h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|ভারতীয় দর্শনের বিকাশ-০৮ : ঈশ্বরবাদ|

Posted on: 10/07/2015


314762_501240416556847_1950408058_n

| ভারতীয় দর্শনের বিকাশ-০৮ : ঈশ্বরবাদ |
রণদীপম বসু

৩.০ : ঈশ্বরবাদ

ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনে নিশ্চয়ই ঈশ্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ। তাই ঈশ্বরবাদের ভূমিকা প্রসঙ্গেও কিছু আলোচনা আবশ্যক বলে মনে হয়। কেননা সাধারণ প্রবণতায় আস্তিকতার সঙ্গে সেশ্বরবাদকে অঙ্গাঙ্গীভাবে অনেকেই যুক্ত করে দেখেন এবং নাস্তিকদের একাত্ম করেন নিরীশ্বরবাদীদের সঙ্গে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেশ্বরবাদ ভারতীয় দর্শনে আস্তিকতার আবশ্যিক অঙ্গ হিসেবে কখনোই গণ্য হয়নি। লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে যে সনাতনপন্থীদের বিচারে বেদের প্রতি আনুগত্যই আস্তিকতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে নির্দেশিত হয়েছে। আর তাই বৌদ্ধ, জৈন এবং চার্বাক দর্শনের ‘নাস্তিক’ সংজ্ঞা হয়েছে এই মানদণ্ডেরই অনুসরণে; ঈশ্বরের প্রতি ঔদাসীন্য বা ঈশ্বরবিরোধিতাকে কেন্দ্র করে নয়। সে-কারণে ভারতীয় বহু দর্শন আস্তিক হলেও সেশ্বর হতে বাধ্য হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই ঈশ্বরের প্রতি ঔদাসীন্য ভারতীয় দর্শনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে।


প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শন জাগতিক সৃষ্টি-বৈচিত্র্যের রহস্য উন্মোচনে প্রয়াসী হয়েছে মূলত কর্মফলবাদের মাধ্যমে। সব ক্ষেত্রে কর্মবাদের সঙ্গে ঈশ্বরকে যুক্ত করা হয়নি। যেমন বিজ্ঞানভিক্ষুর সাংখ্যপ্রবচনসূত্র তথা সাংখ্য মতে কর্মফলবাদের সঙ্গে ঈশ্বরের ধারণার কোন সঙ্গতি নেই। আর মীমাংসা-মতে মীমাংসকাচার্য কুমারিল ভট্টও তাঁর শ্লোকবার্তিক গ্রন্থের সম্বন্ধাক্ষেপপরিহার-এ কর্ম এবং ঈশ্বরেচ্ছা উভয়কে জগৎসৃষ্টির মূলে একত্র যুক্ত করতে অনিচ্ছুক। বৌদ্ধ দর্শনে তো ঈশ্বরের কোন স্থানই নেই। আর বেদানুগ হওয়ার ফলে মীমাংসা দর্শন বৈদিক দেবদেবীসমূহকে তার বিষয়বস্তুর পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করেছে বটে, যদিও সেখানে নামসর্বস্বতা ছাড়া কোন দেবমহিমার কোন উপস্থিতি চোখে পড়ে না; কিন্তু ঈশ্বরকে এখানেও কোন প্রবেশাধিকার দেয়নি। মীমাংসার আদিগ্রন্থ জৈমিনির মীমাংসাসূত্রেই ঈশ্বরের কোন উল্লেখ নেই। বরং মীমাংসক আচার্য প্রভাকর এবং কুমারিল ভট্ট ঈশ্বরের অস্তিত্বের সমর্থনে প্রদত্ত বিভিন্ন দার্শনিকদের যুক্তির বিরোধিতা করে ঈশ্বরের অস্তিত্বের অসার্থকতা প্রমাণ করার যে অভূতপূর্ব চেষ্টা করেছেন, যুক্তিনিষ্টতায় ভারতীয় দর্শনেই তা প্রায় বিরল বলা যেতে পারে। এ বিষয়ে মীমাংসা-দর্শনে বিস্তারিত আলোচিত হলেও প্রসঙ্গ বিবেচনায় বর্তমান আলোচনার শেষে তার কিছু নমুনা-দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হবে।

নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে মীমাংসা দর্শন নিরীশ্বরবাদী হলেও পরবর্তীকালে মীমাংসকেরা হয়তো মানবমনের অন্তর্নিহিত ভগবৎ বিশ্বাসের কাছে নতি স্বীকার করেছেন এবং দার্শনিক যুক্তির বন্ধনে মীমাংসা দর্শনকে সেশ্বরবাদের সঙ্গে যুক্ত করার এক বিশেষ প্রয়াস এঁদের মধ্যে সুপরিস্ফুট। এরকম প্রয়াসেরই পূর্ণ রূপায়নের পরিচয় বহন করে বেদান্ত দেশিকের ‘সেশ্বর মীমাংসা’ নামক গ্রন্থটি। এই নামেই বলে দেয় প্রকৃত বা আদি মীমাংসা-দর্শন কোনভাবেই সেশ্বর নয়।

অন্যদিকে ন্যায় এবং বৈশেষিক দর্শন সাধারণভাবে সেশ্বরবাদ হিসেবে গণ্য হলেও প্রাথমিক পর্যাযে ঈশ্বরের প্রতি একই ধরনের ঔদাসীন্যের পরিচয় দিয়েছে। ন্যায়সূত্রের স্থানবিশেষে ঈশ্বরের এক সাধারণ উল্লেখ থাকলেও ঈশ্বরবাদের পক্ষে সূত্রকার গৌতমের কী জাতীয় সমর্থন ছিলো তা বলা কঠিন। কেননা ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে–

ঈশ্বরঃ কারণং পুরুষকর্মাফল্যদর্শনাৎ। (ন্যায়সূত্র-৪/১/১৯)।।
অর্থাৎ : কর্মফলমুক্ত পুরুষই ঈশ্বর। (মুক্ততর্জমা)


অতি স্বাভাবিকভাবেই কয়েকজন নৈয়ায়িক ব্যাখ্যাকার এই সূত্রগুলিতে গৌতমের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বদলে ঈশ্বরসম্বন্ধীয় বিশেষ মতবাদের সমালোচনা আবিষ্কার করেছেন। নৈয়ায়িক উদয়নাচার্য, বাচস্পতি মিশ্র এবং বর্ধমানের মতে সূত্রটিতে ঈশ্বরসম্বন্ধীয় সূত্রকারের নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত হয়নি, বেদান্ত মতের সমালোচনা প্রসঙ্গে সূত্রটি এখানে উপস্থাপিত। সূত্রকারের এই ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টাই হয়তো ভাষ্যকার বাৎস্যায়নের ন্যায়ভাষ্যের বক্তব্য–

‘গুণবিশিষ্টমাত্মান্তরমীশ্বরঃ’। (ন্যায়ভাষ্য-৪/১/২১)
অর্থাৎ : গুণবিশিষ্ট (পরম) আত্মাই ঈশ্বর। (মুক্ততর্জমা)


উদয়নাচার্য (ন্যায়কুসুমাঞ্জলি), উদ্দ্যোতকর (ন্যায়বার্তিক) প্রমুখ পরবর্তী নৈয়ায়িকেরা স্পষ্টভাবেই সেশ্বর সংজ্ঞার সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করেছেন। একইভাবে কণাদের বৈশেষিকসূত্রের মধ্যেও ঈশ্বরের উল্লেখ নেই। যদিও বৈশেষিক দর্শনের পরবর্তী আচার্যদের প্রচেষ্টায় অবশ্য এই শাস্ত্র সেশ্বরবাদের তালিকায় নিজের নামকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর ন্যায়-বৈশেষিক অনুসারী আচার্য অন্নংভট্টের স্পষ্ট ঘোষণা–

‘তত্র ঈশ্বরঃ সর্বজ্ঞঃ পরমাত্মা এক এব’। (তর্কসংগ্রহ)।
অর্থাৎ : নিত্য পরমাত্মা বা ঈশ্বর এক ও সর্বজ্ঞ।

এবং তর্কসংগ্রহদীপিকা টীকায় অন্নংভট্ট বলেন–

‘নিত্যজ্ঞানাধিকরণত্বং ঈশ্বরত্বম’। (তর্কসংগ্রহদীপিকা)।
অর্থাৎ : পরমাত্মা বা ঈশ্বর নিত্যজ্ঞানের অধিকরণ বা আশ্রয়।


অন্যদিকে আমরা জানি যে, আস্তিক দর্শনগুলির মধ্যে সাংখ্য নিরীশ্বরবাদীদের সভার পুরোভাগে আপন স্থান নির্দিষ্ট করে নিয়েছে। যুক্তিবাদের সমর্থক এই দর্শনের আচার্যরা ঈশ্বরীয় শক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার বা ঈশ্বরকে দার্শনিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে আদি স্থান দেবার পক্ষে যুক্তির কোন সমর্থন খুঁজে পাননি। যেমন সাংখ্যকারিকায় দেখা যায়–

বৎসবিবৃদ্ধিনিমিত্তং ক্ষীরস্য যথা প্রবৃত্তিরজ্ঞস্য।
পুরুষবিমোক্ষনিমিত্তং তথা প্রবৃত্তিঃ প্রধানস্য।। (সাংখ্যকারিকা-৫৭)
অর্থাৎ : যেমন বাছুরের বৃদ্ধির জন্য অচেতন দুধের (গাভীর স্তন থেকে নিঃসৃত হবার) প্রবৃত্তি হয়, সেইরূপ পুরুষের মুক্তির জন্য অচেতন প্রধানেরও (সৃষ্টির) প্রবৃত্তি হয়ে থাকে।
.
তস্মাত্তৎসংযোগাদচেতনং চেতনাবদিব লিঙ্গম্ ।
গুণকর্ত্তৃত্বেহপি তথা কর্ত্তেব ভবত্যুদাসীনঃ।। (সাংখ্যকারিকা-২০)
অর্থাৎ : সেইহেতু, পুরুষের সংযোগবশত অচেতন মহদাদি চেতনার মতো মনে হয় এবং ত্রিগুণের কর্তৃত্ববশত উদাসীন পুরুষ কর্তার মতো প্রতিভাত হন।
.
পুরুষস্য দর্শনার্থং কৈবল্যার্থং তথা প্রধানস্য।
পঙ্গ্বন্ধবদুভয়োরপি সংযোগস্তৎকৃত সর্গঃ।। (সাংখ্যকারিকা-২১)
অর্থাৎ : পুরুষের মুক্তির জন্য এবং প্রধানের (তথা মূলপ্রকৃতির) ভোগের জন্য পঙ্গু ও অন্ধের মতো উভয়ের (অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতির) সংযোগ হয়। (পুরুষ ও প্রকৃতির) সংযোগবশত মহদাদি ব্যক্ত জগতের সৃষ্টি হয়।


সাংখ্যদর্শনের অন্যান্য গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ঈশ্বর সম্বন্ধীয় বিতর্ক ঈশ্বরের প্রসঙ্গে দর্শনটির একই মনোভাবেরই সাক্ষ্য দেয়। আবার সাধারণের কাছে সাংখ্যের সমান্তর দর্শন যোগদর্শনের পরিচিতি সেশ্বর-সাংখ্য হিসেবে। কারণ বিভিন্ন তত্ত্বের স্বীকৃতিতে উভয় দর্শনের সাম্য থাকলেও ঈশ্বরের স্বীকৃতি প্রসঙ্গ একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করেছে। সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে কিন্তু ‘পুরুষবিশেষ’ রূপে ঈশ্বরের কল্পনা সাংখ্য বা যোগের দার্শনিক কাঠামোতে নেহাতই খাপছাড়া বলে বিদ্বজ্জনেরা মনে করেন। কারণ, সাংখ্য-যোগমতে আদি তত্ত্বের অন্যতম পুরুষ সংখ্যায় বহু হয়েও গুণগত পার্থক্যের কোন অপেক্ষা রাখে না।  যেমন পতঞ্জলির যোগসূত্রে বলা হয়েছে–

ক্লেশকর্ম্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষঈশ্বরঃ। (যোগসূত্র-১/২৪)।।
তত্র নিরতিশয়ং সর্ব্বজ্ঞত্ববীজম্ । (যোগসূত্র-১/২৫)।।
অর্থাৎ : যে পরমপুরুষকে ক্লেশ, কর্ম, বিপাক এবং আশয় অধীন করতে পারে না, যিনি সর্বাত্মা হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তিনিই ঈশ্বর। (যোগসূত্র-১/২৪)।।  যিনি ঈশ্বর, তিনি সর্বজ্ঞ। তাঁতে নিরতিশয় সর্বজ্ঞত্ব-বীজ নিহিত আছে। (যোগসূত্র-১/২৫)।।


এইভাবে অনধিকার প্রবেশকারী ঈশ্বরকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ব্যাখ্যাকারেরা নানাভাবে সচেষ্ট হলেও ঈশ্বরের অন্তর্ভুক্তি যোগদর্শনের তাত্ত্বিক বিন্যাসের সঙ্গে পরিপূর্ণ সঙ্গতি রাখতে কোনক্রমে সক্ষম হয়নি।’- (লতিকা চট্টোপাধ্যায়, চার্বাক দর্শন, পৃষ্ঠা-৬২)। অদ্বৈত-বেদান্তমতের প্রবর্তক শঙ্করাচার্য তাঁর ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে (শাঙ্করভাষ্য-২/২/৩৭) যোগদর্শনের ঈশ্বরসম্বন্ধীয় ধারণার অসঙ্গতির উল্লেখ করেছেন।

তাছাড়া দুটো দর্শনের ভিন্নতা সত্ত্বেও দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকে সাংখ্য ও যোগ প্রায় অভিন্ন হওয়ায় সুপ্রাচীন কাল থেকে প্রকৃত বেদপন্থী দার্শনিকেরা যে বিবেচনায় নিরীশ্বরবাদী সাংখ্যকে একান্তভাবেই বেদ-বিরোধী বলে চিহ্নিত করেন, সেই একই বিবেচনায় যোগকেও তাই বেদ-পন্থী বলে স্বীকার করার খুব সুযোগ থাকে না। এবং তা যে ছিলোও না, দার্শনিক সাহিত্যে এর নমুনা বিরল নয়। ব্রহ্মবাদী দার্শনিক বাদরায়ণ তাঁর ব্রহ্মসূত্রে ব্রহ্মবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বেদ বা শ্রুতি-বিরোধী সাংখ্যমত খণ্ডনের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় সাংখ্য-খণ্ডনের ফলে যে যোগ-দর্শনও খণ্ডিত হয় তা প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে একটি সূত্র রচনা করেছিলেন-

‘এতেন যোগঃ প্রত্যুক্তঃ।। (ব্রহ্মসূত্র : ২/১/৩)
অর্থাৎ : এর দ্বারা যোগদর্শনকেও খণ্ডন করা হলো।


এই সূত্রটির ভাষ্যে প্রখ্যাত অদ্বৈতবাদী বেদান্ত দার্শনিক শংকারাচার্যের বক্তব্য প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অভিমতটিও প্রাসঙ্গিক–
তত্রাপি শ্রুতিবিরোধেন প্রধানং স্বতন্ত্রমেব কারণং মহদাদীনি চ কার্যানি অ-লোকবেদ প্রসিদ্ধানি কল্পান্তে’। অর্থাৎ, যোগদর্শনেও শ্রুতি বিরুদ্ধ– বস্তুত লোকপ্রসিদ্ধি বিরুদ্ধ এবং বেদ-বিরুদ্ধও– প্রধান বা প্রকৃতির এবং প্রধানোৎপন্ন মহত্তত্ত্ব প্রভৃতির (সাংখ্যসম্মত) উপদেশ আছে। এই কারণেই যোগের প্রত্যাখ্যান প্রয়োজন। শংকর প্রশ্ন তুলেছেন, সাংখ্য-প্রত্যাখ্যানের ফলে যোগও যদি প্রত্যাখ্যাত হয় তা হলে এই অতিদেশ-সূত্রটির অবতারণা কেন? উত্তরে তিনি বলছেন, প্রয়োজন এই যে শ্রুতিতে সম্যক-দর্শনের-উদ্ভব-উপায় হিসেবে– অর্থাৎ সাধনপদ্ধতি অর্থে– যোগের প্রশংসা আছে; কিন্তু তা থেকেই কেউ যেন কল্পনা না করেন যে যোগের দার্শনিক তত্ত্বও শ্রুতি-সমর্থিত। প্রসঙ্গত, যোগদর্শনের বেদ-বিরুদ্ধতা বিষয়ে শংকরের সঙ্গে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী বেদান্ত দার্শনিক রামানুজ সম্পূর্ণ একমত। যোগ-দর্শন স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যাখ্যান করবার প্রয়োজন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি স্পষ্টই ‘অবৈদিকত্বাৎ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন।– (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-২৬)।

সাংখ্য ও যোগদর্শনের পারস্পরিক সম্পর্ক যে অনেক গভীর তা কেউ অস্বীকার করেন না। যেমন ভগবদ্গীতায়ও বলা হয়েছে–

‘যৎ সাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদযোগৈরপি গম্যতে।
একং সাংখ্যং চ যোগং চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।’- (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৫/৫)
অর্থাৎ : সাংখ্য যার অধিগম্য, যোগও তার অধিগম্য। সাংখ্য ও যোগের ফল একই মোক্ষ বলে উভয়কে যিনি অভিন্ন দেখেন, তিনিই যথার্থদর্শী, সম্যক্ জ্ঞানী।


তবে তত্ত্বগত বিচারে উভয় দর্শনের ঐক্য সত্ত্বেও সাংখ্যের উপযোগিতা যেখানে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে, যোগদর্শনের উপযোগিতা সেখানে প্রধানত ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করে।
যে দর্শন কেবল তত্ত্ব-নিদিধ্যাসন এবং বৈরাগ্য-অভাসের দ্বারা আত্মসাক্ষাৎকারে বিশ্বাসী, তাকে সাংখ্য এবং যে দর্শন তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধানরূপ ক্রিয়ার সাহায্যে আত্মসাক্ষাৎকারে বিশ্বাসী, তাকে যোগ বলা হয়। সাংখ্য বর্ণিত পুরুষতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব, জগৎ পরিণাম, সৎকার্যবাদ এবং মোক্ষ এসব যোগসম্মত। তবে কৈবল্যলাভের উপায় সম্পর্কে যোগ দর্শনে সাংখ্যের অতিরিক্ত কিছু নির্দেশ আছে। সাংখ্যদর্শনে বিবেকজ্ঞানকেই ত্রিবিধ দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি এবং কৈবল্যলাভের উপায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে যোগ দর্শনে বিবেকজ্ঞান লাভ ও কৈবল্য প্রাপ্তির জন্য অতিরিক্ত কিছু প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াগুলিকে এককথায় ‘যোগ’ বলা হয়।

ভারতীয় দর্শনে ব্যবহারিক উপযোগিতা একটি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। তাই অন্যান্য ভারতীয় দর্শনগুলি একই সংজ্ঞার মাধ্যমে দর্শনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক এই উভয় দিককে পরিস্ফুট করতে সচেষ্ট। অন্যদিকে সাংখ্য-যোগের মধ্যে এই প্রয়াস দুটি সুনির্দিষ্ট দর্শন পদ্ধতির সৃষ্টি করেছে। দুই সম্প্রদায়ের ভিত্তি এক হলেও এদের ব্যবহারিক প্রয়োগ ভিন্ন। যে তাত্ত্বিক মতবাদ সাংখ্যদর্শনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় রূপায়িত, সেই মতবাদেরই পটভূমিকায় মোক্ষপথের যাত্রীকে যোগদর্শন তার অভীষ্ট পথের সন্ধান দিয়েছে সুসংহত উপায়ের নির্দেশনায়। প্রকৃষ্ট জ্ঞান হিসেবে সাংখ্যের এবং শ্রেষ্ঠ বল হিসেবে যোগের যে প্রশংসা মহাভারতে (শান্তিপর্ব, মহাভারত-১২/৩০০-৩০১) দেখা যায় তা নিশ্চয়ই উভয় শাস্ত্রের পারস্পরিক ভেদেরই ইঙ্গিত বহন করে। তাই মোক্ষশাস্ত্রেও বলা হয়–

‘নাস্তি সাংখ্যসমং জ্ঞানং নাস্তি যোগসমং বলম্’।
অর্থাৎ : সাংখ্যতত্ত্বের তুল্য জ্ঞান নেই, যোগের তুল্য বল বা শক্তি নেই।


তাত্ত্বিকভাবে খাপছাড়া মনে হলেও যোগদর্শনে ঈশ্বরের অন্তর্ভুক্তি যে এই ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তারই ভিত্তিতে, একটু তলিয়ে দেখলে বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। মোক্ষ বা আত্মস্বরূপ উপলব্ধির প্রধানতম উপায় হিসেবে যোগ চিত্তবৃত্তি-নিরোধের উপর প্রাধান্য অর্পণ করেছে। যেমন–

‘যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’।- (যোগসূত্র-১/২)
অর্থাৎ : চিত্তবৃত্তির নিরোধই যোগ।

এবং–

‘বিষয়সম্বন্ধাৎ চিত্তস্য পরিণাম-বিশেষা বৃত্তয়ঃ’।- (যোগসূত্র)
অর্থাৎ : বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ হওয়ার ফলে চিত্তের যে বিষয়াকারে পরিণতি, তাই চিত্তের বৃত্তি।


ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত চিত্তের বহির্মুখী চিত্তকে সূক্ষ্মাভিমুখী করে এবং সূক্ষ্ম থেকে ক্রমে সূক্ষ্মতর বিষয়ে অভিনিবিষ্ট হয়ে পরিণামে চিত্তকে আত্মতত্ত্বে বিলীন করার মাধ্যমেই জীবের পরমার্থপ্রাপ্তি সম্ভব বলে যোগদর্শনের অভিমত। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঙ্গযুক্ত যে ক্রিয়াপদ্ধতির বিধান যোগে আছে ‘সমাধি’ তার অন্তিম এবং প্রধানতম পর্যায়। যেমন–

‘সর্ব্বার্থতৈকাগ্রতয়োঃ ক্ষয়োদয়ৌ চিতস্য সমাধিপরিণামঃ’। (যোগসূত্র-৩/১১)
অর্থাৎ : নানা বস্তু সম্বন্ধীয় নানা প্রকার মনোবৃত্তির নিবৃত্তি হলে যে এক পরমবস্তু বিষয়ক পরমাবৃত্তি উদিত হয়, তা-ই সমাধি-পরিণাম।


সমাধির সার্থক রূপায়ন নির্ভর করে অব্যবহিত পূর্ববর্তী অপর দুটি যোগাঙ্গ ‘ধ্যান’ এবং ‘ধারণা’র যথার্থ অনুশীলনের উপর। ‘ধ্যান’ চিত্তের একাগ্রতা এবং ‘ধারণা’ একাগ্র চিত্তের বিশেষ এক বিষয়ে অভিনিবেশের অর্থে ব্যবহৃত। যেমন–

‘দেশবন্ধশ্চিত্তস্য ধারণা’- (যোগসূত্র : ৩/১)
‘তত্র প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানম্’- (যোগসূত্র : ৩/২)
অর্থাৎ : চিত্তকে কোন দেশে (নাড়ীচক্রে, ভ্রূমধ্যে, নাসাগ্রে অথবা কোন দিব্যমূর্তিতে) আবদ্ধ বা সংস্থিত রাখাকেই বলা হয় ধারণা (যোগসূত্র-৩/১)।। ধারণাতে প্রত্যয় বা জ্ঞানবৃত্তির স্থির আলম্বন বা একতানতাকেই ধ্যান বলে। (যোগসূত্র-৩/২)।।


ধারণা ও ধ্যানের মধ্যে পার্থক্য হলো, ধ্যান অবিচ্ছিন্ন আর ধারণা বিচ্ছিন্ন। একই বিষয় সম্পর্কে চিন্তা হলেও ধারণার ক্ষেত্রে খণ্ড খণ্ড জ্ঞানের উদ্ভব হয়, আর ধ্যানের ক্ষেত্রে জ্ঞানের বিষয় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহের মতো চলতে থাকে। ধারণার প্রত্যয়কে বিন্দু বিন্দু জল বা তেলের সঙ্গে তুলনা করা যায়। অন্যদিকে ধ্যানের প্রত্যয় হলো অবিচ্ছিন্ন জলধারা বা তৈলধারার ন্যায়। ধ্যানশক্তির বলে সাধক যে কোন বিষয় অবলম্বন করে ধ্যান করতে পারেন। এই ধ্যান এবং ধারণাযুক্ত চিত্ত পরিণামে সমাধিলাভে সমর্থ হয়; এ অবস্থায় একাগ্র চিত্তের বিশেষ ধারণা অপর সব কিছুকে আত্মসাৎ করে এককভাবে বিরাজ করে।–

যথাভিমতধ্যানাৎ বা। (যোগসূত্র-১/৩৯)।।
তদেবার্থমাত্রনির্ভাসং স্বরূপশূন্যমিব সমাধিঃ। (যোগসূত্র : ৩/৩)।।
অর্থাৎ : নিজের অভিমত যে কোন দিব্যবস্তু ধ্যান করো না কেন, তার প্রভাবে অবশ্যই একাগ্রশক্তি প্রবল হবে (যোগসূত্র-১/৩৯)।।  ধ্যান যখন ধ্যেয়ের স্বভাবের আবেশে জ্ঞানাত্মক স্বভাবশূন্য হয় তখন তাকে সমাধি বলা হয়। (যোগসূত্র-৩/৩)।।


যোগশাস্ত্রে ধারণার বিষয় হিসেবে ঈশ্বরের বিশেষ কোন রূপের উপযোগিতা অনস্বীকার্য এবং যোগসূত্রে ঈশ্বরপ্রণিধানকে সমাধিলাভের এক প্রকৃষ্ট উপায় হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। যেমন–

‘সমাধিরীশ্বর প্রণিধানাৎ’। (যোগসূত্র-২/৪৫)
অর্থাৎ : ঈশ্বর প্রণিধান বা ভগবানে চিত্ত নিবেশ দ্বারা সমাধি হয়।


কিন্তু প্রকৃষ্ট হলেও ঈশ্বরপ্রণিধান সমাধিপথের যাত্রীদের অবশ্য অনুসরণীয় হিসেবে নির্দেশিত হয়নি। কারণ যোগের তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে ঈশ্বরের আবশ্যিক কোন যোগ নেই। ধ্যানশক্তির বলে সাধক যে কোন বিষয় অবলম্বন করেই ধ্যান করতে পারেন। পাতঞ্জলসূত্রে বলা হয়েছে–

‘যথাভিমতধ্যানাৎ বা।’- (যোগসূত্র-১/৩৯)
‘ত্রয়মেকত্র সংযমঃ’। (যোগসূত্র-৩/৪)
‘তজ্জয়াৎ প্রজ্ঞালোকঃ’। (যোগসূত্র-৩/৫)
অর্থাৎ :
নিজের অভিমত যে কোন দিব্যবস্তু ধ্যান করো না কেন, তার প্রভাবে অবশ্যই একাগ্রশক্তি প্রবল হবে। (পাতঞ্জল-১/৩৯)।। পার্থিব কিংবা অপার্থিব কোন বস্তুতে বা বিষয়ে ধারণা, ধ্যান ও সমাধির যে সন্মিলিত প্রয়োগ, তারই এক নাম সংযম। (পাতঞ্জল-৩/৪)।।  সংযম আয়ত্ত হলে দিব্যজ্ঞানময়ী পরমাবুদ্ধি স্ফূরিত হয়। সেই বুদ্ধিপ্রভাবে অসম্ভব সম্ভব হয়। অসাধ্য সাধ্য হয়। তার প্রভাবে করা যায় না এমন কার্য নেই। (পাতঞ্জল-৩/৫)।।


তাই হয়তো একাগ্র চিত্তের চরম পরিণতি সমাধির লক্ষ্যের সহায়ক হিসেবেই ঐশ্বরিক রূপে ভাবনার উপযোগিতায় ঈশ্বরপ্রণিধানকে সমাধির অন্যতম সাধন বলে যোগসূত্রের অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে এভাবে–

‘ঈশ্বর প্রণিধানাৎ বা।’- (যোগসূত্র-১/২৩)
অর্থাৎ : শুদ্ধভক্তি সহকারে ঈশ্বরের অর্চনা করলেও সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অধিকারী হওয়া যায় (পাতঞ্জল-১/২৩)।


এবং এই উপযোগিতারই স্বীকৃতি দেখা যায় সমাধির প্রস্তুতি হিসেবে উপস্থাপিত বিভিন্ন যোগাঙ্গের অন্যতম নিয়মের মধ্যে ঈশ্বরপ্রণিধানের অন্তর্ভুক্তিতে। যেমন–

‘তপঃস্বাধ্যায়েশ্বরপ্রণিধানানি ক্রিয়াযোগঃ।’- (যোগসূত্র-২/১)
‘স সমাধিভাবনার্থঃ ক্লেশতনূকরণার্থশ্চ।’- (যোগসূত্র-২/২)
অর্থাৎ :
তপস্যা, স্বাধ্যায় এবং ঈশ্বরপ্রণিধানকেই ক্রিয়াযোগ বলা হয় (পাতঞ্জল-২/১)।  ঐ ক্রিয়াযোগের অন্তর্গত তপস্যা, স্বাধ্যায় এবং ঈশ্বরপ্রণিধান অভ্যাস করতে করতে নানাপ্রকার ক্লেশের ক্ষয় হতে থাকে এবং তার সাথে সাথে সমাধির অনুকূলশক্তিও বৃদ্ধি হতে থাকে (পাতঞ্জল-২/২)।


অন্যান্য বিভিন্ন নিয়মের অভ্যাসের মতো ঈশ্বরপ্রণিধানের অভ্যাসও যে যোগীকে তার লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করবে যোগদর্শনের আচার্যরা তা উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং ঈশ্বরের এই ব্যবহারিক উপযোগিতার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করতেও তাঁরা কুণ্ঠিত হননি। বস্তুতপক্ষে–
তাত্ত্বিক বিচারের দ্বারপথে দার্শনিক মতবাদের রাজ্যে ঈশ্বরের প্রবেশ কষ্টসাধ্য। তৎসত্ত্বেও মানুষের সহজ ধর্মবিশ্বাস স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তারই ভিত্তিতে ভারতের দর্শন বহুক্ষেত্রে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছে। প্রকৃতপক্ষে দার্শনিক মতবাদ এবং ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টানা কোনদিন সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ প্রাথমিক পর্যায়ে নিরীশ্বরবাদী হলেও ব্যাখ্যাকারদের ধর্মীয় মতবাদের প্রভাবে পরিণামে সেশ্বরবাদে রূপান্তরিত হয়েছে। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের ভাষ্য এবং টীকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ভাষ্যকারদের মধ্যে অনেকেই শৈব সম্প্রদায় ভুক্ত। ফলে উভয় দর্শনেই ঈশ্বর ক্রমশঃ তাঁর আসন নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন। নিরীশ্বরবাদী হিসাবে সুপরিচিত সাংখ্যদর্শনও বৈষ্ণব ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে বহুক্ষেত্রে একাত্ম হয়ে মহাভারত এবং ভাগবতপুরাণে সেশ্বরবাদে রূপান্তর লাভ করেছে। মহাভারত ও পুরাণাদিতে অভিব্যক্ত সাংখ্যমত অবশ্য এই দর্শনের যুক্তিবাদী রূপ সম্পূর্ণ লুপ্ত এবং সম্প্রদায়বিশেষের ধর্মমতের দার্শনিক ভিত্তি হিসাবে এই মতে বর্ণনা করা যায়।’- (লতিকা চট্টোপাধ্যায়, চার্বাক দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৪)।

এবং পরবর্তী যুগের ভাষ্যকার সাংখ্যাচার্য বিজ্ঞানভিক্ষু এই ধর্মবিশ্বাসেরই প্রভাবে সাংখ্যদর্শনকে সেশ্বরবাদ হিসেবে প্রচারে প্রবৃত্ত হয়েছেন। সাংখ্যের নিজস্ব দার্শনিক কাঠামো যে ঈশ্বরকে স্বীকার করার পথে প্রধান বাধা প্রসঙ্গক্রমে তারও উল্লেখ বিজ্ঞানভিক্ষুর রচনায় (সাংখ্যপ্রবচনভাষ্য, ভূমিকা) দৃষ্ট হয়। যেমন–

‘ঈশ্বরব্যবস্থাপনস্য স্বশাস্ত্রেহনুপযোগাৎ’। (বিজ্ঞানামৃতভাষ্য, পৃ-১২৯)
অর্থাৎ : ঈশ্বর স্বীকৃতির ব্যবস্থা এই শাস্ত্রের পক্ষে অনুপযোগী। (মুক্ততর্জমা)

আর তাই হয়তো সাংখ্যপ্রবচনভাষ্যের ভূমিকায় ভাষ্যকার বিজ্ঞানভিক্ষু স্বয়ং স্বঘোষিত দায়িত্ব নিয়ে আরো বললেন–

‘কালার্কভক্ষিতং সাংখ্যশাস্ত্রং জ্ঞান-সুধাকরম্ ।
কলাবশিষ্টং ভূয়োহপি পুরয়িষ্যে বচোহমৃতৈঃ।। (সাংখ্যপ্রবচনভাষ্য)
অর্থাৎ : সাংখ্যশাস্ত্র কালসূর্যের গ্রাসে পতিত হয়েছে এবং তার কলামাত্রই অবশিষ্ট আছে ; আমি অমৃতবাক্যের দ্বারা তা পূরণ করবো।


সেশ্বরবাদের অবদানের প্রসঙ্গে এটা স্পষ্ট যে ভারতীয় দর্শন কেবলমাত্র কতিপয় মতবাদের সমষ্টিই নয়, ব্যবহারিক উপযোগিতাকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় দর্শনের সার্থকতা। আর যে ধর্মীয় বিশ্বাসের দ্বারপথে এই ঈশ্বর ভারতীয় দর্শনে প্রবেশ লাভ করেছেন সেই বিশ্বাস যুক্তি বা অনুমানের সঙ্গে সমানভাবেই ভারতীয় দার্শনিক জগতে প্রমাণ হিসেবে গণ্য এবং প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন ঋষি এবং কথিত সত্যদ্রষ্টাদের উক্তিতে বিশ্বাসের রূপ নিয়ে ‘শব্দ’ বা ‘শ্রুতি’ এই প্রমাণের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। যুক্তির মাধ্যমে যার বিচার হয় না সেই ধর্মচেতনা ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যেহেতু বেদান্তদর্শনে এই ধর্মবিশ্বাসের প্রভাব অপরিসীম, তাই সেশ্বরবাদের সঙ্গে বেদান্তের একাত্মতা খুব সহজ পদ্ধতিতেই দেখা যায়। মোটকথা ঈশ্বরের সঙ্গে বেদান্তের সহজ, স্বাভাবিক সম্পর্কের মূল অনুসন্ধান করতে হয় ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে দর্শনটির এই অঙ্গাঙ্গী-যোগের মধ্যে।

অন্যদিকে ‘নিরীশ্বর বৌদ্ধ এবং জৈন দর্শনও ব্যবহারিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে একাত্ম করে ভারতের অন্য আস্তিক দর্শনগুলির মতই সেশ্বরবাদের রূপ নিয়ে ধর্মমতে পরিণতি লাভ করেছে। বুদ্ধদেব এবং জৈন তীর্থঙ্করেরা ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীরব থাকলেও পরবর্তী অনুগামীরা ক্রমে নিজ নিজ ধর্মমার্গের প্রবর্তকদের মধ্যেই ঈশ্বরত্ব আরোপ করতে থাকেন। আর এইভাবে তাঁরা সাধারণ ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি বিধানে প্রয়াসী হন। বৌদ্ধ এবং জৈন মতবাদ দর্শনের পর্যায় থেকে পরিপূর্ণ ধর্মমতে রূপান্তর লাভ করে এবং বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবীদের আপন গণ্ডীতে ক্রমশঃ আত্মসাৎ করতে আরম্ভ করে।’- (লতিকা চট্টোপাধ্যায়, চার্বাক দর্শন, পৃষ্ঠা-৬৬)।

অতএব, পরিশেষে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আত্মা, জন্মান্তর, কর্মফল, অদৃষ্ট, মোক্ষ, ঈশ্বর, শ্রুতি এবং অনুমান প্রমাণ ইত্যাদি ধারণার উৎসগুলিই আসলে ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনের উর্বর কল্পক্ষেত্রটিকে বহুবিচিত্রভাবে পল্লবিত করেছে। সাধারণ জনজীবনে সার্বিকভাবে এর পরবর্তী প্রভাবও নিশ্চয়ই অনস্বীকার্য। এবং সেগুলিই যদি প্রতিরোধের নিমিত্তে প্রতিরোধাত্মক চার্বাকী মতের উত্থানের চূড়ান্ত কারণ হয়ে থাকে তবে সে সম্ভাবনাকেও নিশ্চয়ই উড়িয়ে দেয়া যাবে না। তবে ওই আলোচনায় যাবার আগে ইতঃপূর্বে যে বিষয়টি দৃষ্টান্তের অপেক্ষায় অসম্পূর্ণ থেকে গেছে সেদিকে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক।

আগেই বলা হয়েছে মীমাংসকরা নিরীশ্বরবাদী। এবং সে-প্রেক্ষিতে মীমাংসক শবরস্বামী, আচার্য প্রভাকর মিশ্র এবং কুমারিল ভট্ট ঈশ্বরের অস্তিত্বের সমর্থনে প্রদত্ত বিভিন্ন দার্শনিকদের যুক্তির বিরোধিতা করে ঈশ্বরের অস্তিত্বের অসার্থকতা প্রমাণ করার যে অভূতপূর্ব চেষ্টা করেছেন, যুক্তিনিষ্টতায় ভারতীয় দর্শনেই তা প্রায় বিরল। কীভাবে?

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : দর্শনে যুক্তিবাদ বা প্রমাণমিতি] [*] [পরের পর্ব : মীমাংসক কর্তৃক ঈশ্বরের অস্তিত্ব খণ্ডন]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 172,001 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: