h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

শক্তি-সাধনা-০৪। প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম-সাধনা

Posted on: 02/10/2017


12046764_600559070082151_1963163237259047425_n

শক্তি-সাধনা-০৪। প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম-সাধনা
রণদীপম বসু

প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুটি মূল ধারা প্রবাহিত হতে দেখা যায়– একটি বৈদিক ধারা ও অপরটি বেদ-পূর্ব বা অবৈদিক ধারা। বৈদিক ধারাটি সুস্পষ্টভাবেই আর্যকেন্দ্রিক। আর যে অবৈদিক উপাদানগুলি তাদের স্বকীয় সত্তা নিয়ে কালক্রমে ভারতীয় সংস্কৃতির বিশেষত্বে ভিন্নমাত্রায় একাকার হয়ে আছে, তা হলো প্রাচীন সিন্ধু-সভ্যতা কেন্দ্রিক ধ্যান-ধারণা। ভারতীয় সংস্কৃতির উৎসধারা বলতে এককালে প্রাচীন বৈদিক ধ্যান-ধারণাকেই বুঝাতো, যা বৈদিক সাহিত্যের বিপুল সম্ভারের মধ্যে মূর্ত হয়ে আছে। কিন্তু ১৯২২ সালে শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে (বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত) সিন্ধু-উপত্যকায় মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে এক সুপ্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতার সাক্ষ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে সেই সাবেকী ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে ভারতীয় ইতিহাসের প্রাচীনত্ব হঠাৎ আরো কয়েক হাজার বছর বেড়ে যায়। সিন্ধু অঞ্চলে ১৯২২-২৭ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রাপ্ত প্রাগৈতিহাসিক নমুনা বিশ্লেষণ করে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হলো যে, এই সভ্যতাকে অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরানো বলতে হবে, এবং স্বীকার করতে হবে যে, সুমের আক্কাদ ব্যবিলন মিশর ও অ্যাসিরিয়ার মতো ভারতবর্ষও পৃথিবীতে প্রথম-সভ্যতার ইমারত গড়ে তুলতে অগ্রসর হয়েছিলো। এমনকি এটাও দেখা গেলো যে, কোন কোন দিক থেকে ভারতবর্ষের ওই প্রাচীন সভ্যতা সমসাময়িক মেসোপটেমিয়া এবং মিশরের তুলনায় উন্নততর ছিলো এবং পরিধির দিক থেকেও তা অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার চেয়ে ঢের বড়ো ছিলো। এবং সর্বশেষ গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে ইদানিং কেউ কেউ বলছেন যে, এই সভ্যতা ন্যুনতম আট হাজার বছরেরও প্রাচীন।

প্রাক-বৈদিক সিন্ধু-সভ্যতার পরিচয় ও তার ধ্যান-ধারণা বিষয়ে বর্তমান লেখকের ’চার্বাকের খোঁজে ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। তবে প্রাক্-আর্য ধর্মবিশ্বাস প্রসঙ্গে বিষয়গত কিছু আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবেই উত্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। ভারতবর্ষীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত মহেঞ্জোদারোর খননকাজ পরিচালনা করেন স্যার জন মার্শাল, ১৯৩১ সালে তাঁর বিবরণী প্রকাশিত হয়। এই বিবরণীর ভূমিকায় তিনি যে মন্তব্য করেন তার সংক্ষিপ্তসারটুকু দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের তর্জমায় উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক হবে। স্যার জন বলছেন–
‘এতদিন পর্যন্ত সাধারণত ধরে নেওয়া হতো, বিজয়ী আর্যদের তুলনায় ভারতবর্ষের প্রাক্-আর্য অধিবাসীরা সভ্যতার একেবারে নিম্নস্তরে পড়েছিল। স্পার্টানদের তুলনায় হেলটদের বা বাইজান্টাইন প্রভুদের তুলনায় স্লাভদের যে-দশা, বিজয়ী আর্যদের তুলনায় আর্য-পূর্বদের দশাও বুঝি সেই রকমই– সে-অবস্থা এমনই হীন ও পদানত যে তারা ‘দাস’ বলেই উল্লিখিত হয়েছে। ঋগ্বেদ-মন্ত্র থেকে তাদের নেহাতই এক কৃষ্ণচর্ম খর্বনাসা বর্বরের চিত্র সংগ্রহ করা হতো– ভাষা ও ধর্মবিশ্বাসের মতোই শারীরিক বৈশিষ্ট্যেও তারা সুপুরুষ আর্যদের তুলনায় অনেক নিকৃষ্ট। অবশ্যই মাঝে মাঝে স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে, তারা গো-সম্পদে সমৃদ্ধ এবং যুদ্ধে পারদর্শী ছিল এবং তাদের অনেক ‘পুর’ ছিল। কিন্তু বেদ-বিদেরা এই ‘পুর’ বলতে কোনো একরকম সাময়িক আশ্রয়স্থলই বুঝতেন– অর্থাৎ, সাদামাটা মাটির তৈরি কোনো ব্যবস্থা, হয়তো বা বেড়া দিয়ে কিংবা পাথরের কোনো রকম আদিম পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। কেননা আর্যদেরই তখনও গ্রাম্যাবস্থা, তাদের সমাজ-সংগঠনও সেই অনুপাতে আদিম। অতএব এ কথা কল্পনা করা কঠিন যে আর্যদের চেয়েও প্রাচীন ভারতবাসীরা– ওই ঘৃণ্য ও নীচ দাসেরা– সুগঠিত নগর বা দুর্গে বাস করতে পারে, বা অন্য কোনো দিক থেকে সভ্যতার উচ্চতর স্তরে উপনীত হতে পারে। বিজেতাদের তুলনায় তাদের মানসিক, দৈহিক, সামাজিক ও ধর্মমূলক নিকৃষ্টতার কথাই স্বতঃসিদ্ধ ছিল এবং ভারতীয় সভ্যতায় তাদের বিশেষ কোনো অবদান স্বীকার করা সম্ভব হয়নি। এ কথা মুহূর্তের জন্যও কল্পনায় আসেনি যে, পাঁচ হাজার বছর আগে– এমনকি আর্যদের নাম পর্যন্ত যখনও শোনা যায় নি– ভারতবর্ষের আর কোথাও হোক-আর-নাই-হোক অন্তত পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে এক উন্নত ও একান্ত স্বকীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। তার সঙ্গে মেসোপটেমিয়া এবং মিশর সভ্যতার সাদৃশ্য অত্যন্ত নিকট, যদিও কোনো কোনো দিক থেকে তা মেসোপটেমিয়া এবং মিশরের তুলনায় উন্নততর। কিন্তু হরপ্পা ও মোহেঞ্জোদাড়োর আবিষ্কার তর্কাতীতভাবে এই কথাই প্রমাণ করেছে। তার ফলে বোঝা গিয়েছে, যীশু খ্রিস্টের তিন হাজার বছর আগেও সিন্ধু-উপত্যকার অধিবাসীরা এক সু-উন্নত সভ্যতার বাহক ছিল এবং সে-সভ্যতার মধ্যে ইন্দো-আর্য সংস্কৃতির চিহ্নমাত্র নেই।— এ সভ্যতায় সমাজ-জীবন ছিল নগর-কেন্দ্রিক এবং কৃষিকাজ ও বাণিজ্যই তার ঐশ্বর্যের প্রধান উৎস। এই বাণিজ্যের ক্ষেত্র নানা দিকে এবং বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। —এ-সব দিক থেকে সিন্ধু-সভ্যতার সঙ্গে পশ্চিম এশিয়া ও মিশরের তাম্র-প্রস্তর সভ্যতার সাধারণ সাদৃশ্য আছে। কিন্তু অন্যান্য দিক থেকে সিন্ধ-সভ্যতা ছিল পাঞ্জাব ও সিন্ধুর নিজস্ব বিশিষ্ট সভ্যতা। —দু-একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়। —চারুশিল্প এবং ধর্ম-বিশ্বাসের দিক থেকেও সিন্ধু-সভ্যতার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য স্বীকারযোগ্য। —অবশ্য সিন্ধ-অধিবাসীদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অন্যান্য দেশবাসীর বিশ্বাসে নানা সাদৃশ্যও দেখা যায়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাদের ধর্মবিশ্বাস এমন একান্তভাবেই ভারতবর্ষীয় যে এমন কি আজকের দিনের হিন্দুধর্মের সঙ্গে– অন্তত বর্তমান হিন্দুধর্মের সর্বপ্রাণবাদ শৈবধর্ম ও শাক্তধর্মের সঙ্গে– সিন্ধু-সভ্যতার ধর্মবিশ্বাসের বিশেষ কোনো পার্থক্য নির্ণয় করা যায় না। সাধারণের মধ্যে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস বলতে আজও ওই শিব-উপাসনা এবং মাতৃ-উপাসনাই প্রধান।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৪৪-৪৫)

জন মার্শালের এই মন্তব্য থেকে দেবীপ্রসাদ তিনটি মূল বিষয় চিহ্নিত করেছেন। তা হলো–
এক।। সিন্ধু-সভ্যতা শুধু সুপ্রাচীন নয়, সু-উন্নতও ছিলো– বৈদিক সাহিত্যের চেয়ে অনেক প্রাচীন এবং বৈদিক-সাহিত্যে প্রতিফলিত মানব-উন্নতির চেয়ে অনেক বেশি উন্নতির পরিচায়ক।
দুই।। যারা বেদ রচনা করেছিলেন তাঁরা এ-সভ্যতা গড়ে তোলেন নি। সিন্ধু-সভ্যতা একান্তই আর্য-পূর্ব। স্বভাবতই এ সভ্যতার স্মারকগুলির মধ্যে বৈদিক প্রভাবের বা আর্য অবদানের চিহ্ন নেই।
তিন।। কিন্তু উত্তরকালের ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে– বিশেষত জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে– সিন্ধু-যুগের ধ্যানধারণা ও পূজা-উপাসনার সাদৃশ্য অত্যন্ত নিকট। অতএব অনুমান হয়, ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সুদূর সিন্ধু-যুগ থেকে একটি মূল ধারা প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়ে এসেছে এবং তার উপর বৈদিক সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই।

সিন্ধু সভ্যতার পরিকল্পিত নাগরিক জীবন থেকে প্রমাণ হয় এখানে একটি দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো। আবিষ্কৃত সীলগুলো প্রমাণ করে রাজ্য পরিচালনায় শাসক রাজা ছিলেন প্রধান। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে মন্দির বা উপাসনা গৃহের অনুপস্থিতি, লিপি পাঠোদ্ধার না হওয়ায় সিন্ধু সভ্যতার ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। তবে সিন্ধু লিপি পাঠোদ্ধার না হলেও আবিষ্কৃত সীল, পোড়ামাটির এবং পাথরের কিছু মূর্তি ও অন্যান্য প্রত্ন-নিদর্শন থেকে সে যুগের অধিবাসীদের ধর্মীয় ধারণা সম্পর্কে বেশ কিছু সাক্ষ্য পাওয়া যায়। এখানে উল্লেখ্য–
‘সিন্ধু-সভ্যতার যে নিদর্শনগুলিকে সাধারণত সীল বলে উল্লেখ করা হয় সেগুলি যে সত্যিই ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে শীলমোহর হিসেবে ব্যবহৃত হতো তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অর্থাৎ, সীল শব্দের ব্যবহার নেহাতই প্রথাগত।’ ‘বরং অধিকাংশ সীলের পিছনে সুতা পরাবার ব্যবস্থা থেকে অনুমান হয় তখনকার লোকেরা এগুলি তাবিজ হিসেবেই অঙ্গে ধারণ করত। অতএব প্রস্তাব হয়েছে, সীল না বলে এগুলিকে সীল-তাবিজ বলাই বাঞ্ছনীয়।’ ‘অন্তত এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে সীলগুলির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল। অধিকাংশ সীলের উপরেই কোনো-না-কোনো চিত্র এবং কিছু লেখা আছে। লেখাটুকু মন্ত্র ধরণের কিছু হতে পারে’, ‘যদিও লিপি-পাঠের অভাবে কোনো কথাই খুব বেশি জোর করে বলা যায় না। অতএব এই তথাকথিত সীলগুলির সঙ্গে সেকালের ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক অনুমিত হলেও সে-ধর্মবিশ্বাসের বৈশিষ্ট্য অনুমান করবার পক্ষে সীলের উপর অঙ্কিত চিত্রাবলীর উপরই নির্ভর করা সম্ভব। স্বভাবতই শুধুমাত্র এই ছবিগুলি বিচার করে সিন্ধু-ধর্মের কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য ধারণায় উপনীত হওয়া সম্ভব নয় : অজস্র সীলের উপর অজস্র ছবি, সেগুলিকে অবলম্বন করে অজস্র কথা কল্পনা করা যায়। তবুও সিন্ধু-ধর্মের সূত্র হিসেবে সীলগুলি মূল্যবান। কেননা অন্যান্য নিদর্শনের ভিত্তিতে সিন্ধু-ধর্ম সংক্রান্ত যে-কথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় তার উপর এই চিত্রাবলী মূল্যবান আলোকপাত করতে পারে। একথা স্বীকার করলে মানতে হবে, আমাদের জ্ঞানের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত অজস্র সীলের মধ্যে মাত্র কয়েকটি নির্বাচিত সীলই সিন্ধু-ধর্মের পরিচায়ক হিসেবে প্রাসঙ্গিক হবে। অপরপর সীলের চিত্রাবলীতে হয়তো সেকালে নানা রকম পৌরাণিক কাহিনী আঁকা আছে; কিন্তু এখনো তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৬০)

বলা বাহুল্য, ভারতীয় ধর্মের ইতিহাসে প্রাক্-বৈদিক ও অবৈদিক ধারাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোটামুটি তিনটি সূত্র থেকে এই ধারাটিকে চিহ্নিত করা যায়– প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সাক্ষ্য, প্রাচীন সাহিত্য উপাদান এবং এখনও টিকে থাকা উপজাতিদের ধর্মব্যবস্থার মধ্যে নৃতাত্ত্বিকদের অনুসন্ধানের মাধ্যমে অবৈদিক ধারাটিকে সনাক্ত করা। এ প্রেক্ষিতে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেন,–
‘প্রাক্-বৈদিক ধর্মব্যবস্থা সম্পর্কে যেটুকু তথ্য আমাদের হাতে আছে তা একান্তই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান নির্ভর। আজকের দিনের ভারতবর্ষে টিকে থাকা উপজাতিদের ধর্মব্যবস্থার যে পরিচয় নৃতত্ত্ববিদদের অনুসন্ধানের ফলে পাওয়া যায় তা থেকে অবৈদিক ধারাটিকে সনাক্ত করা সম্ভব, যদিও তা অবিমিশ্র নয় এবং সেখানে বৈদিক ধ্যানধারণার প্রভাব বর্তমান। কিন্তু প্রাক্-বৈদিক ও অবৈদিক ধারাটিকে বিশদভাবে জানার সবচেয়ে কার্যকর সূত্র হল ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্য ও নানা ধর্মব্যবস্থার আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য। যে পদ্ধতিকে পণ্ডিতেরা সংস্কৃতকরণ আখ্যা দেন, সেটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল যে তা কখনও একমুখী নয়। এই পদ্ধতির দ্বারা উচ্চতর সংস্কৃতির নানা দিক যেমন নিম্নতর ও উপজাতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে, তেমনই ওই সকল সংস্কৃতির অনেক বিষয়কেই উচ্চতর সংস্কৃতি আত্মসাৎ করে নিয়েছে। পাঞ্চরাত্র, পাশুপত প্রভৃতি সম্প্রদায় বেদবাহ্য বলে ঘোষিত হলেও পরে সেগুলি বৈদিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত হয়ে যায়। একথা তন্ত্রের ক্ষেত্রেও সত্য। সাংখ্যদর্শন শঙ্করাচার্য কর্তৃক ‘বেদবিরোধী’ এবং ‘বেদানুসারী মনুবচনের বিরোধী’ বলে ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও তা শাস্ত্রের মর্যাদা পেয়েছে।’
‘এই গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে সর্বযুগেই ব্রাহ্মণদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। ভারতীয় ধর্মের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ্যধর্ম বলে কোন ধর্ম কোনদিনই ছিল না, কিন্তু সকল ধর্মের ক্ষেত্রেই ব্রাহ্মণদের প্রভাব ছিল অপরিসীম, কেননা আধুনিক ইংরাজীতে যাকে বলা হয় একসপার্টাইজ, যে কোন ধর্মের তত্ত্বগত ও প্রয়োগমূলক দিকের ক্ষেত্রে সেটি ব্রাহ্মণদের বরাবরই ছিল। তাই আমরা দেখি যে এমনকি বেদপ্রামাণ্যবিরোধী বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব ব্রাহ্মণদের হাতেই স্বাভাবিকভাবে চলে এসেছিল। বুদ্ধের ‘সিংহগর্জনকারীদের’ মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ আচার্যগণও ছিলেন প্রধানত ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধধর্মের তত্ত্ব ও দর্শনের বিকাশ প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণদের হাতেই হয়েছিল। এই কারণেই বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের ব্যাখ্যামূলক ও দার্শনিক সাহিত্য কালক্রমে পালি ও প্রাকৃতের পরিবর্তে সংস্কৃতভাষাতেই রচিত হয়। অবৈদিক, উপজাতীয় ও লৌকিক বিষয়াবলীর সংস্কৃতকরণের ক্ষেত্রে চারটি পর্যায় ও মাত্রাভেদ ছিল, যথা- পূর্ণ, অংশ, কলা ও কলাংশ। ভিন্ন সংস্কৃতির যতটা যে মাত্রায়– অর্থাৎ সমগ্রভাবে, অথবা আংশিকভাবে, অথবা ভগ্নাংশে অথবা আরও স্বল্পতর মাত্রায়– গৃহীত হত, সামাজিক স্তরবিন্যাসে সেই সংস্কৃতিভুক্ত মানুষদের মর্যাদার স্থান সেই অনুপাতে নির্ণীত হত; অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যসংস্কৃতির যারা যত নিকটে তাদের সামাজিক মর্যাদা অর্থাৎ জাতিকাঠামোর সোপানে তাদের অবস্থান তত উপরের দিকে এবং যারা যত দূরবর্তী তাদের অবস্থান তত নীচের দিকে। এই পদ্ধতির কিন্তু আজও বিরাম নেই।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট)

প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে যে বিষয়টি মনে রাখা আবশ্যক তা হলো, রাজনৈতিক ঘটনাবলির গতিপ্রকৃতির মতোই, ধর্মব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের বিবর্তন, এমনকি শিল্পকলা ও সাহিত্যের ভঙ্গি ও পদ্ধতিসমূহ, সবকিছুই উৎপাদন-ব্যবস্থা ও উৎপাদন-সম্পর্কসমূহের বিকাশের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। এতদঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিভিন্ন মানের সংস্কৃতির সীমায় আবদ্ধ থাকার দরুন এবং সেগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক ক্ষীণ হবার কারণেই, যাদের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা ও বিবর্তনকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে চালানো হয়, তারা মূলতঃ উচ্চবর্ণের মানুষ, সর্বস্তরের মানুষ নয়। উৎপাদন-ব্যবস্থার উন্নততর কলাকৌশলের সঙ্গে অর্ধোন্নত ও একান্ত অনুন্নত কলাকৌশল ও তার সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান এখনকার মতোই প্রাচীন ভারতবর্ষের বৈশিষ্ট্য ছিল এবং তার বহু বাস্তব চিত্র অতীত যুগের রচনাবলি থেকে পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে আমরা দেখি–
‘ঋগ্বেদে উল্লিখিত ‘পঞ্চকৃষ্টি’র ব্যাখ্যা যাস্ক করেছেন ‘পঞ্চমনুষ্যজাতানি’ বলে যার অর্থ চাতুর্বর্ণ্যসহ পঞ্চম বর্ণ নিষাদ। যজুর্বেদের রুদ্রাধ্যায়ে নিষাদ হিসাবে আট জাতের মানুষকে উল্লেখ করা হয়েছে যাদের মধ্যে ব্রাত্য, পুঞ্জিষ্ঠ, স্বনিন্ এবং মৃগায়ু শিকারজীবী বলে কথিত। পদ্মপুরাণে (২/২৭/৪২-৪৩) নিষাদদের বংশধর হিসাবে কিরাত, ভিল্ল, নাহলক, ভ্রামর ও পুলিন্দদের কথা বলা হয়েছে। শবরেরা ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (৭/১৮) শিকারজীবী জাতি বলে উল্লিখিত হয়েছে। পুরাণসমূহের জনপদতালিকায় তাদের বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা বলা হয়েছে।… শবরদের মতো পুলিন্দরাও শিকারজীবী উপজাতি ছিল যাদের কথা অশোকের লিপিতে বলা হয়েছে। বৃহৎসংহিতায় (৪/২২ ইত্যাদি) তাদের ‘গণ’ বা উপজাতি বলা হয়েছে। পুলিন্দদের তিনটি শাখা ছিল– একটি পশ্চিমী শাখা, একটি হিমালয় অঞ্চলীয় শাখা যা কিরাত ও তঙ্গনদের সঙ্গে সম্পর্কিত, এবং একটি দক্ষিণী শাখা। বাজসনেয় সংহিতায় (৩০/১৬) কিরাতদের হিমালয়ের অধিবাসী বলা হয়েছে। নিষাদদের মত কিরাত নামটিও একটি ব্যাপক অর্থে প্রযুক্ত হত। এছাড়া অন্ধ্র, পুণ্ড্র প্রভৃতি আরও বহু শিকারজীবী উপজাতি প্রাচীন সাহিত্যে বর্ণিত হয়েছে।’

প্রাচীন গ্রন্থসূহের সাক্ষ্য থেকে এই সব উপজাতিদের ধর্ম সম্বন্ধে যা জানা যায় তা হচ্ছে, তারা মূলত জগৎ ও জীবনের উৎস হিসেবে মাতৃকাদেবীর উপাসক ছিল। যেমন–
‘দেবীর বর্ণনাপ্রসঙ্গে হরিবংশে (৪৮অ) সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে তিনি শবর, বর্বর ও পুলিন্দদের দ্বারা বিশেষভাবে পূজিতা হন (শবরৈর্বর্বরৈশ্চৈব-পুলিন্দৈশ্চ পুপূজিতা)। মহাভারতের দুর্গাস্তোত্রে (৪/৬) দেবীকে বিন্ধ্যপর্বত অঞ্চলের নিবাসিনী বলা হয়েছে; শুধু তাই নয় তিনি মদ্য-মাংস-পশু-প্রিয়া রূপে কল্পিতা হয়েছেন, যা থেকে স্পষ্টই সে যুগের উপজাতীয় শিকারজীবী মানুষদের সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক প্রমাণিত হয়। মহাভারতের কিরাতপর্বাধ্যায়ে শিব ও দেবী যথাক্রমে কিরাত ও কিরাতিনীর ছদ্মবেশেই অর্জুনের সামনে হাজির হয়েছিলেন। ‘বরাহপুরাণে’ (২৮/৩৪) দেবীকে কিরাতিনী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বাক্পতির গৌড়বহো নামক প্রাকৃত কাব্যে (শ্লোক ৩০৫) দেবীকে শবরী বলা হয়েছে। বৌদ্ধদেবী পর্ণশবরী আদিতে বৃহৎসংহিতা কথিত পর্ণশবর উপজাতির দেবী ছিলেন। দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গের নাম শাবরোৎসব বা শবরদের উৎসব যা অনুষ্ঠিত হত বিজয়াদশমীর দিনে। জীমূতবাহনের কালবিবেক গ্রন্থে এই শাবরোৎসবের বিশদ বর্ণনা আছে। বাক্পতির পূর্বোক্ত গ্রন্থে (শ্লোক ২৮৫-৩৪৭) বিন্ধ্যবাসিনী দেবীকে কালী ও পার্বতীর সঙ্গে অভিন্ন ঘোষণা করা হয়েছে এবং সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই দেবী কোল ও শবরদের দ্বারা পূজিতা হন এবং এঁর সামনে নরবলি দেওয়া হয়। বাণভট্টের কাদম্বরীতে (পূর্বভাগ/কথামুখ) দেবীর সম্মুখে নরবলি দিয়ে শবরদের পূজা পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। সুবন্ধুর বাসবদত্তায় শবরদের উপাসিতা রক্তপিপাসু দেবী কাত্যায়নী বা ভগবতীর উল্লেখ আছে। ভবভূতির মালতীমাধবেও এই ধরনের দেবীর পরিচয় পাওয়া যায়।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট)

প্রাচীন গ্রন্থসমূহে পিছিয়ে-পড়ে-থাকা উপজাতিদের যে চিত্র আঁকা আছে, তাদের জীবনযাত্রার পদ্ধতির যে বর্ণনা দেওয়া আছে সেগুলির সঙ্গে আজকের যুগের উপজাতি জীবনের বিশেষ কিছু পার্থক্য নেই বলে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন। কালধর্মে বহিরঙ্গের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে এইমাত্র। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী–
‘ভারতের উপজাতীয় ধর্মব্যবস্থার কয়েকটি বিশেষ দিক আমাদের চোখে পড়ে। প্রথমটি হচ্ছে হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে তাদের নিজস্ব দেবদেবীর সমীকরণ, বিশেষ করে শিব ও দেবীর সঙ্গে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, অন্যান্য দেবতা থাকলেও, ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন মাতৃদেবী যাঁর পূজার প্রধানতম উপকরণ হচ্ছে বলিদান, এবং সেটা নরবলি হলেই ভাল হয়। অসমের চুটিয়া উপজাতিদের ধর্ম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গেইট বলেছেন যে তাদের দেবতা কেচাই-খাতি কালীর সঙ্গে অভিন্না হিসাবে বিবেচিতা যাঁর পূজারীদের বলা হত দেওরি। পূর্বে এই দেবীর সামনে নরবলি দেওয়া হত। আসামের বিখ্যাত দেবী কামাখ্যাও যে এককালে পরম রক্তপিপাসু ছিলেন, তার প্রমাণ যখন তাঁর নূতন মন্দিরের উদ্বোধন হয় তখন তাঁকে ১৪০ জন লোকের মাথা উপহার দেওয়া হয়েছিল। কামরূপে এক শ্রেণীর লোক ছিল যাদের বলা হত ‘ভোগী’ যারা নিজেরাই ঘোষণা করত যে দেবী তাদের চেয়েছেন, এবং বলিপ্রদত্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা চরম সুখভোগের অধিকারী ছিল সর্ব অর্থেই। আদিতে এই দেবী ছিলেন সম্ভবত খাসি উপজাতির মাতৃদেবী কা-মে-খা, যিনি পরে কামরূপের জাতীয় দেবীতে এবং আরও পরে তান্ত্রিক দেবী হিসাবে সর্বভারতে প্রসিদ্ধা হয়ে ওঠেন। কামাখ্যার কোন মূর্তি নেই, তিনি যোনিরূপে পূজিতা, প্রস্তরনির্মিত একটি যোনি তাঁর প্রতীক। এই দেবী নির্দিষ্ট সময়ে রজস্বলা হন এবং সেই রজঃ, যা বর্তমানে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়, পরম পবিত্র জীবনদায়িনী শক্তি হিসাবে ভক্তগণের নিকট বিবেচিত। উড়িষ্যার উপজাতীয় দেবীরা ঠাকুরাণী বা গ্রামদেবতা নামে পরিচিত, এবং তাঁদের প্রত্যেকেই রক্তপিপাসু, যাঁদের মধ্যে আবার বিখ্যাত হচ্ছেন গঞ্জাম জেলার অরাবা, বাবুরি এবং ভোণ্ডারিদের ঠাকুরাণীরা। কেওনঝরের ভুনিয়া বেন্দকর বা শবর প্রভৃতি উপজাতিদের ঠাকুরাণীরা আগে নরবলি গ্রহণ করতেন। শুল্কিদের উপজাতীয় দেবী স্তম্ভেশ্বরী প্রথমে শাক্ত একানংসা ও পরে জগন্নাথ-ভগিনী সুভদ্রায় রূপান্তরিতা হন।’- (ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট)

এছাড়া বিভিন্ন উপজাতির পূজিত আরও অনেক পুরাতন মাতৃদেবী রয়েছেন। যেমন– ‘উত্তরভারতের আহিরদের মাতৃদেবী সচরাচর দেবী নামেই পরিচিত, যাঁর প্রেমিক সর্বত্রই শিব। ওঁরাওদের— শিকারের দেবী— চণ্ডা বা চণ্ডী।— বেদিয়াদের মাতৃদেবী কালী, জ্বালামুখী প্রভৃতি নামে পূজিতা।— পালামৌ জেলার কারোয়ারদের দেবীর নাম চণ্ডা বা চন্দা যিনি বিহার ও উত্তরপ্রদেশের নানাস্থানে ধর্তি (ধরিত্রী), পুর্গাহৈলি বা ডাকিনী, জ্বালামুখী, অঙ্গারমতী প্রভৃতি নামে পূজিতা হন। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের শাওরা বা শবরদের মধ্যে শীতলা-মাই ও বনসুরী দেবী জনপ্রিয়।— ছোটনাগপুরের কুর-রা নাগ-ভুইয়ান বা নাগমাতার পূজা করে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের কালোয়াররা কালী, দুর্গা, রৎমা প্রভৃতির পূজা করে। মাঝোয়ারদের দেবীর নাম দেওহারিন, তারা নাগিন নামক সর্পদেবীর পূজা করে। মাল, মাল-পাহাড়ী প্রভৃতির মধ্যে মনসার ব্যাপক প্রভাব আছে। মধ্যপ্রদেশের শবরদের প্রধান দেবী ভবানী।— মাহারদের দেবীর নাম আই-ভবানী, প্রত্যেক ঘরে ঘরে যাঁর মূর্তি থাকে। বসন্তের দেবীরা নানা নামে পূজিতা। গোন্দদের মধ্যে তিনি দন্তেশ্বরী। তাঁর অপরাপর নাম মাতা, দেবী, শীতলা, পার্বতী, বজর প্রভৃতি।— রাজস্থানের উপজাতীয় দেবীরা সচরাচর মামাদেবী, শাকম্ভরী, মাতা-জননী, আশাপূর্ণা প্রভৃতি হিন্দু নামে পরিচিতা। সবচেয়ে প্রভাবশালী হচ্ছে শস্যদেবী গৌরী।’
এ সকল উপজাতীয় ধর্মব্যবস্থায় দেবীপ্রাধান্য থাকলেও পুরুষ দেবতাদের কিছু ভূমিকা আছে। এ সকল দেবীর স্বামী সচরাচর শিব। এঁদের অধিকাংশই ভূমি ও কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিতা। এঁরা কোন বৃহৎ প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক নন, ছোটখাটো গ্রাম্য ব্যাপার নিয়ে এঁদের কারবার, যেমন কৃষিকাজ, পশুরোগ, অনাবৃষ্টি, কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি। ভারতের সর্বত্রই পৃথিবীকে দেবী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাঁর অলৌকিক ক্ষমতায় আস্থা রাখা হয়।

ধর্মব্যবস্থায় যেহেতু এতদঞ্চলের আধুনিক পরিস্থিতিতেও প্রাচীন অবস্থার অনেক কিছু টিকে আছে, তাই প্রাচীন অবস্থাকে বোঝার জন্য আধুনিক অবস্থায় নিম্নতর পর্যায়গুলিতে আটকে থাকা পরিস্থিতির যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় নৃতত্ত্ব ও প্রাচীন সাহিত্য যে সকল তথ্য হাজির করে সেগুলিকে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যাবলির আলোয় বিচার করা, কেননা প্রাচীন মানুষ যা ‘করেছিল’ তারই নিদর্শন প্রত্নতত্ত্ব আমাদের সামনে হাজির করে। ‘ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস’ গ্রন্থের ‘ঐতিহাসিক পটভূমি : প্রাক্-বৈদিক যুগ’ অধ্যায়ে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে আহরিত কিছু নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষা উপস্থাপন করেছেন। এ পর্যায়ে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলির সহায়তা নিতে পারি।

নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পিছিয়ে-পড়ে-থাকা ট্রাইবগুলিকে, তাদের খাদ্য সংস্থান পদ্ধতির ভিত্তিতে মূলতঃ তিন ভাগে ভাগ করা হয়– শিকারী (নিম্ন ও উচ্চ), পশুপালক (নিম্ন ও উচ্চ) এবং কৃষিজীবী (নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ)।
উচ্চ শিকারজীবী পর্যায়ে কিছুটা উন্নত ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার, হাঁড়িকুড়ি তৈরি, কাপড় বোনা এবং পশুকে পোষ মানানোর কিছু কিছু নিদর্শন পাওয়া গেলেও, এই সমাজে কোন পেশাদার শ্রেণীর সৃষ্টি হয় না। নিম্ন পশুপালক পর্যায় নিছকই পশুপালন নির্ভর, যেখানে শিকারের ভূমিকা থাকলেও কৃষি অনুপস্থিত। অনুরূপভাবে নিম্ন ও মধ্য কৃষিজীবী পর্যায়ে, ভক্ষ্য হিসেবে পশুর স্থান থাকলেও উৎপাদন-ব্যবস্থায় তার কোন ভূমিকা নেই। কিন্তু উচ্চ-পশুপালক পর্যায়ে পশু পালনের সঙ্গে কৃষি যুক্ত হওয়ায় এবং উচ্চ-কৃষিজীবী পর্যায়ে কৃষির সঙ্গে পশুপালন যুক্ত হওয়ায়, উৎপাদন ব্যবস্থার গুণগত রূপান্তর ঘটে। তাই পশুপালক ও কৃষিজীবী পর্যায়স্তরের উচ্চতর স্তরগুলিতে কারিগরি বিদ্যা, স্থায়ী আবাস স্থাপন ও ধাতুর ব্যবহার বহুলাংশে বেড়ে যায়, পেশাদার শ্রেণিসমূহের উদ্ভব ঘটে। উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্তের সৃষ্টি হয় এবং এই উদ্বৃত্তভোগী একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির উদয় হয়। পরিণামে সাম্যমূলক জ্ঞাতিভিত্তিক ট্রাইবাল ব্যবস্থায় ভাঙন ধরে এবং রাষ্ট্র-ব্যবস্থার লক্ষণগুলি প্রকটিত হয়।
শিকারজীবী পর্যায়ের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কিত কিছু আচার-অনুষ্ঠান লক্ষ্য করা যায়। ভক্ষ্য পশুগুলির উপর কিছুটা পবিত্রতা আরোপ করা হয় এবং সমবেত নৃত্যগীতমূলক আচার-অনুষ্ঠান সহকারে সেগুলিকে নিহত ও ভক্ষণ করা হয়। পরবর্তীকালের যাগযজ্ঞে শিকারজীবী পর্যায়ের এই আচার-অনুষ্ঠানগুলির পল্লবিত রূপ লক্ষ্য করা যায়। এই পর্যায়ে জাদু-বিশ্বাস (magic), প্রাথমিক ধরনের আত্মার ধারণা (animism), অচেতন বস্তুর শুভাশুভ বিষয়ক ক্ষমতায় বিশ্বাস (animatism) প্রভৃতি কিছু কিছু ধারণার উন্মেষ দেখা যায়। আরও দেখা যায় মাতৃকা দেবীর (Mother Goddess) প্রাথমিক কল্পনা। মাটি, পাথর বা হাড়ের তৈরি যে সকল প্রাচীন মাতৃকা মূর্তি পাওয়া গেছে, সেগুলির গঠন দেখেই অনুমিত হয় যে এই মূর্তিগুলি মাতৃত্ব, গর্ভধারণ প্রভৃতির প্রতীক হিসেবেই পূজিত হতো। মাতৃকাপূজার ব্যাপকতার আরও একটি কারণ ছিল আদিম সমাজের স্বাভাবিক মাতৃপ্রাধান্য। জন্মদানের ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা থাকলেও মানবসমাজের প্রাথমিক পর্যায়ে নারীর ভূমিকাই ছিল স্বাভাবিকভাবে স্বীকৃত, কেননা তার মাতৃত্বমূলক কাজের ক্ষেত্রে কোন সংশয়ের অবকাশ নেই। তার পুরুষ সঙ্গীর ভূমিকা গৌণ, কেননা, জন্মদানের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বের উপলব্ধি ঘটতে সময় লেগেছিল অনেককাল। আদিম সমাজে পিতৃত্বের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা ছিল। তাই নারীই ছিল জীবনদাত্রী, তার মাতৃত্বমূলক অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহ জীবনদায়িকা শক্তির প্রতীক হিসেবে সর্বত্রই গড়ে উঠেছিল।
পশুপালক পর্যায়ে পিতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যার সূচনা দেখা যায় উচ্চ শিকারজীবী পর্যায় থেকেই। পশুপালন মূলত পুরুষালি কাজ, সেই হিসেবে এই সমাজে পুরুষপ্রাধান্য কিছুটা অনিবার্য। উচ্চ-পশুপালক সমাজে পশু শুধু জীবনধারণেরই উপকরণ নয়, সম্পত্তিও বটে, যা রক্ষা করা যায়, লুণ্ঠন ও অপহরণের দ্বারা বর্ধিত করা যায়। শিকারজীবী সমাজে সম্পত্তিবোধ থাকে না, কৃষিজীবী সমাজের প্রাথমিক পর্যায়গুলিতেও এই বোধ তীব্র নয়। সম্পত্তিই সুবিধাভোগী শ্রেণির সৃষ্টি করে, এই কারণেই পশুপালক সমাজে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয় তাড়াতাড়ি। সম্পদের এই প্রেরণাই পশুপালক সমাজকে যুদ্ধপরায়ণ করে তোলে, কেননা যুদ্ধের দ্বারাই অপরের সম্পদ অধিকার করা যায়। সম্পত্তির সঙ্গে উত্তরাধিকারের প্রশ্নও জড়িত, এই কারণেই পশুপালক সমাজ পিতৃতান্ত্রিক, যেখানে দাবি করা হয় স্ত্রী বা স্ত্রীরা সর্বদাই স্বামীর অনুগত থাকবে। পশুপালক সমাজের এই বৈশিষ্ট্যগুলি তাদের ধর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রাকৃতিক শক্তিগুলি এখানে দেবতারূপে কল্পিত। দেবমণ্ডলীতে দেবীদের স্থান স্বাভাবিকভাবেই গৌণ। প্রধান দেবতা যুদ্ধবাজ দলনেতারই প্রতিচ্ছবি। তাদের পুরাণাদি যুদ্ধের কাহিনীতে ভরপুর। আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের শিকারজীবী ঐতিহ্যের প্রতিফলন সুস্পষ্ট, পুরাতন আমলের জাদুবিশ্বাসমূলক অনুষ্ঠানগুলি যাগযজ্ঞ ও পশুবলিতে আরও পল্লবিত।
পক্ষান্তরে কৃষিজীবী সমাজের ধর্মব্যবস্থায় আরও সুদূর অতীতের মাতৃপ্রাধান্যের একটি নবরূপের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার ও মেয়েদের দ্বারাই বর্ধিত। তাই কৃষিজীবী সমাজজীবনের প্রাথমিক পর্যায়গুলিতে, অন্তত পশুবাহিত লাঙল প্রবর্তিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত, নারীপ্রাধান্য কিছুটা অবারিত ছিল। ধর্মের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে। আদি কৃষিজীবীদের কল্পনায় জীবনদায়িনী মানবী মাতা ও শস্যদায়িনী পৃথিবী বা বসুমাতা একাকার হয়ে গেছে। মানবিক ও প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতা এই সূত্রে বাঁধা পড়েছে। মাতৃত্বের দেবী শস্যের দেবীতে রূপান্তরিতা হয়েছেন। আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসের প্রভাব পড়েছে। প্রাকৃতিক ও মানবিক ফলপ্রসূতা একই রহস্যের দুই দিক। মানবিক প্রজননের অনুকরণ তাই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার পক্ষেও অপরিহার্য মনে হয়েছে। এ কারণেই লিঙ্গ ও যোনি পূজা এবং কামমূলক আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপকতা আদিম কৃষিজীবী সমাজে লক্ষ্য করা যায়– তান্ত্রিক যৌনাচারসমূহে যেগুলির নিদর্শন আজও টিকে আছে। এগুলির পেছনকার মূল বিশ্বাস– নারী ও প্রকৃতি অভিন্না। নারী ক্ষেত্রস্বরূপা, পুরুষ বীজস্বরূপ, যে কারণে মনু বলেছেন– ‘ক্ষেত্রভূতা স্মৃতা নারী বীজভূতঃ স্মৃতঃ পুমান্। ক্ষেত্রবীজসমাযোগাৎ সম্ভবঃ সর্বদেহিনাম্ ।।’ (মনুসংহিতা-৯/৩৩) (অর্থাৎ, নারী শস্যক্ষেতের মতো, আর পুরুষ শস্যের বীজস্বরূপ। এই ক্ষেত্র ও বীজের সংযোগে সকল প্রাণীর উৎপত্তি)। এই দ্বৈতবাদ কালক্রমে ভারতীয় চেতনায় প্রকৃতি ও পুরুষের ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে। নারী ও পুরুষের মিলনে যেভাবে সন্তানের সৃষ্টি হয়, বিশ্বসৃষ্টির মূলেও অনুরূপভাবে প্রকৃতি (Female Principle) এবং পুরুষের (Male Principle) মিলন ক্রিয়াশীল, কিন্তু প্রাধান্য প্রকৃতিরই।
ঐতিহাসিক পটভূমিকায় বিষয়টিকে দেখতে গেলে প্রতীয়মান হয় যে, আদিম চেতনায় নারী কেবল উৎপাদনেরই প্রতীক ছিল না, সত্যকারের জীবনদায়িনীর ভূমিকাই তার ছিল। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং গুণাবলী ওই জীবনদায়িনী শক্তিরই পরিচায়ক। সামাজিক বিবর্তনের প্রাথমিক স্তরগুলিতে তাই এই মাতৃত্বেরই ভূমিকা ছিল প্রধান, জীবনদায়িনী মাতৃদেবীই তাই ছিলেন ধর্মের কেন্দ্রবস্তু। উন্নততর কৃষি এবং পশুপালন প্রচলিত হওয়ার পর থেকে, অর্থাৎ সমাজবিকাশের কিছুটা উন্নততর পর্যায়ে, জন্মদানের ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা একটু একটু করে স্বীকৃত হতে শুরু করে। সৃষ্টিতত্ত্বের এই পুরুষ উপাদানটি প্রথম পরিচিত হয় মাতৃদেবীর তাৎপর্যহীন প্রেমিক হিসেবে, কালক্রমে উভয়ের মর্যাদা সমান হয়, এবং অবশেষে পুরুষ উপাদানটিই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যেখানে প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, সেখানে এই রূপান্তর খুব দ্রুত হয়নি। আদিম যুগের জীবনদায়িনী মাতার ভূমিকা শস্য ও উদ্ভিদ-জগতে পরিব্যাপ্ত হয়েছে, সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতিই মাতৃদেবীরূপে কল্পিতা হয়েছেন। কালক্রমে পিতৃপ্রধান ধর্মের প্রতিষ্ঠা হলেও পুরাতন মাতৃদেবীকে স্থানচ্যুত করা সম্ভবপর হয়নি, বিশেষ করে ভারতবর্ষে, যেখানকার সমাজজীবন আজও বহুলাংশে কৃষিভিত্তিক।
এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই আমরা এযাবৎ প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য ও যথাযথ সাহিত্য নিদর্শনের আলোকে প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম-সাধনায় আদিম প্রজননভিত্তিক উর্বরতামূলক বিশ্বাস তথা শাক্ত-উপাদানের অনিবার্য উপস্থিতি ও তার প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের চেষ্টা করতে পারি।

(চলবে—)

[পূর্ব-পোস্ট : দেবী-কল্পনার বিবর্তন] [*] [পরের পোস্ট : সিন্ধু-সভ্যতায় মাতৃপ্রাধান্য ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 441,803 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

অক্টোবর 2017
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« সেপ্টে.   নভে. »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: