h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৯/১ : পাশুপত ধর্মসম্প্রদায়

Posted on: 02/09/2018


PT-102
শিব ও লিঙ্গ-০৯/১ : পাশুপত ধর্মসম্প্রদায়
রণদীপম বসু

ভারতীয় ঐতিহাসিক দলিলগুলি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে প্রাক-পাণিনি পর্বেই এখানে বিশেষ শৈব সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। তাদের আচার আচরণের একটা রূপরেখাও ঐতিহাসিক দলিলগুলি থেকে প্রমাণ হয়। এ প্রসঙ্গে ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্রোপাধ্যায়ের মত হলো,–
‘পাণিনি মূলতঃ শব্দসাধনের জন্য অষ্টাধ্যায়ী নামক ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। পাণিনি সম্প্রদায়ের ও পুরাণের মতে এই ব্যাকরণের মূলে আছে ১৪টি শিবসূত্র। শিবসূত্রগুলির সাহায্যে বিভিন্ন প্রত্যাহার গঠন করে ব্যাকরণের পরিভাষাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শিবসূত্রগুলি প্রাচীন শৈব ব্যাকরণের ও শৈব সম্প্রদায়ের কথা বলে। পাণিনির বিভিন্ন সূত্রেও শৈবদের উল্লেখ আছে; যথা– ‘শিবাদিভ্যোহণ্’ (৪/১/১১২) ইত্যাদি। তখনকার শৈব ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কে আরও একটু টুকরো চিত্র পাওয়া যায়– ‘আয়ঃশূলদণ্ডাজিনাভ্যাং ঠক্ঠক্রৌ’ (৫/২/৭৬) সূত্র থেকে। পাণিনি ব্যাকরণের উপর রচিত পতঞ্জলীর মহাভাষ্যে এই লৌহ ত্রিশূলধারীদেরই শৈবভাগবত বলা হয়েছে। কারো কারো মতে পতঞ্জলীর শিবভাগবতেরাই পাশুপত মতাবলম্বী সম্প্রদায়। তার প্রমাণ হিসাবে মহাভারতে পাশুপতদের উল্লেখের কথা তাঁরা বলে থাকেন।’– (লিঙ্গপুরাণ, ভূমিকা, পৃষ্ঠা-২০)
পাশুপত যে একটি ধর্মসম্প্রদায় তার অন্যতম পরোক্ষ পরিচয় পাওয়া যায় মহাভারতে। এর শান্তিপর্বের নারায়ণীয় পর্বাধ্যায়ে সাংখ্য, যোগ, পাঞ্চরাত্র, বেদ এবং পাশুপত এই পঞ্চবিধ জ্ঞান ও ধর্মমতের তালিকা দেয়া হয়েছে। যেমন, মহাভারতের শান্তিপর্বের ৩৪৯ অধ্যায়ে বলা হয়েছে–

সাংখ্যং যোগং পঞ্চরাত্রং বেদাঃ পাশুপতং তথা।
জ্ঞানান্যেতানি রাজর্ষে বিদ্ধি নাশ মতানি বৈ।। (মহা-১২/৩৪৯/৬৪)

সেখানে এক জায়গায় বলা হয়েছে ব্রহ্মদেবের পুত্র উমাপতি শিব শ্রীকণ্ঠ পাশুপত ধর্মের প্রবর্তক–

উমাপতির্ভূতপতি শ্রীকণ্ঠঃ ব্রহ্মণঃ সুতঃ।
উক্তবান ইদমব্যগ্রো জ্ঞানং পাশুপতং শিবঃ।।
–(মহাভারত, শান্তিপর্ব, অধ্যায় ৩৪৯/৬৮)
অর্থাৎ : ব্রহ্মার পুত্র উমাপতি ভূতনাথ শ্রীকণ্ঠ শিবই স্থিরচিত্তে পাশুপত জ্ঞান প্রচার করিয়াছিলেন।

              মহাভারতের এই উক্তির সাথে পরবর্তীকালের বায়ু, কূর্ম, লিঙ্গ প্রভৃতি কিছু পুরাণের বক্তব্যের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। শৈবপুরাণগুলিতে বিশেষ ভাবে পশুপতির কথা ও পাশুপত দর্শনাদির কথা পাওয়া যায়। লিঙ্গপুরাণের উত্তর ভাগের নবম অধ্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা আছে। সেখানে শৈলাদি সনৎকুমারকে বলেছেন–

ব্রহ্মাদ্যাঃ স্থাবরান্তাশ্চ দেবদেবস্যধীমতঃ।
পশবঃ পরিকীর্ত্ত্যন্তে সংসারবশবর্ত্তিনঃ।
তেষাং পতিত্বাদ্ ভগবান রুদ্রঃ পশুপতিঃ স্মৃতঃ।। –(লিঙ্গপুরাণ)
অর্থাৎ : ব্রহ্ম থেকে সূক্ষ্ম কীট পর্য্যন্ত সংসারবর্তী যা কিছু স্থাবর জঙ্গমাত্মক সবই দেবদেবের পশু বলে কীর্তিত হয়। ভগবান রুদ্র তাদের অধিপতি বলে পশুপতি নাম কীর্ত্তিত হন।

 

                পুরাণে আরো বলা হচ্ছে– ‘ভগবান বিষ্ণু পশুর মত জীবগণকে মায়ারজ্জুতে বন্ধন করছেন। শঙ্কর ছাড়া আর কেউ বন্ধনমোচক নেই। তিনি জগৎকে একদিকে চতুর্বিংশতি তত্ত্বরূপ রজ্জুর দ্বারা বদ্ধ করছেন, আবার জীবগণ কর্তৃক আরাধিত হয়ে তাদের মুক্তিও দিচ্ছেন। চতুর্বিংশতি তত্ত্বপাশটি কিরূপ? তার উত্তরে বলা হয়েছে– দশটি ইন্দ্রিয়ময় পাশ (পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় ও পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়), মন, বুদ্ধি, অহংকার ও চিত্তরূপ অন্তঃকারণময় চারটি পাশ, শব্দাদি পঞ্চ গুণময় পঞ্চপাশ ও ক্ষিত্যাদি পঞ্চ বিষয়ময় পঞ্চপাশ। ভগবান এই চতুর্বিংশতি প্রকার বন্ধনসাধন পাশ দ্বারা বিষয়াসক্ত জীবেদের বন্ধন করেছেন। মহেশ্বর ব্রহ্মাদি কীট পর্য্যন্ত সকলকেই সত্ত্বাদিগুণময় পাশত্রয় দ্বারা বন্ধন করিয়ে স্বয়ং সদসদ্ কার্য্য করাচ্ছেন। যদি ঐ পরমেশ্বর জীবগণের দ্বারা ভক্তি সহকারে পূজিত হন তাদের বন্ধনমুক্তি ঘটে। অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ এই পঞ্চবিধ ক্লেশকে পণ্ডিতেরা রজ্জু বলেন। অবিদ্যাকে তম, মোহ, মহামোহ, তমিস্র ও অন্ধতমিস্র– এই পঞ্চপ্রকারে অবস্থিত বলে থাকেন। প্রাণী অবিদ্যাবদ্ধ হলে শিব ভিন্ন অন্য কেউ মোচনকর্তা নেই। সর্বান্তর্যামী ভগবানের ভূত, ভবিষ্যত, বর্তমান ত্রিকালেই অবিদ্যা, রাগ বা দ্বেষের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। ত্রিকালাতীত মঙ্গলদাতা সর্বশরণ্য পরমাত্মা শিবের ত্রিকালের কোন কালেই পুণ্য, পাপ ও ঐ কার্য্যের পরিণাম দৈবের সঙ্গেও সম্বন্ধ নেই। পশুপতি শিব কালত্রয়েই আশ্রয় কর্তৃক অস্পষ্ট থাকেন। প্রধান পুরুষ ভগবান পরমেশ্বর স্থাবর জঙ্গমাত্মক অখিল প্রপঞ্চ থেকে পৃথক ও শ্রেষ্ঠ। লোকের জ্ঞান ঐশ্বর্য্যের আপেক্ষিক আধিক্য দেখা যায়, কিন্তু শিবেতে যে জ্ঞানৈশ্বর্য্য আছে তা থেকে তাদের জ্ঞানৈশ্বর্য্যের আতিশয্য দৃষ্ট হয় না বলে মনীষীগণ শিবকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে থাকেন। প্রত্যেক সৃষ্টির প্রারম্ভে সমুৎপন্ন কাল, বিনশ্বর ব্রহ্মা প্রভৃতিকে এই শিবই শাস্ত্রসমূহের উপদেশ দিয়ে থাকেন। অনাদিনিধন শিব খণ্ডকালস্থায়ী সকল গুরুগণের গুরু। এই পরমেশ্বরের নিজ প্রয়োজন না থাকলেও কেবল পরের প্রতি অনুগ্রহার্থই সকল কার্য্যের কারণ হয়েছেন তিনি। পরমাত্মা শিবের বাচক হল ওঙ্কার। পূর্বকালে দেবদেব শঙ্কর ভক্তদের প্রতি দয়াবান হয়ে পাশুপত যোগ ও পাশুপত জ্ঞানতত্ত্ব বলেছিলেন। যাজ্ঞবল্ক্য সূর্যের দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে এই তত্ত্ব গার্গপুত্রকে বলেন। এভাবেই গুরুপরম্পরায় পাশুপততত্ত্ব প্রচারিত হয়। পুরাণে অদ্বৈত তত্ত্বের সঙ্গে পাশুপতকে এক করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।’– (ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, লিঙ্গপুরাণ, ভূমিকা, পৃষ্ঠা-৩৭)
বিভিন্ন শৈব পুরাণে পাশুপত মতের অল্পবিস্তর উল্লেখ আছে। পাশুপত ব্রত এবং পাশুপত মত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে শিবপুরাণের বায়বীয় সংহিতায় বলা হয়েছে–

যুগাবর্ত্তেষু শিষ্যেষু যোগাচার্য্যস্বরূপিণা।
তত্র তত্রাবতীর্ণেন শৈবেনৈব প্রবর্ত্ততে।।
সংক্ষিপ্যাস্যা প্রবক্তারশ্চত্বার পরমর্ষয়ঃ।
রুরুর্দধীচোহগস্ত্যশ্চ উপমন্যুর্মহাযশাঃ।।
তে চ পাশুপতা জ্ঞেয়াঃ সংহিতানাং প্রবর্তকাঃ।
তৎসন্ততীয়া গুরবঃ শতশোহথ সহস্রশঃ।।
তত্রোক্তঃ পরমো ধর্মশ্চর্য্যাদ্যাত্মা চতুর্বিধঃ।
তেষু পাশুপতো যোগঃ শিবং প্রত্যক্ষয়েদ্দৃঢম্ ।। –(বায়বীয় সংহিতা-২৮/১৪-১৭)
অর্থাৎ : প্রত্যেকটি যুগের আবর্তনের সময় মহাদেব যোগাচার্য্যরূপে অবতীর্ণ হয়ে শিষ্যদের এই ব্রত এবং জ্ঞানের শিক্ষা দান করেন। চারজন পরম ঋষি সংক্ষেপে এই শাস্ত্রের উক্তি করেছেন। তাঁরা হলেন– রুরু, দধীচ, অগস্ত্য এবং মহাযশা উপমন্যু। এঁরা পশুপতির উপাসক এবং পাশুপত সংহিতা সমূহের প্রবর্তক। এঁদের বংশে শত সহস্র গুরু উৎপন্ন হয়েছেন। এইসব শাস্ত্রে চর্য্যাদিরূপে চার প্রকার পরম ধর্ম উক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে পাশুপত যোগ শিবকে সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করিয়ে দেয়।

               ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, পাশুপত সম্প্রদায়ের আচার্যগণ আঠারটি রৌদ্রাগমের প্রাধান্য মানতেন কিন্তু দশটি শিবজ্ঞানের প্রামাণ্য মানতেন না। কারণ পাশুপত সম্প্রদায় অনেকটা অদ্বৈতবাদী। রৌদ্রাগম গুলিতে দ্বৈতদৃষ্টির সঙ্গে অদ্বৈত দৃষ্টির মিশ্রণ হয়েছিল অথচ শিবাগমে অদ্বৈত দৃষ্টি অঙ্গীকৃত হয়নি। সেই কারণেই আগমের একটি ধারাকে প্রামাণ্য মানলেও অপর ধারাকে পাশুপতেরা মানেননি। সম্ভবত পাশুপতরাই সর্বপ্রাচীন শিবোপাসক সম্প্রদায়। পাতঞ্জল মহাভাষ্যে এদেরই সম্ভবত শিবভাগবৎ সম্প্রদায় বলা হয়েছে।
পাশুপত মত বেদবিরোধী না বেদসম্মত এই ব্যাপারে দুরকম ব্যাখ্যাই পাওয়া যায়। রামানুজের মতে (‘পত্যুরসামঞ্জস্যাৎ’ এই ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে) পাশুপত মতানুযায়ী কাপালিক, কালামুখ, পাশুপত ও শৈব এই চারটি সম্প্রদায়ই বেদ বিরোধী– ‘সর্বে হ্যৈতে বেদবিরুদ্ধাং তত্ত্বপ্রক্রিয়াং ঐহিকামুষ্কিক নিঃশ্রেয়স-সাধনকল্পনাশ্চ কল্পয়ন্তি’। তবে বৃহৎসংহিতা, কূর্মপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ ইত্যাদি পর্যালোচনা করলে কিন্তু পাশুপতদের বেদবিরোধী বলে মনে হয় না।

                সে যাক, আমরা আগেই বলেছি যে মহাভারতে পাশুপত মতের উল্লেখ রয়েছে, এবং পরবর্তীকালের কিছু পুরাণের বক্তব্যে তার সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন, বায়ুপুরাণে (বায়ু-২৬/২১০-১৩) বলা হয়েছে শিব শ্মশানে পরিত্যক্ত একটি মৃতদেহে প্রবেশ করে নকুলী বা নকুলীশ নামে আবির্ভূত হন এবং পাশুপত ধর্মের প্রচার করেন। তাঁর চারজন প্রধান শিষ্য ছিল– কুশিক, গার্গ্য, মিত্রক এবং কৌরুষ্য– যাঁরা মাহেশ্বর যোগে দীক্ষাগ্রহণ করে রুদ্রলোক প্রাপ্ত হন।
লিঙ্গপুরাণেও ওই একই কাহিনী স্থান পেয়েছে, তবে সেখানে নকুলীর পরিবর্তে লকুলী নামটি উল্লিখিত হয়েছে। লিঙ্গপুরাণের পূর্বভাগে লকুলীশ নামক শৈব সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে এভাবে–

দিব্যাং মেরুগুহাং পুণ্যাং ত্বয়া সার্ধঞ্চ বিষ্ণুনা।
ভবিষ্যামি তদা ব্রহ্মণ্! লকুলী নাম নামতঃ।।
কায়াবতার ইত্যেবং সিদ্ধক্ষেত্রঞ্চ বৈ তদা।
ভবিষ্যতি সুবিখ্যাতং যাবৎভূমির্ধরিষ্যতি।।
তত্রাহপি মম তে পুত্রা ভবিষ্যন্তিতপস্বিনঃ।
কুশিকশ্বৈব গর্গশ্চমিত্রঃ কৌরুষ্যত্রব চ।।
যোগাত্মনো মহাত্মনো ব্রাহ্মণা বেদপারগাঃ।
প্রাপ্যমাহেশ্বরং যোগং বিমলাহ্যুর্ধ্বরেতসঃ।।
রুদ্রলোকং গমিষ্যন্তি পুনরাবৃত্তিদুর্লভম্ ।
এতে পাশুপতাঃ সিদ্ধা ভস্মোৎধূলিতবিগ্রহাঃ।। –(লিঙ্গপুরাণ-পূর্বভাগ-২৪/১২৯-১৩৩)
অর্থাৎ : (ক্রমাগত পরিবর্তনশীল অষ্টাবিংশতি দ্বাপরযুগ উপস্থিত হলে ব্রহ্মা কিংবা স্বয়ং বিষ্ণু পরাশর পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হবেন। তখন আমার ষষ্ঠাংশভূত পুরুষোত্তম কৃষ্ণ বাসুদেব থেকে যদুকুল শ্রেষ্ঠ বাসুদেব উৎপন্ন হবেন। আমিও তখন যোগমায়া দ্বারা ব্রহ্মচারী হয়ে শ্মশাসে মৃত ও পরিত্যক্ত অনাথকায় দর্শন করে সেই দেহের মধ্যে যোগের দ্বারা প্রবিষ্ট হবো। হে ব্রহ্মণ্! তখন লকুলীশ নাম ধারণ করে তোমার সঙ্গে আমিও সুমেরু নামক দিব্য গুহায় বাস করবো। যতদিন পৃথিবী কুল ধারণ করবেন, ততদিন আমি কায়বতার নামক পবিত্রক্ষেত্রে বাস করবো। সেখানেও বেদপারদর্শী আমার তপস্বী পুত্ররা– কুশিক, গর্গ, মিত্র ও কৌরুষ্য নামে খ্যাত হবে। অবশেষে এরা সকলেই মাহেশ্বর যোগের দ্বারা পাপ থেকে মুক্তিলাভ করে রুদ্রলোকে গমন করবে। এরা বাহ্য ও অভ্যন্তর শুচি হবে, গায়ে ভস্ম লেপন করবে এবং শিবলিঙ্গ পূজায় নিরত থাকবে। এরা সকলেই পশুপতি মন্ত্রে দীক্ষিত হবে। এই পশুপতি মন্ত্র একদিকে যেমন জ্ঞানের পথ দেখায়, তেমনি ভাবে সংসারের সর্ববন্ধন ছিন্ন করে।

               ঐ পুরাণের মতে শিব নিজেই কায়াবতারে লকুলী নামে অবতার রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর শিষ্যদের কথাও এখানে বলা হয়েছে– কুশিক, গর্গ, মিত্র ও কৌরুষ্য। এ প্রসঙ্গে ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন–
‘বায়ুপুরাণের ২৩ অধ্যায়ে শিবের অষ্টাবিংশ অবতারের কথা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ২৮ সংখ্যক অবতার হলেন লকুলীশ। এখানেও বলা হয়েছে যে কায়ারোহণ তীর্থে তিনি আবির্ভূত হন। লকুলীশের কুশিক, গর্গ, মিত্র ও কৌরুষ্য নামক চারজন শিষ্যের কথাও জানা যায়। মাধবাচার্য্যরে সর্বদর্শনসংগ্রহ গ্রন্থে লকুলীশ মতকেই পাশুপত মত বলা হয়েছে, যদিও অনেকে লকুলীশকে পাশুপত মতের প্রতিষ্ঠাতা বলে মানেন না। হয়তো পাশুপত মতকে একটা সংগঠিত রূপ তিনি দিয়েছিলেন। পঞ্চাধ্যায়ী বা পঞ্চার্থবিদ্যা নামক গ্রন্থ তাঁর রচনা। মাধবাচার্য্যও সর্বদর্শনসংগ্রহে নকুলীশ-পাশুপত অধ্যায়ে পঞ্চার্থভাবদীপিকার কথা বলেছেন। দশম থেকে দ্বাদশ শতকের বিভিন্ন লিপিতে লকুলীশের উল্লেখ পাওয়া যায়।’– (লিঙ্গপুরাণ, ভূমিকা, পৃষ্ঠা-৩৯-৪০)
অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বর্ণনায়,– ‘রাজস্থানের উদয়পুরের কিছু উত্তরে একটি মন্দিরগাত্রে ৯৭১ খ্রীষ্টাব্দে উৎকীর্ণ একটি লেখে বলা হয়েছে যে ভৃগুকচ্ছ দেশে শিব লগুড়হস্ত (লকুল) এক ব্রহ্মচারীরূপে আবির্ভূত হন ও পাশুপত যোগ প্রবর্তন করেন। ত্রয়োদশ শতকের একটি লেখ থেকে জানা যায় যে শিব লাটদেশে ভট্টারক শ্রীলকুলীশ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর চারজন শিষ্য– কৌশিক, গার্গ্য, কৌরুষ এবং মৈত্রেয়– পাশুপতদের চারটি সম্প্রদায়ের প্রবক্তা হন। মথুরা থেকে প্রাপ্ত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলের এক লিপি থেকে জানা যায় যে পাশুপত ধর্মগুরু লকুলীশ খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের গোড়ার দিকে আবির্ভূত হয়েছিলেন।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০১)

              এবং ঐতিহাসিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহাদেবের আঠাশতম ও শেষ অবতার বলে কথিত পুরাণাদিতে উল্লিখিত লকুলীশ খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে পূর্ব-প্রচলিত শৈব মত ও আচার অনুষ্ঠানসমূহকে শৃংখলাবদ্ধ ও পুনর্গঠিত করেছিলেন, এবং তাঁর প্রবর্তিত ধর্মমত পাশুপত নামে খ্যাত। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত হলো,–
‘নানাপ্রকার তথ্য একত্র আলোচনা করিলে যে মীমাংসায় উপনীত হওয়া যায় তাহা সংক্ষেপে এইরূপ। মহাদেবের অষ্টাবিংশতিতম ও শেষ অবতার বলিয়া পুরাণাদিতে বর্ণিত লকুলীশ খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে কাথিয়াবাড় অঞ্চলে আবির্ভূত হইয়া পূর্বপ্রচলিত শৈব-পাশুপত ধর্মের পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবন করিয়াছিলেন। পাশুপত ধর্ম সংগঠনে তাঁহার অংশ ও অবদান এত অধিক ছিল যে পরবর্তী কালে এই ধর্মমত ও সম্প্রদায়ের নামের সহিত তাঁহার নাম সংযুক্ত হইয়া যায়। পূর্বেই বলিয়াছি মাধবাচার্য তাঁহার সর্বদর্শনসংগ্রহ গ্রন্থে ইহাকে নকুলীশ (লকুলীশ)-পাশুপত আখ্যায় অভিহিত করিয়াছেন। লকুলীশ প্রণীত গ্রন্থের নামও তিনি করিয়াছেন– ইহার নাম ছিল পঞ্চার্থবিদ্যা; এই গ্রন্থ হইতে একটি শ্লোকও তিনি উদ্ধৃত করিয়াছেন। শৈব-পাশুপত ধর্মসম্প্রদায়ের উদ্ভব খুব সম্ভব পূর্ব ভারতে বুদ্ধ মহাবীরেরও পূর্ববর্তী কালে হয়, এবং ক্রমশঃ তাহা ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশে বিস্তৃত হয়। মধ্যযুগে দক্ষিণ ভারতীয় বীরশৈব বা লিঙ্গায়ৎ সম্প্রদায়ের পুনর্গঠনে বসব যেরূপ প্রধান অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার পূর্বে শৈব-পাশুপত ধর্মসম্প্রদায়ের পুনর্গঠনে লকুলীশও তদনুরূপ বা উহা অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করেন। বসব ছিলেন এক রাজপুরুষ, কিন্তু লকুলীশ সম্বন্ধে যাহা জানা যায় তাহাতে মনে হয় রাজনীতি হইতে দূরে থাকিয়া তিনি ধর্মসংস্কারেই মন দিয়াছিলেন। পাশুপত ধর্মমতের মূলতত্ত্ব সম্বলিত একটি সুপ্রাচীন গ্রন্থের নাম পাশুপতসূত্র। (রাশীকর কৌণ্ডিন্যভাষ্য সমেত এই গ্রন্থ ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে আর. অনন্তকৃষ্ণ শাস্ত্রী কর্তৃক সম্পাদিত হইয়াছিল। ইহা ত্রিবান্দ্রাম সংস্কৃত গ্রন্থমালার ১৪৩ সংখ্যক গ্রন্থ।) ইহার রচয়িতা কে তাহা সঠিক জানা নাই, তবে লকুলীশ বা তাঁহার পূর্ববর্তী কোনও শিবভাগবত ইহা রচনা করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। গুপ্তযুগে রাশীকর কৌণ্ডিন্য নামে এক পাশুপতাচার্য ইহার একটি বিশদ ভাষ্য রচনা করিয়া যান। পাশুপতসূত্র পঞ্চ অধ্যায়ে বিভক্ত, এবং ইহাতে পাশুপত ধর্মতত্ত্বসমূহ সূত্রের আকারে সন্নিবদ্ধ আছে। ইহা ও কৌণ্ডিন্য বিরচিত ইহার ভাষ্য অবলম্বন করিয়াই পণ্ডিত মাধবাচার্য বহু পরবর্তী কালে তাঁহার সর্বদর্শনসংগ্রহ গ্রন্থে অল্প কয় পৃষ্ঠায় এই ধর্মের মূল তত্ত্বগুলি ব্যাখ্যা করিয়া যান। মাধব খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর লোক হইলেও তাঁহার ব্যাখ্যাত পাশুপত মতগুলির সহিত পাশুপতসূত্রে এবং কৌণ্ডিন্যভাষ্যে বর্ণিত ধর্মতত্ত্বগুলির পূর্ণ সাদৃশ্য বর্তমান। মাধবপ্রদত্ত বিবরণের একটি সুবিধা এই যে ইহা সংক্ষেপে অথচ সুবিন্যস্তভাবে পাশুপত ধর্মদর্শনের পরিচয় দেয়।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৫৩-৫৪)
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, শিবপুরাণের বায়বীয় সংহিতাতেও পাশুপত মতের আলোচনা পাওয়া যায়। কিন্তু পাশুপত সূত্র ও কৌণ্ডিন্যভাষ্যে যেভাবে পাশুপত মতের বিবরণ এবং তার বিভিন্ন পদের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, পুরাণোক্ত পাশুপত মত এবং তার ব্যাখ্যা কয়েকটি ক্ষেত্রে ভিন্ন বলে মনে হয়। এসব পার্থক্যের মূলানুসন্ধান করা এবং তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য কিভাবে হবে তা দার্শনিকদের আলোচন্য বিষয়।

              পাশুপত মত অনুযায়ী ধর্মতত্ত্ব পঞ্চবিভাগে বিভক্ত, অর্থাৎ পাঁচটি বিষয়ের উপর পাশুপত ধর্ম কেন্দ্রীভূত– কার্য, কারণ, যোগ, বিধি ও দুঃখান্ত। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন–
‘এ থেকেই বোঝা যায় জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গীর ক্ষেত্রে পাশুপত ধর্ম বৌদ্ধধর্মের অনুরূপ ধারণাই পোষণ করে। এরও মূল প্রতিপাদ্য দুঃখ ও দুঃখের নিবৃত্তি। বৌদ্ধধর্মের মত পাশুপত ধর্মও কার্য-কারণ তত্ত্বে বিশ্বাসী। যোগ ও বিধি বৌদ্ধধর্মেরও বিষয়। তবে তফাৎ এই যে বৌদ্ধধর্ম যেখানে কতকগুলি নৈতিক অনুশাসনের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, যেগুলির অনুশীলন করলেই নির্বাণলাভ ঘটবে, পাশুপত ধর্ম সেখানে অতি পুরাতন প্রাক্-বিভক্ত সমাজব্যবস্থার জীবনচর্যায় ফিরে যেতে চেয়েছে, লৌকিক আচার অনুষ্ঠানসমূহের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে। আদি কৃষিনির্ভর সমাজের তান্ত্রিক ধ্যানধারণাসমূহ পাশুপত ধর্মে বিশেষভাবে প্রশ্রয় পেয়েছে। দ্বিতীয় পার্থক্য হল বৌদ্ধধর্ম যেখানে নিরীশ্বরবাদী, পাশুপত ধর্মে সেখানে ঈশ্বরের বিশেষ স্থান আছে, যে ঈশ্বর হলেন শিব। পাশুপত ধর্মে জাতিভেদ স্বীকৃত নয়।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০২)
পাশুপত কার্যকারণতত্ত্ব সাংখ্য আশ্রয়ী। পাশুপতের প্রথম তত্ত্ব কার্য বলতে জগৎকে, জাগতিক বস্তু ও প্রাণীসমূহকে বোঝায়, পাশুপত তত্ত্বে যাদেরকে পশু আখ্যা দেয়া হয়েছে। জীব বা পশুর গুণসমূহের নাম বিদ্যা এবং উপাদানসমূহের নাম কলা। তাই পাশুপত মতে বলা হয়, কার্য তিন প্রকার– বিদ্যা, কলা এবং পশু। একজন মানুষ আসলে কলা ও গুণযুক্ত পশু।
সাংখ্যোক্ত চতুর্বিংশতি তত্ত্বের কথা আমরা জানি। এই চতুর্বিংশতি তত্ত্ব হলো– পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম), পঞ্চ তন্মাত্র (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ), পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক্), পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (বাক্, পাণি, পাদ, পায়ূ ও উপস্থ), তিনটি জীবমধ্যস্থ ইন্দ্রিয় (মন, বুদ্ধি ও অহংকার বা অহংজ্ঞান) এবং পরিদৃশ্যমান সমষ্টিগত জগৎ। এই চব্বিশটি তত্ত্বের শেষেরটিকে বাদ দিলে যে ২৩টি তত্ত্ব অবশিষ্ট থাকে, পাশুপত মতানুযায়ী ওই তেইশ তত্ত্বের প্রথম দশটি কার্যরূপী, এবং শেষের ত্রয়োদশটি কারণরূপী কলা। কলা বা উপাদানসমূহের অবলম্বনে পশু যতদিন দেহের সঙ্গে যুক্ত থাকে ততদিন সে অবিশুদ্ধ এবং যখন এই বন্ধন থেকে ক্রমে ক্রমে সে বিমুক্ত হয় তখন সে শুদ্ধ পর্যায়ে উন্নীত হয়।

               পাশুপতের দ্বিতীয় তত্ত্ব কারণতত্ত্ব নানাভাবে কল্পিত। অর্থাৎ পশুর অস্তিত্বের, বন্ধনের ও মুক্তির কারণ নানাবিধ। তবে সব কারণের মূল কারণ সৃষ্টি-স্থিতি-লয় কর্তা একমাত্র ইশ্বরকেই বুঝায় যিনি পশুপতি শিব। তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বক্রিয়াশীল, সাদ্য এবং পতি। অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বর্ণনায়–
‘পাশুপত কারণতত্ত্ব আসলে সাংখ্যের চতুর্বিংশতি তত্ত্ব যা দিয়ে প্রকৃতির বিবর্তন ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কিন্তু ঈশ্বরবাদী হবার দরুনই সাংখ্যের কারণ পরম্পরার মাথায় ঈশ্বরকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে পাশুপত যোগদর্শনের মতই সেশ্বর সাংখ্য। স্বাভাবিক নিয়মেই সেই কারণে যোগদর্শনের সঙ্গে পাশুপতের একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে, এবং যোগ পাশুপত ধর্মের পঞ্চতত্ত্বের একটিতে পরিণত হয়েছে। পাশুপত ধর্ম মূলত আচার-অনুষ্ঠানমূলক হলেও, সেখানে ক্রিয়া-নিরপেক্ষ যোগের একটা স্থান রাখা হয়েছে।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০২)
অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোবাধ্যায়ের ভাষ্যে– ‘যোগতত্ত্ব বুদ্ধি ও চিন্তন সহযোগে পতির সহিত পশুর মিলনপ্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করিয়াই কল্পিত হইয়াছে। এই মিলনপ্রচেষ্টা দুই প্রকারের; মন্ত্র জপ, ধ্যানাদি ক্রিয়ার দ্বারা জীব যে ঈশ্বরের সহিত যোগ সাধন করেন ইহা একপ্রকার, অপরটি এরূপ কোনও বাহ্য চেষ্টাসাপেক্ষ নহে, উহা ক্রিয়াবিরতিমূলক এবং ঈশ্বরসহ মিলন সম্বন্ধীয় এক স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান হইতে উদ্ভূত। এই ক্রিয়া নিরপেক্ষ যোগ উন্নততর এ বিষয়ে সন্দেহ নই, তবে পশুর যোগের শ্রেষ্ঠ পর্যায়ে উপনীত হইতে হইলে প্রস্তুতির আবশ্যক। এই পূর্ব-প্রস্তুতিই অবশেষে তাহার চেতন ও অবচেতন সত্তাকে পতির সহিত মিলন বিষয়ে সম্বুদ্ধ করে, এবং তাহার তৎকালীন মনোভাবকে বলা হয় সম্বিদ।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৫৫)

                এ পর্যায়ে পাশুপত ধর্মের তৃতীয় ও চতুর্থ তত্ত্ব যোগ ও বিধি সম্পর্কে আলোচনার সুবিধার্থে এই ধর্মের পঞ্চম তত্ত্ব দুঃখান্ত সম্পর্কে আগে ধারণা নেয়াটা সুবিধাজনক হবে। পাশুপত ধর্মের মূল উদ্দেশ্য এই দুঃখান্ত অর্থাৎ দুঃখকে অন্ত বা দূর করা। মানুষের জীবন যে দুঃখময় তা সাংখ্য, বৌদ্ধ, বেদান্ত প্রভৃতি শাস্ত্রে বিশেষভাবেই উক্ত হয়েছে। উপনিষদের মহাবাক্য ‘অতোহন্যৎ আর্তম’ বুঝায় যে ব্রহ্ম ব্যতীত সব কিছুই দুঃখপূর্ণ। বুদ্ধ প্রচারিত চারটি আর্যসত্যের (জগৎ দুঃখময়, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ নিবারণের উপায় আছে এবং দুঃখ নিবৃত্তি মার্গ) মূল বিষয়ই দুঃখ। পাশুপতদের লক্ষ্য একদিকে ঈশ্বরের সাথে যোগ, তেমনি অন্যদিকে ঈশ্বরের প্রসাদে সর্বদুঃখের অন্ত। পাশুপত সূত্রকার বলেছেন– ‘অপ্রমাদী গচ্ছেৎ দুঃখানামন্তম্ ঈশপ্রদাদাৎ’ (পাশুপতসূত্র-৪/৪৯)। রাশীকর কৌণ্ডিন্য তাঁর ভাষ্যে বলেন, দুঃখ তিনপ্রকার– আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক দুঃখ।
আধ্যাত্মিক দুঃখের উৎস তিনটি– মানস-সঞ্জাত, প্রবৃত্তি-সঞ্জাত (ক্রোধ, লোভ, ভয়, বিষাদ, ঈর্ষা, অসূয়াদি) এবং দেহসঞ্জাত (শরীর সংক্রান্ত ব্যাধিপুঞ্জ থেকে উদ্ভূত)। আধিদৈবিক দুঃখ পাঁচ প্রকার– ইহলোকভয়, পরলোকভয়, অহিত-সংপ্রয়োগ, হিত-বিপ্রয়োগ ও ইচ্ছা-ব্যাঘাত। আধিভৌতিক দুঃখও পাঁচ প্রকার– গর্ভে বাস, জন্মগ্রহণ, অজ্ঞান, জরা ও মরণ।
এসব দুঃখের হাত থেকে ঈশ্বরের প্রসাদে পাশুপত ব্রতচারী মুক্ত হন, এবং তাঁর দুঃখের শেষ হয়। এটাই পাশুপত সাধকের অনাত্মক মোক্ষ। কিন্তু এটিই তাঁর একমাত্র কাম্য নয়। তাঁর মোক্ষচিন্তা সাত্মকও বটে, কারণ দুঃখশেষের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নানাপ্রকার অপ্রাকৃত শক্তির ও ঐশ্বর্যের অভিলাষী। এই দুঃখের নিবৃত্তির দুটি রাস্তা, একটি যোগ ও অপরটি বিধি, যা যথাক্রমে পাশুপত ধর্মের তৃতীয় ও চতুর্থ তত্ত্ব।

               পাশুপতসূত্র অনুযায়ী, যোগের দ্বারা পাশুপত যোগীর পঞ্চরূপ অলৌকিক জ্ঞান এবং তিন প্রকার ঐশী ক্রিয়াশক্তির উদ্ভব হয়। এই জ্ঞান ও কর্মশক্তি সম্পর্কে পাশুপতসূত্রে বলা হয়েছে–

দূরদর্শনশ্রবণমননবিজ্ঞানানি চাস্য প্রবর্তন্তে। সর্বজ্ঞতা।
মনোজবিত্বম্ । কামরূপিত্বম্ । বিকরণঃ ধর্মিত্বম্ । –(পাশুপতসূত্র-১/২১-২৬)
অর্থাৎ : পাঁচটি জ্ঞানের স্বরূপ হইল দূরদর্শন, শ্রবণ, মনন, বিজ্ঞান ও সর্বজ্ঞত্ব। এবং তিনটি ক্রিয়াশক্তি হইল মনোজবিত্ব, কামরূপিত্ব ও বিকরণধর্মিত্ব।

                 পঞ্চরূপ জ্ঞান হিসেবে এখানে দূরদর্শনের অর্থ আণবিক, গুপ্ত ও অতিদূরস্থ বস্তুসমূহ দর্শন ও স্পর্শ করবার শক্তি। শ্রবণের অর্থ যাবতীয় শব্দ শ্রবণ করবার অপার্থিব ক্ষমতা। মনন অর্থাৎ চিন্তাযোগ্য যাবতীয় বস্তু সম্বন্ধে আশ্চর্য প্রকার জ্ঞান। বিজ্ঞানের অর্থ সর্ব বিজ্ঞানশাস্ত্র বিষয়ক অত্যাশ্চর্য বিশেষ জ্ঞান। সর্বজ্ঞতা বলতে লিখিত অলিখিত, চিন্তিত অচিন্তিত ও এমন কি অকথিত সম্ভাব্য সর্বপ্রকার শাস্ত্রের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে অলৌকিক এবং অশেষ পারদর্শিতা। অন্যদিকে ক্রিয়াশক্তি মনোজবিত্ব বলতে যে কোন কার্য ইচ্ছানুযায়ী সম্পাদনের ক্ষমতা, কামরূপিত্ব বলতে যে কোন রূপ ও আকার গ্রহণের ক্ষমতা এবং বিকরণধর্মিত্ব বলেতে ইন্দ্রিয়াদির ক্রিয়া রুদ্ধ অবস্থাতেও সর্বপ্রকার অপ্রাকৃত ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের অধিকারিত্ব বোঝায়।
এছাড়াও পাশুপত-সূত্রকার প্রথম অধ্যায়ের শেষ কয়টি সূত্রে যোগীর আরও সব অলৌকিক শক্তির কথা বলেছেন। যেমন–

সর্বে চাস্য বশ্যা ভবন্তি। –(সূত্র-১/২৭)
সর্বে চাস্য বধ্যা ভবন্তি। –(সূত্র-১/৩১)
সর্বেষাং চাবধ্যো ভবতি। –(সূত্র-১/৩২)
অভীতঃ ; অক্ষয়ঃ ; অজরঃ ; অমরঃ ; (সূত্র-১/৩৩-৩৬)
সর্বত্র চাপ্রতিহতগতির্ভবতি। –(সূত্র-১/৩৭)
অর্থাৎ : পাশুপত যোগী ইচ্ছানুযায়ী বশ করা, হনন করা, উজ্জীবিত করার সর্বক্ষমতা প্রাপ্ত হন। তিনি সর্ব অবস্থায় ভীতিহীন, অক্ষয়, জরাহীন, অমর এবং সর্বত্র অপ্রতিহত গতিশক্তির অধিকারী হন।

             যোগের দ্বারা এসব অলৌকিক শক্তি পাশুপত যোগীর অধিকারী সিদ্ধ হলে মহাদেবের মহাগণপতিত্ব লাভ সম্ভব। তাই পাশুপতসূত্রে বলা হয়েছে–

ইত্যেতৈর্গুণৈর্যুক্তো ভাগবতো মহাদেবস্য মহাগণপতির্ভবতি। –(পাশুপতসূত্র-১/৩৮)
অর্থাৎ : জীব মুক্ত অবস্থায় সমস্ত অজ্ঞান ও দৌর্বল্য ত্যাগ করিতে সমর্থ হয় এবং অসীম জ্ঞান ও ক্রিয়াশক্তির অধিকারী হইয়া ঈশ্বরের প্রসাদে মহাদেবের মহাগণপতিত্ব প্রাপ্ত হয়।

 

               এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য হলো, ‘রাশীকর কৌণ্ডিন্যের মতে পাশুপত-তন্ত্র যোগনিষ্ঠ, এবং উপরিলিখিত অলৌকিক শক্তিসমূহ রঙীন পতাকা দ্বারা যেমন প্রাণীগণকে প্রলুব্ধ করা যায় তেমন তন্ত্রাভিলাষীর প্রলোভন স্বরূপই যেন ঐ সকল শক্তি অর্জনের কথা বলা হইয়াছে (রঙ্গ-পতাকাদিবচ্ছিষ্য প্রলোভনার্থমিদম্– পৃ. ৪২)। –(পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৫৯)
তবে মহাগণপতিত্ব লাভের জন্য পাশুপত যোগীকে যোগচর্চার পাশাপাশি পাশুপত ধর্মের চতুর্থ তত্ত্ব বিধিও পালন করতে হয়। বিধি হচ্ছে পশুর পুণ্য ও উৎকর্ষ সম্পাদনকারী ধর্মাচরণ প্রণালী বা আচার-অনুষ্ঠান। প্রধান বিধিগুলির নাম চর্যা। চর্যার দুই ভাগ– ব্রত এবং দ্বার।
দেহে ছাই মাখা, ছাই-এর গাদায় শয়ন করা, হাস্য-গীত-নৃত্য-হুড়ুক্কার ধ্বনি করা, নমস্কার, মন্ত্রোচ্চারণ প্রভৃতি ব্রতের অঙ্গ। পাশুপতসূত্রে বলা হয়েছে–

ভস্মনা ত্রিষবণং স্নায়ীত ; –(পাশুপতসূত্র-১/২)
ভস্মনি শয়ীত ; –(পাশুপতসূত্র-১/৩)
হসিত-গীত-নৃত্য-হুড়ুক্কার-নমস্কার জপ্যোপহারেণোপতিষ্ঠেৎ ; –(পাশুপতসূত্র-১/৮)
অর্থাৎ : ভস্মস্নান অর্থাৎ সমস্ত শরীরে ত্রিসন্ধ্যা ভস্মানুলেপন (১/২), ভস্মে শয়ন (১/৩), অহেতুকী হাস্য, গীত, নৃত্য, হুড়ুক্কার শব্দকরণ (জিহ্বা ও তালুর সাহায্যে বৃষভাদি পশুর ন্যায় অস্ফুট ধ্বনি), সাষ্টাঙ্গ নমস্কার, মন্ত্রোচ্চারণ প্রভৃতি ক্রিয়া পাশুপত ব্রতের অঙ্গ।

             অন্য যেসব ক্রিয়ানুষ্ঠানের সাহায্যে ধর্মের প্রবেশপথ উন্মুক্ত হয় তাকে পাশুপত মতে ‘দ্বার’ বলা হয়। দ্বার ছয় প্রকার– ক্রাথন, স্পন্দন, মণ্ডন, শৃঙ্গারণ, অবিত্তকরণ এবং অবিতদ্ভাষণ। পাশুপতসূত্রে বলা হয়েছে–

ক্রাথেত বা স্পন্দেত বা মণ্ডেত বা শৃঙ্গারেত বা অবিতঙ্কুর্ষাৎ অবিতদ্ভাষেত –(পা.সূ.-৩/১২-১৭)
অর্থাৎ : ক্রাথন (জাগরূক অবস্থায় নিদ্রিত থাকার ভাণ করা), স্পন্দন (পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর ন্যায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কম্পন ঘটানো), মণ্ডন (ভ্রমণকালে পদদ্বয় ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিক্ষেপ বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া ঘটানো), শৃঙ্গারণ (সুন্দরী যুবতী দর্শনে আদিরসাত্মক ভাব প্রকাশ), অবিত্তকরণ (অসামাজিক, নিন্দার্হ উন্মত্তবৎ আচরণ) এবং অবিতদ্ভাষণ (অর্থহীন প্রলাপ উচ্চারণ) করবে।

               অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,– ‘চর্যার গৌণ উপায়গুলিও প্রায় সমপর্যায়ের, যেমন শিবলিঙ্গ পূজাশেষে দেহে ভস্মলেপন ও দেবতার প্রতি উৎসর্গীকৃত পুষ্প, পত্র ও মাল্যাদি অঙ্গে ধারণ, অপরের উচ্ছিষ্ট ভোজন ইত্যাদি। পাশুপত সূত্রে উপরোক্ত বিধিগুলি নানাভাবে বর্ণিত আছে। এই গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ের দুইটি (ষষ্ঠ ও অষ্টম) শ্লোক এ সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য। ষষ্ঠ শ্লোকটি এইরূপ– উন্মত্তবদেকো বিচরেত লোকে, অর্থাৎ ‘লোকসমাজে পাশুপত ব্রতধারী উন্মত্তের ন্যায় বিচরণ করিবেন’। অষ্টম শ্লোকে বলা হইতেছে– উন্মত্তো মূঢ় ইত্যেবং মন্যন্তে ইতরে জনাঃ, অর্থাৎ ‘সাধারণ (সামাজিক) লোক তাঁহাকে উন্মত্ত ও মূর্খ বলিয়া মনে করিবে’। ভাষ্যকার কৌণ্ডিন্য এ প্রসঙ্গে এই ক্রিয়াগুলিকে ‘ব্রাহ্মণকর্মবিরুদ্ধ’ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন (অব্যক্তপ্রেতোন্মত্তাদ্যং ব্রাহ্মণকর্মবিরুদ্ধং ক্রমং)। এই সকল আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভূত বিধিসমূহের অন্ততঃ কিয়দংশ বোধ হয় প্রাচীন আজীবিক ও শিবভাগবত সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণের অঙ্গ ছিল। শেষোক্ত সম্প্রদায় সম্বন্ধে পতঞ্জলির কটাক্ষপাতের কথা পূর্বে বলা হইয়াছে। বৃহৎসংহিতার দেবপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধীয় অধ্যায়ে লিখিত আছে যে ‘সভস্ম দ্বিজগণ’ নিজ শাস্ত্রোক্ত বিধি অনুসারে শম্ভূর মূর্তি অর্থাৎ শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করিবেন। ভট্ট উৎপল ইহার ভাষ্যকালে বলিতেছেন যে সভস্ম দ্বিজের অর্থ পাশুপত, এবং পাশুপতদিগের শাস্ত্রের নাম বাতুলতন্ত্র (বৃহৎসংহিতা, সুধাকর দ্বিবেদী সম্পাদিত সংস্করণ, ৫৯তম অধ্যায়, ঊনবিংশ শ্লোকের ব্যাখ্যা)। পণ্ডিত দ্বিবেদী উৎপলের বাতুলতন্ত্র যে ঠিক কোন শাস্ত্র সে বিষয়ে সন্দেহশীল ছিলেন। কিন্তু পাশুপতসূত্র, সর্বদর্শনসংগ্রহাদি গ্রন্থে প্রদত্ত পাশুপত বিধির যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরে দেওয়া হইল উহা হইতে মনে হয় পাশুপতসূত্র-জাতীয় গ্রন্থাদিই উৎপল নির্দিষ্ট বাতুলতন্ত্র।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৫৬-৫৭)
অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে, ‘এগুলি সুপ্রাচীন যুগের জাদুবিশ্বাসমূলক আচার আচরণের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। শ্রেণীসমাজের পটভূমিকায় এগুলির তাৎপর্য বোঝা মোটেই কঠিন নয়, যদিও এগুলির আদি তাৎপর্য স্বাভাবিকভাবেই বহু ক্ষেত্রে বিপরীতে পর্যবসিত। পাশুপত সুত্রকারের যথেষ্ট রসজ্ঞান আছে যখন তিনি বলেন উন্মত্তোমূঢ় ইত্যেবং মন্যতে ইতরে জনাঃ, অর্থাৎ সাধারণ লোক তাঁকে উন্মত্ত ও মূর্খ বলে মনে করবে। কিন্তু ব্যাপারটা উন্মত্ততা নয়, ভট্ট-উৎপল পাশুপত শাস্ত্রকে বাতুলতন্ত্র আখ্যা দিলেও।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০৩)

                পাশুপত সম্প্রদায়ের ধর্মমত ও দর্শন সম্বন্ধে যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপরে দেওয়া হলো তা থেকে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই মত রুদ্র-শিবের ঘোর রূপের সাথে অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট। এই পন্থা অতিমার্গিক অর্থাৎ এটি সহজসাধ্য সামাজিক পথ থেকে বহুলাংশে পৃথক এবং বোধ হয়, অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের অনুমানে, এই অনুরূপ পথকেই পতঞ্জলি রভসাশ্রিত উপায় বলে বর্ণনা করেছেন। তবে এটা বলা যেতে পারে যে শৈব সম্প্রদায়গণের মধ্যে পাশুপত (পরে নকুলীশ পাশুপত আখ্যায় অভিহিত) সম্প্রদায়ই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন।
পাশুপত ধর্মের এই প্রাচীনতার কারণেই পণ্ডিতদের নির্ভরযোগ্য অনুমান হলো, প্রাচীন মুদ্রা, লেখমালা ও প্রত্নতাত্ত্বিক যে শৈব-সাক্ষ্যগুলি পাওয়া যায় তা বস্তুত পাশুপত ধর্মের তৎকালীন অবস্থিতির ইতিহাসগত প্রামাণ্য। যদিও শৈবধর্মের গোড়ার দিকের ইতিহাসে লেখমালার সাক্ষ্য বড় বেশি পাওয়া যায় না, তবে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতকের মুদ্রায়, বিশেষ করে উজ্জয়িনী থেকে প্রাপ্ত মুদ্রায় দণ্ডকমণ্ডুলু যুক্ত ত্রিমুখ শিবের চিত্র বর্তমান বলে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন। তক্ষশিলার অনতিদূরে শিরকপ থেকে প্রাপ্ত একটি ব্রোঞ্জ সীলে ত্রিশূলসহ দ্বিভুজ একটি শিবমূর্তি অঙ্কিত আছে এবং তাতে শিবরক্ষিত শব্দটি উৎকীর্ণ রয়েছে বলে জানা যায়। শকরাজ মোঅস, পহ্লব রাজ গন্ডোফেরিস এবং কুষাণ রাজ বিম কদফিস, কণিষ্ক, হুবিষ্ক প্রভৃতির মুদ্রায় শিবের মনুষ্য মূর্তি খোদিত থাকার কথা ইতঃপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, বিম কদফিস পাকাপোক্তভাবেই শৈব ছিলেন। তাঁর সুবর্ণ ও তাম্রমুদ্রার যেদিকে শিব ও তাঁর বাহন নন্দীর মূর্তি অঙ্কিত সেই দিকে খরোষ্ঠী লিপিতে প্রাকৃত ভাষায় উৎকীর্ণ রয়েছে : মহরজস রজতিরজস সবলোক ইশ্বরস মহিশ্বরস বিম কদফিসস ত্রতরস।
ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্যে– ‘ঐতিহাসিক কালে ভারতের বাইরের কুষাণ রাজারা শৈব ছিলেন বলে জানা যায়। এনাদের মুদ্রায় শিবমূর্তির কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি। পরবর্তীকালে মধ্য এশিয়ায় খনন কার্যের ফলে সেখান থেকে পঞ্চমুখ বৃহভবাহন শিবের ও হরপর্বতীর মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সব প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে এইসব অঞ্চলে যে শৈবসভ্যতা বিস্তৃত হয়েছিল তা বোঝা যায়। চীন দেশের পর্বতগাত্রে বৃষভবাহন শিব, গণেশ প্রভৃতির মূর্তি খোদিত অবস্থায় পাওয়া যায়, ফলে শৈব সভ্যতা সেখানেও বিস্তৃত হয়েছিল তা বোঝা যায়। বহির্ভারতীয় অনেক রাজা শিবের উপাসক ছিলেন এবং শৈবধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শিবস্তম্ভ প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পূর্বে শৈব ছিলেন এবং নিত্য শিবোপাসনা করতেন।’– (লিঙ্গপুরাণ প্রথম খন্ড, ভূমিকা, পৃষ্ঠা-১৯-২০)
গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের অজস্র শিবমূর্তি, লিঙ্গ ও মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া যায়। লেখমালার সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে শিবভক্ত রাজা ও প্রধানেরা মাহেশ্বর, পরম-মাহেশ্বর, অত্যন্ত-মাহেশ্বর প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করতেন। –‘গুপ্ত রাজারা যদিও বৈষ্ণব ছিলেন, মহারাজ বৈন্যগুপ্ত তাঁর গুণৈঘর লিপিতে নিজেকে ভগবন্-মহাদেব-পাদানুধ্যাত বলেছেন। পশ্চিম ভারতের ষষ্ঠ শতকের জনেন্দ্র যশোধর্মা, হুন সর্দার মিহিরকুল, বাকাটক বংশীয় রাজগণ, বলভীর মৈত্রকগণ, পরবর্তী গুপ্তবংশীয় দেবগুপ্ত ও বিষ্ণুগুপ্ত, মৌখরি শাসকবর্গ প্রভৃতি অনেকেই পাশুপত মতাশ্রয়ী ছিলেন। আর্য উদিতাচার্যের মথুরা শিলালেখ থেকে জানা যায় যে ওই অঞ্চলে কুশিকের অনুগামী পাশুপতাচার্যদের ঘাঁটি ছিল। চিন্ত্র প্রশস্তি থেকে জানা যায় গার্গ্য অনুগামী পাশুপতাচার্যগণ কাথিয়াবাড় অঞ্চলে বাস করতেন।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০৪)

               প্রাচীন ভারতীয় চিন্তানায়ক ও দর্শনশাস্ত্রকারগণের মধ্যে কেউ কেউ যে পাশুপত সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন, এ বিষয়ে সাহিত্যগত প্রমাণ রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিমত হলো–
‘বৈশেষিক সূত্রের রচয়িতা ঋষি কণাদ পাশুপত ছিলেন বলিয়া মনে হয়। ইহার ভাষ্যকার প্রশস্তপাদ বলিয়াছেন যে কণাদ তাঁহার যোগ এবং আচার বিষয়ক উৎকৃষ্ট জ্ঞান দ্বারা মহেশ্বরকে তুষ্ট করিয়া ঈশ্বরের অনুগ্রহে বৈশেষিক সূত্র রচনা করিতে সমর্থ হন। উদ্যোত নামক বাৎস্যায়ন কৃত ন্যায়ভাষ্যের টীকার রচয়িতা ভারদ্বাজ তাঁহার গ্রন্থের শেষে পাশুপতাচার্য আখ্যায় অভিহিত হইয়াছেন। বরাহমিহির ও তাঁহার ভাষ্যকার উৎপলের পাশুপত সম্প্রদায় সম্বন্ধীয় মন্তব্যের কথা পূর্বে বলিয়াছি। বাণভট্ট কাদম্বরীতে রক্তবস্ত্র পরিহিত পাশুপতদিগের কথা বলিয়াছেন; তাহাদের পরিধেয় বস্ত্র লালবর্ণের ছিল বলিয়া তাহাদের হয়ত আর এক নাম ছিল রক্তপট। চীন পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁহার সি-ইউ-কি গ্রন্থে অনেকবার পাশুপতদিগের উল্লেখ করিয়াছেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে এবং ভারতের বাহিরেও যে খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে পাশুপতগণের মঠ ও মন্দির ছিল তাহা এই গ্রন্থ হইতে জানা যায়। সিন্ধুনদের অপর পারে সুদূর গন্ধার প্রদেশে ভ্রমণকালে তিনি ভীমাদেবী পর্বতের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে উক্ত পর্বতের সানুদেশে তখন দেব (শিব) মন্দির ছিল। উক্ত মন্দিরে ও তৎপার্শ্ববর্তী স্থানে “ভস্মাচ্ছাদিত তীর্থিকেরা” তপশ্চর্যা ও পূজার্চনাদি করিত। এই ভস্মাবৃত তীর্থিকগণ (বৌদ্ধমতে বিধর্মী) ও বরাহমিহির কথিত সভস্মদ্বিজগণ যে পাশুপতদিগকেই বুঝাইতেছে এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। বারাণসীতে তিনি দশসহস্র পাশুপত তীর্থিক দেখিয়াছিলেন, ইহারা মহেশ্বরের পূজা করিত, দেহে ভস্মলেপন করিত, মস্তকে জটাধারণ করিত এবং কোনও বস্ত্র পরিধান করিত না। দক্ষিণ ভারতের মলয়কূট প্রদেশের একস্থানে পর্বতশীর্ষস্থ হ্রদের পার্শ্ববর্তী একটি দেব (শিব) মন্দিরের উল্লেখ প্রসঙ্গে তিনি পাশুপত তীর্থিকের কথা বলিয়াছেন। মধ্যভারতের মালব প্রদেশে ভ্রমণকালে তিনি শত শত শিব মন্দির দেখিয়াছিলেন; মালবদেশে বহু অবৌদ্ধ ধর্মসম্প্রদায়ের লোক বাস করিতেন, এবং ইঁহাদের মধ্যে পাশুপতদিগেরই সংখ্যাধিক্য ছিল। মধ্যপ্রদেশের মহেশ্বরপুর নামক স্থানে তিনি অনেকগুলি দেবমন্দির দেখিয়াছিলেন, এগুলির বেশীর ভাগই পাশুপত সম্প্রদায়ের অধিকারে ছিল। সিন্ধু প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তে বেলুচিস্তানের পূর্ব সীমানায় লাংকল নামক দেশের বহুসংখ্যক দেবমন্দির এবং দীক্ষিত পাশুপতের কথা তিনি বলিয়াছেন। ইহার রাজধানীতে একটি বিশাল ও সুন্দর শিবমন্দির ছিল, এবং পাশুপতগণ ইহাকে অত্যন্ত সম্মানের চক্ষে দেখিতেন। বর্তমান আফগানিস্থানের দক্ষিণপূর্ব প্রান্তে বন্ন প্রদেশেও তিনি পাশুপত সম্প্রদায়ের অধিকারভুক্ত বহু শিবমন্দিরের উল্লেখ করিয়াছেন। খোটান সম্বন্ধীয় সে সময়ে প্রচলিত এক কাহিনীর বর্ণনাকালে তিনি সেই সুদূর দেশেও পাশুপতদিগের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করিয়াছেন।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১৬৪-৬৫)

                পূর্ব ভারতে পাশুপত সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি সম্পর্কে হিউয়েন সাং বিশেষ কিছু বলেননি। কিন্তু উড়িষ্যায় পাশুপত ধর্ম যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, একাম্রক্ষেত্র ভুবনেশ্বরে মধ্যযুগের বহু শিবমন্দিরের উপস্থিতি থেকেই ধারণা পাওয়া যায়। রাজারাণী, মুক্তেশ্বর, শিশিরেশ্বর, প্রভৃতি ভুবনেশ্বরের শিবমন্দিরগুলির গাত্রে উৎকীর্ণ লকুলীশ ও তাঁর চারজন প্রধান শিষ্যের মূর্তি দেখা যায়। উড়িষ্যার দক্ষিণ সীমানায় মুখলিঙ্গম গ্রামের সোমেশ্বর মন্দিরগাত্রেও অনুরূপ মূর্তি খোদিত আছে। অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথের মতে, এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উড়িষ্যা প্রদেশে লকুলীশ পাশুপত সম্প্রদায়ের সমধিক বিস্তার সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য প্রদান করে।
বাঙলায় লকুলীশের মূর্তি বিরল। তবে বর্ধমান জেলার বরাকরের নিকটবর্তী বেগুনিয়া গ্রামে আদি মধ্যযুগের একটি শিব মন্দিরের শিখরে সম্মুখস্থ মধ্যভাগে যোগাসনে উপবিষ্ট উর্ধ্বলিঙ্গ দন্ডধারী (লকুলীশের আরেক নাম লকুটপাণীশ অর্থাৎ যিনি লকুট বা লগুড় অর্থাৎ দণ্ড হাতে ধারণ করেন) লকুলীশের একটি ক্ষুদ্র মূর্তি খোদিত আছে, যার প্রতি জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কলকাতার দক্ষিণ উপকণ্ঠে কালীঘাট মন্দিরের দেবীর ভৈরবের নাম লকুলীশ। এই দেবস্থান খুব প্রাচীন না হলেও তার সাথে শক্তিপীঠের অন্যতম কাহিনী জড়িত। কালীঘাট মাহাত্ম্যে বর্ণিত আছে যে, দেবীর অঙ্গুষ্ঠ এখানে পতিত হয়, এবং দেবীর এই অঙ্গের প্রহরায় থাকেন লকুলীশ ভৈরব। কালীমন্দিরের অনতিদূরে একটি শিবমন্দির আছে, তার অভ্যন্তরস্থ শিবলিঙ্গ আজও লকুলীশ ভৈরবের প্রতীক হিসেবে পূজা পেয়ে আসছে।
–‘হিউয়েন সাং দক্ষিণ ভারতের মলয়কূট প্রদেশে ভ্রমণ কালে পাশুপত তীর্থিকদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কর্ণাটকের সির তালুকের অন্তর্গত হেমাবতী গ্রামে প্রাপ্ত ৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দের একটি লেখ থেকে জানা যায় যে ওই স্থানে লকুলীশ মুনিনাথ চিল্লুকরূপে জন্মগ্রহণ করেন, এবং তিনি লকুলীশ মত পুনরুজ্জীবিত করেন। ১১০৩ খ্রীষ্টাব্দে কর্ণাটক থেকে প্রাপ্ত অপর একটি লেখ থেকে জানা যায় যে ন্যায়-বৈশেষিক দার্শনিক সোমেশ্বর সূরি লকুলীশ পাশুপত মতবাদের একজন উৎসাহী প্রচারক ছিলেন। চালুকা, রাষ্ট্রকূট, চোল প্রভৃতি বংশীয় নৃপতিরা এবং সে দেশের বিত্তশালী ব্যক্তিগণ অনেক শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’– (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০৪)

(চলমান…)

[পূর্বের পোস্ট : শৈব সম্প্রদায়] [*] [পরের পোস্ট : কাপালিক, কালামুখ, মত্তময়ূর সম্প্রদায়]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 439,383 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

সেপ্টেম্বর 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« মার্চ    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: