h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

তন্ত্র-সাধনা-১৪ : তান্ত্রিক চক্রানুষ্ঠান

Posted on: 21/10/2017


11951361_595381297266595_4746709102409714816_n

তন্ত্র-সাধনা-১৪ : তান্ত্রিক চক্রানুষ্ঠান
রণদীপম বসু

কুলাচারী তান্ত্রিক-সাধকেরা চক্র করে দেব-দেবীর সাধনা করে থাকেন। তন্ত্রশাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের চক্রানুষ্ঠানের নানারকম বিধান রয়েছে। তবে সাধকগণের মধ্যে দুই প্রকার চক্রের অনুষ্ঠানই বহুল প্রচলিত বলে জানা যায়– তত্ত্বচক্র বা দিব্যচক্র এবং ভৈরবীচক্র বা স্ত্রী-চক্র। তবে শাস্ত্রের বিধানাযায়ী কুলাচারী ভৈরবীচক্র এবং দিব্যাচারী তত্ত্বচক্রের অনুষ্ঠান করবে।

         তত্ত্বচক্র : তত্ত্বচক্রে ব্রহ্মজ্ঞানীরই অধিকার, অন্যের নাই। শাস্ত্রভাষ্যে বলা হয়েছে–

ব্রহ্মভাবেন তত্ত্বজ্ঞা যে পশ্যন্তি চরাচরম্ ।
তেষাং তত্ত্ববিদাং পুংসাং তত্ত্বচক্রেহস্ত্যধিকারিতা।।
সর্বব্রহ্মময়ো ভাবশ্চক্রেহস্মিংস্তত্ত্বসংজ্ঞকে।
যেষামুৎপদ্যতে দেবি ত এব তত্ত্বচক্রিণঃ।।
অর্থাৎ : যিনি এই চরাচরকে ব্রহ্মভাবে অবলোকন করিয়া থাকেন, সেই তত্ত্ববিৎ পুরুষই এই চক্রের অধিকারী। সমস্তই ব্রহ্ম, এবম্বিধ ভাবময় ব্যক্তিরই তত্ত্বচক্রে অধিকার।

        অতএব পরব্রহ্মের উপাসক, ব্রহ্মজ্ঞ, ব্রহ্মতৎপর, শুদ্ধন্তঃকরণ, শান্ত, সর্বপ্রাণীর হিতকার্যে নিরত, নির্বিকল্প দয়াশীল, দৃঢ়ব্রত ও সত্যসঙ্কল্প সাধক, এরূপ ব্রহ্মজ্ঞানী ব্যক্তিগণই এই তত্ত্বচক্রের অনুষ্ঠান করবে। এই চক্রের অনুষ্ঠানে কোনো ঘট-স্থাপন নাই, বাহুল্য পূজাদিও নাই। এই তত্ত্বের সাধনা– সর্বত্র ব্রহ্মভাব। ব্রহ্মমন্ত্রোপাসক এবং ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তি চক্রেশ্বর হয়ে ব্রহ্মজ্ঞ সাধকদের সাথে তত্ত্বচক্রের অনুষ্ঠান আরম্ভ করবে। তার ক্রমপ্রণালী স্বামী নিগমানন্দের বর্ণনায় নিম্নরূপ–

        ‘রম্য, সুনির্মল এবং সাধকগণের সুখজনক স্থানে বিচিত্র আসন আনয়ন করিয়া বিমল আসন কল্পনা করিবে। চক্রেশ্বর এই স্থানে ব্রহ্ম-উপাসকগণের সহিত উপবেশন করিয়া তত্ত্বসমুদয় আহরণকরতঃ আপন সম্মুখভাগে স্থাপন করিবে। চক্রেশ্বর সকল তত্ত্বের আদিতে “ওঁ ” এই মন্ত্র শতবার জপ করিবে। তৎপর “ওঁ হংসঃ” এই মন্ত্র সাতবার কিংবা তিনবার জপ করিয়া সমস্ত শোধন করিবে। তৎপর ব্রহ্মমন্ত্রদ্বারা সেই সকল দ্রব্য পরমাত্মাতে উৎসর্গ করিয়া ব্রহ্মজ্ঞ সাধকগণের সহিত একত্র পান-ভোজন করিবে। এই তত্ত্বচক্রে জাতিভেদ বর্জন করিবে। ইহাতে দেশ, কাল কিংবা পাত্র নিয়ম নাই। যথা–

যে কুর্বন্তি নরা মূঢ়া নিব্যচক্রে প্রমাদতঃ।
কুলভেদং বর্ণভেদং তে গচ্ছন্ত্যধর্মাং গতিম্ ।।
— যে মূঢ় নর দিব্যচক্রে ভ্রমবশতঃ কুলভেদ বর্ণভেদ প্রভৃতি করে, সে নিশ্চয়ই অধোগতি প্রাপ্ত হয়।

অতএব দিব্যাচারী ব্রহ্মজ্ঞ সাধকোত্তম যত্নসহকারে ধর্মার্থ-কাম-মোক্ষ-প্রাপ্তিকামনায় তত্ত্বচক্রের অনুষ্ঠান করিবে।

ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্মহবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্ ।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।।
–তত্ত্বচক্রের অনুষ্ঠান করিয়া– যাহা অর্পিত হইতেছে তাহা ব্রহ্ম, যাহা অর্পণ-পদবাচ্য তাহাও ব্রহ্মকর্তৃক হুত হইতেছে, অর্থাৎ অগ্নি ও হোমকর্তাও ব্রহ্ম।– এইরূপ ব্রহ্মকর্মে যাঁহার চিত্তের একাগ্রতা জন্মে, তিনিই ব্রহ্মলাভ করিয়া থাকেন।

      দিব্যাচারী ব্রহ্মজ্ঞ সাধকের ন্যায় কুলাচারীরও কুলপূজাপদ্ধতিতে চক্রের প্রয়োজন, বিশেষ-পূজাসময়ে সাধকগণের চক্রানুষ্ঠান করা অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করা হয়।

         ভৈরবী-চক্র : কুলাচারীর অনুষ্ঠেয় স্ত্রী-চক্র ভৈরবী-চক্র নামে খ্যাত। যিনি এই চক্রে বসে প্রাধান্য করেন, অর্থানুষ্ঠানাদির আয়োজন প্রভৃতি করেন, তাঁকে চক্রেশ্বর বলে।
তন্ত্র-মতে এই ভৈরবীচক্র শ্রেষ্ঠ হতে শ্রেষ্ঠ, সারাৎসার। বলা হয়, একবার মাত্র চক্রের অনুষ্ঠান করলে সর্বপাপ হতে মুক্ত হওয়া যায়। আর নিত্য এর অনুষ্ঠানে নির্বাণমুক্তি লাভ হয়। তবে ভৈরবীচক্র-বিষয়ে সে-ধরনের কোনো নিয়ম নাই; যে-কোন সময়ে এই অতি শুভঙ্কর ভৈরবীচক্রের অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। এরদ্বারা দেবী শীঘ্রই বাঞ্ছিত ফল প্রদান করেন। ভৈরবীচক্রেরও গুরু-প্রণালীভেদে জপ-তপে পার্থক্য আছে হয়তো, কিন্তু সাধন-প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যে খুব একটা ভিন্নতা নেই বলেই মনে হয়। শ্রীমৎস্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী ‘তান্ত্রিকগুরু’তে যেভাবে এই চক্রের বিধান বর্ণনা করেছেন ক্রমান্বয়ে তা উদ্ধৃত করা যেতে পারে। তিনি বলছেন–
‘কূলাচারী সাধক সুরম্য মৃত্তিকার উপরে কম্বল কিংবা মৃগচর্মাদির আসন পাতিয়া “ক্লীং ফট্” এই মন্ত্রে আসন সংশোধনপূর্বক তাহাতে উপবেশন করিবে। অনন্তর সিন্দূর, রক্তচন্দন, অথবা কেবল জলদ্বারা ত্রিকোণ ও তদ্বহির্ভাগে চতুষ্কোণমণ্ডল লিখিবে। পরে সেই মণ্ডলে একটি বিচিত্র ঘট, দধি, আতপ তণ্ডুল, ফল, পল্লব, সিন্দূরতিলকযুক্ত এবং সুবাসিত জলপূর্ণ করিয়া প্রণব (ওঁ) মন্ত্র পাঠ-করতঃ স্থাপন করিবে এবং ধূপ দীপ প্রদর্শন করাইবে। তৎপরে গন্ধপুষ্পদ্বারা অর্চনা করিয়া ইষ্টদেবতার ধ্যান করিবে ও সংক্ষেপে পূজাপদ্ধতি-অনুসারে তাহাতে পূজা করিবে। পশ্চাৎ সাধক আপন ইচ্ছানুসারে তত্ত্বপাত্র সম্মুখে রাখিয়া “ফট্” এই মন্ত্রে প্রোক্ষণ করিয়া দিব্যদৃষ্টি-দ্বারা অবলোকন করিবে। অনন্তর অলি-যন্ত্রে (মদ্যপাত্রে) গন্ধপুষ্প প্রদান করিয়া–
“নবযৌবসম্পন্নাং তরুণারুণবিগ্রহাম্ ।
চারুহাসামৃত উদ্ভাস-উল্লাসৎ-বদনপঙ্কজাম্ ।।
নৃত্যগীতকৃতামোদাং নানাভরণভূষিতাম্ ।
বিচিত্রবসনাং ধ্যায়েৎ-বরাভয়করাম্বুজাম্ ।।”
এই মন্ত্রে আনন্দভৈরবীর এবং
“কর্পুরপুরধবলং কমলায়তাক্ষং দিব্যাম্বর-আভরণভূষিদেকান্তিম্ ।
বামেন পাণিকমলেন সুধাঢ্যপাত্রং দক্ষেণ শুদ্ধগুটিকাং দধতং স্মরামি।।”
এই মন্ত্রে আনন্দভৈরবের ধ্যান করিবে।
ধ্যানান্তে সেই মদ্যপাত্রে উভয় দেব-দেবীর সমরসতা বিশেষরূপে চিন্তা করিবে। তৎপরে “ওঁ আনন্দভৈরব্যৈ আনন্দভৈরবায় নমঃ” এই মন্ত্রে গন্ধপুষ্পদ্বারা পূজা করতঃ অলি-যন্ত্রে (মদ্যপাত্রে) “আং হ্রীং ক্রোং স্বাহা” এই মন্ত্র একশত আটবার জপ করিয়া মদ্য শোধন করিবে। পরে মাংসাদি যাহা পাওয়া যায়, সেই সমুদয় “ওঁ আং হ্রীং ক্রোং স্বাহা” এই মন্ত্রদ্বারা শতবার অভিমন্ত্রিত করিয়া শোধন করিবে। অনন্তর সমস্ত তত্ত্ব ব্রহ্মময় ভাবনা করিয়া চক্ষুর্দ্বয় মূদ্রিত করতঃ দেবীকে নিবেদন করিয়া দিয়া পান-ভোজন করিবে।’

        ভৈরবীচক্রের মূল অনুষ্ঠানের সাথে পরিচয়ের আগে এ প্রসঙ্গে বলে রাখা আবশ্যক, চক্রে বসার কিছু বিধিবদ্ধ নিয়ম তন্ত্রে বলা আছে। যেমন মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–

চক্রমধ্যে বৃথালাপং চাঞ্চল্যং বহুভাষণম্ ।
নিষ্ঠীবনমধোবায়ুং বর্ণভেদং বিবর্জেয়েৎ।।
ক্রুরান্ খলান্ পশূন্ পাপান্ নাস্তিকান্ কুলদূষাকান্ ।
নিন্দকান্ কুলশাস্ত্রাণাং চক্রাদ্দূরতরং ত্যজেৎ।।- (মহানির্বাণ-তন্ত্র)
অর্থাৎ : চক্রমধ্যে থাকিয়া বৃথালাপ অর্থাৎ ইষ্টমন্ত্রজপাদি ও পদ্ধতি-অনুসারে ব্যতীত অন্য প্রকার আলাপ করিবে না; চঞ্চলতা প্রকাশ করিবে না; থুথু ফেলিবে না; অধোবায়ুনিঃসারণ এবং জাতিবিচার করিবে না। ক্রূর, খল, পশ্বাচারী, পাপী, নাস্তিক, কুলদূষক এবং কুলশাস্ত্রনিন্দুকদিগকে চক্রে বসিতে দিবে না।

এবং–

পূর্ণাভিষেকাৎ কৌলঃ স্যাচ্চক্রাধীশঃ কুলার্চকঃ।- (মহানির্বাণ-তন্ত্র)
অর্থাৎ : যাঁহার পূর্ণাভিষেক হইয়াছে তিনিই কৌল, কুলার্চক ও চক্রাধীশ্বর হইবেন।

         তাছাড়া এটাও বলা হয়– ‘ভৈরবীচক্র আরম্ভ হইলে সমস্ত জাতিই দ্বিজশ্রেষ্ঠ হয়। আবার ভৈরবীচক্র হইতে নিবৃত্ত হইলে সর্ববর্ণ পৃথক অর্থাৎ যে জাতি ছিল তাহাই হয়। আবার ভৈরবীচক্রমধ্যে জাতিবিচার নাই– উচ্ছিষ্টাদিরও বিচার নাই। চক্রমধ্যগত বীরসাধকগণ শিবের স্বরূপ। এই চক্রে দেশ-কাল নিয়ম বা পাত্র-বিচার নাই। চক্রস্থান মহাতীর্থ, সুতরাং তীর্থসমূহ হইতে শ্রেষ্ঠ। এখান হইতে পিশাচাদি ক্রূরজাতি দূরে পলায়ন করে, কিন্তু দেবতাগণ আগমন করিয়া থাকেন। পাপী ব্যক্তিগণ এই ভৈরবীচক্র ও শিবস্বরূপ সাধকগণকে দর্শন করিলে পাপমুক্ত হইয়া থাকে। যে কোন স্থান হইতে বা যে কোন ব্যক্তিকর্তৃক আহৃত দ্রব্যও চক্রমধ্যস্থ সাধকগণের হস্তে অর্পিত হইলেই শুচি হইয়া থাকে। চক্রান্তর্গত কুলমার্গাবলম্বী সাক্ষাৎ শিবস্বরূপ সাধকগণের পাপাশঙ্কা কোথায়? ব্রাহ্মণেতর যে কোন সামান্য জাতি কুলধর্ম-আশ্রিত হইলেই দেববৎ পূজ্য।’- (তান্ত্রিকগুরু)

         শবাসন, মুণ্ডাসন, অথবা চিতাসনে আসীন হয়ে ভয়ানক সব তন্ত্রচর্চার সাক্ষ্য বিভিন্ন তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়। যেমন ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থের দ্বিতীয়ভাগে মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্ত বলছেন–
‘নানাপ্রকার সাধনের মধ্যে শবসাধন বীরাচারীদের একটি প্রধান সাধন। অষ্টমী বা চতুর্দশী তিথিতে অথবা কৃষ্ণ-পক্ষীয় মঙ্গলবারে শূন্য গৃহে, নদী-তীরে, পর্বতে, নির্জন স্থানে, বিল্ব-বৃক্ষ-মূলে বা শ্মশান-ভূমিতে অথবা তাহার সমীপবর্তী বন-স্থানে সাধনা করিতে হয়। সাধকে দ্বিতীয় প্রহর রাত্তিতে মদ্যাদি উপচার লইয়া সাধনার স্থলে উপস্থিত হয় এবং তথায় গুরু, গণেশ, যোগিনী প্রভৃতির পূজা করিয়া বলিদানাদি সাধন পূর্বক শব আনয়ন করে। কিরূপ শব প্রশস্ত, পশ্চাৎ লিখিত হইতেছে।

যষ্টিবিদ্ধং খড়্গবিদ্ধং পয়োমৃতম্ ।
বজ্রবিদ্ধং সর্পদষ্টং চাণ্ডালঞ্চাভিভূতকম্ ।।
তরুণং সুন্দরং শূরং রণে নষ্টং সমুজ্জ্বলম্ ।
পলায়নবিশূন্যঞ্চ সম্মুখে রনবর্তিনম্ ।। (তন্ত্রসার-ধৃত ভাবচূড়ামণি-বচন)
যে চণ্ডাল যষ্টি, শূল, খড়্গ বা বজ্রের আঘাতে কিম্বা সর্প-দংশনে প্রাণ ত্যাগ করিয়াছে, অথবা অভিভূত, জল-মগ্ন বা সম্মুখ-যুদ্ধে পলায়ন-পরাঙ্মুখ হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে, সে যদি সুন্দর কান্তি-বিশিষ্ট শৌর্যবান ও তরুণ-বয়স্ক হয় তাহা হইলে শব সাধনার্থ, তাহার শব আনয়ন করিবে।

         সাধকে শব আনয়ন পূর্বক তাহার পূজা করিবে এবং পরে সেই শবের পৃষ্ঠ-দেশে চন্দন-লেপন পূর্বক হরিণ-চর্ম ও কম্বল স্থাপন করিয়া রাখিবে। অনন্তর ডাকিনী যোগিনী প্রভৃতির পূজা করিয়া ও কিছু দূরে একজন উত্তর সাধক রাখিয়া পূজার সামগ্রী সম্বলিত শবারোহণ করিবে, এবং দেবতার অর্চনাদি করিয়া জপ করিতে থাকিবে।
শবসাধনের সময়ে এরূপ ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর ক্রিয়ানুষ্ঠান করিবার ব্যবস্থা আছে যে, তাহা করা দূরে থাকুক, পাঠ করিলেও ভয় পাইতে হয়।

করকাঞ্চীং সমাদায় মুণ্ডমালাবিভূষিতঃ।
তেনৈব তিলকং দত্বা তত্তদ্ভস্মবিভূষিতঃ।
শ্মশানেচাসকৃজ্জপ্ত্বা সর্বসিদ্ধীশ্বরোভবেৎ। (শ্যামারহস্য)
কর-কাঞ্চীগ্রহণ করিয়া মুণ্ড মালায় বিভূষিত হইবে এবং তদীয় রক্তের তিলক ধারণ ও শরীরে তাহার ভস্ম লেপন পূর্বক শ্মশান-ভূমিতে পুনঃ পুনঃ জপ করিয়া সর্ব সিদ্ধি প্রাপ্ত হইবে।

মহাষ্টমীনবম্যোস্তু সংযোগে পুরতঃ স্থিতঃ।
ছাগমহিষমেষাণাং চতুর্দিক্ষু শবান্ ক্ষিপেৎ।।
কবন্ধান্মুণ্ডপুঞ্জাংশ্চ দীপাদিভিরলঙ্কৃতান্ ।
মধ্যে কবন্ধমাস্তীর্য তত্র গন্ধর্বরূপধৃক্ ।।
তাম্বুলপুরিতমুখোমঞ্জনাঞ্চিতলোচনঃ।
কৃত্বা তাবন্মনুং জপ্ত্বা সর্বসিদ্ধীশ্বরোভবেৎ।। (শ্যামারহস্য)
মহা অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধি-কালে গ্রামের বাহিরে ছাগ, মহিষ ও মেষের শব এবং দীপ-সংযুক্ত কবন্ধ ও মুণ্ড সমুদায় চারিদিকে ক্ষেপণ করিবে, মধ্যস্থলে একটি কবন্ধ রাখিয়া তাহার উপর আরোহণ করিবে এবং গন্ধর্ব-রূপ ধারণ পূর্বক মুখেতে তাম্বুল পূর্ণ ও চক্ষুতে অঞ্জন-বিশেষ লিপ্ত করিয়া মন্ত্র জপ পূর্বক সর্ব সিদ্ধি প্রাপ্ত হইবে।

       বাহুল্য বিবেচনায় এইসব শবসাধনের প্রসঙ্গ বর্তমান আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। তাছাড়া মহানির্বাণ-তন্ত্রে বলা হয়েছে যে–

পুরশ্চর্যাশতেনাপি শবমুণ্ডচিতাসনাৎ।
চক্রমধ্যে সকৃজ্জপ্ত্বা তৎফলং লভতে সুধীঃ।।- (মহানির্বাণ-তন্ত্র)
অর্থাৎ : শবাসন, মুণ্ডাসন, অথবা চিতাসনে আরূঢ় হইয়া শত পুরশ্চরণ করিলে যে ফল পাওয়া যায়, ভৈরবীচক্রে বসিয়া একবারমাত্র মন্ত্রজপ করিলে সেই ফল লাভ হইয়া থাকে।

 

        অতএব কুলাচারী সাধক সযত্নে ভৈরবীচক্রের অনুষ্ঠান করবে। কিন্তু ভৈরবীচক্রের মূল অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে তার গুরুত্ব ও গুহ্যতত্ত্ব অনুধাবনের সুবিধার্থে আমাদেরকে আরও কিছু সহায়ক তথ্য জেনে নেওয়া আবশ্যক। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থে এই স্ত্রী-চক্রের বৃত্তান্ত প্রসঙ্গে বলেছেন–
‘এইরূপ ব্যবস্থা আছে যে, সাধকেরা চক্রাকারে বা শ্রেণী ক্রমে আপন আপন শক্তির সহিত ললাটে চন্দন প্রলেপ করিয়া যুগ যুগ ক্রমে ভৈরব-ভৈরবী-ভাবে উপবেশন করিবে এবং মধ্যস্থিত কোন স্ত্রীকে সাক্ষাৎ কালী বোধ করিয়া মদ্য-মাংসাদি দ্বারা তাঁহার অর্চনা করিতে থাকিবে।’

          কিভাবে স্ত্রীলোককে ঐভাবে পূজা করতে হয়, শাস্ত্রে তার বিবরণ আছে। ইতঃপূর্বে আমরা গুপ্তসাধনতন্ত্রের প্রথম পটলে বিবরণ উল্লেখ করেছিলাম; পাঠের সুবিধার্থে আবারও উল্লেখ করা হচ্ছে (গুপ্তসাধনতন্ত্র-১/১০-১৪)–

ইহলোকে সুখং ভুক্ত্বা দেবীদেহে প্রলীয়তে।
সাধকেন্দ্রো মহাসিদ্ধিং লব্ধ্বা যাতি হরেঃ পদম্ ।। ১০
পঞ্চাচারেণ দেবেশি কুলশক্তিং প্রপূজয়েৎ।
নটী কাপালিকী বেশ্যা রজকী নাপিতাঙ্গনা।। ১১
ব্রাহ্মণী শূদ্রকন্যা চ তথা গোপালকন্যকা।
মালাকারস্য কন্যা চ নবকন্যাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।। ১২
বিশেষবৈদগ্ধ্যযুতাঃ সর্ব্বা এব কুলাঙ্গনাঃ।
রূপযৌবনসম্পন্না শীলসৌভাগ্যশালিনী।। ১৩
পূজনীয়া প্রযত্নেন ততঃ সিদ্ধির্ভবেদ্ ধ্রুবম্ । ১৪
অর্থাৎ : যে সাধক শক্তির আরাধনা করেন, তিনি ইহলোকে বিবিধ সুখভোগ করিয়া দেবীদেহে প্রলীন হইতে পারেন এবং সেই সাধকেন্দ্র শক্তিসাধনবলে মহাসিদ্ধি লাভ করিয়া অন্তে হরিপদ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ১০।। দেবেশি! পঞ্চাচার ক্রমে কুলশক্তির অর্চ্চনা করিবে। নটী, কাপালিককন্যা, বেশ্যা, রজকী, নাপিতপত্নী, ব্রাহ্মণী, শূদ্রকন্যা, গোপকন্যা ও মালাকারকন্যা ইহারাই নবকন্যা বলিয়া কীর্ত্তিত আছে। ১১-১২।। বিশেষতঃ যাহারা বিশেষ গুণশালিনী এইরূপ সর্ব্বজাতীয় রূপযৌবনসম্পন্না, সুশীলা ও সৌভাগ্যশালিনী কন্যাও কুলাঙ্গনা বলিয়া গ্রহণ করা যায়। ১৩।। উক্ত কুলাঙ্গনা সকলকে যত্নপুরঃসর পূজা করিবে। এইরূপ অর্চ্চনাদ্বারা সাধকের নিশ্চয়ই সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। ১৪।

 

         এখানে উল্লেখ্য, মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের বক্তব্যানুযায়ী, রেবতীতন্ত্রে চণ্ডালী, যবনী, বৌদ্ধা, রজকী প্রভৃতি চৌষট্টি প্রকার কুল-স্ত্রীর বিবরণ আছে। নিরুত্তরতন্ত্রকার বলেন, ঐ সকল চণ্ডালী, রজকী প্রভৃতি শব্দ বর্ণ বা বর্ণসঙ্কর-বোধক নয়; কার্য বা গুণের বিজ্ঞাপক। বিশেষ বিশেষ কার্যের অনুষ্ঠান করলে, সকল বর্ণোদ্ভব কন্যাই ঐ সমস্ত বিশেষ বিশেষ নাম প্রাপ্ত হয়ে থাকে; যেমন–

পূজাদ্রব্যং সমালোক্য রজোহবস্থাং প্রকাশয়েৎ।
সববর্ণোদ্ভবা রম্যা রজকী স প্রকীর্তিতা।।
আত্মানং গোপয়েদ যা চ সর্বদা পশুশঙ্খটে।
সর্ববর্ণোদ্ভবা রম্যা গোপিনী সা প্রকীর্তিতা।।
অর্থাৎ : পূজা-দ্রব্য দেখিয়া যে কোন বর্ণোদ্ভবা কন্যা রজো-অবস্থা প্রকাশ করে, তাহাকে রজকী বলে। যে কোন বর্ণোদ্ভবা রমণী পশ্বাচারীর নিকটে আপনাকে গোপন করে, তাহাকে গোপিনী বলা যায়।

 

       শাস্ত্রে কুলস্ত্রীর উপরিউক্ত বর্ণনা দেখে যথার্থ অনুধাবনে অসমর্থ পাঠকের বিবাদ-ভঞ্জনের লক্ষ্যে এটা জেনে রাখা আবশ্যক যে, ঐ চক্র-গত পর পুরুষেরাই ঐ সমস্ত কুলস্ত্রীর প্রকৃত পতি; কেননা কুল-ধর্মে বিবাহিত পতি পতি নয়। কুলস্ত্রীর প্রতি শাস্ত্রের উপদেশ হলো–

পূজাকালং বিনা নান্যং পুরুষং মনসা স্পৃশেৎ।
পূজাকালে চ দেবেশি বেশ্যেব পরিতোষয়েৎ।।- (উত্তর-তন্ত্র)
অর্থাৎ : পূজা-কাল ভিন্ন অন্য সময়ে পর পুরুষকে মনেতেও স্পর্শ করিবে না। দেবেশি! পূজা-কালে বেশ্যার ন্যায় সকলের পরিতোষ করিবে।

এবং তিরুত্তর-তন্ত্রে একেবারে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে–

আগমোক্তপতিঃ শম্ভুরাগমোক্তপতির্গুরূঃ।
স পতিঃ কুলজায়াশ্চ ন পতিশ্চ বিবাহিতঃ।।
বিবাহিতপতিত্যাগে দূষণং ন কুলার্চনে।
বিবাহিতং পতিং নৈব ত্যজেদ্বেদোক্তকর্মণি।।- (তিরুত্তর-তন্ত্র)
অর্থাৎ : আগমোক্ত পতি শিব-স্বরূপ; তিনিই গুরু। সেই পতি কুলস্ত্রীদিগের প্রকৃত পতি; বিবাহিত পতি পতি নয়। কুল-পূজায় বিবাহিত পতি ত্যাগ করিলে দোষ হয় না। কেবল বেদোক্ত কর্মে বিবাহিত পতিকে পরিত্যাগ করিবে না।

        প্রাণতোষিণী-ধৃত বচনে বলা হয়েছে, সাক্ষাৎ কালী-স্বরূপা উক্ত কুলনারীর পূজা করে মদ্য শোধনাদি পূর্বক পান করতে হয়–

সিন্দূরতিলকং ভালে পাণৌ চ মদিরাসবম্ ।
কৃত্বা পিবেদ্গুরূং ধ্যায়ংস্তথা দেবীঞ্চ চিন্ময়ীম্ ।।- (প্রাণতোষিণী-ধৃত বচন)
অর্থাৎ : ললাটে সিন্দূর-চিহ্ন এবং হস্তে মদিরাসব ধারণ করিয়া গুরু ও দেবতার ধ্যান পূর্বক পান করিবে।

এবং শ্যামারহস্যের মতে, হস্তে সুরা-পাত্র ধারণ করে তদ্গত ভাবে বন্দনা করতে হয় এভাবে–

শ্রীমদ্ভৈরবশেখরপ্রবিলসচ্চন্দ্রামৃতপ্লাবিতং
ক্ষেত্রাধীশ্বরযোগিনীসুবগণৈঃ সিদ্ধৈঃ সমারাধিতম্ ।
আনন্দার্ণবকং মহাত্মকমিদং সাক্ষাৎ ত্রিখণ্ডামৃতং
বন্দে শ্রীপ্রথমং করাম্বুজগতং পাত্রং বিশুদ্ধিপ্রদম্ ।।- (শ্যামারহস্য)
অর্থাৎ : মহাদেবের শির-স্থিত, চন্দ্রের অমৃত দ্বারা প্লাবিত, এবং ক্ষেত্রপাল, যোগিনীগণ, দেবগণ ও সিদ্ধগণ কর্তৃক আরাধিত এবং মাহাত্ম্য-স্বরূপ, আনন্দ-সাগর, সাক্ষাৎ ত্রিখণ্ডামৃত, শুদ্ধি-প্রদায়ক ও হস্ত-কমল-স্থিত এই প্রথম পাত্রের বন্দনা করি।

 

        এবার আমরা ভৈরবীচক্রের অনুষ্ঠানের পরবর্তী প্রণালী অবগত হতে স্বামী নিগমানন্দের ‘তান্ত্রিকগুরু’ থেকে কিছু উদ্ধৃতি টানতে পারি। তিনি বলছেন–
‘পূর্বোক্ত প্রকারে ভৈরবীচক্রে পূজাদি করিয়া পান-ভোজনাদি করিবে। প্রথমতঃ আপনার বামভাগে পৃথক্ আসনে স্বীয় শক্তিকে (কুলস্ত্রীকে) সংস্থাপন অথবা একাসনে উপবেশন করিয়া স্বর্ণ, রৌপ্য, কাচ অথবা নারিকেলমালানির্মিত পানপাত্র শুদ্ধিপাত্রের দক্ষিণ আধারোপরি স্থাপন করিতে হইবে। পানপাত্র পাঁচ তোলার কম করিবার নিয়ম নাই, তবে অভাবপক্ষে তিন তোলা করা যাইতে পারে। তদনন্তর মহাপ্রসাদ (?) আনয়ন করিয়া পানপাত্রে সুধা (মদ্য) এবং শুদ্ধিপাত্রে মৎস্যমাংসাদি প্রদান করিবে। তৎপরে সমাগত ব্যক্তিগণের সহিত পানভোজন সমাধা করিবে।
তন্ত্রশাস্ত্রের মদ্যপানের উদ্দেশ্য মত্ততা নহে; দেহস্থ শক্তিকেন্দ্র উদ্বোধন করাই উদ্দেশ্য। প্রথমে আস্তরণের জন্য উত্তম শুদ্ধি গ্রহণ করিবে।
অনন্তর–

স্বস্বপাত্রং সমাদায় পরমামৃতপূরিতম্ ।
মূলাধারাদিজিহ্বান্তাং চিদ্রূপাং কুলকুণ্ডলীম্ ।।
বিভাব্য তন্মুখাম্ভোজে মূলমন্ত্রং সমুচ্চরন্ ।
পরস্পরাজ্ঞামাদায় জুহুয়াৎ কুণ্ডলীমুখে।।
–কুলসাধক হৃষ্টমনে পরমামৃতপূর্ণ স্ব স্ব পাত্র গ্রহণ করিয়া মূলাধার হইতে আরম্ভ করিয়া জিহ্বাগ্র পর্যন্ত কুলকুণ্ডলিনীর চিন্তা করতঃ মুখকমলে মুলমন্ত্র উচ্চারণপূর্বক পরস্পর আজ্ঞা গ্রহণান্তে কুণ্ডলীমুখে পরমামৃত প্রদান করিবে।

বলা বাহুল্য সুষুম্নাপথে ঐ মদ্য ঢালিয়া দিতে হয়। ইহার কৌশল গুরুমুখে শিক্ষা করিয়া ক্রমাভ্যাসে আয়ত্ত করিতে হয়। ঐরূপ কৌশল এবং একতান চিন্তায় কুণ্ডলিনীশক্তি উদ্বোধিতা হয়েন। কিন্তু যদি অতিরিক্ত সুরাপান ঘটে, তাহা হইলে কুলধর্মাবলম্বিগণের সিদ্ধিহানি হইয়া থাকে। যথা–

যাবন্ন চালয়েদ্দৃষ্টির্যাবন্ন চালয়েন্মনঃ।
তাবৎ পানং প্রকুর্বীত পশুপানমতঃপরম্ ।।- (মহানির্বাণ-তন্ত্র)
–যে-কাল পর্যন্ত দৃষ্টি ঘূর্ণিত ও মন চঞ্চল না হয়, তাবৎ সুরাপানের নিয়ম, ইহার অতিরিক্ত পান পশুপানসদৃশ।

       অতএব সুরাপানে যাহার ভ্রান্তি উপস্থিত হয়, সেই পাপিষ্ঠ কৌল নামের অযোগ্য। তবেই দেখা যাইতেছে, কেবল কুণ্ডলিনী-শক্তিকে উদ্বোধিত ও শক্তিসম্পন্ন রাখিতে তন্ত্রে মদ্যপানের ব্যবস্থা। তবে চক্রস্থিত কুলশক্তিগণ মদ্যপান করিবে না।

সুধাপানং কুলস্ত্রীণাং গন্ধস্বীকারলক্ষণম্ ।।- (মহানির্বাণ-তন্ত্র)
–কুলরমণীগণ কেবল মদ্যের আঘ্রাণ মাত্র স্বীকার করিবে, পান করিবে না।

        এইরূপ নিয়মে পান-ভোজন সমাধান্তে শেষতত্ত্ব সাধন করিবে। এই ক্রিয়া অতি গুহ্য ও অপ্রকাশ্য বিধায় এবং অশ্লীলতা দোষাশঙ্কায় সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে পারিলাম না। উপযুক্ত গুরুর নিকটে মুখে মুখে শিক্ষা করিতে হয়। শেষতত্ত্বের সাধনায় সাধক উর্ধ্বরেতা হয় এবং প্রকৃতিজয়ী হইয়া ও আত্মসম্পূর্তি লাভ করিয়া জীবন্মুক্ত হইতে পারে।’- (তান্ত্রিকগুরু)

         উক্ত বর্ণনায় ‘পান-ভোজন সমাধান্তে শেষতত্ত্ব সাধন’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা বোধ করি তন্ত্রের পঞ্চতত্ত্ব সম্পর্কে অবহিতকারী ব্যক্তি বুঝতে অসমর্থ হবেন না। কেননা ইতঃপূর্বে দেখানো হয়েছে, তন্ত্রে ‘পঞ্চতত্ত্ব’ বলতে বুঝায়– মদ্য মাংস মৎস্য মুদ্রা মৈথুন– এই পাঁচটি তত্ত্ব। এই পর্যায়ে কুলার্ণবতন্ত্রের ভাষ্যেও বলা হয়েছে–

পীত্বা মদ্যং পঠেৎ স্তোত্রাং সাধকঃ কুলভৈরবঃ।
কুলস্ত্রীসঙ্গনিরতঃ কুলকার্য সমাচরেৎ।।
অর্থাৎ : কুলভৈরব-স্বরূপ সাধকে মদ্য পান করিয়া স্তব পাঠ করিবে এবং কুল-স্ত্রী সংসর্গে প্রবৃত্ত হইয়া কুল-কার্যের অনুষ্ঠান করিতে থাকিবে।

 

         তার পরে আনন্দোল্লাসের আরম্ভ হয়। এ ব্যাপারের সবিশেষ বর্ণনা প্রকৃতই অনধিকারীর পক্ষে অত্যন্ত অশ্লীল বলে গণ্য হতে পারে। তন্ত্র-শাস্ত্রে এর বিস্তৃত উন্মুক্ত বর্ণনা থাকলেও আমরা বরং তন্ত্র থেকে কিছু কিছু মূলানুগত বিষয় উদ্ধৃত করে এর একটা বিশিষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারি। যেমন, কুমারীতন্ত্রের ষষ্ঠ পটলে (কুমারীতন্ত্র-৬/২১-২৭) ইষ্টদেবতা-স্বরূপ কালিকামন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কিভাবে কুলাচার পালন করতে হবে তার বর্ণনায় বলা হয়েছে–

ব্রাহ্মণস্তাম্রপাত্রে তু মধুমদ্যং প্রকল্পয়েৎ।
নটী কাপালিকা বেশ্যা রজকী-নাপিতাঙ্গনা।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২১)
ব্রাহ্মণী শূদ্রকন্যা চ তথা গোপালকন্যকা।
মালাকারস্য কন্যা চ নবকন্যা প্রকীর্ত্তিতাঃ।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২২)
এতাসু কাঞ্চিদানীয় ততস্তু যোনিমণ্ডলে।
পূজয়িত্বা মহাদেবীং ততো মৈথুনমাচরেৎ।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২৩)
ধর্ম্মাধর্ম্ম-হবির্দীপ্তে আত্মাগ্নৌ মনসা স্রুচা।
সুষুম্নাবর্ত্ননা নিত্যমক্ষবৃত্তির্জুহোম্যহম্ ।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২৪)
স্বাহান্তোহয়ং মহামন্ত্র আরম্ভে পরিকীর্ত্তিতঃ।
ততো জপেস্মহাবিদ্যাং দেবীং ত্রিভুবনেশ্বরীম।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২৫)
যোগকালে পঠেদ্দেবি ইমং মন্ত্রং মহেশ্বরি।
প্রকাশাকাশ-হস্তাভ্যামবলোক্যোন্মনীশ্রুচা।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২৬)
ধর্ম্মাধর্ম্মকলাস্নেহপূর্ণমগ্নৌ জুহোম্যহম্ ।
স্বাহান্তোহয়ং ভবন্মেন্ত্রঃ শুক্রত্যাগে প্রীকীর্ত্তিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র-৬/২৭)
অর্থাৎ :
ব্রাহ্মণ তাম্রপাত্রস্থিত মধুকেই মদ্যরূপে কল্পনা করিবে।
নটী, কাপালিকা, বেশ্যা, রজকী, নাপিতাঙ্গনা, ব্রাহ্মণী, শূদ্রকন্যা, গোপকন্যা এবং মালাকার কন্যা- ইহারা নবকন্যা বা গ্রহণীয়া কুলযুবতী বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। ২১-২২।। এই সকল কুলযুুবতী মধ্যে অন্যতমা কুলযুবতী গ্রহণ করিয়া তাহার শক্তিমণ্ডলে কালিকা দেবীর পূজা করিবে। তৎপর কুলযুবতীর মৈথুনে প্রবৃত্ত হইবে। ২৩।।
মৈথুনে প্রবৃত্ত হইবার পূর্ব্বে “ওঁ ধর্ম্মাধর্ম্ম হবির্দীপ্তে আত্মাগ্নৌ মনসা স্রুচা। সুষুম্নাবর্ত্ননা নিত্যমক্ষবৃত্তি র্জুহোম্যহং স্বাহা” এই মন্ত্র পাঠ করিবে। তৎপর রতি সংযোগকালে ত্রিভুবনেশ্বরী কালিকা দেবীর মন্ত্র জপ করিবে। ২৪-২৫।। হে মনেশ্বরি! তৎপর শুক্রত্যাগ কালে “ ওঁ প্রকাশাকাশ হস্তাভ্যাবমলোক্য নীশ্রুতা। ধর্ম্মাধর্ম্মকলাস্নেহপূর্ণমগ্নৌ জুহোম্যহং স্বাহা।” এই মন্ত্র জপ করিতে করিতে শুক্রত্যাগ করিবে। ২৬-২৭।।

 

         সাধনকালে কুলস্ত্রীই যে দেবীরূপিণী এবং কুলস্ত্রীই যে সাধকের প্রাণ সে সম্পর্কে কুমারীতন্ত্রের অষ্টম পটলে বলা হয়েছে–

স্ত্রিয়ো দেবাঃ স্ত্রিয়ং প্রাণাঃ স্ত্রিয় এব বিভূষণাম্ ।
স্ত্রীমেলনং সদা কার্য্যং সুন্দরীভির্ব্বিশেষতঃ।। (কুমারীতন্ত্র-৮/১২)
অর্থাৎ : সাধনকালে কুলস্ত্রীই দেবীরূপিণী, কুলস্ত্রীই সাধকের প্রাণ এবং কুলস্ত্রীকেই সাধকের ভূষণরূপে গণ্য করিবে। সাধক বিশেষভাবে সর্বদা সুন্দরী কুলস্ত্রীগণের সহিত মিলিত হইবে।

 

         এই সাধনপন্থা যত বিচিত্রগামীই হোক না কেন, এবং সাধকমনে তা যত অভ্রান্তই হোক না কেন, তবুও লোকচক্ষুর সাক্ষাতে এরকম চর্চাকর্ম যে লজ্জার কারণ হতে পারে বা ভিন্নার্থ তৈরি করতে পারে সে বিষয়েও সাধকেরা নিশ্চয়ই সচেতন ছিলেন। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে–

ন নিন্দেন্ন হসেদ্বাপি চক্রমধ্যে মদাকুলান্ ।
এতচ্চক্রগতাং বার্তাং বহির্নৈব প্রকাশয়েত।।
তেভ্যোজনং কুর্বীত নাহিতঞ্চ সমাচরেৎ।
ভক্ত্যা সংরক্ষয়েদেতান্ গোপয়েচ্চ প্রযত্নতঃ।। – (প্রাণতোষিণী)
অর্থাৎ : চক্র-মধ্যে মদিরা-মুগ্ধ ব্যক্তিদিগকে দেখিয়া হাস্য ও নিন্দা করিবে না এবং এই চক্রের বার্তা বাহিরে প্রকাশ করিবে না। তাহাদের নিকটে ভোজন করিবে, অহিত আচরণে বিরত থাকিবে, ভক্তি পূর্বক তাহাদিগকে রক্ষা করিবে এবং যত্ন পূর্বক গোপন করিয়া রাখিবে।

মূলত তন্ত্র-সাধনায় শক্তির দেবী আসলে অন্তর্জাগে মন্ত্রাগম্য এবং বাহ্যপূজায় এই দেবীই কুলস্ত্রী-স্থানে পূজিত হয়ে থাকেন। আর চক্র ও পূজার প্রণালীতে জপ-মন্ত্রের বিশিষ্ট ভিন্নতা ছাড়া কুলাচারের সাথে খুব একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। কেননা, তন্ত্রচর্চায় কুলাচারের মাহাত্ম্য যে সর্বোচ্চ অবস্থানে এবং কুলস্ত্রীর মাধ্যমেই যে সর্বোচ্চ পূজার সাধন হয়ে থাকে, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। যেমন, কুমারীতন্ত্রের অষ্টম পটলেই (কুমারীতন্ত্র-৮/১৬-২৬) কালিকা বা মহাকালীপূজার বিবরণে বলা হচ্ছে–

শ্রীভৈরব উবাচ–
ন জাপকালনিয়মো নার্চ্চাদিষু বলিষ্বপি।
সেচ্ছানিয়য় উক্তোহত্র মহামন্ত্রস্য সাধনে।। ৮/১৬
পূজয়েৎ বিবিধৈঃ পুষ্পৈ-স্তুলসীবর্জ্জিতৈঃ শুভৈঃ।
এবং সংপূজ্য বিধিবৎ ভোজনে কালিকাং জপেৎ।। ৮/১৭
শক্তিং নিশায়াং সংপূজ্য বিধিবৎ সাধকোত্তমঃ।
সিন্দুরভূষণো নিত্যং তথা চৈব দিগম্বরঃ।। ৮/১৮
নারীং দিগম্বরীং কৃত্বা বিপরীতো ভবেত্তদা।
আলিঙ্গনং চুম্বনঞ্চ কুর্য্যাচ্চৈব নিরন্তরম্ ।। ৮/১৯
নির্লজ্জকামবাণেন সৃষ্টিসম্পাদনোৎসুকা।
তস্মিন্ কালে সাধকেন্দ্রো জপেৎ সংক্ষিপ্তমানসঃ।। ৮/২০
সম্ভোগঞ্চ স্বয়ং কুর্ব্বন্ জপেৎ সারস্বতমনুম্ ।
ইত্যাচারপরঃ শ্রীমান্ কুলাচারপরঃ সদা।। ৮/২১
ইহ সা মানবশ্রেষ্ঠঃ পশ্চান্মুক্তো ভবেদ্ ধ্রুবম্ ।
বাগ্মীয়ং সর্ব্ববিদ্যানাং সর্ব্বসারস্বত-প্রদঃ।। ৮/২২
তস্মাৎ ভাব্যা মহাবিদ্যা কুলাচারঃ সুদুর্ল্লভঃ।
অস্য শাস্ত্রপ্রযুক্ত-শ্চেদাচারং ন করোতি যঃ।। ৮/২৩
সংশয়াৎ স পাপিষ্ঠো ন বিদ্যাফলমশ্নুতে।
রাজরাজেশ্বরী বিদ্যা কথিতা ভুবি দুর্লভা।। ৮/২৪
যস্য জ্ঞানপ্রভাবেন কলয়ামি জগৎ ত্রয়ম্ ।
শিবশক্তিরূপরা দেবী নিত্যানন্দস্বরূপিণী।। ৮/২৫
সারস্বতপ্রদা দেবী নিত্যানিত্যস্বরূপিণী।
যাং জ্ঞাত্বা মুক্তিমাপ্লোতি কিমন্যৎ কথয়ামি তে।। ৮/২৬
অর্থাৎ :
যোগেশ্বর শ্রীভৈরব বলছেন–
এই সাধনায় জপ, অর্চ্চনা বা বলি প্রভৃতি কোন বিষয়েই কালাকাল বিচারের কোন আবশ্যকতা নাই। এই মহামন্ত্রের সাধনে স্বেচ্ছাচারই একমাত্র নিয়ম। ৮/১৬।। পূজাকালে বিবিধপ্রকার শুভ (মঙ্গলসূচক) পুষ্প দ্বারা মহাকালীর পূজা করিবে। পূজার্থে তুলসী সর্ব্বদা বর্জ্জন করিবে। এইরূপে যথাবিধি কালিকার পূজা করিয়া, ভোজনকালেও কালিকা মন্ত্র জপ করিবে। ৮/১৭।।
সাধকশ্রেষ্ঠ নিশাকালে কুলস্ত্রীকে শক্তিরূপে গ্রহণ করিয়া যথাবিধি তাহাকে পূজা করিবে। প্রত্যহ সিন্দুরভূষণে ভূষিত হইয়া সাধক দিগম্বর এবং কুলস্ত্রীকে দিগম্বরীরূপে গ্রহণ করিয়া বিপরীত-রতিতে প্রবৃত্ত হইবে। সাধক নিরবচ্ছিন্নভাবে কুলস্ত্রীকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করিবে। ৮/১৮-১৯।। নির্লজ্জভাবে কামবাণে পীড়িত হইয়া যখন কুলস্ত্রী সৃষ্টি-সম্পাদনে সমুৎসুকা হয়, তখন সাধকশ্রেষ্ঠ সংক্ষিপ্ত মানসিক জপে প্রবৃত্ত হইবে। ৮/২০।। অথবা সাধক নিজে কুলস্ত্রী-সম্ভোগে প্রবৃত্ত হইলেও রতিকালে কালিকা মন্ত্র জপ করিতে থাকিবে। এইরূপে শ্রীমান (ভাগ্যবান) সাধক সর্বদা কুলাচারপরায়ণ হইয়া কালিকা সাধনায় প্রবৃত্ত হইবে। ৮/২১।।
এইরূপে যে ব্যক্তি মহাকালীর সাধনা করে, সে ব্যক্তি ইহকালে মানবশ্রেষ্ঠ এবং দেহান্তে মুক্তি লাভ করে। ইহা ধ্রুব সত্য। এই মন্ত্রপ্রভাবে সাধক বাগ্মী সর্ব্ববিদ্যা এবং জ্ঞানের অধীশ্বর হইয়া থাকে। ৮/২২।। সুতরাং সর্বদা সুদুর্লভ কুলাচারক্রম পদ্ধতিতে এই মহাবিদ্যার সাধনা করিবে। তন্ত্রশাস্ত্রোক্ত শক্তিসাধনায় প্রবৃত্ত হইয়া যে ব্যক্তি কুলাচারে রত হয় না, বা কুলাচার সম্বন্ধে সংশয় পোষণ করে, সে ব্যক্তি মহাপাপিষ্ঠ এবং তাহার সাধনাও ফলবতী হয় না। মহাকালী মন্ত্র, সর্ব্বমন্ত্রশ্রেষ্ঠ এবং পৃথিবীতে এই মন্ত্র অতি দুর্লভ। ৮/২৩-২৪।।
এই মন্ত্রপ্রভাবে আমি ত্রিজগত পালন করিতেছি। দেবী মহাকালী স্বয়ং শিব ও শক্তিস্বরূপা এবং নিত্যানন্দ-স্বরূপিণী। দেবী মহাকালী জ্ঞানদায়িনী এবং নিত্যানিত্য সমস্তই তাঁহার রূপ। কালিকাদেবীর স্বরূপ জ্ঞাত হইলে সাধক মুক্তিলাভ করে। ৮/২৫-২৬।।

 

          তন্ত্রে এরকম আরেকটি সাধনার নাম লতা-সাধনা। এ সম্পর্কে ভিন্নত্র আলোচিত হয়েছে বিধায় এখানে এ আলোচনার বিস্তৃতি ঘটানো বাহুল্য হবে। তবে এটিও কুলাচার-অনুরূপ সাধনাই বলতে হয়। এ প্রসঙ্গে মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের বক্তব্য হলো–
‘তন্ত্রের মধ্যে লতাসাধনাদি অধিকতর লজ্জাকর ও ঘৃণাকর যে সমস্ত ব্যাপারের বর্ণনা আছে, পাঠকগণের সমক্ষে তাহা উপস্থিত করা কোন রূপেই শোভা পায় না। যাঁহাদের জানিবার ইচ্ছা হয় কুলার্ণব, গুপ্তসাধন-তন্ত্র, নিরুত্তর-তন্ত্র, শ্যামারহস্য, প্রাণতোষিণী প্রভৃতি দেখিলেই জানিতে পারিবেন। লতাসাধনে একটি স্ত্রীলোককে ভগবতী জ্ঞান করিয়া মদ্য-পানাদি সহকারে তাহার সাধন করিতে হয়। উহাতে তাহার শরীরের গুহ্যাগুহ্য নানাস্থানে মন্ত্র-জপ এবং আপনার ও তাহার অঙ্গ-বিশেষের পূজা বন্দনাদি পুরঃসর স্ত্রী-পুরুষ-ঘটিত ব্যাপারানুষ্ঠানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হইয়া থাকে।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়)

        আমাদের আধুনিক রুচি ও নীতিবোধের কাছে এ জাতীয় চিন্তাধারা বীভৎস কামবিকারের পরিচায়ক বলে মনে হতে পারে নির্দ্বিধায়। কিন্তু এই সাধনচর্চার উৎসকাল ও তার পরম্পরা বিবেচনায় এটিকে সেই সময়কালের বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতেই দেখা যৌক্তিক বলে মনে করি। দত্ত মহাশয়ের কথিত প্রায় অনুরূপ একটি সাধন-প্রণালীর বর্ণনা আমরা দেখতে পাই গুপ্তসাধনতন্ত্র’র চতুর্থ পটলে (গুপ্তসাধনতন্ত্র-৪/২-৯)। বলা হচ্ছে–

শ্রীশিব উবাচ–
শৃণু পার্ব্বতি বক্ষ্যামি অতিগুপ্ততরং মহৎ।
প্রকাশাৎ সিদ্ধিহানিঃ স্যাত্তস্মাদ্ যত্নেন গোপয়েৎ।। ৪/২
স্বশক্তিং পরশক্তিং বা দীক্ষিতাং যৌবনান্বিতাম্ ।
বিদগ্ধাং শোভনাং শয্যাং ঘৃণালজ্জাবিবর্জ্জিতাম্ ।। ৪/৩
তামানীয় সাধকেন্দ্রো দদ্যাৎ পাদ্যাদিকং শুভম্ ।
পঞ্চাচারেণ তাং শক্তিং পূজায়িত্বা যথাবিধি।। ৪/৪
শতং শীর্ষে শতং ভালে শতং সিন্দূরমণ্ডলে।
শতং মুখে শতং কণ্ঠে শতং হৃদয়মণ্ডলে।। ৪/৫
শতযুগ্মং স্তনদ্বন্দ্বে শতং নাভৌ জপেৎ সুধীঃ।
যোনিপীঠে শতং জপ্ত্বা সাধকঃ স্থিরমানসঃ।। ৪/৬
এবং সহস্রং সংজপ্য দেবীং তত্র বিচিন্তয়েৎ।
স্বয়ং শিবস্বরূপশ্চ চিন্তয়েৎ সাধকোত্তমঃ।। ৪/৭
শিবমন্ত্রেণ দেবেশি স্বলিঙ্গং পূজয়েদথ।
তাম্বুলং তন্মুখে দত্ত্বা সাধকো হৃষ্টমানসঃ।। ৪/৮
তদনুজ্ঞাং সমাদায় যোনৌ লিঙ্গং বিনিক্ষিপেৎ। ৪/৯

স্বাহেত্যনেন মন্ত্রেণ পূর্ণাহুতিং সমাচরেৎ।
শুক্রোৎসারণকালে চ দেব্যৈ শুক্রং সমর্পয়েৎ।। ৪/১৩
এবং কৃতে মন্ত্রসিদ্ধির্নাত্র কার্য্যা বিচারণা।
যং যং প্রার্থয়তে কামং তং তং প্রপ্নোতি নিশ্চিতম্ ।। ৪/১৪
ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ :
শিব কহিলেন, পার্বতী! আমি অতি গুপ্ততর সাধনোপায় বলিতেছি, শ্রবণ কর। এই সাধন প্রকাশ করিলে সিদ্ধিকার্যের ব্যাঘাত জন্মে, অতএব সর্বপ্রযত্নে ইহা গোপন রাখিবে। ৪/২।।
স্বীয় শক্তি হউক, কি পরশক্তিই হউক, দীক্ষিতা নবযৌবনান্বিতা নানা গুণশালিনী পরমসুন্দরী ঘৃণালজ্জাবিবর্জ্জিতা রমণীকে আপন শয্যায় আনয়ন করিয়া পাদ্যাদি বিবিধ উপহারদ্বারা ভক্তিপূর্বক অর্চ্চনা করিবে। এইরূপে পঞ্চাচারক্রমে সেই শক্তিকে যথাবিধি অর্চ্চনা করিয়া তাহার মস্তকে শতবার, কপালে শতবার, সিন্দুরমণ্ডলে শতবার, মুখে শতবার, কণ্ঠে শতবার, হৃদয়মণ্ডলে শতবার, স্তনদ্বয়ে দ্বিশতবার এবং নাভিতে শতবার ইষ্টমন্ত্র জপ করিতে………হইবে। অনন্তর সাধক একাগ্রচিত্ত হইয়া সেই শক্তির যোনি পীঠে শতবার ইষ্টমন্ত্র জপ করিবে। ৩-৬।। সাধক এইরূপে সেই শক্তির দেহে সহস্র জপ করিয়া তাহাকে ইষ্ট দেবতাস্বরূপ চিন্তা করিবে এবং আপনিও সাক্ষাৎ শিব এইরূপ জ্ঞান করিবে। ৭।। অনন্তর আপন মুখে এবং সেই শক্তির মুখে তাম্বুল প্রদান করিয়া শক্তির অনুজ্ঞাগ্রহণান্তে মূলগ্রন্থের লিখিত বিধি অবলম্বনপূর্বক ‘সাধন’ করিবে। ৮-৯।।…
তৎপরে মূলের লিখিত প্রকাশাকাশমন্ত্রাভ্যাং ইত্যাদি মন্ত্রের অন্তে স্বাহাশব্দ প্রয়োগ করিয়া পূর্ণাহুতি দিতে হইবে এবং শুক্রোৎসারণকালে মহাদেবীকে সেই শুক্র নিবেদন করিবে। ১৩।। যে সাধক এইরূপ সাধন করেন, তাঁহারই নিশ্চয় মন্ত্রসিদ্ধি হইয়া থাকে, ইহাতে অন্যথা মনে করিবে না। উক্তরূপে সাধনদ্বারা সিদ্ধিলাভ হইলে সাধক যে যে কামনা করে, নিশ্চয়ই সেই সেই কাম্যদ্রব্য পাইতে পারে। ১৪।।

         এখানে বোধকরি বলা অসঙ্গত হবে না যে, তান্ত্রিক সাধনদৃষ্টি বস্তুত শাক্ত দৃষ্টিভঙ্গি-প্রসূত গুহ্য আচার-সমষ্টি। দীর্ঘ ব্যাপ্তিকাল জুড়ে এই সাধনতন্ত্রে নানাবিধ মত ও পথের সম্মিলন হয়ে পর্যায়ক্রমে তার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে নানান সাধনাঙ্গের বিচিত্র সমাহার। যদিও তার সমন্বিত বিশ্ববীক্ষায় খুব একটা মৌলিক প্রভেদ ঘটেনি বলেই মনে হয়। বস্তুত শাক্ত দৃষ্টিভঙ্গির যে প্রকৃতিগত বিশ্ববীক্ষা, তার সমরূপে দেহকেন্দ্রিক উপাসনা ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সাধনতান্ত্রিক কল্পিত উপায় হলো তন্ত্রাচার। এক্ষেত্রে আরো মজার ব্যাপার হলো, ভারতীয় দার্শনিক বিশ্ববীক্ষায় বৈদান্তিক দ্বৈত ও অদ্বৈত উভয় মতবাদই শাক্তধর্মে স্থান পেতে দেখা যায়। এ প্রেক্ষিতে বিদ্বান গবেষক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী–

       ‘তন্ত্রসাধনার দুটি বিশেষ কুল বা সম্প্রদায়ের প্রচলন আছে– শ্রীকুল ও কালীকুল। শ্রীকুল অবলম্বীরা কিছুটা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী।… শিবাদ্বৈতবাদের…প্রণেতা শ্রীকণ্ঠের ব্রহ্মসূত্রভাষ্য এবং অপ্পয় দীক্ষিতকৃত শিবার্কমণিদীপিকা তাঁরা মেনে থাকেন। তাঁরা শিবের সৎ ও চিৎ প্রকাশত্ব স্বীকার করেন এবং শক্তিকে বিমর্শিনী অর্থাৎ শিবের স্বতঃসিদ্ধা স্পন্দস্বরূপা বলে মনে করেন। কালীকুল অবলম্বীরা সাধারণত অদ্বয়বাদী। তাঁরা বলেন সচ্চিদানন্দরূপে দেবী ব্রহ্মস্বরূপিণী এবং তাঁর মায়া বিবর্ত, পরিণামী নয়। তাঁদের মতে শিবশক্তিতত্ত্ব গুণাতীত, নির্দ্বন্দ্ব ও একমাত্র উপলব্ধিগম্য।’
‘শাক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর মূল কথা হল চরম সত্তা, যা দেশ, কাল ও কারণাতীত বিশুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ, প্রকাশ রূপে বর্তমান। বিমর্শ শক্তি এই প্রকাশেরই ক্রিয়াসম্পর্কীয় স্বাতন্ত্র্য, যদিও প্রকৃতপক্ষে এই শক্তি, তাঁর স্বরূপ অর্থাৎ চরম সত্তার সঙ্গে অভিন্ন, তাঁরই মধ্যে নিহিত এবং তাঁরই অবিচ্ছেদ্য গুণরূপে প্রকাশিত। শক্তির দুটি অবস্থা আছে– নিষ্ক্রিয় এবং ক্রিয়াশীল। শক্তি যখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে তখন বলা হয় যে বিমর্শ প্রকাশে লীন হয়ে আছে, কিন্তু শক্তি যখন জাগ্রত তখন চরম সত্তাও স্বয়ং চেতন হন। তখন তাঁর আত্মজ্ঞান অহম রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র বিশ্বজগৎ দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবির ন্যায় এই অহমে প্রতিফলিত হয়। চরম সত্তা যাঁর প্রকাশ শিব এবং বিমর্শ শক্তি, একই সঙ্গে বিশ্বময় ও বিশ্বাতীত। দুই-এ মিলে এক অখণ্ড সত্তা। অহমের প্রথম অক্ষর, বর্ণমালার প্রথম অক্ষর অ প্রকাশকে সূচিত করে, দ্বিতীয় অক্ষর, বর্ণমালার শেষ অক্ষর হ, বিমর্শকে সূচিত করে, এবং এই দুই-এর ঐক্য যা অ থেকে হ পর্যন্ত বর্ণমালার সকল অক্ষরের ঐক্যকে বোঝায় তা অনুস্বর বা বিন্দু।’
‘এই চরম সত্তার সঙ্গে শক্তি বা কলা চিরকালীন ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছেন। কলা শব্দটির অর্থ বিশ্বাতিক্রমী সর্বাতীত শক্তি। এই শক্তির প্রথম বিকার ইচ্ছা। তৈলবীজের মধ্য হতে যেমন তৈল নিষ্ক্রান্ত হয় তেমনই সৃষ্টির প্রারম্ভেই শক্তির আবির্ভাব হয়। এই শক্তির আবির্ভাব নিদ্রায় অচেতনতার পর জাগ্রত ব্যক্তির স্মৃতি পুনরাবির্ভাবের মত। সত্তা এবং শক্তি উভয়েই চিৎ বা শুদ্ধ জ্ঞান স্বরূপ, তবে শক্তি সকল বস্তুর উপর ক্রিয়া করেন বলে তাদেরই প্রকৃতি অনুসারে কখনও জ্ঞান এবং কখনও ক্রিয়ারূপে প্রতিভাত হন। দ্বৈতবাদী শাক্তদের মতে বিন্দু হচ্ছে নিত্য জড় বস্তু কিন্তু শক্তির ক্রিয়ার অধীন। অদ্বৈতবাদী শাক্তদের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য এখানে যে যদিও তাঁরা শিবকে শক্তির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বলে মনে করেন, এবং তাঁদের এক ঈশ্বরসত্তার দুদিক বলে মনে করেন, বিন্দু বা জড়বস্তুকে তাঁরা শিবশক্তি অন্বয়ের থেকে পৃথক করে দেখেন। তাঁদের মতে বিন্দু শিব ও শক্তির মতই নিত্য, সৃষ্টি বিষয়ে শিব কর্তা, শক্তি তাঁর যন্ত্র এবং বিন্দু জড় উপাদান, শক্তি জড়স্বভাব নয় বলে ক্রিয়ার সময় তার কোন পরিবর্তন হয় না, কিন্তু বিন্দুতে হয়ে থাকে।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৭০-৭১)

(চলবে…)

[আগের পোস্ট : তন্ত্রে ষট্চক্র-ভেদ] [*] [পরের পোস্ট : তন্ত্রে মারণ-উচাটন]

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 346,257 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 113 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: