h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

Archive for the ‘বেদান্ত-দর্শন’ Category

14962320_1803376536568509_21541437_n

চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন-৪র্থ খণ্ড
(বেদান্ত)

উত্তর-মীমাংসার নামান্তর হলো বেদান্ত। প্রাচীন ভারতীয় ছয়টি আস্তিক দর্শনের মধ্যে ভাববাদের চূড়ান্ত রূপ এই বেদান্তদর্শনের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। বৈদিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে হিন্দুদের কাছে বেদ সকল জ্ঞানের আকর বলে বিবেচিত। বেদের চারটি অংশ- মন্ত্র বা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ। বেদের চারটি অংশের মধ্যে সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে কর্মকাণ্ড এবং আরণ্যক ও উপনিষদকে জ্ঞানকাণ্ড বলা হয়। সুতরাং বেদের অন্ত অর্থাৎ উপনিষদকেই মুখ্যত বেদান্ত নামে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ, উপনিষদ তত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা ও সমর্থনই বেদান্তদর্শন।  উপনিষদ বিভিন্ন কালে রচিত হয়েছে এবং তা সংখ্যায় বহু। এগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান উপনিষদগুলি হলো ঈশ, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন, কেন, কঠ, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, কৌষীতকি, মৈত্রী, শ্বেতাশ্বতর প্রভৃতি। কিন্তু উপনিষদগুলিতে দার্শনিক তত্ত্বাবলী আলোচিত হলেও সে-আলোচনা বহুলাংশেই বিক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। তা ছাড়া এ-আলোচনা যুক্তিতর্কমূলক সুসংবদ্ধ দার্শনিক আলোচনা নয় এবং নানা উপনিষদে নানা রকম আলোচনার মধ্যে ঠিক কোন্ তত্ত্বকে প্রকৃত উপনিষদ-প্রতিপাদ্য তত্ত্ব বলা হবে সে-কথা নির্ণয় করাও সহজ নয়। স্বভাবতই, উপনিষদের অনুগামী পরবর্তী দার্শনিকেরা উপনিষদ-প্রতিপাদ্য মূল দার্শনিক তত্ত্বকে সনাক্ত করে যে সুসংবদ্ধ দার্শনিক ব্যাখ্যা দিতে চাইলেন, তা-ই বেদান্তদর্শনের উপজীব্য।
Read the rest of this entry »

ট্যাগ সমুহঃ , ,

247249_538972072783681_2043413948_n

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০৬ : অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের পার্থক্য|
রণদীপম বসু

৬.০ : অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের পার্থক্য

ব্রহ্মবাদী বেদান্ত সূত্রকার মহর্ষি বাদরায়ণের একই ব্রহ্মসূত্র গ্রন্থের ভাষ্য রচনা করলেও দৃষ্টিভঙ্গিগত কিছু মৌলিক পার্থক্যের কারণে ব্যাখ্যার ভিন্নতায় আচার্য শঙ্করের শারীরকভাষ্যকে কেন্দ্র করে অদ্বৈত-বেদান্ত এবং আচার্য রামানুজের শ্রীভাষ্যকে কেন্দ্র করে বিশিষ্টাদ্বৈত-বেদান্ত সম্প্রদায়ের উদ্ভব। যদিও উভয় সম্প্রদায়ই দাবি করেন যে মহর্ষি বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রে তাদেরই নিজস্ব মতবাদ তথা দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁদের এই দাবিকে বহাল রেখেও এক্ষেত্রে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদের সঙ্গে রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন-

(১) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম নির্গুণ ও নির্বিশেষ। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সগুণ ও সবিশেষ।
(২) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয়। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সক্রিয়, জগৎ-স্রষ্টা।
(৩) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সকল প্রকার ভেদরহিত। বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম স্বগতভেদযুক্ত, স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদরহিত।
(৪) অদ্বৈতমতে ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, এই সত্যের কোন পরিমাণগত ও প্রকারগত ভেদ নেই। অপরদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম, জীব ও জগৎ সমানভাবে সত্য। এই পরিমাণগত ভেদ নেই, কিন্তু প্রকারগত ভেদ আছে।
(৫) অদ্বৈতমতে ব্রহ্মের মায়াশক্তি মিথ্যা বা অবিদ্যাপ্রসূত। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্মের মায়াশক্তি যথার্থই ব্রহ্মের শক্তি।
(৬) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সৎ, চিৎ ও আনন্দস্বরূপ। আর বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম সৎ ও সত্তাবান, চিৎ ও চৈতন্যময়, আনন্দ ও আনন্দময়।
(৭) অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম ও জীব অভিন্ন। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে ব্রহ্ম ও জীব ভিন্নও বটে, অভিন্নও বটে।
(৮) অদ্বৈতমতে মুক্তজীব অভোক্তা ও অকর্তা। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে মুক্তজীব ভোক্তা ও কর্তা।
(৯) অদ্বৈত মতানুযায়ী মোক্ষে জীব ব্রহ্মে বিলুপ্ত হয় অর্থাৎ মুক্তজীব ব্রহ্ম-সাযুজ্য লাভ করে। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈত মতানুযায়ী মোক্ষে জীব ব্রহ্মে লীন হয় না, বরং ব্রহ্ম-সদৃশ হয় অর্থাৎ, ব্রহ্ম-স্বারূপ্য লাভ করে।
(১০) অদ্বৈতমতে জীবিত অবস্থায় মুক্তি বা জীবন্মুক্তি সম্ভব। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে জীবন্মুক্তি অসম্ভব।
(১১) অদ্বৈতমতে শুদ্ধজ্ঞানই মুক্তির উপায়। বিশিষ্টাদ্বৈতমতে জ্ঞান, ভক্তি ও ঈশ্বরকরুণার সমন্বয় এবং প্রপত্তি ও শরণাগতি মুক্তির উপায়।
(১২) অদ্বৈতমতে আত্মা বিভুপরিমাণ। অন্যদিকে বিশিষ্টাদ্বৈতমতে আত্মা অণুপরিমাণ।
(১৩) অদ্বৈতমতে জহৎ-অজহৎ লক্ষণার সাহায্যে ‘তত্ত্বমসি’ মহাবাক্যের তাৎপর্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে বিশেষ্য-বিশেষণভাবজনিত সামানাধিকরণ্যের দ্বারা ‘তত্ত্বমসি’ মহাবাক্যের তাৎপর্য প্রতিপাদিত হয়।
(১৪) অদ্বৈতমতে জগৎ মিথ্যা। অথচ বিশিষ্টাদ্বৈতমতে জগৎ সত্য।

[আগের পর্ব : রামানুজের মতে জীবের বন্ধন ও মোক্ষ] [*] [শেষ]

380712_496249430389279_962211301_n

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০৫ : রামানুজের মতে জীবের বন্ধন ও মোক্ষ|
রণদীপম বসু

৫.০ : রামানুজের মতে জীবের বন্ধন ও মোক্ষ


জীবের বন্ধন :
রামানুজের মতে কর্ম ও অবিদ্যার দ্বারা জীবাত্মা বদ্ধ হয়। জীবাত্মার সঙ্গে কর্ম ও অবিদ্যার যোগ অনাদি যেহেতু সংসার অনাদি। কৃতকর্মের জন্যই আত্মা দেহ, ইন্দ্রিয় ও মনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংসারদশা প্রাপ্ত হয়। এই অবস্থাই হলো আত্মার বন্ধন বা বদ্ধাবস্থা। এই যোগ বা সংশ্লিষ্টতার ফলে জীবের ‘অহং’, ‘মম’ প্রভৃতি বোধ জন্মায়। এ অবস্থায় জীবের স্বরূপ আচ্ছাদিত হয়। বদ্ধজীব তখন ‘অহংবোধ’ ও ‘ক্ষুদ্র-আমিত্বের’ বশবর্তী হয়। দেহ, ইন্দ্রিয়, মনের বিভিন্ন অবস্থা থেকে জীবাত্মা নিজেকে পৃথক করতে পারে না। আর পৃথক করতে না পারার জন্যই জীবাত্মা অবিদ্যার বশীভূত হয়। এই অবিদ্যাজনিত জীবাত্মার জ্ঞান হলো ‘আমি স্থূল’, ‘আমি বধির’, ‘আমি দুঃখিত’ ইত্যাদি।

‘মমত্ববোধ’ও ঐ অবিদ্যা থেকে উৎসারিত হয়। যে বস্তু, বিষয় ও ব্যক্তি জীবের দেহ, ইন্দ্রিয় ও মনের সুখ উৎপাদন করে সেই বস্তু, বিষয় ও ব্যক্তি জীবাত্মার প্রিয় হয়। এই অবিদ্যাজনিত মমত্ববোধের দৃষ্টান্ত হলো- ‘আমার স্ত্রী’, ‘আমার পুত্র’, ‘আমার বাড়ি’ ইত্যাদি। বস্তুত ‘আমার’ সঙ্গে ঐ বিষয়গুলির কোন যোগ নেই। জীব কর্মের বন্ধনে দেহ, ইন্দ্রিয় ও মনের সঙ্গে যুক্ত হবার ফলে ঐরূপ অবিদ্যার আশ্রয় হয়। তাই প্রিয় বস্তু, বিষয় ও ব্যক্তির বিয়োগে এবং অপ্রিয় বস্তু, বিষয় ও ব্যক্তির সংযোগে জীবাত্মা দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে। এ প্রেক্ষিতে রামানুজের শ্রীভাষ্যে বলা হয়েছে-
Read the rest of this entry »

jct-3

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০৪ : রামানুজের মতে জীবের ধারণা|
রণদীপম বসু

৪.০ : রামানুজের মতে জীবের ধারণা

বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের প্রবর্তক রামানুজ তাঁর মতবাদে তিনটি তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। এই তিনটি তত্ত্ব হলো- ঈশ্বর, চিৎ এবং অচিৎ। রামানুজের মতে এই তিনটি তত্ত্বই সৎ বা পদার্থ। চিৎ হলো আত্মা বা জীবাত্মা। তাঁর মতে দেহবিশিষ্ট আত্মাই জীব। জীবের আত্মা ব্রহ্মের চিৎ-অংশ এবং জীবের দেহ ব্রহ্মের অচিৎ-অংশজাত। জড়দেহ অনিত্য, কিন্তু চিৎ আত্মা নিত্য। তবে আত্মা নিত্য হলেও এই মতে আত্মা অসীম নয়। আত্মা নিত্য, সসীম ও সংখ্যায় বহু। অদ্বৈতবাদী শঙ্করাচার্যের মতে আত্মা চৈতন্যস্বরূপ। ন্যায়মতে চৈতন্য আত্মার আগন্তুক গুণ বা বহিরাগত ধর্ম। কিন্তু বিশিষ্টাদ্বৈতমতে আত্মা চৈতন্যস্বরূপও নয়, আবার চৈতন্য আত্মার আগন্তুক গুণও নয়, চৈতন্য আত্মার নিত্যগুণ।

আচার্য রামানুজকৃত মহর্ষি বাদরায়ণের বেদান্তসূত্র বা ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যায় বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী ভাষ্যগ্রন্থ ‘শ্রীভাষ্যে’ জীব বা আত্মার স্বরূপ ও লক্ষণ বর্ণিত হয়েছে। এগুলোই জীব সম্বন্ধে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী ধারণা প্রকাশ করে। যেমন-

জীবাত্মা নিত্য, সসীম ও স্বতন্ত্র :
রামানুজের মতে জীবাত্মা ঈশ্বরের একটি অংশ বা প্রকাররূপে তাঁর শরীরের উপাদানস্বরূপ। তবে প্রকার বা অংশ হলেও জীবাত্মা একটি আধ্যাত্মিক দ্রব্য এবং নিত্য। আত্মার সৃষ্টি এবং বিনাশ নেই। প্রলয়ের সময় জীবাত্মায় যে কর্ম নিহিত থাকে, সেই কর্ম অনুসারে পরবর্তী জন্মে সে অন্য শরীর পরিগ্রহ করে। প্রলয় ও সৃষ্টির মধ্যবর্তী কালে জীবাত্মা বিভিন্ন শরীর ধারণ করে পূর্বজন্মে কৃত কর্মের ফল ভোগ করে থাকে। রামানুজের মতে জীবাত্মার সঙ্গে কর্মের সম্পর্ক অনাদি। একমাত্র জীবাত্মা মোক্ষলাভ করলেই কর্ম তার জ্যোতিকে ম্লান ও আচ্ছন্ন করতে পারে না। কারণ মোক্ষলাভ করলে আত্মা পৃথিবীতে অবতরণ করে শরীর গ্রহণ করে না।

রামানুজ বলেছেন যে, জীবাত্মা যদিও নিত্য ও সত্য, তবুও সীমিত। কারণ জীবাত্মা ঈশ্বরের অংশ বা প্রকার। সুতরাং আত্মা অণুপরিমাণ। শ্রীভাষ্যে বলা হয়েছে-
Read the rest of this entry »

375676_503678702979685_483738966_n

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০৩ : রামানুজের মতে জগৎ|
রণদীপম বসু

৩.০ : রামানুজের মতে জগৎ

বেদান্তসূত্রের ভাষ্য গ্রন্থ হিসেবে রচিত শ্রীভাষ্যে আচার্য রামানুজ তাঁর বিশিষ্টাদ্বৈত মতবাদে তিনটি তত্ত্ব স্বীকার করেছেন- ব্রহ্ম বা ঈশ্বর, চিৎ বা আত্মা এবং অচিৎ বা জড়। তাঁর মতে ঈশ্বরই সর্বোচ্চ তত্ত্ব। কিন্তু ঈশ্বর একমাত্র তত্ত্ব নন। ঈশ্বরের দুটি অংশ- চিৎ এবং অচিৎ। অর্থাৎ ভেদের দিক থেকে তত্ত্ব তিনটি- চিৎ, অচিৎ ও ব্রহ্ম। কিন্তু অভেদের দিক থেকে তত্ত্ব কেবলমাত্র একটি এবং তা হলো চিৎ-অচিৎ বিশিষ্ট ব্রহ্ম। ব্রহ্ম বা ঈশ্বরই পরম সত্তা এবং চিৎ ও অচিৎ হলো ব্রহ্মের দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রামানুজের মতে ব্রহ্মের চিৎ অংশ থেকে জীব এবং অচিৎ অংশ থেকে জড় বস্তুর সৃষ্টি। সুতরাং ব্রহ্ম অংশী বা বিশেষ্য এবং চিৎ ও অচিৎ ব্রহ্মের অংশ বা বিশেষণ। অংশ ও অংশী সম্পূর্ণভাবে অভিন্ন নয়, আবার সম্পূর্ণভাবে ভিন্নও নয়। তাদের মধ্যে যে অভেদ, তা হলো বিশিষ্ট অভেদ, আত্যন্তিক অভেদ নয়। এ কারণেই রামানুজের মতবাদকে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বলা হয়।

রামানুজের মতে ব্রহ্ম বা ঈশ্বর যেহেতু যথার্থই জগৎ-স্রষ্টা, তাই সৃষ্ট-জগৎ যথার্থই সত্য। তাঁর মতে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তাঁর মঙ্গলময় ইচ্ছাশক্তির দ্বারা তাঁর নিজের মধ্য থেকে জীব ও জড় সমন্বিত এই জগৎ সৃষ্টি করেন। মাকড়সা যেমন তার অভ্যন্তর থেকে তন্তু বের করে জাল বোনে, ঈশ্বরও তেমনি তাঁর চিৎ অংশ থেকে জীবজগৎ এবং অচিৎ অংশ থেকে জড়জগৎ সৃষ্টি করেন। জড় অচিৎ এবং চেতন জীবাত্মাগুলি ঈশ্বরেই বিধৃত। ঈশ্বর জগতের উপাদান ও নিমিত্তকারণ। ঈশ্বরের চিৎ অংশ জীবের এবং অচিৎ অংশ জগতের উপাদান কারণ। আবার ঈশ্বর জীব ও জগতের নিমিত্তকারণ। কারণ তিনিই জীব ও জগতের আবির্ভাব নিয়ন্ত্রণ করেন। সৃষ্টির পূর্বে জীব ঈশ্বরের চিৎ অংশে এবং জড়জগৎ ঈশ্বরের অচিৎ অংশে অব্যক্ত রূপে বর্তমান থাকে।

জগৎ সৃষ্টির ব্যাখ্যায় রামানুজ পরিণামবাদের সমর্থক। তাঁর মতে এই জগতের যাবতীয় জড় বস্তুর মূল উৎস হলো অচিৎ। এই অচিৎকেই ‘প্রকৃতি’ বলা হয়। এই ধরনের চিন্তা যে বিভিন্ন উপনিষদে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে, তা প্রদর্শন করে রামানুজ তাঁর পরিণামবাদী তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। যেমন, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে-
Read the rest of this entry »

candle-meditation

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০২ : রামানুজের মতে ব্রহ্মের ধারণা|
রণদীপম বসু

২.০ : রামানুজের মতে ব্রহ্মের ধারণা

আচার্য শঙ্করের ন্যায় রামানুজও ব্রহ্মকেই চরম ও পরম সত্তা বা সত্যরূপে গ্রহণ করেছেন। তবে তাঁর মতে ঈশ্বরই সর্বোচ্চ তত্ত্ব, কিন্তু একমাত্র তত্ত্ব নন। ঈশ্বরের দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ- চিৎ এবং অচিৎ। জগৎ ব্রহ্মের অচিৎ অংশ এবং জীবাত্মা ব্রহ্মের চিৎ অংশ। চিৎ এবং অচিৎ ঈশ্বরের মতোই সত্য, তবে তারা ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল। শরীর যেমন আত্মার উপর নির্ভর করে, তেমনি জড় ও আত্মা ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে থাকে। বিশ্বের সব কিছুই ঈশ্বরের শরীর এবং ঈশ্বর হলেন অজৈব প্রকৃতি ও সকল জীবের আত্মা। চিৎ বা অচিৎ, ব্রহ্মের কোন অংশই মিথ্যা নয়। উভয় অংশই ব্রহ্মে বিধৃত। চিৎ ও অচিৎ-এর দ্বারা বিশিষ্ট বলেই রামানুজের ব্রহ্ম বিশিষ্টব্রহ্ম। অতএব, দার্শনিক বিচারে বলতে গেলে বলতে হয়, রামানুজ তিনটি তত্ত্ব স্বীকার করেছেন। রামানুজের দর্শনে ব্রহ্ম, চিৎ ও অচিৎ এই ত্রিতত্ত্ব স্বীকৃত, তবে এই ত্রিতত্ত্ব সমন্বিত হয়ে এক পরমতত্ত্বে পর্যবসিত। এই পরমতত্ত্বই বিশিষ্ট অদ্বৈত ব্রহ্ম বা সগুণ ব্রহ্ম।

আচার্য রামানুজ তাঁর শ্রীভাষ্যের মঙ্গলাচরণেই বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের মূলতত্ত্বকে অতি সংক্ষেপে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন-
Read the rest of this entry »

images_12

|বেদান্তদর্শন-বিশিষ্টাদ্বৈতবেদান্ত-০১ : ভূমিকা- রামানুজ|
রণদীপম বসু

১.০ : ভূমিকা

ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাধারায় বেদান্তের প্রভাব সহজেই পরিলক্ষিত হয়। তাদের নিকট সত্য বহুমুখী। বেদান্তীরা এই বহুমুখী সত্যকে বহুরূপে উপলব্ধির কথা ঘোষণা করেছেন। তাই বেদান্ত চিন্তা বহুমুখী। উপনিষদীয় ভাবধারায় পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্তগুলিকে প্রয়োজনীয় মীমাংসার মাধ্যমে মহর্ষি বাদরায়ণ যেমন ব্রহ্মসূত্র রচনা করে অভিন্ন লক্ষ্যাভিমুখী করার উদ্যোগ নিয়ে একটি পরমতত্ত্বের মধ্যে সমন্বয়কৃত  ব্রহ্মবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, আবার এই ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য রচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন বেদান্তী দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যহেতু পরবর্তীকালে বেশ কিছু ভিন্ন ভিন্ন মতবাদেরও সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে আচার্য শঙ্কর প্রবর্তিত অদ্বয় পরমব্রহ্মের ভাবনাপ্রসূত বিশুদ্ধাদ্বৈতবাদ যেমন অদ্বৈতবেদান্তের প্রতিষ্ঠা করেছে, তেমনি এই ব্রহ্মসূত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা-ভাষ্যে জ্ঞানকাণ্ড-প্রধান অদ্বৈতবেদান্তের প্রতিক্রিয়ারূপে উদ্ভূত হয়েছে রামানুজাচার্য-প্রবর্তিত ভক্তিপ্রধান বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ।

শঙ্করের অদ্বৈতবাদ ও রামনুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ এই উভয় বেদান্ত-চিন্তাই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরস্পর-নিরপেক্ষ। অদ্বৈতবেদান্তের জ্ঞানপ্রধান, নির্বিশেষ, বিমূর্তচিন্তা দার্শনিক বিচারে অতি উচ্চস্তরের হলেও এইমত সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক-তৃপ্তি সাধনে সক্ষম হয়নি। এই অক্ষমতাই হয়তো ভক্তিবাদী রামানুজাচার্যকে ভক্তিমার্গ অনুসরণ করে ‘বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ’ নামে একটি স্বতন্ত্র বেদান্তমত প্রবর্তনে উদ্বুদ্ধ করেছে। রামানুজের মতবাদও অদ্বৈত মতবাদ, তবে তা নির্বিশেষ নয়। আচার্য শঙ্কর তাঁর অদ্বৈতমতে এক অদ্বয় পরমব্রহ্ম ছাড়া পরমার্থত আর দ্বিতীয় কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। কিন্তু আচার্য রামানুজ বহুর অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদকে নির্গুণ ব্রহ্মবাদের সঙ্গে ঈশ্বরবাদের সমন্বয়ের প্রচেষ্টারূপে গণ্য করা যায়।

বলা বাহুল্য যে, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তা ভারতীয় চিন্তাধারায় কোন অভিনব বা নতুন সংযোজন নয়। নির্গুণ ব্রহ্মবাদ ও ঈশ্বরবাদ বহু প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিলো। রামানুজাচার্যের বহুপূর্বে ভাগবতের ঈশ্বরবাদে, উপনিষদের সপ্রপঞ্চ-ব্রহ্মবাদে, মহাভারতের নারায়ণীয় অধ্যায়ে, ভগবদ্গীতায় ও বিষ্ণুপুরাণে এই চিন্তাধারার আভাস পাওয়া যায়। প্রাচীন বৈষ্ণব তামিল-কবি আলবারদের নানা গাথা ও গ্রন্থ, ভাস্কর, যাদবপ্রকাশ ও যমুনাচার্য’র চিন্তাধারা, ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত, ভাগবত ও মহাভারতের বৈষ্ণবপাদ রামানুজের চিন্তাধারাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হয়। বিশিষ্টাদ্বৈত মতবাদ যে তাঁর পূর্বেকার লেখক যথা বোধায়ন, টঙ্ক, কপরদিন, ভারুচী প্রমুখের মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, বেদান্তসূত্রভাষ্য ‘শ্রীভাষ্য’-এ রামানুজ তা স্বীকার করেছেন।

দর্শনের পরমব্রহ্মকে ভক্তের ভগবানরূপে কল্পনা করে রামানুজ বেদান্ত দর্শনে ভক্তিবাদের অপূর্ব সমাবেশ করেছেন। বাস্তবভাব সমন্বয়ের দ্বারা একটি ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করা এবং ঈশ্বরকে লাভ করার জন্য  মানুষের যে প্রবল বাসনা তার প্রতিষ্ঠা করাই রামানুজের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শিক্ষার সঙ্গে রামানুজের মতে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এ কারণেই রামানুজ প্রচারিত দার্শনিক ভাবনা ও ধর্মমত সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলো।

রামানুজ (১০১৭-১১৩৭ খ্রিঃ)
আচার্য রামানুজ ১০১৭ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের শ্রীপেরম্বুদুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ১২০ বছর জীবনধারণ করে ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বাল্য নাম লক্ষ্মণ। পিতার নাম কেশব ভট্ট এবং মাতার নাম কান্তিমতি। শৈশবে তিনি পিতৃহীন হন। যমুনাচার্য তাঁর মাতামহ এবং মহাপূর্ণ তাঁর মাতুল। বাল্যকালে তিনি কাঞ্চিপুরীতে আচার্য যাদবপ্রকাশের কাছে বেদান্ত অধ্যয়ন শুরু করেন, কিন্তু পরে মতবিরোধ-হেতু তিনি গুরু কর্তৃক বিতাড়িত হন। তারপর তিনি মাতামহ যমুনাচার্যের কাছে বেদান্তের পাঠ গ্রহণ করেন এবং শঙ্কর, ভাস্কর ও যাদবপ্রকাশের মতবাদ খণ্ডন করে বিশিষ্টাদ্বৈত মতবাদ প্রচার করেন।

আচার্য রামানুজ ছিলেন অতীব ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর পাণ্ডিত্য সম্বন্ধে নানা অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। মহর্ষি বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রের উপর তিনি যে ব্রহ্মসূত্রভাষ্য রচনা করেন তা ‘শ্রীভাষ্য’ নামে সমধিক পরিচিত। এছাড়াও তিনি ‘গীতাভাষ্য’, ‘বেদান্তদীপ’, ‘বেদান্তসংগ্রহ’, ‘শরণাগতিগদ্য’, ‘শ্রীরঙ্গগদ্য’, ‘আগমপ্রামাণ্য’, ‘সিদ্ধিত্রয়’, ‘মহাপুরুষনির্ণয়’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।

রামানুজের পরেও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের সমর্থনে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। রামানুজের পরবর্তীকালের রামানুজ-শিষ্য সুদর্শন সূরি’র শ্রীভাষ্যের ‘শ্রুতপ্রকাশিকাটীকা’, বেঙ্কটনাথ-এর ‘শতদূষণী’, ‘ন্যায়পরিশুদ্ধি’, ‘তত্ত্বটীকা’, মেঘনাদারির ‘ন্যায়দ্যুমণি’, আচার্য শ্রীনিবাস-এর ‘যতীন্দ্রমতদীপিকা’, লোকাচার্য’র ‘তত্ত্বত্রয়’ প্রভৃতি গ্রন্থ বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের উপর অতি মূল্যবান গ্রন্থ।

রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের এক অপূর্ব সমাবেশ দেখা যায়। পরম সদ্ববস্তুই পরম কল্যাণ এবং পরম অন্বিষ্ট সত্তা, কল্যাণ এবং পুরুষার্থ আত্যন্তিক অর্থে সমন্বিত, এই সত্যটিকে বিশিষ্টাদ্বৈত মতে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। রামানুজের মতে ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়। তবে-
বিশিষ্টাদ্বৈত মতে যদিও ব্রহ্মই চূড়ান্ত সত্য, তবুও ব্রহ্মকে নির্গুণ আখ্যা দেয়া ভুল। বরং ব্রহ্মকে অনন্ত-কল্যাণগুণের আধার মনে করতে হবে। তিনিই ঈশ্বর; উপাসনা সৎকর্মের সাহায্যে তাঁর করুণার উদ্রেক করতে পারলেই জীবের মুক্তি। পরিদৃশ্যমান জড়জগৎ এবং জীবাত্মার স্বাতন্ত্র্য মিথ্যা নয়। কেননা, ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের মধ্যেই চিৎ এবং অচিৎ- চেতনা এবং জড়- উভয় বৈশিষ্ট্যই বর্তমান। চিৎ বৈশিষ্ট্য থেকেই জীবাত্মার সৃষ্টি, অচিৎ থেকে জড়জগতের। ব্রহ্ম চিৎ-অচিৎবিশিষ্ট। জীবাত্মার সঙ্গে জড়দেহের সম্পর্কই বন্ধনের স্বরূপ এবং তার মূলে রয়েছে জন্মজন্মান্তরের কৃতকর্মজনিত অজ্ঞান। ঈশ্বরের করুণায় জীবাত্মা এই অজ্ঞান কাটিয়ে মুক্তিলাভ করবে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭)

ঈশ্বর, চিৎ-শক্তি এবং অচিৎ-শক্তি এই ত্রিতত্ত্বে রামানুজ বিশ্বাস করেন। তার মতে ঈশ্বরই পরমতত্ত্ব। ঈশ্বর বিশেষ্য, চিৎ ও অচিৎ তার বিশেষণ। প্রমাণ ও প্রমেয় বিচারে রামানুজের মতে বিশিষ্ট ব্রহ্মই একমাত্র জ্ঞেয় বস্তু। প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ জ্ঞানের ত্রিবিধ উপায়। তবে আচার্য রামানুজও শাস্ত্র বা শব্দপ্রমাণকেই প্রত্যক্ষ ও অনুমানের উপরে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন, ব্রহ্মবাদী বাদরায়ণের সূত্রগ্রন্থ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যগ্রন্থ শ্রীভাষ্যে রামানুজ বলেছেন- 
Read the rest of this entry »


রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 172,436 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুন 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check