h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Archive for the ‘প্রতিবিম্ব’ Category

| কে যায় চিড়িয়াখানায় !

-রণদীপম বসু

মানুষ চিড়িয়াখানায় যায় কেন ? এর একটা কারণ হতে পারে, যখনি মানুষ হিসেবে নিজের আত্মবিশ্বাসে টান পড়ে যায়, তখনি ছুট লাগায় চিড়িয়াখানার দিকে ! মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্বটাকে যত দ্রুত সম্ভব ঝালাই করে নেয়ার তাগিদে। কী হয় সেখানে গিয়ে ? এর অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের আধিপত্যের কিছু নমুনা পর্যবেক্ষণ করে নিজেকে আশ্বস্ত করা। কী সেই নমুনা ? গায়ে-গতরে যত বলবানই হোক, মানুষের হিংস্র বুদ্ধির সাথে কুলিয়ে না উঠা প্রকৃতি জননীর সহজ সরল বোকাসোকা প্রাণীগুলোর বন্দীদশা। যা কিনা সুসভ্য মানুষ কর্তৃক অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে সৃজনশীল দক্ষতার সাথে। এই দুর্ভাগা বন্দী প্রাণীগুলোকে কেন মানুষ চিড়িয়া নাম দিলো তা নতুন করে আবিষ্কারের আনন্দে এদেরকে অমানবিক প্রক্রিয়ায় উত্যক্ত করার মধ্য দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে। নইলে আর মানুষ হলাম কেন আমরা ! Read the rest of this entry »

ট্যাগ সমুহঃ

25122008_JatioSangsadBhabanView1Dhaka_photo_RanadipamBasu

জাতীয় সংসদ, আমাদের চোখ ক্যামেরার চোখ…
রণদীপম বসু

.

(২৭ ডিসেম্বর ২০০৮)
জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০৮ এর কাউন্ট ডাউন খুব দ্রুত শূন্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সব পর্যায়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন প্রায়। যদিও কোথাও কোথাও কিছু অনিয়ম অপরাধের খবর কানে আসছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচনের চূড়ান্ত অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করবো আমরা। সব নির্বাচনেই মানুষের মধ্যে অদ্ভুত কিছু আবেগের খেলা দেখা যায়। এবারেও আছে। তবে সব বিচারেই এবারের নির্বাচনে একটা বিশাল ভিন্নতা রয়েছে বলে মনে হয় অন্য যে কোন নির্বাচনের সাথে। নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় জোট মহাজোট দল প্রার্থী কর্মী সমর্থক ভোটার ও সাধারণ জনগণের বোধের জগতে নিশ্চয়ই এই ভিন্নতাগুলো রেখাপাত করেছে। অনেক প্রার্থী দল ও সমর্থকের নৈতিক ও আদর্শগত অবস্থান এবার অনেক বেশি পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়ে গেছে সবার কাছে। এক কান কাটা ও দু’কান কাটার পার্থক্যটাও চক্ষুষ্মাণ নাগরিকদের কাছে খোলাশা হয়ে যাওয়ার কথা। অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে জনগণের রায়ের অপেক্ষায় থাকা প্রধান প্রধান যে ইস্যুগুলো এবার মোটা দাগে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠেছে তা হলো-

25122008_Mausoleum_of_ZiaurRahmanView2_photo_RanadipamBasu
০১) সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়া বনাম বর্জন করা
০২) দুর্নীতিগ্রস্ত লুটেরা মামদোবাজদের কাছে ফের নতিস্বীকার বনাম তাদেরকে প্রতিরোধের প্রত্যয় ঘোষণা করা
০৩) নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার দায়বদ্ধতা বনাম স্বেচ্ছাচারিতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনীর অনুমোদন করা
০৪) সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকারবোধকে উচ্চকিত করে পরিবর্তন আহ্বান বনাম পুরাতন গড্ডালিকায় ভেসে যাওয়ার অভ্যস্ততায় থেকে যাওয়া
০৫) এবং অর্থহীন বাকপটুতাসবর্স্ব বাগাড়ম্বরের অথর্বতা স্বীকার করে নেয়া বনাম নতুন আলোয় উদ্ভাসনের ভিশনারী প্রতিনিধি খুঁজে নেয়া।
.

.

.

.

.

.

.

.

এর বাইরে আরো অনেক অনেক পয়েণ্ট আসতে পারে এবং এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বিতর্কে অনেকেই পাতার পর পাতা ভরিয়েও ফেলতে পারেন। এ মুহূর্তে সে পথে না গিয়ে আমাদের মেধা মনন আর উপলব্ধির নিজস্ব ঘরে বিষয়গুলোকে শেষ মুহূর্তের ভাবনা হিসেবে নাড়াচাড়া করে দেখার জন্য তুলে নিয়ে আমরা বরং আসুন একটু সংসদ ভবন এলাকা থেকে ঘুরে আসি। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, কেন ঘুরে আসবো ? আমাদের কি আর কাজ কাম নেই ? উত্তরে এটুকুই বলবো, অবশ্যই আছে। তবে এই ঘুরে আসাটা এজন্যেই গুরুত্বপূর্ণ যে, জনপ্রতিনিধি বানিয়ে আমরা কাকে কোথায় কীভাবে কেন পাঠাচ্ছি তা অনুভব করতে আমাদের রাষ্ট্রীয় সমস্ত কর্মকাণ্ডের উৎসটাকে আবারো একটু ফিরে দেখা জরুরি নয় কি ?

.

.

.

.

.

কথায় বলে, শীতের দিনে সকাল ও বিকেল আছে, দুপুর নেই। তবুও দুপুর ভেবে খ্রীস্টিয় বড়দিনের যে সময়টাতে বেরিয়ে বিজয়সরণীর মোড় ঘুরে হাঁটছিলাম, তখন শেষ বিকেল। হালকা রোদ ও কুয়াশাচ্ছন্নতায় সংসদ ভবনের পেছনভাগটাকে ধোয়াশার মতো লাগছে। রাস্তার একপাশে জিয়া উদ্যান, অন্যপাশে সংসদ ভবন এলাকা। এমপি হোস্টেলের লাল দালানগুলো পেরিয়ে এগিয়ে যেতেই ঢলে পড়া সূর্যের আঁচ সরাসরি চোখে। পকেট থেকে বের করে ২ মেঃপিঃ মোবাইল ক্যামেরার চোখ সেদিকে তুলতেই চোখ ঝাঁজিয়ে গেলো। স্মৃতি ধরে রাখতে না পারার হতাশা ফের পকেটে পুরে জিয়া উদ্যানে ঢুকে পড়লাম।

.

.

.

.

.

.

.

.

.

ব্যক্তিগত অনুভবে তখন এক দোলাচলের খেলা। রাস্তার এপার আর ওপার, কী পরস্পরবিরোধী আয়োজন ! একদিকে সংসদ ভবন আমাদের আশা-ভরসার তীর্থভূমি ম্লান আলোয় নিথর, অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও রাজনৈতিক জীবনে যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মীয় মৌলবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক জেনারেল জিয়ার মাজার সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল ! চারদিকে ভ্রমনপিপাসুদের কোলাহল।

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

দু-একটা ক্লিক শেষে ফিরে আসতে আসতে সংসদ ভবনটার দিকে ফের ক্যামেরার চোখ তুলে ধরলাম। আর সূর্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক ব্যাখ্যাহীন দুঃখবোধ ভরে নিয়ে ফিরে চললাম।
.

.

.

.

.

.

.

.

এমপি হোস্টেল পেরোতে পেরোতে ভাবছি, এই চমৎকার স্থাপত্যগুলোর ভোগবিলাসের জন্য কি আবারো কিছু মদ্যপ নারীলুলোপ ভণ্ড প্রতারককে নির্বাচিত করে পাঠাবো আমরা ? ভেতরে সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। অথচ এই সাধারণেরা যাকে নির্বাচিত করবে সেই হবে এর যাচ্ছেতাই ভোগদখলের দাবীদার। কী চমৎকার ব্যবস্থা !
.

.

.

.

.

.

.

.

রাতে বাসায় ফিরে মোবাইল থেকে ছবিগুলো কম্প্যুটারে আপলোড করেই চোখ কপালে উঠে গেলো ! এ কী ! আমাদের চোখ আর ক্যামেরার চোখে দেখা এক নয় তবে ! এই বিষন্ন আধিতে দাঁড়িয়েই দেখুন না, কী এক উদ্ভাসিত আলোয় ঝলমল করছে সংসদ ভবন (উপরে প্রথম ছবিতে ক্লিক করুন) ! এটা কি নতুন কোন আগামীর উদ্ভাসন, না কি পুরোটাই ফাঁকি !!!

[sachalayatan]

06022009_EkusheBoiMela09_Photo1_RanadipamBasu

। ম্যালা কথা বইমেলায়…।
রণদীপম বসু

.
যে কোন কারণে হোক, যাঁরা এবার মেলায় যান নি বা যেতে পারেন নি তাঁদের জন্য উৎসর্গিত এই পোস্ট।

.


.

.

.

এবারের বইমেলার সরকারি নাম ছিলো ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০০৯’। বাঙালির ঐতিহ্যমাখা বাংলা একাডেমি চত্বরে আয়োজিত এই বইমেলা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথই পেরিয়ে এলো। পূর্বনাম ‘পুঁথিঘর’ পরবর্তীতে ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনীর প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা স্বত্বাধিকারী বাবু চিত্ত রঞ্জন সাহা’র বাংলা একাডেমি চত্বরে চট বিছিয়ে বই মেলে বসে থাকা ফেব্রুয়ারির খুব ছোট্ট একটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে আজকের যে বিশাল একুশে বইমেলার রৈ রৈ আয়োজন অবয়ব, এটাকে হয়তো একটা গ্রন্থযুদ্ধই বলা যেতে পারে। শত শত প্রকাশনি, হাজার হাজার লেখক আর লক্ষ লক্ষ পাঠক ক্রেতার উচ্ছ্বসিত সমাবেশে আজ কোলাকুলি-কিলাকিলি, মাতামাতি-হাতাহাতি, গলাগলি-গালাগালির যে উদ্বাহু সরবতা প্রবহমান একে তো যুদ্ধই বলতে পারি আমরা।

.


.

.

.

.

আর তাই এই যুদ্ধের পেছনে কতো পরিকল্পনা, কতো নীতি, কতো নীতিহীনতাও লুকিয়ে আছে কে জানে। যাঁরা জানার তাঁরা হয়তো ঠিকই জানেন, আমরা জানি না। এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য মেলা প্রাঙ্গনে খোলা যে সিস্টেম বা ফ্রন্টগুলো চর্মচক্ষের অপরিকল্পিত অটো-রাডারে এমনিতেই ধরা পড়েছে তাকে সময়ের দাগে চিহ্ণিত করা আদৌ জরুরি কিনা জানি না। তবে নাই কাজ তো খই ভাজ জাতীয় বেকার প্রয়াস বললে নিজের উপরই অবিচার হয়ে যায়। তবু এরকম কোন উদ্দেশ্য হয়তো অবচেতনেই রয়ে গেছে এই উদ্যোগের পেছনে। তাহলে এবার কিছু খৈ ভাজা যাক।

একটু দাঁড়াও, এটা মেলার প্রবেশ তোড়ন…
অন্যবারের চেয়ে এবারের বইমেলার দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রধান পার্থক্যটাই ছিলো মেলার পরিসর একাডেমির নিজস্ব প্রাঙ্গন ছেড়ে বাইরের প্রধান রাস্তায় টেনে সম্প্রসারণ করা। আসলে সম্প্রসারণ বললেও ভুল হবে। মূলতঃ বাংলা একাডেমির নির্মীয়মান নতুন ভবনটি একাডেমি প্রাঙ্গনের বিরাট জায়গা খেয়ে ফেলায় পরিসর এতো বেশি সঙ্কুচিত হয়ে গেছে যে, মেলার আগের অবয়ব বা আকারটাকে ধরে রাখতেও এর গত্যন্তর ছিলো না। তাই টিএসসি থেকে দোয়েলচত্বরগামী প্রধান সড়কটাও এবার মেলার অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে। দু’দিকের দুটো তোড়নই ছিলো মেলার প্রবেশ মুখ।

.

.

.

.

.

আর রাস্তার মধ্যে মেলা চলে আসার কারণেই কিনা, আগত ক্রেতা পাঠক দর্শনার্থীর কোন কমতি না থাকলেও অন্যবারের মতো এবার আর মেলায় ঢুকতে কোন দুঃসহ দীর্ঘ লাইন ধরতে হয়নি। গতবার তো এরকম কয়েকবারই হয়েছে যে মেলা প্রাঙ্গন থেকে প্রায় এক কিলো দূরে সেই শাহবাগ মোড়ে বা অন্যদিকে কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারের প্রায় কাছাকাছি জায়গা থেকেই লাইন ধরতে হয়েছে। তবে বাংলা একাডেমির চমৎকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার তার নিজস্ব সীমানা প্রাচীর ভেঙে দুটো গেটের মাঝামাঝি আরেকটি প্রধান ফটক তড়িঘড়ি নির্মানও এই অসহনীয় জটমুক্তির অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।

বাংলা একাডেমি পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র, হ্রাসকৃত মূল্য…
একমাত্র এই বইমেলা ছাড়া একাডেমির এই স্থায়ী পুস্তক বিক্রয়কেন্দ্র থেকে চাকুরেদের জন্য অফিস টাইমের মধ্যে বই কেনা বা সংগ্রহ করা কখনোই সম্ভব নয়, যদি না অফিস ফাঁকি দেয়া হয়। ফলে মেলা চলাকালীন সময়ে সারাক্ষণই বিক্রয়কেন্দ্র দুটোকে সরব থাকতে দেখা গেছে। একটিতে ৩০% হ্রাসকৃত মূল্যে বই বিক্রি এবং অন্যটিতে ন্যুনতম দশ বছর আগের প্রকাশনাগুলো ৫০% হ্রাসকৃত মূল্যে বিলি করে স্টক খালি করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। এমনিতে এবারের মেলায় সবার জন্য ২৫% ডিসকাউন্টে বই বিক্রির নিয়ম কড়াকড়ি ছিলো। গতবারও তাই ছিলো। তবে তার আগেরবার অর্থাৎ ২০০৭-এ ছিলো সম্ভবত ৩০%। একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্র বাদে বাকি বইয়ের ক্ষেত্রে এই ডিসকাউন্ট প্রথাটা কেন যেন খুব ঘোরালো মনে হয়। এটা কি এক ধরনের ক্রেতা ঠকানো নয় ?

.

.

.

.

.

আমাদের দেশের প্রায় সব প্রকাশনাই বইমেলা কেন্দ্রিক হয়ে ওঠায় লেখক রয়্যালিটি (যদি সত্যি তা লেখককে দেয়া হয়), প্রকাশনা ব্যয়, বিপণন ব্যয়, প্রকাশকের মুনাফা ধরেই যদি বইয়ের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হতো, তাহলে প্রকাশকের প্রকৃত মুনাফা আসলে কত, যে, তা থেকে ২৫-৩০% হ্রাসকৃত মূল্যে বিক্রি করেও প্রকাশকের ঘটি বাটি বিক্রি করতে হয় না ! আসলে হ্রাসকৃত মূল্যের পরিমাণটাকে প্রকৃত মূল্যের সাথে যোগ করেই বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বাস্তবে এই যদি হয় তাহলে মূল্যহ্রাসের এই অনৈতিক ভড়ং দেখিয়ে পাঠককে প্রতারণা করার দরকারটাই বা কী এর জবাব কেউ দেবেন ? বাঙালি মনস্তত্ত্বের কোথাও না কোথাও মাগনা খাওয়া বা ভিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি লোক ঠকানোর একটা তীব্র প্রবণতা খুব সক্রিয়ভাবে রয়ে গেছে হয়তো। আর এজন্যই হয়তো আমাদের আত্মসম্মানবোধে এই ঘটনাগুলো কখনো নাড়া দিতে দেখা যায় না।

নজরুল মঞ্চ, মোড়ক ‘উম্মোচন’ এবং উন্মোচন কেন্দ্র…
একাডেমি প্রাঙ্গনে বর্ধমান হাউসের সামনেই সুশীতল বটবৃক্ষটার ছায়ায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবক্ষ ভাস্কর্য মূর্তিটা ঘিরে ইট সিমেন্ট বাধানো প্রশস্ত বেদীটার মধ্যে এবারের মেলায় প্রকাশ হতে থাকা বইয়ের মোড়ক উম্মোচন এবং উন্মোচনের ধুম লেগে থাকে।

.

.

.

.

.

সাধারণের মধ্যে এর কৌতুহলও কম ছিলো না। লেখক প্রকাশকরা সঙ্গি-সাথিসহ আপামর পাঠকের কাছে নতুন বই প্রকাশের ম্যাসেজটা এখান থেকেই প্রথম ঘোষণা দেন। তবে ঘোষণার সময় যে মজার বিষয়টা বারবারই লক্ষ্য করা গেছে, যাদেরকে উদ্দেশ্য করে এ ঘোষণা সেই আম-পাঠকরা কিংবা অতিউৎসাহী দর্শনার্থীরা সম্মুখাংশের বদলে পেছনভাগটা দখলে রাখতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এ উছিলায় নিজেদের খুবসুরৎ চেহারাটা মিডিয়ার ক্যামেরায় ধরে রাখাতেই আগ্রহ তাদের বেশি ছিলো।

.

.

.

.

.

ফলে ভীড়ের ঠেলায় ঘোষণাকারীদেরই ঘোষণামঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ার অবস্থা। আর যারা শোনার কথা তারা তখন ক্যামেরার চোখে চোখ রেখে বিভিন্ন পোজ ধরাতেই ব্যস্ত। যেহেতু এখানে কোন লাউড স্পীকার ছিলো না, তাই পাশেই একাডেমির বিরতিহীন অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে জোরালো শব্দের বিবর্ধিত আওয়াজে চাপা পড়ে মোড়ক উন্মোচন আসলেই উম্মোচনের দশায় পরিণত হচ্ছিল। এজন্যই কি মাসব্যাপি মেলার শেষ প্রান্তে এসে সংশোধনের আগ পর্যন্ত গোটা মাস ধরে মঞ্চের পেছনের দু-দুটো বিশাল বোর্ডে বিরাটাকার উন্মোচন বানানটাকে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ ‘উম্মোচন’ বানিয়ে রেখেছিল ?

লেখক কুঞ্জ, কথা ছিলো আড্ডা হবে…
বটবৃক্ষটার নিচেই নজরুল মঞ্চের ঠিক পেছনে লেখকদের সাথে পাঠকের একটা দৃশ্যমান যোগসূত্র ঘটানোর উদ্দেশ্যেই হয়তো লেখককুঞ্জের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো।

.

.

.

.

.

.

পাঠকের সংযোগ না ঘটলেও অনেককেই দীর্ঘসময় এখানে বসে থাকতে দেখা গেলো যাঁরা লেখক হিসেবে নিজেদেরকে পরিচিত করানোর প্রত্যাশা হয়তো করেছিলেন। কিন্তু আমাদের তথাকথিত সম্ভ্রান্ত লেখকদেরকে এই লেখক কুঞ্জের আশেপাশে দেখা যায় নি। তাঁরা বিভিন্ন প্রকাশনার স্টলে অটোগ্রাফ বাণিজ্যে দিনভর এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, ভক্তকূল ছাড়া স্বাভাবিক ও সাধারণ পাঠকরা ওইসব স্টলে গিয়ে যে কোন বইয়ের খোঁজ করবেন তার উপায় থাকে নি।

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

তবে ব্যতিক্রম হিসেবে লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে দেখা গেলো লেখক কুঞ্জের পাশেই বেদীর ধারটাতে বসে শিশু থেকে বয়স্ক অনুরক্তদের ইচ্ছা পূরণ করতে। হয়তো এজন্যই তিনি শ্রদ্ধাভাজন জাফর ইকবাল। কষ্ট লাগলো চির তরুণ এই ব্যক্তিত্বের প্রিয় চেহারায় চলে যাওয়া সময়ের অনিবার্য রেখাগুলো হঠাৎ করেই যেন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠছে !

আজকের বই, বর্ধমান হাউসের তথ্য-দেয়াল…

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

প্রতিদিন মেলায় যে সব বই প্রকাশিত হচ্ছিল সে বইগুলোর কভার নির্দিষ্ট দেয়ালগাত্রে সেটে দিয়ে পাঠক অবগতি ও আকর্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো। কিন্তু যে পরিমাণ বই প্রতিদিন আসছিল বা গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর কভার কি সত্যি সত্যি এখানে সাটা হচ্ছিল ? মনে হয় না। তবে এ অঞ্চলটা তারুণ্যের মুখরতায় উজ্জ্বল ছিলো।

নানা রঙ নানা সুর, একুশে অনুষ্ঠান মঞ্চ…
এখানেই জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহান একুশে বইমেলার শুভ উদ্বোধন করেন।

.

.

.

.

.

.

বর্ধমান হাউসের ঠিক পার্শ্ববর্তী খোলা স্থানটিতে কালো পর্দা টানানো বিশাল মঞ্চ আর শ্রোতা দর্শকের জন্য সুপরিসর বসার ব্যবস্থা রেখে তৈরি করা এ আয়োজনটি মাসব্যাপি সেমিনার, আলোচনা, বক্তৃতা, আবৃত্তি, সংগীত, নাটক, পুরস্কার বিতরণ ইত্যাদি অনুষ্ঠানমুখরতায় খুবই সরগরম ছিলো। তবে এখানেই দর্শক সারিতে চেয়ার বাইড়াবাইড়ির মতো লজ্জাজনক ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। বুঝাই যাচ্ছে যে এতো সংস্কৃত প্রভাবেও আমাদের বাঙালি রুচি থেকে জংলি খাসিলতটা এখনও কেটে যায় নি।

তথ্য কেন্দ্র, তথ্যের সমাহার এবং…

.

.

.

.

.

.

.

মেলা প্রাঙ্গনে ঢুকলেই মাইকে কিছু বিরতিহীন ধারাবর্ণনা শুনতে পাওয়া যায়। বইয়ের নাম অমুক, লেখক তমুক, বইটি প্রকাশ করেছে সমুক প্রকাশনী ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ঘোষণাগুলোই আসছিলো তথ্য কেন্দ্র থেকে। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশকদের সরবরাহকৃত তালিকা পাঠ করে করে আগত দর্শনার্থীদেরকে ঐদিনের প্রকাশিত বইয়ের তথ্য অবগত করানোর ব্যবস্থাটা ভালোই। অবশ্যই আরেকটি ভালো উদ্যোগ ছিলো মেলার কোন সমস্যা বা হারানো বিজ্ঞপ্তির ঘোষণা।

.

.

.

.

.

.

.

এ ছাড়া মেলার যেকোন তথ্যসহযোগিতার জন্য বর্ধমান হাউসের পশ্চিম পাশের প্রশস্ত বারান্দার একাংশ জুড়ে বসানো এই তথ্য কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থানে ছিলো ভাস্কর্য মোদের গরব। যেখানে বিভিন্ন টিভি মিডিয়ার অবস্থানের কারণে মেলার ভীড়টা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে এখানেই। এবং তথ্য কেন্দ্রের পাশেই বারান্দার আরেক অংশে বিভিন্ন প্রতিবাদ ক্যাম্পেইনগুলোও অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।

‘মোদের গরব’, মিডিয়ার প্রক্ষেপন কেন্দ্র…
ভাস্কর অখিল পালের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নির্ভর চমৎকার অর্থপূর্ণ মডেল অনুসারে শিল্পী গোপাল চন্দ্র পালের নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য ‘মোদের গরব’-এর সামনেই ছিলো প্রতিদিনের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার লাইভ সম্প্রচার কেন্দ্র। প্রায় সবগুলো চ্যানেলই এই জায়গাটা থেকে মেলার লাইভ সাক্ষাৎকার, লেখক ও বই পরিচিতি এবং তথ্য সম্প্রচার করেছে।

.

.

.

.

.

.

.

আর এ জন্যই মেলা চলাকালীন এ জায়গাটা ছিলো নতুন-নতুনিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা, নিজেদেরকে কোনভাবে যদি ক্যামেরার চোখে একটু ধরিয়ে দেয়া যায় ! এই সামান্য চাওয়াটুকুর ভীড়ে জায়গাটা এতোই ব্যতিব্যস্ত ছিলো যে, মেলায় বই বেরিয়েছে এমন লেখক লেখিকাদের অনেকেই বইটি হাতে নিয়ে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেও পিছপা হন নি। টিভি মনিটরে পর্দায় সামান্য কয়েক মুহূর্তের জন্য লাইভ সাক্ষাৎকারের দ্যুতি ছড়ানোর এই তীব্রতম আশা নিয়ে অনেক প্রসিদ্ধ লেখককেও এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনেকেই বেশ মজা পেয়েছেন। আহা, নিজেদেরকে প্রদর্শনযোগ্য করে তোলার জন্য আমরা কত কীই না করি !

সময় ভাঙার হাট, লিটল ম্যাগাজিন চত্বর…

.

.

.

.

.

.

ওগুলো কি কেওড়া গাছ ? দুটো বড় গাছের ভিত্তিমূল বাঁধিয়ে গোলাকার দুটো বেদীতে লিটলম্যাগ কর্মীদের সম্ভাব নিয়ে বসার স্থানটা ঠাসবুনুনির মতো হলেও স্বপ্নবান তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে এই আপাত বাধা অবশ্য দমিয়ে রাখতে পারে নি, পারার কথাও নয়। কেননা প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধবাদী আদর্শ ধারণ করে যে তরুণ লিটলম্যাগ কর্মীরা তাদের তারুণ্যকে নিবেদন করেন, সেখানে সামনে প্রচল বাধাকে অপ্রতিরোধ্য বাধা মনে না করাই তো এদের উদ্যমসূত্র।

মেলাকে ছুঁয়ে থাকা মেলা, ধোঁয়া আর তারল্য…
মেলায় আগত দর্শনার্থীদের মোট সংখ্যাকে যদি স্টল সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়, যে ফলাফল বেরোবে, গাণিতিক নিয়মে তাকেই স্টলপ্রতি গড় দর্শনার্থী সংখ্যা ধরে নিতে পারি। এই গড় সংখ্যার সাথে অবশ্য সম্ভাব্য যা ঘটেছে সেই প্রকৃত সংখ্যার গরমিল থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেননা দর্শনার্থীদেরকে তো কেউ দিব্যি দিয়ে মেলায় প্রবেশ করায় নি যে ওটাতে যেতে হবে ওটাতে নয়। কিন্তু বর্ধিত মেলা এরিয়ার মধ্যেই যে ব্যতিক্রমী স্টলটিতে লোক সমাগমের রেট সবচেয়ে বেশি ছিলো বলে জোর বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে তা হলো সবচেয়ে কাছাকাছি শীববাড়িস্থ ব্যাচেলার্স ষ্টাফ কোয়ার্টার্স গেট সংলগ্ন চা স্টলটিতে।

.

.

.

.

.

.

.

এত্তোবড় জমজমাট একটা মেলার পবিত্রতা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্যে মেলায় পান সিগারেট সেবন ও বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ায় শুধুমাত্র চা কফি পানি কিংবা ফুচকা পপকর্নের জন্য বাংলা একাডেমির গলাকাটা কেন্টিনটাতে অনেকেই হয়তো গিয়েছেন। কিন্তু গোটা মেলার বাদবাকি সব চাপ পড়েছে গিয়ে মেলার মূল প্রাঙ্গন থেকে বেরিয়ে শীববাড়িস্থ ওই বাদাইম্যা গোছের চায়ের দোকানটাতেই, যার একটা টেবিল মাত্রই সম্বল। পাশে পানি পান সিগারেট ও কফি পানের ব্যবস্থা থাকায় আড্ডারু তরুণ যুবকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে সারাক্ষণই জমজমাট ছিলো এই চিপাগলিটা। ধুমপায়ী লেখক পাঠক ক্রেতা আড্ডারুদের জন্য এটা একটা বিরাট সুযোগ বৈ কি !

অন্তর্জালিক ব্লগারাড্ডা, শুদ্ধস্বর…

.

.

.

.

.

.

.

এবারের মেলায় একটামাত্র কর্ণার ছিলো ‘মোদের গরব’ ভাস্কর্যটির ঠিক পেছন বরাবর, যেখানে কেবল সিঙ্গেল সারিতে গুটিকয় স্টল ছিলো। অপর পার্শ্বে কোন স্টল থাকার সুযোগ ছিলো না। যা ছিলো তা কিভাবে যে খাপে খাপে জায়গামতো মিলে গেলো ভাবতেই আশ্চর্য হই। একটা খোলা বারান্দা ! সচল প্রকাশনার উৎসকেন্দ্র শুদ্ধস্বর প্রকাশনের স্টলটি বারান্দার ঠিক উল্টো এই সারিতে না হয়ে মেলার অন্য কোথাও বরাদ্দ হলে এবারের মতো এমন ব্লগারাড্ডারুদের আড্ডাটা আদৌ এতোটা জমজমাট হতো কিনা ঘোরতর সন্দেহ থেকেই যায়। এক্কেবারে সোনায় সোহাগা অবস্থা। অদৃশ্য কোন সত্তায় কখনোই বিশ্বাসী ছিলাম না এবং এখনো নই। তবু মনে হয় কে যেন কানে ধরে সব সচলগুলোকে এক জায়গায় মিলিয়ে দিয়ে একটা হৈহুল্লোড়ের মেলা বসাতে চেয়েছিলো।

.

.

.

.

.

.

.

এবং হয়েছেও তাই। কোত্থেকে কতগুলো গাছের গুঁড়ি এনে মোড়ার মত বানিয়ে ওই বারান্দাতে যে আড্ডা কেন্দ্রটা গড়ে ওঠেছিলো, গোটা মেলার সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল ও আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে ওঠলো এটাই। এই বারান্দার সিংহভাগ জুড়ে প্রথম দিন থেকে একুশে ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানটি জোরেসোরে খুব সফলভাবে চালিয়েছেন তরুণ উদ্যমী কিছু ব্লগার ভাই। এবং এই বারান্দাটাই হয়ে ওঠেছিলো চেনা-অচেনা বিভিন্ন ব্লগের অন্তর্জালিক লেখক পাঠক বন্ধু-বন্ধুনিদের এক অভূতপূর্ব প্রাণকেন্দ্র।

.

.

.

.

.

.

.

এই কর্ণারের সর্বশেষ স্টলটাও ছিলো সম্ভবত এই মেলার একমাত্র সাজসজ্জাহীন স্টল, যাকে কাছে থেকে দেখেও ভালো করে না তাকালে বুঝার উপায় ছিলো না যে ওটার নাম ‘ভোরের শিশির’। এটাই কি মেলার সবচেয়ে গরীব স্টল ? না কি সমস্ত সাজ-সজ্জার বিরুদ্ধে এক উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ ও ব্যতিক্রম ?

.


.

.

.

.

.

.

মাসব্যাপি দীর্ঘ এই বইমেলা যা বাঙালির প্রাণের মেলা, এখানে জান্তে-অজান্তে আরো বহু বহু ঘটনাই হয়তো ঘটেছে। মেলার আভ্যন্তরীণ বিষয় ছাড়াও পিলখানা ট্র্র্যাজেডির মতো রাষ্ট্রিয় বিষাদময় ও রহস্যপূর্ণ ঘটনাও ঘটেছে যা মেলাকে তীব্রভাবেই প্রভাবিত করেছে। বয়ানকারী হিসেবে ব্যক্তিগত আবেগ, সীমাবদ্ধতা, সময় সুযোগের ঘাটতি সবকিছু মিলিয়ে মাসব্যাপি বিরাট এই আয়োজনের যে কোন সংক্ষিপ্ত বর্ণনাই যে ভয়াবহ রকমের অসম্পূর্ণতায় ভরা তা বলাবাহুল্য। তবু এই সঙ্গতিহীন অসম্পুর্ণতাটুকুই না হয় উপস্থাপন ব্যর্থতার নমূনা-চিহ্ণ হয়ে থাক।

.

28022009_EkusheBoiMela09_Photo15_RanadipamBasu

.

24022009_EkusheBoiMela09_Photo4_RanadipamBasu
.
[sachalayatan]

নোবেল লরিয়েটের সাথে একদিন
– রণদীপম বসু

.

.

.

.

.

.

.

.

১৩ অক্টোবর, ২০০৬ শুক্রবার। এই ঐতিহাসিক দিনে নরওয়ের নোবেল কমিটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেয়। বাংলার সোনার ছেলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের এ পুরস্কার ছিনিয়ে আনার সংবাদে উল্লাসে ফেটে পড়লো গোটা জাতি।

.

.

.
.

.

.

১৯১ জন প্রতিযোগীর তালিকা থেকে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্রঋণের জয়বার্তা ঘোষণা করে দারিদ্র্য বিমোচনে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় প্রায়োগিক অবদানের স্বীকৃতি দিলো অবশেষে। এর স্রষ্টা যে বাংলা মায়ের এই দামাল ছেলেটি। তাই এর উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি বাঙালীর বুকে মুহূর্তেই। হীনমন্য জাতি হিসেবে এতকালের মিথ্যে অপবাদের মোড়ক ছিন্নভিন্ন করে বেরিয়ে এসেছে একান্ত স্বরূপে আবার। আত্মবিশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশে। বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছে তাই সেই একাত্তরের গর্জনের মতোই- ‘আমরা পারি, আমরা পারি…..’।
.


.

.

.

.

.

দেশী বিদেশী মিডিয়া আর দল মত জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের উচ্ছল আর্দ্রতায় মাতোয়ারা গ্রামীণ ব্যাংক-চত্বরসহ গোটা দেশ যে উৎসবে মেতে উঠেছিলো, কেউ না দেখে থাকলে এই অনুভূতি কি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব?
পুরস্কার ঘোষণার প্রাক্কালে নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে ডানবোল্ট মিওস কর্তৃক প্রদত্ত সাইটেশনটির বাংলা তর্জমা ছিলো এরকম-

.

.

.

“ নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি” ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় অবদানের জন্য এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।

বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যের চক্র ভেঙ্গে বের করে আনার পথ দেখাতে না পারলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন সম্ভব নয়। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি সে রকমের একটি পথের দিশা। এ পথে আনা উন্নয়ন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অগ্রগতিকেও গতিশীল করে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অনেক দেশেই কোটি মানুষের স্বার্থে স্বপ্নের বাস্তব প্রয়োগে মুহাম্মদ ইউনূস নিজের নেতৃত্ব গুণের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

জামানত ছাড়াই দরিদ্র মানুষকে ঋণ দেয়া অসম্ভব একটি ধারণাই ছিলো । তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে ইউনূস প্রথম বারের মতো এ অসম্ভব ধারণাকেই শুধু ভাঙ্গেননি, তিনি ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে গ্রামীণ ব্যাংক আজ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্যই ধারণা ও মডেলের অফুরান উৎসের রূপ নিয়েছে। পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষের সুন্দর জীবন যাপনের অধিকার যেমন আছে তেমনি তাদের সম্ভাবনাও আছে। সংস্কৃতি ও সভ্যতা নির্বিশেষে ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে গরিবের মধ্যে গরিবতম মানুষটিও নিজের উন্নয়নে কাজ করতে পারেন। মেয়েদের জন্য নিপীড়নমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেসব সমাজে বিরাজ করছে ক্ষুদ্রঋণ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ এক মুক্তির উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমান অংশগ্রহণ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক গণতন্ত্র তার পুরো সম্ভাবনার বাস্তব রূপ দিতে পারে না। পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য নির্মূল ইউনূসের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন। শুধু ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে সে স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে এ স্বপ্ন পূরণে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বড় একটি ভূমিকা পালন করে আসছে।”

.

বাঙালি হিসেবে তৃতীয় আর বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম এই নোবেল লরিয়েট-কে কাছে থেকে দেখা ও তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করার সৌভাগ্য হলো একদিন। ২২ জানুয়ারি, ২০০৭। ততদিনে তিনি তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের সহকর্মীদের সাথে নিয়ে এক জমকালো সফরের মধ্য দিয়ে নরওয়ের অসলো থেকে নোবেল পুরস্কার নিয়ে রাজকীয় মর্যাদায় সুইডেন ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঘুরে এসেছেন। স্যার আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বরে নোবেল কমিটি অসলোতে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান করে থাকে। ১০ ডিসেম্বর,২০০৬ তারিখে ঐতিহ্যবাহী সিটি হলে অনুষ্ঠিত এবারের রাজকীয় অনুন্ঠানটি তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে সরাসরি টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় সবাই একযোগে উপভোগ করেছেন। সবাই দেখেছেন ড. ইউনূস কী বিশাল সম্মান এ জাতির ললাটে এঁকে দিয়েছেন।

.

এতোবড় ব্যক্তিত্বের বিশালতা আর গভীরতা পরিমাপ করা আমার মতো এতো ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। সে চেষ্টা করাটাও আমার জন্যে নির্বুদ্ধিতার নামান্তরই। শুধু উপলব্ধি করার অনুভূতিটা রয়েছে, এবং তা প্রকাশের ভাষা এ মুহূর্তে আমার আয়ত্তের বাইরে। অন্য কোন প্রেক্ষিতে তাঁর সুবিশাল কাজ নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনার ইচ্ছা রইলো। আজ বরং এই নোবেল ব্যক্তিত্বের সাথে গুটিকয় স্মৃতিচিহ্নের সচিত্র নমূনা দানের জন্য অমায়িক আলোকচিত্রি জনার নূরজাহান চাকলাদারের কাছে আমার সবিশেষ কৃতজ্ঞতাটুকু জানিয়ে রাখি। পাঠক আপনাকেও ধন্যবাদ এতোক্ষণ সাথে থাকার জন্য।


যুক্তরাষ্ট্র : যে দেশে ‘মে দিবস’ উপেক্ষিত !
রণদীপম বসু
.
১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটে দৈনিক শ্রমঘণ্টা কমিয়ে দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে বিক্ষুব্ধ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রমিকদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে বিশ্বব্যাপি পহেলা মে’র দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে বেছে নেয়া হয়।

.

.

.

.

.

জাতিসংঘও এ দিনটিকে অনুমোদন করে। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনকারী প্রায় সব রাষ্ট্রগুলোতে দিনটিকে সরকারিভাবে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ যে দেশে এই মে দিবসের সৃষ্টি, যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে শ্রমিকরা একতরফা দিনটিকে পালন করলেও সরকারিভাবে নাকি মে দিবস পালিত হয় না ! ওখানে যে দিনটিকে লেবার ডে হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় তা হচ্ছে পহেলা সেপ্টেম্বর। মজার ব্যাপার, সেপ্টেম্বরের প্রথম দিনটি হচ্ছে গ্রীষ্মকালকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানোর দিন। এ দিনটিকে আবার শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সবাই একত্রে পালন করে থাকে।

.

.

.

.

.

.

.

.

.

১৮৮৬ সালে হে মার্কেটের এই ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ধনিক শ্রেণীর পক্ষ হতে শ্রমিকদেরকেই বেশি দায়ী করা হয়। শ্রমিক সমাবেশ থেকে পুলিশের ওপর নিক্ষিপ্ত বোমায় একজন পুলিশ মারা যায়। এবং এ কারণেই পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে বাধ্য হয় বলে দাবী করা হয়। পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক হতাহত হলেও মেথিয়াস জে ডিগান নামের নিহত সেই পুলিশের স্মরণে ১৮৮৯ সালে হে মার্কেট স্কোয়ারে একটি মনুমেন্ট নির্মাণ করা হয়। সেদিন অর্ধশতাধিক পুলিশ আহত হয় এবং এ ঘটনাকে পুলিশের নথিতে দাঙ্গা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

.

.

.

.

.

.

ডিগানকে খুন করার জন্য যে বিচারের আয়োজন করা হয়, সেই বিচারে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে বিশ্বব্যাপি শ্রমিক জনগণ মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড রহিত করা হলেও বাকি চারজন স্পাইস, পারসন্স, ফিশার ও এঞ্জেল’কে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসির রজ্জু গলায় পরার সময় এই সাহসী বীরেরা আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সঙ্গীত গাইতে থাকেন।

.

.

.

.

.

.

.

.

শিকাগোর ফরেস্ট পার্কে জার্মান ওয়াল্ডহেইম কবরস্থানে যেখানে তাঁদেরকে সমাহিত করা হয়, ১৮৯৩ সালে সেখানে তাঁদের স্মরণে একটি মনুমেন্ট নির্মাণ করা হয়। আর একশ’ বছর পরে এসে ভাস্কর আলবার্ট ওয়েইনার্ট নির্মিত এই মনুমেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল হিস্টরিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ঘোষণা করে।

এখন তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়, মে দিবসের কী হবে ?
(more picture)

.
[sachalayatan]

09012009_TradeFair09Gate_Photo1_RanadipamBasu

আপনি কেন বাণিজ্য মেলায় যাবেন…
রণদীপম বসু

.
বাণিজ্য মেলায় গিয়ে বোকারা জগৎ সংসার ভুলে কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর আমার মতো বুদ্ধিমান যারা, তার তখন হ্যাবলার মতো চেয়ে থাকে স্টলগুলোর দুর্দান্ত বাহারি সব ডিজাইগুলোর দিকে।

বাণিজ্য মেলাতে গিয়ে কিছু কেনার চাইতেও বুদ্ধিমানদের আকর্ষণ যে ওই বাহারি স্টলগুলোর দিকে, তার কারণ হলো দু’টো। চাইলেও কেনাকাটা করার সংগতিশূন্যতার বোধ ডিস্টার্ব করার সুযোগ তো পায়ই না, বরং একটা নান্দনিক তৃপ্তি সারাক্ষণ ছড়িয়ে থাকে মন ও মনন জুড়ে। অতএব আপনি কেন বুদ্ধিমান হবেন না..!

তাহলে চলুন ঢাকার আগারগাওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশেই সদ্য শুরু হওয়া চতুর্দশ ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০০৯ থেকে ঘুরে আসি একবার। মেলায় প্রবেশমূল্য ধরা হয়েছে সাধারণ জনপ্রতি ১২টাকা, শিশুদের জন্য ৭টাকা করে।

রথ দেখাটাই আসল। সাথে যদি কলা থেকেই থাকে, বেঁচতে তো আর কেউ বাঁধা দিচ্ছে না ! তবে একই সাথে এও বলে রাখি, আয়োজকরা কিন্তু ঠিকই জানেন যে, এখানে বুদ্ধিমানরা দেখতেই আসেন। এবং শেষ পর্যন্ত বোকা হয়েই ফিরে যান…! হা হা হা !

তবে আমি কিন্তু বোকা হইনি…!


[মেলার আরো ছবি]

[sachalayatan]
[somewherein]

রণদীপম বসু

রণদীপম বসু

‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।’

# আমার উঠোন:

[ হরপ্পা-ব্লগস্পট ] [ উত্তর-হরপ্পা ] [ হরপ্পা ইয়োগা ] [ হরপ্পা-ছবিঘর ] [ সচলায়তন ] [ বাঁধ-ভাঙার আওয়াজ ] [ মুক্তাঙ্গন ] [ আমার-ব্লগ ] [মুক্ত-মনা ব্লগ ] [মুক্ত-মনাওয়েব ] [ সাতরং ] [বাংলা-উইকি ] [ফেস-বুক ]  [প্রযুক্তি-ফোরাম ] [আগুন-পাখি ] [প্রথম-আলো ব্লগ ] [উইকি-ইউজার ] [বাংলা-ফোরাম ] [খবর.কম ]

# খোঁজ-খবর:

[ ইয়াহু-মেইল ] [ জি-মেইল ] [ হটমেইল ] [গুগল-সার্চ ]

# কল-কব্জা:

[বাংলা-খাতা ] [অভ্র-লেখ ] [ফোনেটিক ]

# কী খবর !

[বিডিনিউজ-এভরিডে ] [একটি-বাংলাদেশ ]

# ছবি-ঘর:

[ফটোবাকেট ] [পিকাসা-ওয়েব ] [ফ্লিকার ]

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.


রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 557,477 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 141 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অগাষ্ট 2020
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos