h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০৩ : শিবলিঙ্গের প্রাক্-বৈদিক নিদর্শন

Posted on: 11/03/2018


Stone_of_Destiny_Siva_Lingam_Ireland

শিব ও লিঙ্গ-০৩ : শিবলিঙ্গের প্রাক্-বৈদিক নিদর্শন
রণদীপম বসু

বিজ্ঞানীরা মনে করেন জীব বিবর্তনের এক ও একমাত্র কারণ হলো– প্রকৃতি, যা নিত্য পরিবর্তনশীল। তার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময়ের স্রোতে এগিয়ে চলার ইতিহাসই মানবসভ্যতার ইতিহাস। ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি অতি সুপ্রাচীন কাল থেকে বেশ কয়েকটা অধ্যায়ে ক্রমবিবর্তিত হতে হতে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। এগুলোকে যদি কালের নিরিখে পর্যায়ক্রমে সাজানো হয়, তা হলে শুরু করতে হয় প্রাগৈতিহাসিক পর্ব থেকে– আদি প্রস্তর যুগ, মধ্য প্রস্তর যুগ ও নব প্রস্তর যুগ। এরপরে ঐতিহাসিক যুগের সূচনা– তাম্র-প্রস্তর যুগ, তাম্র যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ ও লৌহ যুগ। লৌহ যুগেই সমাজ জীবনে আসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন, যার ফলশ্রুতিতে আজও আমরা বহুবিবর্তিত হয়েই চলেছি। ভারতবর্ষে তাম্র-প্রস্তর থেকে ব্রোঞ্জ যুগ অবধি সভ্যতাকে বলা হয় হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতা। আর এরপরে বৈদিক সভ্যতা, যার সূচনা তাম্র সভ্যতা থেকে শুরু করে লৌহযুগ অবধি বিস্তৃত।

              এ-পর্যায়ে প্রাক্-বৈদিক হরপ্পা সভ্যতার ধর্মবিশ্বাসের নিদর্শন হিসেবে প্রত্ন-নিদর্শনস্বরূপ যে কতকগুলি মাতৃকামূর্তি, লিঙ্গ ও যোনির কিছু অনুকৃতি এবং একটি পুরুষ দেবতা অঙ্কিত কয়েকটি সীল পাওয়া গেছে, এই তিন ধরনের নিদর্শন বস্তুত একটি অখণ্ড ধর্মবিশ্বাসের পরিচয় বহন করে বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। লিঙ্গ ও যোনির উপস্থিতি একটি উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস-কেন্দ্রিক ধর্মের সূচনা করে– যেগুলি যথাক্রমে ওই পুরুষ দেবতা ও মাতৃকাদেবীর প্রতীক। এ থেকে পণ্ডিতেরা অনুমান করেছেন যে, এগুলি পরবর্তীকালের সুবিস্তৃত শিব ও শক্তির ধারণার পূর্বাভাস। তাছাড়া বেদোত্তর ভারতীয় ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে লিঙ্গ উপাসনা এবং তার সঙ্গে শিবের যে গভীর ও ব্যাপক সংযোগ চোখে পড়ে, এই প্রভাব যে আকস্মিক হতে পারে না বরং তার পেছনে সুদূর কোন এক প্রাগৈতিহাসিক অতীত অনুমেয়, সেটিও মনে রাখা আবশ্যক। তাই এ বিষয়ের সম্যক অনুসন্ধান করতে আমাদেরকে প্রাচীন প্রত্ন-নিদর্শনগুলোর আনুপূর্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তার পর্যায়ক্রমিক যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হলে প্রয়োজন হয় এ যাবৎ আমাদের নাগালে থাকা প্রাচীন সাহিত্য-রচনাগুলোর যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণাদির। এ প্রেক্ষিতে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ–
‘কিন্তু ইহা মনে রাখিতে হইবে যে ঋগ্বেদ প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থে আর্যদের ধর্মানুষ্ঠানের যে বিবরণ পাওয়া যায়, উহা সেকালকার সমস্ত ভারতীয়দিগের ধর্মজীবনের পূর্ণ পরিচয় নহে। ভারতবাসীদিগের ভিতরে যে প্রধান দুই ভাগ ছিল– আর্য ও অনার্য, ইহার কথা বিস্মৃত হইলে চলিবে না। সেই সময়কার অনার্যদিগের ধর্মক্রিয়া কিরূপ ছিল তাহা জানিবার প্রকৃষ্ট উপায় নাই। বেদ প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে ইহার আংশিক রূপ কখনও কখনও নির্ণয় করা যায় বটে, কিন্তু উহা অনার্যদিগের বিরুদ্ধপক্ষের দ্বারাই বর্ণিত রূপ। বৈদিক ঋষিরা অনার্যদিগকে ‘রাক্ষস’, ‘যাতু’, ‘যাতুধান’, ‘অনাস’, ‘মূরদেব’, ‘শিশ্নদেব’ ইত্যাদি নানাবিধ নিন্দাসূচক আখ্যা দিয়াছেন। সর্বশেষ আখ্যাটির অনেক আধুনিক পণ্ডিত কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা যদি গ্রহণ করা যায়, তাহা হইলে একশ্রেণীর অনার্যগণদ্বারা আচরিত একটি বিশিষ্ট ধর্মকার্যের বিষয়ে আমরা কিছু জানিতে পারি। এই অনার্যেরা যে সৃজনশক্তির মূল উৎস এক ‘পিতৃদেবতা’র জননযন্ত্র (লিঙ্গ)-কে ঐশীশক্তির প্রতীক বলিয়া পূজা করিত উহা অনুমান করা অসঙ্গত হয় না। ‘মূরদেব’ কথাটির অর্থ কোনও কোনও আধুনিক পণ্ডিত ‘মূর্তিপূজক’ বলিয়া মনে করেন। তাঁহাদের এই অর্থ সঠিক বলিয়া গৃহীত হইলে, সে সময়কার অনার্যদিগের মধ্যে মূর্তিপূজা যে উহাদের ধর্মকার্যের অন্যতম প্রধান অঙ্গরূপে প্রচলিত ছিল ইহা অনুমিত হইতে পারে। প্রসঙ্গতঃ বলা যায় যে পরবর্তীকালে এই দুইটি অনুষ্ঠানই বিশেষ বিশেষ ভারতীয় উপাসক সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যূনাধিক বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। কিন্তু এতদ্দেশীয় প্রাক্-আর্যদিগের ধর্মজীবন সম্বন্ধে ইহাই সম্যক্ ও সবিশেষ পরিচয় নহে। আরও কিছুর ইঙ্গিত ব্রাহ্মণ্য ও ব্রাহ্মণ্যেতর, যথা– বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি,– প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থ হইতে সংগ্রহ করা যায়। ইহারও বহুপূর্ববর্তী কালের প্রাক্-বৈদিকযুগের এমন অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে যেগুলি হইতে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিম প্রান্তের প্রাক্-আর্য অধিবাসিগণের ধর্মজীবন সম্বন্ধে আমরা কিছু কিছু জানিতে পারি। ঋগ্বেদে জুগুপ্সিত শিশ্নদেবদিগের কথা এইমাত্র বলা হইয়াছে। সিন্ধু উপত্যকায় এবং বেলুচিস্তানের নালপ্রদেশে এমন কতকগুলি দ্রব্য পাওয়া গিয়াছে যেগুলির ‘লিঙ্গ’ বা ‘যোনির’ প্রতীক ব্যতীত অন্য কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া সঙ্গত মনে হয় না। অনেকেই স্বীকার করেন যে এইগুলি এখানকার প্রাচীন অধিবাসিগণের পূজানুষ্ঠানে ব্যবহৃত হইত। পৌরাণিক শিবের আদিপুরুষের পরিচয় আমরা এখানকারই কয়েকটি শিলমোহর হইতে প্রাপ্ত হই, এবং ইহাও অনুমান করিতে পারি যে শিশ্ন-প্রতীক (লিঙ্গ) পূজা এই কালের আদি-শিবের পূজার একটি অঙ্গ ছিল।… এই লিঙ্গ-পূজাই কি করিয়া শিব-পূজার প্রধান বৈশিষ্ট্যরূপে পরিগণিত হইয়াছিল পৌরাণিক ও তান্ত্রিক যন্ত্রপূজার (শক্তিপূজার অন্যতম অঙ্গ) আদিমতম নিদর্শন বোধ হয় সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত মধ্যে ছিদ্রবিশিষ্ট বৃত্তাকার ছোট বড় প্রস্তরগুলিতেই দেখা যায়। আর একটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এখানকার শিলমোহরগুলির গাত্রে উৎকীর্ণ নানা চিত্র ও ছোট কিংবা কিছু বড় মৃন্ময় বা প্রস্তরনির্মিত মূর্তিবিশেষ এবং অন্য বহু প্রকার নিদর্শন আমাদিগকে স্পষ্টই জানাইয়া দেয় যে সেকালের সিন্ধুতটবাসিগণ দেবতা ও দেবতা-প্রতীকসমূহের পূজা করিত। তাহাদের ধর্মকার্যে যজ্ঞাদি বৈদিক ক্রিয়ার কোনও স্থান ছিল না। ইহাদের দ্বারা আচরিত পূজানুষ্ঠানই দেশের আদিম জনসাধারণের ধর্মানুষ্ঠানকে বিশেষরূপে প্রভাবিত করে।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১-২)

           শাক্ত-সাধনা সম্পর্কিত আলোচনায় এটি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে, প্রাক্-বৈদিক ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে সিন্ধু-ধর্মের প্রধানতম উপাদান হলো উর্বরতামূলক আদিম জাদুবিশ্বাস বা তার স্মারক। আর এ-বিশ্বাসের মূলসূত্র অনুসারে মানবীয় ফলপ্রসূতা ও প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা একই সূত্রে বাঁধা। স্বভাবতই আদিম মানুষদের মধ্যে প্রচলিত এই বিশ্বাসমূলক আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে– এবং এই বিশ্বাস-উদ্ভূত নানান প্রচলিত ধর্মের ক্ষেত্রেও– জনন-অঙ্গের উপর বিশেষ গুরুত্ব-আরোপণের পরিচয় পাওয়া যায়। সিন্ধু-ধর্মও যে স্বভাবতই তার ব্যতিক্রম নয়, তার প্রমাণ হলো সমগ্র সিন্ধু-সাম্রাজ্য জুড়ে আবিষ্কৃত অজস্র লিঙ্গ ও যোনি মূর্তি। জন মার্শাল প্রমুখ প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এগুলির বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন এবং প্রায় একবাক্যে এগুলিকে সিন্ধু-ধর্মের পরিচায়ক বলেই গ্রহণ করেছেন। এ-প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক আলোচনার সুবিধার্থে অধ্যাপক জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিটি প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করি–
‘ভারতবর্ষের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রধানতঃ সিন্ধুনদ ও তাহার দুই একটি অববাহিকা আশ্রয় করিয়া বহুকাল পূর্বে (অনেকের মতে বৈদিক যুগ আরম্ভ হইবার বেশ কিছু আগে) যে বিশিষ্ট নাগর সভ্যতা গড়িয়া উঠে তাহার অনেক নিদর্শন হরপ্পা, মহেঞ্জো-ডারো, নাল প্রভৃতি অঞ্চলে পাওয়া গিয়াছে। নিদর্শনগুলি সেখানকার সুপ্রাচীন অধিবাসীদিগের জীবনধারার ভিন্ন ভিন্ন দিকের উপর প্রভূত আলোকপাত করে। তাহাদের শিল্প ও সংস্কৃতি, পৌর ও ধর্ম জীবন, আর্থিক ও সামাজিক সংগঠন ইত্যাদি বিষয়ে এই নিদর্শনগুলি আমাদিগকে অনেক তথ্য প্রদান করে। ইহাদিগের মধ্যে নরম পাথর (steatite), এক জাতীয় মৃত্তিকা (faience) প্রভৃতি দ্রব্যে নির্মিত ‘শিলমোহর’ (sealings) বা ‘শিলকবচ’ (seal amulets) গুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মহেঞ্জো-ডারোতে প্রাপ্ত এইরূপ একটি চতুষ্কোণ শিলমোহরের গাত্রে উৎকীর্ণ চিত্র বোধ হয় প্রাচীন সিন্ধুতটবাসীদিগের ধর্মবিশ্বাস সম্বন্ধে কিছু পরিচয় দেয়। ইহাতে ত্রিমুখ, দ্বিশৃঙ্গ, দ্বিভুজ, নাতিউচ্চ আসনের উপর যোগাসনে উপবিষ্ট একটি মূর্তি অঙ্কিত দেখা যায়। বসার বিশিষ্ট ভঙ্গী দেখিয়া মনে হয় যে ইহা পরবর্তী কালে বর্ণিত কূর্মাসন; মূর্তিটির বহুবলয় ভূষিত দুইটি বাহু পূর্ণ প্রসারিত এবং জানুদ্বয়ে ন্যস্ত; ইহার কণ্ঠে ও বক্ষে কয়েকটি মালা (গ্রৈবেয়ক) লম্বমান; ইহার শৃঙ্গমধ্যস্থ শিরোভূষণ দীর্ঘ ও ঊর্ধ্বে কিঞ্চিৎ প্রসারিত; মূর্তির উভয় পার্শ্বে হস্তী, ব্যাঘ্র, গন্ডার ও মহিষ– এই চারি প্রাণী অঙ্কিত রহিয়াছে; আসনের নীচে দুইটি মৃগ এবং একটি পুস্তকাধার(?) চিত্রিত আছে; শিলমোহরের উপর দিকে বাম পার্শ্বে একটি মনুষ্যমূর্তি রেখাকারে অঙ্কিত আছে। এই মূর্তি যে মহেঞ্জো-ডারোর প্রাচীন অধিবাসীদিগের দ্বারা পূজিত এক দেবতার প্রতিকৃতি এ বিষয়ে স্যার জন মার্শাল নিঃসংশয় ছিলেন। কূর্মাসনে আসীন মূর্তির আর একটি বৈশিষ্ট্য ঊর্ধ্বলিঙ্গতা (ইহা খুব স্পষ্ট নহে), এবং উপরে বর্ণিত অন্যগুলি এই দেবতার পরিচয় প্রদানে মার্শালকে সাহায্য করিয়াছিল। তিনি ইহাকে পৌরাণিক শিবের আদি প্রতীক বলিয়া বর্ণনা করিয়াছিলেন। তাঁহার এ মত যদিও সকল পণ্ডিত গ্রহণ করেন নাই, তথাপি ইহার বহু পরবর্তী কালের মহাযোগী ও পশুপতি রূপে কল্পিত শিব দেবতার আদিম নিদর্শন রূপে গণনা করা খুব অযৌক্তিক নহে।’
‘মহেঞ্জো-ডারোতে প্রাপ্ত আরও কতিপয় শিলমোহরে অনুরূপ দেবতা মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। তথাকার আর একটি শিলমোহরে বোধ হয় এই দেবতারই অন্য এক রূপ প্রদর্শিত আছে। এখানেও দেবতা যোগাসনে উপবিষ্ট (আসন ঠিক কূর্মাসন নহে), এবং ইহার উভয় পার্শ্বে মিশ্র মানব ও সর্পাকৃতি হাঁটু গাড়িয়া প্রার্থনারত দুইটি নাগমূর্তি দেখা যায়। ইহাকেও পরবর্তী যুগের নাগ পরিবেষ্টিত শিবের আদিম রূপায়ণ বলিয়া মনে করা বিশেষ অসঙ্গত না হইতে পারে। অপর কয়েকটি শিলে মনুষ্যমুখবিশিষ্ট মেষ, ঐরূপ অর্ধ হস্তী ও অর্ধ বৃষ প্রভৃতি বহু মিশ্রাকৃতি (hybrid) মূর্তি স্বতই আমাদিগকে পরবর্তী কালের মিশ্রাকৃতি শিবগণসমূহের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। হরপ্পাতে পাওয়া একটি পোড়া মাটির (terracotta) শিলে অঙ্কিত চিত্র এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাইতে পারে। অপর দু একটি দৃশ্যের সহিত ইহাতেও যোগাসনে উপবিষ্ট এবং নাতিদীর্ঘ ও ঊর্ধ্বে প্রসারিত শিরোভূষণ যুক্ত, নানা প্রাণী পরিবেষ্টিত এক দেবতা মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। শিলমোহরের পিছনের দিকে প্রদর্শিত বৃষমূর্তি ও ত্রিশূলধ্বজ, দ্বিতল গৃহের সম্মুখে দন্ডায়মান অপর এক মনুষ্য (দেবতা ?) মূর্তির ও যোগাসনে উপবিষ্ট মূর্তিটির পরিচয় প্রদানে সাহায্য করে। এম.এস. বৎস অনুমান করিয়াছিলেন যে দ্বিতল গৃহ একটি দেবায়তন, এবং আসীন ও দণ্ডায়মান মূর্তিদ্বয় মার্শাল বর্ণিত আদি শিবের বিভিন্ন রূপায়ণ (M. S. Vats, Excavations at Harappa, pp. 129-30)। এ অনুমানের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না, কারণ বৃষ এবং ত্রিশূল, পরবর্তী কালের শিব দেবতার বিশেষ লাঞ্ছন। এ অনুমান সত্য হইলে প্রাচীন সিন্ধুতটবাসীদিগের পূজার দেবতা এই আদি শিবের কি নাম ছিল তাহা জানিবার কোনও উপায় অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। শিলমোহরগুলির গাত্রে খোদিত চিত্রাত্মক লিপিমালার (pictographs) যদি সর্বজনগ্রাহ্য পাঠোদ্ধার সম্ভব হইত তাহা হইলে হয়ত আমরা উহা জানিতে পারিতাম।’
‘প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার অপর কয়েকটি নিদর্শন বোধ হয় এই দেবতার পূজা-প্রতীক সম্বন্ধে আরও কিছু ইঙ্গিত প্রদান করে। নরম প্রস্তর বা পোড়া মাটিতে নির্মিত হ্রস্বাকৃতি এমন কতকগুলি দ্রব্য পাওয়া গিয়াছে যেগুলিকে লিঙ্গ-প্রতীক বলিয়া মার্শাল মনে করেন। ইহাদের আকৃতি ও গঠনপ্রণালী এই অনুমান সমর্থন করে, এবং ইহা মনে করা অসঙ্গত নহে যে সিন্ধুতটবাসীদিগের অনেকে ইহাদিগকে তাঁহাদের দ্বারা পূজিত পিতৃদেবতার পূজা-প্রতীক রূপে ব্যবহার করিতেন।… মহেঞ্জো-ডারো, হরপ্পা প্রভৃতি স্থানে প্রাপ্ত এই নিদর্শনগুলির উক্তরূপ ব্যাখ্যা সর্বজনগ্রাহ্য হয় নাই সত্য, কিন্তু এ মত গ্রহণ করিলে ঋগ্বেদে জুগুপ্সিত শিশ্নদেব বলিয়া বর্ণিত প্রাচীন জনগণের সঙ্গত পরিচয় পাওয়া যায়। অবশ্য সে ক্ষেত্রে শিশ্নদেব কথাটির অর্থ শিশ্নপূজক বলিয়া ধরিয়া লইতে হইবে।’– (পঞ্চোপাসনা, পৃষ্ঠা-১২১-২৩)

                প্রসঙ্গত, সিন্ধু-সভ্যতার সাথে বৈদিক আর্য-সভ্যতার পার্থক্য নিরূপণকারী বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে গিয়ে ড. অতুল সুরের বক্তব্য হলো–
‘অনেকেই বলেন যে সিন্ধু সভ্যতা ও বৈদিক আর্য সভ্যতা অভিন্ন। কিন্তু এটা যে ভ্রান্ত মত সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই দুই সভ্যতার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করলেই এটা বুঝতে পারা যাবে। দুই সভ্যতার মূলগত পার্থক্যগুলি নীচে দেওয়া হল :
১. সিন্ধু সভ্যতার বাহকরা শিশ্ন-উপাসক ছিল ও মাতৃকাদেবীর আরাধনা করত। আর্যরা শিশ্ন-উপাসক ছিল না ও শিশ্ন-উপাসকদের ঘৃণা ও নিন্দা করত। আর্যরা পুরুষ-দেবতার উপাসক ছিল। মাতৃকাদেবীর পূজার কোন আভাসই আমরা ঋগ্বেদে পাই না।
২. আর্যরাই প্রথম ঘোড়াকে পোষ মানিয়েছিল। ঘোড়াই ছিল তাদের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জন্তু। এখানে বলা দরকার যে, ঘোড়ার কোন অশ্মীভূত (fossilized) অস্থি আমরা সিন্ধু সভ্যতার কোনও কেন্দ্রে পাইনি। সিন্ধু সভ্যতার বাহকদের কাছে বলীবর্দই প্রধান জন্তু ছিল। এটা সীলমোহরসমূহের ওপর পুনঃ পুনঃ বলীবর্দের প্রতিকৃতি ক্ষোদন থেকে বুঝতে পারা যায়। পশুপতি শিব আরাধনার প্রমাণও মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া গিয়েছে। বলীবর্দ শিবেরই বাহন। সুতরাং সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রসমূহে বলীবর্দের প্রাধান্য সহজেই অনুমেয়।
৩. সিন্ধু সভ্যতার বাহকরা নগরবাসী ছিল। আর্যরা নগর নির্মাণ করত না। তারা নগর ধ্বংস করত। সেজন্য তারা তাদের প্রধান দেবতা ইন্দ্রের নাম পুরন্দর রেখেছিল।
৪. আর্যরা মৃতব্যক্তিকে দাহ করত। সিন্ধু সভ্যতার ধারকরা মৃতকে সমাধিস্থ করত।
৫. আর্যদের মধ্যে লিখন-প্রণালীর প্রচলন ছিল না। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার ধারকদের মধ্যে লিখন-প্রণালী সুপ্রচলিত ছিল।
৬. সিন্ধু সভ্যতা যে আর্য সভ্যতা নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে মৃৎপাত্র। কুরু-পাঞ্চাল দেশ অর্থাৎ যেখানে আর্য সভ্যতা বিস্তারলাভ করেছিল, সেখানকার বৈশিষ্ট্যমূলক মৃৎপাত্রের রঙ ছিল ধূসর বর্ণ। সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রসমূহ থেকে যে-সব মৃৎপাত্র পাওয়া গিয়েছে সেগুলির রঙ ‘কালো-লাল’।
৭. সিন্ধু সভ্যতা ছিল কৃষিভিত্তিক সভ্যতা। আর্যরা প্রথমে কৃষিকার্য জানত না। এটা আমরা শতপথ-ব্রাহ্মণের এক উক্তি থেকে জানতে পারি।
৮. সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা হাতির সঙ্গে বেশ সুপরিচিত ছিল। আর্যদের কাছে হাতি এক নূতন জীববিশেষ ছিল। সেজন্য তারা হাতিকে ‘হস্তবিশিষ্ট মৃগ’ বলে অভিহিত করত। বস্তুত হাতিকে প্রাচ্য ভারতের পালকাপ্য নামে এক মুনিই প্রথম পোষ মানিয়েছিলেন।
এসব প্রমাণ থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, আর্য সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা এক নয়।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

আর বাঙলার সঙ্গে সিন্ধুসভ্যতার ঘনিষ্টতা দেখাতে গিয়ে ড. সুর আরো বলেন–
‘ভারতে তাম্রাশ্ম সভ্যতার অভ্যুত্থানের মূলে ছিল তামার ব্যবহার। বাঙালীরাই সেই তামা তাম্রাশ্ম সভ্যতার কেন্দ্রসমূহে নিয়ে যেত। বাঙালীরা যে সিন্ধুসভ্যতার কেন্দ্রসমূহে উপস্থিত ছিল, তার প্রমাণ আমরা পাঁচটি সূত্র থেকে পাই– (১) মাতৃদেবীর উপাসনা, (২) মৎস্য-ভক্ষণ, (৩) হস্তীর সহিত পরিচয়, (৪) ধান্যের ব্যবহার এবং (৫) শিব ও শিবলিঙ্গের আরাধনা।’
‘মৎস্যভক্ষণ বাঙালীরই বৈশিষ্ট্য। মহেঞ্জোদারোতে যে বঁড়শি পাওয়া গিয়েছে তা থেকে স্বতই প্রমাণিত হয় যে সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে এমন এক শ্রেণী ছিল যারা মৎস্য ভক্ষণ করত। মহেঞ্জোদারোতে আমরা হস্তীর প্রতিকৃতি পেয়েছি। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে নিবদ্ধ কিংবদন্তী অনুযায়ী হস্তী প্রাচ্যভারতের পালকাপ্য মুনি কর্তৃক পালিত জন্তু। তিনিই প্রথম হস্তীকে বশ করেন ও হস্তীবিদ্যা সম্বন্ধে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। বাঙলাদেশই হাতির আদিম নিবাস। মহেঞ্জোদারোতে হাতির উপস্থিতি বাঙলাদেশের সঙ্গে ওই সভ্যতার সম্পর্ক সূচিত করে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে মহেঞ্জোদারোর ‘সীল’সমূহে উৎকীর্ণ হাতির প্রতিকৃতির সঙ্গে প্রাচীন বাঙলার উৎকীর্ণ পাঞ্চ-মার্ক মুদ্রায় প্রদর্শিত হাতির বিশেষ মিল আছে।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

             বাঙালির প্রিয় ও প্রধান খাদ্য চাউল তথা ধান্য প্রসঙ্গে ইতঃপূর্বেই আলোচিত হয়েছে। আর মাতৃকাপূজা সম্বন্ধে বললে এটা তো সর্বজনস্বীকৃত যে, বাঙলাই মাতৃদেবীর পূজার লীলাকেন্দ্র। তাছাড়া সমগ্র বাঙলা অঞ্চল জুড়ে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য মন্দিরে মন্দিরে শিব ও শিবলিঙ্গের আরাধনার তো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু এই শিব বা শিবলিঙ্গের পূজার সাথে সমগ্র সিন্ধু-সাম্রাজ্য জুড়ে আবিষ্কৃত অজস্র লিঙ্গ ও যোনি মূর্তি প্রাপ্তির কারণে তাকে লিঙ্গ-উপাসনার সমার্থক করে ফেলায় যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয়টির বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা আবশ্যক বৈকি।

              ড. অতুল সুরের বক্তব্য অনুযায়ী– ‘হিন্দুধর্মে শিব ও শক্তি যে মাত্র নরাকারে পূজিত হন, তা নয়; লিঙ্গ ও যোনি হিসাবেও পূজিত হন। সিন্ধু উপত্যকার প্রাচীন অধিবাসীরা যে লিঙ্গ-যোনি উপাসক ছিলেন তা সেখানে প্রাপ্ত মণ্ডলাকারে গঠিত প্রতীকসমূহ থেকে বুঝতে পারা যায়। এছাড়া, আমরা সেখানে প্রস্তরনির্মিত পুরুষলিঙ্গের এক বাস্তবানুগ প্রতিরূপ পেয়েছি। সিন্ধু উপত্যকার অধিবাসীরাই যে ঋগ্বেদে বর্ণিত সমৃদ্ধিশালী নগরসমূহের আর্য-বৈরী ‘শিশ্নোপাসক’ সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।’
এ-বিষয়ে বৈদিক সাহিত্যেও সাক্ষ্য পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, ঋগ্বেদে শিশ্নদেব বা লিঙ্গ-উপাসকেরা নিন্দিত হয়েছে। যেমন–

‘ন যাতব ইন্দ্র জুজুবুর্নো ন বন্দনা শবিষ্ঠ দেব্যাভিঃ।
স শর্ধদর্যো বিষুণস্য জন্তোর্মা শিশ্নদেবা অপি গুর্ঋৃতং নঃ’।। (ঋক-৭/২১/৫)
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! যাতুগণ যেন আমাদের হিংসা না করে। হে বলবত্তম ইন্দ্র! তারা যেন আমাদেরকে বেদীস্থ ব্যক্তিদের থেকে পৃথক না করে। প্রভু ইন্দ্র যেন বিষম প্রাণীর শাসনে যেন আমাদেরকে উৎসাহ দেন এবং শিশ্নদেবগণ যেন আমাদের ঋতকে পরাজিত না করে।

               কিন্তু এখানে এই শিশ্নদেব বলতে ঠিক কাদেরকে বোঝানো হয়েছে? এক্ষেত্রে শিশ্নদেব বলতে শিশ্নপূজক বলে ধরে নিতে অধিকাংশ পণ্ডিত আগ্রহী। যদিও বলা আবশ্যক যে, সায়নাচার্য তাঁর ঋগ্বেদ-ভাষ্যে তার অর্থ অন্যরূপ করেছেন। তাঁর মতে শিশ্নদেব শব্দ কামুক ইন্দ্রিয়পরায়ণ ব্যক্তিগণকেই বুঝাতো। এক্ষেত্রে অন্য একটি ঋক থেকে হয়তো এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে। যেমন–

‘স বাজং যাতাপদুষ্পদা সন্ত্স্বর্ষাতা পরি ষদৎসনিষ্যন্ ।
অনর্বা যচ্ছতদুরস্য বেদো ঘ্নঞ্ছিশ্নদেবা অতি বর্পসা ভূৎ’।। (ঋক-১০/৯৯/৩)
অর্থাৎ : তিনি সুচারু গতিতে গমনপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন। সর্ববস্তুর দাতা (সেই ইন্দ্র) দিতে উদ্যত হয়ে যুদ্ধে অবস্থিত হন। তিনি নিজতেজে অবিচলিতভাবে শিশ্নদেবগণকে হত্যা করতে করতে পরাভূত করে শতদ্বারবিশিষ্ট শত্রুপুরী হতে ধন অপহরণ করেন।

 

              অতএব অনুমান হয়, ঋগ্বেদে যাদের শিশ্নদেব বা লিঙ্গ-উপাসক বলে উল্লেখ করা হয়েছে তারা শুধুই যে ইন্দ্র-আক্রান্ত ও আর্যদল-লুণ্ঠিত হয়েছিলো তাই নয়, তারাই ছিলো ঐশ্বর্যপূর্ণ শতদ্বার-বিশিষ্ট শত্রুপুরীর অধিবাসীও। কিন্তু বৈদিক আর্যরা কি সিন্ধু-সভ্যতার পুর বা নগর ছাড়াও আর কোনো ঐশ্বর্যপূর্ণ পুর বা নগর ধ্বংস করেছিলো? প্রখ্যাত বিদ্বান-গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন–
‘এ-জাতীয় কল্পনার পক্ষে প্রত্নতত্ত্বে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং পাবার কোনো ভবিষ্যৎ-সম্ভাবনাও নেই। অপরপক্ষে, হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া অজস্র লিঙ্গ ও যোনি-মূর্তি থেকে অবশ্যই প্রমাণ হয় ওই প্রাচীন ঐশ্বর্যপূর্ণ নগরবাসীরা শিশ্নদেব বা লিঙ্গ-উপাসক ছিল। অতএব এখানেও সাহিত্যমূলক সাক্ষ্যের সঙ্গে প্রত্নতত্ত্বমূলক সাক্ষ্যের পূর্ণ-সঙ্গতি দেখা যায় : সিন্ধু-অধিবাসীদেরই ঋগ্বেদ-উল্লিখিত শিশ্নদেব বলে সনাক্ত করতে হবে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৫)
অন্যদিকে সিন্ধু-সভ্যতাকে আর্য-কীর্তি বলে প্রতিপন্ন করার আশায় হয়তো এমন কল্পনা করা যেতে পারে যে ঋগ্বেদ-নিন্দিত ওই শিশ্নদেব বলতেও আর্য-গোষ্ঠিভুক্ত কোনো ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষই বুঝতে হবে। সেক্ষেত্রে শিশ্নদেবদের সঙ্গে শতদ্বারবিশিষ্ট পুরের সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে এ-কথা কল্পনা করা একান্তই অসম্ভব যে প্রাচীন আর্যরাও নগর-সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো। যদিও পরবর্তী কালের বৈদিক সাহিত্যে– বিশেষত যজুর্বেদ, ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্য এবং শ্রৌতসূত্রে– উর্বরতামূলক জাদু-বিশ্বাসের প্রচুর স্মারক দেখা যায়, এক্ষেত্রে বৈদিক মানুষদের অর্থনীতিতে কৃষিকাজের ক্রমবধমান গুরুত্বের সঙ্গে এর সম্পর্ক অনুমেয় বলে দেবীপ্রসাদ মনে করেন।

              কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ঋগ্বেদে ওই শিশ্নদেবদের প্রতি মনোভাব যত বিরূপই হোক না কেন পরবর্তীকালের ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসকে এ-মনোভাব খুব একটা প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয় না। কেননা উত্তরকালের ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসের অন্যতম প্রধান পরিচয় বলতে ওই লিঙ্গ-উপাসনাই। এই উপাস্য লিঙ্গ সাধারণত শিবলিঙ্গ– বা শিব বলেই অভিহিত হয়। আর তাই ওই লিঙ্গ-উপাসনাকে শৈব-সাধনার পরিচায়ক বলে গ্রহণ করানোর উৎসাহ অকারণ মনে হয় না। এবং এই উৎসাহের পরিণাম হিসেবেই হয়তো প্রত্নতত্ত্ববিদ জর্জ মার্শাল কর্তৃক অনুমিত হয়েছে, ‘শক্তি-সাধনার মতোই শৈব-সাধনারও সূত্রপাত প্রাচীন প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু যুগে এবং বেদোত্তর ভারতবর্ষীয় ধর্ম-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও শক্তি-সাধনার মতোই ওই শৈব-সাধনার অবিচ্ছিন্ন প্রভাব টিকে থেকেছে।’

              প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,– ‘মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত একটি সীলে ত্রিমুখ, দ্বিশৃঙ্গ, যোগাসনে উপবিষ্ট (সম্ভবত কূর্মাসনে) একটি মূর্তি অঙ্কিত দেখা যায়। মূর্তিটির দুই বাহু বলয়বিশিষ্ট পূর্ণ প্রসারিত ও হাঁটুর উপর ন্যস্ত। বক্ষঃদেশে কয়েকটি মালা বিদ্যমান। মূর্তিটির দু’পাশে চারটি প্রাণী অঙ্কিত আছে– হস্তী, ব্যাঘ্র, গণ্ডার ও মহিষ। এই মূর্তিটিকে স্যার জন মার্শাল পৌরাণিক শিব-পশুপতির আদি প্রতীক বলেছেন, এবং এ বক্তব্য অনেকেই সমর্থন করেছেন। আর একটি সীলে এই দেবতা যোগাসনে উপবিষ্ট, দুপাশে দুটি নাগজাতীয় মূর্তি দেখা যায়। হরপ্পায় প্রাপ্ত একটি পোড়ামাটির সীলে যোগাসনে উপবিষ্ট, শিরোভূষণযুক্ত এবং নানা প্রাণী পরিবেষ্টিত এক দেবতাকে দেখা যায়। সীলের পিছন দিকে প্রদর্শিত বৃষ মূর্তি ও ত্রিশূলধ্বজ, মূর্তিটির উপবেশনভঙ্গী প্রভৃতি শিবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’
‘কিন্তু স্মরণ করিয়ে দেওয়া এক কথা, প্রমাণিত হওয়া আর এক। প্রথমোক্ত সীলটির উপর মার্শাল সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর প্রধান যুক্তি হল সীলটির উপর অঙ্কিত নানা চিহ্ন থেকে শিব কল্পনার বিভিন্ন পৌরাণিক উপাদানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে প্রচলিত কয়েকটি নির্বাচিত পৌরাণিক উপাদান অবলম্বন করে প্রাচীনকালের কোন চিত্রকে অবধারিতভাবে শিবমূর্তি বলে শনাক্ত করা সম্ভবপর নয়। কিন্তু পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যেরও মূল্য আছে, যা হচ্ছে সমগ্র হরপ্পা সভ্যতা জুড়ে আবিষ্কৃত অজস্র লিঙ্গ ও যোনি মূর্তি। উত্তরকালের ভারতীয় ধর্মে লিঙ্গ বলতে প্রধানত শিবলিঙ্গই বোঝায়। আলোচ্য সীলের মূর্তিটি পৌরাণিক শিব হোক আর নাই হোক সমগ্র হরপ্পা সভ্যতা জুড়ে যে অজস্র লিঙ্গ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মূর্ত সাক্ষ্য উপেক্ষণীয় হতে পারে না।’– (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৯৭-৯৮)

           এক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠে, সিন্ধু যুগেও ওই উপাস্য লিঙ্গ-মূর্তিকে উত্তরকালের মতো শিব-মূর্তি বা শিব-লিঙ্গ আখ্যা দেয়া হতো কিনা তা জানা নেই; অন্তত সিন্ধু-লিপির পাঠোদ্ধারের পূর্বে এ-বিষয়ে কোনো সুনিশ্চিত অনুমানেরও সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, উত্তরকালে ওই ‘শিব’ নামটিকে কেন্দ্র করে যে অসংখ্য পৌরাণিক কল্পনার জটিলতা সৃষ্ট হয়েছে, এই পৌরাণিক উপাদানগুলির নির্ভুল ইতিহাস নির্ণয় করাও হয়তো একান্তই অসম্ভব। অতএব প্রাচীন সিন্ধু-সভ্যতায় মার্শাল কর্তৃক দাবীকৃত ‘শৈব’-সাধনার স্বাক্ষর কতোটা গ্রহণযোগ্য?
দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘সিন্ধু-যুগে প্রচলিত শৈব-ধর্মের নজির হিসেবে মার্শাল সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন মহেঞ্জোদারোতে আবিষ্কৃত কোণা-ভাঙা একটি সীলের উপর। এ-বিষয়ে তাঁর প্রধান যুক্তি হলো, সীলটির উপর অঙ্কিত নানা চিহ্ন থেকে শিব-কল্পনার বিভিন্ন পৌরাণিক উপাদানের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়– অতএব ওই সীলের কেন্দ্রস্থ মূর্তিটিকে অবধারিতভাবেই শিবমূর্তি বলে গ্রহণ করতে হবে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৬)
একইভাবে প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. অতুল সুরও মনে করেন– ‘সিন্ধু উপত্যকার প্রাগার্য অধিবাসিগণ যে মাত্র মাতৃদেবীর পূজা করতেন, তা নয়। সুমের ও মধ্য-প্রাচীর প্রাচীন অধিবাসীদের ও বর্তমানকালের ভারতীয় হিন্দুদের মত তাঁরা সৃজন-শক্তির আধার হিসাবে এক পুরুষ দেবতারও উপাসনা করতেন। মহেঞ্জোদারো থেকে যে তিন-মুখবিশিষ্ট এক দেবতার উৎকীর্ণ মূর্তি এক সীলের ওপর পাওয়া গিয়েছে, তার দ্বারা এটা প্রমাণিত হচ্ছে। এই দেবতা সিংহাসনের উপর আসীন। তাঁর বক্ষ, কণ্ঠ ও মন্তক উন্নত। তাঁর এক পা অপর পায়ের উপর আড়াআড়িভাবে স্থাপিত, তাঁর দুটি হাত বিস্তৃতভাবে হাঁটুর উপর স্থাপিত। তিনি পর্যঙ্ক-আসনে উপবিষ্ট হয়ে, ধ্যানস্থ ও উর্ধ্বলিঙ্গ। তাঁর উভয়পার্শ্বে চার প্রধান দিক-নির্দেশক হিসেবে হাতি, বাঘ, গণ্ডার ও মহিষের প্রতিমূর্তি অঙ্কিত। তাঁর সিংহাসনের নীচে দুটি মৃগকে পশ্চাৎদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পাওয়া যায়। এখানেই যে আমাদের আদি-শিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বস্তুত পরবর্তীকালের শিবের তিনটি মূলগত ধারণা, আমরা এখানে দেখতে পাই– তিনি (১) যোগীশ্বর বা মহাযোগী, (২) পশুপতি, ও (৩) ত্রিমুখ।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

               কিন্তু শিবের মতো জনপ্রিয় দেবতাকে নিয়ে কল্পিত প্রচুর পৌরাণিক কাহিনীর জটিলতার মধ্য থেকে পরবর্তীকালে প্রচলিত কয়েকটি নির্বাচিত পৌরাণিক উপাদান অবলম্বন করে প্রাচীন কালের কোনো চিত্রকে অবধারিতভাবে শিবমূর্তি বলে সনাক্ত করা সুসঙ্গত নয় বলেই অনেকে মনে করেন। তাছাড়া সিন্ধু-যুগের অন্যান্য এমন সীলও পাওয়া গেছে যার কেন্দ্রস্থ মূর্তিটি আলোচ্য সীলেরই অনুরূপ, কিন্তু সে মূর্তির সঙ্গে মার্শাল-আলোচিত সীলে পাওয়া পৌরাণিক উপাদানের সম্পর্ক নেই; হয়তো বা অধুনা-অজ্ঞাত-কোনো পৌরাণিক কাহিনীর সম্পর্ক-মুলক ইঙ্গিত থাকা অসম্ভব নয়। তারচেয়ে বরং ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে লিঙ্গ-উপাসনার যে ব্যাপক ও গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, তার সঙ্গে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া অজস্র লিঙ্গমূর্তি যে প্রাগৈতিহাসিক অতীতের ইঙ্গিত দেয়, তার যোগসূত্র অন্বেষণের মধ্যেই হয়তো বা এর সমাধান লুকিয়ে আছে। উত্তরকালের প্রথা অনুসারে এই উপাস্য লিঙ্গমূর্তিগুলিকে আমরা যদি শিবলিঙ্গ অ্যাখ্যা দিতে সম্মত হই তা হলেই এই দিক থেকেই সিন্ধু ধর্মে শৈব-সাধনার আদি-রূপ স্বীকারযোগ্য হতে পারে।
কিন্তু এখানে প্রশ্ন, সিন্ধু-যুগের ওই ধর্ম-বিশ্বাসে লিঙ্গ-উপাসনার এমন গভীর ও ব্যাপক প্রভাব কেন? উত্তর-লাভের মূলসূত্রটা আমরা ইতঃপূর্বেই দেখেছি–
‘অন্যান্য নানা দেশের নানা ধর্ম-বিশ্বাসের মতোই আমাদের দেশের এই প্রাগৈতিহাসিক ধর্মবিশ্বাসটিও এক আদিম উর্বরতামূলক জাদু-বিশ্বাস থেকেই জন্মলাভ করেছিল। সেই আদিম পর্যায়ের মানুষ প্রাকৃতিক উৎপাদিকা-শক্তির বাস্তব রহস্য উদ্ঘাটন করতে শেখেনি, প্রকৃতির ফলপ্রসূতাকেও মানবীয় ফলপ্রসূতার অনুরূপ বলেই কল্পনা করেছিল এবং মানবীয় প্রজননের সান্নিধ্যে বা সাহায্যে প্রাকৃতিক উৎপাদিকা শক্তিকে উদ্বুদ্ধ ও সমৃদ্ধ করার আয়োজন করেছিল। অতএব আদিম মানুষদের মধ্যে প্রচলিত এই জাদুবিশ্বাসমূলক আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মানবীয় জননাঙ্গ ও তার অনুকরণের বিবিধ প্রয়োগ চোখে পড়ে; প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসগুলি থেকে তার চিহ্ন বিলুপ্ত হয়নি– সিন্ধু যুগের ধর্মবিশ্বাস থেকেও নয়।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৭)

           আবার সিন্ধু-ধর্মের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য যে মাতৃপ্রাধান্য– মার্শালের এ-সিদ্ধান্ত অবশ্য-স্বীকার্য। অথচ পৌরাণিক ইঙ্গিতের উপর নির্ভর করে পূর্বোল্লিখিত সীলের তথাকথিত শিব-মূর্তিকে তিনি পুরুষ দেবতা বলেই সনাক্ত করতে চেয়েছেন। কিন্তু আলোচ্য সীলের মূর্তিটি পৌরাণিক শিব হোক-বা-নাই-হোক সমগ্র সিন্ধু-সাম্রাজ্য জুড়ে যে-অজস্র লিঙ্গ বা শিবলিঙ্গ আবিষ্কৃত হয়েছে তার মূর্ত সাক্ষ্য কিছুতেই উপেক্ষণীয় নয়, এবং এগুলি অবধারিতভাবেই পুরুষাঙ্গের নিদর্শন। অতএব, ওই মাতৃপ্রধান ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে এগুলির নিদর্শন অন্তত কোনো-এক আপাত-অসঙ্গতির পরিচায়ক বলেই প্রতীত হয়। তাই এখানেও প্রশ্ন, সিন্ধু-যুগের শক্তি-সাধনায়– ওই বসুমাতা বা শাকম্ভরীর উপাসনায় (শাকম্ভরী দেবী প্রসঙ্গে শাক্ত-সাধনা বিষয়ে অন্যত্র আলোচিত হয়েছে)– এই পুরুষতত্ত্বের তাৎপর্য কী হতে পারে?

            এক্ষেত্রে পরবর্তী কালের ভারতবর্ষীয় শাক্ত ধর্ম এই প্রশ্নের উপর কী ধরনের আলোকপাত করে তা খুঁজতে গিয়ে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাবলী থেকে প্রথমে প্রাসঙ্গিক বক্তব্যাংশের উদ্ধৃতি টানেন–
‘তন্ত্রের শাক্ত সাধকগণ বলেন যে, শিব তো স্থাণু-সদৃশ একটা বিদ্যমানতার দ্যোতকমাত্র, তাঁহার উপাসনা করি কোন্ হিসাবে। শক্তি না থাকিলে শিব তো শব, অথচ শক্তি-শূন্যে শিব হইতেই পারেন না। অতএব শিব আছেন, মাথার উপর থাকুন, আমরা মায়ের– আদ্যাশক্তির– উপাসনা করিব। কারণ, তিনিই তো সব– তিনি মেধা, তিনি মায়া, তিনি লজ্জা, তিনি ক্ষমা, তিনি বুদ্ধি, তিনি ধৃতি, তিনি বিদ্যা, তিনি ছায়া, তিনি শান্তি, তিনি ক্ষান্তি– তাঁহাকে পূজা করিব না তো কাহার পূজা করিব?’
অতঃপর দেবীপ্রসাদ বলেন– ‘অতএব দেখা যায়, উত্তরকালের শাক্ত-তত্ত্ব ঐকান্তিক অর্থে মাতৃপ্রধান হলেও তার মধ্যে শিব বা পুরুষতত্ত্বের যে কোনো-ভাবেই হোক না কেন একটা স্থান থেকে গিয়েছে। শক্তিই প্রধান, শক্তিই মূলতত্ত্ব, তবুও অন্তত গৌণ অর্থে শিব বা পুরুষ-তত্ত্বও স্বীকৃত হয়েছে। স্বভাবতই এই প্রসঙ্গে সাংখ্য-দর্শনের কথা মনে পড়ে : প্রকৃতিই প্রধান তবু পুরুষও সত্য– যদিচ এই পুরুষ অপ্রধান এবং উদাসীন মাত্র।… আপাতত মন্তব্য হলো, পরবর্তীকালের শাক্ত-ধর্মকে যদি সিন্ধু-ধর্মেরই রেশ বলে স্বীকার করা হয় তা হলে অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে সিন্ধু-যুগের ওই প্রাগৈতিহাসিক শাক্ত-ধর্মের মধ্যেই আলোচ্য বৈশিষ্ট্যের বীজ ছিল– হয়তো তারই মূর্ত নিদর্শন হলো ওই বসুমাতামূলক ধর্মবিশ্বাসের স্মারকগুলির মধ্যে যোনি-মূর্তি ছাড়াও লিঙ্গ-মূর্তি বা শিবলিঙ্গগুলি। অতএব সিন্ধু-ধর্মেও এই শিবলিঙ্গ নির্দেশিত পুরুষ তত্ত্বের স্থান গৌণ– অপ্রধান এবং উদাসীন– বলেই অনুমেয়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৮)

            যদিও অবশ্যই উত্তরকালের ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসে শক্তি-সাধনা ও শৈব-সাধনার মধ্যে পার্থক্য ও প্রভেদ ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং শৈব-ধর্মে ওই শিব বা পুরুষ-তত্ত্ব স্বভাবতই স্বাতন্ত্র্য এবং প্রাধান্য লাভ করেছে, কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো সেখানেও ওই আদিম মাতৃতত্ত্বের– শক্তির বা প্রকৃতির– গুরুত্ব সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়নি। যেমন উদাহরণস্বরূপ, শৈব-সিদ্ধান্ত অনুসারে ‘হর’ বা ‘শিব’ (ঈশ্বর) সৃষ্টির নিমিত্ত-কারণ মাত্র; সৃষ্টির উপাদান-কারণ বলতে ‘মায়া’ বা ‘প্রকৃতি’। এদিক থেকে অনুমান হয়, উত্তরকালের শৈব-সাধনায় শিব বা পুরুষতত্ত্বের উপর যতোখানিই আপেক্ষিক গুরুত্ব আরোপিত হোক না কেন তা থেকে ওই আদিম মাতৃপ্রধান বা প্রকৃতিপ্রধান বিশ্বাসের চিহ্ন সম্পূর্ণভাবে লুপ্ত হয়নি বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন। অবশ্যই উত্তরকালের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে ওই মাতৃপ্রধান বিশ্বাসের অকৃত্রিম ও প্রকৃষ্টতম পরিচয় শক্তি-সাধনা বা তন্ত্র সাধনাতেই– এই তন্ত্র-সাধনা পরবর্তীকালে যতই জটিল ও পল্লবিত রূপ গ্রহণ করুক না কেন।

              এ পর্যায়ে এসে আমাদেরকে একটি আপাত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় যে, সিন্ধু-সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ের আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজ অবশ্যই মাতৃপ্রধান। কিন্তু নগর-সভ্যতার সুউন্নত পর্যায়েও সমাজ-ব্যবস্থা মাতৃপ্রধান ছিলো এমনটা বলার উপায় নেই। উন্নততর কৃষিকাজের পর্যায়ে গৃহপালিত পশুর সাহায্যে লাঙল দেবার ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কৃষিকাজে পুরুষের ভূমিকাই প্রধান হয়ে ওঠায় ক্রমশ সমাজ-ব্যবস্থাও পুরুষ প্রধান হয়ে উঠেছে। কিন্তু সমাজ-ব্যবস্থায় মাতৃ-প্রাধান্য ক্ষুণ্ন ও পরিবর্তিত হলেও ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে মাতৃপ্রাধান্যের সুস্পষ্ট স্মারক রয়ে গেছে। তার সাথে পুরুষবাচক কিছু কিছু সহায়ক উপজীবিকা যুক্ত হয়েছে হয়তো, যদিও তা অপ্রধান। যেহেতু কৃষিভিত্তিক উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসগুলো বরাবরই মাতৃপ্রাধান্যমূলক, তাই সেটি অক্ষুণ্ন থেকেই হয়তো পরবর্তীকালে সেখানে প্রকৃতির সমরূপী প্রজননমূলক জাদুবিশ্বাস হিসেবে আচার-বিশ্বাসে প্রতীকি লিঙ্গ-সাধনার বিষয়টি কালক্রমে ঢুকে গেছে। তারপরও তার অপ্রাধান্যের কারণেই হয়তোবা সেই সিন্ধুবাসীদেরকে পরবর্তীকালের আধিপত্যবাদী আর্য-প্রচারকরা ঋগ্বেদে শিশ্নদেব বলে বিদ্রুপ ও নিন্দা করেছেন। তবে ওই সুপ্রাচীন মাতৃপ্রধান বা প্রকৃতিপ্রধান ধর্ম-বিশ্বাসের সুস্পষ্ট দার্শনিক পরিণতি প্রাচীন সাংখ্য-দর্শনে ঘটেছিলো বলেই অনুমান হয়। এবং যেহেতু ওই প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস অনুসারে আদি-মাতৃকা বলতে বসুমাতা বা পৃথিবী, সেই কারণেই এ-তত্ত্বের দার্শনিক পরিণতি হিসেবে সাংখ্যদর্শনেও সৃষ্টির আদি কারণ বলতে জড়-রূপা প্রকৃতি বা প্রধান বা মায়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘পুরুষ’-তত্ত্ব পরিচয় পাওয়া যায় এই দর্শনে। সাংখ্য-দর্শনের আদি-অকৃত্রিম রূপটির মধ্যে ওই ‘পুরুষ’-তত্ত্বের প্রকৃত তাৎপর্য হলো, সাংখ্যর পুরুষ ‘অপ্রধান’ ও ‘উদাসীন’ বলেই প্রখ্যাত– উত্তরকালের শাক্ত-সাধকদের কাছে যেমন শক্তিই প্রধান, যদিও ‘শিব আছে, মাথায় থাকুন– কিন্তু শক্তি-শূন্য শিব তো শবের মতোই’।

           তবে এ-প্রসঙ্গে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, পুরুষ-প্রধান বৈদিক ঐতিহ্যের দার্শনিক পরিণতির ক্ষেত্রে তথা উপনিষদের চিন্তাধারায় পুরুষই চরম তত্ত্ব, শেষ সত্য। যেমন কঠ-উপনিষদে বলা হয়েছে–

‘মহতঃ পরমব্যক্তমব্যক্তাৎ পুরুষঃ পরঃ।
পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ।।’ (কঠোপনিষদ-১/৩/১১)
অর্থাৎ : ‘মহৎ’-এর চেয়ে ‘অব্যক্ত’ (‘প্রকৃতি’) শ্রেষ্ঠ, অব্যক্তের চেয়ে ‘পুরুষ’ শ্রেষ্ঠ। পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নয়। তিনিই শেষ, তিনিই পরা গতি অর্থাৎ চূড়ান্ত পরিণতি।

            ঋগ্বেদের ‘পুরুষ-সূক্তে’ (ঋগ্বেদ-১০/৯০, শক্তি-সাধনা অধ্যায়ে এই পুরুষ-সূক্তের উদ্ধৃতি ও আলোচনা করা হয়েছে) এই চিন্তাধারার সূত্রপাত মনে করা হয় এবং ঔপনিষদিক দর্শনে তার চূড়ান্ত পরিণতি। স্বভাবতই বৈদিক চিন্তাবিকাশের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ‘পুরুষ’ শব্দের অর্থ অপরিবর্তিত নয়। যেমন ছান্দোগ্য-উপনিষদে দেখা যায় এই ‘পুরুষ’ এক জ্যোতির্ময় ‘অ-মানব’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন–

‘মাসেভ্যঃ সংবৎসরং সংবৎসরাৎ আদিত্যম্ আদিত্যাচ্চন্দ্রমসং চন্দ্রমসো বিদ্যুতং তৎ পুরুষোহমানবঃ স এনান্-ব্রহ্ম গময়ত্যেষ দেবযানঃ পন্থা ইতি।’ (ছান্দোগ্য-৫/১০/২)
অর্থাৎ :
তাঁরা (যারা মৃত্যুর পর অর্চিলোক প্রাপ্ত হন) সেখান (অর্চি, দিন, শুক্লপক্ষ, উত্তরায়ণের ছয় মাস) থেকে সংবৎসরে, সংবৎসর থেকে আদিত্যে, আদিত্য থেকে চন্দ্রে এবং চন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ-লোক প্রাপ্ত হন। সেই স্থানে [ব্রহ্মলোক থেকে] এক ‘অমানব-পুরুষ’ এসে তাদের ব্রহ্মলোকে নিয়ে যায়। এই পথই দেবযান অর্থাৎ দেবলোকের পথ।

               এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদে দেখা যায়, এই যে অমৃতময় ‘পুরুষ’ চিৎস্বরূপ, তিনি ব্রহ্ম বা আত্মার সঙ্গে অভিন্ন–

‘অয়মাত্মা সর্বেষাং ভূতানাং মধু, অস্যাত্মনঃ সর্বাণি ভূতানি মধু। যশ্চায়ম্ অস্মিন্নাত্মনি তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চায়মাত্মা তেজোময়োহমৃতময়ঃ পুরুষোহয়মেব স যোহয়মাত্মা, ইদং অমৃতমিদং ব্রহ্মেদং সর্বম্ ।’ (বৃহদারণ্যক-২/৫/১৪)
অর্থাৎ :
এই আত্মা অর্থাৎ দেহ যাবতীয় বস্তুর মধু। যাবতীয় বস্তুও এই দেহের কাছে মধুস্বরূপ। এই দেহে যে তেজোময় অমৃতময় পুরুষ আছেন আর দেহ মধ্যে যে জীবাত্মারূপী তেজোময় অমৃতময় অধ্যাত্ম পুরুষ আছেন– দুই-ই এক। ইনি অমৃত, ইনি ব্রহ্ম। ইনিই সব কিছু।

              কিন্তু এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, উপনিষদ-প্রতিপাদ্য ওই পরব্রহ্ম বা পরমতত্ত্বকে বোঝাবার উদ্দেশ্যেও প্রাচীন ‘পুরুষ’ শব্দটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি। এবং উপনিষদের স্থান-বিশেষে এমন ইঙ্গিত থেকে গিয়েছে যা থেকে অনুমান হয় এই অমূর্ত দার্শনিক তত্ত্বটির নিচে একান্ত মূর্ত ও মানবাত্মক অর্থ ঢাকা পড়ে আছে। যেমন, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে লক্ষ্যণীয়–

‘অজামেকাং লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং বহ্বীঃ প্রজাঃ সৃজমানাং সরূপাঃ।
অজো হ্যেকো জুষমাণোহনুশেতে জহাত্যেনাং ভুক্তভোগামজোহন্যঃ।।’-(শ্বেতাশ্বতর-৪/৫)
অর্থাৎ :
প্রকৃতি নিজের মতোই অনেক জীব সৃষ্টি করে। তারা কেউ বা লাল, কেউ বা সাদা আবার কেউ বা কালো। একজন অজ্ঞান জীব এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তা ভোগ করে। কিন্তু আরেকজন বুদ্ধিমান এবং বিচারশীল ব্যক্তি পূর্ব পূর্ব অভিজ্ঞতার দরুন তিনি বুঝেছেন যে এই স্থূল জগৎ অজ্ঞান-অবিদ্যারূপী ক্ষণস্থায়ী; সেই কারণেই তিনি এই জগৎকে ত্যাগ করেন।

            তাই দেবীপ্রসাদ বলেন– ‘স্বভাবতই উপনিষদের চিন্তাধারায় চিন্ময় ব্রহ্ম অর্থে পুরুষ-তত্ত্বের উপর এ-জাতীয় ঐকান্তিক গুরুত্ব আরোপণের ফলে জড়রূপা প্রকৃতি বা মায়া, অজ্ঞান বা অবিদ্যা-বোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই মায়া-নিবৃত্তিই উপনিষদে পরম-পুরুষার্থ বলে ঘোষিত। অতএব অত্যন্ত সুপ্রাচীন কালেই– উপনিষদের যুগেই– ভারতীয় দর্শনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট মতাদর্শগত সংঘাত পরিলক্ষিত হয় : একদিকে আদিম মাতৃপ্রধান বিশ্বাসের দার্শনিক পরিণতি হিসেবে জড়রূপা প্রকৃতি বা মায়াকে প্রধান বলে গ্রহণ করবার পরিচয়, অপর দিকে আদিম পুরুষপ্রধান বিশ্বাসের দার্শনিক পরিণতি হিসেবে প্রকৃতি বা মায়াকে অবিদ্যা বা মিথ্যা বলে উপেক্ষা করে চিন্ময় পুরুষ বা ব্রহ্মকেই পরম-সত্তা বা পরম-তত্ত্ব বলে গ্রহণ করবার পরিচয়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৯)

            পরবর্তীকালের দার্শনিক আলোচনায় ব্রহ্মবাদী বেদান্ত-দর্শন ও প্রাচীন সাংখ্য-দর্শনের মধ্যকার দার্শনিক সংঘাতের তাৎপর্যটাও যে এখানেই লুকায়িত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেদান্তদর্শনের সূত্রগ্রন্থ ‘ব্রহ্মসূত্রে’ বিরাট অংশ জুড়ে সাংখ্য-খণ্ডনের আয়োজন এ-কারণেই। এছাড়া প্রাচীন নিরীশ্বর সাংখ্যকে সেশ্বরে রূপান্তরের প্রয়াস এবং সমান্তর দর্শন হিসেবে সেশ্বর-সাংখ্য হিসেবে পরিচিত যোগ-দর্শনের জন্ম-বৃত্তান্তও খুব সম্ভবত এখানেই জড়িয়ে আছে। এ-প্রেক্ষিতে সিন্ধু-ধর্মের আরেকটি বৈশিষ্ট্যের বিশ্লেষণ আবশ্যক।
‘সীলের উপর অঙ্কিত যে-মূর্তিকে মার্শাল পৌরাণিক শিব বলে সনাক্ত করতে চেয়েছেন সেটি প্রকৃত শিব-মূর্তি হোক আর নাই হোক তার আসন-ভঙ্গির বৈশিষ্ট্য অবশ্যই লক্ষণীয়। কেননা পরবর্তী কালের ধর্ম-সাধনার ক্ষেত্রে এরই নাম যোগাসন– যোগ-সাধনার আসন-ভঙ্গি। বস্তুত মার্শাল নিজেও এই আসন-ভঙ্গিকে যোগাসন বলেই সনাক্ত করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, পুরাণের শিব ‘যোগী’ অতএব আলোচ্য মূর্তির ওই যোগাসন থেকেও তাকে শিবমূর্তি বলেই গ্রহণ করতে হবে। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, সিন্ধু সভ্যতার অন্যান্য সীল এবং কোনো কোনো ভগ্ন প্রস্তরমূর্তিতে এই আসন ভঙ্গিরই পরিচয় পাওয়া যায়। অতএব এই মূর্ত প্রমাণগুলির দিক থেকে আমরা অনুমান করতে বাধ্য, যে সিন্ধু যুগেও ‘যোগ’-সাধনা প্রচলিত ছিল, কিংবা উত্তরকালে যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘যোগ’ সিন্ধু-ধর্মের মধ্যেই তার সুস্পষ্ট সূত্রপাত দেখা যায়।
কিন্তু সিন্ধু-ধর্মে যোগ-সাধনার নিদর্শক হিসেবে শুধুমাত্র এগুলির উপরই নির্ভর করবার প্রয়োজন নেই। বস্তুত এগুলি আবিষ্কৃত হবার অনেক আগেই রমাপ্রসাদ চন্দ মহেঞ্জোদারোতে আবিষ্কৃত দু’টি প্রস্তরমূর্তির বিশেষত চোখের ভঙ্গি থেকে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে পরবর্তীকালে ভারতবর্ষীয় ভাস্কর্যে যোগী-মূর্তি রচনার যে-বিশিষ্ট রীতি দেখা যায় তার সঙ্গে মহেঞ্জোদারোর ওই প্রস্তরমূর্তিগুলির অত্যন্ত নিকট সাদৃশ্য সুস্পষ্ট।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭৯-৮০)

কী সেই সাদৃশ্য? রমাপ্রসাদ চন্দ বলছেন (সূত্র: ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৮০)–
‘The only part of the statuettes that is in fair state of preservation, the bust, is characterized by a stiff erect posture of the head, the neck and the chest, and half-shut eyes looking fixedly at the tip of the nose. This posture is not met with in the figure sculptures, whether pre-historic or historic, of any people outside India; but it is very conspicuous in the images worshipped by all Indian sects including the Jainas and the Buddhists, and is known as the posture of the `yogin’ or one engaged in practicing concentration.’

           অতএব সিন্ধু-ধর্মে যোগ-সাধনার পরিচয় উপেক্ষা করা যায় না। অবশ্যই পরবর্তীকালে এই সাধন-পদ্ধতি অত্যন্ত পল্লবিত রূপ গ্রহণ করেছে এবং পরবর্তীকালে ‘যোগ’ নামের একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক সম্প্রদায়েরও পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু সিন্ধু-যুগে যোগ-সাধনা কতখানি পল্লবিত ও জটিল রূপ গ্রহণ করেছিলো এবং ‘যোগ’ নামের কোনো দার্শনিক সম্প্রদায় একান্তই গড়ে উঠেছিলো কিনা সে-কথা প্রত্নতত্ত্বমূলক গবেষণার বর্তমান পর্যায়ে– বিশেষত সিন্ধু-লিপির পাঠোদ্ধারের পূর্বে– আমাদের পক্ষে জানতে পারা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু–
‘একটি কথা অবশ্যই অবধারিতভাবে প্রমাণ হয় : উত্তরকালে এই যোগের রূপ ও রূপান্তর যেমনই হোক না কেন, একে যেভাবে শ্রুতিমূলক বা বেদমূলক বলে দাবি করা হয়েছে তা ঐতিহাসিকভাবে একান্তই অবাস্তব; কেননা বাস্তব ঘটনা হলো শ্রুতি– এমনকি ঋগ্বেদ-সংহিতা– রচিত হবার সহস্রাধিক বছর পূর্বেই এবং আর্য-পূর্বদের মধ্যেই এই সাধন পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে বৈদিক ঐহিহ্যের বাহকেরা যে-অর্থেই এবং যে- কোনো কারণেই এই সাধন-পদ্ধতিকে স্বীকার এবং গ্রহণ করুন না কেন, একে প্রকৃতপক্ষে শ্রুতিমূলক বা বেদমূলক বলে কল্পনা করবার কোনো রকম সঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৮১)

           যোগ যে আদিতে কোনো-এক অ-বৈদিক বা বেদ-বহির্ভূত সাধন-পদ্ধতি ছিলো– বিশেষ করে মহেঞ্জোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কারের পর– বিদ্বান ও পণ্ডিতদের মধ্যে খুব একটা দ্বিমত নেই। ওই অ-বৈদিক সাধন-পদ্ধতির ইতিহাস যে কতো প্রাচীন এ-বিষয়েও সংশয় নেই। কিন্তু সিন্ধু-সভ্যতা যে বৈদিক আর্যদের আক্রমণেই বিধ্বস্ত হয়েছিলো– একথা অনুমিত হবার পর আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে বৈদিক সাহিত্যের কয়েকটি সাক্ষ্য বিষয়ে নতুন করে বিচার করবার প্রয়োজন হয়েছে। যেমন, কৌষীতকি উপনিষদে প্রতর্দনের প্রতি ইন্দ্র যখন আস্ফালন করে বলছেন–

‘ত্রিশীর্ষাণাং ত্বাষ্ট্রম্ অহনম্ । অরুণ্মুখান্ যতীন্ সালাবৃকেভ্যঃ প্রাযচ্ছং। বহ্বীঃ সন্ধা অতিক্রম্য দিবি প্রহ্লাদীয়ান্ অতৃণম্ অহম্ অন্তরীক্ষে পৌলোমান্, পৃথিব্যাং কালখাঞ্জান্ । তস্য মে তত্র ন লোম চ মা মীয়তে।’- (কৌষীতকি-৩/১)
অর্থাৎ :
আমি ত্রিশীর্য ত্বষ্টৃপুত্রকে হত্যা করেছি; আমি অরুণ্মুখ যতিদেরকে সালাবৃকের অর্থাৎ নেকড়ের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছি। অনেক সন্ধিকে লঙ্ঘন করে আমিই স্বর্গে প্রহ্লাদের অসুরদলের অসুরদের, অন্তরিক্ষে পুলোমার আর পৃথিবীতে কালখঞ্জের অনুচরদের নিধন করেছি। এত বিশাল বিশাল কাজ করেও আমার একটা কেশও কারো নষ্ট করার সাধ্য হয়নি।

            এখানে ত্রিশীর্ষ বিশেষণটি চিত্তাকর্ষক, কেননা সিন্ধু-সভ্যতার যে-মূর্তিটিকে মার্শাল যোগী-শিব বলে সনাক্ত করতে চেয়েছেন সেটিও সম্ভবত ত্রিশীর্ষ এবং সিন্ধু-সভ্যতার অন্যান্য সীলেও তিনটি শিংযুক্ত মূর্তি পাওয়া গেছে বলে দেবীপ্রসাদের ভাষ্য। যদিও এই ত্রিশীর্ষ বিষয়ক উপনিষদীয় উদ্ধৃতির প্রকৃত পৌরাণিক ব্যাখ্যা বহুলাংশেই বিতর্কসাপেক্ষ। কেননা, পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ত্বষ্ট্রা মানে বিশ্বকর্মা এবং ত্রিশীর্ষ ত্বষ্ট্রাপুত্র হলো বিশ্বরূপ। কিন্তু ইন্দ্রের উপরিউক্ত উক্তির মধ্যে আরও চিত্তাকর্ষক বক্তব্য হলো, আমি অরুণ্মুখ যতিদেরকে সালাবৃকের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছি। সালাবৃক মানে নেকড়ে বা হায়না, অরুণ্মুখ মানে বেদনার্ত-মুখ হওয়া সম্ভব।

            কিন্তু ‘যতি’ মানে কী? এর সাধারণ অর্থ করা হয় তপস্বী। তবে মুণ্ডক-উপনিষদ এবং গীতার উক্তি থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় এই যতিরা প্রকৃত যোগ-সাধকই ছিলো। কেননা এই গ্রন্থগুলিতে যোগ-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যতিদের সুস্পষ্টভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। যোগসূত্র অনুসারে যোগ-এর আটটি অঙ্গ–

‘যমনিয়মাসন-প্রাণায়ামপ্রত্যাহারধারণাধ্যানসমাধয়োহষ্টাবঙ্গানি’- (যোগসূত্র : ২/২৯)
অর্থাৎ : যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি- এই আটটি হলো যোগের অঙ্গ।

মুণ্ডক উপনিষদে যতিদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে–

‘বেদান্তবিজ্ঞানসুনিশ্চিতার্থাঃ সন্ন্যাসযোগাৎ যতয়ঃ শুদ্ধসত্ত্বাঃ।
তে ব্রহ্মলোকেষু পরান্তকালে পরামৃতাঃ পরিমুচ্যন্তি সর্বে।।’- (মুণ্ডক-৩/২/৬)
‘সত্যেন লভ্যস্তপসা হ্যেষ আত্মা সম্যগ্জ্ঞানেন ব্রহ্মচর্যেণ নিত্যম্ ।
অন্তঃশরীরে জ্যোতির্ময়ো হি শুভ্রো যং পশ্যন্তি যতয়ঃ ক্ষীণদোষাঃ।। (মুণ্ডক-৩/১/৫)
অর্থাৎ :
যাঁরা বেদান্তশাস্ত্রের মর্মার্থ জেনেছেন, সন্ন্যাস ও যোগ অভ্যাসের মাধ্যমে যেসব যতির চিত্তশুদ্ধি হয়েছে, তাঁরা এই জীবনেই আত্মাকে উপলব্ধি করেন এবং মৃত্যুকালে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন (মুন্ডক-৩/২/৬)। কায়মনোবাক্যে সত্যের অনুসরণ ও ব্রহ্মচর্য অভ্যাসের দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ করতে হয়। দেহের মধ্যে সেই জ্যোতির্ময় পরমাত্মার উপলব্ধির মাধ্যমে যতিরা শুদ্ধ ও অনাসক্ত হয় (মুন্ডক-৩/১/৫)।

           আর গীতায় বলা হয়েছে যতিরা ‘প্রাণায়াম-পরায়ণাঃ’, তারা কাম-ক্রোধ-বিযুক্ত ও সংযতচিত্ত, তারা যোগ-ধারণাসম্পন্ন। যেমন–

‘দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞা যোগযজ্ঞাস্তথাহপরে।
স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ।।’ (ভগবদ্গীতা-৪/২৮)
‘অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেহপানং তথাহপরে।
প্রাণাপানগতী রদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ।।’ (ভগবদ্গীতা-৪/২৯)
‘কামক্রোধবিযুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্ ।
অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্ ।।’ (ভগবদ্গীতা-৫/২৬)
অর্থাৎ :
যতিরা ত্যাগ, তপস্যা, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার ও স্বাধ্যায় ইত্যাদি যোগরূপ সাধনা করেন (গীতা-৪/২৮)। তাঁরা প্রাণ ও অপান বায়ুর দ্বারা গ্রহণ, আহুতি ও রুদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে পূরক, রেচক ও কুম্ভকরূপ প্রাণায়াম-পরায়ণ যোগ-সাধক (গীতা-৪/২৯)। কাম-ক্রোধ-বিযুক্ত ও সংযতচিত্ত যতিগণ জীবিতাবস্থায় ও মৃত্যুর পরে উভয়ত ব্রহ্ম-নির্বাণ লাভ করেন (গীতা-৫/২৬)।

 

            অতএব এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, যতিরা যোগ-সাধক। যোগ-সাধনার প্রধান লক্ষণগুলি যতিদের মধ্যে দেখা যায়। তাহলে তাদের প্রতি ইন্দ্রের ওই আক্রোশ কেন? এখানে উল্লেখ্য, ইন্দ্র যে যতিদেরকে হায়নার মুখে সমর্পণ করেছিলেন তার স্মৃতি শুধুমাত্র কৌষীতকি উপনিষদের মধ্যেই আবদ্ধ নয়; তৈত্তিরীয় সংহিতা (তৈঃ সঃ-৩/৩/৭/৩, ২/৫/১/১), ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (ঐঃ ব্রাঃ-৭/২৮), শতপথ ব্রাহ্মণ (শঃ ব্রাঃ-১/২/৩/২, ১২/৭/১/১), পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণ (পঃ ব্রাঃ-১৪/১১/২৮) এবং জৈমিনীয় ব্রাহ্মণেও (জৈঃ ব্রাঃ-১/১৮৫-৬) বারবার একই কথা পাওয়া যায়– ইন্দ্র যতিদের সালাবৃকের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া যতিরা যে অত্যন্ত প্রাচীন কালের যোগ-সাধক ছিলো– ঋগ্বেদে তাদের উল্লেখ থেকে এ-কথা সহজেই অনুমতি হয়। যেমন–

‘তৎ তভ্যামি সুবীর্য্যম তদ্ ব্রহ্ম পূর্বচিত্তয়ে।
য ন যতিভ্যঃ ভর্গবে ধনে হিত য ন প্রষ্কণ্বমাভিতঃ।।’- (ঋগ্বেদ-৮/৩/৯)
অর্থাৎ : হে বীর্যবান ইন্দ্র, তোমার নিকট পূর্ব-যুগের প্রজ্ঞাবিশিষ্ট ব্যক্তিদের অপেক্ষা অধিক অন্ন যাঞ্চা করছি। যতিদের নিকট থেকে ভৃগুদের ধন প্রদান করে তার দ্বারা কণ্বের পুত্রকে রক্ষা কর।

            টীকাকার সায়ণের ব্যাখ্যা অনুসারে ‘যতি’র অর্থ হলো, কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন যজ্ঞবিহীন জনগণ। তৈত্তিরীয় সংহিতা থেকে কৌষীতকি উপনিষদ পর্যন্ত যতিদের প্রতি ইন্দ্রের যে বিরূপতা প্রকাশ পেয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হতে পারে না। কিন্তু যতিদের প্রতি ইন্দ্রের এই নিষ্ঠুরতা কেন? ১৯২৯ সালেই শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ এই প্রশ্নের একটি উত্তর দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালের প্রত্নতত্ত্বমূলক আবিষ্কারের আলোয় সে-উত্তরের গুরুত্ব বণিত হয়েছে বলেই অনুমিত হয়। শ্রীযুক্ত চন্দের বক্তব্যটি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত তর্জমাসহ (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৮২-৩) উদ্ধৃত করা যেতে পারে–
‘The only possible answer to this question is, that yatis were not originally priests of the Vadic cult like the Bhrigus and the Kanvas, but of non-Vedic rites practiced by the indigenous pre-Aryan population of the Indus Valley, in the legend of the slaughter of the Yatis by Indra we probably hear an echo of the conflict between the native priesthood and the intruding Rishis in the proto-historic period. If this interpretation of the legend is correct, it may be asked, what was the religious or magico-religious practice of the Yatis? In classical Sanskrit Yati denotes an ascetic. The term is derived from the root `yat’, to strive, to exert oneself, and is also connected with the root `Yam’, to restrain, to subdue, to control. As Applied to a priest, etymologically Yati can only mean a person engaged in religious exercise such as `tapas’, austerities, and `yoga’…. The marble statuettes of Mohenjo-daro with head, neck and body quite erect and half shut eyes fixed on the tip of the nose has the exact posture of one engaged in practicing Yoga. I therefore propose to recognize in these statuettes the image of the Yatis of the proto-historic and pre-historic Indus Valley intended either for worship or as votive offering. Like the Rishis of the pre-Regvedic and early Regvedic period, these Yatis, who practiced Yoga were also primarily magicians.’
অর্থাৎ :
সংক্ষেপে, বৈদিক সাহিত্যে যতিদের প্রতি যে ইন্দ্র-আক্রোশের পরিচয় পাওয়া যায় তার একমাত্র ব্যাখ্যা হলো, যতিরা বৈদিক ধর্মানুষ্ঠানের অনুগামী ছিল না; তারা সিন্ধু-উপত্যকার স্থানীয় আর্য-পূর্ব জনসাধারণের অ-বৈদিক ধর্মানুষ্ঠান পালন করত। ইন্দ্রের যতি-হত্যা কাহিনীতে সম্ভবত ইতিহাস-আভাসিত যুগে স্থানীয় পুরোহিতশ্রেণীর সঙ্গে আগন্তুক ঋষিদের সংঘর্ষের পরিচয় পাওয়া যায়। কাহিনীটির এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হলে প্রশ্ন উঠবে, যতিদের ধর্মানুষ্ঠান বা যাদু অনুষ্ঠানমূলক আচরণের প্রকৃতি কী ছিল? ক্লাসিক্যাল সংস্কৃতে যতি শব্দের অর্থ হল তপস্বী।… পুরোহিত-বোধক হিসেবে যতি শব্দের একমাত্র তাৎপর্য হলো তপস্যা এবং যোগমূলক ধর্মানুষ্ঠানে নিরত মানুষ।… মহেঞ্জোদারোর মর্মর-মূর্তিতে যোগাসনের নির্ভুল পরিচয় পাওয়া যায়, মাথা, গলা ও দেহের কঠিন ঋজুভাব, অর্ধনিমীলিত চোখ নাসিকাগ্রের উপর নিবদ্ধ। অতএব এই মূর্তিকে সিন্ধু-উপত্যকার প্রাগৈতিহাসিক এবং ইতিহাস-আভাসিত যুগের যতির মূর্তি বলে সনাক্ত করতে পারি।… ঋগ্বেদ-পূর্ব এবং ঋগ্বেদ সূচনা যুগে বৈদিক ঋষিদের মতোই ওই যোগী যতিরাও প্রধানতই ম্যাজিসিয়ান বা জাদুকর ছিল।…

             ‘যোগ এবং যোগীদের বিরুদ্ধে বৈদিক ঋষিদের ওই প্রাচীন বিরূপতা সত্ত্বেও কালক্রমে কীভাবে এবং কেন বৈদিক ঐতিহ্যেই যোগ-সাধনার গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছিল– এ প্রশ্ন অবশ্যই জটিল। কিন্তু আপাতত মন্তব্য হলো, সিন্ধু-সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে যোগ-সাধনার সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় এবং এই সভ্যতা আর্য-আক্রমণেই বিধ্বস্ত হয়েছে; অতএব বৈদিক ঋষিদের রচনায় সিন্ধু-সভ্যতার যোগীদের বিরুদ্ধে আক্রোশের পরিচয় থাকাই স্বাভাবিক। অপরপক্ষে, যতি বলতে প্রাচীনকালের যোগসাধক বোঝাতো এবং বৈদিক সাহিত্যে বারবার এই উপাখ্যানই পাওয়া যায় যে ইন্দ্র অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাঁদের হত্যা করেছিলেন। অতএব এ-ক্ষেত্রেও প্রত্নতত্ত্বমূলক এবং সাহিত্যমূলক সাক্ষ্যের মধ্যে সঙ্গতি খুঁজতে হলে শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দের ওই পুরানো অনুমানটিকে স্বীকার করতে হয়। এবং এই দিক থেকে প্রাচীন সিন্ধু-ধর্মের সঙ্গে বৈদিক-ধর্মের সংঘাত চিত্রটিও পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে। কেননা, সিন্ধু-ধর্মের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বলতে মাতৃ-উপাসনা, লিঙ্গ-উপাসনা এবং যোগ-সাধনা। অপর পক্ষে বৈদিক সাহিত্যে দেখা যায়, ইন্দ্র প্রাচীন পূজনীয়া মাতৃদেবীকে আক্রমণ ও বিধ্বস্ত করেছেন, শিশ্ন-দেবদের শতদ্বার-বিশিষ্ট নগর লুণ্ঠন করেছেন এবং যতি বা যোগীদের নেকড়ের মুখে সমর্পণ করেছেন। বৈদিক মানুষেরা সিন্ধু-সভ্যতা ধ্বংস করে থাকে তা হলে তাদের সাহিত্যে সিন্ধু-ধর্মের বিরুদ্ধে এ-জাতীয় আক্রোশের পরিচয় থাকাই স্বাভাবিক।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৮৩)

            অতএব, কৃষিজীবীদের যে-উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস থেকে এই সুপ্রাচীন আর্য-পূর্ব সিন্ধু-ধর্মবিশ্বাসে বসুমাতা-উপাসনা এবং শিশ্ন-উপাসনার উদ্ভব হয়েছিলো তারই মধ্যে যোগ-সাধনার আদি এবং আদিম রূপটির সূত্র অনুসন্ধান করা আবশ্যক। এবং সিন্ধু-ধর্মের এই তিনটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর-নিরপেক্ষ বা স্বতন্ত্র নয়, যদিও পরবর্তীকালে ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই সিন্ধু-ধর্মের বিভিন্ন অঙ্গ বহুলাংশেই পরস্পর-বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র রূপ গ্রহণ করে উত্তরকালে শক্তি-সাধনা, শৈব-সাধনা এবং যোগ-সাধনায় পরিণত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষীয় তথা এতদঞ্চলের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এগুলির প্রভাব যে কতো ব্যাপক ও গভীর তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। আর্য-আক্রমণের ফলে ওই প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা বিধ্বস্ত হলেও ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার ক্ষেত্র থেকে তার প্রভাব বিলুপ্ত হয়নি। বিলুপ্ত যে হয়নি তা মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজের বক্তব্য থেকেও তার আভাস মেলে–
‘An enquir into the ancient cultures would show that the cult of `Sakti’ is very old in India as in other parts of the world. And it is quite possible that it existed along with Saiva and Pasupata cults in the days of the pre-historic Indus-Valley civilization.’…
`The cult of `Sakti’ produced a profound influence on general Indian thought. A topographical surveyof India would show that the country is scattered over with numerous centers of `Sakti-sadhana’. It was widespread in the past and has continued unbroken till today.’
অর্থাৎ :
প্রাচীন সংস্কৃতি সংক্রান্ত অনুসন্ধানের ফলে দেখা যায়, শাক্ত পূজা-পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সুপ্রাচীন। খুব সম্ভব, প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু-সভ্যতাতে শৈব ও পাশুপত পূজাপদ্ধতির পাশাপাশি এই শাক্ত পূজাপদ্ধতিও বর্তমান ছিলো।…
শাক্ত-পূজাপদ্ধতি সামগ্রিকভাবে ভারতীয় চিন্তাধারার উপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। স্থানবিবরণের দিক থেকে ভারতবর্ষের আলোচনা করলে দেখা যায়, দেশের উপর অসংখ্য শক্তিসাধনার কেন্দ্র ছড়ানো রয়েছে। অতীতে এই শাক্ত-ধর্ম অত্যন্ত প্রবল ছিলো এবং আজকের দিন পর্যন্ত তা অবিচ্ছেদ্যভাবেই চলে আসছে। (সূত্র: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৮২)

              আর যেহেতু ভারতীয় দর্শনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো যে, তা সব সময় সাধন-পদ্ধতি ও ধর্মবিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারেনি, তাই এতদঞ্চলের দর্শন-চর্চা ও ধর্ম-সাধনাও অনেকাংশেই একাকার হয়ে থেকেছে। ফলে পরবর্তীকালে ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে সিন্ধু-ধর্মের প্রভাব যদি সত্যিই ব্যাপক ও গভীর হয় তাহলে উত্তরকালের দর্শন-চর্চাও যে সম্পূর্ণভাবে সিন্ধু-যুগের প্রভাব-নিরপেক্ষ হয়েছিলো, অন্তত সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার না-হওয়া পর্যন্ত এমন কথা কল্পনা করার সঙ্গত কোনো কারণ নেই বলেই মনে হয়। আর ধর্মবিশ্বাস ও সাধন-পদ্ধতি তো সমাজ-সংস্কৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবেই জড়িত। এ-কারণেই হয়তো ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দিতে গিয়ে প্রাগৈতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ড. অতুল সুর উদ্ধৃতি মন্তব্য করেন– “হিন্দু সভ্যতার গঠনের মূলে বারো-আনা ভাগ আছে সিন্ধু উপত্যকার প্রাক্-আর্য সভ্যতা; আর মাত্র চার-আনা ভাগ মন্ডিত আর্য সভ্যতার আবরণে।”

             এখানে উল্লেখ্য, সম্ভবত আমাদের অনুমান করবার সপক্ষে যথেষ্ট কারণ আছে যে, সিন্ধু সভ্যতা আর্য সভ্যতার ন্যায় আগন্তুক সভ্যতা ছিলো না। এ সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ ভারতবর্ষেই ঘটেছিলো। আমরা জানতে পারি যে, মূলগতভাবে সিন্ধু সভ্যতা ছিলো তাম্রাশ্ম যুগের সভ্যতা (chalcolithic civilization)। তার মানে, প্রস্তর যুগের শেষে এই সভ্যতার ধারকদের মধ্যে তামার ব্যবহার প্রচলিত হয়েছিলো। তাম্রাশ্ম যুগের সভ্যতার অভ্যুদয়ে তামা-ই প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। মিশর, সুমের, সিন্ধু উপত্যকার সর্বত্রই সভ্যতার প্রথম প্রভাতে তামার ব্যবহার দেখা যায়। আর গবেষকদের বয়ান থেকে এটাও জানা যায় যে, বাঙলাই ছিলো সে-যুগের তামার প্রধান আড়ত। তামার বৃহত্তম খনি ছিলো বাঙলাদেশেই। বাঙলার বণিকরাই ‘সাত সমুদ্দুর তেরো নদী’ পার হয়ে ওই তামা নিয়ে যেতো সভ্যতার বিভিন্ন কেন্দ্রসমূহে বিপণনের জন্য। এজন্যই বাঙলার সবচেয়ে বড় বন্দরের নাম ছিলো ‘তাম্রলিপ্তি’। তাম্রাশ্ম যুগের অনেক দ্রব্য আজও বাঙালী হিন্দু পরিবারের ঠাকুরঘরে দেখতে পাওয়া যায়, যেমন– পাথর ও তামা দিয়ে তৈরি থালা-বাটি-গেলাস ও তামার কোষাকুষি ইত্যাদি।
অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার সঙ্গে প্রস্তর যুগ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরবিন্যাস হরপ্পায় পাওয়া যায়। প্রস্তর যুগের যে স্তর থেকে তাম্রাশ্ম যুগের উদ্ভব হয়েছিলো, নৃতত্ত্বের ভাষায় তাকে আমরা নবোপলীয় যুগের (neolithic) সভ্যতা বলি। এই নবোপলীয় যুগের মানুষই প্রথম ভূমিকর্ষণ ও স্থায়ী বসতি স্থাপন শুরু করে। তা ছাড়া, নবোপলীয় যুগের মানুষরা পশুপালন করতো, মৃৎপাত্র তৈরি করতো, বস্ত্রবয়ন করতো ও নিজেদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য যে-সকল আয়ুধ বা যন্ত্রাদি ব্যবহার করতো, সেগুলিকে বেশ মসৃণ বা পালিশ করতো। বস্তুত নবোপলীয় যুগেই প্রথম সভ্যতার সূচনা। গ্রাম-বাঙলার দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ধামা, চুবড়ি, কুলা, ঝাপি, বাটনা বাটার শিল-নোড়া ও শস্য পেষাইয়ের জন্য জাঁতা ইত্যাদির ব্যবহার আধুনিক নগর-সভ্যতার প্রভাবে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসলেও আজও অনেক স্থানেই এগুলো নবোপলীয় যুগের কৃৎকৌশলের সাক্ষ্য বহন করছে।

              লিঙ্গপূজার সূচনা যে এই নবোপলীয় যুগেই হয়েছিলো এবং কিভাবে তার সম্ভাব্য সূত্রপাত ঘটেছে, এ-বিষয়ে একটি নৃতাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছেন ড. অতুল সুর এভাবে–
‘পরিষ্কার বুঝতে পারা যাচ্ছে যে ভারতের বিস্তৃত ভূখন্ডে প্রত্নোপলীয় যুগ থেকে নবোপলীয় ও পরে তাম্রাশ্ম যুগ পর্যন্ত সভ্যতার একটা ধারাবাহিকতা ছিল।
…অন্তিম প্রত্নোপলীয় যুগের মানুষ হয় নদীর ধারে, আর তা নয়তো পাহাড়ের ওপরে বা পাহাড়ের ছাউনির মধ্যে মাটির ঘর তৈরি করে বাস করত। এসব জায়গায় কোন কোন স্থানে আয়ুধ-নির্মাণের কারখানাও পাওয়া গিয়েছে। তা থেকে বুঝতে পারা যায় যে, সে-যুগের মানুষ সম্পূর্ণভাবে যাযাবরের জীবন যাপন করত না। তার মানে, এ যুগের মানুষ সমাজবদ্ধ হবার চেষ্টা করছিল। সেটা বুঝতে পারা যায় কয়েক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে তাদের চিত্রাঙ্কন থেকে। এ চিত্রগুলি তারা খুব সম্ভবত ঐন্দ্রজালিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করত। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধর্মেরও উন্মেষ ঘটছিল।
এই স্থায়ী বসতিস্থাপনের প্রবণতা নবোপলীয় যুগেই বিশেষভাবে প্রকটিত হয়। তারা পশুপালন ও কৃষির উপযোগী স্থানেই বসতিস্থাপন করত। কৃষির উদ্ভব কিভাবে ঘটেছিল, সেটা এখানে বলতে চাই। ভূমিকর্ষণের সূচনা করেছিল মেয়েরা। পশুশিকারে বেরিয়ে পুরুষের যখন ফিরতে দেরি হত, তখন মেয়েরা ক্ষুধার তাড়নায় গাছের ফল এবং ফলাভাবে বন্য অবস্থায় উৎপন্ন খাদ্যশস্য খেয়ে প্রাণধারণ করত। তারপর তাদের ভাবনা-চিন্তায় স্থান পায় এক কল্পনা। সন্তান-উৎপাদনের প্রক্রিয়া তাদের জানাই ছিল। যেহেতু ভূমি বন্য অবস্থায় শস্য উৎপাদন করে, সেইহেতু তারা ভূমিকে মাতৃরূপে কল্পনা করে নেয়। যুক্তির আশ্রয় নিয়ে তারা ভাবতে থাকে, পুরুষ যদি নারীরূপ ভূমি (পরবর্তীকালে আমাদের সমস্ত ধর্মশাস্ত্রেই মেয়েদের ‘ক্ষেত্র’ বা ‘ভূমি’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে) কর্ষণ করে সন্তান উৎপাদন করতে পারে তবে মাতৃরূপ পৃথিবীকে কর্ষণ করে শস্য উৎপাদন করা যাবে না কেন? তখন তারা পুরুষের লিঙ্গস্বরূপ এক যষ্টি বানিয়ে নিয়ে ভূমি কর্ষণ করতে থাকে। (Przyluski তাঁর ‘Non-Aryan Loan in Indo-Aryan’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে ‘লিঙ্গ’, ‘লাঙ্গুল’ ও ‘লাঙ্গল’– এই তিনটি শব্দ একই ধাতুরূপ থেকে উৎপন্ন)। মেয়েরা এইভাবে ভূমি কর্ষণ করে শস্য উৎপাদন করল। পুরুষরা তা দেখে অবাক হল। তারা লক্ষ্য করল লিঙ্গরূপী যষ্টি হচ্ছে passive, আর ভূমিরূপী পৃথিবী ও তাদের মেয়েরা হচ্ছে active। Active মানেই হচ্ছে শক্তির আধার। ফসল তোলার পর যে প্রথম ‘নবান্ন’ উৎসব হল, সেই উৎসবেই জন্ম নিল লিঙ্গপূজা ও ভূমিরূপী পৃথিবীর পূজা।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

             ‘প্রৎসিলুসকি (Przyluski) দেখিয়েছেন যে ‘লিঙ্গ’ ও ‘লাঙ্গল’ শব্দদ্বয় অস্ট্রিক ভাষার অন্তর্ভুক্ত শব্দ, এবং ব্যুৎপত্তির দিক থেকে উভয় শব্দের অর্থ একই। তিনি বলেছেন যে পুরুষাঙ্গের সমার্থবোধক শব্দ হিসাবে ‘লিঙ্গ’ শব্দটি অস্ট্রো-এসিয়াটিক জগতের সর্বত্রই বিদ্যমান, কিন্তু প্রতীচ্যের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহে এর অভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি আরও বলেছেন যে সংস্কৃত ভাষায় যখন শব্দ দুটি প্রবিষ্ট হল, তখন একই ধাতুরূপ (‘লনগ্’) থেকে লাঙ্গুল ও লিঙ্গ শব্দ উদ্ভূত হয়েছিল। অনেক সূত্রগ্রন্থ ও মহাভারত-এ ‘লাঙ্গুল’ শব্দের মানে লিঙ্গ বা কোন প্রাণীর লেজ। যদি ‘লাঙ্গল = লাঙ্গুল’, এই সমীকরণ স্বীকৃত হয়, তা হলে এই তিনটি শব্দের (লাঙ্গল, লাঙ্গুল ও লিঙ্গ) অর্থ-বিবর্তন (semantic evolution) বোঝা কঠিন হবে না। কেননা, সৃষ্টি প্রকল্পে লিঙ্গের ব্যবহার ও শস্য-উৎপাদনে লাঙ্গল দ্বারা ভূমিকর্ষণের মধ্যে একটা স্বাভাবিক সাদৃশ্য আছে। অস্ট্রিকভাষাভাষী অনেক জাতির লোক ভূমিকর্ষণের জন্য লাঙ্গলের পরিবর্তে লিঙ্গ-সদৃশ খনন-যষ্টি ব্যবহার করে। এ সম্পর্কে অধ্যাপক হিউবার্ট ও. ময়েস বলেছেন যে মেলেনেসিয়া ও পলিনেসিয়ার অনেক জাতি কর্তৃক ব্যবহৃত খননযষ্টি লিঙ্গাকারেই নির্মিত হয়। মনে হয়, ভারতের আদিম অধিবাসীরাও নবোপলীয় যুগে বা তার কিছু পূর্বে এইরূপ যষ্টিই ব্যবহার করত, এবং পরে যখন তারা লাঙ্গল উদ্ভাবন করল, তখন তারা একই শব্দের ধাতুরূপ থেকে তার নামকরণ করল।’- (ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

           ধারণাগতভাবে বিষয়টা যদি যৌক্তিক বিচারে স্বীকারযোগ্য হয় তাহলে মাতৃপূজা ও লিঙ্গপূজার সমন্বিত ভারতীয় শক্তিবাদের তাত্ত্বিক পরিকল্পনার উৎস-বীজটা যে সেই সুপ্রাচীন সিন্ধুযুগের অনার্য সমাজ-উদ্ভূত ধর্মবিশ্বাসেরই বিবর্তিত পরম্পরার স্মারক-চিহ্ন, তা বোধকরি অস্বীকার করা যাবে না।
এক্ষেত্রে আরেকটি কৌতুহলজনক উদাহরণ হলো– ‘আমরা লিঙ্গের যেসব প্রতিরূপ পেয়েছি, তা দাক্ষিণাত্য থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছে। এটা খুবই বিচিত্র ব্যাপার যে একপ্রকার লিঙ্গ-উপাসনা, আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে নিবদ্ধ কিংবদন্তী অনুযায়ী দাক্ষিণাত্যের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। সূত্রসংহিতায় বলা হয়েছে যে দৈত্যরাজ বাণ মহাদেবের বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি প্রতিদিন স্বহস্তে একটি শিবলিঙ্গ তৈরি করে, তাঁর অর্চনা করতেন। শতবর্ষ এইরূপ পূজা করবার পর মহাদেব তাঁর প্রতি বিশেষ প্রীত হয়ে তাঁকে এক বর দিয়ে বলেন– ‘আমি তোমাকে চৌদ্দ কোটি বিশেষ গুণ-সম্পন্ন লিঙ্গ দিতেছি। এইসকল লিঙ্গ নর্মদা ও অন্যান্য পুণ্যসলিলা নদীতে পাওয়া যাবে। ভক্তগণকে এইসকল লিঙ্গ মোক্ষদান করবে।’ হিমাদ্রি যাজ্ঞবল্ক্যকে উদ্ধৃত করে তাঁর ‘চতুর্বর্গচিন্তামণি’ গ্রন্থে বলেছেন : ‘এইসকল লিঙ্গ অনন্তকাল ধরে অবিরাম নর্মদা নদীর স্রোতে আবর্তিত হবে। প্রাচীনকালে নৃপতি বান ধ্যানস্থ হয়ে মহাদেবের আরাধনা করলে, মহাদেব প্রীত হয়ে লিঙ্গরূপ ধারণ করে পর্বতের উপরে অবস্থান করেন। সেই কারণে এই লিঙ্গকে বাণলিঙ্গ বলা হয়। এক কোটি লিঙ্গের অর্চনা করে উপাসক যে ফল পাবেন, একটি বাণলিঙ্গ অর্চনা করলেও সেই ফলই পাবেন। নর্মদা নদীর তীরে প্রাপ্ত বাণলিঙ্গের অর্চনা করলে মোক্ষলাভ উপাসকের করায়ত্ত হয়।’- (ড. অতুল সুর / ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়)

           বাণলিঙ্গের উপাসনার সঙ্গে বাণের নাম সংযুক্ত থাকাটা খুবই অর্থবহ বলে গবেষকদের ধারণা। কেননা বাণ বঙ্গদেশের রাজা ছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন যে বর্তমান বাণগড়-ই বাণরাজার রাজধানী ছিলো। বাণের পিতা ছিলেন অসুররাজ বলি। মহাভারত অনুযায়ী অসুররাজ বলির মহিষী সুদেষ্ণার গর্ভেই অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুহ্ম, পুণ্ড্র প্রভৃতি জাতিগুলির আদিপুরুষের জন্ম হয়েছিলো। বলি শিবেরই উপাসক ছিলেন। সুতরাং শিবপূজার সঙ্গে বঙ্গদেশের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। বস্তুত বর্তমানেও লিঙ্গরূপী শিবের মন্দির বাঙলাদেশে যতো দেখা যায়, ভারতের আর কোথাও তত দেখা যায় না। শিব যে প্রাগার্য দেবতা তা পণ্ডিতমহলে সর্বজন-স্বীকৃত। আবার এদেশের ধর্মবিশ্বাসে শিব মাতৃদেবীর ভর্তা। মাতৃদেবীর পূজার উদ্ভব বাঙলাদেশেই ঘটেছিলো। এবং এখনও তা যেরূপ জনপ্রিয়, শিবের গাজন উৎসবও (বিশেষ করে নিম্নকোটির লোকদের মধ্যে) সেরূপ জনপ্রিয়। এবং তা হয়তো প্রাগার্যকাল থেকেই চলে আসছে। ঋগ্বেদে লিঙ্গ-উপাসকদের প্রতি ঘৃণা-প্রকাশ ও কটুক্তি থেকেই বোঝা যায় যে লিঙ্গ-উপাসনা প্রাগার্য সভ্যতার অবদান। আর তাই–
‘বেদোত্তর ভারতের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে লিঙ্গ উপাসনা এবং তার সঙ্গে শিবের গভীর ও ব্যাপক সংযোগ চোখে পড়ে। এ প্রভাব আকস্মিক হতে পারে না বলেই সুদূর কোন এক প্রাগৈতিহাসিক অতীত অনুমেয়। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো থেকে প্রাপ্ত লিঙ্গসমূহ স্বভাবতই সেই প্রাগৈতিহাসিক অতীতের ইঙ্গিত দেয়। উত্তরকালের প্রথা অনুসারে এই উপাস্য লিঙ্গগুলিকে যদি আমরা শিবলিঙ্গ আখ্যা দিতে সম্মত হই, তাহলে এই দিক থেকেই সিন্ধুধর্মে শৈব সাধনার আদিরূপ স্বীকারযোগ্য হতে পারে। তাই এই অনুমান অসঙ্গত নয় যে শক্তিসাধনার মত শৈব-সাধনারও সূত্রপাত প্রাক্-বৈদিক যুগে এবং বেদোত্তর ভারতের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও শক্তি-সাধনার মত শৈব-সাধনাও অবিচ্ছিন্ন প্রভাবে টিকে থেকেছে।’– (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১৯৮)
শিবের ধারণার সাথে তাঁর লিঙ্গপ্রতীক যে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে সেটি হয়তো এ পর্যায়ে আমাদের ধারণায় অস্পষ্ট নয়। কিন্তু কী করে লিঙ্গ ও শিব কোন এক ব্রাহ্ম-মুহূর্তে এক হয়ে গেলেন তার অনুমান করতে গিয়ে প্রাপ্ত দৃশ্যমান উপাদানের বিচ্ছিন্ন নিদর্শন দিয়ে মানবসভ্যতার একটি সুপ্রাচীন অবিচ্ছিন্ন প্রাগৈতিহাসিক পরম্পরার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাক্ষ্য-প্রমাণের যে অনুক্ত ঘাটতিগুলো থেকে যায়, তার জন্যে প্রয়োজন হয় যৌক্তিক অনুমানভিত্তিক কিছু নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিন্যাসের। আমাদের আলোচনার প্রাসঙ্গিকতায় এটাও গুরুত্বপূর্ণ বৈকি।

(চলবে…)

[পূর্বের পোস্ট : শিবলিঙ্গের প্রকারভেদ ও মাহাত্ম্য] [*] [পরের পোস্ট : মানববিকাশের নৃতাত্ত্বিক ধারায় লিঙ্গোপাসনার পটভূমি]

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 278,705 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 108 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
Advertisements
%d bloggers like this: