h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Archive for the ‘সাহিত্য পাড়া’ Category

কবি-কবিতা-ছড়া-শিল্প-বিভ্রম…
রণদীপম বসু


গুরুচণ্ডালিকা
আলোচনার কান ধরে টান দিলে কবিতা  (poem)  এসে যেতেই পারে। তাই প্রথমেই বলে নেয়া ভালো যে এটা কোন কবিতার কাশ বা কাব্য আলোচনা নয়। স্রেফ অভিজ্ঞতা বিনিময়। আপ্তজনদের গপ্পোসপ্পো থেকে শিক্ষার্থী হিসেবে কিছু শিখতে চাওয়াজনিত যে বদহজমের সূত্রপাত, সেটাকে খালাস না করা অব্দি স্বাচ্ছন্দ্যের দেখা পাচ্ছি কই ! তাছাড়া শেখা বা জানার প্রক্রিয়াগত ভিন্নতা ব্যক্তিমাত্রেই স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব মেধা, বোধ ও সীমাবদ্ধতার স্কেলে নিয়ন্ত্রিত বলে রহিমকে রাম বানিয়ে ফেলা বা শিল্পের কলা’কে হস্তী-ভক্ষ্য কদলীবৃক্ষ বানিয়ে গিলে ফেলার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়ার নয়। এমন দুর্যোগ ঘনীভূত হলে হাত তোলে জানান দেয়ার স্বাধীনতা সবারই রয়েছে, যে, আর্ট  (art) আর অষ্টকদলী একই বস্তু নয় !

দুর্দান্ত সব কবিতা উপহার দিয়েও বোহেমিয়ান শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো শক্তিমান কবি  (poet) যখন নিজেকে পদ্যকার হিসেবে ঘোষণা দেয়ার কৌতুক আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন, তখন সত্যিকারের কবিরা নিজ নিজ কৃতকর্মগুলো হাতে নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসেন বৈ কি। কবি শব্দের আগে একটা ‘সত্যিকারের’ শব্দ বসানো মানেই যুক্তিবিদ্যার আরোহী পদ্ধতি অনুযায়ী কাল্পনিকভাবে হলেও প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্টো স্বভাবের আরেকটা সত্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়া হয়। তাহলে কি মিথ্যাকারের কবিও রয়েছে ! রয়েছে বৈ কি ! নইলে কবি জীবনানন্দ দাশ কেনই বা সাধ করে ‘কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি’ উক্তি করে এমন ল্যাঙ মারতে গেলেন !

জীবনানন্দের এই উক্তিটাতে যে অবশ্যই জটিল একটা বিভ্রম লুকিয়ে আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। তাই উক্তিটাকে খুব সরলভাবে নেয়ারও উপায় নেই। এ কারণেই কৌতুহলটা উচ্চকিত হয়ে ওঠে, বিভ্রমটা কী ? তাঁর উক্তির প্রথম অংশটা আবারো আমরা খেয়াল করি, ‘কবিতা লিখে অনেকেই…’। হাঁ, লিখতেই পারে ! তাতে কী হয়েছে ? হয়েছে বা হচ্ছে অনেক কিছুই, আবার কিছুই না। যে কোনো কাজের অনিবার্য ফলাফলের মতোই কিছু সম্ভাব্যতাকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এদের ‘কেউ কেউ কবি’ বলে। কিন্তু উক্তির প্রথম অংশে কাজের ডিটেইলসটা কিন্তু স্পষ্ট নয়। এখানেও কতকগুলো সম্ভাব্যতার অনির্দেশ্যতা দেখতে পাই আমরা। যেহেতু অনেকেই কবিতা লিখেন, তাহলে অনেকে আবার অকবিতাও লিখেন। আবার অনেকে কবিতাই লিখেন না। অকবিতা লিখলে কবি হওয়া যায় কিনা, সে বিষয়টা এখানে অপ্রযোজ্য হয়ে আছে। অকবিতা লিখা এবং কবিতা না লিখা আবার দুটো ভিন্ন বিষয়। আমাদের অনেকেই যে প্রশ্নটি করতে দ্বিধা করেন তা হলো, কবিতা না লিখলে কি কবি হওয়া যায় না ? প্রশ্নটাকে অর্থহীন ভেবে উড়িয়ে দেয়ার কোন কারণ নেই। জীবনানন্দের ভাষায় কেবল কবিতা লিখলেই যদি কবি হওয়া না যায়, তাহলে উল্টো যুক্তিতে যদি বলি, কবিতা না লিখেও কেউ কেউ কবি, এটাকে কি ফ্যালাসি বলবো ? মোটেও ফ্যালাসি নয় তা।

যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় ফ্যালাসি হচ্ছে অর্থহীন প্রতিতুলনা দিয়ে কোন উদ্ভট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। যেমন, আমার দাঁড়ি আছে, ছাগলেরও দাঁড়ি আছে, অতএব আমি ছাগল এইরকম। তাই বিষয়টা ফ্যালাসি না হলেও ফ্যালাসির মতো মনে হতে পারে। কেননা জীবনানন্দের উক্তি থেকে এটা অন্তত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কবিতা লেখাটা কবি হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন ফ্যাক্টর বা শর্ত নয়। তাহলে কী সেই শর্ত ? আলোচনার এই উন্মুক্ততায় এসে এখানেই আমরা থমকে যাই। সেরকম কোন শর্ত এখনো স্বতঃসিদ্ধতা পায় নি বলেই অনুমিত একটা ধারণা থেকে আমরা এটা বুঝে নেই যে, কবি একটি অন্তর্গত সত্তার নাম। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে গেলে যে সব সৎ-গুণাবলী ও সুকৃতি থাকতে হয়, একজন কবির সত্তায় তা তো থাকবেই, বরং মেধা মনন আর সৃজনশীলতায় মাখানো আরো কিছু উপলব্ধির অনুরণনও সেখানে থাকতে হয়।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসবে, আমরা কী করে বুঝবো ‘তিনি’ একজন কবি ? বুঝার কি কোনো কায়দা আছে ? এ ক্ষেত্রে আবারো যুক্তির সিঁড়িকেই মাধ্যম করে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। একবাক্যে যেহেতু জগতের সবাইকে বাছবিচারহীনভাবে কবি বলে স্বীকৃতি দেয়াটা বালখিল্য উদ্ভটতা হিসেবে গণ্য হবে, তাই উল্টোভাবে ‘কেউ কবি নয়’ থেকে পর্যায়ক্রমে সামনে কবি হওয়ার দিকে আগানোটাই যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া বলে মনে হয়। অর্থাৎ ধীরে ধীরে একজন কবি তৈরি হয়ে ওঠেন। সুকৃতি আর মানবিক গুণাবলীর সমন্বয়েই এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা আগাতে থাকে। যাঁর মধ্যে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার মানবিক গুণাবলীরই ঘাটতি রয়েছে, তিনি যদি মানুষই হয়ে ওঠতে না পারলেন, কবি হবেন কী করে ! এখানে আবার প্রশ্ন, মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ একজন পরিপূর্ণ মানুষ আর কবির মধ্যে তফাৎটা কোথায় তাহলে ? পরিপূর্ণ একজন মানুষ হওয়ার পরও কবি হয়ে ওঠতে বাকি যে মেধা মনন বোধ উপলব্ধি ও সৃজনশীল সুকৃতিটুকু দরকার, মূলতঃ সেটাই তফাৎ। এবং খুব সঙ্গতভাবেই, যেহেতু প্রসঙ্গ কবি হওয়ার, তাই শেষ পর্যন্ত কবিতা বা কাব্যবোধের বিষয়টা অনিবার্যভাবে চলে আসাটাই তো স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত।

জীবনানন্দের কথাতেই ফিরে যাই আবার- কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি। এখন মনে হয় কথাটার অন্তর্গত ভাবের আরেকটু কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা। আমাদের উপলব্ধিবোধটাকে একটু অন্তর্মুখী করে কয়েকটা বিষয় এবার মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। ধরে নেই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় অগ্রগামী, ব্যক্তিক স্বভাব, রুচি, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সার্বিক জীবনাচারে মানবিক বিবেচনাবোধে উত্তীর্ণ একজন ‘তিনি’ যে চমৎকার একজন মানুষ হিসেবে স্বীকৃত হতেই পারেন তাতে আমাদের দ্বিমত নেই। কিন্তু স্রষ্টা হিসেবে তাঁর রচনায় যদি সৃজনশীল কাব্যবোধের প্রকাশ না ঘটে, তাহলে কবি পরিচয়ের প্রাসঙ্গিকতা এখানে কতোটা প্রযোজ্য হবে ?

আবার অন্যদিকে একটি রচনা কবিতা হয়ে ওঠতে যে সব শর্তাবলী প্রয়োগ আবশ্যক, সেই সব কিছু ঠিক রেখেই ‘তিনি’ উৎকর্ষ কাব্যসাধনায় মগ্ন রয়েছেন ঠিকই। কিন্তু ব্যক্তি জীবনে তিনি অসৎ, সামাজিক জীবনে অসদাচারী এবং সামষ্টিকভাবে তিনি মানবতার বিরুদ্ধ অবস্থানে নিজেকে জড়িত রেখেছেন বা পশ্চাৎপদ মানসিকতায় তিনি প্রগতির বিপক্ষ-কাতারে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, তাঁকে কি আমরা কবি বলতে পারি ?

‘কবিতা লিখে অনেকেই, কেউ কেউ কবি ’, জীবনানন্দের কথাটিকে এসব শ্রেয়বোধ দিয়ে যদি বিশ্লেষণ করি আমরা, তাহলেই হয়তো অনেকগুলো বিভ্রমের পর্দা আমাদের চোখের সামনে থেকে নির্দ্বিধায় অপসৃত হয়ে যাবে। আমরা কি আদৌ করবো তা ? গুটিকয় পঙক্তি বা বাক্য রচনা করেই আমরা বুঝে না বুঝে নিজের বা অন্যের নামের আগে ‘কবি’ উপাধীর সুদৃশ্য যে তকমাটি অনায়াসে বসিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করছি না, এটা কি আমাদের বাছবিচারহীন উদারতার মূর্খামী, না কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বুদ্ধিবৃত্তিক বালখিল্যতা, এই আত্মবিশ্লেষণটা কি এখন জরুরি নয় ?


অতঃপর ছড়াকার-ছড়াশিল্পী সমাচার
ছড়াসাহিত্যেও ইদানিং মনে হয় একটা পরিচিতি সংকট ক্রমেই দৃষ্ট হয়ে ওঠছে। রচনার মূল যে অভিক্ষেপ ছড়া, সেটা কি হচ্ছে নাকি হচ্ছে না সে বিষয়টা খুব সচেতনভাবে আমরা এড়িয়ে তো যাচ্ছিই, বরং কেউ কেউ আবার এতদিনকার ‘ছড়াকার’ পরিচয়টাকে নিজের জন্য অতি অপ্রতুল বিবেচনায় আকর্ষণীয় নতুন তকমা ধারণ করতে চাচ্ছি ‘ছড়াশিল্পী’ নামে ! ছড়াকে যেনতেন একটা আকার হয়তো দিয়ে দিচ্ছি আমরা, কিন্তু এই ছড়াকে  (rhyme)  শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে নিজস্ব মন ও মননে কতটুকু সৃজনশীল শিল্পসত্তা ধারণ করতে হয়, তা কি আদৌ ভাবি আমরা ?

যারা এই অল্পতে তুষ্ট নন, তাঁদেরকে বিনীতভাবে বলি, একজন ব্যক্তি ক্রমে ক্রমে শিল্পী হয়ে ওঠলে এটা সমাজের জন্য সংস্কৃতির জন্য অবশ্যই গৌরবের ব্যাপার। এতে সমাজ সংস্কৃতি ঋদ্ধ হয়ে ওঠে। আমরাও তো এই উত্তরণই চাই। কিন্তু চিন্তাভাবনায় ঘাটতি রেখে এমন স্বেচ্ছামুকুট ধারণ করার আগে অন্ততঃ এক হাজারবার ভাবা জরুরি নয় কি যে, অন্যের কথা বাদ দিলেও নিজের কাছেই নিজেকে যেন জবাবদিহিতায় পড়তে না হয় ? কারণ তিনিই শিল্পী যিনি নিজের মধ্যে শিল্পের কলাকৈবল্যসমেত এক মহৎ কবিসত্তা ধারণ করেন।

আমাদের লোকছড়া নিয়ে ব্যাপক সন্ধান ও গবেষণা থাকলেও আধুনিক ছড়া সাহিত্যের গবেষণাকর্ম খুঁজতে এখনো আমাদেরকে দূরবীণ আর অনুবীক্ষণযন্ত্র হতে নিয়েই বেরোতে হয়। ঘাড় ফেরালেই যেদিন এই চর্মচক্ষে আধুনিক ছড়াসাহিত্যের প্রয়োজনীয় গবেষণাকর্ম অনায়াসলব্ধ হয়ে ওঠবে, সেদিনই হয়তো ছড়াসাহিত্যের এরকম বহু অনর্থক সংকটও অনেকাংশে কেটে যাবে। আমাদেরকে সেদিনের প্রতীক্ষায়ই থাকতে হবে বৈ কি…।
(১৭/০১/২০০৯)

(Image:Sculpture ‘the thinker’ by Rodin)

Advertisements

tajulislamblog_1209307064_1-8

উল্টোস্রোতের কুল-ঠিকানা, প্রসঙ্গ- লিটল ম্যাগাজিন…(এক)

-রণদীপম বসু/Ranadipam Basu


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই, তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।’
— প্রাচীন গ্রীক কবি ইউরিপিডিস (৪৮০-৪০৬ খ্রীঃ পূঃ)


নান্দীপাঠ

দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কলেবর বাড়িয়ে দিলেই যেমন ‘বড় কাগজ’ হয় না, তেমনি তা কমিয়ে দিলেও ‘ছোট কাগজ’ হয়ে যায় না। নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে যা নাকি সত্যনিষ্ঠ তীক্ষ্ণধার ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে এস্টাব্লিশম্যান্ট বা প্রাতিষ্ঠানিকতার গড্ডালিকাময় অসারতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে, সেটাই ‘ছোট কাগজ’। এই যে দেখিয়ে দেয়ার কাজ, সেটা দু’ভাবে হতে পারে। এক, প্রাতিষ্ঠানিকতার লেবেল মারা চলমান ধারাটা যে সৃজনশীলতার সক্ষমতা হারিয়ে বয়ান পুনর্বয়ানের বর্জ্য ঘেটে ঘেটে একঘেয়েমীর রুচিহীন বরাহস্বভাবে উপনীত হয়েছে, তা চিহ্নিত করে পাঠকরুচিকে পুনর্মূল্যায়নে যৌক্তিক আহ্বান জানানো। দুই, প্রথাবিরোধী নতুন স্বরযোজনার মধ্য দিয়ে পুরনো ধারাকে ইঙ্গিতময় অবসরে ঠেলে দিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জনে পাঠকচিত্তকে নিজের দিকে আকর্ষণ করা। উভয়ক্ষেত্রেই এর প্রধান কাজটি হলো পুরনোকে অস্বীকার করা। স্পষ্ট উচ্চারণে জানিয়ে দেয়া, ব্যাক-ডেটেড ধারণার দিন শেষ, এবার আপ-টু-ডেট নতুনের পালা। কিন্তু এই অস্বীকারের কাজটি তো আর এমনি এমনি হয় না। এ জন্যে যে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃজনশীল উন্মেষ ঘটাতে হয়, তা পারে কেবল তরুণেরাই। আরো স্পষ্ট করে বললে- তারুণ্য। নবীন বযেসীদেরকেই সাধারণত তরুণ বলা হলেও তারুণ্য কিন্তু বয়সনির্ভর নয়। তারুণ্য একটি বহমান সত্তা। সৃজনশীল অগ্রযাত্রাই তারুণ্যের আসল মাপকাঠি। অতএব, লিটল ম্যাগাজিন মানেই তারুণ্যের পতাকা। সৃষ্টির নেশায় মত্ত তারুণ্যের অবিচল ঝাণ্ডা। এই অবিচলতার প্রোথিত জমিনটাকে ফলনযোগ্য উর্বরতায় সমৃদ্ধ করতে চাই নবীন কোন দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রায়োগিক উজ্জ্বলতাও। এ আয়োজনেও পিছিয়ে থাকে না লিটল ম্যাগাজিন। তাই লিটল ম্যাগাজিন হলো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যবাহী, সাহিত্যমননে এস্টাব্লিশম্যান্ট বিরোধী সৎ ও রুচিশীল তারুণ্যের সৃজনশীল সাহিত্যপত্র। এখানেই সংকলনপত্রের সাথে লিটল ম্যাগাজিনের মৌলিক পার্থক্য। অন্তত লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস আমাদেরকে তাই শেখায়।

Read the rest of this entry »

কবি সমুদ্র গুপ্ত

কবি সমুদ্র গুপ্ত

সমুদ্রের যে সমুদ্র গুপ্তই থেকে গেলো…
রণদীপম বসু


@ পথ চললেই পথের হিসাব

‘তুমি বললে ফুল/ আমি বললাম কাগজের নিষ্প্রাণ গন্ধহীন/ তুমি বললে যাই হোক/ তবুও তো ফুল/ মানুষটা তো কাগজ কেটে কেটে/ কামান বন্দুক মারণাস্ত্র বানাতেও পারতো’…

মানুষের শ্রেয়বোধে এমন গভীর আস্থা ঢেলে যাঁর কলম থেকে এরকম সুবর্ণ পঙক্তি ঝরে, তাঁর কি কোন অভিমান থাকতে পারে ? তবু ঝরে যাওয়া কালির মতো এরকম কিছু পঙক্তিচিহ্ণ রেখে ঠিকই চলে গেছেন তিনি আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কী এমন অভিমান তাঁর ?
‘চুমু খেয়ে ঠোঁট সরাতে না সরাতেই/ তোমার ওষ্ঠ সরে যায়/ হাজার বছর খুঁজেও কেউ/ সেই চুমুর চিহ্ণ খুঁজে পাবে না/ একই পথ একই পা পদক্ষেপ/ তবু প্রতিবার প্রতিটি চুমুর পরে/ তোমার ওষ্ঠ সরে যায়/ কেউ কোনদিন একই পথে দু’বার হাঁটে নি/… চুমু খেয়ে ঠোঁট সরাতে না সরাতেই/ তোমার ওষ্ঠ সরে যায়/ আমার স্মৃতিতে শুধু/ চুমুস্মৃতির খড় লটকে থাকে।’
— (দুঃখ/ মাথা হয়ে গেছে পাখা শুধু ওড়ে)

এই লটকে থাকা স্মৃতির খড় খুঁজে খুঁজে এক জোড়া অবাধ্য পা ঢুঁড়ে বেড়িয়েছে এই বাংলার প্রতিটা জনপদ, নদীতীর, অরণ্য ; খুঁজে ফিরেছে নদী আর নদীর উৎসে ফেরার চিরায়ত সুর, মোহনার অন্ধকারে যা নাকি কেঁদে ওঠে বিহ্বলতায়। কুড়িয়েছে কষ্ট, সুখ, আজন্মের না পাওয়ার ব্যথা। হাঁটতে হাঁটতে বৃক্ষের চোখে চোখ রেখে ডুবে গেছে অদ্ভুত সাযুজ্যে মাখা মানুষের অচেনা বোধের এক মায়াবী আঁধারী ডোবায়। কিছুতেই মানে না বিস্ময় ! তাই বুঝি লুকানো থাকে না তাও-
‘পাতার মানচিত্র রঙ ও রেখা চেনা থাকলে/ গাছ চিনতে ভুল হয় না/… কথা, মানুষ-গাছের পাতার মতো/ কথার মানচিত্র রঙ ও রেখা/ আমাদের এক থেকে অন্যকে পৃথক করে দেয়/… কেবলই কাণ্ড শাখা বাকলসমেত দাঁড়িয়ে থাকলে/ মানুষকে আর চেনা যায় না ’
— (কথা বললে চেনা যায়/ মাথা হয়ে গেছে পাখা শুধু ওড়ে)

Read the rest of this entry »

কবিতার ভাষান্তর, আদৌ কি অনুবাদ সম্ভব ?
রণদীপম বসু


(১)

কবিতা কেন কবিতা, তা নিয়ে কাব্য-সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বে বিস্তর আলোচনা বাদানুবাদ হয়েছে, হচ্ছে এবং আগামীতেও হবে। সাহিত্যের বিচিত্র প্রবাহে নিত্য-নতুন বৈচিত্রের জন্যেই এর আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। কিন্তু কবিতার ভাষান্তর বা অনুবাদ আদৌ সম্ভব কি না, এ প্রসঙ্গ চলে এলে ‘কবিতা কী’, সে প্রসঙ্গও এড়িয়ে যাওয়ার আর উপায় থাকে না। তাহলে কবিতা কী ?

কবিতা কী ? নানা মুনির নানা মতে হাবুডুবু খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত কবিতা যে আসলে শিল্পোপলব্ধির এক মায়াবী রসের নাম, তা আর বুঝতে বাকী থাকে না। কাব্যরসে নিমগ্ন রসজ্ঞরা বলেন – ‘ভাব থেকেই কবিতার জন্ম।’ কিন্তু ‘ভাব’ তো একটা বিমূর্ত ধারণা মাত্র। আর যেহেতু কবিতা হচ্ছে একপ্রকার শব্দশিল্প, তাই আমরা বলতে পারি ভাবযুক্ত শব্দরচনাই কবিতা। আবার শব্দই যেহেতু ভাবের মাধ্যম এবং অর্থহীন বা ভাবহীন কোন শব্দ বাস্তবে অস্থিত্বহীন, তাই শব্দ মাত্রেই কোন না কোন বস্তু বা ভাবের প্রতীকী প্রকাশ। তবু মালার্মে কথিত ‘ শব্দই কবিতা ’ সংজ্ঞাটিকে ভাবগত অর্থে মেনে নিলেও কবিতার পরিপূর্ণ সংজ্ঞা আদতে তৈরি হয় না। এজন্যেই ইংরেজ কবি কোলরিজের ‘শ্রেষ্ঠ শব্দের শ্রেষ্ঠ বিন্যাস’ সংজ্ঞাটিকে অধিকতর অর্থবহ মনে হয়। কিন্তু এখানেও বিপত্তিটা দেখা দেয় কবিতার সাথে একটা চমৎকার সফল গদ্যের পার্থক্য নিরূপন করতে গিয়ে। কিন্তু দান্তে যখন বলেন -‘সুরে বসানো কথাই হলো কবিতা’ তখন কি সংগীত প্রাধান্য কবিতাকে আলাদাভাবে বিশিষ্ট হতে দেয়? এদিকে ছন্দ-অন্ত-প্রাণ কবি বলেই হয়তো শঙ্খ ঘোষের ‘ছন্দে সমর্পিত শব্দেরই নাম কবিতা’ কথাটিকে মেনে নিতে গেলেও প্রশ্ন ওঠে – তবে ছড়া বা পদ্য কেন কবিতা নয়? তাই বুঝি শেষ পর্যন্ত আমাদের অগতির গতি রবীন্দ্রনাথেই ফিরে যেতে হয়-‘রূপের মধ্যে অরূপের সন্ধানই কবিতা।’ এটাকেই যথার্থ সংজ্ঞা বলে মনে হয়। প্রয়োজনীয় শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে যে অপরূপ শব্দচিত্র বা দৃশ্য আঁকা হয় তার মধ্যে অরূপের সন্ধান অর্থাৎ অন্তর্গত অনুভূতির রসে ভিন্ন কোন অর্থের আবহ তৈরি করাকে কবিতা বলা যায়।

Read the rest of this entry »


রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 440,808 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements