h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শক্তি-সাধনা-১১। শক্তিপূজায় পৌরাণিক দুর্গা ও শস্যদেবী শাকম্ভরী…

Posted on: 07/10/2017


12004962_598650700272988_6352938307443038956_n

শক্তি-সাধনা-১১ ।  শক্তিপূজায় পৌরাণিক দুর্গা ও শস্যদেবী শাকম্ভরী
রণদীপম বসু

পার্বতী উমা দেবীই পরবর্তীকালে দুর্গা নামে সুপ্রসিদ্ধা হয়েছেন বলে মনে করা হয়। এই দুর্গা দেবীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় তৈত্তিরীয় আরণ্যকের অন্তর্গত যাজ্ঞিকা উপনিষদে। দুর্গা বা দুর্গি নামের প্রথম উল্লেখ তৈত্তিরীয় আরণ্যকের ওই যাজ্ঞিকা উপনিষদের দুর্গা-গায়ত্রীটিতে পাওয়া যায়,–

‘কাত্যায়নায় বিদ্মহে, কন্যাকুমারীং ধীমহি, তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াৎ।’
অর্থাৎ– কাত্যায়নকে জানি, কন্যাকুমারীকে ধ্যান করি, সুতরাং দুর্গি আমাদের প্রেরণ করুন।

এখানে দুর্গির সাথে শিবের কোন সংযোগ আছে কিনা আদৌ জানা যায় না। আবার এই তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম খণ্ডের দ্বিতীয় অনুবাকে দুর্গার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা হলো–

তাং অগ্নিবর্ণাং তপসা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্মফলেষু জুষ্টাম্ ।
দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরসে নমঃ।। (তৈত্তিরীয় আরণ্যক-১০/২)
অর্থাৎ : অগ্নিবর্ণা তপপ্রদীপ্তা সূর্য (বা অগ্নির) কন্যা, যিনি কর্মফলের (পুরস্কার প্রদানের জন্য লোকদিগের দ্বারা) প্রার্থিত হন, এমন দুর্গা দেবীর আমি শরণাপন্ন হই; হে সুন্দর রূপে ত্রাণকারিণী, তোমাকে নমস্কার।

          এই শ্লোকটি নারায়ণ-উপনিষদ (নারাঃ উপঃ-২/২) এবং দেবীভাগবতেও (দেবীভাগ: ৭/৩১/৪৫) উদ্ধৃত হয়েছে। দুর্গাদেবীর সঙ্গে সূর্যাগ্নির সম্পর্ক এখানে স্পষ্ট, কিন্তু রুদ্র বা শিবের সঙ্গে কোন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়।
সাধারণত দুর্গতিনাশিনী বলেই দেবীকে আমরা ‘দুর্গা’ বলে জানি। পরবর্তীকালে যদিও দুর্গার অনেক অর্থ দেখা যায়, এবং সেসব অর্থের সাহায্যেই পুরাণাদিতে ‘দুর্গা’র ব্যাখ্যা হয়ে থাকে। শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী শব্দকল্পদ্রুমে দুর্গা শব্দের যে অর্থ ধৃত হয়েছে তা হলো–

দুর্গো দৈত্যে মহাবিঘ্নো ভববন্ধে কুকর্মণি।
শোকে দুঃখে চ নরকে যমদণ্ডে চ জন্মনি।।
এহাভয়েহতিরোগে চাপ্যাশব্দো হন্তৃবাচকঃ।
এতান্ হন্ত্যেব যা দেবী সা দুর্গা পরিকীর্তিতা।। –(শব্দকল্পদ্রুম)
অর্থাৎ : দুর্গ শব্দের বাচ্য দুর্গনামক দৈত্য, মহাবিঘ্ন, ভববন্ধ, কুকর্ম, শোক, দুঃখ, নরক, যমদণ্ড, জন্ম, মহাভয় এবং অতিরোগ; আ-শব্দ হইল হন্তৃবাচক। এইসকলকে হনন করেন যে দেবী তিনিই দুর্গা নামে পরিকীর্তিতা।

             এই শ্লোক দুটি ব্রহ্মবৈবর্ত-পুরাণেও (ব্রহ্মবৈঃ পুঃ-৫৭/৭-৮) রয়েছে। কৌতুহলের বিষয় হলো, দুর্গাকে যেসব আপদ-বিপদে জনসাধারণ সাধারণত স্মরণ করে থাকে তার মধ্যে বেছে বেছে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করে এখানে দুর্গার ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে অনুমান। এ ধরনের আরও গুটিকয় ব্যাখ্যা শব্দকল্পদ্রুমে রয়েছে বলে জানা যায়। এসব ব্যাখ্যায় হয়তো প্রচলিত বিশ্বাসের কথাই জানা যায়, কিন্তু তা থেকে ঐতিহাসিক সত্য পাওয়ার সম্ভাবনা নাই বলেই মনে হয়। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে একবার বলা হয়েছে– ‘দুর্গাসি দুর্গ-ভবসাগর-নৌ-রসঙ্গা’ (চণ্ডী-৪/১১)– অর্থাৎ– ‘অসঙ্গা তুমি দুর্গম ভবসাগরে নৌকা-স্বরূপ বলেই দুর্গা।’ আবার অন্যত্র বলা হয়েছে–

তত্রৈব চ বধিষ্যামি দুর্গমাখ্যং মহাসুরম্ ।
দুর্গাদেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি।।– (চণ্ডী-১১/৪৯-৫০)
অর্থাৎ– দুর্গম নামক মহাসুরকে বধ করিবেন বলিয়া দেবী দুর্গা দেবী নামে খ্যাত হইবেন।

            স্কন্দপুরাণে (কাশীখণ্ডে) রুরুদৈত্যের পুত্র দুর্গাসুরের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ ও দুর্গাসুরবধ-বৃত্তান্ত সবিস্তারে বর্ণিত আছে। দুর্গাসুরের নিধনের পরে দেবী দুর্গা নামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন–

অদ্য প্রভৃতি মে নাম দুর্গেতি খ্যাতিমেষ্যতি।
দুর্গদৈতস্য সমরে পাতনাদতিদুর্গমাৎ।।
যে মাং দুর্গাং শরণগা ন তেষাং দুর্গতিঃ ক্বচিৎ।।
— (স্কন্দপুরাণ-কাশী উত্তরার্ধ-৭২/৭১-৭২)
অর্থাৎ– আজ থেকে অতি দুর্গম দুর্গদৈত্যকে সমরে বধ করার জন্য আমার খ্যাতি হবে দুর্গা নামে। যে আমার বা দুর্গার শরণ গ্রহণ করবে, তার কখনও দুর্গতি হবে না।

মহাভারতেও (বিরাটপর্ব–৬/২০-২২) দেবী দুর্গা কর্তৃক দুর্গতিনাশের বিস্তৃত ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন–

দুর্গাত্তারয়সে দুর্গে তস্মাৎ দুর্গা স্মৃতাজনৈঃ।
কান্তারেষ্ববসন্নানাং মগ্নানাঞ্চ মহার্ণবে।।
দস্যুভির্বা নিরুদ্ধানাং ত্বং গতিঃ পরমা নৃণাম্ ।
জলপ্রতরণে চৈব কান্তারেষ্বটবীযু চ।।
যে স্মরন্তি মহাদেবি ন চ সীদন্তি তে নরাঃ। (মহা-বিরাটপর্ব-৬/২০-২২)
অর্থাৎ– হে দুর্গে, তুমি দুর্গতি নাশ কর বলেই লোকে তোমায় দুর্গা বলে থাকে। কান্তার মধ্যে যারা অবসন্ন হয়ে পড়ে, মহাসমুদ্রে যারা মগ্ন হয়, দস্যুর দ্বারা যারা বন্দি হয়, সেই মনুষ্যগণের তুমিই পরমা গতি। জল (নদী বা সমুদ্র) পার হওয়ার সময়ে কান্তারে এবং অরণ্যে, হে মহাদেবি! যারা তোমাকে স্মরণ করেন তাঁরা কখনও বিপন্ন হন না।

          তবে কোনও কোনও পণ্ডিতের প্রণিধানযোগ্য মতটি হলো, দুর্গ-রক্ষাকারিণী দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবীই হলেন দুর্গা। দেবী-পুরাণে, দেবী-ভাগবতে এবং খিল হরিবংশে এই মতের সাক্ষ্য পাওয়া যায় বলে শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্ত উল্লেখ করেছেন। দেবীপুরাণে দেবীকে দুর্গে বিরাজমানা দুর্গেশ্বরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে–

রমসে দেবি দুর্গেষু দুর্গেশ্বরি নমোহস্তুতে।– (দেবীপুরাণ-৮৩/৬২)
দুর্গেষু কারয়েৎ দুর্গাং মহিষাসুরঘাতিনীম্ ।– (দেবীপুরাণ-৭২/১২৪)

দেবীভাগবতে দেবী নগরপালিকা হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন–

নগরেহত্র ত্বয়া মাতঃ স্থাতব্যং মম সর্বদা।
দুর্গা দেবীতি নাম্না বৈ ত্বং শক্তিরিহ সংস্থিতা।।– (দেবীভাগবত-৩/২৪/৫-৬)

           আর স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ডে বলা হয়েছে– মহাদেব কাশী রক্ষার নিমিত্ত নন্দীকে প্রতি দুর্গে দুর্গাপ্রতিমা সন্নিবেশ করতে আদেশ দিয়েছিলেন–

প্রতিদুর্গং দুর্গারূপাঃ পরিতঃ পরিবাসয়।– (স্কন্দঃ-কাশীঃ-উত্তরার্ধ-৬৯/১৭৮)

আদেশ পেয়ে নন্দী কাশীর সর্বত্র প্রতি দুর্গে দুর্গামূর্তি স্থাপন করেছিলেন–

আহূয় সর্বতো দুর্গাঃ প্রতিদুর্গং ন্যবেশয়ৎ।।– (স্কন্দঃ-কাশীঃ-উত্তরার্ধ-৬৯/১৮০)

           অন্যদিকে কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে দুর্গ মধ্যে যেসব দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁদের অন্যতমা হলো অপরাজিতা। পণ্ডিতেরা মনে করেন অপরাজিতাই দুর্গা। [পুরমধ্যে বহিশ্চ দেবালয়-নির্মাণবিধিঃ]–

অপরাজিতাহপ্রতিহত-জয়ন্ত-বৈজয়ন্ত-কোষ্ঠকান্ শিব-বৈশ্রবণাশ্বিশ্রী-মদিরা-গৃহাণি চ পুরমধ্যে কারয়েৎ। কোষ্ঠকালয়েষু যথোদ্দেশং বাস্তু-দেবতাঃ স্থাপয়েৎ। ব্রাহ্মৈন্দ্রযাম্য-সৈনাপত্যানি দ্বারাণি। বহিঃ পরিখায়া ধনুঃশতাপকৃষ্টাশ্চৈত্য-পুণ্যস্থান-বন-সেতুবন্ধাঃ কার্যাঃ, যথাদিশং চ দিগ্দেবতাঃ। –(অর্থশাস্ত্র-২/৪/৫)
অর্থাৎ–
দুর্গ-নগরের মধ্যবর্তী স্থানে অপরাজিতা (দুর্গা), অপ্রতিহত (বিষ্ণু), জয়ন্ত (ইন্দ্রপুত্র বা সুব্রহ্মণ্য) ও বৈজয়ন্তের (ইন্দ্রের) আলয় বা মন্দির এবং শিব, বৈশ্রবণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, শ্রী (লক্ষ্মী) ও মদিরা দেবীর মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। (নগরের চারদিকে বিভিন্ন দেবতার নামে দ্বার নির্মাণ করাতে হবে।–) যেমন, উত্তর দিকে ব্রহ্মদেবতাত্মক ব্রাহ্ম-দ্বার, পূর্বদিকে ইন্দ্রসম্বন্ধীয় ইন্দ্র-দ্বার, দক্ষিণদিকে যম-সম্পর্কীয় যাম্য-দ্বার এবং পশ্চিমদিকে সেনাপতি- (কার্তিকেয়) সম্পর্কীয় সৈনাপত্য-দ্বার। নগরের বাইরে পরিখা থেকে ধনুঃশত বা দণ্ডশত (চারশত হাত) ব্যবধানে চৈত্য, পুণ্যস্থান, বন ও সেতুবন্ধ স্থাপন করাতে হবে; এবং নিজ নিজ দিক্ অনুসারে দিগ্দেবতাদের আলয় স্থাপন করাতে হবে।

             যদি অপরাজিতাই দুর্গা হয় তাহলে দুর্গরক্ষিণী দেবী দুর্গার নাম না করে কৌটিল্য অপরাজিতার নাম করলেন কেন? নিশ্চয়ই দুর্গা নাম তখনও প্রসিদ্ধ হয়নি। তবে দুর্গাপূজার অন্তে অপরাজিতা পূজার রীতি একালেও বর্তমান আছে। যেমন, দুর্গাপূজাতে দশমীর দিন পূজা অন্তে ঘট বিসর্জনের পর ঈশানকোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে তার উপর অপরাজিতা লতা রেখে অপরাজিতা পূজার রীতি প্রচলিত। কালিকাপুরাণে বর্ণিত দুর্গাপূজা পদ্ধতিতে এই অপরাজিতা পূজার ধ্যানমন্ত্র হলো–

নীলোৎপলদলশ্যামাং ভুজগাভরণোজ্জলাং।
বালেন্দুমৌলিনীং দেবীং নয়নত্রিতয়ান্বিতাম্ ।
শঙ্খচক্রধরাং দেবীং বরদাং ভয়নাশিনীম্ ।
পীনোত্তুঙ্গস্তনাং শ্যামাং বরপদ্মসুমালিনীম্ ।।
অর্থাৎ– নীলপদ্মের পাপড়ির তুল্য শ্যামবর্ণা, সর্পের অলংকারে উজ্জ্বলা, মস্তকে কলাচন্দ্রশোভিতা, ত্রিনয়নসমন্বিতা, শঙ্খচক্রধারিণী বরদা ও অভয়দাত্রী, পীনোন্নতস্তনী, শ্যামা শ্রেষ্ঠপদ্মমালাভূষিতা।

            চতুর্ভুজা এই অপরাজিতা বৈষ্ণবী শক্তি বিষ্ণুমায়া লক্ষ্মী ও শিবশক্তি শিবানীর মিশ্রণে কল্পিতা। দুর্গার এক নাম অপরাজিতা বলেই সম্ভবত নামসাদৃশ্যের কারণে অশোক প্রভৃতি নবপত্রিকার মতো অপরাজিতা লতা পূজার রীতি প্রচলিত হয়েছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে দুর্গে নিবেশিতা দেবীর নাম অপরাজিতা বলেই, শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের জিজ্ঞাসা– ‘দুর্গা কি প্রাথমিক রূপে নগরপালিকা দুর্গরক্ষিণী দেবী ছিলেন? দুর্গাধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপেই কি তিনি সর্বশক্তিময়ী দেবীরূপে পূজিতা হইলেন? শক্তিময়ীর মহাদেবীত্ব লাভ অতি সহজেই সম্ভব হইয়াছিল।’
মহাদেবীরূপে পূজালাভের বেলায় পার্বতী উমা খানিকটা পিছিয়ে পড়েছেন, সেক্ষেত্রে মায়ের দুর্গারূপই প্রাধান্য লাভ করেছে। মার্কণ্ডেয়-চণ্ডীতেই আমরা দেখেছি যে, যিনি দেবতেজঃসম্ভবা চণ্ডী, তিনিই কাত্যায়নী, তিনিই কালী, দুর্গা, পার্বতী প্রভৃতি বিচিত্র নামে অভিহিতা। দেবী চামুণ্ডারূপে চণ্ডমুণ্ড বধ করেছেন, দুর্গারূপে বধ করেছেন দুর্গাসুর, কালীরূপে পান করেছেন রক্তবীজের রক্ত। একই মহাশক্তির যেমন বিচিত্র নাম, তেমনি বিচিত্র তাঁর রূপ। মার্কণ্ডেয় পুরাণে চণ্ডী, কালী, চামুণ্ডা, পার্বতী, দুর্গা, কৌশিকী, বিন্ধ্যবাসিনী, রক্তদন্তিকা, শতাক্ষী, শাকম্ভরী, ভীমা, ভ্রামরী প্রভৃতি বিচিত্র নাম-রূপের সমন্বয় ঘটেছে। এই দেবী মহিষাসুর বধ করার জন্যই মহিষাসুরমর্দিনী বা মহিষমর্দিনী নামে খ্যাত হয়েছিলেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণের এই বিবরণ অনুসারেই মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার মূর্তি নির্মিত ও পূজিত হয়। কিন্তু মার্কণ্ডেয় পুরাণের কোথাও উমার উল্লেখ নেই। মার্কণ্ডেয়পুরাণেই শরৎকালে চণ্ডীর পূজার উল্লেখ রয়েছে– ‘শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়তে যা চ বার্ষিকী।’

              ভারতবর্ষের একটি ধর্মসম্প্রদায়-রূপে দেবীপূজা বা মাতৃপূজার প্রচলন কখন থেকে হয়েছে তা বলা শক্ত। তবে মহাদেবীরূপে মায়ের পূজালাভের ক্ষেত্রে দুর্গারূপ প্রাধান্য পাবার কারণ হয়তো প্রবাদ-কিংবদন্তী-রূপে শ্রীরামচন্দ্রের রাবণবধের জন্য অকালে শরৎকালে দেবীর বোধন করে পূজার প্রচার। বাল্মীকি-রামায়ণে যার আভাস-মাত্রও নেই। রামায়ণে যদিও উমার উল্লেখ আছে এবং রামায়ণে বিষ্ণুর সঙ্গে শ্রী বা লক্ষ্মীর উল্লেখও কয়েক জায়গায় পাওয়া যায়। এর বাইরে কোনও দেবী বা দেবীপূজার উল্লেখ বাল্মীকির রামায়ণে নেই। অন্যদিকে প্রচলিত মহাভারতে এ জাতীয় দেবীদের উল্লেখ ও স্তবস্তুতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ হলো দু’টি দুর্গাস্তব (যা ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে)। দুর্গাস্তব দু’টির একটি হলো বিরাটপর্বে যুধিষ্ঠির-কর্তৃক দুর্গাস্তব, অন্যটি হলো ভীষ্মপর্বে যুদ্ধের প্রারম্ভে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন যে দুর্গাস্তব করেছিলেন তা।
যুধিষ্ঠিরের এই স্তবের মধ্যে দেখা যায়– দুর্গা যশোদাগর্ভসম্ভূতা এবং নন্দগোপকুলে জাতা, কংস-কর্তৃক শিলাতলে নিক্ষিপ্তা হয়ে তিনি আকাশদেশে অন্তর্হিতা হয়েছিলেন। তিনি দিব্যমাল্যবিভূষিতা, দিব্যাম্বরধরা ও খড়্গখেটকধারিণী। তিনি বালার্কবর্ণা, পূর্ণচন্দ্রনিভাননা, চতুর্ভুজা ও চতুর্বক্ত্রা। দেবী আবার কখানও কৃষ্ণবর্ণা এবং অষ্টভুজা-রূপেও পূজিতা। তিনি দিব্যকুণ্ডলধারিণী, কেশবন্ধে দিব্যমুকুটধারিণী। তিনি মহিষমর্দিনী ও বিন্ধ্যবাসিনী। আর অর্জুন-কর্তৃক দেবীর স্তবে দেখা যায়– দেবী ভগবতী যোগিগণের পরমসিদ্ধিদাত্রী, ব্রহ্মস্বরূপিণী, সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-কারিণী, জরামৃত্যুহীনা, ভদ্রকালী, বিজয়া, কল্যাণপ্রসূ, মুক্তিস্বরূপা, সাবিত্রী, কালরূপিণী, মোহিনী, কান্তিমতী, পরমা সম্পৎ, শ্রী, হ্রী ও জননী।
এক্ষেত্রে শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের অভিমত হলো,– ‘দেবীপূজার ইতিহাসে মহাভারতের এই দুইটি দুর্গাস্তবের উপর এত দিন আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করিতাম। কিন্তু মহাভারত-সম্বন্ধে নূতন যে-সকল অধ্যয়ন ও গবেষণা হইয়াছে তাহাতে দেখা যায় যে এই স্তবগুলি খাঁটি নয়– প্রক্ষিপ্ত। পুণা হইতে মহাভারতের যে প্রামাণিক সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে তাহা হইতে এই-সকল স্তবস্তুতির অংশ পরবর্তী কালের যোজনা বলিয়া বাদ দেওয়া হইয়াছে। মহাভারতে পার্বতী উমাকেও স্বতন্ত্রা স্বপ্রধানা দেবী রূপে পাই না, শিবপত্নী-রূপেই সেখানে তাঁহার পরিচয়। মহাভারতের পরিশিষ্টরূপে পরিগণিত ‘খিল হরিবংশে’ যে দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায় তিনি তখনও ব্রাহ্মণ্যধর্মের মধ্যে দৃঢ়প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না; তখন পর্যন্ত মদ্যমাংসবলিপ্রিয়া দেবী শবর, পুলিন্দ এবং বর্বরগণ-কর্তৃকই পূজিতা। পার্বতী উমার সহিত অভিন্নতা লাভ করিয়াই ব্রাহ্মণ্যধর্মে তাঁহার দৃঢ়প্রতিষ্ঠা লাভ বলিয়া মনে হয়। পৌরাণিক যুগেই এই মিলন সঙ্ঘটিত হইয়াছে।’
‘একটি তথ্য এইখানেই বিশেষভাবে লক্ষ্য করিতে হইবে। দুর্গা দুর্গতি-নাশিনীই হোন, দুর্গাসুর-নাশিনীই হোন বা দুর্গরক্ষিণীই হোন, তিনি শস্ত্র-ধারিণী এবং অরিমর্দিনী; কিন্তু পার্বতী উমার কোনও প্রাচীন উল্লেখের মধ্যেই আমরা এই শস্ত্রধারিণী অরিমর্দিনী রূপের উল্লেখ পাই না। উমাকে প্রথমে পাইলাম কন্যারূপে– বহুশোভমানা হৈমবতী-রূপে; তাহার পরে পাইলাম শিবপ্রিয়া-রূপে– তাহার পরে পাই গণেশ-জননী ও কুমার-জননী-রূপে। তাহার পরে যখন লক্ষ্মী-সরস্বতীও তাঁহাদের স্বাতস্ত্র্য বর্জন করিয়া মায়ের কন্যাত্ব স্বীকার করিলেন তখন মায়ের সোনার সংসারকে পূর্ণরূপে দেখিতে পাইলাম। হাজার হাজার বৎসর ধরিয়া এই পার্বতী উমার প্রেমময়ী পত্নীত্ব এবং অনন্ত-স্নেহময়ী মাতৃত্বের রূপই প্রাধান্য লাভ করিয়া আসিয়াছে; শিবের সহিত প্রণয়-কলহ বা গৃহ-কলহ ব্যতীত মায়ের ভ্রূকুটিকুটিল মুখ কখনও বড় একটা দেখা যায় নাই– অন্ত্র-শস্ত্র ধারণ ত দূরের কথা। কিন্তু মহাদেবী যখনই ভয়ঙ্করী– রণোন্মাদিনী– অসুরনাশিনী– তখনই তিনি দুর্গা, চণ্ডী, কালী। মায়ের এই অসুরনাশিনী মূর্তির সহিত সর্বাপেক্ষা অধিক যুক্ত হইল মায়ের চণ্ডী-রূপ। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, দেবীর এই অসুরনাশিনী চণ্ডী বা চণ্ডিকার ধারা মায়ের পার্বতী উমার ধারা হইতে একটি পৃথক ধারা। পরবর্তী কালে দুই ধারা নির্বিশেষে মিশিয়া এক হইয়া গিয়াছে।’– (ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, পৃষ্ঠা-৪৯-৫০)
কিন্তু আমরা পরে দেখবো, শক্তিবাদের অনার্য বিশ্বাসাশ্রিত যে অন্তর্গত ধারাটি শাক্তচেতনার প্রাচীনতম উপাদানগুলোকে ধারণ করে শস্যদেবী-রূপে একাত্ম হয়ে আছে তা একাধারে কৌতুহলোদ্দীপক এবং শক্তি-সাধনার মৌলিক অভিব্যক্তির দ্যোতকও। যেখানে প্রকৃতি মাতৃরূপে কল্পিত।

                দুর্গাপূজা :  দুর্গাপূজা মুখ্যত বাঙলাদেশের পূজা। এই পূজা শারদীয়া পূজা হিসেবে খ্যাত। বাঙালি হিন্দুর বৃহত্তম উৎসব শরৎকালীন দুর্গোৎসব। অধ্যাপক হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের ভাষ্যে দুর্গাপূজার গোটা প্রক্রিয়াটা নিম্নরূপ,–
‘আশ্বিনের শুক্লা ষষ্ঠী থেকে শুক্লানবমী পর্যন্ত দেবী দশভূজা মহিষমর্দিনীর পূজা হয়। দেবী প্রতিমার সঙ্গে সংযুক্ত হয় লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিকেয় গণেশের মূর্তি। দশমী তিথিতে হয় দেবী প্রতিমার বিসর্জ্জন। এই দশমী তিথি বিজয়াদশমী নামে খ্যাত। এই দিনটি দশেরা উৎসব নামে সারা ভারতে পালিত হয়। এই দিনে উত্তর ভারতের প্রায় সর্বত্র রাবণের পুত্তলিকা দাহ করা হয় ও রামলীলা গান করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই দিনে রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ নিহত হয়েছিল। ষষ্ঠীতে দেবীর ষষ্ঠ্যাদিকল্প অর্থাৎ আবাহন, বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস প্রভৃতির অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ষষ্ঠীতে সন্ধ্যাকালে দেবীর বোধন হয়। শাস্ত্র মতে দেবীর বোধন হয় বিল্ববৃক্ষে বা বিল্বশাখায়। কোন কোন স্থলে কৃষ্ণানবমীতে কোথাও কোথাও শুক্ল প্রতিপদে দেবীর বোধনের রীতি প্রচলিত। কৃষ্ণা নবমী বা শুক্ল প্রতিপদ থেকে প্রত্যহই ঘটে দেবীর পূজা হয়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিমায় দেবীর অর্চনা করা হয়ে থাকে। সপ্তমীতে অন্যতম অনুষ্ঠান নবপত্রিকা প্রবেশ– কদলী বৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়া বেল একত্র বেঁধে শাড়ী পরিয়ে একটি বধূর আকৃতি বিশিষ্ট করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়, এই উদ্ভিদ সমন্বয়কে নবপত্রিকা– প্রচলিত ভাষায় কলাবৌ– বলা হয়ে থাকে। দশমীতে দেবীর বিসর্জনের দিনে অপরাজিতা পূজা, সিদ্ধিপান ও পারস্পরিক প্রীতি সম্ভাষণ, আলিঙ্গন, প্রণাম প্রভৃতি দ্বারা মনোমালিন্য দূর করে সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠার রীতি। নূতন বস্ত্র পরিধান পূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ষষ্ঠী তিথিতেই সাধারণতঃ অধিকাংশ স্থলে দেবীর বোধন হয়, এর দ্বারা ষষ্ঠী দেবী ও দুর্গার একাত্মতা সুপ্রতিষ্ঠিত। এই দিনকে দুর্গা-ষষ্ঠীও বলা হয়। অষ্টমীতে বিশেষ অনুষ্ঠান– অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিতে আটচল্লিশ মিনিটে দেবীর বিশেষ পূজা সন্ধিপূজা। অর্ধরাত্রি পূজাও কোন কোন স্থলে প্রচলিত। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিন দিন কোন কুমারী বালিকাকে অভ্যর্থনা করে এনে পূজা করা হয়। অনেক জায়গাতেই দশমী তিথিতে অশ্লীল বাদ্যগীত শবরোৎসব নামে অনুষ্ঠিত হয়। নবমীতে হোমযাগের দ্বারা পূজার পূর্ণাহুতি দেওয়ার রীতি। তিন দিনই এবং সন্ধি ও অর্ধরাত্রি পূজায় মহিষ, মেষ ও ছাগ বলি দেওয়ার রীতি। আজকাল অনেক জায়গাতেই বৈষ্ণবীয় প্রভাবে বলি রহিত হয়েছে। এই ভাবে বৈদিক, পৌরাণিক, তান্ত্রিক, লৌকিক বিচিত্র রীতি-পদ্ধতি দুর্গাপূজায় সম্মিলিত হয়ে দুর্গা পূজাকে বাঙ্গালীর সার্বজনীন উৎসবে পরিণত করেছে।’– (হিন্দুদের দেবদেবী : উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ- তৃতীয় পর্ব, পৃষ্ঠা-২২২-২৩)

               এখানে উল্লেখ্য, শরৎকালে দুর্গাদেবীর বোধন ও পূজাকে অকাল বোধন বলা হয়ে থাকে। প্রসিদ্ধি আছে যে, রামচন্দ্র রাবণ বধের নিমিত্ত দেবীর কৃপালাভের উদ্দেশ্যে অকালে (শরৎকালে) দেবীর পূজা করেছিলেন। দেবীর বর লাভ করে রামচন্দ্র দশমী তিথিতে রাবণ বধ করে বিজয়ী হয়েছিলেন। তাই দশমী তিথি বিজয়া দশমী। দশেরা উৎসব রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ-বিজয়ের উৎসব। কৃত্তিবাসী রামায়ণে কৃত্তিবাস লিখেছেন,– ‘অকালে শরতে কৈল চণ্ডীর বোধন।’ আদিতে দুর্গাপূজা বসন্তকালেই অনুষ্ঠিত হতো, যে বাসন্তীপূজা আজও বর্তমান। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বক্তব্য হলো,–
‘শারদীয়া পূজার উল্লেখ কালিকাপুরাণে (৬৫, ১) পাওয়া যায়। রামচন্দ্র কর্তৃক দেবীর অকালবোধনের কাহিনী বাল্মীকি রামায়ণে নেই, কৃত্তিবাসের বাংলা রামায়ণেই তা সবিস্তারে উল্লিখিত আছে। কালিকাপুরাণ কৃত্তিবাসের পূর্ববর্তী, কাজেই কৃত্তিবাসের পূর্বেই শারদীয়া দুর্গোৎসবের প্রচলন ছিল। ষোড়শ শতকের স্মার্ত রঘুনন্দন তাঁর শ্রীদুর্গোৎসবতত্ত্বে দুর্গাপূজার নিয়ম কানুন বর্ণনা প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী লেখকদের মত উল্লেখ করেছেন। বাচস্পতি মিশ্র, শ্রীনাথ, শূলপাণি, জীমূতবাহন, রামকৃষ্ণ প্রভৃতি নিবন্ধকারদের রচনার সাক্ষ্য থেকে মনে হয় যে খ্রীষ্টীয় চতুর্দশ শতকে শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং তার মৃন্ময় মূর্তির ব্যবহার প্রচলিত ছিল। হয়ত তার আগেও ছিল কিন্তু সে বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।’- (ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস)
মহাকবি কৃত্তিবাস তাঁর বাংলা রামায়ণে রামচন্দ্র কর্তৃক অষ্টোত্তরশত বা একশত আটটি নীলপদ্মদ্বারা দুর্গা পূজার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। কালিকাপুরাণে এবং বৃহদ্ধর্মপুরাণে এরকম অকাল বোধনের উল্লেখ আছে। যেমন, কালিকাপুরাণ (কাঃ পুঃ-৬০/২৬-২৭, ৩২)-এ বলা হয়েছে–

রামস্যানুগ্রহার্থায় রাবণস্য বধায় চ।
রাত্রাবেব মহাদেবী ব্রহ্মণা বোধিতা পুরা।। ২৬
ততস্তু ত্যক্তনিদ্রা সা নন্দায়ামাশ্বিনে সিতে।
জগাম নগরীং লঙ্কাং যত্রাসীৎ রাঘবঃ পুরা।। ২৭
নিহতে রাবণে বীরে নবম্যাং সকলৈঃ সুরৈঃ।
বিশেষপূজাং দুর্গায়াশ্চক্রে লোকপিতামহঃ।। ৩২
অর্থাৎ– পুরাকালে রামের অনুগ্রহের এবং রাবণের বধের নিমিত্ত মহাদেবী রাত্রিতে ব্রহ্মার দ্বারা বোধিতা হয়েছিলেন। ২৬।। তারপর নিদ্রা ত্যাগ করে তিনি আশ্বিনের শুক্লপক্ষে যেখানে পূর্বে রাম ছিলেন, সেই লঙ্কা নগরীতে গমন করেছিলেন। ২৭।। বীর রাবণ নিহত হলে সকল দেবতার সঙ্গে পিতামহ ব্রহ্মা দুর্গার বিশেষ পূজা করেছিলেন। ৩২।।

             তবে এখানে দেবীর পূজা রামচন্দ্র করেননি, করেছিলেন ব্রহ্মা। বৃহদ্ধর্মপুরাণেও দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা স্বয়ং। এখানে ব্রহ্মা পুরোহিতরূপে প্রার্থনা করেছিলেন (বৃহদ্ধর্ম, পূর্ব খণ্ড-২২/১৪-১৫)–

ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।
অকালে তু শিবে বোধস্তব দেব্যাঃ কৃতো ময়া।। ১৪
তস্মাদদ্যাদ্রয়াযুক্ত নবম্যামাশ্বিনে শুভে।
রাবণস্য বধং যাবদর্চয়িষ্যামহে বয়ম্ ।। ১৫
অর্থাৎ– রাবণের বধ এবং রামের অনুগ্রহের নিমিত্ত হে শিবে তোমার বোধ আমি করেছি। ১৪।। সুতরাং শুভ আশ্বিন মাসে আদ্রা নক্ষত্রযুক্ত নবমী তিথিতে রাবণের বধ পর্যন্ত আমরা তোমার অর্চনা করবো। ১৫।।

          এই বৃহদ্ধর্মপুরাণেই (বৃহদ্ধর্ম, পূর্ব খণ্ড-২২/২৬-২৭) দেবী বলেছিলেন, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা নবমী থেকে শুক্লাষ্টমী পর্যন্ত বিল্ববৃক্ষে তাঁর পূজা বিধেয় এবং সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত তাঁর পূজাকাল–

এবং পঞ্চদশাহনি মম পূজা মহোৎসবঃ।
অথ ত্রয়োদশাহনি বিল্বে মাং পূজয়েৎ কৃতী।।
সপ্তম্যাং গৃহমানীয় পূজয়েন্মাং দিনদ্বয়ম্ ।
অর্থাৎ– এইভাবে পনেরো দিন আমার পূজা মহোৎসব। অনন্তর তেরো দিন বিল্ববৃক্ষে কৃতী আমাকে পূজা করবে, সপ্তমীতে গৃহে এনে দু’দিন আমাকে পূজা করবে।

আর কৃত্তিবাস লিখেছেন,–

সায়াহ্ন কালেতে রাম করিল বোধন।
আমন্ত্রণ অভয়ার বিল্বাধিবাসন।।

           এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের অভিমত হলো,– ‘কোন প্রাচীন পুরাণে অকাল বোধনের উল্লেখ না থাকলেও অকাল বোধনের স্মৃতি হিসাবেই বাঙ্গালাদেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাল্মীকি প্রণীত রামায়ণে অকালবোধনের কোন উল্লেখ নেই। রামচন্দ্র রাবণ বধের পূর্বে দুর্গা পূজা করেন নি, ব্রহ্মাও করেন নি। রামচন্দ্র করেছিলেন আদিত্য হৃদয় স্তব অর্থাৎ সূর্যস্তব পাঠ। বাল্মীকির রামায়ণ রচনাকালে পৃথক দেবসত্তা হিসাবে দুর্গা-চণ্ডীর আবির্ভাব হয়নি। দেবী দুর্গা-চণ্ডী সূর্য ও অগ্নির তেজোরূপা বলেই সম্ভবতঃ সূর্যপূজার স্থলে দুর্গা পূজার রীতি প্রবর্তিত হয়েছে।’– (হিন্দুদের দেবদেবী : উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ- তৃতীয় পর্ব, পৃষ্ঠা-২২৪)

                এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, শরৎকালে দেবীর বোধনকে অকালবোধন বলা হয় কেন? ইতঃপূর্বেই আমরা দেখেছি, কালিকাপুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা রাত্রিতে দেবীর বোধন করেছিলেন। দেবতার অর্চনার পক্ষে রাত্রি নিশ্চয়ই অকাল। প্রচলিত বিশ্বাস মতে, দেবীপূজার প্রকৃষ্ট সময় বসন্তকাল– চৈত্রমাসের শুক্লা ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত দেবীর বাসন্তী পূজার রীতি প্রচলিত আছে। ‘পূজাপার্বণ’-এর গ্রন্থকার আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে দুর্গা পূজা বৈদিক রুদ্রযজ্ঞের আধুনিক সংস্করণ, রুদ্রযজ্ঞের অগ্নিই দুর্গা। আবার কারও কারও ব্যাখ্যায়,– শাস্ত্রানুসারে ছয়মাস উত্তরায়ণ দেবতাদের একদিন ও ছয়মাস দক্ষিণায়ণ দেবতাদের এক রাত্রি। দক্ষিণায়ণ শুরু হলে বিষ্ণু শয়ন করেন; তখন শয়ন একাদশী হয়। দক্ষিণায়ণান্তে বিষ্ণুর উত্থান,– সে সময়ে উত্থান একাদশী হয়। দেবগণ রাত্রিতে অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে নিদ্রিত থাকেন, দিনে অর্থাৎ উত্তরায়ণে জাগ্রত হন। উত্তরায়ণ তাই যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানের প্রকৃষ্ট কাল। বিষ্ণুশক্তি বিষ্ণুমায়া দুর্গাও রাত্রিতে শায়িতা বা নিদ্রিতা থাকেন। তাই দক্ষিণায়ণকালে শরতে দেবীর উদ্বোধন বা জাগরণ বা অকালবোধন।
কিন্তু বৈদিক যুগে এক সময়ে যে শরৎকালে বৎসর শুরু হতো এবং সে কারণে বৎসর অর্থে ‘শরৎ’শব্দের প্রয়োগ বৈদিক সাহিত্যে যথা ঋগ্বেদ (ঋগ্বেদ-১০/১৬১/২-৪), অথর্ববেদ (অথর্ববেদ-১৯/৬৭/২-৪) ইত্যাদিতে বহুবার পাওয়া যায়। যেমন, ঋগ্বেদে বলা হয়েছে–

যদি ক্ষিতায়ুর্যদি বা পরেতো যদি মৃত্যোরন্তিকং নীত এব।
তমা হরামি নিঋর্রৃতেরুপস্থাদস্পার্ষমেনং শতশারদায়।। (ঋক-১০/১৬১/২)
শতং জীব শরদো বর্ধমানঃ শতং হেমন্তাঞ্জতমু বসন্তান্ ।
শতমিন্দ্রাগ্নী সবিতা বৃহস্পতিঃ শতায়ুষা হবিষেমং পুনর্দুঃ।। (ঋক-১০/১৬১/৪)
অর্থাৎ : যদিও এ রোগীর পরমায়ু ক্ষয় হয়ে থাকে অথবা যদি এ মরেও গিয়ে থাকে, যদি একেবারে মৃত্যুর নিকটেই গিয়ে থাকে তথাপি আমি মৃত্যুদেবতা নির্ঋতির নিকট হতে তাকে ফিরিয়ে আনছি। আমি একে এরূপ স্পর্শ করেছি যে এ ব্যক্তি একশত শরৎ (বৎসর) জীবিত থাকবে। ২।। হে রোগী! একশত শরৎকাল জীবিত থাক, সুখে সচ্ছন্দে একশত হেমন্ত, একশত বসন্ত জীবিত থাক। ইন্দ্র, অগ্নি, সবিতা ও বৃহস্পতি হব্যদ্বারা তৃপ্ত হয়ে একে একশত বৎসর পরমায়ু প্রদান করুন। ৪।।

              অনুমান হয়, শরৎ প্রবেশে নববর্ষের সূচনায় রুদ্রযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতো। তৈত্তিরীয়-ব্রাহ্মণে রুদ্র-ভগিনী অম্বিকার উল্লেখ পাওয়া যায় এবং ধ্বংসের দেবতা রুদ্রের ধ্বংস কার্যের সহায়িকা ছিলেন অম্বিকা। এই অম্বিকা কে? তৈত্তিরীয়-ব্রাহ্মণে (তৈঃ ব্রাঃ-১/১/৬-১০) শরৎকেই অম্বিকা বলা হয়েছে। যেমন–

করদ্বাস্যাম্বিকা স্বসা। তয়া বা এষ হিনস্তি। যং হিনস্তি তয়ৈবৈনং সহ শময়তি।
অর্থাৎ– শরৎ তাঁর (রুদ্রের) ভগিনী অম্বিকা। তাঁর সাহায্যে ইনি (রুদ্র) ধ্বংস করেন। তাঁর সাহায্যে যাঁকে ধ্বংস করেন, (যজ্ঞীয় পুরোডাশাদির দ্বারা) তুষ্টা হয়ে তিনিই তাঁকে (রুদ্রকে) শান্ত করেন।

             শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের মতে,– ‘আমরা শরৎকালে সুরথ রাজা এবং সমাধি বৈশ্যকর্তৃক দুর্গাপূজার উপাখ্যানের সহিত যুক্ত করিয়া অথবা শ্রীরামচন্দ্রের শরৎকালে অকালে দেবীর বোধনের সহিত যুক্ত করিয়া ইহার শারদীয়া বিশেষণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিয়া থাকি। বাজসনেয়-সংহিতায় আমরা রুদ্র-ভগিনী অম্বিকার উল্লেখ পাই। সেখানে ভগিনী অম্বিকার সহিত তাঁহাকে যজ্ঞ-ভাগ গ্রহণ করিতে বলা হইয়াছে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণেও আমরা রুদ্র-ভগিনী অম্বিকার উল্লেখ পাই। শতপথ-ব্রাহ্মণেও অনুরূপ বর্ণনা দেখিতে পাই। সেখানে বলা হইয়াছে,– “তিনি তাহা (এই মন্ত্রে) হোম করেন। হে রুদ্র, এই ভাগ তোমার, ভগিনী অম্বিকার সহিত তাহা সেবন কর! স্বাহা!” “অম্বিকা নামে ইহার ভগিনী (আছেন), তাঁহারই সহিত ইঁহার (রুদ্রের) এই ভাগ।” (৫/৩/৯)। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে আবার অম্বিকাকে রুদ্রের পত্নীরূপে দেখিতে পাইতেছি। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এবং কাঠক-সংহিতায় আবার দেখিতে পাই এই অম্বিকাকেই ‘শরৎ’ বলা হইয়াছে (শরদ্বৈ অম্বিকা)। এই শরৎ-রূপিণী অম্বিকার পূজাই হইল শারদীয়া পূজা।’– (ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, পৃষ্ঠা-২৪-২৫)

এখানে আরেকটি বিষয়ে কৌতুহল হলো, রুদ্র কিভাবে অম্বিকার সাহায্যে ধ্বংস করেন? অম্বিকার ভূমিকা কী? এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের একটি উদ্ধৃতি– শুক্লযজুর্বেদের একটি মন্ত্রের (৩/৫৩) ব্যাখ্যায় আচার্য মহীধর লিখেছেন,–

যোহয়ং রুদ্রাখ্যো ক্রূরো দেবস্তস্য বিরোধিনং হন্তুমিচ্ছা ভবতি। তদানয়া ভগিন্যা ক্রূরদেবতয়া সাধনভূতয়া তং হিনস্তি সা চাম্বিকা শরদ্রূপং প্রাপ্য জ্বরাদিকমুৎপাদ্য তং বিরোধিনং হন্তি।
–(অস্যার্থ) এই যিনি রুদ্র নামক নিষ্ঠুর দেবতা, তাঁর বিরোধীকে হত্যা করতে ইচ্ছা করেন, তিনি এই ক্রূরা দেবী ভগিনীর সহায়তায় তাঁকে হত্যা করেন। সেই অম্বিকা শরদ্রূপ গ্রহণ করে জ্বর প্রভৃতি উৎপাদন করে বিরোধীকে হত্যা করেন।

           অতএব, অধ্যাপক হংসনারায়ণের ব্যাখ্যা হলো,– ‘শরৎকালে নানা রোগের প্রাদুর্ভাবে দেশে মড়ক দেখা দিত। নববর্ষের সূচনায় নানা রোগের আবির্ভাবে বিব্রত আর্যমানব রুদ্র যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতেন সর্বজীবের কল্যাণ কামনায়। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, রুদ্রভগিনী-অম্বিকাই শরদ্রূপ ধারণ করে রুদ্রের ধ্বংসকার্যে রোগ সৃষ্টির দ্বারা সাহায্য করে থাকেন। তাই রুদ্রযজ্ঞে সূর্যাগ্নিরূপী রুদ্রের সঙ্গে রুদ্রতেজোরূপা অম্বিকাকেও পশু পুরোডাশ ইত্যাদির দ্বারা প্রসন্ন করার আয়োজন করা হোত। বর্ষগণনা রীতি পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু রুদ্রযজ্ঞের স্মৃতি রয়ে গেল। শরতে বর্ষারম্ভ না হওয়ায় হয়ে গেল অকাল। রুদ্রযজ্ঞের স্থলাভিষিক্ত হোল রুদ্রশক্তি রুদ্রাণীর পূজার্চনা। যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে দুর্গোৎসব প্রকৃতপক্ষে নববর্ষের উৎসব। গৃহসজ্জা, নববস্ত্র পরিধান, উৎকৃষ্ট দ্রব্য ভোজন, আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি প্রীতিসম্ভাষণ, আলিঙ্গন, গুরুজনদের আশীর্বাদ গ্রহণ প্রভৃতি নববর্ষের অঙ্গীভূত।’– (হিন্দুদের দেবদেবী, পৃষ্ঠা-২২৬)
‘এখানে লক্ষ্য করিতে হইবে, শরৎকাল হইতে বাঙলাদেশের শস্যঋতুর আরম্ভ; দেবীপূজার আরম্ভও তাই শরৎকালে। আমাদের শস্যঋতুর শেষ প্রকৃতপক্ষে বসন্তের শেষে; আবার লক্ষ্য করিলে দেখিতে পাইব, এই শরৎ হইতে বসন্ত পর্যন্তই হইল বাঙলাদেশে সর্বপ্রকারের দেবীপূজার কাল; শারদীয়া অম্বিকাপূজা-দ্বারা দেবীপূজার আরম্ভ; তার পরে লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা, বাসন্তীপূজা, অন্নপূর্ণাপূজায় বাৎসরিক দেবীপূজার শেষ।’– (ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, পৃষ্ঠা-২৫)

               দুর্গাপূজার ভেতরেও দেখা যায়, পূজার প্রথম অঙ্গ হলো ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন। এই বোধনের সময়ে দেবীর প্রতীক কী? দেবী সেখানে বিল্বশাখা। এর তাৎপর্য কী? এর পরেই দেখা যায়, দেবীর স্নান, প্রতিষ্ঠা এবং পূজা হলো নবপত্রিকায়। এই নবপত্রিকা কী? নবপত্রিকা বলতে নয়টি গাছকে বোঝানো হয়। একটি সপত্র কলা গাছের সঙ্গে বাকি আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ অথবা সপত্র শাখা একত্র করে একজোড়া বেলসহ বেঁধে, শ্বেত অপরাজিতা লতার দ্বারা বেষ্টন করে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দিয়ে সিঁদুর মাখিয়ে এই নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। দুর্গাপূজায় গণেশের পাশে দেবীমূর্তির ডানদিকে এই নবপত্রিকা স্থাপনের বিধি দুর্গপূজা পদ্ধতিগুলিতে লক্ষ্য করা যায়। এজন্যেই হয়তো কেউ কেউ ভুল করে এই শস্য-বধূ নবপত্রিকাকে গণেশের বৌ বলে থাকেন। নবপত্রিকার নয়টি গাছের নাম হলো– কলা, ডালিম, ধান, হলুদ, মানকচু, সাধারণ কচু, বেল, অশোক ও জয়ন্তী। নব্য স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন ভট্টাচার্য রচিত ‘তিথিতত্ত্বে’র একটি শ্লোকে এই নবপত্রিকার পরিচয় দেয়া হয়েছে–

‘কদলী দাড়িমী ধান্যং হরিদ্রা মানকং কচুঃ।
বিল্বাশোকৌ জয়ন্তী চ বিজ্ঞেয়া নবপত্রিকা।।’

             এই নবপত্রিকা নবদুর্গা নামে পূজিতা হন– উদ্ভিদগুলি দেবীর প্রতিরূপ হিসেবে গণ্য হয়। এই নয় দেবী হলেন– রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা ও জয়ন্তাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী। নয়টি উদ্ভিদের একত্র অবস্থান নবপত্রিকা নবদুর্গা নামে ‘নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রে পূজিতা হয়। নবপত্রিকা সম্পর্কে পণ্ডিতেরা প্রায় সমস্বরে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে নবপত্রিকা শস্যদেবীর পূজা। শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্তের ভাষ্য অনুযায়ী–
‘এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজা মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। দূর্গাপূজাবিধিতে দেখিতে পাই রম্ভার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হইলেন ব্রাহ্মণী, কচুর কালিকা, হরিদ্রার দুর্গা, জয়ন্তীর কার্তিকী, বিল্বের শিবা, দাড়িম্বের রক্তদন্তিকা, অশোকের শোকরহিতা, মানকচুর চামুণ্ডা এবং ধান্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হইলেন লক্ষ্মী। নবপত্রিকার শস্যসমূহের দেবীর সহিত যোগের ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে; দেবী হরিদ্রাবর্ণ বলিয়া হরিদ্রার দেবীত্ব, তিনি জয়রূপিণী বলিয়া জয়ন্তী, মানদায়িনী বলিয়া মানের সহিত তাঁহার যোগ; বিল্ব শঙ্কর-প্রিয় বলিয়া দেবীর স্বরূপত্ব লাভ করিয়াছে; দেবী শোকরহিতা বলিয়া অশোকে তাঁহার অধিষ্ঠান; জীবের প্রাণদায়িনীরূপে দেবী ধান্যরূপা; দেবী অসুর-বিনাশকালে দাড়িম্ববীজের ন্যায় রক্তদন্তবিশিষ্টা হইয়া রক্তদন্তিকা নামে খ্যাতা– এইজন্য দাড়িম্বেও দেবীর অধিষ্ঠান। বলা বাহুল্য, এই সবই হইল পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সহিত এই শস্যদেবীকে সর্বাংশে মিলাইয়া লইবার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-দেবী মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপূজার ভিতরে এখনও এই আদি-মাতা পৃথিবীর পূজা অনেকখানি মিলিয়া আছে।’– (ভারতের শক্তি-সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, পৃষ্ঠা-২৫-২৬)
শবর প্রভৃতি জাতির মধ্যে প্রচলিত শস্যোৎসব থেকে দুর্গাপূজার এই অঙ্গটি আসতে পারে বলে যোগেশচন্দ্র রায় মহাশয় অনুমান করেন– ‘বোধ হয় কোনও প্রদেশে শবরাদি জাতি নয়টি গাছের পাতা সম্মুখে রাখিয়া নবরাত্রি উৎসব করিত। তাহাদের নবপত্রী দুর্গা প্রতিমার পার্শ্বে স্থাপিত হইতেছে। মানুষের স্বভাব– যেটা কোথাও হয়, সেটা অন্যত্র প্রচারিত হয়।’- (পূজাপার্বণ)

            সন্ধিপূজা : পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সাথে শস্যদেবীকে সর্বাংশে মিলিয়ে নেয়ার যে সচেতন প্রচেষ্টা, তার অন্যতম দৃষ্টান্ত মনে হয় সন্ধিপূজার অনুষ্ঠান। দুর্গাপূজায় অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিস্থলে দেবীর যে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠান হয় তা-ই সন্ধিপূজা নামে প্রসিদ্ধ। লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী এই সময়ে প্রতিমায় আবির্ভূতা হন। সন্ধিপূজার বিশেষ মাহাত্ম্য কীর্তিত হয়েছে বৃহদ্ধর্মপুরাণে। এই পুরাণানুসারে (বৃহদ্ধর্মপুরাণ-পূর্বখণ্ড-২২/২০-২৫),–
‘ব্রহ্মা রাবণ বধের নিমিত্ত দেবীর বোধন করেছিলেন আশ্বিনের কৃষ্ণা নবমীতে। দেবী চণ্ডিকা জাগ্রত হয়ে রাক্ষস নিধনের বর দিয়েছিলেন। তাঁর বরে কৃষ্ণানবমীতে কুম্ভকর্ণ, ত্রয়োদশীতে লক্ষ্মণের অস্ত্রে অতিকায়, অমাবস্যার রাত্রিতে লক্ষ্মণ কর্তৃক ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ, প্রতিপদে মকরাক্ষ ও দ্বিতীয়াতে দেবান্তক প্রভৃতি রাক্ষস নিহত হবে। সপ্তমীতে দেবী শ্রীরামের অস্ত্রে প্রবেশ করবেন, অষ্টমীতে রাম-রাবণের যুদ্ধ প্রবল রূপ ধারণ করবে। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের শিরসমূহ ছিন্ন হবে, আর সেই শির পুনর্যোজিত হলে নবমীতে রাবণ নিহত হবে।’
এই দেবীদত্ত বর অনুসারে– বৃহদ্ধর্মপুরাণ-২২/৪৮-এ বলা হয়েছে– রামচন্দ্র অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড ছিন্ন করেছিলেন– ‘পাতয়ামাস দশ বৈ মস্তকান্ কালসন্ধিকে।’
এবং সেজন্যই বৃহদ্ধর্মপুরাণে সন্ধিপূজার মাহাত্ম্য প্রকাশ করতে গিয়ে দেবী বলেছেন যে, অষ্টমী-নবমী সন্ধিক্ষণের পূজার মহিমা খুব বেশি–

অষ্টমীনবমীসন্ধিকালোহয়ং বৎসরাত্মকঃ।
তত্রৈব নবমীভাগঃ কালঃ কল্পাত্মকো মম।।– (বৃহদ্ধর্মপুরাণ-২২/২৯)
অর্থাৎ– অষ্টমী-নবমী সন্ধিক্ষণের পূজা এক বৎসরের পূজার তুল্য,– তার মধ্যে নবমীভাগে পূজা কল্পকাল পূজার তুল্য।

                আর এই মাহাত্ম্যের অন্য প্রেক্ষিতটি আমরা জানতে পারি যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির অভিমত থেকে। তাঁর মতে শরৎঋতুর সূচনা লগ্ন ছিল বৈদিক যুগে অষ্টমী নবমীর সন্ধিতে– ‘হিম বৎসরের আট চান্দ্রমাস গতে অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে শরৎ ঋতুর আরম্ভ। এই কারণে দুর্গাপূজায় সন্ধিক্ষণের মাহাত্ম্য হইয়াছে।’– (পূজাপার্বণ, পৃষ্ঠা-৯৪)

              কুমারীপূজা :  দুর্গাপূজার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো কুমারীপূজা। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী– এই তিনদিনই দেবীপূজার অন্তে কোন কুমারী বালিকাকে নূতন বস্ত্র পরিধান করিয়ে দেবীজ্ঞানে পূজা করার রীতি। যদিও বর্তমানে এই তিনদিনের প্রতিদিন এবং সর্বত্র এই পূজা হয় না। কালিকাপুরাণে কুমারীপূজার ধ্যানমন্ত্র হলো–

বালরূপাঞ্চ ত্রৈলোক্যসুন্দরীং বরবর্ণিনীম্ ।
নানালংকার নম্রাঙ্গীং ভদ্রবিদ্যাপ্রকাশিনীম্ ।।
চারুহাস্যাং মহানন্দহৃদয়াং শুভদাং শুভাম্ ।
ধ্যায়েৎ কুমারীং জননীং পরমানন্দরূপিণীম্ ।।

              এই মন্ত্রে কুমারীরূপিণী দেবীর পূজা করা হয়, দেবী দুর্গা কুমারী নামে প্রসিদ্ধা। বৃহদ্ধর্মপুরাণে দেখা যায়, দেবতাদের স্তবে প্রীতা হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সম্মুখে আবির্ভূতা হয়ে বিল্ববৃক্ষে দেবীর বোধন করতে বলেছিলেন– ‘কন্যারূপেণ দেবানামগ্রতো দর্শনং দদৌ।’ –(বৃহঃ-পুরাণ-পূর্বখ–২১/৬২)
দেবীপুরাণ মতে, দেবীর পূজার পর উপযুক্ত উপচারে কুমারীদের ভোজনে তৃপ্ত করার নির্দেশনায় বলা হয়েছে–

নৈবেদ্যং শালিজং ভক্তং শর্করা কন্যকাস্বপি। –(দেবীপুরাণ-৩৩/৯১)
অর্থাৎ– শালিচালের ভাত, শর্করা (মিষ্টান্ন) প্রভৃতির নৈবেদ্য দ্বারা কুমারীদের ভোজন করাবে।

            দুর্গাপূজায় কুমারীপূজা সংযুক্ত হয়েছে নিঃসন্দেহে তান্ত্রিক সাধনা থেকে। তান্ত্রিক মতে কুমারী দেবীর প্রতীক। তাই যে-কোন প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠে কুমারীপূজার রীতি। কামরূপ কামাখ্যার মন্দিরে নিয়মিত কুমারীপূজা করা হয়ে থাকে। কুমারীপূজার প্রাধান্য থেকেই বাঙলাদেশে ‘গৌরীদান’ প্রথা প্রচলিত হয়েছিল। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তন্ত্রসারে কুমারীপূজার স্বপক্ষে জ্ঞানার্ণবতন্ত্রের বচন উদ্ধার করেছেন–

হোমাদিকং হি সকলং কুমারী পূজনং বিনা।
পরিপূর্ণফলং ন স্যাৎ পূজয়া তদ্ ভবেদ্ ধ্রুবম্ ।
কুমারীপূজয়া দেবী ফলং কোটিগুণং ভবেৎ।।
পুষ্পং কুমার্যৈ যদ্দত্তং তন্মেরুসদৃশং ফলম্ ।
কুমারী ভোজিতা যেন ত্রৈলোক্যং তেন ভোজিতম্ ।। –(তন্ত্রসার)
অর্থাৎ– কুমারী পূজা ছাড়া হোম প্রভৃতি সকল কর্ম পরিপূর্ণ ফললাভ করে না। কুমারীপূজায় সেই ফল অবশ্যই লাভ হয়। কুমারীকে পুষ্প দিলে তার ফল হয় মেরুপর্বত সমান, কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোককে ভোজন করান হয়।

এই তন্ত্রসারেই দেখি দেবী শিবকে বলছেন–

কুমারিকা হ্যহং নাথ সদা ত্বং কুমারিকা। -(তন্ত্রসার)
অর্থাৎ– হে নাথ, আমিও কুমারী তুমিও কুমারী। (অর্থাৎ সকল কুমারীই শিব-পার্বতীর অংশ।)

আবার তন্ত্রসারে বলা হচ্ছে–

কুমারী যোগিনী সাক্ষাৎকুমারী পরদেবতা। –(তন্ত্রসার)
অর্থাৎ– কুমারী সাক্ষাৎ যোগিনী, কুমারী পরদেবতা।

            এবং মহানবমীতে কুমারীপূজার বিধান তন্ত্রসারেই আছে এভাবে– ‘মহানবম্যাং দেবেশি কুমারীং চ প্রপূজয়েৎ।’
এখানে উল্লেখ্য, তন্ত্র মতে– এক বৎসর থেকে ষোল বৎসর পর্যন্ত বালিকারা ঋতুমতী না হওয়া পর্যন্ত কুমারীরূপে পূজিত হওয়ার যোগ্য। একেক বর্ষীয়া কুমারীদের একেক নাম রয়েছে। যেমন–
‘একবৎসরের কন্যার নাম সন্ধ্যা, দ্বিবর্ষা কন্যা সরস্বতী, তিনবৎসরের ত্রিধামূর্তি, চতুবর্ষা কালিকা, পঞ্চবর্ষা সুভগা, ষড়্বর্ষা উমা, সপ্তবর্ষা মালিনী, অষ্টবর্ষা কুব্জিকা, নববর্ষীয়া কন্যার নাম কালসন্দর্ভা, দশমবর্ষীয়া অপরাজিতা, একাদশবর্ষীয়া কন্যা রুদ্রাণী, দ্বাদশবর্ষা ভৈরবী, ত্রয়োদশবর্ষীয়া মহালক্ষ্মী, চতুর্দশবর্ষীয়া পীঠনায়িকা, পঞ্চদশবৎসরের কন্যার নাম ক্ষেত্রজ্ঞা ও ষোড়শবর্ষীয়া কুমারী অম্বিকা।’– (হিন্দুদের দেবদেবী : উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, পৃষ্ঠা-২৩৮-৩৯)

             দেবীর কুমারী নাম বহু প্রাচীন। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে এবং নারায়ণী-উপনিষদেও দেবীকে কন্যা ও কুমারী বলা হয়েছে এভাবে–

কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারি ধীমহি। তন্নো দুর্গি প্রচোদয়াৎ।
–(তৈঃ আঃ-১০/২, নারাঃ-উপঃ-২/১/৩৪)
অর্থাৎ– হে দুর্গে, তুমি কন্যা ও কুমারী, কাত্যায়নকে জানি, তোমাকে ধ্যান করি, তুমি আমাদের প্রেরণ কর।

মহাভারতের দুর্গাস্তোত্রে দেবী কুমারী, কৌমার্য-ব্রত ধারিণী–

নমোহস্তু বরদে কৃষ্ণে কুমারি ব্রহ্মচারিণি। –(মহাঃ-বিরাটপর্ব-৬/৭)
কৌমারং ব্রতমাস্থায় ত্রিদিবং পালিতং ত্বয়া। –(মহাঃ-বিরাটপর্ব-৬/১৪)
কুমারি কালি কাপালি কপিলে কৃষ্ণ পিঙ্গলে। –(মহা:-ভীষ্মপর্ব-২১/৪)

আবার শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী চণ্ডীও কুমারী–

কৌমারীরূপসংস্থানে নারায়ণি নমোহস্তু তে। –(চণ্ডী-১১/১৫)
অর্থাৎ– অপাপবিদ্ধা (নিত্যশুদ্ধা) ও কুমার-শক্তিরূপিণী হে নারায়ণি, আপনাকে প্রণাম।

আর দেবীপুরাণ দেবীর কৌমারী নামের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন–

কুমার-রূপধারী চ কুমার-জননী তথা।
কুমার-রিপুহন্ত্রী চ কৌমারী তেন সা স্মৃতা। –(দেবীপুরাণ-৩৭/৮৫)
অর্থাৎ– কুমার রূপ ধারণ করেন, কুমারের জননী, কুমার রিপুনাশিনী বলেই তিনি কৌমারী নামে স্মৃতা।

ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে কন্যাকুমারী নামক বিখ্যাত পীঠে দেবীর কন্যাকুমারী বিগ্রহ দেবীর কুমারী নামের সার্থকতা প্রতিপাদন করে।– ‘খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে লিখিত ‘Periplus of the Erythraean Sea’ গ্রন্থে কুমারিকা অন্তরীপে কন্যা কুমারী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়।… এখানে শুধু যে কন্যা কুমারী দেবীর ইঙ্গিত পাই তা নয়, দেবীর উপাসক উপাসিকারও উল্লেখ পাওয়া যায়। ছত্রিশগড় অঞ্চলে কুমারী মেয়েরা ভাদ্রের কৃষ্ণাষ্টমী থেকে আশ্বিনের শুক্লানবমী পর্যন্ত সতেরো দিন ব্যাপী একবেলা উপবাস করে ‘কুমারী ওষা’ নামক ব্রত পালন করে। বিজয়চন্দ্র মজুমদারের মতে (প্রবাসী, আশ্বিন ১৩২৯) এই ব্রত অনার্যসংস্কৃতি থেকে আগত।’– (হিন্দুদের দেবদেবী, পৃষ্ঠা-২৩৯-৪০)
দেবী মহাশক্তিকে কুমারী বলার বিশেষ তাৎপর্য উল্লেখ করে যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি লিখেছেন,– ‘দুর্গা কুমারী। তাঁহার পুত্রকন্যা নাই। এই কারণে দুর্গা পূজায় কুমারী-পূজা বিহিত হইয়াছে।’– (পূজাপার্বণ)
এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক হংসানারায়ণ ভট্টাচার্যের বর্ণনায়– ‘দেবতেজঃসম্ভূতা চণ্ডী অবশ্যই কুমারী। তিনি শিব-ভার্যাও নন, গণেশ কার্তিকেয়ের জননীও নন। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে উমা-পার্বতী শিব-জায়া হলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে পুত্রকন্যার জননী নন। কার্তিকেয়ও তাঁর গর্ভজাত পুত্র নন। তথাপি প্রচলিত অর্থে শিবের বিবাহিতা হিসাবে তাঁকে কুমারী বলা যায় না।’ –(হিন্দুদের দেবদেবী-তৃতীয় পর্ব, পৃষ্ঠা-২৪০)
প্রকৃতপক্ষে বৈদিক, পৌরাণিক ও তান্ত্রিক ধর্মোপাসনার রীতি বিভিন্নভাবে একত্র সম্মিলিত হয়েছে দুর্গাপূজায়।

            শারদীয়া-প্রতিমার প্রাচীনত্ব : বাঙলায় শারদীয় দুর্গাপ্রতিমায় যে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ সহ মহিষমর্দিনীকে উপস্থাপিত করা হয় তা কতো প্রাচীন বলা যায় না। প্রসিদ্ধ ‘পঞ্চোপাসনা’ গ্রন্থে মহাশয় জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য অনুযায়ী– ‘যে প্রথায় প্রতি বৎসর আশ্বিন-কার্তিক মাসে বঙ্গদেশের সর্বত্র দশভূজা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি অনেকদিন ধরিয়া পূজাপূর্বক বিজয়া দশমীতে বিসর্জন দেওয়া হয়, উহার সমধিক প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে ঠিক করিয়া কিছু বলা যায় না। বঙ্গদেশে এবং অন্যত্র আদি-মধ্যযুগ হইতে আরম্ভ করিয়া উত্তর-মধ্যযুগ পর্যন্ত যে সকল প্রস্তর বা ধাতু-নির্মিত মহিষমর্দিনী মূর্তি পাওয়া গিয়াছে, উহাতে সচরাচর মহিষাসুরের সহিত যুদ্ধরত অবস্থায় দশপ্রহরণধারিণী দেবীকে এবং দেবীর বাহন সিংহ ও কর্তিতশির মহিষের দেহ হইতে নির্গমনশীল নররূপী অসুরকে দেখানো হইয়া থাকে। বাংলার শারদীয়া দুর্গাপ্রতিমায় যেরূপ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে অতিরিক্ত পরিবার দেবতা রূপে দেখানো হয়, সেরূপ কোনও প্রাচীন ধাতু বা প্রস্তরনির্মিত মূর্তি অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। কিন্তু ইহা মনে রাখিতে হইবে যে শারদীয়া মৃন্ময়ী দুর্গাপ্রতিমা প্রতি বৎসর পূজার পর জলে বিসর্জিত করা, এবং পূর্ব পূর্ব বৎসরের ‘কাঠামো’র উপর নূতন করিয়া নির্মাণ করাই বিধি। সুতরাং এরূপ মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ ও পূজাশৈলী যে কত প্রাচীন উহার প্রত্নতত্ত্বগত প্রমাণ সংগ্রহ করা অসম্ভব। এ বিষয়ে আমাদিগকে সাহিত্যগত সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করিতে হইবে। দেবীমাহাত্ম্যে লিখিত আছে যে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য ঋষি মেধসের নিকট হইতে মহামায়া-দুর্গাতত্ত্ব সবিশেষ জানিয়া নদীতীরে গমন করেন, এবং সেখানে অবস্থানপূর্বক জগন্মাতার দর্শনলাভ কামনায় শ্রেষ্ঠ জপ দেবীসূক্ত পাঠ করিয়া ও সেই নদীতটে দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করিয়া পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্যাদির দ্বারা পূজা করেন (মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ৯২ অধ্যায়, শ্লোকসংখ্যা ৯-১১)। এখানে ‘মহীময়ী মূর্তি’ পূজার কথা আছে সত্য, কিন্তু মূর্তি ও মূর্তি-পরিবারাদির কোনও বর্ণনা নাই। রাজা ও বৈশ্য তিন বৎসর এইরূপ পূজা করিয়া তবে দেবীর দর্শন পাইয়াছিলেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ হইতে জানা যায় যে পূজাশেষে তাঁহারা মৃন্ময়ী প্রতিমা নদীতে বিসর্জন দিয়াছিলেন। মৃন্ময়ী মূর্তি ক্ষণিক পর্যায়ের, এবং ইহা নদীজলে বিসর্জিত করাই স্বাভাবিক। সুরথ রাজার দেবীপূজার সময় শরৎকালে ছিল না, উহা বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া কিংবদন্তী। আজিও ইহার অনুকল্প রূপে বসন্তকালে বাসন্তী নামে দেবীর পূজা বাংলাদেশে অল্প প্রচলিত আছে। শরৎকালে দেবীর যে পূজা ব্যাপকভাবে এ দেশে প্রচলিত উহার অন্যতম প্রথম উল্লেখ আমরা কালিকাপুরাণে পাই। ইহার পঞ্চষষ্ঠীতম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোক এইরূপ–

শরৎকালে পুরা যস্মান্নবম্যাং বোধিতা সুরৈঃ।
শারদা সা সমাখ্যাতা পীঠে লোকে চ মানব।।
(যেহেতু পূর্বে শরৎকালে দেবগণ কর্তৃক মহাদেবী বোধি হইয়াছিলেন, সেই নিমিত্ত পীঠস্থানে এবং লোকমধ্যে তিনি শারদা নামে বিখ্যাত হন।)

             এখানে দেবগণ কর্তৃক তাঁহার শরৎকালে বোধনের কথা বলা হইয়াছে, কৃত্তিবাস কথিত শ্রীরামচন্দ্রের দ্বারা অকালে তাঁহার বোধনের কথা নাই। …বঙ্গদেশীয় শারদীয়া পূজার অন্যতম ভিত্তি কৃত্তিবাসী রামায়ণ। কালিকাপুরাণ বাংলাদেশেই রচিত হইয়াছিল বলিয়া অনেকের বিশ্বাস। ইহার রচনাকাল কৃত্তিবাসের পূর্বে; ইহাতে শারদীয়া পূজার কথা আছে, কিন্তু দেবতাদিগকেই এই পূজার প্রথম প্রবর্তক বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে।’
‘রঘুনন্দন প্রমুখ প্রসিদ্ধ বঙ্গদেশীয় স্মৃতিনিবন্ধকারদিগের গ্রন্থে আমরা শারদীয় দুর্গোৎসবের বিবরণ পাই। স্মার্ত রঘুনন্দন খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন। তাঁহার অষ্টাবিংশতি তত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত শ্রীদুর্গোৎসবতত্ত্বে তাঁহার পূর্ববর্তী গ্রন্থকার ও পূর্বপ্রচলিত প্রবচনাদির উপর নির্ভর করিয়া তিনি পূজা-পদ্ধতি সম্বন্ধে বহু জ্ঞাতব্য তথ্য লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। কালিকাপুরাণ, বৃহন্নন্দিকেশ্বরপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে তিনি এতৎসম্পর্কিত অনেক উপাদান সংগ্রহ করেন। বাচস্পতি মিশ্র, শ্রীনাথ, শূলপাণি, জীমূতবাহন, রামকৃষ্ণ প্রভৃতি রঘুনন্দনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নিবন্ধকারগণ তাঁহাদের দুর্গাপূজা সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তিপূজার পদ্ধতি লিখিয়া গিয়াছেন। খৃষ্টীয় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি তাঁহার দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী নামক গ্রন্থেও দেবীর এইরূপ মূর্তির পূজার্চনার কথা লিখিয়াছেন। শূলপাণি ও জীমূতবাহন একই সময়ে বর্তমান ছিলেন। শূলপাণি তাঁহার দুর্গোৎসববিবেক, বাসন্তীবিবেক এবং দুর্গোৎসবপ্রয়োগ নামক তিনটি নিবন্ধে জীকন ও বালক নামক তাঁহার পূর্ববর্তী নিবন্ধকার দুইজনের এতৎসম্পর্কিত উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন। জীকন ও বালক বাঙ্গালী ছিলেন; তাঁহাদের আবির্ভাবকাল সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানা না গেলেও, ইহা বলা যায় যে তাঁহারা বাংলার অন্যতম প্রাচীন স্মৃতিনিবন্ধকার ভবদেব ভট্টের পূর্ববর্তী ছিলেন। রাজা হরিবর্মদেবের (খৃষ্টীয় একাদশ শতক) প্রধান মন্ত্রী ভবদেব ভট্ট তাঁহার নিবন্ধাবলীতে জীকন, বালক এবং আর একজন প্রাচীন গ্রন্থকার শ্রীকরের অনেক উক্তির আলোচনা করিয়াছেন। এই সকল তথ্য আমাদিগকে জানাইয়া দেয় যে মৃন্ময়ী প্রতিমায় দেবীর পূজার্চন বাংলাদেশে ন্যূনাধিক সহস্র বৎসর ধরিয়া প্রচলিত আছে। তবে দেবীর ও তাঁহার পরিবারাদির রূপায়ণে যে এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে কোনও পরিবর্তন আনীত হয় নাই ইহা বলা যায় না। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ যেভাবে কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত দেবীর পরিবার-দেবতা রূপে প্রদর্শিত হইতেন, এবং এখনও কোনও কোনও প্রাচীনতন্ত্রী প্রতিমাতে প্রদর্শিত হন, উহা যে ঠিক কোন সময়ে প্রথম প্রচলিত হয় সে বিষয়ে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না।’- (পঞ্চোপাসনা, জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়)

               শাবরোৎসব :  শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ মহাশয়ের কথা ইতঃপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনিই প্রথম সবার নজরে আনেন যে, বঙ্গদেশের দুর্গাপূজা আসলে শস্যদেবীর পূজা, যা অনুষ্ঠিত হয় তান্ত্রিক সর্বতোভদ্রমণ্ডল যন্ত্রে ও নবপত্রিকায়, যা হচ্ছে নয়টি গাছ– কদলী বা রম্ভা, কচ্চী, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম, অশোক, মানক ও ধান্য এবং তিনি পুরশ্চর্যার্ণবের তৃতীয় খণ্ড থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন যে, উক্ত নয়টি বৃক্ষের প্রত্যেকটির অধিষ্ঠাত্রী দেবী যথাক্রমে ব্রহ্মাণী, কালিকা, দুর্গা, (কার্তিকী) কৌমারী, শিবা, রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, চামুণ্ডা এবং লক্ষ্মী। দুর্গা আরাধনায় দেবীকে উদ্ভিজ্জসমূহের অধিষ্ঠাত্রীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। দেবীর শাকম্ভরী নামের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে বর্ণিত তাঁর অন্নপূর্ণা রূপ, এবং কুলচূড়ামণি, শাক্তানন্দতরঙ্গিণী, তন্ত্রসার প্রভৃতি গ্রন্থে তান্ত্রিক শাক্ত উপাসনায় যে কুলবৃক্ষ পূজার উল্লেখ আছে, তা দেবীর সঙ্গে উদ্ভিদ জগতের সম্পর্ক ব্যক্ত করে।
এই উৎসব যে এককালে বস্তুত প্রাচীন কৌম-সমাজের একটি শস্য-প্রজনন-উৎসব ছিল তার স্বপক্ষে বিদ্বান গবেষকেরা বিভিন্ন প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। শ্রদ্ধেয় জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চোপাসনা’ গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা জানতে পারি, শূলপাণি তাঁর দুর্গোৎসববিবেক গ্রন্থে কালিকাপুরাণ (কালিকাপুরাণ-৬১/১৭-২১) থেকে শারদীয় দুর্গোৎসবে অনুষ্ঠিতব্য শাবরোৎসব নামক এক বিধি সম্পর্কিত কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। অধ্যাপক হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যও তাঁর ‘হিন্দুদের দেবদেবী : উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’ গ্রন্থের তৃতীয় পর্বে (পৃষ্ঠা-২৬৩) তা উপস্থাপন করেছেন। কালিকাপুরাণে শাবরোৎসবের নির্দেশ ও বিবরণে বলা হয়েছে–

বিসর্জয়েৎ দশম্যান্তু শ্রবণে শাবরোৎসবৈঃ।। ১৭।।
— — —
তদা সম্প্রেষণং দেব্যা দশম্যাং কারয়েদ্বুধঃ।। ১৮।।
সুবাসিনীভিঃ কুমারীভির্বেশ্যাভির্নর্তকৈ স্তথা।
শঙ্খতূর্যনিনাদৈশ্চ মৃদঙ্গৈঃ পটহৈস্তথা।। ১৯।।
ধ্বজৈর্বস্ত্রৈর্বহুবিধৈর্লাজপুষ্প প্রকীর্ণকৈঃ।
ধূলিকর্দমবিক্ষেপৈঃ ক্রীড়াকৌতুকমঙ্গলৈঃ।। ২০।।
ভগলিঙ্গাভিধানৈশ্চ ভগলিঙ্গপ্রগীতকৈঃ।
ভগলিঙ্গাদিশব্দৈশ্চ ক্রীড়ায়েষুরলং জনাঃ।। ২১।।
পরৈর্নাক্ষিপ্যতে যস্তু য পরান্নাক্ষিপেদ্ যদি।
ক্রুদ্ধা ভগবতী তস্য শাপং দদ্যাং সুদারুণম্ ।। ২২।।
অর্থাৎ : দশমীর দিবস শ্রবণা নক্ষত্রে শাবরোৎসবের সহিত দেবীর বিসর্জন করিবে। —জ্ঞানীব্যক্তি দশমীতে শ্রবণা নক্ষত্রে দেবীকে জলে প্রেরণ করিবেন। সুন্দর বস্ত্রে সজ্জিতা কুমারী ও বেশ্যা এবং নর্তকগণ সঙ্গে লইয়া শঙ্খ, তূরী, মৃদঙ্গ এবং পটহের শব্দ করিতে করিতে নানাবিধ বস্ত্রের ধ্বজা উড়াইয়া খই এবং ফুল ছড়াইতে ছড়াইতে ধূলিকর্দম নিক্ষেপ করতঃ নানা ক্রীড়াকৌতুক ও মঙ্গলাচরণপূর্বক ভগলিঙ্গাদিবাচক গ্রাম্যশব্দ উচ্চারণ ও তাদৃশ শব্দবহুল গান এবং তাদৃশ অশ্লীল বাক্যালাপ করিয়া বিসর্জনের সময়ে ক্রীড়া করিবে। সেই দিবস (অর্থাৎ বিজয়াদশমীর দিন) যদি কোনও মনুষ্য নিজের উপর অশ্লীল ব্যবহার করিতে না চাহে, অথবা যদি অন্যকে অশ্লীল ব্যবহারের দ্বারা আক্ষিপ্ত না করে, তবে ভগবতী ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে শাপ প্রদান করিয়া গমন করেন।

              কিন্তু, শ্রীজিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রমাপ্রসাদ চন্দ শূলপাণির গ্রন্থ থেকে যে পাঠ উদ্ধার করেছেন তার শেষ চরণটি ভিন্নরূপ : ভগলিঙ্গক্রিয়াভিশ্চ ক্রীড়য়েষুরলজ্জিত। দুটি শ্লোকের রীতিমতো অর্থভেদ বর্তমান বলে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন। জিতেন্দ্রনাথ তাঁর ‘পঞ্চোপাসনা’ গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেছেন যে– ‘রঘুনন্দনও বিজয়াদশমীতে প্রতিমা-বিসর্জন সম্পর্কে এই শাবরোৎসবের কথা বলিয়াছেন। তিনি বলিতেছেন, ‘ততো ধূলিকর্দম-বিক্ষেপক্রীড়াকৌতুকমঙ্গল ভগলিঙ্গাভিধানং ভগলিঙ্গপ্রগীত পরাক্ষিপ্ত পরাক্ষেপকরূপং শাবরোৎসবং কুর্যাৎ’। শারদীয়া দুর্গাপূজায় পুরাকালে অনুষ্ঠিত শাবরোৎসব এখন কোথাও পালিত হয় কিনা জানি না, তবে শাবরমার্গ নামে যে সেকালের তান্ত্রিক শক্তি-উপাসনার এক শাখা ছিল উহা মেরুতন্ত্রের একটি উক্তি হইতে আমরা জানিতে পারি। এই তন্ত্রে বামমার্গের পাঁচটি শাখাকে যথা কৌলিক, বাম, চীনক্রম, সিদ্ধান্তীয় ও শাবর, হাতের পাঁচ অঙ্গুলির সহিত তুলনা করা হইয়াছে; কৌলিক অঙ্গুষ্ঠ, বাম তর্জনী, চীনক্রম মধ্যম, সিদ্ধান্তীয় অনামিকা এবং শাবর কনিষ্ঠাঙ্গুলি। শ্লোকটি এইরূপ–

কৌলিকোহঙ্গুষ্ঠতাং প্রাপ্তো বামঃ স্যাত্তর্জনীসমঃ।
চীনক্রমো মধ্যমঃ স্যাৎ সিদ্ধান্তীয়োহবরো ভবেৎ।
কনিষ্ঠঃ শাবরো মার্গঃ ইতি বামন্তু পঞ্চধা।।

              আধুনিককালে অবশ্য এ ধরনের অশ্লীল নৃত্যগীত দুর্গোৎসবের অঙ্গ হিসেবে অপ্রচলিত হয়ে গেছে। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি উক্ত শবরোৎসবকে লৌকিক বিশ্বাসজাত এবং বৈদিক যুগ থেকে আগত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন,–
‘লোকের বিশ্বাস ছিল, নববর্ষের প্রথম দিন চক্ষু কর্ণ কিম্বা দেহ অশুচি করিলে সে বৎসর যমদুত স্পর্শ করিতে পারে না। মহারাষ্ট্রে ব্রাহ্মণাদি উচ্চ বর্ণ অন্ত্যজ স্পর্শ দ্বারা দেহ অশুচি করে, পরে স্নান করে। এই বিশ্বাস অল্পকালের নয়, অন্ততঃ সাড়ে চারি সহস্র বৎসর হইতে আছে। ইহার প্রমাণ আছে। বৈদিক কালে সম্বৎসর ব্যাপী সত্রের পর এইরূপ অশ্লীল ক্রীড়া কৌতুক হইত। আমার বিশ্বাস, বৈদিক কালের সোমরস বর্তমান ভাং (সিদ্ধি)। আমরা বিজয়া দশমীতে সিদ্ধি পান করি।’– (পূজাপার্বণ, পৃষ্ঠা-৮)
অধ্যাপক হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে, যোগেশচন্দ্রের বক্তব্য যথার্থ হলে এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে অশ্লীল ক্রীড়া কৌতুক যদি শবরাদি অনার্য জাতির কাছ থেকে এসে থাকে, ত তা এসেছে বৈদিক যুগেই। বৈদিক যজ্ঞরূপা দুর্গার অর্চনায় বৈদিক যুগের উৎসব সংযুক্ত হওয়া স্বাভাবিক। হয়তো বা তার সঙ্গে শবর জাতির উৎসবও সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে।

            শস্যদেবী শাকম্ভরী দুর্গা :  শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ যে কয়েকটি চিত্তাকর্ষক সাহিত্যমূলক সাক্ষ্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তা হলো,– ‘মার্কণ্ডেয়-পুরাণে’র দেবী-মাহাত্ম্যে স্বয়ং দেবী ঘোষণা করছেন–

‘ততঃ অহম্ অখিলং লোকম্ আত্মদেহ-সমুদ্ভবৈঃ।
ভবিষ্যামি সুরাঃ শাকৈঃ অবৃষ্টৈঃ প্রাণধারকৈঃ।।
শাকম্ভরী ইতি বিখ্যাতিং তদা যাস্যামি অহং ভুবি।…’ (মার্কণ্ডেয়-পুরাণ-৯২/৪২-৪৩)
অর্থাৎ : অনন্তর বর্ষাকালে আত্মদেহ-সমুদ্ভূত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সমগ্র জগতের পুষ্টি-সরবরাহ করবো; তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবো।

     এখানে শাকম্ভরী নামের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, শাকাদি উদ্ভিদ দেবীগর্ভপ্রসূত। এ কারণেই দেবী শাককে আত্মদেহ-সমুদ্ভূত বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ দেবী বলতে এখানে বসুমাতা, পৃথিবী। বলা বাহুল্য, সংস্কৃত শাস্ত্রকাররা শাক-শব্দের দ্বারা কেবলমাত্র লতা জাতীয় বস্তুকেই বুঝতেন না– পত্র, মূল ইত্যাদি দশ প্রকার বস্তুকে বুঝতেন–

‘পত্রমূলকরীরাগ্রফলকাণ্ডাস্থিরূঢ়কাঃ।
ত্বক্ পুষ্পং কবকং চেতি শাকং দশবিধং স্মৃতম্ ।।’
অর্থাৎ : পত্র, মূল, করীর (মরুদেশস্থ বৃক্ষবিশেষ), অগ্র, ফল, কাণ্ড, অস্থিরূঢ়ক, ত্বক, পুষ্প ও কবক এই দশপ্রকার শাক স্মৃতিতে উক্ত হয়েছে।

আবার লক্ষ্মীতন্ত্রে শাকম্ভরী দেবীর সঙ্গে উমা, দুর্গা, পার্বতী, চণ্ডী, সতী ও কালিকেশা দেবীকে এক করে দেয়া হয়েছে–

‘শাকম্ভরী শতাক্ষী সা সৈব দুর্গা প্রকীর্তিতা।
উমা গৌরী সতী চণ্ডী কালিকেশা চ পার্বতী।।
শাকম্ভরী স্তুবন্ ধ্যায়ন্ শত্রু সংপূজয়ন্ নমন্ ।
অক্ষয়ামশ্নুতে ভূতিমন্নং পানং ভবান্তরে।।
অর্থাৎ : শতাক্ষী শাকম্ভরী জগতে দুর্গা, উমা, গৌরী, সতী, চণ্ডী, কালিকেশা ও পার্বতী নামে খ্যাত। শাকম্ভরীর স্তব, পূজা ও ধ্যান করলে অপর জন্মে অক্ষয় অন্ন পান ও ঐশ্বর্য লাভ হয়।

 

             যে-সুপ্রাচীন বিশ্বাস থেকে এই দেবী-নামের উদ্ভব হয়েছিলো তার একটি মূর্ত নিদর্শন হরপ্পা ধ্বংসস্তুপের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। হরপ্পায় এমন একটি অদ্ভূত সীল আবিষ্কৃত হয়েছে– তার এক-পিঠে উত্তানপদ দেবীমূর্তি, এই দেবীর গর্ভ থেকেই উদ্ভিদের উদ্ভব অঙ্কিত হয়েছে। অতএব অনুমান হয়, মার্কণ্ডেয়-পুরাণের এই শাকম্ভরী দেবী পুরাণের চেয়ে অনেক পুরনো; প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু-যুগেও তাঁর পরিচয় অস্পষ্ট নয়।
সিন্ধু-সভ্যতায় দেবী-রহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সম্পর্ক ইঙ্গিত যে শুধুমাত্র এই সীলটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ তা নয়। অন্যান্য অনেক সীলেও দেবীকে উদ্ভিদ-পরিবৃতা বা উদ্ভিদ-অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে অঙ্কিত করা হয়েছে। এ-জাতীয় নজির থেকেই সিন্ধু-সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন পরিচালনাকারী বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শাল অনুমান করেছিলেন, সিন্ধু-সভ্যতায় বৃক্ষ-উপাসনাও প্রচলিত ছিলো। এবং এ-বিষয়ে তিনি আরো একটি যুক্তি দিয়েছেন যে– উত্তরকালে ভারতবর্ষীয় ধর্ম-বিশ্বাসে বৃক্ষের অধিষ্ঠাত্রী বলতে সর্বত্রই দেবীর কল্পনা।

        এখানে উল্লেখ্য, ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের একটি সূক্তে (ঋগ্বেদ-১০/৭২) দেবী অদিতির বর্ণনাতেও এই কৌতুহলোদ্দীপক ‘উত্তানপদ’ শব্দ ও ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন–

‘দেবানাং যুগে প্রথমেহসতঃ সদজায়ত।
তদাশা অন্বজাযন্ত তদুত্তানপদস্পরি’।। (ঋক-১০/৭২/৩)
‘ভূর্জজ্ঞ উত্তানপদো ভুব আশা অজায়ন্ত।
অদিতের্দক্ষো অজায়ত দক্ষাদ্বদিতিঃ পরি’।। (ঋক-১০/৭২/৪)
অর্থাৎ :
দেবোৎপত্তির পূর্বতন কালে অবিদ্যমান হতে বিদ্যমান বস্তু উৎপন্ন হলো। পরে উত্তানপদ (উত্তানপদ বলতে বৃক্ষ : সায়ণ) হতে দিক সকল জন্ম গ্রহণ করলো (ঋক-১০/৭২/৩)। উত্তানপদ হতে পৃথিবী জন্মিল, পৃথিবী হতে দিক সকল জন্মিল, অদিতি হতে দক্ষ জন্মিলেন, দক্ষ হতে আবার অদিতি জন্মিলেন (ঋক-১০/৭২/৪)।

             আারো বেশ কিছু সূক্তের মতোই ঋগ্বেদের এই সূক্তটির রচয়িতা হলেন বৃহস্পতি ঋষি। তবে এখানে এই ঋকসমূহে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বেদ-পূর্ব বা তারচেয়েও অন্তত হাজার বছরের পুরনো সিন্ধু-ধর্মীয় কৃষিভিত্তিক উত্তানপদ-ধারণা ঋগ্বেদেও বহমান থাকা। এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে স্থায়ী হয়ে যাওয়া আর্য-সভ্যতায় পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিবেচনায় ধীরে ধীরে নিজেদের জীবন-ব্যবস্থাকে অবশ্যম্ভাবীরূপে কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থার সাথে খাপ-খাইয়ে নেয়া। এবং অবশ্যই তাদের পুরুষ-প্রাধান্য বজায় রেখে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, জন মার্শাল যে সিন্ধু-সভ্যতার অন্যতম উপাদান হিসেবে বৃক্ষ-উপাসনার কথা উল্লেখ করেছেন, এই তথাকথিত বৃক্ষ-উপাসনাকে কি সিন্ধু-ধর্মের কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে, না কি একে শক্তি-সাধনার কোন অভিব্যক্তি বা লক্ষণ মনে করা যুক্তিসঙ্গত? এক্ষেত্রে পরবর্তী কালের ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসকে যদি এ-প্রশ্নের উপর আলোকপাত করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, পরবর্তী কালের শক্তি-সাধনার বিশেষ অঙ্গই হলো উদ্ভিদ-অধিষ্ঠাত্রী বা শস্যদেবীর উপাসনা। কারণ–
‘এ-বিষয়ে আধনিক বিদ্বানেরা ইতিপূর্বেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন : যাঁর নাম শাকম্ভরী তাঁরই নাম দুর্গা। তাই ফসলের সময়টিতেই দুর্গোৎসবের আয়োজন। কিন্তু দুর্গা-মূর্তি বলতে তো দশভূজা মহিষমর্দিনীর রূপ। কিন্তু শ্রীযুক্ত চন্দ দেখাচ্ছেন, এ-রূপ তুলনায় অনেক অর্বাচীন : প্রচলিত পৌরাণিক উপাখ্যান অনুসারে রাবণ-বধের বরপ্রার্থনায় রামচন্দ্র ওই মহিষ-মর্দিনীর উপাসনা করেছিলেন। কিন্তু বাল্মীকির মূল রামায়ণে এ-উপাখ্যান নেই; তার বদলে রামচন্দ্র সেখানে সূর্যের কাছেই বর-প্রার্থনা করছেন। অতএব এই মহিষ-মর্দিনী রূপটি অনেক পরবর্তীকালের; এবং পরবর্তী কালের বলেই (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে) “এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজার প্রতিমা গড়াইয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বৎসর পূর্বে ঠিক এমনভাবে প্রতিমা বাংলা কারিগর গড়িত না।… কারণ, আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময় যে-প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডিমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে-উৎসব করিয়া থাকি সেই উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণঘটের; দেবীকে আহ্বান করিতে হয় ‘যন্ত্রে’ ও ঘটে।” ঘটের উপর নবপত্রিকা স্থাপন করতে হয় এবং দুর্গাপূজার প্রধানতম অনুষ্ঠান এই নবপত্রিকাকে কেন্দ্র করেই। আবার, ওই নয়টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটিরই অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে এক-একটি দেবীর কল্পনা। তা হলে দুর্গাপূজার– অর্থাৎ, পরবর্তী ভারতবর্ষীয় ধর্মে মাতৃপূজা সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিব্যক্তিটির– ক্ষেত্রেও দেবীরহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সুস্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়। শ্রীযুক্ত চন্দ বলেছেন, এই কারণেই শাক্তরা প্রত্যুষে কুলবৃক্ষ বা কুলতরুকে প্রণাম করেন এবং আদি-পর্যায়ে শক্তি বা দুর্গা শস্যদেবী হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিলেন বলেই তাঁর নামান্তর অন্নদা বা অন্নপূর্ণা।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭০)

            তার মানে, বৃক্ষ-উপাসনাকে সিন্ধু-ধর্মের কোন এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে বরং এ-কথা অনুমান করাই যুক্তিসঙ্গত হবে যে, সুপ্রাচীন কাল থেকে ওই তথাকথিত বৃক্ষ-উপাসনা শাক্ত-ধর্মেরই একটি প্রধানতম উপাদান ছিলো। এখন প্রশ্ন হলো, শক্তি-সাধনা বা মাতৃ-উপাসনার সঙ্গে শস্য জগতের বা উদ্ভিদ-জগতের এ জাতীয় সম্পর্ক কেন? নৃতত্ত্ববিদেরা এ-প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন–
‘পৃথিবী বা প্রকৃতির ফলপ্রসূতামূলক কামনা থেকেই বসুমাতা বা আদ্যা-শক্তি বা জগদম্বা পরিকল্পনার উদ্ভব। অর্থাৎ, এই বসুমাতা-কল্পনার উৎসে আছে এক আদিম বিশ্বাস, সে-বিশ্বাস অনুসারে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা ও মানবীয় ফলপ্রসূতা সমগোত্রীয়। তাই শস্যদায়িনী প্রকৃতিও সন্তানদায়িনী মাতার অনুরূপ– প্রকৃতিও মাতৃরূপে পরিকল্পিত। অতএব প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও মানবীয় প্রজননের সংস্পর্শ বা অনুকরণের সঙ্গে সংযুক্ত। নৃতত্ত্ববিদদের পরিভাষায় এই আদিম বিশ্বাসের নাম ‘ফার্টিলিটি ম্যাজিক’– উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে দেশে দেশান্তরে যে-সব বহুবিধ আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত হয়েছে, নৃতত্ত্ববিদদের রচনায় তার বহুল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭১)

              এ প্রেক্ষিতে ড. অতুল সুরের পর্যবেক্ষণটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ গ্রন্থে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন–
‘বাঙলার সঙ্গে সিন্ধুসভ্যতার ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে লোথালে ধান্যের ব্যবহার। চাউল বাঙালীর প্রিয় ও প্রধান খাদ্য। ধান্যের চাষ যে বঙ্গোপসাগরের আশপাশের কোন স্থানে উদ্ভূত হয়েছিল, এ সম্বন্ধে পণ্ডিতমহলে কোন দ্বিমত নেই। কারলো চিপোলো তাঁর ‘দি ইকনমিক হিস্টরি অভ্ ওয়ার্লড পপুলেশন’ গ্রন্থে এই মতই প্রকাশ করেছেণ এবং বাঙলাদেশকে নির্দেশ করেছেন।’
‘মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা প্রভৃতি নগরে মাতৃদেবীর পূজার যে ব্যাপক প্রচলন ছিল তা মৃন্ময়ী মাতৃকাদেবীর মূর্তিসমূহ থেকে প্রকাশ পায়। বাঙলাই মাতৃদেবীর পূজার লীলাকেন্দ্র। —মাতৃদেবীর পূজার উদ্ভব নবোপলীয় যুগে কৃষির সূচনার সঙ্গে ঘটেছিল। বাঙলায় নবোপলীয় বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ধান্যের চাষ নিয়ে। মনে হয়, ধান্যের চাষের সঙ্গে মাতৃদেবীর পূজা বাঙলাতেই শুরু হয়েছিল। ধান্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন লক্ষ্মী। লক্ষ্মীপূজার অপর নাম খন্দপূজা। খন্দ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ফসলাদি। লক্ষ্মীপূজা যে অতি প্রাচীনকাল থেকেই অনুসৃত হয়ে আসছে, তা লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি থেকেই প্রকাশ পায়। সূচনায় মাতৃদেবীর পূজা যে ফসলাদির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিল তা সিন্ধসভ্যতার কেন্দ্রে (হরপ্পায়) প্রাপ্ত এক সীলের ওপর খোদিত নারীমূর্তি থেকে প্রকাশ পায়। এই নারীমূর্তির যোনি-মুখ থেকে নির্গত হয়েছে পল্লবিত ছোট চারা-গাছ, লতা-পাতা, গুল্ম ইত্যাদি। ষাট বছর পূর্বে আমি আমার ‘প্রি-অ্যারিয়ান এলিমেন্টস্ ইন ইন্ডিয়ান কালচার’ গ্রন্থে বলেছিলাম যে মাতৃদেবী আদিতে যে শস্যাদির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তা তাঁর অন্নপূর্ণা, শাকম্ভরী ইত্যাদি অভিধা থেকেই প্রকাশ পায়। অবশ্য অন্নপূর্ণা নামটি সংস্কৃত। কিন্তু আদিতে এই শব্দটির কী রূপ ছিল, তা আমরা জানি না। তবে প্রাচীন সুমেরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘এ-নান্না’ নামের সঙ্গে এর যথেষ্ট নৈকট্য আছে। (তুলনা করুন হিংলাজের অধিষ্ঠাত্রী ‘নানা’ দেবী)।’
‘মাত্র নামের সাদৃশ্য নয়। সুমের ও ভারতের মাতৃদেবীর কল্পনার মধ্যে এক অসাধারণ সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। এই উভয় দেশের মাতৃদেবীর মূলগত সাদৃশ্য হচ্ছে– (১) উভয়দেশেই মাতৃদেবী ‘কুমারী’ হিসাবে কল্পিত হয়েছিলেন, অথচ তাঁদের ভর্তা ছিল। বোধ হয়, মহাষ্টমীর দিন বাঙলাদেশে ‘কুমারী’ পূজা তারই স্মারক। (২) উভয়দেশেই মাতৃদেবীর বাহন ‘সিংহ’ ও তাঁর ভর্তার বাহন ‘বলীবর্দ’। (৩) উভয় দেশেই মাতৃদেবীর নারীসুলভ গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি পুরুষোচিত কর্ম, যথা যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। (৪) প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার লিপিসমূহে তাঁকে বারম্বার ‘সৈন্যবাহিনীর নেত্রী’ বলা হয়েছে। আমাদের দেশের ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বিভাগেও বলা হয়েছে যে দেবতারা যখন অসুরগণ কর্তৃক পরাহত হয়েছিলেন, তখন তাঁরা মহিষাসুরকে বধ করবার জন্য দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। (৫) মেসোপটেমিয়ার মাতৃদেবী পর্বতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট সেজন্য তাঁকে ‘পর্বতের দেবী’ বলা হত। ভারতে মাতৃদেবীর পার্বতী, হৈমবতী, বিন্ধ্যবাসিনী প্রভৃতি নাম তাই সূচিত করে। (৬) সুমেরে মাতৃদেবীর নাম ছিল ‘এ-নান্না’; সে নাম হিংলাজে ‘নানা’দেবীর নামে এখনও বর্তমান। (৭) সুমেরীয়দের পরিধেয় বসন ‘কৌনক’ তালপাতা দিয়ে তৈরী করা হত; প্রাচীন ভারতে দেশজ লোকদের পাতা ও ‘বল্কল’ পরিধান ও পর্ণশবরীর (দেবীর এক নাম) নাম আমাদের তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। (৮) দু’দেশেই ধর্মীয় গণিকাবৃত্তি (বা সাময়িকভাবে সতীত্বের বিসর্জন দেওয়া) প্রথা প্রচলিত ছিল। পশ্চিম এসিয়ায় এটার উদ্ভব হয়েছিল ঐন্দ্রজালিক (mimetic or homoeopathic) পদ্ধতি থেকে। সধবা ও অনূঢ়া উভয়দেশীর মেয়েরাই দেবীর প্রসন্নতালাভের জন্য সাময়িকভাবে তাদের সতীত্বের বিসর্জন দিত। বলা বাহুল্য, ভারতে এটা বামাচারী তন্ত্রধর্মের বৈশিষ্ট্য। সব তন্ত্রেই বলা হয়েছে মৈথুন ছাড়া কুলপূজা (তন্ত্র অনুযায়ী দেবীর পূজা) হয় না। যেমন, ‘গুপ্তসংহিতা’য় বলা হয়েছে, ‘কুলশক্তিম বিনা দেবী যো যপেত স তু পামর’। আবার ‘নিরুত্তরতন্ত্র’-এ বলা হয়েছে ‘বিবাহিতা পতিত্যাগে দুষণম্ ন কুলার্চনে’। তার মানে কুলপূজার জন্য সধবা স্ত্রীলোক যদি তার পতি ত্যাগ করে, তবে তার কোন দোষ হয় না। (৯) উভয়দেশেই দেবীপূজার সঙ্গে নরবলি প্রচলিত ছিল। (কালিকাপুরাণ, ৭ অধ্যায়)।’- (ড. অতুল সুর / ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, পৃষ্ঠা-৪১-৪৩)

             দেবীপূজায় তন্ত্রবিধি : এখান যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় তা হলো, উপরে উল্লিখিত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে ‘যন্ত্র’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে ‘দুর্গোৎসবের সময় যে-প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডিমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে-উৎসব করিয়া থাকি সেই উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণঘটের; দেবীকে আহ্বান করিতে হয় ‘যন্ত্রে’ ও ঘটে।’ কেননা ‘যন্ত্র’ শব্দটি তন্ত্র-সাধনার পক্ষে অবিচ্ছেদ্য একটি উপাদান। তন্ত্রে একজাতীয় চিত্রের ব্যবহার আছে, সেগুলিকে যন্ত্র বলে–
‘যন্ত্র সাধারণত দুই প্রকার– পূজাযন্ত্র ও ধারণ-যন্ত্র। পূজাযন্ত্রে যে দেবতার পূজা করিতে হইবে, সেই দেবতার যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া তাহাতে পূজা করিতে হয়। ঐরূপ যন্ত্রকে পূজাযন্ত্র বলা হয়।
যে যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া ধারণ করা হয় তাহার নাম ধারণ-যন্ত্র। এই ধারণ-যন্ত্র ভূর্জপত্রে অঙ্কিত করিয়া ধারণ করিতে হয়।…
তন্ত্রে লিখিত আছে,– যন্ত্রে দেবতার অধিষ্ঠান হইয়া থাকে, এইজন্য যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া দেবতার পূজা করিতে হয়। (বিশ্বকোষ-১৫/৪৫)

গন্ধর্বতন্ত্রে বলা হয়েছে–

‘বিনা যন্ত্রেণ চেৎ পূজা দেবতা ন প্রসীদতি। (গন্ধর্বতন্ত্র-৫/১)
অর্থাৎ : যন্ত্র ছাড়া পূজা করলে দেবতা সন্তুষ্ট হন না।

              তবে মাতৃকাভেদ তন্ত্রের মতে, যেখানে প্রতিমার পূজা হয় সেখানে যন্ত্র অঙ্কনের কোনো প্রয়োজন নেই। যন্ত্রও প্রতীক, প্রতিমাও প্রতীক, তাই একসঙ্গে দুটি প্রতীক অনাবশ্যক বলেই হয়তো মাতৃকাভেদ তন্ত্রে এমন বিধান দেয়া হয়েছে। তবে তন্ত্রাভিজ্ঞদের মতে অবশ্য যন্ত্র শুধু দেবীর প্রতীক নয়, তা শক্তিলেখও বটে। অগ্রসর সাধকের জন্যেই যন্ত্রপূজা। প্রত্যেক দেবীর আলাদা আলাদা যন্ত্র থাকলেও ভূপুর এবং পদ্ম সকল যন্ত্রেরই বৈশিষ্ট্য। তন্ত্র ও পুরাণ মতে পদ্ম হলো সৃষ্টির প্রতীক। কাজেই সৃষ্টির আদি কারণ স্বরূপিণী দেবীর পূজার জন্য যন্ত্র উৎকৃষ্ট আধার।
কখনো কখনো যন্ত্রের পরিবর্তে বিভিন্ন মণ্ডলেও দেবীর পূজা করার বিধান শাস্ত্রে পরিলক্ষিত হয়। কুলার্ণব তন্ত্রে তাই বলা হয়েছে–

‘মণ্ডলেন বিনা পূজা নিষ্ফলা কথিতা প্রিয়ে।
তস্মান্মণ্ডলমালিখ্য বিধিবত্তত্র পূজয়েং।। (কুলার্ণবতন্ত্র-৬/২০)
অর্থাৎ : মণ্ডল ছাড়া পূজা নিষ্ফল হয় বলে যথানিয়মে মণ্ডল এঁকে পূজা করতে হবে।

                 দূর্গাপূজা মূলত পৌরাণিক পূজা হলেও দেবীপূজার সাধারণ নিয়মানুসারে এখানেও যন্ত্রে বা মণ্ডলে পূজার ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। আর তন্ত্রমতে এই যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র। ‘কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রগুলি যে পূজা, দেবতা ইত্যাদি আধ্যাত্মিক বিষয়ের চেয়ে প্রাচীনতর,– অর্থাৎ, পূজা ও দেবতাদির বিষয় পরে কৃত্রিমভাবে যন্ত্রগুলির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে,– যন্ত্রগুলিকে ভালো করে পরীক্ষা করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমত, মোটের উপর একই চিত্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেবদেবীর সম্পর্ক বা ঐক্য পরিকল্পিত হয়েছে (বৃহৎতন্ত্রসারে বিভিন্ন যন্ত্রের চিত্র দ্রষ্টব্য)। তার থেকেই বোঝা যায়, উক্ত সম্পর্কাদির চেয়েও যন্ত্রগুলি প্রাচীনতর। দ্বিতীয়ত, বহু যন্ত্রের সঙ্গেই যন্ত্রসংযুক্ত দেবতাটির স্পষ্ট বিরোধ দেখা যায়। আধুনিক তান্ত্রিক গ্রন্থাদিতে কয়েকটি প্রসিদ্ধ যন্ত্রের নাম হলো, গণেশযন্ত্র, শ্রীরামযন্ত্র, নৃসিংহযন্ত্র, গোপালযন্ত্র, কৃষ্ণযন্ত্র, শিবযন্ত্র, মৃত্যুঞ্জয়যন্ত্র ইত্যাদি (বৃহৎতন্ত্রসার দ্রষ্টব্য)। উল্লেখিত দেবতাগুলি সকলেই পুরুষ। অথচ, যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪০২)

                তান্ত্রিক যন্ত্রগুলি যে নারী-জননাঙ্গের প্রতীকমাত্র, এ-বিষয়ে শ্রীচক্রপূজা প্রসঙ্গে স্যার ভান্ডারকরের বক্তব্য হলো–
‘It consists in the worship of picture of the female organ drawn in the centre of another consisting of a representation of nine such organs, the whole of which forms the `Sricakra’….The pictures are drawn on a`bhurja’ leaf or a piece of silken cloth or a gold leaf.’- (বিশ্বকোষ-১৫/৫৪৫)

             তার মানে, এভাবে নারী-জননাঙ্গের চিত্র অঙ্কন করবার পিছনে এক আদিম বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়; সেই বিশ্বাস হলো নারী-জননাঙ্গের উপরই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও নির্ভরশীল। এ-বিষয়ে তন্ত্র-সাধনার আভ্যন্তরীণ তথ্যটুকুও যাচাই করে নেয়া যায়। যেমন, আদিতে দুর্গা যে শস্য-জননী ছিলেন এবং দুর্গোৎসব যে শস্য-উৎসবই ছিলো– সে-বিষয়ে শ্রীযুক্ত চন্দের বক্তব্য থেকেই জানতে পেরেছি আমরা। প্রমাণ হিসেবে তিনি কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, দুর্গোৎসব হলো শারদোৎসব– ফসল পাকবার ঋতু তখন। দ্বিতীয়ত, শাকম্ভরী, অন্নপূর্ণা প্রভৃতি দুর্গার নাম। তৃতীয়ত, দুর্গাপূজায় নবপত্রিকার গুরুত্ব। শ্রীযুক্ত চন্দের এই প্রমাণগুলি অসামান্য মূল্যবান নিঃসন্দেহে। তার সাথে প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিটি স্মরণ করতে পারি–
‘আমাদের দেশে একটা রীতি প্রচলিত আছে যে, সিদ্ধ সাধকগণ জপ-যজ্ঞের ফলে যে ধ্যানগম্য মূর্ত্তি দর্শন করিয়া থাকেন, যাহার মানস পূজা করিয়া কৃতার্থ হন, স্তব স্তোত্রের ইশারায় তাঁহারা সেই রূপের বর্ণনা লোকসাধারণের শ্রবণগোচর করিয়া দেন। সাধারণ পূজকে সাধকের মুখ-নিঃসৃত স্তব শুনিয়া একটা রূপের, একটা প্রতিমার কল্পনা করিয়া লয়, এবং ধাতু, পাষাণ বা মাটির মূর্ত্তি গড়িয়া তাহারই প্রকাশ্যে পূজা অর্চ্চনা করে। লোকহিতের জন্য, সমাজে একটা ভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি অনুসারে বাঙ্গালায় মূর্ত্তিপূজার প্রচলন হইয়াছে। এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজা দুর্গার প্রতিমা গড়িয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বর্ষ পূর্বে ঠিক এমনভাবে প্রতিমা বাংলার কারিকর গড়িত না। গোড়ায় যখন সিংহবাহিনীর মৃন্ময়ী মূর্তির পূজা এ দেশে প্রচলিত হয়, তখন কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী, কেহই ছিলেন না, তখন একা সিংহবাহিনী মহিষাসুর মথন করিতেছেন। সেকালের সিংহের চেহারা আর এক রকমের ছিল, মহিষাসুরও আজকালকার চোরা অসুরের মতন ছিল না। যাহার যেমন অভিরুচি হইয়াছে, যেমন শখ হইয়াছে, ধ্যানে যে যখন নতুন কিছু দেখতে পাইয়াছে, তখন সে তাহাই প্রতিমার সঙ্গে বসাইয়া দিয়াছে। কারণ, আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময়ে যে প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডীমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে উৎসব করিয়া থাকি, সে উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণ ঘটের, দেবীকে আহ্বান করিতে হয় যন্ত্রে ও ঘটে; কেন না, ঘট ঐখানে পূজকের দেহঘটের অনুকল্প মাত্র। প্রতিমা বাহ্য শোভার জন্য রাখা হয় এবং লোকসাধারণের তুষ্টির জন্য উপার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সামান্য একটু পূজা করা হয়। কালীপূজাতেও ঐ একই ব্যাপার ঘটে। পঞ্চাশৎবর্ণরূপিণী মুণ্ডমালিনী কালীকে আরাধনা করিতে হয় বর্ণে বর্ণে, চক্রে চক্রে; মন্ত্রের উপর হোম করিতে হয়, মন্ত্রের উপর কালিকাশক্তির আহ্বান করিতে হয়। বাহিরের মূর্ত্তি অবলম্বন মাত্র, লোক দেখাইবার ছবি মাত্র।’ (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাবলী-২/২৬৫)

                তাহলে মূল কথা দাঁড়াচ্ছে, দুর্গাপূজার আদি-অকৃত্রিম রূপটিকে চিনতে হলে পুত্রকন্যাপরিবৃতা ওই দশভূজাকে বাদ দিয়ে যন্ত্র ও ঘটের উপরই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা প্রয়োজন। এর বর্ণনায় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোকায়ত দর্শন’ (পৃষ্ঠা-৪০৪-৯) এ বর্ণিত তথ্যমূলক দীর্ঘ বিবৃতির সহায়তা নিতে পারি–

              ‘দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ ওই যন্ত্র ও ঘটের দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা যাক। যন্ত্রটির নাম সর্বতোভদ্রমণ্ডল। এটি তন্ত্রের একটি বিখ্যাত যন্ত্র :
এই চিত্রটি আঁকবার নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে (বৃহৎতন্ত্রসার: ৭৪-৫)–

ষটত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেৎ পদ্মং সুলক্ষণম্ ।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা।।
দ্বারশোতোপশোভাস্রাং শিষ্টাভ্যাং পরিকল্পয়েৎ।
শাস্ত্রোক্তবিধিনা মন্ত্রী ততঃ পদ্মং সমালিখেৎ।।
পদ্মক্ষেত্রস্য সংত্যজ্য দ্বাদশাংশং বিহঃ সুধীঃ।
তন্মধ্যং বিভজেদ্বৃত্তৈস্ত্রিভিঃ সমবিভাগতঃ।।
আদ্যং স্যাৎ কর্ণিকাস্থানং কেশরাণাং দ্বিতীয়কম্ ।
তৃতীয়ং তত্র পত্রাণাং মুক্তাংশেন দলাগ্রকম্ ।।
বাহ্যবৃত্তান্তরালস্য মানেন বিধিনা সুধীঃ।
নিধায় কেশরাগ্রেষু পরিতোহর্ধনিশাকরান্ ।।
লিখিত্বা সার্দ্ধসংস্থানি তত্র সূত্রাণি পাতয়েৎ।
দলাগ্রাণাঞ্চ যন্মানং তন্মানাৎ বৃত্তমালিখেং।।
তদন্তরালং তন্মধ্যসূত্রস্যোভয়তঃ সুধীঃ।
আলিখেদ্বাহ্যহন্তেন দলাগ্রাণি সমন্ততঃ।।
দলমূলেষু যুগশঃ কেশরাণি প্রকল্পয়েৎ।
এতৎ সাধারণং প্রোক্তং পঙ্কজং তন্ত্রবেদিভিঃ।।
———————————————
অঙ্গুলোৎসেধবিস্তারাঃ সীমারেখাঃ নিতাঃ শুভাঃ।
কর্ণিকাং পীতবর্ণেন কেশরাণ্যরুণেন চ।।
শুক্ল-বর্ণানি পত্রাণি তৎসন্ধীন্ শ্যামলেন চ।
রজসা রঞ্জয়েন্মন্ত্রী যদ্বা পীতৈব কর্ণিকা।।
কেশরাঃ পীতরক্তাঃ স্যুররুণানি দলানি চ।
সন্ধয়ঃ কৃষ্ণবর্ণাঃ স্যুঃ সিতেনাপ্যসিতেন বা।।
রঞ্জয়েৎ পীঠগর্ভাণি পাদাঃ স্যুররুণপ্রভাঃ।
গাত্রাণি তস্য শুক্লানি বীথিষু চ চতসৃষু।।
আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্ ।
বর্ণৈনানাবিধৈশ্চিত্রৈঃ সর্ব্বদৃষ্টিমনোহরাম্ ।।
দ্বারানি শ্বেতবর্ণানি শোভা রক্তাঃ সমীরিতাঃ।
উপশোভাঃ পীতবর্ণাঃ কোণান্যসিতভানি চ।।
তিস্রো রেখা বহিঃ কার্য্যাঃ সিতরক্তাসিতাঃ ক্রমাৎ।
মণ্ডলং সর্ব্বতোভদ্রমেতৎ সাধারণং মতম্ ।।
অর্থাৎ :
তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে। পরে অবশিষ্ট দুই পংক্তি দ্বারা মধ্যস্থলে দ্বার, উভয় পার্শ্বে দুইটি করিয়া শোভা এবং শোভাদ্বয়ের পার্শ্বে দুইটি করিয়া উপশোভা এবং পরে কোণ প্রস্তুত করিতে হইবে। যে ৩৬টি ঘর লইয়া পদ্ম অঙ্কিত, তাহার দ্বাদশটি ঘর বাহিওে পৃথক রাখিয়া তন্মধ্যস্থ ২৪টি ঘরকে ৩টি বৃত্ত দ্বারা সমভাগে বিভক্ত করিবে। উহার প্রথম বৃত্ত কর্ণিকা, দ্বিতীয় বৃত্ত কেশর ও তৃতীয়টি পদ্মপত্র। যে দ্বাদশাংশ বাহিরে রাখা হইয়াছে, উহা পত্রের অগ্র। তৃতীয় বৃত্তের মধ্যস্থ স্থানের পরিমাণে পদ্মপত্র রচনা করিবে। কেশর সমূহের অগ্রভাগে অর্ধচন্দ্র অঙ্কিত করিবে। অর্ধচন্দ্রাকৃতি রেখা-সমূহের মধ্যভাগে সূত্রপাত করত পদ্মপত্রের অগ্রগুলির সমান মাপে বৃত্তরেখা আঁকিবে।
মধ্যস্থ সূত্রপাতের দুই পার্শ্বে স্থির হস্তে দলাগ্র আঁকিবে। দলমূলে দুই দুইটি করিয়া কেশর করিতে হয়। ইহাকেই তন্ত্রবেত্তারা সাধারণ পদ্ম কহেন।…
এক অঙ্গুলি উৎসেধ অর্থাৎ বেধ পরিমাণে শুভ্রবর্ণদ্বারা সীমারেখা সকল চিত্রিত করিয়া পীতবর্ণদ্বারা কর্ণিকা, রক্তবর্ণ গুণ্ডিকাদ্বারা কেশর ও শুক্লবর্ণদ্বারা পত্রসকল রঞ্জিত করিয়া শ্যামবর্ণে সমস্ত সন্ধিস্থানে চিত্রিত করিবে। প্রকারান্তরে যথা– কর্ণিকা পীতবর্ণ, কেশরসকল পীত রক্তবর্ণ, পত্রসকল রক্তবর্ণ, সন্ধি কৃষ্ণবর্ণ, পীঠগর্ভ শুক্লবর্ণ কিংবা কৃষ্ণবর্ণ, পীঠপাদ রক্তবর্ণ ও পীঠগাত্র শুক্লবর্ণ করিয়া বীথিচতুষ্টয়ে পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে। এই কল্পলতিকা দর্শনমনোহর করিবে। দ্বারসকল শুক্লবর্ণ, শোভা রক্তবর্ণ, উপশোভা পীতবর্ণ ও কোণ চতুষ্টয় কৃষ্ণবর্ণ করিবে। মন্ডলের বহির্দেশে শ্বেত রক্ত ও কৃষ্ণবর্ণ তিনটি রেখা চিত্রিত করিবে। এই প্রকারে সাধারণ সর্বতোভদ্রমণ্ডল নির্মাণ করিতে হইবে।

            এতোখানি জ্যামিতিক নিষ্ঠা নিয়ে, শোভা এবং উপশোভায় বিভূষিত করে, এই যে সর্বতোভদ্রমণ্ডলটি আঁকবার নির্দেশ পাওয়া গেলো, এর মূল কথা কী? তন্ত্রবেত্তারা জানেন, এর মূল কথা হলো অষ্টদলপদ্ম ও বীথিকা:
ষটত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেৎ পদ্মং সুলক্ষণম্ ।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা।।
(অর্থাৎ : তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে।)

সুলক্ষণ পদ্ম এবং বীথিকা; ওই বীথিকার নাম কল্পলতিকা :

আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্ ।
(অর্থাৎ : পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে।)

             প্রথমে মনে রাখা দরকার, তন্ত্রে এই পদ্ম এবং বীথিকার গুরুত্ব কতোখানি। কেননা, শুধুমাত্র সর্বতোভদ্রমণ্ডল নয়, প্রায় সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রেরই মূল বিষয়বস্তু বলতে এই পদ্ম এবং বীথিকাই। তান্ত্রিক যন্ত্রের ছবিগুলিকে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে খুঁটিনাটির তারতম্য থাকলেও অষ্টদলপদ্ম এবং বীথিকাই সমস্ত চিত্রের মূল বিষয়বস্তু।
অতএব, যন্ত্র-প্রসঙ্গে প্রধানতম প্রশ্ন ওঠে, ওই পদ্ম বা অষ্টদলপদ্মের প্রকৃত তাৎপর্য কী ? বাংলার পূজাপদ্ধতি এবং তন্ত্রেও যন্ত্র-সংকেতের সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় যাঁর আছে তিনিই জানেন, তন্ত্রে পদ্ম বা অষ্টদলপদ্ম নারী-জননাঙ্গের প্রতীক মাত্র। অনেক সময় তান্ত্রিক রচনায় পদ্ম শব্দটিকে একেবারে সোজাসুজি সেই অর্থেই গ্রহণ করা হয়। যথা :

‘পদ্মমধ্যে গতে শুক্রে সন্ততিস্তেন জায়তে।।’ (বিশ্বকোষ-৭/৫৪১)
(অর্থাৎ, পদ্মমধ্যে শুক্রের মিলনে সন্ততির জন্ম।)

              তন্ত্রে ‘পদ্ম’-শব্দের এই জাতীয় ব্যবহার একটুও দুর্লভ নয়। বৌদ্ধতন্ত্র প্রসঙ্গে আধুনিক বিশেষজ্ঞ বলছেন (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪০৯)–
‘Vajra’ (with the variant `mani’) is a decent or mystic phrase for `linga’, the male organ, just as `padma’, lotus, is the literary rendering of `bhaga’ or `yoni’.’
অর্থাৎ : বজ্র (বা মণি) শব্দ পুরুষ-অঙ্গবাচক, যেমন পদ্ম শব্দ হলো ভগ বা নারী-জননাঙ্গের সাহিত্যিক প্রতিশব্দ।

             তাহলে পদ্মের অর্থ নারীজননাঙ্গই। এই পদ্মই হলো সর্বতোভদ্রমণ্ডলের– তথা সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রের– মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু সেই সঙ্গেই লক্ষ্য করা দরকার, তান্ত্রিক যন্ত্রগুলিতে শুধুমাত্র পদ্মের চিত্র নয়; পদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে বীথিকার সম্পর্ক কী? তান্ত্রিক যন্ত্র প্রসঙ্গে এই প্রশ্নটি স্বভাবতই সবচেয়ে মৌলিক। যুক্তি অনুসারে, এর মূলে আছে এক আদিম বিশ্বাস : যে-বিশ্বাস থেকে দেবীর নাম হয়েছিলো শাকম্ভরী, কিংবা, যে-বিশ্বাসের মূর্ত পরিচয় হরপ্পার ওই অত্যাশ্চর্য সীলটিতে টিকে আছে। এবং, এইভাবে প্রাকৃতিক উর্বরতার সঙ্গে মানবীর উর্বরতার সংযোগ কল্পনা করা হয়েছে বলেই তন্ত্রে নারী-জননাঙ্গকে উদ্ভিদ-বাচক নাম (লতা) দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো।
ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে জানা যায়– ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার বিশেষ বিশেষ ফুলকেই যন্ত্র হিসাবে ধরে নিয়ে তার উপর দেবীপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। ঐ ফুলগুলির অনেকগুলির ক্ষেত্রেই বাহ্যত দেখা যায় যোনি আকৃতি অথবা স্ত্রীপুং মিলনের আকৃতি। জগজ্জননীর পূজার আধার হয়েছে তাই ঐ সব পুষ্প। এ ফুলগুলিকে তান্ত্রিক মহলে বলা হয় যন্ত্রপুষ্প। শাস্ত্রকারের উক্তি হলো–

“যত্রাপরাজিতা পুষ্পং জবাপুষ্পঞ্চ বিদ্যতে।
করবীরে শুক্লরক্তে দ্রোণঞ্চ যত্র তিষ্ঠতি।
তত্র দেবী বসেন্নিতাং তদ্ যন্ত্রে চণ্ডিকার্চনম্ ।।”
( যেখানে অপরাজিতা, জবা, শ্বেতকরবী, রক্তকরবী ও দ্রোণপুষ্প থাকে, সেখানে চণ্ডিকাদেবী নিত্য বাস করেন। তাই এইসব যন্ত্রপুষ্পে দেবীর পূজা করবে।)

              এই তালিকায় পদ্মের নাম করা হয়নি। এর কারণ পদ্মকে শাস্ত্রকাররা স্বাভাবিক যন্ত্র বলে থাকেন।’- (ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় / দুর্গামাহাত্ম্য ও পূজাপ্রসঙ্গ)

              এই আদিম বিশ্বাসটির দিক থেকে শক্তি-সাধনার তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তন্ত্রমতে নারী-জননাঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যেমন- ‘স্ত্রীভগং পূজনাধারঃ’ অর্থাৎ, ‘স্ত্রীভগ বা নারীযোনি হচ্ছে সকল উপাসনার আধার বা উৎস’; এজাতীয় কথা তন্ত্রে বহুবার পাওয়া যায়। তন্ত্রের একটি প্রসিদ্ধ সাধনার নামই হলো ‘ভগযাগ’। এছাড়া তন্ত্র সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের প্রচুর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কেননা, তন্ত্র-সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের একটি পারিভাষিক অর্থ আছে। সে-অর্থ হলো, নারী-জননাঙ্গ। তন্ত্র-সাধনায় অন্যান্য গুহ্য সাধনার মতো আরেকটি গুহ্য ও কঠিন সাধনার নাম লতা-সাধনা। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলছেন–
‘সে সাধনা অতি কঠোর, অতি দুরারাধ্য। শিব বলিয়াছেন যে, “ হে দেবি, তোমার মত নারী এবং আমার মতন পুরুষ হইলেই এই খেলা খেলিতে পারে। বরং ফণী ধরিয়া বিষভক্ষণ করা সহজ, বরং সিংহশার্দূলের সহিত যুদ্ধ করা সহজ, কিন্তু লতা-সাধনা অতি কঠিন, অতি কঠোর। যে পুরুষের নারীরূপ দেখিয়া কামমোহ উৎপন্ন হইতে পারে, যে রতিজন্য সুখাস্বাদে বিভোর হয়, সে যেন এমন কাজ না করে।” এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করিয়া শিব আবার বলিতেছেন,– সমস্ত জগৎকে স্ত্রীময় ভাবিতে হইবে। শক্তিই শিব, শিবই শক্তি– এই সমস্ত জগৎই শক্তির স্বরূপ। যিনি এই নিখিল জগৎ শক্তিরূপে দর্শন করিতে না পারেন, তিনি যে এ সাধনায় প্রবৃত্ত না হন।’- (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী-২/২৫১)

গুপ্তসাধনতন্ত্রের প্রথম পটলেও দেখি মহেশ্বর শিব দেবী পার্ব্বতিকে বলছেন (গুপ্তসাধনতন্ত্র-১/৮-৯)–

কিঞ্চিন্ময়া তু চাপল্যাৎ কথায়ামি শৃণুষ্ব মে।
শক্তিমুলং জগৎ সর্ব্বং শক্তিমুলং পরন্তপঃ।। ৮
শক্তিমাশ্রিত্য নিবসেদ্ যত্র কুত্রাশ্রমে বসন্ ।
সাধকস্যার্চ্চিতাং শক্তিং সাধকজ্ঞানকারিণীম্ ।। ৯
অর্থাৎ :
দেবি! তোমার নিকট কুলাচার মাহাত্ম্য বর্ণন করা আমার চপলতা মাত্র। তথাপি তোমার নিকট যথাশক্তি কিঞ্চিন্মাত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। শক্তিই অনন্ত জগতের আদিকারণ এবং শক্তিই সমস্ত তপস্যার মূল। ৮।। সাধকগণ শক্তিকে আশ্রয় করিয়া যে কোন আশ্রমে বাস করুক না কেন, তাহাতেই তাহারা সিদ্ধিলাভ করিতে পারে। সাধকগণ শক্তির অর্চনা করিলেই সেই শক্তি সাধকের জ্ঞান প্রদান করেন। ৯।।

          এই কুলশক্তির অর্চনা করতে প্রয়োজন হয় কুলাঙ্গনার। কারণ গুপ্তসাধনতন্ত্রেই দেখতে পাই, মহেশ্বর পার্বতীকে বলছেন (গুপ্তসাধনতন্ত্র-১/১০-১৪)–

ইহলোকে সুখং ভুক্ত্বা দেবীদেহে প্রলীয়তে।
সাধকেন্দ্রো মহাসিদ্ধিং লব্ধ্বা যাতি হরেঃ পদম্ ।। ১০
পঞ্চাচারেণ দেবেশি কুলশক্তিং প্রপূজয়েৎ।
নটী কাপালিকী বেশ্যা রজকী নাপিতাঙ্গনা।। ১১
ব্রাহ্মণী শূদ্রকন্যা চ তথা গোপালকন্যকা।
মালাকারস্য কন্যা চ নবকন্যাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।। ১২
বিশেষবৈদগ্ধ্যযুতাঃ সর্ব্বা এব কুলাঙ্গনাঃ।
রূপযৌবনসম্পন্না শীলসৌভাগ্যশালিনী।। ১৩
পূজনীয়া প্রযত্নেন ততঃ সিদ্ধির্ভবেদ্ ধ্রুবম্ । ১৪
অর্থাৎ :
যে সাধক শক্তির আরাধনা করেন, তিনি ইহলোকে বিবিধ সুখভোগ করিয়া দেবীদেহে প্রলীন হইতে পারেন এবং সেই সাধকেন্দ্র শক্তিসাধনবলে মহাসিদ্ধি লাভ করিয়া অন্তে হরিপদ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ১০।। দেবেশি! পঞ্চাচার ক্রমে কুলশক্তির অর্চ্চনা করিবে। নটী, কাপালিককন্যা, বেশ্যা, রজকী, নাপিতপত্নী, ব্রাহ্মণী, শূদ্রকন্যা, গোপকন্যা ও মালাকারকন্যা ইহারাই নবকন্যা বলিয়া কীর্ত্তিত আছে। ১১-১২।। বিশেষতঃ যাহারা বিশেষ গুণশালিনী এইরূপ সর্ব্বজাতীয় রূপযৌবনসম্পন্না, সুশীলা ও সৌভাগ্যশালিনী কন্যাও কুলাঙ্গনা বলিয়া গ্রহণ করা যায়। ১৩।। উক্ত কুলাঙ্গনা সকলকে যত্নপুরঃসর পূজা করিবে। এইরূপ অর্চ্চনাদ্বারা সাধকের নিশ্চয়ই সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। ১৪।

                এক্ষেত্রে সম্ভবত সহজেই অনুমেয় হয় যে, বস্তুত কুলাচার বা কুলশক্তির অর্চনা ও লতা-সাধনার মধ্যে আদৌ কোন পার্থক্য নেই। তাহলে এরকম গুহ্য ও কঠিন লতা-সাধনার মূল কথাটা কী? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৩৯৯) উদ্ধৃতি টেনেছেন এভাবে–

‘এই সাধনার প্রধান অধিকরণ স্ত্রী, এইজন্য ইহাকে লতাসাধনা কহে। এই সাধনার বিষয় তন্ত্রে বর্ণিত হইয়াছে…
লতায়াঃ সাধনং বক্ষ্যে শৃণুস্ব হরবল্লভে।
শতং কেশে শতং ভালে শতং সিন্দুরমন্ডলে।।
স্তনদ্বয়ে শতদ্বন্দ্বং শতং নাভৌ মহেশ্বরি।
শতং যোনৌ মহেশানি উত্থায় চ শতত্রয়ম্ ।।
এবং দশশতং জপ্ত্বা সর্ব্বসিদ্ধিশয়ো ভবেৎ।
অথান্যৎ সংপ্রবক্ষ্যামি সাধনং ভুবি দুর্লভম্ ।।
রজোহবস্থাং সমানীয় তদ্ যোনৌ স্বেষ্টদেবতাম্ ।
পূজয়িত্বা মহারাত্রৌ ত্রিদিনং পূজয়েন্মনুম্ ।।
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
[ভাবার্থ : বিশ্বকোষ, ১৭ খন্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]

          বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক রুচি ও নীতিবোধের কাছে এ জাতীয় চিন্তাধারা বীভৎস কামবিকারের পরিচায়কমাত্র বলেই দেবীপ্রসাদ বাংলা তর্জমাটুকু এখানে উদ্ধত না করে কেবল সূত্র উল্লেখ করেছেন। প্রায় অনুরূপ কুলাচার পালন ও সাধনার বর্ণনা গুপ্তসাধনতন্ত্র’র চতুর্থ পটলে (গুপ্তসাধনতন্ত্র-৪/৩-৯) এবং কুমারীতন্ত্রেও (কুমারীতন্ত্র-৬/২১-২৩) দেখতে পাওয়া যায় (গ্রন্থান্তরে তন্ত্র প্রসঙ্গ দ্রষ্টব্য)।
আবার বৃহস্পতি তুল্য জ্ঞানবান হওয়ার যে প্রক্রিয়া এই তান্ত্রিক সাধনায় উক্ত হয়েছে, তাও রীতিমতো কৌতুহলোদ্দীপকই বলা যায়–

বৃহস্পতিসমো যন্তু ভবিতুং কাময়েন্নরঃ।
সর্ব্বো বৃহস্পতিসমো ভবেচ্চৈব ন সংশয়ঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/১৯)
সুন্দরীং যৌবনোন্মত্তাং নারীমানীয় নিত্যশঃ।
অষ্টোত্তরশতং জপ্তা কুলমামন্ত্র্য মন্ত্রবিৎ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২০)
মৈথুনং যঃ করোত্যেব স তু সর্ব্বং ফলং লভেৎ।
তন্মুখে চ মুখং চ দত্ত্বা সহস্রং মানসং জপেৎ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২১)
স ভবেৎ সর্ব্বসিদ্ধিদো নাত্র কার্য্যবিচারণা।
সর্ব্বেষাং সাধনাং মধ্যে শ্রেষ্ঠঃ স্যাৎ কুলসাধনম্ ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২২)
তস্মাৎ সর্ব্বপ্রযত্নেন সাধয়েৎ সুসমাহিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২৩)।
অর্থাৎ :
যে ব্যক্তি বৃহস্পতি তুল্য জ্ঞানবান হইতে ইচ্ছা করে সে ব্যক্তি এই সাধনাপ্রভাবে বৃহস্পতিতুল্য জ্ঞানবান হইয়া থাকে, এতদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। ১৯।। প্রত্যহ সুন্দরী যৌবনোন্মতা কুলযুবতী আনয়নপূর্ব্বক প্রথমে কুলাগার অভিমন্ত্রিত করিবে। তৎপর মন্ত্রজ্ঞ সাধক অষ্টোত্তর শতবার কালিকামন্ত্র জপ করিয়া ঐ কুলস্ত্রীর সহিত মৈথুনে প্রবৃত্ত হইবে। এইরূপে কুলস্ত্রীর সহিত রতিক্রিয়া সম্পন্ন করিলে সাধক পূর্ণফল লাভ করিয়া থাকে। রতিকালে কুলযুবতীর মুখে মুখ প্রদান করিয়া এক-সহস্র সংখ্যক মানস জপ করিবে। ২০-২১।। যে ব্যক্তি এইরূপে কার্য্য করে সে সর্ব্বসিদ্ধিদাতা হইয়া থাকে। এতদ্বিষয়ে বিচার বিতর্ক অনাবশ্যক। সর্ব্বপ্রকার সাধন পদ্ধতির মধ্যে কুলাচারমতে সাধনই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং সর্ব্বপ্রযত্নে অত্যন্ত একাগ্রতার সহিত কুলাচার পদ্ধতিতে সাধন করিবে। ২২-২৩।

               বস্তুত, তান্ত্রিক মতের মূল চেতনা হলো- ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তাই আছে দেহভাণ্ডে।’ তান্ত্রিক সাধনার এই দৃষ্টিভঙ্গি শাক্ত-ধারণার সাধনরূপ মাত্র। রহস্য-চিহ্নায়ক তন্ত্র-নির্দেশনায় প্রাচীন তন্ত্র-সাধনার গূঢ়তত্ত্বে আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে পঞ্চমকারের তথ্য এখন হয়তো আর গোপন নেই। এক্ষেত্রে যদিও তান্ত্রিক রিচ্যুয়াল বা আধ্যাত্মিক তন্ত্রবিশ্বাস মতে বলা হয়ে থাকে, পঞ্চমকারের তাৎপর্য অতি গূঢ়, সাধারণের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। তবে তন্ত্রসাধনায় যত গূঢ় রহস্যই থাকুক না কেন, এটা যে কোন প্রাচীন উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসের মাধ্যমে বিবর্তিত এক কামপ্রধান আচারই হবে তা বিদ্বান গবেষকেরা দৃঢ়ভাবে অনুমান করেন। কিন্তু সবকথা ছাপিয়ে তন্ত্রসাধনায় বীজমন্ত্রের প্রাধান্যকে কখনোই অবহেলা করা হয়নি। যেমন-

কামেন মায়য়া চৈব পুটিতং কামবীজকম্ ।
তদা কামেশ্বরো মন্ত্রঃ সর্ব্বকামফলপ্রদঃ।। (কুব্জিকাতন্ত্রম্ : ২/৩৫)
অর্থাৎ : কামবীজ (ক্লীং) এবং মায়াবীজ (হ্রীং) দ্বারা কামবীজকে পুটিত করিলে, তাহা সর্ব্বকাম ফলপ্রদ কামেশ্বর মন্ত্র হয়। (ক্লীং হ্রীং ক্লীং হ্রীং ক্লীং)।

            তন্ত্রসাধকদের ধ্যান-ধারণায় একাক্ষরী বা দ্ব্যক্ষরী ইত্যাদি মন্ত্রচৈতন্য বা বীজমন্ত্রের ব্যবহার ও তার প্রতীকী কর্মশক্তি ও ফলপ্রদানের উপর প্রচণ্ড আস্থা ও বিশ্বাসের ছাপ আমরা ইতোমধ্যেই অনুধাবন করেছি। তাই দেখতে পাই, তন্ত্রে বলা হচ্ছে–

অস্যাঃ স্মরণমাত্রেণ জীবন্মুক্তশ্চ সাধকঃ।
একোচ্চারণমাত্রেণ অশ্বমেধাযুতং ফলম্ ।। (কুব্জিকাতন্ত্রম্ : ২/৪৯)
অর্থাৎ : কালিকামন্ত্র স্মরণমাত্রই সাধক জীবন্মুক্তি লাভ করে এবং একবার মাত্র উচ্চারিত হইলে অযুত অশ্বমেধযজ্ঞ সম্পাদনের ফল লাভ হয়।

             এবং এই বীজমন্ত্র যে কোন-না-কোনো দেবীশক্তির ধ্যানপ্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে তা তন্ত্রসাহিত্যগুলি ঘাটলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন তন্ত্রে এই শক্তিদেবীর বিভিন্ন নাম থাকলেও তান্ত্রিক আচারের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। কোথাও তিনি চণ্ডিকা, কোথাও অম্বিকা, কোথাও কামেশ্বরী, কোথাও চামুণ্ডা, কোথাও জগদম্বিকা, কোথাও তারা, কোথাও বা কালী বা কালিকা ইত্যাদি। কিন্তু তন্ত্রযোগের সাধনপ্রক্রিয়ায় এইসব মন্ত্রচৈতন্য তথা বীজমন্ত্রের ভূমিকা ও কার্যকর শক্তি যে কী বিপুল, তা তন্ত্রসাধনায় কুমারীতন্ত্রের ষষ্ঠ পটলের ‘কুলাচার-কথন’ উপাখ্যানের মাধ্যমেও অনুধাবন করা যায়, যেমন–

শ্রীদেব্যুবাচ-
দেবদেব মহাদেব জগৎপ্রলয়কারকঃ।।
কুলাচারে তু মদ্যাদ্যৈঃ কথং সিদ্ধির্ভবেৎ প্রভো।
অর্ধমকারনং হ্যেতৎ সংশয়ং ছিন্দি মে প্রভো।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/১)
শ্রীভৈরব উবাচ-
সাধু পৃষ্ঠো হি দেবেশি কথয়ামি শৃণুম্ব মে।
পুরা দারুবনে রম্যে মুনয়ো রাগমোহিতাঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/২)
পরস্ত্রিয়ং ধর্ষয়ন্তি মদ্যং পিবন্তি নিত্যশঃ।
তদ্দষ্টানুচিতং কর্ম্ম বির্ষ্ণুমাং সমুপস্থিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৩)
দেবদেব মহাদেব সৃষ্টিস্থিতিলয়াত্মকঃ।
প্রভো দারুবনে পাপা মদ্যপানরতাস্তথা।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৪)
পরস্ত্রিয়ং ধর্ষয়ন্তি মুনয়ো রাগমোহিতাঃ।
দিগম্বরাশ্চ মত্তাশ্চ কিং গতিশ্চ ভবিষ্যতি।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৫)
ইতি বিষ্ণুবচঃ শ্রুত্বা তমবাদমহং প্রিয়ে।
কালিকায়া মহাবিদ্যা অনিরুদ্ধঃ সরস্বতী।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৬)
বিদ্যারাজ্ঞীতি সা প্রোক্তা এতন্মন্ত্রপ্রজপকাঃ।
পরং মুক্তা ভবিষ্যন্তি তদ্গায়ত্রীং জপন্তি চ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৭)
কালিকায়াঃ প্রভাবেন সর্ব্বে দেবা বিমোহিতাঃ।
ভ্রুণহত্যা-মাতৃবধাৎ পরশুরামো বিমোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৮)
দত্তাত্রেয়শ্চ ত্রিপুরঃ সুরাপানাদ্বিমোচিতঃ।
ব্রহ্মহত্যা-শিরচ্ছেদাদহং রুদ্রোহপি মোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৯)
গৌতমস্ত্রীধর্ষণাচ্চ দেবেন্দ্রোহপি বিমোচিতঃ।
কন্যায়া ধর্ষণাদ্বাপি ব্রহ্মাবাচং বিমোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/১০)
চাণ্ডালীগমনাদ্বাপি বশিষ্ঠোহপি বিমোচিতঃ।
রাবণস্য বধাচ্চাপি রামচন্দ্রো বিমোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/১১)
.
অর্থাৎ :
দেবী কহিলেন- হে দেবদেব মহাদেব। আপনি জগৎ প্রলয়কারক। হে প্রভু ! কুলাচারবিধি-নির্দ্দিষ্ট মদ্যাদি পঞ্চমকার অধর্ম্ম অর্থাৎ পাপ সৃষ্টির কারণ। সুতরাং তৎসমুদয় কিরূপে মন্ত্রসিদ্ধি-প্রদায়ক হইতে পারে প্রকাশ করিয়া আপনি আমার সন্দেহ দূর করুন। ১।
ভৈরব কহিলেন- দেবেশি ! তুমি অতি উত্তম প্রশ্ন করিয়াছ। আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতেছি, শ্রবণ কর। পুরাকালে মুনিগণ কামমোহিত চিত্তে রম্য দারুবনে নিয়ত মদ্যপান এবং পরস্ত্রী ধর্ষণকার্য্যে ব্যাপৃত ছিল। মুনিগণের এই সকল অন্যায় কার্য্য দর্শন করিয়া, বিষ্ণু আমার নিকট আসিয়া উপস্থিত হন। ২-৩।
তখন বিষ্ণু আমাকে বলিতে লাগিলেন, হে দেবদেব মহাদেব ! আপনি সৃষ্টি স্থিতি এবং লয়ের কর্ত্তা। হে প্রভো ! দারুবনে কামমোহিত মদ্যপায়ী পাপাত্মা দিগম্বর ও পানমত্ত মুনিগণ পরস্ত্রী ধর্ষণ করিতেছে। ইহাদের কি গতি হইবে। ৪-৫।
হে প্রিয়ে ! তৎকালে বিষ্ণুর এই কথা শুনিয়া আমি কহিলাম, কালিকা-নামক যে মহামন্ত্র এবং অনিরুদ্ধ যাহার সরস্বতী, যাহা মন্ত্রসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ- এই সকল মুনিগণ সেই মহামন্ত্র জপ করে। সেই কালিকা গায়ত্রী জপ করিয়া ইহারা সকলেই শ্রেষ্ঠ মুক্তি লাভ করিবে। ৬-৭।
কালিকাদেবীর প্রভাবে দেবতারাও বিমোহিত হইয়া থাকেন। কালিকাদেবীর প্রভাবে পরশুরাম ভ্রুণহত্যা ও মাতৃবধ পাপ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন। ৮।
কালিকাদেবীর প্রভাবে দত্তাত্রেয় এবং ত্রিপুর সুরাপানের পাপ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন। আমি রুদ্রও স্বয়ং ব্রহ্মহত্যা বা ব্রহ্মার শিরচ্ছেদরূপ পাতক হইতে কালিকাদেবীর প্রভাবেই মুক্তিলাভ করিয়াছিলাম। ৯।
সুরপতি ইন্দ্রও কালিকাদেবীর প্রভাবে গুরুপত্নী গৌতমীতে ধর্ষণজনিত পাপ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন এবং ব্রহ্মাও কন্যাধর্ষণহেতু পাপ হইতে, বশিষ্ঠ চাণ্ডালীগমন পাপ হইতে এবং রামচন্দ্র রাবণবধজনিত পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়াছিলেন। ১০-১১।

           সে যাই হোক, আমাদের আধুনিক যুগের পটভূমিতে এই তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতিকে যতো বীভৎস বিকৃতি বলে প্রতীয়মান হোক না কেন, সমাজবিকাশের যে-পর্যায়ে এগুলির উদ্ভব হয়েছিলো একমাত্র তারই পটভূমিতে এগুলির আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধান করা যাবে। অতএব, তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতিকে বীভৎস-বিকৃতি বলে নিজস্ব ধারণা-আরোপ করার আগে এই সাধনপন্থার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে অবহিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তন্ত্রের তত্ত্বদৃষ্টি প্রসঙ্গে আলোচনা অন্যত্র করা যাবে। কিন্তু দেবীপূজার প্রধান অঙ্গ হিসেবে তন্ত্র-বিহিত ‘যন্ত্র’ যে বস্তুত দেবী বা অনুরূপ কল্পনার প্রতীকী পরিকল্পনাই, সে বিষয়ে দ্বিধা থাকা সঙ্গত হবে না বলেই মনে হয়। গুপ্তসাধনতন্ত্রেও আমরা এই যন্ত্রে পূজার বিধান উল্লেখ দেখতে পাই (গুপ্তসাধনতন্ত্র-৮/১২-১৪, ১৬-১৭)–

শালগ্রামে মণৌ যন্ত্রে প্রতিমায়াং সুরেশ্বরি।
পুস্তিকায়াঞ্চ গঙ্গায়াং সামান্যে চ জলে তথা।। ১২
অথবা পুষ্পযন্ত্রে চ পূজয়েচ্ছিবলিঙ্গকে।
যন্ত্রভেদেন দেবেশি ফলং সম্যক্ প্রজায়তে।। ১৩
শালগ্রামে শতগুণং মণৌ তদ্বৎ ফলং লভেৎ।
যন্ত্রে লক্ষগুণং প্রোক্তং প্রতিমায়াং তথৈব চ।। ১৪
পুষ্পযন্ত্রে মহেশানি পূজনাং সর্ব্বসিদ্ধিভাক্ ।
শিবলিঙ্গে মহেশানি অনন্তফলমীরিতম্ ।। ১৬
ন কুর্য্যাৎ পার্থিবে লিঙ্গে দেবীপূজাদিকাঃ ক্রিয়াঃ।
পার্থিবে পূজনাদ্দেবি সিদ্ধিহানিঃ প্রজায়তে।। ১৭
অর্থাৎ :
শালগ্রামে, শিলাতে, মণিতে, যন্ত্রে, প্রতিমাতে, পুস্তকে, গঙ্গাতে, সামান্যজলে, পুষ্পযন্ত্রে অথবা শিবলিঙ্গে সাধক দেবীর পূজা করিবে। দেবেশি! যন্ত্রবিশেষে পূজা করিলে ফলের তারতম্য হইয়া থাকে। ১২-১৩।। শালগ্রাম শিলাতে দেবীর পূজা করিলে সেই পূজাতে শতগুণ ফললাভ হয়, মণিতে পূজা করিলেও উক্তরূপ ফললাভ হইয়া থাকে। যন্ত্রেতে ও প্রতিমাতে পূজা করিলে লক্ষগুণ ফল কথিত আছে। ১৪।। মহেশানি পুষ্পযন্ত্রে পূজা করিলে সাধক সর্ব্বপ্রকার সিদ্ধিভাগী হয়, শিবলিঙ্গে পূজা করিলে অনন্তফল হইয়া থাকে। ১৬।। প্রিয়ে! কদাচ পার্থিবলিঙ্গে দেবীর পূজাদি ক্রিয়া করিবে না, দেবী! পার্থিবলিঙ্গে পূজা করিলে সিদ্ধিহানি হইয়া থাকে। ১৭।।

            অতএব, আমাদের আলোচ্য দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ যে যন্ত্র ও ঘট, তান্ত্রিক প্রণালীতে ইতঃপূর্বে যন্ত্রের তাৎপর্য দেখেছি সর্বতোভদ্রমণ্ডলের আলোচনায়। এরপর সর্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হবে। এক্ষেত্রে ‘ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি’তে ঘট স্থাপন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে–
‘অনন্তর সর্বতোভদ্রমণ্ডলোপরি ঘট স্থাপন করিবে। যথা,– শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করিবে, তদুপরি ধৌত সুলক্ষণ ঘট, তাহাতে দধ্যক্ষত (দধি মাখানো আতপ চাউল) দিয়া শুদ্ধ জলপূর্ণ করিয়া স্থাপন করিবে। তাহার কণ্ঠে আচারৎ লাল সুতা ও আলতা দেওয়া হয়। মধ্যে পঞ্চপল্লব (আম্র, অশ্বত্থ, বট, পাকুড়, যজ্ঞীয়ডুম্বুর শাখা), অলভে কেবল আম্রপল্লব দিবে। তদভাবে দুইটি পানও দিবার ব্যবস্থা আছে। এক সরা চাউলে একটি হরিতকী কিংবা সুপারী দিয়া তদুপরি স্থাপন করিবে। তদুপরি একটি নির্দোষ সশীর্ষ ফল (নারিকেল অথবা কদলী) দিবে; ঐ ফলকে সিন্দুর রঞ্জিত করিবে। ঘটে একটি সিন্দুর পুত্তলিকা আঁকিবে, পুষ্পমাল্য দিয়া শোভিত করিবে…।’ (ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি-১/২৩৯)

         দেবীপ্রসাদ বলেন, সর্বতোভদ্রমণ্ডলের অর্থ হলো নারী-জননাঙ্গ : সর্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট, ঘটের গায়ে সিন্দুরপুত্তলিকা– মানবীয় প্রজননের প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ নকল তোলবার আয়োজন। এইভাবে মানবীয় প্রজননের নকল তুলে কোন্ কামনা সফল করবার কল্পনা করা হচ্ছে তার আভাস আমরা আগেই পেয়েছি : নারী-জননাঙ্গের তান্ত্রিক নাম লতা, তান্ত্রিক যন্ত্রে অষ্টদলপদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। অর্থাৎ, নারী অঙ্গের জননশক্তির স্পর্শে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার কল্পনা। ঘট-স্থাপনার মধ্যে সেই চেষ্টাকেই আরো একটু এগিয়ে নিয়ে যাবার আয়োজন করা হলো। শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করে ফসল ফলানোর মহড়া শুরু হলো। আর তারপর ঘটের উপরস্থ পল্লবকে স্পর্শ করে কামনা জানানো হবে :

‘ওঁ, অয়মূর্জাবতো বৃক্ষ উজ্জীব ফলিনী ভব। পর্ণং বনস্পতের্নুত্বা নুত্বা চ সুয়তাং রয়িঃ।’ (ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি-১/২৪০)
অর্থাৎ : হে শক্তিমতি বৃক্ষ, (তুমি) বাঁচিয়া ওঠো ও ফলবতী হও। বনস্পতির পাতাকে সেবা করিয়া ধন প্রসব করো।

           অনেক সময় ঘটের উপরের ডাবটির গায়েই সিন্দুরপুত্তলি এঁকে দিয়ে মানবীয় ফলপ্রসূতার সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সাদৃশ্যে বিশ্বাসকে আরো স্পষ্ট ও অভ্রান্ত করবার আয়োজন দেখা যায়। ওই যন্ত্র আর ঘটই হলো দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ। তার মানে, কৃষি-আবিষ্কার পর্যায়ের এক আদিম বিশ্বাসই এ-পূজার প্রাণবস্তু। একটু গভীরভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, আদিপর্বে দুর্গাপূজা আসলে পূজাই ছিলো না। পূজার বদলে ছিলো জাদুঅনুষ্ঠান। জাদুঅনুষ্ঠানের মূল কথাটা হলো একটা কামনা সফল করবার চেষ্টাই। কিন্তু তা প্রার্থনা-উপাসনার সাহায্যে ঈশ্বরের করুণা উদ্রেক করে নয়। তার বদলে, কামনা সফল হওয়ার একটা নকল তুলে ওই নকলের সাহায্যেই বাস্তবভাবে কামনাটিকে সফল করবার কল্পনা। অষ্টদলপদ্মের ছবি এঁকে সিন্দুরপুত্তলীর ছবি এঁকে, মানবীয় ফলপ্রসূতার নকল তোলা হলো আর কল্পনা করা হলো প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার কামনাও এইভাবেই সফল হবে।
বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক চেতনার দিক থেকে এ-বিশ্বাস একেবারে অর্থহীন। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সম্পর্ক কোথায়? কিন্তু আধুনিক চেতনার মাপকাঠিতে তন্ত্রকে বোঝা যাবে না। তার বদলে এই তান্ত্রিক বিশ্বাসটিকে ঠিকভাবে বুঝতে হলে পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের আচর-অনুষ্ঠানকে– বা পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের আচার-অনুষ্ঠানের স্মারকগুলিকে– বিচার করতে হবে। কিভাবে? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের তর্জমায় অধ্যাপক জর্জ টমসন-এর উদ্ধৃতি–
‘উত্তর আমেরিকায় ফসলে পোকা ধরলে ঋতুমতী মেয়েরা রাত্রে নগ্ন হয়ে ক্ষেতের উপর হাঁটে। ইয়োরোপের চাষীদের মধ্যে এ-প্রথা আজো টিকে আছে। খারাপ পোকার প্রতিষেধ হিসেবে প্লিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন, ঋতুমতী মেয়েরা খালিপায়ে এলোচুলে কোমরের ওপর পর্যন্ত কাপড় তুলে ক্ষেতের উপর হাঁটবে। কলিউমেল্লার মতে ডিমোক্রাইটসেরও সেই বিধান : তিনি বলেছেন, মেয়েরা খালিপায়ে আর এলোচুলে তিনবার দৌড়ে ক্ষেত প্রদক্ষিণ করবে। ধারণাটা স্পষ্ট এই যে, এ-অবস্থায় নারীদেহে যে-উর্বরাশক্তির আবির্ভাব হয় তাই এ-ভাবে ক্ষেতের মধ্যে সঞ্চারিত করা হবে। অন্যত্র দেখা যায়, ওই শক্তিকে নারীত্বের সহজাত শক্তি হিসেবেই মনে করা হচ্ছে। জুলুদের মধ্যে প্রথা হলো, ক্ষেতে ঘোরবার সময় মেয়েরা নগ্ন হবে, কিন্তু তখন ঋতুমতী যে হতেই হবে তা নয়। মেয়েদের জননাঙ্গ প্রদর্শন-মূলক অনুষ্ঠানাদিরও একই উৎস– এই অনুষ্ঠান গ্রীসে বিশেষ করে ডিমিটর-দেবীর সঙ্গে সংযুক্ত। নানান গ্রীক পূজাপদ্ধতিতে ব্যবস্থা দেখা যায়, পূজারিণীরা খালিপায়ে আর এলোচুলে সার বেঁধে হাঁটবে– ওই পূজাপদ্ধতিগুলিও একই জাতীয় ধারণা থেকে এসেছে।’ (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪১২)

               নারী জননাঙ্গকেই মানুষ এককালে উৎপাদন-শক্তির আধার মনে করেছে আর তাই প্রাকৃতিক উৎপাদনে সংকট দেখা গেলে মেয়েরা নগ্নতার সাহায্যে সে-সংকট দূর করতে চেয়েছে।
এ প্রসঙ্গেই স্মর্তব্য যে আধুনিক বিদ্বানদের অনেকেই দাবি করেছেন, সিন্ধু-সভ্যতার প্রচলিত নানা চিত্রলিপি এবং অন্যান্য নিদর্শনের মধ্যে পরবর্তীকালে তন্ত্র সাধনায় ব্যবহৃত নানা চিত্রাবলীর সুস্পষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া যায়।
যেমন, ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে প্রত্ন-তত্ত্ব খননে এমন কিছু মাতৃমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে যে মাতৃমূর্তিগুলির রচনায় যোনি বা নারী-জননাঙ্গের উপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপণ করার চেষ্টা খুবই স্পষ্ট। তাছাড়া মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তুপ থেকে পোড়ামাটির যোনি-মূর্তিও এর জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। এই যোনি ক্রমশই জামিতিক ত্রিকোণের আকার ধারণ করেছে। কেননা তন্ত্র-সাধনায় যন্ত্র হিসেবে প্রচলিত চিত্রগুলির সঙ্গে এই মূর্তির নিম্ন-ভাগের সাদৃশ্যের আভাস পাওয়া যায় বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অভিমত। তন্ত্রে যেগুলিকে যন্ত্র বলা হয় সেগুলি আর কিছুই নয়, ওই নারী-জননাঙ্গের প্রতীক-চিহ্নমাত্র।

             আদিম মাতৃপ্রধান বা শক্তি-প্রধান চিন্তাধারা ক্রমশ কী করে নারী-জননাঙ্গ-কেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ-পর্যায়ে তার ব্যাখ্যা কী হতে পারে?–
‘প্রাচীন মাতৃমূর্তির পরিকল্পনায় যদি জননাঙ্গকেই ক্রমশ নারীদেহের প্রধানতম অবয়ব বলে গ্রহণ করবার চেষ্টা দেখা যায় তাহলে স্বভাবতই কৃষিভিত্তিক প্রচীন সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে নারীদেহের অন্যান্য অবয়ব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র যোনি বা নারী-জননাঙ্গের মূর্তি খুঁজে পাওয়া বিস্ময়ের ব্যাপার হবে না।…
মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা এ-জাতীয় যোনি-মূর্তি রচনা করেছিলেন কেন? এর পিছনে নিশ্চয়ই প্রজননের কামনা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র প্রজননের কামনাই নয়। তার সঙ্গে জড়িত ছিলো ধনোৎপাদনের কামনাও– কৃষিকাজের সাফল্য-কামনাও। কেননা এই যোনি-মূর্তি মানব-বিশ্বাসের এমন এক স্তরের সাক্ষ্য বহন করছে, যেখানে শুধুমাত্র সন্তান-উৎপাদনই নয়– প্রাকৃতিক উৎপাদনও– নারী-জননাঙ্গের উপর নির্ভরশীল।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৯৫)

              ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসটির স্মারক সিন্ধু-সভ্যতার মধ্যেই পরিসমাপ্ত নয়, বরং উত্তরকালের তন্ত্র-সাধনার মধ্যেই যে তার অবিচ্ছেদ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, ইতোমধ্যে আমরা কিছুটা অবগত হয়েছি বটে। এবং আমাদেরকে এটা মনে রাখতে হবে যে, উত্তরকালের তান্ত্রিক আচারসম্পন্ন শাক্তসাধকদের কথিত প্রকৃতিসাধনার সঙ্গিনী হিসেবে যে সাধনসঙ্গীটি থাকেন, তিনি কিন্তু কোন-না-কোনোভাবে একজন কুলরমণীই। আর প্রাকৃতিক উৎপাদনের সাথে নারী জননাঙ্গের প্রাধান্যের ধারণাটি প্রোথিত আছে যে প্রাচীনতম বদ্ধমূল বিশ্বাসের উপর তা হলো এক উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস।
বলা বাহুল্য, দেবীপূজারূপে শাক্তধর্ম খ্রিস্টাব্দের চতুর্থ শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এক গৌণ ধর্ম বলেই মনে করা হয়। তবে দেহ ও শক্তিকে অবলম্বন করে তান্ত্রিক সাধনা এই যুগের মধ্যেই এক বৃহৎ সম্প্রদায়ের মধ্যে গুপ্তবিদ্যা রূপে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।

[পূর্বপোস্ট : পার্বতী উমা : মানবরূপী দেবী না দেবীরূপী মানবী?] [*] [পরের পোস্ট : শক্তিদেবী কালী ও তাঁর পূজার ইতিহাস]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 557,477 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 141 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: