h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

তন্ত্র-সাধনা-০২ : তন্ত্র-শাস্ত্র

Posted on: 16/10/2017


12042906_599938180144240_5375375480413254287_n

তন্ত্র-সাধনা-০২ : তন্ত্র-শাস্ত্র
রণদীপম বসু

অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্বে’র ‘ধর্মকর্ম : ধ্যান-ধারণা’ অধ্যায়ে শাক্তধর্ম প্রসঙ্গে বলেন,– ‘দেবীপুরাণে (খ্রীষ্টোত্তর সপ্তম-অষ্টম শতক) বলা হইয়াছে, রাঢ়া-বরেন্দ্র-কামরূপ-কামাখ্যা-ভোট্টদেশে (তিব্বতে) বামাচারী শাক্তমতে দেবীর পূজা হইত। এই উক্তি সত্য হইলে স্বীকার করিতেই হয়, খ্রীষ্টোত্তর সপ্তম-অষ্টম শতকের পূর্বেই বাঙলাদেশের নানা জায়গায় শক্তিপূজা প্রবর্তিত হইয়া গিয়াছিল। ইহার কিছু পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় গুপ্তোত্তর পর্বে এবং মধ্য-ভারতে রচিত জয়দ্রথ-যামল গ্রন্থে। এই গ্রন্থে ঈশান-কালী, রক্ষা-কালী, বীর্যকালী, প্রজ্ঞাকালী প্রভৃতি কালীর নানা রূপের সাধনা বর্ণিত আছে। তাহা ছাড়া ঘোরতারা, যোগিনীচক্র, চক্রেশ্বরী প্রভৃতির উল্লেখও এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। আর্যাবর্তে শাক্তধর্ম যে গুপ্ত-গুপ্তোত্তর পর্বেই বিকাশ লাভ করিয়াছিল আগম ও যামল গ্রন্থগুলিই তাহার প্রমাণ। খুব সম্ভব ব্রাহ্মণ্য অন্যান্য ধর্মের স্রোত-প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গেই শক্তিধর্মের স্রোতও বাঙলাদেশে প্রবাহিত হইয়াছিল এবং এই দেশ পরবর্তী শক্তিধর্মের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রূপে গড়িয়া উঠিয়াছিল। এইসব আগম ও যামল গ্রন্থের ধ্যান ও কল্পনাই, অন্তত আংশিকত, পরবর্তী কালে সুবিস্তৃত তন্ত্র সাহিত্যের ও তন্ত্রধর্মের মূলে এবং এই তন্ত্র-সাহিত্যের প্রায় অধিকাংশ গ্রন্থই রচিত হইয়াছিল বাঙলাদেশে। তন্ত্রধর্মের পরিপূর্ণ ও বিস্তৃত বিকাশও এই দেশেই। দ্বাদশ শতকের আগেকার রচিত কোনও তন্ত্র-গ্রন্থ আজও আমরা জানি না এবং পাল-চন্দ্র-কম্বোজ লিপিমালা অথবা সেন-বর্মণ লিপিমালায়ও কোথাও এই গুহ্য সাধনার নিঃসংশয় কোনও উল্লেখ পাইতেছি না, এ-কথা সত্য। কিন্তু পাল-পর্বের শাক্ত দেবীদের রূপ-কল্পনায়, এক কথায় শক্তিধর্মের ধ্যানধারণায় তান্ত্রিক ব্যঞ্জনা নাই, এ কথা জোর করিয়া বলা যায় না। জয়পালের গয়া-লিপিতে মহানীল-সরস্বতী নামে যে দেবীটির উল্লেখ আছে তাঁহাকে তো তান্ত্রিক দেবী বলিয়াই মনে হইতেছে। তবু, স্বীকার করিতেই হয় যে, পাল-পর্বের অসংখ্য দেবী মূর্তিতে শাক্তধর্মের যে রূপ-কল্পনার পরিচয় আমরা পাইতেছি তাহা আগম ও যামল গ্রন্থবিধৃত ও ব্যাখ্যাত শৈবধর্ম হইতেই উদ্ভূত এবং শাক্তধর্মের প্রাক্-তান্ত্রিক রূপ। এ তথ্য লক্ষণীয় যে, পুরাণকথানুযায়ী সকল দেবীমূর্তিই শিবের সঙ্গে যুক্ত, শিবেরই বিভিন্নরূপিণী শক্তি, কিন্তু তাঁহাদের স্বাধীন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিল এবং সেইভাবেই তাঁহারা পূজিতাও হইতেন। শাক্তধর্ম ও সম্প্রদায়ের পৃথক অস্তিত্ব ও মর্যাদা সর্বত্র স্বীকৃত ছিল।’

     শক্তি বা মাতৃকা পূজকগোষ্ঠীর সাহিত্যনিদর্শন-রূপ সুস্পষ্ট উল্লেখ মনে হয় বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা গ্রন্থেই প্রথম পাওয়া যায়। শ্রীজিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই গ্রন্থের প্রতিমাপ্রতিষ্ঠাপনম্ নামক অধ্যায়ে (৫৯তম অধ্যায়, সুধাকর দ্বিবেদী সম্পাদিত সংস্করণ) ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের ইষ্টদেবতার বিগ্রহ মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করবার প্রকৃত অধিকারীর কথাপ্রসঙ্গে গ্রন্থকার বলেছেন–

‘মাতৃণামপি মণ্ডলক্রমবিদো।’- (বৃহৎসংহিতা)
অর্থাৎ : মাতৃকাগণের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবার জন্য মণ্ডলক্রমবিদগণই উপযুক্ত।

এবং তার উপর ভাষ্যকালে উৎপলাচার্য বলছেন যে–

‘মাতৃণাং ব্রাহ্ম্যাদীনাং (সপ্তমাতৃকাঃ) মণ্ডলক্রমবিদো যে মণ্ডলক্রমং পূজাক্রমং বিদন্তি জানন্তি’।
অর্থাৎ : ব্রাহ্মী ইত্যাদি সপ্তমাতৃকাগণের (বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা তাঁরাই করবেন), যাঁরা পূজাক্রম সম্বন্ধে অভিজ্ঞ।

      জিতেন্দ্রনাথ বলেন– ‘ভাষ্যকার মণ্ডলক্রম সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই বলেন নাই, ইহার অর্থ পূজাক্রম বলিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন। কিন্তু মণ্ডলক্রম যে তান্ত্রিক পূজাবিধি, এবং ইহার প্রয়োগে যে শাক্তগণই বিশেষ পারদর্শী ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।… তবে উৎপল এ প্রসঙ্গে বৃহৎসংহিতার এই শ্লোকের (৫৯, ১৯) শেষ চরণের ‘স্ববিধিনা’ কথাটির ব্যাখ্যাকালে বলিয়াছেন যে মাতৃকা-পূজকদিগের পক্ষে ‘স্ববিধিনা’ বলিতে স্বকল্পবিহিত বিধানই বুঝায় (মাতৃণাং স্বকল্পবিহিত বিধানেন)। এখানে কল্প কথাটির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝিলেই জানা যাইবে যে উৎপল তান্ত্রিক পূজাবিধানের কথাই বলিয়াছেন।’- (পঞ্চোপাসনা)
কল্প কী? শব্দকল্পদ্রুম কোষগ্রন্থে বারাহীতন্ত্র থেকে উদ্ধৃত শ্লোক হতে জানা যায়–

‘কল্পশ্চতুর্বিধঃ প্রোক্ত আগমো ডামরস্তথা।
যামলশ্চ তথা তন্ত্রং তেষাং ভেদাঃ পৃথক্ পৃথক্ ।।
অর্থাৎ : কল্প চতুর্বিধ, যথা আগম, ডামর, যামল ও তন্ত্র। এগুলির প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক ভেদ আছে।

      তাহলে উৎপলকথিত স্বকল্পবিধানের অর্থ এই বুঝতে হবে যে, তিনি ভিন্ন ভিন্ন কল্পভুক্ত শক্তি-পূজকগণকেই মাতৃকাগণের মূর্তি নিজ নিজ কল্পোক্ত বিধান অনুসারে প্রতিষ্ঠা করবার অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন।
আমরা জানি যে, এককালে পূর্বভারতের বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যা প্রভৃতি স্থানে শক্তিপূজার প্রবল আধিক্য দেখা দিয়েছিলো। তান্ত্রিকতা মূলত শক্তিপূজাই। তাই শক্তিপূজার অন্যতম প্রধান অঙ্গ তন্ত্র ও তান্ত্রিক পূজা-পদ্ধতি সম্বন্ধে না-জানলে বস্তুত শক্তি-সাধনার বিষয়টি আমাদের কাছে অনধিতই থেকে যায়। আর এ প্রসঙ্গে দেবীপূজা সম্পর্কিত তান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা, তার প্রয়োগ ও এ-সম্পর্কিত সাহিত্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমাদের কাছে তার এক বিরাট ও বৈচিত্র্যময় রূপ আধা-প্রত্যক্ষ হয়ে ধরা দেয়।

        তন্ত্র কথাটির অভিধান বা কোষগত অর্থ বহুবিধ হলেও শক্তিপূজা সম্পর্কিত তার যে দুয়েকটি অর্থ আছে সেটি দেখা যেতে পারে। V.S.Apte তাঁর ‘Sanskrit-English Dictionary’-তে তন্ত্রের অন্যতম অর্থ করেছেন– ‘The regular order of ceremonies and rites, system, framework, ritual’, অর্থাৎ, ধর্মগত ক্রিয়ানুষ্ঠানের নিয়মানুগ ব্যবস্থা, বিধিবদ্ধ ধর্মাচারানুষ্ঠান-সম্বন্ধীয় শাস্ত্র, কাঠামো ইত্যাদি। আর শ্রীমৎ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কৃত বৃহৎতন্ত্রসার গ্রন্থে তন্ত্রের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে–

তন্ত্রস্য লক্ষণং। সর্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ তন্ত্রনির্ণয় এব চ।। দেবতানাঞ্চ সংস্থানং তীর্থানাঞ্চৈব বর্ণনং। তথৈবাশ্রমধর্ম্মশ্চ বিপ্রসংস্থানমেব চ। সংস্থানঞ্চৈব ভূতানাং যন্ত্রাণাঞ্চৈব নির্ণয়ঃ। উৎপত্তির্বিবুধানাঞ্চতরূণাং কল্পসংজ্ঞিতং।। সংস্থানং জ্যোতিষাঞ্চৈব পুরাণাখ্যানমেব চ। কোষস্য কথনঞ্চৈব ব্রতানাং পরিভাষণং।। শৌচাশৌচস্য চাখ্যানং নরকাণাঞ্চ বর্ণনং। হরচক্রস্য চাখ্যানং স্ত্রীপুংসোশ্চৈব লক্ষণং।। রাজধর্ম্মেঅ দানধর্ম্মো যুগধর্ম্মস্তথৈব চ। ব্যবহারঃ কথ্যতে চ তথা চাধ্যাত্মবর্ণনং।। ইত্যাদিলক্ষণৈর্যুক্তং তন্ত্রমিত্যভিধীয়তে।- (বৃহৎতন্ত্রসারঃ)
ভাবার্থ :
সৃষ্টি ও প্রলয় প্রকরণ, তন্ত্র নির্ণয়, দেবতা সংস্থান, তীর্থবর্ণন, ব্রহ্মচর্য্যাদি আশ্রম ধর্ম, ব্রাহ্মণাদি বর্ণের কর্তব্যাকর্তব্য, প্রাণিসংস্থান, পুরাণকথন, কোষকথন, ব্রতবর্ণন, শৌচাশৌচ কথন, নরক বর্ণন, হরচক্র কথন, স্ত্রীপুরুষ লক্ষণ, রাজধর্ম, দানধর্ম, যুগধর্ম, ব্যবহার ও আত্মনির্ণয় ইত্যাদি বিষয় যে শাস্ত্রে বর্ণিত আছে তাহাকে তন্ত্র শাস্ত্র বলে।

       তবে তন্ত্রের বিশেষ অর্থানুযায়ী তাকে বেদবিহিত ক্রিয়াদি থেকে পৃথক বুঝতে হবে, এবং যজ্ঞাদি বৈদিক ক্রিয়ানুষ্ঠান দেববিগ্রহ পূজাদি তান্ত্রিক ধর্মাচরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন লৌকিক দেব-দেবীর উপাসনার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ-সকল দেবতাকে আশ্রয় করে যে-সকল ধর্মাচারক্রম উদ্ভূত হয়, সেগুলোকে ন্যায্যত অবৈদিক পর্যায়ে ফেলা হয়ে থাকে। এদিক থেকে বিচার করলে গাণপত্য, বৈষ্ণব, শৈব, সৌর ইত্যাদি পূজাক্রম শাক্ত পূজাক্রমের মতো তান্ত্রিক পর্যায়ভুক্ত বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে। কিছু সংগৃহিত পাঞ্চরাত্র গ্রন্থাবলীর তালিকায় তন্ত্রসাগর, পাদ্মসংহিতাতন্ত্র, পাদ্মতন্ত্র, লক্ষ্মীতন্ত্র প্রভৃতি নাম পাওয়া যায়। এভাবে সৌর ও গাণপত্য ধর্মমত সংক্রান্ত কোনও কোনও গ্রন্থ তন্ত্র নামে অভিহিত হতে পারে।

      বারাহী-তন্ত্রোক্ত চতুর্বিধ কল্পের কথা আমরা জেনেছি– আগম, ডামর, যামল ও তন্ত্র। জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে–
‘তন্ত্রকার আগম-সংখ্যা দ্বাদশ বলিয়া নির্দিষ্ট করিয়াছেন, এবং ইহাদিগের নাম দিয়াছেন,– মুক্তক, প্রপঞ্চ, সারদা, নারদ, মহার্ণব, কপিল, যোগ, কল্প, কপিঞ্জল, অমৃতশুদ্ধি, বীর ও সিদ্ধসম্বরণ; প্রত্যেকটি আগমের শ্লোকসংখ্যা বহু সহস্র। এখানে বলা প্রয়োজন যে এই আগমগুলি শৈবাগম হইতে পৃথক। ডামর ষট্সংখ্যক (ডামরঃ ষড়বিধো জ্ঞেয়ঃ), এবং উহাদিগের নাম এইরূপ– যোগ, শিব, দুর্গা, সারস্বত, ব্রহ্ম ও গন্ধর্ব। যামলের সংখ্যাও ছয় (যামলাঃ ষট্ চ সংখ্যাতাঃ), যথা আদিযামল, ব্রহ্মযামল, বিষ্ণুযামল, রুদ্রযামল, গণেশযামল ও আদিত্যযামল। তন্ত্রের দুই উপবিভাগ, তন্ত্র ও উপতন্ত্র; তন্ত্রের সংখ্যা বিংশতি এবং উপতন্ত্রের সংখ্যা একাদশ। বিংশতি তন্ত্র এইগুলি– নীলপতাকা, বামকেশ্বর, মৃত্যুঞ্জয়, যোগার্ণব, মায়া (মহাতন্ত্র নামে আখ্যাত), দক্ষিণামূর্তি, কালিকা, কামেশ্বরী, হরগৌরী, কুব্জিকা (এটিও মহাতন্ত্র), কাত্যায়নী, প্রত্যঙ্গিরা, মহালক্ষ্মী, ত্রিপুরার্ণব (মহাতন্ত্র), সরস্বতী, যোগিনী (ইহাকে তন্ত্ররাজ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে), বারাহী, গবাক্ষী (ক্ষ), নারায়ণীয় ও মৃড়ানী (তন্ত্ররাজ)। একাদশটি উপতন্ত্র এইরূপ– বশিষ্ঠ, কপিল, নারদ, গর্গ, পুলস্ত্য, ভার্গব, সিদ্ধ, যাজ্ঞবল্ক্য, ভৃগু, শুক্র ও বৃহস্পতি। ’- (পঞ্চোপাসনা)
সহজ কথায়, বারাহীতন্ত্রের মতে তান্ত্রিক সাহিত্য চার প্রকার– আগম, ডামর, যামল ও তন্ত্র। আগম বারোটি– মুক্তক, প্রপঞ্চ, সারদা, নারদ, মহার্ণব, কপিল, যোগ, কল্প, কপিঞ্জল, অমৃতশুদ্ধি, বীর ও সিদ্ধসম্বরণ। ডামর ছয়টি– যোগ, শিব, দুর্গা, সারস্বত, ব্রহ্ম ও গন্ধর্ব। যামল ছয়টি– আদিত্য, ব্রহ্ম, আদি, বিষ্ণু, রুদ্র ও গণেশ। তন্ত্র কুড়িটি ও উপ-তন্ত্র এগারোটি। কুড়িটি তন্ত্র হলো– নীলপতাকা, বামকেশ্বর, মৃত্যুঞ্জয়, যোগার্ণব, মায়া, দক্ষিণামূর্তি, কালিকা, কামেশ্বরী, হরগৌরী, কুব্জিকা, কাত্যায়নী, প্রত্যঙ্গিরা, ত্রিপুরার্ণব, সরস্বতী, যোগিনী, বারাহী, গবাক্ষী, নারায়ণীয় এবং মৃড়ানী। একাদশটি উপতন্ত্র হলো– বশিষ্ঠ, কপিল, নারদ, গর্গ, পুলস্ত্য, ভার্গব, সিদ্ধ, যাজ্ঞবল্ক্য, ভৃগু, শুক্র ও বৃহস্পতি।

       তবে উপরিউক্ত তালিকাকে সম্পূর্ণ মনে করা ভুল হবে। কেননা এর বাইরে আরও বহু তন্ত্রের নাম পাওয়া যায়।
‘স্বর্গীয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় তাঁহার ‘Catalogue of Palmleaf and Selected Paper Manuscripts belonging to the Durber Library, Nepal’ নামক গ্রন্থের দুই খণ্ডে উপরোক্ত তালিকার বাহিরে বহু ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে প্রাচীন তন্ত্রগুলি উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম এই চতুর্বিধ শাসনগত বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বারাহীতন্ত্রোক্ত কুব্জিকা মহাতন্ত্র (এখানে কুব্জিকামত বলিয়া বর্ণিত) পশ্চিমশাসনান্তর্গত ছিল। কুব্জিকামতে লিখিত আছে যে বৈদিক ধর্ম হইতে শৈবধর্ম শ্রেষ্ঠ, দক্ষিণাচার শৈবধর্ম হইতে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু পশ্চিমাম্নায় সকল ধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। শাস্ত্রী মহাশয় এ জাতীয় অনেকগুলি পুঁথি অনুশীলন করিয়া মীমাংসা করিয়াছিলেন যে পশ্চিমশাসনের কুব্জিকামত, কুলালিকাম্নায়, শ্রীমত, কাডিমত বিদ্যাপীঠ প্রভৃতি বিবিধ নামবিশিষ্ট একটি তান্ত্রিক শাখা ছিল। ইহার কয়েকটি পরিশিষ্ট (উত্তর) ছিল, যথা শ্রীমতোত্তর বা মন্থানভৈরব এবং কুব্জিকামতোত্তর। মূল শাখা ষট্ক নামক চারি অংশে বিভক্ত এবং প্রতি অংশে ৬,০০০ সংখ্যক শ্লোক থাকিলে, মূলে সর্বসাকুল্যে ২০,০০০ শ্লোক ছিল। ইহা হইতে এই তান্ত্রিক শাখা সাহিত্যের বিরাটত্ব নির্ণীত হইবে। ইহার ন্যূনাধিক প্রাচীনত্বও এসিয়াটিক সোসাইটির পুঁথি-সংগ্রহভুক্ত গুপ্তোত্তর ব্রাহ্মীলিপিতে লিখিত খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর একটি কুব্জিকামত পুঁথি হইতে প্রমাণিত হয়। কাশ্মীর শৈবাচার্য অভিনবগুপ্ত তাঁহার ত্রিংশিকা নামক গ্রন্থে কুব্জিকা তন্ত্রের উল্লেখ করিয়াছেন। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীর কুব্জিকামত পুঁথি পাওয়া গিয়াছে। ইহার পর কুব্জিকামত শাখার সাহিত্যসৃষ্টি কার্য বন্ধ হইয়া যায়। শাস্ত্রী মহাশয় আরও বলিয়াছেন যে ইহা অপেক্ষা অধিক প্রাচীন তান্ত্রিক শাখাও যে ছিল উহা কুব্জিকামত লিখিত দেবযান, পিতৃযান, প্রভৃতি প্রাচীনতর নাম হইতে বুঝা যায়।’- (জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় / পঞ্চোপাসনা)
অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে, ‘এই তালিকার বাইরে অনেক তন্ত্রগ্রন্থ আছে যেগুলির বিষয়বস্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভূতডামর, জযদ্রথযামল, গ্রহযামল, দেবীযামল, যামলাক্ষ্য তন্ত্র, নিত্যা, নিরুত্তর, গুপ্তসাধন, চামুণ্ডা, মুণ্ডমালা, মালিনীবিজয়, ভূতশুদ্ধি, মন্ত্রমহোদধি, ত্রিপুরাসার, ত্রিপুরারহস্য, কুলার্ণব, জ্ঞানার্ণব, মহাকৌলজ্ঞানবিনির্ণয়, প্রাণতোষণী, মহানির্বাণ, প্রপঞ্চসার, শারদাতিলক, মৎস্যসূক্ত ইত্যাদি অনেক তান্ত্রিক গ্রন্থ পাওয়া গেছে। এছাড়া শক্তিতত্ত্বের ব্যাখ্যান ও সর্বদা ব্যবহারযোগ্য গ্রন্থ হিসাবে সৌন্দর্যলহরী, ললিতাসহস্রনাম, ললিতোপাখ্যান, ষট্দ্রক্রক্রম, যোগচিন্তামণি, শাক্তানন্দ-তরঙ্গিণী, তন্ত্রসার প্রভৃতি গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য।’- (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২২৫)

          আবার, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কৃত বৃহৎতন্ত্রসার গ্রন্থের ভূমিকায় আমরা তন্ত্রাগমের এক দীর্ঘ তালিকা পেয়ে যাই, যেমন–
সিদ্ধেশ্বর, মহাতন্ত্র, কালীতন্ত্র, কুলার্ণব, জ্ঞানার্ণব, নীলতন্ত্র, ফেৎকারিণী, দেব্যাগম, উত্তরা, শ্রীক্রম, সিদ্ধিজামল, মৎস্যসূক্ত, সিদ্ধসার, সিদ্ধসারস্বত, বারাহী, যোগিনী, গণেশবিহর্ষিণী, নিত্যাতন্ত্র, শিবাগম, চামুণ্ডা, মুণ্ডমালা, হংসমাহেশ্বর, নিরুত্তর, কুলপ্রকাশ, কল্প, গান্ধর্ব্ব, ক্রিয়াসার, নিবন্ধ, সম্মোহন, তন্ত্ররাজ, ললিতাখ্য, রাধা, মালিনী, রুদ্রযামল, বৃহৎশ্রীক্রম, গবাক্ষ, সুকুমুদিনী, বিশুদ্ধেশ্বর, মালিনী, বিজয়, সময়াচার, ভৈরবী, যোগিনীহৃদয়, ভৈরব, সনৎকুমার, যোনিতন্ত্র, নবরত্নেশ্বর, কুলচূড়ামণি, ভাবচূড়ামণি, দেবপ্রকাশ, কামাখ্যা, কামধেনু, কুমারী, ভূতডামর, মালিনীবিজয়, যামল, ব্রহ্মযামল, বিশ্বসার, মহাকাল, কুলামৃত, কুলোড্ডীশ, কুব্জিকা, তন্ত্রচিন্তামণি, মহিষমর্দ্দিনী, মাতৃকা, মহানির্ব্বাণ, মহানীল, মহাকালসংহিতা, মেরু, ডামর, বীরভদ্র, বিজয়চিন্তামণি, একজটিকা, নির্ব্বাণ, ত্রিপুরা, কালীবিলাস, বরদা, বাসুদেবরহস্য, বৃহৎগৌতমীয়, বর্ণোদ্ধৃত, বিষ্ণুজামল, বৃহন্নীল, বৃহৎযোনি, রহস্য, ব্রহ্মজ্ঞান, বামকেশ্বর, ব্রহ্মযামল, অদ্বৈত্য, বর্ণবিলাস, পুরশ্চরণচন্দ্রিকা, রসোল্লাস, পঞ্চদশী, পিচ্ছিলা, প্রপঞ্চসার, পরমেশ্বর, হংসাদ্য, নবরত্নেশ্বর, নিত্য, লীল, নারায়ণী, নারদীয়, নাগার্জ্জান, দক্ষিণামূর্ত্তি, সংহিতা, দত্তাত্রেয়, অষ্টাবক্র, যক্ষিণী, যোগসারার্ণব, অনুত্তম, যোগেশ্বর, যামলভৈরব, রাজরাজেশ্বরী, রেবতী, রামার্চ্চনচন্দ্রিকা, স্ববোদয়, ইন্দ্রজাল, কালীতন্ত্র, কালীকুলসর্ব্বস্ব, কুমারী, কৃকলাশদীপিকা, কঙ্কালমালিনী, কালোত্তর, কুব্জিকা, কুলার্ণব, কল্পসূত্র, গৌরীতন্ত্র, গন্ধর্ব্বতন্ত্র, শ্রীগণেশ, বিমর্ষিণী, গুরুতন্ত্র, গায়ত্রী, গবাক্ষ, গবাক্ষসংহিতা, জ্ঞানভাষ্য, অন্নদাকল্প, উৎপত্তি, উত্তর, উড্ডীশ, যক্ষডামর, সরস্বতী, শারদা, শক্তিসঙ্গম, আগমসর্ব্বস্ব, চীনাচার, তারারহস্য, শ্রীশ্যামারহস্য, স্কন্দযামল, নিগমকল্পদ্রুম, লতা, লতাসার, উর্দ্ধাম্নার। সৈন্ধোক্ত, কাপিল, অদ্ভূত, জৈমিনী, বশিষ্ঠ, কপিল, নারদ, গর্গ, পুলস্ত, ভার্গব, সিদ্ধ, যাজ্ঞবল্ক, ভৃগু, শুক্র, বৃহস্পতি ইত্যাদি।

       এই বিশাল তান্ত্রিক ও শাক্ত-সাহিত্যের অধিকাংশ রচয়িতাদের নাম জানা যায় না। মাত্র অল্প কয়েকটির বিভিন্ন রচয়িতার পরিচয় সম্পর্কে কিছু জানা যায়। যাঁদের পরিচয় জানা যায় তাঁদের মধ্যে বাঙালি শক্তি-পূজকদের নামই উল্লেখযোগ্য, যেমন– কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, রামতোষণ বিদ্যালঙ্কার ইত্যাদি। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে,–
‘বঙ্গদেশে শাক্ত-তান্ত্রিক লেখকদের মধ্যে মহামহোপাধ্যায় পরিব্রাজকাচার্যের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য যাঁর কাম্যযন্ত্রোদ্ধার নামক গ্রন্থের তারিখ ১২৯৭ শকাব্দ অর্থাৎ ১৩৭৫ খ্রীষ্টাব্দ। পরবর্তী তান্ত্রিক লেখকদের মধ্যে সর্বানন্দের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থের নাম সর্বোল্লাস। তিনি ত্রিপুরা জেলার মেহার নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলেন এবং তৎপ্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তি মেহারকালী নামে আজও বিদ্যমান। সর্বানন্দের জানা তারিখ ১৪২৫ খ্রীষ্টাব্দ।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট)
অন্যদিকে ‘শাক্ত দার্শনিকদের মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অভিনবগুপ্ত যাঁর তন্ত্রালোক প্রভৃতি গ্রন্থ শৈব-শাক্ত দর্শনের ভিত্তিস্বরূপ। এছাড়া গোরক্ষ বা মহেশ্বরানন্দের মহার্ঘমঞ্জরী, পুণ্যানন্দের কামকলাবিলাস, নথনানন্দের চিদ্বল্লীটীকা, অমৃতানন্দের যোগিনীহৃদয়দীপিকা ও সৌভাগ্যসুভগোদয়, ও স্বতন্ত্রানন্দের মাতৃকাচক্রবিবেক শাক্তদর্শনের উপর রীতিমত আলোকপাত করে। অভিনবগুপ্তের পর সবচেয়ে বিদ্বান শাক্ত দার্শনিক ছিলেন অষ্টাদশ শতকের ভাস্কর রায়। নিত্যাষোড়শিকার্ণবের ভাষ্য সেতুবন্ধ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। তাঁর সৌভাগ্যভাস্কর, গুপ্তবতী, শান্তবানন্দকল্পলতা, বরিবস্যাপ্রকাশ প্রভৃতি গ্রন্থে তান্ত্রিক শাক্তদর্শন অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে ব্যাখ্যাত হয়েছে।’- (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য)
কিংবদন্তী আছে যে, স্বয়ং শঙ্করাচার্য অদ্বৈতবাদী হলেও তান্ত্রিক উপাসক ছিলেন, এবং তিনি সৌন্দর্যলহরী, ললিতাসহস্রনাম প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু এর সত্যতা অনিশ্চিত। ষট্চক্রক্রমের গ্রন্থকার ছিলেন ব্রহ্মানন্দগিরি। তিনি ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর অন্য দুটি বিখ্যাত রচনার নাম শাক্তানন্দতরঙ্গিণী ও তারারহস্য। তাঁর শিষ্য পূর্ণানন্দ নামে একজন তান্ত্রিক সাধক এই গ্রন্থের একটি টীকা যোগচিন্তামণি রচনা করেন। পূর্ণানন্দের অন্যান্য রচনা শ্যামারহস্য, শাক্তক্রম, শ্রীতত্ত্বচিন্তামণি, তত্ত্বানন্দতরঙ্গিণী, ষট্কর্মোল্লাস প্রভৃতি। তন্ত্রসার রচনা করেছিলেন স্বনামধন্য কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, যাঁর সময়কাল ১৫৯৬-১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দ। তিনি মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের প্রায় এক শতাব্দী পরে জীবিত ছিলেন বলে কারো কারো অভিমত। তাঁর অধস্তন সপ্তম পুরুষ রামতোষণ বিদ্যালঙ্কার প্রাণতোষিণীতন্ত্রের রচয়িতা। মধ্যযুগের অপর উল্লেখযোগ্য শাক্ত তান্ত্রিক লেখক গৌড়ীয় শঙ্কর যাঁর তারারহস্যবৃত্তির রচনাকাল ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ। তিনি শঙ্কর আগমাচার্য নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। তাঁর অন্যান্য রচনা হলো শিবার্চনমহারত্ন, শৈবরত্ন, কুলমুলাবতার, ক্রমস্তব প্রভৃতি। মন্ত্রমহোদধির রচয়িতা যে মহীধর তা উক্ত গ্রন্থের মধ্যেই স্পষ্টভাষায় লিখিত আছে।
‘মন্ত্রমহোদধি ন্যূনাধিক দ্বাবিংশ তরঙ্গে বিভক্ত, এবং ইহাতে তান্ত্রিক ধর্মাচরণ সংক্রান্ত বহু তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। ইহার প্রথম তরঙ্গের একটি শ্লোকে পঞ্চোপাসনার কথা এইরূপ ভাবে লিখিত দেখা যায়– বিষ্ণুশিবোগণেশার্কো দুর্গা পঞ্চৈব দেবতাঃ। আরাধ্যাঃ সিদ্ধিকামেন তন্ত্রমন্ত্রৈর্যথোদিতম্ ।। অন্যান্য পটলে গণেশ মন্ত্র, কালীসুমূখী মন্ত্র, তারা মন্ত্র, ছিন্নমস্তাদিকথন, শ্যামা মন্ত্র, মহাপূর্ণা মন্ত্র, ষট্কর্মাদি নিরূপণ, হনুমন্মন্ত্র, বিষ্ণু, শিব, কার্তবীর্যাদি মন্ত্র নিরূপণ, এবং স্নান, পূজা, পবিত্রার্চন, মন্ত্রশোধন, সূন্দরী (ষোড়শী) পূজন ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ের অবতারণা করা হইয়াছে। মহাতন্ত্র নামে অভিহিত মৎস্যসূক্ত মহারাজাধিরাজ লক্ষ্মণসেনের ধর্মাধ্যক্ষ পণ্ডিত হলায়ুধ মিশ্রের রচনা। ইহা চতুঃষষ্টি পটলে বিভক্ত একটি প্রামাণিক তান্ত্রিক গ্রন্থ। ইহাতেও নানাবিধ তান্ত্রিক ধর্মাচরণের কথা আছে, এবং মহীধর প্রণীত মন্ত্রমহোদধিতে যেমন দশমহাবিদ্যার কালী, তারা, ষোড়শী ও ছিন্নমস্তার নাম পাওয়া যায়, তেমন মৎস্যসূক্তের ষষ্টিতম পটলে আর একটি মহাবিদ্যা মাতঙ্গিনীর (মাতঙ্গী) নামের উল্লেখ আছে। এই পটলে মাতঙ্গিনীবিদ্যার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। এই গ্রন্থের একষষ্টিতম পটলের বিষয়বস্তু হইতেছে সর্বগ্রহনিবারিণী মহাবিদ্যা সংক্রান্ত; কিন্তু ইহাতে দশমহাবিদ্যার অন্য নামগুলি পাওয়া যায় না। পরবর্তীর পটলে অপরাজিতার নাম আছে, এবং গ্রন্থের অন্যত্র ছয়টি মাতৃকা ও তাঁহাদের স্থানের কথা আছে, যথা– ব্রহ্মাণী (শিরে), মাহেশ্বরী (নেত্রে), কৌমারী (কর্ণে), বারাহী (উদরে), ইন্দ্রাণী (নাভীতে) এবং চামুণ্ডা (গুহ্যে); ইহা লক্ষ্য করিবার বিষয় যে এ প্রসঙ্গে বৈষ্ণবীর নাম করা হয় নাই।…’
‘এই বিশাল সাহিত্যের কোনও কোনও অংশের সহিত ভারতীয় অনার্য ও তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর লোকদের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন, কারণ এগুলি অত্যন্ত অশুদ্ধ সংস্কৃতে রচিত, এবং ইহাদের বিষয়বস্তু নিম্নস্তরের যাদুবিদ্যা সংক্রান্ত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় পশ্চিমাম্নায়ের অন্তর্গত কুব্জিকামত সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে ভেলক (ভেল্কী) বা নিম্নস্তরের যাদুবিদ্যায় অশেষ পারদর্শিতা অর্জনই এইসব তান্ত্রিক উপাসকের পরম লক্ষ্য ছিল, এবং যাঁহারা এ বিষয়ে কৃতকার্য হইতেন তাঁহাদিগকে নাথ বলা হইত; নাথপন্থীরা সমাজের নিম্নস্তরের লোক ছিলেন, ও এ কারণেই ইহাদিগের দ্বারা রচিত তান্ত্রিক গ্রন্থসমূহের সংস্কৃত ভাষা অশুদ্ধ, ব্যাকরণবহির্ভূত ও দুর্বোধ্য ছিল। ১৬৪২ খৃষ্টাব্দে লিখিত জয়দ্রথযামল সম্বন্ধে তিনি বলিয়াছেন যে ইহার বিষয়বস্তু সাধারণতঃ কুলার্ণব তন্ত্র হইতে গৃহীত। ইহাতে লিখিত আছে যে পর্ণশবরী দেবীর পূজা হয় কুম্ভকারের নয় কলুর গৃহে অনুষ্ঠিত হইবে, এবং ইহারা হিন্দুসমাজের নিম্নস্তরে অবস্থিত।- (জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়/ পঞ্চোপাসনা)
তবে দুর্বোধ্য এবং অশুদ্ধ সংস্কৃতে বহু তান্ত্রিক গ্রন্থ লিখিত হলেও মহানির্বাণতন্ত্রের ন্যায় অনেক গ্রন্থও লিখিত হয়েছিলো, যেগুলোর ভাষা ও ভাবসমৃদ্ধি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। তবে কেউ কেউ মনে করেন এই তন্ত্র আধুনিক কালের, এবং এটি রাজা রামমোহন রায়ের গুরু স্বামী হরিহরানন্দ ভারতীর রচনা।

        তান্ত্রিক গ্রন্থগুলির অনেকগুলি মহেশ্বর শিব ও মহেশ্বরী পার্বতীর মধ্যে সংলাপের আকারে লিখিত। দক্ষিণাম্নায়ভুক্ত বারাহীতন্ত্র গুহ্য কালিকা দেবী ও চণ্ডভৈরব দেবতার কথোপকথন বলে বর্ণিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, হিন্দুতন্ত্রে আলোচিত তত্ত্বসমূহ মৎস্যেন্দ্রনাথ, আদিনাথ, কণ্ঠনাথ প্রভৃতি নয়জন অবতারিতের দ্বারা মর্ত্যে আনীত হয়েছিলো। গোরক্ষনাথ প্রণীত হঠযোগদীপিকায় তাঁদের নাম পাওয়া যায়। নাথপন্থীরা পূর্বভারতীয় তান্ত্রিক পর্যায়ের এক বৃহৎ শৈবসম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। ধারণা করা হয়, তাঁদের আরম্ভকাল খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীর শুরুতে। কথিত আছে যে, মহাকৌলজ্ঞানবিনির্ণয় নামে অন্যতম মূলতন্ত্র মৎস্যেন্দ্রনাথের দ্বারা আনীত হয়েছিলো। এটি বেশ প্রাচীন, কারণ তাঁর পুঁথি গুপ্তোত্তর ব্রাহ্মীলিপিতে লিখিত। পুঁথিশেষে এটি চন্দ্রদ্বীপ বিনির্গত বলে বর্ণিত হয়েছে। তবে কি তা পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চল হতে উদ্ভূত বলা ধরা যেতে পারে? প্রাচীন বঙ্গদেশের এ অঞ্চল তান্ত্রিক উপাসনার অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন কেন্দ্র বলে পরিচিত। কামাখ্যা গুহ্যতন্ত্র নামে একটি তন্ত্রের নামও মৎস্যেন্দ্রনাথের সাথে জড়িত।

        ‘তান্ত্রিক ঐতিহ্যে তিনটি স্রোত স্বীকৃত হয়– দক্ষিণ, বাম ও মধ্যম। দক্ষিণ স্রোতের অন্তর্গত তন্ত্রসমূহের নাম যোগিনীজাল, যোগিনীহৃদয়, মন্ত্রমালিনী, অঘোরেশী, অঘোরেশ্বরী, ক্রীড়াঘোরেশ্বরী, লাকিনীকল্প, মারিচী, মহামারিচী ও উগ্রবিদ্যাগণ। মধ্যম স্রোতের অন্তর্গত তন্ত্রসমূহ হচ্ছে বিজয়, নিশ্বাস, স্বায়ম্ভূব, বাতুল, বীরভদ্র, রৌরব, মাকুট ও বীরেশ। বাম স্রোতের তন্ত্র হচ্ছে চন্দ্রজ্ঞান, বিশ্ব, প্রোদ্গীত, ললিত, সিদ্ধ, সন্তান, সর্বোদ্গীত, কিরণ ও পরমেশ্বর। ব্রহ্মযামলের পরিশিষ্ট পিঙ্গলামতে দু’ধরনের তন্ত্রের উল্লেখ আছে, কামরূপী ও উড্ডিয়ানী। অপর একটি পরিশিষ্ট জয়দ্রথযামলে তিন ধরনের মহাযোগী তন্ত্রের উল্লেখ আছে যথা মঙ্গলাষ্টক, চক্রাষ্টক ও শিখাষ্টক। মহাসিদ্ধসার তন্ত্রে ভারতবর্ষকে তিনটি ভৌগোলিক ভাগে ভাগ করা হয়েছে– বিষ্ণুক্রান্তা, রথক্রান্তা ও অশ্বক্রান্তা, প্রতিটি অঞ্চলে চৌষট্টিটি করে তন্ত্র বর্তমান। শক্তিসঙ্গমতন্ত্রের মতে বিন্ধ্য থেকে যবদ্বীপ পর্যন্ত এলাকা বিষ্ণুক্রান্তা, উত্তরে বিন্ধ্য থেকে মহাচীন পর্যন্ত রথক্রান্তা এবং পশ্চিমের অবশিষ্ট অংশ অশ্বক্রান্তা। ষট্সম্ভবরহস্যে চারটি তন্ত্র সম্প্রদায়ের কথা উল্লিখিত হয়েছে– গৌড়, কেরল, কাশ্মীর ও বিলাস। বাস্তবে মোটামুটি তিনটি তান্ত্রিক সম্প্রদায় স্বীকৃত– গৌড়ীয়, কাশ্মীরীয় এবং দ্রাবিড়ীয়।’
‘কাশ্মীর শৈববাদের গ্রন্থসমূহ কাশ্মীরীয় তন্ত্রের অন্তর্গত। অনুরূপভাবে শৈব সিদ্ধান্তীদের রচনাসমূহ দ্রাবিড়ীয় তন্ত্রের অন্তর্গত।… গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের গ্রন্থসমূহের মধ্যে কৌলাবলী, গান্ধর্ব, কুলার্ণব, ফেৎকারিণী, সনৎকুমার, মহাচীনাচার, কামাখ্যা, গুপ্তসাধন, মাতৃকাভেদ, তারারহস্য, গায়ত্রী, গৌতমীয়, মহানির্বাণ, শ্যামারহস্য, ত্রিপুরাসারসমুচ্চয়, উড্ডামেশ্বর, নিরুত্তর, কামধেনু, কঙ্কালমালিনী, নীলতন্ত্র, নির্বাণ, বৃহন্নীল, রুদ্রযামল, যোগিনী, যোগিনীহৃদয়, তন্ত্ররাজ, প্রভৃতি। জয়দ্রথতন্ত্রলোকে (১/১৮) কথিত হয়েছে যে শিবের যোগিনী মুখ হতে চৌষট্টিটি ভৈরব আগম নির্গত হয়েছিল যেগুলি অদ্বৈতপন্থী ছিল। এ ভিন্ন দশটি দ্বৈতপন্থী শৈব আগম এবং আঠারোটি মিশ্র মতবাদের রৌদ্র আগম বর্তমান ছিল। শঙ্করের উপর আরোপিত সৌন্দর্যলহরীতে (৫/৩৭) চৌষট্টিটি তন্ত্রের উল্লেখ আছে, যেগুলির নামের তালিকা লক্ষ্মীধরের ভাষ্যে দেওয়া আছে। বিভিন্ন শাক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রীবিদ্যা সম্প্রদায়ের সাহিত্য অতি বিস্তৃত, কালীসম্প্রদায়েরও নিজস্ব সাহিত্য আছে।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৬৫-১৬৬)

         বাঙলাদেশে যে পঞ্চমকার যুক্ত তান্ত্রিক সাধনা মধ্যযুগ থেকে প্রচলিত ছিলো সে সম্বন্ধে অনেকের ধারণা যে এটি চীন বা মহাচীন বা কারও কারও মতে বর্তমান তিব্বত থেকে এখানে আসে। এ প্রসঙ্গে শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের অভিমতটি উল্লেখযোগ্য–
‘মাতৃপূজা এবং শক্তিসাধনার প্রচলন বাঙলাদেশে অনেক পূর্ব হইতে প্রচলিত থাকিলেও খ্রীস্টীয় সপ্তদশ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ইহা এখানে একটা নবরূপ লাভ করিয়াছে এবং এই নবরূপেই বাঙলার সমাজ-সংস্কৃতিকে তাহা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করিয়াছে। কিন্তু বাঙলাদেশে তন্ত্রসাধনার প্রচলন এবং প্রভাব অনেক পূর্ব হইতে। বাঙলাদেশে এবং তৎসংলগ্ন পূর্বভারতীয় অঞ্চলসমূহে এই তন্ত্রপ্রভাব খ্রীস্টীয় অষ্টম শতক হইতে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত মহাযান বৌদ্ধধর্মের উপরে গভীর প্রভাব বিস্তার করিয়া মহাযান বৌদ্ধধর্মকে বজ্রযান, সহজযান প্রভৃতি তান্ত্রিক ধর্মে রূপান্তরিত করিয়া দিয়াছিল। আমার ধারণা, বাঙলাদেশে যত হিন্দুতন্ত্র প্রচলিত আছে তাহা মোটামুটিভাবে খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতক হইতে খ্রীস্টীয় পঞ্চদশ শতকের মধ্যে রচিত। বাঙলাদেশে এই হিন্দুতন্ত্র ও বৌদ্ধতন্ত্র বলিয়া যে দুইটি জাতিভেদ করা হয় সেই ভেদলক্ষণ আমার কাছে খুব স্পষ্ট এবং নিঃসন্দিগ্ধ মনে হয় না। সংস্কারবর্জিতভাবে বিচার করিয়া দেখিলে দেখা যাইবে, ভারতবর্ষের তন্ত্রসাধনা মূলতঃ একটি সাধনা। তন্ত্রের মধ্যে দার্শনিক মতবাদগুলি বড় কথা নয়– বড় হইল দেহকেই যন্ত্রস্বরূপ করিয়া কতকগুলি গুহ্য সাধনপদ্ধতি। এই সাধনপদ্ধতিগুলি পরবর্তী কালের লোকায়ত বৌদ্ধধর্মের সহিত মিলিয়া-মিশিয়া বৌদ্ধতন্ত্রের সৃষ্টি করিয়াছে, আবার হিন্দুধর্মের সহিত মিলিয়া-মিশিয়া হিন্দুতন্ত্রের রূপ ধারণ করিয়াছে; কিন্তু আসলে বৌদ্ধ ‘প্রজ্ঞা-উপায়ে’র পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনাশ্রিত সাধনা, আর হিন্দু শিব-শক্তির পরিকল্পনা এবং তদাশ্রিত সাধনার মধ্যে বিশেষ কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে বলিয়া মনে হয় না। এই তন্ত্রসাধনার একটি বিশেষ ধারা বৌদ্ধ দোঁহাকোষ এবং চর্যাগীতিগুলির ভিতর দিয়া যে সহজিয়া রূপ ধারণ করিয়াছে, তাহারই ঐতিহাসিক ক্রম-পরিণতি বাংলাদেশের বৈষ্ণব সহজিয়া সাধনায় এবং বিশেষ বিশেষ বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে।’– (দাশগুপ্ত/ ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য)
অপরদিকে নরেন্দ্রনাথ বলেন,– ‘বজ্রযান-কালচক্রযান-সহজ পরিমণ্ডলে একটি তান্ত্রিক ধারার উদ্ভব বঙ্গদেশে হয়েছিল যা সিদ্ধ ধারা নামে পরিচিত। এই ধারার অনুগামীদের লক্ষ্য ছিল সিদ্ধি বা অলৌকিক শক্তিলাভ। বর্ণরত্নাকর, শবরতন্ত্র এবং বিভিন্ন তিব্বতী পুঁথিতে চুরাশী জন সিদ্ধের উল্লেখ আছে। সিদ্ধদের লক্ষ্য ছিল জীবন্মুক্তি বা অমরত্বের সাধনা। এই জন্য তাঁরা যৌগিক কায়সাধন ছাড়াও ঔষধপত্র ব্যবহারে বিশ্বাসী ছিলেন। এই সকল ঔষধ প্রধানত পারদ ও অভ্রের দ্বারা প্রস্তুত করা হত। তাঁরা রসায়নশাস্ত্রের প্রভূত চর্চা করেছিলেন এবং এই তান্ত্রিক রসায়নবিদ্যা রসেশ্বর দর্শন নামে পরিচিত হয়েছিল। মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভারতের সিদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে বঙ্গদেশের সিদ্ধরা বিশেষ যোগাযোগ রাখতেন। চুরাশীজন সিদ্ধের তালিকায় কয়েকজন প্রসিদ্ধ নাথ সম্প্রদায়ের গুরুর নাম পাওয়া যায়। কৌলজ্ঞাননির্ণয় গ্রন্থে মৎস্যেন্দ্রনাথকে যোগিনী কৌলের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বলা হয়েছে। অকুলবীরতন্ত্রের লেখকত্ব তাঁর উপর আরোপ করা হয়েছে। গোরক্ষনাথ রচিত গোরক্ষসংহিতা, জালন্ধরী বা হাড়ি-পা রচিত বজ্রযোগিনীসাধনা, শুদ্ধিবজ্রপ্রদীপ, শ্রীচক্রসংবরগর্ভতত্ত্বনিধি, হুংকারচিত্তবিন্দুভাবনাক্রম প্রভৃতি তন্ত্রের কথা এখানে উল্লেখ করা চলতে পারে।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৬৭)

        এ প্রেক্ষিতে শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্ত আরো বলছেন,– ‘অন্তত দেড় হাজার বৎসর ধরিয়া বাঙলাদেশে এই একটি তান্ত্রিক ধারা প্রবহণের কারণ কি? এ-বিষয়ে আমার একটি ধারণা আছে– তাহা স্থির সিদ্ধান্ত না হইলেও সুধীগণের বিচারের জন্য উপস্থাপিত করিতেছি। আজকাল আমরা ভারতবর্ষের বহু স্থানে তন্ত্রশাস্ত্র এবং তন্ত্রসাধনার কিছু কিছু উল্লেখ এবং সন্ধান পাইতেছি বটে, কিন্তু তথাপি আমার মনে হয়, বৃহত্তর ভারতে এই তান্ত্রিকতার একটি বিশেষ ভূমিভাগ আছে। উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মীর হইতে আরম্ভ করিয়া নেপাল, তিব্বত, ভূটান, কামরূপ এবং বাঙলাদেশ– হিমালয় পর্বতসংশ্লিষ্ট এই ভূভাগকেই বোধহয় বিশেষভাবে তান্ত্রিক অঞ্চল বলা চলে। হিমালয়সংশ্লিষ্ট এই বিস্তৃত অঞ্চলটিই কি তন্ত্রবর্ণিত ‘চীন’ দেশ বা মহাচীন? তন্ত্রাচার ‘চীনাচার’ নামে সুপ্রসিদ্ধ; বশিষ্ঠ চীন বা মহাচীন হইতে এই তন্ত্রাচার লাভ করিয়াছিলেন, এইরূপ প্রসিদ্ধিও সুপ্রচলিত। এই-সকল কিংবদন্তীও আমাদের অনুমানেরই পরিপোষক বলিয়া মনে হয়। আমরা লক্ষ্য করিতে পারি, প্রাচীন তন্ত্র অনেকগুলিই কাশ্মীরে রচিত; ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানেও কিছু কিছু তন্ত্র রচিত হইলেও বঙ্গ-কামরূপ মুখ্যভাবে পরবর্তী তন্ত্রের রচনাস্থান– নেপাল-ভূটান-তিব্বত-অঞ্চলে এগুলির বহুল প্রচার এবং অদ্যাবধি সংরক্ষণ। ইহা ব্যতীতও পার্শ্বপ্রমাণরূপে আমরা আরো কতকগুলি তথ্যের উল্লেখ করিতে পারি। তন্ত্রোক্ত দেহস্থ ষট্চক্রের পরিকল্পনা সুপ্রসিদ্ধ; নিম্নতম মূলাধার চক্র হইতে আরম্ভ করিয়া ভ্রূমধ্যস্থ আজ্ঞাচক্রকে লইয়া এই ষট্চক্র। এই ছয়টি চক্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রহিয়াছেন– নিম্ন হইতে আরম্ভ করিয়া এই দেবীগণ যথাক্রমে হইলেন ডাকিনী, রাকিণী, লাকিনী, কাকিনী, শাকিনী এবং হাকিনী। এই নামগুলির প্রতি লক্ষ্য করিলেই বেশ বোঝা যায় এই নামগুলি সম্ভবতঃ সংস্কৃত নহে। পক্ষান্তরে দেখিতে পাই, ‘ডাক’ কথাটি তিব্বতী, অর্থ জ্ঞানী; ইহারই স্ত্রীলিঙ্গে ডাকিনী। আমাদের ‘ডাক ও খনার বচনে’র ডাকের বচন কথার মূল অর্থ বোধহয় জ্ঞানীর বচন। ডাকিনী কথার মূল অর্থ বোধহয় ছিল ‘গুহ্যজ্ঞানসম্পন্না’; আমাদের বাঙলা ‘ডাইনী’ কথার মধ্যে তাহার রেশ আছে; মধ্যযুগের নাথসাহিত্যের রাজা গোপীচাঁদের মাতা ময়নামতী ‘মহাজ্ঞান’সম্পন্না এই-জাতীয় ‘ডাইনী’ ছিলেন। সুতরাং মনে হয়, এই ‘ডাকিনী’ দেবী কোনো নিগূঢ়জ্ঞানসম্পন্না তিব্বতী দেবী হইবেন। ‘লাকিনী’ ও ‘হাকিনী’ নামে ভারতবর্ষের অন্যত্র কোনো দেবীর উল্লেখ পাইতেছি না, কিন্তু ভূটানে ‘লাকিনী’ ও ‘হাকিনী’ দেবীর সন্ধান পাওয়া যাইতেছে। তাহা হইলে তিব্বত-নেপাল-ভূটান-অঞ্চলের আঞ্চলিক দেবীরাই কি তন্ত্রের ষট্চক্রের মধ্যে আপন আপন আসন প্রতিষ্ঠিত করিয়া লইয়াছেন?’
‘এই প্রসঙ্গে আরো একটি তথ্যের প্রতি পণ্ডিতগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। তন্ত্রের মধ্যে মন্ত্রের অতিশয় প্রাধান্য। এই মন্ত্রতত্ত্বের বিভিন্ন দিক্ রহিয়াছে। কিন্তু সেই-সকল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে অশ্রদ্ধা না করিয়াও কতকগুলি ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাইতে পারে। তন্ত্রের মন্ত্রসমূহের মধ্যে আমরা বীজমন্ত্রের নানাভাবে উল্লেখ দেখিতে পাই। এই বীজমন্ত্রগুলি সাধারণতঃ একাক্ষরী। এই একাক্ষরী বীজমন্ত্রসমূহের মধ্যে প্রণব বা ‘ওঁ’ সুপ্রসিদ্ধ বৈদিক মন্ত্র। অন্য মন্ত্রগুলি বৈদিক বলিয়া মনে হয় না। হ্রীং ক্লীং হৈঁ ক্রীং প্রভৃতি মন্ত্র মূলতঃ সংস্কৃত ভাষাজাত কি-না এ বিষয়ে সংশয় প্রকাশের অবকাশ আছে। এই বীজমন্ত্র ব্যতীত তন্ত্রের মধ্যে আমরা আর-এক রকমের মন্ত্রমালা পাই, এই মন্ত্রগুলি সাধারণতঃ দ্বিমাত্রিক– ইহাদের কোনো অর্থ আমরা বুঝিতে পারি না। মহাযানী বৌদ্ধ দার্শনিক অসঙ্গ একস্থানে বলিয়াছেন যে, এই অর্থহীনতাই ইহাদের যথার্থ তাৎপর্য। অবশ্য অর্থহীন মন্ত্র অথর্বাদি বেদের মধ্যেও পাওয়া যায়। তন্ত্রে যে একাক্ষরী বীজমন্ত্রের এবং দ্ব্যক্ষরী মন্ত্রমালার বহুল ব্যবহার পাওয়া যায় সেগুলি সম্বন্ধে এমন কথা মনে করা কি একান্ত ভ্রমাত্মক হইবে যে, এগুলি আমাদের পূর্বোক্ত তান্ত্রিক অঞ্চলের কোনো প্রাচীনকালে প্রচলিত ভাষার লুপ্তাবশেষ? আমরা সাধারণভাবে যাহাকে চীনাঞ্চল বা মহাচীনাঞ্চল বলিয়া ইঙ্গিত করিয়াছি সেখানকার ভাষায় একাক্ষরিত্ব বা দ্ব্যক্ষরিত্বের প্রাধান্যের কথাও আমাদের এই প্রসঙ্গে স্মরণ রাখিতে হইবে।’- (ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য)

                তন্ত্রের সঙ্গে চীন বা মহাচীনের এই যে প্রাচীন যোগ খোঁজার প্রয়াস, এ প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের নিম্নোক্ত বক্তব্যটিও কৌতুহলজনক। তিনি বলছেন–
‘তাওবাদ সংক্রান্ত অধ্যাপক নীড্হামের (J. Needham : Science and Civilisation in China. Vol. II).. বিশ্লেষণ ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে তন্ত্রের ভূমিকাকে– এবং, অতএব, সামগ্রিকভাবে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসকেই– সম্পূর্ণ নতুন আলোয় দেখবার দাবি তুলেছে। কেননা, তাঁর বিশ্লেষণ অনুসারেই, দার্শনিক তত্ত্ব এবং সাধন-পদ্ধতি উভয় দিক থেকেই তাওবাদ ও তন্ত্র প্রায় অভিন্ন; এমনকি তিনি এ-কথা কল্পনা করতেও দ্বিধা বোধ করেন নি যে, চীনা তাওবাদই হয়তো ভারতের জমিতে এসে ভারতীয় তন্ত্রের রূপ গ্রহণ করেছিল :
At first sight, then, Tantrism seems to have been an Indian importation to China. But closer inspection of the dates leads to a consideration, at least, of the possibility that the whole thing was really Taoist. (P. 427)
আপাতদৃষ্টিতে এ-মন্তব্য যতই বিস্ময়কর ঠেকুক না কেন, মনে রাখা দরকার যে ভারতীয় তন্ত্রগ্রন্থে মহাচীন এবং চীনাচারের উল্লেখ অস্পষ্ট নয়; এমনকি তারা-তন্ত্রে এমন কথাও বলা হয়েছে যে ঋষি বশিষ্ঠ চীনদেশে গিয়ে বুদ্ধদেবের কাছে তন্ত্রে দীক্ষা পেয়েছিলেন এবং ভারতে প্রত্যাবর্তন করে তিনি এই তন্ত্রেরই প্রচার করেছিলেন। এ-জাতীয় সাক্ষ্যর উপর নির্ভর করেই প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও সিল্ভ্যাঁ লেভি ইতিপূর্বেই ভারতীয় তন্ত্রে চীনা প্রভাব প্রতিপন্ন করবার প্রয়োস করেছিলেন। কিন্তু তান্ত্রিক ধ্যানধারণার আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সমস্যার আলোচনায় আমরা পরে প্রত্যাবর্তন করব। আপাতত এটুকু মনে রাখাই যথেষ্ট যে, তন্ত্রের সঙ্গে তাওবাদের সাদৃশ্য কম নয়। অধ্যাপক নীড্হাম যেমন বলেছেন,
In any case, it is possible to find detailed parallels of much precision between Taoism and Tantrism. (P. 428)
তন্ত্র ও তাওবাদের মধ্যে সাদৃশ্য যদি এমন গভীর হয় এবং এই তাওবাদই যদি চীনদেশের চিন্তা-ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের বাহক হয়ে থাকে– তাহলে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসেও তন্ত্রের অনুরূপ গুরুত্ব সন্দেহ করা নিশ্চয়ই অসঙ্গত বা অস্বাভাবিক হবে না।’– (সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি ইত্যাদি অগ্রন্থিত রচনা, পৃষ্ঠা-২৩-২৪)

               এ প্রেক্ষিতে আরেকটি প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য বলে মনে হয়। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও সমাজভাবনার ইতিহাসে এক বিশেষ স্থানের অধিকারী ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন ডেসমন্ড বার্নাল বা সংক্ষেপে জে. ডি. বার্নাল (১৯০১-১৯০৭১) তাঁর জগদ্বিখ্যাত ‘ইতিহাসে বিজ্ঞান’ (Science in History) গ্রন্থে বলেন,–
‘রসায়নিক ধ্যানধারণার উদ্ভব হয় সাদৃশ্যবিচারের মাধ্যমে চিন্তা করার কার্যকর প্রণালীর মধ্যে থেকে। সে-চিন্তাপ্রণালী মূলত জীববিজ্ঞান বা সমাজতত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। রসায়নে এক মৌলিক দ্বৈতরূপের অস্তিত্ব রয়েছে, যা ধাতু এবং অধাতুর মধ্যে পরিস্ফুট। আজ আমরা জানি, এই দ্বৈতরূপের কারণ হচ্ছে, ইলেকট্রনের ঘাটতি বা বাড়তি। সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে মনে হয় এই দ্বৈতচরিত্রের প্রথম ফলিত প্রয়োগ ঘটায় চিনারা। সুদূর প্রাগৈতিহাসিক কালেই তারা রক্তের জাদু-বিকল্প হিসেবে লাল হিঙ্গুল ব্যবহার করেছিল। সেই হিঙ্গুল-কে তারা গন্ধক আর পারদ– এই দুই মৌল উপাদানে বিভক্ত করে নিয়েছিল। তাও-পন্থীরা এই দুটি মৌলকে তাঁদের পুরুষ-উপাদান ইন আর স্ত্রী-উপাদান ইয়াং-য়ের সাধারণ তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নেন (এই দুই উপাদানের মূল আবার নিহিত ছিল প্রাচীনতর টোটেমের মধ্যে)। এর মধ্যে থেকে তাঁরা আলকেমির এক ধারা গড়ে তোলেন। সম্ভবত এই উৎস থেকেই প্রথমে ভারতীয় এবং পরে আরবি আলকেমির উদ্ভব ঘটে। প্রথম দিকে অবশ্য সোনা নয়, অমৃত পানীয় তৈরির পন্থা আবিষ্কারই ছিল এর লক্ষ্য।’– (ইতিহাসে বিজ্ঞান, পৃষ্ঠা-১৭৯)

              ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে তন্ত্রের যে গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে তা হলো রসায়ন বা অ্যালকেমিবিদ্যায়– এবং সাধারণভাবে ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে– তান্ত্রিকদের অবদান। আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় দুই পর্বে রচিত তাঁর বিখ্যাত ’হিন্দু রসায়নশাস্ত্রের ইতিহাস’ (History of Hindu Chemistry) শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের মাধ্যমে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে প্রাচীন ভারতের আয়ুর্ব্বেদ ও রসায়নে তান্ত্রিকদের এই অবদানের ইতিহাস হাজির করেছেন। এ বিষয়ে যথাস্থানে আলোচনা করা যাবে। তবে তন্ত্রের সঙ্গে তাওবাদের কিছু মৌলিক সাদৃশ্য দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্যে উদ্ধৃত করা যেতে পারে।
‘প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাক্ষেত্রের মতোই প্রাচীন চীনের চিন্তাক্ষেত্রেও প্রকৃতি-পুরুষের তত্ত্ব দেখতে পাওয়া যায়। চীনা ভাষায় প্রকৃতি ইন্ (Yin), এবং পুরুষ ইয়াঙ (Yang)। ফর্কে প্রমুখ ইয়োরোপীয় চীন-তত্ত্ববিদেরা ইতিপূর্বেই দেখিয়েছিলেন যে ইন্-ইয়াঙ তত্ত্ব সামগ্রিকভাবে সমস্ত প্রাচীন চীন চিন্তাধারাকেই সঞ্জীবিত করেছিল; প্রমাণ হিসেবে, ফর্কে বলেছেন, প্রাচীন চীনের দুটি প্রধান সম্প্রদায়ই– অর্থাৎ কন্ফুসীয়-সম্প্রদায় এবং তাও-সম্প্রদায় উভয়ই– এই ইন্-ইয়াঙ বা প্রকৃতি-পুরুষের তত্ত্বকে আশ্রয় করেছে (ERE [Encyclopaedia of Religion and Ethics] viii, 492)। অধ্যাপক নীড্হাম-ও অবশ্যই এ-কথা স্বীকার করেছেন (P.61); কিন্তু এদিক থেকে উক্ত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে প্রভেদ এবং বিশেষ করে তাও-সম্প্রদায়ের যে-বৈশিষ্ট্য ইতিপূর্বে ইয়োরোপীয় বিদ্বানদের চোখে পড়ে নি সেদিকে তিনি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্র্ষণ করেছেন :
If it were not unthinkable (from the Chinese point of view) that the Yin and the Yang could ever be separated, one might say that Taoism was a Yin thought-system and Confucianism a Yang one. (P. 61)
কিংবা,
Confucian knowledge was masculine and managing; the Taoists condemned it and sought after a feminine and receptive knowledge which could arise only as the fruit of a passive and yielding attitude in the observation of Nature. (P. 33)
অর্থাৎ, ভারতীয় দর্শনের পরিভাষায় এই কথাটি বলতে গেলে বলা দরকার, তাওবাদ প্রকৃতি-প্রধান চিন্তাধারার পরিচায়ক এবং এইদিক থেকেই কন্ফুসীয়-সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাও-সম্প্রদায়ের মৌলিক প্রভেদ, কেননা কন্ফুসীয় সম্প্রদায় পুরুষ-প্রধান।
ভারতীয় তন্ত্রের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, তথাকথিত বিভিন্ন তান্ত্রিক সম্প্রদায় এই [সাংখ্যোক্ত] প্রকৃতি-পুরুষের তত্ত্বকে বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন ভাবে ব্যক্ত করবার চেষ্টা করেছে : তথাকথিত বৌদ্ধ-তন্ত্রে বলা হয়েছে প্রজ্ঞা ও উপায়, শূন্যতা ও করুণা বা বজ্র ও পদ্ম-র কথা; তথাকথিত শাক্ততন্ত্রে বলা হয়েছে শক্তি ও শিব বা হর ও গৌরীর কথা; আবার বৈষ্ণব সহজিয়ারা এই কথাকেই রাধা ও কৃষ্ণ বা রতি ও রসের তত্ত্ব বলে প্রচার করেছেন। কিন্তু তন্ত্রের যে সম্প্রদায়ই হোক না কেন, এই প্রকৃতি-পুরুষের মধ্যে সর্বত্র প্রকৃতিই প্রধান।’– (তন্ত্র ও তাওবাদ, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি ইত্যাদি অগ্রন্থিত রচনা, পৃষ্ঠা-২৫)

                 এছাড়া, যদিও তাওবাদে এই প্রকৃতি-প্রাধান্য সর্বত্র একভাবে কীর্তিত নয়, তবু দেবীপ্রসাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাও-কাব্যের সঙ্গে আমাদের তান্ত্রিক-কাব্যের আশ্চর্য সাদৃশ্য তাওবাদীদের ঐ Mysterious Feminine-এর পরিচয় আমরা পেয়েছি চর্যা-সঙ্গীতের ডোম্বী, শবরী, সহজসুন্দরী নামের অন্তরালে। বৈষ্ণব-কবিদের গানেও তাও-কাব্যের প্রায় হুবহু কথারই পরিচয় পাওয়া যায়, যেমন– ‘প্রকৃতি আচার পুরুষ বেভার/ যে-জনা জানিতে পারে’, কিংবা ‘পুরুষ ছাড়িয়া প্রকৃতি হবে/ একদেহ হয়ে নিত্যতে রবে’ ইত্যাদির সঙ্গে ‘He who knows the male, yet cleaves to what is female’ কথার পার্থক্য কোথায়?
‘অবশ্য তাওবাদীদের কাব্যও অনেকাংশে সন্ধ্যা-ভাষায় রচিত; এ-কাব্যও আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা হেঁয়ালির মতো প্রতীত হয়। চীন-ভাষায় বলা হয়, তাওবাদীরা সমাজের বাইরে হাঁটেন– তাই আমাদের তান্ত্রিকদের কাব্যের মতোই তাঁরাও তাঁদের বলবার কথাটা সোজা সমাজ-স্বীকৃত ভাষায় ব্যক্ত করেন না। কিন্তু অধ্যাপক নীড্হাম এর যে-কারণ প্রদর্শন করছেন তাও কম চিত্তাকর্ষক নয়। প্রচলিত সমাজকে মানেন নি বলেই ওরা সমাজের বাইরে হাঁটেন; সমাজের উচ্চ-মহল-উচ্ছ্বসিত জ্ঞানকে জ্ঞান বলে স্বীকার করেন নি বলেই তাঁরা জ্ঞানীদের প্রসঙ্গে বিদ্রূপ-মুখর আর তাঁদের বক্তব্য উচ্চ-সমাজ সমর্থিত ও প্রচলিত নীতিবোধ এবং ধর্মবোধের তীব্র বিরোধী বলেই তাঁদের বলবার কথাটা সোজাসুজি সামাজিক ভাষায় তাঁরা বলতে চান নি। স্বভাবতই আমাদের চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যদের কথা মনে পড়ে। দীর্ঘ উদ্ধৃতির প্রয়োজন নেই।’– (ঐ, পৃষ্ঠা-২৭)
আমাদের পরবর্তী আলোচনাগুলোতে পর্যায়ক্রমে এ বিষয়গুলো আরও খোলাশা হবে আশা করি।


(চলবে…)

[পূর্বপোস্ট : ভূমিকা] [*] [পরের পোস্ট : তন্ত্রের প্রাচীনত্ব]

 

Advertisements

1 Response to "তন্ত্র-সাধনা-০২ : তন্ত্র-শাস্ত্র"

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 439,383 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: