h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-৯/১০ : দশনামী সম্প্রদায়

Posted on: 04/11/2019


images-dashnam
শিব ও লিঙ্গ-৯/১০ : দশনামী সম্প্রদায়
রণদীপম বসু

এমন প্রবাদ আছে যে, পূর্বে সন্ন্যাস-ধর্ম বহুকাল প্রচলিত ছিল, মধ্যে রহিত বা দুর্বল হয়ে যায়, পরে আচার্য শঙ্কর তা আবার প্রবলভাবে প্রবর্তিত করেন। ‘ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা, জীব ব্রহ্মময়’– এই অদ্বৈতমত প্রতিষ্ঠাকারী বিখ্যাত বেদান্তবাদী শঙ্করাচার্যই কিনা দশনামী উপাসক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, বিষয়টি আশ্চর্যেরই বটে। তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো, মাত্র বত্রিশ বছরের জীবনকালে তাঁর সৃষ্টি ও কর্মকাণ্ডের যে বিশাল ব্যাপ্তি তার মাত্রা ও পরিমাণ হতবাক করার মতোই।
শঙ্কর-জয়, শঙ্কর-দিগ্বিজয়, শঙ্করবিজয়বিলাস প্রভৃতি গ্রন্থে তাঁর চরিত-বর্ণনা আছে এবং তাঁকে নিয়ে প্রচুর জনশ্রুতি ছড়িয়ে আছে। খ্রিস্টাব্দ অষ্টম শতকের শেষ বা নবম শতকের প্রথম ভাগে শঙ্করাচার্য মলয়বর দেশের নম্বুরি ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত প্রথানুসারে আট বছর বয়সে উপনয়ন-সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি বেদাধ্যয়নে প্রবৃত্ত হন। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর শিক্ষা ও বুদ্ধির বিস্ময়কর বিকাশ ঘটতে থাকে। বারো বছর বয়সের সময় তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে, কিন্তু এতে তাঁর অধ্যয়ন থেমে থাকেনি। অল্প বয়সেই তিনি সন্ন্যাসাশ্রম অবলম্বন করে গৃহত্যাগ করেন। তারপর ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ ও সে-সময়ের প্রচলিত নানা মত খণ্ডন করে স্বীয় মত সংস্থাপন করেন। বেদান্তশাস্ত্রের প্রচার ও তত্ত্বজ্ঞান-প্রচলন-উদ্দেশে তিনি চারটি স্থানে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠিত করেন– শৃঙ্গগিরিতে শৃঙ্গগিরি মঠ, দ্বারকায় সারদা মঠ, শ্রীক্ষেত্রে গোবর্ধন মঠ ও বদরিকাশ্রম অঞ্চলে জ্যোসী মঠ। এ প্রসঙ্গে মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের অভিমত হলো–
‘নির্গুণ উপাসনা প্রকাশ করা ঐ সমস্ত মঠ-স্থাপনের প্রধান প্রয়োজন তাহার সন্দেহ নাই; কিন্তু একটি বিশেষ দেখিতেছি, সগুণ অর্থাৎ সাকার দেবতার উপাসনায় তাঁহার কিছুমাত্র বিদ্বেষ ছিল না। ঐ সমস্ত মঠ সাকার-বাদীদের তীর্থস্থানেই প্রস্তুত ও মঠ বিশেষে সাকার দেবতাবিশেষের প্রতিমূর্তিও প্রতিষ্ঠিত করা হয়।’–(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-১৪)
যেমন, আনন্দগিরি-কৃত শঙ্করদিগ্বিজয় গ্রন্থে বলা হয়েছে–

শৃঙ্গপুরসমীপে তুঙ্গভদ্রানদীতীরে চক্রং নির্ম্মায় তদগ্রে সরস্বতীং নিঘায় এবমাকল্পং স্থিরাভব মদাশ্রমে ইত্যাজ্ঞাপ্য নিজমঠং কৃত্বা তত্র দেব্যাঃ পীঠনির্ম্মাণং কৃত্বা ভারতীসম্প্রদায়ং নিজশিষ্যাঞ্চকার। –(শঙ্করদিগ্বিজয়)
অর্থাৎ : তুঙ্গভদ্রা-নদীতীরে শৃঙ্গপুরের নিকটে চক্র নির্মাণ করিয়া তাহার সম্মুখে সরস্বতীদেবীকে প্রতিষ্ঠিত করিলেন, এবং বলিলেন, “কল্পান্ত পর্যন্ত আমার আশ্রমে অবস্থিতি কর।” পরে নিজ মঠ নির্মাণ ও তাহাতে দেবীর পীঠ প্রস্তুত করিয়া ভারতী নামক শিষ্য-সম্প্রদায় প্রবর্তিত করিলেন।

        লিখিত আছে, শঙ্করাচার্যের শিষ্যেরা তাঁর আদেশানুসারে নানা দেশে ভ্রমণ ও সেখানকার পণ্ডিতদের সাথে বিতর্ক-বিচারে অবতীর্ণ হয়ে শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি সাকার দেবতার উপাসনা প্রচার করেন। যেমন–

এবমশেষদিগ্বিজয়ং কৃত্বা তত্তদ্দেশস্থান্ কাংশ্চিত্ পঞ্চাক্ষরিহামন্ত্ররাজ্যে পদেশাদিনা তন্মতাবলম্বিনঃ করোতি পরমতকালানলঃ শঙ্করচার্য্যশিষ্যঃ। –(আনন্দগিরি-কৃত শঙ্করদিগ্বিজয়)
অর্থাৎ : শঙ্করাচার্যের শিষ্য পরমতকালানল অশেষরূপে দিগ্বিজয় করিয়া সেই সেই দেশের অনেক লোককে পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের উপদেশ দ্বারা শৈবমতাবলম্বী করিতে থাকেন।

        এভাবে দিবাকর আচার্য দ্বারা সৌর-মত, ত্রিপুর-কুমার দ্বারা শাক্ত-মত, গিরিজাপুত্র দ্বারা গাণপত্য-মত ও বটুকনাথ দ্বারা ভৈরব-উপাসনা প্রচারিত হয় বলে লিখিত আছে। তাঁরা সবাই পরম গুরু শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তাঁর প্রধান চার শিষ্য হলেন– পদ্মপাদ, হস্তামলক, মণ্ডন ও তোটক। পদ্মপাদের দুই শিষ্য– তীর্থ ও আশ্রম। হস্তামলকের দুই শিষ্য– বন ও অরণ্য। মণ্ডনের তিন শিষ্য– গিরি, পর্বত ও সাগর। তোটকের তিন শিষ্য– সরস্বতী, ভারতী ও পুরি। এই শব্দগুলো শুনলেই অক্লেশে বোধ হতে পারে, এসব তাঁদের প্রকৃত নাম নয়, কল্পিত উপাধি-বিশেষ। লিখিত আছে, বিশেষ বিশেষ লক্ষণানুসারে এই দশ শিষ্যের তীর্থাদি দশটি নাম ও এই দশ জন থেকেই দশনামী সন্ন্যাসীদের তীর্থাদি দশ সংজ্ঞা উৎপন্ন হয়েছে। প্রাণতোষিণী-তে বলা হয়েছে–

ত্রিবেণীসঙ্গমে তীর্থে তত্ত্বমস্যাদিলক্ষণে।
স্নায়াত্তত্ত্বার্থভাবেন তীর্থনামা স উচ্যতে।।
আশ্রমগ্রহণে প্রৌঢ় আশাপাশবিবর্জিতঃ।
যাতায়াতবিনির্মুক্ত এতদাশ্রমলক্ষণম্ ।।
সুরম্যে নির্ঝরে দেশে বনে বাসং করোতি যঃ।
আশাপাশবিনির্মুক্তোবননামা স উচ্যতে।।
আরণ্যে সংস্থিতোনিত্যমানন্দনন্দনে বনে।
ত্যক্ত্বা সর্বমিদং বিশ্বমরণ্যলক্ষণং কিল।।
বাসোগিরিবরে নিত্যং গীতাভ্যাসে হি তৎপরঃ।
গম্ভীরাচলবুদ্ধিশ্চ গিরিনামা স উচ্যতে।।
বসেত্ পর্বতমূলেষু প্রৌঢ়ো যো ধ্যঅনধারণাত্ ।
সারাত্মারং বিজানাতি পর্বতঃ পরিকীর্তিতঃ।।
বসেত্ সাগরগম্ভীরো বনরত্নপরিগ্রহঃ।
মর্যাদাশ্চ ন লঙ্ঘেত সাগরঃ পরিকীর্তিতঃ।।
স্বরজ্ঞানবশোনিত্যং স্বরবাদী কবীশ্বরঃ।
সংসারসাগরে সারভিজ্ঞোয়োহি সরস্বতী।।
বিদ্যাভারেণ সম্পূর্ণঃ সর্বভারং পরিত্যজেত্ ।
দুখভারং ন জানাতি ভারতী পরিকীর্তিতঃ।।
জ্ঞানতত্ত্বেন সম্পূর্ণঃ পূর্ণতত্ত্বপদে স্থিতঃ।
পরব্রহ্মরতোনিত্যং পুরিনামা স উচ্যতে।।
–(প্রাণতোষিণী। অবধূত-প্রকরণ।)
অর্থাৎ : তত্ত্বমসি প্রভৃতি লক্ষণ-যুক্ত ত্রিবেণী-সঙ্গম-তীর্থে যিনি তত্ত্বভাবে স্নান করেন, তাঁহার নাম তীর্থ। যিনি আশ্রম গ্রহণে পারদর্শী এবং কামনা বর্জিত হইয়া জন্ম-মৃত্যু হইতে বিমুক্ত হন, তাঁহাকে আশ্রম বলা যায়। যিনি কামনা শূন্য হইয়া সুরম্য নির্ঝর-সন্নিহিত বন-স্থলে বাস করেন, তাঁহাকে বন বলে। যিনি আরণ্য-ব্রত অবলম্বনপূর্বক সমুদায় সংসার পরিত্যাগ করিয়া আনন্দ-দায়ক অরণ্য মধ্যে চিরদিন অবস্থিতি করেন, তিনিই অরণ্য। যিনি নিত্য গিরি-নিবাসী, গীতাভ্যাসে তৎপর, এবং গম্ভীর ও অবিচলিত বুদ্ধি-বিশিষ্ট, তাঁহাকে গিরি কহা যায়। যিনি পর্বত-মূলে বাস করেন, ধ্যান-ধারণা দ্বারা উন্নতি প্রাপ্তি হন, এবং সারাৎসার ব্রহ্মাকে জানেন, তিনি পর্বত নামে খ্যাত হন। যিনি সাগরের মর্যাদা-উল্লঙ্ঘনে বিরত থাকেন, তাঁহাকে সাগর বলে। যিনি স্বর জ্ঞান-বিশিষ্ট, স্বর-বাদী, কবীশ্বর ও সংসার-সাগর মধ্যে সারজ্ঞানী, তিনি সরস্বতী। যিনি বিদ্যা-ভার পরিপূর্ণ হইয়া সকল ভার পরিত্যাগ করেন, দুঃখ-ভার জানেন না, তিনিই ভারতী। যিনি জ্ঞান-তত্ত্বে পরিপূর্ণ ও পূর্ণ-তত্ত্ব-পদে অবস্থিত, এবং সতত পরব্রহ্মে অনুরক্ত, তাঁহার নাম পুরি।

        শঙ্করাচার্যের প্রতিষ্ঠিত পূর্বোক্ত চারটি মঠের মধ্যে শৃঙ্গগিরির মঠে পুরি, ভারতী ও সরস্বতীর, সারদা মঠে তীর্থ ও আশ্রমের, গোবর্ধন মঠে বন ও অরণ্যের এবং জ্যোসী মঠে গিরি, পর্বত ও সাগরের শিষ্য-প্রণালী প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রত্যেক দশনামী এর কোন না কোন মঠের ও কোন না কোন প্রণালীর অন্তর্গত। এই দশ প্রকার সন্ন্যাসীর শ্রেণির মধ্যে যিনি যে শ্রেণিতে প্রবেশ করেন, তিনি সেই শ্রেণির নাম প্রাপ্ত হন।
এই চারটি প্রধান মঠ ছাড়াও স্থানে স্থানে অন্য লোকের প্রতিষ্ঠিত অনেকগুলো মঠ রয়েছে। প্রত্যেক মঠের একেক জন অধ্যক্ষ থাকে, তাঁর নাম মোহন্ত। সেখানে শিবাদি দেবতার প্রতিমূর্তি স্থাপিত দেখা যায় এবং লোকে সেখানে এসে সন্ন্যাস গ্রহণ করে থাকে।
শতনামীরা অনেকে নিজেদেরকে নির্গুণ-উপাসক বলে পরিচয় দিলেও, তাঁদের বিভূতি প্রভৃতি শৈব-চিহ্ন-ধারণ, শিবালয়ে অবস্থান, গুরু শঙ্করাচার্যকে শিবাবতার বলে বিশ্বাস, অধিকাংশেরই প্রথমে শিব-মন্ত্র-গ্রহণ, মহিম্নঃ স্তব নামে প্রসিদ্ধ শিব-স্তোত্র-পাঠ ছাড়াও উপাসনা কার্যে পর্যাপ্তি ইত্যাদির বিবিধ বিষয় তাঁদের শিবানুরাগ ও শিবপক্ষীয়তা বিষয়ে সাক্ষ্য দান করে। তাছাড়া শাস্ত্রেও সুস্পষ্ট লিখিত আছে, মহাদেবই সন্ন্যাসীদের দেবতা–

যতীনাঞ্চ মহেশ্বর। –(সুতসংহিতা)
অর্থাৎ : মহাদেব সন্ন্যাসীদের দেবতা।

        শঙ্করাচার্যের ভাষ্যানুযায়ী বেদান্ত-চর্চা ও বেদান্ত-প্রতিপাদ্য আত্মজ্ঞান সাধনই তাঁদের মুখ্য ধর্ম। ফলতঃ দশনামীদের বিশ্বাস যে, যিনি ব্রহ্ম তিনিই শিব। শিবগীতাতে শিবের নিরাকার সাকার উভয় স্বরূপ একত্র বর্ণনা দ্বারা এ বিষয়টিই সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় বলে অক্ষয় কুমার দত্তের অভিমত। শিবগীতাতে বলা হচ্ছে–

অচিন্ত্যরূপমব্যক্তমনন্তমমৃতং শিবম্ ।
আদিমধ্যান্তরহিতম্ প্রশান্তং ব্রহ্মা কারণম্ ।।
একং বিভুং চিদানন্দমরূপমজমদ্ভুতম্ ।
শুদ্ধস্ফটিকসঙ্কাশমুমাদেহার্দ্ধধারিণম্ ।।
ব্যাঘ্রচর্মাম্বরধরং নীলকণ্ঠং ত্রিলোচনম্ ।
জটাধরং চন্দ্রমৌলিং নাগযজ্ঞোপবীতিনম্ ।।
ব্যাঘ্রচর্মোত্তরীয়ঞ্চ বরেণ্যমভয়প্রদম্ ।
পরাভ্যঅমমর্ধ্বহস্তাভ্যাং বিভ্রাণং পরশুং মৃগম্ ।।
চন্দ্রসূর্যাগ্নিনয়নং স্মেরবক্ত্রসরোরূহম্ ।
ভূতিভূষিতসর্বাঙ্গং সর্বাভরণভূষিতম্ ।।
এবমাত্মারণিং কৃত্বা প্রণবঞ্চোত্তরারণিম্ ।
জ্ঞাননির্মথনাভ্যাসাত্ সাক্ষাৎ পশ্যতি মাং জনঃ।। –(শিবগীতা)
অর্থাৎ : অচিন্ত্য, অব্যক্ত, অনন্ত, অমর, শিব-স্বরূপ, আদ্যন্ত-মধ্য-রহিত, প্রশান্ত, কারণ-স্বরূপ ব্রহ্ম, একমাত্র সর্বব্যাপী, জ্ঞানানন্দ-স্বরূপ, রূপ-বর্জিত জন্ম-রহিত, অদ্ভুত, শুদ্ধ-স্ফটিক-প্রভ উমার, অর্ধ-দেহ-ধারী, ব্যাঘ্র-চর্ম-পরিধান, নীলকণ্ঠ ত্রিলোচন জটাধর চন্দ্রমৌলি নাগ-যজ্ঞোপবীত-ধারী, ব্যাঘ্র-চর্ম-রচিত-উত্তরীয়-ধারী, বরণীয়, অভয়-প্রদাতা, দুই উৎকৃষ্ট ঊর্ধ্বহস্ত দ্বারা পরশু এবং মৃগধারী মধ্যাহ্নকালীন কোটি সূর্যের ন্যায় আভা-যুক্ত, কোটি-চন্দ্র-তুল্য সুশীতল, চন্দ্র-সূর্য-অগ্নি এই ত্রিনয়ন-বিশিষ্ট, ঈষৎ-হাস্যযুক্ত-মুখ-পদ্ম-বিশিষ্ট, সর্বাঙ্গে বিভূতি ভূষিত, এবং সর্বাভরণ-যুক্ত এইরূপ আত্মা যে আমি, আমাকে অরণি করিয়া প্রণবকে উত্তর অরণি করিয়া জ্ঞান-মন্থন পূর্বক লোকে আমারে সাক্ষাৎ দেখিতে পায়।

        উল্লিখিত দশ প্রকার সন্ন্যাসীর মধ্যে অনেকেই কেবল আপন আপন শ্রেণীর নামমাত্র ধারণ করে; স্বধর্মোচিত সাধন ও নিয়মানুষ্ঠান কিছুই করে না। অক্ষয় কুমার দত্তের মতে, তারা নিতান্ত মূর্খ; কেবল তীর্থভ্রমণ ও বিজয়া-ধূম পান করে জীবন-ক্ষেপ করে। বেদান্তানুমত তত্ত্বজ্ঞানের অনুশীলন তাদের আদি ধর্ম হলেও হতে পারে, কিন্তু পরে তারা তন্ত্র ও যোগ-শাস্ত্র অবলম্বন করে সে-অনুযায়ী অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়েছে। এই সন্ন্যাসীরা ভিক্ষোপজীবী। এরা বৈরাগীদের ন্যায় ডোর কৌপীন ধারণ করে এবং মৃত্যু হলে শব দাহ না করে মৃত্তিকার মধ্যে স্থাপন অথবা জলে মগ্ন করা হয়ে থাকে। তাকে মৃৎ-সমাধি ও জল-সমাধি বলে। এ বিষয়ে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

সন্ন্যাসিনাং মৃতং কায়ং দাহয়েন্ন কদাচন।
সম্পূজ্য গন্ধপুষ্পাদ্বৈর্নিখনেদ্বাপ্সু মজ্জয়েত্ ।। –(মহানির্বাণতন্ত্র অষ্টমোল্লাস)
অর্থাৎ : সন্ন্যাসীদের মৃতদেহ কদাচ দগ্ধ করিবে না; গন্ধ-পুষ্পাদি দ্বারা অর্চনা করিয়া মৃত্তিকার মধ্যে প্রোথিত করিবে অথবা জলে মগ্ন করিয়া দিবে।

        ভারতের কাশী, মৃজাপুর প্রভৃতি পশ্চিমোত্তর প্রদেশে কেউ কেউ একটি প্রস্তরাধারে শব সংস্থাপন করে সমাধি দিয়ে থাকে বলে জানা যায়।
দশনামী সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেকানেক ব্যক্তি অধ্যবসায়শালী ও উৎসাহবান দেশ-পর্যটকও হয়েছেন। শঙ্করাচার্য নিজে শিষ্যগণ নিয়ে ভারতভূমির দক্ষিণসীমা থেকে উত্তরাভিমুখে নানাদেশ পরিভ্রমণপূর্বক উত্তর-সীমাস্থ হিমালয়ের কেদারনাথ পর্যন্ত গিয়েছেন। এখনও অনেকে দক্ষিণে সেতুবন্ধ, উত্তরে বদরিকাশ্রম, কেদারনাথ, কৈলাস-পর্বত ও মানস সরোবর এবং পশ্চিমে বেলুচিস্থানের অন্তর্গত হিংলাজ পর্যন্ত পর্যটন করেন এবং কেউ বা তারচেও দূর দূরান্তর যাত্রা করে থাকেন।
দশনামীরা ভিন্ন ভিন্ন বৃত্তি ও সাধন অবলম্বন করে দণ্ডী, পরমহংস, অবধূত বা সন্ন্যাসী প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন উপাধি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্ত তাঁর বিখ্যাত ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় আলোচনা করেছেন। আমরা তাঁর সহায়তা নিয়ে এই দশনামীদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিষয়ে আলোকপাত করার সামান্য চেষ্টা করতে পারি।

দণ্ডী :
যাঁরা দণ্ড কমণ্ডলু সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করেন, তাঁদের নাম দণ্ডী। মাতা, পিতা, পুত্র, কন্যা ও ভার্যাবিহীন ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কারও দণ্ডী হবার অধিকার নেই। এ বিষয়ে নির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে যে, পিতা, মাতা, শিশু-পুত্র ও যুবতী ভার্যা বিদ্যমান থাকতে দণ্ড গ্রহণ করলে তা বিফল হয় ও বিষম প্রত্যবায় জন্মে,–

স্থিতায়াং যৌবনযুতকান্তায়াৎ পরমেশ্বরি।
সর্বং হি বিফলং তস্য যঃ কুর্যাদ্দণ্ডধারণম্ ।।
বিদ্যতে পিতরৌ দেবি! যঃ কুর্যাদ্দণ্ডধারণম্ ।
সন্ন্যাসং বিফলং তস্য রৌরবাখ্যং গমিষ্যতি।।
বিদ্যতে বালভাবেন যস্য কান্তা সুতস্ত্রথা।
সন্ন্যাসধারণং তস্য বৃথা হি পরমেশ্বরি।
স গুরুশ্চাপি শিষ্যশ্চ রৌরবাখ্যং প্রপদ্যতে।। –(নির্বাণতন্ত্র ত্রয়োদশ পটল)
অর্থাৎ : যুবতী ভার্যা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যে দণ্ড গ্রহণ করে, পরমেশ্বরী, তার সব বিফল হয়। পিতা মাতা বিদ্যমান থাকতে যে দণ্ড ধারণ করে, দেবী, তার সন্ন্যাস বিফল হয় এবং সে রৌরব নরকগামী হয়। শিশু-পুত্র সহ ভার্যা বিদ্যমান থাকতে যে দণ্ড গ্রহণ করে, হে পরমেশ্বরী, তার সন্ন্যাস ধারণ বৃথা। এ অবস্থায় যে গুরু শিষ্যকে দণ্ড ধারণ করান, সেই গুরু ও শিষ্য উভয়েরই নরকবাসের বিষম প্রত্যবায় জন্মে।

        অধিকারী ব্যক্তি সন্ন্যাসাশ্রম অবলম্বনে কৃত-সংকল্প হলে, কোন ভক্তি-ভাজন দণ্ডী-সন্নিধানে উপস্থিত হয়ে আত্মবাসনা অবগত করেন। সেই দণ্ডী গুরু তাঁকে সে বিষয়ে নিতান্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও যথার্থই পিতা, মাতা, ভার্যা, পুত্রাদি-বিবর্জিত জানতে পারলে যথাবিহিত উপদেশদান ও সে উদ্দেশে কতকগুলি ক্রিয়া সম্পাদন করতে প্রবৃত্ত হন। দণ্ড গ্রহণ ব্যাপারটি শিষ্যের পুনর্জন্ম বলে পরিগণিত হয়। গুরু তাঁর শরীরে ফুৎকার দিয়ে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন, অন্নপ্রাশন ও পুনঃসংস্কার করে দেন এবং দশাক্ষর মন্ত্র নামে একটি মন্ত্র উপদেশ করে থাকেন। এটি তাঁদের মূলমন্ত্র। তাঁরা এই মন্ত্র জপ করে যাবতীয় কার্য সাধন করেন। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্ত বলেন–
‘দণ্ড-গ্রহণের সময়ে শিখা ও সূত্র অর্থাৎ যজ্ঞোপবীত পরিত্যাগ করিতে হয়। একটি গুবাকের সহিত সেই শিখা ও যজ্ঞোপবীত সংযোজিত এবং ঘৃত ও মৃত্তিকাদ্বারা বিলেপিত করিয়া যথাবিধানে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। তাহা ভস্মীভূত হইলে, শিষ্য ভক্ষণ করেন। করিলে, তৎক্ষণাৎ নরনারায়ণ হইয়া উঠেন এইরূপ লিখিত আছে। এই নিমিত্তেই লোকে বলে ‘পৈতা পুড়াইয়া ভগবান্ হয়’।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-২৭)

        গুরু যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণ ও ক্রিয়া অনুষ্ঠান করে দণ্ড-কমণ্ডলু ও গেরুয়া বস্ত্রের কৌপীন প্রদান করেন। ঐ দণ্ডের এক স্থান যজ্ঞোপবীতজড়িত ও একটু গেরুয়া বস্ত্রে আবৃত থাকে। ঐ দণ্ড গাছটি দণ্ডীদের পরম পদার্থ মনে করা হয়। তাঁরা এটির উপরিভাগে মহাকালীর পূজা করেন ও সেখানে মহামায় বিদ্যমান আছেন এরূপ ভাবনা করে থাকেন। নির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

অদ্যাবধি মহামায়াং দণ্ডোপরি বিভাবয়।
কুরু পূজাং মহাকাল্যা দণ্ডোপরি হৃদা ততঃ।।
সাক্ষান্নারায়ণস্ত্বং হি ধর্মাধর্মপরোহভবঃ।
তব মাতা পিতা স্বামী সর্বং দণ্ডান্তিকে স্থিতম্ ।। –(নির্বাণতন্ত্র)
অর্থাৎ : অদ্যাবধি দণ্ডের উপর মহামায়া বিদ্যমান বলিয়া ভাবনা কর ও ঐ দণ্ডের উপরি মহাকালীর মানসী পূজা করিতে থাক। তুমি সাক্ষাৎ নারায়ণ স্বরূপ ও ধর্মাধর্মের অতীত। তোমার মাতা, পিতা, স্বামী সকলই দণ্ড-সন্নিধানে অবস্থিত।

        অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্য অনুযায়ী, দণ্ডী ও পরমহংসেরা বলেন থাকেন, দশনামীর মধ্যে তীর্থ, আশ্রম, সরস্বতী ও ভারতীর কিয়দংশ এই সাড়ে তিন শ্রেণি শঙ্করাচার্যের প্রকৃত শিষ্য সম্প্রদায়। তাঁরা শঙ্করাচার্যের প্রবর্তিত মতের অনুবর্তী থেকে যথাবিধি ধর্মানুষ্ঠান করে আসছেন। অবশিষ্ট সাড়ে ছয় শ্রেণি স্বধর্ম থেকে স্খলিত হয়ে অনেক ধরনের অনুচিত আচরণে অনুরক্ত হয়েছে।
দণ্ডীরা দণ্ড গ্রহণের সময়ে পূর্বনাম পরিত্যাগ করে একটি নতুন নাম ও উল্লিখিত তীর্থাদি চার উপাধির একটি উপাধি গ্রহণ করে থাকেন। এঁরা নির্গুণোপাসনাই মুখ্য কর্ম বলে জানেন এবং অনেকে সেজন্যে প্রণব জপ ও তার উপযুক্ত অন্য অন্য অনুষ্ঠান করে থাকেন। যাঁরা তাতে অসমর্থ বা অনধিকারী, তাঁরা শিবাদি কোন সগুণ দেবতার মন্ত্র নিয়ে তাঁর উপাসনায় প্রবৃত্ত হন। তাঁদের মহাবাক্য গ্রহণ নামে একটি ক্রিয়া আছে। উপনিষদের মধ্যে পরমাত্মার স্বরূপ-প্রতিপাদক জীবব্রহ্মের অভেদ-বোধক কয়েকটি নির্দিষ্ট বাক্য আছে; তাকে মহাবাক্য বলে। যেমন–

অয়মাত্মা ব্রহ্ম। অর্থাৎ, এই জীবাত্মা ব্রহ্ম।
অহং ব্রহ্মাস্মি। অর্থাৎ, আমি ব্রহ্ম।
তত্ত্বমসি। অর্থাৎ, তুমি সেই ব্রহ্ম।

        মহাবাক্য গ্রহণ ক্রিয়ায় তারই একটি মহাবাক্য অবলম্বন করতে হয়। এবং তার অর্থ চিন্তন করে আত্ম-জ্ঞানের অনুশীলনে প্রবৃত্ত হন। তাঁরা মস্তক মুণ্ডন, শ্মশ্রু পরিত্যাগ ও গেরুয়া বস্ত্র পরিধান এবং বিভূতি ও রুদ্রাক্ষ মালা ধারণ করে দণ্ড-কমণ্ডলু সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করে থাকেন। এরা অন্য সকল দশনামী অপেক্ষা শুদ্ধাচারী। প্রতিদিন কমণ্ডলু ও পরিধেয় বস্ত্র ধৌত করেন, সন্ধ্যাবন্দনাদি কিছু ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করেন এবং প্রতি অমাবস্যায় অথবা দুই মাস অন্তর ক্ষৌরী হয়ে থাকেন। ধাতু ও অগ্নি স্পর্শ করেন না, ফলে নিজে পাক করে খান না। কোন ব্রাহ্মণের গৃহে ভিক্ষা গ্রহণ অর্থাৎ প্রস্তুত অন্ন ভক্ষণ করেন, অথবা সঙ্গে ব্রহ্মচারী থাকে, তাঁরই হাতে ভোজন করে থাকেন। দ্বি-ভোজন, ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য জাতির অন্ন গ্রহণ ও আঙরাখা, খেল্কা প্রভৃতি সূতিবস্ত্র পরিধান তাঁদের পক্ষে বিধেয় নয়। নগরে বসতি করাও নিষিদ্ধ। নিকটবর্তী কোন স্থানে নির্জনে একাকী অবস্থিতি করাই উচিত। এই দণ্ডীদের মতো এতোটা শুদ্ধাচার পরমহংস অবধূত প্রভৃতি সন্ন্যাসীকে অবলম্বন করে চলতে হয় না। দণ্ডী-সম্প্রদায়ের আচার, ব্যবহার ও ধর্ম অনুষ্ঠান অনেকাংশে পূর্বকালীন চতুর্থ আশ্রম অর্থাৎ সন্ন্যাসাশ্রমেরই অনুরূপ। তাঁদের নিয়মাদির সাথে মনু-বচনগুলির ব্যবস্থিত নিয়মের পার্থক্য নেই। যেমন, মনুসংহিতায় সন্ন্যাসাশ্রমীদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–

আগারাদভিষ্ক্রন্তঃ পবিত্রোপচিতোমুনিঃ।
সমুপঢেষু কামেষু নিরপেক্ষঃ পরিব্রজেৎ।। –(মনু-৬/৪১)
অর্থাৎ : গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে পবিত্র দণ্ড-কমণ্ডলু-কৃষ্ণাজিন প্রভৃতি উপকরণসম্পন্ন হয়ে মৌন অবলম্বনপূর্বক সন্ন্যাসী হবে। কোন কামনার বস্তু সামনে এসে পড়লেও, তাতে নিরপেক্ষ হবে অর্থাৎ এগুলিতে আকৃষ্ট না হয়েই সন্ন্যাসগ্রহণ করবে।

অনগ্নিরনিকেতঃ স্যাদ্গ্রামমন্নার্থমাশ্রয়েৎ।
উপক্ষেকোহসঙ্কসুকো মুনি র্ভাবসমাহিতঃ।। –(মনু-৬/৪৩)
অর্থাৎ : সন্ন্যাসী লৌকিক ও শাস্ত্রীয় অগ্নি বর্জন করবে, তার কোনও আশ্রয় বা বাসস্থান থাকবে না। কেবলমাত্র ভিক্ষার্থে এক একবার গ্রামে যাবে। সকল বস্তুতেই, এমন কি কমণ্ডলু প্রভৃতি অচেতন পদার্থসমূহেও, উপেক্ষাযুক্ত হবে; সন্ন্যাসী অসঙ্কসুক অর্থাৎ স্থিরমতি হবে। সন্ন্যাসী ‘মুনি’ অর্থাৎ বাকসংযমী হবে এবং ভাবেতেও অর্থাৎ চিন্তাতেও সমাহিত বা একনিষ্ঠ হবে।

ক্লৃপ্তকেশনখশ্মশ্রুঃ পাত্রী দণ্ডী কুসুম্ভবান্ ।
বিচরেন্নিয়তো নিত্যং সর্বভূতান্যপীড়য়ন্ ।। –(মনু-৬/৫২)
অর্থাৎ : কেশ, নখ ও শ্মশ্রু কেটে ফেলে, ভিক্ষাপাত্র, দণ্ড ও কুসুম্ভ (অর্থাৎ কমণ্ডলু) ধারণ করে, কোনও জীব ও উদ্ভিদকে পীড়া না দিয়ে সংযত হয়ে সন্ন্যাসী বিচরণ করবে।

এককালং চরেদ্ভৈক্ষং ন প্রসজ্জেত বিস্তরে।
ভৈক্ষে প্রসক্তো হি যতি র্বিষয়েষ¦পি সজ্জতি।। –(মনু-৬/৫৫)
অর্থাৎ : সন্ন্যাসী প্রাণধারণের জন্য একবার মাত্র ভিক্ষান্ন ভোজন করবে, বেশি ভিক্ষা সংগ্রহ করবে না। সন্ন্যাসী যদি বেশি ভিক্ষান্ন সঞ্চয়ে আসক্ত হয়, তাহলে বিষয়েও আসক্ত হয়ে পড়তে পারে।

বিধূমে সন্নমূষলে ব্যঙ্গারে ভুক্তবজ্জনে।
বৃত্তে শরাবসম্পাতে ভিক্ষাং নিত্যং যতিশ্চরেৎ।। –(মনু-৬/৫৬)
অর্থাৎ : গৃহস্থের রান্নাঘরে রন্ধনের ধূম বন্ধ হলে, মুষলাদির কাজ (অর্থাৎ ধান ভানা ইত্যাদি) বন্ধ হলে, চুল্লির অগ্নি নিভে গেলে, ‘ভুক্তবজ্জন’ অর্থাৎ ভোজন-ক্রিয়া সম্পন্ন হলে এবং শবাব (অর্থাৎ ভোজন-পাত্র) পরিত্যক্ত হলে, দিনের অপরাহ্নভাগে সন্ন্যাসী ভিক্ষাচরণ করবে।

অলাভে ন বিষাদী স্যাল্লাভে চৈব ন হর্ষয়েৎ।
প্রাণযাত্রিকমাত্রঃ স্যান্মাত্রাসঙ্গাদ্বিনির্গতঃ।। –(মনু-৬/৫৭)
অর্থাৎ : পূর্বনির্দিষ্ট সময়ে যদি কোথাও ভিক্ষা পাওয়া না যায় তাহলে সন্ন্যাসী বিষণ্ন হবে না, আবার ভিক্ষালাভ করলেও আহ্লাদিত হবে না। যাতে কেবলমাত্র প্রাণযাত্রা নির্বাহ হয়, সেই পরিমাণ ভিক্ষা সংগ্রহ করবে। অন্যান্য ব্যবহার্য-দ্রব্যের আসক্তি থেকেও মুক্ত থাকবে।

        ইতঃপূর্বেই বলা হয়েছে, দণ্ডীরা অন্য সকল দশনামী অপেক্ষা শুদ্ধাচারী। তবে এঁরা শুদ্ধাচারী হলেও তন্ত্রের মধ্যে তাঁদের গুপ্তভাবে মদ্যমাংসাদি ব্যবহার করবার ব্যবস্থা থাকে। তাই শাক্তদের যেমন পশ্বাচারী ও বীরাচারী নামে দুটো সম্প্রদায় রয়েছে, তেমনি দণ্ডীদেরও দুটো দল রয়েছে বলে জানা যায়। একদলে মদ্যমাংসাদির ব্যবহার রয়েছে, অন্য দলে নেই।
দণ্ডীতে দ্বাদশ বৎসর পর্যন্ত উল্লিখিত নিয়মগুলি পরিপালনপূর্বক দণ্ড ত্যাগ করে পরমহংস আশ্রম অবলম্বন করবে এমন বিধান আছে–

দ্বাদশাব্দস্য মধ্যে তু যদি মৃত্যুর্ন জায়তে।
দণ্ডং তোয়ে বিনিঃক্ষিপ্য ভবেৎ পরমহংসকঃ।।
অর্থাৎ : দ্বাদশ বৎসরের মধ্যে যদি মৃত্যুর ঘটনা না ঘটে তাহা হইলে জলের মধ্যে দণ্ড নিঃক্ষেপ করিয়া পরমহংস হইবে।

        কিন্তু অনেককে ঐ সময়ের বহু পূর্বে দণ্ড ত্যাগ কিংবা অনেককে তার বহুদিন পরেও দণ্ডাশ্রমে অবস্থান করতে দেখা যায়। দণ্ডীদের অগ্নি-স্পর্শ নিষিদ্ধ, তাই তাঁরা শবদাহ করতে পারেন না। হয় মৃত্তিকাতে খনন করেন, নয়তো কোন দেব-নদীতে শবদেহ মগ্ন করে থাকেন। কাশী তাঁদের প্রধান তীর্থ স্থান।

কুটীচক, বহূদক, হংস ও পরমহংস :
সূতসংহিতার জ্ঞানযোগ খণ্ডে চার প্রকার সন্ন্যাসীর বিবরণ রয়েছে– কুটীচক, বহূদক, হংস ও পরমহংস। পরমহংসরা যদিও তত্ত্বজ্ঞানাবলম্বী, কিন্তু সুতসংহিতায় মহাদেবকেই পরমহংস ইত্যাদি সকল শৈব-সন্ন্যাসীর আশ্রম-দেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন–

ব্রহ্মচর্যাশ্রমস্থানাং ব্রহ্মা দেবঃ প্রকীর্তিতঃ।
গৃহস্থানাঞ্চ সর্বে সূর্য্যতীনাঞ্চ মহেশ্বরঃ।।
বানপ্রস্থাশ্রমস্থানামাদিত্যোদেবতা মতা।
তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু পূজ্যঃ সন্ন্যাসিনাং হরঃ।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : ব্রহ্মচারীদের দেবতা ব্রহ্মা, গৃহস্থদের সকল দেবতাই পূজ্য, সন্ন্যাসীদের দেবতা মহাদেব, এবং বানপ্রস্থদের দেবতা সূর্য। অতএব সন্ন্যাসীরা সর্বকালে শিবের পূজা করবেন।

        কুটীচক ও হংসেরা শিব-লিঙ্গ অর্চনা করেন, বহূদকেরা দেব-পূজায় প্রবৃত্ত হন, পরমহংসেরা কেবল প্রণব জপ ও জ্ঞানানুশীলন করে থাকেন। সুতসংহিতার জ্ঞানযোগ-খণ্ড থেকে তাঁদের ক্রিয়ানুষ্ঠানের বৃত্তান্ত নিচে উদ্ধৃত করা হলো। কুটীচক প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–

কুটীকশ্চ সন্ন্যাস্য খে খে বেশ্মনি নিত্যশঃ।
ভিক্ষামাদায় ভুঞ্জীত সবন্ধুনাং গৃহেহথবা।।
শিখী যজ্ঞোপবীতী স্যাৎ ত্রিদণ্ডী সকমণ্ডলুঃ।
স পবিত্রশ্চ কাষায়ী গায়ত্রীঞ্চ জপেৎ সদা।।
সর্বাঙ্গোদ্ধূননং কুর্যাৎ ত্রিপুণ্ড্রঞ্চ ত্রিসন্ধিষু।
শিবলিঙ্গার্চনং কুর্ষাৎ শ্রদ্ধয়ৈব দিনে দিনে।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : কুটীচকে সন্ন্যাস গ্রহণপূর্বক স্বীয় গৃহ বা স্ববন্ধু-গৃহে অবস্থিতি করিবে, এবং ভিক্ষা করিয়া ভোজন করিতে থাকিবে। শিখাবিশিষ্ট যজ্ঞোপবীতযুক্ত, ত্রিদণ্ড কমণ্ডলুধারী, কাষায়-বস্ত্র পরিধান ও শুদ্ধাচারী থাকিয়া সর্বদা গায়ত্রী জপ করিবে। ত্রিসন্ধ্যা সর্বাঙ্গে ভস্ম লেপন ও ললাটে ত্রিপুণ্ড্র ধারণ করিবে এবং প্রতি দিবস শ্রদ্ধা সহকারে শিব-লিঙ্গ অর্চনা করিতে থাকিবে।

সূতসংহিতায় বহূদক প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে–

বহূদকশ্চ সন্ন্যাস্য বন্ধুপুত্রাদিবর্জিতঃ।
সপ্তাগারং চরেৎ ভৈক্ষং একান্নং পরিবর্জযেৎ।।
গোবালরজ্জুসম্বন্ধং ত্রিদণ্ডং শিক্যমদ্ভূতম্ ।
পাত্রং জলপবিত্রঞ্চ কৌপীনঞ্চ কমণ্ডলুম্ ।।
আচ্ছাদং তথা কন্থাং পাদুকাং ছত্রমদ্ভূতম্ ।
পবিত্রমজিনং সূচীং পক্ষিণীমক্ষসূত্রকম্ ।।
যোগপট্টং বহির্বস্ত্রং মৃৎখনিত্রীং কৃপাণিকাম্ ।
সর্বাঙ্গোদ্ধূননং তদ্ধৎ ত্রিপুণ্ড্রঞ্চৈব ধারয়েৎ।।
শিখী যজ্ঞোপবীতি চ দেবতারাধনে রতঃ।
স্বাধ্যায়ী সর্বদা বাচমুত্সৃজেৎ ধ্যানতত্পরঃ।।
সন্ধ্যাকোলেষু সাবিত্রীং জপন্ কর্ম সমাচরেৎ।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : বহূদকে সন্ন্যাসাশ্রম অবলম্বন ও বন্ধু পুত্রাদি পরিত্যাগ করিয়া সাতগৃহে ভিক্ষা করিবে; এক গৃহস্থের অন্ন-গ্রহণ করিবে না। গো-পুচ্ছ-লোমের রজ্জু দ্বারা বদ্ধ ত্রিদণ্ড, শিক্য, জল-পূত পাত্র, কৌপীন, কমণ্ডলু, গাত্রাচ্ছাদন, কন্থা, পাদুকা, ছত্র, পবিত্র চর্ম, সূচী, পক্ষিণী, রুদ্রাক্ষমালা, যোগপট্ট, বহির্বাস, খনিত্রী ও কৃপাণ গ্রহণ করিবে। সর্বাঙ্গে ভস্ম লেপন এবং ত্রিপুণ্ড্র, শিখা ও যজ্ঞোপবীত ধারণ করিবে। বেদাধ্যায়ন ও দেবতারাধনায় রত হইয়া ও সর্বদা বাক্য পরিত্যাগ করিয়া ইষ্টদেবতার চিন্তনে তৎপর হইবে এবং সন্ধ্যাকালে গায়ত্রী-জপ সহকারে স্বধর্মোচিত ক্রিয়ানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত থাকিবে।

আর হংস প্রসঙ্গে সূতসংহিতায় বলা হয়েছে–

হংসঃ কমণ্ডলুং শিক্যং ভিক্ষাপাত্রং তথৈবচ।
কন্থাং কৌপীনমাচ্ছাদ্যমঙ্গবস্ত্রং বহিঃপটম্ ।।
একন্তু বৈণবং দণ্ডং ধারয়েল্লিত্যমাদরাৎ।
ত্রিপুণ্ড্রেদ্ধূননং কুর্যাৎ শিবলিঙ্গং সমর্চ্চয়েৎ।।
অষ্টগ্রাসং সকৃন্নিত্যমশ্নীয়াৎ সশিখং বপেৎ।
সন্ধ্যাকালেষু সাবিত্রী জপমধ্যাত্মচিন্তনম্ ।।
তীর্থসেবাং তথা কৃচ্ছ্রং তথা চান্দ্রায়নাদিকম্ ।
কুর্বন্ গ্রামৈকরাত্রেণ ন্যায়েনৈব সমাচরেৎ।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : হংস কমণ্ডলু, শিক্য, ভিক্ষা-পাত্র, কন্থা, কৌপীন, আচ্ছাদন, অঙ্গ-বস্ত্র, বহির্বাস এবং বংশ-দণ্ড সতত যত্নপূর্বক ধারণ করিবে; অঙ্গেতে ভস্ম লেপন, ত্রিপুণ্ড্র ধারণ ও শিব-লিঙ্গ অর্চনা করিবে; প্রতি দিবস একবার মাত্র আট গ্রাস ভোজন করিবে; শিখা সহিত সমুদায় কেশ মুণ্ডন করিবে; সন্ধ্যাকালে গায়ত্রী জপ ও অধ্যাত্মচিন্তন করিবে; এবং তীর্থ সেবা কৃচ্ছ্র ও চান্দ্রায়ণাদি ব্রতানুষ্ঠান সহকারে এক রাত্রিমাত্র গ্রামে অবস্থিতি করিবে ও ন্যায়যুক্ত আচরণ করিতে থাকিবে।

অন্যদিকে পরমহংস সম্পর্কে সূতসংহিতায় বলা হয়েছে যে,–

পরমহংসস্ত্রিদণ্ডঞ্চ রজ্জুং গোবালমিশ্রিতম্ ।
শিক্যং জলপবিত্রঞ্চ পবিত্রঞ্চ কমণ্ডলুম্ ।।
পক্ষিণীমজীনং সূচীং মৃত্খনিত্রীং কৃপাণিকাম্ ।
শিখাং যজ্ঞোপবিতঞ্চ নিত্যকর্ম পরিত্যজেৎ।।
কৌপীণং ছাদনং বস্ত্রং কন্থাং শীতনিবারিকাম্ ।
যোগপট্টং বহির্বস্ত্রং পাদুকাং ছত্রমদ্ভূতম্ ।।
অঞ্চমালঞ্চ গৃহ্নীয়াৎ বৈণবং দণ্ডমব্রণম্ ।
অগ্নিরিত্যাদিভির্ম্মন্ত্রৈঃ কুর্যাদুদ্ধূননং মুদা।।
ওমিতি চ ত্রিভিঃ প্রোচ্য পরমহংসস্ত্রিপুণ্ড্রকম্ ।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : পরমহংসে ত্রিদণ্ড, গো-বাল-মিশ্রিত রজ্জু, জল-পবিত্র শিক্য, পবিত্র কমণ্ডলু, পক্ষিণী, অজিন, সূচী, মৃৎখনিত্রী, কৃপাণ, শিখা, যজ্ঞোপবীত ও নিত্য-কর্ম পরিত্যাগ করিবে। কৌপীন, আচ্ছাদন-বস্ত্র, শীত-নিবারিকা কন্থা, যোগপট্ট, বহির্বাস, পাদুকা, ছত্র, অক্ষমালা ও বংশ-দণ্ড গ্রহণ করিবে। “অগ্নি” ইত্যাদি মন্ত্রদ্বারা অঙ্গে ভস্ম লেপন করিবে ও তিনবার “ওঁ” উচ্চারণ করিয়া ত্রিপুণ্ড্র করিবে।

কিন্তু নির্ণয়সিন্ধুতে লিখিত আছে,–

পরমহংসস্যৈকদন্ড এর সোহপ্যবিদুষঃ।
বিদুষান্তু সোহপি নাস্তি।
ন দণ্ডং ন শিক্ষাং নাচ্ছাদং চরতি পরমহংস ইতি। –(নির্ণয়সিন্ধু)
অর্থাৎ : পরমহংস একটি দণ্ড ধারণ করিবে, কিন্তু জ্ঞানবান্ পরমহংসদের পক্ষে তাহাও বিধেয় নয়। পরমহংসে দণ্ড, শিখা ও আচ্ছাদন ধারণ করিবে না।

        অতিভোজন করলে ও রিপু-পরতন্ত্র করলে, যোগাভ্যাসে মনঃসংযোগ হয় না, এ জন্য পরমহংসদের অপরিমিত আহার এবং কাম, ক্রোধ, শোক, মোহ, হর্ষ, বিষাদ প্রভৃতি পরিত্যাগ করবার ব্যবস্থাও সূতসংহিতায় রয়েছে। যেমন–

মাধুকরমথৈকান্নং পরমহংসঃ সমাচরেৎ।
নাতাশ্নতস্তু যোগোহস্তি নচৈকান্তমনশ্নতঃ।।
তস্মাদ্যোগানুগুণ্যেন ভুঞ্জিত পরমহংসকঃ।
অভিশস্তং সমুৎসৃজ্য সার্ব্ববর্ণিকমাচরেৎ।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : পরমহংসেরা নানা স্থান হইতে অল্প অল্প ভৈক্ষ্য সংগ্রহপূর্বক একবার মাত্র আহার করিবে। অনাহারী এবং অত্যাহারী উভয়েরই যোগ সম্ভব না, অতএব পরমহংসেরা যোগানুরূপ ভোজন করিবে এবং নিন্দিত আচরণ পরিত্যাগ করিয়া সর্ববর্ণোচিত ব্যবহার করিতে থাকিবে।

সূতসংহিতার বর্ণনায় কুটীচক, বহূদক, হংস ও পরমহংস– এই চারপ্রকার সন্ন্যাসীর আচরণ-অনুষ্ঠানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা এবং কিছু ক্ষেত্রে অভিন্ন নিয়ম পরিলক্ষিত হয়। যেমন–

স্নানং শৌচমভিধ্যানং সত্যানৃতবিবর্জনম্ ।
কামক্রোধপরিত্যাগং হর্ষরোষবিবর্জনম্ ।।
লোভমোহপরিত্যাগং দম্ভদর্পাদিবর্জনম্ ।
চাতুর্ম্মাসঞ্চ সর্ব্বেসাং বদন্তি ব্রহ্মবাদীনঃ।। –(সূতসংহিতা জ্ঞানযোগ-খণ্ড)
অর্থাৎ : ব্রহ্মবাদীরা বলেন, কুটীচক, বহূদক, হংস ও পরমহংসে স্নান, শৌচাচার ও অভিধ্যান করিবে এবং বাণিজ্য, কাম, ক্রোধ, হর্ষ, রোষ, লোভ, মোহ, দম্ভ, দর্প প্রভৃতি পরিত্যাগ ও চাতুর্মাস্যের অনুষ্ঠান করিবে।

এই চারপ্রকার সন্ন্যাসীই মোক্ষাভিলাষী। তবে কুটীচক, বহূদক ও হংসেরা ব্রাহ্মণের ন্যায় গায়ত্রী জপ করেন; পরমহংসেরা কেবল প্রণব-জপে প্রবৃত্ত থাকেন। সূতসংহিতায় বলা হচ্ছে–

কুটীচকাশ্চ হংসাশ্চ তথৈবচ বহূদকাঃ।
সাবিত্রীমাত্রসম্পন্নাঃ ভবেয়ুর্মোক্ষকারণাৎ।।
প্রবণাদ্যাস্ত্রয়োবেদাঃ প্রণবে পর্য্যবস্থিতাঃ।
তস্মাৎ প্রণবমেবৈকং পরমহংসঃ সদা জপেৎ।।
বিবিক্তদেশমাশ্রিত্য সুখাসনঃ সমাহিতঃ।
যথাশক্তি সমাধিস্থোভবেৎ সন্ন্যাসীনাং বরঃ।। –(সূতসংহিতা)
অর্থাৎ : কুটীচক, হংস এবং বহূদক ইঁহারা মোক্ষ-লাভ উদ্দেশে গায়ত্রী মাত্র উপাসনা করিবেন। বেদ-ত্রয় প্রণব-মূলক, এবং প্রণবেতেই তাহাদের পর্যবসান। অতএব পরমহংসে সর্বদা প্রণবমাত্র জপ করিবে। সন্ন্যাসী-প্রধান পরমহংসে নির্জন দেশে সমাহিত ও মনের সুখে উপবিষ্ট থাকিয়া যথাশক্তি সমাধিস্থ হইবে।

এই চারপ্রকার উপাসকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও একরূপ নয়। নির্ণয়সিন্ধুতে কুটীচককে দাহ, বহূদককে জল-তারণ ও হংসকে জলে নিক্ষেপ, এবং পরমহংসকে খনন করবার ব্যবস্থা রয়েছে।–

কুটীচকং চ প্রদহেৎ তরয়ঞ্চে বহূদকং।
হংসং জলে তু নিঃক্ষিপা পরমহংসং প্রপূরয়েৎ।। –(নির্ণয়সিন্ধু)
অর্থাৎ : কুটীচককে দাহ, বহূদককে জল-তারণ, হংসকে জলে নিক্ষেপ, এবং পরমহংসকে খনন করিবে।

        কিন্তু বায়ুসংহিতাতে লিখিত আছে, পরমহংস ছাড়া অন্য তিন প্রকার সন্ন্যাসীকে খনন করে পরে দাহ করবে। যেমন–

মৃতে ন দহনং কার্যং পরমহংসস্য সর্বদা।
কর্তব্যং খননং তস্য নাশৌচং নোদকক্রিয়া।।
অশ্বত্থস্থাপনং কার্যং তদ্দেশেহধ্বর্য্যুনা মুনে।
অশ্বত্থে স্থাপিতে তেন স্থাপিতো হি মহেশ্বরঃ।।
অন্যেযামপি ভিক্ষুণাং খননং পূর্বমাচরেৎ।
পশ্চাদ্গৃহী যথাশাস্ত্রং কুর্য্যাদ্দনমত্তমম্ ।।
অর্থাৎ : পরমহংসের মৃত্যু হইলে, দাহ না করিয়া খনন করিবে। তাঁহার অশৌচ নাই। জল-ক্রিয়াও নাই। হে মুনি! অধ্বর্যু সেই স্থানে অশ্বত্থ রোপণ করিবেন। অশ্বত্থ স্থাপন করিলে তাঁহার শিব-স্থাপন করা হয়। অন্য অন্য সন্ন্যাসীকে প্রথমে খনন করিবে, পশ্চাৎ শব গ্রহণ করিয়া যথাশাস্ত্র দাহন করিবে।

        এই চারপ্রকার সন্ন্যাসীর মধ্যে পরমহংসকেই সচরাচর দেখা যায়। তবে পরমহংস দুই প্রকার– দণ্ডী-পরমহংস ও অবধূত-পরমহংস। যাঁরা দন্ড ত্যাগ করে পরমহংসাশ্রম অবলম্বন করে, তাঁরা দণ্ডী-পরমহংস। আর যাঁরা অবধূতী বৃত্তির অনুষ্ঠান করে পরে পরমহংস হন, তাঁদের বলা হয় অবধূত-পরমহংস।
যদিও এঁরা ওঁকার-উপাসক ও তত্ত্বজ্ঞানাবলম্বী, তবুও প্রয়োজনে কেউ কেউ দেব-প্রতিমূর্তির অর্চনা করেন, তবে তাঁকে নমস্কার করেন না। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বীরাচার অবলম্বন অর্থাৎ সুরাপান করে থাকেন। কুলাচার-পরায়ণ দন্ডী ও পরমহংসেরা যেভাবে চক্র করে সুরাপানাদি করেন, তার নাম মহাবিদ্যা। কাশী এঁদের প্রধান তীর্থ স্থান।

অবধূত বা সন্ন্যাসী :
যে সব জটা ও শ্মশ্রুধারী শৈব উদাসীন সচরাচর সন্ন্যাসী বলে প্রসিদ্ধ, তারাই অবধূত। এরা নিজেরা নিজেদেরকে অবধূত ও নিজেদের বৃত্তিকে অবধূতী বৃত্তি বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এই অবধূত-মার্গীদের সাধনপন্থা সিদ্ধাচার্যদের গুহ্য সাধনা থেকে উদ্ভূত বলে ধারণা করা হয়। বৌদ্ধ-তন্ত্রের চক্রভেদ যোগমার্গে যে তিনটি প্রধান নাড়ীর উপর সিদ্ধাচার্যদের যোগ-সাধন প্রক্রিয়ার নির্ভর, তার প্রধানতমটির নাম অবধূতী। অবধূত-যোগ এই অবধূতী নাড়ীর গতি-প্রকৃতির উপর নির্ভর করতো। এ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষ্য হলো–
‘অবধূত-মার্গীরা সকলেই কঠোর সন্ন্যাস-জীবন যাপন করিতেন; এ-বিষয়েও প্রাচীনতর বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সন্ন্যাসাদর্শের সঙ্গে ইহাদের যোগ ছিল ঘনিষ্ঠ। নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ ও জৈন ভিক্ষুদের যে সব ধূতাঙ্গ আচরণ করিবার কথা অবধূতরাও তাহাই করিতেন। এই ধূত বা ধূতাঙ্গ আচরণের জন্যেও হয়তো তাঁহাদের নামকরণ হইয়াছিল অবধূত। লোকালয় হইতে দূরে বনের মধ্যে গাছের নীচে তাঁহারা বাস করিতেন, ভিক্ষান্নে জীবনধারণ করিতেন, জীর্ণ চীবর পরিধান করিতেন। জৈনদের ধূতাচরণের তালিকাও ঠিক এইরূপ; দেবদত্ত ও আজীবিক সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাহাই করিতেন। বহু শতাব্দী পর অবধূত-মার্গীরা আবার এই সব ধূতসাধন পুনঃপ্রবর্তিত করেন। তাঁহারা বর্ণাশ্রম স্বীকার করিতেন না, শাস্ত্র, তীর্থ কিছুই মানিতেন না। কোনও বস্তুতেই তাঁহাদের কোনও আসক্তি ছিল না; উন্মাদের মতো ছিল তাঁহাদের আচরণ। প্রসিদ্ধ সিদ্ধাচার্য অদ্বয়বজ্রের আর এক নাম অবধূতী-পাদ; নিঃসংশয়ে তিনি অবধূত-মার্গী ছিলেন। চৈতন্য-সহচর নিত্যানন্দও ছিলেন অবধূত; চৈতন্য-ভাগবতে অবধূতদের জীবনাচরণের খুব সুন্দর বর্ণনা আছে।’–(বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫৩২)
পরবর্তীকালে এই গৃহত্যাগী অবধূত-মার্গী সন্ন্যাসীরাই হয়তো ক্রমে তান্ত্রিক শৈবাগমে আত্মীকৃত হয়ে পড়ে। কেননা, এই অবধূতদের বর্ণনা মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্যে–
‘যে সমস্ত শৈব উদাসীন দণ্ডীদের ন্যায় অমাবস্যায় মস্তকাদি মুণ্ডন না করিয়া সচরাচর জটা ও শ্মশ্রু ধারণ করেন এবং এই প্রস্তাবের মধ্যে লিখিত নিয়মানুসারে যাঁহাদের সন্ন্যাস গ্রহণ, ষট্কর্ম-সাধন ও নানাবিধ বৃত্তি অবলম্বন করা হয়, তাঁহাদিগকেই অবধূত ও তাঁহাদের বৃত্তিকেই অবধূতী বলে।
শাণু দেবী প্রবজ্ঞানি অবধূতো যথা ভবেৎ।
বীরসা মূর্তিং জানীয়াৎ সদা তত্ত্বপরায়ণঃ।।
যদ্রূপং কথিতং সর্বং সন্ন্যাসধারণম্ পরম্ ।
তদ্রূপং সর্বকর্মাণি প্রকুর্য্যাৎ বীরবল্লভম্ ।।
দণ্ডিনো মুণ্ডনং চামাবস্যায়ামংচরেদ্ যথা।
তথা নৈব প্রকুয্যাত্তু বীরসা মুণ্ডনং প্রিয়ে।।
অসংস্কৃত কেশজালং মুক্তালম্বিকচোচ্চয়ম্ ।
অস্থিমালাবিভূষা বা রুদ্রাক্ষানপি ধারয়েৎ।।
দিগম্বরো বা বীরেন্দ্রাশ্চাথ বা কৌপিনী ভবেৎ।
রক্তচন্দনসিক্তাঙ্গং কুর্য্যাদ্ভস্মাঙ্গভূষণম্ ।।- (নির্বাণতন্ত্র চতুর্দশ পটল)
দেবি! যে রূপে অবধূত হয়, বলিতেছি শুন। তিনি সতত পঞ্চতত্ত্ব-সেবায় তৎপর থাকিয়া বীর (বীরাচার-বিশিষ্ট) স্বরূপের জ্ঞান লাভ করিবেন। সন্ন্যাস সংক্রান্ত সমস্ত উৎকৃষ্ট বিষয়ের যেরূপ বিবরণ করিয়াছি, তিনি সেইরূপ বীর-প্রিয় ভাবে সমুদায় কার্যের অনুষ্ঠান করিবেন। দণ্ডী সকলে অমাবস্যার দিনে যেরূপ মস্তক মুণ্ডন করেন, প্রিয়! বীবাবধূতে সেরূপ করিবে না। অসংস্কৃত কুন্তলরাশি ও লম্ববান মুক্ত-কেশ সমূহ ধারণ করিবে। অস্থি-মালায় শোভিত হইবে বা রুদ্রাক্ষ ব্যবহার করিবে। বীর-শ্রেষ্ঠ অবধূতে বিবস্ত্র থাকিবে বা কৌপীন ধারণ করিবে এবং শরীরে রক্তচন্দন ও ভস্ম লেপন করিতে থাকিবে।
শৈব-সম্প্রদায়ে রুদ্রাক্ষ মালার বড় গৌরব। অনেকে মস্তকে কর্ণ যুগলে, গলদেশে, বাহুদ্বয়ে ও প্রকোষ্ঠে রুদ্রাক্ষ মালা ব্যবহার করে। কেহ কেহ রুদ্রাক্ষের মুকুট প্রস্তুত করিয়া মস্তকে ধারণ করিয়া থাকে।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, পৃষ্ঠা-৪৮)

        এখানে উল্লেখ্য যে, তন্ত্রকারেরা বলেন, কলিযুগে বেদোক্ত সন্ন্যাসাশ্রম নিষিদ্ধ। তন্ত্রোক্ত অবধূতাশ্রমই সন্ন্যাসাশ্রম। এবং ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, সামান্য বর্ণ সকলেরই অবধূতাশ্রম অবলম্বনে অধিকার আছে। যেমন–

ভিক্ষুকেহপ্যাশ্রমে দেবি বেদোক্তদণ্ডধারণম্ ।
কলৌ নাস্ত্যেব তত্ত্বজ্ঞে যতস্তৎ শ্রৌতসংস্কৃতিঃ।।
শৈবসংস্কারবিধিনাবধূতাশ্রমধারণম্ ।
তদেব কথিতং ভদ্রে সন্ন্যাসগ্রহণং কলৌ।।- (মহানির্বাণতন্ত্র অষ্টমোল্লাস)
অর্থাৎ : তত্ত্বজ্ঞে! কলিকালে সন্ন্যাসাশ্রমে বেদোক্ত দণ্ড ধারণের বিধান নাই; কেননা তাহা শ্রৌত সংস্কার। শৈব সংস্কার দ্বারা যে অবধূতাশ্রম গ্রহণ, তাহাই কলিতে সন্ন্যানগ্রহণ।

ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয়ো বৈশ্যঃ শূদ্রঃ সামান্য এব চ।
কুলাবধূতসংস্কারে পঞ্চানামধিকারিতা।।- (প্রাণতোষিণী-ধৃত মহানির্বাণতন্ত্র বচন)
অর্থাৎ : ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, সামান্য এই পঞ্চ প্রকার বর্ণেরই কুলাবধূত হইবার অধিকার আছে।

তবে–

মাতরং পিতরং বৃদ্ধং ভার্যাঞ্চৈব পতিব্রতাং।
শিশুঞ্চ তনয়ং হিত্বা নাবধূতাশ্রমং ব্রজেৎ।।- (মহানির্বাণতন্ত্র অষ্টম উল্লাস)
অর্থাৎ : বৃদ্ধ পিতা, মাতা, পতিব্রতা ভার্যা ও শিশু পুত্র পরিত্যাগ করিয়া অবধূতাশ্রম অবলম্বন করিবে না।

        এই অবধূত-মার্গীরা সচরাচর গৃহত্যাগী উদাসীন হলেও তন্ত্রের কোথাও কোথাও আবার গৃহাশ্রমী সাধক-বিশেষকেও অবধূত সংজ্ঞা দিতে দেখা যায়। যেমন–

অবধূতশ্চ দ্বিবিধো গৃহস্থশ্চ চিতানুগঃ।
সচেলশ্চাপি দিগ্বাসাবিধিয়োনিবিহারবান্ ।।
সদারঃ সর্বদারস্থো অট্টহাসো দিগম্বরঃ।
গৃহাবধূতো দেবেশি দ্বিতীয়স্তু সদাশিবঃ।।- (প্রাণতোষিণী-ধৃত মুণ্ডমালাতন্ত্র-বচন)
অর্থাৎ : দেবেশি! অবধূত দুই প্রকার– গৃহস্থ ও উদাসীন। বস্ত্র-ধারী বা বিবস্ত্র দার-পরিগ্রাহী, যথাবিধি সর্ব-স্ত্রীগামী ও অট্টহাস-যুক্ত গৃহস্থ অবধূত, দ্বিতীয় সদাশিব-স্বরূপ।

        তন্ত্রে চার প্রকার অবধূতের বৃত্তান্ত আছে– ব্রহ্মাবধূত, শৈবাবধূত, ভক্তাবধূত ও হংসাবধূত। ব্রহ্মাবধূত প্রসঙ্গে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

ব্রহ্মমন্ত্রোপাসকা যে ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদয়ঃ।
গৃহাশ্রমে বসন্তোহপি জ্ঞেয়াস্তে যতয়ঃ প্রিয়ে।। –(মহানির্বাণতন্ত্র চতুর্দশ-উল্লাস)
অর্থাৎ : ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়াদি যে সমস্ত ব্যক্তি ব্রহ্ম-মন্ত্র গ্রহণ করে, তাহারা গৃহস্থ হইলেও যতি বলিয়া পরিগণিত হয়।

শৈবাবধূত প্রসঙ্গে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

পূর্ণাভিষেবিধিনা সংস্কৃতা যে চ মানবাঃ।
শৈবাবধূতাস্তে জ্ঞেয়াঃ পূজনীয়াঃ কুলার্চ্চিতে।। –(মহানির্বাণতন্ত্র চতুর্দশ-উল্লাস)
অর্থাৎ : যে সকল লোক পূর্ণাভিষেকের নিয়মানুসারে সন্ন্যাস গ্রহণ করে, সেই সমস্ত শ্রদ্ধাস্পদ ব্যক্তির নাম শৈবাবধূত।

ভক্তাবধূত প্রসঙ্গে প্রাণতোষিণী-তে বলা হয়েছে–

ভক্তাবধূতো দ্বিবিধঃ পূর্ণাপূর্ণবিভেদতঃ।
পূর্ণঃ পরমহংসাখ্যঃ পরিব্রাড়পরঃ স্মৃতঃ।। –(প্রাণতোষিণী-ধৃত মহানির্বাণতন্ত্র-বচন)
অর্থাৎ : ভক্তাবধূত দুই প্রকার– পূর্ণ ও অপূর্ণ। পূর্ণ ভক্তাবধূতকে পরমহংস এবং অপূর্ণকে পরিব্রাজক বলে।

আর চতুর্থ হংসাবধূত প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে–

চতুর্ণামবধূতাণাং তুরীয়ো হংস উচ্চতে।
ত্রয়োহন্যে যোগভোগাদ্যা মুক্তাঃ সর্বে শিবোপমাঃ।।
হংসী ন কুর্য্যাৎ স্ত্রীসঙ্গম্ ন বিধতে পরিগ্রহম্ ।
প্রারব্ধমশ্নন্ বিহরেৎ নিষেধবিধিবর্জিতঃ।।
ত্যজেৎ স্বজাতিচিহ্নানি কর্মাণি গৃহমোধিনাম্ ।
তুরিয়ো বিচরেৎ ক্ষৌণীং নিঃসঙ্কল্পো নিরুদ্যমঃ।।
সদাত্মভাবসন্তুষ্টঃ শোকমোহবিবর্জিতঃ।
নির্নিকেতস্তিতিক্ষুঃ স্যান্নিঃসঙ্গো নিরুপদ্রব।।
নার্পণং ভক্ষপেয়ানাং ন তস্য ধ্যানধারণা।
মুক্তবিমুক্তো নির্দ্বন্দ্বো হংসাচারপরো যতিঃ।। –(প্রাণতোষিণী-ধৃত মহানির্বাণতন্ত্র বচন)
অর্থাৎ : চারি প্রকার অবধূতের মধ্যে চতুর্থকে তুরীয় বলে। অন্য তিন প্রকার অবধূত যোগ ভোগ উভয়েতেই রত। তাঁহারা মুক্ত ও শিবতুল্য। হংসাবধূতে স্ত্রীসঙ্গ ও দান গ্রহণ করিবে না; যদৃচ্ছা-ক্রমে যাহা কিছু পায় তাহাই ভক্ষণ করিবে; নিষেধ বিধি কিছুই মানিবে না। ঐ তুরীয়াবধূতে স্বজাতির চিহ্ন ও গৃহাশ্রমের ক্রিয়া সমস্ত পরিত্যাগ করিবে এবং সংকল্প-বর্জিত ও নিশ্চেষ্ট হইয়া সর্বত্র ভ্রমণ করিতে থাকিবে। সর্বদা আত্ম-ভাবেতে সন্তুষ্ট, শোক-মোহ-রহিত, গৃহশূন্য, তিতিক্ষাযুক্ত লোকসংসর্গ-বর্জিত ও নিরুপদ্রব হইবে। তাঁহার ধ্যান-ধারণাও নাই, ভক্ষ্য-পানীয় নিবেদন করাও নাই। তিনি মুক্ত, বিমুক্ত, নির্বিবাদ হংসাচার-পরায়ণ ও যতি।

        এই সন্ন্যাস-মার্গী উপাসক সম্প্রদায়ের আচার-বিচার সাধন-পন্থা ইত্যাদি বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যায়। যিনি গৃহাশ্রম পরিত্যাগপূর্বক সন্ন্যাসাবলম্বনে কৃতসংকল্প হন, তিনি প্রথমে গুরু-সন্নিধানে আগমন-পূর্বক শিখা-সূত্র পরিত্যাগ করে ‘নমঃ শিবায়’ বা ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ এই মন্ত্র গ্রহণ করেন, এবং নিজের পূর্ব নাম বিসর্জন দিয়ে একটি নতুন নাম ও গিরি, পুরি, ভারতী, বন, অরণ্য, পর্বত, সাগর এই সাত উপাধির অন্তর্গত একটি উপাধি প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। তাকে বলে নামসন্ন্যাস।
নামসন্ন্যাসী গুরু উপদেশ অনুসারে উপাসনা ও তীর্থ-ভ্রমণাদি করতে প্রবৃত্ত হন ও কিছুদিন পর ষট্কর্ম নামক ছয় প্রকার ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করে পূর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অন্য একটি মন্ত্র গ্রহণ করেন। তাকে বলে কর্মসন্ন্যাস।
কর্মসন্ন্যাস গ্রহণ করার সময়ে দেব, ঋষি ও পিতৃ-লোকের অর্চনা, আত্ম-শ্রাদ্ধ ও বীজহোম নামে একটি হোমের অনুষ্ঠান করে শিখা ও যজ্ঞসূত্র পরিত্যাগ করতে হয়। বলা বাহুল্য, শূদ্রের যেহেতু যজ্ঞোপবীত নেই, তাই তাঁর শিখা-ত্যাগ করলেই কার্য সিদ্ধ হয়। মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

ততঃ সন্তর্প তাঃ সর্বা দেবর্ষিপিতৃদেবতাঃ।
শিখাসূত্রপরিত্যাগাদেহি ব্রহ্মময়ো ভবেৎ।।
যজ্ঞসূত্রশিখাত্যাগাৎ সন্ন্যাসঃ স্যাদ্ধিজন্মনাম্ ।
শূদ্রাণামিতরেষাঞ্চ শিখাং হুত্বৈব সংস্ক্রিয়া।। –(মহানির্বাণতন্ত্র অষ্টম-উল্লাস)
অর্থাৎ : তদনন্তর দেব, ঋষি ও পিতৃ-লোকের তৃপ্তি সাধন এবং শিখা ও যজ্ঞোপবীত পরিত্যাগ করিয়া মনুষ্য ব্রহ্মময় হইবে। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও ভৈশ্যে শিখা সূত্র উভয় পরিত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসী হইবে। শূদ্র ও অন্য অন্য বর্ণের কেবল শিখা দগ্ধ হইলেই সন্ন্যাস সংস্কার সিদ্ধ হয়।

        এখানে উল্লেখ্য যে, সন্ন্যাসীর নামসন্ন্যাস গ্রহণের সময় শিখা ও সূত্র পরিত্যাগ করেন; অতএব কর্মসন্ন্যাসের সময় প্রথমে একবার যজ্ঞসূত্র গ্রহণ করে পরে ত্যাগ করে থাকেন। এঁরা দণ্ডীদের ন্যায় ঐ সূত্র একটা সুপারিতে জড়িয়ে ও অগ্নিতে দগ্ধ করে ভক্ষণ করেন। ষট্কর্ম সাধনের সময় যদি মস্তকে জটা থাকে, তাহলে সেই জটা কর্তন করেন, নয়তো কুশের শিখা প্রস্তুত করে ছেদন করতে হয়।
উল্লিখিত ছয় প্রকার কর্মকে ষট্কর্ম বলে। এই ছয় প্রকার কর্ম সম্পন্ন হলে, গুরু শিষ্যের দক্ষিণ কর্ণে জীব-ব্রহ্মের অভেদবোধক নিম্নোক্ত মন্ত্র উপদেশ দেন। তার নাম সচ্চিদানন্দ মন্ত্র।–

তত্ত্বমসি মহাপ্রাজ্ঞ হংসঃ সোহহং বিভাবয়।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ স্বভাবেন সুখং চর।। –(মহানির্বাণতন্ত্র অষ্টম-উল্লাস)
অর্থাৎ : মহাপ্রাজ্ঞ! তুমিই সেই ব্রহ্ম। আমি সেই ব্রহ্ম– এইরূপ ভাবনা কর। মমতা ও অহঙ্কার পরিত্যাগ করিয়া আত্মভাবে সুখে বিচরণ কর।

        যে পর্যন্ত না ঐ ষট্কর্ম সম্পন্ন ও উপরিউক্ত মহামন্ত্র গৃহীত না হয়, সেযাবৎ সন্ন্যাসী পূর্ণ-সন্ন্যাসী হন না। শিষ্য এই মহামন্ত্র গ্রহণপূর্বক নিজেকে আত্মস্বরূপ বিবেচনা করে নিম্নোক্ত মন্ত্রোচ্চারণ-পূর্বক গুরুকে প্রণাম করেন।–

নমস্তুভ্যং নমোমহ্যং তুভ্যং মহ্যং নমোনমঃ।
ত্বমেব তদহমেব বিশ্বরূপ নমোহস্তু তে।। –(মহানির্বাণতন্ত্র অষ্টম-উল্লাস)
অর্থাৎ : তোমাকে নমস্কার। আমাকে নমস্কার। তোমাকে ও আমাকে বার বার নমস্কার। তুমিই সুতরাং তুমি ও আমিই বিশ্বরূপ, অতএব তোমাকে নমস্কার করি।

        তন্ত্রের মধ্যে উল্লিখিত ব্রহ্ম-মন্ত্র উপদেশ দেবার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্যে, সন্ন্যাসীরা সচরাচর ঐরূপ অর্থ-প্রতিপাদক নিম্নোক্ত সচ্চিদানন্দ মন্ত্রটি গ্রহণ করে থাকেন। এটিকে পরমহংশ-মন্ত্রও বলা হয়।–

ওঁ সোহহং হংসঃ পরমহংসঃ পরমাত্মা দেবতা।
চিন্ময়ং সচ্চিদানন্দস্বরূপং সোহহং ব্রহ্ম।।
অর্থাৎ : ওঁ। আমি সেই হংস, পরমহংস পরমাত্মাদেবতা। আমি সেই জ্ঞানময় সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ পরব্রহ্ম।

এই মন্ত্রের একটি গায়ত্রীও আছে, তা অভ্যাস করে জপ করতে হয়। সেটি হলো–

ওঁ হংসায় বিদ্মহে পরমহংসায় ধিমহি তন্নো হংসঃ প্রচোদয়াৎ।
অর্থাৎ : ওঁ। হংসকে জ্ঞান হই, পরমহংসকে চিন্তা করি, হংস আমাদিগকে তাহা প্রেরণ করুন।

        এ প্রসঙ্গে ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগে মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য হলো,–
‘এ দেশীয় ব্রাহ্মণেরা যেমন উপনয়নকালে গায়ত্রী-উপদেশ গ্রহণ করেন, কিন্তু প্রায় সকলেই তাহার অর্থ-বোধ ও তাৎপর্যানুশীলনে অসমর্থ হইয়া তন্ত্রোক্ত একটি সাকার দেবতার আরাধনায় অনুরক্ত হন, সেইরূপ সন্ন্যাসীরা শেষে সচ্চিদানন্দ মন্ত্র গ্রহণ করেন বটে, কিন্তু অধিকাংশে তাহার ভাব-গ্রহ ও অর্থবোধে অসমর্থ হইয়া শিবের উপাসনাতেই প্রবত্ত থাকেন। তাঁহারা সচরাচর এই নিম্নলিখিত শ্লোকটি আবৃত্তি করেন,–
মহেশান্ন পরো দেবো মহিম্নো ন পরা স্তুতিঃ।
অঘোরান্ন পরো মন্ত্রো নাস্তি তত্ত্বং গুরোঃ পরম্ ।।
মহাদেবের পর আর দেবতা নাই, মহিম্নঃস্তবের পর আর স্তব নাই, অঘোর-মন্ত্রের পর আর মন্ত্র নাই, গুরু-তত্ত্বের পর আর তত্ত্ব নাই।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৩৯)

         যে গুরু ষট্কর্ম সম্পাদন করে দেন, তাঁকে আচার্য বলে। দণ্ডী আচার্যই প্রশস্ত। তবে দণ্ডী উপস্থিত না থাকলে কোন সন্ন্যাসীকে ঐ পদে অভিষিক্ত করা হয়। সন্ন্যাসীদের অনেক প্রকার গুরু থাকে।–
‘নাম-সন্ন্যাস-গ্রহণের সময়ে যিনি শিষ্যকে মন্ত্রোপদেশ দেন, তিনি মূল গুরু। যিনি শিষ্যের শিখাচ্ছেদন করেন, তাঁহার নাম শাখা-গুরু অর্থাৎ শিখা-গুরু। যিনি শিষ্যের শরীরে বিভূতি লেপন করেন, তাঁহার নাম বভূত্-গুরু। যিনি লেঙ্গুটি অর্থাৎ কৌপীন পরিধান করান, তাঁহার নাম লেঙ্গট্-গুরু। ইচ্ছা করিলে এক ব্যক্তি লেঙ্গট্-গুরু ও বভূত্-গুরু উভয়ই হইতে পারেন। ষট্কর্মের সময়ে যে ব্যক্তি আচার্য হন, তিনি আচার্য-গুরু। সন্ন্যাসীদের এইরূপ সাত প্রকার গুরু হইয়া থাকে।’– (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, পৃষ্ঠা-৩৯)
এছাড়া সন্ন্যাসীদের মধ্যে দীক্ষা-গুরু ও মন্ত্র-শিষ্য ছাড়া অন্য একরূপ গুরু-শিষ্যের সম্বন্ধ বিদ্যমান আছে। কোন কোন সন্ন্যাসী নিজের থেকে শ্রেষ্ঠ বা বয়োজ্যেষ্ঠ অন্য কোন সন্ন্যাসীকে গুরু-স্বরূপ বিবেচনা করে তাঁর নিকট ধর্ম বিষয়ক উপদেশ গ্রহণ করেন ও তাঁর অনুগত হয়ে সেবা শুশ্রূষা করতে থাকেন। এ ধরনের গুরুকে সিদ্ধ ও শিষ্যকে সাধক বলে।

         প্রাত্যহিক ক্রিয়া সন্ন্যাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্ম। সন্ন্যাসীদের প্রাত্যহিক ক্রিয়াতে শিব-পূজারই আধিক্য দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা প্রতিদিন স্নানোত্তর কৌপীন পরিবর্তন ও বিভূতি ধারণ করে শিব-পূজা করেন। যদি সঙ্গে কোন শিব-মূর্তি থাকে, তবে তাঁরই আরাধনা করেন, নয়তো ধারে-কাছে শিবালয় থাকলে সেখানে অর্চনা করতে যান। এই উভয় ধরনের কোন সুযোগ না থাকলে, বাম হস্তের আঙ্গুলগুলির বিন্যাস-বিশেষ দ্বারা পঞ্চমুখী অথবা যোনিবিশিষ্ট লিঙ্গরূপী মহাদেব করে তাঁরই পূজা করে থাকেন। পরে সন্ন্যাস-গ্রহণের সময়ে গৃহীত ‘নমঃ শিবায়’ বা ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ এই মন্ত্র জপ করেন।
অন্য অনেক সম্প্রদায়ের ন্যায় এঁদেরও গুরু-ভক্তি একটি প্রধান ধর্ম। সায়ংকালে তাঁরা মানসী পূজা করেন; চক্ষু মুদ্রিত করে গুরুমূর্তি ধ্যান করেন। মনে মনে গুরুকে আসন দিয়ে উপবেশন করান, পাদপ্রক্ষালন ও স্নানাদি করিয়ে তাঁর শরীরে বিভূতি লেপন করেন, পুষ্পচন্দনাদির দ্বারা অর্চনা করেন, নানাবিধ সুরস সামগ্রী সংগ্রহ করে ভোজন করতে দেন ও অন্যান্য নানাভাবে শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শন করতে থাকেন।

        সন্ন্যাসীরা বেশভূষা হিসেবে ডোর, কৌপীন, বিভূতি ও রুদ্রাক্ষ-মালা ধারণ করেন। গেরুয়া বস্ত্র ও অন্য প্রকার বস্ত্রও ব্যবহার করে থাকেন এবং নানা তীর্থে গমন করে নানা প্রকার তীর্থ-সামগ্রী সংগ্রহপূর্বক শরীরে সংযুক্ত করে রাখেন। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের বিবরণ অনুযায়ী–
‘ইঁহাদের মধ্যে অনেকে বাহুদেশে পিত্তলময়, তাম্রময় ও লৌহময় এক এক প্রকার বলয়াকার দ্রব্য ধারণ করেন। ঐ সমুদায়কে নেপাল, বদরিকা ও কেদারনাথের কঙ্কণ কহে। ঐ সকলের উপরে বিবিধ প্রকার দেবমূর্তি অঙ্কিত থাকে। নেপালে অঙ্গুরীয়ের মত অথবা তদপেক্ষা কিছু বড় পিত্তলময় একরূপ দ্রব্য পাওয়া যায়, তাহাকে নেপালের পবেত্রী বলে। তাহাতে শিব, বৃষ ও ত্রিশূলের প্রতিমূর্তি থাকে। সন্ন্যাসীরা কেহ কেহ তাহা রুদ্রাক্ষ-মালার সহিত গ্রথিত করিয়া গল-দেশে ধারণ করেন। তাঁহারা নেপালে পশুপতিনাথ, বদরিকাশ্রমে বদরিনারায়ণ ও কেদারনাথে কেদারনাথ দর্শন করিতে গিয়া ঐ সমস্ত ক্রয় করিয়া আনেন। কোন কোন সন্ন্যাসী নেপাল হইতে ঐরূপ আর একটি সামগ্রী আনিয়া ব্যবহার করেন, তাহাকে ঐ স্থানের গুঞ্জেশ্বরী দেবীর চুড়ি বলে। অনেকে আবার হিঙ্গলাজে গিয়া একরূপ প্রস্তরময় শ্বেতবর্ণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালা পরিয়া আইসেন, তাহার নাম ঠুম্রা। কেহ বা তাহার সহিত প্রবালখণ্ড মিশ্রিত তরিয়া গল-দেশ সুশোভিত করিয়া রাখেন। কেহ কেহ আবার হিঙ্গলাজেশ্বরীর প্রসাদী সুপারী ও স্বর্ণ-মক্ষী নামে এক প্রকার ধাতু-দ্রব্য জটায় বা অন্য কোন স্থানে ধারণ করেন। হিঙ্গলাজযাত্রীদের মুখে শুনিতে পাওয়া যায়, তথায় পর্বতের নিম্ন ভাগে একটি সুড়ঙ্গ আছে, তাহা ঐ দেবীর যোনি স্বরূপ। তাহার মধ্য দিয়া ঐ সমস্ত বস্তু লইয়া গেলেই প্রসাদ হইয়া যায়। কোন সন্ন্যাসী বা প্রকোষ্ঠ-দেশে গণ্ডার-চর্মের বলয় পরিধান করেন। কেহ কেহ সেতুবন্ধ রামেশ্বরে একরূপ মালা ও শঙ্খ-বলয় গ্রহণ করিয়া শরীরে ধারণ করেন। ঐ শঙ্খ-বলয়কে রামনাথের পবিত্রী বলে। কোন কোন ব্যক্তি আবার মণিকর্ণিকা বা মণিকরণ কুণ্ডের মণি বলিয়া একরূপ উপলখণ্ড গল-দেশে ধারণ করেন। তাহারা বলেন, হিমালয়ের মধ্যে এক স্থানে ঐ নামে এমন একটি উষ্ণ-প্রস্রবণ আছে যে, অগ্নি-সংযোগ ব্যতিরেকে তাহার জলে ভাত, ডাল প্রভৃতি রন্ধন করিয়া ভোজন করা যায়। সেই প্রস্রবণ একটি প্রধান তীর্থ; তাহারা তাহা দর্শন করিতে গিয়া ঐ উপলখণ্ড আহরণ করিয়া থাকেন। সন্ন্যাসীদের অন্তর্গত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ে অন্য অন্য অপূর্ব অলঙ্কারেও শরীর অলঙ্কৃত করিয়া রাখে…।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় : দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৪০-৪১)

        ইতঃপূর্বে আচার্য শঙ্কর প্রতিষ্ঠিত চারটি মঠের উল্লেখ করা হয়েছে– শৃঙ্গগিরি মঠ, জ্যোসী মঠ, সারদা মঠ ও গোবর্ধন মঠ। এ ছাড়াও অন্য লোকের প্রতিষ্ঠিত আরও অনেক মঠ আছে। প্রত্যেক মঠের একেকজন অধ্যক্ষ থাকে, যার নাম মোহন্ত। কৃতসংকল্প ব্যক্তিরা এসব মঠে এসে সন্ন্যাস গ্রহণ করে থাকেন। এসব মঠ ছাড়াও আখাড়া নামে কতকগুলো স্থান আছে। মঠ আখাড়ায় প্রভেদ হলো যে, মঠের উপর তার মোহন্তের সম্পূর্ণ আধিপত্য থাকে; আখাড়ার ভাব সেরকম নয়। অনেক দশনামী সন্ন্যাসী একত্র মিলিত হয়ে আখাড়া প্রস্তুত করে এবং সেখানে তাদের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকে। আখাড়ার মোহন্ত তাদের মত-গ্রহণ ছাড়া কিছুই করতে পারেন না।
দণ্ডীরা কেবল মঠের অন্তর্গত, কিন্তু সন্ন্যাসীরা মঠ ও আখাড়া উভয়েরই অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুস্থানী বৈষ্ণবদের ন্যায় তাঁদেরও সাতটি মূল আখাড়া আছে– নিরবাণী, নিরঞ্জনী, অটল, আহ্বান, যূনা, আনন্দ ও বড় আখাড়া। এই আখাড়ার সংখ্যা ও নাম নিয়ে কিছুটা ভিন্নমতও রয়েছে। যেমন অনেকেরই মতে, যূনা ও বড় আখাড়া আসলে এক আখাড়ারই নাম। সেক্ষেত্রে আখাড়ার সংখ্যা দাঁড়াবে ছয়টি। অন্য একটি আখাড়ার নাম ‘অগন্’। এই সাতটি আখাড়াই প্রসিদ্ধ। কিন্তু দশনামী ভাঁটদের গ্রন্থে আটটি আখাড়ার প্রসঙ্গ রয়েছে বলে জানা যায়। অষ্টম আখাড়ার নাম ভূতনাথ আখাড়া। রুখড় সুখড় প্রভৃতি তার অন্তর্গত। প্রত্যেক সন্ন্যাসীই এর কোন না কোন আখাড়ার লোক। এখানে স্মর্তব্য যে, লোকে মঠে এসে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু আখাড়ায় সে বিষয়ের ব্যবস্থা নেই।

        মঠ ও আখাড়া ছাড়াও সন্ন্যাসীদের পরিচায়ক আরও কিছু বিষয় আছে, যেমন– জাতি, বর্ণ, গোত্র, দেব, দেবী, মড়ী, পরিবার, চূলা, চক্কী ইত্যাদি। সন্ন্যাসীদের পরিচয় জানতে হলে, সেই সবকিছু জিজ্ঞাসা করে জানতে হয়। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্যে–
‘ইঁহাদের সকলেরই এক জাতি, এক বর্ণ ও এক পরিবার। জাতির নাম বিহঙ্গম, বর্ণের নাম রুদ্র ও পরিবারের নাম অনন্ত। সম্প্রদায় গোত্রাদি অন্য অন্য বিষয় ভিন্ন ভিন্ন। চারি মঠে চারি সম্প্রদায় ও চারি গোত্র চলিয়া আসিতেছে; প্রত্যেক সন্ন্যাসী তাহার কোন না কোন সম্প্রদায়ের ও কোন না কোন গোত্রের অন্তর্ভূত।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় : দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৪২)
প্রত্যেক মঠের নিম্নোক্ত স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ক্ষেত্র, দেব দেবী, তীর্থ, বেদ ও মহাবাক্য নির্দিষ্ট আছে; প্রত্যেক সন্ন্যাসীকে নিজ নিজ মঠানুসারে তার এক একটি অবলম্বন করতে হয়। যেমন–

……মঠ………… ক্ষেত্র………… দেব………… দেবী……….. তীর্থ………… বেদ………. মহাবাক্য
শৃঙ্গগিরি মঠ…. রামেশ্বর…… আদিবরাহ…… কামাখ্যা….. তুঙ্গভদ্রা……. যজুর্বেদ…… অহম্ব্রহ্মাস্মি
জ্যোসী মঠ…. বদরিকাশ্রম….. নারায়ণ……. পুন্নাগরী….. অলকানন্দা… অথর্ববেদ… অয়মাত্মব্রহ্ম
সারদা মঠ……. দ্বারকা……… সিদ্ধেশ্বর……. ভদ্রকালী… গঙ্গাগোমতী…. সামবেদ…… তত্ত্বমসি
গোবর্ধন মঠ… পুরুষোত্তম… জগন্নাথ…… বিমলা…. মহোদধি……. ঋগ্বেদ…. প্রজ্ঞান-মানদ্দং ব্রহ্ম

         চার মঠের প্রত্যেকের এক একজন আচার্য ও ব্রহ্মচারী নির্দিষ্ট আছেন। কখনো কখনো এক একজন সন্ন্যাসী বিশেষরূপে ক্ষমতাপন্ন হয়ে এক একটি সন্ন্যাসি-দল প্রবর্তিত করেন, তারই নাম মড়ী। আমাদের বর্তমান আলোচনায় এসবের বিবরণ জরুরি নয়। তবে সন্ন্যাসীদের জ্যোৎমার্গ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। তার আগে বলা বাহুল্য, সন্ন্যাসীরা শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত উল্লিখিত চারটি মঠ ছাড়াও আর তিনটি মনঃকল্পিত গুপ্ত মঠ স্বীকার করেন। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের বর্ণনামতে–
‘ঐ তিনটির কল্পনা তাঁহাদের ইষ্টসাধনার বিজ্ঞাপক ভিন্ন অন্য কিছু বোধ হয় না।
পঞ্চম মঠ।– কৈলাস ক্ষেত্র। কাশী সম্প্রদায়। নিরঞ্জন দেবতা। মানসসরোবর তীর্থ। ঈশ্বর আচার্য। সনক সুনন্দন ও সনৎকুমার ব্রহ্মচারী। সত্যং জ্ঞানমনস্তং ব্রহ্মবাক্য।
ষষ্ঠ মঠ।– নাভিকুণ্ডলিনী ক্ষেত্র। সত্য সম্প্রদায়। পরমহংস দেবতা। হংস দেবী। ত্রিকুটি তীর্থ। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশাদি ব্রহ্মচারী। অজপা মন্ত্র।
সপ্তম মঠ।– এই মঠের আম্নায়ে শুদ্ধাত্মা তীর্থ এবং অহমেব হংসঃ, নিত্যোহহম্, নির্মলোহহম্, শুদেধাহহম্, নির্বিকল্পোহহম্ ইত্যাদি তত্ত্বজ্ঞান-সম্পন্ন বিমুক্ত ব্যক্তির লক্ষণ-প্রতিপাদক কতকগুলি বাক্য সন্নিবেশিত আছে।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় : দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৫৩)

        সন্ন্যাসীরা যে অনেকেই কুলাচারী অর্থাৎ মদ্য-মাংসাদি ব্যবহার করে থাকেন, তা নির্বাণতন্ত্রের উদ্ধৃতি থেকেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যেমন–

সম্বিদাসেবনং কর্য্যাৎ সদ্য কারণ সেবনম্ । –(প্রাণতোষিণী-ধৃত নির্বাণতন্ত্র-বচন)
অর্থাৎ : সম্বিদা গ্রহণ ও সর্বদা সুরা সেবন করিবে।

গুপ্তভাবেন দেবেশি শৃণু মৎপ্রাণবল্লভে।
সন্ন্যাসীনাং সদাসেব্যং পঞ্চতত্ত্বং বরাননে।। –(নির্বাণতন্ত্র)
অর্থাৎ : প্রাণ-প্রিয়ে! বরাননে! দেবেশ্বরি! শ্রবণ কর। সন্ন্যাসীতে গুপ্তভাবে পঞ্চতত্ত্ব গ্রহণ করিবে।

           তন্ত্র-সাধনার পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চমকার হলো– মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন। এ বিষয়ে এখানে তান্ত্রিক আলোচনার সুযোগ নেই। তবে জ্যোৎমার্গপ্রবেশ নামে সন্ন্যাসীদের এক প্রকার সাধনা আছে, যা তন্ত্রোক্ত চক্র-সাধনা-বিশেষ বলা যায়। সেখানে মদ্য-মাংসের প্রচুর ব্যবহার হয়ে থাকে। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্যে–
‘যে দেবীর উদ্দেশে এই ব্যাপারের অনুষ্ঠান হয়, তাঁহার নাম বালা-সুন্দরী। সন্ন্যাসীরা নিশা-যোগে কোন নিভৃত স্থানে একত্র সমাগত হইয়া নিম্নলিখিত প্রকারে একরূপ জ্যোতি অর্থাৎ দীপ প্রজ্বলিত করেন এবং সেই জ্যোতিতে ঐ দেবীর আবির্ভাব হয় বলিয়া বিশ্বাস করেন। এই নিমিত্তই ইহার নাম জ্যোৎমার্গ। তাঁহারা তথায় দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে এক হাত ছয় অঙ্গুলি প্রমাণ একটি মৃত্তিকাময় বেদি নির্মাণ করিয়া তাহার উপরে ঐ পরিমাণের একখণ্ড শ্বেতবর্ণ বস্ত্র স্থাপন করেন, ও তাহার উপর ঐ পরিমাণের আর একখণ্ড রক্তবর্ণ বস্ত্র অর্থাৎ খেরো পাতিয়া থাকেন এবং ঐ রক্তবর্ণ বস্ত্রের মধ্যস্থলে একটি গ্লাস রাখিয়া তাহার চতুর্দিকে তণ্ডুল দিয়া কালী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, হনুমান্ ও ভৈরব প্রভৃতির প্রতিমূর্তি প্রস্তুত করেন। ঐ গ্লাস ঘৃতপূর্ণ করিয়া তাহার মধ্যে একটি কার্পাসের বাতি দেন ও সেই বাতির অগ্রভাগে একটু কর্পূর দিয়া রাখে। সাধনার সময়ে সেই বাতি প্রজ্বলিত করিয়া তাহাতেই উল্লিখিত বালাসুন্দরী দেবীর অর্চনা করেন এবং মদ্য, মাংস, লুচি প্রভৃতি ভোগ দিয়া প্রসাদ পাইতে থাকেন। ইঁহারা ঐ দীপ-শিখাকে প্রকৃত জ্বালামুখীর শিখা বলিয়া বিশ্বাস যান এবং অনেকে ঐ জ্যোতবর্তিকার ভস্ম একটি মাদুলির মধ্যে রাখিয়া গল-দেশে ধারণ করেন।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় : দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৪৪-৪৫)
জ্যোৎমার্গে সুরাপানাদি গুহ্য ব্যাপারের অনুষ্ঠান হয় বলে সন্ন্যাসীরা সেসব গোপন রাখার উদ্দেশ্যে কতকগুলি সাঙ্কেতিক শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। জ্যোৎমার্গানুসারী সন্ন্যাসী ছাড়া অন্যে তা জানতে পারে না। যেমন– ‘মদ্য’র সাঙ্কেতিক শব্দ হচ্ছে– তীর্থ, প্রথমা, বিন্দু ও পদ্মাবতী। মাংসের সাঙ্কেতিক শব্দ– সিদ্ধি ও দ্বিতীয়া। মৎস্যের সাঙ্কেতিক শব্দ– তৃতীয়। তামাক– ষষ্ঠী ও তমালপত্রী। গাঞ্জা– সপ্তমী। শুক্র– ধাতু। জল– অলিল। ভাত– সতি। লুচি– চক্রী। ইত্যাদি।
জানা যায়, জ্যোৎমার্গ-প্রবিষ্ট সন্ন্যাসীরা চৈত্র ও আশ্বিন মাসে নবরাত্র নামে একটি ব্রতের অনুষ্ঠান করেন। একজন সন্ন্যাসী কোন গৃহের মধ্যে দুই পার্শ্বে দুটি প্রদীপ জ্বেলে উপবিষ্ট থাকেন। একটি প্রদীপ ঘৃত-পূর্ণ অন্যটি তৈল-পূর্ণ। ঘৃতের প্রদীপটি মহাদেবের উদ্দেশ্যে এবং তৈলের প্রদীপটি কালীর উদ্দেশ্যে প্রজ্বলিত হয়। সন্ধ্যার পরে জ্যোৎমার্গানুসারী অন্যান্য সন্ন্যাসী এসে শিব, শক্তি ও ভৈরবের অর্চনা করেন ও ভোগ দিয়ে প্রসাদি-সামগ্রী ভক্ষণ করতে থাকেন। নবম দিবসে পূর্বোক্তরূপে জ্যোৎমার্গের অনুষ্ঠান করেন এবং সে উপলক্ষে দূর দূরান্তরের জ্যোৎমার্গানুসারী সন্ন্যাসীদেরকে নিমন্ত্রণ করে পাঠান।

          সন্ন্যাসীদের সকল জাতির অন্ন ভোজনেই অধিকার আছে। বলা হয়ে থাকে, চুরি নারী মিথ্যা– এই তিনটি ছাড়া আর কিছুই সন্ন্যাসীদের পরিত্যাজ্য নয়। শাস্ত্রেও এরূপ ব্যবস্থা আছে। সন্ন্যাসীদের আহার-ব্যবহার সম্বন্ধে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

বিপ্রান্নং শ্বপচান্নং বা যস্মাত্তস্মাৎ সমাগতম্ ।
দেশং কালং তথা চান্নমশ্নীয়াদবিচারয়ন্ ।। –(প্রাণতোষিণী-ধৃত মহানির্বাণতন্ত্র-বচন)
অর্থাৎ : সন্ন্যাসীরা যে স্থান সে স্থান হইতে কি ব্রাহ্মণ কি চণ্ডাল যে কোন জাতির অন্ন প্রাপ্ত হউক না কেন, দেশ কালের বিচার না করিয়া তাহা ভোজন করিবেন।

ধাতুপ্রতিগ্রহং নিন্দামনৃতং ক্রীড়নং স্ত্রিয়া।
রেতস্ত্যাগমসূয়াঞ্চ সন্ন্যাসী পরিবর্জয়েৎ।। –(মহানির্বাণতন্ত্র)
অর্থাৎ : ধাতু-প্রতিগ্রহ, নিন্দা, মিথ্যা কথন, স্ত্রীলোকের সহিত ক্রীড়া রেতস্ত্যাগ এবং অসূয়া এই সমস্ত কার্য সন্ন্যাসীতে পরিত্যাগ করিবে।

          স্থানে স্থানে অনেক সন্ন্যাসী একত্র দলবদ্ধ হয়ে অবস্থান করেন, অথবা তীর্থ-পর্যটন করে থাকেন। এই দলকে জমাৎ বলে। অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্যে–
‘ঐ জমাতের কার্যনির্বাহের বন্দোবস্ত নিতান্ত সামান্য নয়। তদর্থ অনেকগুলি কর্মচারী নিযুক্ত হইয়া থাকে; মোহন্ত, পূজারী, কুঠারী, ভাণ্ডারী, কারবারী, হিসাবী, কোতোয়াল, পাহারাদার ও তূহরীওয়ালা। মোহন্ত প্রধান অধ্যক্ষ; তিনি জমাতের সকল বিষয়ের অধ্যক্ষতা ও সমস্ত কার্য সম্পাদন করেন। পূজারী যথানিয়মে ও যথাসময়ে চরণপাদুকা পূজা করেন। কুঠারী প্রকৃত ভাণ্ডারী; তিনি আহার-দ্রব্যাদি সমস্ত বস্তু রক্ষা করিয়া থাকেন। পাচকের নাম ভাণ্ডারী; তিনি রন্ধন করিয়া সন্ন্যাসীদিগকে ভোজন করান। বড় বড় জমাতে বহুসংখ্যক ভাণ্ডারী থাকে। কারবারী প্রকৃত ধনরক্ষক; তিনি ধন রক্ষা করেন ও প্রয়োজন মতে ব্যয়ার্থ অর্থ দিয়া থাকেন। মুহুরীকে হিসাবী বলে; তিনি আয়-ব্যয় লিখিয়া রাখেন। কোতোয়াল মোহন্তের আদেশানুসারে অন্য অন্য কর্মচারীকে স্ব স্ব কর্মে নিয়োজিত করেন ও তাহাদের কার্যের তত্ত্বাবধান করিয়া থাকেন। দেব-স্থান এবং ডঙ্কা, নিশান, ঝাঁজ, ঘণ্টা প্রভৃতি পূজার দ্রব্য রক্ষার্থ চৌকী দেওয়া পাহারাদারের কার্য। সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেকে পর্যায়ক্রমে দিবারাত্র ঐ কর্ম নির্বাহ করেন। তূরহীওয়ালা তূরীবাদন করিয়া জমাতের গৌরব বৃদ্ধি করেন। কেবল তূরী নয়, ডঙ্কা ও পতাকাতেও জমাতের শোভা ও মহিমা বর্ধন করিয়া থাকে। সন্ন্যাসীরাই ঐ সমুদায় কর্মচারীর পদে অভিষিক্ত হন। কেবল সন্ন্যাসী নয়, যোগী, পরমহংস প্রভৃতি অন্য অন্য শৈব উদাসীনেও জমাতে প্রবেশ করিয়া থাকেন।’ –(ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় : দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৪৭)

          কোন সন্ন্যাসীর মৃত্যু ঘটলে, মৃৎসমাধি বা জল-সমাধি দেওয়া হয়, এবং মরনোত্তর ক্রিয়া হিসেবে তিন দিনের দিন রোঠ ভোগ ও তের দিনের দিন পঙ্গৎ ও শঙ্খঢাল নামে একটি ক্রিয়া হয়ে থাকে। ঘৃত, আটা ও চিনি মিশ্রিত করে একধরনের চূর্ণ পদার্থ প্রস্তুত করা হয়, তাকে রোঠ বলে। একেক দিন অপরাহ্নে এই রোঠ ভোগ দেয়া হয়; হলে, প্রত্যেক সন্ন্যাসী প্রসাদ গ্রহণ করে থাকেন। শঙ্খঢাল কিছুটা গুরুতর ক্রিয়া। জ্যোৎমার্গানুসারী সন্ন্যাসীদেরই শঙ্খঢাল হয়, অন্যের হয় না। মৃত ব্যক্তির শিষ্য বা শিষ্যানুশিষ্যাদি কোন সন্ন্যাসী কুশপুত্তল প্রস্তুত করে এই ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করেন এবং সেই ক্রিয়াকারক ও ক্রিয়া-ভূমিস্থ অন্যান্য সমস্ত সন্ন্যাসী মন্ত্রোচ্চারণ-পূর্বক সেই পুত্তলের উপরে জল ঢালতে থাকেন। এই শঙ্খঢাল ক্রিয়ায় অধিক ব্যয় হয় বলে অনেকেরই তা সম্পন্ন হয় না। দিনের বেলায় পঙ্গত্ ও রোঠ ভোগ হয়, কিন্তু শঙ্খঢাল রাত্রিযোগে নির্বাহিত হয়ে থাকে। মৃত্যুস্থানে অন্যান্য সন্ন্যাসী উপস্থিত থাকলে এবং ব্যয়োপযুক্ত অর্থ সংগৃহীত হলে, সেই স্থানেই ঐ সব কর্ম সম্পন্ন হয়। নয়তো তাঁর গুরুর গাদিতে সংবাদ পৌঁছলে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুযোগ ও সামর্থ না থাকায় অনেকেরই মৃৎ-সমাধি বা জল-সমাধির মাধ্যমেই মরণোত্তর ক্রিয়ার পর্যাবসান হয়।

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : নাথ সম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : শৈব তন্ত্র, শিব ও শক্তি]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 484,144 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 128 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

নভেম্বর 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 7 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: