h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৭ : উত্তর-বৈদিক পুরাণ সাহিত্য

Posted on: 12/03/2018


800px-Lord_Shiva_Statue_at_Murdeshwara

শিব ও লিঙ্গ-০৭ : উত্তর-বৈদিক পুরাণ সাহিত্য
রণদীপম বসু

মানবসমাজ বিবর্তনের ধারায় আগুনের আবিষ্কার ও ব্যবহার যেমন নবদিগন্তের সূচনা করে, তেমনিভাবেই লোহার আবিষ্কারও (আনুমানিক দশম-নবম খ্রিস্টপূর্ব) আনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ফলে পুরাতনী সমাজব্যবস্থা নতুনভাবে বিন্যস্ত হতে থাকে। চাষাবাদ, ব্যবসাবাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতির সাথে সাথে সমাজের বৃত্তি বিভাজনও পুনর্বিন্যস্ত হতে থাকে। সমাজে অন্তর্দ্বন্দ্ব চিরকালই ছিল, এবং তা ছিল মূলত ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের ক্ষমতা দখলের লড়াই-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতির সাথে সাথে আর্থিক বলে বলীয়ান বৈশ্য শ্রেণির উদ্ভব হলো। তারাও ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে তৃতীয় শক্তি রূপে নিজেদের জড়িয়ে ফেললো। বস্তুত এই সময় থেকেই সনাতনী সমাজব্যবস্থা ধারাবাহিক অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে বিভিন্ন সংকটের মধ্যে পড়তে থাকে। এইসব আঘাতকে সামাল দিয়ে সমাজকে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টাতেই বৈদিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বহুলভাবে সমৃদ্ধ ও ক্রমবিবর্তিত হতে থাকে, যার ফসল হলো বিপুল বৈদিক সাহিত্যসম্ভার ও বেদমূলক উত্তর-বৈদিক সাহিত্য– পুরাণ। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের গভীরে যাওয়ার আগে পুরাণ সম্পর্কিত কিছু সাধারণ ধারণা অবগত হওয়া আবশ্যক।

পুরাণ শব্দের অর্থ পূর্বতন। তাই বলা হয়– ‘পুরাভরম্ ইতি পুরাণম্’, অর্থাৎ যা পুরনো দিনের কথা– তাই পুরাণ। সে অনুযায়ী পূর্বতন ঘটনাবলির বিবরণ করা পুরাণের উদ্দেশ্য হতে পারে। কিন্তু আমরা পুরাণ-সাহিত্য বলতে প্রচলিত যে পুরাণ ও উপ-পুরাণগুলোকে বুঝি সেগুলো কোনভাবেই অধিক প্রাচীন নয়। এগুলো প্রায় সবই গুপ্তযুগের সৃষ্টি। যদিও বেদের উপনিষদ ভাগ অন্যান্য ভাগ অপেক্ষা নব্য, কিন্তু ভারতীয় পণ্ডিতদের মতে এগুলোও পুরাণের চেয়ে প্রাচীন। বাস্তবিকই প্রচলিত পুরাণ ও উপপুরাণগুলো সেইসব প্রামাণিক উপনিষদের পরে সঙ্কলিত হয়েছে। অথচ বেদের অন্তভাগ বেদান্ত বলতে যে উপনিষদ ভাগকে বুঝি সেই প্রাচীন উপনিষদগুলিতেও পুরাণের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন–

সহোবাচ ঋগ্বেদং ভগবোহধ্যোমি যজুর্ব্বেদং সামবেদমাথর্ব্বনং চতুর্থমিতিহাসপূরাণং পঞ্চমং।– (ছান্দোগ্যোপনিষদ্- সপ্তম প্রপাঠক)
অর্থাৎ : তিনি কহিলেন, ভগবন্! আমি ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, আথর্বণ নামক চতুর্থ বেদ এবং পঞ্চম বেদ-স্বরূপ ইতিহাস-পুরাণ জ্ঞাত আছি।

এবং–

অস্য মহতোভূতস্য নিশ্বসিতমেতদ্যদৃগ্বেদো যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোহসর্ব্বাঙ্গিরস ইতিহাসঃ পুরাণং।– (বৃহদারণ্যক উপনিষদ)
অর্থাৎ : এই পরমাত্মা হইতে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, ইতিহাস ও পুরাণ উৎপন্ন হইয়াছে।

আবার হিন্দু সমাজে রামায়ণ ও মনুসংহিতা পুরাণ অপেক্ষা পুরাতন গ্রন্থ বলে প্রবাদ আছে। বাস্তবিকই তা-ই। কিন্তু রামায়ণের স্থানে স্থানে অযোধ্যাধিপতি রাজা দশরথের সারথি সুমন্ত্র পুরাণবিৎ বলে বারবার পরিকীর্তিত হয়েছে। যেমন–

ইত্যুক্রান্তঃ পুরদ্বারমাজগাম পুরাণচিৎ।
সদাসক্তঞ্চ তৎবেশ্ম সুমন্ত্রঃ প্রবিবেশ হ।।– (অযোধ্যাকাণ্ড- ১৫ সর্গ/ ১৯ শ্লোক)
অর্থাৎ : এই কথা বলিয়া, পুরাণজ্ঞ সুমন্ত্র অন্তঃপুরের দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন এবং সেই সতত-অবারিতদ্বার-গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিলেন।

              এ প্রেক্ষিতে মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্ত বলেন– ‘এইরূপ, উক্ত কাণ্ডের (অযোধ্যাকাণ্ড) ষোড়শ সর্গের প্রথম শ্লোকে সুমন্ত্রের পুরাণাভিজ্ঞতা বালকাণ্ডের নবম সর্গের প্রথম শ্লোকে সুমন্ত্র কর্তৃক পুরাণকথন এবং ঐ কাণ্ডের অষ্টাদশ সর্গের বিংশ শ্লোকের ও অযোধ্যাকাণ্ডের ষষ্ঠ সর্গের ষষ্ঠ শ্লোকের টীকায় ‘সুতাঃ পৌরাণিকাঃ’ বলিয়া সুতগণের পুরাণ-ব্যবসায় উল্লিখিত হইয়াছে। এই সকল স্থলের পুরাণ শব্দ কদাচ বর্ত্তমান পুরাণ হওয়া সম্ভব নয়।’– (উপক্রমণিকা, ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, পৃষ্ঠা-১৯০)
এবং মনুসংহিতার মধ্যেও পুরাণ ও ইতিহাস-অধ্যয়নের ব্যবস্থার কথা জানা যায়, যেমন–

স্বাধ্যায়ং শ্রাবয়েৎ পিত্রে ধর্ম্মশাস্ত্রাণি চ্চৈবি হ।
আখ্যানানীতিহাসাংশ্চ পুরাণানি খিলানি চ।।– (মনুসংহিতা-৩/২৩২)
অর্থাৎ : শ্রাদ্ধ ক্রিয়াতে ব্রাহ্মণদিগকে বেদ, ধর্মশাস্ত্র, আখ্যান, ইতিহাস, পুরাণ ও খিল নামক শাস্ত্র শ্রবণ করাইবেন।

             অতএব, মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের মতে,– ‘প্রচলিত পুরাণ সমুদয় অপেক্ষায় প্রাচীনতর বলিয়া সুপ্রসিদ্ধ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, কল্পসূত্র, উপনিষদ্, রামায়ণ ও মনুসংহিতায় যখন পুরাণের প্রসঙ্গ আছে, তখন সেই পুরাণ কদাচ প্রচলিত পুরাণ হইতে পারে না। অধুনাতন অষ্টাদশ মহাপুরাণ ও অষ্টাদশ উপপুরাণ রচিত বা সঙ্কলিত হইবার পূর্ব্বে অন্যরূপ গ্রন্থবিশেষ পুরাণ বলিয়া প্রচলিত ছিল বলিতে হইবে।’
‘মহাভারতেরও মধ্যে লিখিত আছে, ইহাতে ইতিহাস ও পুরাণের স্বার্থ সমর্থন করা গিয়াছে। এবং মহাভারতে বর্ণিত অনেকানেক নির্দ্দিষ্ট উপাখ্যান পৌরাণিক কথা বলিয়া লিখিত হইয়াছে।’
‘এই সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া দেখিলে স্পষ্ট প্রতীতি হয়, এক্ষণকার প্রচলিত পুরাণ ও মহাভারত রচিত বা সঙ্কলিত হইবার পূর্ব্বে পুরাতন কথা বিষয়ক গ্রন্থ-বিশেষ পুরাণ ও ইতিহাস নামে প্রসিদ্ধ ছিল। ফলতঃ পূর্ব্বে যে অন্য পুরাণ ছিল, এক্ষণকার প্রচলিত পুরাণের মধ্যেও তাহা স্পষ্টরূপে লিখিত আছে।… পুরাণের মধ্যেই এরূপ একটি উপাখ্যান সন্নিবেশিত আছে যে, প্রথমে বেদব্যাস একখানি পুরাণ-সংহিতা প্রস্তুত করিয়া সূত-কুলোদ্ভব লোমহর্ষণকে প্রদান করেন ; লোমহর্ষণ তদনুসারে এক সংহিতা এবং তাঁহার তিন শিষ্য তিন সংহিতা প্রস্তুত করেন ; এই চারি সংহিতার সার সঙ্কলন পূর্ব্বক বিষ্ণুপুরাণ রচিত হয়।’– (উপক্রমণিকা, ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, পৃষ্ঠা-১৯১)

               বিষ্ণুপুরাণোক্ত ঐ পুরাণ-সংহিতা কিরূপ ছিল তা এতকাল পরে নিরূপণ করা অসাধ্যই বলা যায়। বিষ্ণুপুরাণকর্তা লিখেছেন, বেদগ্রাহ্য আখ্যান, উপাখ্যান, গাথা, কল্পশুদ্ধি এই চার বিষয় নিয়ে পুরাণ-সংহিতা প্রস্তুত করেন। কিন্তু এই বিষয় চারটি কী? ঐ পুরাণের টীকাকার লিখেছেন–

স্বয়ং দৃষ্টার্থকথনং প্রাহুরাখ্যানকং বুধাঃ।
শ্রুতস্যার্থস্য কথনমুপাখ্যানং প্রচক্ষতে।।
গাথাস্তু পিতৃপৃথ্বীপ্রভৃতিগীতয়ঃ।
কল্পশুদ্ধিঃ শ্রাদ্ধকল্পাদিনির্ণয়ঃ।।
অর্থাৎ : স্বয়ং দৃষ্টি করিয়া যে সকল বিষয় কথিত হইয়াছে তাহার নাম আখ্যান, পরম্পরা শ্রুত কথার নাম উপাখ্যান, পিতৃ-বিষয়ক ও পৃথ্বী-বিষয়ক গীত ও অন্যান্য কোন কোন গীতের নাম গাথা এবং শ্রাদ্ধ-কল্পাদি নিরূপণের নাম কল্পশুদ্ধি।

             তার মানে, কোনো বিষয় প্রত্যক্ষ দর্শন করে, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা হিসেবে কারো কাছে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করাকে বলে আখ্যান। অপরের কাছে শোনা কোনো বিষয় বা ঘটনার বর্ণনা হলো উপাখ্যান। পিতৃপুরুষদের কথা অথবা পুরাতন কোনো ঘটনা স্মরণ রাখার জন্য লোকমুখে প্রচলিত যে শ্লোক তার নাম গাথা।

              পুরাণের কোনও কোনও অংশ অতি প্রাচীন, হয়তো বেদেরও সমকালীন, কিন্তু তা বর্তমান আকারে সংকলিত হয়েছে মাত্র দেড় হাজার বছর আগে। গুপ্ত যুগকেই পুরাণ রচনার স্বর্ণযুগ বলে। কারণ বেশিরভাগ পুরাণই এই সময় রচিত হয়েছিল। এর মধ্যে আঠারখানাকে পুরাণ বা মহাপুরাণ বলে, আর বাকি আঠারখানাকে উপপুরাণ বলে। তবে সর্বত্রই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসকে পুরাণগুলোর ও মহাভারতের রচনাকর্তা বলা হয়েছে। দেবীভাগবতের মতে–

অষ্টাদশ-পুরাণানি কৃত্বা সত্যবতীসুতঃ।
ভারতাখ্যানমতুলং চক্রে তদুপবৃংহিতম্ ।।
অর্থাৎ : সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব আঠারটি পুরাণ রচনা করার পর সেই পুরাণতত্ত্বকে আরও ব্যাখ্যা করার জন্য মহাভারত রচনা করেছিলেন।

               কিন্তু ব্যাসদেব আদৌ পুরাণগুলোর রচয়িতা কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থের উপক্রমণিকায় (পৃষ্ঠা-১৯৭-৯৮) তাঁর মূল্যায়ন খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলছেন–
‘এক্ষণে বেদ-শাস্ত্রের যেরূপ বিভাগ ও শৃঙ্খলা প্রচলিত আছে, তাহা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের কৃত বলিয়া প্রসিদ্ধ। সমুদায় অষ্টাদশ পুরাণ ও সমগ্র মহাভারত তাঁহারই প্রণীত বলিয়া বিখ্যাত আছে। কিন্তু রচনা ও ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় মতামত প্রভৃতি বহুবিধ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন পুরাণের এত বিভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায় যে সমস্ত পুরাণ এক জনের রচিত বলিয়া কোন ক্রমেই স্বীকার করা যায় না। ফলতঃ এক্ষণকার অষ্টাদশ পুরাণের এক পুরাণও যে বেদব্যাসের রচিত নয়, তাহা পশ্চাৎ নিঃসংশয়ে প্রতিপন্ন হইবে। মহাভারত যে এক জনের বিরচিত নয় ইহা ইতি পূর্ব্বে প্রদর্শিত হইয়াছে। বেদব্যাস অষ্টাদশ পুরাণের রচনাকর্ত্তা এ প্রবাদও যে অপেক্ষাকৃত আধুনিক, পুরাণের মধ্যেই তাহার নিদর্শন লক্ষিত হইয়া থাকে। তাহাতে এইরূপ লিখিত আছে যে, বেদব্যাস একখানি পুরাণ-সংহিতা প্রস্তুত করিয়া সূত-কুলোদ্ভব লোমহর্ষণকে প্রদান করেন, এবং লোমহর্ষণ তাহা স্বীয় শিষ্যদিগকে শিক্ষা দেন। বিষ্ণু, ভাগবত ও আগ্নেয় পুরাণে এই কথাটি সুস্পষ্টরূপে লিখিত আছে। এস্থলে বিষ্ণুপুরাণ হইতে উদ্ধৃত হইতেছে।’

আখ্যানৈশ্চাপ্যুপাখ্যানৈর্গাথাভিঃ কল্পশুদ্ধিভিঃ।
পুরাণসংহিতাং চক্রে পুরাণার্থবিশারদঃ।।
প্রখ্যাতো ব্যাসশিষ্যোহভুৎ সুতো বৈ লোমহর্ষণঃ।
পুরাণসংহিতাং তস্মৈ দদৌ ব্যাসো মহামুনিঃ।।
সুমতিশ্চাগ্নিবর্চ্চাশ্চ মিত্রায়ুঃ শাংশপায়নঃ।
অকৃতব্রণোহথ সাবর্ণিঃ ষট্ শিষ্যাস্তস্য চাভবন্ ।।
কাশ্যপঃ সংহিতাকর্ত্তা সাবর্ণিঃ শাংশপায়নঃ।
লৌমহর্ষণিকা চান্যা তিসৃণাং মূলসংহিতা।।
(বিষ্ণুপাুরণ। ৩ অংশ। ৬ অধ্যায়। ১৬-১৯ শ্লোক।)
অর্থাৎ : পুরাণার্থবিৎ বেদব্যাস আখ্যান, উপাখ্যান, গাথা ও কল্পশুদ্ধি লইয়া একখানি পুরাণ-সংহিতা রচনা পূর্ব্বক সুপ্রসিদ্ধ শিষ্য সূতকুলোদ্ভব লোমহর্ষণকে প্রদান করিলেন। সুমতি, অগ্নিবর্চ্চাঃ, মিত্রায়ু, শাংশপায়ন, অকৃতব্রণ ও সাবর্ণি নামে তাঁহার ছয় শিষ্য ছিল। তন্মধ্যে কাশ্যপ সাবর্ণি, শাংশপায়ন ইহাঁরা এক একখানি পুরাণসংহিতা করেন। লোমহর্ষণ লৌমহর্ষণিকা নামে যে সংহিতা প্রস্তুত করিয়াছিলেন, তাহাই এ তিনের মূল।

              এ প্রেক্ষিতে দত্ত মহাশয় আরও বলছেন– ‘উল্লিখিত পুরাণ-সঙ্কলন বিষয়ক উপাখ্যানের সমুদায় কথা যথার্থ কিনা, তাহা নিঃসংশয়ে নিরূপণ করা সুকঠিন বটে, কিন্তু কোন সময়ের পণ্ডিতেরা যে বেদব্যাসকে কেবল একখানি পুরাণসংহিতার কর্ত্তা বলিয়া বিশ্বাস করিতেন এবং তাঁহার অষ্টাদশ পুরাণ রচনা বিষয়ক উপাখ্যান যে তাহার বহুকাল পরে রচিত হয়, ইহা পূর্ব্বোক্ত বচন-দর্শনে স্পষ্ট প্রতীত হইতেছে। তিনি যে দুইখানি সংহিতা করিয়াছিলেন, ইহা কোন পুরাণে লিখিত নাই। বরং বিষ্ণুপুরাণের অন্তর্গত পূর্ব্বোক্ত বচনে স্পষ্ট লিখিত আছে, বেদব্যাস একখানি পুরাণ-সংহিতা করিয়া লোমহর্ষণকে প্রদান করেন। লোমহর্ষণ তদনুযায়ী একখানি সংহিতা রচনা করেন এবং তদীয় শিষ্য কাশ্যপ, সাবর্ণি ও শাংশপায়ন সকলে এক একখানি সংহিতা প্রস্তুত করিয়া যান।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, উপক্রমণিকা, পৃষ্ঠা-১৯৯)
তাছাড়া, পুরাণগুলি পাঠ করলে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন পুরাণে এমন পরস্পরবিরুদ্ধ মতামত ও ঘোরতর নিন্দাবাদ প্রকাশিত রয়েছে যে, সেসব নিন্দা এক মতাবলম্বী এক ব্যক্তি কর্তৃক বিরচিত হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এক্ষেত্রে সেগুলোর কিছু নমুনা উপস্থাপন করা যেতে পারে (সূত্র: ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, উপক্রমণিকা পৃষ্ঠা-২৩১-২৩২), যেমন–

মোহাদ্যঃ পুজয়েদন্যং স পাষণ্ডী ভবিষ্যতি।
ইতরেষান্তু দেবানাং নির্মাল্যং গর্হিতং ভবেৎ।।
সকৃদেব হি যোহশ্নাতি ব্রাহ্মণো জ্ঞানদুর্ব্বলঃ।
নির্মাল্যং শঙ্করাদীনাং স চাণ্ডালো ভবেৎ ধ্রুবম্ ।।
কল্পকৌটীসহস্রাণি পত্যতে নরকাগ্নিনা।। -(পদ্মপুরাণ। উত্তরখণ্ড। ৭৮ অধ্যায়।)
অর্থাৎ : যে ব্যক্তি মোহবশতঃ বিষ্ণু ভিন্ন অন্য দেবতার উপাসনা করে, সে পাষণ্ড হইবে। বিষ্ণু ভিন্ন অন্যের নির্ম্মাল্য গর্হিত। যে অজ্ঞ ব্রাহ্মণ একবার মাত্রও শিবাদির প্রসাদ-সামগ্রী ভোজন করে, সে নিশ্চিত চণ্ডাল। সে নরকাগ্নিতে কোটিসহস্র কল্প দগ্ধ হয়।

ধ্যানং হোমস্তপস্তপ্তং জ্ঞানং যজ্ঞাদিকোবিধিঃ।
তেষাং বিনশ্যতি ক্ষিপ্রং যে নিন্দন্তি পিনাকিনম্ ।। -(কুর্মপুরাণ। ২ অধ্যায়।)
অর্থাৎ : যাহারা শিব-নিন্দা করেন, তাঁহাদিগের ধ্যান, হোম, তপ, জ্ঞান ও যজ্ঞাদিক-বিধি সমুদায় শীঘ্র নষ্ট হয়।

ভগবত্যাঃ কালিকায়া মাহাত্ম্যং যত্র বর্ণ্যতে।
নানাদৈত্যবধোপেতং তদ্বৈ ভাগবতং বিদুঃ।।
কলৌ কেচিৎ দুরাত্মানো ধূর্ত্তা বৈষ্ণবমানিনঃ।
অন্যদ্ভাগবতং নাম কল্পয়িষ্যন্তি মানবাঃ।। -(স্কন্দ পুরাণ)
অর্থাৎ : যে গ্রন্থেতে অনেকানেক অসুর-বধের সহিত ভগবতী কালিকার মাহাত্ম্য-বর্ণন আছে, পণ্ডিতেরা তাহাকেই ভাগবত বলিয়া জানেন। কলিযুগে বৈষ্ণবাভিমানী ধূর্ত্ত দুরাত্মা লোক সকল ভগবতীর মাহাত্ম্য-যুক্ত গ্রন্থকে ভাগবত না বলিয়া অন্য ভাগবত কল্পনা করিবে।

সৌরস্য গাণপত্যস্য শৈবাদের্ভূরিমানিনঃ।
শাক্তস্য বৈষ্ণবোবারি হস্তেহ্যন্নং পরিত্যতেজ।।
সঙ্গং বিবর্জ্জয়েৎ শৈবশাক্তাদীনান্তু বৈষ্ণবঃ।
ন কার্য্যা প্রার্থনা তেভ্যস্তেষাং দ্রব্যমমেধ্যবৎ। -(পদ্মপুরাণ। উত্তরখণ্ড। ১০০ অধ্যায়।)
অর্থাৎ : সৌর, গাণপত্য, শক্তি, শৈবাদির হস্তে বৈষ্ণব অন্নজল গ্রহণ করিবে না। বিষ্ণু-ভক্তে শৈব-শাক্তাদির সংসর্গ করিবে না ও তাহাদিগের নিকট প্রার্থনা করিবে না। তাহাদিগের দ্রব্য পুরীষ-তুল্য।

               পুরাণোক্ত এসব বিষয় পর্যালোচনা করে অক্ষয় কুমার দত্তের পর্যবেক্ষণ হলো– ‘পুরাণের বিষয়ে যাহা কিছু লিখিত হইল, সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া দেখিলে, বেদব্যাসকে প্রচলিত পুরাণ সমুদায়ের রচয়িতা বলিয়া কোন মতেই বিশ্বাস করা যায় না; প্রত্যুত, স্বধর্ম্মানুরক্ত পণ্ডিতগণ কর্ত্তৃক স্ব স্ব ধর্ম্মানুযায়ী ধর্ম্ম-প্রণালী-প্রচলন উদ্দেশে তাঁহার নামে সেই সমস্ত প্রচার করা হইয়াছে এইটিই প্রতীয়মান হইয়া উঠে। আর এক রূপ প্রমাণেও তাহাই প্রতিপন্ন করিয়া দিতেছে। ভিন্ন ভিন্ন পুরাণে পরস্পর এরূপ বিরুদ্ধ এবং ঘোরতর নিন্দাবাদ ও বিষময় বিদ্বেষভাব প্রকাশিত রহিয়াছে যে, সে নিন্দা এক মতাবলম্বী এক ব্যক্তি কর্ত্তৃক বিরচিত হওয়া কোন রূপেই সম্ভব নহে।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, উপক্রমণিকা, পৃষ্ঠা-২৩০-৩১)

             সে যাক, বেদব্যাস পুরাণ-সংহিতা একত্র করুন বা নাই করুন, যে সময়ে এই পুরাণ-সংকলন-বিষয়ক আখ্যানটি রচিত হয়েছিল, সে সময়ের প্রচলিত পুরাণ এরকমই ছিল বলতে হয়। বহুকাল পূর্বে পুরাণের এরকম অবস্থা থাকা হয়তো সম্ভব, কিন্তু তার পরেই যে অধুনাতন পুরাণগুলো সংকলিত হয়েছে এমনও নয়। বরং এটাই সম্ভব যে, পুরাণগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে এসেছে এবং তাতে কালে কালে নতুন নতুন বিষয় বিনিবেশিত হয়েছে।
তবে এই আঠারটি মহাপুরাণের তালিকায় কোন্ কোন্ পুরাণ থাকবে সে বিষয়ে পুরাণগুলোর মধ্যেই মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। সেই মতভেদ আলোচনা আমাদের অভীষ্ট নয় বিধায় আমাদের প্রাথমিক ধারণার সুবিধার্থে কেবলমাত্র দেবী ভাগবতোক্ত মহাপুরাণের তালিকাটি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। যেমন–

শৃণ্বন্তু সম্প্রবক্ষ্যামি পুরাণানি মুনিশ্বরাঃ।
যথা শ্রুতানি তত্ত্বেন ব্যাসাৎ সত্যবতীসূতাৎ।।
মদ্বয়ং ভদ্বয়ঞ্চৈব ব্রত্রয়ং ব চতুষ্টয়ম্ ।
অনাপলিঙ্গকুস্কানি পুরাণাণি পৃথক্ পৃথক্ ।।
অর্থাৎ : সূত বললেন– হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ! আমি সত্যবতীপুত্র ব্যাসদেবের কাছে যেমন যেমন শুনেছি, তেমনিভাবে পুরাণগুলির নাম বলে যাচ্ছি, আপনারা শুনুন। ‘ম’ অক্ষর দিয়ে আরম্ভ হয়েছে দুটি পুরাণ– মৎস্য, মার্কণ্ডেয়; ‘ভ’ অক্ষর দিয়ে আরম্ভ হয়েছে দুটি পুরাণ– ভবিষ্য, ভাগবত; ‘ব্র’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে তিনটি পুরাণ– ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড ও ব্রহ্মবৈবর্ত; ‘ব’ অক্ষর দিয়ে আরম্ভ হয়েছে চারটি পুরাণ– বামন, বায়ু, বিষ্ণু এবং বরাহ; ‘অ’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে একটি– অগ্নি; ‘ন’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে একটি– নারদ; ‘প’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে একটি– পদ্ম; ‘লিং’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে একটি– লিংগ; ‘গ’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে একটি– গরুড়; ‘কূ’ দিয়ে আরম্ভ হয়েছে একটি– কূর্ম; এবং ‘স্ক’ দিয়ে আরম্ভ একটি– স্কন্দ। এগুলিই হলো আঠারটি পুরাণ।

 

              পরবর্তীকালে সম্ভবত উপপুরাণগুলি রচিত হওয়ার পর তার থেকে প্রধান পুরাণগুলিকে পৃথক করে বোঝাবার জন্য মহাপুরাণ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব, এই আঠারটি মহাপুরাণ হলো– (১) ব্রহ্ম পুরাণ, (২) পদ্ম পুরাণ, (৩) বিষ্ণু পুরাণ, (৪) শিব পুরাণ, (৫) ভাগবত পুরাণ, (৬) নারদ পুরাণ, (৭) মার্কণ্ডেয় পুরাণ, (৮) অগ্নি পুরাণ, (৯) ভবিষ্য পুরাণ, (১০) ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, (১১) লিঙ্গ পুরাণ, (১২) বরাহ পুরাণ, (১৩) স্কন্দ পুরাণ, (১৪) বামন পুরাণ, (১৫) কূর্ম পুরাণ, (১৬) মৎস্য পুরাণ, (১৭) গরুড় পুরাণ ও (১৮) ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ। এগুলো হয় বৈষ্ণব, নয় শৈব, কিংবা শাক্ত মতানুসারী। তাই বলা হয়, পুরাণ হলো– বেদমূলক উত্তর বৈদিক সাহিত্য গ্রন্থ। বেদের শিক্ষাকে আখ্যান ও রূপকের সাহায্যে সাধারণ মানুষের কাছে মনোরম করে জনসমাজে প্রচার করা। যার ফলে এর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যই সবচেয়ে বেশি। তাই পুরাণের অপর নাম হলো– পঞ্চম বেদ। রামায়ণ ও মহাভারতকেও এই একই অর্থে পুরাণ বলা হয়।
যদিও মহাভারতের আদিপর্বের প্রথম অধ্যায়ে ব্যাসদেব মহাভারতকে সর্বশাস্ত্রের সার এবং চারবেদের তুলনায় আরো মহৎ সৃষ্টি বলে বর্ণনা করেছেন, আধুনিক গবেষকদের মতে আদিপর্বের এই সব আত্মপ্রচারমূলক অংশ অনেক পরের রচনা। মহাভারতের সামাজিক প্রতিষ্ঠার পর ঐসব অংশ সংযোজিত হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। তবুও মার্কণ্ডেয় পুরাণে প্রথম অধ্যায়ে মহাভারতকে একই সঙ্গে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষশাস্ত্র বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সমস্ত শাস্ত্রের মধ্যে একে শ্রেষ্ঠ বলে কীর্তন করা হয়েছে–

ধর্মশাস্ত্রমিদং শ্রেষ্ঠমর্থশাস্ত্রমিদং পরম্ ।
কামশাস্ত্রমিদঞ্চাগ্রং মোক্ষশাস্ত্রং তথোত্তমম্ ।।
যথাযুধানাং কুলিশমিন্দ্রিয়ানাং যথা মনঃ।
তথেহ সর্বশাস্ত্রাণাং মহাভারত সুত্তমম্ ।। (মার্কণ্ডেয় পুরাণ)
অর্থাৎ : এই মহাভারতই একমাত্র শাস্ত্র যেখানে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন অস্ত্রের মধ্যে বজ্র যেমন শ্রেষ্ঠ, ইন্দ্রিয়দের মধ্যে মন যেমন প্রধান, তেমনি সমস্ত শাস্ত্রের মধ্যে মহাভারতই হলো সর্বোত্তম।

 

             এখানে আরেকটি বিষয় স্মর্তব্য। বেদের যুগে দ্বিজাতি ছাড়া অপর কারো বেদপাঠের অধিকার ছিল না। তাছাড়া অত্যন্ত জটিল বিচার সাপেক্ষ বেদ শাস্ত্র সকলেই বুঝতে পারবে না বলেও ধরে নেওয়া হতো। এমনকি মেধাহীন ব্রাহ্মণ সন্তানদেরও গুরুরা বেদের সামান্য দু’চার কথা শিখিয়ে গুরুগৃহ থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। সমগ্র বেদ তাদের শেখানো হতো না। অথচ বেদের মূল তত্ত্বগুলো না জানলে হিন্দুধর্মের তাৎপর্য বোঝা এবং সঠিকভাবে পূজা-পাঠ করা অসম্ভব। এই কারণেই সকলে যাতে বেদের তত্ত্বকথা গল্পের এবং ইতিহাসের মাধ্যমে বুঝে নিতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই পুরাণশাস্ত্র রচিত হয়েছিল বলে কথিত হয়। ভাগবত পুরাণে তাই ব্যাসদেব বলছেন–

স্ত্রীশূদ্র দ্বিজবন্ধূনাং ত্রয়ী ন শ্রুতিগোচরা।
ইতি ভরতমাখ্যানং মুনিনা কৃপয়া কৃতম্ ।। (ভাগবত-পুরাণ)
অর্থাৎ : শূদ্র, স্ত্রীলোক এবং নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণদের (ত্রয়ী) বেদ শেখানো হতো না বা শোনানো হতো না। এদেরকে কৃপা করে বেদ শাস্ত্রের জ্ঞান দেবার জন্যই ব্যাসদেব মহাভারতাদি পুরাণ রচনা করেছেন।

অন্যান্য পুরাণেও এ-কথার প্রতিধ্বনি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, দেবী ভাগবতেও একই কথা বলা হয়েছে–

অল্পায়ুষোহল্পবুদ্ধীংশ্চ বিপ্রান্ জ্ঞাত্বা কলাবথ।
পুরাণসংহিতাং পুণ্যাং কুরুতেহসৌ যুগে যুগে।।
স্ত্রীশূদ্রদ্বিজবন্ধূনাং ন বেদশ্রবণং মতম্ ।
তেষামেব হিতার্থায় পুরাণানি কৃতানি চ।। (দেবী-ভাগবত)
অর্থাৎ : কলিযুগের ব্রাহ্মণদের আয়ুষ্কাল অত্যন্ত অল্প এবং বুদ্ধির স্বল্পতা দেখে, তাদের সহজেই বেদ শাস্ত্রের জ্ঞান দেবার জন্য ব্যাসদেব যুগে যুগে পুরাণ রচনা করেন। স্ত্রী, শূদ্র এবং অধম ব্রাহ্মণদের বেদ শ্রবণের অধিকার নেই দেখে, তাদের মঙ্গলের জন্যই ব্যাসদেব পুরাণ সংহিতা রচনা করেন।

 

           ভারতীয় পণ্ডিতেরা পুরাণশাস্ত্রকে শাস্ত্রীয় মর্যাদা দিলেও এবং অষ্টাদশ বিদ্যাস্থানের মধ্যে গ্রহণ করলেও, পুরাণের প্রকৃত ক্রমিক স্থান কিন্তু বেদের নিচে। বেদ অপৌরুষেয় শাস্ত্র, অর্থাৎ বেদ কারো রচনা নয়। ব্রহ্মের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মতো তা চিরকালই আছে। তা অনাদি অনন্তকাল ধরে লোকের মুখে মুখে গুরুশিষ্য পরম্পরা ক্রমে চলে আসছে। কিন্তু পুরাণ পৌরুষেয় অর্থাৎ কোনো পুরুষের রচনা। ব্যাসদেব পুরাণ রচনার পর তাঁর শিষ্যদের সেই পুরাণ পড়ান এবং এই শিষ্যদের দ্বারাই পরম্পরাক্রমে তা প্রচারিত হয়। এই কারণে বেদ শ্রুতি প্রস্থান এবং পুরাণ স্মৃতি প্রস্থান। যদি কোনো পুরাণের কথা বেদ বিরোধী হয়, তাহলে সেই পুরাণশাস্ত্রের বচন প্রামাণ্য বলে গ্রাহ্য হবে না। সেক্ষেত্রে বেদের কথাকেই প্রমাণ হিসেবে ধরতে হবে। এটাই বেদবিহিত শাস্ত্র বিধান।
অমরসিংহের অমরকোষ অনুযায়ী পুরাণের পাঁচ লক্ষণ– পুরাণং পঞ্চলক্ষণং। এই পাঁচ লক্ষণ কী কী, তা ঐ গ্রন্থের টীকায় বলা হয়েছে–

পঞ্চলক্ষণ সমন্বিতম্–
সর্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ বংশো মন্বন্তরাণি চ।
বংশানুচরিতাং চেতি পুরাণং পঞ্চলক্ষণম্ ।।
অর্থাৎ : পুরাণের পাঁচটি লক্ষণ হলো– (১) সর্গ (সৃষ্টি), (২) প্রতিসর্গ (প্রলয়ের পর নবসৃষ্টি), (৩) বংশ (দেবতা ও মহর্ষিগণের বংশ তালিকা), (৪) মন্বন্তর (চৌদ্দজন মনুর শাসন বিবরণ) ও (৫) বংশানুচরিত (রাজবংশাবলি)।

          এই পঞ্চলক্ষণযুক্ত প্রামাণিক গ্রন্থ হচ্ছে বিষ্ণু পুরাণ, কূর্ম পুরাণ ও বায়ু পুরাণ। কিন্তু কোন কোন পুরাণে এই পঞ্চলক্ষণের অল্পই নিদর্শন পাওয়া যায়। তার পরিবর্তে সেখানে দেবদেবীর মাহাত্ম্য ও ব্রত নিয়মাদি অন্যান্য পারমার্থিক বিষয় সবিশেষ বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া আবার কোনও কোনও পুরাণে আরও বেশি লক্ষণ আছে। যেমন স্কন্দ পুরাণে এতো বিভিন্ন বিষয়ের সমাবেশ আছে যে, শুধুমাত্র একেই একটা ‘বিশ্বকোষ’ বলা যায় বলে অনেকেই মনে করেন। সমস্ত পুরাণগুলো সংস্কৃত শ্লোকে, কদাচিৎ সংস্কৃত গদ্যে রচিত। এখানে কর্ম, ভক্তি, যোগ ও জ্ঞান এইসব বিষয়ে শিক্ষা থাকলেও পুরাণে ভক্তি-ধর্মের শিক্ষাই মুখ্য, কারণ তা জনগণের সদ্য কল্যাণকারক ও সহজেই অনুকরণীয়।

           এখানে বলে রাখা ভালো, প্রাক্-বৈদিক কাল থেকেই এদেশে রাজ অনুগৃহীত কিছু মানুষ ছিল, যাদের কাজ ছিল– দেশে দেশে গিয়ে প্রাচীন কালের কথা, রাজা-রাজড়াদের বীরত্বের কথা, প্রাচীন রাজবংশাবলির কথা বিভিন্ন আখ্যানের মাধ্যমে একত্রিত করে জনগণের মধ্যে প্রচার করা। এদের বলা হতো সূত বা মাগধ। সূত যে জাতি-বিশেষের নাম স্মৃতি ও পুরাণে তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যেমন–

তথা ক্ষেত্রে সূতপুত্রো নিহতো লোমহর্ষণঃ।
বলরামাস্তযুক্তাত্মা নৈমিষেহভূৎ স্ববাচ্ছয়া।। (কল্কিপুরাণ- ২৭ অধ্যায়)
অর্থাৎ : সেইরূপ, সূত-পুত্র লোমহর্ষণ স্বেচ্ছানুসারে নৈমিষ ক্ষেত্রে বলরামের গদা দ্বারা হত হইয়াছিলেন।

ব্যাসশিষ্যং মুখাসীনং সূতং বৈ রোমহর্ষণম্ ।
তং পপ্রচ্ছ ভরদ্বাজো মুনীনামগ্রতস্তদা।। (নৃসিংহ পুরাণ- প্রথম অধ্যায়)
অর্থাৎ : ব্যাসশিষ্য সূত লোমহর্ষণ সচ্ছন্দে উপবিষ্ট হইলে, সর্বাগ্রে ভরদ্বাজ মুনি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন।

কূর্ম্ম পুরাণে লিখিত আছে, সূত বংশোদ্ভব লোমহর্ষণ বলছেন–

মদষ্বয়ে চ যে সূতাঃ সম্ভূতা বেদবর্জ্জিতাঃ।
তেষাং পুরাণবক্তৃত্বং বৃত্তিরাসীদজাজ্ঞয়া।। (কূর্ম্মপুরাণ- ১২ অধ্যায়/৩৮-৩৯)
অর্থাৎ : আমার বংশে যে সকল সূতের উৎপত্তি হইয়াছিল, তাঁহাদের বেদে অধিকার ছিল না ; তাঁহারা ভগবানের আজ্ঞানুসারে পুরাণ ব্যবসায় করিতেন।

পুরাণজ্ঞ সূত লোমহর্ষণের ন্যায় তাঁর পুত্র উগ্রশ্রবারও যে সূত সংজ্ঞা প্রাপ্তি ঘটে তারও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যেমন–

শৌনক উবাচ।
সূত সূত মহাভাগ বদ নো বদতাং বর।
কথাং ভাববতীং পুণ্যাং যদাহ ভগবান শুকঃ।।
অর্থাৎ : শৌনক উগ্রশ্রবাকে কহিলেন সূত! তুমি অতি ভাগ্যবান এবং সুবক্তাদিগের মধ্যে অগ্রগণ্য। ভগবান শুকদেব যে পবিত্র ভাগবত-কথা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, তুমি আমাদিগের সমীপে তাহা বর্ণন কর।
.
শৌনক উবাচ।
উক্তং নাম যথা পূর্ব্বং সর্ব্বং তচ্ছ্রুতবানহম্ ।
যথা তু জাতোহ্যাস্তীক এতদিচ্ছামি বেদিতুম্ ।
তচ্ছ্রুত্বা বচনং তস্য সূতঃ প্রোবাচ শাস্ততঃ।।
–(মহাভারত-আদিপর্ব- ৪০ অধ্যায়/ ৬ শ্লোক)
অর্থাৎ : শৌনক কহিলেন, তুমি যাহা যাহা কহিলে, সমুদায় শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে আস্তীকের জন্ম-বৃত্তান্ত জানিতে অভিলাষ হইয়াছে। সূত উগ্রশ্রবা এই বাক্য শ্রবণ করিয়া শাস্ত্রানুসারে কহিতে লাগিলেন।

 

            অতএব, কেবল সূত নামক ব্যক্তি-বিশেষ পুরাণ-বক্তা ছিলেন এ কথা কোনভাবেই প্রামাণিক নয়। বস্তুত পুরাণ-কথন সূত নামক জাতি-বিশেষের ব্যবসায় ছিল এটাই সর্বতোভাবে যুক্তিসিদ্ধ। কেননা, পুরাণে সূত জাতির যেরূপ বৃত্তি নিরূপিত আছে, তা বিবেচনা করে দেখলেই প্রথম প্রকার পুরাণের স্বরূপ ও তাৎপর্যার্থ কিঞ্চিৎ জ্ঞাত হওয়া যায়, যেমন–

তস্য বৈ জাতমাত্রস্য যজ্ঞে পৈতামহে শুভে।
সূতঃ সূত্যাং সমুৎপন্নঃ সৌত্যেহহনি মহামতিঃ।।
তস্মিন্নেব মহাযজ্ঞে জজ্ঞে প্রাজ্ঞোহথ মাগধঃ।
প্রোক্তৌ তদা মুনিবরৈস্তাবুভৌ সূতমাগধৌ।।
স্তূয়তামেপ নৃপতিঃ পৃথর্ব্বৈণ্যঃ প্রতাপবান্ ।
কর্ম্মৈতদনুরূপং বাং পাত্রং স্তোত্রস্য চাপ্যয়ম্ ।।
–(বিষ্ণুপুরাণ- ১ অংশ/ ১৩ অধ্যায়/ ৫০-৫৩ শ্লোক)
অর্থাৎ : সদ্যোজাত পৃথু রাজার শুভ যজ্ঞে সোমাভিষব-ভূমিতে ভূপতির জন্মদিবসেই সূতের উৎপত্তি হইল এবং জ্ঞানবান মাগধও সেই মহাযজ্ঞে উৎপন্ন হইলেন। পিতামহ ব্রহ্মা এই যজ্ঞের দেবতা। তখন মুনি সকলে তাঁহাদের উভয়কে কহিলেন, তোমরা এই বেণ-তনয় পৃথু রাজার স্তুতি কর, ইহাই তোমাদের যথার্থ কার্য্য এবং ইনি তোমাদের স্তুতির উপযুক্ত পাত্র।
.
তে উচুর্ঋষয়ঃ সর্ব্বে স্তুয়তামেপ পার্থিবঃ।
তৈর্নিযুক্তৌ সুকর্ম্মাণি পৃথোর্যানি মহাত্মনঃ।
তুষ্টুবুস্তানি সর্ব্বানি আসীর্ব্বাদাংস্ততঃ পরান্ ।।
–(বহ্নিপুরাণ/ পৃথুর উপাখ্যান নামক অধ্যায়)
অর্থাৎ : সেই ঋষিগণ সূত ও মগধকে কহিলেন, তোমরা এই ভূপতির স্তব কর। সূত ও মাগধ তাঁহাদের কর্তৃক নিযুক্ত হইয়া মহাত্মা পৃথুর সৎকীর্তি সমুদায় কীর্তন করিয়া তাহাদের কল্যাণ কামনা করিলেন।

            বায়ু ও পদ্মপুরাণেও সূতের এই ধরনের বৃত্তান্ত আছে। এই দুই পুরাণে লিখিত আছে, সূতের দুই প্রকার বৃত্তি নিরূপিত ছিল– পুরাণ-কীর্তন ও ক্ষত্রিয়-কর্ম। রামায়ণ ও মহাভারতেও তাদের সারথ্য কর্ম ও রাজবংশের যশোবর্ণন এই উভয় বৃত্তি থাকার প্রচুর প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের দ্বারাই রাজ-বংশাবলি-বিবরণ ও এবিষয়ক কিছু কিছু পুরাবৃত্ত রক্ষিত হয়ে পুরাণ নামে প্রসিদ্ধ হয়। অক্ষয় কুমার দত্ত বলেন, রামায়ণের অন্তর্গত সুমন্ত্রের পৌরাণিক কথা তার দৃষ্টান্তস্থল। আর মহাভারতের অনেক স্থানে বংশ বিশেষের কীর্তনই যে পুরাণ বলে লিখিত আছে তারও এই কারণ। যেমন, মহর্ষি শৌনক বলছেন–

পুরাণে হি কথা দিব্যা আদিবংশাশ্চ ধীমতাম্ ।
কথ্যন্তে যে পুরাস্মাভিঃ শ্রুতপূর্ব্বাঃ পিতুস্তবঃ।।
–(মহারভারত-আদিপর্ব- পঞ্চমাধ্যায়/২ শ্লোক)
অর্থাৎ : পুরাণে সমুদায় মনোহর কথা ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদিগের আদি-বংশের বৃত্তান্ত আছে। পূর্বে আমরা তোমার পিতার সন্নিধানে সে সমস্ত কথা শ্রবণ করিয়াছি।

 

           বস্তুত এই সূত ও মাগধরাই ছিলেন সেকালের রাজ-ঐতিহাসিক। এরাই পুরনো দিনের কথা, গাথা, প্রশস্তি ও আখ্যানগুলোকে পরম্পরাগতভাবে উত্তরকালের কাছে পৌঁছে দিতো। তাই সমাজে এঁদের বেশ মান্যতাও ছিল। এটাই ছিল আমাদের দেশের ইতিহাস রক্ষার প্রাচীন ব্যবস্থা। যদিও এই ব্যবস্থায় শ্রোতা ও বক্তার কল্পনার দৌড়ে অনেক সময়ই বাস্তবতার সীমারেখা হারিয়ে যেতো। আজ আমরা যাকে ক্রিটিক্যাল বৈচারিক ইতিহাস বলি সে যুগে এ রকম কোনও নৈষ্ঠিক ব্যবস্থা চালু ছিল না। বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পর এই সমস্ত আখ্যান ও উপকথাগুলো ‘জাতক’ কাহিনির রূপ ধারণ করে। জাতক কাহিনিগুলো প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৌদ্ধধর্ম মহাসম্মেলনে সংকলিত হয়ে যায়। উল্লেখ্য, তৃতীয় মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (২৬৯-২৩২ খ্রিস্টপূর্ব)।
এখানে বলা বোধ করি বাহুল্য হবে না যে, কোন বৈদিক আখ্যানকে বিস্তৃততর রূপ দিয়ে নিজের মত করে সাজানোর যে প্রয়াস পুরাণ সাহিত্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তা কোন্ প্রেক্ষিতে কিংবা কেন এমনটা হতে হলো সে বিষয়ে কিছুটা প্রাক্-ধারণা না থাকলে পূর্বকালীন পৌরাণিক গাথা বা সুপ্রাচীন উপাখ্যান থেকে পরবর্তীকালের অধুনাতন পুরাণ সাহিত্য রচনা বা সংকলনের কার্যকারণ ও গুরুত্ব যথাযথ অনুধাবন করা যাবে না।

            আমরা জানি, সম্রাট অশোকের কাল থেকে প্রাক্-গুপ্ত যুগ অবধি প্রায় পাঁচ-ছয়শো বছর ধরে দেশে বৌদ্ধ ধর্মের বিপুল প্রাবল্য দেখা দেয়। দলে দলে সাধারণ ও নিম্নকোটির মানুষেরা ধর্মান্তরিত হতে থাকে। সনাতন ধর্মের উপর বৌদ্ধ ধর্মের এই আঘাতকে সামাল দেওয়া তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদীদের জন্য অতীব জরুরি হয়ে পড়ে। তাছাড়া এই সময় থেকেই সনাতনী সমাজব্যবস্থা ধারাবাহিক অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে বিভিন্ন সংকটের মধ্যে পড়তে থাকে। ফলে এইসব আঘাতকে সামাল দিয়ে সমাজকে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টাতেই বৈদিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বহুলভাবে সমৃদ্ধ ও ক্রমবিবর্তিত হতে থাকে; যার ফসল হলো আজকের বিপুল বৈদিক সাহিত্যসম্ভার ও বেদমূলক উত্তর-বৈদিক সাহিত্য– পুরাণ। বস্তুত এ জন্যেই পরবর্তীকালের পৌরাণিক ধর্মের উদ্ভব। আর্য-অনার্য-ব্রাত্য ধর্মের চূড়ান্ত সংশ্লেষণের মধ্যে দিয়েই পৌরাণিক ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ। তখন আর্য ও অনার্য জাতির ঐতিহ্য, দেবতাবাদ, পূজা-পার্বণ সূত বা মাগধদের মুখে মুখে চলে আসা রাজকাহিনী ও শক্তিধর পুরুষদের কাহিনী ও সমস্ত কিছুকেই একত্রিত করে বর্তমানে প্রচলিত পুরাণের উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা। তবে এ সমস্ত গাথা কথা যেহেতু আর্য প্রতিভায়, আর্য ভাষায় গ্রথিত হয়েছে, তাই এতে আর্য প্রাধান্য ও প্রভাব আছে বিস্তর। এই পুরাণগুলো নব-সংস্কৃতি ও নব-সভ্যতার ধারক ও বাহক। যা পরবর্তীকালের হিন্দুধর্ম, হিন্দু সভ্যতা ও হিন্দু সংস্কৃতি।
শ্রদ্ধেয় গিরীন্দ্রশেখর বসু’র ভাষ্যে,– ‘পুরাকালে ভারতবর্ষ বহু খণ্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক রাজার সভায় একজন করিয়া মাগধ থাকিতেন। মাগধগণ নিজ নিজ প্রভু রাজার বংশ-বিবরণ ও কীর্তিকলাপ জানিয়া রাখিতেন। স্টেট হিস্টরিয়ন (State Historian) বলিলে আমরা যাহা বুঝি, মাগধ তাহাই। পূর্ববর্ণিত সূতগণ বিভিন্ন দেশের মাগধগণের নিকট হইতে সমসাময়িক ‘হিষ্টরি’ সংগ্রহ করিতেন। কোন মাগধ স্বীয় প্রভু সম্বন্ধে কোন অত্যুক্তি করিয়া থাকিলে বা প্রভুর কোন দোষ গোপন করিয়া থাকিলে সূতগণ তাহা সংশোধন করিতেন। এইজন্যই সূতগণকে সত্যব্রতপরায়ণ বলা হইয়াছে। সূতগণ সকল রাজারই বংশবিবরণাদি জানিতেন। পুরাকালে রাজা ও ঋষিগণ প্রায়ই যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিতেন। যজ্ঞে নানা দেশ হইতে বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ও বিদ্বান ঋষিগণ নিমন্ত্রিত হইয়া আসিতেন। যজ্ঞে সূতগণ আগমন করিয়া নিজ নিজ সংগৃহীত বিবরণ পাঠ করিতেন। এই সূতোক্ত কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া রাখা এক শ্রেণীর ঋষির কার্য ছিল। পরম্পরাপ্রাপ্ত সূত-কাহিনী ঋষিগণ কর্তৃক গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ হইয়া পুরাণ নামে পরিচিত হইয়াছিল।’– (পুরাণে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, গিরীন্দ্রশেখর বসু অগ্রন্থিত বাংলা রচনা, পৃষ্ঠা-১৫০)
তাই অশোক রায়ের মতামত হলো,– ‘বেদের সময়কাল বা তারও আগেকার পুরাবৃত্ত, ইতিবৃত্ত, আর্য-অনার্য জাতির রূপকথা, নীতিকথা, ব্যবহারিক জ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিদ্যা, তার ভূয়োদর্শন ও সমস্ত চিন্তার ফল, তার ভাবজগৎ, কর্মজগৎ ও যা কিছু শ্রেষ্ঠ উদ্দীপনাময় ও অনুপ্রেরণাময় তার সবকিছু নিয়েই সৃষ্টি হল ভারতের অপূর্ব বিশ্বকোষ বা পুরাণ গ্রন্থরাশি। এতে অলংকারশাস্ত্র, ব্যাকরণশাস্ত্র, বৈদ্যশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, নীতিশান্ত্র এমনকী বিজ্ঞান ও ভূগোল পর্যন্ত এতে পাওয়া যায়। তাই শ্রদ্ধেয় গিরীন্দ্র শেখর বসু ও ড. রামগোপাল দেবদত্ত ভান্ডারকার মনে করেন– পুরাণ সমূহের মধ্যেই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। এফ. ই. পর্জিটার মনে করেন– বেদ অপেক্ষা পুরাণের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক বেশি। এল. ভি. বার্নেটেরও ওই একই মত। শ্রীমতি রমিলা থাপারও ঐতিহাসিক তথ্যের উৎস হিসাবে পুরাণগুলির বিশেষ গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড. ভিনসেন্ট স্মিথ দেখিয়েছেন– মৎস্য পুরাণে অন্ধ্র-রাজগণের বংশতালিকা ও তাঁদের রাজত্বকাল সঠিকভাবে দেওয়া আছে।’– (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-১৯৫)

            তবুও পুরাণের কাহিনীগুলিতে যেসব অভিনব আখ্যানাদি দেখা যায় তাতে করে আমাদের কাছে বস্তুতই পুরাণের কোন্ অংশ পুরাণ আর কোন্ অংশ ইতিহাস তা রহস্যময় বলেই মনে হয়। তবে উপনিষদের মধ্যে যে পুরাণ ইতিহাসের প্রসঙ্গ আছে, সে বিষয়ে বেদ-টীকাকার সায়নাচার্য্য বলেছেন–

দেবাসুরাঃ সংযত্তা আসন্নিত্যাদয় ইতিহাসঃ। ইদং বা অগ্রে…… কিঞ্চিদাসীদিত্যাদিকং জগতঃ প্রাগবস্থামুপক্রম্য সর্গপ্রতিপাদকং বাক্যজাতং পুরাণং।- (ঋগ্বেদ-উপোদ্ঘাত)
অর্থাৎ :
বেদের অন্তর্গত দেবাসুরের যুদ্ধ বর্ণনা প্রভৃতির নাম ইতিহাস, আর সৃষ্টি প্রক্রিয়া-বিবরণের নাম পুরাণ।

শঙ্করাচার্যের মতও প্রায় অভিন্ন। তিনি বলেছেন–

ইতিহাস ইত্যুর্ব্বশীপুরূরেরভোঃ সংবাদাদিরূর্ব্বশীহাপ্সরা ইত্যাদিব্রাহ্মণমেব পুরাণমসদ্বা ইদমগ্র আসীদিত্যাদি।- (বৃহদারণ্যক-উপনিষদের চতুর্থ ব্রাহ্মণের ভাষ্য)
অর্থাৎ :
উর্ব্বশী পুরুরবার কথোপকথনাদিস্বরূপ ব্রাহ্মণ-ভাগের নাম ইতিহাস, আর সৃষ্টি প্রক্রিয়া-ঘটিত বৃত্তান্তের নাম পুরাণ।

সে যাক্, পুরাণ ও উপপুরাণ কেবল মনঃ-কল্পিত অভিনব বিষয়েই পরিপূর্ণ এমন নয় বলে অক্ষয় কুমার দত্তের অভিমত। তিনি আরও বলেন,– ‘ঐ সমুদায় এবং তাদৃশ পুনরুদ্দীপ্ত ধর্ম্ম-প্রণালীর অনুযায়ী অন্য অন্য গ্রন্থ-রচয়িতারা পূর্ব্বতন ঋষি, মুনি, রাজগণাদি সংক্রান্ত প্রাচীন বিষয় সমুদায় সঙ্কলন পূর্ব্বক নিজ নিজ গ্রন্থে সন্নিবেশ করিয়াছেন এবং শৈব-বৈষ্ণবাদি নূতন নূতন উপাসক-সম্প্রদায় সংক্রান্ত বহুবিধ বিষয়ের সহিত সংযুক্ত করিয়া তাহাদের নানারূপ অভিনব বেশ সম্পাদন করিয়া গিয়াছেন।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, পৃষ্ঠা-২৩৪)
বস্তুত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এই ত্রিমূর্তির উপাসনা প্রচার এবং বিশেষত শিব, বিষ্ণু ও তাঁদের শক্তিগণের মহিমা-কীর্তন ও আরাধনা-প্রচলন করাই সমস্ত পুরাণ ও উপপুরাণের প্রধান উদ্দেশ্য। এ বিষয়ে অক্ষয় কুমার দত্তের ভাষ্য হলো–
‘মহাভারত ও পুরাণ-কর্ত্তাদের নিজ নিজ মত-প্রভাব-প্রচার ও সম্প্রদায়-বর্দ্ধন-সাধন উদ্দেশে পুরাণ-বিশেষে ও উপাখ্যান-বিশেষে দেবতা-বিশেষের সমধিক মাহাত্ম্য কীর্ত্তিত হইয়াছে। এই হেতু, অমাবস্যা ও পৌর্ণমাসী পরস্পর যেরূপ বিপরীত পদার্থ, ভিন্ন ভিন্ন পুরাণে সেইরূপ পরস্পর-বিরুদ্ধ মত সমুদায় প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। শৈব গ্রন্থকার মহাদেবকে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর স্রষ্টা, বৈষ্ণব গ্রন্থকার বিষ্ণুকে ব্রহ্মা ও মহাদেবের সৃজন-কর্ত্তা এবং শাক্ত গ্রন্থকার ভগবতীকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব তিনেরই উৎপাদন কর্ত্রী বলিয়া বর্ণন করিয়াছেন।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, উপক্রমণিকা পৃষ্ঠা-২৩৪)

           বিষয়টি অবশ্যই আকর্ষণীয় ও কৌতুহলোদ্দীপক। আমাদের এই কৌতুহল নিবৃত্তির লক্ষ্যে পরস্পর-বিরোধী এই পুরাণ-সাহিত্যের কিছু নমুনা উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। যেমন, শৈব মতাবলম্বী লিঙ্গপুরাণের মতে, শিব ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর জন্মদাতা বলে বর্ণিত হয়েছে–

অথোবাচ মহাদেবঃ প্রীতোহহং সুরসত্তমৌ।
পশ্যতং মাং মহাদেবং ভয়ং সর্ব্বং বিমুঞ্চতম্ ।।
যুবাং প্রসূতৌ গাত্রাভ্যাং মম পূর্ব্বং মহাবলৌ।
অয়ং মে দক্ষিণে পার্শ্বে ব্রহ্মা লোকপিতামহঃ।।
বামে পার্শ্বে চ মে বিষ্ণুর্বিশ্বাত্মা হৃদয়োদ্ভবঃ।- (লিঙ্গপুরাণ-১৭/১-৩)
অর্থাৎ : পরে মহাদেব বলিলেন, সুরশ্রেষ্ঠ (ব্রহ্মা ও বিষ্ণু)! আমি (নারায়ণের স্তবে) সন্তুষ্ট হইয়াছি। আমি মহাদেব; আমাকে নির্ভয়ে দর্শন কর। পূর্বকালে, তোমরা দুই মহাবল (পুরুষ) আমার শরীর হইতে উৎপন্ন হইয়াছ। এই লোক-পিতামহ ব্রহ্মা আমার দক্ষিণ পার্শ্বে ও জগতের আত্মাস্বরূপ হৃদয়োদ্ভব বিষ্ণু আমার বাম পার্শ্বে প্রসূত হন।

অন্যদিকে ভাগবত কর্তা ভাগবত-পুরাণে বলছেন–

সৃজামি তন্নিষুক্তোহহং হরো হরতি তদ্বশঃ।- (ভাগবত-২/৩/৩০)
অর্থাৎ : আমি (অর্থাৎ ব্রহ্মা) তাঁহা (অর্থাৎ বিষ্ণু) কর্তৃক নিযুক্ত হইয়া সৃজন করিতেছি এবং মহাদেব তাঁহার নির্দেশক্রমে সংহার করিতেছেন।

বিষ্ণুপুরাণে বলা হচ্ছে–

ভ্রূকুটীকুটিলাৎ তস্য ললাটাৎ ক্রোধদীপিতাৎ।
সমুৎপন্নস্তদা রুদ্রো মধ্যাহ্নার্কসমপ্রভঃ।।- (বিষ্ণুপুরাণ-১/৭/১০)
অর্থাৎ : তাঁহার (অর্থাৎ ব্রহ্মার) ক্রোধানলে প্রদীপ্ত ভ্রূকুটী-কুটিল ললাট-দেশ হইতে মধ্যাহ্ন কালের সূর্যপ্রভার ন্যায় প্রভা-বিশিষ্ট রুদ্র উৎপন্ন হইলেন।

আবার মহাভারতের অনুশাসনপর্বে বলা হচ্ছে–

অশক্তোহহং গুণান্ বক্তুং মহাদেবস্য ধীমতঃ।
যোহি সর্ব্বগতো দেবো ন চ সর্ব্বত্র দৃশ্যতে।।
ব্রহ্মাবিষ্ণুসুরেশানাং স্রষ্টা চ প্রভুরেব চ।
ব্রহ্মাদয়ঃ পিশাচান্তা যং হি দেবা উপাসতে।।
প্রকৃতীনাং পরত্বেন পুরুষস্য চ যঃ পরঃ।
চিন্ত্যতে যো যোগবিদ্ভির্ঋষিভিস্তত্ত্ব দর্শিভিঃ।।- (মহাভারত-অনুশাসনপর্ব-১৪/৩-৫)
অর্থাৎ : যিনি সর্বত্র-ব্যাপী অথচ কোথাও দৃষ্টিগোচর নন, যিনি ব্রহ্মা বিষ্ণু ও দেবরাজের সৃষ্টিকর্তা ও প্রভু এবং ব্রহ্মা অবধি পিশাচ পর্যন্ত দেবগণ যাঁহার উপাসনা করেন, আমি সেই ধীমান মহাদেবের গুণ-বর্ণনে অশক্ত।

অপরদিকে অনেক পুরাণেই ভগবতীকে শিব-ভার্য্যা বলে উল্লিখিত আছে, অথচ আবার মার্কণ্ডেয়-পুরাণের দেবীমাহাত্ম্যচণ্ডী-মধুকৈটভবধপ্রকরণের ৮৩ ও ৮৪ শ্লোকে তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব তিনেরই জননী বলে বর্ণিত হয়েছেন–

বিষ্ণুঃ শরীরগ্রহণ সহ মীশান এব চ।
কারিতা স্তে যতোহতস্ত্বাং কঃ স্তোতুং শক্তিমান্ ভবেৎ।।- (মার্কণ্ডেয়-পুরাণ)
অর্থাৎ : তুমি আমার (অর্থাৎ ব্রহ্মার), বিষ্ণুর ও মহাদেবের শরীর উৎপাদন করিয়াছ। অতএব কে তোমার স্তব করিতে সক্ষম হইতে পারে?

 

              এভাবে ভক্ত-বিশেষের ভক্তি-প্রভাবে কোন পুরাণ উপাখ্যানে শিব, কোথাও বিষ্ণু এবং কোথাও বা ভগবতী সর্বপ্রধান দেবতা হিসেবে পরিকীর্তিত হয়েছেন। স্বমত-পক্ষপাতী পর-মত-দ্বেষী পণ্ডিতেরা প্রতিপক্ষের উপাস্য দেবের মহিমা খর্ব করে নিজ নিজ উপাস্য দেবতার মহিমা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই যে ঐ সমস্ত উপাখ্যান ও পরস্পর-বিরুদ্ধ মতামতগুলি উদ্ভাবন করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। আবার আপাত বিদ্বেষহীন বা সমন্বয়বাদী স্মার্ত পণ্ডিতেরা সেসব মতামত নিজেদের রুচি বিরোধী দেখে বিরোধ-নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সবগুলিকে সামঞ্জস্য-সাধনের উদ্দেশ্যে অন্যত্র এমন ভাব প্রকাশ করেছেন যে, যিনিই ব্রহ্মা, তিনিই বিষ্ণু, তিনিই মহেশ্বর।
কিন্তু আমাদের বর্তমান আলোচনার লক্ষ্যবিন্দু যেহেতু লিঙ্গ প্রতীকে সর্বেশ্বর মহাদেব শিবের সুলুক সন্ধান করা, সেহেতু এবার আমরা শৈব পুরাণ-সাহিত্যের সহায়তায় আমাদের অনুসন্ধান জারি রাখতে পারি।

(চলবে…)

[পূর্বের পোস্ট : প্রাচীন সাহিত্যে শিব] [×] [পরের পোস্ট : পুরাণ শাস্ত্রে শিব ও লিঙ্গ]

 

 

 

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 439,415 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   সেপ্টে. »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: