h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৮ : পুরাণ-শাস্ত্রে শিব ও লিঙ্গ

Posted on: 13/03/2018


Lord Shiva wallpapers

শিব ও লিঙ্গ-০৮ : পুরাণ-শাস্ত্রে শিব ও লিঙ্গ
রণদীপম বসু

আমরা দেখতে পাই, পৌরাণিক যুগে পরম শিব ও পরব্রহ্মতত্ত্ব প্রচারের পর থেকে লিঙ্গপূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে। পণ্ডিতদের মতে এই সময়টা গুপ্ত যুগ। কারণ পরবর্তী কালের মন্দিরগুলিতে মূলতঃ লিঙ্গমূর্তিই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, যদিও কয়েকটি ক্ষেত্রে মানবাকার মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিষয়গত ধারণার লক্ষ্যে অধ্যায়ের শুরুতেই শিব ও লিঙ্গ বিষয়ে এ দুয়ের অদ্বয়ত্ব, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের জন্য শৈব মতানুসারী পুরাণগুলিতে উপস্থাপিত লিঙ্গের পূজা ও তার বৈচিত্র্য ও প্রকারভেদ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে বিধায় এখানে সেগুলোর পুনরুক্তির দরকার নেই। তবে এটা জানা যায় যে,–
‘কেবল ভারতবর্ষেই নয়, ভারতের সীমা ছাড়িয়ে কম্বোজ, চম্পা প্রভৃতি রাজ্যেও লিঙ্গ পূজার প্রচলন ঘটেছিল। নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী তাঁর ‘South Indian Influences in the Far East’ গ্রন্থে কম্বোজ ও চম্পায় লিঙ্গরূপী শিবের উপাসনার কথা বলেছেন। ঐতিহাসিক ইলিয়টের মতে প্রায় ৫৫০ খৃষ্টাব্দের প্রথমার্ধে কম্বোডিয়ায় লিঙ্গপূজার প্রচলন ছিল। কম্বোডিয়া অউথিয়া, লোপচুরি প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বৌদ্ধ দেবতাদের সঙ্গে সঙ্গে রাম, বিষ্ণু, শিব, গণেশ, স্কন্দ, উমা, লক্ষ্মী প্রভৃতি ব্রাহ্মণ্য দেবতার মূর্তিও আবিষ্কৃত হয়েছে। থাইল্যান্ড অঞ্চলে প্রাপ্ত শিবের ত্রিশূল, ঐ অঞ্চলে শৈব ধর্মের প্রসারের কথাই বলে।’– (ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়/ ভূমিকা, লিঙ্গ পুরাণ, পৃষ্ঠা-১১)

             ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি যে, শৈব তন্ত্র ও পুরাণের অনুযায়ী লিঙ্গার্চক সম্প্রদায়ের বিশ্বাস হলো, শিবশক্তি লিঙ্গেতে নিত্য অধিষ্ঠান করেন এবং যে পরম সত্তার থেকে জগতের উৎপত্তি হয় এবং যাঁর মধ্যে জগৎ লীন হয় সেই পরম কারণই লিঙ্গ।
লিঙ্গের আবির্ভাব সম্পর্কে লিঙ্গপুরাণের সপ্তদশ অধ্যায়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের বিবাদাত্মক একটি আখ্যান কথিত হয়েছে। সেই কাহিনীতে বলা হয়েছে– শ্রেষ্ঠত্বের অধিকার নিয়ে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে বিরোধ থেকে ক্রমশঃ ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বাধলো। তখন তাঁদের মোহ দূর করার জন্য শিব অনল স্তম্ভ রূপে তাঁদের দুজনের মাঝখানে আবির্ভূত হলেন–

প্রলয়ার্ণবমধ্যে তু রজসা বদ্ধবৈরয়োঃ।
এতস্মিন্নন্তরে লিঙ্গমভবচ্চাবয়োঃ সুরাঃ।।
বিবাদশমনার্থঞ্চ প্রবোধার্থঞ্চ ভাস্বরম্ ।
জ্বালামালাসহস্রাভং কালনলশৎপোমম্ ।। (লিঙ্গপুরাণ সপ্তদশ অধ্যায়)
অর্থাৎ : প্রলয়-সমুদ্রের মধ্যে রজোগুণ-প্রভাবে আমাতে (অর্থাৎ ব্রহ্মাতে) ও বিষ্ণুতে বিরোধ হইতেছিল, এমন সময়ে সেই বিরোধ-ভঞ্জন ও প্রবোধ-প্রদান জন্য শত-সংখ্যক কালাগ্নি স্বরূপ ও সহস্র অগ্নিশিখা তুল্য দীপ্তিমান্ লিঙ্গ উৎপন্ন হইল।

প্রজাপতি ব্রহ্মার বয়ানে লিঙ্গপুরাণের বাকি উদ্ধতাংশটি এরকম–

‘আমরা দুজনেই তখন রজোগুণে আবিষ্ট হবার ফলে প্রলয় সমুদ্রের মধ্যে লোমহর্ষক এক মহাযুদ্ধ আমরা আরম্ভ করলাম। আমাদের পারস্পরিক বিবাদ বন্ধ করে প্রবোধের জন্য সেই সময় উভয়ের সম্মুখে আবির্ভূত হল ভাস্বর লিঙ্গ। এই লিঙ্গের আভা সহস্র শিখায় সমুজ্জ্বল অগ্নির মতই ছিল ভয়ঙ্কর। আদি মধ্য ও অন্তহীন, ক্ষয় ও বৃদ্ধিশূন্য, অনির্দেশ্য, অব্যক্ত ও বিশ্ববীজস্বরূপ সেই লিঙ্গের উজ্জ্বল সহস্র শিখা দেখে মোহিত হয়ে ভগবান বিষ্ণু আমাকে বললেন– এই অগ্নির কিভাবে উৎপত্তি হল তা আমাদের পরীক্ষা করা দরকার। আমি এই অগ্নি স্তম্ভের নীচের দিকে যাচ্ছি, তুমি ওপরের দিকে যাও। সেই সময়েই ভগবান হরি তাঁর বরাহরূপ প্রকাশ করেছিলেন। আমিও আকাশে উড়ে যাবার জন্য তখন হংসরূপ গ্রহণ করলাম।… লিঙ্গের স্বরূপ জানার জন্য শুভ্রবর্ণ হংসরূপ ধরে আগুনের মত রক্তচক্ষু ও সুন্দর পাখা যুক্ত হয়ে আমি বায়ুর মত বেগে ওপরে উড়তে লাগলাম। নারায়ণও দশযোজন বিস্তৃত শতযোজন আয়ত মেরুপর্বতের মত নীল কাজলের মত বিশাল বরাহ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। তখন তাঁর তীক্ষ্ণ ধারাল দাঁতগুলো সূর্য্যরে মত চক্চক্ করছিল, নাসিকা ঘোর গর্জন করছিল এবং হাত-পা গুলি বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী করছিল। এইভাবে তিনি পাতালে প্রবেশ করলেন। তৎসত্ত্বেও শূকর রূপ ধারণকারী বিষ্ণু লিঙ্গের মূল কোথায় তা সামান্য পরিমাণেও বুঝতে পারলেন না। এদিকে আমিও অনন্ত আকাশে উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, অথচ লিঙ্গের অন্ত কোথায় তা বুঝতে পারলাম না। অবশেষে অহঙ্কার-বশতঃ নীচের দিকে নেমে এলাম। দেবতাদের উৎপত্তির বীজস্বরূপ বিষ্ণুও পরিশ্রান্ত হয়ে ভয়-কম্পিতনেত্রে শীঘ্রই মাটির তলা থেকে উপরে উঠে এলেন। মায়ার দ্বারা মুগ্ধ বিষ্ণু আমার সঙ্গে মিলিত হবার পর আমরা উদ্বিগ্ন মনে ভগবান শম্ভুর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম এবং তাঁকে প্রণাম করলাম।’– (লিঙ্গ পুরাণ পূর্বভাগ, সপ্তদর্শ অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৩১-২)

             শিবপুরাণের বিদ্যেশ্বর সংহিতা (৩/২৭-৬১, ৫/১১, ৭/১৯-২০ ইত্যাদি) অংশের কাহিনীতে এবং লিঙ্গপুরাণ ইত্যাদির কাহিনীতেও শিবের স্তম্ভমূর্তির কথা আছে। তাই অনেক পণ্ডিত এই স্তম্ভ মূর্তিকেই শিবের আদিরূপ বলে মনে করেন। তাছাড়া আখ্যানগুলির মৌলিক ঐক্য থাকলেও ক্ষেত্র বিশেষে বিন্যাসগত পার্থক্য আছে। তবে কোনও আখ্যানেই কিন্তু লিঙ্গকে জননেন্দ্রিয়ের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয় না। অতএব সাধারণ ভাবে পৌরাণিক ধারায় লিঙ্গোপাসনার অন্য একটা দিক আছে।
পুরাণ আখ্যান অনুযায়ী আদ্যান্তহীন সেই স্তম্ভের শেষ ব্রহ্মা বিষ্ণু খুঁজে পেলেন না। শিবপুরাণে শিব তাই ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকে বলেছেন–

অনাদ্যন্তমিদং স্তম্ভমণুমাত্রং ভবিষ্যতি।
দর্শনার্থং হি জগতাং পূজনার্থং হি পুত্রকৌ।।
ভোগাবহমিদং লিঙ্গং ভুক্তিমুক্ত্যেকসাধনম্ ।
দর্শনস্পর্শনধ্যানাজ্জন্তূনাং জন্মমোচনম্ ।। (শিবপুরাণ)
অর্থাৎ : জগৎবাসীর দর্শন ও পূজনের জন্য এই আদি ও অন্তহীন স্তম্ভ ক্ষুদ্ররূপ ধারণ করবে। ভোগাবহ এই লিঙ্গ একাধারে ভুক্ত ও মুক্তির সাধন। এই লিঙ্গের দর্শন, স্পর্শন ও ধ্যানের দ্বারা জীবের জন্ম বন্ধ ঘুচে যায়।

            এ কারণে– ‘বৈদিক যূপ উপাসনা থেকেই শিবলিঙ্গের উৎপত্তির কথা অনেকে বলতে চেয়েছেন। শূলগব যজ্ঞের স্মারক হিসাবে যূপের পাশে উৎকীর্ণ বৃষমূর্তি যৌধেয়দের মুদ্রায় আবিষ্কৃত হয়েছে। আনন্দকামারস্বামী স্তম্ভপূজন থেকেই শিবলিঙ্গের উৎপত্তির কথা বলেছেন। কুষাণযুগের শেষ দিককার একটি চতুর্ভুজ দণ্ডায়মান শিবমূর্ত্তির গায়ে স্তম্ভের মত প্রতীক দেখা যায়।’
‘খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকের মুদ্রার থেকে একথা যেমন একদল প্রমাণ করতে চান, তেমনি ভারতীয় ও বিদেশী শাসকদের মুদ্রার থেকে শিবপূজার আদি উৎসকে একদল আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। কারো কারো মুদ্রায় বৃষ ও যূপ অঙ্কিত দেখে তাদেরই শিব ও শিবলাঞ্ছন হিসাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন অনেকে।’
‘বৌদ্ধদের মধ্যে প্রচলিত স্তূপ পূজা থেকে লিঙ্গ পূজার উদ্ভব ঘটেছে বলে একদল পণ্ডিত মনে করেন। আপাত ভাবে বৌদ্ধস্তূপের সঙ্গে শিবলিঙ্গের আকারগত সাদৃশ্য অস্বীকার করা যায় না। বৌদ্ধ যুগেই সাচীস্তূপ প্রভৃতির এবং পরবর্তী কালের সারনাথ, বুদ্ধগয়া প্রভৃতি স্থানে স্তূপ পূজার প্রচলন ছিল এবং এখনও আছে। লিঙ্গকে যেভাবে অক্ষত, চন্দন, পুষ্প, ধূপ, দীপ প্রভৃতি দ্বারা অর্চনা করা হয় বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতাতেও সেই ভাবেই স্তূপ অর্চনার বিধান পরিলক্ষিত হয়। সাচীস্তূপ অবশ্য বুদ্ধকায়স্বরূপ বৌদ্ধ স্মৃতি মন্দিরেরই নিদর্শন। মনে রাখতে হবে যে শিবলিঙ্গও কিন্তু সেই অর্থে শিবপ্রতীক। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে প্রাপ্ত ফলকগুলি যদি সত্য সত্যই শিবলিঙ্গ হয়ে থাকে, তাহলে কিন্তু বৌদ্ধস্তূপ অর্চনা থেকে লিঙ্গ পূজার প্রচলন ঘটেছিল– একথা বলা যাবে না, কারণ বৌদ্ধপর্বের বহু পূর্ব থেকেই সেক্ষেত্রে লিঙ্গপূজার অস্তিত্ব স্বীকার করতে হবে।’- (ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

          এবং লিঙ্গপূজার উৎপত্তি যে বৌদ্ধপর্বের বহু পূর্বেই ঘটেছে ইতঃপূর্বের আলোচনা থেকে আমরা এই ধারণা ইতোমধ্যেই পেয়েছি। আর পুরাণের রচনাকাল মূলত গুপ্তযুগেই এবং লিঙ্গ পুরাণের রচনাকাল মোটামুটি ৭০০ খ্রিস্টাব্দ বলে ধরা হয়। তবুও ভারতীয় পরম্পরা অনুসারে পুরাণগুলি বেদেরই প্রবর্ধিত রূপ। ড. উদয়চন্দ্রের মতে,– ‘তাই অনেক ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে যে– ‘পুরাণম্ বেদসম্মতম্’। পুরাণগুলি দুভাবে বৈদিক তথ্যকে ব্যবহার করেছে– (১) কোন বৈদিক আখ্যানকে বিস্তৃততর রূপ দিয়ে নিজের মত করে সাজিয়ে নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেমন উমা হৈমবতীর কেনোপনিষদযুক্ত আখ্যান লিঙ্গ পুরাণে ১/৫৩/৫৫-তে আমরা পেয়েছি। (২) আবার বৈদিক মন্ত্রগুলিকে বিভিন্ন পূজা পদ্ধতির সঙ্গে পুরাণগুলি যুক্ত করেছে। লিঙ্গপুরাণে উল্লিখিত মন্ত্রগুলি আমরা নিম্নলিখিত বৈদিক গ্রন্থে পেয়ে থাকি– ঋগ্বেদের মূল অংশ, ঋগ্বেদের খিল অংশ, সামবেদ, অথর্ববেদ, মাধ্যন্দিন বাজসনেয়ী সংহিতা, বাজসনেয়ীসংহিতা, তৈত্তিরীয়সংহিতা, মৈত্রায়নী সংহিতা, কাঠক সংহিতা, তৈত্তিরীয় আরণ্যক, মহানারায়ণ উপনিষদ্, নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদ্, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্, আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র, হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র ইত্যাদি। মন্ত্রগুলিকে কোথাও কোথাও বিশেষ সংজ্ঞার দ্বারা বিধান করা হয়েছে, কখনো আদি অংশ উদ্ধৃত করে বিধান দেওয়া হয়েছে আবার কখনো বা মন্ত্রমধ্যস্থ অংশ তুলে হয়তো পর পর কয়েকটি মন্ত্র প্রয়োগ করতে হয়েছে। এখানে যজুর্বেদের তথা কৃষ্ণযজুর প্রভাব বেশী বলেই মনে হয়েছে।’
‘বিভিন্ন সময়েই লিঙ্গপুরাণে রুদ্রাধ্যায়ের মন্ত্র উদ্ধৃত হয়েছে এবং শতরুদ্রীয় ইত্যাদির কথাও প্রায়ই বলা হয়েছে। ‘ত্র্যম্বকম্ যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্ । উর্বারুকমিব বন্ধনাত্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাত্ ।’ ইত্যাদি বৈদিক মন্ত্রকে মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র বলা হয়ে থাকে এবং (লিঙ্গপুরাণের) উত্তর ভাগের ৫৪ অধ্যায়ে একেই মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র বলা হয়েছে। তন্ত্রের যামল ধারায় কিন্তু এই মন্ত্রকে মৃত্যুঞ্জয় বলা হয়নি। তাদের মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র আরো ছোট এবং মন্ত্রটি তান্ত্রিকমন্ত্র। বর্তমানে অনেক পুরোহিতকে (বিশেষতঃ বাংলার বাইরেকার) লিঙ্গপুরাণোক্ত মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের সঙ্গে তন্ত্রোক্ত মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জুড়ে নিয়ে জপ করতে দেখেছি। হয়তো তন্ত্র ও বেদের মিশ্রণের ফলেই এরূপ ঘটেছে। লিঙ্গ পুরাণেও অনেক ক্ষেত্রে বৈদিক মন্ত্রটির আগে তন্ত্রোক্ত মন্ত্র পুটিত করে পাঠের বিধান পরিলক্ষিত হয়। যেমন উত্তর ভাগের ৫১ অধ্যায়ে শত্রুজয়ের জন্য ব্যবহৃত গায়ত্রী মন্ত্রের পূর্বে ‘ওঁ ফট্ জহি হুং ফট্ হিন্দি ভিন্দি জহি হন হন স্বাহা’ ইত্যাদি যুক্ত করতে বলা হয়েছে। মন্ত্রের অবয়ব শাক্তদের বগলামুখী মন্ত্রের কথাই মনে করায়। এভাবেই প্রত্যেকটি মন্ত্রের আলোচনা হলে একটা নতুন দিকের আভাস পাওয়া যাবে বলেই মনে হয়। বৈদিক এবং ধর্মশাস্ত্রধৃত মন্ত্রগুলি সাধারণ ভাবে লিঙ্গপুরাণের পূর্বভাগে এসেছে এবং তন্ত্রোক্ত মন্ত্রের প্রাধান্য উত্তর ভাগে এসেছে। পাশুপতাদি শৈবধারাকে কেউ কেউ বৈদিক ধারা বলেছেন আবার কেউ কেউ অবৈদিক ধারা বলেছেন। সমন্বয়ধর্মী ব্রাহ্মণ্য রচনা পুরাণে যখন এসব ধারা বিধৃত হয়েছে, তখন তার উপর বৈদিক শান্তিবারির প্রলেপ অবশ্যই পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই লিঙ্গপুরাণে খাঁটি অবৈদিক শৈব ধারার পূর্ণ পরিচয় অবিকৃত ভাবে বোধ হয় পাওয়া যাবে না।’– (ভূমিকা, লিঙ্গ পুরাণ)

         কিন্তু এখানে বলা বোধ করি বাহুল্য হবে না যে, কোন বৈদিক আখ্যানকে বিস্তৃততর রূপ দিয়ে নিজের মত করে সাজানোর যে প্রয়াস পুরাণ সাহিত্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তা কোন্ প্রেক্ষিতে কিংবা কেন এমনটা হতে হলো সে বিষয়ে কিছুটা প্রাক্-ধারণা না থাকলে পুরাণ সাহিত্যের উৎস বা পুরাণ রচনার কার্যকারণ ও গুরুত্ব যথাযথ অনুধাবন করা যাবে না। তাই অতি সংক্ষেপে বিষয়টার কিঞ্চিৎ বিবৃতি দেয়া যেতে পারে।

          এখন পর্যন্ত যেটুকু জানা যায় সেই মতে, বৈদিক আর্যরা ভারতবর্ষের পশ্চিমদিক থেকে ক্রমশ পূর্বদিকে সরে এসে তাদের আর্যাবর্তের সীমারেখাকে ক্রমপ্রসারিত করেছে। কিন্তু শুরুতে তারা একই সাথে উত্তর-পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকেও প্রসারিত হতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন তো সেই দেশ একেবারে জনশূন্য ছিল না, ফলে সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রবল প্রতিরোধের সামনে আর্যদের পরাজয় স্বীকার করতে হয়। সে যাত্রায় তাদের দাক্ষিণাত্য ও কাশ্মীর উপত্যকা অভিযান ব্যর্থ হয়। আর এই পরাজয়ের প্রত্যাঘাতে আর্য-সমাজজীবনে নিশ্চয়ই গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়। আমরা প্রাচীন ঋগ্বেদ-সংহিতায় দেখি বলা হচ্ছে-

বি জানীহ্যার্য্যান্যে চ দস্যবো বর্হিষ্মতে রন্ধয়া শাসদব্রতান্ ।
শাকী ভব যজমানস্য চোদিতা বিশ্বেত্তাতে সধমাদেষু চাকন।।- (ঋগ্বেদ-১/৫১/৮)
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! তুমি কারা আর্য এবং কারা দস্যু তা বিশেষরূপে অবগত হও। ঐ ব্রত বা যজ্ঞবিরোধীদের নিগ্রহ করে যজ্ঞানুষ্ঠাতা যজমানের অধীন কর। তুমি শক্তিশালী, অতএব যজ্ঞ-সম্পাদকদের সহায় হও। আমি তোমার হর্ষজনক যজ্ঞে তোমার সেই কর্ম প্রশংসা করতে ইচ্ছা করি।

উল্লেখ্য, মনুসংহিতার রচনাকালে আর্যাবর্তের যে সীমানা চিহ্নিত করা হয় তা হলো–

আসমুদ্রাত্তু বৈ পূর্ব্বদাসমুদ্রাত্তু পশ্চিমাৎ।
তয়োরেবান্তরং গির্য্যােরার্য্যাবর্ত্তং বিদুর্বুধাঃ।।- (মনুসংহিতা-২/২২)
অর্থাৎ : উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে বিন্ধ্যাচল এবং পূর্বে পূর্বসমুদ্র ও পশ্চিমে পশ্চিমসমুদ্র, এই চতুঃসীমাবদ্ধ ভূভাগের নাম পণ্ডিতেরা আর্যাবর্ত বলিয়া জানেন।

            অমরকোষেও লিখিত আছে যে, বিন্ধ্য ও হিমালয় পর্বতের মধ্যগত দেশ আর্য্যাবর্ত্ত অর্থাৎ আর্য্যদিগের স্থান ছিল।’– আর্য্যাবর্ত্তঃ পুণ্যভূমির্মধ্যং বিন্ধ্যহিমাগয়োঃ।- (অমরকোষ)
আর এই আর্যাবর্তে কারা বসবাস করবে, তাও মনুসংহিতায় বলে দেয়া হয়েছে এভাবে–

এতান্ দ্বিজাতয়ো দেশান্ সংশ্রয়েরন্ প্রযত্নতঃ।
শূদ্রস্তু যস্মিন্ কস্মিন্ বা নিবসেৎ বৃত্তিকর্ষিতঃ।।- (মনুসংহিতা-২/২৪)
অর্থাৎ : দ্বিজাতি অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যেরা এই সকল দেশে বসতি করিবেন, শূদ্রেরা ব্যবসায় অনুরোধে যথা তথা বাস করিতে পারে।

           তার মানে কি এই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যেরাই আর্যাবর্তের অধিবাসী আর্য? আর শূদ্রেরা অনার্য? অন্তত মনুবচন রচনাকালে যে তা-ই ছিল এটা অস্বীকারের উপায় নেই। কেননা, অথর্ববেদ-সংহিতায় সমগ্র লোককে দুইভাবে ভাগ করার নির্দেশনাই দেয়া আছে এভাবে–

তয়াহং সর্ব্বং পশ্যামি যশ্চ শূদ্র উতার্য্যঃ।- (অথর্ববেদ-৪/১২০/৪)
অর্থাৎ : সমগ্র লোক শূদ্র ও আর্য এই দুইভাগে বিভক্ত।

শতপথ ব্রাহ্মণে ও কাত্যায়ন-প্রণীত শ্রৌতসূত্রেও এই বক্তব্যে প্রতিধ্বনি করে বলা হয়েছে–
শূদ্রার্য্যৗে চর্ম্মণি পরিমণ্ডলে ব্যযচ্ছেতে।- (কাত্যায়ন-শ্রৌতসূত্র-১০/৩/৭)
এবং এই কাত্যায়নকৃত সূত্রের অর্থে ভাষ্যকার বলেন–

শূদ্রশ্চতুর্থো বর্ণঃ আর্য্যস্ত্রৈবর্ণিকঃ।
অর্থাৎ : আর্য্য শব্দের অর্থ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন বর্ণ; চতুর্থ বর্ণের নাম শূদ্র।

         মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের মতে,– ‘বোধ হয়, শূদ্রবর্ণ আর্য্যবংশীয় নহে; আর্য্যরো ভারতবর্ষে আসিয়া শূদ্রনামক অনার্য্য-জাতি-বিশেষকে আপনাদের সমাজ-ভুক্ত করিয়া লন।’
আর এজন্যেই বোধকরি বর্ণবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজাধিকারী মনুসংহিতায় আর্য ও অনার্য এই উভয় কুলের পরস্পর বিভিন্নতা সুস্পষ্ট করে বিধান দেয়া হয়েছে–

জাতো নার্য্যামনার্য্যারামার্য্যাদার্য্যাে ভবেৎগুণৈঃ।
জাতোহপ্যনার্য্যাদার্য্যায়ামনার্য্য ইতি নিশ্চয়ঃ।।- (মনুসংহিতা-১০/৬৭)
অর্থাৎ : আর্য্য পুরুষের ঔরসে ও অনার্য্যা নারীর গর্ভে যে সন্তান জন্মে, সে সন্তান শাস্ত্রোক্ত-গুণযুক্ত হইলে আর্য্যত্ব প্রাপ্ত হয়। আর অনার্য্য পুরুষের ঔরসে আর্য্যা স্ত্রীর গর্ভে যে পুত্র জন্মে, সে নিশ্চয়ই অনার্য্য।

 

             আর্য-সমাজজীবনে গভীর সংকটের অন্যান্য উপাদান হিসেবে আমরা আরও জানতে পারি যে, এই আর্যাবর্তে প্রথম থেকেই আর্যদের মধ্যেও সকলেই কিন্তু বৈদিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ছিল না। এ ছাড়া আরও ছিল বিভিন্ন সময়ে বৈদিক আর্যসমাজ থেকে বহিষ্কৃত কিছু মানুষ, যাদের ‘বাহীক’ বলা হতো। এইসব দলছুটেরা সমাজে ভবঘুরের মতো জীবনযাপন করতো এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে সর্বস্তরের মানুষের সাথে যথেচ্ছভাবে মেলামেশা করে এক অবৈদিক জনগোষ্ঠীর সূচনা করে। এইসব বেদবহির্ভূত জনগোষ্ঠীতে আর্য-অনার্য সকলেরই স্থান ছিল। এদেরকে সমগ্রভাবে বলা হতো– ‘ব্রাত্যজন’। সংহিতা ও ব্রাহ্মণের নৈষ্ঠিক ক্রিয়াকলাপকে প্রথমেই তারা অস্বীকার করে উপনিষদের ব্রহ্মতত্ত্বের জ্ঞানকাণ্ডকে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে জনমানসে এক অদ্ভূত মোহের সৃষ্টি করেছিল। ফলে বহু সাধারণ মানুষ এদের প্রতি আকৃষ্ট হয়– যা এক সময়ে বৈদিক সমাজের এক সংকট হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়াও বৈদিক যাগযজ্ঞ ও ক্রিয়াকর্মগুলি ক্রমশ বহু বিস্তৃত হয়ে অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রচুর বলিদানের প্রথাও প্রচলিত ছিল। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজজীবনে চাষাবাদের উৎকর্ষের সাথে সাথে কৃষির জন্য প্রয়োজন হলো প্রচুর গো-ধনের। ফলে যাগযজ্ঞের নামে বিপুল গোধনের অপচয়ের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগোষ্ঠী প্রতিবাদী হতে শুরু করলে বৈদিক সমাজ সংগঠকদের কাছে এটাও এক নতুন সামাজিক সংকটের সৃষ্টি করে।
আবার পাপপুণ্য, কর্মফল ও জন্মান্তরবাদ ইত্যাদি বিষয় নিয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। কারণ এ সময়ে লোকায়ত চার্বাক দর্শনের চমৎকারিত্বে বহু লোক আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ছিলেন জাবালি ও অন্যান্যরা। তাঁদের দর্শনের কথা ও যুক্তিগুলোর চমৎকারিত্বে রয়েছে তাৎক্ষণিক প্রভাব ও মোহগ্রস্ততা। সমাজের কিছু ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উত্থাপিত তাঁদের যুক্তি ও তীক্ষ্ণ সমালোচনায় বৈদিক জনমানসে সৃষ্ট বিভ্রান্তি সামাজিক সংকট ও অস্থিরতা বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে ওঠে।
এর সাথে যুক্ত হলো বহুত্ববাদী ও নিরীশ্বরবাদী কপিলের সাংখ্য দর্শনের সুস্পষ্ট বক্তব্য– প্রমাণের অভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করা গেল না এবং তাবৎ স্থাবর ও জঙ্গম (জীব ও জড় জগৎ) পঞ্চভূতের থেকে সৃষ্ট হয়ে আবার পঞ্চভূতেই লীন হয়ে যায়। তা হলে আত্মা কী? আর তার অবস্থানই বা কোথায়? আর এই তত্ত্বের নিরীখে পুনর্জন্মবাদ টেকে কী করে? কপিলের এই লোকায়তমুখী সাংখ্যদর্শন তখন জনসমাজে বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফলে বৈদিক সমাজের বাঁধনও আলগা হয়ে যায়। এই গভীর সংকট কাটিয়ে সাধারণ মানুষকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় সমাজ সংগঠকদের বহু পরিশ্রম করে বহু দার্শনিকতার অবতারণা করতে হয়। এতে করে বৈদিক সাহিত্য ও সংস্কৃতিও নতুন নতুন সংকটের মোকাবিলায় ক্রমসমৃদ্ধ হতে থাকে।

           এমনিতেই সাধারণ মানুষ দ্বন্দ্বদীর্ণ শ্রেণিভিত্তিক সমাজে খুব একটা সুখে-শান্তিতে ছিল না। তার উপর প্রায়ই যুদ্ধ বিগ্রহ ও নানা অশান্তি লেগেই থাকতো। সে তুলনায় অপরদিকে অনার্য জীবনযাত্রা ছিল গোষ্ঠীবদ্ধ সরল ও অনাড়ম্বর। ফলে বহু মানুষ এই সরল অনাড়ম্বর গোষ্ঠীবদ্ধ সুখী জীবনযাত্রার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকলো। এতেও সমাজে আরেকধরনের সংকটের সৃষ্টি হতে থাকে। এইসব সামাজিক সংকটকে কাটিয়ে ওঠবার উপায়ও ভেবেচিন্তে বের করতে হয়।
এদিকে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবকালীন সময় থেকে সনাতনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেখা দেয় প্রবল প্রতিবাদী আন্দোলন। সে যুগে অনেকগুলি প্রতিবাদী সংগঠন সনাতন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়। এদের মধ্যে জৈন, বৌদ্ধ ও আজীবিকেরাই প্রধান। এদের সঙ্গে ছিল বেদ-বহির্ভূত আর্যরা। তারাও সংখ্যায় নিতান্ত কম ছিল না। এইসব আঘাতের মুখে সনাতনী ব্যবস্থা অত্যন্ত সংকটের মুখে পড়ে গেলো। দলে দলে লোক ওইসব ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সনাতন ধর্ম ত্যাগ করছে। এই অবস্থাকে সামাল দেওয়ার জন্যে তখন সনাতন ধর্মে যেসব বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলো, জানা যায়, তার মধ্যে একটা হলো– ব্রাত্যস্তোম বা শুদ্ধি যজ্ঞ। এই যজ্ঞে সকল ব্রাত্যজন হবিপ্রদান করে, সনাতন ধর্মে দীক্ষিত হয়ে, সকলের সাথে সমাসনের অধিকার পায়।

           আমরা আগেই দেখেছি যে, আর্য সমাজে প্রায় গোড়া থেকেই অনার্য রক্তের সংমিশ্রণ হয়েছিল। তখন থেকেই তাঁরা প্রাগার্য সমাজের অনুকরণে শ্রেণিবিভাগ, গোত্রবিভাগ ইত্যাদি করে বলে মনে করা হয়। তবে তখনও তাঁদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল না। আর তাও যেটুকুও বা ছিল তাতে লোকে সচ্ছন্দে এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে উন্নীত হতে পারতো। তাই দেখা যায় জাবালি, সত্যকাম, মহীদাস ঐতরেয়-কে নিজেদের গোষ্ঠীভুক্ত করে নেওয়া হয় তাঁদের গুণ কর্মের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে।–
‘এই সময়ে সমাজে একজন শূদ্রও ব্রাহ্মণ হতে পারত (কপিল স্মৃতি ৮৯৬ ও ৮৯৭ শ্লোক দ্রষ্টব্য)। ব্রাহ্মণের সর্বশ্রেষ্ঠ গায়ত্রী মন্ত্রের রচয়িতা ক্ষত্রিয় কুলজাত বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণ্যত্ব লাভ করেছিলেন। অর্থাৎ সে যুগে ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ্যত্ব একান্তই জন্মার্জিত বা রক্তের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল ছিল না। যথাযথ সংস্কারের উপরেই তা একান্ত ভাবে নির্ভরশীল ছিল। এ থেকে বোঝা যায় যে, সে যুগে আর্য সমাজজীবনে সামাজিক সচলতা বা সোশ্যাল মোবিলিটি ছিল।’
‘এ ছাড়াও অনার্যদের প্রধান দেবতা ছিলেন ‘আদি শিব’, যা পরবর্তীকালে সমগ্র ব্রাত্যজনের গণদেবতা। ঋগ্বেদ সংহিতাতে তিনি বৈদিক রুদ্রের সমীকরণ হয়ে খুবই অপ্রধান দেবতারূপে স্তুত ছিলেন। সেই দেবতাকে সনাতনী ধর্মে প্রাধান্য দিয়ে সামনের সারিতে নিয়ে আসা হল– আমজনতাকে আকৃষ্ট করবার একমাত্র আকুল অবলম্বন হিসাবে।— বৈদিক সংস্কৃতির মহিমা মণ্ডিত হয়ে রুদ্রদেব সনাতনী ধর্মকে রক্ষা করবার একমাত্র উপায় হিসাবে যজুর্বেদের দুই শাখাতেই বিপুলভাবে স্তুত হয়ে দার্শনিকতার চরমোৎকর্ষতা লাভ করে পরমাত্মায় পর্যবসিত হলেন। তাই রুদ্রাধ্যায়ের প্রতিটা মন্ত্রেই যে কবিত্ব শক্তি ও দার্শনিকতার পরাকাষ্ঠা দেখা যায় তা আজও বৈদিক সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।’
‘কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা করা গেল না। যে অতুলনীয় কবিত্বশক্তি ও অসাধারণ দার্শনিকতা দিয়ে ‘গণদেবতাকে’ বন্দনা করা হল, তা সাধারণ মানুষের বোধ-বুদ্ধির জগতের অনেক অনেক ঊর্ধ্বের কথা। ফলে সাধারণ মানুষ এতে আকৃষ্ট হল না। তারা চায় তাদের প্রাণের ঠাকুরকে প্রাণের ভক্তি আর উষ্ণতা দিয়ে বাঁধতে। পেতে চায় আরও আরও নিবিড় করে। ফলে প্রচেষ্টা যতই মহৎ ও মহাকালের সম্পদ হোক না কেন, তা দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মিটল না।’- (অশোক রায়, বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-১৯৪)

            এই তাৎক্ষণিক প্রয়োজন না-মেটার প্রেক্ষিতে তখন অন্য উপায়ের কথা ভাবা হতে লাগলো, যা দিয়ে সমাজকে আবার নতুনভাবে সংগঠিত করে তোলা যায়। প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে রাজ অনুগৃহীত কিছু মানুষ ছিল, যাদের কাজ ছিল– দেশে দেশে গিয়ে প্রাচীন কালের কথা, রাজা-রাজড়াদের বীরত্বের কথা, প্রাচীন রাজবংশাবলির কথা বিভিন্ন আখ্যানের মাধ্যমে একত্রিত করে জনগণের মধ্যে প্রচার করা। এদেরকে বলা হতো সূত বা মাগধ– ইতঃপূর্বে যাদের কথা আলোচিত হয়েছে– এরাই ছিলেন সেকালের রাজা-রাজড়াদের রাজ-ইতিহাসবক্তা। এরাই পুরনো দিনের কথা, গাথা, প্রশস্তি ও আখ্যানগুলোকে পরম্পরাগতভাবে উত্তরকালের কাছে পৌঁছে দিতো। সমাজে এদের বেশ মান্যতাও ছিল। এটাই ছিল আমাদের দেশের ইতিহাস রক্ষার প্রাচীন ব্যবস্থা। যদিও এই ব্যবস্থায় শ্রোতা ও বক্তার কল্পনার দৌড়ে অনেক সময়ই বাস্তবতার সীমারেখা হারিয়ে যেত। অশোক রায়ের ভাষ্যে– ‘আজ আমরা যাকে (ক্রিটিক্যাল) বৈচারিক ইতিহাস (‘ইতিহ-আস’ হল ইতিহাস) বলি সে যুগে এ রকম কোনও নৈষ্ঠিক ব্যবস্থা চালু ছিল না।’
‘বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পর এই সমস্ত আখ্যান ও উপকথাগুলো ‘জাতক’ কাহিনির রূপ ধারণ করে। জাতক কাহিনিগুলো প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৌদ্ধধর্ম মহা সম্মেলনে (তৃতীয় মহাসম্মেলন সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে ২৬৯-২৩২ খ্রি. পূ.) সংকলিত হয়ে যায়। এরপর সম্রাট অশোক থেকে প্রাক্-গুপ্ত যুগ অবধি, এই পাঁচ-ছয়শো বছর ধরে দেশে বৌদ্ধ ধর্মের বিপুল প্রাবল্য দেখা দেয়। দলে দলে সাধারণ ও নিম্নকোটির মানুষেরা ধর্মান্তরিত হতে থাকে। সনাতন ধর্মের উপর বৌদ্ধ ধর্মের এই আঘাতকে সামাল দেওয়ার জন্যেই পৌরাণিক ধর্মের উদ্ভব। আর্য-অনার্য-ব্রাত্য ধর্মের চূড়ান্ত সংশ্লেষণের মধ্যে দিয়েই পৌরাণিক ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ। তখন আর্য ও অনার্য জাতির ঐতিহ্য, দেবতাবাদে, পূজা-পার্বণ সূত বা মাগধদের মুখে মুখে চলে আসা রাজকাহিনি ও শক্তিধর পুরুষদের কাহিনি ও সমস্ত কিছুকেই একত্রিত করে পুরাণের উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা। তাই বলা হয়– পুরাভরম্ ইতি পুরাণম্ । অর্থাৎ যা পুরনো দিনের কথা– তাই পুরাণ। তবে এই সমস্ত গাথা কথা যেহেতু আর্য প্রতিভায়, আর্য ভাষায় গ্রথিত হল, তাই এতে আর্য প্রাধান্য ও প্রভাব আছে বিস্তর। এই পুরাণগুলো নব-সংস্কৃতি ও নব-সভ্যতার ধারক ও বাহক। যা পরবর্তীকালের হিন্দুধর্ম, হিন্দু সভ্যতা ও হিন্দু সংস্কৃতি।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-১৯৫)

            বলা বাহুল্য, বর্তমানে হিন্দুধর্মে যে প্রতিমাপূজা ভারতবর্ষের সর্বত্র দেখা যায়, বেদে তার কোনও উল্লেখ নেই। সেখানে দেবতারা মন্ত্রময়ী ও অপুরুষবিৎ। প্রাগার্য বা অনার্যরাই মূর্তি পূজা করতো। অথচ তাদের দেব-দেবীরাই পৌরাণিক যুগে আর্য প্রজ্ঞায় মহিমান্বিত হয়ে এক-একটা গুণকে আশ্রয় করে, এক এক দেবদেবীর মূর্তি কল্পনা করা হয়েছে। যেহেতু মাটি বা ধাতুর প্রতিমায় দেবতার আবির্ভাব, তাই তাঁর পাদ্য-অর্ঘ্য, ধূপ-দীপ, পুষ্প-পত্র ও নৈবেদ্য দিয়ে অর্চনা করা হয়েছে। দেবতার তৃপ্তির জন্য বাদ্য, গীত ও নৃত্য ইত্যাদি আড়ম্বরের আয়োজন করা হয়েছে। ফলে বৈদিক দেবতারা বৈদিক উপাসনা-পদ্ধতির মতোই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত, যদিও পৌরাণিক দেবতারা একেবারে বেদ-বহির্ভূত সম্পূর্ণ নতুন দেবতা হয়তো নন, কিন্তু আমরা জানি যে, ঋগ্বেদের দেবসভায় তাঁদের স্থান ছিল নিতান্ত অপ্রধান ও নগন্য। তাহলেও প্রশ্ন আসে– মন্ত্রদ্রষ্টা আর্য ঋষি ও ব্রহ্মজ্ঞানীর প্রজ্ঞা কেন এই অধমাধম মূর্তি পূজাকে সাদরে গ্রহণ করলো ! অশোক রায়ের ভাষ্যেই এর উত্তর খোঁজা যেতে পারে,–
‘খুব সম্ভবত প্রতিমা শব্দটার মধ্যেই তাঁদের চিন্তার মূল সূত্র পাওয়া যায়। প্রতিমার অর্থই– প্রতিমূর্তি, কল্পিত শরীর বা Image যা আসল বা স্বরূপ নয়; কিন্তু আসলের ছায়ায় তারই গুণাবলম্বনে রূপ-কল্পনা মাত্র। কবিরা যেমন প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষকে স্পষ্ট করে বোঝাবার জন্যে উপমার আশ্রয় নেন। মুনিরাও তেমনি অপ্রত্যক্ষ, অরূপ কিন্তু গুণময়কে বোঝানোর জন্যে গুণাশ্রয়ে রূপের কল্পনা করে থাকেন। শাস্ত্রে আছে– ব্রহ্ম যদিও চিন্ময়, অপ্রমেয়, তবু সাধকের হিতের জন্যে তাঁরও রূপ কল্পনা করা হয়। নির্গুণ ও অশরীরী, ব্রহ্মসদ্ভাব উত্তম, ধ্যানভাব মধ্যম, স্তুতি ও জপ অধম, বাহ্য পূজা অধমেরও অধম। কিন্তু এতে ব্রহ্ম সান্নিধ্য আসে; তাই নিষ্ক্রিয়তা, নাস্তিকতা বা ব্রহ্মবিমুখতা থেকে সহস্রগুণ বরণীয়। মহানির্বাণ তন্ত্রে আছে– ধ্যান, ধারণা বা স্তুতিরূপ অন্তপূজা; প্রতিমা পূজা বাহ্যপূজা, তা যে অধম তাতে কোনও সন্দেহ নেই। রূপ, চিহ্ন বা প্রতীক অথবা শব্দ-আশ্রয় না করে অশব্দ, অস্পর্শ, অলিঙ্গ, অরূপ, অব্যয়ের ধারণা ও আরাধনা করতে পারেন কয়জন। সাধারণ মানুষের পক্ষে ইন্দ্রিয়ের সাহায্য না নিয়ে অতিরিন্দ্রিয়কে অনুভব করা সম্ভব কী?’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-১৯৭)

           রূপ দর্শনেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য বিষয়, অবশ্যই তা অনেক স্থূল। কিন্তু পুরাণকারেরা হয়তো মনে করলেন– প্রথম অবস্থায় সগুণ-সাকার ঈশ্বরের গুণাবলিকে রূপ-প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারলে সাধারণ লোকের পক্ষে রূপাশ্রয়ে গুণের উপলব্ধি করা সহজ হবে। তাই সাধকেরা রূপাবলম্বনে উপাসনা করতে করতে অরূপ-জ্যোতি ও পরে স্বরূপ-সত্তার উপলব্ধি করেন। চঞ্চলচিত্ত মানুষ দেবতা বা ইষ্টের শ্রীমূর্তি ধ্যানের পথ ছেড়ে বাহ্য বিষয়ে বা বাহ্য রূপের নেশায় ধাবিত হয়। এই অবস্থায় অভ্যাসযোগ অবলম্বনীয়। ক্রমাগত অভ্যাস যোগের দ্বারা চিত্তের বিক্ষেপ হয় প্রশমিত। বাহ্য রূপের প্রতি সংসারী জীবের যে স্বাভাবিক প্রবণতা তখন তা মুছে যেতে থাকে। ক্রমে ইষ্টমূর্তিতে চিত্ত লয়প্রাপ্ত হয়। অধ্যায়ান্তরে তন্ত্রের আলোচনায় এই মূর্তি কল্পনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হয়েছে। তবে ভাব কিভাবে রূপ পরিগ্রহ করে তার দৃষ্টান্ত দেখাতে গিয়ে অশোক রায়ের বর্ণনায়–
‘ভাব কীভাবে রূপ পরিগ্রহ করে সরস্বতীর মূর্তি লক্ষ করলেই তা সহজেই বোঝা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি আর্য ঋষি প্রজ্ঞায় ছিলেন– অম্বিতমে দেবী তমে বা নদীরূপী দেবীরূপী চ। কিন্তু পরবর্তীকালে ইনিই জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বিদ্যার আলোকে সমস্ত অবিদ্যার অন্ধকার দূরীভূত করেন। তাই তিনি সর্বশুক্লা– এক অখণ্ড জ্যোতিস্বরূপা। তাঁর বর্ণ শুক্ল, বসন শুক্ল, আসনের হংস ও পদ্মও শুক্ল; তিনি শুদ্ধ সত্ত্বগুণময়ী– তাই জ্যোতির্ময়ী। তাঁর এক হাতে পুস্তক, যা যাবতীয় বিদ্যার প্রতীক, অপর হাতে বীণা, যা মহানাদ বা প্রণব; অথবা গীতবাদ্য ইত্যাদি, যা সুকুমার কলার প্রতীক। যোগীগণের প্রস্ফুটিত মানস-শতদলে শুদ্ধ বিদ্যার অধিষ্ঠঅন। নীর ত্যাগ করে ক্ষীর গ্রহণ করতে পারে যে মরাল, সেই তাঁর বাহন।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-১৯৯)

          এভাবে পরমেশ্বরের একেকটা গুণকে আশ্রয় করে একেকটা দেবদেবীর রূপ কল্পনা হতে হতে পৌরাণিক যুগে দেবদেবীর সংখ্যা অগণিত পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। তবে দেবদেবীর সংখ্যা যাই হোক, শাস্ত্রকারেরা দেবতার একত্ব ও অদ্বিতীয়ত্বকে কখনোই বিস্মৃত হননি। তাই ইষ্ট দেবতা শিব, বিষ্ণু অথবা শক্তি যিনিই হোন না কেন, আরাধনার সময় প্রত্যেক দেবতাই সৃষ্টি-স্থিতি ও লয়কারী– সর্বশক্তিমান, সর্বগুণাধার পরমেশ্বর রূপেই অর্চিত হয়ে থাকেন। ভক্তের রুচিভেদ ও প্রকৃতিভেদের জন্যই এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের বহুরূপের উপাসনা দেখা যায়।
তবে পৌরাণিক যুগে দেব-পরিকল্পনার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো– ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর– এই ত্রিমূর্তি বা ত্রয়ী। আবার এই ত্রিমূর্তিই এক দেহে লীন হয়ে– পরমাত্মা পরমেশ্বর। যিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের নিয়ন্তা। এ দেবতা নতুন, এঁর রূপকল্পনাও নতুন, এমনকি পূজাবিধিও নতুন। এখানে বৈদিক যাগ-যজ্ঞ বা উপনিষদের অরূপের ধ্যান-ধারণা আর নেই। এই পৌরাণিক কল্পনায় আমরা দেখি–
‘ধ্যান-স্তিমিত-লোচন, চতুরানন ব্রহ্মা রক্তপদ্মে উন্নত উজ্জ্বল দেহ, বাম করে কমণ্ডলু, দক্ষিণ করে যজ্ঞের স্রুব বা হাতা, অপর দুই হাতে জপমালা ও অভয় মুদ্রা। তাঁর বামে সাবিত্রী দেবী, দক্ষিণে সরস্বতী, সম্মুখে বেদরাশি, পুরাভাগে ঋষিগণ বেদধ্বনি করছেন। ইনি দেবতা ও অসুরদের পিতামহ, ইনি প্রজাপতি, ইনি কখনও হংসপৃষ্ঠে আরোহণ করে থাকেন। ইনি সৃষ্টিকর্তা, অনাদি অনন্ত কাল ধরে নিরন্তর অসংখ্য জগৎ ও জীবসৃষ্টি করে চলেছেন।
বৈদিক বিষ্ণু এখন পৌরাণিক বিষ্ণু-নারায়ণ। জ্যোতির্ময় সবিতৃ মণ্ডলের মধ্যে পদ্মাসনে উপবিষ্ট, তাঁর হিরন্ময় অঙ্গে কেয়ূর, কিরীট, কুণ্ডল ও হার। ইনি চতুর্ভুজ; তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। ইনি সর্বদা জগৎপালক।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-২০০)

                আর দেবাদিদেব মহেশ্বর শিব? ইতঃপূর্বেই আলোচনা হয়েছে যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগের ‘সমাধি প্রস্তর’ এক সময়ে বিবর্তিত হয়– আত্মা প্রস্তরে, যা আজও আদিবাসী সমাজে ‘বীরকাঁড়’ বলে পরিচিত। তারপর ভূমিকর্ষণের প্রয়োজনীয়তায় সৃজন শক্তির প্রতীক রূপে ‘লিঙ্গযষ্টিতে’। তারপর সিন্ধু সভ্যতায় আমরা আদি শিবকে দেখতে পাই– পশুপতি রূপে। এখানে তিনি কেবল একাই নন, একই সাথে পূজিত হতে দেখি আদি মাতাকেও। সেখানে তাঁরা যে সৃজন শক্তি ও উর্বরা শক্তির প্রতীক লিঙ্গ ও যোনি রূপে আলাদা আলাদাভাবে পূজিত হতেন, এ-বিষয়ে বিদ্বান মহলে সকলেই প্রায় নিঃসন্দেহ।
এরপর বৈদিক যুগে ঋগ্বেদের কালে তিনি শিশ্নদেব রূপে নিন্দিত হলেও, পরবর্তীকালে বৈদিক দেবমণ্ডলীতে একজন অত্যন্ত অপ্রধান ধ্বংসের দেবতা রুদ্ররূপে স্তুত। এ সময় শিব কথাটা ছিল রুদ্রের বিশেষণ। এরপর উপনিষদে– বিশেষ করে শ্বেতাশ্বতরে– কিছু কিছু জায়গায় তিনি একটু একটু করে মঙ্গলময় রূপ পরিগ্রহ করতে থাকেন। কিন্তু যজুর্বেদের দুই শাখাতেই তিনি বিপুলভাবে স্তুত হয়ে পরমাত্মায় পর্যবসিত হন। এই সময়েই তাঁর মঙ্গলময় রূপে দার্শনিক প্রকাশ চরমোৎকর্ষ লাভ করে। ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে ঋগ্বেদের যুগে শিব কথাটা ছিল রুদ্রের বিশেষণ, আর এখন রুদ্র শব্দটা হয়ে দাঁড়ালো শিবের বিশেষণ। ফলে যজুর্বেদের রুদ্রাধ্যায়ে তিনি বন্দিত হলেন–

নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ।
নমঃ শঙ্করায় চ ময়ষ্করায় চ।
নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ।।
অর্থাৎ : শম্ভুকে নমস্কার, সুখভবকে নমস্কার। শঙ্করকে নমস্কার, সুখকরকে নমস্কার। শিবকে নমস্কার, শিবতরকে নমস্কার।

           এখানে শম্ভব, ময়োভব, শঙ্কর, ময়ষ্কর ও শিব– প্রতিটা শব্দের একই অর্থ– কল্যাণ সুন্দর মঙ্গলময় রূপ। এ শুধু শিবই নয়। ‘শিবতর’ অর্থাৎ অধিকতার মঙ্গলদায়ক ও কল্যাণজনক।

            অশোক রায়ের ভাষ্যে, এই সময় তিনি বৈদিক অগ্নিদেবতারও কয়েকটা বৈশিষ্ট্য নিয়ে শিবরূপে লীন হন। তাই বলা হয়– শিব বা মহেশ্বর রজতগিরির ন্যায় শুভ্র। এঁর পঞ্চমুখ ও ত্রিনয়ন, ললাটে চারুচন্দ্র, পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম। পদ্মাসীন এই দেবতা সতত অমর-গণ কর্তৃক বন্দিত হয়ে বরাভয় হস্তে নিখিলের ভয় হরণ করছেন। মহাপ্রলয়ের তাণ্ডবে মত্ত হয়ে ইনিই রূদ্ররূপে বিশ্বসংহার করে থাকেন।
শিবের বাহ্যরূপ বিচার করলে অনার্যভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু আর্য প্রতিভা তাঁর সমগ্র তত্ত্ব-বিচার করে তাঁদের প্রজ্ঞায় এঁকে সংস্কৃত করেছেন, শুদ্ধ করেছেন। রূপকাশ্রয়ে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়ে মোহনীয় ও বরণীয় করেছেন; আর সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্-এর প্রকাশে সম্পূর্ণ করার প্রয়াস নিয়েছে। কারণ–
‘আর্যপ্রজ্ঞা অনুভব করেছিল, অগণিত অনার্য ও ব্রাত্য নরনারীর নিত্য-পূজিত এই শ্মশাসচারী উন্মত্ত গণদেবতাই ধর্ম সংকটের কালে একমাত্র ত্রাতা। যখন সাধারণ মানুষ বৈদিক যাগ-যজ্ঞ, ক্রিয়াকর্ম, আচার-অনুষ্ঠানের বিপুল ব্যায়বাহুল্যতা ও ক্রিয়াসর্বস্বতায় বীতশ্রদ্ধ, তখন মানুষের কাছে ইনিই এই সবের (যাগ-যজ্ঞ, ক্রিয়া-কর্মের) ঊর্ধ্বের একমাত্র গণদেবতা। যাঁর পূজায় নারী-পুরুষ, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল, পণ্ডিত-মূর্খ সকলেরই সমান অধিকার। ভক্তি ছাড়া এঁর পূজায় আর অন্য কোনও উপচারই লাগে না। শুধু একটা বেলপাতা, শুধু একটু জল, তাতেই আশুতোষের পরম তুষ্টি। তাই আর্য ঋষিপ্রজ্ঞা এঁকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেন। বৈদিক রুদ্র দেবতার অঙ্গীভূত করে শিব দেবতাকে তাঁরা নতুন ভাবে প্রকাশ করলেন। এর আগেও তাঁরা একবার প্রকাশ করেছিলেন– যজুর্বেদে। কিন্তু বর্তমান রূপই হল শিবঠাকুরের পৌরাণিক রূপ। তাঁর প্রত্যেকটা ভূষণ ও আচারকে অপূর্ব দার্শনিক রূপকাশ্রয়ে আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়ে এমনভাবে মহিমান্বিত করলেন যা সকলের কাছে গ্রহণীয়, আদরণীয় ও বরণীয় হয়ে সমগ্র হিন্দু জনমানসে পরমাত্মার রূপ পরিগ্রহ করল।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-২০১)

           তাঁর যে অনার্য রূপের পরিচয় ছিল, তিনি কখনও ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিত, আবার কখনও বা উলঙ্গ; কণ্ঠে সর্পমালা, বৃষভ তাঁর বাহন, পর্বতে তার বাস, ভূতপ্রেত নিয়ে শ্মশানে-মশানে তাঁর বিচরণ; আর চিতাভস্ম গায়ে মেখে তিনি বিষ, সিদ্ধি বা ধুস্তুর সেবন করেন– এই কথাগুলোকেই দার্শনিকতায় মহিমামণ্ডিত করে বলা হলো–
‘চতুষ্পদ ধর্মরূপী বৃষই হল বৃষভ দেবতার বাহন। তিনি উলঙ্গ নন, দিগম্বর– দিক ব্যাপিয়া অম্বর যাঁর। তিনি বিশ্বব্যাপী ভূমা। তাঁর আবার বসন হবে কী করে? প্রপঞ্চ– পরাঙ্মুখ মহাযোগী। তিনি বাঘাম্বর ও বাঘাম্বরেই ধ্যানাসীন। পৃথিবীর যত ভয়স্থান, যত দুঃখ, যত ব্যাধি, যত বিপদ ও যত অমঙ্গল, এমনকী বিষধর সর্প এই সমস্ত কিছুকেই নিজ অঙ্গে অঙ্গভূষণ করে, জটায় কিরীট-ভূষণ করে, পরম মঙ্গলময় শিব যেন নির্বিকার। তাঁর অগণিত রত্ন-ভাণ্ডার তিনি স্পর্শও করেন না। সেবক কুবের তা ভোগ-রক্ষা করে চলেছেন। শ্মশানের চিতা বিভূতি অঙ্গে মেখে সংহারের দেবতা সৃষ্টির ক্ষণভঙ্গুরত্ব ও সংসারের নশ্বরত্বই যে এই জগতের চরম পরিণাম, একান্ত বৈরাগ্যভরে তা ঘোষণা করছেন। দেবাসুরের (সংসার?) সমুদ্র মন্থনে যখন অমৃত উঠল তখন কেউই শিবকে স্মরণ করল না। তারপর যখন বাসুকী নাগের উদ্গীর্ণ কালকূট, হলাহল বা গরলে বিশ্ব-বিনাশ হয় হয়; তখনই একমাত্র তিনিই সেই হলাহলকে পান করে বিশ্বকে আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। পরম মঙ্গলময় দেবতা তিনি, তাই জগতের সমস্ত অমঙ্গল বিষকে নিজ কণ্ঠে ধারণ করে– নীলকণ্ঠ বা নীললোহিত।’
‘তাঁর তৃতীয় নেত্র হল– প্রজ্ঞানেত্র। যোগীরাজের যোগসিদ্ধিজাত এই জ্ঞাননেত্র। তাই এই নেত্রজাত জ্ঞানবহ্নি দ্বারাই তিনি রতি-সহায় মদনকে ভস্মীভূত করে উমার পরিণয়-প্রসঙ্গে কামের দৌত্যকে অস্বীকার করলেন। এই জ্ঞাননেত্রের কেবল উপরিভাগই ভক্তের প্রতি অমৃত-বর্ষী স্নিগ্ধ চন্দ্রকলায় দীপ্যমান। তারই জটিল শীর্ষ অবলম্বন করেই ভূলোকে গঙ্গাবতরণ হয়। হিমালয়ের গভীর অরণ্যানী তাঁরই জটাজালের আভাস। সেই জটারণ্যের জালে ঘুরে ঘুরে সুরধুনি মন্দাকিনীর মর্ত্যে অবতরণ। বুদ্ধদেবের ধ্যান-প্রশান্ত রূপের মহিমাই তাঁকে সংসার-বিরাগী যোগীরাজরূপে পরিচিত করেছে। তিনিই তন্ত্রের মহাভৈরব, বেদের মহারুদ্র। আবার তিনিই নটরাজ রূপে বিশ্ব-সৃষ্টি লীলায় ও প্রলয়-তাণ্ডবে উন্মত্ত। বামে উমাকে সঙ্গিনী করে তিনিই সাংখ্যের প্রকৃতি ও পুরুষরূপে প্রকাশিত। তিনিই আদর্শ গৃহী। দশদিকে দশভূজ বিস্তার করে সিংহবাহিনী অসুরমর্দ্দিনী মহাশক্তি দুর্গা তাঁর গৃহিণী। ঋদ্ধি ও বিদ্যা স্বরূপা লক্ষ্মী ও সরস্বতী তাঁর দুই কন্যা। বল ও সিদ্ধিরূপী কার্তিক ও গণেশ এই দুই পুত্রকে নিয়ে মহাগৃহী শংকর।’
‘তাঁর হস্ত-ধৃত ত্রিশূল জীবের ত্রিতাপ বিনাশকারী, ইনি জ্ঞানেশ্বর, সাক্ষাৎ পরমজ্ঞানী। শিবশক্তির ভেদ ঘুচিয়ে ইনিই বেদান্তের অদ্বৈত ব্রহ্ম; রজতগিরিনিভকান্তি পরম জ্যোতি স্বরূপে প্রকাশমান। এই পুরুষ থেকেই মঙ্গলজাত বলে ইনি– শিব ও শম্ভু; মঙ্গলময় বলে– শংকর। ইনি আশুতোষ, মৃত্যুঞ্জয়; ভূজগভূষণ, নীলকণ্ঠ; ইনিই স্মরহর, চন্দ্রশেখর; আবার ইনিই গঙ্গাধর, পরমেশ্বর, ইনিই পরমব্রহ্ম।’
‘তাঁর কত নাম, কত রূপ; কত কাহিনি তাঁকে আশ্রয় করে পর্বতে, নদীতটে, অরণ্যে, নগরে ও গ্রামে। কত শত কুৎসিত কাহিনি প্রেত-পিশাচের মতো তাঁকে অবলম্বন করে বেঁচে আছে তার ইয়ত্তা নেই। সত্যিই ইনি দেবাদিদেব মহাদেব। সর্বভাব, সর্বধর্ম ও সর্বজ্ঞতা এঁতেই এসে মিশেছে, যেন মানুষের কল্পনার চূড়ান্ত পরিস্ফূর্তি এখানেই। তাই শৈব সাধকেরা উদার মন্ত্রে বলেন– যত্র জীব তত্র শিব।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-২০২)

              পৌরাণিক কল্পনায় এই পুরো বিষয়টা আর্য প্রজ্ঞায় ও সংস্কৃতিতে রচিত হয়েছিল বলেই ব্রাহ্মণ্যবাদের মূর্ত প্রতীক ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে স্থান দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ স্বর্গ– বৈকুণ্ঠে, এবং সেখানে তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া মা লক্ষ্মীর সাথে অধিষ্ঠিত। আর শিব ঠাকুরের স্থান হলো মর্ত্যরে মেরুপর্বত– কৈলাসে। সেখানে তাঁর সাথে অধিষ্ঠিতা হলেন– শিবজায়া মা দুর্গা।
বলা হয়, পৌরাণিক যুগের আরেক শ্রেষ্ঠ অবদান হলো মার্কণ্ডেয় পুরাণের শ্রীশ্রীচণ্ডী। এ-বিষয়ে অধ্যায়ান্তরে শক্তি-সাধনা প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। তবু বর্তমান আলোচনায় খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশে শরৎকালে ঘরে ঘরে যে মহাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, আজ তা বাঙালি হিন্দুর জাতীয় উৎসব দুর্গাপূজা। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মতো শ্রীশ্রীচণ্ডীও হিন্দু-সম্প্রদায়ের নিত্য পাঠ্য গ্রন্থ। তবে এর মাহাত্ম্য অন্যরকম। অশোক রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে মহাদেবীর তিনটি চরিত্র দেখা যায়। প্রথম চরিতে মধু-কৈটভ-বধ; মধ্যম চরিতে মহিষাসুর-বধ; আর উত্তর চরিতে শুম্ভনিশুম্ভ-বধ।
‘মধ্যম চরিতে– মহিষাসুর স্বর্গভূমি অধিকার করলে, ক্রুদ্ধ দেবতাদের দেহসম্ভূত তেজরাশি পুঞ্জীভূত হয়ে এক জ্বলন্ত পর্বতের রূপ ধারণ করে। সেই মিলিত মহাতেজ থেকেই নারীরূপে মহাশক্তির আবির্ভাব। আর এই মহাশক্তিই দেবগণ দ্বারা পূজিতা হয়ে, মহিষাসুর বিনাশ ও স্বর্গভূমি উদ্ধার করেন। তিন চরিতে দেবীর চারটে স্তব আছে, যার মহিমা অতুলনীয়। চৈতন্যই শক্তি, আর শক্তির বহুবিধ প্রকাশই হল– সৃষ্টি। এই শক্তিই মায়া; যার প্রভাব কেউই অতিক্রম করতে পারে না। তাই জগতের সমস্ত প্রাণী ও মানুষ মহামায়ার প্রভাবে মোহিত হয়ে নিজ নিজ কার্য করে চলেছে। কিন্তু কে এই দেবী? মুনি বলেন– তিনিই সৃষ্টিকারিণী, স্থিতি ও সংহারকারিণী শক্তি; মহাবিদ্যা, মহামায়া ও মহাসুরী তিনিই; তিনি কালরাত্রি ও মোহরাত্রি; তিনি শ্রী, লজ্জা, পুষ্টি, তুষ্টি, শান্তি ও ক্ষান্তি; তিনি সৌম্যা, সৌমরতা থেকেও অতীব সুন্দরী; সৎ, অসৎ যাবতীয় বস্তুর তিনিই একমাত্র শক্তি– দেবী পরমেশ্বরী।’
‘পুণ্যবানের ঘরে তিনি– লক্ষ্মীস্বরূপা; পাপাত্মার ঘরে– অলক্ষ্মীস্বরূপা। বুদ্ধিমানের হৃদয়ে– বুদ্ধি, সাধুর অন্তরে– শ্রদ্ধাস্বরূপা। তিনি সর্বভূতে মাতৃরূপে ও সর্ববিধ শক্তিরূপে অবস্থিতা। তিনিই বিশ্বের বীজ, পরমা মায়া। সমস্ত বিদ্যা ও সমস্ত নারী তারই রূপভেদ। সমগ্র জগৎ তাঁরই প্রভাবে সম্মোহিত। একমাত্র তিনি প্রসন্না হলেই মানুষের মোহমুক্তি সম্ভব। তাই কথাতেই বলা আছে– একৈবাহহং জগত্যত্র দ্বিতীয় কা মমাপরা– এ জগতে আমি একাই বর্তমান, আমার আবার দ্বিতীয় কে? বহুরূপে দেবী একাই জগৎ-খেলা খেলিতেছেন।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-২০৩)

             সে যাক্, আমরা যদি শিব প্রসঙ্গে আসি তাহলে এ পর্যায়ে এসে বোঝা যাচ্ছে যে, আজকের দিনের শিবঠাকুর ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রকৃতই যেন– দেবাদিদেব। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই তিনি বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন মানুষের কাছে আশ্রয়-ভরসার প্রতীক স্বরূপ। তাই তিনি সেই সময় থেকেই সর্বপূজিত ও সর্বপ্রণম্য। তারপর মানব বিবর্তনের ধারা বেয়ে তাঁরও রূপবিবর্তন ঘটতে থাকে। এই মহাকালের পথ পরিক্রমার বিভিন্ন নিদর্শনগুলোই ক্রমে তাঁর বাহন, অঙ্গভূষণ ও পূজা প্রকারণ রূপে দেবাংশী হয়েছে বলে পণ্ডিতদের অভিমত। আদিতে তিনি ছিলেন অমূর্ত বা বিমূর্ত। এরপরে সিন্ধু সভ্যতায় তিনি হলেন মূর্ত ও অমূর্ত। সমগ্র আর্য সভ্যতায় ঋগ্বেদ সংহিতার যুগ থেকে অথর্ববেদ সংহিতার যুগ পর্যন্ত তিনি আবার অমূর্ত, কারণ, আর্যরা মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন। এরপরে পৌরাণিক যুগে এসে আর্য-অনার্য এই দুই সভ্যতার চূড়ান্ত ধারা সংশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে আবার তিনি মূর্তিরূপ পরিগ্রহ করলেন; আবার একই সাথে তিনি লিঙ্গ প্রতীকেও পূজিত হতে থাকলেন। সবশেষে আজ তিনি তাঁর লিঙ্গ প্রতীকে এতোটাই জনপ্রিয় যে, তার ফলে তাঁর কায়ারূপ জনমানস থেকে ক্রম-অপস্রিয়মাণ।
বর্তমানে শিবঠাকুরের যে মূর্তিরূপ দেখি, তার উৎপত্তি সম্ভবত পৌরাণিক যুগেই সূচিত হয়েছে। সেখানে সিন্ধু সভ্যতার আদি শিবের মূর্তি বহু পরবর্তী অনার্য সভ্যতার মধ্যে ফল্গুধারার মতো প্রাগার্য সভ্যতা থেকে অনুপ্রবেশ করেছিল কিনা তা অবশ্যই গবেষণার বিষয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা তাঁর যে গৌরীপট্ট সমন্বিত লিঙ্গ প্রতীকরূপ দেখি তা মোটেও বেশি প্রাচীন কালের কথা নয়। কারণ প্রাগৈতিহাসিক আত্মা প্রস্তর থেকে শুরু করে পৌরাণিক কাল পর্যন্ত লিঙ্গ প্রতীক বহুবার বহু-সংস্কৃত হলেও আদি পিতার সাথে আদি মাতার সমন্বয় মূর্তি রচনা কখনোই সম্ভব হয়নি। সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শনগুলো থেকেও অনুমান করা যায় যে তখনো লিঙ্গ ও মাতৃদেবী (আদি পিতা ও আদি মাতা) আলাদা আলাদা ভাবেই পূজিত হতেন। পৌরাণিক যুগে এসেও লিঙ্গমূর্তিতে গৌরীপট্ট সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। বরং, পণ্ডিতজনদের মতে, এই সময়ে বোধহয় কোনও সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে লিঙ্গমূর্তি ক্রমে ক্রমে একান্ত বাস্তবানুগ রূপ নেয়, আবার একই সাথে ক্রমশ তা আকারেও বড় হতে থাকে। এরকম বহু নিদর্শনের মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের গুড্ডিমল্লম গ্রামের মনুষ্যপ্রমাণ (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর) লিঙ্গমূর্তিটি আজও সাড়ম্বরে পূজিত হওয়ার কথা ইতঃপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে।
‘এই সময়কার লিঙ্গমূর্তিগুলো সরাসরি মাটির উপরে খাড়াভাবে প্রোথিত অবস্থায় থাকত। যা ক্রমশ শ্লীলতার সীমারেখা অতিক্রম করতে থাকে। তারপর এই বাস্তবানুগ রূপ খুব সম্ভবত জনরোষেই ধীরে ধীরে পরিশীলিত হয়। যার ফলে পরবর্তীকালের নিদর্শনগুলো বাস্তবানুগতা ছেড়ে বিভিন্ন মাপের নানা ধরনের (লম্বা, ডিম্বাকৃতি, উপবৃত্তাকার, গোলাকার ইত্যাদি) হতে থাকে। আর তা সরাসরি মাটির উপরে খাড়া ভাবে প্রোথিত থাকত।’
‘এইরকম শিবলিঙ্গ আজও বহু জায়গায় (প্রাচীন মন্দিরগুলোতে) পূজিত হচ্ছে। একটু ভালভাবে লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে, সেইসব লিঙ্গমূর্তিতে গৌরীপট্ট পরবর্তীকালে বিভিন্ন কায়দায় সংযোজন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়– কাশীর বিশ্বনাথ, কেদারনাথ, মহাকাল, ওংকারেশ্বর, লিঙ্গরাজ, তারকেশ্বর ইত্যাদি। এই উদাহরণগুলো দেখে অনেক প্রাজ্ঞ মানুষ আপত্তি করতে পারেন যে, ওইসব মন্দিরগুলো তো আরও অনেক প্রাচীন কালের নিদর্শন। তা হলে তাঁদেরকে কি এই যুক্তিতে আনা যায়? কথাটা ঠিকই বিশ্বনাথ, মহাকাল, ওংকারেশ্বর ইত্যাদি মন্দিরগুলো অতি প্রাচীন। কিন্তু ইতিহাস বলে ওই মন্দিরগুলো বহুবার বহুভাবে বিনষ্ট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে; আবার নতুন করে তৈরি হয়েছে।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-২০৫)

            ঐতিহাসিকেরা যদিও গুপ্তযুগকে পৌরাণিক ও হিন্দু সভ্যতার স্বর্ণযুগ বলেন, কিন্তু এই সময়েও লিঙ্গমূর্তিতে আদিপিতার সাথে আদিমাতার সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হয়নি। তা সম্ভব হয়েছে গুপ্তোত্তর কালে এসে (খ্রি. ষষ্ঠ শতাব্দী) কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে। আবিষ্কৃত হলো ‘সনালিকা গৌরীপট্ট সমন্বিতম্’ শিবলিঙ্গ। জানা যায়, এর ঠিক কিছুকাল আগে পাঞ্জাবের উদম্বর জনগোষ্ঠী বহুভাবে লিঙ্গমূর্তির রূপ সংস্কারের বহু প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, যার নিদর্শন আজও পাওয়া যায় বলে গবেষকদের অভিমত।
‘তৈরি হল মানুষের দার্শনিকতার সাথে মেলবন্ধন করে যুগোপযোগী ও রুচিসম্মত শিবলিঙ্গ মূর্তি। যাতে বাস্তবানুগতার চেয়ে দার্শনিকতাই বেশি প্রাধান্য লাভ করেছে। আর তাই এই মূর্তি আসমুদ্রহিমাচলে সর্বত্র আদৃত, পূজিত ও প্রণম্য হল– আদি পিতা ও আদি মাতার– শিবশক্তির– বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং-এর দার্শনিক বিমূর্ত প্রকাশরূপে।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-২০৬)
আর এই দার্শনিকতার সাহিত্য নিদর্শনও আমরা দেখতে পাই পরবর্তীকালের শৈব তন্ত্র ও পুরাণ সাহিত্য নিদশনগুলিতে। যেমন, বায়বীয় সংহিতায় বলা হয়েছে–

লিঙ্গবেদী মহাদেবী লিঙ্গং সাক্ষান্মহেশ্বরঃ। (বায়বীয় সংহিতা উত্তরভাগ-২৭/১৩)
অর্থাৎ : লিঙ্গের বেদীতে মহাদেবীর এবং লিঙ্গেতে মহেশ্বরের অধিষ্ঠান।

প্রাণতোষিণী-ধৃত লিঙ্গপুরাণ বচনেও বলা হয়েছে–

লিঙ্গবেদো মহাদেবী লিঙ্গং সাক্ষান্মহেশ্বরঃ।
ত্রয়োঃ সংপূজনান্নিত্যং দেবী দেবশ্চ পূজিতৌ।। (প্রাণতোষিণী-ধৃত লিঙ্গপুরাণ বচন)
অর্থাৎ : লিঙ্গ-বেদী মহাদেবী ভগবতী-স্বরূপ। আর লিঙ্গ সাক্ষাৎ মহাদেব স্বরূপ। এই লিঙ্গ ও বেদীর পূজাতে শিব ও শক্তি উভয়ের পূজা হয়।

পরবর্তীকালের তান্ত্রিক দৃষ্টিতেও একই তত্ত্ব পাওয়া যায়। যেমন, নিরুত্তর তন্ত্রের ভাষায়–

লিঙ্গরুপো মহাকালো যোনিরূপা চ কালিকা। (নিরুত্তরতন্ত্র-১৪পটল)
অর্থাৎ : লিঙ্গরূপে মহাকাল এবং যোনিরূপে কালিকা দেবী অবস্থান করেন।

নারদপঞ্চরাত্রেও লিঙ্গযোনির নিত্যসম্বন্ধের কথা পাওয়া যায়, যেমন–

যত্র লিঙ্গস্তত্র যোনির্যত্র, যোনিস্ততঃ শিবঃ। (নারদপঞ্চরাত্র)
অর্থাৎ : যেখানে লিঙ্গ সেখানেই যোনি এবং যেখানে যোনি সেখানেই শিবের অবস্থান।

একইভাবে–

শক্তিং বিনা মহেশানি প্রেতত্বং তস্য নিশ্চিতম্ ।
শক্তিসংযোগমাত্রেণ কর্মকর্তা সদ্যশিবঃ।
অতএব মহেশানি পূজয়েচ্ছিবলিঙ্গবম্ ।।
অর্থাৎ : মহেশানি ! শক্তি-সংযুক্ত না থাকিলে শিব নিশ্চিত শব-স্বরূপ হন, এবং শক্তি-যুক্ত হইলেই কর্ম-ক্ষম হইয়া উঠেন। অতএব শক্তির সহিত শিব-লিঙ্গের পূজা করিবে।

লিঙ্গ যেহেতু পিতৃত্বের এবং যোনি মাতৃত্বের প্রতীক, হয়তো এর থেকেই জগৎ পিতা-মাতার কল্পনা শাস্ত্রকারদের বুদ্ধিতে উদিত হয়েছিল। সে কারণেই নিরুত্তরতন্ত্রে বলা হয়েছে–

যোনিশ্চ জনিকা মাতা লিঙ্গশ্চ জনকঃ পিতা।
মাতৃভাবং পিতৃভাবমুভয়োরপি চিন্তয়েৎ।।
অর্থাৎ : যোনিতে মাতা এবং লিঙ্গে পিতা, এভাবে উভয়কে মাতৃ-পিতৃজ্ঞানে চিন্তা করবে।

তাই হয়তো পরবর্তীকালে শঙ্করাচার্য্যরে অন্নপূর্ণাস্তোত্রে বলা হয়েছে–

মাতা মে পার্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বরঃ।
বান্ধবাঃ শিবভক্তাশ্চ স্বদেশো ভুবনত্রয়ম্ ।। (অন্নপূর্ণাস্তোত্র)
অর্থাৎ : দেবী পার্বতী আমার মা, পিতা মহেশ্বর; শিবভক্তরা বান্ধব তাই ত্রিভুবনই স্বদেশ।


(চলবে…)

[পূর্বের পোস্ট : উত্তর-বৈদিক পুরাণ সাহিত্য] [×] [পরের পোস্ট : শৈব সম্প্রদায়]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 412,070 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 122 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   সেপ্টে. »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 1 month ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: