h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ-০২ : শিবলিঙ্গের প্রকারভেদ ও মাহাত্ম্য

Posted on: 10/03/2018


lord-shiva-lingam-wallpapers-5

শিব ও লিঙ্গ-০২ : শিবলিঙ্গের প্রকারভেদ ও মাহাত্ম্য
রণদীপম বসু

শিবলিঙ্গের প্রকারভেদ ও মাহাত্ম্য

প্রাথমিকভাবে শিবলিঙ্গ দুই প্রকার– কৃত্রিম ও অকৃত্রিম। এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যের দ্বারা যেমন কৃত্রিম ও অকৃত্রিম শিবলিঙ্গ নির্মিত হয়েছে, তেমনি তাদের আকৃতিও বিভিন্ন প্রকার হয়েছে। এইসব আকৃতি অনুসারে বিভিন্ন প্রকার লিঙ্গের বিভিন্ন নামকরণ হয়েছে। ফলে শালগ্রাম শিলা চেনার জন্য যেরূপ বিভিন্ন প্রকার চক্রজ্ঞানের প্রয়োজন হয়, তেমনি শিবলিঙ্গ পরিজ্ঞানের জন্যও গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এই সব গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে শিবলিঙ্গের অসংখ্য নাম ও আকৃতির বিবরণ পাওয়া যায়।
শাস্ত্র অনুযায়ী শিবলিঙ্গ দুই প্রকার– কৃত্রিম ও অকৃত্রিম। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট স্বয়ম্ভুলিঙ্গ, বাণলিঙ্গ ইত্যাদিকে অকৃত্রিম লিঙ্গ বলে। প্রাণতোষিণী তন্ত্রে বলা হয়েছে–

লিঙ্গং হি দ্বিবিধমকৃত্রিমং কৃত্রিমঞ্চ।
অকৃত্রিমং স্বয়ম্ভূতং স্বয়ম্ভূবাণলিঙ্গাদি।। (প্রাণতোষিণী)
অর্থাৎ : লিঙ্গ দুই প্রকার, অকৃত্রিম ও কৃত্রিম; স্বয়ম্ভূ ও বাণ-লিঙ্গ প্রভৃতি যে সকল লিঙ্গ মনুষ্য দ্বারা নির্মিত হয় নাই, তাহার নাম অকৃত্রিম লিঙ্গ।

              আর ধাতু, পাথর ইত্যাদি দিয়ে মানুষের তৈরি শিবলিঙ্গকে কৃত্রিম লিঙ্গ বলে। এই কৃত্রিম ও অকৃত্রিম উভয় ধরনের লিঙ্গই আবার দুই প্রকার– চল ও অচল। যে লিঙ্গকে প্রয়োজনে স্থানান্তরিত করা যায় তাকে চল বা সচল লিঙ্গ এবং যে লিঙ্গকে প্রয়োজনে স্থানান্তরিত করা যায় না তকে অচল লিঙ্গ বলে। সাধারণত কৃত্রিম লিঙ্গের মধ্যে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গকে অচল লিঙ্গ বলে।
অকৃত্রিম শিবলিঙ্গ পাঁচ প্রকার– স্বয়ম্ভূলিঙ্গ, দৈবলিঙ্গ, গোললিঙ্গ, আর্যলিঙ্গ ও মানসলিঙ্গ। লিঙ্গশাস্ত্র অনুযায়ী–

তল্লিঙ্গং দ্বিবিধং জ্ঞেয়মচলঞ্চ চলং তথা।
প্রাসাদে স্থাপিতং লিঙ্গসচলং তচ্ছিলাদিজম্ ।।
পঞ্চধা তৎ স্থিতং লিঙ্গং স্বয়ম্ভূদৈব-গোলজম্ ।
আর্যঞ্চ মানসং লিঙ্গং তেষাং লক্ষণমুচ্যতে।।
অর্থাৎ : কৃত্রিম হোক আর অকৃত্রিমই হোক সমস্ত শিবলিঙ্গই চল ও অচল ভেদে দ্বিবিধ। যে লিঙ্গকে স্থানান্তরিত করা যায় না তা অচল লিঙ্গ আর যাকে স্থানান্তরিত করা যায় তা চল লিঙ্গ। অকৃত্রিম শিবলিঙ্গকে আবার পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা যায়, যথা– স্বয়ম্ভূলিঙ্গ, দৈবলিঙ্গ, গোললিঙ্গ, আর্যলিঙ্গ ও মানসলিঙ্গ।

          শাস্ত্র অনুযায়ী দশদিক্পালের থেকে উৎপত্তি হয়েছে দশ প্রকার স্বয়ম্ভূলিঙ্গের। এইসব অকৃত্রিম স্বয়ম্ভূলিঙ্গের লক্ষণ বর্ণনায় বলা হয়েছে–

নানাছিদ্রসমাযুক্তং নানাবর্ণসমন্বিতম্ ।
অদৃষ্টমূলং যল্লিঙ্গং কর্কশং ভূবি দৃশ্যতে।।
তল্লিঙ্গন্তু স্বয়ম্ভূতমপরং লক্ষণচ্যুতম্ ।
স্বয়ম্ভূলিঙ্গমিত্যুক্তং তচ্চ নানাবিধংমতম্ ।।
শঙ্খাভমস্তকং লিঙ্গং বৈষ্ণং তদুদাহৃতম্ ।
পদ্মাভমস্তকং ব্রাহ্মং ছত্রাভং শাক্রমুচ্যতে।।
শিরোযুগ্মং তথাগ্নেয়ং ত্রিপদং যাম্যমীরিতম্ ।
খড়্গাভং নৈঋতং লিঙ্গং বারুণং কলসাকৃতি।।
বায়ব্যং ধ্বজবল্লিঙ্গং কৌবেরন্তু গদান্বিতম্ ।
ঈশানস্য ত্রিশূলাভং লোকপালাদিনিঃসৃতম্ ।।
স্বয়ম্ভূলিঙ্গমাখ্যাতম্ সর্বশাস্ত্রবিশারদৈঃ।।
অর্থাৎ : যে প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গ বহুছিদ্রযুক্ত নানা বর্ণযুক্ত এবং ভূগর্বে যার তল খুঁজে পাওয়া যায় না তারাই স্বয়ম্ভূলিঙ্গ। এইসব লক্ষণ যদি স্বয়ম্ভূলিঙ্গে না থাকে, তাহলে তা লক্ষণচ্যুত বলে বুঝতে হবে। যে সব স্বয়ম্ভূলিঙ্গের মস্তক শঙ্খের মত আবৃতি বিশিষ্ট তাদের বলে বৈষ্ণবলিঙ্গ। যে লিঙ্গের মস্তক পদ্মের মত আকৃতিবিশিষ্ট তার নাম ব্রাহ্মলিঙ্গ। যার মস্তকভাগ ছত্রের মত তাকে বলে ঐন্দ্রলিঙ্গ। শিবলিঙ্গের দুটি মস্তক থাকলে সেই লিঙ্গকে বলে আগ্নেয় লিঙ্গ। তিনটি পদচিহ্ন থাকলে তাকে বলে যাম্যলিঙ্গ। খড়্গরে মত আকৃতিযুক্ত লিঙ্গকে বলে নৈর্ঋতলিঙ্গ। কলসের মত আকৃতিযুক্ত লিঙ্গকে বলে বারুণলিঙ্গ। ধ্বজচিহ্ন যুক্ত হলে (ঢেউখেলানো) সেই লিঙ্গের নাম বায়বীয় লিঙ্গ। যে লিঙ্গের মধ্যে গদাচিহ্ন অঙ্কিত দেখা যায় তার নাম কৌবের লিঙ্গ। যদি ত্রিশূল চিহ্ন অঙ্কিত থাকে তাহলে সেই লিঙ্গকে বলে ঈশানলিঙ্গ। এইভাবে দশদিকপাল থেকে দশরকম স্বয়ম্ভূলিঙ্গ প্রকাশিত হয়েছে।

            এছাড়াও বিভিন্ন দেবতার চিহ্নযুক্ত বহু ধরনের স্বয়ম্ভূলিঙ্গ আছে। তবে এখানে উল্লেখ করা বাহুল্য হবে না যে, প্রাকৃতিক ঘটনায় সৃষ্ট বস্তুপুঞ্জে ভক্তিবাদীর দৃষ্টিতে যতই অপ্রাকৃত ধারণা সঞ্জাত আধ্যাত্মিক ভাবনা থাকুক না কেন, গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গিতে এর পেছনের যে বিজ্ঞানাশ্রিত ভক্তি-নিরপেক্ষ পুরাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও থাকতে পারে এটি আমাদের ভুলে যাওয়া চলে না। তাই এক্ষেত্রে অশোক রায়ের মন্তব্যটি প্রাসঙ্গিক,– ‘সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণে যে-কোনও ধরনের শিলাতে যদি সুলক্ষণ যুক্ত ও লিঙ্গাকৃতি দেখা যায়, তবে সেই শিলাকেই স্বয়ম্ভূলিঙ্গ বলে। বিভিন্ন ধরনের শিলার বর্ণও তাই বিভিন্ন। প্রকৃতির প্রকোপে (Weathering effect-এর ফলে) শিলাগাত্র মসৃণ না হওয়ারই কথা। তারপর তা নিত্যদিনের পূজা-অর্চনা ও অঙ্গমার্জনার ফলে ধীরে ধীরে মসৃণ হয়ে যায়। অনেক সময় আবার লিঙ্গের যে অংশে ভক্তের হাত বেশি পড়ে সেই অংশ অতি মসৃণ হয়ে যায়, বাকি অংশ থাকে অমসৃণ কর্কশ; ফলে লিঙ্গে একই সাথে রুদ্র ও শিবরূপ অনুভূত হয়। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক শিলা সুনিপুণ লিঙ্গাকৃতি না হওয়াই স্বাভাবিক, ফলে তাতে নানা ধরনের চিহ্ন (আকৃতি অনুযায়ী) অনুভূত হয় এবং সেই লক্ষণ চিহ্ন অনুযায়ী স্বয়ম্ভূলিঙ্গের নামকরণ হয়ে থাকে। তাই ভক্তের চোখে ভগবান বিভিন্ন নামরূপে ধরা দেন।’- (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-৩০৩)

স্বয়ম্ভূলিঙ্গের পর দ্বিতীয় প্রকার প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গ দৈবলিঙ্গের লক্ষণ বর্ণনায় শাস্ত্রকার বলছেন–

করসংপুটসংস্পর্শং শূলটঙ্কেন্দুভূষিতম্ ।
রেখাকোটরসংযুক্তং নিম্নোন্নতসমন্বিতম্ ।।
দীর্ঘাকারঞ্চ যল্লিঙ্গং ব্রহ্মভাগাদিবর্জিতম্ ।
লিঙ্গং দৈবমিতি প্রোক্তং গোলকং প্রোচ্যতেহধুনা।।
অর্থাৎ : যে প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গে করসংপুটের চিহ্ন (হাতের ছাপ-এর মতো দাগ) দেখা যায়, যাতে শূল টঙ্গনামক খড়্গ, চন্দ্রকলা চিহ্ন ও রেখাচিহ্ন থাকে এবং যা ছিদ্রবিশিষ্ট ও উন্নতান্নত (অমসৃণ) দীর্ঘাকৃতি এবং যদি লিঙ্গে গৌরীপট্ট না থাকে অর্থাৎ লিঙ্গে ব্রহ্মভাগ, বিষ্ণুভাগ ও রুদ্রভাগের পৃথক লক্ষণ দেখা না যায়, তাকে দৈবলিঙ্গ বলে।

 

              এখানে উল্লেখ্য, লিঙ্গের গৌরীপট্টের ওপরের দিককে বলে রুদ্রভাগ, এখানে রুদ্রের অবস্থান। গৌরীপট্ট অংশের নাম বিষ্ণুভাগ, এখানে বিষ্ণুর অবস্থান এবং গৌরীপট্টের নিচের অংশ হলো ব্রহ্মভাগ। যদি গৌরীপট্ট না থাকে, তাহলে এরূপ তিন অংশের বিভাগ সম্ভবপর হয় না। সুতরাং এই তিন ভাগ বিবর্জিত লক্ষণাক্রান্ত লিঙ্গকে দেবলিঙ্গ বলে। আর যেহেতু এটিও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক লিঙ্গ, তাই পুরাতত্ত্বের দৃষ্টিতে ভাবলে, পাললিক শিলায় স্তরায়ণ চিহ্ন প্রায়শই প্রকটভাবে দেখা যায়। বিশেষত, যদি পলি অধঃক্ষেপণ মোটাদানার হয়। এই স্তরায়ণ চিহ্নই আসলে উপরে বর্ণিত লিঙ্গের রেখা চিহ্ন। এছাড়া মোটা দানার পলি অধঃক্ষেপের ফলে সৃষ্ট শিলা সর্বদাই অমসৃণ ও ছিদ্রযুক্তই হয়ে থাকে।

           এরপর শাস্ত্রকারের ভাষায় তৃতীয় প্রকার প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম গোললিঙ্গ বা গোলকলিঙ্গের লক্ষণ হিসেবে বলা হয়েছে–

কুষ্মাণ্ডস্য ফলাকারং নাগরঙ্গফলোপমম্ ।
কাকডিম্বফলাকারং গোললিঙ্গমিতীরিতম্ ।।
অর্থাৎ : যে প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গের আকৃতি চালকুমড়ার মতো, অথবা নাগরঙ্গ (কমলালেবু) ফলের মতো কিংবা কাকের ডিমের মতো যার মাথার দিকটা (ফলক) তার নাম গোল লিঙ্গ।

             বেনারসের বিখ্যাত ‘তিল ভাণ্ডেশ্বর’ শিবলিঙ্গকে গোলকলিঙ্গের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর চতুর্থ প্রকার প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম আর্যলিঙ্গের লক্ষণে শাস্ত্রকার বলছেন–

নারিকেলফলাকারং ব্রহ্মসূত্রবিবর্ত্তনম্ ।
মূলে স্থূলশ্চ যল্লিঙ্গং কপিত্থফলসন্নিভম্ ।।
তালস্য বা ফলাকারং মধ্যে স্থূলঞ্চ যদ্ভবেৎ।
মধ্যে স্থূলং বরং লিঙ্গং ঋষিবাণমুদাহৃতম।।
অর্থাৎ : যে প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গে ব্রহ্মসূত্র চিহ্ন বা যজ্ঞোপবীত লক্ষণ দেখা যায়, যার মূল ভাগ স্থূলকায় অর্থাৎ লিঙ্গের আকৃতি নারকেল-এর মতো, অথবা যার মধ্যভাগ স্থূল অথচ লিঙ্গটি কদবেল বা তালের মতো দেখতে তাকে বলে আর্যলিঙ্গ। এরূপ লিঙ্গ ঋষিবাণলিঙ্গ নামেও পরিচিত। এরমধ্যে মধ্যভাগ স্থূল লিঙ্গই শ্রেষ্ঠ।

            প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে,– ‘বিজারক পরিবেশে পলি অধঃক্ষেপণ হলে অক্সিজেনের অভাবে কোনও অক্সাইড যৌগ তৈরি করতে পারে না। তার বদলে তৈরি হয় সালফাইড যৌগ। সাধারণত এই ধরনের শিলার বর্ণ হয় কালো বা ধূম্রবর্ণ। কালো রং-এর কাদা পাথরে বা তা থেকে সৃষ্ট শেল পাথরে সাদা কোয়ার্টজ-এর স্তর প্রায়শই দেখা যায়। পাললিক শিলায় এই স্তরায়ণকে ‘কোয়ার্টজ ভেন’ বলে। এই কোয়ার্টজ ভেনই শিব লিঙ্গে সাদৃশ্যতাবশত হয়েছে যজ্ঞোপবীত বা ব্রহ্মসূত্র চিহ্ন।’– (অশোক রায়)

            পঞ্চম প্রকার প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গ হলো মানসলিঙ্গ। মানসলিঙ্গকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়– রৌদ্রলিঙ্গ, শিবনাভিলিঙ্গ এবং বাণলিঙ্গ।
রৌদ্রলিঙ্গ প্রসঙ্গে ‘বীরমিত্রোদয়’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে–

নদীসমুদ্ভবং রৌদ্রমন্যোন্যস্য বিঘর্ষণাৎ।
নদীবেগাৎ সমং স্নিগ্ধং সজ্ঞাতং রৌদ্রমুচ্যতে।।
অর্থাৎ : নদীর গতিবেগে গড়িয়ে চলা নুড়িগুলো পরস্পর ঘষা খেতে খেতে পাথর যদি সমতল ও মসৃণ হয়ে লিঙ্গরূপ ধারণ করে তাহলে সেই লিঙ্গকেই রৌদ্রলিঙ্গ বলে।

এ প্রসঙ্গে শাস্ত্রকার বলেন–

সরিৎপ্রবাহসংস্থানং বাণলিঙ্গসমাকৃতি।
তদন্যদপি বোদ্ধব্যং রৌদ্রলিঙ্গং সুখাবহম্ ।।
নদীসারনর্মদায়াং বাণলিঙ্গসমাকৃতি।
তদন্যদপি বোদ্ধব্যং লিঙ্গং রৌদ্রং ভবিষ্যতি।।
রৌদ্রলিঙ্গং তথা খ্যাতং বাণলিঙ্গসমাকৃতি।
শ্বেতং রক্তং তথা পীতং কৃষ্ণং বিপ্রাদিপূজিতম্ ।।
স্বভাবাৎ কৃষ্ণবর্ণং বা সর্বজাতিষু সিদ্ধিদম্ ।
নর্মদাসম্ভবং রৌদ্রং বাণলিঙ্গবদীরিতম্ ।।
অর্থাৎ : নদীপ্রবাহ থেকে যে লিঙ্গের উদ্ভব, যা বাণলিঙ্গাকৃতি তাকেই বলে রৌদ্রলিঙ্গ। নর্মদা নদীর স্রোত থেকে উৎপন্ন অথচ বাণলিঙ্গের মতো আকৃতি বিশিষ্ট লিঙ্গকেও রৌদ্রলিঙ্গ বলে। রৌদ্রলিঙ্গ চার প্রকার হয়ে থাকে– শ্বেত, রক্ত, পীত এবং কৃষ্ণ। ব্রাহ্মণেরা শ্বেতবর্ণ, ক্ষত্রিয়েরা রক্তবর্ণ, বৈশ্যেরা পীতবর্ণ এবং শূদ্রেরা কৃষ্ণবর্ণ লিঙ্গের পূজা করলে সর্বসিদ্ধি লাভ হয়। কৃষ্ণবর্ণের লিঙ্গে সব জাতির পক্ষেই পূজিত ও শুভ। নর্মদা নদীতে জাত রৌদ্রলিঙ্গ বাণলিঙ্গের মতোই ফলদায়ক।

          বীরমিত্রোদয় অনুসারে যে প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম লিঙ্গে রমণীয় বেদিকা দেখা যায়, মহর্ষিগণ তাকে শিবনাভিলিঙ্গ বলেন। এ প্রসঙ্গে শাস্ত্রকার বলেন–

উত্তমং মধ্যমধমং ত্রিবিধং লিঙ্গমীরিতম্ ।
চতুরঙ্গুলমুৎসেধে রম্যবেদিকমুত্তমম্ ।
উত্তমং লিঙ্গমাখ্যাতং মুনিভিঃ শাস্ত্রকোবিদৈঃ।।
তদর্দ্ধং মধ্যমং প্রোক্তং তদর্ধমধমং স্মৃতম্ ।
শিবনাভিময়ং লিঙ্গং প্রতিপূজ্য মহর্ষিভিঃ।
শ্রেষ্ঠং সর্বলিঙ্গেভ্যস্তস্মাৎ পূজ্যং বিধানতঃ।।
অর্থাৎ : শিবনাভিলিঙ্গ উত্তম, মধ্যম ও অধম ভেদে তিন প্রকার। চার আঙুল উচ্চতাযুক্ত এবং সুন্দর বেদি সমন্বিত লিঙ্গ হলো উত্তম শিবনাভিলিঙ্গ। তার অর্ধেক অর্থাৎ দু-আঙুল উচ্চতাযুক্ত এরূপ লিঙ্গ মধ্যম প্রকৃতির এবং এর অর্ধেক পরিমাণ অর্থাৎ এক আঙুল উচ্চতাযুক্ত লিঙ্গ হলো অধম প্রকৃতির শিবনাভিলিঙ্গ। অপরাপর অন্যান্য লিঙ্গ অপেক্ষা শিবনাভিলিঙ্গ শ্রেষ্ঠ বলে মহর্ষিরা মনে করেন। সকলেরই যথাবিধানে এই লিঙ্গে পূজা করা কর্তব্য।

 

              অন্যান্য লিঙ্গের তুলনায় শাস্ত্রে বাণলিঙ্গের প্রশংসাই অধিক পাওয়া যায়। মেরুতন্ত্র-এ নর্মদা নদীর স্রোতমধ্যস্থিত সচল স্বয়ম্ভূলিঙ্গকে বাণলিঙ্গ বলা হয়েছে। এই বাণলিঙ্গে সর্বদা সদাশিবের অধিষ্ঠান। অন্ন-জল বা যে-কোনও বস্তু বাণলিঙ্গে অর্পিত হলে তা-ই প্রসাদরূপে গ্রহণ করা যায়। বলা হয় যে, রুদ্রাক্ষ ও শিবলিঙ্গ যত স্থূল হয় ততই প্রশস্ত, কিন্তু শালগ্রাম শিলা ও বাণলিঙ্গ যত সূক্ষ্ম হবে ততই উৎকৃষ্ট। বাণলিঙ্গের নামকরণ সম্পর্কে শাস্ত্রে দুই রকম মতবাদ পাওয়া যায়–

বাণার্চ্চার্থং কৃতং লিঙ্গং বাণলিঙ্গমতঃ স্মৃতম্ ।
বাণো বা শিব ইত্যুক্তস্তৎকৃতং বাণমুচ্যতে।।
অর্থাৎ : বাণাসুর শিবপূজার জন্য যে লিঙ্গসমূহ নির্মাণ করেছিলেন সেগুলির নাম হয়েছিল বাণলিঙ্গ। এই মতানুসারে বাণাসুরের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ হলো বাণলিঙ্গ। আরেকটি মতে বলা হয়েছে যে, বাণ শব্দের অর্থ হলো শিব। এই শিব বা বাণের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ হলো বাণলিঙ্গ।

      একইভাবে বীরমিত্রোদয়-এও বলা হয়েছে–

বাণঃ সদাশিবো দেবো বাণো বাণান্তরোহপি চ।
তেন যস্মাৎ কৃতং তস্মাদ্বানলিঙ্গমুদাহৃতম্ ।। (বীরমিত্রোদয়)
অর্থাৎ : স্বয়ং সদাশিবের নাম বাণ। বাণ শব্দে বাণ রাজাও বুঝায়। সেই বাণ রাজা কর্তৃক স্থাপিত হওয়াতে, বাণ-লিঙ্গ বলিয়া খ্যাতি হইয়াছে।

             বাণলিঙ্গের উৎপত্তি সম্পর্কে শাস্ত্রে একটি আখ্যায়িকা পাওয়া যায়। লিঙ্গপুরাণ গ্রন্থের ভূমিকায় কৃত ড.উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনা অনুসারে– পুরাকালে সর্বপ্রকার ক্রোধ জয়কারী ও শিবপূজায় রত মহাদেবের এক প্রিয় ভক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিপুণ এক শিল্পী। প্রত্যেকদিন স্বহস্তে তিনি শিবলিঙ্গ প্রস্তুত করে ও পূজা করে তা প্রতিষ্ঠা করতেন। এইভাবে প্রত্যহ শিবপ্রতিষ্ঠার দ্বারা দিব্য শত বৎসর কেটে গেল। তার একান্ত ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শঙ্কর তাঁর কাছে আবির্ভূত হয়ে বললেনঃ ‘হে বাণ! তোমার ওপর আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। তুমি কী বর প্রার্থনা কর তা জানাও। আমি এক্ষুনি তোমাকে সেই বর দেব’। বাণ শিবের কথায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে প্রণাম করে বল্লেন– ‘হে ভগবান্! শাস্ত্রমতে শুভ লক্ষণযুক্ত শিবলিঙ্গ নির্মাণ করতে আমার প্রত্যেকদিন খুব কষ্ট হয়। অতএব আপনি সন্তুষ্ট হয়ে শুভলক্ষণ যুক্ত কিছু লিঙ্গ আমাকে দিন। ঐসব লিঙ্গের অর্চনার দ্বারা যেন আমার সমস্ত অভিলাষ পূর্ণ হয় এবং আমি কৃতার্থ হই।’ জগৎকারণস্বরূপ মহাদেব বাণের এরূপ প্রার্থনা শ্রবণের পর কৈলাশ পর্বতের শিখরে গিয়ে চোদ্দ কোটি শিবলিঙ্গ প্রস্তুত করলেন। এই প্রত্যেকটি লিঙ্গই সিদ্ধলিঙ্গ এবং এদের পূজা করলে প্রতিটি মানুষেরই উন্নতি লাভ হয়। তারপর মহাদেব সেই লিঙ্গগুলি এনে বাণকে দান করলেন। বাণ তখন থেকে আর লিঙ্গ প্রস্তুত করতেন না। শিবপ্রদ ঐ লিঙ্গগুলির থেকেই প্রত্যেকদিন এক একটি লিঙ্গকে প্রতিষ্ঠা করতেন এবং পূজা করতেন। নিজের রাজধানীতে এই বিশালসংখ্যক লিঙ্গকে নিয়ে গিয়ে চিন্তা করলেন যে মানবদের সিদ্ধির জন্য মহাবেগযুক্ত নদীর মধ্যে এই লিঙ্গগুলিকে রক্ষা করা উচিত। এরূপ চিন্তা করে বিভিন্ন পবিত্রস্থানে তিনি লিঙ্গগুলিকে রেখে এলেন। শিবপ্রদত্ত এই বাণলিঙ্গগুলি যেখানে যেখানে রেখে আসা হয়েছিল সেই সেই স্থলেই বাণলিঙ্গ পাওয়া যায়। বাণ কোন্ কোন্ স্থানে কত পরিমাণ লিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন তার একটি বিবরণ শাস্ত্রকারেরা লিপিবদ্ধ করেছেন–

লিঙ্গানাং কালিকাগর্তে সঞ্চিতাস্তু ত্রিকোটিকঃ।
শ্রী শৈলে কোটয়স্তিস্রঃ কোটোকো কন্যকাশ্রমে।।
মাহেশ্বরে চ কোট্যস্তু কন্যাতীর্থে তু কোটিকা।
মহেন্দ্রে চৈব নেপালে একৈকা কোটিরেব চ।।
অর্থাৎ : তিন কোটি লিঙ্গ কালিকাগর্তে, তিন কোটি শ্রীশৈলে, এক কোটি কন্যকাশ্রমে, এক কোটি মাহেশ্বরক্ষেত্রে, এক কোটি কন্যাতীর্থে, এক কোটি মহেন্দ্রাচলে, এক কোটি নেপালে এবং অন্যান্য স্থানে অবশিষ্ট গুলিকে রক্ষা করলেন। নদীর স্রোতে ভেসে আসা বা পর্বতে কুড়িয়ে পাওয়া এইসব লিঙ্গকেই বাণলিঙ্গ জ্ঞানে সাধকেরা পূজা করে থাকেন।

 

              কেবলমাত্র প্রস্তর নির্মিত লিঙ্গেই যে শিবপূজা হয় তা নয়, মাটির দ্বারা শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে তার উপরেও শিব পূজার বিধান শাস্ত্রে পরিলক্ষিত হয়। মাটির দ্বারা নির্মিত লিঙ্গকে বলে পার্থিব লিঙ্গ। বিভিন্ন কামনায় বিভিন্ন প্রকার পার্থিব লিঙ্গের পূজা বিধি আছে। এই প্রকার লিঙ্গ নির্মাণ, তার পরিমাপ, লিঙ্গ গঠনকালে মাথার উপর বজ্রস্থাপন এবং পূজার সময় বজ্রমোচন ইত্যাদির বিধিবিধান ও মন্ত্র বাংলাদেশের পঞ্চোপাসক ব্রাহ্মণগণ বিশেষভাবে অবহিত। পার্থিব শিবলিঙ্গ পূজা করলেও তাকে বাণলিঙ্গ রূপেই পূজা করা হয়ে থাকে।
বলা হয়, কোমল বস্তু দিয়ে নির্মিত লিঙ্গের মধ্যে পার্থিব লিঙ্গই শ্রেষ্ঠ। আর কঠিন বস্তু দিয়ে নির্মিত লিঙ্গের মধ্যে পাষাণ-নির্মিত লিঙ্গই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য দামী প্রস্তর বা ধাতুর দ্বারাও লিঙ্গ নির্মিত হতো। এদের মধ্যে ক্রমিক উৎকর্ষের কথা আলোচনা করতে গিয়ে মেরুতন্ত্রে এরূপ ক্রমোৎকর্ষের যে তালিকা পাওয়া যায়, সেখানে বস্তুত বাণলিঙ্গের মাহাত্ম্যই বর্ণিত হয়েছে। যেমন, বলা হয়েছে–

কোমলেষু তু লিঙ্গেষু পার্থিবং শ্রেষ্ঠমুচ্যতে।
কঠিনেষু তু পাষাণং পাষাণাৎ স্ফটিকং পরম্ ।।
স্ফাটিকাৎ পুষ্পরাগোত্মমিন্দ্রনীলোদ্ভবং ততঃ।
ইন্দ্রনীলাচ্চ গোমেদং গোমেদাৎবিদ্রুমোদ্ভবম্ ।।
বিদ্রুমান্মৌক্তিকং শ্রেষ্ঠং হৈরণ্যাদ্ধীরকং বরম্ ।
হীরকাৎ পারদং শ্রেষ্ঠং বাণলিঙ্গং ততঃ পরম্ ।।
সংস্থাপ্য বাণলিঙ্গং রত্নকোটিগুণং ভবেৎ।
রসলিঙ্গে ততঃ বাণাৎ ফলং কোটিগুণং স্মৃতম্ ।।
অর্থাৎ : কোমল পদার্থের দ্বারা যত লিঙ্গ প্রস্তুত করা হয় তার মধ্যে পার্থিব লিঙ্গই সর্বশ্রেষ্ঠ, আর কঠিন বস্তু দিয়ে নির্মিত লিঙ্গের মধ্যে প্রস্তর নির্মিত লিঙ্গ শ্রেষ্ঠ। প্রস্তর নির্মিত লিঙ্গের থেকেও স্ফটিক নির্মিত লিঙ্গ শ্রেষ্ঠ, আবার স্ফটিকলিঙ্গের থেকেও শ্রেষ্ঠ হলো পদ্মরাগমণি নির্মিত লিঙ্গ। পদ্মরাগনির্মিত লিঙ্গের চেয়েও কাশ্মীর লিঙ্গ, তার থেকেও পুষ্পরাগনির্মিত লিঙ্গ, তার চেয়ে ইন্দ্রনীলমণি গঠিত লিঙ্গ, তার চেয়ে গোমেদ নির্মিত লিঙ্গ, তার চেয়ে হীরক লিঙ্গ, তার চেয়ে স্বর্ণনির্মিত লিঙ্গ, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ পারদনির্মিত লিঙ্গ এবং পারদ লিঙ্গের (শাস্ত্রে পারদকে রুদ্রের বীর্য বলে) থেকেও বাণলিঙ্গ সর্বশ্রেষ্ঠ। এককোটি রত্নলিঙ্গ পূজা করলে যে ফল পাওয়া যায় একটিমাত্র বাণলিঙ্গ পূজার দ্বারা সেই ফল পাওয়া যায়। কোটি বাণলিঙ্গ পূজার ফল একটি পারদ লিঙ্গের পূজাতে লাভ হয়।

 

             উল্লেখ্য, এই শ্লোকে একবার বাণলিঙ্গ পারদলিঙ্গের থেকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, আবার পরক্ষণেই বলা হয়েছে একটি পারদলিঙ্গ পূজার দ্বারা কোটি বাণলিঙ্গের পূজার ফল লাভ হয়। পণ্ডিতেরা বলেন, এতে কোন বিরোধ নেই। কেননা তাদের মতে, এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে যে কৃত্রিম পারদলিঙ্গের তুলনায় অকৃত্রিম বাণলিঙ্গ শ্রেষ্ঠ। আবার পারদ যেহেতু শিববীর্য তাই পারদলিঙ্গ কৃত্রিম বাণলিঙ্গের থেকেও শ্রেষ্ঠ একথা বলতে চাওয়া হয়েছে।
বাণলিঙ্গের মাহাত্ম্য এখানেই শেষ নয়। বীরমিত্রোদয়ধৃত-কালোত্তর অনুযায়ী– ‘বাণলিঙ্গের লক্ষণ বিষয়ে প্রাচীন স্মৃতিগ্রন্থে আছে যে, নর্মদা, গঙ্গা, যমুনা ও অন্যান্য পুণ্যৎ নদীর উৎপত্তিস্থলে বাণলিঙ্গ স্থাপিত আছে। সর্বার্থদায়ক সদাশিব সর্বদা সেইসব বাণলিঙ্গে অধিষ্ঠান করেন। ইন্দ্রাদি দেবগণ যে যে বাণলিঙ্গের পূজা করেছেন, সেই সেই লিঙ্গে সেই সেই দেবতার চিহ্ন সমুদয় প্রকটিত আছে। কথিত আছে যে, বাণলিঙ্গ পূজা করলে ভোগ ও মোক্ষ লাভ হয়। বাণলিঙ্গে গৌরীপট্ট যোগ করলেও চলে, আবার না করলেও চলে কারণ, বাণলিঙ্গে শিবের সাথে শক্তির নিরন্তর অবস্থান। স্বভাবতই গৌরীপট্ট বাণলিঙ্গে অন্তর্নিবিষ্ট আছেন। আবার বাণলিঙ্গের অভিষেক সংস্কার, আবাহন, প্রতিষ্ঠা ও বিসর্জন নেই কারণ, বাণাসুর বা অন্যান্য দেবগণ নিজ নিজ পূজিত বাণলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেই রেখেছেন। আবার তারা যে সমস্ত বাণলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাতে কোনওরকম স্পর্শ দোষও হয় না।’ (অশোক রায়)

            বাণাসুর ও অন্যান্য দেবতারা যে যে লিঙ্গ অর্চনা করেছেন, সেই সেই লিঙ্গ তাঁদের নিজ নিজ লাঞ্ছন চিহ্নে চিহ্নান্বিত হয়ে নামরূপলক্ষণে বাণলিঙ্গের বিভিন্ন প্রকারভেদ স্বরূপ মানুষের কাছে পূজ্য হয়েছে। এগুলি বস্তুত অস্বয়ম্ভূলিঙ্গ। শাস্ত্রকারের ভাষায় সেই সেই লিঙ্গ পূজনের বিশেষ ফলশ্রুতির কথাও বলা হয়েছে। যেমন–

বজ্রাদিচিহ্নতং লিঙ্গং ইন্দ্রলিঙ্গং প্রকীর্ত্তিতম্ ।
সাম্রাজ্যদায়কং তদ্ধি মনোহভীষ্টপ্রদায়কম্ ।। ১
বারুণং বর্ত্তুলাকারং পাশাঙ্কং চালিবর্চসম্ ।
বৃদ্ধিঃ সুখাদের্বৈ সত্ত্বসৌভাগ্যাদিস্তু লভ্যতে।। ২
শালগ্রামাদিসংস্থন্তু শশাঙ্কং শ্রীবিবর্দ্ধনম্ ।
পদ্মাঙ্কং স্বস্তিকাঙ্কং বা শ্রীবৎসাঙ্কং বিভূতয়ে।। ৩
বৈষ্ণবং শঙ্গচক্রাঙ্গগদাজাদিবিভূষিতম্ ।
শ্রীবৎসকৌস্তুভাঙ্কঞ্চ সর্বসিংহাসনাঙ্কিতম্ ।।
বৈনতেয়সমাঙ্কং বা তথা বিষ্ণুপদাঙ্কিতম্ ।
বৈষ্ণবং নাম তৎ প্রোক্তং সর্বৈশ্বর্য্যফলপ্রদম্ ।। ৪
আরুণং হিত্যকীলালমুষ্ণস্পর্শং করোত্যলম্ ।। ৫
আগ্নেয়ং তচ্ছক্তিনিভমথবা শক্তিলাঞ্ছিতম্ ।
ইদং লিঙ্গবরং স্থাপ্য তেজসোহধিপতির্ভবেৎ।। ৬
কৃষ্ণং ধূমং ন বা রুচ্যং ধ্বজাভং ধ্বজমুষলম্ ।
মস্তকে স্থাপিতং যস্য বায়ুলিঙ্গং প্রকীর্ত্তিতম্ ।। ৭
তূণপাশগদাকারং গুহ্য কেশস্য মধ্যগম্ ।
অস্থিশূলাঙ্কিতং রৌদ্রং হিমমন্ডলবর্চসম্ ।। ৮
অর্থাৎ : বজ্রাদি চিহ্নে চিহ্নিত বাণলিঙ্গকে ইন্দ্রলিঙ্গ বলে এবং এই লিঙ্গ পূজনে সাধক সাম্রাজ্য লাভ করে এবং তার মনোবাসনা সিদ্ধ হয়। ১।। যে বাণলিঙ্গ গোলাকৃতি পাশচিহ্নযুক্ত এবং ভ্রমরের মতো কালো তাকে বারুণলিঙ্গ বলে এবং এই লিঙ্গ পূজনে সত্ত্বগুণ ও সুখসৌভাগ্যাদি বৃদ্ধি হয়। ২।। শালগ্রামশিলাতে যেরূপ চক্রচিহ্ন থাকে সেরূপ চিহ্ন এবং শশাঙ্ক চিহ্ন থাকলে সেই লিঙ্গকে বলে বৈষ্ণব লিঙ্গ। এরূপ লিঙ্গ পূজার দ্বারা শ্রীবৃদ্ধি হয়। বৈষ্ণবলিঙ্গে যদি পদ্ম, স্বস্তিক ইত্যাদি চিহ্ন অঙ্কিত থাকে তাহলে তার পূজার দ্বারা বিভূতি লাভ হয়। ৩।। বাণলিঙ্গে যদি শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, শ্রীবৎস, কৌস্তুভ, সিংহাসন, গরুড়, বিষ্ণুপদ ইত্যাদি চিহ্ন থাকে, তাহলে সেই লিঙ্গকেও বৈষ্ণবলিঙ্গ বলে এবং এরূপ লিঙ্গ পূজার দ্বারা সাধক সর্বপ্রকার ঐশ্বর্য্য প্রাপ্ত হন। ৪।। জলের মতো স্বচ্ছ এবং উষ্ণস্পর্শ হলে সেই লিঙ্গকে আরুণলিঙ্গ নামে অভিহিত করা হয়। আরুণলিঙ্গও সাধকের মঙ্গল সাধন করে। ৫।। শক্তি চিহ্ন লিঙ্গের মধ্যে বিদ্যমান থাকলে এবং আগুনের মতো তেজসম্পন্ন হলে সেই লিঙ্গকে বলে আগ্নেয়লিঙ্গ। এরূপ শিবলিঙ্গের পূজার দ্বারা তেজের অধীশ্বর হওয়া যায়। ৬।। যে লিঙ্গ কৃষ্ণ বা ধূম্রবর্ণ, নির্মল নয় বরং ধ্বজাসদৃশ (ঢেউ খেলানো) এবং যার মস্তকে ধ্বজ ও মুষলচিহ্ন থাকে সেরূপ অসমতল লিঙ্গ বায়ুলিঙ্গ নামে খ্যাত। ৭।। যে লিঙ্গের মাঝখানে তূণ, পাশ বা গদার চিহ্ন থাকে তাকে বলে কুবেরলিঙ্গ। যদি লিঙ্গগাত্রে অস্থি বা শূলচিহ্ন বর্তমান থাকে এবং লিঙ্গের বর্ণ হিমমণ্ডলের (সাদা বরফের) মতো হয়, তাহলে সেই লিঙ্গকে রৌদ্রলিঙ্গ বলে। ৮।।

             এছাড়াও হেমাদ্রিধৃত লক্ষণ কাণ্ডে– দেবর্ষি নারদ পূজিত একাদশ রুদ্র বাণলিঙ্গের প্রধান প্রধান লক্ষণ-চিহ্নের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে নয় প্রকার চিহ্ন-লক্ষণের বর্ণনা নিম্নরূপ, যেমন–

মধুপিঙ্গলবর্ণাভং কৃষ্ণকুন্ডলিকাযুতম্ ।
স্বয়ংভূলিঙ্গমাখ্যাতং সর্বসিদ্ধৈর্নিষেবিতম্ ।। ১
নানা বর্ণ সমাকীণং জটাশূলসমন্বিতম্ ।
মৃত্যুঞ্জয়াহ্বয়ং লিঙ্গং সুরাসুরনমস্কৃতম্ ।। ২
দীর্ঘাকারং শুভ্রবর্ণং কৃষ্ণবিন্দুসমন্বিতম্ ।
নীলকণ্ঠং সমাখ্যাতং লিঙ্গং পূজ্যং সুরাসুরৈঃ।। ৩
শুক্লাভং শুক্লকেশঞ্চ নেত্রত্রয়সমন্বিতম্ ।
ত্রিলোচনং মহাদেবং সর্বপাপপ্রণোদনম্ ।। ৪
জ্বলল্লিঙ্গং জটাজুটং কৃষ্ণাভং স্থূলবিগ্রহম্ ।
কালাগ্নিরুদ্রমাখ্যাতং সর্বসর্বত্ত্বৈর্নিষেবিতম্ ।। ৫
মধুপিঙ্গলবর্ণাভং শ্বেতযজ্ঞোপবীতকম্ ।
শ্বেতপদ্মসমাসীনং চন্দ্ররেখাবিভূষিতম্ ।
প্রলয়াস্ত্রসমাযুক্তং ত্রিপুরারিসমাহ্বয়ম্ ।। ৬
শুভ্রাভং পিঙ্গলজটং মুণ্ডমালাধরং পরম্ ।
ত্রিশূলধরমীশানং লিঙ্গং সর্বার্থসাধনম্ ।। ৭
ত্রিশূলডমরুধরং শুভ্ররক্তার্দ্ধভাগতঃ।
অর্দ্ধনারীশ্বরাহ্বানং সর্বদেবৈরভীষ্টদম্ ।। ৮
ঈষদ্রক্তময়ং কান্তং স্থূলং দীর্ঘং সমুজ্জ্বলম্ ।
মহাকালং সমাখ্যাতং ধর্মকামার্থমোক্ষদম্ ।। ৯
এতত্তু কথিতং তুভ্যং লিঙ্গচিহ্নং মহেশি তু।
একেনৈব কৃতার্থঃ স্যাৎ বহুভিঃ কিমু সুব্রতে।। ১০
অর্থাৎ : নারদের মতে– যে বাণলিঙ্গ মধুর মতো পিঙ্গলবর্ণ এবং যাতে কৃষ্ণবর্ণ কুণ্ডলিনী বিদ্যমান তাকে বলে স্বয়ম্ভূলিঙ্গ। সিদ্ধযোগীরা এই প্রকার লিঙ্গের পূজা করে থাকেন। ১।। নানা বর্ণযুক্ত যে লিঙ্গে জটা ও শূলচিহ্ন বর্তমান থাকে, তাকে বলে মৃত্যুঞ্জয়লিঙ্গ। সমস্ত সুরাসুরই এই লিঙ্গকে নমস্কার করে। ২।। কৃষ্ণবিন্দু যুক্ত দীর্ঘাকৃতি ও শুভ্রবর্ণ বাণলিঙ্গকে নীলকণ্ঠলিঙ্গ বলে। এই লিঙ্গ সুর ও অসুর সকলেরই পূজ্য। ৩।। ত্রিনেত্রচিহ্ন শোভিত শুক্লবর্ণ, শুক্লাভাযুক্ত ও শুক্ল কেশরচিহ্ন সমন্বিত বাণলিঙ্গকে বলে ত্রিলোচনলিঙ্গ। এর পূজা করলে সর্বপাপ বিনষ্ট হয়। ৪।। স্থূল, অগ্নির মতো উজ্জ্বল অথচ কৃষ্ণবর্ণ আভাযুক্ত এবং জটাজুটচিহ্ন বর্তমান থাকলে, সেই লিঙ্গকে বলে কালাগ্নিরুদ্রলিঙ্গ। এরূপ লিঙ্গ সর্বজীবের পূজ্য। ৫।। যে বাণলিঙ্গ মধুর মতো পিঙ্গল আভাযুক্ত, শ্বেত যজ্ঞোপবীত চিহ্ন শোভিত এবং শ্বেতপদ্মের উপর অধিষ্ঠিত চিহ্নযুক্ত ছাড়াও শোভন চন্দ্ররেখা ও প্রলয়ান্ত্র চিহ্ন দৃষ্ট হলে, সে লিঙ্গকে ত্রিপুরারিলিঙ্গ বলে। ৬।। যে বাণলিঙ্গ শুভ্রবর্ণ পিঙ্গল জটাজুট যুক্ত এবং ত্রিশূল ও মুণ্ডমালা চিহ্ন শোভিত, তাকে বলে ঈশানলিঙ্গ। এই লিঙ্গ পূজনে সমস্ত অভিপ্রায় সিদ্ধ হয়। ৭।। ত্রিশূল ও ডমরুচিহ্ন শোভিত যে বাণলিঙ্গের অর্ধাংশ শুভ্রবর্ণ ও অর্ধাংশ রক্তবর্ণ, তাকে অর্ধনারীশ্বরলিঙ্গ বলে। এরূপ বাণলিঙ্গ সর্বদেবপূজ্য এবং ঈপ্সিতফলপ্রদ। ৮।। ঈষৎ লোহিতবর্ণ, স্থূল, দীর্ঘ, সুদৃশ্য ও উজ্জ্বল হলে সেই বাণলিঙ্গকে বলে মহাকাললিঙ্গ। এই লিঙ্গের পূজার দ্বারা ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই পুরুষার্থ চতুষ্টয় লাভ হয়। ৯।। বাণলিঙ্গের যেসব চিহ্নের কথা বলা হলো তার সবগুলোই একটি লিঙ্গে থাকবে এমন কথা নেই, তবে এসব চিহ্নের একটি মাত্র চিহ্ন থাকলেও তা বাঞ্ছিতসিদ্ধি দান করে। ১০।।

 

            নর্মদা নদীর জলে প্রাপ্ত যে সমস্ত বাণলিঙ্গ দেখা যায় সেই সব অকৃত্রিম বাণলিঙ্গ বিভিন্ন প্রকার রঙের হয়ে থাকে। তবে প্রত্যেক প্রকার লিঙ্গ প্রত্যেকের পূজ্য নয়। শাস্ত্রানুসারে বিশেষ বর্ণের লিঙ্গ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির পূজ্য। যেমন–

অর্থদং কপিলং লিঙ্গং ঘনাভং মোক্ষকাক্সিক্ষণাম্ ।
লঘু বা কপিলং স্থূলং গৃহী নৈবার্চয়েৎ ক্বচিৎ।
পূজিতব্যং গৃহস্থেন বর্ণেন ভ্রমরোপমম্ ।।
অর্থাৎ : কপিলবর্ণের বাণলিঙ্গ পূজা করলে অর্থ লাভ হয়। তবে মোক্ষার্থীরা মেঘের মত বর্ণের লিঙ্গ পূজা করবেন। কিন্তু যে লিঙ্গ অতি লঘু বা অতি স্থূল অথচ কপিল বর্ণ (হলদে বা মেটে হলদে) তার পূজা গৃহীর পক্ষে কর্তব্য নয়। ভ্রমরের মতো কৃষ্ণবর্ণ লিঙ্গ (অতি লঘু বা অতি স্থূল হলেও) গৃহস্থের পূজা করা কর্তব্য।

           অকৃত্রিম বাণলিঙ্গগুলি যদিও একই নর্মদা নদীর জলে একইভাবে সৃষ্ট, তবুও শাস্ত্রে কিছু লক্ষণযুক্ত বিশেষ বিশেষ আকৃতির বাণলিঙ্গকে পূজা করতে নিষেধ করা হয়েছে। এইসব অপূজ্য এক এক ধরনের লিঙ্গ পূজার দ্বারা এক এক প্রকারের অমঙ্গল লাভ ঘটে। এইসব অনিষ্টকর লক্ষণযুক্ত অপূজ্য বাণলিঙ্গকে অনিষ্টকর লিঙ্গ বা ত্যাজ্য বাণলিঙ্গ বলে। কিরূপ লিঙ্গের পূজায় কিরূপ অমঙ্গল ঘটে তা শাস্ত্রকারেরা একত্র নিবন্ধ করেছেন। যেমন–

কর্কশে বাণলিঙ্গে চু পুত্রদারক্ষয়ো ভবেৎ।
চিপিটে পূজিতে তস্মিন্ গৃহভঙ্গো ভবেৎধ্রুবম্ ।।
একপার্শ্বস্থিতে ধেনুপুত্রদারধনক্ষয়ঃ।
শিরসি স্ফুটিতে বাণে ব্যাধিমরণমেব চ।।
ছিদ্রলিঙ্গেহর্চ্চিতে বাণে বিদেশগমনং ভবেৎ।
লিঙ্গে চ কর্ণিকাং দৃষ্ট্বা ব্যাধিমান্ জায়তে পুমান্ ।
অত্যুন্নতি বিলাগ্রে তু গোধনানাং ক্ষয়ো ভবেৎ।।
তীক্ষ্ণাগ্রং বক্রশীর্ষঞ্চ ত্র্যস্রলিঙ্গং বিবর্জয়েৎ।
অতিস্থূলং চাতিকৃশং স্বল্পং বা ভূষণান্বিতম্ ।
গৃহী বিবর্জয়েত্তাদৃক্ তদ্ধি মোক্ষার্থিনো হিতম্ ।।
অর্থাৎ : কর্কশ বাণলিঙ্গের পূজা করলে স্ত্রীপুত্র ক্ষয় হয় এবং চিপিট (চ্যাপ্টা) লিঙ্গের পূজার দ্বারা গৃহভঙ্গ হয়। একপাশমাত্র আছে (একপার্শ্বাস্থিত) এরূপ লিঙ্গের পূজা করলে সেই পূজকের স্ত্রী, পুত্র, গাভী, ধন ইত্যাদি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। মাথাভাঙা (শিরসি স্ফুটিত) বাণলিঙ্গের পূজা করলে ব্যাধি ও মৃত্যুলাভ ঘটে। ছিদ্রযুক্ত লিঙ্গের পূজা করলে বিদেশ গমন ঘটে। যে লিঙ্গের মস্তকে পদ্মকোষের মতো কর্ণিকা থাকে তার পূজা করলে পীড়া হয়। যে লিঙ্গের ছিদ্রের পাশটা অত্যন্ত উঁচু তার অর্চনা করলে গোধন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যে বাণলিঙ্গের অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ অথবা বক্র বা যে লিঙ্গ ত্রিকোণাকৃতি তার পূজা করতে নেই। যে বাণলিঙ্গ অত্যন্ত স্থূল, অত্যন্ত কৃশ বা অতি খর্ব তা সুলক্ষণ চিহ্নান্বিত হলেও গৃহীর পক্ষে সেরূপ লিঙ্গ পূজ্য নয়। তবে ওইসব লিঙ্গ পূজা মোক্ষকামীর পক্ষেই হিতকর।

এছাড়াও শাস্ত্রকারের ভাষায়–

দণ্ডাকারং ভবেদ্যাম্যমথবা রসনাকৃতি।
নিশ্চিতং নিধনস্তেন ক্রিয়তে স্থাপিতেন তু।। ১
রাক্ষসং খড়্গসদৃশং জ্ঞানযোগফলপ্রদম্ ।
কর্করাদিপ্রলিপ্তস্তু কুণ্ঠকুক্ষিযুতং তথা।
রাক্ষসং; নৈর্ঋতের্লিঙ্গং গার্হস্থে ন সুখপ্রদম্ ।। ২
অর্থাৎ : শিবলিঙ্গ যদি লাঠির মতো লম্বা হয় বা জিহ্বার মতো লম্বা হয় তাকে বলে যাম্যলিঙ্গ। এরূপ লিঙ্গকে পূজা করতে নেই। এধরনের লিঙ্গ স্থাপন করলে বা পূজা করলে সাধকের নিশ্চিত মৃত্যু হয়। ১।। খড়গের মতো আকৃতি বিশিষ্ট লিঙ্গকে বলে রাক্ষস লিঙ্গ। এরূপ লিঙ্গের পূজা করলে মোক্ষলাভ হয়। তবে রাক্ষস লিঙ্গের গা যদি কাঁকরের মতো কর্কশ হয় এবং মাঝখানটা চ্যাপা থাকে, তাহলে সেই লিঙ্গকে নৈর্ঋতলিঙ্গ বলে। এই লিঙ্গের পূজোর দ্বারা অলক্ষ্মী লাভ হয়। সেই কারণে গৃহস্থের পক্ষে এরূপ লিঙ্গ পূজা করা উচিত নয়। ২।।

 

            এতক্ষণ আমরা অকৃত্রিম বা প্রাকৃতিক লিঙ্গের লক্ষণ ও পূজা-মাহাত্ম্য দেখলাম। এবার কৃত্রিম লিঙ্গ সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে।
কৃত্রিম লিঙ্গ শব্দের অর্থ ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ। কৃত্রিম লিঙ্গ শিলা, ধাতু, মাটি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে, তাই পৃথিবীতে কৃত্রিম লিঙ্গের সংখ্যা অসংখ্য। ইতঃপূর্বে শৈলজ ও ধাতুনির্মিত লিঙ্গের উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বিশেষ বিশেষ কিছু জিনিস দিয়ে তৈরি কৃত্রিম লিঙ্গের আরও কিছু শাস্ত্র-নির্দেশনা দেখতে পারি, যেমন গরুড় পুরাণে বলা হয়েছে–

কার্য্যং পুষ্পময়ং লিঙ্গং হয়গন্ধসমন্বিতম্ ।
নবখণ্ডাং ধরাং ভুক্ত্বা গণেশাধিপতির্ভবেৎ।।
রজোভিনির্মিতং লিঙ্গং যঃ পূজয়তি ভক্তিতঃ।
বিদ্যাধরপদং প্রাপ্য পশ্চাচ্ছিবসমো ভবেৎ।।
শ্রীকামো গোশকৃল্লিঙ্গং কৃত্বা ভক্ত্যা প্রপূজয়েৎ।
স্বচ্ছেন কপিলেনৈব গোময়েন প্রকল্পয়েৎ।।
কার্য্যং যথাক্রমং লিঙ্গং যবগোধূমশালিজম্ ।
শ্রীকামঃ পুষ্টিকামশ্চ পুত্রকামস্তদর্চয়েৎ।।
সিতাখণ্ডময়ং লিঙ্গং কার্য্যমারোগ্যবর্দ্ধনম্ ।
বশ্যে লবণজং লিঙ্গং তালত্রিকটুকান্বিতম্ ।।
গব্যঘৃতময়ং লিঙ্গং সংপূজ্য বুদ্ধিবর্দ্ধনম্ ।
লবণেন চ সৌভাগ্যং পার্থিবং সর্বকামদম্ ।।
কামদং তিলপিষ্টোত্মং তুষোত্থং মারণে স্মৃতম্ ।।
ভস্মোত্থং সর্বফলদং গুড়োত্মং প্রীতিবর্দ্ধনম্ ।
গন্ধোত্মং গুণদং ভুরি শর্করোত্মং সুখপ্রদম্ ।।
বংশাঙ্কুরোত্মং বংশকরং গোময়ং সর্বরোগদম্ ।
কেশাস্থিসম্ভবং লিঙ্গং সর্বশত্রুবিনাশনম্ ।।
ক্ষোভণে মারণে পিষ্টসম্ভবং লিঙ্গমুত্তমম্ ।
দারিদ্র্যদং দ্রুমোদ্ভূতং পিষ্টং সারস্বতপ্রদম্ ।।
দধিদুগ্ধোদ্ভবং লিঙ্গং কীর্ত্তিলক্ষ্মীসুখপ্রদম্ ।
ধান্যদং ধান্যজং লিঙ্গং ফলোত্মং ফলদং ভবেৎ।।
পুষ্পোত্মং দিব্যভোগায়ুর্মুক্ত্যৈ ধাত্রীফলোদ্ভবম্ ।
নবনীতোদ্ভবং লিঙ্গং কীর্তিসৌভাগ্যবর্দ্ধনম্ ।।
দুর্বাকাণ্ডসমুদ্ভূতম্ অপমৃত্যুনিবারণম্ ।
কর্পূরসম্ভবং লিঙ্গং তথা বৈ ভুক্তিমুক্তিদম্ ।
অয়োস্কান্তং চতুর্ধা তু জ্ঞেয়ং সামান্যসিদ্ধিষু।।
অর্থাৎ : অশ্বগন্ধাযুক্ত কুসুম দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার অর্চনা করলে নবখণ্ডা পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য্য ভোগের পর গণাধিপত্য লাভ করা যায়। যে ব্যক্তি যথাযথ ভক্তির দ্বারা ধুলিনির্মিত শিবলিঙ্গ প্রস্তুত করে পূজা করে সে বিদ্যাধরপদ প্রাপ্ত হয় এবং শিবতুল্য হয়ে থাকে। কপিলা ধেনুর গোময় ভূপতিত হবার পূর্বেই তা আহরণ করে তার দ্বারা শিবলিঙ্গ প্রস্তুত করে পূজা করলে শ্রীলাভ করা যায়। অতএব শ্রীকামী এভাবে লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার অর্চনা করবেন। শ্রীকামী ব্যক্তি যবের দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার অর্চনা করবেন, পুষ্টিকামী ব্যক্তি গোধূম দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার অর্চনা করবেন এবং পুত্রকামী ব্যক্তি শালিধান্য দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার অর্চনা করবেন। মধু জমে চিনির মতো শক্ত হলে, তার দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে যে পূজা করে, তার আরোগ্য লাভ হয়। লবণ, হরিতাল এবং ত্রিকূট দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার পূজা করলে বশীকরণ সিদ্ধ হয়। গব্যঘৃত দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে তার পূজা করলে বুদ্ধিবৃদ্ধি ঘটে। লবণ নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা সৌভাগ্য লাভ হয়। মৃত্তিকা নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা সর্বকামনা পূর্ণ হয়। তিল বেটে তার দ্বারা লিঙ্গ প্রস্তুত করে পূজা করলে অভীষ্টসিদ্ধি হয় এবং তুষ দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে মারণকার্য্য সিদ্ধ হয়ে থাকে। ভস্ম নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে সর্বপ্রকার অভীষ্ট লাভ হয়। গুড় দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে প্রীতি বৃদ্ধি পায়। চন্দন প্রভৃতি গন্ধ দ্রব্যের দ্বারা লিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করলে বহু গুণের অধিকারী হতে পারা যায়। শর্করা বা চিনির দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে সুখ লাভ হয়। বাঁশ গাছের অঙ্কুরের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা বংশ বৃদ্ধি ঘটে থাকে। গোময় বা গোবর দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে সর্বপ্রকার রোগ তকে আক্রমণ করে। কেশ, অস্থি ইত্যাদি নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে যাবতীয় শত্রু বিনষ্ট হয়। পিষ্ঠনির্মিত লিঙ্গ ক্ষোভন ও মারণকার্য্যে প্রশস্ত। কাষ্ঠ নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা দারিদ্র হয়। পিষ্ঠসম্ভব লিঙ্গ বিদ্যাদান করে। দধি, বা দুগ্ধ দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে কীর্তি, শ্রী ও সুখলাভ হয়। ধান্য নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে ধান্য লাভ এবং ফল নির্মিত লিঙ্গ পূজা করলে ফল লাভ ঘটে। পুষ্পজ লিঙ্গ পূজা করলে দিব্য ভোগ লাভ করা যায়। ধাত্রীফল নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা মুক্তিলাভ হয় এবং ননী (নবনীত) দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা কীর্তি ও সৌভাগ্যবৃদ্ধি ঘটে। দুর্বাকাণ্ডের দ্বারা লিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করলে অপমৃত্যু নিবারিত হয়। কর্পূর নির্মিত লিঙ্গে পূজা করলে ভুক্তিমুক্তি প্রাপ্তি ঘটে। চারপ্রকার অয়স্কান্ত নির্মিত লিঙ্গে পূজা করলে সিদ্ধি পাওয়া যায়।

 

              এতক্ষণের আলোচনায় বিভিন্ন পর্যায়ের সাধক ও পূজকদের পূজ্য নানা প্রকারের কৃত্রিম ও অকৃত্রিম শিবলিঙ্গের প্রসঙ্গ আলোচিত হলেও যেসব বিখ্যাত ‘অচল’ শিবলিঙ্গ গোটা ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রাচীনকাল থেকে অগণিত মন্দির, তীর্থ ও লক্ষকোটি ভক্ত জনগোষ্ঠীর নিত্য কোলাহল-সমাকীর্ণ অনড় শিবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও প্রকাশিত হয়ে আছে, সেসবের উল্লেখ না হলে বস্তুত সাধন-পরম্পরায় প্রাধান্য অর্জনকারী এই শৈব সাধনা তথা লিঙ্গ পূজার মূল স্পন্দনটাকে উপলব্ধি করা যাবে না। কিন্তু আমাদের বর্তমান আলোচনায় এগুলোর বিশাল বিস্তৃত বিবরণ দেয়া সম্ভব নয় বা উদ্দেশ্যও তা নয়। কেননা, শিবপুরাণের জ্ঞানেশ্বর-সংহিতার আটত্রিশ অধ্যায়ে ঋষিরা সূতের কাছে লিঙ্গের বিষয়ে যখন জানতে চেয়েছেন তখন তিনি বলেছেন–

যৎ পৃষ্টং হি ঋষিশ্রেষ্ঠ লিঙ্গানি কথ্যতেহধুনা।
সর্বের্ষাঞ্চৈব লিঙ্গানাং সংখ্যানং বিদ্যতে কুতঃ।।
সর্বা লিঙ্গময়ী ভূমিঃ সর্বং লিঙ্গময়ং জগৎ।
লিঙ্গময়ানি তীর্থানি সর্বং লিঙ্গে প্রতিষ্ঠিতম্ ।।
সংখ্যা ন বিদ্যতে তেষাম্ কিঞ্চৈব তৎ ব্রবীমিহ।
যৎ কিঞ্চিৎদ্দৃশ্যতে দৃশ্যং বর্ণ্যতে স্মর্য্যতে চ যৎ।
তৎ সর্বং শিবরূপঞ্চ নান্যদস্তীতি কিঞ্চন।।
তথাপি শ্রূয়তাং হ্যেতং কথায়ামি যথাশ্রুতম্ ।
লিঙ্গানি চ ঋষিশ্রেষ্ঠঃ পৃথিব্যাং যানি তানিহ।। (শিবপুরাণ-জ্ঞানসংহিতা-৩৮/১৬-২২)
অর্থাৎ : এই পৃথিবীতে লিঙ্গের সংখ্যা পরিমাপ করা যায় না। সমগ্র জগৎ যেমন লিঙ্গময় তেমন সমগ্র পৃথিবীও লিঙ্গময়। যা কিছু দেখা যায়, বর্ণনা করা যায়, স্মরণ করা যায় সবই শিবস্বরূপ, শিব ছাড়া আর কিছুই নেই। লোকেদের উপকারের জন্য ভগবান শম্ভু বিভিন্ন স্থানে লিঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মানুষের পক্ষে সেই সমস্ত লিঙ্গের সংখ্যা নিরূপণ কিভাবে সম্ভব।

           এর পরেই এখানে কয়েকটি জ্যোতিলিঙ্গের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। স্থাপিত লিঙ্গের সংখ্যা অসংখ্য হলেও প্রচলিত মতে জ্যোতিলিঙ্গের সংখ্যা বারোটি অর্থাৎ– দ্বাদশ জ্যোতিলিঙ্গ। শিবপুরাণে বলা হয়েছে–

সৌরাষ্ট্রে সোমনাথঞ্চ শ্রীশৈলে মল্লিকার্জনম্ ।
উর্জুয়িনাং মহাকালমোঙ্কারং পরমেশ্বরম্ ।।
কেদারং হিমবৎপৃষ্ঠে ডাকিন্যাং ভীমশঙ্করম্ ।
বারাণস্যাং বিশ্বেশরং ত্র্যম্বকম্ গৌতমীতটে।।
বৈদ্যনাথং চিতাভূমৌ নাগেশং দারুকাননে।
সেতুবন্ধে চ রামেশং ঘুশ্মেকঞ্চ শিবালয়ে।। (জ্ঞানেশ্বর-সংহিতা-৩৮/১৭-১৯)
অর্থাৎ : দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ হলো– সৌরাষ্ট্রে শ্রীসোমনাথ, শ্রীশৈলে শ্রীমল্লিকার্জুন, উজ্জয়িনীতে শ্রীমহাকাল, পরমেশ্বরে শ্রীওঙ্কারেশ্বর, হিমালয়পৃষ্ঠে শ্রীকেদারনাথ, শ্রীভীমাশঙ্কর, বারাণসিতে শ্রীবিশ্বেশ্বর, গৌতমীতটে শ্রীত্র্যম্বকেশ্বর, চিতাভূমে শ্রীবৈদ্যনাথ, দারুকাননে শ্রীনাগেশ্বর, সেতুবন্ধে শ্রীরামেশ্বর এবং শিবালয়ে শ্রীঘুশ্নেশ্বর।

 

             প্রাচীনকালে সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তিরাশি/চুরাশিটা মন্দিরে দেবাদিদেব মহাদেবের পূজার জন্যে বিখ্যাত ছিল বলে জানা যায়। স্কন্দ পুরাণের আবন্ত্যখণ্ডে বিভিন্ন তীর্থে অবস্থিত চুরাশি প্রকার লিঙ্গের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে উমা শিবকে জিজ্ঞাসা করেছেন–

চতুরশীতিলিঙ্গানি ত্বয়োক্তানীহ যানি তু।
তানি বিস্তরতো ব্রূহি সর্বপাপহরাণিতু।। (স্কন্দপুরাণ-আবন্ত্যখণ্ড-১/১৯)
অর্থাৎ : আপনি যে চতুরশীতি লিঙ্গের কথা বলেছেন তা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করুন, আমি সর্বপাপ হর ঐ সকল লিঙ্গের কথা শুনতে চাই।

             মহাদেব তখন বিস্তৃতভাবে সেই সব লিঙ্গের বিবরণ ও তার পূজা ফলের কথা বলেছেন। বিভিন্ন তীর্থের বর্ণনা প্রসঙ্গে শিবের কথাও এখানে এসেছে। এর মধ্যে কিছু মন্দির সেসময় নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলেও বেশিরভাগই প্রাচীন, অতি প্রাচীন ও মহা প্রাচীন। যেমন স্বয়ং কাশী বিশ্বনাথই স্মরণাতীত কাল থেকে অনাদি লিঙ্গ বা অবিমুক্তেশ্বররূপে পূজিত হয়ে আসছিলেন, পরে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে হলেন– বিশ্বেশ্বর বা বিশ্বনাথ। এরপরে হয়তো আরো হাজার বছর কেটে গেছে। সপ্তম শতাব্দীতে হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠ সংগঠক বলে কথিত শঙ্করাচার্য ওই সুপ্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে বারোটা মন্দিরকে জ্যোতির্লিঙ্গ বলে আখ্যা দিলেন। শিবপুরাণ ও নন্দীপুরাণে কথিত আছে– ‘আমি সর্বত্র বিরাজমান হলেও এই বারোটি স্থানে (সোমনাথ, মল্লিকার্জুন, মহাকালেশ্বর, ওংকারেশ্বর ও অমলেশ্বর, কেদারনাথ, ভীমাশংকর, ত্রম্বকেশ্বর, বৈদ্যনাথ বা বৈজনাথ, নাগেশ্বর, রামেশ্বর, বিশ্বেশ্বর বা বিশ্বনাথ, বিমলেশ্বর ও ঘৃশ্লেশ্বর) জ্যোতির্লিঙ্গরূপে বাস করি।’

           জ্যোতির্লিঙ্গ শব্দটার প্রচলন সর্বপ্রথম শুরু হয়েছিল কৈলাস শৃঙ্গ-কে শিবলিঙ্গরূপে অভিষেক করার সময় থেকে। তারপর সেই ধারা বেয়ে সমতলের প্রথম জ্যোতির্লিঙ্গ হলেন– কাশী বিশ্বনাথ। তারপর ছড়িয়ে পড়লো সারা ভারতের তিরাশিটা স্থানে। এর মধ্যে বারোটাকে শঙ্করাচার্য মান্যতা জ্ঞাপন করলেন। ভক্তের টানে দেবাদিদেব মহাদেব ওইসব স্থানে আবির্ভূত হয়ে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে অবস্থান করছেন বলেই বিশ্বাস। কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে দেখলে যুক্তিসংগত কারণেই এই শিবপুরাণ ও নন্দীপুরাণ সপ্তম শতাব্দীর পরেই রচিত বলে মনে হয়। তবে সারা ভারতের প্রতিটা কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা শত শত শিবলিঙ্গের মধ্যে কেন ওই বারোটা শিবলিঙ্গই জ্যোতির্লিঙ্গের মান্যতা পেলো, সে সম্পর্কে আচার্য শঙ্করের কোনও ব্যাখ্যা আছে বলে জানা নেই। স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মকে সংগঠিত করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সারা ভারতের বিভিন্ন হিন্দু তীর্থস্থানগুলোতে বৈদিক মতে পূজা পদ্ধতির প্রচলন করেন। এছাড়াও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত তীর্থস্থানগুলোকে দেখভাল করার জন্যে ভারতবর্ষের চারকোণায় চার-চারটে মঠও প্রতিষ্ঠা করেন। অশোক রায়ের মতে, শঙ্করাচার্য সম্ভবত এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আর্য ও অনার্য প্রভাবিত ও পূজিত তীর্থস্থানগুলোর (তিরাশিটা) মধ্যে থেকে সেই যুগে জনপ্রিয়তার নিরিখে মান্যতা জ্ঞাপন করেছিলেন। নইলে অনার্য প্রভাবিত তীর্থস্থানগুলো (বৈদ্যনাথ/বৈজনাথ, ভীমাশংকর, নাগনাথ ও ঘৃশ্লেশ্বর ইত্যাদি) একই সাথে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের শিরোপা কিভাবে পেলো তার আপাত ব্যাখ্যা মেলে না।

             তবে জ্যোতির্লিঙ্গের সৃষ্টির ধারণার বিকাশ কিভাবে ঘটতে পারে বা ঘটেছে, অশোক রায় যেভাবে তার বিজ্ঞানসম্মত সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন তাকে যুক্তিসঙ্গত বলে মেনে নিতে বাধা দেখি না। কেননা–
‘মহাকাশে পৃথিবীর কক্ষপথে বা তার আশপাশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাপহীন, আলোহীন (প্রধানত লোহা, নিকেল ও সিলিকেট-এর বিভিন্ন যৌগের) অসংখ্য ধূলিকণা। এদের প্রধান উৎস হল ধূমকেতু। যদিও কিছু ধূলিকণা সৌরজগতের সৃষ্টির সময়কাল থেকে পড়ে থাকা পদার্থ। আবার কখনও কখনও গ্রহাণুর সংঘর্ষজাত টুকরো। এরা পৃথিবীর কক্ষপথের উপরে বা তার আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। পৃথিবী নিজের কক্ষপথের সেই বিশেষ জায়গায় এলেই এরা (পৃথিবীর আকর্ষণে) সেকেন্ডে ৫০-৭০ কিলোমিটার গতিবেগ নিয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০-১৫০ কিমি উপর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পৃথিবীর উপরে আছড়ে পড়ে। এই বিপুল গতিবেগে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে উদ্ভূত প্রচণ্ড তাপে যখন তারা জ্বলে ওঠে তখনই তাদের আমরা দেখতে পাই। এদের বলে উল্কা (Meteor)। এই উল্কাপিণ্ডের (Meteoroid) বেশিরভাগই জ্বলতে জ্বলতে নেমে আসার পথেই নিঃশেষ হয়ে যায় (পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ কিমি উপরে)। চলতি কথায় এর নাম ‘তারা খসা’ (Shooting Star)। জ্বলে ওঠা উল্কাপিন্ড তার আশপাশের বাতাসকে উত্তপ্ত ও আয়নিত করে, ফলে কখনও কখনও উল্কা নিঃশেষ হয়ে গেলেও আকাশে থেকে যায় তার আভা (Meteor trail), কোনও উল্কা মিলিয়ে যায় অতি দ্রুত, আবার কেউ কেউ বিস্ফারিত হয়ে তৈরি করে অগ্নি গোলক (Fire ball বা bolides)। রাতের আকাশের যে অংশ থেকে উল্কাগুলো ছুটে আসে বলে মনে হয় সেই অংশকে বলে ‘দীপ্তিকেন্দ্র’; আর যে নক্ষত্রমন্ডলীতে এই দীপ্তিকেন্দ্রের অবস্থান তারই নামে রাখা হয় উল্কাবৃষ্টির নাম।’
‘এই মহাজাগতিক পদার্থগুলো সমস্ত গ্রহেই চিরকালই পড়ে আসছে। পৃথিবীর উপরে বাতাসের এক পরিমণ্ডল থাকায় তার সাথে সংঘর্ষের ফলে বেশিরভাগ উল্কাই নেমে আসার পথেই জ্বলতে জ্বলতে নিঃশেষ হয়ে যায়। কদাচিৎ দু’-একটা ওই বিপুল বেগ নিয়ে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে। তখন সেখানে ঘটে এক– প্রলয় কাণ্ড (একই সাথে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও প্রবল বিস্ফোরণ)। ভারতবর্ষের ‘লোনার হ্রদ’ এইরকমই এক বিশাল উল্কাপাতের ফলে সৃষ্ট। সেখানে উল্কা মাটির এত গভীরে চলে গেছে যে তার হদিশ আজও মেলেনি। সাইবেরিয়াতেও এইরকমই এক উল্কাপাতের কথা জানা যায়। সম্প্রতি নজরে এল নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন গত ৭ নভেম্বর ২০০৫-এ চন্দ্রপৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছে এক ১২ সেমি চওড়া উল্কা। তার গতিবেগ ছিল ২৭ কিমি প্রতি সেকেন্ডে। এই বিপুল বেগে চাঁদের বুকে উল্কাটি আছড়ে পড়ায় যে বিস্ফোরণ ঘটে তার শক্তি ছিল ৭০ কেজি T.N.T-এর সমান।’
‘এই ধরনের বড়সড় উল্কাপাতের ঘটনা পৃথিবীতে কদাচিৎ ঘটে। জ্বলতে জ্বলতে প্রায় নিঃশেষিত কিছু টুকরো অনেক সময়ই পড়ে। যদিও তার ফলে সেই অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় যথেষ্ট।’
‘যাই হোক যে কথা বলার জন্য উল্কাপাতের ঘটনার প্রস্তাবনা তা হল– আদিমকাল থেকেই প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা প্রত্যক্ষ করেছে এই অতি প্রাকৃত ঘটনাকে। ফলে ভয়ে, বিস্ময়ে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে, দূর থেকে স্তব-স্তুতি করে শান্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে এই জ্যোতির্ময় অগ্নিগোলককে। ক্রমে ঠাণ্ডা হয়ে এলেও সাহস হয়নি কাছে যাওয়ার। ফলে বারংবার প্রণতি জানিয়েছে দূর থেকে। তারপর একসময় কাছে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে স্তুব-স্তুতি-প্রণতি জানিয়ে ও সবশেষে ওই মহাশক্তিধরের উপরে জল ঢেলে তাকে শান্ত করার প্রয়াসও চালিয়েছে।’
‘সাধারণত এই উল্কাপিণ্ডগুলো দেখতে হয় কালো মসৃণ ও ডিম্বাকৃতি। এতে প্রধানত লোহা ও নিকেল ছাড়া বিভিন্ন সিলিকেট যৌগও থাকে। তাই এর ওজনও হয় অন্য সাধারণ পাথরের থেকে বেশি। ফলে দেবদত্ত ও দৈবগুণসম্পন্ন বলে প্রতিষ্ঠা পেতে দেরি হয় না। কালক্রমে তা দেবত্বের মান্যতাও লাভ করে– ভয়ে ও ভক্তিতে। শুরু হয়ে যায় তন্ত্র-মন্ত্র, ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসার কাজে এই অতি দুর্লভ জিনিসের ব্যবহার। কালস্রোতে তা শিবত্বের সাথে লীন হয়ে যায়। অতি প্রাচীন শৈব সম্প্রদায়ের ভ্রাম্যমাণ তীর্থিকেরা এই অতি দুর্লভ বস্তুকে সযত্নে সংগ্রহ করে বিভিন্ন শৈব তীর্থস্থানে শিবলিঙ্গের মণি বেদিকায় তা প্রোথিত করে দেয়। তাদের মধ্যে সেই সময়ে যেসব শৈবতীর্থের শিবলিঙ্গ জনমানসে প্রসিদ্ধি লাভ করে সম্ভবত তাদের মধ্যে থেকেই আচার্য শঙ্কর বারোটা স্থানকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মান্যতা জ্ঞাপন করেন।’– (বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ, পৃষ্ঠা-১৬৩-৬৫)

            এই সম্ভাব্য কারণের মধ্যে কতটুকু সত্য নিহিত থাকতে পারে তার বিচার হয়তো একদিন সময়ই করবে। তবে শিবলিঙ্গের আর এক শাস্ত্রিয় বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ডে। স্কন্দপুরাণের মাহেশ্বর খণ্ড থেকেও শিবলিঙ্গ সম্পর্কে অনেক বিবরণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন শিবতীর্থের দীর্ঘ তালিকা ও বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে এইসব তীর্থ সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী বিস্তৃত ছিল। সে বিবরণ এখানে বাহুল্য। বাস্তবতা হলো, লিঙ্গ পূজা যে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-মধ্য-পশ্চিম সমগ্র ভারতেই বিস্তৃত ছিল তা এইসব তীর্থ তালিকা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়। বর্তমান ভারতবর্ষেও এমনকি এই বাংলাদেশেও তুলনামূলক বিচারে শিবক্ষেত্রেরই প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু কোন্ সময় থেকে এই লিঙ্গপূজার উদ্ভব এবং সেই সঙ্গে শিবলিঙ্গের এই অমূর্ত বা বিমূর্ত রূপের পেছনে কোন্ প্রাচীন বিশ্বাস বা দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে আছে, গবেষকের ভক্তিনিরপেক্ষ কৌতুহলী দৃষ্টিতে তা অনুসন্ধান করা আবশ্যক বৈকি।

[পূর্বের পোস্ট : ভূমিকা] [×] [পরের পোস্ট : শিবলিঙ্গের প্রাক-বৈদিক নিদর্শনশিবলিঙ্গের প্রাক-বৈদিক নিদর্শন]

 

 

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 333,354 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 112 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   সেপ্টে. »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: