h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৯/৫ : আগমান্ত শৈব সম্প্রদায়

Posted on: 03/09/2018


MV_-_Uma-Maheshvara
শিব ও লিঙ্গ-০৯/৫ : আগমান্ত শৈব সম্প্রদায়
রণদীপম বসু

খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতক থেকে দক্ষিণ ভারতে আরও একটি শৈব মত প্রতিষ্ঠালাভ করে যা আগমান্ত শৈবধর্ম নামে খ্যাত। এই মত মূলত শৈব সিদ্ধান্ত অনুসারী, কিন্তু এই মতের সাধকরা তন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাঁদের আদি এলাকা ছিল গোদাবরী তীরে মন্ত্রকালী নামক অঞ্চল। এই মতের প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ দ্বাদশ শতকের অঘোর শিবাচার্য বিরচিত ক্রিয়াকর্মদ্যোতিনী। এছাড়া ত্রিলোচন শিবাচার্যের সিদ্ধান্তসারাবলী, নিগম-জ্ঞানদেবের জীর্ণোদ্ধারদশকম প্রভৃতিও এই সম্প্রদায়ের প্রামাণ্য গ্রন্থ। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়–
‘প্রাচীন শৈব ধর্মতত্ত্বের প্রধান ভিত্তি ছিল আগমশাস্ত্র, এবং আগমশাস্ত্রের অনুমোদিত সংখ্যা ছিল অষ্টাবিংশতি। আগমান্ত শৈব গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে গোদাবরী নদীর তীরে মন্ত্রকালী নামক স্থানে বংশানুক্রমে শৈবাচার্যদিগের বাস ছিল। তথায় মন্ত্রকালেশ্বর শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করিয়া আমর্দক প্রমুখ চারিটি শৈব মঠ স্থাপিত হয়। আমর্দক তৎকালীন অতি বিখ্যাত শৈব মঠ, এবং ইহার বহু শাখা ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রবলপ্রতাপ চোল নৃপতি রাজেন্দ্র চোল গঙ্গাতীরবর্তী দেশসমূহে বিজয়াভিযানকালে উক্ত শৈবাচার্যদিগের সংস্পর্শে আসেন, এবং অভিযান হইতে প্রত্যাবর্তনকালে ইঁহাদিগের মধ্য হইতে কয়েকজনকে লইয়া আসিয়া নিজ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন। চোল রাজ্যে নবাগত এই আচার্য গোষ্ঠী শৈব ধর্মতত্ত্বমূলক বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন; এবং ইহার ফলে দক্ষিণ ভারতে শৈব ধর্মদর্শনের প্রভূত প্রসার হয়। ইঁহাদের অন্যতম বংশধর অঘোর শিবাচার্য খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বর্তমান ছিলেন, এবং তিনি ক্রিয়াকর্মদ্যোতিনী নামক শৈবদর্শন সংক্রান্ত এক অতি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁহার পর যথাক্রমে ত্রিলোচন শিবাচার্য সিদ্ধান্তসারাবলী, এবং বামদেব শিবাচার্যের পুত্র নিগম জ্ঞানদেব জীর্ণোদ্ধারদশকম্ নামে এ জাতীয় গ্রন্থসমূহ রচনা করিয়াছিলেন। তাঞ্জোরের সুবিখ্যাত বৃহদীশ্বর শিবমন্দিরের নির্মাতা পরাক্রান্ত চোল নৃপতি রাজরাজ সর্বশিব পণ্ডিত শিবাচার্যকে উক্ত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত-পদে নিযুক্ত করেন, এবং এই নির্দেশ দেন যে আর্য, মধ্য ও গৌড় দেশীয় শৈবগুরুদিগের শিষ্য-প্রশিষ্যগণই ভবিষ্যতে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত-পদ আলঙ্কৃত করিবার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবেন। ইহা হইতে অনুমান করা অসঙ্গত হইবে না যে সর্বশিব পণ্ডিত শিবাচার্য উত্তরদেশাগত আচার্য ছিলেন, এবং আগমান্ত শৈব মতের রূপায়ণে দ্রবিড়োত্তর দেশীয় আচার্যগণ এক সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ চোল নৃপতিগণের ধর্মগুরুর পদে অভিষিক্ত হন, এবং ইঁহারা রাজ্যে এরূপ প্রভাবশালী ছিলেন যে কখনও কখনও তাঁহারা রাজার বিধান পরিবর্তন করিতেও পশ্চাৎপদ হইতেন না।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৯৩-৯৪)

                  আগমান্ত শৈবেরা বেদ ও উপনিষদে বিশ্বাসী বেদান্ত শৈবগোষ্ঠী থেকে পৃথক ছিলেন। তাঁরা বেদের উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন না। আটাশটি আগমশাস্ত্রই (অধিকাংশ এখনও অপ্রকাশিত) তাঁদের নিজস্ব শাস্ত্র, যা তাঁদের মতে মহাদেবের পঞ্চমুখ থেকে নির্গত। কামিকাগম, সুপ্রভেদাগম, বিজয়াগম, কিরণাগম, বাতুলাগম প্রভৃতি ওই আটাশটি আগম শাস্ত্রের অন্তর্গত। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের ভাষ্যে–
‘মহাদেব পঞ্চবক্ত্র; তাঁহার পাঁচটি মুখের নাম সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ ও ঈশান। এই বিভিন্ন বক্ত্রের দ্বারাই আটাশটি শৈবাগম নিম্নলিখিত ক্রমে ঘোষিত হইয়াছিল বলিয়া আগমান্ত শৈবদিগের বিশ্বাস। সদ্যোজাত মুখ হইতে কামিকাগম প্রমুখ পাঁচটি আগম, বামদেব মুখ হইতে সপ্রভেদাগম প্রভৃতি পাঁচটি, অঘোর বক্ত্র হইতে বিজয়াগম প্রমুখ পাঁচটি, তৎপুরুষ বক্ত্রের দ্বারা রৌরবাগম প্রমুখ পাঁচটি এবং ঈশান বদন হইতে কিরণাগম, বাতুলাগম প্রভৃতি ছয়টি আগম ভগবান মহাদেব কর্তৃক ব্যাখ্যাত হয়। এই ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী আগমান্ত শৈবগণ অষ্টাবিংশতি আগমশাস্ত্রের উপর এত অধিক গুরুত্ব প্রদান করিতেন। ইহাও এ প্রসঙ্গে বলা আবশ্যক যে আগমগুলির বিভিন্ন তালিকাভুক্ত নামসমূহের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য দৃষ্ট হয়। শিব স্বয়ং ইহাদের রচয়িতা এ কিংবদন্তীর কথা বাদ দিলে ইহা বলা যায় যে অধিকাংশ শৈবাগম খৃষ্টীয় নবম শতকের মধ্যে রচিত হইয়াছিল। ইহাদের রচনাস্থল যে প্রধানতঃ দক্ষিণ ভারত, তাহার অন্যতম প্রমাণ এই যে এগুলি প্রায় নাগরী অক্ষরে কিন্তু তামিল, তেলেগু, কানাড়ী প্রভৃতি দক্ষিণ দেশীয় ভাষায় রচিত হয়। বহু আগম অনেক পাঞ্চরাত্র সংহিতার ন্যায় এখনও অপ্রকাশিত আছে।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৯৪-৯৫)

                আগমান্ত শৈবেরা জাতিভেদ মানতেন না, যে কারণে অপরাপর সম্প্রদায়, বিশেষ করে কুমারিল ভট্ট প্রমুখ মীমাংসক এবং অদ্বৈতমতাবলম্বিগণ কর্তৃক তাঁরা অপমার্গী, নাস্তিক, শূদ্র হিসেবে নিন্দিত ছিলেন। তাঁরাও আবার অদ্বৈতবাদী ও বেদাচারী মীমাংসকদেরকে পাশবদ্ধ পশু বলে নিন্দা করতেন এবং তাঁদেরকে শৈব দীক্ষা গ্রহণের অনুপযুক্ত বলে মনে করতেন। পরস্পরের প্রতি তাঁরা অপভাষণরত হলেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে একে অপরের ধর্মাচরণ আংশিকভাবে গ্রহণ করতে বিমুখ হতেন না। আগমান্ত শৈবেরা গৃহ্যসূত্রে বর্ণিত কয়েকটি হোম ও বেদাচারীদের উপযোগী মন্ত্র তাঁদের ধর্মানুষ্ঠানে ব্যবহার করতেন এবং বৈদিক মন্ত্রের অনুকরণে কতিপয় মন্ত্রও রচনা করেছিলেন বলে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথে অভিমত। তবে তাঁদের পূজাকার্যে ব্যবহৃত সর্বাপেক্ষা পবিত্র পঞ্চাক্ষর মন্ত্র ছিল–‘নমঃ শিবায়’, এবং ধর্মপালনের অন্যান্য অঙ্গ বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল।
গুরুকরণ ও দীক্ষা আগমান্ত শৈবদের পক্ষে অত্যাবশ্যক ছিল। তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে এ বিষয়ে অবহেলা করলে তাঁরা জীবনে পূর্ণতা লাভ করতে পারবেন না, এবং অবশেষে মোক্ষলাভ থেকে বঞ্চিত হবেন। গুরু বা আচার্য এই দীক্ষাদান ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করতেন, এবং শৈব দীক্ষা গ্রহণেচ্ছুর দ্বারা তিনি সাক্ষাৎ ইষ্টদেবতা শিব রূপে পরিগণিত হতেন। দীক্ষায় যোগ্যতালাভের জন্য দেবীর কৃপার উপর নির্ভর করতে হতো, এই কৃপালাভকে শৈবশাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘শক্তিপাতম্’। দীক্ষাকামীর নিজ নিজ শক্তি অনুযায়ী শক্তিপাত কয়েক প্রকারের হতো। কারও পক্ষে তৎক্ষণাৎ অর্থাৎ দীক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা মনোমধ্যে উদয়ের প্রায় সাথে সাথে, কারও পক্ষে অচিরে, আবার কারও পক্ষে ধীরে বা অতি ধীরে দেবীর অনুগ্রহ লাভ সম্ভব হতো। আগমান্ত শৈবেরা নানাপ্রকার আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ার উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন, তবে এই অনুষ্ঠানসমূহ অতিমার্গিতাদোষ থেকে মুক্ত ছিল।

                শক্তিপাতের তারতম্য অনুযায়ী শৈব দীক্ষা ছিল তিন প্রকার– সময়-দীক্ষা, বিশেষ-দীক্ষা ও নির্বাণ-দীক্ষা। সাধারণের জন্য প্রথমটিই অর্থাৎ সময়-দীক্ষা নির্দিষ্ট ছিল, বাকি দুটি উন্নততর মানসিকতা সম্পন্নদের জন্য। সময় ও বিশেষ দীক্ষা বিধিতে গুরু বা আচার্যের অংশ অধিকতর প্রধান ও সক্রিয় ছিল। নির্বাণ দীক্ষা সেসব শিষ্যের পক্ষেই প্রযোজ্য হতো, যাঁরা আধ্যাত্মিকতার পথে পূর্ব থেকেই অধিক অগ্রসর থাকতেন। সময়-দীক্ষা গ্রহণকারীদের গুরু ও শিবাগ্নির পূজা করতে হতো, এবং তাঁরা দাসমার্গী ছিলেন, অর্থাৎ নিজেদের ঈশ্বরের ভৃত্য বা সেবক হিসেবে গণ্য করতেন, পূর্বোক্ত শৈব সিদ্ধান্ত মতে যা চর্যা মার্গ।
সময় দীক্ষায় গুরু কর্তৃক অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার দ্বারা শিষ্য পাশ হতে মুক্ত হতেন, এবং ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শূদ্রাদি জাতি অনুযায়ী শিষ্য বা শিষ্যার নতুন নামকরণ হতো এবং নামগুলি প্রধানত শিবের পঞ্চমুখের নামানুসারে রাখা হতো। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, স্ত্রী ও শূদ্রের শৈব দীক্ষা গ্রহণে কোনও বাধা ছিল না, তবে জাতি ও লিঙ্গ অনুযায়ী দীক্ষার পর তাঁদের নামকরণে পার্থক্য রাখা হতো। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়–
‘নূতন নামগুলি সাধারণতঃ ঈশান, তৎপুরুষ, অঘোর ইত্যাদি মহাদেবের পঞ্চবক্ত্রের নামানুযায়ী রাখা হইত, এবং এই সব নাম সকলকেই দেওয়া যাইত; তবে নামগুলির শেষে কিঞ্চিৎ বৈচিত্র্য থাকিত। নবদীক্ষিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়জাতিভুক্ত হইলে নামের পিছনে শিব ও দেব উপাধি যুক্ত করা হইত, যেমন ঈশান শিব (ব্রাহ্মণ), ঈশান দেব (ক্ষত্রিয়) ইত্যাদি। কিন্তু তাঁহারা যদি বৈশ্য বা শূদ্র জাতিভুক্ত হইতেন, তাহা হইলে উভয় ক্ষেত্রেই গণ উপাধি প্রযুক্ত হইত, যথা ঈশান গণ নাম বৈশ্য ও শূদ্র উভয়ের পক্ষেই প্রযোজ্য ছিল। দীক্ষাপ্রাপ্তা ব্রাহ্মণী হইলে তাঁহার নাম রাখা হইত ঈশান- বা ঈশা-শিবশক্তি, ক্ষত্রিয়াণী হইলে ঈশান- বা ঈশা-দেবশক্তি, এবং বৈশ্যা ও শূদ্রাণী হইলে ঈশান- বা ঈশা-গণশক্তি। যাঁহারা তাঁহাদিগের গুরুর নিকট হইতে সময় দীক্ষা গ্রহণ করিতেন, তাঁহাদের বলা হইত সময়ী এবং তাঁহারা দেহান্তে রুদ্র পদ প্রাপ্ত হইতেন। যে সব দীক্ষাকামীর শক্তিপাত ধীরে বা অধি ধীরে হইত তাঁহাদের পক্ষেই সময় দীক্ষা উপযোগী ছিল।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৯৭)

                      বিশেষ-দীক্ষার অধিকারীরা পুত্রক নামে পরিচিত ছিলেন যাঁরা ক্রিয়া ও যোগের অধিকারী ছিলেন এবং ঈশ্বরের অধিকতর অন্তরঙ্গতা দাবি করতেন। বিশেষ দীক্ষার অধিকারীদের পক্ষে দেবীর অনুগ্রহ লাভ অপেক্ষাকৃত অল্প সময়সাপেক্ষ ছিল। বিশেষ দীক্ষার অনুষ্ঠানাবলী অনেকাংশে সময় দীক্ষার বিধিসমূহের অনুরূপ হলেও কোন কোন বিষয়ে ভিন্নতর ছিল। গুরু শিষ্যকে সময়াচার শিক্ষা দিতেন। এই শিক্ষানুযায়ী শিষ্য শিব, শৈবশাস্ত্র, শিবাগ্নি এবং গুরুর নিন্দা থেকে বিরত থাকতেন। মৃত্যুকাল পর্যন্ত গুরু ও শিবাগ্নির পূজা অর্চনা তাঁর নিত্য কর্তব্য ছিল এবং মৃত্যুর পর তাঁদের ঈশ্বর-পদ প্রাপ্তি ঘটতো বলে বিশ্বাস করা হয়। আর নির্বাণ-দীক্ষিতেরা ছিলেন আরও উচ্চস্তরের যাঁরা যোগের ও জ্ঞানের অধিকারী।
তামিল শৈব গ্রন্থে শৈবতত্ত্বভুক্ত চারটি পাদের নাম পাওয়া যায়– সারিথেই (চর্যা), কিরিকেই (ক্রিয়া), য়োকম্ (যোগ) ও জ্ঞানম্ (বিদ্যা বা জ্ঞান)। দীক্ষাবিধির স্তর অনুযায়ী সময়ী বা সময়-দীক্ষিতেরা চর্যার অধিকারী, পুত্রক বা বিশেষ-দীক্ষিতেরা চর্যা ও ক্রিয়ার (ক্ষেত্রবিশেষে যোগের) অধিকারী, এবং নির্বাণ-দীক্ষিতেরা যোগ ও জ্ঞানের অধিকারী। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য–
‘পুত্রকগণ সময়ীদিগের অপেক্ষা যে উচ্চ পর্যায়ের শৈব ছিলেন উহা উভয়ের কর্মগত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা প্রমাণিত হয়। পুত্রকেরা চর্যা ও ক্রিয়াপাদের অন্তর্গত কার্যাবলী করিবার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু সময়ীরা সাধারণতঃ দাসমার্গাশ্রয়ী হইতেন। শিবমন্দিরস্থ দেবতার পূজানুষ্ঠানে উভয় গোষ্ঠীর উপরে যে সব কার্যের ভার অর্পিত হইত উহা হইতে এই পার্থক্য স্পষ্টরূপে বুঝা যায়। পুত্রকেরা আনুষ্ঠানিক দেবপূজার অধিকারী হইতেন, অপর পক্ষে সময়ীরা প্রায়শঃ পুষ্প, পত্র মাল্যাদি পূজোপকরণ সংগ্রহ প্রভৃতি কার্যের ভার পাইতেন। কিন্তু সর্বাপেক্ষা উচ্চস্তরের শৈব ছিলেন নির্বাণ দীক্ষায় দীক্ষিত ব্যক্তিগণ। দীক্ষিত হইবার সঙ্গে সঙ্গেই যে ইঁহারা জীবদ্দশাতেই সর্বপ্রকার পাশ হইতে শুধু মুক্ত হইতেন তাহা নহে, পরন্তু তাঁহারা পবিত্রতায় তাঁহাদের ইষ্টদেবতা শিবের প্রায় সমকক্ষ হইতেন, এবং সর্বজ্ঞত্ব, পূর্ণকামত্ব, অনাদি জ্ঞান, অপরাশক্তি, পূর্ণস্বাধীনত্ব প্রভৃতি ঐশী ক্ষমতার অধিকারী হইতেন। এ প্রসঙ্গে ইহা পুনরায় উল্লেখযোগ্য যে দীক্ষিত আগমান্ত শৈবদিগের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ স্তরের ব্যক্তিগণের নিকটও সিদ্ধ পাশুপত যোগীদিগের মত অপ্রাকৃত ঐশী শক্তিসমূহ কাম্য হইলেও, ইহার অর্জনে তাঁহারা কোনও রূপ উগ্র পন্থার আশ্রয় লইতেন না।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৯৭-৯৮)

                            আগমান্ত শৈবেরাও শৈব সিদ্ধান্তীদের মতো– পতি, পশু ও পাশ– এই ত্রিতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের মতানুযায়ী, কাশ্মীর শৈবদর্শনে ত্রিকের দুটি তত্ত্ব পশু ও পাশ সম্পূর্ণরূপে পতি বা ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু আগমান্ত শৈব দর্শনে পতি বা ভগবান শিব কিয়ৎ পরিমাণে পশু বা জীবের কর্মাদির দ্বারা প্রভাবিত হয়েই যেন সৃষ্টিকার্যে অগ্রসর হন। তিনি সর্বজ্ঞ এবং কর্ম ও মলাদিযুক্ত হলেও, কর্মনিরপেক্ষ কারণ নন। মাধবাচার্য তাঁর সর্বদর্শনসংগ্রহের শৈব প্রস্থানে এই আগমান্ত শৈবদর্শন সম্পর্কে বলেন–

তমিমং পরমেশ্বরঃ কর্মাদিনিরপেক্ষঃ কারণমিতি পক্ষং বৈষম্যেনৈর্ঘৃণ্যদোষদূষিতত্বাৎ। –(সর্বদর্শনসংগ্রহঃ, শৈবদর্শনম্)
অর্থাৎ : ঈশ্বর যদি কর্মাদিনিরপেক্ষ কারণস্বরূপ হন তাহা হইলে আগমান্ত শৈবদিগের মতে তাঁহার পক্ষপাতিত্ব দোষ ঘটে।

                 আগমান্ত শৈব মতে পতি বা ভগবান শিব সর্বক্রিয়াশীল ও সর্বজ্ঞ এবং জীবের ন্যায় কর্ম ও মলাদি পাশযুক্ত দেহবদ্ধ নন। তবে এই শাস্ত্রে তাঁর যে শরীর কল্পনা করা হয়েছে, এটি তাঁর সর্বশক্তির ও পঞ্চবিধ মন্ত্রের সূক্ষ্ম সমন্বয় বলে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের অভিমত। তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম খণ্ডে ৪৩ থেকে ৪৭ অনুবাকে এই মন্ত্র পাঁচটি বর্ণিত আছে। পঞ্চবিধ মন্ত্রই পতি শিবের পঞ্চশক্তি রূপে কল্পিত হয়েছে, এবং তা থেকেই তাঁর পঞ্চকৃত্যের (সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার, অনুগ্রহ ও তিরোভাব) উদ্ভব। জিতেন্দ্রনাথ কর্তৃক উদ্ধৃত তৈত্তিরীয় আরণ্যকের এই পঞ্চবিধ মন্ত্র হলো–

সদ্যোজাতং প্রপদ্যামি সদ্যেজাতায় বৈ নমঃ। ভবে ভবে নাতি ভবে ভজস্ব মাং। ভবোদ্ভবায় নমঃ। (তৈ.আ.-৪৩)।। বামদেবায় নমঃ জ্যেষ্ঠায় নমঃ শ্রেষ্ঠায় নমো রুদ্রায় নমঃ কালায় নমঃ কলবিকরণায় নমো বলবিকরণায় নমো বলায় নমো বলপ্রমথনায় নমঃ সর্বভূতদমনায় নমো মনোন্মনায় নমঃ। (তৈ.আ.-৪৪)।। অঘোরেভ্যোহথ ঘোরেভ্যো ঘোর ঘোরতরেভ্যঃ। সর্বতঃ শর্ব সর্বেভ্যো নমস্তে অস্তু রুদ্ররূপেভ্যঃ। (তৈ.আ.-৪৫)।। তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহী। তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ। (তৈ.আ.-৪৬)।। ঈশানঃ সর্ববিদ্যানামীশ্বরঃ সর্বভূতানাং ব্রহ্মাধিপতির্ব্রহ্মণোধিপতি র্ব্রহ্মাশিবো মে অস্তু সদা শিবোম্ । (তৈ.আ.-৪৭)।।

এখানে পশুপতি শিবের সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর, তৎপুরুষ এবং ঈশান– এই পাঁচটি বক্ত্র বা মুখ যথাক্রমে পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং উর্ধ্বভাগস্থিত, এবং মন্ত্র পাঁচটি বিভিন্ন বক্ত্র প্রতিপাদক।

 

                 শৈব মতে মন্ত্রাবলী, মন্ত্রেশ্বর, মহেশ্বর এবং মুক্ত জীব,– এই চার পদার্থই ভগবান মহাদেবের প্রকৃতিবিশিষ্ট। শৈবাগম মতে, শরীর অর্থাৎ ত্রিবিধ (আণব, কার্ম ও মায়িক) মলের দ্বারা আবৃত শিবই জীবত্ব প্রাপ্ত হন। এই শরীরাত্মক আবরণ-বিহীন হলে জীবকেই শিব বলা হয়। পরম শিব সর্বথা স্বতন্ত্র। পশু, জীব বা জীবাত্মা, ক্ষেত্রজ্ঞ বলে খ্যাত, এবং নিত্য ও সর্বব্যাপী। মুক্ত জীবের প্রতি আগমান্ত শৈব মতে সর্বার্ধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মুক্ত জীব আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থিত এবং অনেকাংশে ভগবান শিবের সারূপ্যযুক্ত। এই স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য জীবকে বহু অন্তর্বর্তী স্তর অতিক্রম করে আসতে হয়; শৈব দর্শনে স্তরসমূহের পর্যায়ক্রম বর্ণনা আছে। মানসিক শক্তিভেদে এই পশু বা জীব তিন প্রকার– বিজ্ঞানাকল, প্রলয়াকল এবং স-কল।
প্রথম প্রকারের অর্থাৎ বিজ্ঞানাকল জীব সর্বোচ্চ স্তরের। জ্ঞানার্জন, ধ্যান ও তপশ্চর্যাদি সৎক্রিয়ার দ্বারা তাঁর কর্মক্ষয় হওয়ার ফলে তিনি কলা থেকে মুক্ত হন, [পাশুপত সম্প্রদায়ের বিবরণ প্রসঙ্গে কলার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। জীব বা পশুর গুণসমূহের নাম বিদ্যা এবং উপাদানসমূহের নাম কলা।] এবং মাত্র আণব মল (অবিদ্যা বা পরিমিত স্বাতন্ত্র্য জ্ঞান) তাঁর সাথে সংযুক্ত থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের অর্থাৎ প্রলয়াকল জীবের বিশ্বপ্রলয়কালে কলামুক্তি ঘটলেও তাঁর দেহে কর্ম থেকে সঞ্জাত মল (কার্ম মল বা সংস্কার) এবং আণব মল দুটিই বর্তমান থাকে। তৃতীয় প্রকারের অর্থাৎ স-কল জীবের কলাবন্ধন থেকে মুক্তি হয় না (স+কল), এবং তার শরীরে আণব, কার্ম ও মায়ীয় (মায়া থেকে সঞ্জাত ভেদবুদ্ধি)– এই ত্রিবিধ মলই সংলিপ্ত থাকে।
বিজ্ঞানাকল জীব দুই প্রকার– সমাপ্তকলুষ ও অসমাপ্তকলুষ। যাঁদের আণবমল এখনও বিনষ্ট হয়নি তাঁরা হলেন অসমাপ্তকলুষ, আর যাঁদের সর্বপ্রকার মল এমনকি আণব মলও বিনষ্ট হয়েছে তাঁরা সমাপ্তকলুষ। সমাপ্তকলুষেরা বিদ্যেশ্বর নামে পরিচিত। একইভাবে প্রলয়াকল ও সকল (কলাযুক্ত) জীবেরাও দুই দুই ভাগে বিভক্ত– পক্ককলুষ ও অপক্ককলুষ। যাঁদের কলুষ থেকে মুক্তি আসন্ন, এবং ঈশ্বর দীক্ষাগুরুর রূপ ধারণ-পূর্বক তাঁদেরকে উপযুক্ত দীক্ষাদান করে তাঁদের মোক্ষলাভের সাহায্য করেন তাঁরা পক্ককলুষ। আর যাঁদের কলুষমুক্তির শীঘ্র কোনও সম্ভাবনা নেই, এবং এজন্য তাঁরা তাঁদের কর্মফল অনুযায়ী সুখদুঃখাদি ভোগ করে থাকেন তাঁরা হলেন অপক্ককলুষ।
আগমান্ত শৈব মত অনুযায়ী, পাশ বা বন্ধন চার রকমের– মল, কর্ম, মায়া এবং রোধ। মল জীবের জ্ঞান ও ক্রিয়া আচ্ছন্ন করে রাখে, ফলকামনা বিশিষ্ট কার্যের নাম কর্ম এবং মায়া স্থূল বস্তু যা জগতের উপাদানীভূত কারণ। চতুর্থটি রোধশক্তি শিবপ্রদত্ত বাধাপ্রধানকারী ক্ষমতা যা প্রয়োগ করে জীব পাশ বা বন্ধন থেকে মুক্তি পাবে।

                         আগমান্ত শৈবেরা আচার-অনুষ্ঠানে বিশ্বাসী। শৈবতত্ত্বভুক্ত চারটি পাদের– চর্যা, ক্রিয়া, যোগ ও বিদ্যা– মধ্যে দীক্ষাবিধি চর্যা ও আংশিক ক্রিয়াপাদের অন্তর্ভুক্ত। চর্যাপাদে প্রায়শ্চিত্তবিধি, পবিত্রারোপণ, শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠাবিধি, স্কন্দ, গণপতি, নন্দী ইত্যাদি গণমুখ্যগণ ও শ্রাদ্ধ ইত্যাদি নানা বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। ক্রিয়াপাদের আংশিক রূপ দীক্ষাগ্রহণ সংক্রান্ত যেসব বিধিনিষেধ দেখতে পাওয়া যায় তা ছাড়াও ক্রিয়াপাদের অন্য অংশ মন্ত্রসাধন, সন্ধ্যাবন্দনা, পূজা, জপ, হোমাদি নিত্যকর্ম, নানাপ্রকার সকাম নৈমিত্তিক কর্ম, আচার্য ও সাধকের অভিষেক ইত্যাদির সাথে যুক্ত। যোগপাদে জীবাত্মা, পরমাত্মা, শক্তি, জগৎপ্রপঞ্চের সৃষ্টিকারণ মায়া ও মহামায়া, অষ্টসিদ্ধি (ভক্ত সাধক যোগসিদ্ধ হলে অণিমা, লঘিমা, মহিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ঈশিত্ব, বশিত্ব ও কামাবসায়িত্ব– এই অষ্টসিদ্ধি বা অপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হন), প্রাণায়াম, ধ্যান, সমাধি, ষট্চক্র প্রভৃতির বিষয় বিশদরূপে বর্ণিত আছে। এই তিনটি পাদের সবকিছুই বস্তুত শৈবদের ক্রিয়াকাণ্ডের অন্তর্গত। আর আগমশাস্ত্রভুক্ত যে তত্ত্বজ্ঞান তা হলো বিদ্যা বা জ্ঞানপাদ।
বিদ্যা বা জ্ঞানপাদের মধ্য থেকে যে দার্শনিক তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায় তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পাশুপত মতের ন্যায় আগমান্ত শৈব দর্শনও দ্বিত্ব বা বহুত্ববাদী। আগমান্ত শৈবগণ শৈব সিদ্ধান্তীদের সঙ্গে এই বিষয়ে একমত যে জীব ও ঈশ্বর (জীবাত্মা ও পরমাত্মা) পৃথক সত্তা, এবং জড়জগতের উপাদানীভূত-কারণ মায়া (প্রকৃতি বা প্রধান)। পাশুপত মতে মুক্ত জীব অজ্ঞান, দুর্বলতা ও দুঃখ পরিহার পূর্বক অসীম জ্ঞান ও অলৌকিক কর্মশক্তির অধিকারী হন এবং ভগবাগ শিবের অনুগ্রহে তাঁর মহাগণপতিত্ব পদ প্রাপ্তি হয়, অন্যদিকে আগমান্ত শৈব মতে চর্যা, ক্রিয়া, যোগ ও জ্ঞানের দ্বারা মুক্ত জীব শিবেরই অনুগ্রহে প্রথমে তাঁর মহাগণপতিত্ব এং পরিণামে তাঁর স্বারূপ্য লাভ করে। শিবের সৃজনশক্তি ব্যতিরেকে আর সমস্ত শক্তিই তাঁর অধিকারে আসে।

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : শৈব সিদ্ধান্ত বা তামিল শৈব সম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : শুদ্ধশৈব বা শিবাদ্বৈত সম্প্রদায়]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 346,255 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 113 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: