h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৯/৬ : শুদ্ধশৈব বা শিবাদ্বৈত সম্প্রদায়

Posted on: 03/09/2018


Lord-Shiva-full-HD-wallpaper
শিব ও লিঙ্গ-০৯/৬ : শুদ্ধশৈব বা শিবাদ্বৈত সম্প্রদায়
রণদীপম বসু

দক্ষিণ ভারতে শুদ্ধশৈব নামে অপর একটি শৈব মত ও সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। শিব পুরাণের অন্যতম অংশ বায়বীয় সংহিতা তাঁদের প্রামাণ্য শাস্ত্রগ্রন্থ, এবং এই মতের সর্বশ্রেষ্ঠ আদি ব্যাখ্যাতা ছিলেন শ্রীকণ্ঠ শিবাচার্য। তিনি ‘ব্রহ্মমীমাংসা’ নামে বেদান্তসূত্রের স্বকৃত ভাষ্য রচনা করেছিলেন, যার উপর শৈবধর্মের ভিত্তি স্থাপনের প্রয়াস পেয়েছিলেন। ষোড়শ শতকের অপ্পয় দীক্ষিত এই ব্রহ্মমীমাংসা-ভাষ্যের নিজস্ব ভাষ্য রচনা করেছিলেন।
ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তসূত্রের উপর রচিত শ্রীকণ্ঠের ভাষ্য বহুলাংশে রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের অনুরূপ, তবে রামানুজ যেমন চরম অদ্বয়বাদ ও দ্বৈতবাদের মধ্যবর্তী পথ গ্রহণ করেছিলেন, শ্রীকণ্ঠের মত একটু বেশি অদ্বয় ঘেঁষা, বরং তাঁকে অদ্বৈতবাদী আচার্য শঙ্কর ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী রামানুজ আচার্যের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ফেলা যায় বলে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের অভিমত।
‘জীবাত্মা ও জড়জগতের সঙ্গে পরমাত্মা বা ব্রহ্ম বা শিবের সম্পর্ককে শ্রীকণ্ঠ দেহ ও আত্মার সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে ব্রহ্ম বা শিবই হচ্ছেন জগতের নিমিত্ত ও উপাদান কারণ। জীবাত্মা ও জড়জগতের আণবিক উপাদানসমূহ তাঁরই শক্তিবশে তাঁতেই সঞ্জাত হয় এবং এই শক্তিবলেই তাঁর দ্বারা জগতের সৃষ্টি হয়। বিশ্বজগৎ ব্রহ্ম হতে অ-পৃথক, যেমন কলস মাটি হতে অ-পৃথক, কিন্তু একই সঙ্গে, ব্রহ্ম জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে অ-ভিন্ন নন, কেননা তিনি চেতনকারণ যেখানে জগৎ ‘অংশত’ অচেতন। ‘অংশত’ এই কারণে যে সেখানে অচেতন বস্তু ও চেতন জীব দুই বর্তমান।’
‘শিবই ব্রহ্ম। ক্রমাগত ধ্যানের দ্বারাই তাঁকে উপলব্ধি করা যায় যার নাম ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার। এই একমাত্র পন্থা যার দ্বারা জীব বন্ধন বা পশুভাব থেকে মুক্ত হতে পারে। আত্মোপলব্ধিতেই শিবোপলব্ধি। এটা একটা মানসিক অবস্থা যার নাম শিবত্ব। বন্ধন যুক্ত জীব এই সাধনার প্রথম স্তরে নিরন্বয়-উপাসক নামে পরিচিত হবে। তার কর্মসমূহ পরিপক্ক হবার পূর্বপর্যন্ত মুক্তি হবে না। ক্রমাগত ধ্যানের অগ্রগতির ফলে তার কিছু বিশেষ গুণ (অসাধারণ) জন্মাবে, পরবর্তী স্তরে ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার, অবশেষে মুক্তি।’– (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০৮)

                শ্রীকণ্ঠ রামানুজের সমকালীন বলে কথিত হলেও, তাঁর রচনায় রামানুজ দর্শনের প্রভাব এত বেশি যে তাঁকে রামানুজ-পরবর্তী বলাই সঙ্গত। আধুনিক পণ্ডিতদের অনেকেই তাঁকে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে স্থান দেবার পক্ষপাতী। এ প্রসঙ্গে ‘পঞ্চোপাসনা’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-২০৩-৪) অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য হলো–
‘তিনি [শ্রীকণ্ঠ শিবাচার্য] ব্রহ্মমীমাংসা বা ব্রহ্মসূত্রের এক বিশদ ভাষ্য রচনা করিয়াছিলেন, এবং এই ভাষ্যে তিনি নিজেকে শ্বেতাচার্যের শিষ্য রূপে একাধিকবার পরিচিত করিয়াছেন। এই শ্বেতাচার্য যে কে ছিলেন উহা সঠিক জানা যায় না, এবং শ্রীকণ্ঠ শিবাচার্যও যে কোন সময়ে বর্তমান ছিলেন সে বিষয়ে মতদ্বৈত আছে। শ্রীকণ্ঠ শিবাচার্য কৃত ব্রহ্মমীমাংসা (সূত্র) ভাষ্যের সম্পাদক পণ্ডিত এল. শ্রীনিবাসাচার্য তাঁহার সম্পাদিত গ্রন্থের সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ভূমিকায় বলিয়াছেন যে কাহারও কাহারও মতে শঙ্করাচার্যের সমকালীন ব্রহ্মসূত্রের অপর এক ভাষ্যকার নীলকণ্ঠ ও শ্রীকণ্ঠ শিবাচার্য অভিন্ন। কিন্তু এ মত যে ভ্রান্ত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। কারণ শ্রীকণ্ঠ শিবাচার্য গৃহীত দার্শনিক মতবাদে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ এরূপ ভাবে সমর্থিত হইয়াছে, যাহাতে মনে হয় তিনি শ্রীরামানুজাচার্যের বেশ কিছু পরবর্তী কালের না হইয়া পারেন না। তিনি খুব সম্ভব খৃষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর লোক ছিলেন, এবং অন্যতম সন্তান আচার্য মেকণ্ডদেবরের সমকালীন ছিলেন। দার্শনিক মতবাদের দিক দিয়া উভয়ের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য ছিল। শ্রীকণ্ঠের মতে শৈবমত শ্রুতি বা বেদান্তে প্রতিষ্ঠিত ছিল, কিন্তু মেকণ্ডদেবর প্রভৃতি আচার্যগণ তাঁহাদের গ্রন্থাদিতে বেদ বা বেদান্তকে ইহার ভিত্তি স্বরূপ মনে করিতেন না, তাঁহাদের মতে আগমাদি শাস্ত্রের উপরই ইহা প্রতিষ্ঠিত ছিল। শ্রীকণ্ঠ বলিতেন যে জীবাত্মা ও জড়জগতের আণবিক উপাদানসমূহ ভগবান শিবের চিচ্ছক্তিবশে তাঁহাতেই সঞ্জাত হয়, এবং এই শক্তিবলেই তাঁহার দ্বারা জগৎপ্রপঞ্চ সৃষ্ট হয়। ইহাই বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের আর এক রূপ। তদ্রচিত ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্যের ভূমিকায় শ্রীকণ্ঠ বলিয়াছেন যে ব্যাসসূত্র (ব্রহ্মসূত্র) পণ্ডিতগণের ব্রহ্মদর্শনের নেত্রস্বরূপ, ইহা পূর্বাচার্যগণের (ভ্রান্ত ব্যাখ্যানের) দ্বারা কলুষিত হইয়াছিল, এখন তিনি নিজকৃত ভাষ্যে ইহার (সঠিক) ব্যাখ্যান দিতেছেন (ব্যাসসূত্রমিদং নেত্রং বিদুষাং ব্রহ্মদর্শনে। পূর্বাচার্যৈঃ কলুষিতং শ্রীকণ্ঠেন প্রসাদ্যতে)। খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শৈবাচার্য অপ্পয় দীক্ষিত শ্রীকণ্ঠ বিরচিত ব্রহ্মমীমাংসা (ব্রহ্মসূত্র) ভাষ্যের ভাষ্য রচনা করিয়া শুদ্ধশৈব সম্প্রদায়ের ধর্মদর্শনের উপর প্রভূত আলোকপাত করিয়াছেন। স্বর্গীয় সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত মহাশয় তাঁহার গ্রন্থে এ সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা করিয়াছেন (S.N.Dasgupta, History of Indian Philosophy, Vol. V, pp 65-96)।’

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : আগমান্ত শৈব সম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : বীরশৈব বা লিঙ্গায়ৎ সম্প্রদায়]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 322,536 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 111 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

| যোগ দর্শন-০৪ : অষ্টাঙ্গিক যো… প্রকাশনায় Jyotish Roy
| সাংখ্য দর্শন-০৫ : সাংখ্য তত্… প্রকাশনায় Biswajit Mitra
|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-১১ :… প্রকাশনায় Goutam jana
| যোগ দর্শন-০২ : যোগ মনস্তত্ত্… প্রকাশনায় Suman
| বেদান্তদর্শন-ব্রহ্মবেদান্ত-৩… প্রকাশনায় বিধান চন্দ্র মন্ডল

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: