h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শক্তি-সাধনা-০৮। প্রকৃতি-উপাসনা

Posted on: 07/10/2017


12004962_598650700272988_6352938307443038956_n

শক্তি-সাধনা-০৮। প্রকৃতি-উপাসনা
রণদীপম বসু

বেদ-পূর্ব সিন্ধু-ধর্ম মাতৃপ্রধান এবং বৈদিক ধর্ম যে পুরুষ-প্রধান, এ বিষয়ে বিদ্বান-পণ্ডিতদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির আলোচনায় অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পরবর্তীকালের ভারতবর্ষীয় ধর্মে অন্তত সাধারণ জনগোষ্ঠির মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে ঋগ্বেদের প্রাচীন পুরুষ-দেবতাদের বিশেষ কোন পরিচয়ই পাওয়া যায় না। অন্যদিকে উত্তরকালের এই ধর্মবিশ্বাসের প্রধানতম উপাদান হলো মাতৃ-পূজা– তা কি ওই বেদ-পূর্ব সিন্ধু-ধর্মেরই রেশ? এ ক্ষেত্রে সিন্ধু-যুগে এই ধর্মবিশ্বাস প্রচলিত ছিলো বলে এর ব্যাখ্যা-সন্ধানে যেমন সিন্ধু-প্রত্নতত্ত্ব-লব্ধ স্মারকগুলির উপর নির্ভর করতে হবে, তেমনি পরবর্তীকালেও এই ধর্মবিশ্বাস বহুলাংশে অক্ষুণ্ন থেকেছে এই অনুমান-জন্য পরবর্তীকালের লিখিত সাহিত্য হয়তো ওই স্মারকগুলির উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করতে পারে। অর্থাৎ ওই শাক্ত-ধর্ম বা মাতৃ-উপাসনার ব্যাখ্যা সন্ধানে একাধারে প্রত্নতত্ত্বমূলক ও সাহিত্যমূলক দ্বিবিধ তথ্যের উপর নির্ভর করা যেতে পারে।

      ইতঃপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ কয়েকটি চিত্তাকর্ষক সাহিত্যমূলক সাক্ষ্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। যেমন, ‘মার্কণ্ডেয়-পুরাণে’র দেবী-মাহাত্ম্যে স্বয়ং দেবী ঘোষণা করছেন–

‘ততঃ অহম্ অখিলং লোকম্ আত্মদেহ-সমুদ্ভবৈঃ।
ভবিষ্যামি সুরাঃ শাকৈঃ অবৃষ্টৈঃ প্রাণধারকৈঃ।।
শাকম্ভরী ইতি বিখ্যাতিং তদা যাস্যামি অহং ভুবি।…’ (মার্কণ্ডেয়-পুরাণ-৯২/৪২-৪৩)
অর্থাৎ : অনন্তর বর্ষাকালে আত্মদেহ-সমুদ্ভূত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সমগ্র জগতের পুষ্টি-সরবরাহ করবো; তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবো।

     এখানে শাকম্ভরী নামের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, শাকাদি উদ্ভিদ দেবীগর্ভপ্রসূত। এ কারণেই দেবী শাককে আত্মদেহ-সমুদ্ভূত বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ দেবী বলতে এখানে বসুমাতা, পৃথিবী। বলা বাহুল্য, সংস্কৃত শাস্ত্রকাররা শাক-শব্দের দ্বারা কেবলমাত্র লতা জাতীয় বস্তুকেই বুঝতেন না– পত্র, মূল ইত্যাদি দশ প্রকার বস্তুকে বুঝতেন–

‘পত্রমূলকরীরাগ্রফলকাণ্ডাস্থিরূঢ়কাঃ।
ত্বক্ পুষ্পং কবকং চেতি শাকং দশবিধং স্মৃতম্ ।।’
অর্থাৎ : পত্র, মূল, করীর (মরুদেশস্থ বৃক্ষবিশেষ), অগ্র, ফল, কাণ্ড, অস্থিরূঢ়ক, ত্বক, পুষ্প ও কবক এই দশপ্রকার শাক স্মৃতিতে উক্ত হয়েছে।

আবার লক্ষ্মীতন্ত্রে শাকম্ভরী দেবীর সঙ্গে উমা, দুর্গা, পার্বতী, চণ্ডী, সতী ও কালিকেশা দেবীকে এক করে দেয়া হয়েছে–

‘শাকম্ভরী শতাক্ষী সা সৈব দুর্গা প্রকীর্তিতা।
উমা গৌরী সতী চণ্ডী কালিকেশা চ পার্বতী।।
শাকম্ভরী স্তুবন্ ধ্যায়ন্ শত্রু সংপূজয়ন্ নমন্ ।
অক্ষয়ামশ্নুতে ভূতিমন্নং পানং ভবান্তরে।।
অর্থাৎ : শতাক্ষী শাকম্ভরী জগতে দুর্গা, উমা, গৌরী, সতী, চণ্ডী, কালিকেশা ও পার্বতী নামে খ্যাত। শাকম্ভরীর স্তব, পূজা ও ধ্যান করলে অপর জন্মে অক্ষয় অন্ন পান ও ঐশ্বর্য লাভ হয়।

 

     যে-সুপ্রাচীন বিশ্বাস থেকে এই দেবী-নামের উদ্ভব হয়েছিলো তার একটি মূর্ত নিদর্শন হরপ্পা ধ্বংসস্তুপের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। হরপ্পায় এমন একটি অদ্ভূত সীল আবিষ্কৃত হয়েছে– তার এক-পিঠে উত্তানপদ দেবীমূর্তি, এই দেবীর গর্ভ থেকেই উদ্ভিদের উদ্ভব অঙ্কিত হয়েছে। অতএব অনুমান হয়, মার্কণ্ডেয়-পুরাণের এই শাকম্ভরী দেবী পুরাণের চেয়ে অনেক পুরনো; প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু-যুগেও তাঁর পরিচয় অস্পষ্ট নয়।
সিন্ধু-সভ্যতায় দেবী-রহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সম্পর্ক ইঙ্গিত যে শুধুমাত্র এই সীলটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ তা নয়। অন্যান্য অনেক সীলেও দেবীকে উদ্ভিদ-পরিবৃতা বা উদ্ভিদ-অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে অঙ্কিত করা হয়েছে। এ-জাতীয় নজির থেকেই সিন্ধু-সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন পরিচালনাকারী বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শাল অনুমান করেছিলেন, সিন্ধু-সভ্যতায় বৃক্ষ-উপাসনাও প্রচলিত ছিলো। এবং এ-বিষয়ে তিনি আরো একটি যুক্তি দিয়েছেন যে– উত্তরকালে ভারতবর্ষীয় ধর্ম-বিশ্বাসে বৃক্ষের অধিষ্ঠাত্রী বলতে সর্বত্রই দেবীর কল্পনা।

     এখানে উল্লেখ্য, ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের একটি সূক্তে (ঋগ্বেদ-১০/৭২) দেবী অদিতির বর্ণনাতেও এই কৌতুহলোদ্দীপক ‘উত্তানপদ’ শব্দ ও ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন–

‘দেবানাং যুগে প্রথমেহসতঃ সদজায়ত।
তদাশা অন্বজাযন্ত তদুত্তানপদস্পরি’।। (ঋক-১০/৭২/৩)
‘ভূর্জজ্ঞ উত্তানপদো ভুব আশা অজায়ন্ত।
অদিতের্দক্ষো অজায়ত দক্ষাদ্বদিতিঃ পরি’।। (ঋক-১০/৭২/৪)
অর্থাৎ :
দেবোৎপত্তির পূর্বতন কালে অবিদ্যমান হতে বিদ্যমান বস্তু উৎপন্ন হলো। পরে উত্তানপদ (উত্তানপদ বলতে বৃক্ষ : সায়ণ) হতে দিক সকল জন্ম গ্রহণ করলো (ঋক-১০/৭২/৩)। উত্তানপদ হতে পৃথিবী জন্মিল, পৃথিবী হতে দিক সকল জন্মিল, অদিতি হতে দক্ষ জন্মিলেন, দক্ষ হতে আবার অদিতি জন্মিলেন (ঋক-১০/৭২/৪)।

     আারো বেশ কিছু সূক্তের মতোই ঋগ্বেদের এই সূক্তটির রচয়িতা হলেন বৃহস্পতি ঋষি। তবে এখানে এই ঋকসমূহে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বেদ-পূর্ব বা তারচেয়েও অন্তত হাজার বছরের পুরনো সিন্ধু-ধর্মীয় কৃষিভিত্তিক উত্তানপদ-ধারণা ঋগ্বেদেও বহমান থাকা। এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে স্থায়ী হয়ে যাওয়া আর্য-সভ্যতায় পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিবেচনায় ধীরে ধীরে নিজেদের জীবন-ব্যবস্থাকে অবশ্যম্ভাবীরূপে কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থার সাথে খাপ-খাইয়ে নেয়া। এবং অবশ্যই তাদের পুরুষ-প্রাধান্য বজায় রেখে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, জন মার্শাল যে সিন্ধু-সভ্যতার অন্যতম উপাদান হিসেবে বৃক্ষ-উপাসনার কথা উল্লেখ করেছেন, এই তথাকথিত বৃক্ষ-উপাসনাকে কি সিন্ধু-ধর্মের কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে, না কি একে শক্তি-সাধনার কোন অভিব্যক্তি বা লক্ষণ মনে করা যুক্তিসঙ্গত? এক্ষেত্রে পরবর্তী কালের ভারতবর্ষীয় ধর্মবিশ্বাসকে যদি এ-প্রশ্নের উপর আলোকপাত করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, পরবর্তী কালের শক্তি-সাধনার বিশেষ অঙ্গই হলো উদ্ভিদ-অধিষ্ঠাত্রী বা শস্যদেবীর উপাসনা। কারণ–
‘এ-বিষয়ে আধনিক বিদ্বানেরা ইতিপূর্বেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন : যাঁর নাম শাকম্ভরী তাঁরই নাম দুর্গা। তাই ফসলের সময়টিতেই দুর্গোৎসবের আয়োজন। কিন্তু দুর্গা-মূর্তি বলতে তো দশভূজা মহিষমর্দিনীর রূপ। কিন্তু শ্রীযুক্ত চন্দ দেখাচ্ছেন, এ-রূপ তুলনায় অনেক অর্বাচীন : প্রচলিত পৌরাণিক উপাখ্যান অনুসারে রাবণ-বধের বরপ্রার্থনায় রামচন্দ্র ওই মহিষ-মর্দিনীর উপাসনা করেছিলেন। কিন্তু বাল্মীকির মূল রামায়ণে এ-উপাখ্যান নেই; তার বদলে রামচন্দ্র সেখানে সূর্যের কাছেই বর-প্রার্থনা করছেন। অতএব এই মহিষ-মর্দিনী রূপটি অনেক পরবর্তীকালের; এবং পরবর্তী কালের বলেই (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে) “এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজার প্রতিমা গড়াইয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বৎসর পূর্বে ঠিক এমনভাবে প্রতিমা বাংলা কারিগর গড়িত না।… কারণ, আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময় যে-প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডিমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে-উৎসব করিয়া থাকি সেই উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণঘটের; দেবীকে আহ্বান করিতে হয় ‘যন্ত্রে’ ও ঘটে।” ঘটের উপর নবপত্রিকা স্থাপন করতে হয় এবং দুর্গাপূজার প্রধানতম অনুষ্ঠান এই নবপত্রিকাকে কেন্দ্র করেই। আবার, ওই নয়টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটিরই অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে এক-একটি দেবীর কল্পনা। তা হলে দুর্গাপূজার– অর্থাৎ, পরবর্তী ভারতবর্ষীয় ধর্মে মাতৃপূজা সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিব্যক্তিটির– ক্ষেত্রেও দেবীরহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সুস্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়। শ্রীযুক্ত চন্দ বলেছেন, এই কারণেই শাক্তরা প্রত্যুষে কুলবৃক্ষ বা কুলতরুকে প্রণাম করেন এবং আদি-পর্যায়ে শক্তি বা দুর্গা শস্যদেবী হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিলেন বলেই তাঁর নামান্তর অন্নদা বা অন্নপূর্ণা।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭০)

     তার মানে, বৃক্ষ-উপাসনাকে সিন্ধু-ধর্মের কোন এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে বরং এ-কথা অনুমান করাই যুক্তিসঙ্গত হবে যে, সুপ্রাচীন কাল থেকে ওই তথাকথিত বৃক্ষ-উপাসনা শাক্ত-ধর্মেরই একটি প্রধানতম উপাদান ছিলো। এখন প্রশ্ন হলো, শক্তি-সাধনা বা মাতৃ-উপাসনার সঙ্গে শস্য জগতের বা উদ্ভিদ-জগতের এ জাতীয় সম্পর্ক কেন? নৃতত্ত্ববিদেরা এ-প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন–
‘পৃথিবী বা প্রকৃতির ফলপ্রসূতামূলক কামনা থেকেই বসুমাতা বা আদ্যা-শক্তি বা জগদম্বা পরিকল্পনার উদ্ভব। অর্থাৎ, এই বসুমাতা-কল্পনার উৎসে আছে এক আদিম বিশ্বাস, সে-বিশ্বাস অনুসারে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা ও মানবীয় ফলপ্রসূতা সমগোত্রীয়। তাই শস্যদায়িনী প্রকৃতিও সন্তানদায়িনী মাতার অনুরূপ– প্রকৃতিও মাতৃরূপে পরিকল্পিত। অতএব প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও মানবীয় প্রজননের সংস্পর্শ বা অনুকরণের সঙ্গে সংযুক্ত। নৃতত্ত্ববিদদের পরিভাষায় এই আদিম বিশ্বাসের নাম ‘ফার্টিলিটি ম্যাজিক’– উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে দেশে দেশান্তরে যে-সব বহুবিধ আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত হয়েছে, নৃতত্ত্ববিদদের রচনায় তার বহুল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৭১)

      এ প্রেক্ষিতে ড. অতুল সুরের পর্যবেক্ষণটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ গ্রন্থে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন–
‘বাঙলার সঙ্গে সিন্ধুসভ্যতার ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে লোথালে ধান্যের ব্যবহার। চাউল বাঙালীর প্রিয় ও প্রধান খাদ্য। ধান্যের চাষ যে বঙ্গোপসাগরের আশপাশের কোন স্থানে উদ্ভূত হয়েছিল, এ সম্বন্ধে পণ্ডিতমহলে কোন দ্বিমত নেই। কারলো চিপোলো তাঁর ‘দি ইকনমিক হিস্টরি অভ্ ওয়ার্লড পপুলেশন’ গ্রন্থে এই মতই প্রকাশ করেছেণ এবং বাঙলাদেশকে নির্দেশ করেছেন।’
‘মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা প্রভৃতি নগরে মাতৃদেবীর পূজার যে ব্যাপক প্রচলন ছিল তা মৃন্ময়ী মাতৃকাদেবীর মূর্তিসমূহ থেকে প্রকাশ পায়। বাঙলাই মাতৃদেবীর পূজার লীলাকেন্দ্র। —মাতৃদেবীর পূজার উদ্ভব নবোপলীয় যুগে কৃষির সূচনার সঙ্গে ঘটেছিল। বাঙলায় নবোপলীয় বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ধান্যের চাষ নিয়ে। মনে হয়, ধান্যের চাষের সঙ্গে মাতৃদেবীর পূজা বাঙলাতেই শুরু হয়েছিল। ধান্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন লক্ষ্মী। লক্ষ্মীপূজার অপর নাম খন্দপূজা। খন্দ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ফসলাদি। লক্ষ্মীপূজা যে অতি প্রাচীনকাল থেকেই অনুসৃত হয়ে আসছে, তা লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি থেকেই প্রকাশ পায়। সূচনায় মাতৃদেবীর পূজা যে ফসলাদির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিল তা সিন্ধসভ্যতার কেন্দ্রে (হরপ্পায়) প্রাপ্ত এক সীলের ওপর খোদিত নারীমূর্তি থেকে প্রকাশ পায়। এই নারীমূর্তির যোনি-মুখ থেকে নির্গত হয়েছে পল্লবিত ছোট চারা-গাছ, লতা-পাতা, গুল্ম ইত্যাদি। ষাট বছর পূর্বে আমি আমার ‘প্রি-অ্যারিয়ান এলিমেন্টস্ ইন ইন্ডিয়ান কালচার’ গ্রন্থে বলেছিলাম যে মাতৃদেবী আদিতে যে শস্যাদির সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তা তাঁর অন্নপূর্ণা, শাকম্ভরী ইত্যাদি অভিধা থেকেই প্রকাশ পায়। অবশ্য অন্নপূর্ণা নামটি সংস্কৃত। কিন্তু আদিতে এই শব্দটির কী রূপ ছিল, তা আমরা জানি না। তবে প্রাচীন সুমেরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘এ-নান্না’ নামের সঙ্গে এর যথেষ্ট নৈকট্য আছে। (তুলনা করুন হিংলাজের অধিষ্ঠাত্রী ‘নানা’ দেবী)।’
‘মাত্র নামের সাদৃশ্য নয়। সুমের ও ভারতের মাতৃদেবীর কল্পনার মধ্যে এক অসাধারণ সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। এই উভয় দেশের মাতৃদেবীর মূলগত সাদৃশ্য হচ্ছে– (১) উভয়দেশেই মাতৃদেবী ‘কুমারী’ হিসাবে কল্পিত হয়েছিলেন, অথচ তাঁদের ভর্তা ছিল। বোধ হয়, মহাষ্টমীর দিন বাঙলাদেশে ‘কুমারী’ পূজা তারই স্মারক। (২) উভয়দেশেই মাতৃদেবীর বাহন ‘সিংহ’ ও তাঁর ভর্তার বাহন ‘বলীবর্দ’। (৩) উভয় দেশেই মাতৃদেবীর নারীসুলভ গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি পুরুষোচিত কর্ম, যথা যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। (৪) প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার লিপিসমূহে তাঁকে বারম্বার ‘সৈন্যবাহিনীর নেত্রী’ বলা হয়েছে। আমাদের দেশের ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর ‘দেবীমাহাত্ম্য’ বিভাগেও বলা হয়েছে যে দেবতারা যখন অসুরগণ কর্তৃক পরাহত হয়েছিলেন, তখন তাঁরা মহিষাসুরকে বধ করবার জন্য দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। (৫) মেসোপটেমিয়ার মাতৃদেবী পর্বতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট সেজন্য তাঁকে ‘পর্বতের দেবী’ বলা হত। ভারতে মাতৃদেবীর পার্বতী, হৈমবতী, বিন্ধ্যবাসিনী প্রভৃতি নাম তাই সূচিত করে। (৬) সুমেরে মাতৃদেবীর নাম ছিল ‘এ-নান্না’; সে নাম হিংলাজে ‘নানা’দেবীর নামে এখনও বর্তমান। (৭) সুমেরীয়দের পরিধেয় বসন ‘কৌনক’ তালপাতা দিয়ে তৈরী করা হত; প্রাচীন ভারতে দেশজ লোকদের পাতা ও ‘বল্কল’ পরিধান ও পর্ণশবরীর (দেবীর এক নাম) নাম আমাদের তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। (৮) দু’দেশেই ধর্মীয় গণিকাবৃত্তি (বা সাময়িকভাবে সতীত্বের বিসর্জন দেওয়া) প্রথা প্রচলিত ছিল। পশ্চিম এসিয়ায় এটার উদ্ভব হয়েছিল ঐন্দ্রজালিক (mimetic or homoeopathic) পদ্ধতি থেকে। সধবা ও অনূঢ়া উভয়দেশীর মেয়েরাই দেবীর প্রসন্নতালাভের জন্য সাময়িকভাবে তাদের সতীত্বের বিসর্জন দিত। বলা বাহুল্য, ভারতে এটা বামাচারী তন্ত্রধর্মের বৈশিষ্ট্য। সব তন্ত্রেই বলা হয়েছে মৈথুন ছাড়া কুলপূজা (তন্ত্র অনুযায়ী দেবীর পূজা) হয় না। যেমন, ‘গুপ্তসংহিতা’য় বলা হয়েছে, ‘কুলশক্তিম বিনা দেবী যো যপেত স তু পামর’। আবার ‘নিরুত্তরতন্ত্র’-এ বলা হয়েছে ‘বিবাহিতা পতিত্যাগে দুষণম্ ন কুলার্চনে’। তার মানে কুলপূজার জন্য সধবা স্ত্রীলোক যদি তার পতি ত্যাগ করে, তবে তার কোন দোষ হয় না। (৯) উভয়দেশেই দেবীপূজার সঙ্গে নরবলি প্রচলিত ছিল। (কালিকাপুরাণ, ৭ অধ্যায়)।’- (ড. অতুল সুর / ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, পৃষ্ঠা-৪১-৪৩)

     এখান যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় তা হলো, উপরে উল্লিখিত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিতে ‘যন্ত্র’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে ‘দুর্গোৎসবের সময় যে-প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডিমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে-উৎসব করিয়া থাকি সেই উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণঘটের; দেবীকে আহ্বান করিতে হয় ‘যন্ত্রে’ ও ঘটে।’ কেননা ‘যন্ত্র’ শব্দটি তন্ত্র-সাধনার পক্ষে অবিচ্ছেদ্য একটি উপাদান। তন্ত্রে একজাতীয় চিত্রের ব্যবহার আছে, সেগুলিকে যন্ত্র বলে–
‘যন্ত্র সাধারণত দুই প্রকার– পূজাযন্ত্র ও ধারণ-যন্ত্র। পূজাযন্ত্রে যে দেবতার পূজা করিতে হইবে, সেই দেবতার যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া তাহাতে পূজা করিতে হয়। ঐরূপ যন্ত্রকে পূজাযন্ত্র বলা হয়।
যে যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া ধারণ করা হয় তাহার নাম ধারণ-যন্ত্র। এই ধারণ-যন্ত্র ভূর্জপত্রে অঙ্কিত করিয়া ধারণ করিতে হয়।…
তন্ত্রে লিখিত আছে,– যন্ত্রে দেবতার অধিষ্ঠান হইয়া থাকে, এইজন্য যন্ত্র অঙ্কিত করিয়া দেবতার পূজা করিতে হয়। (বিশ্বকোষ-১৫/৪৫)

গন্ধর্বতন্ত্রে বলা হয়েছে–

‘বিনা যন্ত্রেণ চেৎ পূজা দেবতা ন প্রসীদতি। (গন্ধর্বতন্ত্র-৫/১)
অর্থাৎ : যন্ত্র ছাড়া পূজা করলে দেবতা সন্তুষ্ট হন না।

      তবে মাতৃকাভেদ তন্ত্রের মতে, যেখানে প্রতিমার পূজা হয় সেখানে যন্ত্র অঙ্কনের কোনো প্রয়োজন নেই। যন্ত্রও প্রতীক, প্রতিমাও প্রতীক, তাই একসঙ্গে দুটি প্রতীক অনাবশ্যক বলেই হয়তো মাতৃকাভেদ তন্ত্রে এমন বিধান দেয়া হয়েছে। তবে তন্ত্রাভিজ্ঞদের মতে অবশ্য যন্ত্র শুধু দেবীর প্রতীক নয়, তা শক্তিলেখও বটে। অগ্রসর সাধকের জন্যেই যন্ত্রপূজা। প্রত্যেক দেবীর আলাদা আলাদা যন্ত্র থাকলেও ভূপুর এবং পদ্ম সকল যন্ত্রেরই বৈশিষ্ট্য। তন্ত্র ও পুরাণ মতে পদ্ম হলো সৃষ্টির প্রতীক। কাজেই সৃষ্টির আদি কারণ স্বরূপিণী দেবীর পূজার জন্য যন্ত্র উৎকৃষ্ট আধার।
কখনো কখনো যন্ত্রের পরিবর্তে বিভিন্ন মণ্ডলেও দেবীর পূজা করার বিধান শাস্ত্রে পরিলক্ষিত হয়। কুলার্ণব তন্ত্রে তাই বলা হয়েছে–

‘মণ্ডলেন বিনা পূজা নিষ্ফলা কথিতা প্রিয়ে।
তস্মান্মণ্ডলমালিখ্য বিধিবত্তত্র পূজয়েং।। (কুলার্ণবতন্ত্র-৬/২০)
অর্থাৎ : মণ্ডল ছাড়া পূজা নিষ্ফল হয় বলে যথানিয়মে মণ্ডল এঁকে পূজা করতে হবে।

 

     দূর্গাপূজা মূলত পৌরাণিক পূজা হলেও দেবীপূজার সাধারণ নিয়মানুসারে এখানেও যন্ত্রে বা মণ্ডলে পূজার ব্যাপক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। আর তন্ত্রমতে এই যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র। ‘কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রগুলি যে পূজা, দেবতা ইত্যাদি আধ্যাত্মিক বিষয়ের চেয়ে প্রাচীনতর,– অর্থাৎ, পূজা ও দেবতাদির বিষয় পরে কৃত্রিমভাবে যন্ত্রগুলির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে,– যন্ত্রগুলিকে ভালো করে পরীক্ষা করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথমত, মোটের উপর একই চিত্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেবদেবীর সম্পর্ক বা ঐক্য পরিকল্পিত হয়েছে (বৃহৎতন্ত্রসারে বিভিন্ন যন্ত্রের চিত্র দ্রষ্টব্য)। তার থেকেই বোঝা যায়, উক্ত সম্পর্কাদির চেয়েও যন্ত্রগুলি প্রাচীনতর। দ্বিতীয়ত, বহু যন্ত্রের সঙ্গেই যন্ত্রসংযুক্ত দেবতাটির স্পষ্ট বিরোধ দেখা যায়। আধুনিক তান্ত্রিক গ্রন্থাদিতে কয়েকটি প্রসিদ্ধ যন্ত্রের নাম হলো, গণেশযন্ত্র, শ্রীরামযন্ত্র, নৃসিংহযন্ত্র, গোপালযন্ত্র, কৃষ্ণযন্ত্র, শিবযন্ত্র, মৃত্যুঞ্জয়যন্ত্র ইত্যাদি (বৃহৎতন্ত্রসার দ্রষ্টব্য)। উল্লেখিত দেবতাগুলি সকলেই পুরুষ। অথচ, যন্ত্রগুলি অবধারিতভাবেই নারী-জননাঙ্গের প্রতীকচিত্র।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪০২)

     তান্ত্রিক যন্ত্রগুলি যে নারী-জননাঙ্গের প্রতীকমাত্র, এ-বিষয়ে শ্রীচক্রপূজা প্রসঙ্গে স্যার ভান্ডারকরের বক্তব্য হলো–
‘It consists in the worship of picture of the female organ drawn in the centre of another consisting of a representation of nine such organs, the whole of which forms the `Sricakra’….The pictures are drawn on a`bhurja’ leaf or a piece of silken cloth or a gold leaf.’- (বিশ্বকোষ-১৫/৫৪৫)

     তার মানে, এভাবে নারী-জননাঙ্গের চিত্র অঙ্কন করবার পিছনে এক আদিম বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়; সেই বিশ্বাস হলো নারী-জননাঙ্গের উপরই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাও নির্ভরশীল। এ-বিষয়ে তন্ত্র-সাধনার আভ্যন্তরীণ তথ্যটুকুও যাচাই করে নেয়া যায়। যেমন, আদিতে দুর্গা যে শস্য-জননী ছিলেন এবং দুর্গোৎসব যে শস্য-উৎসবই ছিলো– সে-বিষয়ে শ্রীযুক্ত চন্দের বক্তব্য থেকেই জানতে পেরেছি আমরা। প্রমাণ হিসেবে তিনি কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, দুর্গোৎসব হলো শারদোৎসব– ফসল পাকবার ঋতু তখন। দ্বিতীয়ত, শাকম্ভরী, অন্নপূর্ণা প্রভৃতি দুর্গার নাম। তৃতীয়ত, দুর্গাপূজায় নবপত্রিকার গুরুত্ব। শ্রীযুক্ত চন্দের এই প্রমাণগুলি অসামান্য মূল্যবান নিঃসন্দেহে। তার সাথে প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতিটি স্মরণ করতে পারি–
‘আমাদের দেশে একটা রীতি প্রচলিত আছে যে, সিদ্ধ সাধকগণ জপ-যজ্ঞের ফলে যে ধ্যানগম্য মূর্ত্তি দর্শন করিয়া থাকেন, যাহার মানস পূজা করিয়া কৃতার্থ হন, স্তব স্তোত্রের ইশারায় তাঁহারা সেই রূপের বর্ণনা লোকসাধারণের শ্রবণগোচর করিয়া দেন। সাধারণ পূজকে সাধকের মুখ-নিঃসৃত স্তব শুনিয়া একটা রূপের, একটা প্রতিমার কল্পনা করিয়া লয়, এবং ধাতু, পাষাণ বা মাটির মূর্ত্তি গড়িয়া তাহারই প্রকাশ্যে পূজা অর্চ্চনা করে। লোকহিতের জন্য, সমাজে একটা ভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি অনুসারে বাঙ্গালায় মূর্ত্তিপূজার প্রচলন হইয়াছে। এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজা দুর্গার প্রতিমা গড়িয়া আমরা পূজা করিয়া থাকি, শত বর্ষ পূর্বে ঠিক এমনভাবে প্রতিমা বাংলার কারিকর গড়িত না। গোড়ায় যখন সিংহবাহিনীর মৃন্ময়ী মূর্তির পূজা এ দেশে প্রচলিত হয়, তখন কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী, কেহই ছিলেন না, তখন একা সিংহবাহিনী মহিষাসুর মথন করিতেছেন। সেকালের সিংহের চেহারা আর এক রকমের ছিল, মহিষাসুরও আজকালকার চোরা অসুরের মতন ছিল না। যাহার যেমন অভিরুচি হইয়াছে, যেমন শখ হইয়াছে, ধ্যানে যে যখন নতুন কিছু দেখতে পাইয়াছে, তখন সে তাহাই প্রতিমার সঙ্গে বসাইয়া দিয়াছে। কারণ, আসল কথা এই যে, দুর্গোৎসবের সময়ে যে প্রতিমা গড়াইয়া, চণ্ডীমণ্ডপ জোড়া করিয়া আমরা যে উৎসব করিয়া থাকি, সে উৎসবে ঠিক সেই প্রতিমার পূজা হয় না; পূজা হয় ভদ্রকালীর, পূজা হয় পূর্ণ ঘটের, দেবীকে আহ্বান করিতে হয় যন্ত্রে ও ঘটে; কেন না, ঘট ঐখানে পূজকের দেহঘটের অনুকল্প মাত্র। প্রতিমা বাহ্য শোভার জন্য রাখা হয় এবং লোকসাধারণের তুষ্টির জন্য উপার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সামান্য একটু পূজা করা হয়। কালীপূজাতেও ঐ একই ব্যাপার ঘটে। পঞ্চাশৎবর্ণরূপিণী মুণ্ডমালিনী কালীকে আরাধনা করিতে হয় বর্ণে বর্ণে, চক্রে চক্রে; মন্ত্রের উপর হোম করিতে হয়, মন্ত্রের উপর কালিকাশক্তির আহ্বান করিতে হয়। বাহিরের মূর্ত্তি অবলম্বন মাত্র, লোক দেখাইবার ছবি মাত্র।’ (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাবলী-২/২৬৫)

      তাহলে মূল কথা দাঁড়াচ্ছে, দুর্গাপূজার আদি-অকৃত্রিম রূপটিকে চিনতে হলে পুত্রকন্যাপরিবৃতা ওই দশভূজাকে বাদ দিয়ে যন্ত্র ও ঘটের উপরই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা প্রয়োজন। এর বর্ণনায় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোকায়ত দর্শন’ (পৃষ্ঠা-৪০৪-৯) এ বর্ণিত তথ্যমূলক দীর্ঘ বিবৃতির সহায়তা নিতে পারি–

     ‘দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ ওই যন্ত্র ও ঘটের দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা যাক। যন্ত্রটির নাম সর্বতোভদ্রমণ্ডল। এটি তন্ত্রের একটি বিখ্যাত যন্ত্র :
এই চিত্রটি আঁকবার নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে (বৃহৎতন্ত্রসার: ৭৪-৫)–

ষটত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেৎ পদ্মং সুলক্ষণম্ ।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা।।
দ্বারশোতোপশোভাস্রাং শিষ্টাভ্যাং পরিকল্পয়েৎ।
শাস্ত্রোক্তবিধিনা মন্ত্রী ততঃ পদ্মং সমালিখেৎ।।
পদ্মক্ষেত্রস্য সংত্যজ্য দ্বাদশাংশং বিহঃ সুধীঃ।
তন্মধ্যং বিভজেদ্বৃত্তৈস্ত্রিভিঃ সমবিভাগতঃ।।
আদ্যং স্যাৎ কর্ণিকাস্থানং কেশরাণাং দ্বিতীয়কম্ ।
তৃতীয়ং তত্র পত্রাণাং মুক্তাংশেন দলাগ্রকম্ ।।
বাহ্যবৃত্তান্তরালস্য মানেন বিধিনা সুধীঃ।
নিধায় কেশরাগ্রেষু পরিতোহর্ধনিশাকরান্ ।।
লিখিত্বা সার্দ্ধসংস্থানি তত্র সূত্রাণি পাতয়েৎ।
দলাগ্রাণাঞ্চ যন্মানং তন্মানাৎ বৃত্তমালিখেং।।
তদন্তরালং তন্মধ্যসূত্রস্যোভয়তঃ সুধীঃ।
আলিখেদ্বাহ্যহন্তেন দলাগ্রাণি সমন্ততঃ।।
দলমূলেষু যুগশঃ কেশরাণি প্রকল্পয়েৎ।
এতৎ সাধারণং প্রোক্তং পঙ্কজং তন্ত্রবেদিভিঃ।।
———————————————
অঙ্গুলোৎসেধবিস্তারাঃ সীমারেখাঃ নিতাঃ শুভাঃ।
কর্ণিকাং পীতবর্ণেন কেশরাণ্যরুণেন চ।।
শুক্ল-বর্ণানি পত্রাণি তৎসন্ধীন্ শ্যামলেন চ।
রজসা রঞ্জয়েন্মন্ত্রী যদ্বা পীতৈব কর্ণিকা।।
কেশরাঃ পীতরক্তাঃ স্যুররুণানি দলানি চ।
সন্ধয়ঃ কৃষ্ণবর্ণাঃ স্যুঃ সিতেনাপ্যসিতেন বা।।
রঞ্জয়েৎ পীঠগর্ভাণি পাদাঃ স্যুররুণপ্রভাঃ।
গাত্রাণি তস্য শুক্লানি বীথিষু চ চতসৃষু।।
আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্ ।
বর্ণৈনানাবিধৈশ্চিত্রৈঃ সর্ব্বদৃষ্টিমনোহরাম্ ।।
দ্বারানি শ্বেতবর্ণানি শোভা রক্তাঃ সমীরিতাঃ।
উপশোভাঃ পীতবর্ণাঃ কোণান্যসিতভানি চ।।
তিস্রো রেখা বহিঃ কার্য্যাঃ সিতরক্তাসিতাঃ ক্রমাৎ।
মণ্ডলং সর্ব্বতোভদ্রমেতৎ সাধারণং মতম্ ।।
অর্থাৎ :
তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে। পরে অবশিষ্ট দুই পংক্তি দ্বারা মধ্যস্থলে দ্বার, উভয় পার্শ্বে দুইটি করিয়া শোভা এবং শোভাদ্বয়ের পার্শ্বে দুইটি করিয়া উপশোভা এবং পরে কোণ প্রস্তুত করিতে হইবে। যে ৩৬টি ঘর লইয়া পদ্ম অঙ্কিত, তাহার দ্বাদশটি ঘর বাহিওে পৃথক রাখিয়া তন্মধ্যস্থ ২৪টি ঘরকে ৩টি বৃত্ত দ্বারা সমভাগে বিভক্ত করিবে। উহার প্রথম বৃত্ত কর্ণিকা, দ্বিতীয় বৃত্ত কেশর ও তৃতীয়টি পদ্মপত্র। যে দ্বাদশাংশ বাহিরে রাখা হইয়াছে, উহা পত্রের অগ্র। তৃতীয় বৃত্তের মধ্যস্থ স্থানের পরিমাণে পদ্মপত্র রচনা করিবে। কেশর সমূহের অগ্রভাগে অর্ধচন্দ্র অঙ্কিত করিবে। অর্ধচন্দ্রাকৃতি রেখা-সমূহের মধ্যভাগে সূত্রপাত করত পদ্মপত্রের অগ্রগুলির সমান মাপে বৃত্তরেখা আঁকিবে।
মধ্যস্থ সূত্রপাতের দুই পার্শ্বে স্থির হস্তে দলাগ্র আঁকিবে। দলমূলে দুই দুইটি করিয়া কেশর করিতে হয়। ইহাকেই তন্ত্রবেত্তারা সাধারণ পদ্ম কহেন।…
এক অঙ্গুলি উৎসেধ অর্থাৎ বেধ পরিমাণে শুভ্রবর্ণদ্বারা সীমারেখা সকল চিত্রিত করিয়া পীতবর্ণদ্বারা কর্ণিকা, রক্তবর্ণ গুণ্ডিকাদ্বারা কেশর ও শুক্লবর্ণদ্বারা পত্রসকল রঞ্জিত করিয়া শ্যামবর্ণে সমস্ত সন্ধিস্থানে চিত্রিত করিবে। প্রকারান্তরে যথা– কর্ণিকা পীতবর্ণ, কেশরসকল পীত রক্তবর্ণ, পত্রসকল রক্তবর্ণ, সন্ধি কৃষ্ণবর্ণ, পীঠগর্ভ শুক্লবর্ণ কিংবা কৃষ্ণবর্ণ, পীঠপাদ রক্তবর্ণ ও পীঠগাত্র শুক্লবর্ণ করিয়া বীথিচতুষ্টয়ে পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে। এই কল্পলতিকা দর্শনমনোহর করিবে। দ্বারসকল শুক্লবর্ণ, শোভা রক্তবর্ণ, উপশোভা পীতবর্ণ ও কোণ চতুষ্টয় কৃষ্ণবর্ণ করিবে। মন্ডলের বহির্দেশে শ্বেত রক্ত ও কৃষ্ণবর্ণ তিনটি রেখা চিত্রিত করিবে। এই প্রকারে সাধারণ সর্বতোভদ্রমণ্ডল নির্মাণ করিতে হইবে।

     এতোখানি জ্যামিতিক নিষ্ঠা নিয়ে, শোভা এবং উপশোভায় বিভূষিত করে, এই যে সর্বতোভদ্রমণ্ডলটি আঁকবার নির্দেশ পাওয়া গেলো, এর মূল কথা কী? তন্ত্রবেত্তারা জানেন, এর মূল কথা হলো অষ্টদলপদ্ম ও বীথিকা:
ষটত্রিংশতা পদৈর্মধ্যে লিখেৎ পদ্মং সুলক্ষণম্ ।
বহিঃপঙক্ত্যা ভবেৎ পীঠং পংক্তিযুগ্মেন বীথিকা।।
(অর্থাৎ : তন্মধ্যে ৩৬টি ঘর লইয়া সুলক্ষণ পদ্ম অঙ্কিত করিবে। ৩৬টি ঘরের বাহিরের এক পংক্তিতে পীঠ, তাহার পরের দুই পংক্তিতে বীথিকা হইবে।)

সুলক্ষণ পদ্ম এবং বীথিকা; ওই বীথিকার নাম কল্পলতিকা :

আলিখেৎ কল্পলতিকাং দল-পুষ্প-সমন্বিতাম্ ।
(অর্থাৎ : পত্র ও পুষ্প সহিত কল্পলতা সর্ববর্ণদ্বারা বিচিত্রিত করিবে।)

     প্রথমে মনে রাখা দরকার, তন্ত্রে এই পদ্ম এবং বীথিকার গুরুত্ব কতোখানি। কেননা, শুধুমাত্র সর্বতোভদ্রমণ্ডল নয়, প্রায় সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রেরই মূল বিষয়বস্তু বলতে এই পদ্ম এবং বীথিকাই। তান্ত্রিক যন্ত্রের ছবিগুলিকে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে খুঁটিনাটির তারতম্য থাকলেও অষ্টদলপদ্ম এবং বীথিকাই সমস্ত চিত্রের মূল বিষয়বস্তু।
অতএব, যন্ত্র-প্রসঙ্গে প্রধানতম প্রশ্ন ওঠে, ওই পদ্ম বা অষ্টদলপদ্মের প্রকৃত তাৎপর্য কী ? বাংলার পূজাপদ্ধতি এবং তন্ত্রেও যন্ত্র-সংকেতের সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় যাঁর আছে তিনিই জানেন, তন্ত্রে পদ্ম বা অষ্টদলপদ্ম নারী-জননাঙ্গের প্রতীক মাত্র। অনেক সময় তান্ত্রিক রচনায় পদ্ম শব্দটিকে একেবারে সোজাসুজি সেই অর্থেই গ্রহণ করা হয়। যথা :

‘পদ্মমধ্যে গতে শুক্রে সন্ততিস্তেন জায়তে।।’ (বিশ্বকোষ-৭/৫৪১)
(অর্থাৎ, পদ্মমধ্যে শুক্রের মিলনে সন্ততির জন্ম।)

     তন্ত্রে ‘পদ্ম’-শব্দের এই জাতীয় ব্যবহার একটুও দুর্লভ নয়। বৌদ্ধতন্ত্র প্রসঙ্গে আধুনিক বিশেষজ্ঞ বলছেন (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪০৯)–
‘Vajra’ (with the variant `mani’) is a decent or mystic phrase for `linga’, the male organ, just as `padma’, lotus, is the literary rendering of `bhaga’ or `yoni’.’
অর্থাৎ : বজ্র (বা মণি) শব্দ পুরুষ-অঙ্গবাচক, যেমন পদ্ম শব্দ হলো ভগ বা নারী-জননাঙ্গের সাহিত্যিক প্রতিশব্দ।

     তাহলে পদ্মের অর্থ নারীজননাঙ্গই। এই পদ্মই হলো সর্বতোভদ্রমণ্ডলের– তথা সমস্ত তান্ত্রিক যন্ত্রের– মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু সেই সঙ্গেই লক্ষ্য করা দরকার, তান্ত্রিক যন্ত্রগুলিতে শুধুমাত্র পদ্মের চিত্র নয়; পদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে বীথিকার সম্পর্ক কী? তান্ত্রিক যন্ত্র প্রসঙ্গে এই প্রশ্নটি স্বভাবতই সবচেয়ে মৌলিক। যুক্তি অনুসারে, এর মূলে আছে এক আদিম বিশ্বাস : যে-বিশ্বাস থেকে দেবীর নাম হয়েছিলো শাকম্ভরী, কিংবা, যে-বিশ্বাসের মূর্ত পরিচয় হরপ্পার ওই অত্যাশ্চর্য সীলটিতে টিকে আছে। এবং, এইভাবে প্রাকৃতিক উর্বরতার সঙ্গে মানবীর উর্বরতার সংযোগ কল্পনা করা হয়েছে বলেই তন্ত্রে নারী-জননাঙ্গকে উদ্ভিদ-বাচক নাম (লতা) দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো।
ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে জানা যায়– ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার বিশেষ বিশেষ ফুলকেই যন্ত্র হিসাবে ধরে নিয়ে তার উপর দেবীপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। ঐ ফুলগুলির অনেকগুলির ক্ষেত্রেই বাহ্যত দেখা যায় যোনি আকৃতি অথবা স্ত্রীপুং মিলনের আকৃতি। জগজ্জননীর পূজার আধার হয়েছে তাই ঐ সব পুষ্প। এ ফুলগুলিকে তান্ত্রিক মহলে বলা হয় যন্ত্রপুষ্প। শাস্ত্রকারের উক্তি হলো–

“যত্রাপরাজিতা পুষ্পং জবাপুষ্পঞ্চ বিদ্যতে।
করবীরে শুক্লরক্তে দ্রোণঞ্চ যত্র তিষ্ঠতি।
তত্র দেবী বসেন্নিতাং তদ্ যন্ত্রে চণ্ডিকার্চনম্ ।।”
( যেখানে অপরাজিতা, জবা, শ্বেতকরবী, রক্তকরবী ও দ্রোণপুষ্প থাকে, সেখানে চণ্ডিকাদেবী নিত্য বাস করেন। তাই এইসব যন্ত্রপুষ্পে দেবীর পূজা করবে।)

     এই তালিকায় পদ্মের নাম করা হয়নি। এর কারণ পদ্মকে শাস্ত্রকাররা স্বাভাবিক যন্ত্র বলে থাকেন।’- (ড. উদয়চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় / দুর্গামাহাত্ম্য ও পূজাপ্রসঙ্গ)

     এই আদিম বিশ্বাসটির দিক থেকে শক্তি-সাধনার তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তন্ত্রমতে নারী-জননাঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যেমন- ‘স্ত্রীভগং পূজনাধারঃ’ অর্থাৎ, ‘স্ত্রীভগ বা নারীযোনি হচ্ছে সকল উপাসনার আধার বা উৎস’; এজাতীয় কথা তন্ত্রে বহুবার পাওয়া যায়। তন্ত্রের একটি প্রসিদ্ধ সাধনার নামই হলো ‘ভগযাগ’। এছাড়া তন্ত্র সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের প্রচুর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কেননা, তন্ত্র-সাহিত্যে ‘লতা’ শব্দের একটি পারিভাষিক অর্থ আছে। সে-অর্থ হলো, নারী-জননাঙ্গ। তন্ত্র-সাধনায় অন্যান্য গুহ্য সাধনার মতো আরেকটি গুহ্য ও কঠিন সাধনার নাম লতা-সাধনা। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলছেন–
‘সে সাধনা অতি কঠোর, অতি দুরারাধ্য। শিব বলিয়াছেন যে, “ হে দেবি, তোমার মত নারী এবং আমার মতন পুরুষ হইলেই এই খেলা খেলিতে পারে। বরং ফণী ধরিয়া বিষভক্ষণ করা সহজ, বরং সিংহশার্দূলের সহিত যুদ্ধ করা সহজ, কিন্তু লতা-সাধনা অতি কঠিন, অতি কঠোর। যে পুরুষের নারীরূপ দেখিয়া কামমোহ উৎপন্ন হইতে পারে, যে রতিজন্য সুখাস্বাদে বিভোর হয়, সে যেন এমন কাজ না করে।” এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করিয়া শিব আবার বলিতেছেন,– সমস্ত জগৎকে স্ত্রীময় ভাবিতে হইবে। শক্তিই শিব, শিবই শক্তি– এই সমস্ত জগৎই শক্তির স্বরূপ। যিনি এই নিখিল জগৎ শক্তিরূপে দর্শন করিতে না পারেন, তিনি যে এ সাধনায় প্রবৃত্ত না হন।’- (পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী-২/২৫১)

গুপ্তসাধনতন্ত্রের প্রথম পটলেও দেখি মহেশ্বর শিব দেবী পার্ব্বতিকে বলছেন (গুপ্তসাধনতন্ত্র-১/৮-৯)–

কিঞ্চিন্ময়া তু চাপল্যাৎ কথায়ামি শৃণুষ্ব মে।
শক্তিমুলং জগৎ সর্ব্বং শক্তিমুলং পরন্তপঃ।। ৮
শক্তিমাশ্রিত্য নিবসেদ্ যত্র কুত্রাশ্রমে বসন্ ।
সাধকস্যার্চ্চিতাং শক্তিং সাধকজ্ঞানকারিণীম্ ।। ৯
অর্থাৎ :
দেবি! তোমার নিকট কুলাচার মাহাত্ম্য বর্ণন করা আমার চপলতা মাত্র। তথাপি তোমার নিকট যথাশক্তি কিঞ্চিন্মাত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। শক্তিই অনন্ত জগতের আদিকারণ এবং শক্তিই সমস্ত তপস্যার মূল। ৮।। সাধকগণ শক্তিকে আশ্রয় করিয়া যে কোন আশ্রমে বাস করুক না কেন, তাহাতেই তাহারা সিদ্ধিলাভ করিতে পারে। সাধকগণ শক্তির অর্চনা করিলেই সেই শক্তি সাধকের জ্ঞান প্রদান করেন। ৯।।

     এই কুলশক্তির অর্চনা করতে প্রয়োজন হয় কুলাঙ্গনার। কারণ গুপ্তসাধনতন্ত্রেই দেখতে পাই, মহেশ্বর পার্বতীকে বলছেন (গুপ্তসাধনতন্ত্র-১/১০-১৪)–

ইহলোকে সুখং ভুক্ত্বা দেবীদেহে প্রলীয়তে।
সাধকেন্দ্রো মহাসিদ্ধিং লব্ধ্বা যাতি হরেঃ পদম্ ।। ১০
পঞ্চাচারেণ দেবেশি কুলশক্তিং প্রপূজয়েৎ।
নটী কাপালিকী বেশ্যা রজকী নাপিতাঙ্গনা।। ১১
ব্রাহ্মণী শূদ্রকন্যা চ তথা গোপালকন্যকা।
মালাকারস্য কন্যা চ নবকন্যাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।। ১২
বিশেষবৈদগ্ধ্যযুতাঃ সর্ব্বা এব কুলাঙ্গনাঃ।
রূপযৌবনসম্পন্না শীলসৌভাগ্যশালিনী।। ১৩
পূজনীয়া প্রযত্নেন ততঃ সিদ্ধির্ভবেদ্ ধ্রুবম্ । ১৪
অর্থাৎ :
যে সাধক শক্তির আরাধনা করেন, তিনি ইহলোকে বিবিধ সুখভোগ করিয়া দেবীদেহে প্রলীন হইতে পারেন এবং সেই সাধকেন্দ্র শক্তিসাধনবলে মহাসিদ্ধি লাভ করিয়া অন্তে হরিপদ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ১০।। দেবেশি! পঞ্চাচার ক্রমে কুলশক্তির অর্চ্চনা করিবে। নটী, কাপালিককন্যা, বেশ্যা, রজকী, নাপিতপত্নী, ব্রাহ্মণী, শূদ্রকন্যা, গোপকন্যা ও মালাকারকন্যা ইহারাই নবকন্যা বলিয়া কীর্ত্তিত আছে। ১১-১২।। বিশেষতঃ যাহারা বিশেষ গুণশালিনী এইরূপ সর্ব্বজাতীয় রূপযৌবনসম্পন্না, সুশীলা ও সৌভাগ্যশালিনী কন্যাও কুলাঙ্গনা বলিয়া গ্রহণ করা যায়। ১৩।। উক্ত কুলাঙ্গনা সকলকে যত্নপুরঃসর পূজা করিবে। এইরূপ অর্চ্চনাদ্বারা সাধকের নিশ্চয়ই সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। ১৪।

     এক্ষেত্রে সম্ভবত সহজেই অনুমেয় হয় যে, বস্তুত কুলাচার বা কুলশক্তির অর্চনা ও লতা-সাধনার মধ্যে আদৌ কোন পার্থক্য নেই। তাহলে এরকম গুহ্য ও কঠিন লতা-সাধনার মূল কথাটা কী? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৩৯৯) উদ্ধৃতি টেনেছেন এভাবে–

‘এই সাধনার প্রধান অধিকরণ স্ত্রী, এইজন্য ইহাকে লতাসাধনা কহে। এই সাধনার বিষয় তন্ত্রে বর্ণিত হইয়াছে…
লতায়াঃ সাধনং বক্ষ্যে শৃণুস্ব হরবল্লভে।
শতং কেশে শতং ভালে শতং সিন্দুরমন্ডলে।।
স্তনদ্বয়ে শতদ্বন্দ্বং শতং নাভৌ মহেশ্বরি।
শতং যোনৌ মহেশানি উত্থায় চ শতত্রয়ম্ ।।
এবং দশশতং জপ্ত্বা সর্ব্বসিদ্ধিশয়ো ভবেৎ।
অথান্যৎ সংপ্রবক্ষ্যামি সাধনং ভুবি দুর্লভম্ ।।
রজোহবস্থাং সমানীয় তদ্ যোনৌ স্বেষ্টদেবতাম্ ।
পূজয়িত্বা মহারাত্রৌ ত্রিদিনং পূজয়েন্মনুম্ ।।
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
[ভাবার্থ : বিশ্বকোষ, ১৭ খন্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]

     বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক রুচি ও নীতিবোধের কাছে এ জাতীয় চিন্তাধারা বীভৎস কামবিকারের পরিচায়কমাত্র বলেই দেবীপ্রসাদ বাংলা তর্জমাটুকু এখানে উদ্ধত না করে কেবল সূত্র উল্লেখ করেছেন। প্রায় অনুরূপ কুলাচার পালন ও সাধনার বর্ণনা গুপ্তসাধনতন্ত্র’র চতুর্থ পটলে (গুপ্তসাধনতন্ত্র-৪/৩-৯) এবং কুমারীতন্ত্রেও (কুমারীতন্ত্র-৬/২১-২৩) দেখতে পাওয়া যায় (তন্ত্রের অধ্যায় দ্রষ্টব্য)।
আবার বৃহস্পতি তুল্য জ্ঞানবান হওয়ার যে প্রক্রিয়া এই তান্ত্রিক সাধনায় উক্ত হয়েছে, তাও রীতিমতো কৌতুহলোদ্দীপকই বলা যায়–

বৃহস্পতিসমো যন্তু ভবিতুং কাময়েন্নরঃ।
সর্ব্বো বৃহস্পতিসমো ভবেচ্চৈব ন সংশয়ঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/১৯)
সুন্দরীং যৌবনোন্মত্তাং নারীমানীয় নিত্যশঃ।
অষ্টোত্তরশতং জপ্তা কুলমামন্ত্র্য মন্ত্রবিৎ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২০)
মৈথুনং যঃ করোত্যেব স তু সর্ব্বং ফলং লভেৎ।
তন্মুখে চ মুখং চ দত্ত্বা সহস্রং মানসং জপেৎ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২১)
স ভবেৎ সর্ব্বসিদ্ধিদো নাত্র কার্য্যবিচারণা।
সর্ব্বেষাং সাধনাং মধ্যে শ্রেষ্ঠঃ স্যাৎ কুলসাধনম্ ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২২)
তস্মাৎ সর্ব্বপ্রযত্নেন সাধয়েৎ সুসমাহিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৫/২৩)।
অর্থাৎ :
যে ব্যক্তি বৃহস্পতি তুল্য জ্ঞানবান হইতে ইচ্ছা করে সে ব্যক্তি এই সাধনাপ্রভাবে বৃহস্পতিতুল্য জ্ঞানবান হইয়া থাকে, এতদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। ১৯।। প্রত্যহ সুন্দরী যৌবনোন্মতা কুলযুবতী আনয়নপূর্ব্বক প্রথমে কুলাগার অভিমন্ত্রিত করিবে। তৎপর মন্ত্রজ্ঞ সাধক অষ্টোত্তর শতবার কালিকামন্ত্র জপ করিয়া ঐ কুলস্ত্রীর সহিত মৈথুনে প্রবৃত্ত হইবে। এইরূপে কুলস্ত্রীর সহিত রতিক্রিয়া সম্পন্ন করিলে সাধক পূর্ণফল লাভ করিয়া থাকে। রতিকালে কুলযুবতীর মুখে মুখ প্রদান করিয়া এক-সহস্র সংখ্যক মানস জপ করিবে। ২০-২১।। যে ব্যক্তি এইরূপে কার্য্য করে সে সর্ব্বসিদ্ধিদাতা হইয়া থাকে। এতদ্বিষয়ে বিচার বিতর্ক অনাবশ্যক। সর্ব্বপ্রকার সাধন পদ্ধতির মধ্যে কুলাচারমতে সাধনই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং সর্ব্বপ্রযত্নে অত্যন্ত একাগ্রতার সহিত কুলাচার পদ্ধতিতে সাধন করিবে। ২২-২৩।

     বস্তুত, তান্ত্রিক মতের মূল চেতনা হলো- ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তাই আছে দেহভাণ্ডে।’ তান্ত্রিক সাধনার এই দৃষ্টিভঙ্গি শাক্ত-ধারণার সাধনরূপ মাত্র। রহস্য-চিহ্নায়ক তন্ত্র-নির্দেশনায় প্রাচীন তন্ত্র-সাধনার গূঢ়তত্ত্বে আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে পঞ্চমকারের তথ্য এখন হয়তো আর গোপন নেই। এক্ষেত্রে যদিও তান্ত্রিক রিচ্যুয়াল বা আধ্যাত্মিক তন্ত্রবিশ্বাস মতে বলা হয়ে থাকে, পঞ্চমকারের তাৎপর্য অতি গূঢ়, সাধারণের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। তবে তন্ত্রসাধনায় যত গূঢ় রহস্যই থাকুক না কেন, এটা যে কোন প্রাচীন উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসের মাধ্যমে বিবর্তিত এক কামপ্রধান আচারই হবে তা বিদ্বান গবেষকেরা দৃঢ়ভাবে অনুমান করেন। কিন্তু সবকথা ছাপিয়ে তন্ত্রসাধনায় বীজমন্ত্রের প্রাধান্যকে কখনোই অবহেলা করা হয়নি। যেমন-

কামেন মায়য়া চৈব পুটিতং কামবীজকম্ ।
তদা কামেশ্বরো মন্ত্রঃ সর্ব্বকামফলপ্রদঃ।। (কুব্জিকাতন্ত্রম্ : ২/৩৫)
অর্থাৎ : কামবীজ (ক্লীং) এবং মায়াবীজ (হ্রীং) দ্বারা কামবীজকে পুটিত করিলে, তাহা সর্ব্বকাম ফলপ্রদ কামেশ্বর মন্ত্র হয়। (ক্লীং হ্রীং ক্লীং হ্রীং ক্লীং)।

     তন্ত্রসাধকদের ধ্যান-ধারণায় একাক্ষরী বা দ্ব্যক্ষরী ইত্যাদি মন্ত্রচৈতন্য বা বীজমন্ত্রের ব্যবহার ও তার প্রতীকী কর্মশক্তি ও ফলপ্রদানের উপর প্রচণ্ড আস্থা ও বিশ্বাসের ছাপ আমরা ইতোমধ্যেই অনুধাবন করেছি। তাই দেখতে পাই, তন্ত্রে বলা হচ্ছে–

অস্যাঃ স্মরণমাত্রেণ জীবন্মুক্তশ্চ সাধকঃ।
একোচ্চারণমাত্রেণ অশ্বমেধাযুতং ফলম্ ।। (কুব্জিকাতন্ত্রম্ : ২/৪৯)
অর্থাৎ : কালিকামন্ত্র স্মরণমাত্রই সাধক জীবন্মুক্তি লাভ করে এবং একবার মাত্র উচ্চারিত হইলে অযুত অশ্বমেধযজ্ঞ সম্পাদনের ফল লাভ হয়।

     এবং এই বীজমন্ত্র যে কোন-না-কোনো দেবীশক্তির ধ্যানপ্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে তা তন্ত্রসাহিত্যগুলি ঘাটলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন তন্ত্রে এই শক্তিদেবীর বিভিন্ন নাম থাকলেও তান্ত্রিক আচারের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। কোথাও তিনি চণ্ডিকা, কোথাও অম্বিকা, কোথাও কামেশ্বরী, কোথাও চামুণ্ডা, কোথাও জগদম্বিকা, কোথাও তারা, কোথাও বা কালী বা কালিকা ইত্যাদি। কিন্তু তন্ত্রযোগের সাধনপ্রক্রিয়ায় এইসব মন্ত্রচৈতন্য তথা বীজমন্ত্রের ভূমিকা ও কার্যকর শক্তি যে কী বিপুল, তা তন্ত্রসাধনায় কুমারীতন্ত্রের ষষ্ঠ পটলের ‘কুলাচার-কথন’ উপাখ্যানের মাধ্যমেও অনুধাবন করা যায়, যেমন–

শ্রীদেব্যুবাচ-
দেবদেব মহাদেব জগৎপ্রলয়কারকঃ।।
কুলাচারে তু মদ্যাদ্যৈঃ কথং সিদ্ধির্ভবেৎ প্রভো।
অর্ধমকারনং হ্যেতৎ সংশয়ং ছিন্দি মে প্রভো।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/১)
শ্রীভৈরব উবাচ-
সাধু পৃষ্ঠো হি দেবেশি কথয়ামি শৃণুম্ব মে।
পুরা দারুবনে রম্যে মুনয়ো রাগমোহিতাঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/২)
পরস্ত্রিয়ং ধর্ষয়ন্তি মদ্যং পিবন্তি নিত্যশঃ।
তদ্দষ্টানুচিতং কর্ম্ম বির্ষ্ণুমাং সমুপস্থিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৩)
দেবদেব মহাদেব সৃষ্টিস্থিতিলয়াত্মকঃ।
প্রভো দারুবনে পাপা মদ্যপানরতাস্তথা।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৪)
পরস্ত্রিয়ং ধর্ষয়ন্তি মুনয়ো রাগমোহিতাঃ।
দিগম্বরাশ্চ মত্তাশ্চ কিং গতিশ্চ ভবিষ্যতি।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৫)
ইতি বিষ্ণুবচঃ শ্রুত্বা তমবাদমহং প্রিয়ে।
কালিকায়া মহাবিদ্যা অনিরুদ্ধঃ সরস্বতী।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৬)
বিদ্যারাজ্ঞীতি সা প্রোক্তা এতন্মন্ত্রপ্রজপকাঃ।
পরং মুক্তা ভবিষ্যন্তি তদ্গায়ত্রীং জপন্তি চ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৭)
কালিকায়াঃ প্রভাবেন সর্ব্বে দেবা বিমোহিতাঃ।
ভ্রুণহত্যা-মাতৃবধাৎ পরশুরামো বিমোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৮)
দত্তাত্রেয়শ্চ ত্রিপুরঃ সুরাপানাদ্বিমোচিতঃ।
ব্রহ্মহত্যা-শিরচ্ছেদাদহং রুদ্রোহপি মোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/৯)
গৌতমস্ত্রীধর্ষণাচ্চ দেবেন্দ্রোহপি বিমোচিতঃ।
কন্যায়া ধর্ষণাদ্বাপি ব্রহ্মাবাচং বিমোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/১০)
চাণ্ডালীগমনাদ্বাপি বশিষ্ঠোহপি বিমোচিতঃ।
রাবণস্য বধাচ্চাপি রামচন্দ্রো বিমোচিতঃ।। (কুমারীতন্ত্র : ৬/১১)
.
অর্থাৎ :
দেবী কহিলেন- হে দেবদেব মহাদেব। আপনি জগৎ প্রলয়কারক। হে প্রভু ! কুলাচারবিধি-নির্দ্দিষ্ট মদ্যাদি পঞ্চমকার অধর্ম্ম অর্থাৎ পাপ সৃষ্টির কারণ। সুতরাং তৎসমুদয় কিরূপে মন্ত্রসিদ্ধি-প্রদায়ক হইতে পারে প্রকাশ করিয়া আপনি আমার সন্দেহ দূর করুন। ১।
ভৈরব কহিলেন- দেবেশি ! তুমি অতি উত্তম প্রশ্ন করিয়াছ। আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতেছি, শ্রবণ কর। পুরাকালে মুনিগণ কামমোহিত চিত্তে রম্য দারুবনে নিয়ত মদ্যপান এবং পরস্ত্রী ধর্ষণকার্য্যে ব্যাপৃত ছিল। মুনিগণের এই সকল অন্যায় কার্য্য দর্শন করিয়া, বিষ্ণু আমার নিকট আসিয়া উপস্থিত হন। ২-৩।
তখন বিষ্ণু আমাকে বলিতে লাগিলেন, হে দেবদেব মহাদেব ! আপনি সৃষ্টি স্থিতি এবং লয়ের কর্ত্তা। হে প্রভো ! দারুবনে কামমোহিত মদ্যপায়ী পাপাত্মা দিগম্বর ও পানমত্ত মুনিগণ পরস্ত্রী ধর্ষণ করিতেছে। ইহাদের কি গতি হইবে। ৪-৫।
হে প্রিয়ে ! তৎকালে বিষ্ণুর এই কথা শুনিয়া আমি কহিলাম, কালিকা-নামক যে মহামন্ত্র এবং অনিরুদ্ধ যাহার সরস্বতী, যাহা মন্ত্রসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ- এই সকল মুনিগণ সেই মহামন্ত্র জপ করে। সেই কালিকা গায়ত্রী জপ করিয়া ইহারা সকলেই শ্রেষ্ঠ মুক্তি লাভ করিবে। ৬-৭।
কালিকাদেবীর প্রভাবে দেবতারাও বিমোহিত হইয়া থাকেন। কালিকাদেবীর প্রভাবে পরশুরাম ভ্রুণহত্যা ও মাতৃবধ পাপ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন। ৮।
কালিকাদেবীর প্রভাবে দত্তাত্রেয় এবং ত্রিপুর সুরাপানের পাপ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন। আমি রুদ্রও স্বয়ং ব্রহ্মহত্যা বা ব্রহ্মার শিরচ্ছেদরূপ পাতক হইতে কালিকাদেবীর প্রভাবেই মুক্তিলাভ করিয়াছিলাম। ৯।
সুরপতি ইন্দ্রও কালিকাদেবীর প্রভাবে গুরুপত্নী গৌতমীতে ধর্ষণজনিত পাপ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন এবং ব্রহ্মাও কন্যাধর্ষণহেতু পাপ হইতে, বশিষ্ঠ চাণ্ডালীগমন পাপ হইতে এবং রামচন্দ্র রাবণবধজনিত পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়াছিলেন। ১০-১১।

     সে যাই হোক, আমাদের আধুনিক যুগের পটভূমিতে এই তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতিকে যতো বীভৎস বিকৃতি বলে প্রতীয়মান হোক না কেন, সমাজবিকাশের যে-পর্যায়ে এগুলির উদ্ভব হয়েছিলো একমাত্র তারই পটভূমিতে এগুলির আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধান করা যাবে। অতএব, তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতিকে বীভৎস-বিকৃতি বলে নিজস্ব ধারণা-আরোপ করার আগে এই সাধনপন্থার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে অবহিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তন্ত্রের তত্ত্বদৃষ্টি প্রসঙ্গে আলোচনা অন্যত্র করা যাবে। কিন্তু দেবীপূজার প্রধান অঙ্গ হিসেবে তন্ত্র-বিহিত ‘যন্ত্র’ যে বস্তুত দেবী বা অনুরূপ কল্পনার প্রতীকী পরিকল্পনাই, সে বিষয়ে দ্বিধা থাকা সঙ্গত হবে না বলেই মনে হয়। গুপ্তসাধনতন্ত্রেও আমরা এই যন্ত্রে পূজার বিধান উল্লেখ দেখতে পাই (গুপ্তসাধনতন্ত্র-৮/১২-১৪, ১৬-১৭)–

শালগ্রামে মণৌ যন্ত্রে প্রতিমায়াং সুরেশ্বরি।
পুস্তিকায়াঞ্চ গঙ্গায়াং সামান্যে চ জলে তথা।। ১২
অথবা পুষ্পযন্ত্রে চ পূজয়েচ্ছিবলিঙ্গকে।
যন্ত্রভেদেন দেবেশি ফলং সম্যক্ প্রজায়তে।। ১৩
শালগ্রামে শতগুণং মণৌ তদ্বৎ ফলং লভেৎ।
যন্ত্রে লক্ষগুণং প্রোক্তং প্রতিমায়াং তথৈব চ।। ১৪
পুষ্পযন্ত্রে মহেশানি পূজনাং সর্ব্বসিদ্ধিভাক্ ।
শিবলিঙ্গে মহেশানি অনন্তফলমীরিতম্ ।। ১৬
ন কুর্য্যাৎ পার্থিবে লিঙ্গে দেবীপূজাদিকাঃ ক্রিয়াঃ।
পার্থিবে পূজনাদ্দেবি সিদ্ধিহানিঃ প্রজায়তে।। ১৭
অর্থাৎ :
শালগ্রামে, শিলাতে, মণিতে, যন্ত্রে, প্রতিমাতে, পুস্তকে, গঙ্গাতে, সামান্যজলে, পুষ্পযন্ত্রে অথবা শিবলিঙ্গে সাধক দেবীর পূজা করিবে। দেবেশি! যন্ত্রবিশেষে পূজা করিলে ফলের তারতম্য হইয়া থাকে। ১২-১৩।। শালগ্রাম শিলাতে দেবীর পূজা করিলে সেই পূজাতে শতগুণ ফললাভ হয়, মণিতে পূজা করিলেও উক্তরূপ ফললাভ হইয়া থাকে। যন্ত্রেতে ও প্রতিমাতে পূজা করিলে লক্ষগুণ ফল কথিত আছে। ১৪।। মহেশানি পুষ্পযন্ত্রে পূজা করিলে সাধক সর্ব্বপ্রকার সিদ্ধিভাগী হয়, শিবলিঙ্গে পূজা করিলে অনন্তফল হইয়া থাকে। ১৬।। প্রিয়ে! কদাচ পার্থিবলিঙ্গে দেবীর পূজাদি ক্রিয়া করিবে না, দেবী! পার্থিবলিঙ্গে পূজা করিলে সিদ্ধিহানি হইয়া থাকে। ১৭।।

 

     অতএব, আমাদের আলোচ্য দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ যে যন্ত্র ও ঘট, তান্ত্রিক প্রণালীতে ইতঃপূর্বে যন্ত্রের তাৎপর্য দেখেছি সর্বতোভদ্রমণ্ডলের আলোচনায়। এরপর সর্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হবে। এক্ষেত্রে ‘ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি’তে ঘট স্থাপন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে–
‘অনন্তর সর্বতোভদ্রমণ্ডলোপরি ঘট স্থাপন করিবে। যথা,– শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করিবে, তদুপরি ধৌত সুলক্ষণ ঘট, তাহাতে দধ্যক্ষত (দধি মাখানো আতপ চাউল) দিয়া শুদ্ধ জলপূর্ণ করিয়া স্থাপন করিবে। তাহার কণ্ঠে আচারৎ লাল সুতা ও আলতা দেওয়া হয়। মধ্যে পঞ্চপল্লব (আম্র, অশ্বত্থ, বট, পাকুড়, যজ্ঞীয়ডুম্বুর শাখা), অলভে কেবল আম্রপল্লব দিবে। তদভাবে দুইটি পানও দিবার ব্যবস্থা আছে। এক সরা চাউলে একটি হরিতকী কিংবা সুপারী দিয়া তদুপরি স্থাপন করিবে। তদুপরি একটি নির্দোষ সশীর্ষ ফল (নারিকেল অথবা কদলী) দিবে; ঐ ফলকে সিন্দুর রঞ্জিত করিবে। ঘটে একটি সিন্দুর পুত্তলিকা আঁকিবে, পুষ্পমাল্য দিয়া শোভিত করিবে…।’ (ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি-১/২৩৯)

     দেবীপ্রসাদ বলেন, সর্বতোভদ্রমণ্ডলের অর্থ হলো নারী-জননাঙ্গ : সর্বতোভদ্রমণ্ডলের উপর ঘট, ঘটের গায়ে সিন্দুরপুত্তলিকা– মানবীয় প্রজননের প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ নকল তোলবার আয়োজন। এইভাবে মানবীয় প্রজননের নকল তুলে কোন্ কামনা সফল করবার কল্পনা করা হচ্ছে তার আভাস আমরা আগেই পেয়েছি : নারী-জননাঙ্গের তান্ত্রিক নাম লতা, তান্ত্রিক যন্ত্রে অষ্টদলপদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা। অর্থাৎ, নারী অঙ্গের জননশক্তির স্পর্শে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার কল্পনা। ঘট-স্থাপনার মধ্যে সেই চেষ্টাকেই আরো একটু এগিয়ে নিয়ে যাবার আয়োজন করা হলো। শুদ্ধ মৃত্তিকায় পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করে ফসল ফলানোর মহড়া শুরু হলো। আর তারপর ঘটের উপরস্থ পল্লবকে স্পর্শ করে কামনা জানানো হবে :

‘ওঁ, অয়মূর্জাবতো বৃক্ষ উজ্জীব ফলিনী ভব। পর্ণং বনস্পতের্নুত্বা নুত্বা চ সুয়তাং রয়িঃ।’ (ক্রিয়াকাণ্ড-বারিধি-১/২৪০)
অর্থাৎ : হে শক্তিমতি বৃক্ষ, (তুমি) বাঁচিয়া ওঠো ও ফলবতী হও। বনস্পতির পাতাকে সেবা করিয়া ধন প্রসব করো।

     অনেক সময় ঘটের উপরের ডাবটির গায়েই সিন্দুরপুত্তলি এঁকে দিয়ে মানবীয় ফলপ্রসূতার সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সাদৃশ্যে বিশ্বাসকে আরো স্পষ্ট ও অভ্রান্ত করবার আয়োজন দেখা যায়। ওই যন্ত্র আর ঘটই হলো দুর্গাপূজার প্রধানতম অঙ্গ। তার মানে, কৃষি-আবিষ্কার পর্যায়ের এক আদিম বিশ্বাসই এ-পূজার প্রাণবস্তু। একটু গভীরভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, আদিপর্বে দুর্গাপূজা আসলে পূজাই ছিলো না। পূজার বদলে ছিলো জাদুঅনুষ্ঠান। জাদুঅনুষ্ঠানের মূল কথাটা হলো একটা কামনা সফল করবার চেষ্টাই। কিন্তু তা প্রার্থনা-উপাসনার সাহায্যে ঈশ্বরের করুণা উদ্রেক করে নয়। তার বদলে, কামনা সফল হওয়ার একটা নকল তুলে ওই নকলের সাহায্যেই বাস্তবভাবে কামনাটিকে সফল করবার কল্পনা। অষ্টদলপদ্মের ছবি এঁকে সিন্দুরপুত্তলীর ছবি এঁকে, মানবীয় ফলপ্রসূতার নকল তোলা হলো আর কল্পনা করা হলো প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার কামনাও এইভাবেই সফল হবে।
বলাই বাহুল্য, আমাদের আধুনিক চেতনার দিক থেকে এ-বিশ্বাস একেবারে অর্থহীন। নারী-জননাঙ্গের সঙ্গে প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সম্পর্ক কোথায়? কিন্তু আধুনিক চেতনার মাপকাঠিতে তন্ত্রকে বোঝা যাবে না। তার বদলে এই তান্ত্রিক বিশ্বাসটিকে ঠিকভাবে বুঝতে হলে পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের আচর-অনুষ্ঠানকে– বা পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের আচার-অনুষ্ঠানের স্মারকগুলিকে– বিচার করতে হবে। কিভাবে? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের তর্জমায় অধ্যাপক জর্জ টমসন-এর উদ্ধৃতি–
‘উত্তর আমেরিকায় ফসলে পোকা ধরলে ঋতুমতী মেয়েরা রাত্রে নগ্ন হয়ে ক্ষেতের উপর হাঁটে। ইয়োরোপের চাষীদের মধ্যে এ-প্রথা আজো টিকে আছে। খারাপ পোকার প্রতিষেধ হিসেবে প্লিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন, ঋতুমতী মেয়েরা খালিপায়ে এলোচুলে কোমরের ওপর পর্যন্ত কাপড় তুলে ক্ষেতের উপর হাঁটবে। কলিউমেল্লার মতে ডিমোক্রাইটসেরও সেই বিধান : তিনি বলেছেন, মেয়েরা খালিপায়ে আর এলোচুলে তিনবার দৌড়ে ক্ষেত প্রদক্ষিণ করবে। ধারণাটা স্পষ্ট এই যে, এ-অবস্থায় নারীদেহে যে-উর্বরাশক্তির আবির্ভাব হয় তাই এ-ভাবে ক্ষেতের মধ্যে সঞ্চারিত করা হবে। অন্যত্র দেখা যায়, ওই শক্তিকে নারীত্বের সহজাত শক্তি হিসেবেই মনে করা হচ্ছে। জুলুদের মধ্যে প্রথা হলো, ক্ষেতে ঘোরবার সময় মেয়েরা নগ্ন হবে, কিন্তু তখন ঋতুমতী যে হতেই হবে তা নয়। মেয়েদের জননাঙ্গ প্রদর্শন-মূলক অনুষ্ঠানাদিরও একই উৎস– এই অনুষ্ঠান গ্রীসে বিশেষ করে ডিমিটর-দেবীর সঙ্গে সংযুক্ত। নানান গ্রীক পূজাপদ্ধতিতে ব্যবস্থা দেখা যায়, পূজারিণীরা খালিপায়ে আর এলোচুলে সার বেঁধে হাঁটবে– ওই পূজাপদ্ধতিগুলিও একই জাতীয় ধারণা থেকে এসেছে।’ (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৪১২)

     নারী জননাঙ্গকেই মানুষ এককালে উৎপাদন-শক্তির আধার মনে করেছে আর তাই প্রাকৃতিক উৎপাদনে সংকট দেখা গেলে মেয়েরা নগ্নতার সাহায্যে সে-সংকট দূর করতে চেয়েছে।
এ প্রসঙ্গেই স্মর্তব্য যে আধুনিক বিদ্বানদের অনেকেই দাবি করেছেন, সিন্ধু-সভ্যতার প্রচলিত নানা চিত্রলিপি এবং অন্যান্য নিদর্শনের মধ্যে পরবর্তীকালে তন্ত্র সাধনায় ব্যবহৃত নানা চিত্রাবলীর সুস্পষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া যায়।
যেমন, ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে প্রত্ন-তত্ত্ব খননে এমন কিছু মাতৃমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে যে মাতৃমূর্তিগুলির রচনায় যোনি বা নারী-জননাঙ্গের উপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপণ করার চেষ্টা খুবই স্পষ্ট। তাছাড়া মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তুপ থেকে পোড়ামাটির যোনি-মূর্তিও এর জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। এই যোনি ক্রমশই জামিতিক ত্রিকোণের আকার ধারণ করেছে। কেননা তন্ত্র-সাধনায় যন্ত্র হিসেবে প্রচলিত চিত্রগুলির সঙ্গে এই মূর্তির নিম্ন-ভাগের সাদৃশ্যের আভাস পাওয়া যায় বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অভিমত। তন্ত্রে যেগুলিকে যন্ত্র বলা হয় সেগুলি আর কিছুই নয়, ওই নারী-জননাঙ্গের প্রতীক-চিহ্নমাত্র।

     আদিম মাতৃপ্রধান বা শক্তি-প্রধান চিন্তাধারা ক্রমশ কী করে নারী-জননাঙ্গ-কেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ-পর্যায়ে তার ব্যাখ্যা কী হতে পারে?–
‘প্রাচীন মাতৃমূর্তির পরিকল্পনায় যদি জননাঙ্গকেই ক্রমশ নারীদেহের প্রধানতম অবয়ব বলে গ্রহণ করবার চেষ্টা দেখা যায় তাহলে স্বভাবতই কৃষিভিত্তিক প্রচীন সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের মধ্যে নারীদেহের অন্যান্য অবয়ব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র যোনি বা নারী-জননাঙ্গের মূর্তি খুঁজে পাওয়া বিস্ময়ের ব্যাপার হবে না।…
মহেঞ্জোদারোর মানুষেরা এ-জাতীয় যোনি-মূর্তি রচনা করেছিলেন কেন? এর পিছনে নিশ্চয়ই প্রজননের কামনা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র প্রজননের কামনাই নয়। তার সঙ্গে জড়িত ছিলো ধনোৎপাদনের কামনাও– কৃষিকাজের সাফল্য-কামনাও। কেননা এই যোনি-মূর্তি মানব-বিশ্বাসের এমন এক স্তরের সাক্ষ্য বহন করছে, যেখানে শুধুমাত্র সন্তান-উৎপাদনই নয়– প্রাকৃতিক উৎপাদনও– নারী-জননাঙ্গের উপর নির্ভরশীল।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৩৯৫)

     ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসটির স্মারক সিন্ধু-সভ্যতার মধ্যেই পরিসমাপ্ত নয়, বরং উত্তরকালের তন্ত্র-সাধনার মধ্যেই যে তার অবিচ্ছেদ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, ইতোমধ্যে আমরা কিছুটা অবগত হয়েছি বটে। এবং আমাদেরকে এটা মনে রাখতে হবে যে, উত্তরকালের তান্ত্রিক আচারসম্পন্ন শাক্তসাধকদের কথিত প্রকৃতিসাধনার সঙ্গিনী হিসেবে যে সাধনসঙ্গীটি থাকেন, তিনি কিন্তু কোন-না-কোনোভাবে একজন কুলরমণীই। আর প্রাকৃতিক উৎপাদনের সাথে নারী জননাঙ্গের প্রাধান্যের ধারণাটি প্রোথিত আছে যে প্রাচীনতম বদ্ধমূল বিশ্বাসের উপর তা হলো এক উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস।

[পূর্বপোস্ট : মাতৃদেবতা পৃথিবী ও অন্যান্য] [×] [পরের পোস্ট : উর্বরতা-কেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 453,081 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 125 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 5 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

%d bloggers like this: