h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-১১ : বাংলার লোকায়তিক শিব ও লৌকিক শৈবধর্ম

Posted on: 07/11/2019


pics 26 c

শিব ও লিঙ্গ-১১ : বাংলার লোকায়তিক শিব ও লৌকিক শৈবধর্ম
রণদীপম বসু

প্রাচীন ভারতীয় যেসব প্রাক্-বৈদিক দেবতা পরবর্তী হিন্দু সমাজেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বলা যায় শিবই সর্বপ্রধান। এতে স্বভাবতই অনুমিত হয় যে, এ দেশের প্রাক্-বৈদিক সমাজে তৎকালীন শৈবধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কার থেকেও এ বিষয় সমর্থিত হয়। সেজন্যেই মনে করা হয়,–
‘বর্তমানে ভারতের যে অঞ্চলে আর্যেতর জাতির লোক অধিক সংখ্যায় বসবাস করে, সেই অঞ্চলেই শৈবধর্মের ও যে অঞ্চলে আর্যভাষী জাতির বংশধরগণ অধিক পরিমাণে বাস করে, সেই অঞ্চলেই বৈষ্ণব ধর্মেরই প্রাধান্য দেখিতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বাংলাদেশ হইতে বহু দূরবর্তী অঞ্চলে উদ্ভুত হইয়াছিল, কালক্রমে তাহা বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হইবার পূর্বেই ইহাকে প্রাগার্য (Pre-Aryan) শৈবধর্মের সংস্পর্শে আসিতে হইয়াছিল। অতএব বাংলাদেশে প্রথম হইতেই যে শিবধর্মের প্রচার হইয়াছিল, তাহার সঙ্গে আর্যেতর সমাজের উপাদান পূর্ব হইতেই মিশ্রিত ছিল। শুধু তাহাই নহে, অনার্য দেবতা শিব ইতিপূর্বেই আর্য সমাজে একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করিয়া স্বকীয় মহিমায় স্বয়ম্প্রতিষ্ঠ হইয়াছিলেন।’– (শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৪২)

         আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন-এর বক্তব্য থেকেও আমরা জানতে পারি,– ‘পুরাকালে পূর্ব্বভারতের রাজারা অধিকাংশই শৈবধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন। তাঁহারা যজ্ঞ-বিদ্বেষী এবং কিরাত, মেচ, কুকি, চাকমা, হাজাং, খস্ প্রভৃতি জাতিদের সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন; শিব অনুচরগণের বিকৃত দেহ ও অদ্ভুত মুখ কল্পনা করিবার কারণ ইহাও হইতে পারে। প্রাচীন শৈব ধর্ম্ম এ দেশে বদ্ধমূল ছিল। শিবের সঙ্গে এ দেশের রাজারা নানাভাবে আত্মীয়তা কল্পনা করিয়া গৌরব অনুভব করিয়াছেন। এই দেশে এককালে স্বয়ম্ভুই সম্রাট্ ছিলেন। ত্রিপুররাজ্যের ত্রিলোচনা এবং কোচবিহারের রাজা বিশ্বসিংহ শিবের ঔরসজাত পুত্র বলিয়া কথিত হইয়াছেন। হরিবংশে লিখিত আছে মহারাজ বাণকে শিব এত ভালবাসিতেন যে স্বীয় পুত্র কার্ত্তিকেয় হইতে তাঁহার আবদার বেশী রাখিতেন; বাণ-প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ– সর্ব্বপ্রকার শিবলিঙ্গ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং বাণলিঙ্গ নামে অভিহিত। কোনদের সঙ্গে নানারূপ শিবলীলা উপকথার বিষয়ীভুত হইয়া আছে। প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে এ সম্বন্ধে নানা কাহিনী বর্ণিত আছে। পার্ব্বত্য জাতিদের সঙ্গে অতিরিক্ত মেশামেশি, যজ্ঞ-বিদ্বেষ ও কৃষ্ণের সহিত শত্রুতা ইত্যাদি কারণে পূর্ব্বদেশের রাজারা ক্ষত্রিয় হইয়াও ‘দানব’ আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। জরাসন্ধ, বাণ, ভগদত্ত, নরক ও মুর প্রভৃতি রাজারা ক্ষত্রিয় হওয়া সত্ত্বেও দানব নামে পরিচিত। ইঁহারা যে আর্য্য-সমাজভুক্ত ছিলেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। বৈদিক সাহিত্যে লিখিত আছে যে, পূর্ব্বদেশীয় রাজারা অতি প্রাচীন কাল হইতে আর্য্যনীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন। পশ্চিম-ভারতীয়, চন্দ্রসূর্য্যবংশীয় ও যদুকুলের রাজাদের সঙ্গে ইঁহাদের কুটুম্বিতা ছিল। জরাসন্ধের দুই কন্যা অস্তি ও প্রাপ্তিকে মথুরারাজ কংস এবং বাণের কন্যা ঊষাকে শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধ বিবাহ করিয়াছিলেন। কৃষ্ণের প্রতি বিদ্বেষের জন্য ক্ষত্রিয়পুঙ্গব কংস ‘দানব’ আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। জয়দেবকৃত কৃষ্ণশ্লোকে তাঁহাকে “কংসদানবঘাতন” বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।’– (বৃহৎ বঙ্গ প্রথম খন্ড : দীনেশচন্দ্র সেন, পৃষ্ঠা-৪০-৪১)
শৈব রাজাদের অনেকেই যজ্ঞে পশুবলির প্রতিবাদী ছিলেন বলে জানা যায়। মহাভারতের আখ্যানে নরকের বিরুদ্ধে এটাই প্রধান অভিযোগ ছিল। তাছাড়া স্বয়ং শিব যে দক্ষের যজ্ঞ নষ্ট করেছিলেন তা আমরা ইতঃপূর্বেই আলোচনা করেছি। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের মতে–
‘সমস্ত বাঙ্গলাদেশ এক সময়ে কৃষ্ণ এবং যজ্ঞানুষ্ঠানকারী ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধবাদী ছিল। দেশ ব্যাপিয়া সেই সময়ে ভোলানাথের ধ্বজা উড়িতেছিল; কৃষ্ণ-সমাশ্রিত ব্রাহ্মণ্যধর্ম্ম এদেশে সে যুগে সমাদৃত হয় নাই। পরবর্ত্তী কালে যজ্ঞ-নিষেধকারী, সাম্য-প্রচারক, করুণাখনি বুদ্ধদেবকে শিব তাঁহার সাম্রাজ্য ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। বহুযুগ পরে যখন এ দেশ কৃষ্ণকে স্বীকার করিল, তখন তাঁহাকে শঙ্খচক্রগদা ছাড়িয়া এ দেশের মাটিতে পদার্পণ করিতে হইয়াছিল। বাঙ্গালী তাঁহার হাতে একটি বাঁশী দিয়া তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিল। এ দেশ কখনই ঐশ্বর্য্যকে গণ্য করে নাই; বল দিয়া এ দেশ কখনই জয় করা যায় নাই; বাঁশীর সুরে– প্রেমের আহ্বানে বাঙ্গালী চিরকাল সাড়া দিয়াছে।’– (বৃহৎ বঙ্গ প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪১)

         আমরা ইতঃপূর্বে বৈদিক রুদ্র দেবতার পর্যায়ক্রমিক বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছি। এই রুদ্র দেবতার মধ্যেই অনার্য উপকরণের উপস্থিতি সুস্পষ্টভাবেই অনুভব করা যায়। তার মানে, বৈদিক দেব-সমাজের মধ্যেই এই অনার্য দেবতা নিজের স্থান করে নেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে রুদ্র দেবতার এই বৈদিক পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে ধ্যানী বুদ্ধের অনুকরণে তাঁর এক শান্ত সমাহিত শিবমূর্তির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মহেঞ্জোদারোতে আবিষ্কৃত শীলমোহরগুলির মধ্যে যোগাসনারূঢ় এক যতি বা দেবমূর্তির পরিচয় থেকে মনে হয় যে, যোগীন্দ্র শিবের পরিকল্পনা প্রাগার্য (Pre-Aryan) সমাজ থেকে উদ্ভুত এবং কালক্রমে তা এসে পৌরাণিক পরিকল্পনার মধ্যে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। এভাবেই ভারতীয় পৌরাণিক সমাজ রুদ্র, শিব ও যোগী চরিত্রের মধ্যে এক ধরনের সামঞ্জস্য স্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছে। সেজন্যেই হয়তো একদিকে এই দেবতা যেমন ঘোর, ভৈরব এবং রুদ্র, আবার তেমনই অন্যদিকে অঘোর, শিব এবং দক্ষিণ– আবার তিনিই যোগীশ্বর ও যোগীন্দ্র। পৌরাণিক সাহিত্যের ভিতর দিয়েই প্রধানত আর্যধর্ম বাংলাদেশে প্রচারিত হয়েছিল বলে এই দেবতার চরিত্রগত বিভিন্নমুখী এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রথম থেকেই এ দেশে প্রচার লাভ করেছিল এবং সেজন্যেই কোথাও তিনি মঙ্গলকারী দেবতা, আবার কোথাও রুদ্র ভয়ানক। শিবের এই দুই প্রধান চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের উপরই বাংলার লৌকিক শৈবধর্মের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল বলে শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন।
তাঁর মতে, বহিরাগত শৈবধর্ম বাংলার সমাজের উচ্চতর স্তরেই সর্বপ্রথম প্রচারিত হয়েছিল, তা থেকেই ক্রমে তা নিম্নতর সমাজেও প্রসার লাভ করে। কিন্তু নিম্নতর সমাজের মধ্যে প্রচারিত হয়ে এই শৈবধর্ম তার পৌরাণিক আদর্শ বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। নিম্নতর সমাজ নিজস্ব সংস্কারের ভিত্তির উপর উচ্চতর সমাজ থেকে তার সকল বিষয়ে প্রেরণা লাভ করে থাকে, কিন্তু যেসব উপকরণ উচ্চতর সমাজ থেকে তাতে গৃহীত হয়, তার মধ্যে তাদের যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হয় না– নিম্নতর সমাজের সংস্কারানুযায়ী সেগুলি নতুন রূপে পুনর্গঠিত হয়। অনেক সময় তা এমনভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকে যে, তাদের মৌলিক পরিচয়ই উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। পৌরাণিক শৈবধর্ম যখন উচ্চতর হিন্দু সমাজ থেকে ক্রমে নিম্নতর সমাজের মধ্যেও প্রচার লাভ করলো, তখন তা এমনভাবে নতুন রূপ লাভ করলো– তা বাংলাদেশের সর্বত্রই যে অভিন্ন হলো তা নয়; কারণ, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় অবস্থার উপর ভিত্তি করেই এ নতুন পরিকল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল। এজন্যে তার মধ্যে আদর্শগত অনৈক্যও অনেক সময় গড়ে উঠেছিল। ক্রমে মূল পৌরাণিক আদর্শ থেকে এসব স্থানীয় পরিকল্পনা অত্যন্ত দূরবর্তী হয়ে পড়েছিল। যেমন, শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের ভাষ্যে–
‘বাংলাদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তৃতির ইতিহাস আলোচনা করিলে জানিতে পারা যায় যে, উত্তর বিহার বা মগধ হইতে ইহার সংলগ্ন অঞ্চল উত্তরবঙ্গেই আর্যসভ্যতা সর্বপ্রথম বিস্তৃতি লাভ করে, উচ্চতর সমাজ হইতে তাহা তদানীন্তন উত্তরবঙ্গের অধিবাসী নিম্নতর জাতির মধ্যেও প্রচারিত হয়। শৈবধর্ম বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করিবার পূর্বেই উত্তরবঙ্গে সাধারণ জন-সমাজের মধ্যে প্রচারিত হইয়া সেই অঞ্চলে একটি স্থানীয় রূপ লাভ করিয়াছিল। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী শিব একজন কৃষক। বলা বাহুল্য যে, উত্তরবঙ্গের সাধারণ কৃষক সমাজেই শিবের এই অভিনব পরিকল্পনা সম্ভব হইয়াছিল। কিন্তু কৃষক হইলেও প্রত্যক্ষ কৃষিকার্যে তাঁহার অসীম অনাসক্তি। অবশ্য এই অনাসক্তির ভাবটুকু তাঁহার চরিত্রের উপর পৌরাণিক চরিত্রেরই প্রভাবের ফল বলিতে হয়। কৃষিকার্যের ঔদাসীন্যের জন্যই তিনি নিত্য সাংসারিক অভাব-অনটনের যন্ত্রণা ভোগ করিয়া থাকেন। এই অসচ্ছলতার জন্য তিনি কৃষিকার্যে মনোযোগী না হইয়া বরং ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিয়া থাকেন। এই-ভাবে বাংলার কৃষকগণ একদিকে যেমন কৃষিকার্য দেব-বৃত্তি বলিয়া নির্দেশ করিয়া ইহার উপর এক অপরূপ গৌরব দান করিয়াছিল, আবার অন্যদিকে তেমনি ভিক্ষাকার্যকেও দেব-বৃত্তি বলিয়া উল্লেখ করিয়া নিষ্ক্রিয় জীবনের মহিমা কীর্তন করিয়াছিল।’
‘পৌরাণিক অকিঞ্চন শিবের পরিকল্পনার উপরই ভিক্ষুক শিবের পরিকল্পনা করা হইয়াছিল, অবশ্য ইহার মধ্যে বৌদ্ধধর্ম হইতে আগত ভিক্ষুজীবনের আদর্শও কতক কার্যকরী হইয়াছিল বলিয়া অনুভব করা যায়। বলা বাহুল্য, ইহাদের সঙ্গে শিবের কৃষক-চরিত্রের কোনরকম সামঞ্জস্য স্থাপন করা যায় না। কৃষিকার্য ব্যতীতও বাংলাদেশের শিবচরিত্রের উপর আরও কয়েকটি গুণ আরোপ করা হইয়াছিল, তাহা তাঁহার ভাঙ্ ও গাঁজায় আসক্তি। শিব কর্তৃক বিষপানের পৌরাণিক কাহিনীকেই সেকালের বাঙ্গালী কৃষকগণ নিজেদের অভিজ্ঞতা ও রুচি অনুযায়ী এইভাবে রূপান্তরিত করিয়া লইয়াছিল; এইভাবে দেখিতে পাওয়া যায় যে, বাংলার শিব একদিকে একজন অলস কৃষক, আবার অন্যদিকে গাঁজা এবং ভাঙে পরম আসক্ত।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৪৩-৪৪)

        সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসবিদদের মতে, এদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তারের পূর্বে উত্তরবঙ্গে কোচ নামক এক জাতি বাস করতো। কৃষিকাজই তাদের প্রধান বৃত্তি ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেক আদিম জাতির ইতিহাস আলোচনায় দেখতে পাওয়া যায় যে, যেসব জাতির মধ্যে কৃষিকার্য প্রচলিত আছে, তাদের মধ্যে কৃষিকার্যের জন্য এক দেবতার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে। কোন কোন জাতির মধ্যে তিনি ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধির দেবতা (Fertility god) বলে পূজিত হন। ইনি কখনও স্ত্রীরূপে, কখনও বা পুরুষরূপে পরিকল্পিত হন। এই কোচ জাতির মধ্যেও এই শ্রেণির এক দেবতার অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের বর্ণনা থেকে জানা যায়, কিছুদিন পূর্বেও উত্তরবঙ্গে বিশেষত দিনাজপুর জেলার সদর মহকুমায় কৃষকদের মধ্যে মহারাজা নামক এক দেবতার পূজা হতো। হয়তো এখনও হয়ে থাকে। অগ্রহায়ণ মাসে নবান্নের সময় স্থানীয় কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে বারোয়ারীভাবে এই দেবতার পূজা করে থাকে। তাদের বিশ্বাস, এই মহারাজের আশীর্বাদেই তারা কৃষিকার্যে সুফল লাভ করতে পারে। অতএব ইনি যে উক্ত ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধির দেবতার ছাড়া আর কিছু নন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই দেবতার মহারাজা নামকরণ বহু পরবর্তী। ধারণা করা হয়, এসব অঞ্চলে আর্যসভ্যতা বিস্তৃতির পর স্থানীয় কৃষকদের এই উর্বরতা বৃদ্ধির দেবতা (Fertility god) কোন কোন স্থানে মহারাজা বলে উল্লিখিত হলেও ব্যাপকভাবে শিব বলেই পরিচিত হতে থাকেন। সেজন্যই প্রাচীন বাংলার কবিগণ শিবকেই সর্বত্র কৃষিকার্যের সহায়ক বলে বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে উত্তরবঙ্গের এই মহারাজা ঠাকুর, পশ্চিমবঙ্গের ধর্মঠাকুর ও শিব ঠাকুরের মধ্যে কোনও মৌলিক পার্থক্য নেই। জানা যায়, তাঁদের পূজোপলক্ষে প্রায় অভিন্ন লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়ে থাকে।
কোচ কৃষক সমাজেই বাংলার লৌকিক শৈবধর্মের প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কারণ,–
‘দেখিতে পাওয়া যায় যে বাংলার বহু দূরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীন সাহিত্যেও শিবকে কোচ রমণীদিগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। বাংলার সর্বত্র প্রচলিত লৌকিক শিবের ছড়ায় কোচনী রমণীর প্রতি শিবের আসক্তির বিস্তৃতি বর্ণনা পাওয়া যায়। অতএব মনে হয়, কোচ জাতীয় কৃষক দিগের সমাজেই পৌরাণিক শিব সর্বপ্রথম আসিয়া প্রবেশ লাভ করেন; অতঃপর সেখানেই তাহার চরিত্র স্থানীয় কোচদিগের সামাজিক জীবনের উপাদানে মিশ্রিত হইয়া একটি স্থানীয় ও লৌকিক রূপ পরিগ্রহ করে; কালক্রমে তাহাই বাংলার সর্বত্র প্রচার লাভ করে। কিন্তু বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে তাহা প্রচার লাভ করিবার পরও কোচ-সংস্রবের লোক-রুচিকর উপকরণগুলি কখনও তাহার মধ্য হইতে পরিত্যক্ত হয় নাই। বিশেষত সংস্কৃত শৈব পুরাণগুলির মধ্যেও শিবচরিত্রের অনুরূপ দুর্নীতিপরায়ণতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। স্কন্দপুরাণে বর্ণিত আছে, দিগম্বর শিব এক ঋষির আশ্রমে প্রবেশ করিলে পর ঋষি-পত্নিগণ তাঁহার সহিত অশ্লীল রসপরিহাস করিতেছেন। অতএব তাঁহার সহিত উক্ত কোচ-রমণীর সম্পর্কের পরিকল্পনায় কিছুটা পৌরাণিক প্রভাব থাকাও আশ্চর্য নহে। কোচ-রমণীর সঙ্গে শিবের সম্পর্কের অর্থ এই যে, হিন্দুধর্মের মধ্যস্থতায় শৈবধর্মের প্রভাব যখন কোচ সমাজের উপর বিস্তার লাভ করিল, তখনও কোচ সমাজের মাতৃতান্ত্রিক ভিত্তি শিথিল হইয়া যায় নাই– সামাজিক ও পারিবারিক পূজাপার্বণে কোচ পুরুষদিগের পরিবর্তে কোচ নারীরাই পৌরহিত্য করিত। এখনও উত্তরবঙ্গের পূর্বসীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চল গারো ও খাসি অঞ্চলে যে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তাহাতে পুরুষদিগের পরিবর্তে নারীরাই পৌরহিত্য করিয়া থাকে। উড়িষ্যার শবর জাতির মধ্যে পুরোহিত এখনও নারীই, পুরুষ নহে। কোচ নারীগণ আর্যেতর দেবতা শিবের পূজায় বিশেষ উৎসাহ দেখাইত, ইহা হইতে শিবের সঙ্গে কোন নারী সংস্রবের কথা কল্পিত হইয়া থাকে। মাতৃতান্ত্রিক কোচ সমাজে নারীর নৈতিক আদর্শ খুব উচ্চ ছিল না বলিয়াই এই সম্পর্কের সূত্র ধরিয়া শিব-চরিত্রেও নৈতিক বিচ্যুতির কথা আসিয়াছে।’– (শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৪৪-৪৫)

         বাঙালি চিরদিন পারিবারিক জীবনে সহস্র বন্ধনের মধ্যেই নিবিড় সুখ উপভোগ করতে অভ্যস্ত। দুঃখ-দারিদ্র্য ও ঐহিক অসচ্ছলতা কিছুতেই তার এই বন্ধন শিথিল করতে পারে না। এদেশের নারীজীবনের আদর্শও স্বতন্ত্র। সহস্র দুঃখ-দারিদ্র্য অভাব-অসন্তোষের মধ্যেও তাদের দাম্পত্য জীবন অশিথিল থেকে যায়। শিবের মতো স্বামীই নারীর আশৈশব জীবনের কাম্য। নিজের স্বামীর মধ্যে এই আদর্শের প্রতিষ্ঠা করে তারা নারী জীবনের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করে। সেজন্যে ব্যক্তি হিসেবে স্বামী যার যেমনই হোক না কেন, তার জন্য কারও মনে ক্ষোভ স্থায়ী হয় না। এদেশের স্বামীও যে কোন অবস্থার মধ্যে পড়েও ভাগ্যের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিয়ে অতি সহজেই দাম্পত্য্য জীবনের পথে অগ্রসর হয়েছে। বাঙালি কবিরা শিবকে দাম্পত্য জীবনের আদর্শ স্বামী বলে কল্পনা করেছেন। গৃহধর্মের আদর্শই বাঙালির নিকট সর্বাপেক্ষা বড়। সেজন্যেই তার পরিকল্পিত দেবতা আদর্শ গৃহধর্মে প্রতিষ্ঠিত। পৌরাণিক শিবের মতো তিনি প্রমথনাথ হয়ে শ্মশানবিহারী নন, বরং তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত,– তিনি স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-পরিবেষ্টিত গৃহী। যদিও তাঁরও আবার কৈলাস বলেই উল্লিখিত হয়, তবুও অতি সহজেই অনুভব করা যায় যে, এই কৈলাস বাংলারই এক নিভৃত পল্লী ব্যতীত আর কিছুই নয়। দুই পুত্র, দুই কন্যা ও এক সর্বংসহা পত্নী নিয়ে এই পল্লীতে বুঝি এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের বাস। গৃহধর্মের পালনের মধ্যেও যে আধ্যাত্মিক চরিতার্থতা সার্থক হতে পারে এ দেশের কবিরা তাঁদের লৌকিক শিবের পরিকল্পনায় তা প্রমাণ করেছেন। মোট কথা বাংলার শিব পৌরাণিক আদর্শানুযায়ী যোগী নন, বরং আদর্শ গৃহী।
অন্যদিকে কৃষকের কল্যাণকর দেবতারূপে উত্তরবঙ্গের কোচ সমাজে যে শিবচরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়, বাংলার পশ্চিম অঞ্চলে পরিকল্পিত শিবের চরিত্রে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় বলে শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন। তার কারণ, এই দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে মৌলিক জাতিগত পরিচয়ে পার্থক্য রয়েছে। শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের ভাষ্য মতে–
‘বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চল সাধারণত রাঢ় নামে পরিচিত। এই অঞ্চলে প্রাচীন কাল হইতে মৃগয়াজীবী কোল মুণ্ডা জাতির এক শাখা বসবাস করিতেছিল। উত্তরবঙ্গের কোচ জাতীয় অধিবাসীদিগের মত তাহারা কৃষিজীবী ছিল না। সেইজন্যই স্বভাবতই কৃষিকার্যের সহায়ক কোন দেবতারও তাহাদের মধ্যে কোন স্থান ছিল না। এই কোল-মুণ্ডা জাতির প্রধান দেবতার নাম ছিল মরাং বুরো, ইনি পর্বতের অধিষ্ঠাতা দেবতা। ইনি মানবের মহা অনিষ্টকারী; উপযুক্ত পূজা না পাইলে নানা দুর্বিপাক সৃষ্টি করিয়া ইনি গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করিয়া ফেলেন। কালক্রমে হিন্দু ধর্ম যখন এই কোল-মুণ্ডা জাতি অধ্যুষিত বাংলার এই পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিস্তার লাভ করিল, তখন স্বভাবত এ’দেশে এই অনার্য-জাতি-প্রভাবিত হিন্দুসমাজের অন্যতম প্রধান দেবতা শিবকে এইপ্রকার রক্তপিপাসু ও ভয়ঙ্কর বলিয়া কল্পনা করিল। অতএব তাঁহাকেও তাহারা তাহাদের মরাং বুরোর মত পশুবলি দ্বারা পূজা করিয়া পরিতৃপ্ত করিতে লাগিল। এমন কি এই অঞ্চলে পরবর্তী কালে আর্যসভ্যতার প্রভাব অধিকতর হওয়া সত্ত্বেও সাধারণের মধ্যে শিবসম্পর্কিত এই মনোভাবের বিশেষ ব্যতিক্রম ঘটিল না। বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম– এই সকল অঞ্চলের বহুস্থলেই আজ পর্যন্তও বার্ষিক শিবপূজা বা চৈত্র-সংক্রান্তির সময় শিবের সম্মুখে পশুবলি দেওয়া হয়। এই অঞ্চলে প্রায় প্রত্যেক গ্রাম্য্য শিবমন্দিরের আঙ্গিনার মধ্যেই ‘ভৈরব থান’ নামক একটি স্থান আছে। আধুনিক কালে ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণের প্রভাববশত অনেক স্থলে শিবের সম্মুখে পশুবলি না দিয়া এই ভৈরব থানে আনিয়া পশুবলি দেওয়া হয়। তামিল দেশেও হিন্দুপ্রভাববশত বর্তমানে গ্রাম্য দেবতাদিগের সম্মুখে পশুবলি দিবার প্রথা প্রায় উঠিয়া গিয়াছে। তথাপি তাঁহাদের সম্মুখে একটি পর্দা টানিয়া দিয়া তাঁহাদের আবরণ-দেবতাদিগের উদ্দেশ্যে এখনও পশুবলি দেওয়া হইয়া থাকে। বাংলাদেশে ভৈরব শিবের আবরণ-দেবতার স্থান গ্রহণ করিয়াছেন। বীরভূম জেলার বারমল্লিকা, পাইকর, দক্ষিণ গ্রাম প্রভৃতি গ্রামে এখনও শিবের সম্মুখেই প্রতি বৎসর পশুবলির ব্যবস্থা করা হয়। শিবচরিত্রের এই অভিনব পরিচয় কেবলমাত্র পৌরাণিক শিবধর্মের যে বিরোধী তাহা নহে, ইহা বাংলাদেশের আর কোন অঞ্চলে দৃষ্টিগোচর হয় না।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৪৬)

         পণ্ডিতদের মতে, ব্রাহ্মণ্যধর্ম এ দেশে প্রচার লাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের বহু উপাদান এসে লৌকিক শৈবধর্মের সঙ্গে মিশ্রিত হতে শুরু করে। পৌরাণিক শিবের পরিকল্পনাও বুদ্ধদেবের চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত, তাই বাংলার তদানীন্তন বৌদ্ধ সমাজ শিবের চরিত্রের মধ্যেই নিজেদের আদর্শের সন্ধান পেয়েছিল। জৈন তীর্থঙ্করদের জীবনাদর্শ গৌতম বুদ্ধ ও পৌরাণিক শিব থেকে বিশেষ স্বতন্ত্র নয়, এজন্যেই কালক্রমে তদানীন্তন বাংলার বিরাট বৌদ্ধ ও জৈন সমাজ নিজেদের ধর্মীয় উপকরণ দ্বারা এদেশের শৈবধর্মকে অভিনবরূপে পুনর্গঠন করে নিয়েছিল। বাংলাদেশের তদানীন্তন আরেকটি ব্যাপক প্রচলিত ধর্ম নাথধর্ম। শৈব কিংবা বৌদ্ধধর্মের বাইরে এর উদ্ভব হলেও শৈবধর্মের ব্যাপক প্রসারবশত কালক্রমে তার মধ্যে দিয়েও শৈবধর্মের উপকরণরাশি প্রকাশ লাভ করেছে। কালক্রমে নাথসিদ্ধাগণও শিবকে গুরু বলে স্বীকার করে নিলেন। ক্রমে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, নাথ ও অনার্য– এসব ধর্মমত থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে বাংলার লৌকিক শৈবধর্ম এক অভিনব সঙ্কর রূপ পরিগ্রহ করেছে।
বিভিন্ন আদর্শ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে নিজস্ব ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তির উপর নাথধর্ম যে কিভাবে শিবচরিত্রের পরিকল্পনা করেছিল, ইতঃপূর্বের নাথ-সম্প্রদায় প্রসঙ্গের আলোচনায় আমরা তার লৌকিক পরিচয় পেয়েছি।
পশ্চিমবঙ্গের একটি লৌকিক দেবতা ধর্মঠাকুরের নামে এককালে এক বিস্তৃত সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে যেভাবে শিবচরিত্রের অদ্ভুত পরিকল্পনা করা হয়েছে, শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের বয়ানে তা উপস্থাপন করা হলো :

          ‘ধর্মঠাকুরের ঘর্ম হইতে আদি জননী আদ্যাশক্তির জন্ম হইল। আদ্যাশক্তিকে গৃহে রাখিয়া ধর্ম বল্লুকা নদীতীরে তপস্যা করিতে গেলেন। দীর্ঘ চৌদ্দ বৎসর ব্যাপিয়া তিনি তপস্যায় নিমগ্ন রহিলেন। তারপর তাঁহার বাহন উলুকের কথায় তিনি তপস্যা ত্যাগ করিয়া গৃহে আদ্যাশক্তির সংবাদ লইতে গেলেন। এদিকে আদ্যাশক্তি যৌবনপ্রাপ্ত হইয়াছেন দেখিয়া ধর্মঠাকুর তাঁহার বরের সন্ধানে পুনরায় বহির্গত হইলেন্ গৃহমধ্যে এক পাত্রে মধু ও আর এক পাত্রে বিষ রাখিয়া গেলেন। ক্রমে যৌবন-ভার আদ্যার অসহ্য হইয়া উঠিল। তিনি দেহত্যাগের সঙ্কল্প করিয়া বিষ পান করিয়া ফেলিলেন, ফলে তিনি গর্ভবতী হইলেন। কালক্রমে তাঁহার গর্ভ হইতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব– এই তিন জনের জন্ম হইল। তাঁহারা জন্ম লাভ করিয়াই কারণসমুদ্রের তীরে গিয়া তপস্যায় নিমগ্ন হইলেন।
ব্রহ্মা বিষ্ণু ও শিব তিনজনই জন্মান্ধ ছিলেন, তাঁহাদিগের ভক্তি পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত ধর্মঠাকুর দুর্গন্ধ শবরূপে কারণ-জলে ভাসিতে ভাসিতে একে একে তাঁহাদের প্রত্যেকের নিকটবর্তী হইলেন,–

দুই চক্ষু অন্ধ বহ্মা যোগে বসে আছে।
ভাইসিতে ভাইসিতে পরভু গেলা তার কাছে।।
দুর্গন্ধ পাইয়া বহ্মা ভাইসিতে লাগিল।
তিন অঞ্জলি জল দিয়া ভাসাইয়া দিল।।

সেখান হইতে শব ভাসিতে ভাসিতে বিষ্ণুর সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইল,–

দুর্গন্ধ পাইয়া তবে বিষ্ণু মহাবলী।
ভাসাইয়া দিল তারে দিয়া তিন অঞ্জলি।।

এবার শব ভাসিত ভাসিতে শিবের সম্মুখে আসিয়া ঠেকিল,–

দুর্গন্ধ পাইয়া শিব ভাবে মনে মন।
কুথা নাহি কার জন্ম মরিল কুন জন।।

শিব তত্ত্বজ্ঞ; তিনি বুঝিতে পারিলেন, ইহা নিরঞ্জনের মায়া ব্যতীত আর কিছুই নহে; কারণ, কোথাও কাহারও তখন পর্যন্ত জন্মই হয় নাই, অতএব শবগন্ধ কোথা হইতে আসিবে?

দু’হাতে ধরিআ মড়া তুলিয়া লইল।
দুর্গন্ধিত শব লএ শিব নাচিতে লাগিল।।
পচা গন্ধ মড়া হএ আইলা নারাঅন।
চিনিতে নারিল আহ্মার ভাই দুইজন।।

ধর্মঠাকুর সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে তিনটি চক্ষু দান করিলেন,–

শ্রীধর্ম বলে তুহ্মি আহ্মারে চিনিলে।
দুহি চক্ষু অন্ধ ছিল ত্রিলোচন হইলে।।

       সংস্কৃত পুরাণাদিতে শিবের ত্রিলোচন হইবার কারণের উল্লেখ আছে, পুরাণ-বহির্ভূত এখানে এই আর একটি স্বতন্ত্র কারণের পরিচয় লাভ করা গেল।
কিন্তু শিব কেবলমাত্র নিজের দৃষ্টিশক্তি লাভ করিয়াই সন্তুষ্ট হইলেন না, তিনি ধর্মঠাকুরের নিকট প্রার্থনা করিলেন–

আর এক নিবেদন করি নারাঅনে।
চক্ষুদান দেহ তুহ্মি ভাই দুহিজনে।।
এত শুনি পরাৎপর বলে ত্রিলোচনে।
তব মুখামৃতে চক্ষু পাইবে দুহিজনে।।
মুখর অমৃত দিয়া দোহার চক্ষু দিল।
অমৃত পাইয়া দুহার দিব্য চক্ষু হইল।।

        ব্রহ্মা ও বিষ্ণু শিবের অনুগ্রহে দৃষ্টিশক্তি লাভ করিয়া আদ্যাশক্তি ও ধর্মঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য চলিলেন। ধর্মঠাকুর ব্রহ্মাকে সৃষ্টির, বিষ্ণুকে পালনের ও শিবকে জগৎ ধ্বংসের কার্যে নিয়োজিত করিলেন। তিনি আদ্যাশক্তিকে জীবজন্মের জন্য মনোনিবেশ করিতে আদেশ করিলেন। তাহার উত্তরে আদ্যাশক্তি বলিলেন, আমি অযোনি-সম্ভবা, আমি কি করিয়াই বা কাহাকে বিবাহ করিব? ধর্মঠাকুর বলিলেন, ‘জন্মজন্মান্তরে শিব তোমাকে বিবাহ করিবে, তাহার ঔরসেই তোমার গর্ভে প্রজাসৃষ্টি হইবে।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৪৮-৫০)

       মধ্যযুগের অন্যতম মঙ্গল-সাহিত্য চণ্ডীমঙ্গলেও অনুরূপ সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে। বাংলার এসব লৌকিক আখ্যান কালক্রমে কতকগুলি অর্বাচীন সংস্কৃত পুরাণেও গিয়ে স্থানলাভ করেছিল। এগুলোর মধ্যে ‘ব্রহ্মবৈবর্র্তপুরাণ’ ও ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণ’ উল্লেখযোগ্য।
একটি প্রাগৈতিহাসিক লৌকিক ধর্মানুষ্ঠান কালক্রমে এদেশে কোন কোন অঞ্চলে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিল,– যা গাজন নামে পরিচিত। শৈবধর্ম প্রভাবিত অঞ্চলে তা শিবের গাজন, ধর্মঠাকুর প্রভাবিত অঞ্চলে তা ধর্মের গাজন ও লৌকিক বৌদ্ধধর্ম প্রভাবিত অঞ্চলে তা আদ্যের গাজন নামে পরিচিত। কোন কোন অঞ্চলে তা নীলের গাজন নামেও কথিত হয়। কেউ কেউ তাকে দেউল পূজা বলেও উল্লেখ করে থাকেন। ভারতের মালদহে প্রায় অনুরূপ একটি অনুষ্ঠান আছে, তার নাম আদ্যের গম্ভীরা। ছোটনাগপুরের ওঁরাও মুণ্ডা জাতির মধ্যেও অনুরূপ ধর্মানুষ্ঠান প্রচলিত আছে, সেখানে এটি মাণ্ডা পরব নামে পরিচিত। উড়িষ্যার কোন কোন অঞ্চলেও এই শ্রেণির অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায়, সেখানে তার নাম সাহী যাত্রা। মহীশূরের সাত ভগিনী মারীর (বা মারী সাত ভগিনীর) বাৎসরিক উৎসবের নাম মারী যাত্রা। মাঘ মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়, তা কতকটা বাংলাদেশের গাজনের অনুরূপ।
শিবের গাজনের মধ্যে শিব-সম্পর্কিত কতকগুলি লৌকিক ছড়া আবৃত্তি করা হয়ে থাকে। সাধারণ লোকের হাতে পড়ে শিবের চরিত্র এখানেও এক অভিনব রূপ লাভ করেছে। যেমন–
‘পশ্চিমবাংলায় প্রায় সর্বত্রই যে গ্রাম্য শিবমন্দির আছে তাহার সংলগ্ন আঙ্গিনায় সাধারণত চৈত্র-সংক্রান্তির দিন এই উৎসব অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। যাহারা বিশেষভাবে পূজায় যোগ দিবার জন্য প্রতি বৎসর মানসিক বা মানত করে, তাহাদিগকে সন্ন্যাসী বলা হয়, ইহাদের মধ্যে একজন মূল সন্ন্যাসী হয়, তাহার নির্দেশেই অন্যান্য সন্ন্যাসিগণ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অঙ্গ পালন করিয়া থাকে; শিবমন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হইতে আরম্ভ করিয়া তিন দিন পর অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত শিব-সম্পর্কে কতকগুলি ছড়া আবৃত্তি করিয়া থাকে।’
‘ইহাদের মধ্যে যে শিবের ছড়া গীত হইয়া থাকে তাহাতেও শিবের কৃষক-চরিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকার লাভ করা যায়। কোন কোন গীতের বিষয়বস্তু এই– শিব কার্পাস তুলার চাষ করিয়া থাকেন। কার্পাস তুলা দ্বারা গঙ্গাদেবী সুতা কাটিয়া দেন, শিব নিজেই সেই সুতা দিয়া তাঁতে নিজের জন্য কাপড় বুনিয়া লন। আনকোরা কাপড়খানি নেতা ধোপানী ক্ষীরসমুদ্রের জলে কাচিয়া দেয়।’
‘গাজন উপলক্ষে গ্রাম্য শিবতলা হইতে ‘বড় তামাসা’র যে শোভাযাত্রা বাহির হয়, তাহাতে গাজুনে শিব নামে একখণ্ড কাষ্ঠ কিংবা প্রস্তরকে বাদ্যভাণ্ড সহকারে গ্রামান্তরের শিবতলায় লইয়া যাওয়া হয়। এই শোভাযাত্রার মধ্যে নৃত্যগীত সহকারে শিব-সম্পর্কিত বিবিধ লৌকিক গীত হইয়া থাকে। কোন কোন বিষয় অভিনীতও হয়। যেমন শিবের কৃষিকার্যের বিষয়টি কোন কোন স্থলে এইভাবে অভিনীত হইতে দেখা যায়– একজন বীজ ছড়ায়, একজন লাঙ্গল দিয়া মাটি চাষ করে, দুই ব্যক্তি হালের বলদের অভিনয় করিয়া জোয়াল কাঁধে লইয়া টানে, কোন ব্যক্তি পাকা ধান কাটিবার অভিনয় করে; তাহাতে মূল সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করে, ‘বলি শিবঠাকুর, কত ধান হ’লো?’ উক্ত ব্যক্তি তাহার একটি জবাব দেয়, ইহা হইতেই সকলে সেই বৎসরের ধান্য উৎপাদনের পরিণাম বুঝিয়া লয়।’
‘এতদ্ব্যতীত গৌরীর শঙ্খ পরিধানের একটি লৌকিক কাহিনীও এই উপলক্ষে গীত হয়। তৃতীয় দিবসে এই অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়, এই উপলক্ষে গাজুনে বাসুল বা পুরোহিত আসিয়া শিবপূজা করে, সন্ন্যাসিগণ শিব, গৌরী, ভূত, পিশাচ ইত্যাদি সাজিয়া মন্দির-প্রাঙ্গণে নৃত্য করে, তারপর বাদ্যভাণ্ড সহকারে নর্তকের দল গৃহে গৃহে ঘুরিয়া ভিক্ষা সংগ্রহ করে। কোন কোন স্থানে চড়ক হয়; চড়কের পর এই অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৫১-৫২)

         জানা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষত হুগলী, হাওড়া ও চব্বিশ পরগণা জেলার ভাগীরথীর দুই তীরে পাঁচুঠাকুর নামে এক লৌকিক দেবতা আছেন। পেঁচো নামক কোন বৃক্ষবাসী অপদেবতা থেকেই তিনি ক্রমে পাঁচুঠাকুর ও অবশেষে পঞ্চানন ঠাকুর নামে পরিচয় লাভ করে বর্তমানে শিবরূপে পূজিত হচ্ছেন। এ অঞ্চলে ভূতে পাওয়া অর্থে পেঁচোয় পাওয়া কথাটি এখনও প্রচলিত আছে বলে শোনা যায়। সংস্কৃত ও বাংলা কবিতায় এই দেবতার মাহাত্ম্যসূচক কয়েকটি কাহিনী রচিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে শিবের সঙ্গে তাঁর অভিন্নতা সম্পাদনের প্রয়াস প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়।
মোটকথায় এটুকু অন্তত বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, নাথ ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন লৌকিক ধর্মের উপাদানের উপর ভিত্তি করে এ দেশে শিবের এক অভিনব সঙ্কর-রূপ পরিকল্পিত হয়েছিল। এরকম বিভিন্নমুখী ও বিপরীতধর্মী কতকগুলো আদর্শের একত্র সংমিশ্রণের ফলে বাংলার শৈব উপাদান দ্বারা বস্তুত কোন বিশিষ্ট সাহিত্য এদেশে গড়ে ওঠতে পারেনি; তার বিভিন্ন উপাদানগুলি এমনভাবে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র যে, এদের দ্বারা কাহিনী ও আদর্শগত কোনও অখণ্ডতা সৃষ্টি সম্ভব হয়নি।

শিবের গীত :
বাংলায় একটি সুপরিচিত প্রবচন আছে– ‘ধান ভানতে শিবের গীত’। তা থেকেই এদেশে লৌকিক কোন শিব-গীতিকা’র অস্তিত্ব সম্বন্ধে একটু আভাস পাওয়া যায়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন স্থানে এই শিব-গীতিকা’র কোন কোন অংশের সঙ্গে পরিচয় লাভ করা গেলেও কিন্তু এটাই সত্য যে, সমগ্রভাবে এই গীতিকা আজ পর্যন্ত কোথা থেকেও আবিষ্কৃত হয়ে মুদ্রিত হয়নি। তবে খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত যে বাংলার সমাজে তার একটি স্বয়ং-সম্পূর্ণ রূপ বহুল প্রচলিত ছিল, সে যুগের বাংলা সাহিত্যে তার উল্লেখ থেকে এ ধারণা পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ চৈতন্যচরিতকার কবি বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার সামাজিক তথ্যরাশিতে পরিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায় (সূত্র: বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৫২)–

একদিন আসি এক শিবের গায়ন।
ডমরু বাজায়– গায় শিবের কথন।।
আইল করিতে ভিক্ষা প্রভুর মন্দিরে।
গাইয়া শিবের গীত বেঢ়ি নৃত্য করে।।
শঙ্করের গুণ শুনি প্রভু বিশ্বম্ভর।
হইলা শঙ্কর মূর্তি দিব্য জটাধর।।
এক লাফে উঠে তার কান্ধের উপর।
হুঙ্কার করিয়া বলে মুই যে শঙ্কর।।
কেহো দেখে জটা শিঙ্গা ডমরু বাজায়।
‘বোল’, ‘বোল’, মহাপ্রভু বোলয়ে সদায়।।
সে মহাপুরুষ যত শিবগীত গাইল।
পরিপূর্ণ ফল তার একত্র পাইল।।

         তা থেকেই বুঝা যায় যে, খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই শিবের গীত মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। শৈব বলে পরিচিত এক শ্রেণির ভিক্ষুক এই গীত গেয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়াতো। এই শিবের গীত সমাজের নিম্নতর স্তরের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই শিব-গীতিকা’র পূর্ণাঙ্গ রূপ কী ছিল, তা উদ্ধৃত অংশ থেকে জানা যায় না।
রংপুর জেলার কৃষকদের মধ্যে শিব সম্পর্কে কতকগুলো লৌকিক ছড়া এখনও প্রচলিত রয়েছে বলে জানা যায়। যোগিসম্প্রদায়ভুক্ত কৃষকেরাই সাধারণত এসব গান গেয়ে থাকে। ধারণা করা হয়, সেকালের সমাজে এই শ্রেণির গানই শৈব ভিক্ষুকেরা দ্বারে দ্বারে গেয়ে বেড়াতো। যেমন–

চণ্ডী বলে শুন গোঁসাই জটিয়া ভাঙ্গেড়া।
তোমার সঙ্গে আও করিলে নাগিবে ঝগড়া।।
চার ছেইলার মাও হৈলাম তোর দ্যাবের ঘরে।
দয়া করি চারখানা শাঁখা নাই পিন্ধাইস্ মোরে।।
ভাসুর আইসে শ্বশুর আইসে রন্ন আন্ধি দ্যাওঁ তারে।
আমার হাত মুড়া, গোঁসাই, তা নজ্জা নাগে তোরে।।
শিব বলে, ‘শুন চণ্ডী, দক্ষরাজার বেটি।
শাঁখা দিবার না পাইন আমি যাক বাপের বাড়ী।।’
এ কথা শুনিয়া চণ্ডী আনন্দিত মন।
নাইওর লাগিয়া চণ্ডী করিল গমন।।
কার্তিক গণেশ নিল ডাইনে বাঁয়ে সাজাইয়া।
অগ্নিপাটা শাড়ী নিল পরিধান করিয়া।।
নাইওরক নাগিয়া চণ্ডী যায় ত চলিয়া।
পালঙ্কেতে বুড়া শিব আছে শুতিয়া।।
নারদমুনি ডাকে তারে ‘মামা, মামা’ বলিয়া।
‘ওহে মামা, ওহে মামা, তুমি বড় আসিয়া।।
পাকা দ্যাড় পহর বেলা আছে পালঙ্কে শুতিয়া।
ঝগড়া নাগাইয়া চণ্ডী যায় গোসা হইয়া।।’
নারদ ভাইগ্না তাকে ডাকায় কান্দিয়া কাটিয়া।।
‘ওহে মামী, ওহে মামী, কার্তিক গণেশের মাও।
এক পাও আগাইবা যদি মামী, কার্তিকের মুণ্ডু খাও।।
ফির পা আগাইবা যদি গণেশের মুণ্ডু খাও।
ফির পা আগাইবা মামী আমার মাথা খাও।।’
নারদ ভাইগ্নার বাক্যেত মহল ফিরিয়া গেল।
মহল যাইয়া চণ্ডী মাতা কামের ব্যাখ্যা দিল।।

          উত্তরবঙ্গের প্রচলিত এরকম আরও ছড়া রয়েছে। তবে ধর্মপূজা উপলক্ষে যে গাজন হয়ে থাকে, ধর্মমঙ্গল সাহিত্যে রামাই পণ্ডিত সঙ্কলিত ‘শূন্য-পুরাণ’ গ্রন্থে তার বিবিধ অনুষ্ঠানের বর্ণনা আছে। এই গাজন উপলক্ষে শিবের চাষ বিষয়ক যে একটি অনুষ্ঠান পালন করা হয়, তা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘শূন্য-পুরাণে’ এ বিষয়ক নিম্নোক্ত ছড়াটি সঙ্কলিত হয়েছে; মনে হয়, এটিও প্রাচীন শিব-গীতিকার একটি অংশ,–

‘যখন আছেন গোসাঞি হয়া দিগম্বর।
ঘরে ঘরে ভিখা মাগিয়া বুলেন ঈশ্বর।।
রজনী পরভাতে ভিক্খার লাগি যাই।
কুথাএ পাই কুথাএ না পাই।।
হর্তুকী বএড়া তাহে করি দিন পাত।
কত হরস গোসাঞি ভিক্খাএ ভাত।।
আহ্মার বচনে গোসাঞি তুহ্মি চষ চাষ।
কখন অন্ন হএ গোসাঞি কখন উপবাস।।
পুখরি কাদাএ লইব ভূমখানি।
আরসা হইলে ছিচএ দিব পানি।।
আর সব কিষাণ কাঁদিব মাথায় হাত দিয়া।
পরম ইচ্ছায় ধান্য আনিব দাইআ।।
ঘরে অন্ন থাকিলেক পরভু সুখে অন্ন খাব।
অন্নর বিহনে পরভু কত দুঃখ পাব।।
কাপাস চষহ পরভু পরিব কাপড়।
কত না পরিব গোঁসাই কেওদা বাঘের ছড়।।
তিল সরিষা চাষ কর গোসাঞি বলি তব পাএ।
কত না মাখিব গোসাঞি বিভূতিগুলো গাএ।।
মুগ বাটলা আর চষিহ ইখু চাষ।
তবে হবেক গোসাঞি পঞ্চামর্ত্তর আশ।।
সকল চাষ চষ পরভু আর রুই ও কলা।
সকল দব্ব পাই যেন ধর্ম পূজার বেলা।।
এতেক সুবিধা হর মনে ত ভাবিল।
মন পবন দুই হেলএ সিজন করিল।।
সুনার যে লাঙ্গল কৈল রূপার যে ফাল।
আগে পিছু লাঙ্গলেতে এ তিন গোজাল।।
আগে জোতি পাশ জোতি আভদর বড় চিন্তা। (!)
দুদিগে দুসলি দিআ জুআলে কৈল বিন্ধা।।
সকল সাজ হৈল পরভুর আর সাজ চাই।
গটা দশ কুআ দিয়া সাজাইল মই।।
তাকর দুভিতে চাই দুগাছি সলি দড়ি।
চাষ চষিতে চাই সুনার পাচন বাড়ি।।
মাঘ মাসে গোঁসাই পিথিবি মঙ্গলিল।
যতগুলি ভূম পরভু সকলি চষিল’।।

         এর সাথে মৈথিল কবি বিদ্যাপতি রচিত পদের তুলনার নিমিত্তে শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য ‘বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে বিদ্যাপতির নিম্নোক্ত পদটি উদ্ধৃত করেছেন। তা থেকে বোঝা যাবে শিব সম্পর্কিত এই বিশ্বাস মিথিলা থেকে উত্তরবঙ্গ পথে বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচার লাভ করেছিল; কিংবা প্রাচীন বাংলাদেশ থেকেও তার মিথিলায় যাওয়া অসম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। বিদ্যাপতির পদটি হলো–

বেরি বেরি অরে শিব মোঞে তোকে বোলঞে
কিরিষি করিয় মন লাই।
বিনু সমরে হর ভিখিএ পত্র মাগিয়
গুণ গৌরব দূর জাই।।
নিরধন জন বোলি সবে উপহাসএ
নাহি আদর অনুকম্পা।
তোহেঁ শিব পাওল আক ধুথুর ফুল
হরি পাওল ফুল চাম্পা।।
খটগ কাটি হরে হর যে বঁধাওল
ত্রিশুল ভাঁগয় করু ফারে।
বসহা ধুরন্ধর হর লএ জোতিঅ
পাএট সুর সরিধারে।।
ভণই বিদ্যাপতি সুনহ মহেশ্বর
ই জানি কইলি তুঅ সেবা।
এতএ জেবরু সে বরু হোঅও
ওতএ সরন দেবা।।
অর্থাৎ– ‘হে শিব, বার বার তোমাকে আমি বলি, কৃষিকার্য কর; হে হর, তুমি নির্লজ্জ হইয়া ভিক্ষা মাগ, তাহাতে তোমার গুণ-গৌরব দূর হয়। নির্ধন বলিয়া সকলে উপহাস করে, সমাদর কিংবা অনুকম্পা প্রকাশ করে না; হে শিব, তুমি আকন্দ ও ধুতুরা ফুল পাইলে, হরি চাঁপা ফুল পাইল; হে হর, খট্টাঙ্গ কাটিয়া লাঙ্গল বানাও, ত্রিশূল ভাঙ্গিয়া ফাল কর। হে হর, ভাল দেখিয়া (ধুরন্ধর) বৃষ লইয়া জুতিয়া দাও, তোমার জটায় যে গঙ্গার ধারা আছে তাহা দিয়া (ক্ষেতের) পাট কর। বিদ্যাপতি বলে, শুন মহেশ্বর, এই জানিয়া তোমার সেবা করিলাম। ইহলোকে যাহা হইবার তাহা হউক, পরলোকে শরণ দিও।’

        বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলেই গাজন উৎসব প্রচলিত আছে, ইতঃপূর্বে তা বর্ণিত হয়েছে। তাতে শিব-বিষয়ক যেসব গীত গাওয়া হয়, তা সব সময়ে এক ও অভিন্ন নয়। যেমন তৎকালীন বাখরগঞ্জের (বরিশাল) একটি গীত নিম্নরূপ (সূত্র: বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৫৭)–

শিব চইলাছেন বিয়ার বেশে নারদ বাজায় বীণা।
পাড়াপড়শী দেখতে এল বিয়ার কথা শুইনা।।
টিপ্ টিপ্ ডম্বুরা বাজে শিঙায় গুন্ গুন্ করে।
খৈস্যা পড়ল মৃগ চর্ম শিব ল্যাঙটা হইয়া নাচে।।
মেনকা সুন্দরী এল জামাই দেখিবারে।
পাগলা জামাই দেখ্যা সবে আউয়া ছিয়া করে।।
কিবা আকৃতি জামাইর কিবা জামাইর রূপ।
দুইটা চক্ষু ফুট্যা রইছে পঞ্চখানি মুখ।।
না দিব গৌরারে বিয়া কার বা বাপের ডর।
ডঙ্কা মাইরা পাগল জামাই বাড়ীর বাইর কর।।

          এ সম্পর্কে শিবের বিবাহে এয়োগণের গীত, শিব-পূজার জন্য পুষ্প-চয়নের গীত, ভগবতীর শঙ্খ-পরিধান বিষয়ক গীত ও শিব-সম্পর্কে আরও বহুবিধ গীত গাওয়া হয়। তবে ভগবতীর শঙ্খ-পরিধানের কাহিনীটি বাংলার সর্বত্র প্রচলিত। রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে যেভাবে প্রচলিত আছে ইতঃপূর্বে তা উল্লেখ করা হয়েছে। তার সাথে বরিশাল অঞ্চলে প্রচলিত নিম্নোক্ত গীতটি তুলনা করে দেখা যেতে পারে (সূত্র: বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৫৭)–

শঙ্খ পরিতে গৌরাইর মনে বড় সাধ।
করযোড়ে কন কথা শিবের সাক্ষাৎ।।
‘বৃদ্ধ হইয়াছি গৌরাই কখন যেন মরি।
কিসের লাইগ্যা কর বেশ দরবার-সুন্দরী।।
কুচনী নগরে আছে তোমার বাপভাই।
সেইখানে যাইয়া পর শঙ্খ আমার কিছু নাই।।
বৃদ্ধ হইয়াছি গৌরাই আমি লড়ি করি ভর।
ভিক্ষা মাগি যাই আমি দেশ দূরান্তর।।’
নারদ বলে, ‘মামা আমার কথা রাখ।
যৌবন কালে স্ত্রীলোক নাইওর পাঠাও কেন।।’
শিব বলে, ‘শুন ভাইগ্না আমার কথা রাখ।
শঙ্খ বণিক হইয়া গৌরাইর মন বুঝিতে যাও।।’

         উপরে উদ্ধৃত শিব-বিষয়ক এসব বিচ্ছিন্ন ছড়া ও গীতিকা ছাড়াও অধিকাংশ মঙ্গলকাব্যেরই সূচনায় সুসংবদ্ধ শিব-কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। শিব সম্পর্কিত ছড়া ও বিবিধ লোক-গীতিকা থেকে প্রধানত উপাদান সংগ্রহ করে তার সাথে পৌরাণিক উপাদান মিশ্রিত করে অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিষয়ক মঙ্গলকাব্যের মধ্যে এই শিব-কাহিনী সংকলিত হয়েছিল। শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের ভাষ্যে–
‘শৈবধর্মের ধ্বংসস্তুপের উপর যেমন পরবর্তী লৌকিক ধর্মের দেউল গড়িয়া উঠিতেছিল, তেমনিই শিব-কাহিনীর উপরই সেই সকল লৌকিক দেবতার কাহিনীমূল প্রতিষ্ঠিত হইতেছিল। কেবল লৌকিক দেবতার কাহিনীমূলেই যে শিব-কাহিনী বর্ণিত হইত, তাহা নহে– সমাজে এই শিব-গীতিকার প্রভাব এত ব্যাপক হইয়া পড়িয়াছিল যে, কৃত্তিবাস-রচিত রামায়ণ-কাব্যের মূল কাহিনীর সঙ্গে নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে আনিয়া শিব-কাহিনী যুক্ত করা হইয়াছে। তৎকালীন বাংলার সমাজে একমাত্র সুপ্রতিষ্ঠিত দেবতাই ছিলেন শিব। সেইজন্য লৌকিক দেবতাগণও সমাজে আত্মপ্রতিষ্ঠা করিতে গিয়া শিবের সঙ্গে একটা সম্পর্কের কল্পনা করিয়া লইতেন।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৫৮)
তবুও আনুপূর্বিক শিব-কাহিনী নিয়ে অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালে কয়েকটি শিব-মঙ্গল কাব্যও রচিত হয়েছিল।

শিবমঙ্গল কাব্য :
পৌরাণিক ও লৌকিক উপাদান মিশ্রিত করে শিবমঙ্গল-কাব্যগুলিতে যে কাহিনীটি সাধারণত পরিকল্পিত হয়েছিল, শ্রী আশুতোষ ভট্টচার্যের ভাষ্যে তা এরূপ–

         ‘একদিন সমবেত দেবতাদিগের সভায় শিব তাঁহার শ্বশুর দক্ষ প্রজাপতিকে কোন সম্মান দেখাইলেন না; এই অপমানের প্রতিশোধ লইবার জন্য দক্ষ এক যজ্ঞের আয়োজন করিলেন; তাহাতে সকল দেবতা নিমন্ত্রিত হইলেন, দক্ষ কেবলমাত্র শিবকে নিমন্ত্রণ করিলেন না। পিতৃগৃহে যজ্ঞের কথা শুনিয়া সতী বিনা নিমন্ত্রণেই সেখা গিয়া উপস্থিত হইলেন। দক্ষ তাঁহার সম্মুখে শিবের নিন্দা করিতে লাগিলেন, শুনিয়া সতী দেহত্যাগ করিলেন; শিব একথা শুনিতে পাইয়া যজ্ঞস্থলে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তাঁহার অনুচরগণ যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করিয়া ভাঙ্গিয়া দিল। সতী গিরিরাজের ঔরসে মেনকার গর্ভে গৌরীরূপে জন্মগ্রহণ করিলেন। আশৈশব তিনি শিবকে পতিরূপে কামনা করিতে লাগিলেন। গিরিরাজ ভিক্ষুক শিবের সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিলেন। প্রাসাদ ত্যাগ করিয়া গৌরী স্বামীর সঙ্গে কুটীরে আসিয়া প্রবেশ করিলেন। কিন্তু দিন আর কাটে না; ভিক্ষুকের ঘরের সম্বল ফুরাইয়া আসিয়াছে, নিশ্চিত অনাহার সম্মুখে। গৌরী শিবকে চাষ করিবার যুক্তি দিলেন। কিন্তু তিনি নিতান্ত অলস প্রকৃতির; সেইজন্য এই পরিশ্রমের কার্যে কোন উৎসাহ দেখাইলেন না। তিনি বলিলেন, চাষের ফল অনিশ্চিত। তিনি ব্যবসা করিতে চাহিলেন, কিন্তু তাঁহার পুঁজি কোথায়?
অগত্যা স্থির হইল তিনি চাষই করিবেন। ইন্দ্রের নিকট হইতে তিনি ভূমি পাট্টা লইলেন; বিশ্বকর্মার হাতে ত্রিশূলটি দিয়া বলিলেন, ‘ইহার লোহা গলাইয়া লাঙ্গল, জোয়াল, মই গড়িয়া দাও।’ বিশ্বকর্মা ত্রিশূল গলাইয়া চাষের সকল সরঞ্জাম গড়িয়া দিলেন। এবার বীজ ধান কোথায় পাওয়া যাইবে? শিব গৌরীকে বলিলেন, ‘কুবেরের কাছে যাও, গিয়া বীজ ধান ধার কর, ধান ঘরে উঠিলে শোধ দিব, বলিও।’ গৌরী নিজে যাইতে অস্বীকার করিলেন, অগত্যা শিব নিজেই কুবেরের নিকট হইতে বীজ ধান ধার করিয়া আনিলেন।
মাঘ মাসের শেষের দিকে খুব বৃষ্টি হইল। অনুচর ভীমকে লইয়া শিব জমি চাষ করিলেন, যথাসময়ে ধান রোপণ করা হইল, প্রচুর ধান হইল; নারদের নিকট হইতে ঢেঁকিটি ধার করিয়া আনিয়া ভীম ধান ভানিল, গৌরীর সংসারে আর অভাব রহিল না। কিন্তু শিব মর্ত্যলোকে গিয়া চাষে এমন মত্ত হইয়া পড়িয়াছেন যে, আর কৈলাসে ফিরিবার নামও করেন না। এদিকে মর্ত্যলোকে তাঁহার কতকগুলি কুচনী সঙ্গিনী জুটিয়াছে। গৌরী তাঁহাকে কৈলাসে ফিরাইয়া আনিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া পড়িলেন। কিন্তু উপায়? উঙানি মশা দিয়া পার্বতী মর্ত্যলোক ছাইয়া ফেলিলেন, মশার কামড়ে শিব অস্থির হইয়া পড়িলেন, তথাপি কৈলাসে ফিরিবার মন নাই; পার্বতী এবার ডাঁশ ও মাছি পাঠাইলেন; সর্বাঙ্গে ঘৃত মাখিয়া শিব তাহাদের কামড় হইতে অব্যাহতি লাভ করিলেন; তারপর জোঁকের উপদ্রব আরম্ভ হইল; তথাপি শিব পার্বতীর প্রতি উদাসীন, কৃষিকার্যে মত্ত হইয়া আছেন।
অবশেষে পার্বতী বাগ্দিনীর রূপ ধারণ করিয়া শিবের কৃষিক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। শিবের ক্ষেতে তিনি মাছ ধরিতে লাগিলেন; তাহাতে ছড়া হইতে ধান ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। তথাপি বাগ্দিনীকে শিব কিছু বলিলেন না; বরং তাহার রূপে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব করিলেন– বিবাহ করিলে তিনি ক্ষেতের জল সেচিয়া বাগ্দিনীকে মাছ ধরিতে সাহায্য করিবেন। শিব বাগ্দিনীকে খুশী করিবার জন্য ক্ষেতের জল সেচিয়া মাছ ধরিতে লাগিলেন। বাগ্দিনী শিবের নিকট হইতে একটি পিতলের অঙ্গুরী চাহিয়া লইলেন। শিব এইবার বাগ্দিনীর নিকট আলিঙ্গন প্রার্থনা করিলেন; আলিঙ্গন দিবার ছলনা করিয়া বাগ্দিনী কৈলাসের পথে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, শিব তাঁহার পশ্চদনুসরণ করিতে লাগিলেন, বাগ্দিনী পার্বতীরূপ ধারণ করিয়া কৈলাসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পার্বতী শিবকে গৃহে প্রবেশ করিতে নিষেধ করিলেন, কারণ, তিনি বাগ্দিনীর প্রেমপাশে আবদ্ধ হইয়া তাহাকে অঙ্গুরী উপহার দিয়াছেন; শিব অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন, চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন। এমন সময় নারদ আসিয়া উপস্থিত হইলেন, পার্বতী তাঁহার কাছে স্বামীর ব্যভিচারের কথা জানাইলেন। ঝগড়া আরও পাকা করিবার জন্য নারদ পার্বতীকে পরামর্শ দিলেন, ‘স্বামীর কাছে একজোড়া শাঁখা চাও, শাঁখা পরিলে স্বামী চিরদিন বশ থাকিবে।’ পার্বতী শিবের নিকট শাঁখা পরিবার অভিলাষ জানাইলেন। কিন্তু শিব ভিক্ষুক, তিনি স্ত্রীর শাঁখা কি করিয়া জোগাইবেন? এক বিপদের উপর আর এক বিপদ দেখা দিল। তিনি ভাবিয়া কোন কূল পাইলেন না।
অভিমানে পার্বতী পিতৃগৃহে চলিয়া গেলেন। পিতৃগৃহে তখন দুর্গোৎসব। নারদ শিবকে পরামর্শ দিলেন, ‘পার্বতীকে যদি ফিরাইয়া আনিতে চাও তবে শাঁখারী সাজিয়া হিমালয়ে যাও, নিজে তাঁহার হাতে শাঁখা পরাইয়া তাঁহাকে ঘরে লইয়া আস।
শিব অগত্যা তাহাই করিলেন, শাঁখারীর বেশ ধরিয়া তিনি হিমালয় যাত্রা করিলেন। শাঁখা দেখিয়া পার্বতীর আহ্লাদের আর সীমা রহিল না। শাঁখার মূল্য জিজ্ঞাসা করায় শিব বলিলেন, ‘ইহার মূল্য আত্মসমর্পণ।’ পার্বতী শিবকে চিনিলেন; তিনি দশ হাত বাড়াইয়া দিলেন, শিব নিজের হাতে তাহাতে শাঁখা পরাইয়া দিলেন। পার্বতীর অভিমান দূর হইল। তাঁহারা কৈলাসে ফিরিয়া আসিলেন।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৫৮-৬০)

            উল্লিখিত কাহিনী থেকে একটি বিষয় সহজেই লক্ষ্য করা যায় যে, তার মধ্যে চরিত্র ও ঘটনাগত ঐক্য বড় একটা নেই। ফলে এর প্রধান চরিত্রগুলি বর্ণিত ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে স্বাভাবিক পরিণতির পথে অগ্রসর হতে পারেনি। কিভাবে? নাগাধিরাজ হিমালয়ের জামাতা ত্রিলোকেশ্বর শিব বিবাহের অব্যবহিত পরই এমন অন্নকষ্টে পড়লেন যে তা দূর করার জন্য তাঁকে স্বয়ং কৃষিকার্যে প্রবৃত্ত হতে হলো। কৃষিকার্য করতে করতেই তিনি কুচনী সঙ্গিনীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করতে লাগলেন। তারপর একদিন এক বাগ্দিনীকে দেখে তারই প্রণয়-পাশে আবদ্ধ হয়ে পড়লেন। অবশেষে একদিন শিব শাঁখারী সেজে শাঁখা বিক্রয় করতে চললেন। বলা বাহুল্য, এসব ঘটনা পরস্পর সামঞ্জস্যহীন; এ কারণে তা থেকে শিবের চরিত্রগত ঐক্যের সন্ধান দুষ্কর হয়ে উঠেছে। শিব চরিত্রের এই স্বতন্ত্র গুণগুলির উদ্ভবের ইতিহাসও যে স্বতন্ত্র তাও সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের অভিমত হলো–
‘বাংলার বিভিন্ন লৌকিক সংস্কার হইতে বিভিন্ন কালে পরস্পর স্বাধীনভাবে বিভিন্ন স্থানীয় (local) দেবতার পরিকল্পনা করা হইয়াছিল। পরবর্তী কালে যখন এ’দেশের বিভিন্ন লৌকিক ধর্মসংস্কারগুলি এক হিন্দুধর্মের বিরাট পক্ষছায়ায় আসিয়া সমবেত হইল, তখণই পৌরাণিক ও এই সকল লৌকিক বিভিন্ন দেব-কল্পনার মধ্যে একটা ঐক্যের সন্ধান করিয়া লইবার প্রসায় দেখা গিয়াছিল, তাহারই ফলে পৌরাণিক শিব কৃষক, লম্পট, শাঁখারী এই সকল বিভিন্ন দোষ-গুণের সহিত সংমিশ্রণ লাভ করিলেন। এই সকল স্বতন্ত্র উপকরণের একত্র সংমিশ্রণের ফলে বাংলা শৈব সাহিত্য একটি নিজস্ব সুসমঞ্জস সাহিত্য-বস্তুতে পরিণতি লাভ করিতে পারে নাই।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৬০)
শিবমঙ্গলকাব্যের কাহিনীগত এই অসংলগ্নতার রহস্য সন্ধান করলে এই ধারণা অমূলক মনে হবে না যে, শিব সম্পর্কিত এসব পুরাণ-বহির্ভূত কাহিনী বহুকাল থেকেই এ’দেশের সমাজে প্রচলিত ছিল এবং শিবমঙ্গলকাব্যগুলিতে তা-ই উপজীব্য করা হয়েছে। আমরা মঙ্গলকাব্য রচনার যুগের এরকম কিছু কাব্য-নমুনা যাচাই করে নিতে পারি। যেমন, খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে শিবমঙ্গলের অন্যতম কবি রামকৃষ্ণ রায় তাঁর কাব্যকে সর্বত্র ‘শিবায়ন’ অথবা ‘শিবের মঙ্গল’ বলে উল্লেখ করেন। শিবের লৌকিক চরিত্রের উল্লেখ এই কাব্যে তত প্রাধান্য লাভ না করলেও শিবের বিবাহ, হরগৌরীর কোন্দল প্রভৃতির বিষয় বর্ণনায় বাঙালির গার্হস্থ্য জীবন অপূর্ব বাস্তব রূপ নিয়ে ফুটে উঠেছে। হর-গৌরীর কোন্দলের বর্ণনায় নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের চিরন্তন দারিদ্র্যের চিত্রই অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে–

শয়নে তোমার পাশে নিদ্রা নাহি হয় ত্রাসে
জটায় জলের কুলকুলি।
সাপের ফোঁস ফাঁস শুনি সাত পাঁচ মনে গুণি
পালাইতে পরম আকুলি।।
হস্ত পদ যদি নাড়ি চামড়ার খড় খড়ি
শয্যে সাপ করে ইলিমিলি।
এমত সুখের শয্যা ইতে পতি পরিচর্যা
যদি করে নারী তারে বলি।।
ভোলানাথ, আমি যেই তেঁই সে সম্বরি।
অন্যে সহে হেন তাপ স্বামীরে বলিয়া বাপ
পলাইত হৈয়া দিগম্বরী।।
ধ্যানে যদি পাও সুখ ক্ষণপ্রায় যায় যুগ
বলদের না মিলে আহার।
জিয়ে পরমায় বলে ক্ষীরগুণে নাহি চলে
ভৃঙ্গি দেখ অস্থিচর্ম সার।।
যাও যদি ভিক্ষাটন ঘর হয় পাশরণ
কোচের নগরে নাটগীত।
কোচিনী ভুলাও তালে নাগরালি বুড়াকালে
লোকমুখে শুনি বিপরীত।।
উদয় করিতে ভানু কার্তিক পাতিয়া জানু
খাইবার চাহে ছয় মুখে।
গণেশ তুলিয়া শুণ্ড ধায় প্রসারিয়া তুণ্ড
নন্দি নিত্য আছে শোষে ভোখে।।
বড়াই না কর বালু পাঁচ বর্ণে আন চালু
পাঁচ মুঠা বাঁটিতে না আঁটে।
মায়ে পোয়ে ঝুলি ঝাড়ি পাই কড়া দশ কড়ি
সেন কাণা নাহি চলে হাটে।।

          দারিদ্র্য-পীড়িত সংসারের গৌরবহীন গৃহিণীপদে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিষয়বুদ্ধিহীন স্বামী নিয়ে এ দেশের নারীরা যে কিভাবে সুখদুঃখের দিন যাপন করে থাকে, রামকৃষ্ণের পার্বতী-চরিত্রের ভিতর দিয়ে তারই পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে আরেক শিবমঙ্গলের কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য পার্বতীর গৃহস্থালী বর্ণনায় একটি দরিদ্র বাঙালি পরিবারের এমন সুন্দর আলেখ্য চিত্রিত করেছেন, যেখানে দেব-চরিত্রগুলি দেবত্ব-বর্জিত হয়ে সাধারণ লোভক্ষুধাতুর মনুষ্যরূপে প্রকাশিত হয়েছে। শিবের ভিক্ষালব্ধ তণ্ডুল রন্ধন করে পার্বতী উপবাসী স্বামিপুত্রকে পরিবেশন করছেন, এবং এখানে একটি অসচ্ছল গার্হস্থ্য জীবনের বাস্তবচিত্র অঙ্কনের নৈপুণ্যই প্রকাশ পেয়েছে–

তিন ব্যক্তি ভোক্তা একা অন্ন দেন সতী।
দুটি সুতে সপ্তমুখ পঞ্চমুখ পতি।।
তিন জন একুনে বদন হইল বার।
গুটি গুটি দুটি হাতে যত দিতে পার।।
তিন জনে বার মুখ পাঁচ হাতে খায়।
এই দিতে এই নাই হাঁড়ি পানে চায়।।
দেখি দেখি পদ্মাবতী বসি একপাশে।
বদন বসন দিয়া মন্দ মন্দ হাসে।।
সুক্ত খেয়ে ভোক্তা চায় হস্ত দিয়া শাকে।
অন্ন আন অন্ন আন রুদ্র মূর্তি ডাকে।।
কার্তিক গণেশ ডাকে অন্ন আন মা।
হৈমবতী বলে বাছা ধৈর্য হয়ে খা।।
মুষগ মায়েল বোলে মৌনে হয়ে রয়।
শঙ্কর শিখায়ে দেয় শিখিধ্বজ কয়।।
হাসিয়া অভয়া অন্ন বিতরণ করে।
ঈষদুষ্ণ সুপ দিল বেশরির পরে।।
শঙ্কর বলেন শুন নগেন্দ্রের ঝি।
সুপ হইল সাঙ্গ আন আর আছে কি।।
দড় বড় দেবী এনে দিল ভাজা দশ।
খেতে খেতে গিরিশ গৌরীর গান যশ।।

         আরও বিভিন্ন শিবমঙ্গল কবিরা লৌকিক শিব ও পার্বতীকে নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন যদিও, তবু পণ্ডিতদের মতে, পরবর্তী বাংলার সমাজে লৌকিক শৈব ধর্ম নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের ভাষ্যে–
‘ক্রমে বাংলার হিন্দু সমাজে লৌকিক শিবের প্রাধান্য একেবারেই লোপ পাইতে আরম্ভ করিল। বাঙ্গালীর নৈতিক জীবনের যে স্তর হইতে লৌকিক শিবের জন্ম হইয়াছিল, তাহা হইতে বাঙ্গালীর সামাজিক জীবন ক্রমে অনেক ঊর্ধ্বে আসিয়া উপনীত হইল। সেইজন্য বাংলার প্রাচীনতম সমাজ হইতে জাত দেবচরিত্রসমূহ পরবর্তী বাংলার উন্নততর সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা অক্ষুণ্ন রাখিতে সমর্থ হইল না। ইতিমধ্যে সমাজের সকল স্তরে বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব কার্যকর হইতে আরম্ভ করিয়াছে। তাহার ফলে শিবের পার্শ্বে নারায়ণের সিংহাসন স্থাপিত হইয়া গিয়াছে। অতএব শিবকেও তখন এই পুরাণাগত নারায়ণের সমমর্যাদায় উন্নীত করিতে গিয়া তাঁহা হইতে লৌকিক চরিত্র-কল্পিত সর্ববিধ গ্রাম্য উপকরণ পরিত্যক্ত হইতে লাগিল। ক্রমে যুগোচিত সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শে হরি ও হর সম্মিলিত রূপেও আত্মপ্রকাশ করিতে লাগিলেন। খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতচন্দ্র রায় রচিত ‘অন্নদা-মঙ্গলে’র শিবকাহিনী এই আদর্শেই রচিত। ইহার মধ্যে শিবের প্রাচীনতম লৌকিক এবং মধ্যযুগের তথাকথিত পৌরাণিক এই উভয় চিত্রেরই ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদা-মঙ্গলো’ক্ত শিব-কাহিনীতে কতকগুলি শৈব ও বিষ্ণুমাহাত্ম্যসূচক পুরাণের আখ্যানই অনুকীর্তিত হইয়াছে। ইহার মধ্যে বিভিন্ন আদর্শোদ্ভুত দেব-চরিত্রগুলির মধ্যে ঐক্যসন্ধান করিয়া সর্বধর্মসমন্বয়-চেষ্টার কল্যাণাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হইতে দেখা যায়। তাহাতে এই কথাই বলা হইয়াছে যে, যে-অবিশ্বাসী এক দেবতায় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করিয়া অপর দেবতার অবহেলা করে তাহার কোনও দেবতার পূজাই সার্থক হয় না।’– (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৯৩-৯৪)
আমরা দেখি, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদা-মঙ্গলে’ বিষ্ণুভক্ত ব্যাসকে শিব-নিন্দার জন্য বিষ্ণুই তিরস্কার করে বলছেন–

যেই শিব সেই আমি যে আমি সে শিব।
শিবের করিলা নিন্দা কি আর বলিব।।
শিবের প্রভাব বলে আমি চক্রধারী।
শিবের প্রভাব হৈতে লক্ষ্মী মোর নারী।।
শিবের যে নিন্দা করে আমি তারে রুষ্ট।
শিবের যে পূজা করে আমি তারে তুষ্ট।।

         শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, বাংলার যে মঙ্গল কাব্য শিবের সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে উচ্ছেদ করার জন্যেই সর্বপ্রথম উদ্ভুত হয়েছিল, পরিণামে তা এই শিবকেই এক স্বতন্ত্র রূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস থেকে বিদায় নিলো।

(চলমান)

[পূর্বের পোস্ট : ‌শৈব তন্ত্র, শিব ও শক্তি] [*] [#]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 484,150 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 128 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

নভেম্বর 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 7 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: