h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শিব ও লিঙ্গ, উপাসনার ক্রমবিকাশ-০১ : ভূমিকা

Posted on: 10/03/2018


2016 - 1[1]

শিব ও লিঙ্গ, উপাসনার ক্রমবিকাশ-০১ : ভূমিকা
রণদীপম বসু

ভূমিকা

শুরুতেই স্মরণে রাখা ভালো যে, হিন্দু সভ্যতায় বহুদেবতাবাদ প্রচলিত থাকলেও হিন্দু সমাজ মূলত পঞ্চদেবতার উপাসক। এই পঞ্চোপাসক সম্প্রদায় হলো– শৈব, শাক্ত, সৌর, গাণপত্য ও বৈষ্ণব। আবার সম্প্রদায়গতভাবে ভগবান শ্রীবিষ্ণু ও শিব ঠাকুরের পূজা মূর্ত ও অমূর্ত বা বিমূর্তরূপে শালগ্রাম শিলায় ও শিবলিঙ্গে বহুল প্রচলিত। এর মধ্যে শিবলিঙ্গ পূজা সমাজ জীবনে এতটাই জনপ্রিয় যে, জনমানসে তাঁর মূর্তিরূপই ক্রমবিলীয়মান। এ প্রসঙ্গে মহাশায় অক্ষয় কুমার দত্ত বলেন–
‘শিবের সহিত অন্য অন্য দেবতার একটি বিষয়ে বিশেষ বিভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহার সর্বাবয়বের প্রতিমূর্তি অতীব বিরল; ভারতবর্ষের সকল অংশেই তদীয় লিঙ্গ-মূর্তিতেই তাঁহার পূজা হইয়া থাকে। উহা সর্বত্র এরূপ প্রচলিত যে, শিবের উপাসনা বলিলে শিবের লিঙ্গ-মূর্তির উপাসনাই বুঝিতে হয়। শিবালয় ও শিব-মন্দির সমুদায় কেবল ঐ মূর্তিরই আলয়। শৈবতীর্থে কেবল ঐ মূর্তিরই মহিমা প্রকাশিত আছে। স্বতন্ত্র একখানি বৃহৎ পুরাণ ঐ মূর্তিরই গুণ-কীর্তন উদ্দেশে বিরচিত হইয়াছে।’– (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় : দ্বিতীয় ভাগ, পৃষ্ঠা-৮৯)
উল্লিখিত ঐ স্বতন্ত্র পুরাণটি হলো লিঙ্গপুরাণ। এই লিঙ্গপুরাণে দুই প্রকার শিবের বিষয় লিখিত আছে– অলিঙ্গ ও লিঙ্গ। যেমন–

জগদ্যোনি মহাভূতং স্থূলং সূক্ষ্মমজং বিভূম্ ।
বিগ্রহং জগতাং লিঙ্গং অলিঙ্গাদভবত্ স্বয়ম্ ।। (লিঙ্গপুরাণ তৃতীয় অধ্যায়)
অর্থাৎ : স্থূল, সূক্ষ্ম, জন্ম-রহিত ও সর্ব-ব্যাপী মহাভূত-স্বরূপ লিঙ্গ শিব জগতের কারণ ও বিশ্ব-রূপ। তিনি অলিঙ্গ-শিব হইতে উৎপন্ন হইয়াছেন।

অন্যদিকে বিদ্যেশ্বর সংহিতার মতে–

শিব একো ব্রহ্মরূপত্বান্নিষ্কলঃ পরিকীর্তিতঃ।
রূপিত্বাৎ সকল স্তদ্বৎ তস্মাৎ সকল নিষ্কলঃ।।
নিষ্কলত্বান্নিরাকারং লিঙ্গং তস্য সমাগতম্ ।
সকলত্বাৎ তথা রেবং সাকারং তস্য সঙ্গতম্ ।। (বিদ্যেশ্বর-সংহিতা)
অর্থাৎ : ব্রহ্ম যেমন নির্গুণ ও সগুণ দুই প্রকারই হন, তেমনি নিষ্কল শিব নিরাকার লিঙ্গরূপী এবং সগুণ শিব সাকার রূপধারী।

             উপরের এই উদ্ধৃতিতে স্পষ্টতই ব্রহ্মবাদী বেদান্ত ধারণারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়, তবু প্রজননমূলক বিশ্বাসাশ্রিত লিঙ্গ ধারণা যে বেদান্তের চেয়ে বহু বহু প্রাচীন ও প্রাগৈতিহাসিক সময়কালে নিহিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু প্রাচীন জনমানসে এই লিঙ্গের সাথে কখন কিভাবে কোথায় শিব নামক বেদবাহ্য এক বিপুল পূজ্য দেবতার ধারণার একাত্মতা ঘটেছে এবং কালে কালে দেবতামূর্তি ছাপিয়ে তাঁর প্রতীকী লিঙ্গমূর্তি রূপটাই এতো জনপ্রিয় ও বহুল পূজ্য হয়ে ওঠেছে সেটা নিশ্চয়ই গভীর অনুসন্ধানের বিষয়। কেননা ঐ লিঙ্গপুরাণের সপ্তদশ অধ্যায়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, মহাদেবের সৃজন-শক্তিই লিঙ্গ। যেমন–

প্রধানং লিঙ্গমাখ্যাতং লিঙ্গী চ পরমেশ্বরঃ। (লিঙ্গপুরাণ সপ্তদশ অধ্যায়)
অর্থাৎ : মহেশ্বর লিঙ্গী এবং তাঁহার প্রকৃতি অর্থাৎ সৃজন-শক্তি লিঙ্গ বলিয়া খ্যাত।

শিব ও লিঙ্গ 

লিঙ্গকে মহাপ্রতীক মেনে যাঁরা দেবতা শিবকে পরমেশ্বরজ্ঞানে উপাসনা করেন তাঁদেরকে বলা হয় শৈব। এই শৈবদের মধ্যেও তত্ত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি ও সাধনাচারের পার্থক্যপ্রসূত বিভিন্ন সম্প্রদায়ভেদ রয়েছে। রয়েছে ধ্যান-ধারণাগত পার্থক্য ও আচার-বিচারে বৈচিত্র্য। লিঙ্গায়েৎ শৈব সম্প্রদায়ের মতে লিঙ্গ নিষ্কল ব্রহ্মের প্রতীক। কোন কোন পন্ডিতের মতে, মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েই তাঁরা নাকি এরূপ লিঙ্গার্চনা শুরু করেন। তবে শৈব সম্প্রদায়গুলোর নিজেদের মধ্যকার তত্ত্বীয় অভিন্নতা হলো, এরা পরমেশ্বর শিবকেই সৃষ্টির আদিদেবতা বলে স্বীকার করেন এবং লিঙ্গকে তাঁরই সূক্ষ্ম প্রতীক হিসেবে গণ্য করেন। ‘লী’ ধাতুর অর্থ লয় পাওয়া এবং ‘গম’ ধাতুর অর্থ বহির্গত হওয়া। কৌলজ্ঞাননির্ণয়ে তাই বলা হয়েছে–

যস্যেচ্ছয়া ভবেৎ সৃষ্টির্লয়স্তত্রৈব গচ্ছতি।
তেন লিঙ্গন্তু বিখ্যাতং যত্র লীনং চরাচরম্ ।।’ (কৌলজ্ঞাননির্ণয়-৩/১০)
অর্থাৎ : যে পরম সত্তার থেকে জগতের উৎপত্তি হয় এবং যাঁর মধ্যে জগৎ লীন হয় সেই পরম কারণই লিঙ্গ।

স্কন্দপুরাণেও প্রায় একইরূপ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়–

আকাশং লিঙ্গমিত্যাহুঃ পৃথিবী তস্য পীঠিকা।
আলয়ঃ সর্বদেবানাং লয়নাল্লিঙ্গমুচ্যতে।।

শিবপুরাণের বায়বীয় সংহিতার মতে–

লিঙ্গঞ্চ শিবয়োর্দেহস্তাভ্যাং যস্মাদধিষ্টিতং। (বা. স. উত্তরভাগ- ২৭/১২)
অর্থাৎ : শিবশক্তি লিঙ্গেতে নিত্য অধিষ্ঠান করেন।

            লিঙ্গপুরাণ, শিবপুরাণ ও স্কন্দপুরাণেই শিব ও শিবলিঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত হওয়া যায়। পুরাণের স্বাভাবিক ধারা অনুসারে লিঙ্গপুরাণে বিভিন্ন প্রকার শিবমূর্তির বর্ণনা এলেও এবং সেই সব মূর্তির পূজাদির কথা বলা হলেও লিঙ্গার্চনার উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে বেশি। শিবের লিঙ্গমূর্তির পূজা না করার জন্যই যে তারকাসুরের ধ্বংস হয়েছিল সেকথা জানিয়ে পিতামহ ব্রহ্মা অতঃপর বলছেন–

পূজনীয়ঃ শিবো নিত্যং শ্রদ্ধয়া দেবপুঙ্গবৈঃ।
সর্বলিঙ্গময়ো লোকঃ সর্বং লিঙ্গে প্রতিষ্ঠিতম্ ।।
তস্মাত্সম্পূজয়েল্লিঙ্গং যইচ্ছেৎ সিদ্ধিমাত্মনঃ।
সর্বে লিঙ্গার্চনাদেব দেবাদৈত্যাশ্চদানবাঃ।।
যক্ষা বিদ্যাধরাঃ সিদ্ধা রাক্ষসাঃ পিশিতাশনাঃ।
পিতরো মুনয়শ্চাপি পিশাচাঃ কিন্নরাদয়ঃ।।
অর্চয়িত্বালিঙ্গমূর্তিং সংসিদ্ধানাত্র সংশয়ঃ।
তস্মাল্লিঙ্গং যজেন্নিত্যং যেনকেনাপিবা সুরাঃ।। (লিঙ্গপুরাণ-১/৭৩/৬-৯)
অর্থাৎ : যে নিজের অভিষ্ট সিদ্ধি করতে চায়, সে লিঙ্গ পূজা করবে। কারণ সমস্ত জগৎ লিঙ্গাধীন এবং লিঙ্গে সমগ্র জগৎ অধিষ্ঠিত। দেব, দৈত্য, দানব, যক্ষ, বিদ্যাধর, সিদ্ধ, রাক্ষস, পিতৃপুরুষগণ, মুনি, কিন্নর সকলেই লিঙ্গমূর্তি মহাদেবকে পূজো করে সিদ্ধ হবে। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

         লিঙ্গপুরাণে বিভিন্ন দেবতার বিভিন্ন প্রকার লিঙ্গার্চনের বিবরণ আছে। বলা হচ্ছে,– ব্রহ্মার আদেশে বিশ্বকর্মা স্বাধিকারানুসারে লিঙ্গ প্রস্তুত করে দেবতাদের দেন। বিষ্ণু ইন্দ্রনীলমণি নির্মিত লিঙ্গ পূজা করতে লাগলেন। ইন্দ্র পদ্মরাগের লিঙ্গ, কুবের সোনার লিঙ্গ, বিশ্বদেবগণ রজতলিঙ্গ, অষ্টবসু চন্দ্রকান্তমণির লিঙ্গ, বায়ু পিতলের, অশ্বিনীকুমার যুগল মাটির, বরুণ স্ফটিকের, দ্বাদশাদিত্য তামার, চন্দ্র মুক্তার, অনন্তাদি নাগেরা প্রবালের, দৈত্য ও রাক্ষসেরা লোহার, গুহ্যকেরা ত্রৈলোহিক, প্রমথেরা লোহার, চামুণ্ডাদি মাতৃগণ বালির, নিরুতি কাঠের, যম পান্নার, রুদ্রগণ ভস্মের, পিশাচেরা সীসার, লক্ষ্মী বৃক্ষের, কার্ত্তিক গোময়ের, শ্রেষ্ঠ মুনিরা কুশাগ্র নির্মিত, বামারা পুষ্পলিঙ্গ, মনোন্মনী গন্ধদ্রব্য নির্মিত লিঙ্গ, বাগদেবী রত্নময় লিঙ্গ, দুর্গা বেদিসমেত স্বর্ণলিঙ্গ পূজা করেন।

লিঙ্গপুরাণের মতোই শিবপুরাণের জ্ঞানসংহিতার পঞ্চবিংশ অধ্যায়ে প্রায় একই প্রকার কথা পাওয়া যায়, যেমন–

প্রস্তুতঞ্চৈব দৃষ্টঞ্চ সর্বং দৃষ্টান্তমদ্ভূতম্ ।
সন্ত্যজ্য দেবদেবেশং লিঙ্গমূর্তিং মহশ্বেরম্ ।।
তারপুত্রাস্তথৈতে বৈ নষ্টাস্তে চৈব বান্ধবাঃ।
ময়া চ বিমোহিতাস্তে বৈ মায়য়া দূরতঃ কৃতাঃ।।
সর্বে বিনষ্টাঃ প্রধ্বস্তাঃ শিবেন রহিতা যদা।
তস্মাৎ সদা পূজনীয়া লিঙ্গমূর্তিধরো হরঃ।।
যদি সুখং সুরেশাশ্চ বৈরন্তর্যং ভবেদিহ।
(পূজনীয়ঃ শিবো নিত্যং শ্রদ্ধয়া দেবপূঙ্গবৈঃ।।
সর্বলিঙ্গময়েঅদেবঃ সর্বলিঙ্গে প্রতিষ্ঠিতঃ।
তস্মাৎ সম্পূজয়েন্নিত্যং যদীচ্ছেৎ সিদ্ধিমাত্মনঃ।।
সর্বে লিঙ্গার্চনাদেব দেবা দৈত্যাশ্চ দানবাঃ।
বয়ষ্ণৈব তথা ব্রহ্মন্ কিমথং বিস্তৃতং ত্বয়া।।
অর্চয় ত্বং লিঙ্গমূর্তিং সংসিদ্ধেৎ নাত্র সংশয়ঃ।
তস্মাল্লিঙ্গেহর্চয়েন্নিত্যং যেন কেনাপি বৈ সুরাঃ।।)- (শিবপুরাণ/জ্ঞানসংহিতা-২৫ অ/২২-২৮)
অর্থাৎ : হে দেবগণ! সর্বদুঃখ নাশের জন্য শঙ্কর যে সেবনীয় তা তোমরা পূর্বে দেখেছো এবং এখনও দেখছো, তাহলে কেন আবার সেই কথা জিজ্ঞাসা করছো? এই বিষয়ে দেবেশ্বর মহাদেব আমার ও ব্রহ্মার কাছে বিশেষ রূপে বলেছেন। তোমরা দেখেছো যে তারক পুত্রগণ লিঙ্গমূর্তি মহাদেবকে অনাদর করে সবান্ধবে বিনষ্ট হয়েছে। আমি প্রথমতঃ তাদের মায়ায় মোহিত করে দূর করে দিলাম এবং পরে যখন তারা শিবকে অবজ্ঞা করতে লাগলো তখন সকলে বিনষ্ট হলো। অতএব হে সুরেশ্বরগণ! যদি সর্বদা সুখবাসনা থাকে, তাহলে সব সময় লিঙ্গমূর্তিধর মহাদেবকে পূজা করা উচিত। দুঃখ দূর করার জন্য দেবতাদেরও সর্বলিঙ্গে অন্তর্যামিরূপে প্রতিষ্ঠিত শিবকে পূজা করা উচিত। (বন্ধনীযুক্ত বাকি শ্লোকগুলির অর্থ পূর্বোক্ত লিঙ্গপুরাণ-১/৭৩/৬-৯ শ্লোকের অনুরূপ।)

এই শিবপুরাণেও লিঙ্গপুরাণ-১/৭৪/১ অংশের শ্লোকের অনুরূপ বক্তব্যে বলা হয়েছে যে–

লিঙ্গানি কল্পয়িত্বৈবঞ্চাধিকারানুরূপতঃ।
বিশ্বকর্মা দদৌ তেভ্যো নিয়োগাদ্ ব্রহ্মণঃ প্রভোঃ।। (জ্ঞানসংহিতা-২৫/৩৮)
অর্থাৎ : ব্রহ্মার আদেশে বিশ্বকর্মা স্বাধিকারানুসারে বিভিন্ন প্রকার লিঙ্গ নির্মাণ করেন ও দেবতাদের প্রদান করেন।

এই বিভিন্ন প্রকার লিঙ্গ প্রসঙ্গে লিঙ্গপুরাণের চুয়াত্তর অধ্যায়ে বিশদভাবে বর্ণিত আছে। যেমন–

ষট্-বিধং লিঙ্গমিত্যাহুর্দ্রব্যাণাঞ্চপ্রভেদতঃ।
তেষাং ভেদাশ্চতুর্যুক্তশ্চত্বারিংশদিতি স্মৃতাঃ।।
শৈলজং প্রথমং প্রোক্তং তদ্ধি সাক্ষাচ্চতুর্বিধম্ ।
দ্বিতীয়ং রত্নজং তচ্চ সপ্তধা মুনিসওমাঃ।।
তৃতীয়ং ধাতুজং লিঙ্গমষ্টধা পরমেষ্ঠিনঃ।
তুরীয়ং দারুজং লিঙ্গং তত্তু ষোড়শধোচ্যতে।।
মৃন্ময়ং পঞ্চমং লিঙ্গং দ্বিধা ভিন্নং দ্বিজোত্তমাঃ।
ষষ্ঠন্তু ক্ষণিকং লিঙ্গং সপ্তধা পরিকীর্ত্তিতম্ ।। (লিঙ্গপুরাণ-১/৭৪/১৩-১৬)
অর্থাৎ : দ্রব্য উপাদানভেদে লিঙ্গকে প্রথমত ছয় ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে এবং তাদের আবার চতুঃচত্বারিংশ বা চুয়াল্লিশ ভাগে বিভাগ করা হয়েছে। প্রথমে শৈলজালিঙ্গ বা প্রস্তরনির্মিত লিঙ্গ চার প্রকার, দ্বিতীয় রত্নজ লিঙ্গ সাত প্রকার, তৃতীয় ধাতুজ লিঙ্গ আট প্রকার, তারপর দারুজ বা কাষ্ঠনির্মিত লিঙ্গ ষোড়শ প্রকার, পঞ্চমে মৃন্ময় বা মৃত্তিকানির্মিত লিঙ্গ দুই প্রকার এবং ষষ্ঠত রঙ্গ বা রাং নির্মিত রিঙ্গ সাত প্রকার।

        বিভিন্ন প্রকার লিঙ্গের বিবরণ শাস্ত্রে শ্রুত হলেও এটাও বলা আছে যে সমস্ত প্রকার লিঙ্গের পূজনে একই ফল লাভ হয় না। যেমন–

শ্রীপ্রদাং রত্নজং লিঙ্গং শৈলজং সর্বসিদ্ধিদম্ ।
ধাতুজং ধনদং সাক্ষাদ্দারুজং ভোগসিদ্ধিদম্ ।।
মৃন্ময়ঞ্চৈব বিপ্রেন্দ্রাঃ সর্বসিদ্ধিকরং শুভম্ ।
শৈলজং চোত্তমং প্রোক্তং মধ্যমঞ্চৈব ধাতুজম্ ।। (লিঙ্গপুরাণ-১/৭৪/১৭-১৮)
অর্থাৎ : রত্ন নির্মিত লিঙ্গ পূজার দ্বারা শ্রীলাভ হয়, শৈলজ (প্রস্তর নির্মিত) লিঙ্গ সর্বসিদ্ধি দায়ক, ধাতুর দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ সাক্ষাৎ ধনদ, কাঠের দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ ভোগ ও সিদ্ধি দান করে, মৃন্ময় লিঙ্গ সর্বসিদ্ধিদায়ক ও শুভ। প্রস্তর দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ অতি উত্তম এবং ধাতুর দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ মধ্যম প্রকৃতির।

কেবল যে দ্রব্যের প্রকারগত ভিন্নতার কারণে লিঙ্গপূজা ভিন্ন ফলদায়ক হয় তাই নয়, লিঙ্গের আকৃতিগত ভিন্নতার কারণেও ফলভিন্নতা হতে পারে। যেমন লিঙ্গপুরাণ মতে–

বহুধা লিঙ্গভেদাশ্চ নব চৈব সমাসতঃ।
মূলে ব্রহ্মা তথা মধ্যে বিষ্ণুস্ত্রিভুবনেশ্বরঃ।।
রুদ্রোপরি মহাদেবঃ প্রণবাখ্যঃ সদা শিবঃ।
লিঙ্গবেদী মহাদেবী ত্রিগুণাত্রিময়াত্মিকা।।
তথা চ পূজয়েদ্যস্তু দেবী দেবশ্চ পূজিতৌ। (লিঙ্গপুরাণ-১/৭৪/১৯-২১)
অর্থাৎ : লিঙ্গের বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। লিঙ্গের মূলে বাস করেন ব্রহ্মা, মধ্যে বিষ্ণু ও উপরে ওঙ্কাররূপী মহাদেব রুদ্র। ত্রিগুণাত্মিকা মহাদেবী হলেন লিঙ্গবেদি। যে ব্যক্তি বেদি সমেত লিঙ্গ পূজা করে, তার সর্ব দেবদেবীর পূজা ফল লাভ হয়।

             উল্লেখ্য, বর্তমানে গৌরীপট্ট সংবলিত যে কৃত্রিম শিবলিঙ্গ দৃশ্যমান হয়, বেদবিহিত পৌরাণিক ব্যাখ্যায়– লিঙ্গের তিন ভাগের মধ্যে– শিবলিঙ্গে গৌরীপট্টের উপরের অংশকে রুদ্রভাগ বলে, মাঝের অংশ অর্থাৎ গৌরীপট্টের অঞ্চলকে বিষ্ণুভাগ এবং গৌরীপট্টের নিচের অংশকে ব্রহ্মভাগ বলে। কিন্তু সকল লিঙ্গে– বিশেষ করে প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্ট লিঙ্গে– এই গৌরীপট্ট দেখা যায় না।
শিবলিঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই গৌরীপীঠ বা গৌরীপট্টের কথা এসে যায়। শাক্তচিন্তা প্রসূত বেদবাহ্য ব্যাখ্যায় এই গৌরীপট্টকে যোনিও বলা হয়। যোনিমুদ্রার আকৃতিও গৌরীপট্টের মতো। লিঙ্গোপাসনাকে যাঁরা যৌন উপাসনা বলেন তাঁরা স্ত্রী ও পুং জননেন্দ্রিয়ের প্রতীক হিসেবেই যোনি ও লিঙ্গকে দেখাতে চান। প্রাণতোষিনী তন্ত্রের একটি বচনে বলা হয়েছে– লিঙ্গ ব্রহ্মস্বরূপ সাক্ষাৎ মহেশ্বর এবং যোনি জগন্ময়ী মহামায়া। নিরুত্তর তন্ত্রেও প্রায় একই কথা পাওয়া যায়–

লিঙ্গরূপো মহাকালো যোনিরূপা চ কালিকা।
অর্থাৎ : লিঙ্গরূপে স্বয়ং মহাকাল এবং যোনিরূপে দেবী কালিকা অধিষ্ঠিত।

এভাবে শিব ও শক্তির অভেদের কল্পনা করেই নারদ-পঞ্চরাত্রের একটি বচনে তাই দেখা যায়–

যত্র লিঙ্গস্তত্র যোনিযত্র যোনিস্ততঃ শিবঃ।
অর্থাৎ : যেখানে লিঙ্গ (শিব) সেখানেই যোনি (শক্তি), যেখানে যোনি সেখানেই শিব।

             লিঙ্গ যেহেতু পিতৃত্বের এবং যোনি মাতৃত্বের প্রতীক, তাই (গৌরীপট্ট সমন্বিত) লিঙ্গ একই সঙ্গে পিতামাতার প্রতীক। লিঙ্গপুরাণের উত্তরভাগেও (১১/৩১) আমরা এধরনের মতবাদের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই–

পীঠাকৃতিরুমাদেবী লিঙ্গরূপশ্চ শঙ্করঃ।
প্রতিষ্ঠাপ্য প্রযত্নেন পূজয়ন্তি সুরাসুরাঃ।।
অর্থাৎ : উমাদেবীকে লিঙ্গপীঠ রূপে এবং মহাদেব শঙ্করকে লিঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করে সমস্ত সুর ও অসুরেরা তার পূজা করে থাকেন।

              বেদপন্থীরা যে যোনিরূপ গৌরীপট্টের ব্যাখ্যা অন্যভাবে দিয়ে থাকেন, তা ইতঃপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রের ব্যাখ্যায় (ঋক-১/১০৪/১) সায়ণাচার্য্য যোনিকে যজ্ঞবেদী হিসেবে অর্থবাদ করেছেন। যেমন–

যোনিষ্ট ইন্দ্র নিষদে অকারি তমা নি ষীদ স্বানো নার্বা।
বিমুচ্যা বয়োহবসায়াশ্বান্দোষা বস্তোর্বহীয়সঃ প্রপিত্বে।। (ঋগ্বেদ-সংহিতা-১/১০৪/১)
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! তোমার বসবার (অবস্থানের) জন্য যে বেদি (যোনি) প্রস্তুত হয়েছে শব্দায়মান অশ্বের ন্যায় তথায় উপবেশন কর। অশ্ববন্ধন রশ্মিবিমোচন করে অশ্বদের মুক্ত করে দাও, সে অশ্ব যজ্ঞকাল সমাগত হলে দিন রাত তোমাকে বহন করে।

           পরবর্তী চিন্তায় সেই বেদীকে দক্ষতনয়া উমা গৌরীর সঙ্গে এক করে দেখা হয়েছে। এই যোনি বা বেদির উপর প্রজ্বলিত অগ্নি হলেন লিঙ্গ। মহাভারতকারও যে সমস্ত পুরুষের প্রতীক হিসাবে লিঙ্গকে এবং সমস্ত নারীর প্রতীক হিসেবে যোনিপীঠকে বিবেচনা করতেন, তা উপমন্যু কথিত শিবলিঙ্গ কথা থেকে বোঝা যায়। সেখানে বলা হয়েছে–

পুংলিঙ্গং সর্বমীশানং স্ত্রীলিঙ্গং বিদ্ধিচাপ্যুমাম্ ।
দ্বাভ্যাং তনুভ্যাং ব্যাপ্তং হি চরাচরমিদং জগৎ।। (মহাভারত-১৩/১৪/২৫৩)
অর্থাৎ : সমস্ত পুরুষ ঈশান এবং সমস্ত স্ত্রীমূর্তিই উমা। শিবশক্তির পুরুষ এবং স্ত্রী এই দুই তনুর দ্বারা জগৎ ব্যাপ্ত।

একই কথা শিবপুরাণের বায়বীয় সংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ে পাওয়া যায়। সেখানে ৫৫ শ্লোকে বলা হয়েছে–

শঙ্কর পুরুষাঃ সর্বে স্ত্রিয়ঃ সর্বা মহেশ্বরী।
সর্বে স্ত্রী-পুরুষাস্তস্মাৎ তয়োরেব বিভূতয়ঃ।।
অর্থাৎ : পুরুষ মাত্রেই সেই দেব-দেব শঙ্কর এবং স্ত্রীমাত্রেই দেবী শঙ্করী। সমস্ত স্ত্রী-পুরুষ সেই ভব-ভবানীর বিভূতি।

           শিব-শক্তির সম্পর্ক দেখাতে গিয়ে এখানে যেসব কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে যে তন্ত্রের বীজ রয়েছে তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না, এবং হয়তো পঞ্চম-মকারের কথাও এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ভগবতীর যোনিরূপ ধারণের কারণ সম্পর্কে পুরাণের আখ্যায়িকাটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। দেবী ভাগবতে এই আখ্যানের কথা যেমন আছে তেমনি শিবতত্ত্বপ্রদীপিকায় ‘শৈবে’ বলে উদ্ধৃত অংশে বিস্তৃতভাবে সেই আখ্যান পাওয়া যায়। ঐ আখ্যানে বলা হয়েছে (ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়)–
‘দারুকবনে শিবভক্ত ঋষিরা যখন ত্রিসন্ধ্যা শিবপূজা ও শিব আরাধনায় রত তখন তাদের ভক্তি পরীক্ষার জন্য শিব দিগম্বর মূর্তিতে নিজের লিঙ্গটি (পুং জননেন্দ্রিয়) ধারণ করে ঋষিপত্নীদের কাছে উপস্থিত হয়ে নানা রকম ভাবভঙ্গী দেখাতে লাগলেন। বিপ্র নারীরাও তাঁর সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করতে লাগলেন। এমন সময় ঋষিরা সমিধ আহরণের জন্য সেই বনে উপস্থিত হয়ে স্ত্রীদের এরূপ কাণ্ড দেখে উলঙ্গ পুরুষটির কাছে বার বার তার পরিচয় জানতে চাইলেন। পুরুষটি আত্ম-পরিচয় না দেওয়ায় ক্রোধোন্মত্ত হয়ে তাঁরা অভিশাপ দিলেন যে ‘তোমার লিঙ্গ ধরাতলে নিপতিত হোক’। অগ্নিতুল্য শিবলিঙ্গ ধরাতলে পতিত হয়ে সব ধ্বংস করল এবং তা স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল সর্বত্র ঘুরতে লাগল ও সবকিছু ধ্বংস করতে লাগল। তখন দেবতা ও ঋষিরা ভয় পেয়ে ব্রহ্মার কাছে গেলেন এবং সব ঘটনা জানালেন। ব্রহ্মা তখন দেবতাদের কাছ থেকে সব ঘটনা জানলেন এবং বললেন– যতক্ষণ না ঐ লিঙ্গ স্থির হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ত্রিজগতের মঙ্গল হবে না। এরপর তিনি ঋষিদের উপদেশ দিলেন গিরিজা দেবীর আরাধনার জন্য। যদি গিরিজা দেবী যোনিরূপ ধারণ করে ঐ লিঙ্গ ধারণ করেন তাহলেই কেবলমাত্র ঐ লিঙ্গ স্থির হবে। অষ্টদশ পদ্মের মণ্ডলে কিভাবে দেবীর আরাধনা করতে হবে তাও ব্রহ্মা উপদেশ দিলেন। পার্বতী যোনিরূপ ধারণের পর শিবলিঙ্গ তাতে আধারিত হল এবং জগৎ শান্তি পেল।’

            শিব সংক্রান্ত বিভিন্ন আখ্যানাদি বিভিন্ন পুরাণে ছড়িয়ে আছে। শৈব পুরাণগুলি শিবকেই প্রাধান্য দিতে চায় বলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রভৃতির মুখে শিবমাহাত্ম্য স্তুতি স্থাপন বসানো হয়েছে। আর সেখানে শিব মানেই শিবলিঙ্গের মাধ্যমে তার অবস্থিতিই প্রধান। তাছাড়া পঞ্চোপাসক সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই লিঙ্গপূজাকে জনপ্রিয় করার বিভিন্ন কায়দা শাস্ত্রকারেরা নিয়েছেন। এজন্য অর্থবাদের দ্বারা বলা হয়েছে যে–

লিঙ্গপূজাং বিনা দেবি! অন্য পূজাং করোতি যঃ।
বিফলা তস্য পূজাস্যাদন্তে নরকমাপ্নুয়াৎ।। (লিঙ্গার্চনতন্ত্র)
অর্থাৎ : লিঙ্গপূজা না করে অন্য দেবতার পূজা করলে সেই পূজা বিফল হবে এবং সেই পূজক অন্তে নরকে যাবে।

           সেই কারণেই ঐ তন্ত্রে শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়কেই বিল্বপত্রের দ্বারা লিঙ্গপূজা করে, তারপর অন্যপূজায় ব্রতী হতে বলা হয়েছে। কিন্তু লিঙ্গপূজা করতে বললেই পূজা হবে না, কেননা লিঙ্গের বহু প্রকারভেদ, পূজার মাহাত্ম্য ও প্রয়োজনীয় বিধি-নিষেধও রয়েছে। সেগুলো জানার প্রয়োজনও রয়েছে।

(চলবে…)

[×] [পরের পোস্ট : শিবলিঙ্গের প্রকারভেদ ও মাহাত্ম্য]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 345,314 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 113 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

মার্চ 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« ফেব্রু.   সেপ্টে. »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Error: Twitter did not respond. Please wait a few minutes and refresh this page.

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: