h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

তন্ত্র-সাধনা-১৭ : সমাজে তন্ত্রের প্রভাব

Posted on: 12/02/2018


12042906_599938180144240_5375375480413254287_n

তন্ত্র-সাধনা-১৭ : সমাজে তন্ত্রের প্রভাব
রণদীপম বসু

হিন্দুর ধর্মানুষ্ঠানের বিপুলতা প্রকাশ করতে যে প্রবাদ-বাক্যটি আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত, তা হলো– ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। অথচ স্ত্রী-আচার ব্যতীত এই অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে যা কিছু করা হয়, তাতে বৈদিক পদ্ধতির সংস্রব অত্যন্ত কম। তান্ত্রিক ও পৌরাণিক পূজাপদ্ধতির প্রচলনই হিন্দুসমাজে সমধিক। নিত্য উপাসনার ক্ষেত্রেও ভারতবর্ষের সর্বত্র তন্ত্রেরই আদর বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ প্রসঙ্গে শ্রী সুখময় শাস্ত্রী’র ভাষ্যে–
‘ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যগণ বৈদিক পদ্ধতিতে উপনীত হইয়াও পরে তান্ত্রিক দীক্ষা গ্রহণ করিয়া থাকেন। গায়ত্রীর উপাসনা অপেক্ষা তান্ত্রিক দীক্ষায় ইষ্টদেবতার উপাসনাতেই হিন্দুগণ বেশী সময় দিয়া থাকেন। ভয়-ভীতিতে গায়ত্রীর শরণ না লইয়া ইষ্টমন্ত্রকেই বেশী স্মরণ করেন।’
‘বিষ্ণুচক্রচ্ছিন্ন সতীদেহ একান্ন খণ্ডে বিভক্ত হইয়া বেলুচীস্থানের হিঙ্গুলাক্ষেত্র হইতে আসামের কামরূপ পর্যন্ত তান্ত্রিক পীঠস্থানে পরিণত হইয়াছে। একই দেবতা সমগ্র ভারতে পরিব্যাপ্ত হইয়া ভারতীয় হিন্দুর তান্ত্রিক উপাসনার প্রবৃত্তি জাগাইতেছেন।’- (তন্ত্রপরিচয়, পৃষ্ঠা-২০)

বৈদিক কিংবা তান্ত্রিক এই উভয় মতে মুক্তিই চরম উপায় বলে নির্দেশিত হয়। এ প্রেক্ষিতে রুদ্রযামলে বলা হয়েছে–

যদ্ বেদৈর্গম্যতে স্থানং তৎ তন্ত্রৈরপি গম্যতে।
অর্থাৎ : বৈদিক সাধনার শেষ লক্ষ্য এবং তান্ত্রিক সাধনার শেষ লক্ষ্য একই।

           তার মানে, পথ বিভিন্ন হলেও উভয়েরই গন্তব্য স্থল অভিন্ন। যেহেতু কলিকালে মানব স্বল্পায়ু এবং ভোগপ্রবণ, তাই কলিকালে তান্ত্রিক অনুষ্ঠানই প্রশস্ত বলে নির্দেশিত হয়েছে। কারণ শাস্ত্রে উপদিষ্ট হয়েছে–

কলৌ তন্ত্রোদিতা মন্ত্রাঃ সিদ্ধাস্তূর্ণফলপ্রদাঃ।- (মহানির্বাণ-তন্ত্র)
অর্থাৎ : তান্ত্রিক উপাসনায় শীঘ্র শীঘ্র ফল পাওয়া যায়।

          তবে কি উপাসনায় শীঘ্র শীঘ্র ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তন্ত্রকে অধিক আদরণীয় করেছে? প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ বিবেচনায় নিলে বিষয়টার ব্যাখ্যা এতোটা সরলীকরণ করে দেখার উপায় নেই বলেই মনে হয়। কেননা শাক্ত-সাধনার ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করলে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অসম্ভব নয় যে, কোন স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাচীন অনার্য ধ্যান-ধারণা ও উপাসনা-পদ্ধতির সাথে কালে কালে বিভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মিলন ও মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক রহস্যময় গূঢ় সাধন-পদ্ধতির পরিবর্তিত রূপ এই তন্ত্র-সাধনা। ফলে আদিম সংস্কৃতির নিজস্ব ফল্গু ধারা কোন জনগোষ্ঠীর অন্তপ্রবাহে সতত বহমান থেকে তাকে নিজস্ব মহিমায় উজ্জীবিত রাখবে এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে শুরু থেকে দীর্ঘকাল আর্যাবর্তের বাইরে থাকা অবাধ্য বাঙালি জাতির লোকায়তিক জীবনধারায় এই তান্ত্রিক প্রভাব যে তার সংস্কৃতিতে ছাপ রেখে যাবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই অনেকেই যে ধারণা করেন, তান্ত্রিক উপাসনা বঙ্গদেশেই প্রথম প্রচলিত হয়েছিলো, তা যৌক্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া একবাক্যে উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। এ বিষয়ে একটি প্রাচীন বচনের কথা জানা যায়,–

গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা মৈথিলে প্রকটীকৃতা।
ক্বচিৎ ক্বচিন্মহারাষ্ট্রে গুর্জরে প্রলয়ং গতা।।
অর্থাৎ : গৌড়ে বা বঙ্গে প্রথম প্রকাশিত বিদ্যা পরে মিথিলায় প্রকটিত হয়েছে এবং কালক্রমে মহারাষ্ট্রের কোন কোন স্থানে প্রচারিত হয়ে গুজরাটে বিলয়প্রাপ্ত হয়েছে।

           যে-কোনো প্রাচীন প্রবাদেরর সাথেই একটি ঐতিহাসিক মূল্য জড়িয়ে আছে। তাই এই প্রবাদ-বাক্যটিরও বিশেষ মূল্য রয়ে গেছে নিশ্চয়ই। কারণ, ভারতের সর্বত্রই তান্ত্রিক উপাসনার সমান সমাদর দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত জৈন-প্রভাবের ফলে ভক্তিশাস্ত্র ও তন্ত্রশাস্ত্র গুজরাটে প্রসার লাভ করেনি– এবং এ কারণেই গুজরাটের উপর এসব শাস্ত্রজ্ঞদের কিঞ্চিৎ বিরক্তির ভাব এই প্রবাদে প্রকাশ পাচ্ছে বলে শ্রী সুখময় শাস্ত্রীর ধারণা। তাঁর ভাষ্যে–
–‘দাক্ষিণাত্যেও কৌল সাধক অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তির আবির্ভাব হইয়াছে। বঙ্গদেশ ও কাশ্মীরে হয়তো এই বিদ্যার সমাদর একটু বেশী হইয়াছিল। বিশেষতঃ বঙ্গদেশে তান্ত্রিক গ্রন্থাদিও কিছু বেশী পাওয়া যায়। তন্ত্র-গ্রন্থ অনেকগুলি লুপ্ত এবং অমুদ্রিত থাকিলেও সারা ভারতেই এই শাস্ত্র এবং শাস্ত্রোপদিষ্ট উপাসনা-পদ্ধতি আদৃত হইতেছে। বৈদিক আচার অপেক্ষা বঙ্গ দেশে চিরকালই তান্ত্রিক আচারের প্রাধান্য। বাঙ্গালার প্রসিদ্ধ বংশগুলি এখনও তান্ত্রিক কোন সিদ্ধ পুরুষ বা আচার্যকেই পূর্বপুরুষ-রূপে পরিচয় দিয়া কৃতার্থতা বোধ করে। কুলবধূ তান্ত্রিক দীক্ষা গ্রহণ না করা পর্যন্ত পরিবারস্থ গুরুজন সেই বধূর পক্কান্ন গ্রহণ করেন না এবং দেবগৃহের কোনও কাজে সেই বধূ সহায়তা করিতে পারেন না– এরূপ উদাহরণ কামরূপ হইতে রাঢ়দেশ পর্যন্ত বহু সম্ভ্রান্ত পরিবারে দেখিতে পাওয়া যায়। পারিবারিক ধর্মকৃত্যে এবং উপাসনাদিতে অধিকার লাভের নিমিত্ত গুরু হইতে তান্ত্রিক দীক্ষা গ্রহণ করা অবশ্য-কর্তব্য বলিয়া তন্ত্রশাস্ত্রের আদেশ। আস্তিক-সম্প্রদায় এই আদেশকে মান্য করিয়া থাকেন। এইভাবে যে ধারাটি এখনও প্রবাহিত, তাহাকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করিবার অবকাশ কোথায়।’- (তন্ত্রপরিচয়, পৃষ্ঠা-২০)
তান্ত্রিক ক্রিয়াকাণ্ডের ফল প্রত্যক্ষসিদ্ধ বলে উপাসকগণ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে বলে থাকেন–

চিকিৎসিত-জ্যোতিষ-তন্ত্রবাদাঃ,
পদে পদে প্রত্যয়মাবহন্তি।
অর্থাৎ : চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতিষ এবং তন্ত্রের বচন প্রতি পদে প্রত্যক্ষ সত্য।

 

           আমাদের সাধারণ লৌকিক জনগোষ্ঠীতেও এই বিশ্বাস কতোটা প্রবল তার নমুনাও আমাদের অগোচর নয় এখনও। ঝাড়-ফুক, তাগা-তাবিজ, বান-বদ্যি, জ্যোতিষ-বিচারের সাথে প্রাত্যহিক জীবন-যাপনের অংশ হয়ে থাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রবল বিশ্বাস-নির্ভরতা থেকেই তা প্রত্যক্ষ করা যায়। বৌদ্ধ-তন্ত্রের সাথে হিন্দু-তন্ত্রের তাত্ত্বিক ধারণায় মৌলিক কোন তফাৎ না থাকলেও বৌদ্ধ-তন্ত্র প্রসঙ্গ ভিন্ন আলোচনার অবকাশ রাখে বিধায় বর্তমান আলোচনা হিন্দু তন্ত্র বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ইতঃপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাধন-প্রণালীতে তেমন মৌলিক কোন পার্থক্য না থাকলেও হিন্দু তন্ত্রের মধ্যেও শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি বিভাগ রয়েছে। তবে সংখ্যায় শাক্ত তন্ত্রই বেশি পাওয়া যায়। এই তন্ত্রসমূহের মধ্যে পরস্পর দ্বেষপূর্ণ উক্তি থাকলেও তার তাৎপর্য ভিন্ন। অর্থাৎ স্ব-সম্প্রদায়ের আচারে সবিশেষ শ্রদ্ধা আকর্ষণই সেসব অশ্রদ্ধামূলক উক্তির তাৎপর্য। শাস্ত্রে এই নিন্দা বলতে আসলে কী বোঝায় তার স্বরূপ প্রকাশ করতে গিয়ে বিখ্যাত মীমাংসক আচার্য শবরস্বামী সিদ্ধান্ত করেছেন–

ন হি নিন্দা নিন্দ্যং নিন্দিতুং প্রযুজ্যতে।
কিং তর্হি। নিন্দিতাদিতরৎ প্রশংসিতুম্ ।
তত্র ন নিন্দিতস্য প্রতিষেধো গম্যতে।
কিং তু ইতরস্য বিধিঃ।
অর্থাৎ : নিন্দ্য বিষয়কে নিন্দা করিবার নিমিত্ত নিন্দার প্রয়োগ করা হয় না, পরন্তু নিন্দিতাতিরিক্ত বিষয়কে অর্থাৎ বিধেয়কে প্রশংসা করিবার নিমিত্তই নিন্দার প্রয়োগ।

 

               দেশভেদে তান্ত্রিক আচার ও সাধনায় কিছু কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এ প্রেক্ষিতে শ্রী সুখময় শাস্ত্রী’র ভাষ্য অনুযায়ী–
–‘সমগ্র ভারতের হিন্দুসমাজেই এখন তান্ত্রিক সাধনা চলিতেছে– এইকথা একাধিকবার বলা হইয়াছে। দাক্ষিণাত্য ও মহারাষ্ট্রে বৈদিক যাগ-যজ্ঞ এখনও লুপ্ত হয় নাই এবং অনেক অগ্নিহোত্রী ব্রাহ্মণও আছেন, কিন্তু সেইসকল দেশেও তান্ত্রিক উপাসনারই প্রাধান্য। মহারাষ্ট্রে গণপতি ও সূর্যের উপাসকের সংখ্যা কম নহে। দক্ষিণ-ভারতের শাক্তদের মধ্যে অধিকাংশই শ্রীবিদ্যার উপাসক। সেখানে বৈষ্ণবের সংখ্যাধিক্য। শৈবও আছেন, কিন্তু বৈষ্ণবের তুলনায় সংখ্যায় কম।’
–‘উত্তর-ভারত ও পূর্ব-ভারতে শক্তি-উপাসনার বাহুল্য। উত্তর ভারতে কিছু কিছু শৈবও আছেন। বঙ্গদেশ ও আসামের হিন্দুসমাজে শাক্তের সংখ্যাই বেশী, বাকি প্রায় সকলই বৈষ্ণব। শ্রীমন্মহাপ্রভুর কৃপাতেই বৈষ্ণবের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিল। পরবর্তী কালে প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর প্রভাবেও বৈষ্ণবের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। বঙ্গীয় শাক্ত সম্প্রদায় কালী, তারা প্রমুখ দেবতাদের উপাসকই বেশী, শ্রীবিদ্যার উপাসক খুব কম। এই কারণে একমাত্র শ্রীতত্ত্ব-চিন্তামণি ব্যতীত বঙ্গদেশীয় তন্ত্রনিবন্ধেও মুখ্য কৌলাচারের বিধান বেশী পাওয়া যায় না। দাক্ষিণাত্য শাক্ত সম্প্রদায়ে শ্রীবিদ্যার পদ্ধতিই বেশী চলে। এই কারণে সেই অঞ্চলের নিবন্ধসমূহে মুখ্য কৌলাচারের উপদেশই বেশী। দাক্ষিণাত্যের কেরল-সম্প্রদায় এবং বাঙ্গালার গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রদায়গত ভেদও কিছু কিছু রহিয়াছে।’
–‘উভয় আচারে যদিও পঞ্চ-মকারের বিধান আছে, তথাপি বামাচার আর কৌলাচার এক নহে। বেদাচার-পরায়ণ দ্বিজাতির পক্ষে বামাচারের সাধন চলিতে পারে না, কিন্তু কৌলাচারে তাঁহাদেরও অধিকার আছে। বেদাচারভ্রষ্ট দ্বিজাতি বামাচারের দ্বারা কৌলাচারকে গ্রহণ করিতে পারিবেন। বামাচার শূদ্রাদির পক্ষেও বিহিত। দাক্ষিণাত্যে এখনও বৈদিক-মার্গাবলম্বী ব্রাহ্মণাদির সংখ্যা কম নহে। এইহেতু দাক্ষিণাত্যের বেদাচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণগণ বামাচারের পথে না গিয়াও দক্ষিণাচার হইতেই কৌলাচারকে অবলম্বন করিতেন। বঙ্গদেশের শাক্ত সাধকগণ বামাচারের দ্বারা কৌলমার্গ গ্রহণ করিতেন। সম্ভবতঃ এই কারণে দাক্ষিণাত্যের নিবন্ধগুলিতে অবিমিশ্র কৌলাচারের পদ্ধতি দেখিতে পাওয়া যায়। আর বঙ্গদেশের তন্ত্র-নিবন্ধগুলি বামাচার ও কৌলাচারের পদ্ধতিতে মিশ্রিত। বামাচারের ভিতর দিয়াই বাঙ্গালী তান্ত্রিক সাধকগণ কৌলাচারে প্রবেশ করিতেন বলিয়া তাঁহাদের নিবন্ধে বামাচার ও কৌলাচারের সীমারেখা নির্ণয় করা সুকঠিন। সকল দেশেই সাধকগণ নিজেদের আচার গোপন করিয়া থাকেন। এইহেতু বিশেষ জিজ্ঞাসু ভক্ত ব্যতীত অপর ব্যক্তি তাঁহাদের সন্ধান জানিতে পারে না। মন্ত্রে সিদ্ধি লাভ করার পর সাধক প্রকাশ্যেও অনেক কিছু অনুষ্ঠান করেন। সেই অবস্থায় আচার প্রকাশ করাও দোষের নহে। তিনি তখন নিন্দা-স্তুতির অনেক উর্ধ্বে অবস্থিত।’- (তন্ত্রপরিচয়, পৃষ্ঠা-৬৭)

            এখানে উল্লেখ্য, পুরশ্চর্যার্ণবের নবম তরঙ্গে সিদ্ধান্তসংগ্রহ-তন্ত্রের কতকগুলি বচন উদ্ধৃত হয়েছে। তা থেকে জানা যায়, প্রদেশ-ভেদে ভারতে তিনটি তান্ত্রিক সম্প্রদায় ছিল– গৌড়-সম্প্রদায়, কাশ্মীর-সম্প্রদায় ও কেরল-সম্প্রদায়। এদের মধ্যকার তান্ত্রিক আচার ও সাধন-প্রক্রিয়ার পার্থক্যগুলো শ্রী সুখময় শাস্ত্রী’র ভাষ্যে–
–‘গৌড়-সম্প্রদায়ে বামমার্গ সবিশেষ আদৃত। এই সম্প্রদায়ে পূজাদিতে পঞ্চ মকারের মুখ্য দ্রব্যই গৃহীত হইয়া থাকে। এই মতে পূজাতে নৈবেদ্য নিবেদনের পরে হোম এবং তাম্বুল নিবেদনের পরে বলি-দানের বিধান। এই সম্প্রদায় বাম হস্তে পূজা এবং দক্ষিণ হস্তে তর্পণ করেন। ইঁহারা স্বীয় হৃদয়ে দেবতার বিসর্জন করিয়া থাকেন।’
–‘কাশ্মীর-সম্প্রদায়ে পীঠার্চনের পরেই বলিদান এবং পঞ্চোপচার পূজার পরেই হোম করা হয়। এই সম্প্রদায় দক্ষিণ হস্তেই পূজা ও তর্পণ করেন। ইহাতে পঞ্চ মকারের অনুকল্প অর্থাৎ প্রতিনিহিত দ্রব্য গৃহীত হইয়া থাকে। ইঁহারা স্বকীয় সহস্রারে দেবতাকে বিসর্জন করেন।’
–‘কেরল-সম্প্রদায়ে পঞ্চ মকারের ভাবনা-মাত্র; কোন দ্রব্যের অপেক্ষা নাই। পূজার অন্তে বলিদান, দক্ষিণ হস্ত দ্বারা পূজন এবং বাম হস্ত দ্বারা তর্পণ। এই মতে সকল কর্মের সমাপ্তিতে হোম, আর স্ব-হৃদয়ে দেবতার বিসর্জন।’
‘উল্লিখিত বর্ণনা অনুসারে দেখা যাইতেছে, আজকাল বঙ্গদেশেও কেরল সম্প্রদায়ের রীতিই সমধিক অনুসৃত হইতেছে।’- (তন্ত্রপরিচয়, পৃষ্ঠা-৬৮)

          পরিশেষে এটা বলা বাহুল্য হবে না যে, হিন্দুধর্মে তন্ত্রের যে তাৎপর্যময় সুস্পষ্ট প্রভাব আনুষ্ঠানিকভাবে বহমান তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো হিন্দুধর্মের প্রচলিত মাতৃপূজা অনুষ্ঠান ও তার বিধি-প্রক্রিয়া। বৈদিক সংস্কৃতিতে পূজা অনুপস্থিত। দুর্গা কালী সরস্বতি লক্ষ্মী এইসব অনার্য ঐতিহ্যবাহী মাতৃপূজার বহিরঙ্গের ভেতরগত মন্ত্র-বিধি-প্রণালীর গোটা প্রক্রিয়া জুড়েই রয়েছে তন্ত্র ও তান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থার বিপুল প্রভাব। এছাড়া আউল-বাউল ফকির-সাধু-সন্ন্যাসী ধারা তথা বাঙালির পরবর্তীকালে সাধন-পরম্পরার মধ্যেও মিশে আছে তন্ত্রের বিপুল প্রভাব।

[আগের পোস্ট : তন্ত্রের জ্ঞানতত্ত্ব] [×]

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 322,536 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 111 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

ফেব্রুয়ারি 2018
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জানু.   মার্চ »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

| যোগ দর্শন-০৪ : অষ্টাঙ্গিক যো… প্রকাশনায় Jyotish Roy
| সাংখ্য দর্শন-০৫ : সাংখ্য তত্… প্রকাশনায় Biswajit Mitra
|প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ-১১ :… প্রকাশনায় Goutam jana
| যোগ দর্শন-০২ : যোগ মনস্তত্ত্… প্রকাশনায় Suman
| বেদান্তদর্শন-ব্রহ্মবেদান্ত-৩… প্রকাশনায় বিধান চন্দ্র মন্ডল

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: