঁড়ে স্বভাব নিয়ে অসহ্য স্বামীটি ছুটির দিনের মূলকর্ম ঘুম বাদ দিয়ে চেয়ারের মধ্যে এমন আহাম্মকের মতো ঝিমুচ্ছে, আর ঘর গোছানোর কথা বললে ব্যস্ত আছি বলে নতুন্ ভাব ধরছে, এটা কি নিশ্চিতভাবেই নিকম্ম স্বভাবের আরো স্খলন নয় ? আমি ভাবি, আসলেই তো ! আমি কি করছিলাম কিছু ? দৃশ্যমান কিছু তো নয় অবশ্যই। তবে মাথার ভেতরে যে সেই সৃষ্টির শূন্যতা ভাঙার খেলাটা চলছিলো ঠিকই, তা আমি বুঝাই কী করে ? যার কোন আকার নেই, হয়তো বিকার আছে, অন্তর্গত, কিন্তু ব্যাখ্যা নেই। কোনো ইন্দ্রীয়গ্রাহ্যতা তো নেই-ই। এটা কি কোন কাজ ?

গণিত না কি পদার্থবিদ্যার কোনো এক ভাইভার ধাঁ-ধাঁয় প্রশ্ন করা হলো, বলো তো দেখি, তুমি দেড়মণ বোঝা মাথায় নিয়ে না থেমে সোজা তিনশ’ গজ হেঁটে গেলে একই গতিতে ; কতটুকু কাজ করলে ? ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যাওয়া এতো বড় একটা কাজের উত্তরের বিপরীতে কী নৃশংস মন্তব্য, কোন কাজই হয় নি ! বলে কী ! এটা কীভাবে হয় ? কাজের সূত্র টেনে কী যেন এক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হলো। ভরবেগ না বল বা দূরত্বের রাশির সাথে গুণন অবস্থায় সাইন থিটা না কস থিটার মান নব্বই ডিগ্রী অনুযায়ী শূন্য হয়ে যাওয়ায় শূন্যগুণফলের ঠেলায় কাজের মোট ফলাফলও শূন্য ! বিজ্ঞানীদেরকে পাগল কি আর এমনি বলে ! মুটের মাথায় বোঝা চাপিয়ে বাসার গেইটে গিয়ে যদি বলি পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুযায়ী তুমি তো ভাই কোন কাজ করো নি, কাজ সমান শূন্য, হাঁড়গোড় একটাও কি আস্ত থাকবে ? তারচে’ও ভয়ঙ্কর কথা হলো এতোবড়ো সংসারটাকে মাথায় নিয়ে আমার করিৎকর্মা স্ত্রী যে এই অনিশ্চিৎ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও ফিজিক্সের সূত্র অনুযায়ী তাঁর কাজের ভয়াবহ শূন্যমানের ফলাফলটি জানবেন, এতে করে যে ধ্বংসের দাবানলটি জ্বলে ওঠবে সংসারে, তা কি স্বয়ং স্রষ্টা এসেও নেভাতে পারবেন ?

অতএব অবিরাম ঝিমুতে থাকা আমার মাথার ভেতরে যখন সেই কবিতার জন্মপূর্ব অসহ্য কষ্টকর আদি খেলাটা চলছিলো, ওটা কি কোনো কাজ ? নাথিং না সামথিং ছিলো, তা নির্ধারণ আমার কর্ম নয়। এবং পরবর্তীতে আচমকা গা-ঝাড়া কী বোর্ডে ঝড় তুলে একেবারে কষ্টহীন এক আনন্দস্রোতে কবিতার যে দেহবল্লরী ভেসে ওঠলো নিমেষে, এটাই বা কেমন কাজ ?

এসব ভাবতে ভাবতে কখনো কেউ যদি হঠাৎ দেখতে পায় আমাদের চেনা চেন চেহারার শ্মশ্রুগুম্ফমণ্ডিত মুখে উপরদেশ খোলা কেউ ভ্রুক্ষেপহীন হাঁটছেন আর হাঁটছেন, আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন- “নাথিং ইজ সামথিং বাট সামথিং ইজ নাথিং ! মানে ? ঘোড়াড্ডিম !”

আমরা কি তাঁকে অপ্রকৃতিস্থ বলবো ?
(১৩/০৮/২০০৮)
.
[sachalayatan]
[somewherein]
[pechali]
[amarblog]
[mukto-mona]
[khabor.com]
[sa7rong]

XRayOfPeaceblog_1207816722_1-MMMM

ছিদ্রান্বেষণ…!
রণদীপম বসু

.

দিনে দিনে ছিদ্রান্বেষণকারী মানুষের সংখ্যা যেই হারে বাড়িয়া যাইতেছে তাহা যে অতিশয় দুঃশ্চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে ইহা আমার দুঃশ্চিন্তার বিষয় নহে। দুঃশ্চিন্তা হইলো আমার আঁতেল বন্ধুটির। যে নাকি মুখ ভার করিয়া থাকিলেই বুঝিতে হয় যে গুরুতর কিছু ঘটিতে যাইতেছে। বলিলাম, কী হইয়াছে তোমার ? আমার মুখের দিকে কিয়ৎক্ষণ অন্যমনস্কভাবে তাকাইয়া থাকিয়া হঠাৎ যেই প্রশ্নটি করিয়া বসিল, তাহা শুনিয়া আমি ভ্যাবচেকা খাইয়া গেলাম ! ‘বলো তো , ছিদ্র মানে কী ?’ প্রশ্নের গুরুত্ব হেলাফেলা করিবার নয়। কেননা এই বন্ধুটির মধ্যে আমরা কস্মিনকালেও কোন তরল-স্বভাব জনিত পাতলা আচরণাদি প্রত্যক্ষ করি নাই। সেইহেতু উত্তরে বলিলাম বটে, ছিদ্র মানে তো ছিদ্রই ! কিন্তু বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না, বন্ধুটি হঠাৎ এইরকম ছিদ্রের অন্বেষণে ব্যস্ত হইয়া পড়িল কেন !

আমার উত্তরে আমি নিজেই সন্তুষ্ট নই, সে ইহাতে কীরূপে সন্তুষ্ট হইবে ! আমার অজ্ঞানতার গর্ত ভরাট করিতে বন্ধুপ্রবর নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া বলিতে শুরু করিল- ব্যাকরণাভিধানে বাঙালা ভাষায় অতি অল্প শব্দই রহিয়াছে যাহাদের একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী একাধিক অর্থ থাকিতে পারে। ‘ছিদ্র’ শব্দটিও সেইরূপ একটি শব্দ, বাঙালা অভিধানে যাহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে (১) ফুটো, ফুটা, বিবর, ছেঁদা, বিঁধ, রন্ধ্র। (২) দোষ, ত্রুটি। (৩) অবকাশ। সেই ক্ষেত্রে বাঙালায় ‘ছিদ্রান্বেষণ’ শব্দটি তিন ধরনের অর্থবিশিষ্ট হইবার কথা। ছিদ্র খুঁজিয়া বেড়ানো, দোষ খুঁজিয়া বেড়ানো, কিংবা অবকাশ খুঁজিয়া বেড়ানো। অথচ কী আশ্চর্য দেখো, অভিধানে ছিদ্রান্বেষী শব্দটির একটি মাত্র অর্থকেই অনুমোদন করা হইয়াছে- যে অপরের দোষ খুঁজিয়া বেড়ায় ! শব্দটি কি অন্যায়ভাবে কেবলি একটি দুরভিসন্ধিমূলক নেতিবাচক ভাবকেই ধারণ করিয়া থাকিবে ? ইহার অন্যথা হইবে না কেন ? আমি যদি তোমাকে বলি, ওহে, এই নাও, সুইটির ছিদ্রান্বেষণ করো, তুমি কি তাহলে উহার পশ্চাৎদেশের ছিদ্র অন্বেষণ না করিয়া দোষ খুঁজিয়া বেড়াইবে ? না কি ছিদ্রটাকেই দোষ ভাবিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠিবে ?

আমার দিকে সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি লইয়া তাকাইয়া থাকায় বুঝিলাম, আমার কাছেই উত্তর চাহিতেছে। বলিলাম, সুইয়ের পাছায় ছিদ্র থাকা দোষ হইবে কেন ? ছিদ্র না থাকিলেই বা ইহা সুই হইবে কী করিয়া ? বরং ছিদ্র না থাকাটাই তো ইহার দোষ হইবে !
তাহা হইলে আমরা কী বুঝিলাম ? পুনর্বার প্রশ্ন।
আমি কিছু বুঝিতে পারিলাম কিনা তাহাই বুঝিতে পারিলাম না। শুধু বলিলাম, হঠাৎ করিয়া তুমি ছিদ্রের পিছনে লাগিলে কেন ?
বলিল, ছিদ্রের পিছনে তো লাগি নাই ! লাগিয়াছি ছিদ্রান্বেষণের পিছনে।
মানে ?
জন্ম সংক্রান্ত জটিলতা। না, ভুল বলিলাম, জন্ম তারিখ সংক্রান্ত বিভ্রান্তির কথা বলিতেছি।
বুঝিলাম না, বন্ধুটি কিসের কথা বলিতেছে। বলিলাম, হঠাৎ জন্ম সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিল কেন তোমার ? এরূপ সন্দেহের হেতু ? আর এই ঘটনার সাথে ব্যাকরণ অভিধানের সম্পর্ক কোথায় ?
সে আশ্চর্য হইয়া বলিল, তুমি কি কোথাও সম্পর্ক দেখিতেছ না !
আমি কোন জবাব না দিয়া তাহার মুখের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলাম। সে বলিতে লাগিল-
সম্পর্ক তো আছেই। সুইয়ের পিছনে তুমি কি ছিদ্র খুঁজিবে, না কি দোষ খুঁজিবে, সেইটাই প্রশ্ন !
আমি তাহার কথার কোন আগামাথা বুঝিলাম না। বলিলাম, তোমার সমস্যাটা কোথায় বল তো ?
সে বলিল, সার্টিফিকেটের সহিত বাস্তবে জন্ম তারিখ না মিলিলে কি সমস্যা জটিল হইয়া যায় ?
আমি বলিলাম, দেখো, স্কুলের সার্টিফিকেটে জন্ম তারিখ যাহা লিপিবদ্ধ হইয়াছে তাহা সঠিক নাও হইতে পারে। আমাদের অনেকেরই তো এইরূপ আছে। যেই তারিখে জন্ম হইয়াছিল পরবর্তী জীবনের বাস্তব অবস্থা কী হইতে পারে বিবেচনা করিয়া বয়স কমাইয়া রেজিস্ট্রেশান করানো হইয়াছে। এইটা তো আকছার ঘটিতেছে। ইহা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারই নিদারুণ দূরাবস্থার চিত্র।
হাঁ, তোমার কথা মানিয়া নিলাম। এইবার বল তো দেখি, এই ক্ষেত্রে তুমি জন্মতারিখ কোনটি ব্যবহার করিবে ?
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটে যাহা আছে তাহাই। আর রাশিফল বিচার করিতে হইলে প্রকৃত তারিখই ব্যবহার করিব।
বাহ্‌, সুন্দর বলিয়াছ তো ! রাশিফলের বিষয়টি তো আমার মাথায় আসে নাই !
তোমার মাথায় কী আসিয়াছে তাহাই বলিয়া ফেল।
বিবাহের ক্ষেত্রে কোন্‌ তারিখটি তুমি ব্যবহার করিবে ?
ইহা কী বলিলে ! তুমিও যে বোকার মতো প্রশ্ন করিতে পার তাহা তো আগে কখনো ভাবি নাই !
এইবার ভাবিয়া বলো !
যদি বিবাহ রেজিস্ট্রি করিতে হয় তাহা হইলে সার্টিফিকেটের তারিখটাই বলিব। আর যদি মন্ত্র পড়িয়া যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহকার্য সম্পন্ন করিতে হয়, তাহা হইলে তো প্রকৃত তারিখটাই বলিতে হইবে। তাহা না করিলে যে শাস্ত্রীয় অকল্যাণ হইবে ! বৈবাহিক সম্পর্কটাকে তো আর ছোট করিয়া দেখিবার উপায় নাই।
বিদেশ গমনের বেলায় ?
তুমি কি আবারও নির্বোধের মতো পাসপোর্টের কথা বলিতেছ ?
হাঁ।
আমার মনে হয় এইবার তোমার মানসিক চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হইবে !
আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু তুমি দাও নাই।
মনে হইতেছে খুবই হতাশাজনক উপসর্গ। কিছুক্ষণ তার দিকে হা করিয়া তাকাইয়া তারপরে বলিলাম, সার্টিফিকেটের তারিখটাই দিব !
কিন্তু তাহার সাথে এইবার কথা বলিতেই আমার আর আগ্রহ হইতেছে না। আমাদের মধ্যকার মেধাবী বন্ধুটির হঠাৎ এ কী হইল ! তাহার জন্য খুবই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হইয়া পড়িতেছি। নিশ্চয়ই তাহার কোথাও একটা গণ্ডগোল হইয়াছে। কেন জানি সতর্ক হইয়া উঠিলাম। পাগলাটে লোকজন হইতে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়। এদিকে তাহার পরের প্রশ্ন, তুমি কি জাতীয় পরিচয় পত্র করাইয়াছ ?
হাঁ করেছি।
উহাতে তারিখ কোনটা দিয়াছ ?
প্রশ্ন শুনিয়া এইবার আমি হতবাক হইয়া রহিলাম ! তাহার উত্তর দিতেই আমার রুচিতে বাঁধিল। অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া বলিলাম, তুমি কি আমাকে ছাগল পাইয়াছ !
কিন্তু এদিকে তাহার ভ্রুক্ষেপই নাই।
মনে করো তুমি নির্বাচনে প্রার্থী হইলে। নমিনেশন ফরমে কোন্‌ তারিখখানা উল্লেখ করিবে ?
এহেন উন্মাদের মতো প্রশ্ন শুনিয়া এইবার আর ধৈর্য্য সংবরণ করিয়া রাখাটাই দায় হইয়া পড়িল। তৎক্ষণাৎ বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠিয়া দাঁড়াইলাম। উন্মাদ না হইলে এইরকম পাগলের প্রলাপ কাহারো মুখ দিয়া বাহির হইতে পারে ! অমনি হাঁটা ধরিলাম। কিন্তু তাহার আগেই আমার শার্টের কাছা টানিয়া ধরিল সে- আহা, ক্ষেপিয়া যাইতেছ কেন ! আর একটি মাত্র প্রশ্ন করিব। কেবল এই প্রশ্নটির উত্তর পাইলেই আমার চলিবে।
আমি তখন তাহার মুষ্ঠি হইতে নিজেকে ছাড়াইতে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। কিন্তু কিছুতেই ছাড়াইতে পারিতেছি না। শুনিয়াছি পাগলের দেহ নাকি প্রচণ্ড শক্তি ধরিয়া থাকে। ততক্ষণে শরীর আমার কাঁপিতে লাগিল। বাহিরে প্রকাশ না করিলেও মনে মনে ভীত হইয়া উঠিলাম। উদ্ধার পাইবার উপায় খুঁজিতেছি। সেই মুহূর্তে তাহার সর্বশেষ প্রশ্নটি শুনিয়া আমার উত্থিত সমস্ত উপসর্গই আচমকা বদলাইয়া গেলো-
এই যে তুমি এতগুলি জায়গায় জন্ম তারিখ ব্যবহার করিয়াছ, প্রতিটি জায়গায় কি ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ হইতে পারে না ?

বিলক্ষণ বুঝিতেছি, একটা দুরারোগ্য পাগলের শক্ত মুষ্ঠিতে আটকা পড়িয়া প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীন আমি একটু একটু করিয়া মূর্চ্ছা যাইবার পথে। বহু দূর হইতে সর্বশেষ যে বাক্যটি মৃদুস্বরে কানে আসিল- বুঝিয়াছি, তুমি অদ্যকার পত্রিকাখানা পড়িয়া দেখ নাই। বদ্ধ পাগলও আজ পাগলামীতে হারিয়া গিয়াছে… ! হা হা হা !
(০১-১২-২০০৮)
…………………………………………………..

সোমবার ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪১৫
১ ডিসেম্বর ২০০৮
সমকাল (শেষপৃষ্ঠা ৭ এর কলামে নিউজ)

[সমকাল প্রতিবেদক]
জন্ম তারিখ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার উল্লেখ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু তার মক্কেল সুপ্রিম কোর্টের অপর এক আইনজীবী ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির পক্ষ থেকে নোটিশটি পাঠিয়েছেন। এতে দাবি করা হয়েছে, খালেদা জিয়া ২৯ নভেম্বর ২০০৮ নিজ নাম ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেন। এতে তিনি জন্ম তারিখ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট উল্লেখ করেছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে ‘প্রয়োজ্য নয়’ উল্লেখ করা হয়েছে।
উকিল নোটিশে বলা হয়, খালেদা খানম, পিতা-মোঃ ইস্কান্দার, দিনাজপুর সদর গার্লস স্কুল থেকে ১৯৬১ সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন। তার রোল নম্বর ছিল ‘দিন-রোল-এফ ৭৯২’। ফরমে জন্ম তারিখ ১৯৪৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। তথ্য অধিদপ্তর থেকে ১৯৯৭ সালের ১৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মকবুল আহমেদের লিখিত চিঠির জবাবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র শিক্ষা বোর্ড) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ তথ্য সরবরাহ করেন।
নোটিশে বলা হয়, খালেদা জিয়া ভোটার নিবন্ধনে জন্ম তারিখ ‘১৫ আগস্ট ১৯৪৭’ লিখেছেন, যা উদ্দেশ্যমূলক। জাতির জনকের মৃত্যুদিবসকে তিনি নিজের জন্মদিন হিসেবে দাবি করছেন জেনেশুনে এবং অসদুদ্দেশ্যে।
আরো বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালের ১ এপ্রিল খালেদা জিয়া পাসপোর্টের জন্য যে আবেদন করেন তাতে জন্মদিনের ঘরে কোনো তারিখ উল্লেখ না করে লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ সালে’। আবার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ের কাবিনে জন্ম তারিখ ১৯৪৭ সালের ৯ আগস্ট উল্লেখ আছে।
উকিল নোটিশে মিথ্যা তথ্য প্রদানের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে, অন্যথায় নোটিশ প্রদানকারী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হবেন।

——————

.
[sachalayatan]

majulhassanblog_1207904023_2-Black_crew

অতৃপ্ত কাকাত্মা
রণদীপম বসু

[ইহা একটি কাল্পনিক যৌগাণুগল্প। ইহাতে সৃষ্ট চরিত্রগুলিও তাই সন্দেহাতীতভাবেই কাল্পনিক। তবুও কেউ যদি অতিকল্পনার কারণে নিজের সহিত কোনরূপ সামঞ্জস্য খুঁজিয়া বাহির করেন, উহা সংস্লিষ্ট পাঠকের ভয়ঙ্কর সৃজনশীলতা বলিয়া গন্য হইবে। সেই ক্ষেত্রে চরিত্রানুগ নামগুলির প্রতি লেখকের পক্ষ হইতে সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাইয়া রাখা হইল।]

কা…কা…।
মুখোমুখি ফ্র্যাটের কার্ণিশ থেকে এক লাফে জানলাটায় এসে বসলো কাকটা। কা..কা..। সাংঘাতিক ব্যাপার তো ! দুটো বিষয় নতুন করে ভাবিয়ে তুললো বিপ্লবকে। প্রথমত আবর্জনায় ঘাটতি না থাকলেও গাছপালাহীন আধুনিক এ শহরে কোথাও কাক নেই। দ্বিতীয়ত অন্ত্যজ গোষ্ঠির একটা পাখি কী করে এতোটা দুঃসাহসী হয়ে মানুষের মুখোমুখি হতে পারে ? তিনি কাকটাকে তাড়া করলেন না।

প্লেটোর দর্শনে বিশ্বাসী এ সময়ের দুর্ধর্ষ ব্লগার বিপ্লব রহমানের মনোযোগটা সচল নেট থেকে সরে এলো। গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কাকটাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। হঠাৎ যেন কুয়াশাময় একটা পর্দা সরে গেলো। তিনি কাকের ভাষা বুঝতে পারছেন !
এটা কি ঠিক করলেন বিপ্লব ভাই ?
কী ঠিক করলাম না ?
আপনারা সচল নেট থেকে কবি-সাহিত্যিকদের খেদিয়ে দিলেন !
পারলাম আর কই ! ওই পিছলা লীলেন আর বসুটাকে… ; কিন্তু তোমাকে তো… ?
আমি তো কবিতা ছেড়ে জেনগল্পের ভাষান্তর ধরেছিলাম !
মানে আপনি মুজিব ভাই ! স্লামালিকুম ! আরে ওখানে কেন ? আসেন আসেন, ভেতরে এসে বসেন.. ?
হাক্ হাক্ হাক্ !
কী ব্যাপার, হাসছেন নাকি ?
হাসছি না তো, কাঁদছি।
কেন ?
কাকের শরীর নিয়ে কি আর…
ও হাঁ, তাইতো ! আপনার এই অবস্থা কেন ?
অতৃপ্ত আত্মারা স্বর্গ বা নরকে ঠাঁই না পেলে কাক হয়ে ঘুরতে থাকে।
মানে ?
নরকের দরজাতে সন্যাসীকে যেভাবে প্যাদানো হচ্ছে, তা দেখেই সোজা ফিরে এলাম।
হু, কোথায় যেন পড়েছিলাম এরকম কাক হয়ে যাওয়ার একটা বিষয়। কিন্তু কই, আপনার কোন আত্মহত্যার খবর তো পাই নাই !
ওই লীলেন আর হিমুটাই চেপে রেখেছে ! আরেকবার এসে নেই সচলে, দেখাবো মজাটা..
হা হা হা !

ঝাঁকি খেয়ে ঘুমের রেশটা কেটে গেলো। মনিটরে চোখ পড়তেই সচকিত হয়ে ওঠলেন ! আরে, আবারো অতিথি লেখকে সয়লাব সব ! সবকটাই কি কবি আর সাহিত্যিক নাকি !
টেনে নিলেন কীবোর্ডটা। পৃথিবীর সমস্ত শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছে কীবোর্ডের খটাখট শব্দঝড়ে !
(২৬/০৫/২০০৮)

[sachalayatan]

876738ce7209

সত্পাত্র
রণদীপম বসু

পাত্রের ভয়ঙ্কর সততার নমূনা জানাজানি হবার পর যা হবার তাই হয়েছে। চালশের বাইফোকাল চশমা নাকে ওঠে চুলে পাক ধরা শুরু হলেও বরের আগে ‘হবু’ বিশেষণটা আর কিছুতেই ছেটে ফেলা যায় নি এখনো।

একজন ডাকসাইটে কর্মকর্তা হবার সবরকম যোগ্যতা থাকলেও চাকরিটা হয়েছিলো তার তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি পদে। অত্যন্ত সত্ ও অতিমেধাবী হওয়ার কারণেই কি না, ওই পদবীটাও তাকে অতিরিক্ত ভালোবেসে ফেলেছে হয়তো। পুরাতন কলিগদের উদাহরণ টেনে লাভ নেই, জুনিয়র সহকর্মীদের কাছেই আশরাফ এখন সাবোর্ডিনেট। তবে হবু বর হিসেবে চাকরি করাটাই প্রধান যোগ্যতা হওয়ায় কন্যার পিতা আর কিছু না জেনেই হোক্, কীভাবে যেন দুজন সঙ্গিসহ নির্ভুল ঠিকানায় একদিন আশরাফের অফিসে এসে হাজির।

কন্যার পিতা সহজ সরল মানুষ, এতো ঘোরপ্যাচে না গিয়ে সোজাসাপ্টা কথাটাই বলে ফেললেন তিনি। দেবার মধ্যে নগদ একলক্ষ টাকা আর… ।

কথাক’টা বলা আর শেষ হয়নি। তার আগেই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেছে আশরাফ। কন্যাপক্ষীয় একজনের হাতটা টেনে ধরে বললো- আসুন আমার সাথে। রাস্তায় নেমেই চলমান লোকাল গাড়িটা থামিয়ে চড়ে বসলো। পেছন পেছন কন্যাপক্ষও। গোটা রাস্তায় নীরব থমথমে আশরাফের ভাবসাব কিছুই বুঝতে পারলেন না এরা। তবু হবু বর বলে কথা ! বাসায় টাসায় নিয়ে যাচ্ছে হয়তো।

গাড়ি থেকে নেমেই হতবাক সবাই। এ কী ! এটা তো গরুর বাজার ! এদিকেই থাকে নাকি সে ? বাজারের যে দিকটাতে বড়োসড়ো দামি ষাঁড়গুলো রয়েছে, ওখানে পৌঁছেই মুখ খুললো সে ! নিন, এখান থেকে পছন্দ করে আপনার মেয়ের জন্য একটা কিনে নিয়ে যান। বলেই তাদেরকে ফেলে রেখে হনহন করে ফিরে চললো আশরাফ।
(২৭/০৫/২০০৮)

[sachalayatan]

kissing_on_the_sunset_by_jei_hun

বিয়ে, সংশোধনের অযোগ্য যে ভুল !
রণদীপম বসু

বিয়ে করার আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে হাঁদারাম আমি তখনও বুঝিনি, কী ভয়ঙ্কর অপরিণামদর্শি ভুলের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি। চল্লিশ পেরিয়েও অকৃতদার পাড়াতো ভাই অরুনদা’র বিজ্ঞজনোচিত পরামর্শকে ‘দিল্লীকা লাড্ডু জো ভি নেহি খায়া, সো ভি পস্তায়া’ ভেবে নিজকে কী হতে যে কী ভেবে বসেছিলাম, তা আর নাই বললাম। দক্ষিণ পাড়ার দিগম্বর দাদু, যাকে দুই পয়সার পাত্তা দিতেও আজ পর্যন্ত কাউকে দেখি নি, আমাকে ভালোবাসেন বলেই হয়তো নির্বুদ্ধি ভেবে খুব করে বলে দিয়েছিলেন, দেখো হে, হটকারী একটা সিদ্ধান্তই যথেষ্ট, পুরুষ মানুষের সটান উল্লম্ব সিনা চোখের পলকেই ভূমির সমান্তরালে বেঁকে সোজা হওয়ার সমস্ত ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। কণ্ঠে যে বাঘের হুঙ্কার গর্জে ওঠতো, ওটা আর কখনোই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করার সীমানা ছেড়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। অতএব এতো তড়িঘড়ি না করে বাপু মাথার বায়ু নামিয়ে ফেলো। মস্তিষ্কে বায়ু চড়ে গেলে বুদ্ধি নাকি হাঁটুতে নেমে আসে। আমার বুদ্ধিবৃত্তিও যে হঠাৎ করে হাঁটু থেকেও বিপজ্জনক নীচে নেমে গেছে, এ বিষয়ে তাঁর কোন সন্দেহ নেই। আমি আর কী বলবো ! সত্যি সত্যি আমি তখন কল্পনার চিত্রল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। যেদিকেই চাই, হতে যাওয়া তুমি আর তুমি শুধু।

তবু আমার ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মতিগতি খুব একটা সুবিধের নয় আঁচ করেই হয়তো পক্ষকালের হাজতবাস অভিজ্ঞ আমাদের সবার মতি ভাই আমাকে সার্বক্ষণিক সাহস যুগিয়ে যেতে লাগলেন, আরে মিয়া পুরুষ হইছো আর মাইয়া মানুষের গন্ধ নিবা না এইটা কী করে হয় ! তুমি মিয়া ঐ শালাগো কারো কথাই শুইনো না। হেগোর মেরুদণ্ড আছে নাকি ! একে তো নাচনে বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি। আমাকে আর পায় কে। কি জানি উদ্যমে ভাটা দিয়ে বসে, তাই লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে সর্বশক্তি দিয়ে তটস্ত করে তুললাম মুরুব্বিদেরকে, যারা সম্মন্ধসূত্র গড়ে দেয়ার মহান ব্রত নিয়ে চিরকালই নিজেদের বিলীন করে দিয়ে আসছেন বলে সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। অতএব যা হবার তাই হলো। কোন এক শুভলগ্ন (?) বেছে শেষ পর্যন্ত ওয়ান ওয়ে রোডে বিয়েটা করেই ফেললাম।

আহারে ! আমার মতো কেউ কি এখন হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছেন, দুপেয়ে একটা বীর পুরুষপুঙ্গব বিয়ে নামক সংশোধনের অযোগ্য এক বালখিল্য ঘটনার শিকার হয়ে চোক্ষের সামনে কী করে ধোপী-গাধার মতো চতুষ্পদী একটা প্রাণীতে পরিণত হয়ে যায় ! প্রবল মাধ্যাকর্ষণ উপেক্ষা করা টানটান সিনা তার কীভাবে ভারবাহী চতুষ্পদী স্বভাবে নুয়ে পড়ে ভূমির সমান্তরালে ক্রমশই নিকটবর্তী হতে হতে শেষপর্যন্ত অদ্ভুত মাটি-লগ্নতায় পেয়ে বসে তাকে ! বার্ষিকীপূর্ণ হতে না হতেই ষড়পদ ধারণ করে দর্পাহত বুকটা তার মাটি ঘষটাতে শুরু করে দেয় ! আর পরাক্রমশীলতায় যিনি যতো অহঙ্কারী ছিলেন বলে শুনা যায়, তার নাকি পদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বাড়তে বাড়তে পদহীন কেঁচোর মতোই……শেষপর্যন্ত গড়াতে গড়াতে মাটিই পরম আশ্রয় হয়ে যায় !

আহা, তবে কি জীবনটাই মাটি ! কেউ কি জানেন, গাধারাই বিয়ে করে, না কি বিয়ে করেই গাধা হতে হয় !
(০৮/০৭/২০০৮)
[sachalayatan]
[pechali]
[somewhereinblog]
[amarblog]
[sa7rong]

ট্যাগ সমুহঃ ,

TC1029~Mind-and-Body-Posters
ছেঁদা … (প্রাপ্তবয়স্ক কৌতুকালেখ্য)
রণদীপম বসু

[নাবালক বয়সে শুনা সাবালকী কৌতুকের তৈরি গল্পরূপ]

বিবাহের বয়স পার হইয়া যাইতেছে, কিন্তু ছেদন মিয়ার জন্য যোগ্য পাত্রীর সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না। পরিবার পরিজন তো আছেই, পাড়া-প্রতিবেশীসহ আশে পাশের কাছে দূরের ময়-মুরব্বী পরিচিত অপরিচিত সবাইকেই প্রায় খবর দেওয়া হইয়া গেছে ছেদনের জন্য একটি রূপসী, বিদূষী, সর্বগুণে গুণান্বিতা, সকল কাজে পারদর্শি এবং যোগ্য একটি পাত্রীর সন্ধান করিয়া দিতে। কিন্তু কেহই সুবিধা করিয়া উঠিতে পারিতেছে না। কারণ, পৌরুষ যতই থাকুক, পুরুষের স্বাভাবিক দেহাবয়বের চাইতেও ছেদনের আকার অতিশয় ছোট এই সংবাদ জানিবামাত্রই পুঁচকে অসভ্য মেয়েগুলো এককথায় বাঁকিয়া বসিতে লাগিল। স্বচ্ছল পিতা-মাতার একমাত্র পুত্রসন্তান হিসাবে আল্লাহর দেয়া সহায়-সম্পদও কিছুমাত্র কম নহে। প্রাকৃতিক জ্ঞানের বহরে তাহাকে গ্রামের সকলেই তোয়াজ করিয়া চলিতে হয়। চার টাকা তিন আনা সের দরে সোয়া তিন সের দুধের পাঁচ বণ্টনে প্রত্যেকের ভাগে কত করিয়া মূল্য পরিশোধ করিতে হইবে খাতার দেড় পৃষ্ঠা ভরিয়া কী সব হিসাব নিকাশ আর আড়াই ঘণ্টা ব্যয় করিয়া পাই-পয়সা সহযোগে যে ব্যাপক ধৈর্য্য সহযোগে বলিয়া দিতে পারে, তাহাকে তোয়াজ না করিয়া উপায় আছে ! কিন্তু এইসব কারণ গৌন হইয়া সেই আকৃতিগত ছোট্ট একটা কারণই বড় হইয়া দেখা দিলো ! পড়ালেখায় তাহার আন্তরিকতায় এতটুকু ঘাটতিও কেউ কখনোই দেখে নাই। তথাপি প্রতিবারেই পরীক্ষা পূর্ণ হইবার আগেই ভাগ্যবিড়ম্বনায় অপরের দোষ ঘাড়ে লইয়া নকল করিবার দায়ে পরীক্ষার হল হইতে বহিষ্কার হইয়া গেলেও পঞ্চমবার ঠিকই মেট্রিক পরীক্ষাটি সম্পূর্ণভাবে দিতে পারিল বটে। কিন্তু পরীক্ষার খাতাকেই কেবল জ্ঞানের প্রকাশিত ক্ষেত্র হিসাবে অদূরদর্শী বিবেচনায় যাহারা অবমূল্যায়ন করিয়া অভ্যস্ত, তাহারা ছেদনের প্রতিভার সাক্ষাৎ পাইবে কী করিয়া। ফলে মেট্রিকে যে অকৃতকার্য হইবেই তাহা কি আর বলিবার বাকী থাকে ! এইসব বুঝিয়া শুনিয়া তাই বৃথা চেষ্টা আর না বাড়াইয়া ছেদন মিয়া অবশেষে প্রকৃতিকেই জ্ঞানার্জনের শ্রেষ্ঠতম উৎস হিসাবে বাছিয়া লইলো। অতএব প্রকৃতি-শিক্ষকের নিকট হইতে লব্ধ জ্ঞানের ব্যাপক চর্চার মাধ্যমে ছেদনের জ্ঞানের চতুর্মুখী সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। কিন্তু প্রকৃতি হইতে প্রত্যক্ষ বৈবাহিক জ্ঞান অর্জন এবং তৎপরবর্তী ফলাফল হাতে-নাতে পাইবার কোন উপায় ছেদনের জানা না থাকায় বাধ্য হইয়াই সে বিবাহ করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছে।

চারিদিক হইতে কেবল নৈরাশ্য আর হতাশার সংবাদ পাইতে পাইতে সবাই যখন হতোদ্যম হইয়া পড়িতেছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেল। এই পাত্রীও কখন আবার বাঁকিয়া বসে, তাই কালবিলম্ব না করিয়া একপায়ে খাড়া ছেদন তাৎক্ষণিক বিবাহ করিয়া ফেলিল এবং ধুমধাম করিয়া কন্যা লইয়া গ্রামে ফিরিল। সে নিজেও হয়তো ভাবিতে পারে নাই যে এইরকম সুশ্রী স্বাভাবিক আকারের একটি পাত্রী সে অকস্মাৎ পাইয়া যাইবে। কন্যা দেখিতে গ্রামের সবাই ভাঙিয়া পড়িল। কেহই আর উপস্থিত হইতে বাকী রহিল না। বরের পাশে কন্যাকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখিয়া সবাই কন্যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া উঠিতে লাগিলো। কিন্তু একই সাথে সবার মুখে হঠাৎ করিয়া একটি আফসোসও ঝরিয়া পড়িল- আহা, কন্যা তো ঠিকই আছে, কিন্তু ছেদা যে ছোট !

ময়-মুরব্বী যে-ই দোয়া-আশির্বাদ করিতে আসিল, সেই আফসোসটাও ধ্বনিত হইতে থাকিল, কন্যা তো ঠিকই আছে কিন্তু ছেদা যে ছোট ! প্রথমে তাহার নাক-মুখ-চোখ লজ্জায় রক্তিম হইয়া অতঃপর ধীরে ধীরে তাহার সর্বাঙ্গ রাগে লাল হইয়া উঠিতে লাগিল। এই কোথাকার বর্বর দেশে আসিয়া পড়িয়াছে সে ! তাহাদের কাহারো জিহ্বার লাগাম তো নাই-ই, বুঝিতে পারিতেছে না স্রষ্টা ইহাদের চোখ দুইটিকে কী উপাদান দিয়া বানাইয়া পাঠাইয়াছে ! বিবাহপূর্ব জীবনে স্পষ্টভাষিণী উপাধিধারী মেয়ে হইয়া এইরকম সর্বৈব মিথ্যা অপবাদ সে সহ্য করিবে কী করিয়া ! ধৈর্য্যরে বাধ ভাঙিতে ভাঙিতে শেষ কাণায় আসিয়া ঠেকিয়াছে। ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রামের দাদী সম্পর্কীয়া বৃদ্ধাটিও যখন তাহাকে নাড়িয়া-চাড়িয়া সামনে পিছনে ডানে বামে হইতে ভালো করিয়া যাচাই বাছাই করিয়া অবশেষে বলিয়া উঠিল- আহা, কন্যা তো সুন্দর, সবকিছুই ঠিক-ঠাক আছে, কিন্তু এই তুলনায় ছেদা তো ছোট ! কন্যা আর সহ্য করিতে পারিল না।

গ্রামবাসী যে ছেদন মিয়াকে আদর করিয়া ছেদা বলিয়া ডাকিতো, এই কথা নববধুকে না জানাইলে সে জানিবে কী করিয়া ! অতএব ছেদন মিয়ার বিবাহভাগ্য শেষপর্যন্ত পূর্বের সেই প্রাকৃতিক অবস্থাতেই রহিয়া গেল।

[sachalayatan]


রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 172,436 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুন 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check