h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শক্তি-সাধনের গুহ্য রহস্যমার্গ তন্ত্র-সাধনা-০১ : ভূমিকা

Posted on: 16/10/2017


12046581_597640647040660_587699030591407997_n

শক্তি-সাধনের গুহ্য রহস্যমার্গ তন্ত্র-সাধনা-০১ : ভূমিকা
রণদীপম বসু

শক্তি-সাধনের এক গুহ্য রহস্যমার্গ হলো তন্ত্র বা তান্ত্রিক-সাধনা। তন্ত্রশাস্ত্র বলতে মোটের উপর সেই সকল গ্রন্থাদি বোঝায় যেগুলিতে শক্তি সাধনার পরিপ্রেক্ষিতে নানাপ্রকার দেবদেবী সংক্রান্ত ধারণাগত ও আচার-অনুষ্ঠানগত বিধিব্যবস্থা ও সেগুলির প্রয়োগ আলোচিত হয়েছে। এদিক থেকে বিচার করলে বৌদ্ধ, শৈব, বৈষ্ণব, গাণপত্য, সৌরাদি পূজাক্রম, যেখানে শক্তির বিশেষ ভূমিকা আছে, সেগুলিও তান্ত্রিক পর্যায়ভুক্ত। বৈষ্ণব পূজাক্রমে পাঞ্চরাত্র সংহিতাসমূহের মধ্যে তন্ত্রসাগর, পাদ্মসংহিতাতন্ত্র, পাদ্মতন্ত্র, লক্ষ্মীতন্ত্র প্রভৃতি নাম পাওয়া যায়। শেষোক্ত লক্ষ্মীতন্ত্র গ্রন্থটিকে শাক্ত তান্ত্রিকেরাও প্রামাণ্য বলে মনে করেন। আবার সৌর ও গাণপত্য ধর্মমত সংক্রান্ত কোন রচনাকেও তন্ত্রের পর্যায়ে ফেলা হয়। আর শৈব তন্ত্রসমূহকে শাক্তরা বহুস্থলেই প্রামাণ্য বলে মনে করেন। তাছাড়া অভিনবগুপ্ত প্রমুখ শৈব লেখকেরা শাক্তদের নিকটও বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য হয়ে থাকেন। তার মানে এসবের পেছনে যে সুদীর্ঘ শাক্ত-ঐতিহ্য বহমান তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে তন্ত্র বিষয়ক আলোচনায় শাক্ত-সাধনা বা এতৎবিষয়ক ধারণাগুলি এতোটাই অঙ্গাঙ্গিভাবেই জড়িয়ে আছে যে তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

      শাক্তধর্ম নামে বর্তমানে যা প্রচলিত তার উৎস যে আদিম যুগের মাতৃকাদেবীর উপাসনা এবং তৎকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠান, এ ব্যাপারে আজ আর কোন দ্বিমত নেই। আর শক্তি-উপাসকদের আরাধ্যা দেবী যে নানাপ্রকার এক বা ভিন্ন জাতীয় দেবী-কল্পনার সংমিশ্রণের ফলে পরবর্তীকালে পূর্ণ রূপ গ্রহণ করেছিলেন তার ইঙ্গিত আমরা ইতঃপূর্বে পেয়েছি। এদের এক বা একাধিক আদিরূপের সঙ্গে বহির্ভারতীয় অনেক প্রাচীন জাতির দ্বারা পূজিত দেবীর মূল কল্পনার ঐক্যও যে ছিলো সে ব্যাপারে অনেক তথ্য-নিদর্শন ইতিহাস সমাজতত্ত্ব প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিদ্বান গবেষকরা বিভিন্নভাবে খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছেন এবং পেয়েছেনও। ফলে মাতৃকারূপে দেবীর পূজা শুধু যে ভারতেই সুপ্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত ছিলো এমন নয়, বরং পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ এবং অন্যান্য স্থানে বহু পূর্বকাল থেইে যে সেসব প্রচলিত ছিলো, এ ব্যাপারেও এখন আর দ্বিমত নেই। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রাচীনতম উপাসনার এই ধারায় উপাস্য পর্যায়ে দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপকল্পনা সুপ্রাচীন হলেও বৈষ্ণব শৈবাদি উপাসক সম্প্রদায়গুলির উল্লেখ যেভাবে খৃষ্টপূর্ব যুগের সাহিত্যে পাওয়া যায় সেভাবে শক্তি-পূজকগোষ্ঠীর উল্লেখ তৎকালীন সাহিত্যে প্রায় দুর্লভ। তবে জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে–
‘শাক্ত সম্প্রদায় সম্পর্কিত এই নেতিবাচক তথ্য ইহার অর্বাচীনত্ব প্রমাণিত করে না। ইহা হইতে এই মাত্র অনুমিত হইতে পারে যে বৈষ্ণব শৈবাদি সম্প্রদায়গুলির ন্যায় ইহা সুপ্রাচীনকালে এত ব্যাপক ও সুগঠিত ছিল না। আরও একটি কথা এ প্রসঙ্গে বলা আবশ্যক। দেবীপূজার এক পর্যায় প্রথমতঃ ও প্রধানতঃ যে বিষ্ণু শিবাদি দেবতাকে আশ্রয় করিয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নাই।’- (জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় / পঞ্চোপাসনা)

       এ প্রসঙ্গে বলা বাহুল্য হবে না যে, ভারতের প্রায় সকল ধর্ম ব্যবস্থাই কোন-না কোনভাবে তান্ত্রিক অন্তঃস্রোতের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। শাক্ততান্ত্রিক ধারণাসমূহ, স্বতন্ত্র ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে, শৈবধর্মকেই আশ্রয় করে বেড়ে উঠেছিল বলেই হয়তো শৈবধর্মের ক্ষেত্রে এই প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। সাংখ্যোক্ত ও তন্ত্রোক্ত পুরুষ-প্রকৃতির ধারণাই শিব ও শক্তির ধারণার উৎস। একটি অন্যনিরপেক্ষ নয়।
এ প্রেক্ষিতে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষক অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন– ‘শাক্ততান্ত্রিক ধারণাসমূহ স্বতন্ত্র ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে শৈবধর্মকে অবলম্বন করেছিল। সাংখ্যোক্ত ও তন্ত্রোক্ত পুরুষ প্রকৃতির ধারণাই শিব ও শক্তির ধারণার উৎস। শৈব ও শাক্তধর্মের মূল তত্ত্বগুলি এই, পার্থক্য হচ্ছে প্রথমটির ক্ষেত্রে পুরুষ প্রাধান্য, দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে প্রকৃতি প্রাধান্য। শিবতত্ত্ব ও শক্তিতত্ত্বের পাকাপাকি সংযোগের সূত্রপাত গুপ্তযুগ থেকে। লেখসমূহ ও সাহিত্য ছাড়াও এই সংযোগের অন্য পরিচয় পাওয়া যায় ভাস্কর্য থেকে। উমা-মহেশ্বর ও কল্যাণসুন্দর (বৈবাহিক) মূর্তিসমূহের সাক্ষ্য এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৫৯)
তবে এক্ষেত্রে এটাও স্মর্তব্য যে,– ‘একটি ভ্রান্ত ধারণা বহুল প্রচলিত যা হচ্ছে শাক্ত ধর্ম ও তন্ত্র যেন একই মুদ্রার দুই দিক। এই ধারণা সঠিক নয়। ভারতীয় ধর্মচেতনার বিকাশের প্রভাতকাল থেকেই একটি বিকল্প লোকায়তিক জ্ঞান, কর্ম ও সাধনার ধারা হিসাবে তান্ত্রিক ধারাটি বরাবর বিদ্যমান ছিল। এই ধারাটির বিকাশ ঋগ্বেদের কিছু অংশে, অথর্ববেদে এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যে দেখা যায়। বুদ্ধও এই ধারাটি থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। তাঁর দেহাত্মবাদ বা নৈরাত্ম্যবাদের উৎস প্রাচীন তান্ত্রিক বিশ্ববীক্ষার মধ্যে অন্বেষণ করা যায়। (এখানে অবশ্য উল্লেখ করা যেতে পারে যে তন্ত্র অত্যন্ত প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ তান্ত্রিক গ্রন্থই মধ্যযুগে রচিত, যেখানে বহু ও বিচিত্র নানা মতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যার ফলে বহু ক্ষেত্রেই মূল বক্তব্যসমূহ নানাভাবে পল্লবিত হয়েছে)। সে যাই হোক, তান্ত্রিক ধারার অনুগামীরা বৌদ্ধমত গ্রহণ করার পরেও নিজেদের প্রাচীন জীবনচর্যা ও সাধন পদ্ধতিকে বজায় রেখেছিলেন এবং সংঘের মধ্যেই নানা ধরনের গুহ্যসমাজের সৃষ্টি করেছিলেন। এই তন্ত্রসাধকদের প্রভাবেই পরবর্তীকালে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব হয়,…। তান্ত্রিক আদর্শসমূহ কিভাবে বৈষ্ণবধর্মকে প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ লক্ষ্মীতন্ত্র (নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে রচিত) থেকে পাওয়া যায় যেখানে লক্ষ্মী বিষ্ণুর চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং সকল সৃষ্টির নিমিত্ত কারণ। তাঁর যে সাধনার কথা উল্লিখিত হয়েছে তা একান্তভাবেই পঞ্চমকারসহ বামাচারী।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৫৮)

       তার মানে, শক্তি-সাধনার যে ধারাটি প্রাচীনতম বিশ্বাস ও মাতৃপূজার রহস্যময় আদিম ধারণাগুলোকে পরম্পরাক্রমে বয়ে এনে এতদঞ্চলের লৌকিক ধর্মচর্যাকে এক আধা-বিমূর্ত আধ্যাত্মিক চেতনায় পল্লবিত করে নতুন মাত্রায় গতিশীল করেছিল বলে মনে করা হয়, সেটি হলো তন্ত্র ও তান্ত্রিক ধর্মচর্যা। তান্ত্রিক ধর্মচর্যা ও বিশ্বাসগুলোর দিকে আলোকপাত করলেই বস্তুত শক্তি-সাধনার রহস্যময়ী মোহিনী রূপটি আমাদের দৃষ্টি-সমীক্ষায় চলে আসে।
‘শাক্ত-তান্ত্রিক ভাবধারার সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এখানে সর্বোচ্চ দেবতা একজন নারী, যিনি নানা নামে ও নানা রূপে কল্পিতা। শাক্ত পুরাণসমূহের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী স্বয়ং আদ্যাশক্তিই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের প্রতীকস্বরূপ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে সৃষ্টি করেন। এই আদ্যাশক্তি বা শক্তিতত্ত্বের মূল সুপ্রাচীন যুগের মানুষের জীবনচর্যার মধ্যে নিহিত। আদিম চেতনায় নারী শুধুমাত্র উৎপাদনের প্রতীকই নয় সত্যকারের জীবনদায়িনীর ভূমিকাই ছিল প্রধান, জীবনদায়িনী মাতৃদেবীই ছিলেন ধর্মজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এই নারীশক্তির সঙ্গে পৃথিবীর, মানবীয় ফলপ্রসূতার সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার, সমীকরণ সাংখ্য ও তন্ত্রোক্ত প্রকৃতির ধারণার উদ্ভবের হেতু, যা থেকে পরবর্তীকালের শক্তিতত্ত্বের বিকাশ ঘটে। পৃথিবীর সর্বত্রই আদিম কৃষিজীবী কৌমসমাজে ধরণীর ফলোৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে নারীজাতির সন্তান-উৎপাদিকা শক্তিকে অভিন্ন করে দেখার রীতি বর্তমান। সংস্পর্শ বা অনুকরণের দ্বারা একের প্রভাব অন্যের উপর সঞ্চারিত করা সম্ভব এই বিশ্বাসকে অবলম্বন করেই আদি-তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বতত্ত্ব গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতির রহস্য মানবদেহেরই রহস্য, কারণ মানবদেহই বিশ্বপ্রকৃতির সংক্ষিপ্তসার।’- (নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট/ পৃষ্ঠা-১৫৭)

       তবে সর্বোপরি শাক্তধর্মের ইতিহাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এই ধর্ম প্রকৃতির দিক থেকে নমনীয় হওয়ার দরুন বিভিন্ন যুগের সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পেরেছিলো বলে মনে করা হয়। শাক্তধর্ম ও তন্ত্রের সামাজিক ভূমিকা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ‘ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস’ গ্রন্থে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন,– মোটামুটিভাবে আমরা তাদের সামাজিক অবদানগুলিকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করতে পারি।
(১) শাক্তধর্ম ও তন্ত্র জাতিভেদ বিরোধী। যদিও পরবর্তীকালের ব্রাহ্মণ্য হস্তাবলেপের প্রভাবে কোন কোন তন্ত্রে জাতিপ্রথাকে যুক্তিসহ করার চেষ্টা হয়েছে, ওই অংশগুলি তন্ত্রের মৌল অংশ নয় বলে আমাদের মনে করতে হবে। কেননা, তন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে বার বার বলা হয়েছে যে জাতিগত ধারণা ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কার নিয়ে এ পথে আসা চলবে না। দীক্ষিত হলে জাতিধর্মে বিশ্বাস রাখা চলবে না। নীচ জাতীয় ব্যক্তিরাও গুরু হতে পারেন এবং ব্রাহ্মণকেও তাঁর চরণাশ্রিত হতে হবে। অসংখ্য নীচ জাতীয় গুরুর উল্লেখ তন্ত্রে দেখা যায়, যাঁদের মধ্যে হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল সকলেই আছেন।
(২) তন্ত্র পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরোধী। শাক্তধর্ম অনুযায়ী সকল নারী, এমন কি সে পেশায় গণিকা হলেও, সাক্ষাৎ মহামায়া এবং সেই হিসাবে শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্র। তন্ত্রমতে নারী কখনও অধঃপতিত হতে পারে না, ইচ্ছামত দীক্ষাদাত্রী হতে পারেন। নারীমুক্তির ক্ষেত্রে একালের সমাজ-সংস্কারকদের চেষ্টার বাস্তব ফল কি হয়েছে জানি না, তবে তান্ত্রিকদের সম্পর্কে এটুকু বলা যায় পুরুষ-সংসর্গ করলেও তার কোন চরিত্র দোষ ঘটে না। নারীরাও গুরু এবং মধ্যযুগ থেকে শুরু করে ঊনিশ শতক পর্যন্ত তাঁরা অসংখ্য সমাজচ্যুতা, পতিতা হিসাবে পরিত্যক্তা, লাঞ্ছিতা ও অপমানিতা নারীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন; তাঁদের সাধিকা, ভৈরবী, যোগিনী ইত্যাদিতে পরিণত করেছিলেন; তাঁদের কাছে নূতন জীবনের স্বাদ এনে দিয়েছিলেন; সমাজের চোখে তাঁদের শ্রদ্ধেয়া করে তুলেছিলেন। হয়ত তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়নি, কিন্তু তাঁরা সামাজিক মর্যাদা পেয়েছিলেন, উচ্চবর্ণের ও বিত্তবান ব্যক্তিরা তাঁদের পদধূলি গ্রহণ করেছিলেন, অনেকে দীক্ষাও নিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণকেও দীক্ষা দিয়েছিলেন একজন তান্ত্রিক ভৈরবী, যিনি তাঁকে পরমহংস বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং দীর্ঘকাল তাঁর ধর্মজীবনের পরিচালিকা ছিলেন। তাঁর জাত-কুল-গোত্র-চরিত্র নিয়ে মাথা ঘামাবার সাহস সে যুগের সমাজের হয়নি।
(৩) বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তান্ত্রিকদের বিশিষ্ট অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। ভারতীয় রসায়নশাস্ত্র মূলত তাঁদের সৃষ্টি। চিকিৎসাশাস্ত্রেও তাঁদের অবদান অতুলনীয়। মানবদেহের গঠন ও কার্যকলাপ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার সূত্রপাত তাঁরাই করেন। শব ব্যবচ্ছেদ, নিষিদ্ধ খাদ্যসমূহের গুণাগুণ পরীক্ষা প্রভৃতি বিষয়গুলি বর্ণাশ্রয়ী ব্রাহ্মণ্যসমাজ বরদাস্ত করেনি। চিকিৎসকের প্রতি স্মৃতিশাস্ত্রকারদের বিষোদ্গারের ধরন দেখলেই তা বোঝা যায়। অত্যন্ত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই এদেশে বিজ্ঞানচর্চার বিকাশ ঘটেছে। তান্ত্রিকদের পক্ষেই এপথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল, কেননা তাঁরা সামাজিক অনুশাসনের বড় একটা ধার ধারতেন না, লোকে তাঁদের ভয়ও করত, আত্মরক্ষার্থেই তাঁরা সামাজিক অনুশাসনের নিজেদের চারপাশে একটা ভীতির প্রাচীর খাড়া করেছিলেন। নিষিদ্ধ খাদ্যাখাদ্যের ভৈষজ্য গুণ পরীক্ষার জন্যই তাঁরা ওইগুলিকে নিজস্ব ধর্মচর্যার উপকরণ করেছিলেন, শবদেহ ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনেই তাঁরা শ্মশানচারী ছিলেন, শব সাধনায় যা হচ্ছে আসল তাৎপর্য।

       এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সবিশেষ তাৎপর্য বিবেচনায় না রাখলে তন্ত্রচর্যা ও তার সমকালীন প্রেক্ষাপট অনুধাবনে ব্যর্থ হবার সম্ভাবনাই প্রকট বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন।

(চলবে…)

[*] [পরের পোস্ট : তন্ত্র-শাস্ত্র]

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 207,714 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 86 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: