h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|চার্বাক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা-২২ : এবং তৈত্তিরীয় উপনিষদ-এ বস্তুবাদের নজির|

Posted on: 15/07/2015


1013505_558200817577931_701784891_n

| চার্বাক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা-২২ : এবং তৈত্তিরীয় উপনিষদ-এ বস্তুবাদের নজির |
রণদীপম বসু

। এবং তৈত্তিরীয় উপনিষদ-এ বস্তুবাদের নজির।

উপনিষদের দৃষ্টান্তে শুধু যে ছান্দোগ্যের উদ্দালক আরুণিই একমাত্র বস্তুবাদী নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, মোটেও তা নয়। অন্যান্য উপনিষদেও অলৌকিক ভাববাদের মোড়কে ভেতরে বয়ে যাওয়া অন্তঃসলিলা বস্তুবাদী কামনা-প্রাধান্যের নজির বিরল নয়। যেমন, ‘তৈত্তিরীয়-উপনিষদ্’ তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত– শীক্ষাবল্লী, ব্রহ্মানন্দবল্লী ও ভৃগুবল্লী। শীক্ষাবল্লীকে বলা হয়েছে ব্রহ্মানন্দবল্লীর ভূমিকা বা প্রস্তুতিপর্ব। এই প্রস্তুতিপর্বে ব্রহ্মানন্দ লাভের প্রস্তুতিটা কীরকম তা বোঝার জন্য ঐ উপনিষদ থেকে একটি প্রার্থনা উদ্ধৃত করা যেতে পারে–

‘আবহন্তী বিতন্বানা কুর্বাণা চীরমাত্মনঃ। বাসাংসি মম গাবশ্চ অন্নপানে চ সর্বদা।
ততো মে শ্রিয়মাবহ লোমশাং পশুভিঃ সহ স্বাহা।
আ মাযন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা। বি মায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা। প্র মায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা।
দমায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা। শমায়ন্তু ব্রহ্মচারিণঃ স্বাহা।। (তৈত্তিরীয়-১/৪/২)
অর্থাৎ :
আমাকে বস্ত্র দাও, গোধন দাও, অন্ন দাও, পানীয় দাও, মেষ প্রভৃতি লোমশ পশু দাও, আমাকে শ্রী অর্থাৎ সৌভাগ্য সমৃদ্ধি দান করো যেন এদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ব্রহ্মচারীরা বেদ অধ্যয়নের জন্য আমার কাছে আসুক, যথাবিধি আসুক। তারা আমার কাছে দম অর্থাৎ ইন্দ্রিয়কে দমন করা এবং শম অর্থাৎ চিত্তের স্থৈর্য অভ্যাস করতে আসুক।।


এ-প্রেক্ষিতে হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের আকর্ষণীয় মন্তব্যটি হলো– ‘একমাত্র ব্রহ্মই সত্য, এ জগৎ মিথ্যা’ এহেন উত্তুঙ্গ ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য প্রস্তুতিপর্বটি খুবই উপভোগ্য। এই মিথ্যা জগতের মিথ্যা অন্নজল খেয়ে মিথ্যা বেঁচে না থাকলে, সব কিছু মিথ্যা মায়া মাত্র এই দিব্য জ্ঞান হবে কী করে? তবে একটা ধাঁধা থেকে গেল। ‘বেদান্তসূত্র’-র ভাষ্যে ব্রহ্মজিজ্ঞাসার অধিকারী কে হতে পারে, কী কী গুণসম্পন্ন হলে ব্রহ্মজ্ঞানে অধিকার জন্মে, এর উত্তরে শংকর চারটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে রয়েছে ‘ইহমুত্রার্থভোগবিরাগঃ’ অর্থাৎ ঐহিক ও পারত্রিক সকল রকম সুখভোগ লালসার প্রতি বৈরাগ্য। তা হলে ব্রহ্মানন্দে পৌঁছাবার জন্য সাংসারিক সুখসমৃদ্ধি লাভের এই আকুল আকূতি কেন? এর মধ্যে শংকর-কথিত বৈরাগ্যের লক্ষণ কোথায়? এই আকুল আবেদন যে মূল উপনিষদেই রয়েছে।’- (চার্বাকদর্শন, পৃষ্ঠা-৭৩)

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে ব্রহ্মানন্দপল্লী ও ভৃগুপল্লীতে যেখানে ব্রহ্মের পাঁচটি কোশ বা স্তর উল্লেখ করা হয়েছে। ‘কোশ’ শব্দের অর্থ আবরণও হতে পারে। বহিরাবরণ অন্তরাবরণ রূপে একটি স্থূল আবরণের মধ্যে পরপর সূক্ষ্মতর আবরণের কল্পনা করা হয়েছে। তা হলে অর্থ দাঁড়ালো মূল থেকে সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মতর রূপে পাঁচটি কোশস্তর রয়েছে– (১) অন্নময় কোশ, (২) প্রাণময় কোশ, (৩) মনোময় কোশ, (৪) বিজ্ঞানময় কোশ এবং (৫) আনন্দময় কোশ।

চরম ভাববাদের প্রতিনিধি মায়াবাদী শঙ্করের ব্রহ্মাদ্বৈতবাদ প্রতিপাদনে ব্যাপৃত কূটকচালের কথা ভুলে গিয়ে যদি এই পঞ্চকোশস্তরের স্বাভাবিক তাৎপর্য অনুধাবন করার চেষ্টা করা যায় তা হলে স্বভাবতই মনে হবে যে পাঁচটি কোশস্তর হলো মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশধারা যা মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র উন্নততর প্রাণীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘এই স্বাভাবিক ব্যাখ্যার ইঙ্গিত উপনিষদেই রয়েছে। মনুষ্যত্ব লাভ করতে হলে মানুষকে সর্বপ্রথম প্রাণী রূপে বেঁচে থাকতে হবে এবং বেঁচে থাকতে হলে পৃথিবী থেকে অন্ন জল ও বায়ু সংগ্রহ করতে হবে। সুতরাং অন্নই ব্রহ্ম। উপনিষদের ভাষায় অন্ন থেকেই প্রাণীগণ জন্মগ্রহণ করে। অন্নের দ্বারাই প্রাণীগণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।’–

‘অন্নাদ্বৈ প্রজাঃ প্রজায়ন্তে। যাঃ কাশ্চ পৃথিবীং শ্রিতাঃ। অথো অন্নেনৈব জীবন্তি। অথৈনদপি যন্ত্যন্ততঃ। অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম। তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। সর্বং বৈ তেহন্নমাপ্নুবন্তি। যেহন্নং ব্রহ্মোপাসতে। অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্টম্ । তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। অন্নাদ্ভূতানি জায়ন্তে। জাতান্যন্নেন বর্ধন্তে। অদ্যতেহত্তি চ ভূতানি। তস্মাদন্নং তদুচ্যতে। ইতি। (তৈত্তিরীয়-২/২/১)।।
তস্মাদ্বা এতস্মাৎ অন্নরসময়াৎ। অন্যোহন্তর আত্মা প্রাণময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ। স বা এষ পুরুষবিধ এব। তস্য পুরুষাবিধতাম্ । অন্বয়ং পুরুষবিধঃ। তস্য প্রাণ এব শিরঃ। ব্যানো দক্ষিণঃ পক্ষঃ। অপান উত্তরঃ পক্ষঃ। আকাশ আত্মা। পৃথিবী পুচ্ছং প্রতিষ্ঠা। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি। (তৈত্তিরীয়-২/২/২)।।
অর্থাৎ :
পৃথিবীকে আশ্রয় করে আছে যত প্রজা (প্রাণী) সবার জন্ম অন্ন থেকে। অন্নেই জীবন ধারণ করে। আবার জীবন শেষে ঐ অন্নের মধ্যেই ফিরে যায়। কারণ অন্নই হলো সবার বড়। বস্তুর মধ্যে সর্বপ্রথম অন্নের জন্ম। তাই (অন্নময় এই জীবনের) অন্নই হলো সর্বৌষধি (ক্ষয়, ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটাবার একমাত্র মাধ্যম)। যে অন্নকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করে সে কাম্য বস্তু অন্ন বা দেহের উপভোগের যাবতীয় বস্তুই পায়। (তৈত্তিরীয়-২/২/১)।।  এই অন্নরসময় বা অন্নময় কোশ ছাড়া এর ভেতরে একটি প্রাণময় আত্মা আছে। এটি প্রাণময় কোশ। এই আত্মা অন্নময় কোশকে সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে, পরিপূর্ণ করে রেখেছে। অন্নময় দেহের মত প্রাণময় এই দেহটিও পুরুষাকার– পাখির মতো। প্রাণ এর মাথা, ব্যান বায়ু (যে বায়ুর সর্বত্র অবাধ গতি) তার দক্ষিণ বাহু। অপান বায়ু (নিম্নগামী বায়ু) তার বাম বাহু। আকাশ তার আত্মা। পৃথিবী তার পুচ্ছ। (তৈত্তিরীয়-২/২/২)।।


অন্ন দৃষ্টিগোচর স্থূল পদার্থ। কিন্তু বাঁচার জন্য আর একটি সূক্ষ্ম পদার্থ দরকার। সে হলো বায়ু, দৃষ্টিগোচর নয়, স্পর্শগোচর। জলকে বোধ হয় অন্নের মধ্যেই ধরা হয়েছে। পরে স্থানান্তরে জলের কথাও আছে। অন্ন জল ও বায়ু প্রাণধারণের প্রধান উপকরণ। বায়ু ও জল পৃথিবী থেকে সংগৃহীত হয়। তাই পৃথিবী এদের পুচ্ছ বা প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ ভিত্তিভূমি।
তৃতীয় কোশ হলো মন। মন মানুষের মননশীলতা বা বিচারশীলতার উপকরণ। এখান থেকেই অন্য প্রাণী হতে মানুষের স্বাতন্ত্র্য সূচিত হলো। উপনিষদ যেহেতু বৈদিক সাহিত্যের অংশ সেহেতু উপনিষদের বক্তা এস্থলে মনোবৃত্তিকে চতুর্বেদের মননের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন।’–

‘তস্যৈষ এব শারীর আত্মা। যঃ পূর্বস্য। তস্মাদ্বা এতস্মাৎ প্রাণময়াৎ। অন্যোহন্তরঃ আত্মা মনোময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ। স বা এষ পুরুষবিধ এব। তস্য পুরুষবিধতাম্ । অন্বয়ং পুরুষবিধঃ। তস্য যজুরেব শিরঃ। ঋগ্ দক্ষিণঃ পক্ষঃ। সামোত্তর পক্ষঃ। আদেশ আত্মা। অথর্বাঙ্গিরসঃ পুচ্ছং প্রতিষ্ঠা। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি। (তৈত্তিরীয়-২/৩/২)।।
অর্থাৎ :
অন্নময় কোষ নিয়ে শরীরের যিনি আত্মা, তিনি প্রাণময় কোষেরও আত্মা– একই আত্মা। এছাড়া আর একটি আত্মা (কোশ) আছে– সেটি হলো মনোময় কোশ। এই মনোময় কোশ প্রাণময় কোশকে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। এরই আকার পাখিরূপী মানুষের মতো। এর শির বা মাথা হলো যজুর্বেদ। ঋগ্বেদ ডান পাখা বা ডান বাহু। সামবেদ বাম পাখা বা বাম বাহু। এই মনোময় কোশের বা দেহের আত্মা হলো আদেশ (বেদের ব্রাহ্মণভাগ)। আর পুচ্ছ অবস্থান করে আছে অথর্ববেদের ঋষি অথর্বা ও আঙ্গিরসের দর্শনের ওপর। (তৈত্তিরীয়-২/৩/২)।।


মনের মননশীলতা বা মনোবৃত্তিই হলো বিজ্ঞান বা বিশিষ্ট উন্নততর জ্ঞানের ভিত্তি। মানুষ মনের দ্বারাই বিশ্বচরাচর সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করে। একেই বলা হয়েছে বিজ্ঞানময় কোশ বা বিজ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্ম। বৈদিক ঋষির মতে বেদই হলো সকল জ্ঞানের আধার। তাই উপনিষদের ঋষি এই জ্ঞানকে বেদজ্ঞানে সীমাবদ্ধ করেছেন।–

‘তস্যৈষ এব শারীর আত্মা। যঃ পূর্বস্য। তস্মাদ্বা এতস্মাৎ মনোময়াৎ। অন্যোহন্তরঃ আত্মা বিজ্ঞানময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ। স বা এষ পুরুষবিধ এব। তস্য পুরুষবিধতাম্ । অন্বয়ং পুরুষবিধঃ। তস্য শ্রদ্ধৈব শিরঃ। ঋতং দক্ষিণঃ পক্ষঃ। সত্যমুত্তরঃ পক্ষঃ। যোগ আত্মা। মহঃ পুচ্ছং প্রতিষ্ঠা। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি। (তৈত্তিরীয়-২/৪/২)।।
অর্থাৎ :
প্রাণময় কোশের আত্মা এবং মনোময় কোশের আত্মা অভিন্ন। এছাড়া এর ভেতরে আর একটি আত্মা বা কোশ আছে। তা হলো বিজ্ঞানময় কোশ। এই বিজ্ঞানময় কোশ প্রাণময় কোশকে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। এরও আকার পাখিরূপ পুরুষাকার– প্রাণময় কোষের অনুরূপ। এর মাথা হলো শ্রদ্ধা। ঋত এই পাখিরূপী পুরুষাকার কোশের ডান পক্ষ বা ডান বাহু। সত্য হলো উত্তর পক্ষ বা উত্তর বাহু। যোগ হলো তার আত্মা। আর এই কোশময় শরীর অবস্থান করে আছে মহ বা মহত্ত্বের ওপর। (তৈত্তিরীয়-২/৪/২)।।


যাজ্ঞিক মতে বেদজ্ঞানের উপযোগিতা নিখুঁতভাবে বৈদিক যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ। এই সব অনুষ্ঠানের দ্বারা উৎপন্ন হয় বাঞ্ছিত ফললাভের আনন্দ। আনন্দই জীবনের লক্ষ্য। এভাবেই অন্নব্রহ্ম থেকে আনন্দব্রহ্মে উত্তরণ। আনন্দব্রহ্মের দুটি পক্ষ, একটি ‘মোদ’ অপরটি ‘প্রমোদ’। আনন্দব্রহ্মের শির বা মস্তক হলো ‘প্রিয়’ (প্রার্থিত বস্তুর দর্শনজনিত সুখ)। ‘মোদ’ শব্দের অর্থ ইষ্ট বস্তুলাভজনিত সুখ। ‘প্রমোদ’ শব্দের অর্থ ইষ্ট বস্তুর ভোগজনিত সুখ।–

‘তস্যৈষ এব শারীর আত্মা। যঃ পূর্বস্য। তস্মাদ্বা এতস্মাদ্ বিজ্ঞানময়াৎ। অন্যোহন্তরঃ আত্মা আনন্দময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ। স বা এষ পুরুষবিধ এব। তস্য পুরুষবিধতাম্ । অন্বয়ং পুরুষবিধঃ। তস্য প্রিয়মেব শিরঃ। মোদো দক্ষিণঃ পক্ষঃ। প্রমোদ উত্তরঃ পক্ষঃ। আনন্দ আত্মা। ব্রহ্ম পুচ্ছং প্রতিষ্ঠা। তদপ্যেষ শ্লোকো ভবতি। (তৈত্তিরীয়-২/৫/২)।।
অর্থাৎ :
মনোময় কোশের যে আত্মা, বিজ্ঞানময় কোশেরও সেই একই আত্মা থাকলেও আর একটি আত্মা আছে, তা আনন্দময় কোশ। বিজ্ঞানময় কোশকে পরিপূর্ণ করে রেখেছে আনন্দময় কোশ। এই কোশও বিজ্ঞানময় কোশের মতোই পুরুষাকৃতিসম্পন্ন। প্রিয় হলো তার শির বা মাথা। মোদ হলো পাখিরূপী সেই পুরুষের ডান পক্ষ বা বাহু। প্রমোদ হলো বাম পক্ষ বা বাহু। আনন্দ তার আত্মা। আর ব্রহ্ম তার পুচ্ছ বা প্রতিষ্ঠা। (তৈত্তিরীয়-২/৫/২)।।


নিজ মতের উপযোগী ভাষ্য তৈরি করতে অনেক চেষ্টাচরিত করেও জুত করতে না-পেরেই হয়তো ব্রহ্মাদ্বৈতবাদী আচার্য ‘শঙ্কর বলতে বাধ্য হলেন ব্রহ্মের এই পাঁচটি স্তরই ভৌতিককার্যস্বরূপ গৌণব্রহ্ম সম্বন্ধে প্রযোজ্য, পরম কারণ-স্বরূপ চৈতন্যময় পরব্রহ্ম বা মুখ্যব্রহ্ম সম্বন্ধে প্রযোজ্য নয়। মুখ্যব্রহ্মই এই গৌণব্রহ্মের ভিত্তি (‘পুচ্ছ’)। উপনিসদুক্ত পঞ্চকোশী ব্রহ্ম ‘পুরুষবিধ’ বা পাঞ্চভৌতিকদেহাশ্রিত, তাই গৌণ।’- (হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়, চার্বাবদর্শন, পৃষ্ঠা-৭৪)
তার মানে, ব্রহ্মাদ্বৈতবাদী শঙ্করের এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মও ব্যবহারিক প্রয়োজনবোধে একাধিক হতে পারেন– একজন মুখ্যব্রহ্ম বা পরমব্রহ্ম বা নির্গুণ ব্রহ্ম, অন্যজন গৌণব্রহ্ম বা স্বগুণ ব্রহ্ম। অদ্বৈত-বেদান্তমতে এই স্বগুণ ব্রহ্ম আসলে জগতের মতোই মিথ্যা ভ্রম বা মায়া, ব্যবহারিক প্রয়োজনেই কল্পিত হন মাত্র।

কিন্তু শঙ্কর যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন, ‘তৈত্তিরীয়-উপনিষদ্’-এর ভৃগুপল্লী বা অন্তিম অধ্যায়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায় সেখানে বারবার বলা হয়েছে– এই পৃথিবীর অন্ন জল বায়ু উপেক্ষা করবে না। প্রচুর অন্ন উৎপাদনের চেষ্টা করবে, তবেই তুমি মহান হবে, পশুসম্পদ ও সন্তানসম্পদ লাভ করবে, ব্রহ্মতেজের অধিকারী হবে, কীর্তিতে মহান হবে। অন্ন জল বায়ু ও তেজের উপাসনা করো। যেমন–

‘অন্নং ন নিন্দ্যাৎ। তদ্ ব্রতম্ । প্রাণো বা অন্নম্ । শরীরম্ অন্নাদম্ । প্রাণে শরীরং প্রতিষ্ঠিতম্ । শরীরে প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিতঃ। তদেতং অন্নম্ অন্নে প্রতিষ্ঠিতম্ । স য এতদ্ অন্নম্ অন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবান্ অন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি প্রজয়া পশুভির্ব্রহ্মবর্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা। (তৈত্তিরীয়-৩/৭/১)।।
অর্থাৎ :
অন্নকে কখনও নিন্দা করবে না। এটা তোমার ব্রত,– তোমার কর্তব্য-কর্ম। প্রাণই অন্ন আর শরীর অন্নভোক্তা। প্রাণে শরীর প্রতিষ্ঠিত। শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত। এই অন্ন এভাবে আরেক অন্নে প্রতিষ্ঠিত। যিনি এভাবে অন্নকে অন্নে প্রতিষ্ঠিত বলে জানেন, তিনিই ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হন। সুপ্রচুর অন্নের মালিক হয়ে অন্নভোক্তা তো হনই, এমনকি পুত্রাদি, পশু, ব্রহ্মতেজ এবং কীর্তিতেও মহান হন। (তৈত্তিরীয়-৩/৭/১)।।


অন্যান্য উপনিষদ্ থেকে ‘তৈত্তিরীয়-উপনিষদ্’-এর একটা বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, এই উপনিষদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ‘অন্নচিন্তা’ আর ‘অন্নস্তুতি’। প্রথম পর্বেই বেঁচে থাকার আকুল আগ্রহ আমরা লক্ষ্য করেছি– অন্ন চাই, জল চাই, বস্ত্র চাই, গৃহপালিত পশু চাই। শেষ পর্যন্ত একই সুর ধ্বনিত হয়েছে। উপসংহারটি আরও উল্লেখযোগ্য–

‘অহমন্নম্-অহমন্নম্-অহমন্নম্ । অহমন্নাদো ৩ হহমন্নাদো ৩ হহমন্নাদঃ। অহং শ্লোককৃদহং শ্লোককৃদহং শ্লোককৃৎ। অহমস্মি প্রথমজা ঋতা ৩ স্য। পূর্বং দেবেভ্যোহমৃতস্য না ৩ ভায়ি। যো মা দদাতি স ইদেব মা ৩ বাঃ। অহমন্নমন্নমদন্তম ৩ স্মি। অহং বিশ্বং ভুবনমভ্যভবা ৩ ম্ । সুবঃ ন জ্যোতীঃ। য এবং বেদ। ইত্যুপনিষৎ। (তৈত্তিরীয়-৩/১০/৬)।।
অর্থাৎ :
আমি অন্ন… আমি অন্ন… আমি অন্ন। আমিই অন্ন গ্রহণ করি… আমিই অন্ন গ্রহণ করি। আমিই শ্লোক রচনা করি… আমিই শ্লোক রচনা করি… আমিই শ্লোক রচনা করি। এই মূর্ত-অমূর্ত জগতে আমিই সবার আগে প্রথম উৎপন্ন হয়েছি। দেবতাদেরও পূর্বে আমি জন্মেছি। আমিই অমৃতের অধিষ্ঠান। যে অন্নস্বরূপ আমাকে অন্নপ্রার্থীর হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দেয়, দান করে, সে সেভাবেই আমাকে রক্ষা করে। আর অন্নার্থ যাকে বিমুখ করে অন্নদান না করে নিজের উদরপূর্তি করে, সেই অসদাচারীকে আমিই ভক্ষণ করি। সূর্যের মতোই আমি স্বপ্রকাশ জ্যোতির্ময়। আমারই অভিব্যক্তি, আমারই প্রকাশ লোকালোক নিয়ে এই ভুবন। এই জ্ঞান যার আয়ত্তে, সবকিছুই তার আয়ত্তে। এই রহস্য যে জেনেছে, তার সবই জানা হয়েছে। এই হলো উপনিষদ্ অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা। (তৈত্তিরীয়-৩/১০/৬)।।


এই শ্লোকটির ব্যাখ্যায় হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন– ‘আমিই অন্ন, কারণ আমিই অন্ন ভক্ষণ করে ‘আমি’ হয়েছি (অহমন্নম্ অহমন্নাদঃ)। অন্ন-রসময় উপাদানসমন্বিত দেহেই চেতনারূপে আমি আবির্ভূত হয়েছি। এই জগতে আমিই প্রথম চেতনা-সমৃদ্ধ জীব, তাই আমি দেবতাদেরও পূর্বে জন্মেছি। আমিই অমৃতের অধিষ্ঠান। স্পষ্টতই এখানে ‘আমি’ বলতে মানব জাতিকে বোঝাচ্ছে। এর পরের কথাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, আমাকে বঞ্চিত করে কেউ যদি একা একা অন্ন ভক্ষণ করে, তাহলে আমি তাকে ভক্ষণ করি। তাৎপর্য অতি পরিচ্ছন্ন। অন্যকে বঞ্চিত করে কেউ একা অন্ন ভক্ষণ করবে না। তাহলে সমাজে একে অন্যকে ভক্ষণ করবে। অর্থাৎ মানবসমাজ ধ্বংস হবে।’- (চার্বাকদর্শন, পৃষ্ঠা-৭৭)

হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায় আরো বলছেন– ‘সমস্ত উপনিষদটি পরিব্যাপ্ত করে আছে অন্নস্তুতি এবং অন্নসমৃদ্ধ মানুষের মহিমা। শংকর কিন্তু এর মধ্যে যেখানেই আমি রয়েছে সেখানেই ‘অহং’ শব্দের অর্থ করেছেন, চৈতন্যস্বরূপ একমাত্র ব্রহ্মা। সুতরাং অন্নময়ী পৃথিবী মায়া মাত্র। স্তুতি বন্দনা করা হয়েছে ব্যবহারিক দৃষ্টিতে। তাই শংকরের সিদ্ধান্ত, অন্নব্রহ্ম থেকে আনন্দব্রহ্ম পর্যন্ত অমুখ্য, গৌণ বা কার্য ব্রহ্মের কথাই বলা হয়েছে। না বলে উপায় কী? আনন্দব্রহ্মের স্তুতি করতে গিয়ে ঋষি বলেছেন, যিনি আনন্দব্রহ্মকে জানেন তিনি প্রচুর অন্নের অধিকারী হন, প্রচুর পশু ও সন্তানের অধিকারী হন, প্রভূত যশ লাভ করেন। এই কি শংকরের ব্রহ্মানন্দ? কী করে হবে? ঋষি যে বলেছেন, মানুষের বাঁচার জন্য প্রচুর অন্ন ফলাতে হবে (অন্নং বহু কুর্বীত)। লক্ষ রাখতে হবে ঋষি আনন্দময় কোশের কথা বলেই আবার অন্নস্তুতিতে ফিরে গেলেন এবং অন্নের মহিমা দিয়েই উপসংহার করলেন। তৈত্তিরীয় উপনিষদ-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শংকরকে অনেক কসরত করতে হয়েছে। ‘চৈতন্যস্বরূপ একমাত্র ব্রহ্মই সৎ’ এই মত তৈত্তিরীয় উপনিষদ-এর দোহাই দিয়ে প্রমাণ করা খুবই কষ্টসাধ্য। তাই তিনি ব্রহ্মানন্দবল্লীর ষষ্ঠ অনুবাকে (পরিচ্ছদে) ‘অসৎ’ শব্দের অর্থ করলেন আকাশকুসুম তুল্য অলীক। আবার ঠিক তার পরেই সপ্তম অনুবাকে ‘অসৎ’ শব্দের অর্থ করলেন একমাত্র সৎ ব্রহ্ম অর্থাৎ অসৎ মানে সৎ। গরজ বড় দায়, তাই অনেক সময় গায়ের জোরে ব্যাখ্যা করতে হয়।

.
সে যাক, তবে এটুকু বলা যায় যে, ভারতীয় দর্শনে বস্তুবাদের পরিচায়ক বলতে শুধুমাত্র চার্বাকই নয়। উপনিষদ্-এর প্রখ্যাত দার্শনিক উদ্দালক আরুণি থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সর্বাস্তিবাদ, সাংখ্যর আদিরূপ, ন্যায়-বৈশেষিকদের পরমাণুবাদ প্রভৃতিকেও বিশুদ্ধ বস্তুবাদ আখ্যা দেওয়া যাক আর না-ই যাক, অন্তত বস্তুবাদ ঘেঁষা দার্শনিক মত বলে গ্রহণ করার নানা কারণ আছে। চার্বাক-প্রসঙ্গে অধুনালভ্য বাস্তব তথ্য এমনই অপ্রতুল যে অন্যান্য বস্তুবাদী বা বস্তুবাদ-ঘেঁষা মতামতের সঙ্গে চার্বাক-মতের তুলনামূলক আলোচনার সুযোগ সত্যিই সংকীর্ণ। তবু, দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘এটুকু অনুমানে বোধহয় বাধা নেই যে উত্তরকালে বিশেষত ন্যায়-বৈশেষিকদের পরমাণুবাদের সমর্থনে অনেক দিক্পাল দার্শনিকের আবির্ভাব হয়েছিল বলেই দার্শনিক মত হিসেবে তা তুলনায় বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করেছিল। কিন্তু, এই উৎকর্ষের খাতিরে ন্যায়-বৈশেষিকদের পক্ষে অনেকাংশে মাথা নোয়াবারও দরকার হয়েছিল; প্রসঙ্গ-বিশেষ ভাববাদের সঙ্গে কমবেশি আপোসও করতে হয়েছিল।

অপরপক্ষে, ‘চার্বাকমত উত্তরকালে দার্শনিক বিচারের দিক থেকে হয়তো সে-উৎকর্ষের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কিন্তু তার কারণ বোধহয় এই যে, চার্বাকপক্ষ থেকে কোথাও কোনোরকম আপোসের আভাসই পাওয়া যায় না। চার্বাকমত হিসেবে যেটুকু আমাদের কাছে টিকে আছে তা থেকে অনায়াসেই অনুমান হয় বস্তুবাদ হিসেবে তা সম্পূর্ণ আপোসহীন। ফলে দার্শনিক উৎকর্ষের দিক থেকে সুযোগ-বঞ্চিত হলেও বস্তুবাদের বৈপ্লবিক ভূমিকার দিক থেকে ভারতীয় ইতিহাসে চার্বাকমত অতুলনীয়।’ (দ্রষ্টব্য : দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতে বস্তুবাদ প্রসঙ্গে, পৃষ্ঠা-১০৭)

শাস্ত্রবচন বলে ব্যাপারটাকেই চার্বাক স্রেফ ধোঁকাবাজি বলে ঘোষণা করে ধর্মের নামে লোকবঞ্চনা এবং শ্রেণীশোষণের পথ বন্ধ করতে চেয়েছিলো; দেহাতীত আত্মার কথা নস্যাৎ করে পরলোক পরজন্ম– এবং তার তত্ত্বগত ভিত্তি কর্মফলবাদ– একেবারে বরবাদ করতে চেয়েছিলো। ফলে সাবেকি ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ জাতিভেদের বিরুদ্ধে অভিযানের পথ প্রদর্শন করেছিলো। প্রামাণিক লোকগাথায় তাই নির্দ্বিধ চার্বাকী ঘোষণা–

‘ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ।
নৈব বর্ণাশ্রমাদীনাং ক্রিয়াশ্চ ফলদায়িকাঃ ।।’ (সর্বদর্শনসংগ্রহ)
অর্থাৎ : (লোকায়তিক চার্বাকেরা বলেন) স্বর্গ বলে কিছু নেই, অপবর্গ বা মুক্তি বলেও নয়, পরলোকগামী আত্মা বলেও নয়। বর্ণাশ্রম-বিহিত ক্রিয়াকর্মও নেহাতই নিষ্ফল।


চতুর্ভূতমাত্রর তত্ত্বকে দার্শনিক উৎকর্ষের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হোক-আর-নাই-হোক, সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতীয় ইতিহাসে চার্বাকমতের বৈপ্লবিক ভূমিকা অবশ্যই অতুলনীয়। শুধু তাই নয়, ভারতীয় ইতিহাসে প্রকৃতিবিজ্ঞানের যতটা বিকাশ তারও তত্ত্বগত ভিত্তি হিসেবে চার্বাকমতের মধ্যেই বিবিধ উপাদান পাওয়া যায়। কীভাবে? ইতঃপূর্বে চার্বাকী প্রত্যক্ষ-প্রাধান্যবাদের আলোচনায় আয়ুর্বেদশাস্ত্রের আদিগ্রন্থ ‘চরক-সংহিতা’ ও ‘সুশ্রুত-সংহিতা’র কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছিলো। বর্তমান প্রসঙ্গে বস্তুবাদের সহচর হিসেবে সংক্ষিপ্তভাবে আরেকটু আলোচনা করা যেতেই পারে।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : উদ্দালক-আরুণি সংবাদ: উপনিষদে বস্তুবাদের অনন্য নজির] [*] [পরের পর্ব : বস্তুবাদের অন্যতম সহচর]

[ চার্বাকের খোঁজে- অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,672 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: