h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শক্তি-সাধনা-০২ : আদিম মানব ও তার ধর্ম…

Posted on: 15/11/2019


mother goddess

শক্তি-সাধনা-০২ : আদিম মানব ও তার ধর্ম
রণদীপম বসু

নৃতাত্ত্বিকেরা হাতিয়ারের ক্রমবিকাশের ধারা অনুশীলন করে মানবসভ্যতার বিকাশের ঐতিহাসিক যুগের যে ধারা চিহ্নিত করেছেন তা হলো যথাক্রমে– প্রস্তর যুগ, তাম্র যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ এবং লৌহ যুগ। কেননা এই হাতিয়ারের ক্রমবিকাশের ধারা অনুশীলন করলেই ব্যবহারকারীদের ক্রমবিবর্তন অনুশীলন করা যায়। আর প্রগৈতিহাসিক প্রত্ন-প্রাচীন প্রস্তর যুগকে আবার উপবিভাগে ভাগ করা হলো– প্রত্নপ্রস্তর বা আদি-প্রস্তর যুগ, মধ্য-প্রস্তর যুগ ও নব বা নব্য-প্রস্তর যুগ। কিন্তু হাতিয়ার তৈরি ছাড়াও শিকারের প্রয়োজনে মানুষ জোট বাঁধতে বাধ্য হলো। ফলে, ভাবের আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা থেকে শুরু হলো ভাষার ব্যবহার। জোটবদ্ধ জীবনে প্রথমে জৈবিক প্রয়োজনে, তারপর ধীরে ধীরে দেখা দিলো পরিবারের প্রয়োজনীয়তা। প্রকৃতির সাথে নিয়ত সংগ্রামশীল মানুষ পর্যায়ক্রমে শিখলো কাঁচা ও পোড়া মাটির ব্যবহার। তারপর একে একে আয়ত্ত করলো তামা, ব্রোঞ্জ ও সবশেষে লোহার ব্যবহার। ‘এরমধ্যে যেসব জিনিস বিনষ্ট হওয়ার তা কালের প্রভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। আর যা নষ্ট হওয়ার নয় তা চাপা পড়ে রইলো– মাটির তলায় বা পৃথিবীর পাঠশালায়, কালের লিখন হয়ে।’
সর্বত্রই দেখা যায় যে, নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে মানবসভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশের ধারা (স্থান-কাল-পাত্রভেদে একটু-আধটু অদল-বদল হলেও) মূলত প্রায় একইরকম, কারণ সর্বত্র প্রকৃতিই হলো তার এক ও অদ্বিতীয় পাঠশালা। তাই ক্রমবিকাশের সারণি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল– এখানে বিশৃঙ্খলার কোনও স্থান নেই। কালের নিয়মে যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চাপা পড়ে আছে মাটির নিচে, সেই প্রাকৃতিক নিয়মের বৈশিষ্ট্য হলো, যত প্রাচীন তত নিচে, আর নবীনের স্থান তার উপরে। ফলে গভীরতাই হলো প্রাচীনত্ব পরিমাপের সাধারণ সূত্র, আর নৃতাত্ত্বিক পরিভাষায় একেই বলে স্তরক্রম (Straticgraphic column)। এই স্তরক্রম থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শনের সূত্র-বিশ্লেষণের মাধ্যমে অগ্রন্থিত মানব-সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা-বিন্যাস করা হয়।
জীব বিকাশের কোনও এক ধারা বেয়ে এসেছে মানুষ। সে তখন নিশ্চয়ই আজকের মতো দেখতে ছিল না। সে ছিল অরণ্যচারী, লোমশ, উলঙ্গ, রিপুতাড়িত জান্তব প্রাণী বিশেষ। মানুষের সমস্ত ভালো-মন্দ গুণাবলিই ছিল তার মধ্যে ভ্রূণ অবস্থার মহাসুষুপ্তিতে। শুধুমাত্র বাঁচার আকাঙ্ক্ষায়, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ও জৈবিক তাগিদে সে আয়ত্ত করেছিল পারিপার্শ্বিকতাকে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার হাত থেকে বাঁচার জন্যে বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন লক্ষণ ও নানা বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়ে উঠে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত হচ্ছিলো। এদেরই এক শাখা থেকে ক্রমে উদ্ভূত হয়েছিলো নরাকার জীব বা প্রাইমেট। বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে মানুষের পূর্বপুরুষ এপ-ম্যান বা কপি-নরদের আবির্ভাব হয় এক কোটি চল্লিশ লক্ষ বছর আগে। তারপর পঁচিশ লক্ষ বছর আগে নরাকার জীবেদের মধ্যে মানুষের লক্ষণযুক্ত জীবের আবির্ভাব ঘটে অষ্ট্রালোপিথেকাসে। তবে এরা প্রকৃত নর নয়, এরাও কপি-নর বা এপ-ম্যান বিশেষ। বর্তমান মানুষের পূর্বপুরুষ ‘হোমো গণের’ (Genus) আবির্ভাবও প্রায় ওই একই সময়ে। এরপর ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা প্রাগৈতিহাসিক মানব বা আদিম মানবের আবির্ভাব হয় তিন থেকে পাঁচ লক্ষ বছর আগে, খুব সম্ভবত গুঞ্জ-মিন্ডেল তুষার যুগের অন্তর্বর্তী সময়ে। আর সবশেষে আধুনিক (বিজ্ঞ) মানুষ ‘হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স’-এর আবির্ভাব হয়েছে মাত্র পঞ্চাশ হাজার বছর আগে। আর তারা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মাত্র পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে।
নৃবিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে প্রায় ৬ লক্ষ থেকে ১০ হাজার বছর আগে অবধি পৃথিবীতে এসেছে চার-চারটে তুষার যুগ, যা মানব সভ্যতার ধারাকে করেছে ক্রমত্বরান্বিত। যাদেরকে চিহ্নিত করা হয় গুঞ্জ, মিন্ডেল, রিস ও উয়র্ম নামে। তুষার যুগে পৃথিবী ক্রমে শীতল থেকে শীতলতর হতে থাকে, ফলে তিন হাজার ফুটের বেশি উঁচু জায়গাগুলো তুষারাবৃত হয়ে যায়। আর দুই তুষার যুগের মধ্যিখানে অন্তর্বর্তী উষ্ণ যুগ। এই অন্তর্বর্তী যুগে পৃথিবী তার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পায়। ফলে প্রতিটা তুষার যুগেই ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় সেই সময়কালের জীব জগৎ ও উদ্ভিদ জগৎ। এভাবে এক তুষার যুগে অরণ্য ধ্বংস হয়ে গিয়ে অন্তর্বর্তী যুগে দেখা দেয় তৃণভূমি। আর জীবজগতে, যারা প্রতিকুল পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারলো না, তারা পৃথিবীর বুক থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল। আর যারা প্রতিকুল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলো তারা বিবর্তনের ধারায় এক ধাপ এগিয়ে গেল।
তখন এক তুষার যুগে আগে যারা ঝুলেছিলো গাছে, অরণ্য ধ্বংস হওয়ার ফলে নরাকার বৃক্ষচারীর দল বাধ্য হয়ে মাটিতে নেমে এসে ক্রমশ দু’পায়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। যারা পারলো তারা বিবর্তনের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। আর তখনই তার হাত দুটো অজান্তেই চলাফেরার প্রয়োজন থেকে হলো চিরমুক্ত। আর এই উঠে দাঁড়াবার ফলে দৃষ্টিশক্তিও হলো ক্রমেই সুদূরপ্রসারী। এই দৃষ্টিশক্তিই তাকে দূরের জিনিস দেখতে ও বিপদের সময় দূরে ছুটে পালাতে সাহায্য করলো। বিপদে পড়লে পালানোই ছিলো আদিম মানবের ধর্ম, রুখে দাঁড়ানো নয়।
আর এক তুষার যুগের প্রভাবে, শুধুমাত্র বাঁচার প্রয়োজনে তাকে আশ্রয় নিতে হলো গুহায়। তুষার যুগে অরণ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে দেখা দেয় তৃণভূমি। পেটের জ্বালা তাকে বাধ্য করলো পশুশিকারে। গায়ে জড়াতে হলো শিকার করা পশুর ছাল, এবং অবশ্যই তা লজ্জা নিবারণের জন্যে নয়। শুধুমাত্র ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচার প্রয়োজনে। আগুনকে ভীষণ ভয় পেলেও জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছে ঠাণ্ডার সময় আগুনের ধারে গেলে আরাম বোধ হয়। তাই দাবানল বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক অগ্নিকাণ্ড থেকে খুব সাবধানে আগুন সংগ্রহ করে এনে প্রথমে গুহামুখে ও পরবর্তীতে গুহার ভেতরে রেখে একই সঙ্গে শীতের প্রকোপ ও বন্যজন্তু জানোয়ারের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শেখে।
আগুনের ব্যবহার বা গুহায় আশ্রয় নেওয়ার বহু আগেই যখন তার গাছ থেকে মাটিতে নেমে এসেছে, তারপর থেকেই তাদের পারিপার্শিক আপদ-বিপদ ভীষণভাবে বেড়ে যায়। ফলে আত্মরক্ষার প্রয়োজন ও শিকারের তাগিদে প্রথমেই সে শিখলো হাতের কাছের সবচাইতে সহজলভ্য জিনিস পাথরকে ব্যবহার করতে, তৈরি হলো– হাতিয়ার। ধীরে ধীরে পাথরের সঙ্গে গড়ে তার পরিচয়, নৈকট্য ও সখ্যতা। হাতিয়ার তৈরি ছাড়াও শিকারের প্রয়োজনে মানুষ জোট বাঁধতে বাধ্য হলো। শিখতে হলো আগুনের ব্যবহার। শুরু হয়ে গেলো মানব সভ্যতার জয়যাত্রা। এরকমই কোনও এক সময়কালে আদিম মানবের গুহা ও তার আশপাশ থেকে এমন কতকগুলো প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে যা পরবর্তীকালের ধর্মের সাথে সম্বন্ধযুক্ত বলে নৃতাত্ত্বিকদের ধারণা।

        অরণ্যচারী আদিম গুহামানবেরা পাথরের ব্যবহার ও আগুনের ব্যবহার শিখে ফেলে প্রায় লক্ষাধিক বছর আগে। এই সময় থেকেই আদি প্রস্তর যুগের সূত্রপাত বলে ধরা হয়। আদি-প্রস্তর যুগের নিদর্শনগুলো সাধারণত ‘কোয়ার্টস’ পাথরের তৈরি বলে ওই সময়কার সভ্যতাকে অনেকেই ‘কোয়ার্টাইট সভ্যতা’ বলে থাকেন। আগুন তাদের একত্রিত করেছে, আর খাদ্য সংগ্রহ ও শিকারের প্রয়োজনেই আদিম মানবকে দলবদ্ধ হতে হয়েছে। দলগত কাজের জন্যে করতে হয়েছে ভাবের আদান-প্রদান, যার পরিণতিতে ভাষার সৃষ্টি।
মধ্য-প্রস্তর যুগে এসে এতোদিনের পূর্ব-অভিজ্ঞতায় মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী বড় পাথরকে ভেঙে টুকরো করে নিয়ে হাতিয়ার তৈরি করার কারিগরি বিদ্যা অর্জন করে ফেলেছে। এই যুগের এইসব ছোট ছোট পাথরের তৈরি অস্ত্রশস্ত্র ও হাতিয়ারগুলোকে ‘পিগমি টুলস’ বলে। প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়া এই কারিগরি বিদ্যা দিয়ে সূক্ষ্মদানার পাথরকে টুকরো করে ঘসে মেজে কখনও বা তাতে বন্য জন্তুর হাড়ের হাতল লাগিয়ে বা গাছের ডাল ভেঙে তাতে জুড়ে দিয়ে নিজের প্রয়োজনানুগ করে তুলতো।
‘এই সময় কৃষ্টির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। হাড়ের তৈরি সূচ, হারপুন ও বর্শাফলক ইত্যাদির ফলে শিকারের যথেষ্ট উন্নতি হওয়ায় মানুষের জীবনে এসেছে অবসর। আর তখনই তৈরি হয়েছে সাজ-সজ্জার নানা উপকরণ। গুহা এখন আর অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়, ফলে সৃষ্টি হয়েছে– গুহাচিত্র। এমনকী বিভিন্ন ধরনের চিত্রাঙ্কনও করা হল পাহাড়ের গায়ে। নৃতাত্ত্বিকরা অনুমান করেন, এই সমস্ত চিত্রগুলো অঙ্কিত হয়েছিল প্রাথমিক ভাবে শিকার ও পরবর্তীকালে ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপের অঙ্গ হিসাবে। এই ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া প্রক্রিয়াই আদিম মানবের প্রাচীনতম ধর্ম। পরবর্তীকালে এর থেকেই ধীরে ধীরে বিকশিত হয় চিকিৎসাবিদ্যা-ওঝা-গুণিন-পুরোহিত ইত্যাদি ইত্যাদি ও ধর্মচেতনা। এ ছাড়াও পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন নারী (আদি মাতার) মূর্তিও এই সময়কার নিদর্শন। প্রসঙ্গত বলা যায়, নারী তাদের কাছে কামিনী বা মোহিনী রূপে ধরা দেয়নি। এই মূর্তিতে নারী (মাতৃ রূপেণ সংস্থিতা) মাতৃরূপে (গর্ভবতী) প্রকটিত হয়েছে। (মূর্তিটি পঞ্চাশ-চল্লিশ হাজার বছরের প্রাচীন।) কোন দার্শনিকতা থেকে (গর্ভবতী নারী মূর্তি) আদি মাতার মূর্তি রচিত হয়েছিল, তা খুব স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও, বিভিন্ন পরম্পরাগত নিদর্শন ও তৎকালীন সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, সেই আদিম মানব সমাজ একটা জিনিস প্রত্যক্ষ করেছিল যে, নারীর মধ্যে দৈহিক ক্ষমতাবল পুরুষের থেকে বেশি না হলেও, তার মধ্যে একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে যা পুরুষের নেই; তা হল, সন্তান-ধারণ ও প্রসব করার ক্ষমতা। একটা জলজ্যান্ত মানব শিশুকে সে ধারণ করতে ও জন্ম দিতে পারে। এই অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার জন্যে নারী সেই আদিম মানব সমাজে প্রথমে বিশিষ্টতা ও পরবর্তীকালে সমীহ আদায় করে নিল।’
‘কিন্তু তখনও তারা এই (জন্ম) রহস্যের কার্য কারণ অনুধাবন করতে পারেনি। ফলে তারা প্রকৃতি তাড়িত হয়ে নারী-পুরুষে মিলিত হলেও এই (নারী-পুরুষের) মিলনই যে সন্তান জন্মানোর ইতিবৃত্ত– তা ছিল তাদের কাছে অজ্ঞাত।’
‘পরবর্তীকালে বিভিন্ন পরম্পরাগত ঘটনা ও প্রত্যক্ষীকরণের উপরে ভিত্তি করে ধীরে ধীরে অনুমানটা স্পষ্ট হতে থাকে যে, সন্তানের জন্ম রহস্যে হেতু হল নারী-পুরুষের মিলন; আর নারী হল শক্তির আধার বা আদ্যাশক্তি।’
‘সুতরাং সেই পঞ্চাশ-চল্লিশ হাজার বছর আগেকার ৯ সেমি. মাপের কোয়ার্টজ পাথরের তৈরি (গর্ভবতী নারী মূর্তি) আদি মাতার মূর্তিটি মাতৃপূজা বা শক্তিপূজার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন (এখনও অবধি আবিষ্কৃত)। এর পরবর্তীকালের নিদর্শন যা আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়েছে– তা এক বিপুল কাল ব্যবধানে– একেবারে নব-প্রস্তর যুগে এসে।’– (অশোক রায়/ মাতৃকাশক্তি, পৃষ্ঠা-২৭-৮)

         মূলত নব-প্রস্তর যুগে মানুষ অভিজ্ঞতায় আরও সমৃদ্ধ হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বড় পাথরকে ভেঙে টুকরো করে, তাকেই আবার ঘষে-মেজে প্রয়োজনানুগ করে তুলতে শিখেছে। আর এই যুগের সভ্যতা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ার ফলে যেখানে যেমন ধরনের পাথর মেলে তাকেই তারা কাজে লাগাতে শিখেছে। আদিম মানবের এই হাতিয়ারে উন্নতির সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতিও যে সমভাবে বিকশিত হচ্ছিল সে দিকটা ভুলে গেলে চলবে না।

         শিকারের অপ্রতুলতায় শুধুমাত্র খিদের জ্বালায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্য অবস্থায় আপনা আপনি গজিয়ে থাকা শস্যদানা আহরণ ও পরবর্তীকালে ভিজে মাটিতে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই কৃষিকার্যের সূচনা। তাই উর্বরা শক্তির প্রসন্নতা ও কৃষির সাফল্যের প্রয়োজনে দেব ধারণা বিবর্তিত হয়– প্রকৃতি (নারী) ও পুরুষে।
দশ হাজার বছর আগে মানুষ কৃষিকার্য ও পশুপালন করতে শেখে। এই সময়কালকে বলা হয় মধ্য-প্রস্তর যুগ। আর নিম্ন-প্রস্তর যুগ বা নব-প্রস্তর যুগে এসে অর্থাৎ আট হাজার বছর আগে মানুষ প্রতিষ্ঠা করেছে গ্রাম, সমাজ, গোষ্ঠী ও পরিবার। আর নাগরিক সভ্যতা? সে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগেকার কথা। এটি তাম্রাশ্ম যুগের অবদান। কৃষিকার্যের অরুণালোকে আদিম মানবের শিকারজীবী-যাযাবর-আরণ্যক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। গড়ে ওঠে স্থায়ী বাসভূমি। প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিবর্তিত হয় পিতৃতান্ত্রিকতায়। ভারতবর্ষে এই সভ্যতার কালানুক্রমিক পরিপুষ্টি ও চরমোৎকর্ষতা দেখা যায়– সিন্ধু সভ্যতায়। যার পরিণতিতে সেখানে নগরায়ণ, কারিগরিবিদ্যা, বহির্বাণিজ্য, জ্ঞানবিজ্ঞান, ধর্ম-দর্শন ও শিল্পকলা চিন্তার এক আশ্চর্য উত্তরণ ঘটে। এ ছাড়াও সেদিনকার সেই ধর্মচিন্তা– যেমন মাতৃদেবীর পূজা, আদি শিব, লিঙ্গ ও যোনি পূজা, সূর্য পূজা, নাগপূজা, পশুপূজা ও বৃক্ষ বা অশ্বত্থ পূজা ইত্যাদি– পরবর্তীকালে হিন্দু সভ্যতার দেবদেবী ধারণা গঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে আদিম মানবেরা কবে কখন সর্বপ্রথম অতিপ্রাকৃতের কাছে ভয়ে মাথা নুয়েছিলো সেটি বলা সম্ভব না হলেও আদিম মানবের মাথা নোয়ানোর বিষয়টি কিভাবে শুরু হয়েছিলো তারও একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা। তা বুঝতে আমাদেরকে আরেকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়।
আদিম মানবগোষ্ঠীর সভ্যতা ও তার সংস্কৃতির নানাদিক নিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা প্রচুর গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। তার মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মৃতদেহ সৎকার ব্যবস্থা। একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় গোষ্ঠীর কেউ মারা গেলে তার সঙ্গীসাথীরা মৃতদেহকে বনে-জঙ্গলে ফেলে দিতো। এর পরের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারেরাই করতো। একদিন এই ব্যবস্থা হলো অচল। প্রিয়জনের মৃতদেহ জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারেরা ছিঁড়ে-খুঁড়ে খায়, এটা তাদের ভালো লাগে না। তখন মৃতদেহকে মাটিতে গর্ত করে চাপা দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হলো। কিন্তু তাতেও দেখা দিলো অসুবিধা। বন্য জন্তুরা মাটি খুঁড়ে শবদেহকে বের করে আনে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া হলো গর্তের উপরে বড়ো-সড়ো একখানা পাথর চাপিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। এবারে আর শবদেহকে বন্য জন্তু-জানোয়ার বের করে আনতে পারে না। ফলে ব্যবস্থাটা ক্রমে প্রথায় পরিণত হয়। জানা যায়, এরকমই এক সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে কোলার জেলায়। তাতে প্রায় চুয়ান্নটি এ ধরনের সমাধির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও মাদ্রাজ, বোম্বাই, মাইসোর ইত্যাদি অঞ্চলে এই একই ধরনের সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।
এরপর মানবসভ্যতা যখন আরও বদলালো বা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলো, তখন এই সৎকার ব্যবস্থাও কিছুটা বদলালো। মৃতদেহ দাহ করে সেই দগ্ধাবশেষ মাটির পাত্রে ভরে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়ার প্রথা চালু হলো। তবে সর্বক্ষেত্রে পূর্ণদগ্ধ না হলেও অর্ধদগ্ধ দেহাবশেষ মাটির পাত্রে ভরে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হতো, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শবদেহ অর্ধদগ্ধই থেকে যেতো। এরকমই এক বিশাল শ্মশান বা সমাধিক্ষেত্র পাওয়া গেছে তিরুণাভেলীর আদিচেনালুরে। এই সমাধিক্ষেত্র নব-প্রস্তর যুগের নিদর্শন বলে মনে করা হয়। এরও পরবর্তীকালের সমাধিতে যথাক্রমে তামা, ব্রোঞ্জ, লোহা ও সোনার অলঙ্কার ও অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী দেখতে পাওয়া গেছে সিন্ধুপ্রদেশের ব্রাহ্মণ্যবাদ অঞ্চল থেকে।

        ‘প্রাথমিকভাবে, মৃত প্রিয়জনের পুঁতে দেওয়া শবদেহ, বন্য জন্তুর হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজনেই শুরু হয়েছিল সমাধিক্ষেত্রে পাথরের ব্যবহার। ক্রমে তা প্রথায় দাঁড়িয়ে যায়। ক্রমে সাধারণ পাথর তখন আর শুধুমাত্র পাথর থাকে না। তা উত্তরিত হয়– দলপতি, গোষ্ঠীপতি, গোষ্ঠীমাতা বা অতি প্রিয়জনের সমাধির স্মারক চিহ্ন রূপে। এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন চলতে চলতে এক সময়ে মানুষই পাথরে আরোপ করে– বিশিষ্টতা। তখন স্মারক প্রস্তর বিশিষ্টতা লাভ করে– স্মৃতিচিহ্নরূপে; যা আজকের দিনের এপিটাফ্। প্রিয়জন বা শ্রদ্ধেয় জনের মূর্ত বা বিমূর্ত প্রতীকরূপে, সাধারণ পাথর তখন অসাধারণত্বের মাত্রা অর্জন করে। শ্রদ্ধায় ভক্তিতে বা ভালবাসায় নিজের পরিবারের বা গোষ্ঠীর পরম প্রয়োজনীয় মুহূর্তের ত্রাতা রূপে এই সমাধিপ্রস্তরে আকুল ভাবে আর্তি জানায়। ক্রমে এই ব্যবস্থাও কায়েমী হয়। এদিকে জীবন-মৃত্যুর ধোঁয়াশা এক কুহেলিকা বিশেষ, ফলে, সমাধি প্রস্তরে আত্মার অবস্থান অতি সহজেই মান্যতা লাভ করে। তখন আত্মাপ্রস্তর ক্রমশ পুজ্য ও প্রণম্য হয়ে ওঠে পিতৃদেবতা বা মাতৃদেবীর প্রতীকরূপে।’
‘গোষ্ঠীর একজন প্রাজ্ঞলোক নানা ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার সাহায্যে আত্মাকে প্রসন্ন করে দলের, গোষ্ঠীর বা ব্যক্তির মঙ্গল সাধনের চেষ্টা করেন। আবার প্রয়োজনে চেষ্টা চালান শত্রুর বিনাশ বা অনিষ্ট ঘটানোরও। এ ছাড়াও রোগ-ব্যাধির বেলাতেও এই একই প্রচেষ্টা চলে। এ থেকেই উত্তরকালে বিকশিত হয় চিকিৎসাবিদ্যা, ওঝা, গুণিন, পৌরোহিত্য ও ধর্মচেতনা। যা সম্ভবত আভিচারিক ক্রিয়াকর্ম (ষট্কর্ম) করন্যাস, মুদ্রা, বীজমন্ত্র অঙ্গভঙ্গি গালবাদ্য ও বিভিন্ন ক্রিয়া কর্মের আদিমতম উৎসমুখ।’ — (অশোক রায়/ মাতৃকাশক্তি, পৃষ্ঠা-৩০)

           ভুরখাইমের ‘সোশ্যাল থিওরি’-র মতে ধর্ম মানুষের সমাজবিন্যাস ও জীবনচর্চার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই আদিবাসীদের সমাজবিন্যাস ও জীবনচর্চার দিকে তাকালে প্রাচীন মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচরণের খানিকটা হদিস পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে প্রাধান্য পায় ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া ও মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। সাধারণত তাদের ‘জড়োপাসক’ বলা হয়। ‘জড়’ বলতে আমরা চেতনাবিহীন ও প্রাণশক্তি রহিত পদার্থকেই বুঝি। কিন্তু জড়ের কল্পনা আদিবাসী সমাজে নেই। তারা লক্ষ্য করেছে মানুষ যতদিন জীবিত থাকে, ততদিন সে নড়াচড়া করে, কথা বলে ও শব্দ করে। কিন্তু মানুষ মারা গেলে তার এই শক্তি লুপ্ত হয়ে যায়। যুক্তির আশ্রয় নিয়ে তখন তারা ভাবে যে, মৃত ব্যক্তির প্রিয় অথবা আত্মার সঙ্গে যেসব পদার্থ সংশ্লিষ্ট, তার আত্মা সেইসব তথাকথিত জড় পদার্থের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তখন তারা সেইসব পদার্থের মধ্যে (মৃত ব্যক্তিকে চোখে দেখতে না পেলেও) তার আত্মাকে অশরীরীরূপে কল্পনা করে।
প্রকৃতি যখন অনুকুল থাকে, তখন জীবনযাত্রা চলে স্বচ্ছন্দে। কিন্তু প্রকৃতি যখনই ঝড় বৃষ্টি তুফান বজ্রপাতে ভয়াল বিরূপ হয়ে ওঠে, গাছপালা পশুপাখি মানুষ সবাই অসহায় হয়ে পড়ে– এরকমই কোনও বিপদসংকুল মুহূর্তে হঠাৎ কারও মাথায় কী ভাবনা চলে আসে, আকুল আবেগে আছড়ে পড়ে আত্মাপ্রস্তরের কাছে– ভক্তিতে নয়, ভয়ে। এভাবেই শুধুমাত্র বাঁচার আকুল আকাঙ্ক্ষায়, জীবনের চরম সংকটময় মুহূর্তের ত্রাতারূপে আত্মাপ্রস্তর প্রণম্য হলো– গোষ্ঠী, পরিবার ও নিজের বিভিন্ন শুভাশুভ কামনায়। নেহায়েত আকস্মিক ঘটনাটাই কালে কালে প্রথায় পরিণত হলো এবং তা আর দেশ-কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকলো না।
অশোক রায়ের উদ্ধৃতিতে– ‘একদা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা নেহাতই অকিঞ্চিৎকর বস্তু ‘উপলখণ্ড’, বিবর্তনের পথে মানুষের হাতে উঠেছিল– হাতিয়ার রূপে। বিশিষ্টতা লাভ করে আত্মাপ্রস্তরে, আর আজ তা মহিমান্বিত হয়ে পূজিত ও প্রণম্য হল, আর্তত্রাণের গরিমায়– বিশ্বাত্মা বা পরমাত্মারূপে।’– (মাতৃকাশক্তি, পৃষ্ঠা-৩১)

         প্রকৃতির প্রলয়ঙ্করতা ও বিরূপতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই আদিম মানব অতিপ্রাকৃতের কাছে মাথা নুইয়েছে– ভক্তিতে নয় ভয়ে। খুব সম্ভবত এইসময় থেকেই ‘প্রাগৈতিহাসিক শিবের’ সূচনা। কারণ এখান থেকেই আজকের দেবাদিদেবের কয়েকটা মূল ভাবনার সূত্রপাত। এই ধারণা আরও স্পষ্ট হলো, যখন দেখা গেলো পাহাড়ের গায়ে বা প্রায়ান্ধকার গুহার দেওয়ালের গুহাচিত্র। ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার অনুষঙ্গ হিসাবেই এই সবের সৃষ্টি। যা ছিলো আদিম মানবের প্রাচীনতম ধর্ম। আর এ থেকেই ধীরে ধীরে বিকশিত হয় চিকিৎসাবিদ্যা-ওঝা-গুনিন ইত্যাদি ও ধর্মচেতনা।
ড. অতুল সুরের বর্ণনায়– ‘নবোপলীয় যুগেই কৃষি ও বয়নের উদ্ভব হয় এবং মানুষ পশুপালন করতে শুরু করে। এ যুগের ধর্মীয় আচার সম্বন্ধে আমাদের খুব বেশি কিছু জানা নেই। তবে প্রত্ন-প্রস্তর যুগের মানুষের মত তারা ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিত ও মৃতব্যক্তির সমাধির ওপর একখানা লম্বা পাথর খাড়াভাবে পুঁতে দিত। এরূপ ঋজুভাবে প্রোথিত পাথর আমরা মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হুগলি প্রভৃতি জেলায় লক্ষ্য করি। সেগুলিকে ‘বীরকাঁড়’ বলা হয়।’– (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, পৃষ্ঠা-২৭)
দক্ষিণ ভারতের আদিবাসীদের মধ্যেও এইরকম পাথরের ফলকের ব্যবহার আছে। দেখা যায় নীলগিরিতে কুডুম্বা ও ইরুলা উপজাতির মধ্যে। তারা এই ফলককে ‘বীরকল্লু’ বলে; যার অর্থ– ‘বীরপুরুষদের স্মৃতিফলক’। এককথায়, এগুলি হচ্ছে সমাধির ওপর স্মৃতিফলক। ছোটনাগপুরের হো, মুণ্ডা ও খেরিয়া উপজাতির লোকেরাও এই স্মৃতিফলকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে মানুষের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর গ্রামের বাইরে যে ‘বৃষকাষ্ঠ’ স্থাপন করা হয়, সেগুলি এরূপ প্রস্তরফলকেরই কাষ্ঠনির্মিত উত্তর-সংস্করণ বলে ড. অতুল সুরের অভিমত। পরবর্তীতে এই বীরকাঁড়, বীরকল্লু বা বৃষকাষ্ঠই বিবর্তিত হলো যূপস্তম্ভে। অশোক রায় বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের মতে, এই যূপস্তম্ভই হলো শিবলিঙ্গের সনাতন রূপ। তাঁর ভাষায়– ‘শিবলিঙ্গ পূজার উৎপত্তি অথর্ববেদ সংহিতার প্রসিদ্ধ যূপস্তম্ভ স্তোত্র হইতে। উক্ত স্তোত্রে অনাদি অনন্ত স্তম্ভের বর্ণনা আছে এবং উক্ত স্তম্ভই যে ব্রহ্ম, তাহাই প্রতিপাদিত হইয়াছে। যজ্ঞের অগ্নি, ধূম, ভস্ম, শিখা, সোমলতা, ও যজ্ঞ কাষ্ঠের বাহক বৃষ যে প্রকারে মহাদেবের অঙ্গকান্তি, পিঙ্গলজটা, নীলকণ্ঠ, বৃষবাহনাত্বাদিতে পরিণত হইয়াছে, সেইরূপ যূপস্তম্ভও শ্রীশঙ্করে লীন হইয়া মহিমান্বিত হইয়াছে।’
বিবর্তনের ধারায় মানুষ যেদিন প্রাণময় সত্তা থেকে মনোময় সত্তায় উন্নীত হলো, সেই সেদিন থেকেই পশুর সাথে মানুষের পার্থক্য দেখা দিলো। পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝেছে প্রকৃতিতে সমগ্র জীবজগতের মধ্যে মাত্র দুটোই সত্তা– নারী ও পুরুষ। আর এই দুই সত্তার পারস্পরিক মিলনের মধ্যে দিয়েই সৃষ্টির ধারা বহমান। নিজের জীবনেও সে এই রিপুতাড়নের উদগ্রতা অনুভব করেছে, দেখেছে জীবজগতেও এই সত্য কত সূক্ষ্মভাবে নিঃশব্দে নীরবে কাজ করে চলেছে।
হয়তো ‘একইসঙ্গে সে একথাও অনুভব করতে শুরু করেছে যে তার পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে বিরাজ করছে মূলত দুটো শক্তি, আর এই দুইয়ের উৎসও ওই একই– প্রকৃতি। এর প্রথমটা হলো মাথার উপরে মহাবিচিত্রতায় ভরা সদা পরিবর্তনশীল এক অনন্ত জগৎ, আর দ্বিতীয়টা হল সে নিজে যার উপর অবস্থান করছে– সেই বসুন্ধরা। এই জগতও বহু বিচিত্রতায় পরিপূর্ণ ও অনন্ত জিজ্ঞাসায় ঠাসা। এই একই সঙ্গে সে অনুভব করেছে যে, তার মাথার উপরের জগৎটা অনেক বেশি শক্তিমান ও সদা পরিবর্তনশীল। তার পরাভবের কাছে নতজানু হয়ে থাকে ধরিত্রী। এই ধরিত্রীর বুকেই বেড়ে উঠেছে তাবৎ জীবজগৎ ও উদ্ভিদ জগৎ, যা তাকে খাদ্য, পানীয় ও শিকার জোগায়। পাহাড়ের গুহাগুলো তাকে মায়ের মতো আশ্রয় জোগায় (প্রকৃতির প্রতিকূলতার হাত থেকে)। তখনই এক দার্শনিকতার উদয় হয়– জগৎটা কি তার পরিচিত! (নারী ও পুরুষের) এক মহা মহা বিশাল রূপ! যেখানে সন্তানের মতোই প্রতিপালিত হচ্ছে সে নিজে। সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংসের ত্রিগুণাত্মিকা ধরিত্রী হলেন– মাতৃস্বরূপা। আর আকাশ, সে তার পরুষতাগুণে হল পুরুষের প্রতীক।’– (অশোক রায়/ মাতৃকাশক্তি, পৃষ্ঠা-৩৩)
এতদিনে অচেনা জগৎটা বুঝি তার কাছে একটু বোধগম্য হলো। কৃষিভিত্তিক মানবসভ্যতার একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় গোষ্ঠীবদ্ধ যে মানবসমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক, সময়ের বিবর্তনে ক্রমে পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো। পুরুষেরা শিকারের সন্ধানে দলবদ্ধভাবে দূর থেকে দূরান্তরে গেলে ঘরে খাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়তো। সন্তানদের ও নিজের খাদ্য-চাহিদা মেটাতে বনের ফল-মধু-ফুল ইত্যাদি সংগ্রহ করেই চলতো খুন্নিবৃত্তি। যখন সেখানেও টান পড়লো, খিদের জ্বালায় নজর পড়লো তৃণভূমিতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অবস্থায় গজিয়ে ওঠা শস্যদানার উপর। তা দিয়েই নিজের ও সন্তানের খিদের জ্বালা মিটতো। ক্রমে এই সংগৃহিত শস্যদানা ভিজে মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে প্রাথমিক অবস্থায় শস্য উৎপাদন করা সম্ভব হলো। এরপর তাদের চিন্তাধারায় এলো এক যুগান্তকারী দার্শনিকতা। নিজেদের জীবনে সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়া তো চিরকালই জানা, সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগালো। যেহেতু ভূমি বন্য অবস্থাতেও শস্য উৎপাদন করে, তাই বসুন্ধরাকে মাতৃরূপে কল্পনা করে ভাবতে লাগলো– পুরুষ যদি নারীরূপী ক্ষেত্রকে কর্ষণ করে, তবে অবশ্যই সেখানে শস্য উৎপাদিত হবে। তখন তারা পুরুষের প্রতীক স্বরূপ এক লিঙ্গ যষ্টি বানিয়ে ভূমিকর্ষণ করলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের সমস্ত ধর্মশাস্ত্রে নারীকে ‘ক্ষেত্র’ বা ভূমি বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। আর পুরুষের লিঙ্গস্বরূপ ‘কর্ষণ যষ্টি’ বা ‘খনন যষ্টি’ আজও অনেক আদিম সমাজে ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। ‘লিঙ্গ’, ‘লাঙ্গুল’ ও ‘লাঙ্গল’– এই তিনটে শব্দ যে একই ধাতুরূপ থেকে নিষ্পন্ন তা ড. অতুল সুরের বর্ণনা থেকে জানা যায়।
‘প্রৎসিলুসকি (Przyluski) দেখিয়েছেন যে ‘লিঙ্গ’ ও ‘লাঙ্গল’ শব্দদ্বয় অস্ট্রিক ভাষার অন্তর্ভুক্ত শব্দ, এবং ব্যুৎপত্তির দিক থেকে উভয় শব্দের অর্থ একই। তিনি বলেছেন যে পুরুষাঙ্গের সমার্থবোধক শব্দ হিসাবে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি অস্ট্রো-এসিয়াটিক জগতের সর্বত্রই বিদ্যমান, কিন্তু প্রতীচ্যের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহে এর অভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি আরও বলেছেন যে সংস্কৃত ভাষায় যখন শব্দ দুটি প্রবিষ্ট হল, তখন একই ধাতুরূপ (‘লনগ্’) থেকে লাঙ্গুল ও লিঙ্গ শব্দ উদ্ভূত হয়েছিল। অনেক সূত্রগ্রন্থ ও মহাভারত-এ ‘লাঙ্গুল’ শব্দের মানে লিঙ্গ বা কোন প্রাণীর লেজ। যদি ‘লাঙ্গল = লাঙ্গুল’, এই সমীকরণ স্বীকৃত হয়, তা হলে এই তিনটি শব্দের (লাঙ্গল, লাঙ্গুল ও লিঙ্গ) অর্থ-বিবর্তন (semantic evolution) বোঝা কঠিন হবে না। কেননা, সৃষ্টি প্রকল্পে লিঙ্গের ব্যবহার ও শস্য-উৎপাদনে লাঙ্গল দ্বারা ভূমিকর্ষণের মধ্যে একটা স্বাভাবিক সাদৃশ্য আছে। অস্ট্রিকভাষাভাষী অনেক জাতির লোক ভূমিকর্ষণের জন্য লাঙ্গলের পরিবর্তে লিঙ্গ-সদৃশ খনন-যষ্টি ব্যবহার করে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক হিউবার্ট ও. ময়েস বলেছেন যে মেলেনেসিয়া ও পলিনেসিয়ার অনেক জাতি কর্তৃক ব্যবহৃত খননযষ্টি লিঙ্গাকারেই নির্মিত হয়। মনে হয়, ভারতের আদিম অধিবাসীরাও নবোপলীয় যুগে বা তার কিছু পূর্বে এইরূপ যষ্টিই ব্যবহার করত, এবং পরে যখন তারা লাঙ্গল উদ্ভাবন করল, তখন তারা একই শব্দের ধাতুরূপ থেকে তার নামকরণ করল।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)
এইভাবে মেয়েরাই প্রথম পৃথিবীর বুকে শস্য উৎপাদন করলো এবং ক্রমে পুরুষেরাও কৃষিকর্মে মেয়েদের সহায়ক হলো। ধারণাগতভাবে বিষয়টা যদি যৌক্তিক বিচারে স্বীকারযোগ্য হয় তাহলে মাতৃপূজা ও লিঙ্গপূজার সমন্বিত ভারতীয় শক্তিবাদের তাত্ত্বিক পরিকল্পনার উৎস-বীজটা যে সেই সুপ্রাচীন সিন্ধুযুগের অনার্য সমাজ-উদ্ভূত ধর্মবিশ্বাসেরই বিবর্তিত পরম্পরার স্মারক-চিহ্ন, তা বোধকরি অস্বীকার করা যাবে না।
কৃষিকাজে লিঙ্গরূপী যষ্টি হচ্ছে passive, আর ভূমিরূপী পৃথিবী ও তাদের মেয়েরা হচ্ছে active। Active মানেই হচ্ছে শক্তির আধার। কৃষির সাথে প্রজনন প্রক্রিয়ার এই সম্পর্ক বুঝতে পারার পর কৃষির সাফল্যের জন্য ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া কৃষি সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রযুক্ত হলো। ফলে নানা ধরনের প্রজনন-কেন্দ্রিক যৌন অনুষ্ঠানের উদ্ভব হতে থাকে। যেমন, নিউ গিনির আদিম অধিবাসীরা এখনও কৃষির সাফল্যের জন্যে কৃষিভূমিতেই মৈথুন-ক্রিয়ায় রত হয়। এটাকে তারা কৃষি সম্পর্কিত একটা অনুষ্ঠান বলেই মনে করে। একেই বলে উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস। জেমস ফ্রেজার তাঁর বিখ্যাত ‘গোল্ডেন বাউ’ গ্রন্থে সারা পৃথিবীর আদিম ও সভ্য সমাজে কৃষিকার্যের বিভিন্ন কৌলিক প্রথার কথা আলোচনা করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি লিখেছেন– জার্মানিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কৃষিকর্মের আগের রাত্রে নারী রাতের অন্ধকারে নগ্ন অবস্থায় ভূমিতে প্রথম বীজবপন করতো। এই প্রথা অন্যত্রও প্রচলিত ছিল, এখনও আছে। আমাদের দেশে সংবৎসর জুড়ে যেসব নানান মেয়েলি ব্রত-অনুষ্ঠানের প্রচলন এখনও গ্রাম-বাংলায় দৃশ্যমান হয় তার প্রায় সবগুলিই এই উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসেরই ক্রমবিবর্তিত পরম্পরা। খুব সম্ভবত এই কারণেই ফসল তোলার পর আদিম মানুষের যে প্রথম ‘নবান্ন’ উৎসব হলো, তা এক যৌন মহোৎসবে পরিণত হলো, আর সেই উৎসবেই জন্ম নিলো– লিঙ্গপূজা ও ভূমিরূপী পৃথিবীর পূজা বা যোনি-পূজা। নব-প্রস্তর যুগে এইভাবেই লিঙ্গপূজার সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে দেবাদিদেব ও আদ্যাশক্তিতে (শিব ও শক্তিতে) পরিণতি লাভ করে। এভাবেই কৃষির সাথে লিঙ্গ ও যোনির সম্পর্ক অতি প্রাচীনকাল থেকে স্থাপিত হয়, যা আজও শিব ও শক্তি রূপে বহমান। একান্ত বাস্তবানুগ পুরুষলিঙ্গ ও যোনি প্রতিরূপ নির্মাণ ও পূজন নব-প্রস্তর যুগেরই অবদান। এ সবই কৃষি, উর্বরতা শক্তি, সৃজনশক্তি ও ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যে সংশ্লিষ্ট এ বিষয়ে পণ্ডিত মহলে কোনও দ্বিমত নেই।

           নব-প্রস্তর যুগের পর এলো তাম্র-প্রস্তর যুগ, তাম্র যুগ ও ব্রোঞ্জ যুগ। পৃথিবীর সমন্ত প্রাচীন সভ্যতাগুলো এই যুগেরই নিদর্শন। ভারতে তাম্র-প্রস্তর যুগের সভ্যতাকে সিন্ধু সভ্যতা বা মহেনজোদারো– হরপ্পা সভ্যতা বলে। সিন্ধু সভ্যতাতেও শিব ও শক্তির পূজা যে হতো এই ধারণা এখন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেখানে লিঙ্গমূর্তি ও যোনিচিহ্ন আলাদা আলাদাভাবেই পূজিত হয়েছে। একইভাবে আদি শিব ও আদি মাতার মূর্তিও পুজিত হতো। পরবর্তীকালে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য সভ্যতা এবং তারপরে পৌরাণিক যুগ। এই সময়েও কিন্তু বর্তমানে শিবলিঙ্গকে আমরা যেরূপে দেখি সেই জগৎ পিতা ও জগন্মাতার যুগল প্রতীকের সমন্বয় সাধন করা তখন সম্ভব হয়নি। যদিও (আমরা অন্যত্র দেখবো) যজুর্বেদের কালে কৃষ্ণ ও শুক্ল যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় ও রুদ্রাধ্যায় পর্বে দেবাদিদেবের দার্শনিক চর্চা চরম শিখরে ওঠে ওই সময়েই তিনি পরমাত্মায় পর্যবসিত হন। কালে বৈদিক সভ্যতা বিবর্তিত হয় পৌরাণিক যুগে এসে। এই সময়েও ওই সমন্বয় সাধন সম্ভব হয়নি। গুপ্ত যুগেই পঞ্চম শতাব্দীতে বেশিরভাগ পুরাণ, বেদ ও মহাকাব্যদ্বয় সংকলিত হয়ে বর্তমানের রূপ লাভ করেছে। আর গুপ্ত যুগের ঠিক শেষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে এসে লিঙ্গমূর্তি ও যোনিচিহ্নের প্রতীকীকরণ ও সমন্বয় সাধন করে সনালিকা গৌরীপট্ট সমন্বিত আজকের শিবলিঙ্গরূপ পরিগ্রহ করে। যা মহাকবি কালিদাসের অনুভূতিতে– বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং। শব্দ ও অর্থ যেমন একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও অভিন্ন, তেমনই শিব ও শক্তি এক ও অভিন্ন।
আগেও উল্লেখ করা হয়েছে, দশ হাজার বছর আগে মানুষ কৃষিকার্য ও পশুপালন করতে শেখে। এই সময়কালকে বলা হয় মধ্য-প্রস্তর যুগ। আর নিম্ন-প্রস্তর যুগ বা নব-প্রস্তর যুগে এসে অর্থাৎ আট হাজার বছর আগে মানুষ প্রতিষ্ঠা করেছে গ্রাম, সমাজ, গোষ্ঠী ও পরিবার। আর মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে গড়ে তোলে নাগরিক সভ্যতা। এটি তাম্রাশ্ম যুগের অবদান। কৃষিকার্যের অরুণালোকে আদিম মানবের শিকারজীবী-যাযাবর-আরণ্যক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। গড়ে ওঠে স্থায়ী বাসভূমি। প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিবর্তিত হয় পিতৃতান্ত্রিকতায়। ভারতবর্ষে এই সভ্যতার কালানুক্রমিক পরিপুষ্টি ও চরমোৎকর্ষতা দেখা যায়– সিন্ধু সভ্যতায়। যার পরিণতিতে সেখানে নগরায়ণ, কারিগরিবিদ্যা, বহির্বাণিজ্য, জ্ঞানবিজ্ঞান, ধর্ম-দর্শন ও শিল্পকলা চিন্তার এক আশ্চর্য উত্তরণ ঘটে। এ ছাড়াও সেদিনকার সেই ধর্মচিন্তা– যেমন মাতৃদেবীর পূজা, আদি শিব, লিঙ্গ ও যোনি পূজা, সূর্য পূজা, নাগপূজা, পশুপূজা ও বৃক্ষ বা অশ্বত্থ পূজা ইত্যাদি– পরবর্তীকালে হিন্দু সভ্যতার দেবদেবী ধারণা গঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

(চলবে…)

[পূর্বের পোস্ট: শক্তি-সাধনা, উৎস ও পরম্পরা] [*] [পরের পোস্ট: প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম-সাধনা]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 557,477 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 141 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

নভেম্বর 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: