h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৪ : মানববিকাশের নৃতাত্ত্বিক ধারায় লিঙ্গোপাসনার পটভূমি

Posted on: 11/03/2018


Mukhalinga

শিব ও লিঙ্গ-০৪ : মানববিকাশের নৃতাত্ত্বিক ধারায় লিঙ্গোপাসনার পটভূমি
রণদীপম বসু

ইতঃপূর্বে আমরা যদিও পর্যায়ক্রমিক আলোচনায় মাঝেমধ্যে নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি-প্রসূত কিছু কিছু প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি টেনেছি, তবুও আলোচনার স্পষ্টতার জন্যে মানবসভ্যতার বিবর্তন ধারার প্রাথমিক আরও কিছু আলোচনা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। বিষয়গত ধারণার স্পষ্টতার লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক অনুমানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বিদ্বান লেখকদের পূর্বাপর নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার একটা সমন্বিত সার-সংক্ষেপ এখানে বিবৃত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

               নৃতাত্ত্বিকেরা হাতিয়ারের ক্রমবিকাশের ধারা অনুশীলন করে মানবসভ্যতার বিকাশের ঐতিহাসিক যুগের যে ধারা চিহ্নিত করেছেন তা হলো যথাক্রমে– প্রস্তর যুগ, তাম্রযুগ, ব্রোঞ্জ যুগ এবং লৌহ যুগ। কেননা এই হাতিয়ারের ক্রমবিকাশের ধারা অনুশীলন করলেই ব্যবহারকারীদের ক্রমবিবর্তন অনুশীলন করা যায়। আর প্রগৈতিহাসিক প্রত্ন-প্রাচীন প্রস্তর যুগকে আবার উপবিভাগে ভাগ করা হলো– প্রত্নপ্রস্তর বা আদি-প্রস্তর যুগ, মধ্য-প্রস্তর যুগ ও নব বা নব্য-প্রস্তর যুগ। কিন্তু হাতিয়ার তৈরি ছাড়াও শিকারের প্রয়োজনে মানুষ জোট বাঁধতে বাধ্য হলো। ফলে, ভাবের আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা থেকে শুরু হলো ভাষার ব্যবহার। জোটবদ্ধ জীবনে প্রথমে জৈবিক প্রয়োজনে, তারপর ধীরে ধীরে দেখা দিলো পরিবারের প্রয়োজনীয়তা। প্রকৃতির সাথে নিয়ত সংগ্রামশীল মানুষ পর্যায়ক্রমে শিখলো কাঁচা ও পোড়া মাটির ব্যবহার। তারপর একে একে আয়ত্ত করলো তামা, ব্রোঞ্জ ও সবশেষে লোহার ব্যবহার। ‘এরমধ্যে যেসব জিনিস বিনষ্ট হওয়ার তা কালের প্রভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। আর যা নষ্ট হওয়ার নয় তা চাপা পড়ে রইলো– মাটির তলায় বা পৃথিবীর পাঠশালায়, কালের লিখন হয়ে।’
মানবসভ্যতা বিকাশের এই ধারা সারা পৃথিবীতে এতই সুশৃঙ্খল ও সাদৃশ্যপূর্ণ যে তা দেখে নৃতাত্ত্বিক ও পণ্ডিত মহলের প্রশ্ন জন্মেছে যে, পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর (সিন্ধু থেকে নীলনদ-এর মধ্যে) বৈসাদৃশ্য থেকে সাদৃশ্যই এত বেশি যে (স্থানভেদে একটু আধটু অদল-বদল হলেও মূলত এক) কতগুলো সম্ভাবনার কথা ভাবতেই পারা যায় যে, এইসব অত্যুন্নত প্রাচীন সভ্যতাগুলো কি কোনও এক অতিপ্রাচীন সভ্যতারই শাখা-প্রশাখা! নাকি এরা সকলেই কোনও এক অতি প্রাচীন সভ্যতার দেশ-কাল-পাত্রভেদের প্রকাশস্বরূপ!
সর্বত্রই দেখা যায় যে, নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে মানবসভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশের ধারা (স্থান-কাল-পাত্রভেদে একটু-আধটু অদল-বদল হলেও) মূলত প্রায় একইরকম, কারণ সর্বত্র প্রকৃতিই হলো তার এক ও অদ্বিতীয় পাঠশালা। তাই ক্রমবিকাশের সারণি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল– এখানে বিশৃঙ্খলার কোনও স্থান নেই। কালের নিয়মে যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চাপা পড়ে আছে মাটির নিচে, সেই প্রাকৃতিক নিয়মের বৈশিষ্ট্য হলো, যত প্রাচীন তত নিচে, আর নবীনের স্থান তার উপরে। ফলে গভীরতাই হলো প্রাচীনত্ব পরিমাপের সাধারণ সূত্র, আর নৃতাত্ত্বিক পরিভাষায় একেই বলে স্তরক্রম (Straticgraphic column)। এই স্তরক্রম থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শনের সূত্র-বিশ্লেষণের মাধ্যমে অগ্রন্থিত মানব-সংস্কৃতির প্রাসঙ্গিক সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা-বিন্যাস করা হয়।

জীব বিকাশের কোনও এক ধারা বেয়ে এসেছে মানুষ। সে তখন নিশ্চয়ই আজকের মতো দেখতে ছিল না। সে ছিল অরণ্যচারী, লোমশ, উলঙ্গ, রিপুতাড়িত জান্তব প্রাণী বিশেষ। মানুষের সমস্ত ভালো-মন্দ গুণাবলিই ছিল তার মধ্যে ভ্রূণ অবস্থার মহাসুষুপ্তিতে। শুধুমাত্র বাঁচার আকাঙ্ক্ষায়, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ও জৈবিক তাগিদে সে আয়ত্ত করেছিল পারিপার্শ্বিকতাকে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার হাত থেকে বাঁচার জন্যে বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন লক্ষণ ও নানা বৈশিষ্ট্যযুক্ত হয়ে উঠে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত হচ্ছিলো। এদেরই এক শাখা থেকে ক্রমে উদ্ভূত হয়েছিলো নরাকার জীব বা প্রাইমেট। বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে মানুষের পূর্বপুরুষ এপ-ম্যান বা কপি-নরদের আবির্ভাব হয় এক কোটি চল্লিশ লক্ষ বছর আগে। তারপর পঁচিশ লক্ষ বছর আগে নরাকার জীবেদের মধ্যে মানুষের লক্ষণযুক্ত জীবের আবির্ভাব ঘটে। তবে এরা প্রকৃত নর নয়, এরাও কপি-নর বা এপ-ম্যান বিশেষ। বর্তমান মানুষের পূর্বপুরুষ ‘হোমো গণের’ (Genus) আবির্ভাবও প্রায় ওই একই সময়ে। এরপর ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ বা প্রাগৈতিহাসিক মানব বা আদিম মানবের আবির্ভাব হয় তিন থেকে পাঁচ লক্ষ বছর আগে, খুব সম্ভবত গুঞ্জ-মিন্ডেল তুষার যুগের অন্তর্বর্তী সময়ে। আর সবশেষে আধুনিক (বিজ্ঞ) মানুষ ‘হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্স’-এর আবির্ভাব হয়েছে মাত্র পঞ্চাশ হাজার বছর আগে। আর তারা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মাত্র পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে।
নৃবিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে প্রায় ৬ লক্ষ থেকে ১০ হাজার বছর আগে অবধি পৃথিবীতে এসেছে চার-চারটে তুষার যুগ, যা মানব সভ্যতার ধারাকে করেছে ক্রমত্বরান্বিত। যাদেরকে চিহ্নিত করা হয় গুঞ্জ, মিন্ডেল, রিস ও উয়র্ম নামে। আর দুই তুষার যুগের মধ্যিখানে অন্তর্বর্তী উষ্ণ যুগ। এক তুষার যুগে অরণ্য ধ্বংস হয়ে গিয়ে অন্তর্বর্তী যুগে দেখা দিলো তৃণভূমি। তখন নরাকার বৃক্ষচারীর দল মাটিতে নেমে এসে ক্রমশ দু’পায়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। আর তখনই তার হাত দুটো চলাফেরার প্রয়োজন থেকে হলো চিরমুক্ত। আর দৃষ্টিশক্তিও হলো ক্রমেই সুদূরপ্রসারী। এই দৃষ্টিশক্তিই তাকে দূরের জিনিস দেখতে ও বিপদের সময় দূরে ছুটে পালাতে সাহায্য করলো। বিপদে পড়লে পালানোই ছিলো আদিম মানবের ধর্ম, রুখে দাঁড়ানো নয়।
আর এক হিমযুগের প্রভাবে, শুধুমাত্র বাঁচার প্রয়োজনে তাকে আশ্রয় নিতে হলো গুহায়। গায়ে জড়াতে হলো শিকার করা পশুর ছাল, এবং অবশ্যই তা লজ্জা নিবারণের জন্যে নয়। পেটের জ্বালা তাকে বাধ্য করলো পশুশিকারে। আত্মরক্ষার প্রয়োজন ও শিকারের তাগিদে প্রথমেই সে শিখলো হাতের কাছের সবচাইতে সহজলভ্য জিনিস পাথরকে ব্যবহার করতে, তৈরি হলো– হাতিয়ার। হাতিয়ার তৈরি ছাড়াও শিকারের প্রয়োজনে মানুষ জোট বাঁধতে বাধ্য হলো। শিখতে হলো আগুনের ব্যবহার। শুরু হয়ে গেলো মানব সভ্যতার জয়যাত্রা। এরকমই কোনও এক সময়কালে আদিম মানবের গুহা ও তার আশপাশ থেকে এমন কতকগুলো প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে যা পরবর্তীকালের ধর্মের সাথে সম্বন্ধযুক্ত বলে নৃতাত্ত্বিকদের ধারণা।

              অরণ্যচারী আদিম গুহামানবেরা পাথরের ব্যবহার ও আগুনের ব্যবহার শিখে ফেলে প্রায় লক্ষাধিক বছর আগে। এই সময় থেকেই আদি প্রস্তর যুগের সূত্রপাত বলে ধরা হয়।
‘আদি-প্রস্তর যুগের নিদর্শনগুলো সাধারণত ‘কোয়ার্টস’ পাথরের তৈরি বলে ওই সময়কার সভ্যতাকে অনেকেই ‘কোয়ার্টাইট সভ্যতা’ বলে থাকেন। মাদ্রাজ, ওয়াঙ্গাল, গুল্টুর ছাড়া কুডাপ্পাতেও প্রচুর পরিমাণে ওই সময়কার নিদর্শন পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান মিলেছে গোদাবরী অঞ্চলে ও নর্মদা অববাহিকার উপত্যকায়। ১৮৭২ সালের এক সমীক্ষায় নর্মদা অঞ্চলে কোয়ার্টস পাথরের তৈরি হাত কুঠার ও অন্যান্য যেসব নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে তা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে ভারতবর্ষে নর্মদা অঞ্চলেই সর্বপ্রাচীন মানবসভ্যতার বসতি ছিল। এ ছাড়াও ওখানকার একই নুড়ি পাথরের স্তর থেকে পাওয়া গিয়েছে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মোষ, ঘোড়া, ভালুক, গণ্ডার, জলহস্তী, হাতি ও কুমিরের কঙ্কাল। আর গোদাবরী অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে মানুষের তৈরি কোয়ার্টস ও অ্যাগেট পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরি ছুরি। এগুলো সবই আদি-প্রস্তর যুগের গোড়ার দিকের নিদর্শন বলেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা।’
‘এর পরবর্তী সময়ে, প্রায় ওই একই সময়কালের ‘আদিম গুহামানবের’ গুহা আবিষ্কৃত হয়েছে– কুর্ণুল জেলায়। সেখানেও পাওয়া গিয়েছে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নানান প্রাণীদের কঙ্কাল। নর্মদা ও গোদাবরী অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো প্লাইস্টোনিন যুগের গোড়ার দিককার; আর কুর্ণুল জেলার গুহা অন্ত-প্লাইস্টোনিন যুগের নিদর্শন বলেই বিজ্ঞানীদের ধারণা।’
‘এ ছাড়াও উত্তর ভারতের জন্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের ঝিলাম, চেনাব, তাউই ও পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি জেলার ‘সোয়ান’ বা ‘সোহান’ (Sohan) নদী ও এইসব নদীর উপনদীর অববাহিকা অঞ্চল ও তার আশপাশ থেকে আদি-প্রস্তর যুগের যে সমস্ত নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় বলে– Sohan Industry বা সোহান কারিগরি। অনুমান করা হয় যে এই কারিগরি এক বিস্তীর্ণ সময়কালের নিদর্শন, যার শুরু প্রথম অন্তর্বর্তী তুষার যুগ থেকে, আর শেষ, তৃতীয় অন্তর্বর্তী তুষার যুগে এসে।’– (অশোক রায়/ বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-৭০,৭২)

               মধ্য-প্রস্তর যুগে এসে এতোদিনের পূর্ব-অভিজ্ঞতায় মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী বড় পাথরকে ভেঙে টুকরো করে নিয়ে হাতিয়ার তৈরি করার কারিগরি বিদ্যা অর্জন করে ফেলেছে। এই যুগের এইসব ছোট ছোট পাথরের তৈরি অস্ত্রশস্ত্র ও হাতিয়ারগুলোকে ‘পিগমি টুলস’ বলে। প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়া এই কারিগরি বিদ্যা দিয়ে সূক্ষ্মদানার পাথরকে টুকরো করে ঘসে মেজে কখনও বা তাতে বন্য জন্তুর হাড়ের হাতল লাগিয়ে বা গাছের ডাল ভেঙে তাতে জুড়ে দিয়ে নিজের প্রয়োজনানুগ করে তুলতো।
‘এ যুগের নিদর্শনও দক্ষিণ ভারতের তিন্নিভেল্লী ও হায়দরাবাদ সহ প্রায় সব কটা জেলাতেই দেখতে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও গুজরাত, কাথিওয়াড়, মধ্য-ভারত ও ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চলেও একই সময়কালের খুব ছোট ছোট পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরি অস্ত্রশস্ত্র দেখতে পাওয়া যায়।’
‘আদি ও মধ্য-প্রস্তর যুগের নিদর্শন ভারতে বিক্ষিপ্তভাবে নর্মদা, গোদাবরী, মধ্য-ভারত ও দক্ষিণ ভারতের কয়েকটা কোয়ার্টজাইট এলাকা ও পরিশেষে সিলিকেট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও নিম্ন-প্রস্তর যুগ বা নব-প্রস্তর যুগের নিদর্শন কিন্তু সারা ভারতের প্রায় সর্বত্রই দেখতে পাওয়া যায়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গা হল দক্ষিণ ভারতের বোলারী, মাইসোর ও হায়দরাবাদ। এ ছাড়াও বিন্ধ্যপর্বত, বাঘেলখণ্ড, মধ্য-ভারত, গুজরাট, রেওয়া, মির্জাপুর, ছোটনাগপুর, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বর্মা, ইন্দোচিন ও মালয় উল্লেখযোগ্য।’– (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-৭৩)
মূলত নব-প্রস্তর যুগে মানুষ অভিজ্ঞতায় আরও সমৃদ্ধ হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বড় পাথরকে ভেঙে টুকরো করে, তাকেই আবার ঘষে-মেজে প্রয়োজনানুগ করে তুলতে শিখেছে। আর এই যুগের সভ্যতা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ার ফলে যেখানে যেমন ধরনের পাথর মেলে তাকেই তারা কাজে লাগাতে শিখেছে। আদিম মানবের এই হাতিয়ারে উন্নতির সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতিও যে সমভাবে বিকশিত হচ্ছিল সে দিকটা ভুলে গেলে চলবে না।

শিকারের অপ্রতুলতায় শুধুমাত্র খিদের জ্বালায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্য অবস্থায় আপনা আপনি গজিয়ে থাকা শস্যদানা আহরণ ও পরবর্তীকালে ভিজে মাটিতে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়েই কৃষিকার্যের সূচনা। তাই উর্বরা শক্তির প্রসন্নতা ও কৃষির সাফল্যের প্রয়োজনে দেব ধারণা বিবর্তিত হয়– প্রকৃতি (নারী) ও পুরুষে।
দশ হাজার বছর আগে মানুষ কৃষিকার্য ও পশুপালন করতে শেখে। এই সময়কালকে বলা হয় মধ্য-প্রস্তর যুগ। আর নিম্ন-প্রস্তর যুগ বা নব-প্রস্তর যুগে এসে অর্থাৎ আট হাজার বছর আগে মানুষ প্রতিষ্ঠা করেছে গ্রাম, সমাজ, গোষ্ঠী ও পরিবার। আর নাগরিক সভ্যতা? সে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগেকার কথা। এটি তাম্রাশ্ম যুগের অবদান। কৃষিকার্যের অরুণালোকে আদিম মানবের শিকারজীবী-যাযাবর-আরণ্যক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। গড়ে ওঠে স্থায়ী বাসভূমি। প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বিবর্তিত হয় পিতৃতান্ত্রিকতায়। ভারতবর্ষে এই সভ্যতার কালানুক্রমিক পরিপুষ্টি ও চরমোৎকর্ষতা দেখা যায়– সিন্ধু সভ্যতায়। যার পরিণতিতে সেখানে নগরায়ণ, কারিগরিবিদ্যা, বহির্বাণিজ্য, জ্ঞানবিজ্ঞান, ধর্ম-দর্শন ও শিল্পকলা চিন্তার এক আশ্চর্য উত্তরণ ঘটে। এ ছাড়াও সেদিনকার সেই ধর্মচিন্তা– যেমন মাতৃদেবীর পূজা, আদি শিব, লিঙ্গ ও যোনি পূজা, সূর্য পূজা, নাগপূজা, পশুপূজা ও বৃক্ষ বা অশ্বত্থ পূজা ইত্যাদি– পরবর্তীকালে হিন্দু সভ্যতার দেবদেবী ধারণা গঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে আদিম মানবেরা কবে কখন সর্বপ্রথম অতিপ্রাকৃতের কাছে ভয়ে মাথা নুয়েছিলো সেটি বলা সম্ভব না হলেও আদিম মানবের মাথা নোয়ানোর বিষয়টি কিভাবে শুরু হয়েছিলো তারও একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা। তা বুঝতে আমাদেরকে আরেকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়।

             আদিম মানবগোষ্ঠীর সভ্যতা ও তার সংস্কৃতির নানাদিক নিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা প্রচুর গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। তার মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মৃতদেহ সৎকার ব্যবস্থা। একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ মৃতদেহকে জঙ্গলে ফেলে দিতো। এর পরের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারেরাই করতো। একদিন এই ব্যবস্থা হলো অচল। তখন মৃতদেহকে মাটিতে গর্ত করে চাপা দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হলো। কিন্তু তাতেও দেখা দিলো অসুবিধা। বন্য জন্তুরা মাটি খুঁড়ে শবদেহকে বের করে আনে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া হলো গর্তের উপরে বড়ো-সড়ো একখানা পাথর চাপিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। জানা যায়, এরকমই এক সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে কোলার জেলায়। তাতে প্রায় চুয়ান্নটি এ ধরনের সমাধির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও মাদ্রাজ, বোম্বাই, মাইসোর ইত্যাদি অঞ্চলে এই একই ধরনের সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।
এরপর মানবসভ্যতা যখন আরও বদলালো বা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলো, তখন এই সৎকার ব্যবস্থাও কিছুটা বদলালো। মৃতদেহ দাহ করে সেই দগ্ধাবশেষ মাটি চাপা দিয়ে দেওয়ার প্রথা চালু হলো। তবে সর্বক্ষেত্রে পূর্ণদগ্ধ না হলেও অর্ধদগ্ধ দেহাবশেষ মাটির পাত্রে ভরে মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হতো, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শবদেহ অর্ধদগ্ধই থেকে যেতো। এরকমই এক বিশাল শ্মশান বা সমাধিক্ষেত্র পাওয়া গেছে তিরুণাভেলীর আদিচেনালুরে। এই সমাধিক্ষেত্র নব-প্রস্তর যুগের নিদর্শন বলে মনে করা হয়। এরও পরবর্তীকালের সমাধিতে যথাক্রমে তামা, ব্রোঞ্জ, লোহা ও সোনার অলঙ্কার ও অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী দেখতে পাওয়া গেছে সিন্ধুপ্রদেশের ব্রহ্মণ্যবাদ অঞ্চল থেকে।

          ‘প্রাথমিকভাবে, মৃত প্রিয়জনের পুঁতে দেওয়া শবদেহ বন্যজন্তুর হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজনেই শুরু হয়েছিল সমাধিক্ষেত্রে পাথরের ব্যবহার, ক্রমে তা প্রথায় দাঁড়িয়ে যায়। সাধারণ পাথর তখন আর শুধুমাত্র পাথর থাকে না। সে উত্তরিত হয়– প্রিয়জনের, দলপতি বা গোষ্ঠীপতির সমাধির স্মারক চিহ্নরূপে। এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন চলতে চলতে চলতে একসময় মানুষই পাথরে আরোপ করে বিশিষ্টতা। আর তখন স্মারক প্রস্তর বিশিষ্টতা লাভ করে– স্মৃতিচিহ্নরূপে, যার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে প্রিয়জনের প্রতীকরূপে (আজও যেমন হয় প্রিয়জন বা শ্রদ্ধেয় জনের Photograph বা তৈলচিত্র) অমূর্ত বা বিমূর্ত প্রতীকরূপে সাধারণ পাথর তখন অসাধারণত্বের মাত্রা (Dimention) লাভ করে। শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে, ভালবাসায়, নিজের, পরিবারের বা গোষ্ঠীর পরম প্রয়োজনীয় মুহূর্তের ত্রাতারূপে মানুষ তখন আকুলভাবে প্রণতি জানায় এই পাথরের কাছে। ক্রমে এ ব্যবস্থাও কায়েমি হয়। এদিকে জীবন ও মৃত্যুর ধোঁয়াশা আজও এক অনন্ত কুহেলিকা। ফলে, সমাধি-প্রস্তরে আত্মার অবস্থান অতি সহজেই মান্যতা লাভ করে। তখন আত্মা-প্রস্তর পুজ্য ও প্রণম্য হয়ে ওঠে পিতৃ-দেবতার বা মাতৃদেবীর প্রতীক রূপে।’
‘এ ছাড়াও, সেদিনের সেই অসহায় মানুষগুলো এতদিন ধরে প্রকৃতির রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার জন্যে একটা প্রকৃতিদত্ত অবলম্বনের অনুসন্ধান করে আসছিল আকুলভাবে। আজ তা এই বিমূর্ত রূপের আধারে আধারিত হতে পারল সঠিকভাবে। শ্মশানের সাথে তাঁর (শিব ঠাকুরের) এই অতি প্রাচীন কালের সম্পর্ক আজও বর্তমান। তাই বলা হয় শিব শ্মশানচারী। এর বহু বহু পরবর্তীকালে মানুষ তাঁর শ্মশানচারিতার দার্শনিক ব্যাখ্যা দিল– তিনি সুখে-দুঃখে সমদর্শী ও বিগতস্পৃহ।’– (অশোক রায়/ বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-৭৬)

               শিকার ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে খাদ্যের অভাব যখন কিছুটা ঘুচলো– তখন জীবনে এলো অবসর। তখন প্রায়-অন্ধকার গুহার গায়ে মানুষ গুহাচিত্র অঙ্কন করলো; চিত্রাঙ্কন করলো পাহাড়ের গায়েও। নৃতত্ত্ববিদেরা মনে করেন এই সমস্ত চিত্রগুলো অঙ্কিত হয়েছিলো ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে। এই ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়াই আদিম মানবের প্রাচীনতম ধর্ম।
প্রকৃতির প্রলয়ংকরতা ও বিরূপতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই আদিম মানব অতিপ্রাকৃতের কাছে মাথা নুইয়েছে– ভক্তিতে নয় ভয়ে। খুব সম্ভবত এইসময় থেকেই ‘প্রাগৈতিহাসিক শিবের’ সূচনা। কারণ এখান থেকেই আজকের দেবাদিদেবের কয়েকটা মূল ভাবনার সূত্রপাত। এই ধারণা আরও স্পষ্ট হলো, যখন দেখা গেলো পাহাড়ের গায়ে বা প্রায়ান্ধকার গুহার দেওয়ালের গুহাচিত্র। ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার অনুষঙ্গ হিসাবেই এই সবের সৃষ্টি। যা ছিলো আদিম মানবের প্রাচীনতম ধর্ম। আর এ থেকেই ধীরে ধীরে বিকশিত হয় চিকিৎসাবিদ্যা-ওঝা-গুনিন ইত্যাদি ও ধর্মচেতনা।
‘ভুরখাইমের ‘সোশ্যাল থিওরি’-র মতে ধর্ম মানুষের সমাজবিন্যাস ও জীবনচর্চার সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং আদিবাসীদের সমাজবিন্যাস ও জীবনচর্চার দিকে তাকালে আমরা প্রাচীন মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচরণের খানিকটা হদিস পাব। বর্তমান ভারতের আদিবাসীদের মধ্যে প্রাধান্য পায় ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া ও মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। সাধারণত আমরা তাদের ‘জড়োপাসক’ বলি, ‘জড়’ বলতে আমরা চেতনাবিহীন ও প্রাণশক্তি রহিত পদার্থকেই বুঝি। কিন্তু জড়ের কল্পনা আদিবাসী সমাজে নেই। তারা লক্ষ করেছে মানুষ যতদিন জীবিত থাকে, ততদিন সে নড়াচড়া করে, কথা বলে ও শব্দ করে। কিন্তু মারা গেলে তার এই শক্তি লুপ্ত হয়ে যায়। যুক্তির আশ্রয় নিয়ে তখন তারা ভাবে যে মৃত ব্যক্তির প্রিয় অথবা আত্মার সঙ্গে যেসব পদার্থ সংশ্লিষ্ট তার আত্মা সেইসব তথাকথিত জড় পদার্থের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তখন তারা সেইসব পদার্থের মধ্যে (মৃত ব্যক্তিকে চোখে দেখতে না পেলেও) তার আত্মাকে অশরীরীরূপে কল্পনা করে।’– (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-৭৬-৭)

              ড. অতুল সুরের বর্ণনায়– ‘নবোপলীয় যুগেই কৃষি ও বয়নের উদ্ভব হয় এবং মানুষ পশুপালন করতে শুরু করে। এ যুগের ধর্মীয় আচার সম্বন্ধে আমাদের খুব বেশি কিছু জানা নেই। তবে প্রত্ন-প্রস্তর যুগের মানুষের মত তারা ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিত ও মৃতব্যক্তির সমাধির ওপর একখানা লম্বা পাথর খাড়াভাবে পুঁতে দিত। এরূপ ঋজুভাবে প্রোথিত পাথর আমরা মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হুগলি প্রভৃতি জেলায় লক্ষ্য করি। সেগুলিকে ‘বীরকাঁড়’ বলা হয়।’– (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, পৃষ্ঠা-২৭)
দক্ষিণ ভারতের আদিবাসীদের মধ্যেও এইরকম পাথরের ফলকের ব্যবহার আছে। দেখা যায় নীলগিরিতে কুডুম্বা ও ইরুলা উপজাতির মধ্যে। তারা এই ফলককে ‘বীরকল্লু’ বলে; যার অর্থ– ‘বীরপুরুষদের স্মৃতিফলক’। এককথায়, এগুলি হচ্ছে সমাধির ওপর স্মৃতিফলক। ছোটনাগপুরের হো, মুণ্ডা ও খেরিয়া উপজাতির লোকেরাও এই স্মৃতিফলকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে মানুষের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর গ্রামের বাইরে যে ‘বৃষকাষ্ঠ’ স্থাপন করা হয়, সেগুলি এরূপ প্রস্তরফলকেরই কাষ্ঠনির্মিত উত্তর-সংস্করণ বলে ড. অতুল সুরের অভিমত। পরবর্তীতে এই বীরকাঁড়, বীরকল্লু বা বৃষকাষ্ঠই বিবর্তিত হলো যূপস্তম্ভে। অশোক রায় বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের মতে, এই যূপস্তম্ভই হলো শিবলিঙ্গের সনাতন রূপ।

            বিবর্তনের ধারায় মানুষ যেদিন প্রাণময় সত্তা থেকে মনোময় সত্তায় উন্নীত হলো, সেই সেদিন থেকেই পশুর সাথে মানুষের পার্থক্য দেখা দিলো। পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝেছে প্রকৃতিতে সমগ্র জীবজগতের মধ্যে মাত্র দুটোই সত্তা– নারী ও পুরুষ। আর এই দুই সত্তার পারস্পরিক মিলনের মধ্যে দিয়েই সৃষ্টির ধারা বহমান। নিজের জীবনেও সে এই রিপুতাড়নের উদগ্রতা অনুভব করেছে, দেখেছে জীবজগতেও এই সত্য কত সূক্ষ্মভাবে নিঃশব্দে নীরবে কাজ করে চলেছে।
হয়তো ‘একইসঙ্গে সে একথাও অনুভব করতে শুরু করেছে যে তার পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে বিরাজ করছে মূলত দুটো শক্তি, আর এই দুইয়ের উৎসও ওই একই– প্রকৃতি। যার প্রথমটা হলো মাথার উপরে মহাবিচিত্রতায় ভরা সদা পরিবর্তনশীল এক অনন্ত জগৎ, আর অপরটি হল সে নিজে যার উপর অবস্থান করছে– সেই বসুন্ধরা। এই জগতও বহু বিচিত্রতায় পরিপূর্ণ– অনন্ত জিজ্ঞাসায় ঠাসা। একই সাথে সে এ কথাও অনুভব করেছিল যে, তার মাথার উপরের জগৎটা অনেক বেশি শক্তিমান– সদা পরিবর্তনশীল নিত্য সক্রিয় ও অনন্ত ক্রিয়াশীল। তার পরাভবের কাছে নতজানু হয়ে থাকে ধরিত্রী। এই ধরিত্রীর বুকেই বেড়ে উঠেছে তাবৎ জীবজগৎ ও উদ্ভিদ জগৎ, যা তাকে খাদ্য ও শিকার জোগায়। আকাশের রুদ্ররোষের হাত থেকে রক্ষা করে– ঠিক যেন মায়ের মতো। তখনই তার মনে এক ভাবের উদয় হল– দুনিয়াটা কি তার পরিচিত (নারী-পুরুষের) জগতেরই এক মহাবিশাল রূপ? সেখানে সন্তানের মতোই প্রতিদিন প্রতিপালিত হচ্ছে সে নিজে? সৃষ্টি-রক্ষা ও পালনের ত্রিগুণাত্মিকা ধরিত্রী হলেন– মাতৃস্বরূপা? আর আকাশ যে তার পরুষতাগুণের কারণেই হল পুরুষের প্রতীক।’
‘এতদিনের অচেনা জগৎটা এবারে যেন একটু বোধগম্য মনে হল তার কাছে। যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে,… তখন জীবনচক্র চলে সুখে, স্বচ্ছন্দে। মাতা বসুন্ধরা তাঁর সবুজ আঁচল বিছিয়ে সকলকে লালন-পালন করেন একসাথে। কিন্তু যখনই আকাশের হয় ক্রোধ, সে তখন ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত, তুফান ডেকে পৃথিবীকে দলে-মুচড়ে, দাপিয়ে-ঝাঁপিয়ে, লণ্ড-ভণ্ড করে তোলে। গাছ-পালা, মানুষ, পশু-পাখি সকলেই তখন অসহায়– থরহরি কম্পমান। এইরকমই কোনও এক বিপদসংকুল মুহূর্তে, হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো কার মাথায় যেন খেলে যায় এক কথা। আকুল আবেগে আছড়ে পড়ে আত্মাপ্রস্তরের কাছে– ভক্তিতে নয়– ভয়ে। শুধুমাত্র বাঁচার তাগিদে, জীবনের চরম সংকট মুহূর্তের ত্রাতারূপে আত্মাপ্রস্তর প্রণম্য হল, পূজিত হল– গোষ্ঠী, পরিবার ও নিজের বিভিন্ন শুভাশুভ কামনায়।’– (অশোক রায়/ বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ)

         একই সংকটকালে অনেকের মনেই একথা জেগেছিল কিনা বলার উপায় নেই, কিন্তু যে ঘটনাটা নেহাতই আকস্মিকভাবে ঘটে গেছে তা-ই ক্রমশ প্রথায় পরিণত হয়ে দাঁড়ালো। তখন আর তা দেশ-কালের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকলো না। আত্মাপ্রস্তরের উত্তরণ ঘটলো বিশ্বাত্মা বা পরমাত্মায়। একদা প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর বস্তু ‘উপলখণ্ড’। বিবর্তনের পথে একদিন মানুষের হাতে উঠেছিলো– হাতিয়ার হয়ে– বিশিষ্টতা লাভ করেছিলো– অন্ত্ররূপে; উৎসারিত রুদ্ধ আবেগের ফল্গুধারাস্নাত হয়ে– গোষ্ঠী, সমাজ, পরিবার ও নিজের মঙ্গল কামনায় অথবা প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর তার কোপানল থেকে বাঁচার আকুল আকাঙ্ক্ষায় সেই উপলখণ্ডই আবার মহিমান্বিত হলো– আত্মাপ্রস্তররূপে; পূজিত ও প্রণম্য হলো, আর্তত্রাণের গরিমায়– বিশ্বাত্মারূপে।
‘তারপর মানবসভ্যতার ক্রমসোপান বেয়ে, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে (আকৃতির একটু-আধটু অদল-বদল করে) সর্বত্রই (সিন্ধু থেকে নীলনদ, এমনকী আমেরিকার রেড-ইন্ডিয়ানদের মধ্যেও) সৃষ্টির বীজরূপে ‘বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং’ সমগ্র মানবজাতির আদি পিতা ও আদি মাতা বা জগৎ পিতা বা জগন্মাতারূপে সর্বজন পূজ্য হল।’– (অশোক রায়/ বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-৭৯)

             কৃষিভিত্তিক মানবসভ্যতার একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় গোষ্ঠীবদ্ধ যে মানবসমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক, সময়ের বিবর্তনে ক্রমে পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো। পুরুষেরা শিকারের সন্ধানে দলবদ্ধভাবে দূর থেকে দূরান্তরে গেলে ঘরে খাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়তো। সন্তানদের ও নিজের খাদ্য-চাহিদা মেটাতে বনের ফল-মধু-ফুল ইত্যাদি সংগ্রহ করেই চলতো খুন্নিবৃত্তি। যখন সেখানেও টান পড়লো, খিদের জ্বালায় নজর পড়লো তৃণভূমিতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অবস্থায় গজিয়ে ওঠা শস্যদানার উপর। তা দিয়েই নিজের ও সন্তানের খিদের জ্বালা মিটতো। ক্রমে এই সংগৃহিত শস্যদানা ভিজে মাটিতে ছড়িয়ে দিয়ে প্রাথমিক অবস্থায় শস্য উৎপাদন করা সম্ভব হলো। এরপর তাদের চিন্তাধারায় এলো এক যুগান্তকারী দার্শনিকতা। নিজেদের জীবনে সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়া তো চিরকালই জানা, সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগালো। যেহেতু ভূমি বন্য অবস্থাতেও শস্য উৎপাদন করে, তাই বসুন্ধরাকে মাতৃরূপে কল্পনা করে ভাবতে লাগলো– পুরুষ যদি নারীরূপী ক্ষেত্রকে কর্ষণ করে, তবে অবশ্যই সেখানে শস্য উৎপাদিত হবে। তখন তারা পুরুষের প্রতীক স্বরূপ এক লিঙ্গ যষ্টি বানিয়ে ভূমিকর্ষণ করলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের সমস্ত ধর্মশাস্ত্রে নারীকে ‘ক্ষেত্র’ বা ভূমি বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। আর পুরুষের লিঙ্গস্বরূপ ‘কর্ষণ যষ্টি’ বা ‘খনন যষ্টি’ আজও অনেক আদিম সমাজে ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। ‘লিঙ্গ’, ‘লাঙ্গুল’ ও ‘লাঙ্গল’– এই তিনটে শব্দ যে একই ধাতুরূপ থেকে নিষ্পন্ন তা ইতঃপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। এইভাবে মেয়েরাই প্রথম পৃথিবীর বুকে শস্য উৎপাদন করলো এবং ক্রমে পুরুষেরাও কৃষিকর্মে মেয়েদের সহায়ক হলো।
কৃষির সাথে প্রজনন প্রক্রিয়ার সম্পর্ক বুঝতে পারার পর কৃষির সাফল্যের জন্য ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া কৃষি সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রযুক্ত হলো। ফলে নানা ধরনের প্রজনন-কেন্দ্রিক যৌন অনুষ্ঠানের উদ্ভব হতে থাকে। যেমন, নিউ গিনির আদিম অধিবাসীরা এখনও কৃষির সাফল্যের জন্যে কৃষিভূমিতেই মৈথুন-ক্রিয়ায় রত হয়। এটাকে তারা কৃষি সম্পর্কিত একটা অনুষ্ঠান বলেই মনে করে। একেই বলে উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস। আমাদের দেশে সংবৎসর জুড়ে যেসব নানান মেয়েলি ব্রত-অনুষ্ঠানের প্রচলন এখনও গ্রাম-বাংলায় দৃশ্যমান হয় তার প্রায় সবগুলিই এই উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসেরই ক্রমবিবর্তিত পরম্পরা। খুব সম্ভবত এই কারণেই ফসল তোলার পর আদিম মানুষের যে প্রথম ‘নবান্ন’ উৎসব হলো, তা এক যৌন মহোৎসবে পরিণত হলো, আর সেই উৎসবেই জন্ম নিলো– লিঙ্গপূজা ও ভূমিরূপী পৃথিবীর পূজা বা যোনি-পূজা। নব-প্রস্তর যুগে এইভাবেই লিঙ্গপূজার সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে শিব ও শক্তিতে পরিণতি লাভ করে। এভাবেই কৃষির সাথে লিঙ্গ ও যোনির সম্পর্ক অতি প্রাচীনকাল থেকে স্থাপিত হয়, যা আজও শিব ও শক্তি রূপে বহমান।

             নব-প্রস্তর যুগের পর এলো তাম্র-প্রস্তর যুগ। পৃথিবীর সমন্ত প্রাচীন সভ্যতাগুলো এই যুগেরই নিদর্শন। ভারতে তাম্র-প্রস্তর যুগের সভ্যতাকে সিন্ধু সভ্যতা বা মহেনজোদারো– হরপ্পা সভ্যতা বলে। সিন্ধু সভ্যতাতেও শিব ও শক্তির পূজা যে হতো এই ধারণা এখন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেখানে লিঙ্গমূর্তি ও যোনিচিহ্ন আলাদা আলাদাভাবেই পূজিত হয়েছে। একইভাবে আদি শিব ও আদি মাতার মূর্তিও পুজিত হতো। কিন্তু বর্তমানে শিবলিঙ্গকে আমরা যেরূপে দেখি সেই জগৎ পিতা ও জগন্মাতার যুগল প্রতীকের সমন্বয় সাধন করা তখন সম্ভব হয়নি। কেবল তাই নয়, পরবর্তীকালের আর্য সভ্যতাতেও ওই সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হয়নি। যদিও (আমরা পরে দেখবো) যজুর্বেদের কালে কৃষ্ণ ও শুক্ল যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় ও রুদ্রাধ্যায় পর্বে দেবাদিদেবের দার্শনিক চর্চা চরম শিখরে ওঠে ওই সময়েই তিনি পরমাত্মায় পর্যবসিত হন। কালে বৈদিক সভ্যতা বিবর্তিত হয় পৌরাণিক যুগে এসে। এই সময়েও ওই সমন্বয় সাধন সম্ভব হয়নি। বরং লিঙ্গরূপে আরও একান্ত বাস্তবানুগ ও বিশাল রূপ পরিগ্রহ করে পরবর্তীকালের রুচির সাপেক্ষে শালীনতার সীমারেখা অতিক্রম করলেও কিন্তু এই সময়েই তিনি (শিব) সামাজিকভাবে সমগ্র ভারতে আমজনতার কাছে গণদেবতারূপে পূর্ণতা লাভ করেন।
গুপ্ত যুগের ঠিক শেষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে এসে লিঙ্গমূর্তি ও যোনি চিহ্নের প্রতীকীকরণ ও সমন্বয় সাধন করে সনালিকা গৌরীপট্ট সমন্বিত আজকের শিবলিঙ্গরূপ পরিগ্রহ করে। তাঁর এই প্রতীকীকরণ রূপ সমগ্র ভূ-ভারতে এতোটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, লিঙ্গ ব্যতীত আজ তাঁর (শিবের) মূর্তি পূজন প্রায় অপসৃতই বলা যায়।

(চলবে…)

[পূর্বের পোস্ট : শিবলিঙ্গের প্রাক্-বৈদিক নিদর্শন] [×] [পরের পোস্ট : বৈদিক সাহিত্যে শিব ও তাঁর বিকাশ]

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 298,580 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 110 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
Advertisements
%d bloggers like this: