h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-৯/৮ : কাশ্মীর শৈববাদ

Posted on: 04/09/2018


tumblr_oyn2ikgd911sjjdtyo1_500
শিব ও লিঙ্গ-৯/৮ : কাশ্মীর শৈববাদ
রণদীপম বসু

খ্রিস্টীয় নবম শতকে উত্তর ভারতের কাশ্মীর প্রদেশে একদল শৈবাচার্যের আবির্ভাবের মাধ্যমে কাশ্মীর শৈববাদের উদ্ভব বলে মনে করা হয়। এই আচার্যদের অন্তরস্থ শিবপ্রেম দার্শনিক তত্ত্বের আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এই আচার্যগোষ্ঠী প্রচারিত শৈবদর্শন এবং ধর্মাচরণ সম্পূর্ণভাবে উগ্রতা ও অতিমার্গিতা দোষ থেকে মুক্ত ছিল। এই মতবাদ বেদ প্রামাণ্য স্বীকার করে না, জাতিভেদও নয়। ত্রিক, স্পন্দ ও প্রত্যভিজ্ঞা– এই তিনটি আদর্শ কাশ্মীর শৈববদাকে চিহ্নিত করেছে, এবং তিনটি নামেই এই মতবাদকে বোঝানো হয়। যদিও প্রত্যভিজ্ঞাদর্শন, স্পন্দবাদ, ত্রিকশাস্ত্র, ষড়র্দ্ধশাস্ত্র, শৈবাদ্বৈতবাদ, আভাসবাদ, কাশ্মীরীয় শৈবাগম– এই কয়েকটি নামে আলোচ্য মতবাদটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
ত্রিতত্ত্বের দিকে প্রবণতা আছে বলে এই মত ত্রিক নামে পরিচিত। ‘ত্রিক’ শব্দটি এক অর্থে ‘শিব-শক্তি-অণু’ এবং অন্য অর্থে ‘পশু-পাশ-পতি’ এই ত্রিতত্ত্বকে বোঝায়। এই ত্রিতত্ত্ব শৈবধর্মের অপরাপর শাখাতে বিদ্যমান থাকলেও, কাশ্মীর শৈববাদে জীব ও জড়জগৎ শিবের সঙ্গে অভিন্ন। শিব যেভাবে নিজেই জীবসমূহ ও জগতের আকারে প্রতিভাত হন, সেই রূপান্তরের পদ্ধতির নাম স্পন্দ। যথেচ্ছ লীলা বা ক্রীড়া-অর্থে ‘স্পন্দ’ শব্দ প্রযুক্ত হয়। ‘হর্ষানুসারী স্পন্দঃ ক্রীড়া’– (শিবদৃষ্টি ১/৩৮ টীকা)। পরমশিবের লীলাচ্ছলেই জগতের উৎপত্তি, প্রকাশ বা স্পন্দন। এইহেতু এই দর্শনকে স্পন্দবাদও বলা হয়। শৈবাগমে স্পন্দ-শব্দ শক্তিকেও বুঝিয়ে থাকে। পরম শিবের লীলা তাঁর শক্তিরই প্রকাশ। আর প্রত্যভিজ্ঞা বলতে বোঝায় পরমাত্মা বা শিবের সঙ্গে জীবাত্মার অভিজ্ঞতার উপলব্ধির উপায়। ‘আমিই শিব বা ঈশ্বর’, ‘আমি শিব হতে ভিন্ন নই’– এপ্রকার অনুভবের পারিভাষিক সংজ্ঞা ‘প্রত্যভিজ্ঞা’। এই দর্শনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে– জীবই প্রচ্ছন্ন শিব। তত্ত্ব প্রত্যভিজ্ঞাত হলে জীব সম্যক্ অনুভব করে যে, সে স্বয়ং শিবস্বরূপ, শিব হতে ভিন্ন নয়। শিবের যতকিছু শক্তি ও ঐশ্বর্য্য সমস্তই তার রয়েছে। সে অবস্থায় জীব শিবত্ব লাভ করে, অর্থাৎ মুক্ত হয়। তাকে আর জন্মপরিগ্রহ করতে হয় না। এরকম উপলব্ধি সদ্গুরুর প্রদর্শিত সাধনার দ্বারাই লভ্য।

                কাশ্মীরীয় শৈবাগমের প্রথম ও প্রধান আচার্য ছিলেন কাশ্মীরের অধিবাসী ‘শিবসূত্রে’র প্রণেতা বসুগুপ্ত (৮২৫ খ্রিঃ) এবং তিনিই কাশ্মীর শৈববাদের প্রবক্তা হিসেবে কথিত। অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বর্ণনা অনুযায়ী– ‘তাঁর (বসুগুপ্ত) শিষ্য কল্লট স্পন্দকারিকা বা স্পন্দসর্বস্ব গ্রন্থে শিবসূত্র অনুসরণে কাশ্মীর শৈববাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেন। বসুগুপ্তের অপর শিষ্য সোমানন্দ শিবদৃষ্টি নামক গ্রন্থের লেখক। পরবর্তী আচার্যদের মধ্যে ঈশ্বরপ্রত্যভিজ্ঞা-কারিকার লেখক উৎপল, রামকণ্ঠ এবং অভিনবগুপ্ত উল্লেখযোগ্য। অভিনবগুপ্ত ছিলেন মহামনীষী, ৪১ খানি গ্রন্থের লেখক। অভিনবগুপ্তের অবদান দু’দিক থেকে অভিনব। প্রথমত, তিনি ৬৪ খানি প্রামাণ্য শৈবাগমের সঙ্গে অদ্বৈত শৈববাদের সকল দিকের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি অদ্বৈত শৈববাদের উপর ভিত্তি করে ভারতীয় সৌন্দর্যতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অভিনবগুপ্তের লেখক জীবন ৯৯১ থেকে ১০২৫ পর্যন্ত। কাশ্মীর শৈববাদের উপর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা পরমার্থসার। পরবর্তী কাশ্মীর শৈববাদী লেখকদের মধ্যে প্রত্যভিজ্ঞাহৃদয়ের লেখক ক্ষেমরাজ (১০৪০ খ্রীঃ) এবং বিভিন্ন টীকাগ্রন্থের লেখক উল্লেখযোগ্য, যাঁরা হলেন অভিনবগুপ্তের পরমার্থসারের টীকাকার যোগরাজ, তন্ত্রালোকের টীকাকার জয়রথ এবং প্রত্যভিজ্ঞাবিমর্শিণীর টীকাকার ভাস্কর-কণ্ঠ (১৭০০ খ্রীঃ)।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২১১)

              নরেন্দ্রনাথের ভাষ্যে, শৈবধর্মের অপরাপর শাখার মতোই কাশ্মীর শৈববাদে চরম সত্তা শিব বা শম্ভু। তিনি সকল জীবের আত্মাস্বরূপ, অপরিবর্তনীয় এবং চিরন্তন পূর্ণ। তিনি বিশুদ্ধ চৈতন্য এবং চরম অভিজ্ঞতা (পরা সংবিৎ) ও পরমেশ্বর। তিনি সকল অস্তিত্বের ভিত্তি এবং সকল জীবের মর্মমূল। তিনি অনাদি এবং এক, সচল এবং অচল সব কিছুতেই তাঁর অধিষ্ঠান। স্থান ও কাল তাঁকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না, তিনি তাদের অতিক্রম করেন এবং তারা তাঁর আভাস মাত্র। তিনি বিশ্বময় এবং বিশ্বোত্তীর্ণ। জগৎ তাঁকে নিঃশেষ করতে পারে না, কারণ তিনি অনন্ত। তিনি সেই অনুত্তর, অর্থাৎ সেই বাস্তবতা যার বাইরে কিছু নেই।
এই শৈবাগমকে আচার্যগণ স্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আভাসবাদও বলেন। এই শাস্ত্রে শিবের স্বতন্ত্র ইচ্ছা বা স্বাতন্ত্র্যশক্তির প্রাধান্য স্বীকৃত। বিশ্বের সকল বস্তুই শিবসত্তায় নিমগ্ন বলে নিখিল বিশ্বই শিবস্বরূপ। দৃশ্যমান বস্তুসমূহ তাঁরই আভাস বা প্রতিবিম্বমাত্র, এই প্রতিবিম্বও অসৎ নয়। এজন্য এ শাস্ত্রের এক নাম ‘আভাসবাদ’। বিশুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ শিব একই সঙ্গে জগতের নিমিত্ত ও উপাদান কারণ। এখানে কারণ এবং কার্যে কোন তফাৎ নেই। আচার্য বসুগুপ্ত ও তাঁর শিষ্য কল্লট প্রণীত স্পন্দশাস্ত্র অনুসারে– অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়–
‘এই শাস্ত্রানুসারে বিশ্বসৃষ্টির জন্য ঈশ্বরকে কোনও গৌণ কারণের উপর নির্ভর করিতে হয় না। কোনও কোনও ধর্মতত্ত্বমতে কর্ম ও প্রধান (উপাদানীভূত কারণ) গৌণ কারণ, এবং ঈশ্বর কর্তৃক সৃজনকার্যের মূলে ইহাদেরও সক্রিয় অংশ বর্তমান। আবার বেদান্তসূত্রে গৃহীত মত যে ঈশ্বর নিজেই উপাদানীভূত কারণ, ইহাও এই শাস্ত্রকারগণ স্বীকার করেন না। শঙ্কর-সমর্থিত মায়াবাদ অনুসারে পরিদৃশ্যমান জগৎপ্রপঞ্চ যে সর্বৈব মিথ্যা উহাও তাঁহাদের দ্বারা স্বীকৃত হয় না। ইঁহাদের মতে ঈশ্বর সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, এবং তিনি তাঁহার অত্যুত্তম ইচ্ছাশক্তির দ্বারা বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করেন। সৃষ্ট জগৎ তাঁহারই প্রতিচ্ছবি, এবং আপাতদৃষ্টিতে ঈশ্বর হইতে উহার যে পার্থক্যবোধ তাহা ভ্রান্তিপ্রসূত; সৃষ্ট জীব ও জগতের তাঁহার সহিত কোনও প্রকৃত বিভেদ নাই। স্ফটিক দর্পণে ধৃত জীবজন্তু গৃহাদির প্রতিচ্ছবিসমূহ যেমন দর্পণের উপর কোনও রেখা বা কলঙ্ক আরোপ করে না, সেরূপ বিশ্বপ্রপঞ্চ তাঁহাতেই প্রতিভাত হইয়া তাঁহার অপার মহিমাকে বিন্দুমাত্র কলুষিত করে না। যে ধর্মদর্শন মতে ঈশ্বর উপাদানীভূত কারণ বলিয়া বিবেচিত, উহার অন্যতম মীমাংসা যে সৃষ্টির বিষয়ীভূত হইয়াই তাঁহার বাহ্য প্রকাশ, ইহাও স্পন্দশাস্ত্রকারগণ কর্তৃক সমর্থিত হয় নাই। বসুগুপ্তের মতে ভগবান মহাদেব অতি নিপুণ যাদুকরের ন্যায় পট, বর্ণ, তুলি ইত্যাদি চিত্রকর্মের নানাবিধ উপাদান আদৌ ব্যবহার না করিয়া এই জগৎপ্রপঞ্চের চিত্র অঙ্কিত করেন। আর একটি সুন্দর উপমার সাহায্যে তাঁহারা ঈশ্বরের অন্য-নিরপেক্ষ ভাবে সৃজনক্রিয়ার ব্যাখ্যা করেন। সিদ্ধ যোগী যেরূপ কোনও উপাদানের সাহায্য ব্যতিরেকে মাত্র তাঁহার একাগ্র ইচ্ছাশক্তিবশে নানাবিধ বস্তু প্রস্তুত করিতে সমর্থ হন, সেরূপ পরম শিব তাঁহার অত্যাশ্চর্য ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করিয়াই এবং কোনও কিছুর সাহায্য না লইয়াই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেন।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫)

             পরম শিব কেবল প্রকাশস্বরূপ। তাঁর শক্তিতেই সবকিছু হচ্ছে। বিশ্বজগতের প্রকাশ কার্যকর হয় শিবের শক্তির মারফৎ। শিব ও শক্তি অভিন্ন। স্ত্রীরূপিণী এই শক্তি শিবের থেকে পৃথক নয়। এই শক্তি বহু ধরনের, প্রধানত পাঁচ ধরনের– চিৎ, আনন্দ, ইচ্ছা, জ্ঞান ও ক্রিয়া। শক্তির প্রকাশেই জগতের প্রকাশ হয়, শক্তি রুদ্ধ হলেই জগৎ লুপ্ত হবে। সৃষ্টি এবং প্রলয় পরপর ঘটে যায়, এই প্রক্রিয়ার শুরুও নেই, শেষও নেই। সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহার চিরকালই চলছে ও চলবে।
অভিনবগুপ্ত প্রণীত তন্ত্রালোক গ্রন্থের ভূমিকায় অনুবাদক সুখময় ভট্টাচার্য্য বলেন,– ‘শিব স্বয়ং স্বেচ্ছায় আপনাকে আচ্ছাদিত করিয়া বিশ্বে অবতরণ করেন এবং পশুর (জীবের) ভূমিকায় লীলাছলে অভিনয় করিয়া থাকেন। প্রত্যভিজ্ঞাদর্শনের সিদ্ধান্ত হইতেছে– ‘শব এব গৃহীতপশুভাবঃ’। ‘স্বেচ্ছয়া স্বভিত্তৌ বিশ্বমুন্মীলয়তি।’ ‘চিতিসঙ্কোচাত্মা চেতনোহপি সঙ্কুচিতবিশ্বময়ঃ।’
‘শুধু জীবই নহে, জড় পদার্থও তাঁহা হইতেই আভাসরূপে বিশ্বে প্রকাশিত হইয়াছে। শিব ও শক্তির সামরস্য বা সমতাই চরম তত্ত্ব। শিবের স্বাতন্ত্র্য শক্তির বলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই নিয়মিত, অনিয়মে কিছুই হয় না।’
‘শিবই জীবভাবে স্বেচ্ছায় জন্মমৃত্যুর আবর্তে লীলা করেন। নিজেকে পরিমিত করিয়া আণবমলে আচ্ছাদিত করেন। এই অবস্থায় সংসারী জীব নিজের শিবত্ব জানিতে পারে না। অর্থাৎ জাগতিক কর্মজনিত মলে আবৃত হইয়া লীলাময় শিব কর্মজনিত বিপাকের পরিণামে জন্ম, আয়ু ও ভোগের বন্ধনে বদ্ধ হন। এই অবস্থাই শিবের স্বেচ্ছাকৃত পশুভাব।’– (তন্ত্রালোক, নিবেদন পৃষ্ঠা-১২-১৩)

              এ প্রেক্ষিতে অভিনবগুপ্ত প্রণীত তন্ত্রালোক গ্রন্থের অনুবাদক সুখময় ভট্টাচার্য্য তাঁর নিবেদন-ভূমিকায় আরও বলছেন যে–
‘পশু অর্থাৎ জীবভাবে প্রকটিত শিব স্বেচ্ছায় পাঁচটি কঞ্চুকে স্বয়ং আবৃত হন। সেইগুলি যথাক্রমে মায়া বা অবিদ্যা, কলা, রাগ, কাল এবং নিয়তি।
…(১) অহন্তা ও ইদন্তার অভিন্নত্বের জ্ঞান, অর্থাৎ ‘আমিই এই বিশ্ব’– সদাশিবের এইপ্রকার জ্ঞানকেই বিদ্যা বলা হয়। এই বিদ্যাকে শুদ্ধ বিদ্যাও বলে। এই বিদ্যাই সদাশিবের মহিষী বা শক্তি। ইহাই ব্রহ্মবিদ্যা। উল্লিখিত বিদ্যার আবরক কঞ্চুকের নাম অবিদ্যা। এই কঞ্চুকের দ্বারা জীবরূপ শিব তাঁহার শিবভাব, সর্বজ্ঞত্ব ও সর্বকর্ত্তৃত্বকে আবৃত করেন।
…(২) শিবের সর্ব্বময় ব্যাপক শক্তি সঙ্কুচিত হইয়া জীবে অবস্থান কালে সেই সঙ্কুচিত শক্তিকেই কলা-কঞ্চুক বলা হইয়াছে।
…(৩) অনুরাগ বা বিষয়াসক্তিকে রাগ বলা হয়। যে বিষয় চিত্তকে আকর্ষণ করে, সেই বিষয়েই অনুরাগ হইয়াছে, এরূপ বলা যায়। বৈষয়িক তৃপ্তি অপূর্ণ থাকিলে লব্ধব্য বিষয়ে আসক্তি জন্মে। শিব নিত্যতৃপ্ত। অতীতে, বর্ত্তমানে বা ভবিষ্যতে তাঁহার কোনরূপ অনুরাগ থাকিতে পারে না। শিবের সেই নিত্যতৃপ্তি সঙ্কুচিত হইয়া অপূর্ণ জীবে আশ্রয় লাভ করে। জীবের তৃপ্তি অসম্পূর্ণ। সর্ব্বদাই ভোগ্য বিষয়ে আসক্তি থাকে। শিবের এই সঙ্কুচিত তৃপ্ততাশক্তিই রাগকঞ্চুক।
…(৪) শিব নিত্য, তিনি কালের দ্বারা পরিচ্ছিন্ন নহেন। উৎপত্তিবিনাশরহিত শিবকে কাল ধ্বংস করিতে পারে না। অহরহঃ জাগতিক পদার্থের ছয়প্রকার বিকার ঘটিতেছে, এই বিকার হইতেছে পদার্থের পরিণাম। ছয়টি পরিণাম হইতেছে– অস্তি (অবস্থান), জায়তে (উৎপত্তি), বর্দ্ধতে (বৃদ্ধি), বিপরিণমতে (অপস্থান্তরপ্রাপ্তি), অপক্ষীয়তে (ক্ষয়) এবং বিনশ্যতি (ধ্বংস)। এই ছয়প্রকার পরিণামের পারিভাষিক সংজ্ঞা– যড়্ভাবাবিকার। শিব তাঁহার নিত্যতাশক্তিকে এই ষড়্ভাবাবিকারের দ্বারা সঙ্কুচিত করিয়া কাল-কঞ্চুকে আবৃত হন। চন্দ্রসূর্য্যাদির গতি অনুসারে এই কালকে দণ্ড, পল, ঘটিকা, মিনিট, দিন, পক্ষ, মাস, ঋতু, বৎসর, যুগ, কল্প, মন্বন্তর প্রভৃতিরূপে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাবে কাল্পনিক বিভাগ করা হইয়াছে।
…(৫) নিয়তি শব্দের অর্থ নিয়ম। ‘এইপ্রকার কাজ করিলে এইপ্রকার ফল হইবে’– এইরূপ নিয়মকেই নিয়তি বলে। শিব নিত্যই স্বতন্ত্র বা স্বাধীন। তিনি তাঁহার এই স্বাধীনতাকে জীবভাবে সঙ্কুচিত করিয়া নিয়তি-কঞ্চুকে আবৃত হইয়া থাকেন। নিয়তিকে অদৃষ্ট বা ভাগ্যও বলা হয়।
এই পাঁচটি কঞ্চুকে শিব স্বেচ্ছায় আবৃত হইয়া লীলা করিতেছেন। স্বতন্ত্র শিব পরতন্ত্র হইয়া প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের অধীন হইয়া বিশ্বকে ভোগ করিতেছেন।
‘শরীরকঞ্চুকিতঃ শিবো জীবো নিষ্কঞ্চুকাঃ পরশিবঃ।’
এই কথা পরশুরাম-কল্পসূত্রেও (১/৫) রহিয়াছে। জীবই পরম শিব। তবে জীবাবস্থায় তিনি অসর্বজ্ঞ। এইহেতু জীবকে অণু বলা হয়। শিবের জীবভাবই শরীরধারণ ও মরণের হেতু। জীবভাবে লীলা করিবার সময়ই শিব অবিদ্যা, কলা, রাগ, কাল ও নিয়তির আশ্রয় হন। অগ্নির অসংখ্য স্ফুলিঙ্গকণা যেরূপ অগ্নি হইতে অভিন্ন, সেইরূপ জীব এবং জড় জগৎও শিব হইতে অভিন্ন। জীবভাবাপন্ন শিবেরও সহস্রারে পরম শিব, হৃদয়ে জীব এবং মূলাধারে কুণ্ডলিনী শক্তির ধ্যান করিতে হয়। জীব পরম শিব হইতে চৈতন্য এবং কুণ্ডলিনী হইতে শক্তি লাভ করিয়া কৃতকৃত্য হন। ষট্চক্রের রহস্য সাধককে অবশ্যই জানিতে হইবে। এই বিদ্যা একান্তই গুরুগম্য।’– (অভিনবগুপ্ত প্রণীত তন্ত্রালোক, নিবেদনপৃষ্ঠা-১৩-১৪)

             কাশ্মীর শৈবমত যে ভাবে স্পন্দ ও প্রত্যভিজ্ঞাশাস্ত্রে ব্যাখ্যাত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এই মত সম্পূর্ণরূপে অদ্বৈতবাদ সমর্থন করে। কিন্তু স্পন্দ ও প্রত্যভিজ্ঞাদর্শনের মত প্রতিষ্ঠার পূর্বে যে আগমশাস্ত্রসম্মত শৈব দর্শন উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত ছিল তা দ্বৈত বা বহুত্ববাদ প্রভাবিত ছিল। পাশুপত দর্শনের অন্তর্নিহিত তত্ত্বও তাই। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ওই দ্বৈতবাদ নিরসনকল্পে বসুগুপ্ত, কল্লট, সোমানন্দ প্রভৃতি এতদ্দেশীয় শৈবাচার্যগণ ‘ত্রিক’ দর্শনের পূর্ণ সমর্থন ও প্রচার করেন বলে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিমত। এ প্রেক্ষিতে তিনি বলেন–
‘ত্রিক’ শব্দটি এক অর্থে ‘শিব-শক্তি-অনু’ এবং অন্য অর্থে ‘পশু-পাশ-পতি’ এই ত্রিতত্ত্বকে বুঝায়। এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় অর্থই আমাদের আলোচনার বিষয়। তত্ত্ব তিন হইলেও এক, কারণ প্রথম দুই তত্ত্ব, পশু ও পাশ সম্পূর্ণরূপে পতি বা পরম শিবের উপর নির্ভরশীল। পরমেশ্বর তাঁহার অত্যাশ্চর্য ক্ষমতাবলে নিজেই অগণিত পশু বা জীবের আকারে প্রতিভাত হন, এবং তাঁহার অপরা শক্তিবশে এই জীবসমূহ সুপ্তি বা জাগরণের অবস্থায় থাকে। সুপ্ত অবস্থায় জীব মলসংযুক্ত থাকে। মল তিন প্রকার, যথা আণব, মায়ীয় ও কার্ম। জীব অবিদ্যা প্রভাবে যখন নিজের স্বাধীন ও বিশ্বাত্মিকা প্রকৃতি সম্বন্ধে অজ্ঞান থাকে ও দেহাত্মভেদ সম্বন্ধে বিমূঢ় হইয়া শরীরকেই নিজ স্থায়ী সত্তারূপে ভাবে এবং এজন্য সঙ্কুচিত ও সীমাবদ্ধ হইয়া পড়ে, তখন সে আণব মলের দ্বারাই কলুষিত থাকে। জীবের দেহবদ্ধ অবস্থা ঈশ্বরসৃষ্ট মায়া হেতু হইয়া থাকে, এবং এই অবস্থায় সে মায়ীয় মলসংযুক্ত হয়। দেহস্থ জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয়াদির দ্বারা প্রভাবিত হইয়া যখন সে নানাপ্রকার কর্মাদি করিয়া চলে, তখন সে কার্ম কলুষ দ্বারা আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। এই ত্রিবিধ মল পরম শিবের নাদাত্মিকা শাশ্বতী শক্তি হইতে সঞ্জাত হয়। নাদ হইতে শব্দেরও সৃষ্টি, এবং শব্দ ব্যতিরেকে জীবের সাংসারিক জীবন রূপ গ্রহণ করে না। (ক্ষেমরাজ তাঁহার শিবসূত্র বিমর্ষিণী গ্রন্থে প্রথম তিনটি সূত্রের ভাষ্যকালে এই সকল তত্ত্ব বিশদভাবে বিশ্লেষণ করিয়াছেন; কাশ্মীর গ্রন্থাবলী, প্রথম খণ্ড, পৃ:৪-১৬।) উপরিলিখিত ত্রিবিধ মল, নাদ ইত্যাদি একত্রে ত্রিকের দ্বিতীয় তত্ত্ব পাশকে বুঝায়। এই পাশে বদ্ধ হইয়া পশু সুপ্ত অজ্ঞানাচ্ছন্ন থাকে। সেই এই পাশ ছিন্ন করিতে পারে এবং সুপ্তি হইতে জাগরণের পথে আসিতে পারে। এজন্য তাহার নিজের আত্যন্তিক প্রযত্ন ও উদ্যম এবং সদগুরুর উপদেশ আবশ্যক। উদ্যমের প্রকৃষ্ট পন্থা হইল একাগ্র ও সুতীব্র মননশক্তি। এই শক্তির যথোপযুক্ত প্রয়োগের ফলে পশু বা জীব শাশ্বত সত্যের আভাস পায় এবং সর্বপ্রকার মল হইতে বিমুক্ত হইয়া পরমাত্মাস্বরূপ হইয়া পড়ে। নিরতিশয় উদ্যমপ্রসূত জীবাত্মা ও পরমাত্মার একাত্মতার স্থায়ী উপলব্ধিই ভৈরব বলিয়া শিবসূত্রের পঞ্চম সূত্রে ও উহার ভাষ্যে বর্ণিত আছে। (উদ্যমো ভৈরবঃ। ভাষ্য……ভৈরবো ভৈরবাত্মক স্বস্বরূপাভিব্যক্তিহেতুত্বাৎ ভক্তিভাজাম্ অন্তর্মুখৈতত্তত্ত্বাবধানঘনানাং জায়তে।)– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৮৫-৮৬)

              অভিনবগুপ্ত প্রণীত তন্ত্রালোকেও বলা হয়েছে,– ‘জীবত্বপ্রাপ্তির ইচ্ছা জাগ্রত হইলে শিব ত্রিবিধ মলের দ্বারা নিজেকে আবৃত করেন। এই তিনটি মল হইতেছে– আণব, মায়িক ও কার্ম্ম।
শরীরাত্মক আবরণবিহীন হইলে জীবই শিব হন। শিব স্বেচ্ছায় নিজের শক্তি দ্বারা তাঁহার পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যকে আচ্ছাদন করিলে স্বাতন্ত্র্য পরিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। এই পরিচ্ছিন্ন বা পরিমিত স্বাতন্ত্র্যের নাম আণব মল। আণব মলেরই অপর সংজ্ঞা অবিদ্যা।
আণব মলের দ্বারা আবৃত শিব দেহপরিমিত অণুরূপ ধারণ করিয়া জীবকে আপনা হইতে ভিন্ন মনে করেন। এই ভেদবুদ্ধিও অবিদ্যাসঞ্জাত। এই ভেদবুদ্ধিরই সংজ্ঞা মায়িক মল।
মায়িক মলের দ্বারা মলিন জীব শুভাশুভ কর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন। কর্ম্মজনিত সংস্কার জীবেই স্থিতি লাভ করে। এই সংস্কারের বশেই জীবের সুখদুঃখ, জন্মমরণ প্রভৃতি ভোগ উপস্থিত হয়। এই সংস্কারেরই পারিভাষিক সংজ্ঞা কার্ম্মমল।
উল্লিখিত সূত্রে শরীর শব্দের অর্থ এই বিবিধ মলের সমষ্টি।’– (তন্ত্রালোক, নিবেদন-পৃষ্ঠা-১৪-১৫)

             প্রত্যভিজ্ঞাশাস্ত্রের প্রবর্তক ছিলেন বসুগুপ্তের শিষ্য সোমানন্দ। তাঁর প্রণীত শিবদৃষ্টি গ্রন্থেই তিনি এই শাস্ত্রমতের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর শিষ্য উৎপলাচার্য বা উদয়াকর এই মতের প্রকৃত রূপ ও বৈশিষ্ট্যের পরিচয় তাঁর পদ্যে রচিত ঈশ্বর প্রত্যভিজ্ঞা কারিকা নামক গ্রন্থে প্রদান করেছেন। জগৎপ্রপঞ্চের সৃষ্টিবিবরণ এবং জীবের সাথে ঈশ্বরের সম্বন্ধ বিষয়ে প্রত্যভিজ্ঞাশাস্ত্রকারদের মত স্পন্দশাস্ত্রকারদের মত থেকে পৃথক নয়, কিন্তু তাঁরা কিঞ্চিৎ বিভিন্ন ঈশ্বরের সাথে জীবের মূলগত ঐক্য উপলব্ধির বিষয় ব্যাখ্যা করেন বলে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিমত। এ প্রসঙ্গে তাঁর ব্যাখ্যা হলো–
‘প্রত্যভিজ্ঞা দর্শন মতে জীবের শিবের সহিত একাত্মতার উপলব্ধি আপনার মধ্যে ঈশ্বরকে জানিবার ও চিনিবার ফলেই হয়। কঠ, শ্বেতাশ্বতর এবং মুন্ডক উপনিষদগুলিতে এই শ্লোকটি পাওয়া যায়–

ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্র তারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।
(কঠ উপ-৫,১৫; শ্বেতাশ্বতর-৬,১৪; মুন্ডক-২,২,১০)
[অর্থাৎ : সেখানে (ব্রহ্মসন্নিধানে) সূর্য দীপ্তি পায় না, চন্দ্রতারকাও দীপ্তি পায় না, এই সকল বিদ্যুৎও দীপ্তি পায় না। এই অল্প-দীপ্যমান অগ্নি কি প্রকারে দীপ্তি পাইবে? দীপ্যমান তাঁহার অনুগত হইয়াই এইসকল দীপ্তি পাইতেছে, তাঁহারই দীপ্তিতে সকলে দীপ্যমান।]

              ‘এই শ্লোক অনুসারে জীবের অভিজ্ঞান শক্তি আপাতদৃষ্টিতে ঈশ্বরের উক্তরূপ শক্তির সমান হইলেও প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বরের সব কিছু উদ্দীপিত করিবার শক্তির উপরই নির্ভর করে। কারণ সূর্য, চন্দ্র, তারা, বিদ্যুৎ, অগ্নি প্রভৃতি যাবতীয় প্রাকৃতিক শক্তি তাঁহার দীপ্তিতেই অনুভাত হয়। জ্ঞান- ও ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট জীব ঐশ্বরিক অংশের অধিকারী, এবং মূলে জীব ও ঈশ্বরে কোনও পার্থক্য নাই। কিন্তু জীব আদিতে অজ্ঞানরূপ তমসায় আচ্ছন্ন থাকা নিমিত্ত ঈশ্বরের সহিত তাহার প্রকৃত ঐক্য উপলব্ধি করিতে পারে না। এই মত ব্যাখ্যানকল্পে স্থানীয় শাস্ত্রকারগণ যে উপমা ব্যবহার করেন উহা অতি সুন্দর। কোনও একটি প্রেমাস্পদ অপরিচিত যুবকের রূপ ও গুণাবলীর বিষয় অবিরত অন্যের মুখে শ্রবণ করিয়া একটি যুবতী তাঁহাকে মনপ্রাণ দিয়া ভালবাসিতে পারে। যুবকের সহিত পূর্বপরিচয়ের অভাববশতঃ তাহার প্রেমাস্পদের নিকট নীত হইলেও সে তাঁহাকে অপর সাধারণের মত ভাবে, ও তাহার চিত্তে প্রিয়মিলনের কোনও আনন্দপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হয় না। কিন্তু যখন তাহাকে কেহ জানাইয়া দেয় যে যাঁহার কথা কানে শুনিয়া সে তাঁহার পায়ে হৃদয় মন সমর্পণ করিয়াছে তিনিই এই পুরুষ, তখন তাহার আনন্দের আর পরিসীমা থাকে না, এবং সে মিলনানন্দে বিভোর হইয়া পড়ে। জীব সেরূপ পরম শিবের অত্যুৎকৃষ্ট সত্তার বিষয় জানিয়া তাঁহাকে ভক্তি শ্রদ্ধা অর্পণ করিলেও অজ্ঞানাবৃত অবস্থায় জানে না যে তাহার ভক্তির পাত্র ভগবান তাহাতেই আসীন আছেন। যখন কিন্তু সদগুরুর উপদেশে তাহার অজ্ঞানান্ধকার দূরীভূত হয়, এবং সে বুঝিতে পারে যে সে নিজেই অতুৎকৃষ্ট গুণাবলীযুক্ত ঈশ্বরের অধিষ্ঠান ও পরমেশ্বরের সহিত তাহার কোনও সত্যকারের ভেদ নাই, তখন পরম শান্তি ও ভূমানন্দ তাহার চিত্তে চির বিরাজমান হয়। স্পন্দশাস্ত্রমতে ঈশ্বরের সহিত জীবের একাত্মতা বোধ সুতীব্র মনন ও সর্বপ্রকার কলুষ হইতে মুক্ত হইবার চেষ্টার ফলে ভৈরবের আকারে তাহার উপলব্ধির বিষয় হয়, আর প্রত্যভিজ্ঞাদর্শন অনুসারে জীবের ঈশ্বরের সহিত একাত্মতা বোধই তাহার পাশমুক্তির প্রাথমিক ও প্রধান উপায়।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৮৭-৮৮)

              বলা বাহুল্য, অদ্বৈত বেদান্তের সাথে প্রত্যভিজ্ঞাদর্শনের কিয়ৎপরিমাণে প্রভেদ রয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তে বস্তুর তিনপ্রকার সত্তা স্বীকৃত। সকল বস্তু ব্রহ্মস্বরূপ হলেও লৌকিক ব্যবহারে ঘট পট প্রভৃতি বস্তুর পরস্পর ভেদজ্ঞানের মূলে রয়েছে বস্তুগত ব্যবহারিক সত্তা। রজ্জুতে সর্পজ্ঞানের ন্যায় ভ্রমস্থলে রজ্জু প্রভৃতিতে সর্পাদিজ্ঞানের মূলে আছে রজ্জুগত প্রতিভাসিক সত্তা। প্রতিভাস শব্দের অর্থ ভ্রম। পারমার্থিক দৃষ্টিতে সকল বস্তুই ব্রহ্ম, ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন কিছুই নেই। এরূপ জ্ঞানে সকল বস্তুতেই রয়েছে– পারমার্থিক সত্তা।
প্রত্যভিজ্ঞাদর্শনে বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদ স্বীকৃত। শিবই লীলাচ্ছলে জীব ও জগৎ সাজিয়েছেন। জড় বা অচেতন কোন বস্তুই নেই। সকল বস্তুই শিবের শক্তি, অথচ শিব ও শক্তি অভিন্ন। লৌকিক ব্যবহারে সবকিছুই প্রকৃতির গুণের দ্বারা চলছে। প্রচ্ছন্ন শিবেরই এই লীলা। মায়ারাজ্যে আত্মবিস্মৃত শিবই জীব। তিনিই প্রমাণ, তিনিই প্রমেয়। জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞাতা সবই তিনি।
প্রতিভাস বা ভ্রমস্থলেও রজ্জুও সত্য, সর্পও সত্য। ভিন্ন সময়ে প্রতীতির জন্যই জীবের ভ্রম হয়। দু’টি বস্তুর আভাস একই ক্ষণে হয় না। ভ্রম একপ্রকার অসম্পূর্ণ জ্ঞান। দেহাদিতে আত্মজ্ঞানের মতো তা একপ্রকার আভাসমাত্র।

             কাশ্মীর শৈবদের ধর্মদর্শনের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো, তাছাড়াও আত্মন, পরমশিবের প্রকাশ, শিবতত্ত্ব, শক্তিতত্ত্ব, সাদাখ্যতত্ত্ব, ঐশ্বরতত্ত্ব, সদ্বিদ্যা, ষট্কঞ্চুক, পুরুষ, প্রকৃতি ও গুণসমূহ, চতুর্বিংশতিতত্ত্ব প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় স্পন্দশাস্ত্র ও প্রত্যভিজ্ঞাশাস্ত্রকারগণ তাঁদের গ্রন্থাদিতে অতি নিপুণ ও বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। সেগুলোর আলোচনা এখানে বাহুল্য হবে। (এর কিছু কিছু বিষয়ে অন্যত্র তন্ত্র’র আলোচনায় আলোকপাত করা হয়েছে।) তবু এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, স্পন্দ শাস্ত্রমতে এবং প্রত্যভিজ্ঞাদর্শন অনুসারে ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মবোধই জীবের পাশমুক্তির প্রাথমিক উপায়। তাই কাশ্মীর শৈববাদে আচার-অনুষ্ঠান এমন কি আসন-প্রাণায়ামাদিও অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় এগুলোর উপর তেমন গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে মাধবাচার্য তাঁর সর্বদর্শনসংগ্রহে তাঁদের প্রসঙ্গে বলেছেন–

 ‘…বাহ্যাভ্যন্তরচর্যাপ্রাণায়ামাদি ক্লেশ প্রথাসকলাবৈধুর্যেন সর্বসুলভমভিনবং প্রত্যভিজ্ঞামাত্রং পরাপরসিদ্ধ্যুপায়ম্ অভ্যুপগচ্ছন্তঃ পরে মাহেশ্বরাঃ প্রত্যভিজ্ঞাশাস্ত্রমভ্যস্যন্তি।’– (সর্বদর্শনসংগ্রহ-৯০)
অর্থাৎ : এই মাহেশ্বরগণ প্রত্যভিজ্ঞানকেই অভীপ্সিত অর্থ ও পরমার্থ লাভের একটি নব উপায় রূপে গ্রহণ করিয়া মনে করিতেন যে ইহা সমানভাবে সকল মানবের আয়ত্তে ছিল, এবং ইহার জন্য প্রাণায়ামাদি বাহ্য ক্লেশকর ধর্মাচরণের কোনও আবশ্যকতা ছিল না।

              কাশ্মীর শৈববাদে মোক্ষ হচ্ছে পূর্ণতার মূল অবস্থায় এবং বিশুদ্ধ চৈতন্যে প্রত্যাবর্তন। পরমশিবের অনুগ্রহব্যতীত জীব মুক্ত হতে পারে না। একমাত্র তাঁরই কৃপা জীবকে সংসারবন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারে। অভিনবগুপ্তের মতে–

ইত্থং দ্বৈতবিকল্পে প্রবিলঙ্ঘ্য মোহিনীং মায়াম্ ।
সলিলে সলিলং ক্ষীরে ক্ষীরমিব ব্রহ্মণি লয়ী স্যাৎ।।’– (পরমার্থসার-৫১)
অর্থাৎ : মোহিনী মায়ারূপ দ্বৈতমূলক ধারণাসমূহের অবসান ঘটলেই জীব ব্রহ্মে লীন হয়ে যায়, জল যেমন জলের সঙ্গে, অথবা দুধ যেমন দুধের সঙ্গে। (পরমার্থসার-৫১)।। উপাদানসমূহ একমাত্র পরম সত্তা শিবে বিলীন হয়ে যায়। যে বিশ্বজগৎসহ নিজেকেও শিবরূপে উপলব্ধি করতে পারে, সে সকল দুঃখ ও বিভ্রান্তিমুক্ত। (পরমার্থসার-৫২)

               বস্তুত কাশ্মীর শৈবমতে মুক্তি কোন অপ্রাপ্ত বস্তুর প্রাপ্তি নয়, বা অজ্ঞাত বস্তুর জ্ঞান নয়। মুক্তি হচ্ছে– প্রাপ্ত বস্তুরই পুনঃপ্রাপ্তি বা জ্ঞাত বস্তুরই প্রত্যভিজ্ঞান। জীব স্বয়ং শিবস্বরূপ হলেও এতোদিন শিবেরই লীলায় মলাবৃত হয়ে প্রচ্ছন্ন ছিল, নিজের শিবরূপতা জানতে পারেনি। শিব স্বপ্রকাশ, বস্তুত কোন কিছুই তাঁকে আবৃত করতে পারে না। স্বেচ্ছায় তিনি জীব ও জগৎ সেজে অভিনয় করছেন। জীব তাঁরই কৃপায় যখন নিজের শিবরূপতা বুঝতে পারে, তখনই সে মুক্ত। পরশুরামকল্পসূত্রেও (১/৬) বলা হয়েছে– ‘স্ববিমর্শঃ পুরুষার্থঃ’– অর্থাৎ, নিজের যথার্থ স্বরূপ জানাই মুক্তি।
শিবের কৃপা বা শক্তিপাতের নিমিত্ত সাধনার প্রয়োজন। সাধনপথে যাওয়ার প্রবৃত্তিও শিবই জুগিয়ে থাকেন। জগতের যাবতীয় বস্তুই শিবের শক্তির স্ফুরণ। অর্থাৎ সকল বস্তুকে শিবময় ভাবনা করতে না পারা পর্যন্ত শিবজ্ঞান হয় না। প্রত্যভিজ্ঞাদর্শনে তান্ত্রিক সাধনার পদ্ধতিও উপদিষ্ট হয়েছে। এই সাধনা একান্তই গুরুগম্য।

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : বীরশৈব বা লিঙ্গায়ৎ সম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : শৈব তন্ত্র]

Advertisements

2 Responses to "শিব ও লিঙ্গ-৯/৮ : কাশ্মীর শৈববাদ"

আপনার লেখা অত্যন্ত জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং প্রামাণ্য । কিন্তু শৈব সম্প্রদায়ের আলোচনায় নাথধর্ম ও নাথসম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতিতে আশ্চর্য হয়েছি । এ সম্পর্কে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ।

ধন্যবাদ। তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। দ্বিধায় ছিলাম, নাথধর্মকে শৈব-সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কি না ! যাক্, অচিরেই পেয়ে যাবেন আশা করি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 346,255 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 113 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: