h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

বৌদ্ধ তন্ত্র-০৬ : বৌদ্ধ-তন্ত্রের ক্রমবিকাশ

Posted on: 29/10/2017


12072828_600311953440196_2795977796601605091_n

বৌদ্ধ তন্ত্র-০৬ : বৌদ্ধ-তন্ত্রের ক্রমবিকাশ
রণদীপম বসু

মহাযান সাহিত্যে ধারণী বা রক্ষামূলক মন্ত্রশাস্ত্রের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণে,–
‘অল্পাক্ষরাপ্রজ্ঞাপারমিতার মতো রচনা এই মন্ত্রশাস্ত্রের প্রাথমিক রূপ। ধারণী নামক বিশেষ পরিভাষাটি গোড়ার দিকে অবশ্য খুবই ব্যাপক অর্থে প্রযুক্ত হত। প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রসমূহ ছাড়াও অন্যান্য মহাযান সূত্রও কখনও কখনও ধারণী বলে উল্লিখিত হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে ধারণী বলতে বিশেষ করে দেবীদের উদ্দেশে নানাপ্রকার সঙ্কটের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য ব্যবহৃত মন্ত্রাবলীকে বুঝিয়েছে। এই রকম একটি ধারণীর সঙ্কলনের নাম পঞ্চরক্ষা যার প্রথমটি পাপ, রোগ এবং অপরাপর অঘটনের প্রতিরোধ কল্পে মহাপ্রতিসরার উদ্দেশে, দ্বিতীয়টি ভূতপ্রেত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মহাসহস্রপ্রমর্দিনীর উদ্দেশে, তৃতীয়টি সর্পবিষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মহামায়ূরীর উদ্দেশে, চতুর্থটি প্রতিকূল গ্রহশান্তি, বন্য পশু ও বিষাক্ত কীটপতঙ্গ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মহাসীতবতীর উদ্দেশে এবং পঞ্চমটি রোগশান্তির জন্য মহামন্ত্রানুসারিণীর উদ্দেশে রচিত। তিব্বতী তাঞ্জুর ও কাঞ্জুর গ্রন্থমালায়, চৈনিক ত্রিপিটকে এবং মহাযানের উপর রচিত নানা গ্রন্থে এই রকম অসংখ্য ধারণীর পরিচয় পাওয়া যায়। এই মন্ত্রশাস্ত্র মন্ত্র নয় বা মন্ত্রযানের পথিকৃৎ যা অবলম্বনে বজ্রযান প্রমুখ তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম গড়ে ওঠে। বৌদ্ধ তন্ত্র চার প্রকার– ক্রিয়াতন্ত্র যেখানে মন্দির নির্মাণ, মূর্তিস্থাপন ও নানাপ্রকার অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে, চর্যাতন্ত্র যা সাধনার ব্যবহারিক দিক্গুলিকে প্রদর্শন করায়, যোগতন্ত্র যা যৌগিক নানা প্রক্রিয়া শিক্ষা দেয় এবং অনুত্তরযোগতন্ত্র যা উচ্চতর অতীন্দ্রিয়বাদের কথা বলে।’
‘বৌদ্ধ তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানমূলক সাহিত্যে সাধনা ও সিদ্ধি, মুদ্রা ও ধ্যান, পূজা ও দেবদেবীদের মূর্তিকল্পনা, বিভিন্ন ধরনের যোগ প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন লেখক রচিত এই ধরনের সাধনশাস্ত্রের একটি বিশেষ সঙ্কলন সাধনমালা নামে পরিচিত। একাদশ শতকে সঙ্কলিত এই গ্রন্থে ৩১২টি সাধন আছে, যেগুলির মধ্যে কিছু অশুদ্ধ সংস্কৃত গদ্যে রচিত এবং কিছু ছন্দে রচিত। কয়েকটি সাধন নাগার্জুনের নামে প্রচলিত যিনি অবশ্য মাধ্যমিক দর্শনের প্রবক্তা নাগার্জুনের থেকে ভিন্ন। কথিত আছে তিনি ভোটদেশ বা তিব্বত থেকে কিছু সাধন নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর রচিত কয়েকটি তান্ত্রিক গ্রন্থের উল্লেখ তিব্বতী তাঞ্জুর সংগ্রহে পাওয়া যায়। অপর একজন তান্ত্রিক আচার্য ইন্দ্রভূতি গৌতম সপ্তম-অষ্টম শতকে উড্ডিয়ানে রাজত্ব করতেন যিনি তিব্বতীয় লামাবর্গের প্রবক্তা পদ্মসম্ভবের পিতা ছিলেন। তাঁর রচিত জ্ঞানসিদ্ধি একটি বিশিষ্ট বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থ। ইন্দ্রভূতির সমকালীন ছিলেন পদ্মবজ্র যাঁর সন্ধ্যাভাষায় রচিত গুহ্যসিদ্ধি গ্রন্থে বজ্রযান বৌদ্ধমতের তত্ত্বসমূহ ব্যাখ্যাত হয়েছে। ইন্দ্রভূতির ভগিনী ছিলেন লক্ষ্মীঙ্করা যাঁর অদ্বয়সিদ্ধি গ্রন্থে পরবর্তীকালের সহজযানের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। আরও একজন তান্ত্রিক লেখিকা ছিলেন সহজযোগিনী চিন্তা যিনি অষ্টম শতকে আবির্ভূত হয়েছিলেন।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১০২-১০৩)

            এখানে উল্লেখ্য, তিব্বতে ভারতীয় বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহের অনুবাদের একটি বিপুল সংগ্রহ বর্তমান। এই সংগ্রহ দুই ভাগে বিভক্ত– কাঞ্জুর ও তাঞ্জুর। প্রথম সংগ্রহ অর্থাৎ কাঞ্জুরে আছে ১১০৮টি গ্রন্থ, বিষয়বস্তু অনুযায়ী যেগুলিকে বিনয়, প্রজ্ঞাপারমিতা, বুদ্ধাবতংসক, রত্নকূট, সূত্র, নির্বাণ ও তন্ত্র এই সাত ভাগে ভাগ করা হয়। আর দ্বিতীয় সংগ্রহ অর্থাৎ তাঞ্জুরে আছে ৩৪৫৮টি গ্রন্থ, বিষয়বস্তু অনুযায়ী যেগুলি তন্ত্র ও সূত্র এই দুই ভাগে বিভক্ত। একাদশ শতকে বিক্রমশিলা মহাবিহারের আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশকে তিব্বতে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং সেখানে তিনি বৌদ্ধধর্মকে নতুনভাবে প্রচার করেন।

         বস্তুত মহাযান মতের দর্শনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহারিক সাধন পরম্পরার বিবর্তনের মধ্য দিয়েই যে বৌদ্ধতন্ত্রের বিকাশ এ বিষয়ে বোধকরি কারও কোন দ্বিমত নেই। এ প্রেক্ষিতে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ভাষ্য হলো–
‘আদি বৌদ্ধ তন্ত্রসমূহের আকর কিন্তু মহাযান সূত্রসমূহের মধ্যে পাওয়া যায়। সপ্তম শতকে রচিত তথাগতগুহ্যক বা গুহ্যসমাজে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের পরিচয় পাই। এই গ্রন্থটিকে পূর্বোক্ত ইন্দ্রভূতি প্রামাণ্য বলে মনে করেছেন। শান্তিদেব তাঁর শিক্ষাসমুচ্চয় গ্রন্থে বহুবার তথাগতগুহ্যসূত্রের উল্লেখ করেছেন। যন্ত্র ও মন্ত্র নিয়ে বিশেষ আলোচনা ছাড়াও গুহ্যসমাজে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের ক্ষেত্রে মৈথুনতত্ত্বের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। অপর একটি তন্ত্র পঞ্চক্রম গুহ্যসমাজেরই সংক্ষিপ্তসার যেখানে যোগ, মন্ত্র, মণ্ডল ও উপলব্ধিতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। অপর একটি বিখ্যাত তান্ত্রিক গ্রন্থের নাম মঞ্জুশ্রীমূলকল্প, অন্য নাম মহাবৈপুল্যমহাযানসূত্র, যাতে মন্ত্র, মুদ্রা ও মণ্ডল তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। এই গ্রন্থটি ৯৮০-১০০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে চীনাভাষায় এবং একাদশ শতকে তিব্বতীয় ভাষায় অনূদিত হয়। একল্লবীর-চণ্ড-মহারোষণতন্ত্র একদিকে যেমন মহাযানমতে প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্বের ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসাবে প্রসিদ্ধ, অপর দিকে এটি যোগিনী উপাসনার উপর বিশেষ আলোকপাত করে। শাক্ত দেবীরা এখানে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। শ্রীচক্রসম্ভারতন্ত্রের তিব্বতী সংস্করণ কেবল পাওয়া যায় যেখানে প্রজ্ঞারূপিণী নারী এবং উপায়রূপ পুরুষের যৌনমিলন ইয়াব-ইউম বা যুগনদ্ধ নামে পরিচিত। অভয়কর গুপ্ত কর্তৃক একাদশ শতকে রচিত নিষ্পন্নযোগাবলী গ্রন্থে বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীদের ধ্যানমূর্তির বর্ণনা ছাড়াও ছাব্বিশটি মণ্ডল সম্পর্কেও নানা তথ্য আছে। অনঙ্গবজ্রের প্রজ্ঞোপায়বিনিশ্চয়সিদ্ধি গ্রন্থে তান্ত্রিক বৌদ্ধ দর্শন ও প্রজ্ঞাভিষেক প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। অপরাপর বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থের মধ্যে হেবজ্রতন্ত্র, অদ্বয়বজ্রসংগ্রহ ও সেকোদ্দেশটীকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১০৩)

         এখানে স্মর্তব্য যে, মহাযান বৌদ্ধধর্মকে অবলম্বন করে দুটি দার্শনিক মতবাদ গড়ে ওঠেছিলো– বিজ্ঞানবাদ বা যোগাচার এবং শূন্যবাদ বা মাধ্যমিক। যোগাচার মতে চৈতন্য বা বিজ্ঞান স্বয়ং ক্রিয়াশীল, সর্বস্রষ্টা এবং পরম সত্য, যার বাইরে কিছু নেই, বিজ্ঞান বা চৈতন্য ব্যতিরেকে কোনও বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব নেই। এ প্রেক্ষিতে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মন্তব্য হলো, পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে যে অদ্বৈত বেদান্ত বিশেষ প্রাধান্যলাভ করেছিল, তার অন্যতম উৎস এই বিজ্ঞানবাদ বা যোগাচার। বিজ্ঞানবাদীরা অস্তিত্বের মূল সত্তাসমূহকে সংস্কৃত এবং অসংস্কৃত, এই দুই ভাগে ভাগ করেন। এই সত্তাসমূহ রূপ বা বস্তু নয়, চিত্ত বা মানসজাত। যোগাচার মতে বাহ্যবস্তুর কোনও প্রকৃত অস্তিত্ব নেই, যেহেতু আমরা চৈতন্য ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমই পেতে পারি না যা জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের ভেদ করতে পারে।
‘এইভাবে যখন যোগাচার দর্শন সমস্ত বস্তুকেই মানসসঞ্জাত বলে ঘোষণা করে এবং পরিদৃশ্যমান সমস্ত কিছুকেই নিছক ধারণা বলেই খারিজ করে দেয় মাধ্যমিক দর্শন বা শূন্যবাদ আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে যে ওই চৈতন্যও অলীক। নাগার্জুন বলেন যে অভিজ্ঞতার জগৎ একটা দৃশ্যাভাস মাত্র, কয়েকটি অবোধ্য সম্পর্কের জালবুনানি। সংস্কৃত তথাকথিত অস্তিত্বের সত্তাসমূহ, যেগুলির সৃষ্টি-স্থিতি-লয় আছে বলে আমাদের ধারণা, আসলে শূন্য, কেন না সৃষ্টি-স্থিতি-লয় কোনও সত্তার মধ্যে একই সঙ্গে থাকতে পারে না। অস্তিত্ব বা অনস্তিত্বকে কোনও বস্তুর মূল সত্তা হিসাবে প্রমাণ করা যায় না। একটি বস্তু তার গুণাবলীর দ্বারাই পরিচিত, এবং সেই হিসাবেই আমরা মাটি, জল ইত্যাদি উপাদানগুলিকে বুঝি, কিন্তু গুণাবলী স্বয়ং অস্তিত্ববান হতে পারে না। চক্ষু ব্যতিরেকে রং নেই, কাজেই গুণাবলীর আপেক্ষিক অস্তিত্ব শূন্য অস্তিত্ব, এবং সেই কারণেই যে সকল বস্তুর মধ্যে সেগুলি অবস্থান করে বলে কল্পিত, সে সকল বস্তুর কোনও সত্যকারের অস্তিত্ব নেই। দ্রব্য এবং গুণ পরস্পরনির্ভর এবং দুটির কোনটিকেই বাস্তবতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা চলে না। পারমার্থিকভাবে দ্রব্য ও গুণ দুই-ই অলীক, কিন্তু আপেক্ষিকভাবে মনে হয় যেন তারা বর্তমান। কোনও কার্য নেই, কোনও কারণ নেই। একটি বস্তু নিজের থেকে সৃষ্ট হয় না, অপরের থেকেও নয়, আসলে সৃষ্টি বা উৎপাদন ব্যাপারটাই অসম্ভব। জগতের কোনও প্রকৃত অস্তিত্ব নেই, বস্তুসমূহ ক্ষণস্থায়ীও নয়, চিরন্তনও নয়, উৎপন্ন হয় না, বিলয়প্রাপ্তও হয় না, একও নয়, পৃথকও নয়। যা ক্রমিক কারণের দ্বারা উদ্ভূত, তা স্ব-উদ্ভূত নয়, কাজেই তার কোনও নিজস্ব অস্তিত্ব নেই।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১১২)

          কিন্তু সত্যানুসন্ধানী ঐতিহাসিক অনুমান হলো, বিজ্ঞানবাদ বা যোগাচার এবং শূন্যবাদ বা মাধ্যমিকের এসব জটিল দার্শনিক তত্ত্ব হয়তো স্বল্পসংখ্যক পণ্ডিতদের চর্চার মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো। কেননা, নীহাররঞ্জন রায়ের অভিমত হলো– ‘বৌদ্ধ জনসাধারণ শূন্যবাদ বা বিজ্ঞানবাদ, যোগাচার বা মাধ্যমিকদের গভীর পারমার্থিক তত্ত্ব ও সাধনমার্গের বিচিত্র স্তরের কিছুই বুঝিত না, বুঝিতে পারা সহজও ছিল না। তাঁহাদের পক্ষে যাদুশক্তিমূল মন্ত্র ও মণ্ডল, ধারণী ও বীজ অনেক বেশি সত্য ও সহজ বলিয়া ধরা দিল এবং ক্রমবর্ধমান ধর্ম-সমাজের জন্য এক শ্রেণীর বৌদ্ধ আচার্যরা মহাযানের নূতন ধ্যান-কল্পনা গড়িয়া তুলিবার দিকে মনোনিবেশ করিলেন। মন্ত্রই হইল তাঁহাদের মূল প্রেরণা এবং মন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ধারণী ও বীজ। ইহাদের রচিত নয়ই মন্ত্র-নয়, ইহাদের প্রদর্শিত যান বা পথই মন্ত্র-যান। এই মন্ত্রযানই মহাযানের বিবর্তনের প্রথম স্তর।’- (বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫২৬)

          বিবর্তনের দ্বিতীয় স্তরে বজ্রযান। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ভাষায়– ‘মহাযান বৌদ্ধধর্মে দুটি বিশিষ্ট সাধনপদ্ধতির উদ্ভব হয়– মন্ত্রযান ও পারমিতাযান। মন্ত্রযান হল তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের প্রাথমিক পর্যায় যেখানে মন্ত্র, ধারণী, মুদ্রা, মণ্ডল, অভিষেক প্রভৃতির প্রাধান্য বর্তমান। বজ্রযান মন্ত্রযানেরই বিবর্তিত রূপ যেখানে শূন্যতার স্থানে বজ্র শব্দটির ব্যবহার হয়। বজ্র বলতে বোঝায় আত্ম ও ধর্মসমূহের, অর্থাৎ অস্তিত্বের মূল সত্তাসমূহের, অপরিবর্তনীয় শূন্য প্রকৃতি। এখানে পরম সত্য হলেন বজ্রসত্ত্ব বা বজ্রধর যিনি বোধিচিত্তের সঙ্গে অভিন্ন এবং শূন্যতা ও করুণার অদ্বয় অবস্থার প্রতীক। তিনিই আদিবুদ্ধ যাঁর থেকে পঞ্চস্কন্ধের (রূপ, বেদনা, সংস্কার, সংজ্ঞা, বিজ্ঞান) প্রতীক পাঁচজন ধ্যানীবুদ্ধের উদ্ভব হয়েছে যাঁরা হলেন বৈরোচন, রত্নসম্ভব, অমিতাভ, অমোঘসিদ্ধি ও অক্ষোভ্য। এঁদের প্রত্যেকেরই সঙ্গিনী হিসাবে একজন করে শক্তি আছেন যাঁরা হলেন বজ্রধাত্বীশ্বরী, লোচনা, মামকা, পাণ্ডরা ও আর্য তারা। প্রত্যেকের পুত্র হিসাবে একজন করে বোধিসত্ত্ব এবং একজন করে মানুষী বুদ্ধ আছেন। বজ্রসত্ত্বের সঙ্গিনী হচ্ছেন বজ্রসত্ত্বাত্মিকা, যিনি বজ্রবারাহী, প্রজ্ঞাপারমিতা প্রভৃতি নামেও পরিচিত। তাঁকে পূজা বা ধ্যান করতে হয় তাঁর শক্তি বা প্রজ্ঞার সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ অথবা যৌনমিলিত অবস্থায়, যা যুগনদ্ধ বা অদ্বয়ের আদর্শের প্রতীক।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১১৪)

          বজ্রযান সম্পর্কে অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় বলেন,– ‘বজ্রযানের ধ্যান-কল্পনা গভীর ও জটিল। বজ্রযানীদের মতে নির্বাণের পর তিন অবস্থা : শূন্য, বিজ্ঞান ও মহাসুখ। শূন্যতত্ত্বের সৃষ্টিকর্তা নাগার্জুন; তাঁহার মতে দুঃখ, কর্ম, কর্মফল, সংসার সমস্তই শূন্য, শূন্যতার এই পরম জ্ঞানই নির্বাণ। বজ্রযানীরা এই নির্বিকল্প জ্ঞানের নামকরণ করিলেন নিরাত্মা; বলিলেন, জীবের আত্মা নির্বাণ লাভ করিলে এই নিরাত্মাতেই বিলীন হয়। নিরাত্মা কল্পিতা হইলেন দেবীরূপে এবং বলা হইল, বোধিচিত্ত যখন নিরাত্মার আলিঙ্গনবদ্ধ হইয়া নিরাত্মাতেই বিলীন হন তখনই উৎপত্তি হয় মহাসুখের। বোধিচিত্তের অর্থ হইতেছে চিত্তের এক বিশেষ বৃত্তি বা অবস্থা যাহাতে সম্যক জ্ঞান বা বোধিলাভের সংকল্প বর্তমান। বজ্রযানীরা বলেন, মৈথুনযোগে চিত্তের যে পরম আনন্দময় ভাব, যে এককেন্দ্রিক ধ্যান তাহাই বোধিচিত্ত। এই বোধিচিত্তই বজ্র, কারণ কঠোর যোগসাধনার ফলে ইন্দ্রিয়শক্তি সম্পূর্ণ দমিত চিত্ত বজ্রের মতো দৃঢ় ও কঠিন হয়। বোধিচিত্তের বজ্রভাব লাভ ঘটিলে তবে বোধিজ্ঞান লাভ হয়। চিত্তের এই বজ্রভাবকে আশ্রয় করিয়া সাধনার যে পথ তাহাই বজ্রযান। ইন্দ্রিয়শক্তিকে, কামনা-বাসনাকে সম্পূর্ণ দমিত করিবার কথা এই মাত্র বলা হইল। বজ্রযানীরা বলেন, ইন্দ্রিয় দমন করিতে হইলে আগে সেগুলিকে জাগরিত করিতে হয়; মিথুন সেই জাগরণের উপায়। মিথুনজাত আনন্দকে অর্থাৎ বোধিচিত্তকে স্থায়ী করা যায় মন্ত্রশক্তির সাহায্যে এবং সেই অবস্থাতেই ইন্দ্রিয়শক্তি দমিত হয়। সাধকের সাধনার শক্তিতে মন্ত্র বা ধ্যান অর্থাৎ তাহার ধ্বনি রূপমূর্তি লাভ করে; এই রূপমূর্তিরাই বিভিন্ন দেবদেবী। মিথুনাবস্থার আনন্দোদ্ভূত বিভিন্ন দেবদেবী সাধকের মনশ্চক্ষুর সম্মুখে নিজ নিজ স্থানে আসিয়া অধিষ্ঠিত হইয়া এক একটি মণ্ডল সৃষ্টি করেন। এই মণ্ডলের নিঃশব্দ ধ্যান করিতে করিতেই বোধিচিত্ত স্থায়ী ও স্থির হইয়া বজ্রের মতো কঠিন হয় এবং ক্রমে বোধিজ্ঞান লাভ ঘটে। বলা বাহুল্য, অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই বজ্রযানের এই সমস্ত সাধন-পদ্ধতিটাই অত্যন্ত গুহ্য এবং যে-ভাষায় ও শব্দে এই পদ্ধতি ব্যাখ্যাত হয় তাহাও গুহ্য। গুরুদীক্ষিত-সাধক ছাড়া সে শব্দ ও ভাষার গূঢ়ার্থ আর কেহ বুঝিতে পারেন না এবং গুরুর নির্দেশ ও উপদেশ ছাড়া আর কাহারও পক্ষে এই সাধন-পদ্ধতি অনুসরণ করাও প্রায় অসম্ভব বলিলেই চলে। বজ্রযানে গুরু অপরিহার্য। বজ্রযানে প্রজ্ঞার সার যে বোধিচিত্ত, ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের ভাষায় তাহাই শক্তি।’- (বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫২৭)

           আনুমানিক দশম শতকে বজ্রযানেরই আরেক সাধনপন্থা হিসেবে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের আর একটি শাখা গড়ে ওঠে যা কালচক্রযান নামে পরিচিত। এই সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা হলেন শ্রীকালচক্র। এখানে কাল শব্দটির অর্থ প্রজ্ঞা বা শূন্য অস্তিত্ব এবং চক্র হচ্ছে জাগতিক পদ্ধতি বা উপায়। অতএব কালচক্র হলো প্রজ্ঞা ও উপায়ের অদ্বয়াবস্থা এবং সেই সঙ্গে বোধিচিত্ত এবং বজ্রসত্ত্ব তথা আদিবুদ্ধের সঙ্গে এক ও অভিন্ন। এ প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন,– ‘কালচক্রযানে অনেক ভয়ঙ্কর ধরনের দেবদেবী বর্তমান যাঁদের মন্ত্র, মণ্ডল ও বলিদানের দ্বারা তৃপ্ত করতে হয়। প্রজ্ঞা ছাড়াও কাল সময়ের দ্যোতক যার বিভাগ প্রাণবায়ুর দ্বারা সম্ভব হয় এবং যা স্নায়ুচক্রের মধ্যে বিস্তৃত থাকে। যোগাভ্যাসের দ্বারা এই প্রাণবায়ুকে সংযত করতে পারলে মানুষও সময়ের চক্রকে এড়াতে পারবে, ফলে তার সকল দুঃখের অবসান ঘটবে। কালচক্রযান বঙ্গদেশ, মগধ, কাশ্মীর ও নেপালে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।’
অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের বর্ণনায়– ‘কালচক্রযানীদের মতে শূন্যতা ও কালচক্র এক এবং অভিন্ন। ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ লইয়া অবিরাম প্রবহমান কালস্রোত চক্রাকারে ঘূর্ণ্যমান। এই কালচক্র সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ; এই কালচক্রই আদিবুদ্ধ ও সকল বুদ্ধের জন্মদাতা। কালচক্র প্রজ্ঞার সঙ্গে মিলিত হইয়া এই জন্মদান কার্যটি সম্পন্ন করেন। কালচক্রযানীদের উদ্দেশ্যই হইতেছে কালচক্রের এই অবিরাম গতিকে নিরস্ত করা অর্থাৎ নিজেদের সেই কাল-প্রভাবের ঊর্ধ্বে উন্নীত করা। কিন্তু কালকে নিরস্ত করা যায় কিরূপে? কালের গতির লক্ষণ হইতেছে একের পর এক কার্যের মালা; কার্যপরম্পরা অর্থাৎ গতির বিবর্তন দেখিয়াই আমরা কালের ধারণায় উপনীত হই। ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই কার্যপরম্পরা মূলত প্রাণক্রিয়ার পরম্পরা ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই, প্রাণক্রিয়াকে নিরুদ্ধ করিতে পারিলেই কালকে নিরস্ত করা যায়। কালচক্রযানীরা বলেন, যোগসাধনার বলে দেহাভ্যন্তরস্থ নাড়ী ও নাড়ীকেন্দ্রগুলিকে আয়ত্ত করিতে পারিলেই পঞ্চবায়ুকে আয়ত্ত করিতে পারিলেই প্রাণক্রিয়া নিরুদ্ধ করা যায় এবং তাহাতেই কাল নিরস্ত হয়। কাল নিরস্ত করাই যেখানে উদ্দেশ্য, সেখানে কালচক্রযানীদের সাধন-পদ্ধতিতে তিথি, বার, নক্ষত্র, রাশি, যোগ প্রভৃতি একটা বড় স্থান অধিকার করিয়া থাকিবে ইহা কিছু বিচিত্র নয় ! এই জন্যই কালচক্রযানীদের মধ্যে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার প্রচলন ছিল খুব বেশি। তিব্বতী ঐতিহ্যানুসারে কালচক্রযানের উদ্ভব ভারতবর্ষের বাহিরে, সম্ভল নামক কোনো স্থানে। পাল-পর্বের কোনও সময়ে নাকি তাহা বাঙলাদেশে প্রবেশ লাভ করে। প্রসিদ্ধ কালচক্রযানী অভয়াকরগুপ্ত এই মতবাদ সম্বন্ধে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ছিলেন রামপালের সমসাময়িক।’- (বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫২৯)

         বজ্রযান গুহ্য সাধনারই সূক্ষ্মতর স্তর সহজযান নামে খ্যাত। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বর্ণনায়– ‘সহজযান বঙ্গদেশসহ উত্তর ভারতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। সহজযানী বৌদ্ধগণ মনে করেন সত্যোপলব্ধি একটা অন্তর্দর্শনের ব্যাপার, এই জন্য সহজ অর্থাৎ স্বাভাবিক পথ গ্রহণ করার দরকার। এই সহজ পথ হল বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতির অনুবর্তী হওয়া। যা নেই দেহভাণ্ডে তা নেই ব্রহ্মাণ্ডে, অতএব দেহই সকল সাধনার উৎস, লক্ষ্য ও মাধ্যম। যৌগিক পদ্ধতিতে কায়সাধনা, নাভিমূলে অবস্থিত নির্মাণচক্রের নারীশক্তিকে জাগিয়ে তোলা, প্রভৃতি সহজযানী মার্গ। সহজিয়া সম্প্রদায়ের রচিত চর্যাপদ ও দোহাসমূহে তাদের সাধনপদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গী বর্ণিত হয়েছে। বজ্রযানীদের মত সহজযানীরাও যুগনদ্ধে বিশ্বাসী। সাধক স্বয়ং বুদ্ধ এবং তাঁর সঙ্গিনী বুদ্ধের শক্তি, উভয়ের মিলনেই পূর্ণজ্ঞান ও মহাসুখ। সহজযানের বিকাশ শুধু বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই হয়নি, বৈষ্ণবদের মধ্যেও এই মার্গের বিকাশ ঘটেছিল।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১১৫)
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় বলেন,– ‘বজ্রযানে মন্ত্রের মূর্তি রূপের ছড়াছড়ি সুতরাং তাহার দেবায়তনও সুপ্রশস্ত; মন্ত্র-মুদ্রা-পূজা-আচার-অনুষ্ঠানে বজ্রযানের সাধনমার্গ আকীর্ণ। সহজযানে দেবদেবীর স্বীকৃতি যেমন নাই, তেমনই নাই মন্ত্র-মুদ্রা-পূজা-আচার-অনুষ্ঠানের স্বীকৃতি। সহজযানীরা বলেন, কাঠ, মাটি বা পাথরের তৈরি দেবদেবীর কাছে প্রণত হওয়া বৃথা। বাহ্যানুষ্ঠানের কোনো মূল্যই তাঁহাদের কাছে ছিল না। ব্রাহ্মণদের নিন্দা তো তাঁহারা করিতেনই; যে-সব বৌদ্ধ মন্ত্রজপ, পূজার্চনা, কৃচ্ছ্রসাধন প্রব্রজ্যা ইত্যাদি করিতেন তাঁহাদেরও নিন্দা করিতেন; বলিতেন সিদ্ধিলাভ, বৌদ্ধত্বলাভ তাঁহাদের ঘটে না। সহজযানী সিদ্ধাচার্যদের ধ্যান-ধারণা ও মতবাদ দোহাকোষের অনেকগুলি দোহায় স্পষ্ট ধরা পড়িয়াছে।’- (বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫২৭)
এক্ষেত্রে তিনি দোহাকোষ থেকে সহজযানের দৃষ্টান্তমূলক দু’টি দোহা’র নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন–

কিং তো দীবে কিং তো নিবেজ্জঁ
কিং তো কিজ্জই মন্তহ সেব্বঁ।
কিং তো তিত্থ তপোবন জাই
মোক্খ কি লব্ ভই পানী হ্নাই।।
অর্থাৎ : কী (হইবে) তোর দীপে, কী (হইবে) তোর নৈবেদ্যে, কী করা হইবে তোর মন্ত্রের সেবায়, কী তোর (হইবে) তীর্থ-তপোবনে যাইয়া ! জলে নাহিলেই কি মোক্ষ লাভ হয় ?

এস জপহোমে মণ্ডল কম্মে
অনুদিন আচ্ছসি বাহিউ ধম্মে।
তো বিনু তরুণি নিরন্তর ণেহে
বোধি কি লব্ ভই প্রণ বি দেহেঁ।
অর্থাৎ : এই জপ-হোম-মণ্ডল কর্ম লইয়া অনুদিন বাহ্যধর্মে (লিপ্ত) আছিস্ । তোর নিরন্তর স্নেহ বিনা, হে তরুণি, এই দেহে কি বোধিলাভ হয় ?

 

         ‘সহজযানী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের গূঢ় সাধন-পদ্ধতি ও ধ্যান-ধারণার সূক্ষ্ম গভীর পরিচয় দোহাকোষের দোহা এবং চর্যাগীতির গীতগুলিতে বিধৃত হইয়া আছে। সহজযানীরা বলেন, বোধি বা পরমজ্ঞান লাভের খবর অন্য সাধারণ লোকের তো দূরের কথা, বুদ্ধদেবও জানিতেন না– বুদ্ধোহপি ন তথা বেত্তি যথায়মিতরো নরঃ। ঐতিহাসিক বা লৌকিক বুদ্ধের স্থানই বা কোথায় ? সকলেই তো বুদ্ধত্ব লাভের অধিকারী এবং এই বুদ্ধত্বের অধিষ্ঠান দেহের মধ্যে– দেহস্থিতং বুদ্ধত্ব ; দেহহি বুদ্ধ বসন্ত ণ জাণই। কোথায় কতদূরে গেলে শূন্যতাবাদ, কতদূরে সরিয়া গেল বিজ্ঞানবাদ। জাগিয়া রহিল শুধু দেহবাদ, শুধু কায়সাধন। সহজিয়াদের মতে শূন্যতা হইল প্রকৃতি, করুণা হইল পুরুষ ; শূন্যতা ও করুণা অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনে, অর্থাৎ নারী ও নরের মিথুন-মিলনযোগে বোধিচিত্তের যে পরমানন্দময় অবস্থার সৃষ্টি লাভ হয় তাহাই মহাসুখ। এই মহাসুখই ধ্রুবসত্য ; এই ধ্রুবসত্যের উপলব্ধি ঘটিলে ইন্দ্রিয়গ্রাম বিলুপ্ত হইয়া যায়, সংসারজ্ঞান তিরোহিত হয়, আত্মপরভেদ লোপ পায়, সংস্কার বিনষ্ট হয়। ইহাই সহজ অবস্থা। রাজা হরিকালদেব রণবঙ্কমল্লের ত্রয়োদশ শতকীয় একটি লিপিতে দেখিতেছি, জনৈক প্রধান রাজকর্মচারী পট্টিকেরক নগরীতে সহজধর্মকর্মে লিপ্ত ছিলেন।’- (নীহাররঞ্জন রায়/ বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, পৃষ্ঠা-৫২৮)

            কায়সাধক সহজযানীরা নিঃসন্দেহে বেদ-বিরোধী ছিলেন, কিন্তু তাঁরা যে বেদ-আগমের কথা বলেছেন তা শুধু বেদ বা আগম মাত্র নয়, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রামাণিক শাস্ত্র মাত্রই তাঁদের দৃষ্টিতে বেদ, আগম প্রভৃতি। এককালের আর্যাবর্তের বাইরের বাঙলায় যে কোনকালেই যথার্থ বেদচর্চা, বৈদিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি খুব বেশি প্রচলিত ছিল না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেন-বর্মণ আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার যখন খুব বেশি, তখনও হলায়ুধ, জীমূতবাহন প্রভৃতি স্মৃতিকারেরা বেদচর্চার অবহেলা দেখে দুঃখ প্রকাশ করতেন বলে নীহাররঞ্জন রায় মন্তব্য করেন। তবু প্রধানত পশ্চিমাগত ক্রিয়াত্বিত ব্রাহ্মণদেরই সাহায্যে ও প্রেরণায় উচ্চকোটির বর্ণ-হিন্দুরা যে কিছু কিছু যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান, বেদপাঠ ইত্যাদি করাতেন, তাঁদের লক্ষ্য করে দোহাকোষে সিদ্ধাচার্য সরহপাদ বলেছেন–

বহ্মণো হি ম জানন্ত হি ভেউ।
এবই পড়িঅউ এ চ্চউ বেউ।।
মট্টী (পাণী) কুস লই পড়ন্ত।
ঘরহিঁ [বইসী] অগ্গি হুণন্তঁ।।
কজ্জে বিরহিঅ হুঅবহ হোমেঁ।
অক্খি উহাবিঅ কুড় এ ধুমের্ঁ।।
অর্থাৎ : ব্রাহ্মণেরা তো যথার্থ ভেদ জানে না; চতুর্বেদ এই ভাবেই পড়া হয়। তাঁহারা মাটি, জল, কুশ লইয়া (মন্ত্র) পড়ে, ঘরে বসিয়া আগুনে আহুতি দেয়; কার্যবিরহিত (অর্থাৎ ফলহীন) অগ্নিহোমের কটু ধোঁয়ায় চোখ শুধু পীড়িত হয়।

আবার দণ্ডী সন্ন্যাদীদের সম্বন্ধে সরহপাদ অন্যত্র বলছেন–

একদণ্ডী ত্রিদণ্ডী ভঅবঁবেসেঁ।
বিণুআ হোই হংহউএসেঁ।।
মিচ্ছেহিঁ জগে বাহিঅ ভুল্লে।
ধম্মাধম্ম ণ জানিঅ তুল্লে।।
অর্থাৎ : একদণ্ডী ত্রিদণ্ডী প্রভৃতি ভগবানের বেশে (সকলেই) ঘুরিয়া বেড়ায়; হংসের উপদেশে জ্ঞানী হয়। মিথ্যাই জগৎ ভুলে বহিয়া চলে; তাহারা ধর্মাধর্ম তুল্যরূপেই জানে না (অর্থাৎ ধর্মাধর্মের মূল্য তাহাদের কাছে সমান)।

 

          দোহাকোষে শাস্ত্রজ্ঞ ও শাস্ত্রাভিমানী এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর প্রভৃতি দেবপূজক ব্রাহ্মণদের প্রচুর উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে সহজযানী সিদ্ধাচার্যেরা তাঁদের শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন না। যেমন–

জাহের বাণচিহ্ন রুব ণ জানী।
সে কোইসে আগম বেএঁ বখাণী।।
অর্থাৎ : যাঁহার বর্ণ, চিহ্ন ও রূপ কিছুই জানা যায় না, তাহা আগমে বেদে কিরূপে ব্যাখ্যাত হইবে?

        সমসাময়িক অন্যান্য ধর্মের মধ্যে থেরবাদী, মহাযানী, কালচক্রযানী ও বজ্রযানী বৌদ্ধধর্ম, দিগম্বর জৈনধর্ম, কাপালিকধর্ম, রসসিদ্ধ তথা নাথসিদ্ধ ধর্ম প্রভৃতি কিছু কিছু উল্লেখ সহজযানীদের চর্যাগীতি ও দোহাকোষে পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁদের প্রতি সহজযাীরা শ্রদ্ধিত ছিলেন বলে মনে হয় না। যেমন চর্যাগীতিতে মহাযানীদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে–

সঅল সমাহিঅ কাহি করি অই।
সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরি অই।।
অর্থাৎ : সরল (ধ্যান) সমাধি দ্বারা কী করিবে? সুখ দুঃখের হাত হইতে তাহাতে মুক্তি পাওয়া যায় না।

মহাযানী-বজ্রযানী-কালচক্রযানী প্রভৃতিদের সম্বন্ধে দোহাকোষে আছে–

অণ্ন তহি মহাজাণহিঁ ধাবই।
তহিঁ সুতন্তু তক্কসত্থ হই।।
কোই মণ্ডলচক্ক ভাবই।
অন্ন চউত্থতত্ত দীসই।।
অর্থাৎ : অন্যেরা ধাবিত হইতেছে মহাযানের দিকে, সেখানে আছে সূত্রান্ত ও তর্কশাস্ত্র। কেহ কেহ ভাবিতেছে মণ্ডল ও চক্র; দিশা দিতেছে চতুর্থ তত্ত্বে।

আবার জৈন-সন্ন্যাসীদের সম্বন্ধে দোহাকোষে সরহপাদ বলছেন–

দীহণক্খ জই মলিণেঁ বেসেঁ।
ণগ্গল হোই উপাড়ি অ কেসেঁ।।
খবণেহি জাণ বিড়ংবিঅ বেসেঁ।
অপ্পণ বাহিঅ মোক্খ উবেসেঁ।।
অর্থাৎ : দীর্ঘনখ যোগী মলিন বেশে নগ্ন হইয়া কেশ উপড়ায়। ক্ষপণকেরা (জৈন-সন্ন্যাসীরা) বিড়ম্বিত বেশে মোক্ষের উদ্দেশ্যে নিজেদের বাহির লইয়া চলে।

জই নগ্গা বিঅ হোই মুক্তি তা সুণহ সিআলহ।
লোমুপাড়ণো অত্থি সিদ্ধি তা জুবই নিতম্বহ।।
পিচ্ছী গণহে দিঠ্ঠ মোক্খ [তা মোরহ চমরহ]।
উঞ্ছেঁ ভো অণোঁ হোই জাণ তা করিহ তুরঙ্গাহ।।
অর্থাৎ : নগ্ন হইলেই যদি মুক্তি হইত, তাহা হইলে কুকুর-শেয়ালেও হইত; লোম উপড়াইলেই যদি সিদ্ধি আসিত তাহা হইলে যুবতীর নিতম্বেরও সিদ্ধিলাভ ঘটিত; পুচ্ছ গ্রহণেই যদি মোক্ষ দেখা যাইত, তাহা হইলে ময়ূর-চামরেরও মোক্ষ দেখা হইত; উচ্ছ্বিষ্ট ভোজনে যদি জ্ঞান হইত, তাহা হইলে হাতি ঘোড়ারও হইত।

 

           প্রাচীন বাঙলায় দশম-একাদশ-দ্বাদশ শতকে এক শ্রেণির সাধক ছিলেন যাঁরা মুত্যুর পর মুক্তি লাভে বিশ্বাস করতেন না; তাঁরা ছিলেন জীবন্মুক্তির সাধক। রস-রসায়নের সাহায্যে কায়সিদ্ধি লাভ করে এই স্থূল জড়দেহকেই সিদ্ধদেহ এবং সিদ্ধদেহকে দিব্যদেহে রূপান্তরিত করা সম্ভব এবং তা হলেই শিবত্ব লাভ ঘটে– এই মতে তাঁরা বিশ্বাস করতেন। তাঁদেরকে বলা হতো রসসিদ্ধ যোগী। অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয় সুস্পষ্ট প্রমাণ করেছেন যে, এই রসসিদ্ধ সম্প্রদায়ই পরবর্তী নাথসিদ্ধ যোগী সম্প্রদায়ের প্রাচীনতর রূপ। যা হোক, তাঁদের সম্বন্ধেও সহজযানী সিদ্ধাচার্যরা যে শ্রদ্ধিতচিত্ত ছিলেন না, বরং কঠোর সমালোচনাই করতেন, তা সরহপাদের দোহাতেই বোঝা যায়,–

অহ্মে ণ জাণহু অচিন্ত জোই।
জামমরণভব কইসণ হোই।।
জাইসো জাম মরণ বি তোইসো।
জীবন্তে মইলেঁ নাহি বিশেসো।।
জা এথু জাম মরণে বিসঙ্কা।
সো করউ রস রসানেরে কক্সক্ষা।।
অর্থাৎ : অচিন্ত্যযোগী আমরা, জানি না জন্ম মরণ সংসার কিরূপে হয়। জন্ম যেমন মরণও তেমনই; জীবিতে ও মৃতে বিশেষ (কোনো) পার্থক্য নাই। এখানে (এই সংসারে) যাহারা জন্ম-মরণে বিশঙ্কিত (ভীত), তাহারাই রস রসায়নের আকাঙ্ক্ষা করুন।

সাধারণ যোগী-সন্ন্যাসীদের সম্বন্ধেও সহজযানীদের ছিল নিদারুণ অবজ্ঞা। সরহপাদের একটি দোহায় আছে–

অহরি এহিঁ উদ্দুলিঅ চ্ছারেঁ।
সীসসু বাহিঅ এ জড়ভারেঁ।।
ঘরহী বইসী দীবা জালী।
কোনহিঁ বইসী ঘণ্টা চালী।।
অক্খি ণিবেসী আসণ বন্ধী।
কণ্নেহিঁ খুসুখুসাই জণ ধন্ধী।।
অর্থাৎ : আর্য যোগীরা ছাই মাখে দেহে, শিরে বহ করে জটাভার; ঘরে বসিয়া দীপ জ্বালে, কোণে বসিয়া ঘণ্টা চালে; চোখ বুঁজিয়া আসন বাঁধে, আর কান খুসখুস করিয়া জনসাধারণকে ধাঁধা লাগায়!

 

           উপরের উদাহরণগুলো অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস আদি পর্ব’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধ-তন্ত্রগ্রন্থ গুহ্যসমাজতন্ত্র, যোগরত্নমালা, হেবজ্রতন্ত্র ইত্যাদিতেও আমরা উপরে বর্ণিত বক্তব্যের সুস্পষ্ট ছায়া দেখতে পাই। তবে কথিত বৌদ্ধ তান্ত্রিক ঘরানার এই যে বিভিন্ন যান, যেমন– মন্ত্রযান, বজ্রযান, সহজযান, কালচক্রযান ইত্যাদির গুহ্য সাধনপন্থার বিশেষ কোন পার্থক্য ছাড়া তাত্ত্বিক পর্যায়ে মৌলিক কোনো পার্থক্য রয়েছে বলে মনে হয় না। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের নিম্নোক্ত বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য–
‘মহাযানোদ্ভূত মন্ত্রযান, কালচক্রযান ও বজ্রযানে সীমানির্দিষ্ট পার্থক্য বিশেষ কিছু কখনো ছিল না। একই বৌদ্ধাচার্য বিভিন্ন যান সম্বন্ধীয় গ্রন্থ-রচনা করিয়াছেন, এবং একাধিক যান কর্তৃক গুরু এবং আচার্য বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছেন। শান্তিদেব, শান্তিরক্ষিত, দীপঙ্কর প্রভৃতি আচার্যরা মহাযান, বজ্রযান, মন্ত্রযান প্রভৃতি সকল যানেই স্বীকৃত, এবং বজ্রযানী-মন্ত্রযানীরা ইঁহাদের আপন গুরু বলিয়া দাবিও করিয়াছেন। ঠিক একই কথা বলা চলে সহজযান, নাথধর্ম, কৌলধর্ম প্রভৃতি সম্বন্ধে। এই সব ধর্ম মত ও সম্প্রদায় সমস্তই সমসাময়িক, এবং এক সম্প্রদায়ের আচার্যরা অন্য সম্প্রদায় কর্তৃক স্বীকৃতিও লাভ করিয়াছেন, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নাই। বজ্রযান ও মন্ত্রযানের অপেক্ষাকৃত প্রতিষ্ঠাবান আচার্যরা তো সকলেই সহজযান, নাথধর্ম এবং কৌলধর্মের আদি গুরু বলিয়া স্বীকৃত। সরহ বা সরহপাদ, কৃষ্ণ বা কাহ্নপাদ, শবরপাদ, লুইপাদ-মীননাথ ইঁহারা প্রত্যেকেই বজ্রযানে যেমন স্বীকৃত, তেমনই সহজযানী-নাথপন্থী-কৌলমার্গী প্রভৃতিরাও ইঁহাদের আচার্য, বা গুরু, বা প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া দাবি করিয়াছেন। শান্তিদেব, শান্তি বা শান্তরক্ষিত, দীপঙ্কর প্রমুখ আচার্যরা গোড়ায় ছিলেন মহাযানী, পরে ক্রমশ বিবর্তিত হইয়াছিলেন বজ্রযানীরূপে, এবং যেহেতু বজ্রযান মহাযান হইতেই উদ্ভূত এবং তাহারই বিবর্তিত রূপ সেই হেতু ইহার মধ্যে অস্বাভাবিক বা অনৈতিহাসিক কিছু নাই। এই কারণেই নাথপন্থী বা কৌলমার্গীদের গুরু লুইপাদ-মীননাথ এবং সহজযানীদের লুইপাদ দুই ব্যক্তি, এমন মনে করিবারও কোনও কারণ নাই। বজ্রযানোদ্ভূত এই সব ধর্মমার্গ ও সম্প্রদায় গোড়ায়ই আপনাপন বৈশিষ্ট্য লইয়া সুনির্দিষ্ট সীমায় সীমিত হয় নাই; সে-সব বৈশিষ্ট্য ক্রমশ পরে গড়িয়া উঠিয়াছে। বরং, সূচনায় ইঁহাদের একই ছিল ধ্যান ও আদর্শ, একই ছিল ভাব-পরিমণ্ডল, এবং যাহারা সেই ধ্যান, আদর্শ ও ভাব-পরিমণ্ডল সৃষ্টি করিলেন তাঁহারা পরে প্রত্যেক স্ব-স্বতন্ত্র মত ও সম্প্রদায় কর্তৃক গুরু এবং আচার্য বলিয়া স্বীকৃত হইবেন, ইহা কিছু অস্বাভাবিক নয়। তাহা ছাড়া, মন্ত্রযান-বজ্রযান ধর্মের মন্ত্র, মণ্ডল প্রভৃতি বাহ্যানুষ্ঠানের প্রতি সহজযানী সিদ্ধাচার্যের মনোভাব যত বিরূপই হোক না কেন, নাথ ও কৌলধর্মের প্রতি বিরূপ হইবার তেমন কারণ কিছু ছিলনা; ইহাদের মধ্যে, মৌলিক বিরোধ স্বল্পই। ইহাদের মধ্যে, বিশেষভাবে নাথধর্মের মধ্যে একটা সমন্বয় ও স্বাঙ্গীকরণ ক্রিয়া সমানেই চলিতেছিল। নাথধর্ম ছিল কতকটা লোকায়ত ধর্ম, সহজযানও কতকটা তাই। কাজেই ইহাদের মধ্যে এবং অন্যান্য লোকায়ত ধর্মের সঙ্গে পরস্পর যোগাযোগ কিছুটা ছিলই, এবং ছিল বলিয়াই ইহাদের ভিতর হইতে এবং ইহাদেরই ধ্যানাদর্শ লইয়া পরবর্তী বৈষ্ণব সহজিয়া-ধর্ম, শৈব, নাথযোগী সম্প্রদায়, আউল-বাউল প্রভৃতি সম্প্রদায় ও মতামতের উদ্ভব সম্ভব হইয়াছিল।’- (বাঙালীর ইতিহাস আদি পর্ব, পৃষ্ঠা-৫৮৭)

           সে যাক্, আমরা দেখি, বজ্রযান সাধন-পদ্ধতিতে বজ্রযান সাধন-পদ্ধতিতে গুরু যে অপরিহার্য তা বৌদ্ধতন্ত্রের আদি গ্রন্থ গুহ্যসমাজতন্ত্রে বলা হয়েছে–

‘ন বিনা বজ্রগুরুণা সর্ব্বক্লেশপ্রমাণকম্ ।
নির্ব্বাণঞ্চ পদং শান্তমবৈবর্ত্তিকমাপ্নুয়াৎ।।’- (গুহ্যসমাজতন্ত্র)
অর্থাৎ : বজ্রগুরু ব্যতিরেকে নির্বাণপদ পাওয়া যায় না। যে নির্বাণে সকল ক্লেশের নাশ হয়, শান্তি যে নির্বাণের চরম ফল, যে নির্বাণে আর “বিবর্ত” থাকে না, অর্থাৎ কোনোরূপ পরিবর্তন হয় না, সে পদ গুরুর কৃপা ভিন্ন পাওয়া যায় না।

সহজযানের মূল কথাও– সদ্গুরুর উপদেশ। কিন্তু সে গুরুকে বজ্রগুরু বলা হয় কেন? বজ্র বলতে শূন্যতা বোঝায়। বজ্রযানের অন্যতম মূল শাস্ত্র ‘হেবজ্রতন্ত্র’র টীকাগ্রন্থ ‘যোগরত্নমালা’য় বলা হয়েছে–

‘দৃঢ়ং সারমশৌষীর্য্যমচ্ছেদ্যঃ অভেদ্যলক্ষণম্ ।
অদাহী অবিনাশী চ শূন্যতা বজ্র উচ্যতে।।’- ( যোগরত্নমালা)
অর্থাৎ : শূন্যতাই বজ্র। তাকে ছেদ করা যায় না, ভেদ করা যায় না, দগ্ধ করা যায় না, বিনাশ করা যায় না, এতে ছিদ্র করা যায় না– তা অতি দৃঢ় ও সারবান। যে গুরু এই শূন্যতাবজ্রের উপদেশ দেন, তিনিই বজ্রগুরু।

         সহজযান মতে, গুরুর উপদেশে যা লাভ হয়, সে লাভ শতসহস্র সমাধিতে হয় না। তার আরেকটি অর্থ হয়তো এরকম যে, ইন্দ্রিয় নিরোধের চেষ্টা করা বৃথা, কঠোর ব্রত ধারণের চেষ্টা বৃথা, কঠিন কঠিন নিয়মপালন করাও বৃথা হয়তো। কেননা, গুহ্যসমাজতন্ত্রেই বলা হয়েছে–

‘দুষ্করৈর্নিয়মৈস্তীব্রৈমূর্ত্তিঃ শুষ্যতি দুঃখিতা।
দুঃখাদ্ধি ক্ষিপ্যতে চিত্তং বিক্ষেপাৎ সিদ্ধিরন্যথা।।’- (গুহ্যসমাজতন্ত্র)
অর্থাৎ : যদি তুমি কঠোর নিয়ম পালন করো, তাহলে তোমার শরীর শুষ্ক হবে ও তোমার নানারূপ দুঃখ উপস্থিত হবে। দুঃখ উপস্থিত হলে মন স্থির থাকবে না, মন স্থির না থাকলে কখনোই সিদ্ধিলাভ হয় না।

           কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, বুদ্ধ যেহেতু সাধনমার্গে মধ্যপন্থা মেনে চলতেন এবং অন্যকেও মধ্যপন্থা অনুসরণের উপদেশ দিয়েছেন, উপরিউক্ত উপদেশে বুঝি তারই প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু ‘হেবজ্রতন্ত্রে’ উক্ত নিচের শ্লোকটিতে আমরা হয়তো অন্য কিছুর ইঙ্গিত পেয়ে যাই–

‘রাগেণ বধ্যতে লোকো রাগেণৈব বিমুচ্যতে।
বিপরীতভাবনা হ্যেষা ন জ্ঞাতা বুদ্ধতীর্থিকৈঃ।।’- ( হেবজ্রতন্ত্র)
অর্থাৎ : বিষয়ের আসক্তিতেই লোকে বদ্ধ হয়, আবার সেই আসক্তিতেই লোকে মুক্ত হয়। আসক্তির এই যে বিপরীত ফলদানের ক্ষমতা বুদ্ধতীর্থিকেরা এটা জানতো না, (অর্থাৎ, অন্য বৌদ্ধসম্প্রদায়ের লোকেরা তা জানে না, আমরা, সহজপন্থীরাই কেবল জানি।)

         অন্য বৌদ্ধসম্প্রদায়ের তীর্থিকেরা কী জানতো না? হয়তো তার উত্তর ‘গুহ্যসমাজতন্ত্রে’ই দেয়া হয়েছে এভাবে–

‘পঞ্চকামান্ পরিত্যজ্য তপোভির্নৈব পীড়য়েৎ।
সুখেন সাধয়েদ্বোধিং যোগতন্ত্রানুসারতঃ।।’- (গুহ্যসমাজতন্ত্র)
অর্থাৎ : পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের পাঁচটি বিষয়, বিষয়কেই ভোগ বলে, বিষয়কেই কাম বলে। সেই পঞ্চকাম বা পাঁচটি ভোগ ত্যাগ করে তপস্যার দ্বারা নিজেকে পীড়া দেবে না। যোগতন্ত্রানুসারে সুখভোগ করতে করতে বোধির সাধনা করবে।

            তাই হয়তো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় তাঁর সহজযান নিবন্ধে কটাক্ষ করেই বলেছেন– ‘এই-সকল সহজপন্থীর শাস্ত্র স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দিতেছে যে, যদি তোমার বোধিলাভের ইচ্ছা থাকে, তবে পঞ্চকাম উপভোগ করো।’- (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা-সংগ্রহ তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৩৫৯)

            অতএব, একান্ত দ্বিরুক্তি হলেও শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের সেই অভিমতটি আবারো উল্লেখ করে বলা যেতে পারে– ‘মাতৃপূজা এবং শক্তিসাধনার প্রচলন বাঙলাদেশে অনেক পূর্ব হইতে প্রচলিত থাকিলেও খ্রীস্টীয় সপ্তদশ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ইহা এখানে একটা নবরূপ লাভ করিয়াছে এবং এই নবরূপেই বাঙলার সমাজ-সংস্কৃতিকে তাহা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করিয়াছে। কিন্তু বাঙলাদেশে তন্ত্রসাধনার প্রচলন এবং প্রভাব অনেক পূর্ব হইতে। বাঙলাদেশে এবং তৎসংলগ্ন পূর্বভারতীয় অঞ্চলসমূহে এই তন্ত্রপ্রভাব খ্রীস্টীয় অষ্টম শতক হইতে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত মহাযান বৌদ্ধধর্মের উপরে গভীর প্রভাব বিস্তার করিয়া মহাযান বৌদ্ধধর্মকে বজ্রযান, সহজযান প্রভৃতি তান্ত্রিক ধর্মে রূপান্তরিত করিয়া দিয়াছিল। আমার ধারণা, বাঙলাদেশে যত হিন্দুতন্ত্র প্রচলিত আছে তাহা মোটামুটিভাবে খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতক হইতে খ্রীস্টীয় পঞ্চদশ শতকের মধ্যে রচিত। বাঙলাদেশে এই হিন্দুতন্ত্র ও বৌদ্ধতন্ত্র বলিয়া যে দুইটি জাতিভেদ করা হয় সেই ভেদলক্ষণ আমার কাছে খুব স্পষ্ট এবং নিঃসন্দিগ্ধ মনে হয় না। সংস্কারবর্জিতভাবে বিচার করিয়া দেখিলে দেখা যাইবে, ভারতবর্ষের তন্ত্রসাধনা মূলতঃ একটি সাধনা। তন্ত্রের মধ্যে দার্শনিক মতবাদগুলি বড় কথা নয়– বড় হইল দেহকেই যন্ত্রস্বরূপ করিয়া কতকগুলি গুহ্য সাধনপদ্ধতি। এই সাধনপদ্ধতিগুলি পরবর্তী কালের লোকায়ত বৌদ্ধধর্মের সহিত মিলিয়া-মিশিয়া বৌদ্ধতন্ত্রের সৃষ্টি করিয়াছে, আবার হিন্দুধর্মের সহিত মিলিয়া-মিশিয়া হিন্দুতন্ত্রের রূপ ধারণ করিয়াছে; কিন্তু আসলে বৌদ্ধ ‘প্রজ্ঞা-উপায়ে’র পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনাশ্রিত সাধনা, আর হিন্দু শিব-শক্তির পরিকল্পনা এবং তদাশ্রিত সাধনার মধ্যে বিশেষ কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে বলিয়া মনে হয় না। এই তন্ত্রসাধনার একটি বিশেষ ধারা বৌদ্ধ দোঁহাকোষ এবং চর্যাগীতিগুলির ভিতর দিয়া যে সহজিয়া রূপ ধারণ করিয়াছে, তাহারই ঐতিহাসিক ক্রম-পরিণতি বাংলাদেশের বৈষ্ণব সহজিয়া সাধনায় এবং বিশেষ বিশেষ বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে।’ -(ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য)

(চলবে…)
[আগের পর্ব : তান্ত্রিক সিদ্ধাচার্যগণ] [*] [পরের পর্ব : বৌদ্ধ-তন্ত্রসাধন]

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 278,115 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 108 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
Advertisements
%d bloggers like this: