h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৯/৩ : নায়নার সম্প্রদায়

Posted on: 02/09/2018


Lord-Shiva-had-a-sister-nam
শিব ও লিঙ্গ-০৯/৩ : নায়নার সম্প্রদায়
রণদীপম বসু

বিভিন্ন উগ্রপন্থী শৈব গোষ্ঠীর প্রাদুর্ভাব যে সুপ্রাচীন কালে প্রথমে উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব-ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রবল হয় তা ইতঃপূর্বেকার শৈব-সম্প্রদায়ের আলোচনা থেকে আমরা ধারণা করতে পারি। দক্ষিণ ভারতেও তা ছড়িয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে কোনও বিশেষ শৈব সম্প্রদায়ের ধর্মানুষ্ঠান রূপে শিবপূজার কথা ছেড়ে দিলেও সাধারণভাবে এই দেবতার পূজা তামিল, তেলেগু, কানাড়ী প্রভৃতি ভাষাভাষী অঞ্চলে সুপ্রাচীনকালে থেকেই প্রচলিত ছিল। কারও কারও মতে দেবতা হিসেবে শিব নামটি ‘রক্তবর্ণ’ এই অর্থবাচক তামিল শব্দ ‘শিবপ্পু’ থেকে গৃহীত। এ মত সত্য হলে, অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে,–
‘শিব যে অনার্য দ্রাবিড়গণের পূজার দেবতা ছিলেন ইহা স্বীকার করিতে কোনও বাধা থাকে না। মহাকাব্য ও পুরাণাদিতে বর্ণিত দক্ষযজ্ঞ বিনাশের কাহিনীও বৈদিক দেবতা হইতে শিবের পার্থক্য নির্দিষ্ট করে। বৈদিক দেবতামণ্ডলীর অপাংক্তেয় শিবের আদিম অনার্য রূপ সম্বন্ধেও ইহা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করে। আর্য ও অনার্য, জেতা ও বিজিত, জাতির ঘনিষ্ঠ সংমিশ্রণের ফলে শিব ভারতীয় জনসমাজে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেবতা রূপে পরিগণিত হন। এদিক দিয়া বিচার করিলেও ভারতবর্ষের দক্ষিণাংশে শিবপূজার প্রাচীনত্ব সহজেই স্বীকৃত হয়।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৭১)
দক্ষিণভারতে তার প্রাচীনতম আদিম প্রতীক যে অন্ধ্র প্রদেশের গুডিমল্লম গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং তা এখনও গ্রামবাসীদের পূজা পেয়ে আসছে, এ তথ্য ইতঃপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে বহু পরবর্তী কাল পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের অনেক অংশে বহু শিবমন্দির নির্মিত হয়েছিল। চালুক্য, রাষ্ট্রকূট, চোল প্রভৃতি বংশীয় নৃপতি ও সেদেশের বিত্তশালী ব্যক্তিগণ এসব দেবগৃহ নির্মাণ করিয়েছিলেন, তার অনেকগুলি এখনও বর্তমান। পট্টডাকল, বিরূপাক্ষ, সোমেশ্বর, শিবকাঞ্চীর মন্দিরসমূহ, তিরুকাজুকুণ্রম, তিরুবোয়িয়ুর, কৈলাস, সুন্দরেশ-মীনাক্ষীর মন্দিরসমূহ এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তামিল শিবভক্তগণের রচিত গীতিকবিতাসমূহে অনেক স্থানীয় শিব মন্দিরের নাম পাওয়া যায়। ভক্তগণ মন্দির থেকে মন্দিরান্তরে গান গাইতে গাইতে ভ্রমণ করে শিবভক্তির প্রচার করতেন। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের ভাষ্যে–
‘কিন্তু এ কথাও বলা আবশ্যক যে পুরাকালে এবং পরেও বাসুদেব-বিষ্ণুর ন্যায় শিব এই দেশে ও ভারতের অন্যান্য অংশে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুসমাজভুক্ত জনগণের সাধারণভাবে ভক্তি ও পূজার পাত্র ছিলেন। এই জাতীয় শিবভক্তদিগের মধ্যে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক ও সংগঠক শঙ্করাচার্যও ছিলেন। তাঁহার জীবনীকারগণের দ্বারা শিবের অবতার রূপে স্বীকৃত হইলেও, তিনি ধর্ম বিষয়ে সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে ছিলেন বলিয়া অনুমিত হয়। বেদান্ত ও স্মার্তমতের এবং অদ্বৈতবাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা তাঁহার স্বল্পায়ু জীবনের প্রধান ব্রত ছিল, এবং ইহার সম্যক্ অনুষ্ঠানে তিনি যেমন বৌদ্ধ প্রভৃতি অব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়গুলির বিরোধিতা করিয়াছিলেন, সেরূপ পাঞ্চরাত্র, শাক্ত, কাপালিক, গাণপত্য প্রভৃতি ব্রাহ্মণ্য ধর্মসম্প্রদায়সমূহেরও কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের প্রবর্তক রূপে খ্যাতিমান; ভারতের বিভিন্ন অংশে তাঁহার প্রতিষ্ঠিত সুবিখ্যাত মঠগুলি হিন্দু জনগণের ধর্মজীবনে বিশিষ্ট অংশ গ্রহণ করিয়া আছে। দক্ষিণ ভারতের শৃঙ্গেরী মঠ আজিও বেদান্ত ও স্মার্ত মতের প্রধান পীঠস্থান রূপে পরিগণিত।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৭২)

                 আচার্য শঙ্কর প্রতিষ্ঠিত এই দশনামী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলির বিধি-বিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে শ্রদ্ধেয় অক্ষয় কুমার দত্তের ‘ভারতীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থে। শঙ্করাচার্য প্রধানত যুক্তি, তর্ক ও বিচারের সাহায্যে বৌদ্ধমত উচ্ছেদ সাধনে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের আরেক দল শিবভক্তের উদ্ভব হয়েছিল যাঁরা তাঁদের নিজ মাতৃভাষা তামিলে রচিত গীতিকবিতা ইত্যাদির দ্বারা শিবভক্তির অত্যধিক প্রচারের মাধ্যমে বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি অব্রাহ্মণ্য ধর্মসম্প্রদায়ের বিরোধিতা করেছিলেন, যাঁদেরকে তামিল ভাষায় নায়নার সম্প্রদায় নামে অভিহিত করা হয়। দক্ষিণ ভারতের বৈষ্ণব আঢ়বারদের মতোই এই নায়নার শৈব সাধক সম্প্রদায় তামিল সাহিত্যে ভক্তিবাদের প্রচলন করেন। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বলেন–
‘খৃষ্টাব্দ আরম্ভ হইবার পর প্রথম কয় শতাব্দী বৌদ্ধ ও জৈন সম্প্রদায় তথায় সমধিক প্রভাবশালী ছিল। সমসাময়িক স্তূপ, চৈত্য, বিহার, মূর্তি, মন্দিরাদি এখনও সে বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করে। বৈষ্ণব, শৈবাদি ব্রাহ্মণ্য ধর্মগুলি খৃষ্টীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দী হইতে ক্রমশঃ প্রতিপত্তিশালী হইতে থাকে, এবং এই সকল ভক্তিকেন্দ্রিক ধর্মের অভ্যুত্থানে দক্ষিণদেশীয় বিষ্ণু ও শিবভক্তগণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করেন।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৭২-৭৩)

                    একাদশ শতকের প্রথমদিকে শৈব ধর্মগুরু নম্বি-অন্দর-নম্বি এই শৈব সাধক নায়নারদের রচনাগুলিকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছিলেন। তিনি সমস্ত শৈব রচনাকে এগারোটি তিরুমুরাই-এ সংগ্রহ করেন। তিরুমুরাই তামিল শব্দ, যার অর্থ শাস্ত্রসংগ্রহাবলী। প্রথম সাতটি তিরুমুরাই-এর একত্র নাম তেবারম্ বা দেবারম্ স্তোত্র, যাতে সম্বন্দর (যাঁর পূর্ণনাম তিরুজ্ঞানসম্বন্দ), অপ্পর (যাঁর প্রকৃত নাম তিরুনাবুক্করশু) ও সুন্দররের (যাঁর প্রকৃত নাম সুন্দরমূর্তি) রচনাবলী আছে। অষ্টমটির নাম তিরুবাচকম যা মাণিক্যবাচকরের রচনা সঙ্কলন। নবম থেকে একাদশ তিরুমুরাই অপরাপর কবিদের রচনাসংগ্রহ। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ে বর্ণনা অনুযায়ী–
‘গোপীনাথ রাও মহাশয় তাঁহার প্রামাণিক গ্রন্থ Elements of Hindu Iconography-র দ্বিতীয় খণ্ডে পেরিয়-পুরাণ নামক তামিল গ্রন্থ হইতে সংগ্রহ করিয়া ইঁহাদের নাম, জাতি, জন্মস্থান ও উপজীবিকার একটি তালিকা দিয়াছেন (পৃষ্ঠা-৪৭৫-৭৮)। ইহাতে ৬৩ জন ভক্তের নাম পাওয়া যায়, চারিজন ব্যতীত সকলের জাতির উল্লেখ আছে, তবে তাঁহাদের পেশা ও জন্মস্থান অনেক ক্ষেত্রেই প্রদত্ত হয় নাই। ৫৯ জন ভক্তের মধ্যে মাত্র ১৫ জন ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভব ছিলেন (ইঁহাদের প্রথম তিন জন, যথা তিরুজ্ঞান সম্বন্ধ, তিল্লাই ব্রাহ্মণ এবং কলয় নায়নার ছিলেন শিবমন্দিরের পুরোহিত– অপর দ্বাদশ জনের পেশা সম্বন্ধে কিছু বলা নাই), অমাত্য ছিলেন তিন জন (খুব সম্ভব ক্ষত্রিয় জাতিভুক্ত), অভিষিক্ত নৃপতি ও শাসনকর্তা (ক্ষত্রিয় জাতির) ছিলেন একাদশ জন, বৈশ্য পাঁচ জন, বেড়্ড়াড় ত্রয়োদশ জন, গোপালক দুই জন, কুম্ভকার, মৎস্যজীবী, ব্যাধ (বেড়ন), তালরস (তাড়ি) আহরণকারী, তন্তুবায়, রজক, তেলি প্রত্যেকটির একজন করিয়া, এবং পানন, পরইঅন ও কুরুম্বন এক এক করিয়া তিন জন। এই বিস্তৃত তালিকাটি একটু মনোযোগ সহকারে অনুশীলন করিলেই বুঝা যায় যে ৫৯ সংখ্যক শিবভক্তদিগের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশী তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর লোক, প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শাসক সম্প্রদায়ভুক্ত ও এক-চতুর্থাংশ শ্রেষ্ঠবর্ণজাত ছিলেন। ইঁহাদের মধ্যে আবার যে তিন জন তাঁহাদের ইষ্টদেবতা সম্বন্ধীয় গীতিকবিতার জন্য খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের দুই জন (তালিকার প্রথম ও শেষ জন,– তিরুজ্ঞানসম্বন্ধ এবং সুন্দরমূর্তি বা সুন্দরর) ব্রাহ্মণ, এবং একজন অর্থাৎ তিরুনাবুক্করশু বেড়্ড়াড় জাতিভুক্ত ছিলেন। রাও-এর তালিকায় তিরুজ্ঞানসম্বন্ধ প্রথম ও সুন্দরমূর্তি সর্বশেষ, এবং তিরুনাবুক্করশু ৪৫ সংখ্যক স্থান অধিকার করিলেও, এই বেড়্ড়াড় জাতির শিবভক্ত তিরুজ্ঞানসম্বন্ধ অপেক্ষা বয়সে অনেক বড় ছিলেন। তিরুজ্ঞানসম্বন্দ (সংক্ষেপে সম্বন্ধর) কিন্তু উক্ত কথাকথিত নিম্নশ্রেণীর শিবভক্তকে এত অধিক শ্রদ্ধা করিতেন যে তিনি তাঁহাকে পিতা বলিয়া সম্বোধন করিতেন। ‘পিতা’ কথাটির তামিল প্রতিশব্দ হইল ‘আপ্পা’ বা ‘আপ্পার’, এবং সেজন্য ব্রাহ্মণবংশীয় নায়নারের শ্রদ্ধাপ্রদত্ত সম্ভাষণ এই বেড়্ড়াড় জাতীয় শিবভক্তের অন্য নাম রূপে জনসাধারণ কর্তৃক গৃহীত হইয়াছে।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৭৩-৭৪)

                  উপরিউক্ত তিনজন শিবভক্তের দ্বারা তামিল ভাষায় রচিত ভক্তিরসাত্মক গীতিকবিতাগুলি একত্রে ‘দেবারম্ স্তোত্র’ নামে পরিচিত। একাদশ বৃহৎ খণ্ডে সংগৃহীত বিশাল তামিল স্তোত্রসাহিত্যের প্রথম সাত খণ্ডে এই দেবারম স্তোত্র। ৩৮৪ সংখ্যক স্তোত্র সংবলিত এগুলি ‘পদিগম্’ নামেও খ্যাত। এই সাত খণ্ডের প্রথম তিন খণ্ড ভক্ত তিরুজ্ঞানসম্বন্ধের রচনা। পরবর্তী তিন খণ্ড তিরুনাবুক্করশু বা আপ্পারের এবং শেষ খণ্ড সুন্দরমূর্তি বা সুন্দররের রচনা। তামিল বৈষ্ণবদের মধ্যে আঢ়বারদের রচিত বিষ্ণুভক্তিমূলক নালায়ির প্রবন্ধাবলির যে উচ্চ সম্মান ও জনপ্রিয়তা রয়েছে, উক্ত তিন নায়নার রচিত দেবারম্ স্তোত্রেরও তামিল শৈবদের মধ্যে সেরকম আদর ও সম্মান। তার আরেক নাম তামিল বেদ। শৈবদের বিশেষ যাত্রায় এবং দেবমন্দিরে বেদপাঠের সঙ্গে সঙ্গে এসব শিবস্তোত্র সুর, লয়, তান সহযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে ও ভক্তিসহকারে নিয়মিত গীত হয়ে থাকে। তামিল ভাষাবদ্ধ বিশাল এই শিব স্তোত্র-সাহিত্য বা তিরুমুরাই-এর অষ্টম খণ্ডের নাম ‘তিরুবাসগম্’ অর্থাৎ ‘শ্রীবাক্য’ বা ‘পবিত্র উক্তি’, এবং এটি তামিল শৈবদের মধ্যে উপনিষদের পর্যায়ভুক্ত। এই খণ্ডের রচয়িতার নাম মাণিক্কবাচকর, যার নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘যাঁর শ্রীমুখ থেকে মাণিক বর্ষিত হয়’। দেবারম্ স্তোত্রের অনুকরণে রচিত অনেকগুলি স্তোত্র সংগ্রহাবলীর নবম খণ্ড, যার একাংশ চোল সম্রাট রাজরাজের উর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ চোলরাজ কণ্ডারাদিত্যের রচনা। সিদ্ধযোগী তিরুমূলর রচিত আধ্যাত্মিক তত্ত্বসংবলিত গানগুলি এর দশম খণ্ড। তিরুমূলর তিন হাজার শ্লোকে শৈব সিদ্ধান্ত মতবাদ ব্যাখ্যা করেছিলেন, এবং তাঁর গ্রন্থ, যা তিরুমন্দিরম নামেও পরিচিত, পরবর্তী শৈব সাধক ও কবিদের অনুপ্রেরণাস্বরূপ ছিল। অবশিষ্ট বিবিধ স্তোত্রাবলী তিরুমুরাই-এর একাদশ বা শেষ খণ্ড। এই একাদশতম খণ্ডের শেষ দশটি স্তবক নম্বি-আন্দার-নম্বির রচনা।
অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পঞ্চোপাসনা’ গ্রন্থে শৈব স্তোত্র সংগ্রহাবলী বা তিরুমুরাই-এর বিভিন্ন খণ্ডের রচয়িতৃগণ সম্বন্ধে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তত্ত্বের দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছেন। তবে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কৃত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী,–
‘এই স্তোত্র রচয়িতা শিবভক্ত নায়নারদের মধ্যে তিরুমূলরের আবির্ভাবের কাল ষষ্ঠ শতক। তাঁর পরবর্তী সাধক কবিদের মধ্যে অপ্পর (৬০০-৬৮১), সম্বন্দর (৬৪৪-৬৬০), মাণিক্যবাচকর (৬৬০-৬৯২) এবং সুন্দরর (৭১০-৭৩৫) বিশেষ উল্লেখযোগ্য, যাঁরা সময়াচার্য নামে কথিত হতেন। অপ্পর রচিত মোট ৩১৩টি পদের পরিচয় পাওয়া গেছে। সম্বন্দর মাত্র ষোল বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু এরই মধ্যে ১০,০০০ পদ রচনা করেছিলেন বলে প্রকাশ। যদিও তাঁর প্রাপ্ত পদসমূহের সংখ্যা ৩৮৪টি। মাণিক্যবাচকর পাণ্ডা রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তিনি ওই পদ পরিত্যাগ করে সাধকের জীবন গ্রহণ করেন। তাঁর জীবনকথা তিরুবিঢ়ইয়াদল এবং বদবুরর পুরাণদ্বয়ে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর রচিত পদাবলী অসংখ্য। যেগুলি তিরুবাচকম নামক তিরুমুরাই গ্রন্থাবলীর অষ্টম খণ্ডে স্থান পেয়েছে। সুন্দরর রচিত শ’খানেক ভক্তিগীতির পরিচয় পাওয়া গেছে, যেগুলির জনপ্রিয়তা অসীম। আজও পর্যন্ত প্রতিটি তামিল শৈবমন্দিরে সুন্দরর রচিত ভক্তিগীতি নিয়মিত গাওয়া হয়। উপরিউক্ত কবিগণের রচনাসমূহ ছাড়াও তামিল শৈব সাহিত্যে পেরিয়াপুরাণম্ নামক একটি গ্রন্থ আছে যাতে ৬৩ জন শৈব সাধকের জীবনী বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থের লেখক ছিলেন শেক্কিঢ়ার।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০৫)

                     দক্ষিণ ভারতীয় এই শিবভক্তগণ তাঁদের স্তোত্রাবলীর সাহায্যে বিশুদ্ধ শিবভক্তি ও ঈশ্বরপ্রেমের সম্যক্ প্রচার ও প্রসারেই আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাঁদের ধর্মাচরণ যেমন কোনও উগ্র কঠোর বিধি অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রভাবিত ছিল না, তেমনি তাঁদের রচিত স্তোত্র ও গীতিকবিতাদির মধ্যে বিশেষ কোনও ধর্মদর্শনের তত্ত্ব নিহিত ছিল না। সহজ সরল অনাড়ম্বরভাবে তান, লয়, সুর সহযোগে ভক্তগণের অন্তর্নিহিত শিবভক্তির প্রকাশ সবার হৃদয় স্পর্শ করতো, এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে অনেকে তাঁদের মত ও পথ গ্রহণ করতেন।

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : কাপালিক, কালামুখ, মত্তময়ূর সম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : শৈব সিদ্ধান্ত বা তামিল শৈব সম্প্রদায়]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 465,260 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 128 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ   নভে. »
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 6 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: