h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

তন্ত্র-সাধনা-০৯ : তন্ত্রের সপ্ত-আচার

Posted on: 18/10/2017


12039374_596710877133637_3107122657114716968_n

তন্ত্র-সাধনা-০৯ : তন্ত্রের সপ্ত-আচার
রণদীপম বসু

আচার বলতে শাস্ত্রবিহিত অনুষ্ঠেয় কতকগুলি কার্যকে বোঝায়। অর্থাৎ শাস্ত্রে যে কার্যগুলি বিধেয় বলে নির্দিষ্ট আছে এবং অবশ্যই যার অনুষ্ঠান করতে হবে, তাকেই আচার বলে। আবার শাস্ত্রবিধি-বিগর্হিত কার্যকেও আচার বলে, কিন্তু তা কদাচার। অতএব আচার বলতে শাস্ত্রবিধিবিহিত অনুষ্ঠেয় কার্যসমষ্টিকেই বুঝিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বক্তব্য হলো–
‘তন্ত্রে সাতটি আচারকে স্বীকার করা হয়, কুলার্ণব মতে সেগুলি হল বেদ, বৈষ্ণব, শৈব, দক্ষিণ, বাম, সিদ্ধান্ত ও কৌল। প্রথম তিনটি পশুভাবের মানুষদের জন্য, চতুর্থ ও পঞ্চমটি বীরভাবের মানুষদের জন্য, ষষ্ঠ ও সপ্তমটি দিব্যভাবের মানুষদের জন্য। প্রথম আচারটি হল দেহ ও মনের শুচিতার জন্য, দ্বিতীয়টি ভক্তির জন্য, তৃতীয়টি জ্ঞানের জন্য, চতুর্থটি প্রথম তিনটির সমন্বয়, পঞ্চমটি ত্যাগের জন্য, ষষ্ঠটি ত্যাগের উপলব্ধির জন্য এবং সপ্তমটি মোক্ষের জন্য নির্দিষ্ট। পরশুরামকল্পে বলা হয়েছে প্রথম পাঁচটি ক্ষেত্রে গুরুর সাহচর্য ও নির্দেশ লাগে, কিন্তু শেষ দুটি ক্ষেত্রে সাধক স্বাধীন। আচারের এই সাতটি স্তরকে অন্যভাবে বলা হয় আরম্ভ, যৌবন, প্রৌঢ়, প্রৌঢ়ান্ত, উন্মনী ও অনবস্থা। সৌন্দর্যলহরীর টীকাকার লক্ষ্মীধর আবার অন্যরকম উপাসক ভাগ করেছেন– সময়াচার, মিশ্রাচার এবং কৌলাচার।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৬৮)

           তন্ত্রশাস্ত্রে দীক্ষিত শক্তি-উপাসকেরা সাধারণত পশ্বাচারী ও বীরাচারী নামক দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিলেন। মহাশয় অক্ষয় কুমার দত্তের পর্যবেক্ষণে–
‘পশুভাব ও পশ্বাচারের সহিত বীরভাব ও বীরাচারের বিশেষ এই যে বীবভাবে ও বীরাচারে মদ্য মাংসের ব্যবহার আছে, পশুভাবে ও পশ্বাচারে তাহা নিষিদ্ধ। কুলার্ণবে ঐ দুই প্রধান আচারকে বিভাগ করিয়া সাত প্রকার আচার নিষ্পন্ন করা হইয়াছে।’- (ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়)
দত্ত মহাশয়ের উদাহৃত কুলার্ণবতন্ত্রের পঞ্চম খণ্ডে প্রদত্ত শ্লোকটি হলো–

সর্বেভ্যশ্চোত্তমা বেদা বেদেভ্যো বৈষ্ণবং মহৎ।
বৈষ্ণবাদুত্তমং শৈবং শৈবাদ্দক্ষিণমুত্তমম্ ।।
দক্ষিণাদুত্তমং বামং বামাৎ সিদ্ধান্তমুত্তমম্ ।
সিদ্ধান্তাদুত্তমং কৌলং কৌলাৎ পরতরং ন হি।।- (কুলার্ণবতন্ত্র)
অর্থাৎ : সর্বাপেক্ষা বেদাচার উত্তম, বেদাচার অপেক্ষা বৈষ্ণবাচার উত্তম, বৈষ্ণবাচার অপেক্ষা শৈবাচার উত্তম, শৈবাচার অপেক্ষা দক্ষিণাচার উত্তম, দক্ষিণাচার অপেক্ষা বামাচার উত্তম, বামাচার অপেক্ষা সিদ্ধান্তাচার উত্তম, সিদ্ধান্তাচার অপেক্ষা কৌলাচার উত্তম, কৌলাচারের পর আর নাই।

        অতএব, কুলার্ণব তন্ত্রে শাক্ত সম্প্রদায়ের সাতটি আচার বা বিভাগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলি হলো– বেদাচার, বৈষ্ণবাচার, শৈবাচার, দক্ষিণাচার, বামাচার, সিদ্ধান্তাচার ও কৌলাচার। কোন্ আচার কিরূপ তন্ত্রে তার লক্ষণ সবিস্তারে লিখিত আছে। তবে আগেই উল্লেখ করা আবশ্যক যে, বেদাচার শব্দে এখানে বৈদিক কর্মের অনুষ্ঠানকে বুঝায় না; বরং তন্ত্রে আচারবিশেষ বেদাচার বলে উক্ত হয়েছে।

           বেদাচার : নিত্যতন্ত্রের বর্ণনানুযায়ী বেদাচারপরায়ণ তান্ত্রিক সাধক ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে গুরুর নাম স্মরণপূর্বক আনন্দনাথের নাম উচ্চারণ ও তাঁকে প্রণাম করবেন এবং সহস্রদলপদ্মে ধ্যান করে পঞ্চোপচারে তাঁর পূজা করবেন। পরে বাগ্ভব বীজ (ঐং) মন্ত্র দশ বা ততোধিকবার জপ করে পরম-কলা কুলকুণ্ডলিনীশক্তিকে ধ্যান করবেন। তারপর যথাশক্তি মূলমন্ত্র জপ করে, জপ শেষে বহির্গমন করে নিত্যকর্ম-বিধানানুসারে ত্রিসন্ধ্যা স্নান ও সমস্ত কর্ম করবে। রাত্রিতে দেবপূজা করবে না। পর্বদিনে মৎস্য, মাংস পরিত্যাগ করবে এবং ঋতুকাল ছাড়া স্ত্রীগমন করবে না। যথাবিহিত অন্যান্য বৈদিক কর্মের অনুষ্ঠান করবে। নিত্যাতন্ত্রে এইভাবে বলা হয়েছে–

বেদাচারং প্রবক্ষ্যামি শৃণু সর্বাঙ্গসুন্দরি।
ব্রাহ্মে মুহূর্তে উত্থায় গুরুং নত্বা স্বনামভিঃ।।
আনন্দনাথশব্দান্তৈঃ পূজয়েদথ সাধকঃ।
সহস্রারাম্বুজে ধ্যাত্বা উপচারৈস্তু পঞ্চভিঃ।
প্রজপ্য বাগ্ভবম্বীজম্ চিন্তয়েৎ পরামাঙ্কলাম্ ।। (নিত্যাতন্ত্র)
অর্থাৎ : সর্বাঙ্গসুন্দরি! বেদাচার প্রকাশ করি, শ্রবণ কর। সাধক ব্রাহ্ম-মুহূর্তে গাত্রোত্থান পূর্বক গুরুর নামান্তে ‘আনন্দনাথ’ এই শব্দ উচ্চারণ করিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিবে, সহস্রার পদ্মেতে ধ্যান করিয়া পঞ্চ উপচার দ্বারা পূজা করিবে এবং বাগ্ভব বীজ অর্থাৎ ঐ মন্ত্র জপ করিয়া পরম কলা শক্তিকে চিন্তা করিবে। ইত্যাদি।

 

          বৈষ্ণবাচার : বৈষ্ণবাচার অনেকাংশে বেদাচারের ন্যায়, এখানে মৈথুন বা এ-সম্পর্কিত জল্পনা নিষিদ্ধ, এবং নিন্দা, কপটাচরণ, হিংসা, মাংসভোজন ইত্যাদি বর্জনীয়। রাত্রে মালা-জপ ও পূজা-কার্যও বর্জনীয়। শ্রীবিষ্ণুদেবের পূজা এবং সমস্ত জগৎ বিষ্ণুময় চিন্তা করা এ আচারের জ্ঞাতব্য। নিত্যাতন্ত্রের প্রথম পটলে বৈষ্ণবাচার সম্বন্ধে বলা হয়েছে–

বেদাচার ক্রমেণৈব সদা নিয়তত্পরঃ।
মৈথুনং তত্কথালাপং কদাচিন্নৈব কারয়েৎ।
হিংসাং নিন্দাঞ্চ কৌটিল্যং বর্জয়েন্মাংসভোজনম্ ।
রাত্রৌ মালাঞ্চ যন্ত্রঞ্চ স্পৃশেন্নৈব কদাচন।।- (নিত্যাতন্ত্র)
অর্থাৎ : বেদাচারের ব্যবস্থানুসারে সর্বদা নিয়মিত কার্য করিতে তৎপর থাকিবে। কদাচ মৈথুন ও তৎসংক্রান্ত কথার জল্পনাও করিবে না। হিংসা, নিন্দা, কুটিলতা, মাংস-ভোজন, রাত্রিতে মালা ও যন্ত্রস্পর্শ এই সমুদায় পরিত্যাগ করিবে।

 

          শৈবাচার : শৈব তথা শক্ত্যাচারে বেদাচারের বিধান, তবে শৈবে পশুঘাত নিষিদ্ধ হলেও শাক্তে পশুবলি নিষিদ্ধ নয়। সর্বকর্মে শিবনাম স্মরণ করা এবং ব্যোম্ ব্যোম্ শব্দ দ্বারা গালবাদ্য করা শৈবাচারের বিধান। নিত্যাতন্ত্রের প্রথম পটলে বলা হয়েছে–

বেদাচারক্রমেণৈব শৈবে শাক্তে ব্যবস্থিতম্ ।
তদ্বিশেষং মহাদেবী কেবলং পশুঘাতনম্ ।।- (নিত্যাতন্ত্র)
অর্থাৎ : বেদাচারের নিয়মানুসারে শৈব ও শক্ত্যাচারের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। মহাদেবি! শাক্তের বিশেষ এই যে, তাহাতে পশু-হত্যার বিধান আছে।

 

            দক্ষিণাচার : দক্ষিণাচারে বেদাচারের নিয়ম পালনীয়, এবং ভগবতীর পূজা ও রাত্রে বিজয়া (সিদ্ধি) গ্রহণ করে গদ্গদ্ চিত্তে মন্ত্রজপ অবশ্য কর্তব্য। চতুষ্পথে, শ্মশানে, শূন্যাগারে, নদীতীরে, মৃত্তিকাতলে, পর্বতগুহায়, দীর্ঘিকাতটে, শক্তিক্ষেত্রে, পীঠস্থলে, আমলকী বৃক্ষতলে, অশ্বত্থ বা বিল্বমূলে বসে মহাশঙ্খমালা (নরাস্থিমালা) দ্বারা জপকর্ম করাও দক্ষিণাচারে বিধেয়। নিত্যাতন্ত্র প্রথম পটলে বলা হয়েছে–

বেদাচারক্রমেণৈব পূজয়েৎ পরমেশ্বরীম্ ।
স্বীকৃত্য বিজয়াং রাত্রৌ জপেন্মন্ত্রমনন্যধীঃ।।- (নিত্যাতন্ত্র)
অর্থাৎ : বেদাচারের নিয়মানুসারে ভগবতীর পূজা করিবে এবং রাত্রিযোগে বিজয়া গ্রহণ করিয়া তৎগত-চিত্তে মন্ত্র জপ করিবে।

 

          বামাচার : বামাচার-পরায়ণ সাধক দিবসে ব্রহ্মচর্য এবং রাত্রে মদ্য-মাংসাদি ‘পঞ্চতত্ত্ব’ ও ‘খপুস্প’ দ্বারা কুলস্ত্রীর পূজা করবে। তবেই তা বামাচার হবে। কুলস্ত্রী বামাস্বরূপা পরমাশক্তির প্রতীক। এই বামাচারক্রিয়া সর্বদা মাতৃজারবৎ (মাতৃযোনির মতো) গোপনীয়। আচারভেদ-তন্ত্রে বলা হচ্ছে–

পঞ্চতত্ত্বং খপুষ্পঞ্চ পূজয়েৎ কুলয়োষিতম্ ।
বামাচারোভমেত্তত্র বামা ভূত্বা যজেৎ পরাম্ ।।- (আচারভেদ-তন্ত্র)
অর্থাৎ : কুলস্ত্রীর পূজা করিবে; তাহাতে মদ্য-মাংসাদি পঞ্চতত্ত্ব ও খপুষ্প ব্যবহার করিতে হইবে। ইহা হইলে বামাচার হইবে। বামা-স্বরূপা হইয়া পরমা শক্তির পূজা করিবে।

 

          এখানে উল্লেখ্য, পঞ্চতত্ত্বের আরেক নাম পঞ্চ-মকার– মৎস্য, মাংস, মদ্য, মুদ্রা ও মৈথুন। মুদ্রা বলতে মদ্যের সাথে যে উপকরণ ভক্ষিত হয় তাকেই বুঝায়। বামাচারী তান্ত্রিকেরা মদ্য সহ মৎস্য, মাংস ব্যতীত ‘চালভাজা’ জাতীয় দ্রব্য ভক্ষণ করেন, তা মুদ্রা বলে পরিচিত। শ্যামারহস্যের উক্তি অনুযায়ী বামাচারীদের এই পঞ্চ-মকার মহাপাপ বিনাশ করে–

মদ্যং মাংসঞ্চ মৎস্যঞ্চ মুদ্রা মৈথুনমেব চ।
মকারপঞ্চকঞ্চৈব মহাপাতকনাশনম্ ।। (শ্যামারহস্য)
অর্থাৎ : মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন– এই পঞ্চমকারে মহাপাতক বিনাশ করে।

          তন্ত্রে খপুষ্পের অর্থ রজঃস্বলা স্ত্রীলোকের রজ। প্রথম রজ, সধবা স্ত্রীর রজ, বিধবা নারীর রজ এবং চণ্ডালীর রজ যথাক্রমে স্বয়ম্ভূপুষ্প, কুণ্ডপুষ্প, গোলকপুষ্প এবং বজ্রপুষ্প নামে অভিহিত। ঘোর বামাচারী তান্ত্রিক উপাসনায় এসবের আনুষ্ঠানিক ব্যবহার প্রশস্ত বলে বিবেচিত হতো। আর তন্ত্রে কুলস্ত্রী বা কুলকন্যা বলতে নয় প্রকার স্ত্রীলোক বুঝায়– নটী, কাপালী, বেশ্যা, রজকী, নাপিতের ভার্যা, ব্রাহ্মণী, শূদ্রকন্যা, গোপকন্যা, মালাকার-কন্যা। এ-বিষয়ে তান্ত্রিক আচার-সাধন প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা করা হবে।

             সিদ্ধান্তাচার : সিদ্ধান্তাচার অনেকাংশে বামাচারের মতোই; এতে বামাচারে ব্যবহৃত সকল প্রকার দ্রব্যই (পঞ্চতত্ত্ব ও খপুস্পাদিসহ) মন্ত্রের সাহায্যে শোধন করে দেবীর প্রীতিকর যে পঞ্চতত্ত্ব তা পশুশঙ্কা বর্জন পূর্বক প্রসাদস্বরূপ সেব করবে। এই আচারের সাধনজন্য পশুহত্যা দ্বারা (যজ্ঞাদির ন্যায়) কোন হিংসাদোষ হবে না। সর্বদা রুদ্রাক্ষ বা অস্থিমালা ও কপালপাত্র (মড়ার মাথার পাত্র) ধারণ করবে এবং ভৈরব-বেশ ধারণপূর্বক নির্ভয়ে প্রকাশ্য স্থানে বিচরণ করবে। নিত্যাতন্ত্রের প্রথম পটলে মহাদেব বলছেন–

শুদ্ধশুদ্ধং ভবেৎ শুদ্ধং শোধনদেব পার্বতি।
এতদেব মহেশানি সিদ্ধান্তাচারলক্ষণম্ ।।- (নিত্যাতন্ত্র)
অর্থাৎ : পার্বতি! শুদ্ধ কি অশুদ্ধ সকল দ্রব্যই শোধন দ্বারা শুদ্ধ হইয়া থাকে। মহেশানি! সিদ্ধান্তাচারের এই লক্ষণ।

এবং সমাচারতন্ত্রের দ্বিতীয় পটলে বলা হয়েছে–

দেবপূজারতোনিত্যং তথা বিষ্ণুপরোদিবা।
নক্তং দ্রব্যাদিকং সর্বে যথালাভেন চোত্তমম্ ।।
বিধিবৎ ক্রিয়তে ভক্ত্যা স সর্বঞ্চ ফলং লভেৎ।।- (সমাচারতন্ত্র)
অর্থাৎ : যে ব্যক্তি অহরহ দেব-পূজায় অনুরক্ত থাকিয়া এবং দিবা-ভাগে বিষ্ণু-পরায়ণ হইয়া রাত্রি-কালে সাধ্যানুসারে ও ভক্তি-সহকারে যথাবিধি মদ্যাদি দান ও সেবন করে, সেই সিদ্ধান্তাচারী সমস্ত ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকে।

 

          কৌলাচার : কৌলাচারের কোন নিয়ম নাই। স্থানাস্থান, কালাকাল ও কর্মাকর্মের কিছুমাত্র বিচার নাই। নিত্যাতন্ত্রের তৃতীয় পটলে কৌলাচার সম্বন্ধে বলা হয়েছে–

দিক্কালনিয়মোনাস্তি তিথ্যাদিনিয়মোন চ।
নিয়মোনাস্তি দেবেশি মহামন্ত্রস্য সাধনে।।
ক্বচিৎ শিষ্টঃ ক্বচিৎ ভ্রষ্ট ক্বচিৎ ভূতপিশাচবৎ।
নানাবেশধরাঃ কৌলাঃ বিচরন্তি মহীতলে।
কর্দমে চন্দনেহভিন্নং পুত্রে শত্রৌ তথা প্রিয়ে।
শ্মশানে ভবনে দেবি তথৈব কাঞ্চনে তৃণে।
ন ভেদো যস্য দেবেশি স কৌলঃ পরিকীর্তিতঃ।।- (নিত্যাতন্ত্র)
অর্থাৎ : মহামন্ত্র-সাধনে দিক ও কালের নিয়ম নাই; তিথি ও নক্ষত্রাদিরও নিয়ম নাই। কোন স্থানে শিষ্ট, কোথাও ভ্রষ্ট, কোথাও বা ভূত-পিশাচ-তুল্য এই প্রকার নানা বেশধারী কৌল সমুদায় পৃথিবীতে বিচরণ করেন। প্রিয়ে! কর্দম ও চন্দনে এবং পুত্র ও শত্রুতে যাহার ভেদ-জ্ঞান নাই, আর দেবী! শ্মশান ও গৃহে এবং কাঞ্চন ও তৃণে যাহার প্রভেদবোধ নাই, সেই ব্যক্তি কৌল বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে।

        মোটকথা, কৌলাচারী ব্যক্তি প্রকৃত জিতেন্দ্রিয়, নিস্পৃহ, উদাসীন ও পরম যোগীপুরুষ এবং অবধূত-শব্দবাচ্য। কৌলাচারী ব্যক্তির কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নাই এবং স্থানাস্থান, কালাকাল ও কর্মাকর্ম ইত্যাদির কিছুমাত্র বিচার নাই।

            ‘উত্তম, মধ্যম ও অধম এই তিনপ্রকার কৌল আছেন। যিনি সর্বভূতে আপনার বিভূ-স্বরূপ দর্শন করেন এবং আপনার মধ্যে সর্বভূতকে দর্শন করেন, তিনিই কৌলিকোত্তম। যিনি ধ্যানপর জ্ঞাননিষ্ঠ এবং সমাহিত, যিনি পঞ্চ তত্ত্ব দ্বারা সাধনা করিয়া থাকেন, তিনি মধ্যম কৌল। যিনি মাত্র জ্ঞানভূমিতে আরোহণ করিতেছেন, তিনিই প্রাকৃত (অধম) কৌল।’- (তন্ত্রপরিচয়, পৃষ্ঠা-৫৮)

          কুলার্ণব-তন্ত্র ও বিশ্বসার-তন্ত্রে এই সপ্তবিধ আচারের বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে। এই সাতটি আচারের মধ্যে বেদাচার, বৈষ্ণবাচার এবং দক্ষিণাচার পশুভাব অবলম্বনীয়। বামাচার ও সিদ্ধান্তাচার বীরভাব আর দিব্যভাবে শুধু কৌলাচার অবলম্বনীয়। বিশ্বসার-তন্ত্র থেকে আরও জানা যায় যে সাতটি আচারকেও প্রধানত বামাচার ও দক্ষিণাচার– এই দু’টি ভাগের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।–

আচারো দ্বিবিধো দেবি বাম-দক্ষিণভেদতঃ।
পঞ্চমুদ্রাদিসংযুক্তো বামাচারঃ প্রকীর্তিতঃ।
পঞ্চমুদ্রাদিরহিতো দক্ষিণাচারসংজ্ঞকঃ। -(বিশ্বসার-তন্ত্র)
অর্থাৎ : আচার দ্বিবিধ– বাম ও দক্ষিণ। পঞ্চতত্ত্বাদি-যুক্ত আচারের নাম বামাচার, আর পঞ্চতত্ত্বহীন আচারের নাম দক্ষিণাচার।

           ‘আচার-প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি কথা মনে রাখা আবশ্যক। সাধনার প্রথম দিকে সকল দ্বিজকেই বেদাচার গ্রহণ করিতে হয়। বৈষ্ণবগণ বৈষ্ণবাচারে এবং শৈবগণ শৈবাচারেই সিদ্ধি প্রাপ্ত হইবেন। সৌর ও গাণপত্য সাধকগণও বৈষ্ণবাচারেই সিদ্ধি লাভ করিবেন। শুধু উপাসনায় স্ব স্ব ইষ্টদেবতার শরণ লইতে হইবে। পরন্তু একমাত্র শাক্ত সাধকই দক্ষিণাচার, বামাচার, সিদ্ধান্তাচার ও কৌলাচারের অধিকারী। কৌলমার্গীয় সাধকের জাতিবিচার নাই। জাতিবর্ণ-নির্বিশেষে সকল শাক্তই সাধনার উচ্চাবস্থায় এই আচার গ্রহণ করিতে পারেন। কৌলাচারই চরম ভূমিকা।’- (তন্ত্রপরিচয়, পৃষ্ঠা-৫৯)
তাই কুলার্ণব-তন্ত্রে বলা হয়েছে–

কৌলাৎ পরতরং ন হি।
অর্থাৎ : কৌলের পর আর কিছু নাই।

           মুমুক্ষু সাধক পরম্পরাগত যে আচারকে অবলম্বন করে সাধনা করে থাকেন, তা-ই কুলাচার। কুল ও অকুল শব্দের অর্থ পর্যালোচনা করে সৌভাগ্যভাস্করে বলা হয়েছে–

কুঃ পৃথ্বীতত্ত্বং লীয়তে যত্র তৎ কুলম্ আধারচক্রম্,
তৎসম্বন্ধাল্লক্ষণয়া সুষুম্নামার্গোহপি। অতঃ সহস্রারাৎ
স্রবদমৃতং কুলামৃতম্ ।
অর্থাৎ : কু শব্দের অর্থ পৃথ্বী। পৃথ্বীতত্ত্ব যাহাতে লীন হয় তাহার নাম কুল। মূলাধার চক্রে পৃথ্বীতত্ত্ব অবস্থিত। এইহেতু এই চক্রকেও কুল বলা যাইতে পারে। মূলাধারের সহিত সুষুম্না-নাড়ীর সম্বন্ধ আছে, এই কারণে লক্ষণার দ্বারা কুল-শব্দ সুষুম্নারও বোধক হইতে পারে। সুষুম্না সহস্রারে মিলিত হইয়াছে, এইহেতু সহস্রার হইতে প্রচ্যুত অমৃতের নাম কুলামৃত।

এবং ভাস্কর রায় তন্ত্রের একটি বচন উদ্ধৃত করে আরও দেখিয়েছেন–

কুলং শক্তিরিতি প্রোক্তমকুলং শিব উচ্যতে।
কুলেহকুলস্য সম্বন্ধঃ কৌলমত্যিভিধীয়তে।
অর্থাৎ : কুল শব্দের অর্থ ‘শক্তি’ এবং অকুল শব্দের অর্থ ‘শিব’। কুলেতে অকুলের সম্বন্ধ– অর্থাৎ শিবশক্তি-সামরস্যের নামই কৌল।

কুলার্ণব-তন্ত্রেও বলা হয়েছে–

অকুলং শিব ইত্যুক্তং কুলং শক্তিঃ প্রকীর্তিতা।
কুলাকুলানুসন্ধানে নিপুণাঃ কৌলিকাঃ প্রিয়ে।।
অর্থাৎ : অকুল শিব আর কুল শক্তি নামে কীর্তিত। এই কুল ও অকুলের তথা শিব-শক্তির সামরস্যের অনুসন্ধাতা সাধকই কৌল।

          কুলজ্ঞানের প্রতিপাদক শাস্ত্রকেও কুল-শাস্ত্র বলা হয়। কুলসাধনের উপযোগী পদার্থগুলির সংজ্ঞাও ‘কুল’। যথা– কুলবৃক্ষ, কুলশক্তি, কুলপীঠ, কুলতিথি, কুলবার, কুলাচার ইত্যাদি।


(চলবে…)

[আগের পোস্ট : তন্ত্রে ভাবত্রয়] [*] [পরের পোস্ট : তান্ত্রিক আচার-সাধন]

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 439,383 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: