h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শক্তি-সাধনা-১০। শক্তিতত্ত্ব ও দর্শন

Posted on: 09/10/2017


11999019_597640487040676_4191804527578047278_n

শক্তি-সাধনা-১০। শক্তিতত্ত্ব ও দর্শন 
রণদীপম বসু

শাক্ত দর্শনের মূল ভিত্তি সাংখ্য, যা গড়ে উঠেছিল প্রাচীনযুগের তন্ত্র থেকে উদ্ভূত প্রকৃতি পুরুষ তত্ত্বকে আশ্রয় করে। তান্ত্রিক পুঁথিসমূহের চেয়ে তন্ত্র অনেক বেশি প্রাচীন, যার মূল খুঁজতে গেলে আমাদেরকে বৈদিক যুগেরও অনেক পেছনে যেতে হবে। সেই সুদূর অতীতের মাতৃপ্রধান সমাজ থেকে প্রকৃতিপ্রাধান্যবাদের উদ্ভব হয়েছে, মাতৃকাদেবীকেন্দ্রিক সেই প্রাচীন জীবনচর্যাই আদি তন্ত্র। পরবর্তীকালের সাংখ্যদর্শন সেই প্রাচীন তন্ত্রকেই অবলম্বন করে গড়ে উঠেছিল। মাতৃ বা প্রকৃতিপ্রধান ধর্মব্যবস্থা, যার আবেদন ছিল মূলত সমাজের নিম্নস্তরে, বিশেষ করে কৃষিজীবী মানুষদের মধ্যে, বরাবরই সাধারণ মানুষের জীবনে বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিল, এবং প্রভাবের পরিধি এতো বিস্তৃত যে, ভারতের অন্যান্য প্রধান প্রধান ধর্মগুলিও শাক্ত-তান্ত্রিক ধ্যানধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এই ধ্যানধারণাগুলি বিভিন্ন ধর্মকে প্রভাবিত করেই ফুরিয়ে যায়নি, গুপ্তোত্তর যুগ থেকে নতুনভাবে রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আধুনিক শক্তিতত্ত্ব বলতে আমরা যা বুঝি তা বস্তুত গুপ্তযুগে পরিগৃহীত নতুন রূপ। অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ভাষ্যে–
‘শাক্তধর্মের মূল ভিত্তি ছিল জনজীবনের নীচের তলা, কৃষিজীবী, কারিগর প্রভৃতি নিয়েই যা গঠিত। এই ধর্মের গুরুরাও ছিলেন নিম্নবর্ণের মানুষ…। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণরাও এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন, এবং তাঁদের বিদ্যাবত্তার জোরে সহজেই নেতৃত্ব অধিকার করেন। ধর্ম ও দর্শনের মূল আদর্শসমূহ লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বও স্বাভাবিকভাবে তাঁদের হাতে এসে পড়ে, কিন্তু তার ফলে বিপদ হয় এই যে শাক্তধর্ম ও তন্ত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদের স্পর্শ লাগে এবং তারই প্রভাবে শাক্তধর্ম ও তন্ত্র তার কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। ব্রাহ্মণ দার্শনিকেরা সাংখ্যকে একেবারে পরিত্যাগ করেননি, কিন্তু… এরা সাংখ্যের উপরও কারিকুরি করে তাকে প্রচ্ছন্ন বেদান্তে পরিণত করেছিলেন। শাক্তদর্শনের ক্ষেত্রে বুদ্ধি, অহংকার, তন্মাত্র, মহাভূত প্রভৃতি সাংখ্য ধারণাকে বজায় রাখলেও এগুলির উপর তাঁরা বেদান্তকে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। সাংখ্যের পুরুষের ধারণাটাকে একেবারে বদলে সেখানে তাঁরা বেদান্তের ব্রহ্মকে বসিয়েছিলেন যাঁর সঙ্গে তাঁরা সমীকরণ করেছিলেন শিবের। প্রকৃতিকেও তাঁরা স্বধর্ম বিচ্যুত করে ওই ব্রহ্মেরই বিমর্শ শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন।’
‘বৈদান্তিক দ্বৈত ও অদ্বৈত উভয় মতবাদ শাক্তধর্মে স্থান পেয়েছে। তন্ত্র সাধনায় দুটি বিশেষ কুল বা সম্প্রদায়ের প্রচলন আছে– শ্রীকুল ও কালীকুল। শ্রীকুল অবলম্বীরা কিছুটা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী।… শিবাদ্বৈতবাদের…প্রণেতা শ্রীকণ্ঠের ব্রহ্মসূত্রভাষ্য এবং অপ্পয় দীক্ষিতকৃত শিবার্কমণিদীপিকা তাঁরা মেনে থাকেন। তাঁরা শিবের সৎ ও চিৎপ্রকাশত্ব স্বীকার করেন এবং শক্তিকে বিমর্শিনী অর্থাৎ শিবের স্বতঃসিদ্ধা স্পন্দস্বরূপা বলে মনে করেন। কালীকুল অবলম্বীরা সাধারণতঃ অদ্বৈতবাদী। তাঁরা বলেন সচ্চিদানন্দরূপে দেবী ব্রহ্ম-স্বরূপিণী এবং তাঁর মধ্যে মায়া বিবর্ত, পরিণামী নয়। তাঁদের মতে শিবশক্তিতত্ত্ব গুণাতীত, নির্দ্বন্দ্ব ও একমাত্র উপলব্ধিগম্য।’- (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস)

     এ প্রেক্ষিতে শক্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে শ্রীজিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন– ‘এই তত্ত্বের আদিমতম সরল রূপ… আমরা ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলস্থ দেবী-সূক্তে পাই…। পৌরাণিক যুগে ইহার সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাখ্যান আমরা মার্কণ্ডেয় পুরাণস্থ দেবীমাহাত্ম্য (শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দুর্গা সপ্তশতী) ও ইহার রহস্যময়, যথা প্রাধানিক রহস্য, বৈকৃতিক রহস্য এবং মূর্তি রহস্যে প্রাপ্ত হই। শ্রীশ্রীচণ্ডীর বিভিন্ন টীকাতে, বিশেষ করিয়া খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকে প্রসিদ্ধ তান্ত্রিকাচার্য ভাস্কর রায় মখী কর্তৃক রচিত ইহার গুপ্তবতী নামক সংক্ষিপ্ত অথচ তত্ত্ববহুল টীকাতে শাক্ত দর্শনের সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা আছে। মার্কণ্ডেয়পুরাণের পূর্ববর্তী কালের কালিকাপুরাণাদি পুরাণে ও কোনও কোনও তন্ত্রগ্রন্থে এবং সৌন্দর্যলহরী প্রমুখ শাক্ত গ্রন্থে আমরা শক্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে অনেক তথ্য অবগত হই। দেবীমাহাত্ম্যে উদ্ধৃত ব্রহ্মাস্তুতি, শক্রাদিস্তুতি, বিষ্ণুমায়াস্তুতি এবং নারায়ণীস্তুতি… এই স্তুতিগুলি একটু মনোযোগসহকারে আলোচনা করিলে শক্তিতত্ত্বের কয়েকটি মূলসূত্রের বিষয় আমরা জানিতে পারি। দেবী যোগনিদ্রারূপিণী মহামায়া, মাত্রাত্রয় রূপে স্থিত ওঁকার, তিনি সর্বজগতে সৃজন, পালন ও সংহার-কর্ত্রী, ত্রিগুণের (সত্ত্ব, রজঃ ও তম) তারতম্যবিধায়িনী আদি প্রকৃতি, তিনি লক্ষ্মী, হ্রী, ঈশ্বরী ও নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি, তিনি বিশ্বরূপিণী– এবং সকল চেতন ও অচেতন বস্তুর অন্তর্নিহিত শক্তি। ব্রহ্মা কর্তৃক দেবীর স্তুতিতে দেবী-চরিত্রের এই এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হইয়াছে। শক্রাদি দেবতাগণের স্তুতিতেও অনুরূপ এবং আরও অনেক বৈচিত্র্যময় দেবী-প্রকৃতির পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। তিনি মুক্তির কারণ পরাবিদ্যা, যোগশাস্ত্রে উক্ত দুরনুষ্ঠেয় যমনিয়মাদি মহাব্রত তাঁহার সাধন; দেবী শব্দস্বরূপা, বেদত্রয়রূপা, বিশ্বপালনার্থ নানাবিধ বৃত্তিস্বরূপা, সমস্ত জগতের দুঃহহারিণী, এবং দুর্বৃত্তগণের দুষ্টপ্রবৃত্তিদমন তাঁহার স্বভাব। বিষ্ণুমায়াস্তুতিতে জগতের আশ্রয়কারিণী দেবী বিষ্ণুমায়া সর্বভূতে চেতনা, বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি রূপে অধিষ্ঠিত আছেন, তিনি চিৎশক্তি রূপে সমগ্র জগৎ ব্যাপিয়া অবস্থিত আছেন (চিতিরূপেণ যা কৃৎস্নমেতদ্-ব্যাপ্য স্থিতা জগৎ)। নারায়ণস্তুতিতে সর্বাত্মিকা ও বিশ্বজগতের আধারভূতা দেবী অনন্তবীর্যা বৈষ্ণবীশক্তি, বিশ্বের আদিকারণ মহামায়া প্রভৃতি নানাবিধ আখ্যায় অভিহিত হইয়াছেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীর প্রাধানিক রহস্যে বর্ণিত আছে যে দেবীর আর এক নাম বা প্রকাশ মহালক্ষ্মী, ইঁহাতে সত্ত্ব রজঃ ও তম গুণত্রয় প্রকটিত। প্রলয়কালে মহালক্ষ্মীর যে তমোগুণান্বিত রূপ প্রকট হয় উহার নাম মহাকালী; দেবীর এই তমোগুণাশ্রিত প্রকাশ মহামায়া, মহামারী, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা বা যোগনিদ্রা, কালরাত্রি প্রভৃতি নামেও পরিচিত। শ্বেতবর্ণা সত্ত্বগুণান্বিতা মহাসরস্বতী মহালক্ষ্মীর আর এক প্রকাশ; মহাসরস্বতীর বিভিন্ন নাম, যথা– মহাবিদ্যা, মহাবাণী, ভারতী, বাক, আর্যা, ব্রাহ্মী, বেদগর্ভা ইত্যাদি। দেবীর এই তিন প্রকাশ হইতে ব্রহ্মা ও শ্রী, রুদ্র ও ত্রয়ী (বেদবিদ্যা) এবং বিষ্ণু ও গৌরী উদ্ভূত হইয়াছিলেন। বৈকৃতিক ও মূর্তি রহস্যেও দেবীর অপরাপর প্রকাশ বর্ণিত আছে, এবং এই সব বিবরণে দেবীতত্ত্বের গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যান দেওয়া আছে।’- (পঞ্চোপাসনা)

     আগেই বলা হয়েছে যে, শক্তিতত্ত্বে সাংখ্যোক্ত পুরুষ-প্রকৃতিবাদ গৃহীত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে। এখানে শিবই সাংখ্যের নিষ্ক্রিয় পুরুষ, এবং অশেষ ও অদ্ভূত ক্রিয়াত্মিকা দেবীই প্রকৃতি হিসেবে আখ্যায়িত। তিনি অণুতে ও মহতে যুগপৎ বিরাজমানা, এবং মানবদেহে কুণ্ডলিনী শক্তি রূপে মূলাধার চক্রে সুপ্ত থাকেন। এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে যোগাদি ও যমনিয়মাদি অভ্যাসের দ্বারা জাগরিত করে মূলাধার থেকে স্বাধিষ্ঠানে, পরে পর্যায়ক্রমে মণিপুর, অনাহুত, বিশুদ্ধি ও আজ্ঞাচক্র থেকে সহস্রারে উন্নীত করাই তান্ত্রিক সাধকের প্রধান সাধনা। এই ছয়টি চক্র তাঁর শরীরের বিভিন্ন অবয়বে যথাক্রমে গুহ্যে, লিঙ্গমূলে, নাভিতে, হৃদয়ে, কণ্ঠে ও মস্তিষ্কে বা ললাটে অবস্থিত। কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ এবং নিম্নস্থ চক্র থেকে উর্ধ্বস্থ চক্রে উন্নয়ন শাক্ত সাধকের প্রারম্ভিক প্রচেষ্টায় স্থায়ী হয় না; প্রথম প্রথম এই শক্তি জাগরিত হলেও পুনরায় নিম্নগামী হয়ে মূলাধারে এসে সুপ্ত হন। বারবার তন্ত্রশাস্ত্রবিহিত যোগাদি প্রক্রিয়ার দ্বারা যখন সাধক কুণ্ডলিনী শক্তিকে সম্যক জাগরিত করে নিম্নতর চক্রগুলির মধ্যে দিয়া উন্নীত করে স্থায়ীভাবে তাঁকে সহস্রারে স্থাপন করতে পারেন, তখনই তাঁর ষট্চক্রভেদ হয়, এবং তিনি সাক্ষাৎ আনন্দমীয় দেবীর দর্শন লাভ করেন। এটাই তাঁর সিদ্ধি, দিব্যজ্ঞান ও মোক্ষলাভ। জীবাত্মা ও পরমাত্মায় অভেদজ্ঞানই বিদ্যজ্ঞান, এবং সেদিক থেকে তান্ত্রিক সিদ্ধি অদ্বৈতবাদের সমর্থক।
শক্তিতত্ত্বের আর এক ভেদ শাম্ভবদর্শন নামক শাক্ত-দর্শন সম্বন্ধীয় গ্রন্থে বর্ণিত আছে। তার উপর ভিত্তি করে শক্তিতত্ত্বের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে গিয়ে শ্রীজিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন–
‘শিব জ্যোতি বা প্রকাশ রূপে বিমর্শ বা স্ফূর্তিরূপা শক্তির মধ্যে অনুপ্রবেশকালে বিন্দুরূপ ধারণ করেন। শিব-শক্তির সম্মেলনে নাদ বা শব্দের উৎপত্তি হয়; ইহা স্ত্রীলিঙ্গাত্মক। পুনরায় পুংবীজ শুক্ররূপী বিন্দু ও স্ত্রীবীজ রজরূপ নাদের পরস্পর মিলন-হেতু প্রথমে কাম ও পরে কলার উদ্ভব হয়; ইহাদের পারস্পরিক মিলন ফলের নাম কামকলা। বিন্দুই জগৎপ্রপঞ্চের উপাদানীভূত কারণ; নাদ বা শব্দ হইতে পদার্থাদির নামকরণ হয়। পরে কামকলা হইতে সমগ্র বিশ্বপ্রপঞ্জ, বাক্য ও অর্থাদির বিকাশ হয়। এই কামকলা প্রধানা শক্তি,; সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি ও হার্ধকলা (ইহা নাদের উৎপত্তির সমকালে নাদবিন্দুর মিলনের ফলে সঞ্জাত আর এক পদার্থ) ইঁহার শরীরের বিভিন্ন অবয়ব স্বরূপ। ইনিই সৃজনকর্ত্রী এবং পরা, ললিতা, ভট্টারিকা ও ত্রিপুরসুন্দরী নামে আখ্যাত। শিব বর্ণমালার আদি বর্ণ ‘অ’, এবং শক্তি ইহার শেষ বর্ণ ‘হ’; এই দুইবর্ণের বা শিব-শক্তির সম্মিলিত রূপ ‘অহম্’ অর্থাৎ অহংজ্ঞান বা ব্যক্তিত্ববোধ কামকলা বা ত্রিপুরসুন্দরীর আর এক রূপ। বর্ণমালার আদি ও অন্ত্যবর্ণ যেমন অন্যান্য বর্ণ এবং সমগ্র বাক্যের ধারক, সেরূপ ইহাদের যুক্তরূপ ত্রিপুরসুন্দরী সমগ্র সৃষ্ট পদার্থের এবং বাক্য ও অর্থের ধারিকা ও বাহিকা। এই হেতু তঁহার নাম পরা এবং তৎসঞ্জাত সৃষ্টি পরিণাম; ইহাই পরিণামবাদ, বেদান্তে কথিত বিবর্তবাদ হইতে ইহা পৃথক। বিবর্তবাদের মূলে শঙ্কর-সমর্থিত মায়াবাদ বর্তমান। শক্তিতত্ত্বের শাম্ভবদর্শনোক্ত সংক্ষিপ্ত পরিচয় হইতে ইহার দুরূহত্ব প্রতীয়মান হয়। ইহার আধ্যাত্মিকতা ও প্রকৃত অর্থ সদ্গুরুর উপদেশ ও সাহায্য ব্যতিরেকে বোধগম্য হওয়া সম্ভব নহে।’- (পঞ্চোপাসনা)

     অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথের বর্ণনায়,– ‘সাধারণভাবে যাকে আমরা শাক্ত দৃষ্টিভঙ্গী বলে থাকি, বৈদান্তিক দার্শনিকতা দ্বারা যা পল্লবিত, তার মূল কথা হচ্ছে চরম সত্তা, যা দেশ, কাল ও কারণাতীত বিশুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপ, প্রকাশরূপে বর্তমান। বিমর্শশক্তি এই প্রকাশেরই ক্রিয়া-সম্পর্কীয় স্বাতস্ত্র্য, যদিও প্রকৃতপক্ষে এই শক্তি তাঁর স্বরূপ অর্থাৎ চরম সত্তার সঙ্গে অভিন্ন। তাঁরই মধ্যে নিহিত, এবং তাঁরই অবিচ্ছেদ্য গুণরূপে প্রকাশিত। শক্তির দুটি অবস্থা আছে– নিষ্ক্রিয় এবং ক্রিয়াশীল। শক্তি যখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে তখন বলা হয় যে বিমর্শ প্রকাশে লীন হয়ে গেছে। কিন্তু শক্তি যখন জাগ্রত তখন চরম সত্তাও স্বয়ং চেতন হন। তখন তাঁর আত্মজ্ঞান অহমরূপে আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র বিশ্বজগৎ দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবির ন্যায় এই অহমে প্রতিফলিত হয়। চরমসত্তা যাঁর প্রকাশ শিব এবং বিমর্শ শক্তি, একই সঙ্গে বিশ্বময় ও বিশ্বাতীত। দুয়ে মিলে এক অখণ্ড সত্তা। অহং-এর প্রথম অক্ষর, বর্ণমালার প্রথম অক্ষর অ, প্রকাশকে সূচিত করে, দ্বিতীয় অক্ষর, বর্ণমালার শেষ অক্ষর হ, বিমর্শকে সূচিত করে, এবং এই দুই-এর ঐক্য যা অ থেকে হ পর্যন্ত বর্ণমালার সকল অক্ষরের ঐক্যকে বোঝায়, তা অনুস্বর বা বিন্দু।’
‘এই চরম সত্তার সঙ্গে শক্তি বা কলা চিরকালীন ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছেন। কলা শব্দটির অর্থ বিশ্বাতিক্রমী সর্বাতীত শক্তি। এই শক্তির প্রথম বিকার ইচ্ছা। তৈলবীজের মধ্য হতে যেমন তৈল নিষ্ক্রান্ত হয় তেমনই সৃষ্টির প্রারম্ভেই শক্তির আবির্ভাব হয়। এই শক্তির আবির্ভাব নিদ্রার অচেতনতার পর জাগ্রত ব্যক্তির পুনরাবির্ভাবের মত। সত্তা এবং শক্তি উভয়েই চিৎ বা শুদ্ধ জ্ঞান স্বরূপ, তবে শক্তি সকল বস্তুর উপর ক্রিয়া করেন বলে তাদেরই প্রকৃতি অনুসারে কখনও জ্ঞান এবং কখনও ক্রিয়ারূপে প্রতিভাত হন। দ্বৈতবাদী শাক্তদের মতে বিন্দু হচ্ছে নিত্য জড় বস্তু কিন্তু শক্তির ক্রিয়ার অধীন। অদ্বৈতবাদী শাক্তদের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য এখানে যে যদিও তাঁরা শিবকে শক্তির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বলে মনে করেন, এবং তাঁদের এক ঈশ্বরসত্তার দুদিক বলে মনে করেন, বিন্দু বা জড় বস্তুকে তাঁরা শিবশক্তি অদ্বয়ের থেকে পৃথক করে দেখেন। তাঁদের মতে বিন্দু শিব ও শক্তির মতই নিত্য, সৃষ্টি বিষয়ে শিব কর্তা, শক্তি তাঁর যন্ত্র, এবং বিন্দু জড় উপাদান। শক্তি জড়স্বভাব নয় বলে ক্রিয়ার সময় তাতে কোন পরিবর্তন হয় না, কিন্তু বিন্দুতে হয়ে থাকে।’- (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস)

     এখানে উল্লেখ্য যে, অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথের মতে, বেদান্তকে ভিত্তি করার দরুন ভারতের ধর্মীয় দর্শনগুলি একটি বিশেষ ধরনের স্ববিরোধ এড়াতে পারেনি। শঙ্করাচার্য কথিত বেদান্তের চরম অদ্বয়বাদী ব্যাখ্যা বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত কোন তরফই মানতে পারেনি, কেননা জগৎকে কোন ধর্মব্যবস্থার পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না। কাজেই তাঁদের প্রধান সমস্যা ছিল বিশুদ্ধ চিৎ-স্বরূপ ব্রহ্মের সঙ্গে– তা তিনি বৈষ্ণবের বিষ্ণুই হন, শৈবের শিবই হন বা শাক্তের শক্তি হন– জড় জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার সমস্যা। কেউ কেউ বলেন যে পরিদৃশ্যমান জগৎ নিত্যসিদ্ধ চরমতত্ত্বে অর্থাৎ ব্রহ্মে অধ্যস্ত, সুতরাং জগৎ মিথ্যা অবভাস মাত্র এবং ব্রহ্মসত্তায় তার কোন ক্রিয়া নেই, তবে মোটামুটি যাঁরা বৈষ্ণব বা শৈব বা শাক্তধর্মের দৃষ্টিভঙ্গীতে ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক নির্ধারণের প্রয়াস পান তাঁদের সমস্ত বক্তব্যের বাড়তি উপাদানগুলি বাদ দিয়ে একটি কাজচলা গোছের সারাংশ করা যায় যে জগৎ সত্য এবং তা কোন-না-কোন প্রকারে ব্রহ্মের পরিণাম অথব বিকার, বিকল্পে ব্রহ্মের বা শক্তির অথবা বিমর্শ সারূপ্যের বিকার। কিন্তু চিৎ-স্বরূপ ব্রহ্ম থেকে অচিৎ জগতের উদ্ভবের ব্যাখ্যার মধ্যে কিছুটা কষ্টকল্পনা আছে যা কোন ধর্মীয় দর্শনই এড়াতে পারেনি, শাক্তদর্শনও নয়।
বলা বাহুল্য, শাক্ত-তন্ত্র একটি সুপ্রাচীন যুগের অন্তঃস্রোত যার মধ্যে বহু ধরনের উপাদান বর্তমান। তন্ত্রের ভাববাদী রূপান্তরকরণ হাল আমলের, অর্থাৎ আদি মধ্য ও মধ্যযুগের, যখন থেকে বৈদান্তিকরা তন্ত্র ও শাক্তধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। কিন্তু তার পূর্ববর্তী পর্যায়ে তন্ত্র মূলত বস্তুবাদী ও লোকায়তিক চরিত্রের অধিকারী ছিল, যার অন্যতম উপাদান ছিল দেহাত্মবাদ। এই উপাদান ছাড়াও আদিম জাদুবিশ্বাসমূলক নানা উপাদান তন্ত্রে বর্তমান। তান্ত্রিক যৌনাচারসমূহ এই সকল আদিম উপাদানের অভিব্যক্তি। অনুরূপভাবে কায়-সাধন ও জীবন্মুক্তির ধারণারও উৎস পৃথক যেগুলির উপর কিছুটা লোকায়ত প্রভাব আছে। জাদুবিশ্বাসের পক্ষে অপরিহার্য শব্দ ও ধ্বনিগত কলাকৌশল তান্ত্রিক মন্ত্রসমূহের রহস্যময়তায় ব্যক্ত হয়েছে। শব্দ, বীজ, নাদ, বিন্দু, বর্ণ, অক্ষর এসব তান্ত্রিক পরিভাষাগুলির উৎস সম্ভবত ওই আদিম জীবনচর্যা। এতগুলি বিচ্ছিন্ন উপাদানের সমন্বয় এবং একটি বিশিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে সেগুলিকে ব্যাখ্যা করার যে কোন প্রয়াসের মধ্যেই স্ববিরোধ থাকতে বাধ্য। কাজেই কোন সমন্বয়ী ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা না করে শাক্তধর্ম ও তন্ত্রের আলোচনায় যদি গঠনকারী উপাদানগুলিকে বিশ্লিষ্ট করে দেখা যায় এবং সেগুলিকে তাদের ঐতিহাসিক উদ্ভবের পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার চেষ্টা হয়, বিবর্তিত ও পল্লবিত রূপ থেকে আলাদা করে, তা হলেই বিষয়টির উপর সুবিচার করা সম্ভব হবে বলে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের অভিমত।

(শক্তি-সাধনা পর্ব আপাতত সম্পন্ন…)

[পূর্বপোস্ট : উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস] [×]

 

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 440,797 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: