h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৯/২ : কাপালিক, কালামুখ, মত্তময়ূর সম্প্রদায়

Posted on: 02/09/2018


Lord-Shiva-Face-and--Shivling-with-Dark-Background-HD-Wallpaper
শিব ও লিঙ্গ-০৯/২ : কাপালিক, কালামুখ, মত্তময়ূর সম্প্রদায়
রণদীপম বসু

শৈব-সম্প্রদায় প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতেই ইতঃপূর্বে কেশীসূক্ত নামে পরিচিত ঋগ্বেদের একটি সূক্ত (ঋগ্বেদ-১০/১৩৬) তর্জমাসহ উদ্ধৃত করে তার উপর আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন প্রমাণ উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন যে, এই সূক্তে ধূলিমলিন পিঙ্গলবস্ত্র পরিহিত, দীর্ঘকেশযুক্ত, উন্মত্তপ্রায় একশ্রেণীর মুনির ইঙ্গিত আছে যাদের হয়তো পাশুপত ব্রতধারী রুদ্রশিব পূজকদের পূর্বসূরী হিসেবে গণ্য করা যায়, বিশেষ করে যখন এখানে কেশীমুনির সঙ্গে রুদ্রের বিষপানের ঐতিহ্যকে সম্পর্কিত করা হয়েছে। তিনি আরও দেখিয়েছেন, পতঞ্জলি আয়ঃশূলিক (লৌহ-ত্রিশূলধারী) এবং দণ্ডাজিনিক (দণ্ডধারী ও পশুচর্ম পরিধানকারী) শিবভাগবতের ধর্মাচরণ সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন কটাক্ষপাত করেছেন, যে আচরণ পরবর্তীকালের লকুলীশ পাশুপত শৈবদের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি। ক্রাথন-স্পন্দন-মণ্ডন-শৃঙ্গারণ-অবিত্তকরণ-অবিতদ্ভাষণাদি পাশুপত চর্যাসমূহ সুস্পষ্টভাবেই কৌণ্ডিন্য কর্তৃক ব্রাহ্মণ্যকর্মবিরুদ্ধ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।
শিবের বেদবাহ্যতার মূলে লিঙ্গ পূজাও যে অন্যতম কারণ ছিল সে কথা আমরা ইতঃপূর্বে বলেছি। এছাড়া যক্ষ ও গুহ্যকগণের সঙ্গে শিব ও উমার সম্পর্ক রামায়ণে (৫/৮৯) উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়া ভাগবত পুরাণে (ভাগবত-৪/২-৭) শিবকে মর্কটলোচন, শ্মশানচারী, ভূত-প্রেতের সহচর, ক্রিয়াহীন, অশুচি, দিগম্বর, প্রসারিত জটাবিশিষ্ট, উন্মত্তবৎ পরিভ্রমণশীল, চিতাভস্মে স্নানকারী, অস্থিভূষণ ও মুণ্ডমালী, অমঙ্গলদায়ক, উন্মাদ ও উন্মাদগণপ্রিয়, তমোগুণান্বিত, প্রমা, ভূতপতি ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে কটূক্তি করা হয়েছে। ভাগবত-পুরাণের চতুর্থ স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সংশ্লিষ্ট আখ্যানটি এরূপ–

মৈত্রেয় বললেন– পূর্বকালে (প্রথম কল্পে স্বায়ম্ভুব-মন্বন্তরে) বিশ্বের সৃষ্টিকারী মরীচি প্রভৃতিদের যজ্ঞে বশিষ্ঠ, নারদ প্রভৃতি পরম ঋষিগণ, নিজ নিজ অনুচরবর্গের সাথে ইন্দ্রাদি সমস্ত দেবগণ, মুনিগণ ও অগ্নি-সকল সমবেত হয়েছিলেন। প্রজাপতি দক্ষ সূর্যের মত তেজঃপুঞ্জে দেদীপ্যমান হয়ে তাঁদের সভায় প্রবেশ করলেন। দক্ষের অঙ্গ প্রভায় সেই মহতী সভা অন্ধকার-শূন্য হয়েছিল। তখন তাঁকে দেখে ব্রহ্মা ও মহাদেব ভিন্ন সকল সভাসদ্গণ অগ্নির সাথে নিজ নিজ আসন হতে উত্থিত হলেন, কারণ দক্ষের অঙ্গপ্রভায় তাঁদের চিত্ত আক্ষিপ্ত হয়েছিল। যা হোক্, তাঁরা দক্ষের যথোপযুক্ত সৎকার করলে, তিনি লোকগুরু ব্রহ্মাকে নমস্কার করে তাঁর আজ্ঞা গ্রহণপূর্বক তাঁরই আসনে উপবেশন করলেন।
দক্ষের আসন গ্রহণের পূর্ব থেকেই ভগবান ভব নিজ আসনে উপবিষ্ট ছিলেন। দক্ষ তাঁর প্রতি বার বার নেত্রপাত করে মনে করলেন, ইনি আমার আদর করলেন না। গাত্রোত্থান না করায় সেই অনাদর সহ্য করতে না পেরে দুই চক্ষুর দ্বারা বক্রভাবে অবলোকনপূর্বক যেন দগ্ধ করতে করতে বললেন– হে দেবগণ, অগ্নিগণ ও ব্রহ্মর্ষিগণ, আমার নিকট আপনারা সাধুপুরুষদের চরিত্র শুনুন। আমি অজ্ঞান ও বিদ্বেষবশতঃ বলছি না। এই শিব নির্লজ্জ ও লোকপালদের যশ-বিনাশকারী। কারণ এ উচিতক্রিয়া পরিত্যাগ করে সাধুজনের আচরিত পথ দূষিত করেছে। এই মূঢ়, ব্রাহ্মণ ও অগ্নির সাক্ষাতে আমার সাবিত্রীতুল্য কন্যার পাণিগ্রহণ করেছে, তাতে এ আমার একরূপ শিষ্য বলা যেতে পারে। এই মর্কটলোচন আমার বালহরিণলোচনা কন্যার পাণিগ্রহণ করায়, এর নিকট আমি প্রত্যুত্থান-পূর্বক অভিবাদনের যোগ্য, কিন্তু এ বাক্যের দ্বারাও আমার উচিত সম্মান রক্ষা করল না।
শূদ্রকে বেদবিদ্যা প্রদানের মত আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও (ব্রহ্মার বচনে) ক্রিয়াকলাপ-বর্জিত, অপবিত্র, অভিমানী, ধর্ম-মর্যাদা-লঙ্ঘনকারী এই শিবকে কন্যা সম্প্রদান করেছি। এই ব্যক্তি বিবস্ত্র ও বিকীর্ণ-কেশ হয়ে ভয়ংকর ভূতপ্রেতগণের সঙ্গে কখন হাস্য, কখন রোদন করতে করতে শ্মশানে উন্মত্তের মত ভ্রমণ করে বেড়ায়। চিতাভস্মের দ্বারা এর স্নান, গলায় প্রেতের মালা, মৃত নরের অস্থি এর ভূষণ, এর নামই কেবল শিব, বস্তুতঃ এ নিজে অশিব। সর্বদা মাদকদ্রব্য সেবনে মত্ত, মত্তজনেরাই এর প্রিয়পাত্র এবং তমোগুণ-স্বভাব প্রমত্থনাথগণের পতি। হায়, ব্রহ্মার বাক্যে অতিশয় উন্মাদ, শৌচাচার-বর্জিত দুষ্টচিত্ত শিবকে আমি সাধ্বী কন্যা সম্প্রদান করেছি।
মৈত্রেয় বললেন– হে বিদূর, দক্ষ প্রতিকূল আচরণ-শূন্য স্থিরভাবে উপবিষ্ট শিবকে এরূপ নিন্দা করে এবং ক্রোধান্ধ হয়ে জলস্পর্শ পূর্বক অভিশাপ দিতে প্রবৃত্ত হলেন। দক্ষ অভিশাপ দিয়ে বললেন– দেবতাদের যজন-সময়ে এই দেবগণের অধম শিব, ইন্দ্র ও উপেন্দ্র প্রভৃতি দেবতাদের সাথে যজ্ঞের ভাগ পাবে না। হে কুরুশ্রেষ্ঠ বিদুর, সেই সভায় অবস্থিত প্রধান প্রধান সদস্যগণ নানাপ্রকারে দক্ষকে নিষেধ করতে লাগলেন, কিন্তু তিনি কারও নিবারণ না মেনে ভগবান ভবকে ঐপ্রকার শাপপ্রদানপূর্বক সভাস্থল থেকে নির্গত হয়ে নিজ ভবনে গমন করলেন।

 

               আসলে তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর মানুষের সঙ্গে শিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার দরুনই এবং সুপ্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ওই শ্রেণীর মানুষদের লৌকিক আচার-আচরণ ও অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক জীবনচর্যা শৈবধর্মে স্থান পাবার কারণেই বিরোধীপক্ষরা শিবকে এইভাবে চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন বলে মনে হয়। আজকের চড়ক-গাজন ইত্যাদি নিম্নতলের অনুষ্ঠানগুলির কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়, উচ্চশ্রেণীর মানুষের কাছে যেগুলি বীভৎস ও ঘৃণ্য বলে প্রতিভাত হয়।
–‘পাশুপত ছাড়াও শৈবধর্মের যে সব শাখায় নিম্নশ্রেণীর ও উপজাতীয় মানুষদের আচার অনুষ্ঠান স্থান পেয়েছে সেগুলি কাপালিক, কালামুখ, অঘোরপন্থী ইত্যাদি নামে পরিচিত। উচ্চবর্ণভুক্ত লেখকগণ এই সকল আচার-অনুষ্ঠান পছন্দ করেন নি এবং এগুলিকে ভয়াবহভাবে চিত্রিত করেছেন, তবে সত্য কথা বলেছেন কিনা সন্দেহ। এই সকল সম্প্রদায়ের কোন নিজস্ব ধর্মশাস্ত্র নেই, থাকলেও তা লুপ্ত হয়েছে বা লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। এগুলির উল্লেখ বিরোধী পক্ষের রচনায়, এবং বলাই বাহুল্য বিকৃতভাবে পরিবেশিত। স্বয়ং শঙ্করাচার্যের মত মানুষও পূর্বপক্ষ হিসাবে বিরোধী পক্ষের মত যখন নিজ রচনা-বিকৃত করে উপস্থাপন করেন, তখন অন্য লেখকদের তো কথাই নেই। কাজেই কাপালিক-কালামুখাদি সম্প্রদায় বিকৃতভাবে চিত্রিত। এছাড়া এইসব সম্প্রদায় মৌলিকভাবে মাতৃপূজক ছিল, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মূল্যবোধগুলিতে পুরোদস্তুর আস্থাহীন ছিল এবং সর্বোপরি জাতিভেদ ইত্যাদিতে বিশ্বাসী ছিল না। স্মার্ত-পৌরাণিক ঐতিহ্যে গঠিত আমাদের লেখকরা, কি প্রাচীন যুগের, কি আধুনিক যুগের, এদের বরদাস্ত করতে পারেন নি। শঙ্করাচার্যের কাছে জগৎ মিথ্যা হলেও জাতিভেদ মিথ্যা নয়, তা ব্রহ্মের মতই ধ্রুব সত্য। সামাজিক ক্ষেত্রে শঙ্করের কাছে একমাত্র মনুই অথরিটি। কথাটি তিক্ত হলেও সত্য।’– (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২১৩-১৪)

               অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,– ‘শৈব সম্প্রদায়দিগের মধ্যে পাশুপত (পরে নকুলীশ পাশুপত আখ্যায় অভিহিত) সম্প্রদায়ই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। অপর কয়টি অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন অতিমার্গিক শৈব সম্প্রদায়ের নাম এইরূপ– কাপালিক, কালামুখ, অঘোরপন্থী ইত্যাদি। এগুলির অসামাজিক বিধি ব্যবস্থা ও অত্যুগ্র ধর্মাচরণ কিঞ্চিৎ আলোচনা করিলে মনে হয় যে ইহাদের উৎপত্তি পাশুপত মত ও সম্প্রদায় হইতেই হইয়াছিল। শঙ্করাচার্য প্রণীত গ্রন্থাদির ভাষ্যকারগণ বলিয়াছেন যে পাশুপত ও শৈব (আগমান্ত ও শুদ্ধ) সম্প্রদায় ব্যতীত অপর দুটি সম্প্রদায়ের নাম ছিল কাপালিক এবং কারুকসিদ্ধান্তিন। বাচস্পতি শেষেরটিকে কারুণিকসিদ্ধান্তিন আখ্যায় অভিহিত করিয়াছেন। কিন্তু রামানুজ এবং কেশব কাশ্মীরিন ইহার নাম দিয়াছেন কালামুখ। আর. জি. ভান্ডারকর অনুমান করিয়াছিলেন যে লকুলীশের চতুর্থ শিষ্যের নাম কৌরুষ্য কারুক নামের সংস্কৃত প্রতিরূপ। তিনি ইহার অধিক আর কিছু বলেন নাই, তবে ইহা হইতে মনে হয় যে কৌরুষ্যই হয়ত কালামুখ সম্প্রদায়ের প্রবর্তক ছিলেন। এ বিষয়ে সঠিক কিছু বলা না যাইলেও ইহা মনে রাখিতে হইবে যে লকুলীশের প্রধান চারিজন শিষ্যের প্রত্যেকেই এক একটি শাখা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক ছিলেন বলিয়া শৈবদিগের বিশ্বাস, এবং তাঁহার দুইজন শিষ্যের কাপালিক ও কালামুখ রূপ দুই উগ্রপন্থী অতিমার্গিক সম্প্রদায়ের প্রবর্তক হওয়া অসম্ভব নহে।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৫৯-৬০)

              ভবভূতির মালতিমাধব এবং কৃষ্ণমিশ্রের প্রবোচন্দ্রোদয় নাটক, পঞ্চতন্ত্র, মত্তবিলাস প্রহসন, মাধব বিরচিত শঙ্করদিগ্বিজয় প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ থেকে এবং রামানুজের শ্রীভাষ্য, গোরক্ষসিদ্ধান্ত সংগ্রহ ইত্যাদি দার্শনিক গ্রন্থ থেকে কাপালিক মতের পরিচয় পাওয়া যায়। ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,– ‘কাপালিকদের সম্পর্কে বাঙালীসমাজে বিকৃত ধারণা আছে এবং তাঁদের তারা দেবীপূজক বলেই মনে করেন। কিন্তু পণ্ডিতেরা কাপালিকদের দক্ষিণী শৈব সম্প্রদায় বলেই মনে করেন। গোরক্ষসিদ্ধান্ত সংগ্রহের মতে আদিনাথ এই কাপালিক মতের প্রবর্তক। শাবরতন্ত্রের বচন উদ্ধার করে বার জন কাপালিক গুরু এবং তাঁদের বার জন শিষ্যের নামও এখানে দেওয়া হয়েছে।’
শাবরতন্ত্রের বচন অনুযায়ী এই বারোজন গুরু হলেন–

আাদিনাথো হ্যনাদিশ্চ কালশ্চৈবাতিকালকঃ।
করালো বিকরালশ্চ মহাকালশ্চ সপ্তমঃ।।
কালভৈরবনাথশ্চ বটুকস্তদনন্তরম্ ।
ভূতনাথো বীরনাথঃ শ্রীকণ্ঠো দ্বাদশো মতঃ।। –(শাবরতন্ত্র)
অর্থাৎ : দ্বাদশ কাপালিক গুরুগণ– আদিনাথ, অনাদি, কাল, অতিকাল, করাল, বিকরাল, মহাকাল, কালভৈরব, বটুক, ভূতনাথ, বরনাথ ও শ্রীকণ্ঠ।

এবং শাবরতন্ত্র অনুযায়ী কাপালিক দ্বাদশ শিষ্যেরা হলেন–

নাগার্জুনো জড়ভরতো হরিশ্চন্দ্রস্তৃতীয়কঃ।
সত্যনাথো ভীমনাথো গোরক্ষশ্চর্পটস্তথা।।
অবদ্যশ্বৈচ বৈরাগ্যঃ কন্থাধারী জলন্ধরঃ।
মার্গপ্রবর্তকা হ্যেতে তদ্বচ্ছমলয়ার্জুনঃ।। –(শাবরতন্ত্র)
অর্থাৎ : কাপালিক দ্বাদশ শিষ্যগণ– নাগার্জুন, জড়ভরত, হরিশ্চন্দ্র, সত্যনাথ, ভীমনাথ, গোরক্ষ, চর্পট, অবদ্য, বৈরাগ্য, কন্থাধারী, জলন্ধর এবং মলয়ার্জুন।

 

                এই কাপালিক সাধকগণ যোগসাধনার দ্বারা অলৌকিক শক্তি অর্জন করতেন এবং তাঁরা ছিলেন অদ্বৈত বিরোধী। ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, গোরক্ষসিদ্ধান্ত সংগ্রহ এবং শঙ্করবিজয়ের কাহিনী পর্যালোচনা করলে সেই সিদ্ধান্তই গ্রাহ্য বলে মনে হয়।
ব্রহ্মসূত্রের ২/২/৩৫ সূত্রের উপর রচিত রামানুজের শ্রীভাষ্যে কাপালিকদের উক্তিস্বরূপ একটি শৈবাগম উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে কাপালিকগণ যজ্ঞোপবীতাদি ছয়টি মুদ্রা বা মুদ্রিকা শরীরে ধারণ করে যোনিতে অধিষ্ঠিত পরমাত্মায় (শিবলিঙ্গের অন্যরূপ বর্ণনা) চিত্ত নিবিষ্ট করেন। ষটমুদ্রিকা হলো ছয়টি চিহ্ন, যথা– কণ্ঠিকা (কণ্ঠহার), রুচক (অলংকার), কুণ্ডল, শিখামণি (শিরোমণি), ভস্ম এবং যজ্ঞোপবীত। উক্ত শৈবাগম বচনটি হলো–

মুদ্রিকাষট্কতত্ত্বজ্ঞঃ পরমুদ্রাবিশারদঃ।
ভগাসনস্থমাত্মানং ধ্যাত্বা নির্বানমৃচ্ছতি।।
কণ্ঠিকা রুচকং চৈব কুণ্ডলং চ শিখামণিঃ।
ভস্ম যজ্ঞোপবীতঞ্চ মুদ্রাষট্কং প্রচক্ষতে।।
আভিমুদ্রিতদেহস্তু ন ভয় ইব জায়তে। –(ব্রহ্মসূত্রের শ্রীভাষ্য-২/২/৩৫-৩৬)
অর্থাৎ : কণ্ঠিকা, রুচক, কুণ্ডল, শিখামণি, ভস্ম ও যজ্ঞোপবীত– এই ছয়টি মুদ্রিকা শরীরে ধারণ করিয়া যিনি যোনিতে অধিষ্ঠিত পরমাত্মাতে নিজ চিত্ত নিবিষ্ট করিবেন তিনি শ্রেষ্ঠ আনন্দের অধিকারী হইবেন এবং তাঁহার আর পুনর্জন্ম হইবে না।

 

              কৃষ্ণমিশ্রের প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকে কাপালিক প্রসঙ্গে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার বর্ণনা দিতে গিয়ে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন,– ‘কৃষ্ণ মিশ্র তাঁহার বিখ্যাত প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকে একটি কাপালিক চরিত্র সৃষ্টি করিয়াছেন। গ্রন্থকার ইহার মুখে তাহার আত্মপরিচয় এইভাবে সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন– ‘আমার কণ্ঠহার ও অন্যান্য অলঙ্কার মানুষের অস্থি হইতে নির্মিত;……উপবাসের পর আমরা ব্রহ্মকপাল (ব্রাহ্মণ শবের মস্তক করোটি) হইতে সুরা পান করিয়া পারণ করি; আমাদের হোমাগ্নি নরমাংস, কপাল, হৃৎপিণ্ড প্রভৃতির দ্বারা প্রজ্বলিত থাকে। আমরা নরবলি ও নররক্তের দ্বারা আমাদের ঘোর ও উগ্র দেবতার তুষ্টি বিধান করি; আমি স্রষ্টা, পাতা ও সংহারকর্তা, সর্বশক্তিমান ভবানীপতির ধ্যান করি।’ কৃষ্ণ মিশ্রের আর একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন যে কাপালিকাদি উগ্রপন্থিগণ অন্য সব দেশ ত্যাগ করিয়া ক্রমশঃ আভীর ও মালব প্রদেশেই একত্রে বাস করিতে আরম্ভ করিয়াছে; এই প্রদেশদুটিতে সাধারণতঃ নীচ পামর জাতি বাস করিয়া থাকে। অপর উগ্রপন্থী শৈব কালামুখদিগের মতে ইহ ও পরকালে শ্রেষ্ঠ সুখ অর্জন করিতে হইলে তন্ত্রাভিলাষী নিম্নলিখিত বিধিসকল পালন করিবেন– নরকপাল হইতে খাদ্যগ্রহণ, মৃতদেহের ভস্ম সর্বাঙ্গে অনুলেপন, ভস্ম আহার, দণ্ড ধারণ, এক পাত্র কারণ (মদ্য) সঙ্গে রাখিয়া উহাতে অধিষ্ঠিত ঈশ্বরকে পূজা সমর্পণ। ঘোর-তান্ত্রিক কাপালিক-কালামুখগণের নিকট জাতিভেদের তীব্রতা অনেক পরিমাণে হ্রাস পাইয়াছিল, কারণ তাঁহারা মনে করিতেন যে, যে কোনও জাতির ব্যক্তি ইঁহাদের ব্রতে দীক্ষিত হইলে (এই ব্রতের নাম ছিল মহাব্রত) ব্রাহ্মণ পর্যায়ে উন্নীত হইতেন।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৬০-৬১)
মাধব বিরচিত শঙ্করদিগ্বিজয় কাব্যে শঙ্করের সঙ্গে এক কাপালিক গুরুর তর্কবিচারের উল্লেখ আছে। ভবভূতির মালতীমাধবেও কাপালিকদের বর্ণনা পাওয়া যায় যাঁদের ঘাঁটি ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের অন্তর্গত শ্রীশৈল বা শ্রীপর্বত। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের বর্ণনায়–
‘মাধব বিরচিত শঙ্করদিগ্বিজয় কাব্যে উজ্জয়িনী নগরে শঙ্করাচার্যের সহিত কাপালিক গুরুর তর্ক বিচার ও উঁহার পরাজয়ের বিষয় বিশদ ভাবে বর্ণিত আছে (১৫, ১-২৮)। কাপালিক গুরু ক্রকচ ভৈরবের উপাসক ছিলেন ও তাঁহার দেবতাকে করধৃত সুরাপাত্রে আহ্বান ও উজ্জীবিত করিয়া শঙ্করাচার্যের বিনাশ সাধন করিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু যেহেতু শঙ্কর শিবেরই অংশস্বরূপ ছিলেন, ভৈরব তাঁহার নিধন না করিয়া ক্রকচকেই বিনাশ করিলেন। ভবভূতি রচিত মালতীমাধব গ্রন্থে অন্ধ্রদেশস্থ শ্রীশৈলম্ কাপালিকদিগের প্রধান ধর্মক্ষেত্র বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে গ্রন্থকার মুণ্ডমালাধারিণী কপালকুণ্ডলা কর্তৃক নায়িকা মালতীকে হরণ, শ্মশানপ্রান্তস্থ করালী চামুণ্ডার মন্দিরে তাঁহাকে আনয়ন এবং উহার গুরু অঘোরঘণ্টা কর্তৃক দেবী সমীপে মালতীকে বলিদান প্রচেষ্টা ইত্যাদি অতি নিপুণভাবে বর্ণনা করিয়াছেন।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৬১)

               কাপালিক ও কালামুখদের সম্বন্ধে মধ্যযুগীয় লেখমালা থেকেও অনেক তথ্য জানা যায়। যেমন, এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বলেন– ‘চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর ভ্রাতুষ্পুত্র নাগবর্ধনের (ইনি খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজত্ব করিতেন) একটি তাম্রশাসনে নাসিক জিলার ইগাতপুরীর নিকটবর্তী একটি গ্রাম কপালেশ্বর শিবের পূজার ব্যয় নির্বাহার্থ এবং মন্দিরবাসী মহাব্রতীদিগের ভরণপোষণের জন্য প্রদত্ত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। মহাব্রতীন বা মহাব্রতধারিন আখ্যা কাপালিক, কালামুখাদি সম্প্রদায়ভুক্ত উগ্রপন্থী শিবোপাসকদিগকেই বুঝাইত। শ্রীযুক্ত নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী বহু প্রমাণ প্রয়োগ সহকারে দেখাইয়াছেন যে খৃষ্টীয় নবম, দশম ও একাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতের বহু স্থানে কালামুখ সম্প্রদায় বিশেষ প্রতিপত্তিশালী ছিল (The Colas, pp. c48-9)। কর্ণাট প্রদেশে প্রাপ্ত ১১৭৭ খৃষ্টাব্দের একটি লেখে একদল তপস্বীকে কালামুখ সম্প্রদায়ভুক্ত এবং লাকুলাগমসময়ের প্রচারক বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে (Epigraphia Carnatica, Vol. V, Pt. I, p. 135)। উক্ত প্রদেশের আর্সিকেরে তালুক হইতে প্রাপ্ত আরও কয়েকটি মধ্যযুগের লেখ পাঠ ও আলোচনা করিয়া আর. জি. ভান্ডারকর সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন যে এ সময়ে এই অতিমার্গিক শৈব সম্প্রদায়গুলি সাধারণভাবে লাকুল (লকুলীশ পাশুপত) সম্প্রদায়ের শাখা সম্প্রদায় বলিয়া বিবেচিত হইত। ইহার পরোক্ষ সমর্থন আমরা উত্তর আর্কট জিলার মেলপাড়ি এবং দক্ষিণ আর্কট জিলার জম্বই গ্রামস্থ দুইটি লেখ হইতে পাই। এগুলি আমাদিগকে জানাইয়া দেয় যে ঐ দুই গ্রামস্থ কালামুখ সম্প্রদায়ের মঠাধীশ দুইজনের নাম ছিল যথাক্রমে লকুলীশ্বর পণ্ডিত ও মহাব্রতিন লকুলীশ্বর পণ্ডিত। সাধারণতঃ এই সকল উগ্রপন্থী শৈবদিগের নাম শেষে ‘রাশি’ উপাধি থাকিত; যথা– শৈলরাশি, জ্ঞানরাশি ইত্যাদি। ভারতবর্ষের উত্তরাংশে বিভিন্ন স্থানে আদি মধ্যযুগের কয়েকটি লেখ পাওয়া গিয়াছে যাহা হইতে এই জাতীয় ঘোরপন্থী শৈবদিগের সম্বন্ধে কিছু জানা যায়। পঞ্জাব প্রদেশের কাংড়া জিলার অন্তর্ভুক্ত শতদ্রু তীরস্থ নির্মন্দ নামক স্থানে প্রাপ্ত খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর একটি তাম্রশাসন আমাদিগকে জানাইয়া দেয় যে নির্মন্দ অগ্রহারে কপালেশ্বর শিবের এক প্রাচীন মন্দির ছিল এবং তথায় অথর্ববেদাধ্যায়ী একদল শৈব ব্রাহ্মণ দেবতার পূজার্চনার জন্য বাস করিতেন। কপালেশ্বর পূজারত ব্রাহ্মণগণ খুব সম্ভব কাপালিক সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৬১-৬৩)
ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে,– ‘কাপালিক ও কালামুখ শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্রগুলি হল– কাঞ্চি, তিরুবর্রিয়ুর, মেলপাডি, কোডুম্বালুর ইত্যাদি। কাপালিকেরা মূলতঃ সাধক বলে তাঁদের অনেক গ্রন্থ ছিল না। কিন্তু সুতসংহিতায় ১/১/১২ কামিকাদি আগমের উল্লেখ আছে। এটি কাপালিকদের গ্রন্থও হতে পারে। গোরক্ষসিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায় যে এরা অদ্বৈত বিরোধি ছিল। এঁদের সাধনার গূঢ়তত্ত্ব সাধারণের কাছে জ্ঞাত ছিল না বলেই অন্যরা তাঁদের অপবাদ দিতেন। এঁদের মত হয়তো পাশুপত সিদ্ধান্তের কাছাকাছি ছিল।’– (লিঙ্গপুরাণ, ভূমিকা, পৃষ্ঠা-৪১)

                অন্যদিকে মধ্যভারতের ত্রিপুরী ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতকের কয়েকটি শিলালিপিতে মত্তময়ূর নামক একটি শৈবসম্প্রদায়ের কথা উল্লিখিত হয়েছে। এ বিষয়ে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্য হলো–
‘মধ্যভারতের ত্রিপুরী ও তন্নিকটবর্তী স্থানে খৃষ্টীয় দশম একাদশ শতাব্দীর কয়েকটি শিলালেখ পাওয়া গিয়াছে; ঐগুলি পাঠে জানা যায় যে হৈহয় রাজগণের বংশানুক্রমিক গুরু ছিলেন গুরুপরম্পরাক্রমে একদল শৈব তপস্বী। ইঁহারা মত্তময়ূর সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন, এবং ইঁহাদের নামের শেষে শম্ভু বা শিব পদবী থাকিত, যথা রুদ্রশম্ভু, ধর্মশম্ভু, সদাশিব, চূড়াশিব, কবচশিব, প্রভাবশিব, প্রশান্তশিব, প্রবোধশিব, অঘোরশিব ইত্যাদি। ইঁহারা মঠাধীশ ছিলেন ও বহু মঠ মন্দিরাদি নির্মাণ করাইয়াছিলেন। ইঁহাদের সম্প্রদায় উগ্রপন্থী অতিমার্গিক ছিল কিনা সঠিক জানা না গেলেও ইহার নাম হইতে মনে হয় যে পাশুপত-বিধি ইহার উপর প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৬৩)
মত্তময়ূর নামক একটি ট্রাইবের উল্লেখ মহাভারতেও (মহা-২/৩২/৪-৫) পাওয়া যায়। অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে খ্রিস্টীয় নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে এঁদের বিকাশ হয়েছিল এবং বাংলাদেশেও পালযুগে এঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। এঁদের ধর্মাচরণ সংক্রান্ত বিশেষ সংবাদ পাওয়া যায় না। লেখমালার সাক্ষ্য থেকে অনুমিত হয় যে এঁরা উদারপন্থী ছিলেন, মূলত যোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন এবং জনসেবামূলক কাজকর্ম, যেমন দরিদ্রকে আহার্য দান, চিকিৎসালয়, বিদ্যালয় প্রভৃতি স্থাপন, এই ধরনের কাজকর্মে লিপ্ত থাকতেন।

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : পাশুপত ধর্মসম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : নায়নার সম্প্রদায়]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 441,810 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: