h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-৯/৯ : নাথ সম্প্রদায়

Posted on: 02/11/2019


ybxjufzwnk-1491330932

শিব ও লিঙ্গ-৯/৯ : নাথ সম্প্রদায়
রণদীপম বসু

নাথধর্ম যোগসাধনা নির্ভর একটি ধর্ম– কায়সাধনা যার অন্যতম উপায়। নাথপন্থীরা আদৌ শৈব-সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তবু শৈব-সম্প্রদায়ের বর্তমান আলোচনায় তাঁদের অন্তর্ভুক্তির কারণ হলো, নাথপন্থীদের বিশ্বাস অনুযায়ী শিব এঁদের আদিগুরু বা আদিনাথ। অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের মতে,–
‘নাথধর্ম সনাতন ভারতীয় ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও ধর্ম নয়– যদিও আচার-আচরণে প্রচলিত ‘হিন্দুধর্ম’ থেকে এদের বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়ার মতো। আর এই আচার-আচরণই নাথধর্মের উৎসে শিবদেবতার উপস্থিতিকে অনিবার্য করে তুলেছে। এই ‘নাথ’ শব্দটির বিশিষ্ট প্রয়োগই এই ধর্মের আচার-পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। সমগ্র মানবসমাজ কতকগুলি ইন্দ্রিয়ের কর্মপদ্ধতি দ্বারা পরিচালিত। এই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের (পঞ্চেন্দ্রিয় দু প্রকারের– এক জ্ঞানেন্দ্রিয়, দুই কর্মেন্দ্রিয়। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক– এগুলি জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু এবং উপস্থ– এগুলি কর্মেন্দ্রিয়) উপর নাথ (প্রভুত্ব) হওয়াই এই ধর্মের মূল কথা। এই নাথ হতে গেলে প্রথমে সিদ্ধতনু, পরে দিব্যতনু বা প্রণবতনু লাভ করতে হয়। প্রণবতনু লাভ করলে তবেই প্রকৃত নাথ হতে পারা যায়। এই তত্ত্ব শিবজাত তত্ত্ব। নাথযোগীদের আদিগুরু স্বয়ং মহাদেব।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১১)

        এঁরা নাথপন্থী, নাথযোগী সম্প্রদায়, যোগী বা যুগী সম্প্রদায় নামেও পরিচিত। তন্ত্রপ্রভাবে এঁরা কৌলমার্গী। গ্রন্থান্তরে অন্যত্র ‘বৌদ্ধ-তন্ত্রের পরিণতি’ প্রসঙ্গে নাথধর্মের এই তন্ত্রপ্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে কৌলমার্গ সম্পর্কে এটুকু বলে রাখা আবশ্যক যে, তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্য ও শক্তি ধর্ম এবং নব বৌদ্ধ ধর্মের গুহ্য সাধনবাদের একত্র মিলনে পরবর্তীতে শক্তিধর্মের যে সব নতুন রূপ দেখা দিয়েছিল তার মধ্যে গবেষকদের মতে কৌলধর্মই প্রধান। কৌলধর্মের কয়েকটি প্রাচীন গ্রন্থ নেপাল রাজকীয় গ্রন্থসংগ্রহে পাওয়া গেছে। অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষ্যে–
‘কৌলধর্মীরা বলেন, তাঁহাদের ধর্মের মূল সূত্রগুলি গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথের শিক্ষা হইতে পাওয়া। মৎস্যেন্দ্রনাথকে অনেকে চুরাশি সিদ্ধাচার্যের অন্যতম লুইপাদের সঙ্গে অভিন্ন বলিয়া মনে করেন। যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে কৌলধর্ম নব বৌদ্ধ গুহ্য সাধনবাদ হইতেই উদ্ভূত, এ-কথা অস্বীকার করা যায় না। তাহা ছাড়া পূর্বেই দেখিয়াছি, কুল বৌদ্ধ গুহ্য সাধনপন্থার একটি বিশেষ অঙ্গ; পঞ্চকুল প্রজ্ঞা বা শক্তির পাঁচটি রূপ; তাঁহাদের কর্তা হইতেছেন পঞ্চতথাগত। এই কুলতত্ত্ব যাঁহারা মানিয়া চলেন তাঁহারাই কৌল বা কুলপুত্র। কৌলমার্গীদের মতে কুল হইতেছেন শক্তি, কুলের বিপরীত অকুল হইতেছেন শিব এবং দেহের অভ্যন্তরে যে শক্তি কুণ্ডলাকারে সুপ্ত তিনি হইতেছেন কুলকুণ্ডলিনী। এই কুলকুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করিয়া শিবের সঙ্গে পরিপূর্ণ এক করাই কৌলমার্গীর সাধনা।’– (বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫৩১)
কৌলমার্গীরা ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রম স্বীকার করতেন। কিন্তু একই গুহ্য সাধনবাদ থেকে উদ্ভূত নাথধর্ম, অবধূত ধর্ম ও সহজিয়া ধর্ম বৌদ্ধ সহজযানীদের মতো বর্ণাশ্রমকে একেবারে অস্বীকার করতো। নাথ ও অবধূত এই দু’টি ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পাল-পর্বেই জানা নায়, আর সহজিয়া ধর্মের প্রথম সংবাদ পাওয়া যায় ত্রয়োদশ শতকে রাজা হরিকালদেবের একটি লিপিতে যেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, হরিকালদেবের এক প্রধান রাজপুরুষ পট্টিকেরক নগরে সহজ-ধর্মকর্মে লিপ্ত ছিলেন। এসব ধর্ম ও সম্প্রদায় কখন কিভাবে উদ্ভূত হয়েছিলো আজ তা বলা কঠিন হলেও, সূচনায় এসব মতবাদের মধ্যে যে খুব একটা পার্থক্যও কিছু ছিলো না তা অনুমান করা যায়। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতকের মধ্যেই নিজস্ব মতামত ধ্যান-ধারণা নিয়ে প্রত্যেকটি ধর্ম ও সম্প্রদায় নিজস্ব সীমারেখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলো।

নাথাচার্য বৃত্ত :
এ প্রেক্ষিতে নাথধর্ম কবে, কোথায়, কখন প্রথম চালু হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে বলার মতো উপকরণ সুলভ না হলেও নাথপন্থার উদ্ভব যে নিম্নশ্রেণীর মানুষদের মধ্যেই ঘটেছিল, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই ধর্মের মূলে প্রবলভাবে জৈন ও আজীবিক প্রভাব বর্তমান। আর তান্ত্রিক বৌদ্ধ প্রভাবের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণভাবে মনে করা হয় খ্রিস্টীয় দশম শতকের কাছাকাছি কোনও সময়ে এই নাথপন্থার উৎপত্তি। কিছু লৌকিক এবং কিছু অলৌকিক কাহিনি এই ধর্মপ্রচারে সহায়তা করেছে। এই ধর্মের আদি প্রচারকগণ যোগীগুরু, নাথাচার্য বা সিদ্ধপাদ নামে পরিচিত। এই আচার্যবৃত্তের আদিতে আছেন সিদ্ধাচার্য মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ। এখানেও সংশয় আছে– এঁরা একই ব্যক্তি না দুইজন। এছাড়া আচার্যদের প্রথম সারিতে আরও আছেন গোরক্ষনাথ বা গোর্খনাথ, জালন্ধরিপা বা হাড়িপা বা হাড়িসিদ্ধা এবং কানুপা। প্রচলিত মতে, নাথধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। কৌলমার্গীরাও মৎস্যেন্দ্রনাথকে গুরু বলে মানতেন। অতএব, মৎস্যেন্দ্রনাথ ও লুইপাদ যদি এক ও অভিন্ন হন তাহলে নাথধর্মও সিদ্ধাচার্যদেরই প্রবর্তিত ধর্মের অন্যতম। নাথধর্মীদের গুরুদের মধ্যে মীননাথ, গোরক্ষনাথ, চৌরঙ্গীনাথ, জালন্ধরীপাদ (হাড়িপা) প্রভৃতি নাথযোগীরা প্রসিদ্ধ। হঠপ্রদীপিকা’র প্রথম উপদেশে উক্ত হয়েছে–

শ্রীআদিনাথ মৎস্যেন্দ্র সারদানন্দ ভৈরবাঃ।
চৌরঙ্গী মীন গোরক্ষ বিরুপাক্ষ বিলেশয়াঃ।।
মন্থানভৈরবোযোগী সিদ্ধবোধশ্চ কন্থড়ী।
কোরণ্ডকঃ সুরানন্দ সিদ্ধপাদশ্চ চর্পটী।।
কণেরিঃ পূজ্যপাদশ্চ নিত্যনাথো নিরঞ্জনঃ।
কাপালি র্বিন্দুনাথশ্চ কাকচণ্ডীশ্ববোময়ঃ।।
অক্ষয়ঃ প্রভুদেবশ্চ ঘোড়াচূলী চ টিণ্টিনী।
ভল্লটির্নাগবোধশ্চ খণ্ডকাপালিকস্তথা।।
ইত্যাদয়ো মহাসিদ্ধা হঠযোগপ্রভাবতঃ।
খণ্ডয়িত্বা কালদণ্ডং ব্রহ্মাণ্ডে বিচরন্তি যে।। (হঠপ্রদীপিকা প্রথম উপদেশ)
অর্থাৎ : আদিনাথ, মৎস্যেন্দ্র, সারদানন্দ, ভৈরব, চৌরঙ্গী, মীন, গোরক্ষ, বিরূপাক্ষ, বিলেশয়, মন্থানভৈরব, সিদ্ধবোধ, কন্থড়ী, কোরণ্ডক, সুরানন্দ, সিদ্ধপাদ, চর্পটী, কণেরি, পূজ্যপাদ, নিত্যনাথ, নিরঞ্জন, কাপালি, বিন্দুনাথ, কাকচণ্ডীশ্বর, ময়, অক্ষয়, প্রভুদেব, ঘোড়াচুলী, টিণ্টিনী, ভল্লটি, নাগবোধ, খণ্ডকাপালিক ইত্যাদি মহাসিদ্ধ ব্যক্তি সকল হঠযোগ-প্রভাবে যম-দণ্ডকে খণ্ডন করিয়া ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে বিচরণ করিতেছেন।

        এই নাথাচার্য বৃত্ত প্রসঙ্গে অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষ বলেন,– ‘এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। এই আচার্য বৃত্ত তিনটি বিন্যাসে বিন্যস্ত। (১) ত্রিনাথ (২) নবনাথ এবং (৩) চুরাশি সিদ্ধাচার্য। ত্রিনাথ বলতে সাধারণত বোঝায় গুরু আদিনাথ, গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথ (মীননাথ সম্ভবত দু’জন ছিলেন) এবং গুরু গোরক্ষনাথ। নবনাথ বা নয়নাথ (এঁদের কাল পঞ্চম থেকে দ্বাদশ খ্রিস্টাব্দ) হলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, জলন্ধর নাথ, কানুপা নাথা, ভর্তৃহরি নাথ, বেরণ নাথ, নাগনাথ (ইনি সম্ভবত নাগার্জুন), চপট নাথ এবং গহিনীনাথ। এই তালিকা আমরা পেয়েছি N.V.Gunaji-এর লেখা Light on the path of Self Realisation বইয়ের ক্রোড়পত্রে। এ ছাড়া মরাঠিতে লেখা ‘নবনাথ ভক্তিসার’ বা শিখগুরু নানকের লেখা ‘প্রাণ সংগলী’ বা পঞ্জাবী গ্রন্থে এই নবনাথের তালিকা আছে। প্রসঙ্গত, সব তালিকাতেই একই নাম নেই। চৌরঙ্গীনাথ, অডবঙ্গ, রেবাণক নাথ, সন্তোষ নাথেরাও স্থান পেয়েছেন কারও কারও পরিবর্তে।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৩১)
এই যে সব তালিকাতে একই নাম নেই তার দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয় যখন অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাঁর ‘নাথপন্থ’ রচনায় বলেন (সূত্র: নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১১২)–
‘গোরখপন্থীরা নবনাথের উল্লেখ করিয়া থাকে। তাহাদের মতে নবনাথের নামÑ (১) একনাথ (২) আদিনাথ (৩) মৎস্যেন্দ্রনাথ (৪) উদয়নাথ (৫) দন্ডনাথ (৬) সত্যনাথ (৭) সন্তোষনাথ (৮) কূর্মনাথ (৯) জালন্ধরনাথ।
কিন্তু “নবনাথ ভক্তিসার” নামক মরাঠী গ্রন্থে নবনাথের একটি শ্লোক আছে। শ্লোকটি এই–

“নব নাথাঁচা শ্লোক”
গোরক্ষ জালন্দর চর্পটাশ্চ অড্ বঙ্গকান্থীপ-মচ্ছিন্দরাদ্যাঃ।।
চৌরঙ্গিরেবাণকভর্তিসংজ্ঞা ভূম্যাং বভুবুর্নবনাথসিদ্ধাঃ।।’

        চুরাশি সিদ্ধার তালিকাতেও অনুরূপ নাম বিভ্রাট আছে। নাথযোগীদের প্রধান গ্রন্থ ‘হঠপ্রদীপিকায়’ চৌরাশি সিদ্ধার কথা আছে, সংশ্লিষ্ট পাঁচটি শ্লোক উপরে (হঠপ্রদীপিকা প্রথম উপদেশ) উদ্ধৃত করা হয়েছে। কিন্তু এতে ৮৪ জনের নাম নেই। এঁদের নাম পাওয়া যায় চারটি তালিকা থেকে। প্রথমটি রয়েছে কবিশেখরাচার্যের ‘বর্ণন রত্নাকর’ (১৩০০-১৩২১ খ্রিঃ) গ্রন্থে। এখান থেকেই সেই তালিকাটি উদ্ধার করেছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ গ্রন্থে। সেই তালিকাটি নিম্নরূপ–
(১) মীননাথ (২) গোরক্ষনাথ (৩) চৌরঙ্গীনাথ (৪) চামরীনাথ (৫) তন্তিপা (৬) হালিপা (৭) কেদারিপা (৮) ধোঙ্গপা (৯) দারিপা (১০) বিরূপা (১১) কপালী (১২) কমারী (১৩) কাহ্ন (১৪) কনখল (১৫) মেখল (১৬) উন্মন (১৭) কাণ্ডলি (১৮) বোধী (১৯) জলন্ধর (২০) টোঙ্গী (২১) মবহ (২২) নাগার্জুন (২৩) দৌলী (২৪) ভিষাল (২৫) অচিতি (২৬) চম্পক (২৭) ঢেন্টস (২৮) ডুম্বরী (২৯) বাকলি (৩০) তুজী (৩১) চপ্পটি (৩২) ভাদে (৩৩) চান্দন (৩৪) কামরী (৩৫) করবৎ (৩৬) ধর্ম্ম পাপতঙ্গ (৩৭) ভদ্র (৩৮) পাতলি ভদ্র (৩৯) পলিহিহ (৪০) ভানু (৪১) জীন (৪২) নির্দ্দয় (৪৩) শবর (৪৪) শান্তি (৪৫) ভর্ত্তৃহরি (৪৬) ভীষণ (৪৭) ভটী (৪৮) গগনপা (৪৯) গমার (৫০) মেনুরা (৫১) কুমারী (৫২) জীবন (৫৩) অঘোরাধব (৫৪) গিরিবর (৫৫) সিয়ারী (৫৬) নাগবালি (৫৭) বিভবৎ (৫৮) সারঙ্গ (৫৯) বিবিকিধজ (৬০) মগরধজ (৬১) অচিত (৬২) বিচিত (৬৩) নেচক (৬৪) চাটল (৬৫) নাচন (৬৬) ভীলো (৬৭) পাহিল (৬৮) পাসল (৬৯) কমলকঙ্গারি (৭০) চিপিল (৭১) গোবিন্দ (৭২) ভীম (৭৩) ভৈরব (৭৪) ভদ্র (৭৫) ভমরী (৭৬) ভূরুকুটি’ (বর্ণন রত্নাকর– বৌদ্ধগান ও দোঁহা)
ঘটনাচক্রে এখানে ৮৪ জনের নাম নেই, আছে ৭৬ জনের; হয়তো মূল তালিকা থেকে বাকি ৮ জনের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয়ত, ইতঃপূর্বে এন ভি গুনাজির ‘লাইট অন দি পাথ অফ সেল্ফ্ রিয়ালাইজেশন’ নামে যে বইটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেই গ্রন্থমালার ২৮ সংখ্যক বইয়ের ক্রোড়পত্রে ৮৪ জন সিদ্ধার পূর্ণ তালিকাটি রয়েছে এভাবে,–
‘(১) কবিশানন্দ সিদ্ধ (২) বাগানন্দ সিদ্ধ (৩) শগতানন্দ সিদ্ধ (৪) বাঞ্ছানন্দ সিদ্ধ (৫) গোরানন্দ সিদ্ধ (৬) অসিতাগানন্দ সিদ্ধ (৭) বটুকানন্দ সিদ্ধ (৮) রবিনন্দ সিদ্ধ (৯) অজমাতনন্দ সিদ্ধ (১৪) ভীষণানন্দ সিদ্ধ (১৫) দিব্যানন্দ সিদ্ধ (১৬) বোধিনন্দ সিদ্ধ (১৭) কলানন্দ সিদ্ধ (১৮) বিলাসানন্দ সিদ্ধ (১৯) সিদ্ধানন্দ সিদ্ধ (২০) মাতৃকানন্দ সিদ্ধ (২১) সরস্বত্যানন্দ সিদ্ধ (২২) শুভাগানন্দ সিদ্ধ (২৩) পরমছতানন্দ সিদ্ধ (২৪) সমরসানন্দ সিদ্ধ (২৫) মহানন্দ সিদ্ধ (২৬) ভোমানন্দ সিদ্ধ (২৭) ব্রহ্মানন্দ সিদ্ধ (২৮) শকানন্দ সিদ্ধ (২৯) চিদানন্দ সিদ্ধ (৩০) পূর্ব্বানন্দ সিদ্ধ (৩১) শুকানন্দ সিদ্ধ (৩২) বনানন্দ সিদ্ধ (৩৩) চৈতন্য সিদ্ধ (৩৪) রাজচৈতন্য সিদ্ধ (৩৫) কলাচৈতন্য সিদ্ধ (৩৬) নামচৈতন্য সিদ্ধ (৩৭) দিব্যচৈতন্য সিদ্ধ (৩৮) প্রজ্ঞাচৈতন্য সিদ্ধ (৩৯) শ্যামচৈতন্য সিদ্ধ (৪০) বিজ্ঞানচৈতন্য সিদ্ধ (৪১) পঞ্চচৈতন্য সিদ্ধ (৪২) আত্মচৈতন্য সিদ্ধ (৪৩) বৈরাগ্যচৈতন্য সিদ্ধ (৪৪) প্রসপদচৈতন্য সিদ্ধ (৪৫) নির্ব্বাণচৈতন্য সিদ্ধ (৪৬) মেধাচৈতন্য সিদ্ধ (৪৭) বিদ্যচৈতন্য সিদ্ধ (৪৮) সিদ্ধচৈতন্য সিদ্ধ (৪৯) শ্রীচৈতন্য সিদ্ধ (৫০) প্রজ্ঞা সিদ্ধ (৫১) শ্রীনাথ সরস্বতী সিদ্ধ (৫২) আনন্দ সিদ্ধ (৫৩) মেধা সিদ্ধ (৫৪) চিদানন্দ সিদ্ধ (৫৫) প্রজ্ঞাসরস্বতী সিদ্ধ (৫৬) কলা সিদ্ধ (৫৭) সমেটা সিদ্ধ (৫৮) দেব সিদ্ধ (৫৯) বিরাট সিদ্ধ (৬০) সার সিদ্ধ (৬১) ভূতভৈরব সিদ্ধ (৬২) বিরাটভৈরব সিদ্ধ (৬৩) স্বরাজ্যভৈরব সিদ্ধ (৬৪) সম্রাট ভৈরব সিদ্ধ (৬৫) আনন্দভৈরব সিদ্ধ (৬৬) রুরুভৈরব সিদ্ধ (৬৭) উন্নতভৈরব সিদ্ধ (৬৮) উদ্ভটভৈরব সিদ্ধ (৬৯) মিরাশতভৈরব সিদ্ধ (৭০) বিশ্বরূপভৈরব সিদ্ধ (৭১) রজবার সিদ্ধ (৭২) দেববার সিদ্ধ (৭৩) ব্রহ্মবার সিদ্ধ (৭৪) রাজবার সিদ্ধ (৭৫) সিদ্ধবায় সিদ্ধ (৭৬) মাপ্র সিদ্ধ (৭৭) কপিলী সিদ্ধ (৭৮) কাম সিদ্ধ (৭৯) মূর্ত্তিশট সিদ্ধ (৮০) মূর্ত্তিচালনা সিদ্ধ (৮১) চক্রবর্তী সিদ্ধ (৮২) জোগবার্ত্তা সিদ্ধ (৮৩) অনুগ্রহ সিদ্ধ (৮৪) নিগ্রহ সিদ্ধ।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৩৩)
এছাড়া, তৃতীয়ত, মরাঠীতে লেখা ‘নবনাথ ভক্তিসার’ নামে যে বইটির কথা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও এই পূর্ণ তালিকাটি রয়েছে। চুরাশি সিদ্ধের আরও একটি চতুর্থ তালিকা পাওয়া যায় অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের ভাষ্যে ‘গীতাপ্রেসে ছাপা তিব্বতিতালিকা কল্যাণ যগাঙ্ক সংখ্যা (Kalyana Yaganka Number) থেকে।’ নাথপন্থীদের স্বীকৃত এই চুরাশি সিদ্ধ পুরুষেরা হলেন–
‘(১) সিদ্ধনাথ (২) বদ্ধপদ্মনাথ (৩) দৃঢ়নাথ (৪) বীরনাথ (৫) পবনমুক্তনাথ (৬) ধীরনাথ (৭) শ্বাসনাথ (৮) পশ্চিমতাননাথ (৯) বাতায়ননাথ (১০) ময়ূরনাথ (১১) মৎস্যেন্দ্রনাথ (১২) কুক্কুটনাথ (১৩) ভদ্রনাথ (১৪) অর্ধপাদনাথ (১৫) পূর্ণপাদনাথ (১৬) দক্ষিণনাথ (১৭) শবনাথ (১৮) অর্ধনাথ (১৯) ধনুষনাথ (২০) পাদশিরানাথ (২১) দ্বিপাদশিরানাথ (২২) স্থিরনাথ (২৩) বৃক্ষনাথ (২৪) অর্ধবৃক্ষনাথ (২৫) চন্দ্রনাথ (২৬) তালনাথ (২৭) ঊর্ধ্ব ধনুষনাথ (২৮) বামসিদ্ধনাথ (২৯) স্বস্তিকনাথ (৩০) স্থিতবিবেকনাথ (৩১) উত্থিতবিবেকনাথ (৩২) দক্ষিণতর্কনাথ (৩৩) পূর্বতর্কনাথ (৩৪) নিঃশ্বাসনাথ (৩৫) অর্ধকূর্মনাথ (৩৬) গরুড়নাথ (৩৭) ব্যাঘ্রনাথ (৩৮) বামত্রিকোণনাথ (৩৯) প্রার্থনানাথ (৪০) দক্ষিণসিদ্ধনাথ (৪১) পূর্ণত্রিকোণনাথ (৪২) বামভুজনাথ (৪৩) ভয়ঙ্করনাথ (৪৪) অঙ্গুঠনাথ (৪৫) উৎকটনাথ (৪৬) বামাঙ্গুষ্ঠনাথ (৪৭) জ্যোষ্ঠিকানাথ (৪৮) বামার্ধপাদনাথ (৪৯) বামভুজপাদনাথ (৫০) ভুজপাদনাথ (৫১) বামবক্রনাথ (৫২) বামজানুনাথ (৫৩) বামশাখনাথ (৫৪) ত্রিস্তম্ভনাথ (৫৫) বামপাদাপাননাথ (৫৬) বামহস্ত চতুষ্কোণনাথ (৫৭) গোমুখনাথ (৫৮) গর্ভনাথ (৫৯) একপাদবৃক্ষনাথ (৬০) মুক্তহস্ত বৃক্ষনাথ (৬১) হস্তবৃক্ষনাথ (৬২) দ্বিপাদ পার্শ্বনাথ (৬৩) কন্দপীড়ননাথ (৬৪) প্রৌঢ়নাথ (৬৫) উপধাননাথ (৬৬) ঊর্ধ্ব সংযুক্তনাথ (৬৭) অর্ধশবনাথ (৬৮) উত্তানকূর্মনাথ (৬৯) সর্বাঙ্গনাথ (৭০) অপননাথ (৭১) যোনিনাথ (৭২) মণ্ডুকনাথ (৭৩) পর্বতনাথ (৭৪) শলভনাথ (৭৫) কোকিলনাথ (৭৬) লোলনাথ (৭৭) উষ্ট্রনাথ (৭৮) হংসনাথ (৭৯) প্রাণনাথ (৮০) কার্মুকনাথ (৮১) আনন্দমন্দিরনাথ (৮২) খঞ্জননাথ (৮৩) গ্রন্থিভেদননাথ (৮৪) ভুজঙ্গনাথ।’– (নবনাথ ভক্তিসার– সুধাকর চন্দ্রিকাঃ)
অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের ভাষ্যে, ‘নাথদের মধ্যে কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, আসন নিরূপণ জন্য এই নামগুলির কল্পনা হইয়াছে।’ তবে এই তালিকাগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে নাথপন্থী সহজপন্থী সকলেই এখানে নির্বিচারে ঠাঁই পেয়ে গেছেন, কোন তালিকাতেই মিল নেই।

নাথ-যোগী :
নাথদের মধ্যে গোরক্ষনাথই বিশেষরূপে প্রসিদ্ধ। এ প্রেক্ষিতে অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘নাথপন্থ’ রচনায় উল্লেখ করেন,– ‘গোরক্ষনাথ প্রভৃতি প্রাচীন নাথদিগের মত ছিল “হঠযোগ”। প্রথম প্রথম নাথেরা শিবের পূজা করিত, শিবকে তাহাদের দেবতা বলিয়া মানিত। তারপর শৈব মত ভাঙ্গিয়া তাহাতে সহজযান ও বজ্রযান মিশাইয়া নাথেরা একটি মতের প্রবর্তন করে। মৎস্যেন্দ্রনাথ কিছু বেশী শৈবভাবাপন্ন ছিলেন। গোরক্ষনাথ ছিলেন বেশী বৌদ্ধভাবাপন্ন। পরে তিনি পুরা বৌদ্ধ হন। শেষে নামে শৈব– কিন্তু কাজে নয়। নাথদের কোন সময়ে কি মত ছিল, তাহা ঠিক জানিবার উপায় নাই। নাথধর্ম জানিতে হইলে– নাথদিগের বর্তমান ও যতদূর সম্ভব অতীতকালের প্রথার আলোচনা আবশ্যক। ’- (সূত্র: নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১০০)
তান্ত্রিক-বৌদ্ধাচার্যদের সাথে নাথাচার্যদের সাধনতত্ত্ব নিয়ে এমন ধূয়াশাপূর্ণ মতামত আমাদের কৌতুহল বৃদ্ধি করে নিশ্চয়ই। তবে চুরাশি সিদ্ধাচার্য বিষয়ে বৌদ্ধতান্ত্রিক ও নাথপন্থীদের আচার্যবৃত্তে যে ভিন্নতা রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী–
‘ত্যাঙ্গুর-গ্রন্থ অনুযায়ী মীননাথ ছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথের পিতা। তাঁহার অন্য নাম বজ্রপাদ ও অচিন্ত্য। মৎস্যেন্দ্রনাথ ছিলেন চন্দ্রদ্বীপের একজন ধীবর। তাঁহার রচিত গ্রন্থাদির মধ্যে পাঁচখানি নেপালে পাওয়া গিয়াছে; তাহারই একখানির নাম কৌলজ্ঞাননির্ণয়। এই গ্রন্থের মতে মৎস্যেন্দ্রনাথ ছিলেন সিদ্ধ বা সিদ্ধামৃত সম্প্রদায়ভুক্ত। মৎস্যেন্দ্রনাথের শিষ্য গোরক্ষনাথ ছিলেন ময়নামতীর রাজা গোপীচন্দ্রের (বঙ্গাল-দেশের রাজা গোবিন্দচন্দ্রের?) সমসাময়িক। গোপীচাঁদ বা গোপীচন্দ্রের মাতা সিদ্ধ গোরক্ষনাথের শিষ্যা মদনাবতী বা ময়নামতীর যোগশক্তি সম্বন্ধে নানা কাহিনী আজও বাঙলাদেশে প্রচলিত। ত্যাঙ্গুরে জালন্ধরীপাদকে বলা হইয়াছে আদিনাথ। এই জালন্ধরীপাদই বোধ হয় রাজা গোপীচাঁদের গুরু হাড়িপা বা হাড়িপাদ; হাড়িপাদ ছিলেন গোরক্ষনাথের শিষ্য। নাথপন্থা যে সূচনায় বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মতবাদ দ্বারা প্রভাবান্বিত হইয়াছিল, এ-সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই। বস্তুত, কোনও কোনও সিদ্ধাচার্যকে নাথপন্থীরা নিজেদের আচার্য বলিয়া স্বীকার করিতেন। নানাপ্রকার যোগে, বিশেষভাবে হঠযোগে, নাথপন্থীদের প্রসিদ্ধি ছিল। মানুষের যত দুঃখ শোক তাহার হেতু এই অপক্ক দেহ; যোগরূপ অগ্নিদ্বারা এই দেহকে পক্ক করিয়া সিদ্ধদেহ বা দিব্যদেহের অধিকারী হইয়া সিদ্ধি বা শিবত্ব বা অমরত্ব লাভ করাই নাথপন্থার উদ্দেশ্য। উত্তর ও পূর্ব-বঙ্গে নাথপন্থীদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি ছিল যথেষ্ট; ব্রাহ্মণ্য তান্ত্রিক শক্তিধর্মের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কারণে নাথধর্ম ও সম্প্রদায় টিকিয়া থাকিতে পারে নাই। ক্রমশ ব্রাহ্মণ-সমাজের নিম্নস্তরে কোনও রকমে তাঁহারা নিজের স্থান করিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। নাথ-যোগীদের জাত হইল ‘যুগী’ (!); বৃত্তি হইল কাপড় বোনা এবং নাথপন্থার শেষ চিহ্ন বাঁচিয়া রহিল শুধু নামের পদবীতে বা অন্ত্যনামে !’– (বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫৩১-৩২)

         গোটা উত্তর ভারত, পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্র অঞ্চল, এমন কি দক্ষিণ ভারতেও নাথপন্থীদের প্রাধান্য ছিলো। অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে, দক্ষিণ ভারতের মাহেশ্বর সিদ্ধ নামক যে সম্প্রদায়টি বর্তমান, তা মূল নাথপন্থী। এই সিদ্ধগণের সংখ্যা আঠারোজন। এদের প্রধান ছিলেন মূল বা মূলর বা শ্রীমূলনাথ। তিনি এবং ছয়জন (কালঙ্গ, অঘোর, মালিকদেব, নাদান্ত, পরমানন্দ ও ভোগ) দক্ষিণী নাথ সিদ্ধদের সাতটি শুদ্ধমার্গের প্রতিষ্ঠাতা। এদের মধ্যে ভোগ ছিলেন চৈনিক এবং তাও-পন্থী, যাঁর সাধন কেন্দ্র ছিল তিনেভেলি জেলার সিদ্ধ পর্বত। তত্ত্বের দিক থেকে এঁরা শৈব ও শাক্ত আগমসমূহ থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ আরও বলেন–
‘নাথ ধর্মের উদ্ভবকেন্দ্র হয়ত হিমালয়ের নিম্নাঞ্চল, যার প্রবক্তাদের মধ্যে মৎস্যেন্দ্রনাথ ও গোরক্ষনাথের নাম বিশেষ পরিচিত। তাঁদের লক্ষ্য অষ্টসিদ্ধি অর্জনের দ্বারা অলৌকিক ক্ষমতালাভ, কায়সাধন ও রাসায়নিক পদ্ধতির সাহায্যে অমরত্ব অর্জন ইত্যাদি…। অন্তর্বেদী অঞ্চলের অর্থাৎ মহারাষ্ট্র অঞ্চলের রসেশ্বর সিদ্ধদের মধ্যে এই নাথ পন্থা প্রচলিত যারা বিশ্বাস করেন প্রাণায়াম বা বায়ুসমূহের যৌগিক নিয়ন্ত্রণ, কায়সাধন এবং অভ্র ও পারদনিষ্পন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারের দ্বারা অমরত্ব অর্জন করা সম্ভব। বীরমাহেশ্বর নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে যে খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে নাথগুরু গোরক্ষনাথ তুঙ্গভদ্রার দক্ষিণে শুদ্ধমার্গের জনৈক বিখ্যাত মাহেশ্বর সিদ্ধের সংস্পর্শে এসেছিলেন। এই মাহেশ্বর সিদ্ধ জীবন্মুক্ত ছিলেন যাঁর কাছে গোরক্ষনাথ দীক্ষিত হন। দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী নয়জন নাথ সিদ্ধ (নবনাথসিদ্ধ) নয়টি সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন যাদের সদস্য সংখ্যা নয় কোটি (নবকোটিসিদ্ধ)। এঁদের উদ্ভবের উৎস রসেশ্বর সিদ্ধ সম্প্রদায়, যাঁরা রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিতেন। এই রসায়ন তন্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন চৈনিক তাও-পন্থী ভোগ। তাও-তে-কিং গ্রন্থে কায়সাধন, বায়ুসাধন ও রসায়নের প্রয়োগে পরম তাও-র প্রভাবাধীন দিব্য দেহ অর্জনের কথা বলা হয়েছে।’
‘উত্তর ভারতের বহুস্থলে নাথ পন্থীরা কান্-ফট যোগী হিসাবে পরিচিত, কেননা তাঁরা কান ফুটো করে একজাতীয় অলংকার ধারণ করেন তাঁদের নিজস্ব ভাষায় যাকে বলা হয় মুদ্রা বা দর্শন, বা কুণ্ডল। তাঁরা রুদ্রাক্ষ ত্রিপুণ্ড্র ও ত্রিশূল ধারণ করেন, শিবরাত্রি উৎসব পালন করেন। শাক্ত তীর্থসমূহ তাঁরা ব্যবহার করেন, এবং দেবী সংক্রান্ত তান্ত্রিক বহু ধারণা তাঁদের ধর্মে বর্তমান। আবার তাঁদের দেবতাদের মধ্যে নিরঞ্জন, শূন্য, অনাদি ও আদিনাথ বর্তমান আছেন। এ থেকে বোঝা যায় নাথধর্মের উপর শৈব, শাক্ত, বৌদ্ধ এবং জৈন সবরকমই প্রভাব বর্তমান। বৈষ্ণব ও ইসলামধর্মেরও কিছু প্রভাব তাঁদের জীবনচর্যার মধ্যে পাওয়া যায়। উত্তর ভারতে বিভিন্ন নাথ সম্প্রদায় ও উপসম্প্রদায়ের ধর্মস্থান এবং মঠাদি আছে, তাঁদের সাম্প্রদায়িক মোহান্তরা যেগুলি পরিচালনা করেন। বঙ্গদেশ ও আসামে নাথগণ যোগী বা যুগী নামে পরিচিত, তাঁদের প্রধান জীবিকা, কিছুকাল আগে পর্যন্ত ছিল তাঁত বোনা। অনেক বাউল বৈষ্ণবও এই সম্প্রদায়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২৫৬)

        সকল যোগীদের সাধারণ উপাধি বা নাম– নাথ। যোগীরা তাদের মৃতদেহ সমাধিস্থ করে। এ প্রসঙ্গে অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ ‘যোগি-জাতি’ নামক রচনায় বঙ্গদেশের নাথ সম্প্রদায় প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন–
‘মৃতের সমাধিতে সকল যোগীই একরূপ অনুষ্ঠান করে। চক্রাকারে আট ফুট গভীর করিয়া তাহাদের সমাধি খনন করা হয়। তলদেশে শবের অবস্থানের জন্য একটি কুলুঙ্গি কাটা হয়। প্রথমে সাত কলসি জলে মৃতদেহ ধুইয়া, নূতন বস্ত্র দিয়া আবৃত করা হয়। এটি যে মুসলমানের প্রথা নয়, এই বৈশিষ্ট্যটুকু বজায় রাখিবার জন্য ওষ্ঠাধরে অগ্নিস্পর্শ করান হয়। শবের গলদেশে তুলসীমালা পরাইয়া দেওয়া হয় এবং তাহার দক্ষিণ হস্তে একটি জপমালা দেওয়া হয়। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ মুড়িয়া দিয়া, দক্ষিণ হস্ত বক্ষের উপরে রাখা হয় এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ঐরূপে মুড়িয়া বাম হস্ত উৎসঙ্গের উপর রক্ষিত হয়। মৃতদেহ পায়ের উপর পা দিয়া আসীন অবস্থায় রাখা হইয়া থাকে। একটি থলির ভিতর চারি কড়া কড়ি দিয়া থলিটি স্কন্ধের উপর ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। সমাধির খোলের ভিতর মৃতদেহ উত্তর-পূর্ব-মুখ করিয়া বসাইয়া, সমাধি মৃত্তিকাবৃত করা হয়। সমাধির উপর একখানি বড় মৃন্ময় থালায় তণ্ডুল, কদলী, চিনি, ঘৃত ও সুপারি রাখা হয়। হুঁকা ও কলিকা আর তার সঙ্গে কিছু তামাক, কিছু কাঠ-কয়লাও দেওয়া হয়। সকলের শেষে তিনকড়া, কি সাতকড়া কড়ি মৃতদেহের অধিকৃত স্থানের মূল্যস্বরূপ জমির উপর ছড়াইয়া দেওয়া হয়। স্ত্রীলোকদের সমাধি ঠিক পুরুষদের মতই হয়।’
‘মৃতদেহের সঙ্গে যে কড়ি দেওয়া হয়, যোগীদের বিশ্বাস, তাহা বৈতরণী পারের জন্য মৃত ব্যক্তির খেয়া পারের মূল্য। মৃতদেহকে উত্তরপূর্বমুখী করিয়া উপবেশন করাইবার তাৎপর্য এই যে, পৃথিবীর উত্তরপূর্ব দিকে কৈলাস অবস্থিত। ১৮৮৩ সালে ডাক্তার ওয়াইজ মৃতের সৎকার-পদ্ধতি এইরূপ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছিলেন। কিন্তু আজকাল অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। আর সকল জায়গার রীতিও একরূপ নয়।’
‘যদিও সকল যোগীদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উল্লিখিত প্রকারেই হয়, তথাপি তাহাদের মধ্যে দুইটি বিভাগ থাকায় শ্রাদ্ধ সম্বন্ধে বিধি কিঞ্চিৎ পৃথক। যোগীদের মধ্যে এক ভাগ মাস্য যোগী– ইহারা মাসান্তে মৃতের শ্রাদ্ধ করে। অপর ভাগ একাদশী যোগী– একাদশ দিবসে ইহাদের শ্রাদ্ধ-কার্য হইয়া থাকে।… এই দুই যোগীদের মধ্যে অন্তর্বিবাহ নাই এবং ইহারা পরস্পরের অন্ন ভোজন করে না। তবে ইহারা পরস্পরের পানপাত্র ব্যবহার করিয়া থাকে।’
‘পূর্ববঙ্গে এক পুরোহিত-বংশ আপনাদিগকে যোগীর ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকে। ইহাদের গোত্র কিন্তু যোগীর গোত্র। ইহারা যোগীই ছিল। কালে নিজেদের আলাদা করিয়া লইয়াছে। গোত্রটুকু পর্যন্ত এখন বদলাইয়াছে।’
‘…মাস্য যোগীদের ক্রিয়ানুষ্ঠানের জন্য কোন ব্রাহ্মণ পুরোহিত নাই। তাহাদের এই কাজ অধিকারী দ্বারাই সম্পন্ন হয়। অধিকারীরা পুরোহিতদিগের দ্বারাই নির্বাচিত হয়। অধিকারীরা উপবীত ধারণ করে এবং আপনাদের ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিচয় দেয়।’
‘…একাদশী যোগীদের ব্রাহ্মণ পুরোহিত আছে। ইহাদের বর্ণশ্রমণ বলা হয়। এই বর্ণশ্রমণেরা মহাত্মা নামে অভিহিত। মহাত্মারা শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণের ঔরসে যোগী স্ত্রীর গর্ভজাত পূর্বপুরুষ হইতে উৎপন্ন বলিয়া আপনাদের পরিচয় দেয়।’
‘…চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ তীর্থে, ঢাকার বুড়াশিবের মন্দিরে, মেঘনার বারুণী উৎসবে, সাগরের কপিল মুনির আশ্রমে এই যোগীর ব্রাহ্মণেরা বহুদিন হইতেই ‘মহান্ত’ হইয়া আসিতেছেন।’
‘শিবরাত্রি মাস্য যোগীদের প্রধান উৎসব। কিন্তু তাহারা জন্মাষ্টমীও পালন করে। বটবৃক্ষতলে ইহারা সিদ্ধেশ্বরীদেবীর পূজা করে, বলিও দিয়া থাকে। ইহারা সকল কার্যে যজ্ঞডুমুর ব্যবহার করে। বট, তুলসী, তমাল ইহাদের নিকট নিতান্ত পবিত্র। বৃন্দাবন, মথুরা ও গোকুল তাহাদের তীর্থমধ্যে গণ্য। এই সকল পুণ্যক্ষেত্র তাহাদের নিকট “থান” নামে পরিচিত। বারাণসী, গয়া এবং সীতাকুণ্ডও তাহাদের প্রধান তীর্থ।’
‘একাদশী যোগীরা “বৃদ্ধশাতাতপীয় সংহিতা” ও “চন্দ্রাদিত্য পরমাগমসংহিতা” আপনাদের শাস্ত্র বলিয়া মানিয়া থাকে। ইহাদের শাস্ত্র মৃতকে সমাধিস্থ করিবার ব্যবস্থা দেয়; কিন্তু পুত্র বা পৌত্রকে মৃতের মুখাগ্নি করিতে হইবে, ইহাই শাস্ত্রে নির্দেশ। একাদশী যোগীরা ব্রাহ্মণ বিধবা হইতে উদ্ভূত বলিয়া আপনাদের পরিচয় দিয়া থাকে। একাদশ দিনে তাহাদের অশৌচান্ত হয়। কিন্তু তাহারা উপবীত ধারণ করে না। ইহাদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষ্ণোপাসক, কেহ কেহ শক্তিরও উপাসনা করিয়া থাকে। ইহাদের মধ্যে বৈষ্ণব যোগীরও সংখ্যা নিতান্ত কম নয়।’
‘যোগিজাতি আপনাদের উৎপত্তি সম্বন্ধে একটি বিবরণ দিয়া থাকে– তাহারা বলে, বারাণসীর এক সন্ন্যাসী অবধূতের দুই পুত্র হয়; এই অবধূত শিব-বতার; অবধূতের জ্যেষ্ঠ পুত্র এক ব্রাহ্মণী স্ত্রীর গর্ভে এবং কনিষ্ঠ পুত্র এক বৈশ্যা স্ত্রীর গর্ভে উৎপন্ন হয়; অবধূতের জ্যেষ্ঠ পুত্রই একাদশী যোগীদিগের পূর্বপুরুষ এবং কনিষ্ঠ পুত্র মাস্য যোগীদিগের পূর্বপুরুষ। ডাক্তার ওয়াই বলেন, একাদশী ও মাস্য যোগীদের অশৌচান্তের সময়ের পার্থক্য বুঝাইবার জন্যই এই আখ্যায়িকাটি কল্পিত হইয়াছে।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১১৯-২০)

        মধ্যযুগে সংস্কৃত এবং প্রাদেশিক ভাষার সাহিত্যে নাথ সম্প্রদায় নানাভাবে উল্লিখিত হয়েছেন। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ (১ম স্কন্ধ, ৮-৯ অধ্যায়), আগম সংহিতা, বৃদ্ধশাতাতপ সংহিতা, মহাবিরাট তন্ত্র, পরাশর কৌশলজ্ঞাননির্ণয়, তন্ত্রালোক প্রভৃতি গ্রন্থে শৈব নাথধর্মের বিবিধ উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, মধ্যযুগে নাথধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ সর্বভারতীয় সম্প্রদায়ের ধর্মে পরিণত হয়েছিল। শিব তাঁদের কাছে আদিনাথ হলেও গোরক্ষনাথই তাঁদের প্রধান আচার্য বলে গৃহীত, সেজন্যেই এঁদেরকে গোরক্ষপন্থীও বলা যায়। এই গোরক্ষনাথ এবং তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যাবলিক্রমে নানান সত্য এবং গল্পকাহিনি বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে। লিখিত ও মৌখিক সাহিত্যের পাশাপাশি রচিত হয়েছে নানান গীত এবং ছড়া। ‘হঠযোগ প্রদীপিকা’র মতো বঙ্গদেশেও এর প্রভূত প্রসার ঘটে। ভারতের অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষার মতোই বিচিত্রতর আকারে প্রকাশে প্রচারিত এই ধর্মসাহিত্য বঙ্গদেশের সাহিত্যে ত্রিমুখী ধারায় রচিত-প্রচারিত হতে থাকে বলে অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষ উল্লেখ করেন। এই ত্রিমুখী ধারা হলো– ধর্মদর্শন ও সাধনভজন প্রণালীকে (হঠযোগ) অবলম্বন করে একটি ধারা এবং গোরক্ষনাথের কাহিনি ও হাড়িপা-ময়নাবতী-গোপীচন্দ্রের কাহিনিকে নিয়ে অপর দুটি ধারা। যেহেতু হঠযোগ বিষয়ে বৌদ্ধতন্ত্র প্রসঙ্গে গ্রন্থান্তরে আলোচিত হয়েছে তাই এখানে বাংলা সাহিত্যে শেষ দুটি ধারার প্রবাহ লক্ষ্য করবো আমরা। আগে গোরক্ষবৃত্ত এবং পরে ময়নাবতী-গোপীচন্দ্র বৃত্ত নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যায়।

নাথ-সৃষ্টিতত্ত্ব ও গোর্খবিজয় কাহিনী :
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের ৩১শ বার্ষিক, ১ মাসিক অধিবেশনে পঠিত ‘নাথধর্ম্মে সৃষ্টিতত্ত্ব’ রচনায় রাজমোহন নাথ বলেন–
‘নাথধর্ম্মের বহু তথ্যপূর্ণ ‘অনাদিপুরাণ’ বা অনাদিচরিত্র, ‘হাড়মালা গ্রন্থ’, ‘যোগিতন্ত্রকলা’ প্রভৃতি কয়েকখানি ‘কলমীপুথি’ আমাদের হস্তগত হইয়াছে। প্রথম দুইখানি বহি ‘যাইবাম’, ‘ভজিলু’, ‘ব্রহ্ম’, ‘হৈআ’ প্রভৃতি শিশু বাঙ্গালা ভাষার অলঙ্কারে ভূষিত। ‘যোগিতন্ত্রকলা’র ভাষা সংস্কৃত, তবে এ সংস্কৃতের ব্যাকরণ রচনা করিতে পাণিনিও একটু প্রমাদে পড়িবেন। বহিগুলি কখন্ ও কাহার দ্বারা লিখিত, বলা যায় না; তবে প্রত্যেক বহির শেষে লেখা আছে, ঐগুলি অন্য বহির নকল এবং পুথিলেখক “যদ্দৃষ্টং তল্লিখিতং” বলিয়া রচনাতে কোনও ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছেন। ‘যোগিতন্ত্রকলা’ নিতান্ত আধুনিক বলিয়া মনে হয়। উহাতে নাথযোগিগণের আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে বহু কথা লিখিত আছে।’– (সূত্র: নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১২৭)
আর ‘নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস’ বইয়ের গ্রন্থকার বারিদবরণ ঘোষের বক্তব্য থেকে জানা যায়, বঙ্গদেশে গোরক্ষনাথকে অবলম্বন করে তাঁর মহিমাব্যঞ্জক যেসব বইপত্র পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য– ঢাকা সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত এবং ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী সম্পাদিত শ্যামদাস সেনের লেখা ‘মীনচেতন’ গ্রন্থ (১৯১৫); মুনশি আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সম্পাদিত ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রকাশিত শেষ ফয়জুল্লা রচিত ‘গোরক্ষ বিজয়’ কাব্য (১৯১৭) এবং ড. পঞ্চানন মণ্ডল সম্পাদিত ও বিশ্বভারতী প্রকাশিত ভীমসেন-রচিত ‘গোর্খবিজয়’ কাব্য (১৯৪১)।

সৃষ্টির পূর্বে কী ছিল, এই প্রশ্নের জবাব শ্রুতি ও বাইবেলে যা লিখিত আছে, নাথধর্মে তার চেয়ে বিশেষ অধিক কিছু নেই বলে রাজমোহন নাথের অভিমত। গোরক্ষবিজয়ের একেবারে শুরুতেও সৃষ্টিতত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বর্ণনায় নাথদের সৃষ্টিতত্ত্বটি নিম্নরূপ–
‘সৃষ্টির পূর্বে সমস্ত কিছুই অন্ধকার ও শূন্য ছিল। সেই শূন্যের মধ্যে একটি বুদ্বুদের উদয় হল, যা থেকে তৈরী হল একটি ডিম, যার সাদা অংশটি আকাশ এবং কুসুমটি পৃথিবী। প্রধান দেবতা আদিনাথের ঘর্ম থেকে জন্মালেন তাঁর প্রণয়িণী কেতকী বা মনসা, যাঁদের সঙ্গমে উদ্ভূত হলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব। এঁদের পরীক্ষা করার জন্য আদিনাথ পুতিগন্ধ মৃতদেহরূপে পথে পড়ে রইলেন যা দেখে ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু তাঁকে এড়িয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর পিতার মৃতদেহকে শিব সঠিকভাবেই চিনলেন এবং তাঁর দেহের সৎকার করলেন। সৎকারকালীন আদিনাথের নাভি থেকে জন্মালেন মীননাথ, গোরক্ষ জন্মালেন মাথার খুলি থেকে, হাড়িপা জন্মালেন অস্থি থেকে, কান-পা জন্মালেন কান থেকে এবং চৌরঙ্গীনাথ জন্মালেন পদদ্বয় থেকে। এঁরা হচ্ছেন পঞ্চ আদি সিদ্ধ।’
‘শিব যেহেতু আদিনাথের যোগ্যতম পুত্র, আদিনাথ তাঁর সঙ্গেই কেতকীর বিবাহ দিয়েছিলেন যিনি গৌরী বা চণ্ডী নামে পরিচিতা। শিব মহাজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যা মানুষকে অজরামর করে। গৌরী এই মহাজ্ঞান প্রার্থনা করতে শিব তাঁকে তা দেবার মনস্থ করলেন, এবং পাছে কেউ তা শুনে ফেলে সেই জন্য গৌরীকে একটি মহাসমুদ্রের মাঝখানে নিয়ে গেলেন। মীননাথ ব্যাপারটাকে আঁচ করতে পেরে মাছ হয়ে সমুদ্রের জলে লুকিয়ে শিবের মুখ থেকে তা জেনে নিলেন। এটা জানতে পেরে শিব তাঁকে অভিশাপ দিলেন যে মীননাথ একদিন এই জ্ঞান বিস্মৃত হবেন।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২৫৭)
নাথপন্থী বিভিন্ন পুথিপত্রে আদিগুরু আদিনাথই অলেকনাথ, তিনিই ‘নিরঞ্জন গোঁসাই’। অন্য আরেক বর্ণনা থেকে পাই–
‘নিরঞ্জনের মুখ থেকে জন্ম হল শিবের ‘বদলে জর্ম্মিল শিব জোগিরূপ ধরি।’ নাভিতে মীননাথ, ‘হাড় হোতে’ হাড়িপা, কান থেকে ‘কানফা সিধাই’, জটা থেকে গোরক্ষনাথের জন্ম হল। আর নিরঞ্জনের ‘সকল’ শরীর থেকে ‘জগতের মাই’ জগন্মাতা গৌরীর জন্ম হল :

জর্ম্মিলেক এক কন্যা পরম সোন্দরি।।
নতুন জৌবন কৈন্যা নাম থুইল গৌরি।।

        হরগৌরী ‘একহি জীবন’, সেইজন্যে নিরঞ্জন নির্দেশ দিলেন শিবকে যে ‘পাইলা এহি নারী’। তিনি আরও আদেশ দিলেন এখানে থেকে তোমাদের কোনও কাজ নেই, তোমরা ‘চলি যাও পৃথিবীর মাজ’। সেই আদেশ পেয়ে তাঁরা পৃথিবীতে এলেন। তখন মীননাথ হাড়িফার চাকর হলেন, ‘মীননাথের চাকরি করে’ যদি গোরক্ষনাথ। আর ‘হাড়িফার সেবা করে কানফা’ যোগী।
এর মধ্যে হরগৌরীর মনে কামভাব জাগায় তাঁরা একত্রিত হলেন। তখন গৌরী শিবকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘কণ্ঠে কেনে তোমার হাড়ের ধর মালা।’ শিব বললেন তবে তুমি শোন, আমি তোমাকে তত্ত্বকথা বলছি। গৌরী প্রশ্ন করলেন ‘তুমি কেনে তর গোসাঞি আমি কেনে মরি।’ তাই শুনে শিব বললেন ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি করে ক্ষীরোদসাগরে চল যাই। সেই সাগরে সুন্দর জলটুঙ্গি আছে (জলের মাঝখানে মাচার মতো)। সেখানে গিয়ে শিব তত্ত্বকথা বলতে শুরু করলেন। এদিকে নাথ যোগী চতুষ্টয় এই সব তত্ত্বকথা জানতেন না। অথচ জানবার জন্যে প্রবল কৌতুহল। তাই মীননাথ সেই মহাজ্ঞান জানবার জন্য তাঁদের অজ্ঞাতসারে সেই জলটুঙ্গির আড়ালে মৎস্যরূপ ধারণ করে লুকিয়ে লুকিয়ে সেইসব গুহ্য কথা শুনতে লাগলেন। কিন্তু মহাদেবের মায়াতে শিবানীর ঘুম এসে গেল। মহাদেব বলে চলেছেন তত্ত্বকথা, শিবানীর কানে ঢুকছে না। মীননাথ দেখলেন গৌরী যদি ‘হুঁ’ ‘হুঁ’ না বলেন, তাহলে তো শিব কথা বলা বন্ধ করে দেবেন গৌরী ঘুমিয়ে পড়েছেন ভেবে। তখন তো তাঁর আর ‘মহাজ্ঞান’ পাওয়া হবে না। তাই টুঙ্গির আড়াল থেকে তিনি গৌরীর গলা নকল করে শিবের কথার পিঠে ‘হুঁ’ ‘হুঁ’ বলে যেতে লাগলেন। শিব ভাবলেন, তাহলে শিবানী সব কথা শুনছেন!
কিন্তু শিবানীর ঘুম ভেঙে গেল একসময়। তিনি ‘কিছু না শুনিলু আমি নিদ্রার কারণ’– এই কথা বলে শিবকে আবার মহাজ্ঞানের কথা বলতে বললেন। তখন শিব ভাবলেন তাহলে আমার কথার পিঠে কে ‘হঁ’ পূরণ করছিল? শিব তখন ধ্যানে সব ব্যাপার জানতে পেরে রেগে গিয়ে ‘শাপ দিলা এক কালে হৌক বিস্মরণ’– তুমি সব কথা একবারে ভুলে যাবে। যাই হোক হরগৌরী কৈলাসে নিজের বাড়িতে চলে এলেন এবং ‘পুনর্বার সিদ্ধা সঙ্গে একত্রে মিলিলা।’ এরপর পূর্বদিকে হাড়িফা পশ্চিমে গোরক্ষ দক্ষিণে কানফা এবং উত্তর দিকে গেলেন মীননাথ। যোগপথ ধ্যান করে এভাবে তাঁরা পৃথিবী পরিক্রমা করতে লাগলেন।’– (নাথ সম্প্রদায়ে ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৫৫-৫৬)

        ইতোমধ্যে গৌরী পঞ্চসিদ্ধকে সংসারী করার চেষ্টা করলেন, এবং নারীর প্রতি তাঁদের যাতে আসক্তি আসে তার জন্য নিজস্ব ছলাকলা প্রয়োগ করলেন। অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের বর্ণনাটি কিছুটা দীর্ঘ হলেও হুবহু উদ্ধৃত করাই সুবিধাজনক হবে বলে মনে করি–
“এরপরে ‘একদিন হরগৌরী একত্রে বসিল। সৃষ্টিস্থাপন হেতু কহিতে লাগিল।’ গৌরী শিবকে বললেন তোমার শিষ্যদের তুমি যদি ঘরসংসারী না করে দাও, তাহলে পৃথিবী রক্ষা পাবে কি করে? তাতে শিব বললেন যে, তাঁর যোগীশিষ্যেরা কামক্রোধহীন। তাদের ঘর-সংসারী করা একটা অসম্ভব ব্যাপার। শুনে ভবানী বললেন, কামভাব শূন্য কোনও লোক পৃথিবীতে নেই ‘কাম ভাবেত জেন নাহি কোন জনে।’ তুমি আমাকে অনুমতি দাও, তবে ‘কটাক্ষে ছলিতে পারি সে সবের মন।’ দেবীর কথা শুনে শিব ধ্যানে বসে সমস্ত সিদ্ধাদের ডেকে পাঠালে তাঁরা এলেন এবং ‘বসিল সকল সিদ্ধা শিব বিদ্যমান।’
এবার অন্নপূর্ণা সবাইকে খেতে দিলেন। তাদের সামনে একটি থালাতে জলে ভর্তি করে রেখে সেই জলে নিজের ‘কোমল শরীর’-এর প্রতিবিম্ব দেখালে শিষ্যদের ‘কামবাণে ভেদিলেক স্থির নহে মন।’ দেবীর মায়া বুঝতে না পেরে চার শিষ্য দেবীকে কামভাবে পেতে চাইলেন চার ভিন্ন উপায়ে। মীননাথ ভাবলেন– এমন সুন্দরীকে যদি পাই, তবে তাকে বিচিত্র শস্যায় নিয়ে ‘রঙ্গ কতুকে তবে রজনি গোঞাই’। দেবী তাঁর কামভাব বুঝতে পেরে তাঁকে অভিযোগ দিলেন তাই হবে, তুমি কদলি দেশে গিয়ে ষোলশ ‘কদলি লইয়া তুহ্মি কর কেলি।’ হাড়িফা মনে মনে ভাবলেন ‘এমন সোন্দরি তবে আহ্মি যদি পাই’ তবে ‘হাড়ি কর্ম করি যদি থাকি তার পাশ’। দেবী জানতে পেরে বললেন তথাস্তু, সেই বরই তুমি পাবে, তোমার অভিলাষ পূর্ণ হবে। তুমি ময়নামতীর কাছে গিয়ে হাতে ঝাঁটা কাঁধে কোদাল নিয়ে হাড়ির কাজ করোগে। কানুপা মনে মনে ভাবলেন, এমন সুন্দরীর সঙ্গে কেলি করে যদি মরে যাই– সেও ভাল। জানতে পেরে দেবী বললেন তবে তুমি ডাহুক পাখি হয়ে এখুনি চলে যাও– ‘আনন্দ করা গিয়া রমণীর ঘর।’ এরপরে ‘গাড়ুর সিধাই’ ভাবলেন ‘এমন কামিনী যদি ভজে মোর ঠাঁই’ তাতে যদি আমার হাত-পা কাটা যায়, সেও ভাল। আমি শালিবাহন রাজার ছেলে হতে রাজি আছি। দেবী বর দিয়ে বললেন– তাহলে তুমি সৎ মায়ের কাছে যাও; তোমাকে জোয়ান দেখে ‘সৎ মাএ ভজিব তোরে’। সব শেষে গোরক্ষনাথ মনে মনে ভাবলেন আমার যদি এমন একজন মা থাকেন, তবে ‘তাহার কোলে ত বসি সুখে দুগ্ধ খাই।’ তিনি যদি আমাকে ‘গুয়ে-মুতে’ পালন করেন তবে তাঁর ‘স্তনদুগ্ধ’ অন্ন খেয়ে বেঁচে থাকি।’
তাই শুনে দেবী জব্দ হলেন। আর সবাইকে কামরূপে ছলনা করেছি, একে ত পারলাম না ‘অবশ্য ছলিমু তোরে আর রূপ ধরি’। দেবীর কথা শুনে শিব হেসে বললেন– ‘গোর্খ হেন সিদ্ধা নাই জগত ভিতর’। তাকে তুমি যদি ভোলাতে পার তাহলে দেখি! একে একে তিন সিদ্ধাই প্রার্থিত দেশে চলে গেলে দেবী সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে শুয়ে রইলেন। দেবীকে সেই অবস্থায় দেখে গোরক্ষনাথ দেবীদেহকে গাছের পাতা দিয়ে ঢেকে দিলেন। কামনাশূন্য গোরক্ষনাথের কাছে দেবীকে আবার হার স্বীকার করতে হল। দেবী মরিয়া হয়ে গোরক্ষকে শাস্তি দেবার জন্যে তাঁর পেটের মধ্যে মাছি হয়ে ঢুকে পড়লেন। তা বুঝতে পেরে গোরক্ষনাথ যোগবলে দশমী দুয়ার, দশ ইন্দ্রিয় বন্ধ করে দিলেন– দেবীর প্রাণ যায়-যায় অবস্থা। বের হবার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে লাগলেন তিনি। খুব নাকাল করে তবে তিনি দেবীকে ছাড়লেন, কিন্তু বের হবার সময় দেবীর কাঁকাল গেল ভেঙে। সেই অবস্থায় গোরক্ষের অভিশাপে তিনি রাক্ষসীর বেশে পথে পড়ে রইলেন আর প্রত্যেকদিন একটি করে মানুষ খেতে লাগলেন। এদিকে শিব শিবানীকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে গোরক্ষনাথকে ধরে জিগ্যেস করলেন ‘কথা গেল মোর নারী তুহ্মি কি করিলা’। শিবের কুৎসিত ইঙ্গিত শুনে গোরক্ষনাথ হেসে বললেন ‘ভাঙ্গ ধুতুরা খাও কি বলিব তোরে। কথাত হারাইছ নারী ধর আসি মোরে।’ গোরক্ষনাথ পরে দেবীকে দেখতে পেয়ে ‘দেবী হয়ে তুমি মানুষ ধরে খাচ্ছ’ ইত্যাদি বলে গঞ্জনা দিয়ে শেষ অবধি তাঁকে রাক্ষসী অবস্থা থেকে মুক্তি দিলেন। তখন শিব গৌরীকে নিয়ে ফিরে গেলেন।
এদিকে গর্ভেশ্বর রাজকন্যা বিরহিনী ভাল স্বামী পাবার জন্য শিবের আরাধনা আরম্ভ করেছিলেন। শিব মনে মনে ভাবলেন, গোরক্ষনাথ দুর্গার বড় অপমান করেছে, একটা চালাকি করে তার প্রতিশোধ নেওয়া যাক। শিব ঐ রাজকন্যার সঙ্গে গোরক্ষনাথের বিয়ের আয়োজন করলেন। শিবের আদেশে গোরক্ষ বালিকাটিকে বিয়ে করলেন বটে, কিন্তু স্বামী হয়েও ‘ছয় মাসের শিশু’ হয়ে ‘দুগ্ধ খাইবার’ জন্যে ওঁয়া ওঁয়া করে কাঁদতে লাগলেন। বালিকা স্ত্রী তো হতভম্ব ‘ভাল স্বামী পাইল দগ্ধ খাইবার চাহে।’ তিনি কাঁদতে আরম্ভ করলেন। বললেন, শিবপূজো করে তোমাকে স্বামী হিসেবে পেয়েছি, তুমি কেন আমার সঙ্গে কপটতা করছ? তখন হেসে গোর্খ তাঁকে বলেন আমি না স্ত্রীলোক, না পুরুষ আমি একটা শুকনো কাঠমাত্র– ‘শরীরে ত রস নাহি কাঠা সমতুল।’ আমি একটা যোগসিদ্ধ মানুষ। যাইহোক, আমার কৌপীনটি ধুয়ে তুমি জলপান করলে ‘সিদ্ধাপুত্র জন্মিব দেখিবা বিদ্যমান’। কন্যা সেইমত কাজ করলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং দশ দণ্ড পরেই তাঁর ‘ছাওয়াল জন্মিল’। গোরক্ষনাথ পুত্রের নাম রাখলেন কর্পটিনাথ। তারপরে স্ত্রীপুত্রকে ছেড়ে ও বিজয়নগর ছেড়ে বকুলগাছের নিচে বসে থাকার সময় তার কাছে আকাশপথে এসে উপস্থিত হলেন কানুপা।
কানুপা গোরক্ষনাথকে তাঁর গুরু মীননাথের হালফিল খবর দিলেন যে ‘তোর গুরু পড়িয়াছে কদলীর ভোলে।’ তাঁর শরীর জীর্ণ হয়ে পড়েছে, মরার দশা। তাঁকে দেখে আমি যমের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, মীননাথের আর তিনদিন মাত্র আয়ু আছে, তাড়াতাড়ি গিয়ে তুমি গুরুর প্রাণ রক্ষা করা।
গোরক্ষও কানুপাকে বললেন, দেখ তোমার গুরু হাড়িফাও খুব একটা ভালো অবস্থাতে নেই। তিনিও মেহেরকুলে ময়নামতী নামে এক বিধবা রাজমহিষীর ছেলের কোপে পড়েছিলেন এবং সেই রাজপুত্র হাড়িফাকে বেঁধে মাটির নিচে ঘর করে সেখানে জ্যান্তে পুঁতে রেখেছে। শুনে কানুপা (কানফা) ‘মেহেরকুল দেশ’-এ চলে গেলেন আর গোরক্ষনাথও গুরুর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কান্ফার কাহিনি আর আমরা এখানে পাই না, পাই ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এ। (তার কাহিনি যখন বলা হবে তখন হাড়িফা কানুফার পরবর্তী কাহিনী জানা যাবে।)
এদিকে গোরক্ষনাথ ১৬০০ কদলী রমণীদের কবল থেকে গুরুকে উদ্ধার করার জন্যে, আগে যমপুরে গিয়ে গুরুর ভাগ্য লিখন জানতে গেলেন। যমরাজ তাঁকে সসম্মানে নিজের কাছে বসিয়ে বললেন যে ‘যোগী যদি আনিতে চাহ আপনা ভুবন। চল যাই তোহ্মি আহ্মি ব্রহ্মার সদন।’ তাই শুনে গোর্খ খুব রেগে গেলে যমরাজ মীননাথের নথিপত্র আনিয়ে তাঁর পরমায়ু যে তিনদিন মাত্র আছে তা মুছে ফেলে দেবার ব্যবস্থা করে গুরুকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচালেন।
এরপরে ভাবতে লাগলেন নিজের রূপ ধরে কদলী রাজ্যে যাওয়া ঠিক হবে না, ওরা জানতে পারলে আমাকে মেরে ফেলবে। তখন তিনি লঙ্গ ও মহালঙ্গ নামে দুই দূতকে ডেকে বললেন চল আমরা বিশ্বকর্মার কাছে গিয়ে সোনার পৈতা, সোনার ছাতা, সোনার ছড়ি, সোনার কুণ্ডলী গড়িয়ে নিয়ে আসি। গোরক্ষের আদেশে লঙ্ক বিশ্বকর্মার কাছে সব কথা জানিয়ে বললেন যে গুরু কদলীরাজ্যে ব্রাহ্মণের বেশে ঢুকতে চান, সেজন্য সোনার এই সব সাজসজ্জার দরকার। বিশ্বকর্মা সেইমত সব করে দিলে লঙ্গ মহালঙ্গকে নিয়ে ব্রাহ্মণবেশে কদলীর রাজ্যে হাজির হলেন। কিন্তু ঢোকার আগে ভাবলেন ব্রাহ্মণ দেখে লোকে যদি প্রণাম করে তখন তো তাকে আশীর্বাদ করতে হবে, তাতে যদি বিপরীত ফল ফলে। সেজন্য ব্রাহ্মণবেশ ছেড়ে তিনি যোগীবেশ ধারণ করে শূন্যে ভর করে কদলীরাজ্যে প্রবেশ করলেন।
সেখানের সম্পদ ও সৌন্দর্য দেখে চমকে যেতে হয়। এক রমণী কাঁখে কলসী নিয়ে জল নিতে এলে ‘দেখিয়া নাথের রূপ কৈন্যা পড়ে ভোলে’– কন্যা তো গোরক্ষনাথের কাছে গিয়ে নিজের গুণের কথা সাতকাহন করে বলতে লাগলেন লাজলজ্জা ছেড়ে, তার ‘পয়োধরে বস্ত্র নাহি রত্তন হার দোলে।’ তুমি কে? মীননাথের পর তো এদেশে কোনও যোগী নেই। পরদেশী যোগীকে পেলে আমরা দক্ষিণ পাটনে তাকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলি। মঙ্গলা কমলা দুই পাটেশ্বরী আছে। বিদেশে আসিছ তুহ্মি না জান আচার।’
যাই হোক, তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। আমি লুকিয়ে তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাই চল– তোমাকে আমি পুষবো। শুনে গোরক্ষ বললেন, আমি তো ভিক্ষে করে খাই, এমন কোনও দেশের কথা তো শুনিনি যেখানে ভিখারিকে মেরে ফেলে। কদলীর রাজা কেন প্রাণ বধ করেন? আমাকে তোমাদের মিনাই (মীননাথ)-কে দেখাতে পার? শুনে সেই ‘রাউলের ঝি’ বলেন, কোনও পুরুষ সেখানে যেতে পারে না, তবে তুমি যদি ‘নাটুয়া’ বেশে যাও তো তার ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি। যাই হোক, সৌন্দর্য ও রত্নভাণ্ডারের বর দিকে তাঁকে কোনও প্রকারে বিদায় করে দিয়ে ‘গোরক্ষনাথ চলি গেল মীনের অন্তর’। সেখানে গিয়ে আপন শিঙ্গাতে আওয়াজ তুললে মীননাথ চমকে উঠলেন। দেখ দেখ তো কে এসেছে? দারোয়ান আর ১৬০০ রমণী অস্ত্র হাতে বেরিয়ে পড়লেন। ‘অন্তরিক্ষে থাকি গোর্খে বোলে হরি হরি’। এই বলে দুই শিষ্যের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে বিশ্বকর্মার কাছে পাঠিয়ে দিলেন ‘নিত্তকির সাজ’ অর্থাৎ নর্তকীর সাজ আনাতে। তারা সাজ আনলে তাদের দুজনকে দোহার করে নর্তকী বেশে মীননাথের সভায় গিয়ে হাজির হলেন গোর্খনাথ। ‘এরূপ নাটুয়া নাহি দেখি কোন কালে’– সবাই খুব মজা পেলেন। গোর্খনাথ নিজেকে ‘ইন্দ্রের নাটুয়া’ বলে পরিচয় দিয়ে এখানে নাচ-গান করবেন বলে এসেছেন তা জানিয়ে দিলেন। দুই পাটরানী তাকে ‘বাটাভরি ধন’ দেবার লোভ দেখিয়ে চলে যেতে বললেন। যাই হোক দারোয়ানকে ঘুষের লোভ দেখিয়ে মীননাথের কাছে গিয়ে তিনি মাদলে আওয়াজ তুললেন। মাদলের ধ্বনিতে মানুষের কথা বলছে শুনে মীননাথ অবাক হবে ভাবছেন। এ কেমন নাটুয়া? তাঁর আদেশে মঙ্গলা নাটুয়াকে রাজার কাছে এনে দিলেন। নাচেগানে ‘মাদলের গানে কহে গুরুরে বুঝাই।’ মাদলের আওয়াজ তাঁকে গুরু ডাকছে শুনে মীননাথ অবাক। আমার তো দুই শিষ্য গোর্খনাথ আর গাড়ুর সিধাই। আর তো কেউ আমাকে গুরু বলে ডাকে না। মাদলের আওয়াজেই গোর্খনাথ বলেন ‘সিস্য পুত্র চিনি লও গুরু মীননাথ। কিন্তু ‘ষোলশ নারীর মধ্যে একলানাগর’ মীননাথের চেতনা আর ফেরে না– তিনি ‘কামরসে ভোল’ হয়ে থাকলেন।
যাইহোক শেষ পর্যন্ত শিষ্যকে চিনতে পারলেন তিনি। শিষ্য বার বার মাদলে ঘা দিয়ে বলতে থাকেন ‘কায়া সাধ কায়া সাধ মাদলেতে বোলে’– বিন্দুক্ষয় নয় বিন্দুধারণ করে যোগ সাধনায় তিনি গুরুকে প্রবুদ্ধ করতে থাকলেন নিরন্তর। কিন্তু নিত্য কামসাধনায় মৃতপ্রায় মীননাথ বলেন ‘চলিতে না পারি আহ্মি গাএ নাহি বল।’ তখন যোগসাধনার নানা গুহ্য উপায় সঙ্কেতে বলতে লাগলেন গোর্খ। এর মধ্যে দিয়েই নাথধর্মের সাধ্য ও সাধনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই উল্টা সাধনায় ‘পাকিছে মাথার কেশ হই জাইব কালা’– পাকাচুল পর্যন্ত কালো চুলে পরিণত হয়ে যায়। এতেই তুমি উদ্ধার পেয়ে যাবে।
নাটুয়া এই সব যোগসাধনার পরামর্শ দিচ্ছেন দেখে ‘কদলির যুবতি’রা একত্রিত হয়ে তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে দেখে মীননাথ তাঁদের বললেন ‘জোগি পুত্র গোর্খনাথ’ আমাকে জ্ঞান দিয়েছে, তোমরা আমাকে ছেড়ে ‘সব চলি যাও ঘরে।’ কিন্তু তারা এতো সহজে ছেড়ে দেবেন কেন। নানা লাস্যে তারা মীননাথকে প্রলুব্ধ করতে লাগলেন। অন্যদিকে গোর্খনাথ গুরুকে ‘চারিচন্দ্র’ সাধনা, উল্টাযোগের কথা বলে চলেছেন। সেই যোগসাধনা করতে অক্ষম মীননাথ দুঃখের সঙ্গে শিষ্যকে বললেন– আমার মরণকাল উপস্থিত। মরণের সময় তোমাকে দেখলাম, বড় আশ্বস্ত হয়েছি এতে। কিন্তু গাভুরের (কানুপা) মুখ দেখতে পেলাম না বলে আফশোস রয়ে গেল। একটাই প্রার্থনা ‘আমি মৈলে তুমি আসি দিও মোরে মাটি’। তাঁর মনে মহাজ্ঞান লাভের বাসনা হল। কিন্তু তাঁকে সাংসারিক মায়ায় আবদ্ধ করার জন্যে কদলীরমণীগণ তাঁর পুত্র বিন্দুনাথকে এনে কোলে বসিয়ে দিলেন। আবার চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। গোর্খনাথ ভাবলেন তাঁর সাধনা কি তবে ব্যর্থ হবে? তিনি গুরুকে মোহমুক্ত করার জন্যে বিন্দুনাথকে মেরে ফেললেন। তাতে গুরু এবং কদলীযুবতীরা কেঁদে ওঠায় তিনি আবার বিন্দুনাথকে বাঁচিয়ে দিলেন। রমণীরা গুরুকে ঘিরে আছেন দেখে গোরক্ষনাথ অগ্নি হেন জ্বলে উঠে ‘চন্দ্র সূর্য সাক্ষি’ করে রমণীদের অভিশাপ দিলেন– ‘গোর্খের শাপেতে উঠ হইয়া পতঙ্গ’ এই বলে হাতে তুড়ি মেরে সমস্ত রমণীদের বাদুড়ে পরিণত করে দিলে ‘সকল কদলি গেল শূন্য হইল পুরি’– দেশ রমণীশূন্য হচ্ছে দেখে ‘ভ্রম ভাঙ্গিল মীন হইল চেতন।’ তিনি যোগাসনে বসলেন আর বিন্দুনাথকেও যোগাসনে বসালেন। যোগের সাহায্যে মীননাথ ‘স্থির হৈল কায়া’।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৫৬-৬০)

        এখানেই গোরক্ষবিজয় কাব্য সমাপ্ত হয়েছে। দীর্ঘ উদ্ধৃতিটি হুবহু উপস্থাপনের অন্যতম কারণ হলো কাহিনির যে আক্ষরিক অর্থ তার পেছনে অন্য কোন সন্ধ্যা ভাষার মাহাত্ম্য জড়িয়ে থাকাটাই এক্ষেত্রে অতি স্বাভাবিক। তার সাধনগত অর্থের সন্ধান ও চর্চা তান্ত্রিক গুহ্যসাধক বা সিদ্ধাচার্যদেরই অধিগম্য। ফলে অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের ভাষ্যে– ‘কাহিনিটিকে রূপক কাহিনি, কাল্পনিক কাহিনি যাই বলি না কেন– একেবারে ভিত্তিহীন গল্প কোনওভাবেই বলতে পারি না। কিংবদন্তীরও একটি ভিত্তি থাকে। নারীর মায়ায় পড়লে যোগীদেরও পতন ঘটে এবং যোগের সাহায্যেই শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্ধার– এমন শিক্ষা এখানে থাকলেও, এই কাহিনির বড় বৈশিষ্ট্য এখানে যে গুরু পথ দেখান তিনিই যখন পথ ভ্রষ্ট হন, তখন শিষ্যই তাঁকে যোগপথে ফিরিয়ে আনেন। শিষ্যের মহিমাই এখানে কীর্তিত। আবার কাহিনির মধ্যে যোগসাধনার বিভিন্ন প্রক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে। এর পদ্ধতি এবং অর্থ উল্টাবাচন নির্ভর। একমাত্র সাধকই এর সন্ধান জানেন। দেহকে কেন্দ্র করেই কায়সাধনায় যোগীর মুক্তি –এই ধর্মের সাহিত্যের মুখ্য বক্তব্য। গল্প এবং সাধনার এমন সুন্দর মেলবন্ধন আমরা কদাচিৎ পাই।’

নাথ-সাহিত্যের কদলীরাজ্য :
প্রসঙ্গত, নাথধর্ম ও সাহিত্যের সঙ্গে যে শব্দবন্ধটি খুব প্রচলিত তা হলো ‘কদলীর দেশ’ বা ‘কদলীরাজ্য’। একাদশ শতক থেকে প্রধানত গীতিকাব্যগুলিতে গোপীচাঁদের সন্ন্যাস, মীনচেতন, গোরক্ষবিজয়, ময়নামতীর গান– সর্বত্রই কদলীরাজ্যের সবিশেষ উল্লেখ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়ে গবেষকদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। যদিও ‘কদলী’ শব্দের সাধারণ অর্থ কলা, নাথধর্ম-সাহিত্যে কদলীর রাজ্য অর্থে বুঝানো হয় নারীদের দেশ বা নারীরাজ্য– যেখানে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, পুরুষেরা সেখানে থাকেন বটে, তবে তাদের সংখ্যা আঙুলে গোনা যায়। মহাভারতেও এমনতর রাজ্যের সন্ধান মেলে– কিম্পুরুষবর্ষ। ‘কিম্পুরুষ’ শব্দটির একটি গূঢ় অর্থ আছে। একটি ঘোর বনে (এটিই কার্তিকেয়ের জন্মস্থান) উমা ও মহাদেব ক্রীড়ারত ছিলেন। উমাকে খুশি রাখার জন্য মহাদেব মাঝে মাঝেই স্ত্রীরূপ ধারণ করে খেলা করছিলেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে বনের সমস্ত পুরুষ-জন্তু, পুরুষ-বৃক্ষ– সব স্ত্রীত্ব প্রাপ্ত হয়েছিল। এখানে শিকার করতে করতে ঢুকে পড়েছিলেন (অর্থাৎ কুমারবনে) জনৈক রাজা ইল। তিনিও স্ত্রীলোকে পরিণত হয়ে যান। এমনি তার স্বামী-অনুচরেরাও স্ত্রীলোক হয়ে যান। রাজা তখন মহাদেবকে কাকুতি-মিনতি করে তাঁকে পুনরায় পুরুষ করে দিতে বলেন। মহাদেব রাজি হলেন না দেখে তিনি উমার হাতে-পায়ে পড়লেন। তখন তিনি একমাস পুরুষ আর পরের একমাস স্ত্রী হয়ে থাকার বর পান। এই অবস্থাকেই বলা হয় কিম্পুরুষত্ব। তাঁর বাস করার জায়গাটিও তখন থেকে কিম্পুরুষবর্ষ নামে চিহ্নিত হয়ে যায়। এ জায়গাটি যে কোথায় তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একমতে এটি জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত হেমকূট পাহাড়ে, অন্যমতে এটি দক্ষিণদেশের অন্তর্গত। বলা বাহুল্য, জম্বু হলো মেরুপর্বতের দক্ষিণ দিকের একটি গাছ। এই গাছের নাম অনুসারেই দ্বীপটির নাম হয় জম্বুদ্বীপ। অশোক অনুশাসনে তাঁর সাম্রাজ্য জম্বুদ্বীপ নামে উল্লিখিত। সিংহলের পালিগ্রন্থেও আফগানিস্তানসহ ভারতবর্ষকে জম্বুদ্বীপ বলা হয়েছে বলে জানা যায়। আবার পুরাণ মতে সুমেরু পাহাড়ের দক্ষিণে এই দ্বীপ অবস্থিত। অন্য একটি মতে কিম্পুরুষ দেশ হলো আসলে নেপাল। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের অভিমত হলো–
‘এসব থেকে দুটি বিষয় আমাদের মনে হয়েছে নারীশাসিত একটি দেশ ছিল এবং এই দেশের সৃষ্টি-কাহিনির সঙ্গে শিবের উপাখ্যান জড়িত। নাথ ধর্ম শৈব ধর্মানুগত, অতএব নাথ সম্প্রদায়ের সঙ্গে এর যোগ থাকা অসম্ভব নয়। কিন্তু নাথ ধর্মে কিম্পুরুষবর্ষ বা কিম্পুরুষদেশ বলে কিছু পাচ্ছি না। কদলী শব্দের সঙ্গে নারীকে যুক্ত করে দেওয়ার আপাত কারণও স্পষ্ট হয় না। তবে নারীর জঙ্ঘাদেশকে কদলীকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করার উল্লেখও বহু প্রাচীন। অমরুশতকে পেয়েছি ‘ঊরুদ্বয়ং মৃগদৃশঃ কদলস্য কাণ্ডৌ’। বিদ্যাপতি লিখেছেন ‘ঊরুযুগ কদলী’, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রয়েছে ‘ঊরু শোভে বিপরীত রামকদলী’। মহাভারতে, বনপর্বে ১৪৬তম অধ্যায়ে ভীমকে কদলীখণ্ডে প্রবেশ করতে দেখেছি– সেটি গন্ধমাদন পর্বের সানুদেশে বহুযোজন বিস্তৃত একটি দেশ। ‘কদলীনারী’রা এই কদলীদেশের অধিবাসিনী। রামায়ণে প্রমীলা রাজ্যকে নারীদের দেশ বলা হয়েছে। মীননাথকৃত প্রমীলার প্রত্যাখ্যান কাহিনিও আমাদের স্মরণে এসে যায় এই প্রসঙ্গে।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৬১)
ফলে ‘গোরক্ষবিজয়’ কাব্যে যে দেশের বর্ণনায় বলা হয়েছে–

এহি রাজ্য বড় হএ ভালা।
চারি কড়া কড়ি বিকাএ চন্দনের তোলা।
লোকের পিধন পাটের পাছড়া।
প্রতি ঘর চালে দেখে সোণার কোমড়া।
কার পথরির পানি কেহ নাহি যাএ।
মণিমাণিক্য তার রৌদ্রেতে সুখাএ।
এছাড়া–
স্থানে স্থানে দেখে সব অমরানগর।
সকল নগরে দেখে উচ্চ উচ্চ ঘর।
সুবর্ণের ঘর সব পতাকা রচিত।
সকল দেশের লোক রতনে ভূষিত।।
রাজ্যের সকল দেখে তার ভাল রঙ্গ!
প্রতি ঘর দ্বারে দেশে হিরণ্যের টঙ্গ।।
ধন্য ধন্য রাজনগর করিয়া বাখানি।
সুবর্ণের কলসে সর্ব্বলোকে খাএ পানি।।
অর্থাৎ রাজ্যটি বেশ ভাল। একতোলা চন্দনের দাম মাত্র চার কড়া কড়ি। লোকেদের পরিধানের পট্টবস্ত্র, প্রত্যেক লোকের বাড়ির চালে রয়েছে সোনার চালকুমড়ো। কেউ অন্যের পুকুরের জল খায় না (অর্থাৎ প্রত্যেকেরই নিজের পুকুর আছে)। মণি-মানিক তারা রোদে শুকোতে দেয়। স্থানে স্থানে গোরক্ষ দেখতে পেলেন স্বর্গপুরীর মত নগর। সব নগরেই উঁচু উঁচু বাড়ি। তাতে উড়ছে সোনার পতাকারাজি। সমস্ত লোক গহনা পরিহিত। প্রত্যেকের ঘরের দরজায় আছে সোনার মাচা। সবাই সোনার কলসিতে জল খায়।

        এমন একটি সম্পদশালী রাজ্যের সিংহাসনে বসে আছেন কমলা ও মঙ্গলা নামে দুই বোন। তাঁদের মন্ত্রী এবং পারিষদের সংখ্যা ১৬০০ এবং সকলেই নারী। প্রজারা সবাই যুবতী নারী– ‘স্ত্রীরাজ্য হএ সে জে স্ত্রী হএ রাজা।’ এবং এই কদলিরাজ্য ‘নারি বিনে নাহি রাজ্যে পুরুষের ঘ্রান।’ পুরুষের সংখ্যা অত্যন্ত কম, সেজন্য এক একজন পুরুষের ঘরে ‘দুই চারি মাই’– প্রত্যেকেই বহুপত্নীক। এহেন রাজ্যের নাম আগেই বলা হয়েছে কদলী দেশ, এর রাজধানীর নাম কদলী নগর, অধিবাসীরাও কদলী নামে পরিচিত। সেজন্যে গোরক্ষনাথ ‘ধরিয়া ব্রাহ্মণরূপ কদলীতে জাএ/একদিষ্টে কদলীর সভা সবে চাএ’। এহেন রাজপুরীতে একমাত্র পুরুষ মীননাথ–

সোল স কদলী আইল করি নানা সাজ
বসিলেক চারি পাশে মীন করি মাঝ।।

        অতএব, ‘এরকম একটা রাজ্যের ঐতিহাসিক পরিচয় দেবার জন্য পণ্ডিতেরা উঠে পড়ে লেগেছিলেন। নলিনীকান্ত ভট্টশালী মনে করেন ‘কামরূপ মণিপুর-ব্রহ্মদেশ’ হলো কদলীরাজ্য। ডঃ শহীদুল্লাহ-এর মতে এটি কাছাড় জেলায়। হারানচন্দ্র চাকলাদারের মতে এটি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কোনও একস্থানে অবস্থিত। লামা তারানাথের পাগ্সাম্ জোন্জ্ঝান্ (১৭৪৭ খিঃ) গ্রন্থে কদলীরাজ্যের যে উল্লেখ আছে, তা বঙ্গদেশের কোনও স্থানে বলেই তার অনুমান। ‘গোরক্ষবিজয়’অনুসারে গোরক্ষনাথ কদলীদেশে যান বকুল থেকে সোজাসুজি। আর বকুল যান তিনি বিজয়নগর থেকে। তাঁর অভিশাপেই কদলী নারীগণ বাদুড়ে পরিণত হন সে কাহিনিও আমরা অন্যত্র বলেছি। এই প্রসঙ্গে এসে যায় বৌদ্ধতান্ত্রিকদের প্রধান কেন্দ্র ওড্ডিয়ান-এর কথা। এর দুটি প্রদেশ শাম্ভব ও লঙ্কাপুরী।… মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে এটি উড়িষ্যায়। লঙ্কা, গৌহাটি থেকে ৯৫ মাইল দূরে নওগাঁ জেলার একটি মৌজা ও রেলস্টেশন। এই নওগাঁ থেকে ২৪ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ভবকা। ভবকা-র ২১ মাইল দক্ষিণপূর্বে এবং লঙ্কা স্টেশন থেকে সমদূরত্বে আছে বকুলিয়া গ্রাম। গোরক্ষনাথ এই বকুল দেশে এসেছিলেন বিজয়নগর থেকে। ভবকার কাছে নওগাঁ শহরের ১১ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে একটি মৌজার নাম কন্দলী। এখানে প্রাচীন মন্দিরে হরপার্বতীর ভগ্নমূর্তি ও শিবলিঙ্গ পাওয়া গেছে। কন্দলী চা বাগানের তিন মাইল ঈশান কোণে পাহাড়ে উপরে একটি গুহার নাম বাদুলী কুরুং। গুহার ভিতরে লক্ষ লক্ষ বাদুড়ের বাস। কন্দলী পাহাড়ের একটি অংশের নাম বামুনী পর্বত। কন্দলী এবং বামুনী পর্বতের কাছাকাছি মিকিড় পাহাড়ে প্রচুর চন্দন গাছ– রপ্তানি পর্যন্ত হত। কে জানে এখান থেকেই ‘চারি কড়া’য় এক তোলা চন্দন পাওয়া যেতো কিনা।
…এতোগুলি পারিপার্শ্বিক অবস্থান, লক্ষণ এবং যুক্তিবিচার করেই নাথধর্মের অন্যতম বিশ্লেষক-ব্যাখ্যাতা পণ্ডিত রাজমোহন নাথের সিদ্ধান্ত নওগাঁ জেলার এই কন্দলীই হল নাথ সাহিত্যে উল্লিখিত কদলীরাজ্য।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৬৩-৬৪)

        প্রসঙ্গত, পণ্ডিত রাজমোহন নাথ দেখিয়েছেন মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথ নাথধর্মের আদিগুরু। কিন্তু অন্য আর-একজন মীননাথ আছেন, যিনি আসলে লুইপাদ (লুই শব্দের অর্থ মাছের উদর) এবং তিনিই দোহা ও কৌলজ্ঞান রচয়িতা। লুই আদি চর্যাগীতিকার সেকথা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রমাত্রেই জানেন। সে কারণে দু’জন মীননাথকে নিয়ে বিভ্রান্তি এসে যায়। দ্বিতীয় জন হলেন নব মৎস্যেন্দ্রনাথ। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বক্তব্য হলো–
‘গোরক্ষবিজয় নামক গ্রন্থ বর্ণিত কাহিনী অনুযায়ী, যা মীনচৈতন্য নামে পরিচিত, গোরক্ষ তাঁর আত্মবিস্মৃত গুরু মীননাথকে কদলীদেশের রমণীদের মোহ থেকে উদ্ধার করেন। মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ সম্পর্কে অনেক পরস্পর বিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। কৌলজ্ঞাননির্ণয় নামক তান্ত্রিক গ্রন্থে তাঁকে যোগিনী কৌলের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে তিনিই সহজিয়া বৌদ্ধ সাধক লুইপাদের সঙ্গে অভিন্ন। বৌদ্ধ সিদ্ধসমূহের তিব্বতী তালিকায় মৎস্যেন্দ্রনাথ উল্লিখিত। নেপালে মৎস্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের সমীকরণ করা হয়েছে। নেপালে তাঁর উদ্দেশ্যে আজও রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাঙালী মুসলমানদের নিকট তিনি মছন্দলী বা মোচরা পীর নামে পরিচিত। মুনিদত্ত বিরচিত চর্যাগীতিকোশে মৎস্যেন্দ্রনাথের উপর আরোপিত কয়েক ছত্র রচনা পাওয়া যায়।’
‘বজ্রযানী গ্রন্থসমূহে মৎস্যেন্দ্র এবং গোরক্ষ সিদ্ধ হিসাবে উল্লিখিত। গোরক্ষনাথের পূজা নেপাল ও উত্তর ভারতে সমধিক প্রসিদ্ধ। উত্তর ভারতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী গোরক্ষ জাতিতে মৎস্যজীবী, কেওটিয়া বা কৈবর্ত ছিলেন। বঙ্গদেশীয় ঐতিহ্যে তিনি গোয়ালা ছিলেন। গোরক্ষনাথের কোন নিজস্ব রচনার উল্লেখ তিব্বতী তালিকায় নেই। গোরক্ষ-সংহিতা নামে অনেক পরবর্তীকালে রচিত একটি গ্রন্থ অবশ্য আছে। উত্তর ভারতের গোরক্ষ পন্থ একটি গুহ্য সাধন পদ্ধতি যার সঙ্গে তন্ত্র ও যোগের সম্পর্ক আছে।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২৫৭-৫৮)

হাড়িপা এবং ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের কাহিনী :
হাড়িপা সম্পর্কিত লৌকিক কাহিনীটির প্রথম অংশ আমরা গোরক্ষবিজয় কাব্য থেকে পেয়েছি। দেবী গৌরী পঞ্চসিদ্ধাকে সংসারী করার চেষ্টা হিসেবে নারীর প্রতি তাঁদের আসক্তি যাতে আসে তার জন্য নিজস্ব ছলাকলা প্রয়োগ করেছিলেন। দেবীর সৌন্দর্যে মোহিত হাড়িপার মনে হয়েছিল:

তবে মনে চিন্তিলেক হাড়িফা সিধাই।
এমন সোন্দরি তবে অহ্মি যদি পাই।।
হাড়ি কর্ম্ম করি যদি থাকি তার পাশ।
পাইতে সোন্দরি মোর মনে হাবিলাস।।

        তাঁর এই ‘হাবিলাস’ (অভিলাষ)-এর কথা বুঝতে পেরে দেবী বলেন–

হাসিয়া বলেন দেবী পাইলা এহি বর।
হাড়িরূপ ধরি নাও মনামতি ঘর।।
হাতে ঝাড়ু লও (তুহ্মি) কাঁধে (ত) কোদাল।
চলহ আমার আঙ্গাএ বর পাইলা ভাল।।

        অর্থাৎ দেবী তাঁকে তার হাতে ঝাঁটা, কোদাল নিয়ে ময়নামতীর ঘরে থাকার বর দিলেন। মোটকথা তিনি রানী ময়নামতীর আস্তাবলের ঝাড়ুদার হতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই রানী ছিলেন একজন সিদ্ধ ডাকিনী যিনি সহজেই হাড়িপার অলৌকিক শক্তির পরিচয় পান। ‘ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের কাহিনি’ থেকে আমরা জানতে পারি, গোপীচন্দ্র বা গোবিন্দচন্দ্রের মা ময়নামতী ছিলেন গোরক্ষনাথে শিষ্য। ময়নামতীর বাবা ছিলেন রাজা তিলকচন্দ্র। ময়নামতী যখন কিশোরী ছিলেন তখন ময়নামতী নাম ছিল না, নাম ছিল শিশুমতি। গোরক্ষনাথ এই কিশোরী শিশুমতিকেই দীক্ষা দিয়ে ‘মহাজ্ঞান’ শিক্ষা দান করেন। এই মহাজ্ঞানের সাহায্যে মরা মানুষকেও বাঁচিয়ে তোলা যায়। শিশুমতির গুরুপ্রদত্ত নাম হয় ময়নামতী। ময়নামতী বড় হলে তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় মানিকচন্দ্রের। বিয়ের পর ময়নামতী স্বামীকে মহাজ্ঞান শিখিয়ে দিতে চান, বলেন– ‘এই জ্ঞান প্রভাবে চিরায়ু হওয়া যায় এবং রোগ শোক দূর হয়’। এইসব প্রলোভন দেখানো সত্ত্বেও মানিকচন্দ্র কোনওভাবেই মহাজ্ঞান শিখতে রাজি হননি। এই নারাজ হওয়ার কারণ– স্ত্রীকে গুরু হিসেবে স্বীকার করে তার কাছে মাথা হেঁট করার পুরুষের কাছে আর কী অপমান বাকি থাকতে পারে? স্ত্রীকে তিনি বললেন– আমি কিছুতেই তোমাকে গুরু বলে স্বীকার করে নিতে পারবো না।
ওদিকে মানিকচন্দ্র ত্রিপুর-রাজবংশের রীতি মেনে আরও চারটি প্রধানা এবং আরও একশ’ আশিটি বিয়ে করেছেন। তাঁদের বয়স অল্প, যৌবনমদে মত্তা। তাঁদের সঙ্গে সামান্য কারণেই ময়নামতীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে। সব দেখে শুনে যুবতী স্ত্রীদের আকর্ষণে মানিকচন্দ্র ময়নামতীকে রাজধানী থেকে তাড়িয়ে দিলেন। ময়নামতী বাধ্য হয়ে পৃথগন্ন হয়ে ‘ফেরুসা’ নগরে বাস করতে লাগলেন।
এর মধ্যে মানিকচন্দ্রের আয়ু শেষ হয়ে এলো। তখন ময়নামতীকে রাজপ্রাসাদে আসার জন্য খবর পাঠানো হলো। ময়নামতী এলেন। মানিকচন্দ্রের মৃত্যুকালে ময়নামতী গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন– তাঁর নাম হলো গোবিন্দচন্দ্র। শৈশবেই তিনি পিতার পরিত্যক্ত সিংহাসনের অধিকারী হলেন, কিন্তু রাজ্যশাসনের ভার থেকে গেল ময়নামতীর হাতেই।
দেখতে দেখতে গোবিন্দচন্দ্র যৌবনে পা দিলেন। ঢাকার অন্তর্গত সাভারের রাজা হরিশ্চন্দ্রের পরমাসুন্দরী কন্যা অদুনার সঙ্গে পুত্র গোবিন্দচন্দ্রের বিয়ে দিলেন ময়নামতী। রাজার ছোট মেয়ে পদুনাকেও গোবিন্দচন্দ্র যৌতুক হিসেবে পেলেন– ‌’অদুনাক বিভা কৈল পদুনাক পাইল দানে।’ (অন্য একটি পুথিতে আছে যে দাক্ষিণাত্যের রাজা রাজেন্দ্র কোল তাঁর কন্যার সঙ্গে গোবিন্দচন্দ্রের বিয়ে দিয়ে সন্ধিস্থাপন করেন)। দুই বোনই গোবিন্দচন্দ্রের শ্রেষ্ঠা মহিষী হয়ে উঠলেন। তাঁর আরও স্ত্রী অবশ্য হয়েছিল।
গোবিন্দচন্দ্রের বয়স যখন আঠারো, তখন ময়নামতী গণনা করে জানতে পারলেন যে এই আঠারো বছর বয়সে তাঁর ছেলে যদি বারো বছরের জন্যে সন্ন্যাস গ্রহণ না করেন তবে তাঁর অবস্থা তাঁর বাবার মতোই হবে– তিনি অকালে মারা যাবেন। তাই তিনি পুত্রকে সন্ন্যাস নেবার কথা বললেন। তাতে পুত্র এবং তাঁর যৌবনবতী পত্নীরা একযোগে বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন। এতেও ময়নামতী পিছু হঠলেন না। তিনি সিদ্ধযোগী হাড়িপা’র কাছে গোবিন্দচন্দ্রকে সন্ন্যাসে দীক্ষা নিতে বললেন। কিন্তু নিম্ন-জাতীয় হাড়ির কাছে গোবিন্দচন্দ্র দীক্ষা নিতে এক্কেবারেই নারাজ। তিনি সরাসরি মাকে দুশ্চরিত্রা আখ্যা দিয়ে হাড়িপার সঙ্গে তাঁর ব্যাভিচারের সম্পর্কের কথা বললেন। তিনি স্পষ্টত বললেন– তুমি যদি এতোই সতী হও, তবে আমার বাবা যখন মারা গেলেন তখন ‘সতী’ হবার জন্যে তুমি সহমরণে যাওনি কেন?

হাট গ্যাছেন বাজার গ্যাছেন কিনিয়া খাইয়াছেন খই।
আমার পিতার মরণের দিন সতি গ্যাছেন কই।।

        মাতৃচরিত্রে গুরুতর অভিযোগ করে পুত্র বলেছেন–

হাড়ির খাইছ গুআ মা হাড়ির খাইছ পান।
ভাব করিয়া শিখিয়া নিছ ঐ হাড়ির গেয়ান।।
হাড়ির গেয়ানে তোমার গেয়ানে জননি একত্র করিয়া।
আমার পিতাকে মারিছেন মা জহরবিস খোয়াইয়া।।
বুদ্ধি পরামর্শে আমায় বনবাসে পাঠায়া।
শ্যাসে বিটি খাবেন তুমি ঐ হাড়ি নিয়া।।

        আমরা ‘গোরক্ষবিজয়ে’র কাহিনীতে দেখেছি, পার্বতীর অভিশাপে হাড়িপা’র এমনতর অবস্থান ঘটবেই। কাজেই ময়নামতী-হাড়িপার মধ্যে গোপন সম্পর্কের ইঙ্গিত যে গোবিন্দচন্দ্র নিছক রোষবশত করেননি তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এদিকে অদুনা-পদুনা স্বামীকে পরামর্শ দিলেন মাকে বলো, তিনি যে শুদ্ধ চরিত্রের তার প্রমাণ দিতে হবে। পুত্র মায়ের চরিত্র পরীক্ষার জন্যে সুকঠোর পরীক্ষার আয়োজন করতে লাগলেন। ময়নামতী সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় দিয়ে পুত্রের মনের সন্দেহ দূর করলেন। তখন উপায়ান্তর না দেখে গোবিন্দচন্দ্র হাড়িপা-র কাছেই সন্ন্যাস নিতে রাজি হলেন। তরুণী বধূরা এতো চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে চোখের জলে ভাসতে লাগলেন।
গোবিন্দচন্দ্রকে সন্ন্যাস নিয়ে বনে যেতেই হলো। মাথা মুড়িয়ে যোগীর বেশ ধরে হাড়িপাকে গুরু বলে মেনে নিয়ে তিনি বারো বছরের জন্য ঘর ছেড়ে গেলেন। তাতেও হাড়িপা’র মন ওঠে না। তিনি শিষ্যকে পরীক্ষা করার জন্য হিরানটীর কাছে মাত্র বারো কড়া কড়ি নিয়ে শিষ্যকে বন্ধক রেখে তাঁকে ‘না তিরি না পুরুষ’ করে চলে গেলেন। হিরানটী গোবিন্দচন্দ্রকে কামপাশে আবদ্ধ করার জন্য নানা ছলাকলা করেও শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন গোবিন্দচন্দ্রের সংযমের কাছে। শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নেবার জন্যে গোবিন্দচন্দ্রকে নানা উৎপীড়ন করতে লাগলেন।
বারো বছর পার হবার পর তাঁর গুরু হাড়িপা এসে হিরা নটীর কাছে শিষ্যের মুক্তি চেয়ে নিলেন এবং বারো কড়া কড়ি ফেলে দিলেন। শিষ্যের কাছে হিরার অত্যাচারের কথা শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে হাড়িপা তাঁকে বাদুড় হয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিলেন।
দেশে ফেরার পথে হাড়িপা শিষ্যকে নানা কঠোর পরীক্ষা করে নিয়ে তারপরে ‘আড়াই অক্ষরের মহাজ্ঞান’ শিখিয়ে দিলেন। এতো কাল পরে সন্ন্যাসীর বেশে রাজা দেশে ফিরে এলেন, কিন্তু অদুনা তাকে দেখেও চিনতে পারলেন না। বরং অন্দরমহলে এক অপরিচিত পুরুষ ঢুকে পড়েছে এজন্যে তাঁকে পায়ে পিষে মেরে ফেলার জন্য রাজহস্তীকে নিযুক্ত করলেন আর রাজবাড়ির বিশালাকার কুকুরকে তাঁর পিছনে লেলিয়ে দিলেন। পশু হলেও তারা তাদের প্রভুকে চিনতে পারলো– রাজহস্তী মাথা নিচু করে হেঁট হয়ে বসে শুড় দিয়ে রাজাকে অভ্যর্থনা জানালো। তার চোখে জল গড়িয়ে পড়লো। তখন অদুনা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠলেন– ‘প্রভু, বনের পশু তোমাকে চিনতে পেরেছে। কিন্তু পোড়াকপালি আমি, তোমাকে চিনতে পারলাম না।’
একে একে পদুনা ও অন্য স্ত্রীরা এবং মা ময়নামতী গোবিন্দচন্দ্রের পরিচয় পেয়ে আনন্দে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। তখন রাজাকে পুনরায় সিংহাসনে বসানো হলো। অতঃপর তিনি সুখে রাজত্ব করতে লাগলেন।

         এই পর্যন্ত পৌঁছে ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের কাহিনীর একটা স্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। কিন্তু লৌকিক কাহিনীর একটা ধর্মই হলো কালে কালে স্থানে স্থানে এর নানা পরিবর্তন ঘটে যায়। তাই অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের বর্ণনায় পাই–
‘দুর্লভ মল্লিকের ‘গোবিন্দচন্দ্রের গীত’-এ দেখি (এই কাব্যে গোপীচন্দ্রকে গোবিন্দচন্দ্র বলা হয়েছে) গোবিন্দচন্দ্র পাকাপাকিভাবে সংসার ছেড়ে যাবার আগেই হাড়িপার উপদেশে যোগী হয়ে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছিলেন। বারো বছর পর পুনরায় সংসারে ফিরে এসে গোবিন্দচন্দ্র সেই ব্রহ্মজ্ঞানের সাহায্যে স্ত্রীদের নানা রকমের যোগবিভূতি দেখিয়ে মন ভোলানো চেষ্টা করছেন জানতে পেরে হাড়িপা খুব রেগে যান এবং গোবিন্দচন্দ্রের অলৌকিক ক্ষমতা কেড়ে নেন। তাতে তিনি আর স্ত্রীদের অদ্ভূত কেরামত দেখাতে না পারায় তাঁদের কাছে খুব অপ্রস্তুত হলেন। মেয়েদের কাছে হেরে যাওয়া পুরুষের কাছে খুব লজ্জার ব্যাপার, তাই রাজা রেগে গিয়ে অদুনা-পদুনার কুপরামর্শে হাড়িপাকে মাটির তলায় পুঁতে দেবার জন্যে আদেশ দিলেন। সেই অবস্থা মাটির তলায় হাড়িপা বারো বছর আটকে রইলেন।’
‘এরপরে (এই কাহিনি আমরা গোরক্ষবিজয়ে বলে এসেছি) দেখি, একদিন গোরক্ষনাথ একটি গাছের তলায় বসে আছেন, এমন সময় আকাশ পথে গাভুরসিদ্ধা বা কানুপা সেখানে এসে হাজির হন এবং তাঁর কাছে থেকে কানুপা জানতে পারলেন যে তাঁর গুরু হাড়িপা মেহেরকুলে মাটির নিচে পোঁতা আছেন। কানুপা শিশুযোগীর বেশ ধরে সেখানে হাজির হয়ে রাজার কাছে হুঙ্কার ছাড়লেন। রাজা তাঁর যোগবিভূতির তখা জানতে পেরে কানুপার শরণ নিলেন। তখন রাজা মাটির তলা থেকে হাড়িপাকে তোলার জন্য আদেশ দিলেন। রাজাকে হাড়িপার ক্রোধ থেকে রক্ষা করার জন্যে কানুপা রাজার মতো দেখতে তিনটি পুতুল তৈরি করে মাটির উপরে রেখে দিলেন। হাড়িপা মাটির তলা থেকে উঠেই ধ্যান ভেঙ্গে চোখ মেলেই সামনে পুতুলগুলো দেখতে পেলেন। তাঁর রোষদৃষ্টিতে পুতুলগুলো ভস্মীভূত হয়ে গেল। রাজা কোনওক্রমে হাড়িপার রাগ থেকে বাঁচলেন। এর পেরে রাজা সংসার বাসনা ছেড়ে স্ত্রীদের রাজ্যে রেখে গুরুর নির্দেশে দক্ষিণ দেশে সমুদ্রতীরে যোগীর বেশে সাধনায় রত হলেন– কেবল বছরে একবার করে দেশে আসতেন। পুত্র পুরোপুরি যোগী হয়েছেন দেখে মাতা ময়নামতীর আনন্দের সীমা থাকল না।’– (নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৬৮-৬৯)
আগের কাহিনীতে গোবিন্দচন্দ্রের সংসারে থাকা এবং পরের কাহিনীটিতে তাঁর যোগী হয়ে যাওয়া– দুই বিপরীত পরিণাম থেকে নাথ সিদ্ধাদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষদের মধ্যে যে দুটি পৃথক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল– তা বুঝতে অসুবিধা হয় না বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেন।

নাথ-দর্শন ও হঠযোগ :
নাথধর্ম বস্তুতই এমন এক যৌগিক বিষয় এবং এখানে এতো বিভিন্ন ও বহুমুখী ঐতিহ্যের সমন্বয় হয়েছে, যা অনুসরণে প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় বহু লুপ্ত ব্যাপারের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে এবং অনেক জটিল ও অব্যাখ্যাত প্রশ্নের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। এবং অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ভাষ্যে–
‘নাথ সাধনা সম্পর্কে সংক্ষেপে যা বলা যায় তা হচ্ছে এই যে এই ধর্মের উদ্ভব বহু সংস্কৃতির সমবায়ে ঘটেছিল। ব্রাহ্মণ্য প্রভাব এই ধর্মে অল্প, এবং নাথ সম্প্রদায় এই স্বাতন্ত্র্য দীর্ঘকাল বজায় রেখেছিল। সম্প্রতি অবশ্য এই সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিকাশ ঘটেছে, কেউ কেউ রুদ্রজ ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচিত হতে চাইছেন। তাঁদের আচার অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে রুদ্রজ ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু নাথ ধর্ম একান্তই লৌকিক ধর্ম যার প্রধান কৃতিত্ব হচ্ছে যে হিন্দুসমাজের নানা বর্ণের মানুষদের সামনে তা একটি নতুন জীবনাদর্শ উপস্থাপিত করতে সমর্থ হয়েছিল, জাতিপ্রথাকে অস্বীকার করার প্রয়াস পেয়েছিল। মূলত খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যেই এই ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। ধর্মের তত্ত্বসমূহ গড়ে উঠেছিল মূলত শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত ও বৌদ্ধ তন্ত্রসমূহের লৌকিক ও উদারপন্থী বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে। এই সকল ধর্মের মানবিক ও মানবকল্যাণমুখী দিকগুলির উপরেই নাথপন্থীরা জোর দিয়েছিলেন।’
‘নাথপন্থা অনুযায়ী চরম সত্তার দুটি দিক, যাদের প্রতীক সূর্য এবং চন্দ্র। সূর্য হচ্ছেন কালাগ্নি যিনি বিনাশের আদর্শ, যিনি মৃত্যু ও ধ্বংসের পদ্ধতির ধারক। পক্ষান্তরে চন্দ্র হচ্ছেন অপরিবর্তনীয়তার আদর্শ। নাথপন্থার চরম আদর্শ হচ্ছে নিজের মধ্যে অদ্বয়ের উপলব্ধি যা সম্ভব অমরত্ব অর্জন ও দিব্য দেহের দ্বারা। এই অদ্বয় অবস্থার প্রতীক সাধারণত শিব, যা চন্দ্র ও সূর্যের সংযোগের দ্বারা সম্ভব। দিব্য এবং অপরিবর্তনীয় দেহ অর্জন হঠযোগের এবং রসায়নের দ্বারা সম্ভব। সেখানে চন্দ্র সূর্যের মিলন ঘটবে। এই মিলনটা যে প্রতীকী বলাই বাহুল্য।’- (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২৫৮-৫৯)

        আর যেহেতু নাথপন্থার চরম আদর্শ হচ্ছে নিজের মধ্যে অদ্বয়ের উপলব্ধি যা সম্ভব অমরত্ব অর্জন ও দিব্য দেহের দ্বারা, তাই নাথপন্থা অনুযায়ী–
‘কায়সাধনের দ্বারা দিব্যদেহ লাভ করা যায়। চন্দ্র হচ্ছেন সোম বা অমৃতের উৎস যিনি মানবদেহে অবস্থিত সহস্রার অঞ্চলের (মস্তিষ্ক প্রদেশ) নীচে থাকেন। যে নির্যাস পরিদৃশ্যমান মানবদেহকে টিকিয়ে রাখে তা উৎপন্ন হয় ওই সোম বা অমৃত থেকে। একে ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলেই অমরত্ব অর্জন করা যায়। কিন্তু এখানে একটি বিরাট অসুবিধা আছে। দেহের মধ্যে অবস্থিত চন্দ্র বা সোম থেকে ক্ষরিত অমৃতবিন্দু সূর্য শুষে নেন, যে সূর্য বাস করেন মানবদেহের নাভিমূলে। কাজেই এই অমৃতকে সূর্যের হাত থেকে রক্ষা করা দরকার। সেটা একটি উপায়ে করা সম্ভব। দেহের মধ্যে একটি আঁকাবাঁকা সর্পাকার নালী আছে (বঙ্ক-নাল), যার দুটি মুখ এবং যা শংখিনী নামেও পরিচিত। এই নালীর মুখটি, যা দিয়ে সোম ক্ষরিত হয়, দশমদ্বার নামে পরিচিত। এই মুখটি বন্ধ করতে পারলেই কাল বা মৃত্যুরূপী সূর্যের গ্রাস থেকে সোম বা অমৃতকে রক্ষা করা সম্ভব। এর জন্য কায়সাধন দরকার। কোন কোন গ্রন্থে তান্ত্রিক কুলকুণ্ডলিনীকে জাগানোর পদ্ধতির দ্বারাই অমৃতক্ষরণ রোধ করা যাবে এমন কথাও বলা হয়েছে।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২৫৯)

        বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নাথযোগীর কায়াসাধনের প্রধান পন্থাই হলো হঠযোগ। ভারতবর্ষীয় প্রায় সকল উপাসক সম্প্রদায়ের মধ্যেই দৈহিক কায়সাধন প্রধানতম সাধনপ্রক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃত। আর তান্ত্রিক সাধকদের মধ্যে কায়সাধনের উপায় হিসেবে যোগাভ্যাস চর্চাই সর্বাধিক গৃহীত এবং সাধক যোগীদের সাধনপন্থায় হঠযোগকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। হঠপ্রদীপিকা, দত্তাত্রেয়সংহিতা, গোরক্ষসংহিতা– এই তিন গ্রন্থে যোগী-সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠেয় যোগপ্রণালীর আসন প্রাণায়ামাদি সমুদায় অঙ্গের ও ষট্চক্র-সাধনের সবিশেষ বৃত্তান্ত বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। গ্রন্থান্তরে তন্ত্রসাধনা বিষয়ক আলোচনায় এই হঠযোগ প্রসঙ্গ আলোচিত হলেও নাথপন্থীদের সাধনায় হঠযোগের প্রাসঙ্গিকতা অতি নিবিড় হওয়ায় এখানে তার কিছুটা পুনরাবৃত্তি করা হলো। দত্তাত্রেয়সংহিতায় যোগের অষ্ট অঙ্গ সম্পর্কে বলা হয়েছে–

যমশ্চ নিয়মশ্চৈব আসনঞ্চ ততঃ পরম্ ।
প্রাণায়ামশ্চতুর্থঃ স্যাত্ প্রত্যাহারশ্চ পঞ্চমঃ।।
ষষ্ঠী তু ধারণা প্রোক্তা ধ্যানং সপ্তমমূচ্যতে।
সমাধিরষ্টমঃ প্রোক্তঃ সর্বপুণ্যফলপ্রদঃ।।- (দত্তাত্রেয়সংহিতা)
অর্থাৎ : যম প্রথম, নিয়ম দ্বিতীয়, তৎপরে আসন তৃতীয়, প্রাণায়াম চতুর্থ, প্রত্যাহার পঞ্চম, ধারণা ষষ্ঠ, ধ্যান সপ্তম, এবং সমস্ত পুণ্য-ফল-দায়ক সমাধি অষ্টম অঙ্গ।

       তবে গোরক্ষসংহিতা’য় হঠপ্রদীপিকা ও দত্তাত্রেয়সংহিতার প্রণালীক্রমে আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি এই ছয় যোগাঙ্গ নির্দেশিত হলেও যম ও নিয়ম এই দু’টি অঙ্গের প্রসঙ্গ নেই। যেমন–

আসনং প্রাণসংরোধঃ প্রত্যাহারশ্চ ধারণা।
ধ্যানং সমাধিরেতানি যোগাঙ্গানি বদন্তি ষট্ ।।- (গোরক্ষসংহিতা)
অর্থাৎ : আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি– এই ছয়টি বিষয় যোগের অঙ্গ বলিয়া উল্লিখিত হয়।

        গোরক্ষসংহিতায় যম ও নিয়মের বিষয়টি উল্লিখিত না হলেও হঠপ্রদীপিকার প্রথম উপদেশে কিন্তু যম ও নিয়মের সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়েছে–

অহিংসা সত্ত্যমস্তেয়ং ব্রহ্মচর্য্যং কৃপার্জবম্ ।
ক্ষমাধৃতির্ম্মিতাহারঃ শৌচং চেতি যমা দশ।।
তপঃ সন্তোষ আস্তিকাং দানং দেবস্য পূজনম্ ।
সিদ্ধান্তশ্রবণঞ্চৈব হ্রী মতিশ্চ জপোহুতম্ ।।
দশৈতে নিয়মাঃ প্রোক্তা যোগশাস্ত্রবিশারদৈঃ।। (হঠপ্রদীপিকা প্রথম উপদেশ)
অর্থাৎ : যোগশাস্ত্র বিশারদদের মতে অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, কৃপা, ক্ষমা, ধৃতি, সারল্য, পরিমিত আহার, শৌচাচার এই দশের নাম যম। তপস্যা, সন্তোষ, আস্তিকতা, দান, দেব-পূজা, সিদ্ধান্ত শ্রবণ, লজ্জা, মতি, জপ, হোম, এই দশের নাম নিয়ম।

         কেবল পরিমিত আহার নয়, ভোজন বিষয়েও যোগীদের এমন কিছু কঠোর নিয়ম পালন করবার ব্যবস্থা রয়েছে যে তাতে করে তান্ত্রিক পঞ্চতত্ত্বের সাধনগামিতা থেকে এই যোগীদের সাধনপন্থার ভিন্নতা খুব সহজেই পরিলক্ষিত হয়। এই যোগীরা বস্তুত নাথ-যোগী বা অবধূত-যোগী। কারণ হঠপ্রদীপিকার বিধানানুসারে অম্ল, লবণ, কটু, তিক্ত– এই চার প্রকার রস এবং মৎস্য, মাংস, মদ্য প্রভৃতি তাদের অভক্ষ্য ঘোষণা করে বলা হয়েছে–

কটুম্লতিক্তলবণোষ্ণহরীত শাক-
সৌবীরতৈলতিলসর্ষপমত্সামদ্যম্ ।।
অজাদিমাংসদধিতক্রকুলন্থকোল-
পিন্যাকহিঙ্গুলসুনাদ্যমপথ্যমাহুঃ।।- (হঠপ্রদীপিকা)
অর্থাৎ : কটু, অম্ল, তিক্ত, লবণ, উষ্ণ দ্রব্য, হরীত শাক, বদরী ফল, তৈল, তিল, সর্ষপ, মৎস, মদ্য, ছাগলাদির মাংস, দধি, তক্র, কুলন্থ, কলায়, বরাহ মাংস, পিন্যাক, হিঙ্গু, লসুনাদি দ্রব্য যোগীদিগের অপথ্য।

গোধূমশালিয়বযষ্টিশভৌনান্নং
ক্ষীরাদ্যখণ্ডনবনীতসিতামধূনি।
শুঠোকপোলকফলাদিকপঞ্চশাকং
মুদ্গাদিদিব্যমূদকঞ্চ যমীন্দ্রপথ্যম্ ।।- (হঠপ্রদীপিকা)
অর্থাৎ : গোধূম, শালিধান্য, যব, যষ্টিক ধান্যরূপ সুচারু অন্ন, ক্ষীর, অখণ্ড নবনীত, চিনি মধু, শুণ্ঠী, কপোলক ফল, পঞ্চশাক, মুদ্গ প্রভৃতি এবং উত্তম জল এই সকল সামগ্রী যোগীর পথ্য।

        শুধু তাই নয়, তন্ত্র-সাধনায় পঞ্চোপচারে যেখানে মৈথুনতত্ত্ব আবশ্যকীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, সেখানে এই যোগীদের জন্য দত্তাত্রেয়সংহিতায় স্ত্রী-সংসর্গ কোনরূপেই কর্তব্য নয় বলে বিধানারোপ করে বলা হয়েছে–

যদি সঙ্গং করোত্যেব বিন্দুস্তস্য বিনশ্যতি।
আয়ুক্ষয়োবিন্দুহীনাদসামর্থঞ্চ জায়তে।।
তস্মাৎ স্ত্রীণাং সঙ্গবর্জ্যং কুর্যাদভ্যাসসমাদরাৎ।
যোগিনোহঙ্গল্য সিদ্ধিঃস্যাৎ সততং বিন্দুধারণাৎ।।- (দত্তাত্রেয়সংহিতা)
অর্থাৎ : স্ত্রী-সঙ্গ করিলে বিন্দু-ক্ষয় হয় এবং বিন্দু-ক্ষয় হইলে আয়ু-নাশ ও বল বিনাশ হয়। অতএব যত্নপূর্বক স্ত্রীলোকের সঙ্গ ত্যাগ অভ্যাস করিবে। বিন্দু ধারণ দ্বারা যোগীদের যোগাঙ্গ সমুদায় সতত সিদ্ধ হইয়া থাকে।

        হঠপ্রদীপিকায় বিধান আছে যে, হঠযোগীরা উপদ্রব-শূন্য নির্জন-স্থানে অবস্থিতিপূর্বক যোগ-মঠে উপবিষ্ট হয়ে যোগাভ্যাস করবেন। এই মঠ যে স্থানে যেভাবে নির্মাণ করতে হবে এবং যেভাবে পরিষ্কৃত রাখতে হবে তাও বর্ণিত হয়েছে এভাবে–

সুরাজ্যে ধার্মিকে দেশে সুভিক্ষে নিরুপদ্রবে।
একান্তমাঠকামধ্যে স্থাতক্যং হঠযোগিণাম্ ।।- (হঠপ্রদীপিকা)
অর্থাৎ : যেখানে বহু সংখ্যক ধার্মিক লোকের বাস আছে এবং সুন্দররূপ ভিক্ষা পাওয়া যায় এইরূপ উপদ্রব-শূন্য উত্তম রাজ্য-স্থিত যোগ মঠে হঠযোগীরা নির্জনে বাস করিবেন।

স্বল্পদ্বারমরন্ধ্রগর্তপিটকং নাত্যুচ্চনীচায়তং
সম্যগ্গোময়সান্দ্রলিপ্তমমলং নিঃশেষবাধোজ্ঝিতম্ ।
বাহ্যেমণ্ডপকূপবেদিরচিতং প্রাকারসম্বেষ্টিতং
প্রোক্তং যোগমঠস্য লক্ষণমিদং সিদ্ধৈর্হঠাভ্যাসিভিঃ।।- (হঠপ্রদীপিকা)
অর্থাৎ : যোগ-মঠ ক্ষুদ্র দ্বার বিশিষ্ট, রন্ধ্রহীন, না অতি উচ্চ না নিম্ন, সম্যকরূপে গোময়-লিপ্ত, পরিষ্কৃত ও নিঃশেষরূপে যোগ-বাধক দ্রব্য-বিহীন হইবে, বাহিরে মণ্ডল, কূপ ও বেদি প্রস্তুত হইবে, এবং সমগ্র মঠ প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকিবে। হঠযোগীরা যোগমঠের এইরূপ লক্ষণ বলিয়া গিয়াছেন।

        এভাবে যোগ-মঠ সর্বদা পরিষ্কৃত রেখে এবং সুগন্ধ দ্বারা সুবাসিত করে তার মধ্যে উপবেশনপূর্বক যোগাভ্যাস করার কথা দত্তাত্রেয়সংহিতায় বলা হয়েছে। এখানে বলা বাহুল্য যে, হঠযোগীদের এই দেহাশ্রয়ী হঠযোগ চর্চা তান্ত্রিক বামাচারী কায়সাধনেও আবশ্যক বিবেচিত হয়ে থাকে। তাই বর্তমান আলোচনা শেষ করার আগে এই হঠযোগাভ্যাসের অন্য বিশিষ্ট দিকগুলো সম্পর্কে আমরা সংক্ষেপে কিছুটা পরিচিত হতে পারি।
হঠযোগচর্চায় উপবেশনের যে নানারূপ কৌশল আছে, তাকে আসন বলে। এই আসন চৌরাশি প্রকার, তার মধ্যে পদ্মাসনই সচরাচর প্রচলিত। দত্তাত্রেয়-সংহিতায় ঐ আসনই শ্রেষ্ঠ আসন বলে উক্ত হয়েছে, যদিও হঠপ্রদীপিকায় সিদ্ধাসন সর্বশ্রেষ্ঠ বলে লিখিত আছে। কিভাবে এই আসন অনুষ্ঠান করতে হয়, তা গোরক্ষসংহিতায় বলা হয়েছে–

বামোরূপরি দক্ষিণং হি চরণং সংস্থাপ্র্য বামং তথা–
প্যন্যোরূপরি তস্য বন্ধনবিধৌধৃত্বা করাভ্যাং দৃঢ়ম্ ।
অঙ্গুষ্ঠং হৃদয়ে নিধায় চিবুকং নাসাগ্রমালোকয়ে-
দেতদ্ব্যাধিবিনাশকারি যমিনাং পদ্মাসনং প্রোচ্যতে।।- (গোরক্ষসংহিতা)
অর্থাৎ : বাম ঊরুপরি দক্ষিণ পদ ও দক্ষিণ ঊরুপরি বাম পদ সংস্থাপন করিবে, ও যেরূপ করিয়া কোন বস্তু বন্ধন করিতে হয় সেইরূপে পশ্চাৎভাগ দিয়া দুই হস্ত দ্বারা অঙ্গুষ্ঠ ধারণ করিবে এবং চিবুক বক্ষঃস্থলে স্থাপন করিয়া নাসিকার অগ্রভাগ দৃষ্টি করিতে থাকিবে। যতিদিগের এই আসনকে পদ্মাসন বলে। ইহা ব্যাধি-নাশক।

        এভাবে আসন-বদ্ধ হয়ে যোগের প্রাণায়াম করার বিধান রয়েছে অর্থাৎ নাসিকা দ্বারা শরীর-মধ্যে বায়ু পূরণ ও ধারণ করে পরে রেচন করবে। তার বিশেষ বিশেষ কাল, সংখ্যা ও প্রকার উল্লিখিত যোগশাস্ত্রগুলিতে সবিস্তারে বর্ণিত আছে। যোগশাস্ত্রের বিধানক্রমে- শরীর-মধ্যে বায়ু-স্তম্ভন অর্থাৎ নিশ্বাস অবরোধ করাকে কুম্ভক বলে (দক্ষিণ হস্তেন নাসাপুটদ্বয়ং ধৃত্বা প্রাণায়ামাঙ্গং বায়ুস্তম্ভনমিতিতন্ত্রম), তা প্রাণায়ামেরই অঙ্গ-বিশেষ। কুম্ভক নানাপ্রকার–
‘যে কুম্ভকের দ্বারা বিজৃম্ভন এবং মুখ ও নাসিকার শীৎকার হয়, তাহার নাম শীৎকার-কুম্ভক। যে কুম্ভক দ্বারা বায়ু পূরণ-কালে ভৃঙ্গ-নাদ এবং রেচন-কালে ভৃঙ্গী-নাদ হয়, তাহার নাম ভ্রমরী-কুম্ভক। হঠপ্রদীপিকাররচয়িতা এইরূপ নানা কুম্ভকের বিবরণ করিয়া পরে লিখিয়াছেন, যোগীরা অভ্যাস-বলে রেচন ও পূরণ না করিয়াও কুম্ভকসাধন করিতে সমর্থ হন। এ অবস্থায় তাঁহাদের কিছুই দুর্লভ থাকে না। এইরূপ লিখিত আছে যে, ক্রমাগত অভ্যাস দ্বারা সাধকেরা আসন হইতে শূন্যে উত্থিত হইয়া অবস্থিতি করিতে পারেন।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় দ্বিতীয় ভাগ, অক্ষয় কুমার দত্ত)
যোগীদের এরকম বিশ্বাস আছে যে, প্রাণায়াম সিদ্ধ হলে দেহের লঘুতা, দীপ্তি ও অগ্নি-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। যেমন–

শরীরলঘুতা দীপ্তিতর্জঠরাগ্নিবিবর্ধনম্ ।
কৃশত্বঞ্চ শরীরস্য তস্য জায়েত নিশ্চিতম্ ।।- (দত্তাত্রেয়-সংহিতা)
অর্থাৎ : তাঁহার শরীরের লঘুতা ও দীপ্তি এবং জঠরাগ্নি-বৃদ্ধি ও দেহের কৃশতা অবশ্যই হয়।

        এভাবে প্রাণায়াম অভ্যাসে শরীর শুদ্ধ না হয়ে শ্লেষ্মাদি-ঘটিত পীড়া জন্মিলে, ধৌতী নেতী প্রভৃতি কতকগুলি ব্যাপারের অনুষ্ঠান করবার ব্যবস্থা যোগশাস্ত্রে বর্ণিত আছে, যেমন–

চতুরঙ্গুলবিস্তারং হস্তপঞ্চদশেন তু।
গুরুপদিষ্টমার্গেন সিক্তবস্ত্রং শনৈর্গ্রসেৎ।
ততঃ প্রত্যাহরেচ্চৈতৎ ক্ষালনং বস্তিকর্ম তৎ।।
কাসশ্বাসপ্লীহকুষ্ঠকক্ষরোগাশ্চ বিংশতিঃ।
ধৌতীকর্মপ্রসাদনে শুদ্ধ্যন্তে ন চ সংশয়ঃ।।- (হঠপ্রদীপিকা)
অর্থাৎ : দৈর্ঘ্যে পনের হাত ও প্রস্থে চারি অঙ্গুলি প্রমাণ একখণ্ড জলসিক্ত বস্ত্র গুরুপদিষ্ট পথ দ্বারা ক্রমশঃ গ্রাস করিবে এবং পরে তাহা নির্গত করিয়া ফেলিবে। ইহাকে বস্তি-কর্ম কহে। এই ধৌতী-কর্ম দ্বারা কাশ, শ্বাস, প্লীহা, কুষ্ঠ, কক্ষ-রোগ প্রভৃতি বিংশতি প্রকার রোগের শান্তি হয়।

        এভাবে, নাসিকা দ্বারা সূত্র প্রবেশ করিয়ে মুখ দ্বারা নির্গত করণের নাম নতী-কর্ম। আবার, নেত্র-যুগল স্থির করে যতক্ষণ না অশ্রুপাত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কোন সূক্ষ্ম লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টি রাখবার নাম ত্রাটক-কর্ম। এভাবে, শরীর-মধ্যে জল-পূরণ বায়ু-পূরণ ও ঐ উভয়ের নির্গমন প্রভৃতি নানাবিধ অনুষ্ঠানের বিধান আছে। এসব কর্মানুষ্ঠান ছাড়া যোগীরা কয়েক প্রকার অঙ্গ-ভঙ্গি প্রভৃতি অভ্যাস করে থাকেন, তার নাম মুদ্রা। যেমন–

অন্তঃকপালবিবরে জিহ্বাং ব্যাবত্ত বন্ধয়েৎ।
ভ্রূমধ্যে দৃষ্টিরপ্যেষা মুদ্রা ভবতি খেচরী।।- (দত্তাত্রেয়-সংহিতা)
অর্থাৎ : কপাল-বিবরের অভ্যন্তরে জিহ্বাকে ব্যাবৃত্ত ও বন্ধ করিয়া ভ্রূ-মধ্যে দৃষ্টি রাখিবে। ইহার নাম খেচরী মুদ্রা।

অধঃশিরশ্চোর্দ্ধপাদঃ ক্ষণং স্যাৎ প্রথমে দিনে।
ক্ষণাঞ্চ কিঞ্চিদধিকম্ভ্যসেদ্ধি দিনে দিনে।।
বলিতং পলিতং চৈব ষন্মাসাদ্ধি বিনাসয়েৎ।
যামমাত্রন্তু যো নিত্যমভ্যসেৎ স তু কালজিৎ।।- (হঠপ্রদীপিকা তৃতীয় উপদেশ)
অর্থাৎ : অধোভাগে মস্তক এবং ঊর্ধ্বদিকে পদ রাখিবে। প্রথম দিনে এইরূপ ক্ষণকাল সাধন করিবে এবং পরে দিন দিন অধিককাল ব্যাপিয়া অভ্যাস করিতে থাকিবে। এই প্রকার অনুষ্ঠান দ্বারা শুক্ল কেশ ও মাংস-কুঞ্চনরূপ বার্ধক্যের চিহ্ন ছয় মাস মধ্যে নষ্ট হইয়া যায়। প্রতিদিন এক প্রহর ব্যাপিয়া যিনি এইরূপ অভ্যাস করেন, তিনি মৃত্যুজয়ী হন।

        কুম্ভক করবার সময় ইন্দ্রিয় সকলকে স্ব স্ব বিষয় থেকে নিরস্ত করার অন্যতম যোগাঙ্গের নাম প্রত্যাহার। দত্তাত্রেয়-সংহিতায় বলা হয়েছে–

একবারং প্রতিদিনং কুর্য্যাৎ কেবলকুম্ভকম্ ।
প্রত্যাহারোহি এবং স্যাৎ এবং কুর্য্যুর্হি যোগিনঃ।।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যো যৎ প্রত্যাহরতে স্ফুটম্ ।
যোগী কুম্ভকমাস্থায় প্রত্যাহারঃ স উচ্যতে।।- (দত্তাত্রেয়-সংহিতা)
অর্থাৎ : প্রতিদিন একবার করিয়া কেবল কুম্ভক করিবে। এইরূপেই প্রত্যাহার হইবে। যোগীরা এই রূপই অনুষ্ঠান করিবেন। যোগীতে কুম্ভকের অনুষ্ঠানপূর্বক ইন্দ্রিয় বিষয় হইতে ইন্দ্রিয় সকলকে সম্যকরূপ প্রত্যাহার করে, এই নিমিত্ত ইহা প্রত্যাহার বলিয়া উল্লিখিত হয়।

        যোগের অন্য আরেক অঙ্গ ধারণা হলো শরীর-মধ্যে স্থান-বিশেষে বায়ু-ধারণ। এই ধারণা পাঁচ প্রকার– পৃথিবী ধারণা, আম্ভসী ধারণা, আগ্নেয়ী ধারণা, বায়বী ধারণা এবং নভো ধারণা।
‘পায়ু-দেশের ঊর্ধ্বে এবং নাভির অধোভাগে পাঁচ দণ্ডকাল বায়ু-ধারণের নাম পৃথিবী ধারণা। নাভি-স্থলে বায়ু-ধারণকে আম্ভসী, নাভির ঊর্ধ্ব মণ্ডলে বায়ু-ধারণকে আগ্নেয়ী, হৃদয়ে বায়ু-ধারণকে বায়বী এবং ভ্রূ-মধ্য হইতে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত মস্তকের সমুদায় স্থানে বায়ু-ধারণ করাকে নভো ধারণা কহে। যোগীদের বিশ্বাস এই যে, পৃথিবী ধারণ করিলে পৃথিবীতে মৃত্যু হয় না। আম্ভসী ধারণা করিলে জলে মৃত্যু হয় না, আগ্নেয়ী ধারণা করিলে অগ্নিতে শরীর দগ্ধ হয় না, বায়বী ধারণা করিলে কোন ভয় থাকে না এবং নভো ধারণা করিলে কোনরূপে মৃত্যু হয় না। শরীরের মধ্যে বায়ু-সঞ্চালন এবং বায়ু-ধারণই হঠযোগের প্রধান অনুষ্ঠান। গোরক্ষনাথ বলেন, বায়ু স্থির না হইলে কিছুই স্থির হয় না। সুতরাং সিদ্ধিলাভও হয় না।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, অক্ষয় কুমার দত্ত)

মন্-থীরিতে পবন্-থীর পবন্-থীরিতে বিন্দুথীর।
বিন্দুথীরিতে কন্দথীর বলে গোরক্ষদেব সকলথীর।।- (হঠপ্রদীপিকা-ধৃত গোরক্ষ-বাক্য)
অর্থাৎ : গোরক্ষদেব বলেন, মন স্থির হইলে বায়ু স্থির হয়, বায়ু স্থির হইলে বিন্দু স্থির হয়, বিন্দু স্থির হইলে কন্দ স্থির হয়, এবং তাহা হইলেই সকল স্থির হয়।

গজ বাধিয়া রাজ্য পবন বাধিয়া যোগী।
ধান্য বাধিয়া গৃহস্থ বিন্দু বাধিয়া ভোগী।।- (হঠপ্রদীপিকা-ধৃত নাথ-বাক্য)
অর্থাৎ : রাজা গজের বাধ্য, যোগী বায়ুর বাধ্য, গৃহস্থ ধান্যের বাধ্য, ভোগী বিন্দুর বাধ্য।

 

        এরপর আসে যোগের পরবর্তী অঙ্গ ধ্যান। যোগশাস্ত্রের মতে ধ্যান দুই প্রকার– সগুণ অর্থাৎ সাকার দেবতার ধ্যান, এবং নির্গুণ অর্থাৎ নিরাকার ব্রহ্মের ধ্যান। যোগীরা সগুণ ধ্যান দ্বারা অণিমাদি ঐশ্বর্য লাভ করেন, আর নির্গুণ ধ্যান দ্বারা সমাধিযুক্ত হয়ে ইচ্ছানুরূপ সকল শক্তি প্রাপ্ত হতে পারেন। দত্তাত্রেয়-সংহিতায় বলা হয়েছে–

সমভ্যসেত্তদা ধ্যানং ঘটিকাষষ্ঠীমেবচ।
বায়ুং নিরুদ্ধ তাং ধ্যায়েৎ দেবতামিষ্টদায়িনীম্ ।।
সগুণধ্যানমেতৎ স্যাদণিমাদিসুখপ্রদম্ ।
নির্গুণং খমির ধ্যায়ন্মোক্ষমার্গে প্রবর্ততে।।
নির্গুণধ্যানসম্পন্নঃ সমাধিঞ্চ সমভ্যসেৎ।
দিনদ্বাদশকেনৈব সমাধিং সমবাপ্নুয়াৎ।।- (দত্তাত্রেয়-সংহিতা)
অর্থাৎ : তখন ষাট দণ্ড কালই ধ্যান অভ্যাস করিবে, বায়ু নিরোধ করিয়া ইষ্টদায়িনী দেবতার ধ্যান করিবে। এই সগুণ ধ্যানে অণিমাদি সুখ লাভ হয়। আর আকাশের ন্যায় ব্যাপন-শীল নির্গুণ দেবতার ধ্যান করিলে, মোক্ষ-পথে প্রবৃত্ত হওয়া যায়। নির্গুণ-ধ্যান সম্পন্ন হইয়া সমাধি অভ্যাস করিবে। করিলে, দ্বাদশ দিনে সমাধি প্রাপ্ত হইবে।

         যোগীরা বিশ্বাস করেন, সমাধি সিদ্ধ হলে ইচ্ছানুসারে দেহত্যাগ বা দেহরক্ষা করে সুখ-সম্ভোগ করতে সক্ষম হন। কেননা তাঁদের বিশ্বাস, মহাদেব স্বীয় সাধককে নিম্নোক্ত অষ্ট ঐশ্বর্য দান করেন-

অণিমা লঘিমা ব্যাপ্তিঃ প্রাকাম্যং মহিমেশিত্য।
বশিকামাবসায়িত্বে ঐশ্বর্যমষ্টধা স্মৃতম।।- (শধশরদ্রুম-ধৃতশব্দমালা-বচন)
অর্থাৎ : অণিমা বা সূক্ষ্মতা অর্থাৎ ইচ্ছানুরূপ স্বীয় শরীর সূক্ষ্ম করিবার ক্ষমতা, লঘিমা বা লঘুতা অর্থাৎ ইচ্ছানুসারে নিজ দেহ লঘু করিবার ক্ষমতা, ব্যাপ্তি অর্থাৎ সর্বত্র গমন করিবার ক্ষমতা, প্রাকাম্য অর্থাৎ ভোগেচ্ছা পূর্ণ করিবার ক্ষমতা, মহিমা অর্থাৎ শরীরকে ইচ্ছামত স্থূল করিবার ক্ষমতা, ঈশিত্ব অর্থাৎ সকলকে শাসন করিবার ক্ষমতা, বশিত্ব অর্থাৎ সকলকে বশ করিবার ক্ষমতা এবং কামাবসায়িতা অর্থাৎ আপনার সর্ব কামনা পূর্ণ করিবার ক্ষমতা। এই আট প্রকার ক্ষমতার নাম অষ্ট ঐশ্বর্য।

        তাই সমাধি সিদ্ধ হলে, যদি দেহ-ত্যাগের ইচ্ছা হয় তবে যোগী তৎক্ষণাৎ পরব্রহ্মে লীন হতে পারেন, নতুনা অণিমাদি ঐশ্বর্য লাভ করে স্বেচ্ছানুসারে সকল লোকে অশেষবিধ সুখ-সম্ভোগ পূর্বক বিচরণ করতে পারেন। দত্তাত্রেয়-সংহিতায় বলা হয়েছে–

সর্বলোকেষু বিচরেদণিমাদিগুণান্বিতঃ।
কদাচিৎ স্বেচ্ছয়া দেবোভূত্বা স্বর্গেহপি সঞ্চরেৎ।
মনুষ্যোবাপি যজ্ঞোবা স্বেচ্ছয়াপি ক্ষণাম্ভবেৎ।
সিংহোব্যাঘ্রোগজোবাপি স্যাদিচ্ছাতো হন্যজন্মতঃ।।- (দত্তাত্রেয়-সংহিতা)
অর্থাৎ : অণিমাদি ঐশ্বর্য বিশিষ্ট হইয়া সর্বলোকে বিচরণ করেন, কদাচিৎ ইচ্ছাধীন দেব-রূপ ধারণ করিয়া স্বর্গ-লোকে ভ্রমণ করেন এবং জন্মান্তরে ইচ্ছামত ক্ষণমাত্রে মনুষ্য, যক্ষ, সিংহ, ব্যাঘ্র বা হস্তী হইয়া থাকেন।

        হঠপ্রদীপিকা প্রভৃতি গ্রন্থে যোগীদের অলৌকিক ক্রিয়া সাধনের এমন অনেক বৃত্তান্ত রয়েছে। এই সাধন-তান্ত্রিক বিশ্বাস যেগুলি সিদ্ধাচার্যদের গুহ্য সাধনা থেকেই উদ্ভূত বলে মনে করা হয়। উল্লেখ্য, ষট্চক্রভেদ যোগীদের একটি প্রধান সাধন। কিন্তু প্রক্রিয়াটি প্রায় অনুরূপ হওয়ায় এবং এ-বিষয়ে গ্রন্থান্তরে তন্ত্র-সাধনা প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে বিধায় এখানে তার পুনরুক্তি ঘটানো বাহুল্য হবে। তবে নাথ-সম্প্রদায় প্রসঙ্গে আলোচনা শেষ করার আগে নাথ-মত নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা তুলে দেয়া যেতে পারে।
অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয় ‘যোগি-জাতি’ শীর্ষক আলোচনায় এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, যোগীসম্প্রদায়ের ধর্মমতের বৈশিষ্ট্যও যে কী, তা তাদের নিজেদের মধ্যে যারা বিশেষ ব্যুৎপন্ন, তারাও একরূপ প্রায় ভুলে গেছে; সুতরাং তাদের সম্প্রদায়ের মূল নীতিগুলো এখান সাধারণের পক্ষে জানবার উপায় নেই। তিনি বলেন,–
‘এই সম্প্রদায়ের ধর্মমত কি, উপাসনা কিরূপ, তাহা সাধারণকে বোঝান যায় না। প্রথমত ইহাদের তত্ত্বের পরিভাষা লইয়াই গোলমাল। একস্থানে নাথ যোগীদের পরিভাষা বা ব্যাখ্যা অন্য এক স্থানে পরিভাষা বা ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ অনুরূপ নয়। কোথাও ঐক্য থাকে, আবার কোথাও অনৈক্য। এরূপ হইবার কারণ কি? পূর্বে সংজ্ঞা ও পরিভাষা একরূপই ছিল। বিভিন্ন সময়ের নাথগুরুরা প্রয়োজনমত একটু-আধটু পরিবর্তন করিয়াছিলেন। তারপর মাঝে কবিরপন্থী ও নানকপন্থীদের সময়ে অনেক মত নাথ যোগীদের ভিতর প্রবেশ করে। অন্যদিকে নাথদের অনেক মত উহারাও গ্রহণ করে। এখন যে নাথ-মত চলিতেছে, তাহার সঙ্গে আসল নাথ-মতের সম্বন্ধ খুব বেশি, একথা বলা যায় না। উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম-ভারতের নানা শ্রেণীর নাথদের সঙ্গে মিশিয়া, তাহাদের কার্যপ্রণালী পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করিয়া আমার ধারণা হইয়াছে যে, খাঁটি নাথ-মত অর্ধেকেরও বেশি লোপ পাইয়াছে। তবে সুবিধার মধ্যে এই যে, দু’পাঁচখানি প্রাচীন বই এখনও আছে। তবে সেগুলির মধ্যে যে কেহই লেখনী সঞ্চালন করেন নাই, একথা হলপ করিয়া বলিতে পারা যায় না।’– (সূত্র: নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১২২)

          বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের মতে, জৈনকবি বানার্সিদাসের ক্ষুদ্র কবিতা-পুস্তক ‘গোরক্ষনাথকে বচন’, ‘গোরক্ষনাথকি গোষ্ঠী’, ‘কুলাঞ্জিপটল’, ‘যোগসার’, ‘যোগান্ত আগমসার’, ‘ব্রহ্মবোধ’, ‘পুণ্যনাথরচিত ‘অর্জুনগীতা’ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে নাথদের মূলনীতি সম্বন্ধে অতি অল্পই জানা যায়। এগুলো থেকে এটুকুই জানা যায় যে, শিব তাদের পরমেশ্বর এবং তাদের মতে শিবের সাথে এক হওয়াই জীবের মুক্তি। তবে এই মুক্তি যোগের দ্বারা সাধিত হয়। তিনি প্রাচীন হিন্দি ভাষায় লিখিত ‘গোরখবোধ’ নামক একটি সিদ্ধান্ত-গ্রন্থের উল্লেখ করেন– যা চতুর্দশ শতকের বলে বিবৃত। গদ্যপদ্যে লিখিত গোরখনাথ ও গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথের কথোপকথান হিসেবে এই পুঁথিটি ৬০ শ্লোকে সমাপ্ত। মাধবাচার্যের শৈবসম্প্রদায়ের মতের সাথে এর মতের পার্থক্য দেখা গেলেও মাধবাচার্যের মতের সাথে তার ঘনিষ্ট সম্বন্ধ রয়েছে বলে করেন। পতঞ্জলির যোগতত্ত্ব ও উপনিষদের যোগতত্ত্বের সাথে যে এদের যোগতত্ত্বের নিকট সম্বন্ধ রয়েছে তা চক্র, কৌশল, নাল (ধমনী, arteries), পবন ও হংস (শ্বাস, breaths) প্রভৃতির ব্যবহারে ও তত্ত্বে এগুলোর সাধারণ অনুশীলন থেকে বুঝতে পারা যায় বলে তাঁর অভিমত। তিনি বলেন,–
‘গোরখবোধের মতে পবন নাভিচক্রে অধিষ্ঠিত এবং সর্বব্যাপী শূন্য ইহার প্রতিষ্ঠা। পবন অন্তঃকরণে অধিষ্ঠিত মনকে অনুপ্রাণিত করে। আকাশে অবস্থিত চন্দ্র মনের উপর প্রভাববিশিষ্ট। পবন সূর্যের প্রভাবের অধীন, এবং শূন্য কালের প্রভাবাধীন। একটি ভূত (element) আছে– তাহা শব্দরূপে অধিষ্ঠিত। অন্তঃকরণ, নাভি, রূপ ও আকাশের উৎপত্তির পূর্বে মন শূন্যে অবস্থিত ছিল, প্রাণবায়ু বা পবন নিরাকার ছিল, শব্দেরও কোন রূপ ছিল না এবং স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে চন্দ্র অবস্থিত ছিল। শূন্য চারি প্রকার– সহজ, অনুভব, পরম এবং অতীত শূন্য। নিদ্রাকালে বা মৃত্যুতে প্রাণ এই শূন্যে চলিয়া যায়। পাঁচটি তত্ত্ব আছে, তন্মধ্যে বোধ হয় নির্বাণ একটি। দশটি দ্বার বা পূর্ণতা (perfection) প্রাপ্তির উপায় আছে। সেগুলির নাম লিখিত হয় নাই।’– (সূত্র: নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১২৩)

         এই গোরখবোধ গ্রন্থটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাঁর প্রাজ্ঞ উপলব্ধি যেভাবে ব্যক্ত করেছেন, প্রণিধানযোগ্য বিবেচনায় তাঁর মতামতটি হুবহু উদ্ধৃত করা যেতে পারে।–
‘গোরখবোধ কি? মহাদেবের অংশবিশেষ গোরখনাথ মচ্ছেন্দ্রনাথকে কতকগুলি প্রশ্ন করেন। মচ্ছেন্দ্রনাথ তাঁহার সেই প্রশ্নগুলির প্রত্যুত্তর দেন। এই প্রশ্নোত্তরমূলক সংবাদই– ‘গোরখবোধ’।
প্রথম প্রশ্ন,– মন কি? মৎস্যেন্দ্রনাথের উত্তর– মন চঞ্চল। ইহার তাৎপর্য এই যে, যাহা কিছু গতিশীল, তৎসর্বাপেক্ষা মন চঞ্চল। বোধ হয়, মৎস্যেন্দ্রনাথ অন্য কোনও ভাবে মনকে বুঝাইতে না পারিয়া একটি বিশেষণের সাহায্যে মনকে বুঝাইয়াছেন। বিদ্যুৎ যে এত চঞ্চল, মন তাহা অপেক্ষাও চঞ্চল; সুতরাং ‘চঞ্চল’ এই বিশেষণ মনের প্রতি প্রযোজ্য। মন কি? না, যাহা সর্বাপেক্ষা চঞ্চল, তাহাই মন। দ্বিতীয় প্রশ্ন,– মন কোথায় থাকে? মৎস্যেন্দ্রনাথের উত্তর– জীবহৃদয়ে মনের বাস। কিন্তু যতদিন দেহ ততদিনই হৃদয়। দেহের অভাবে হৃদয়ের অভাব হয়। তখন মন কোথায় অবস্থিতি করে? মৎস্যেন্দ্র বলেন,– হৃদয়াভাবে মন অনুপ ব্রহ্মে অবস্থিতি করে। ব্রহ্মের উপমা নাই বলিয়া তিনি ব্রহ্মের বিশেষণ ‘অনুপ’ করিয়াছেন।
মৎস্যেন্দ্র বলিয়াছেন– পবন মনের জীবনস্বরূপ।
পবনের দুই প্রকার অবস্থা আমরা নিরীক্ষণ করি। এক অবস্থায় পবন স্থির, শান্ত; আর এক অবস্থায় পবন অত্যন্ত চঞ্চল। পবন কখনও দৃষ্টিগোচর হয় না এবং চাঞ্চল্য ব্যতীত পবন কখনও অনুভূত হয় না। মৎস্যেন্দ্রের মতে এই পবনই মনের জীবন স্বরূপ। এখন প্রশ্ন হইতেছে– পবন কি? মৎস্যেন্দ্রের উত্তর– পবন সন্ধি। ইহার তাৎপর্য এই যে, জন্মমৃত্যুর সন্ধিস্থল পবন। শ্বাস-প্রশ্বাসই জীবন, শ্বাস-প্রশ্বাস পবনের সাহায্যেই হয়। যাহা জীবনের শেষ ও মৃত্যুর আরম্ভ, তাহাই জীবন-মৃত্যুর সন্ধি। শ্বাস-প্রশ্বাসে জীবন, কিন্তু নাভিশ্বাসে মৃত্যু। প্রাণি-শরীরে বায়ু যেমন অবস্থা-বিশেষে জীবের জীবন, ইহা অবস্থাবিশেষে মৃত্যুর কারণ। এই যুক্তিতে বায়ুকে (জীবন-মৃত্যুর) সন্ধি বলা যাইতে পারে। কিন্তু নাভিমূল পরিত্যাগ করিয়া পবন কোথায় যায়? শরীরস্থ পবন নাভিতেই অবস্থিতি করে। নাভিমূল পরিত্যাগ করিয়া পবন আদিত্যহৃদয়রূপ নিরঞ্জনে অবস্থান করে।
পবনের উৎপত্তি শব্দ হইতে। শব্দ ওঁকারধ্বনি। স্থিরবায়ু ওঁকারধ্বনি হইতে উৎপন্ন। আকাশ স্পন্দিত হইয়াই ধ্বনির উদ্ভব হয়। জগৎ স্পন্দনসম্ভূত। স্পন্দন স্থগিত হইলে কিছু থাকে না, প্রথম স্পন্দনেই শব্দ সম্ভূত হয়। সে স্পন্দন অতি সূক্ষ্ম। স্পন্দন যখন অপেক্ষাকৃত স্থূলাবস্থা প্রাপ্ত হয়, তখনই তাহা পবনাকার প্রাপ্ত হয়। সুতরাং বায়ুর উৎপত্তি ও লয়-স্থান নাদ। কিন্তু নাভিমূল পরিত্যাগ করিয়া পবন আদিত্যমণ্ডলে অবস্থান করে।
মৎস্যেন্দ্রনাথ দেখিতেছেন– পবনই সব। জগতের সকল চাঞ্চল্যের একমাত্র আদর্শ পবন। শব্দও চাঞ্চল্যসম্ভূত; সুতরাং পবনেরই অবস্থা-বিশেষ। মৎস্যেন্দ্রের সিদ্ধান্ত সবই মূলে এক, এবং একেরই অবস্থান্তরে নামান্তর হয়। সুতরাং মৎস্যেন্দ্র স্থিরবায়ুকে মাতা স্বরূপ ব্রহ্ম বলিতেছেন। তাই তাঁহার মতে বায়ু স্থিরত্ব প্রাপ্ত হইয়া ব্রহ্মস্বরূপতা লাভ করে, অর্থাৎ পবনের ব্রহ্মে লয় হয়। ইহাকে ক্রিয়ার পরাবস্থা বলে; কারণ, ক্রিয়া চাঞ্চল্যেরই নামান্তর।
চঞ্চল মন যখন স্থির হইয়া শূন্যে থাকে, তখন ওঁকারধ্বনি শ্রুত হয়। ওঁকারধ্বনি শব্দের পরাবস্থা। মনের চঞ্চল অবস্থায় সে ধ্বনি শোনা যায় না। ওঁকার-ধ্বনি হইতে জগতের উৎপত্তি। যখন সকলেই স্থির থাকে, তখন সমস্তই মহাশূন্যে বিলীন থাকে। কিন্তু সেই মহাশূন্যে যখন স্পন্দন সম্ভূত হয়, তখনই জগতের সৃষ্টি হয়। আকাশের স্পন্দন হইলেই শব্দ সম্ভূত হয়, সেই শব্দই ওঁকারনাদ। মহাব্যোমে এই ওঁকারনাদ অনবরতই হইতেছে। মনের চাঞ্চল্যের বিরাম হইলে প্রথমে ভৃঙ্গ, বেণু, বীণাসদৃশ ধ্বনি পরে ঘণ্টানাদ এবং মেঘরব, শঙ্খ, কাঁসর, ঝাঁজ, ডফ ও সিংহনাদ এই দশপ্রকার অনাহত শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়।
মৎস্যেন্দ্র প্রাণকে শব্দের উৎপত্তিস্থল বলিয়াছেন। এ কথা বলিবার কারণ এই যে, তাঁহার মতে প্রাণই স্থির বায়ু। তাৎপর্য এই যে, শরীরস্থ পঞ্চবায়ু যখন পরস্পরের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া কার্য করে, তখন প্রাণসম্ভব হয়। শরীরস্থ এক বা একাধিক বায়ুর বৈষম্যগত স্বাস্থ্যহানি হয়। জগতের কিছুই স্থির থাকে না এবং থাকিতেও পারে না, সকলই চঞ্চল। আমাদের মনও চঞ্চল। কিন্তু অনেক সময় আমাদের স্থিরভাব অনুভূত হয়। যখন বাস্তবিকই কিছুই স্থির নয়, অথচ আমরা স্থিরত্ব অনুভব করি কেন? ইহার কারণ, সামঞ্জস্যই স্থিরত্ব। এই স্থিরত্বই চাঞ্চল্যের রূপান্তর বা অবস্থান্তর। আমাদের সম্পূর্ণ সুস্থাবস্থায়ও শরীরের সকল পরমাণু চঞ্চল থাকে, কিন্তু আমাদের আভ্যন্তরিক কোন চাঞ্চল্যই অনুভূত হয় না। শরীরস্থ পরমাণু-সকলের কার্যের সামঞ্জস্য থাকিলে তাহাদের চাঞ্চল্য অনুভব করা যায় না। সামঞ্জস্য ভঙ্গ হইলে, এই শরীরই আমাদের পীড়াদায়ক হইয়া পড়ে। প্রাণ বলিতে শুধু দেহের প্রাণ বুঝায় না। জগতেরও একটা প্রাণ আছে। যোগী বলেন,– স্থিরবায়ুই সেই প্রাণ। যে অবস্থায় বায়ুর গতি সর্বাপেক্ষা সমতা প্রাপ্ত হয় এবং বায়ুর কার্যের সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়, সেই অবস্থায় বায়ুই জগতের প্রাণস্বরূপে অবস্থান করে।
মৎস্যেন্দ্র বলেন, প্রাণ না থাকিলে শব্দ শোনা যায় না। সুতরাং প্রাণ শব্দের জীবন। ক্রিয়া দ্বারা ক্রিয়া পরাবস্থাতে এই প্রাণাগ্নি সকল কর্মকে দগ্ধ করে।
যখন সকল ক্রিয়ার পরিসমাপ্তি হয়, এবং সকল চাঞ্চল্য বিদূরিত হয়, তখন একমাত্র ব্রহ্মই থাকেন, আর কিছুই থাকে না। তখন জল যেমন জলে মিশাইয়া যায়, সেইরূপ অবিনাশী জীব ব্রহ্মে বিলীন হয়। যখন ব্রহ্মাণ্ড থাকে, তখন ব্রহ্মের স্থিতি ব্রহ্মাণ্ডে। চাঞ্চল্য বিদূরিত হইলে ব্রহ্মাণ্ডের অভাবে ব্রহ্ম স্ব-স্বরূপে অবস্থান করেন।
এইরূপে মৎস্যেন্দ্র যে-সকল তত্ত্বের বিষয় বলিয়াছেন, তাহা নিম্নে দেওয়া হইল:–
হৃদয় না থাকিলে, মন অনুপে থাকিত। নাভি না থাকিলে, পবন নিরঞ্জনে থাকিত। অনহদ না থাকিলে, শব্দ অনুপে থাকিত। নিরঞ্জন না থাকিলে, ব্রহ্ম অবিনাশীতে থাকিতেন। ব্রহ্মাণ্ড না থাকিলে, ব্রহ্ম জ্যোতিস্বরূপে থাকিতেন। ব্রহ্মাণ্ড না থাকিলে, হংস অবিনাশীতে থাকিত। অনুপ না থাকিলে, শূন্য ওঁকারে থাকিত। কমল না থাকিলে, কাল শূন্যে থাকিত। কাল না থাকিলে, জীব শিবে থাকিত। চন্দ্র না থাকিলে, শিব নিরঞ্জনে থাকিতেন। সুষুম্না না থাকিলে, নিরঞ্জন ব্রহ্মে থাকিতেন।
মনের জীব পবন। পবনের জীব সংন্যাস। সংন্যাসের জীব শব্দ। শব্দের জীব প্রাণ। প্রাণের জীব ব্রহ্ম। ব্রহ্মের জীব হংস, হংসের জীব অবিনাশী। অবিনাশীর জীব শূন্য। শূন্যের জীব অনুপ। অনুপের জীব কাল। কালের জীব– জীব। শিবের জীব নিরঞ্জন। নিরঞ্জনের জীব– এক ব্রহ্ম।
নিরঞ্জন অনিল হইতে উৎপন্ন। শিব নিরঞ্জন হইতে উৎপন্ন। কাল শিব হইতে উৎপন্ন। ওঁকার কাল হইতে উৎপন্ন। শূন্য ওঁকার হইতে উৎপন্ন। হংস শূন্য হইতে উৎপন্ন। ব্রহ্ম হংস হইতে উৎপন্ন। প্রাণ ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন। পবন শব্দ হইতে উৎপন্ন। শ্বাস পবন হইতে উৎপন্ন। মন শ্বাস হইতে উৎপন্ন।
তনুত্যাগ হইলে, মন পবনে মিশিয়া যায়, পবন শব্দে মিশিয়া যায়, শব্দ প্রাণে মিশিয়া যায়, প্রাণ ব্রহ্মে মিশিয়া যায়, ব্রহ্ম হংসে মিশিয়া যায়। হংস সুরতিতে মিশে। শূন্য ওঁকারে মিশে। ওঁকার কালে মিশে। কাল জীবে মিশে। জীব শিবে মিশে। শিব নিরঞ্জনে মিশে। নিরঞ্জন আপে মিশে। আপ আপে মিশে।’– (সূত্র: নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১২৩-২৬)

নাথ-তীর্থ :
বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় নাথপন্থীদের তীর্থস্থান এখনও ছড়িয়ে আছে। যদিও সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অনেকটা মানসিক কারণে সেই পুরনো গৌরব, সেই প্রাচীন মাহাত্ম্য আজ আর ততখানি দেখা যায় না। বাঙলায় এবং বাঙলার বাইরের এসব নাথপন্থী তীর্থস্থানের তথ্য অনেকটা হুবহু বিবরণে নেয়া হয়েছে অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষের ‘নাথ সম্প্রদায়ের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গ, বর্তমান বাংলাদেশ– একসময়ে নাথ যোগীদের সাধন স্থান ছিল। এখনও নানা স্থানে নাথগুরুদের স্মরণে মেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ঢাকার চারপাশে বিশেষ করে মানিকগঞ্জে এবং আটিয়া কালমারি অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে ‘তিননাথের মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পান-সুপারি, সরষের তেল এবং গাঁজা– তিনটি জিনিস এই মেলার প্রধান উপকরণ। সেবকেরা তিনটি কলকেতে গাঁজা ভরে তিনটি টিকে ধরিয়ে আগুন দেন। পানও তিনভাগ করে দেওয়া হয়। তেল দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়– তারপরে ত্রিনাথ বা তিননাথের (আদিনাথ, মীননাথ ও গোরক্ষনাথ) মাহাত্ম্য কথা বলা হয়। কথা শেষ করার আগে যদি গাঁজার কলকে জ্বলে ওঠে, তার দিকে ভক্তগণ দৃষ্টি রাখেন। পরে তার প্রসাদ পাওয়া হয়। প্রদীপ নিভে না যাওয়া পর্যন্ত নাথ সংগীত গান করা হয়। এখানে ‘আপাতত কষ্ট দূরে গিয়ে সুখ আসুক’ বলে মানত করা হয়।
বিক্রমপুরের কোথাও কোথাও ত্রিনাথের সেবকেরা বর্তমান ছিলেন। যুগী সম্প্রদায়ের লোকেরা ত্রিনাথে পূজা করতেন এবং এখানেও গাঁজার প্রচলন ছিল। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের বিক্রমপুরের ইতিহাস গ্রন্থে– এই অনুষ্ঠানে গীত একটি গানের উল্লেখ রয়েছে। তাতে অবশ্য ত্রিনাথ বলতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বোধ করি এভাবেই হিন্দুধর্মের সঙ্গে নাথ ধর্মের একটি মিশ্রণ ঘটে গেছে।
বগুড়া, কুমিল্লা, খুলনা প্রভৃতি জেলাতেও নাথসম্প্রদায়ের মঠ-মন্দিরের অবস্থান ছিল ও এখনও আছে বলে জানা যায়। বগুড়া শহরের ৭/৮ মাইল উত্তর-পশ্চিম ও উত্তরে দুটি নাথ-পীঠ রয়েছে। প্রথমটি পরিচিত ‘যোগীরভবন’ নামে। বগুড়া শহরের ১১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং মহাস্থানগড়ের ৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৮০ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই নাথ সম্প্রদায়ের মঠ ‘যোগীল ভবন’ নামে পরিচিত এবং একটি প্রধান সাধনকেন্দ্র। এর দুটি শাখা কেন্দ্র যোগীগোফা এবং গোরক্ষকুই– দুটিই দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত। এখানে অনেকগুলি মন্দির আছে, তবে ‘ধর্মভুঙ্গি’ নামে যে মন্দিরটি আছে তাতে উৎকীর্ণ লিপিমালা ‘সর্বসিদ্ধ সন ১১৪৮ শ্রীসুফলা’ থেকে এর প্রতিষ্ঠাকাল অনুমান করা যায়। মন্দিরের গদিঘরে নিত্য প্রজ্বলিত ধুনি, মঠের বাইরে কালভৈরব (শিবের প্রহরী), সর্বমঙ্গলা, দুর্গা এবং গোরক্ষনাথের মন্দির পাশাপাশি অবস্থিত। কালভৈরব মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা জয়নাথ এবং প্রতিষ্ঠাকাল ১১৭৩ সাল।
বগুড়া শহরের ৮ মাইল উত্তরে অবস্থিত মহাস্থানগড়টি আসলে প্রাচন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষের উপর স্থাপিত। ‘বল্লাল চরিত’ গ্রন্থে এই মহাস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাস্থানগড়ের মোহান্তরা নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত। ঢাকা সংলগ্ন বেশ কয়েকটি স্থানে নাথধর্মের যথেষ্ট প্রভাব পড়েছিল। দাশোড়ার কাছে শিববাড়ি গ্রামের ‘অচল শিব মন্দির’, খোদ ঢাকার জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস সংলগ্ন ‘বুড়া শিবের মন্দির’, ঢাকা-মানিকগঞ্জের ‘শিবালয়’, ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা জমিদারির সংলগ্ন জঙ্গলের ‘লক্ষ্মীখোলা শিবালয়’, কুষ্টিয়া জেলার খয়েরপুর গ্রামের সংলগ্ন নাথের গ্রামের ‘পাষাণ নাথজির সমাধিমন্দির’, একসময়ে নাথেদের অধিকারে থাকা (?) ঢাকার ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’ রাজশাহীর নওগাঁর মৈনস গ্রামের ‘শিবলিঙ্গ ও কালীবাড়ি’ রূপগঞ্জ জেলার লাক্ষা তীরবর্তী ভাঙ্গাবাজার সংলগ্ন তালতলা গ্রামের ‘কথুনাথের দেবালয়’ প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য হিসেবে ‘নাথ সম্প্রদায়ে ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুমিল্লার লালমাই ময়নামতী পাহাড়টির নাম থেকে পাহাড়টি গোরক্ষনাথ-শিষ্যা ময়নামতীর নামে চিহ্নিত বলে ধারণা করা হয়। ত্রিপুরার রাজমালা অনুসারে লালমাই ছিলেন ময়নামতী-গুপিচন্দ্রের কন্যা। খুলনা জেলার দক্ষিণে কপিলমুনি গ্রামে একসময় বহু যোগী বাস করতেন বলে জানা যায়।

        ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে কিছু দূরে হাওড়া-বর্ধমান মেইন লাইন রেলপথে মাত্র ঘণ্টা দেড়েকের লোকাল ট্রেন পথে পাণ্ডুয়া একটি রেলস্টেশন। এর মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মহানাদ। ভাগীরথীর পশ্চিমতীরবর্তী এই কেন্দ্রটি আগে ছিল নাথযোগীদের অন্যতম বৃহৎ সাধনকেন্দ্র। স্থানের নাম এই সত্য ধারণ করে আছে। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণরাঢ়ে মহানাদ ছিল নাথযোগীদের পীঠস্থান স্বরূপ, এখানেই তাঁদের প্রধান মঠ ছিল। এরই অধীনে হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর বা চব্বিশ-পরগণার কয়েকটি শাখা মঠ গড়ে উঠেছিল। নাথপন্থীরা শৈব সাধনপন্থীও। শিবকে পাওয়ার জন্যে শক্তি সাধনা দরকার, সে শক্তি মানবদেহে গুহ্যমূলের মুলাধারচক্রে সাড়ে তিন পাক অবস্থায় বিরাজ করছেন। তিনিই কুলকুণ্ডলিনী শক্তি– কুণ্ডলী আকারে বিরাজিত। এখানে দেখতে পাওয়া যায় বিশাল গৌরীপট্ট (লম্বায় সাড়ে ছ হাতের বেশি এবং চওড়াতেও আড়াই হাতের বেশি) ছাড়া বটুক ভৈরব, কালভৈরব, বহু শিবলিঙ্গ, কালী, হরপার্বতীর মূর্তি ও মন্দির মহানাড়ের সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে– তবে বেশি কেন্দ্রীভূত জটেশ্বর মন্দিরের কাছাকাছি চত্বরে। মঠের মধ্যে জটেশ্বর শিব বিরাজিত, প্রতিষ্ঠাতা যোগীরাজ মহেন্দ্রনারায়ণ নাথ। সম্রাট জাহাঙ্গির এর ব্যয় নির্বাহের জন্য ভূমিদান করেন বলে জানা যায়। মহানাদে একসময় মেলা-উৎসবের খুব ধুমধাম ছিল। শিবরাত্রির সময়ে অনুষ্ঠিত এই মেলাকে বলা হতো ‘মানাদের জাত’। জটেশ্বরনাথ মন্দিরের সামনের চত্বরের একপাশে একটি উঁচু বেদীর উপর পোঁতা একটি লৌহদণ্ড দূর থেকেই নজরে পড়ে। দণ্ডটি পূজিত হন, ‘মহাকাল’ বা ‘কালভৈরব’ হিসেবে। মহানাদের দুটি শাখা মঠ ছিল– একটি দমদমে অন্যটি মেদিনীপুরে।
নাথধর্ম ও নাথযোগীদের প্রভাব দক্ষিণ বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া থেকে কলকাতাসহ দক্ষিণ-চব্বিশ পরগণা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং কোথাও কোথাও হয়তো এখনও বিদ্যমান। তারকেশ্বরের তারকনাথ, লোকনাথ, গড়ভবানীপুরের মণিনাথ, কলকাতার চৌরঙ্গীনাথ এর প্রমাণ বহন করছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু মন্দিরের পূজারীরা ‘নাথ’ নামযুক্ত। কলকাতার চৌরঙ্গি অঞ্চলের চৌরঙ্গিনাথ এবং ধর্মতলার ধর্মঠাকুরের সেবাইতরা নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন বলে অনেকের অনুমান। পশ্চিমবঙ্গের আরও বহু স্থানে নাথ-মন্দির ও মঠ রয়েছে।

        অসমের হোজাই ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে বহু যোগিজাতির বাস। কামরূপ জেলার রঙ্গিয়া রেল স্টেশন থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে বালিকুটি নামে যে গ্রাম আছে সেখানে আছে একটি ভগ্নদশাপ্রাপ্ত গোরক্ষনাথের মন্দির। এখানে পাথরের আসনে উপবিষ্ট গোরক্ষমূর্তি বর্তমান। জনশ্রুতি যে, বল্লাল সেনের অত্যাচারে অত্যাচারিত নাথযোগীরা গোরক্ষনাথের মূর্তিসহ এখানে চলে এসে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করলে রাজা চন্দ্রকান্ত সিংহ মন্দিরের সেবাকার্যে ৭২ বিঘা জমি দান করেন।
গোয়ালপাড়া জেলায় রংজুলির কাছে একটি পর্বত আছে, যার নাম গোরক্ষপর্বত– সম্ভবত গোরক্ষনাথের নামানুসারে নামকৃত।

         উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত লিঙ্গরাজ মন্দিরের পশ্চিমে যে পাপনাশিনী কুণ্ড আছে, তার পাড়েই রয়েছে একটি মঠ, যা কপালি মঠ নামে পরিচিত। প্রবাদ আছে যে, ১০ শতকে গোরক্ষ-শিষ্য কপলবনি বা কপালমুনি– এই কুণ্ডের তীরে বসেই বনদুর্গা দেবীর আরাধনা করেন এবং তাঁর সিদ্ধিলাভ ঘটে। তাঁর সময়ে ওড়িশার রাজা ছিলেন যযাতিকেশরী। তিনি এই সিদ্ধিলাভের কথা জানতে পেরে এখানে এই মঠটি নির্মাণ করে তা এই মুনিকে দান করেন। এই মঠের মোহান্তরাই একসময়ে লিঙ্গরাজের রথযাত্রার অনুষ্ঠান করতেন। সেই প্রথার জের টেনে এখনও রথযাত্রার সময় কপালি মঠেই প্রথম নৈবেদ্যভোগ নিবেদিত হয় এবং নাথ মোহান্ত রথে বসলেই তবে রথযাত্রা শুরু হয়। সংসারীরা নন, যাঁরা গৃহত্যাগী– তাঁরাই এই মঠের মোহান্ত হতে পারেন।
কটক জেলার মহাকালপাড়া সংলগ্ন কেয়ারবাঙ্ক মঠ-এর প্রাচীনত্ব প্রায় পাঁচশ’ বছর। একসময়ে পারাদ্বীপের মহারাজা কৃষ্ণনাথ নামক এক সিদ্ধযোগীকে প্রায় এক হাজার বিঘা জমি দান করেন। কৃষ্ণনাথ এসেছিলেন বঙ্গদেশ থেকে। কৃষ্ণনাথ এখানে এই কেয়ারবাঙ্ক মঠটি স্থাপন করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে এই মঠটিই উড়িষ্যা প্রদেশে অবস্থিত সর্বপ্রধান নাথ-পীঠ।
কটকের প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে একটি মঠের নাম ত্রিলোচনপুর মঠ– এখানে পূজিত হন মৎস্যেন্দ্রনাথের মূর্তি। এছাড়া কেন্দ্রাপাড়ার নিকটবর্তী ভেরাবিশগ্রামের একটি শিবমন্দিরে আছে মৎস্যেন্দ্রনাথের একটি মূর্তি। এর পূজকেরাও নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত। রত্নগিরি পর্বতেও আছে এমন ধরনের একাধিক মূর্তি।
উড়িষ্যার কটক-অঞ্চলেই নাথ যোগীদের অধিকার ও প্রভাব বেশি ছিল। কটক-পারাদ্বীপ রেলপথে একটি স্টেশনের নাম গোরখনাথ। স্টেশনের অনতিদূরে রয়েছে একটি পীঠ স্থান, নাম– গোরখ গাদি। গাদি হলো স্মৃতিপীঠ। প্রতি বছর অগ্নিপূর্ণিমার দিকে এখানে একটি বড় মেলা বসে। উড়িষ্যার পুরীতে কানফাট যোগীদের সৎনামী নামে একটি মঠ ও মন্দির আছে।

         বিহারের বৈদ্যনাথ ধাম হিন্দুর পবিত্রক্ষেত্র এবং শিবপূজার আদত জায়গা। এখানের নাথকুঞ্জ নামে বিখ্যাত হর্ম্যটি দর্শনীয়। নাথবংশীয় পাণ্ডারা এখানে আজও বর্তমান। গয়ার ২৫ কিলোমিটার উত্তরে নাগার্জুনী গুহার কাছে সিদ্ধেশ্বর নামে একটি শিবলিঙ্গের অবস্থান। নাথযোগী কর্মমার্গ ও ভয়ঙ্করনাথের নাম ওই শিবমন্দিরের গায়ে খোদিত আছে। রামগড় পাহাড়ে যে যোগীমায়া গুহা আছে, তার গুহাচিত্রে নাথ বিষয়ক চিত্র আছে।
গোরক্ষপুর বা গোরোখপুর– প্রাচীন যুক্তপ্রদেশের একটি বড় শহর এই গোরক্ষপুরের নামকরণ হয়েছে গোরক্ষনাথের নামানুসারেই। জনশ্রুতি যে স্থানীয় গোরক্ষপাহাড়ে তপস্যা করে তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর অন্তর্ধানের পর তাঁর শিষ্যরা তাঁর ছাতা, পাদুকা ও ছড়ি সংগ্রহ করে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। শৈব হিন্দুদের এই পরম তীর্থস্থানে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তরা এখানে এসে গোরক্ষনাথের পুজো দেন। মন্দিরটি শহর থেকে দু-মাইল দূরে। এখানে যে প্রদীপটি অনুক্ষণ জ্বলে, সেটি নাকি গোরক্ষনাথ নিজে জ্বালিয়ে গেছেন। মূল মন্দিরটি আলাউদ্দিন খিলজি ধ্বংস করে সেখানে একটি মসজিদ স্থাপন করেন। বর্তমান মন্দির মোহান্ত বুধনাথ কর্তৃক ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয়। এখানের মোহান্ত ৩৬০টি মঠের অধিকারী। আটটি দেবোত্তর গ্রামের সম্পত্তি থেকে এর ব্যয় নির্বাহ হয়।

         উত্তরপ্রদেশের হরিদ্বার শহরে এক সময়ে বিরাট একটা ঘেরা জায়গার মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল গোরক্ষনাথজির আখড়া। প্রায় এক হাজার নাথসন্ন্যাসীর আসন ছিল এখানে। এঁদের অনেকে শরীরে ভস্ম লেপন এবং কেবলমাত্র কৌপিন ধারণ করতেন। এছাড়া এখানে গোরক্ষপন্থীদের বেশ কিছু মঠ-মন্দির আছে। একটি গুহা আছে কানফাট সম্প্রদায়ের। আয়িপন্থী, দরিয়াপন্থী ও দ্বাদশপন্থদের মঠও এখানে আছে। এছাড়া হৃষিকেশে কালীকম্বলীবাবার পঞ্চাতি ছত্রেও নাথপন্থী পরিব্রাজকদের অস্থায়ী শিবির স্থাপিত হয়– বিশেষত কুম্ভমেলার সময়ে। হরিদ্বারের একটি সুড়ঙ্গের নাম নাথ সুরঙ্গা– নাথপন্থীদের কীর্তির নিদর্শন। হরিদ্বারে মায়ামন্দিরের নিকটস্থ সরভনাথ বা সর্বনাথ শিবের মন্দির আছে, পাশেই নাথজিদের ‘গদি’ আছে।
কাশীর অনতিদূরে চুনারে ভর্তৃহরির যে দুর্গ আছে তার রাজা ভর্তৃহরি সিংহাসন ত্যাগ করে গোরক্ষনাথের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে এখানে মঠ নির্মাণ করেন। এছাড়া উত্তরপ্রদেশের তুলসীপুরে কানফাট সম্প্রদায় সাম্প্রতিককালে দেবীপাটন মন্দির স্থাপন করেছেন বলে জানা যায়। মন্দিরে পূজিত দেবী পটেশ্বরী দুর্গা। কথিত আছে, এখানেই সতীর ডান হাত পড়েছিল। এই পীঠস্থানে শেষ চৈত্রে বিরাট মেলা বসে। মঠের অধিবাসীরা হঠযোগে পারদর্শী। এর অধীনস্থ নয়টি নিষ্কর গ্রামের লোকেরা মঠ-মন্দিরের ব্যয় বহন করে থাকেন।
নৈনিতাল আলমোড়ায় যাঁরা বাস করেন তাঁরা ধর্মনাথ-সম্প্রদায়ভুক্ত। সংলগ্ন মন্দিরে ভৈরব, পার্বতী ও গোরক্ষমূর্তি পূজিত। শিবলিঙ্গেরও পূজা হয়। পূজারীগণ সৎনাথী সম্প্রদায়ভুক্ত। কাশীর বারানসিতে আছে ভৈরবের লাট, কালভৈরবের মন্দির এবং শহরের বাইরে গোরক্ষটিলা। গোরক্ষটিলায় অনেক সাধু সন্ন্যাসীর বাস। এলাহাবাদেরও গোরক্ষপন্থীদের মঠ এবং ভৈরবনাথের মন্দির রয়েছে।

         পশ্চিম ভারতে ব্রহ্মগিরি নামে এক দশনামী সন্ন্যাসী গুরু গোরক্ষনাথের প্রসাদ লাভ করে অওঘড় নামে একটি মত প্রবর্তিত করেন। গুজরাট অঞ্চলে তার গাদি থাকলেও শিষ্য-প্রণালী নেই। গাদির মোহান্তের মৃত্যু ঘটলে সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজনকে প্রকরণ বিশেষের সাহায্যে ঐ গাদির অধিকারী করা হয়। জনশ্রুতি যে, গোরক্ষনাথ ব্রহ্মগিরিকে মন্ত্রদান না করে কুণ্ডলাদি কয়েকটি চিহ্ন দান করেন। ব্রহ্মগিরি আপন মতাবলম্বী সুখড়, রুখড় ও গুদর সম্প্রদায়কে তা দিয়ে যান।
দ্বারকার কাছে যে গোরক্ষক্ষেত্র আছে, তার সেবা করেন কানফট সম্প্রদায়ের যোগীরা। এছাড়া আমেদাবাদের উত্তরে গোরক্ষনাথের নামে পর্বতশ্রেণী আছে। গুজরাটের কাথিয়াবাড়ে ‘গোরক্ষমড়ি’ মন্দিরে আজও গোরক্ষনাথের পূজা হয়।
পঞ্জাবের শিয়ালকোটের কাছেই আছে গোরক্ষকূপ। কিংবন্তী আছে যে, শালিবাহন রাজার প্রথমা মহিষীর গর্ভে পুরাণ ভাগবত নামে একটি পুত্র জন্মেছিলেন। তিনি সাবালক হওয়ার পর রাজা শালিবাহন পুনশ্চ দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। দ্বিতীয়া রানী সতীনপুত্রের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন। এর ফলে তিনি প্রতিহিংসাবশত পুরাণ ভাগবতের নামে তাঁর সতীত্বহানির অভিযোগ করেন রাজার কাছে। রাজা ছেলের হাত-পা কেটে একটি কুয়োতে ফেলে দেন। গোরক্ষনাথের দয়ায় ঐ পুত্র বেঁচে ওঠেন ও তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। বন্ধ্যানারীরা পুত্রকামনায় এখানে ‘হত্যা’ দেন। এই কূপটিই গোরক্ষকূপ নামে পরিচিত।
পঞ্জাবের টিলা নামে একটি স্থানে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোরক্ষনাথী মঠ আছে গোরক্ষটিলায়। এটি ঝিলমের প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরবর্তী। টিলার উচ্চতা ৩২৪২ ফুট, পর্বত টিলার গা অমসৃণ হলেও দুরারোহ। জনশ্রুতি যে, এই টিলাতেই গোরক্ষনাথের জীবনাবসান ঘটে। জানা যায়, টিলা নির্মাণের ব্যয় নির্বাহের জন্য সম্রাট আকবর কয়েকটি গ্রাম দান করে যান। চৈত্রমাসে এখানে মেলা বসে। অমৃতসরেও একটি শিবমন্দির আছে। এটি দ্বাদশপন্থীদের মিলনক্ষেত্র বিশেষ। আম্বালাতে আছে গোরক্ষনাথ ও তাঁর শিষ্য গুগার মন্দির।
মুম্বাইয়ের সাতপুরা প্রভৃতি জায়গায় গোরক্ষগড় ও মছিন্দরগড় নামে দুটি মন্দির আছে। আছে গোরক্ষনাথের মন্দির। মহারাষ্ট্র কেশরী ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মন্দির নির্মাণ করেন। গণেশপুরী থানার একটি উচ্চ প্রস্রবণের নাম গোরক্ষমছিন্দর।
কাশ্মীরের শ্রীনগরে গোরক্ষ পূজিত হন শিবের অবতার হিসেবেই। আগে এই ক্ষেত্র গোরক্ষক্ষেত্র নামেই সুপরিচিত ছিল। আর কানফাটদের একটি বড় তীর্থস্থান অমরনাথ স্বয়ং।

         ভারতের রাজস্থান এক সময়ে নাথপন্থীদের একটি বড় ঘাঁটি ছিল বলে জানা যায়। যোধপুরের রাজা ছিলেন মানসিংহ (১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে)। তাঁর গুরু ছিলেন দেবনাথ। তিনি গুরুকে একটি নগর দান করেন, তার নাম ছিল মহামন্দির– যা দু’মাইল দীর্ঘ প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত। দেবনাথ যোধপুরে অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠঅ করেন। এগুলিই যোধপুরের প্রাচীন মন্দির।
মেবারের রাজধানী উদয়পুরের দশ কিলোমিটার উত্তরদিকে একটি গিরিসঙ্কটে অবস্থিত আছে একলিঙ্গ শিবমন্দির। বহু প্রাচীনকাল থেকে গিহেলাট বংশীয় রাজগণ এই শিবের উপাসক। এখানকার গোঁসাই যাঁরা তাঁরা নাথ জাতীয়। উদয়পুরের রাণাগণ এঁদের শিষ্য। এই মন্দিরের সঙ্গে বাপ্পারাও এবং কানফট যোগীরা যুক্ত। সর্বশ্রেণীর কানফট যোগীরা এখানে বাস করেন। উদয়পুররাজের প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র নাথদ্বার-এর নামকরণ নাথপন্থ অনুসারেই কৃত।
ভারতের হিমাচল প্রদেশে কেদারনাথের পথে গৌরীকুণ্ডের কাছে যে সেয়ামগ্রাম আছে, এককালে গোরক্ষনাথ এখানে বাস করেছিলেন বলে অনেকের ধারণা। তুঙ্গিনাথের মন্দিরে যোগাসনে উপবিষ্ট তাঁর একটি মন্দির আছে। শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত অষ্টম শতকের যোশিমঠের রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় দায়িত্ব দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের। জানা যায়, ১৪ শতক পর্যন্ত এই দায়িত্ব ছিল নাথপন্থী যোগীদের অধিকারে।

        পাকিস্তানের করাচির অনতিদূরে হিংলাজ কোটেশ্বর প্রভৃতি জায়গায় নাথদের অনেক মঠ ছিল বলে জানা যায়। এক সময়ে এই সব তীর্থস্থান বেড়ানোর শেষে ভ্রমণকারীরা হাতে যোনিলিঙ্গের ছাপ এঁকে নিতেন। লাহোরে আছে আয়িপন্থীদের মঠ, সমাধি ও শিবমন্দির। এছাড়া পেশোয়ারের গোরক্ষক্ষেত্র-এর কথা উল্লেখ করে গেছেন স্বয়ং আবুলফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে। এখানে বাবা রঙ্গনাথ খ্যাতনামা যোগী ছিলেন।
নেপাল নাথযোগীদের একটি বড় আশ্রম দীর্ঘকাল থেকেই। বলা হয়, শৈবযোগীদের বেশে মৎস্যেন্দ্রনাথ এখানে শৈবধর্ম প্রচার করতে যান। তবে বিস্ময়ের কথা হলো, শৈবযোগী হলেও তিনি এখানে পূজিত হন চতুর্থ বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বর অবতার হিসেবে। আবার নেপালে তাঁর শৈবমূর্তিও পাওয়া গেছে। শৈব প্রচারক নিজেই শিবের ভূমিকা পেয়ে গেলেন– তা অবাক করার মতোই। আবার এখানে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মতোই মৎস্যেন্দ্রেরও রথযাত্রা হয়। তবে তা অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখ মাসে। এর কারণ রাজ্যচ্যুত নেপালরাজ বসন্ত মৎস্যেন্দ্রের আশির্বাদে হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলেন– এই বিশ্বাসে বৈশাখ মাসে এই উৎসবের প্রচলন করেন।
নেপালে মৎস্যেন্দ্রনাথের মন্দির রাঙ্গমতী অবলোকিতেশ্বরের মন্দির নামে পরিচিত। স্বর্ণদ্বারসহ এই মন্দিরের নির্মাণকাল ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দ (৭৯২ নেপালাব্দ)। নেপালরাজ নরেন্দ্রদেবের আমলে নাথধর্ম এখানে যথেষ্ট প্রচার লাভ করে। মৎস্যেন্দ্রনাথ এখানের অন্যতম প্রধান দেবতা। বাগমতী গ্রামে তাঁর একটি মন্দির ও মন্দিরে তাঁর বিগ্রহ আছে। এখান থেকেই রথযাত্রা বা ‘গুদরি কাড়’ শুরু হয়। বাগমতী নদীর পূর্বতীরে তাঁর এবং গোরক্ষনাথের দুটি মন্দির আছে। হিউয়েন সাঙ বলে গেছেন, মৎস্যেন্দ্রনাথ নেপাল ও তিব্বতের জাতীয় দেবতা। গোরক্ষনাথও সমান মর্যাদায় ভূষিত।
কাঠমুন্ডুতে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে গোরক্ষ মন্দিরের স্থাপনা। এর চারপাশে তাঁর ও মৎস্যেন্দ্রনাথের বহু মন্দির। বাগমতীতে মৎস্যেন্দ্রনাথ ও গোরক্ষনাথের মন্দিরের কাছে মীননাথের মন্দির আছে। সাওয়ারি কোটের রতননাথ মঠে যে একটি প্রস্তরখণ্ড আছে, কিংবদন্তী যে, এখানে গোরক্ষনাথের আত্মা বন্ধ করা আছে। সিকিমের চঙ্গচিলিঙ্গ মঠে গোরক্ষমূর্তির পূজা হয়।
এছাড়া চিন ও জাপানে মৎস্যেন্দ্রনাথ বা অবলোকিতেশ্বর ক্বানসাইন নামে পূজিত হয়ে থাকেন বলে জানা যায়। তিনি মানবের ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পান। চিনের চুসান দ্বীপপুঞ্জের দুটো দ্বীপে মৎস্যেন্দ্রনাথের মন্দির আছে। তাঁর মূর্তি বালি, জাভা, ভুটান প্রভৃতি স্থানে আছে। রেঙ্গুনের স্ট্র্যান্ড রোডে চিনারা স্থাপন করেছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ ও অবলোকিতেশ্বরের মন্দির। প্রতি নভেম্বরে এখানে উৎসব হয়।

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : কাশ্মীর শৈববাদ] [*] [পরের পোস্ট : দশনামী সম্প্রদায়]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 465,260 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 128 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

নভেম্বর 2019
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 6 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: