h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|ভারতীয় দর্শনের বিকাশ-০৭ : দর্শনে যুক্তিবাদ বা প্রমাণমিতি|

Posted on: 10/07/2015


602621_499911806689708_410310815_n

| ভারতীয় দর্শনের বিকাশ-০৭ : দর্শনে যুক্তিবাদ বা প্রমাণমিতি |
রণদীপম বসু

২.৪ : দর্শনে যুক্তিবাদ বা প্রমাণমিতি

‘প্রমাণ’ সংজ্ঞায় জ্ঞানের মাধ্যমকে বোঝায়। মানুষের জ্ঞানের বিস্তীর্ণ রাজ্যে যে যে বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি, দার্শনিক বিচারের পরিসরে আসার যোগ্যতা একমাত্র সেগুলিরই। যে প্রবেশপথকে আশ্রয় করে মানুষের অন্তর্লোকে জ্ঞানের ভাণ্ডারে বিষয়গুলির ক্রমিক সঞ্চয়, তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘প্রমাণ’ এই বিশেষ শব্দের দ্বারা। প্রমাণের বিচার বিষয়ে ভারতীয় দার্শনিকেরা বিশেষ তৎপর, কারণ তাঁরা মনে করেন যে জ্ঞানের সত্যাসত্য নির্ধারণের প্রস্তুতি রচিত হয় জ্ঞানের প্রবেশপথ বা প্রমাণের গুণাগুণ বিচারের মাধ্যমে। তাই যে প্রণালী দ্বারা প্রমা বা যথার্থজ্ঞান লাভ করা যায় তাকেই প্রমাণ বলা হয়।
ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন শাখায় প্রমাণকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। আবার প্রতিটি শ্রেণীকে বিশিষ্ট লক্ষণের সুনির্দিষ্ট বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়েছে। তবে ভারতীয় দর্শনগুলির মধ্যে প্রমাণের বিচার সর্বাধিক প্রাধান্যের দাবি রাখে ন্যায়দর্শন। এ কারণেই ভারতীয় দর্শন জগতে ‘প্রমাণশাস্ত্র’ হিসেবে ন্যায়ের পরিচিতি।


প্রমাণ বা জ্ঞানের মাধ্যম হিসেবে সাধারণভাবে দুটি নাম উল্লেখ করা যেতে পারে– প্রত্যক্ষ এবং অনুমান। চার্বাক এবং চার্বাকেতর, পরস্পরবিরোধী এই দুটি ভারতীয় দর্শনগোষ্ঠির মধ্যে সেতুবন্ধ রচিত হয়েছে এই প্রমাণ দুটি, বিশেষ করে প্রথমটির সাহায্যে। কারণ দ্বিতীয়টির আংশিক অনুমোদন লক্ষণীয় কেবলমাত্র চার্বাকের বিশেষ একটি শাখাগোষ্ঠির মধ্যে। প্রথমটির বিরোধিতা চার্বাকের একাংশে দেখা গেলেও চার্বাক নামের সঙ্গে এই প্রত্যক্ষ প্রমাণের স্বীকৃতির এক অচ্ছেদ্য যোগ সকলের কাছে সুপরিস্ফুট।

চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বহির্জগতের সঙ্গে সরাসরি যোগের ফলে আমাদের যে জ্ঞান হয়, প্রত্যক্ষ প্রমাণকে তার মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। মহর্ষি গৌতম তাঁর ন্যায়সূত্রে প্রত্যক্ষের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে–

‘ইন্দ্রিয়ার্থ সন্নিকর্ষোৎপনং জ্ঞানম্ অব্যোপদেশ্য অব্যভিচারী ব্যবসায়ত্মকম্ প্রত্যক্ষম্’। (ন্যায়সূত্র: ১/১/৪)।
অর্থাৎ : ইন্দ্রিয় এবং অর্থের সন্নিকর্ষের ফলে যে অব্যাপদেশ্য (অশাব্দ), অব্যভিচারী  (অভ্রান্ত) এবং ব্যবসায়াত্মক (নিশ্চয়াত্মক) জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তাই প্রত্যক্ষ।


আমাদের বাহ্য ইন্দ্রিয় পাঁচটি– চক্ষু বা দর্শনেন্দ্রিয়, কর্ণ বা শ্রবণেন্দ্রিয়, নাসিকা বা ঘ্রাণেন্দ্রিয়, জিহ্বা বা স্বাদেন্দ্রিয়, ত্বক বা স্পর্শেন্দ্রিয়। তাই বাহ্য প্রত্যক্ষণও পাঁচ রকমের হয়। আবার ন্যায়মতে মন ইন্দ্রিয়ের অতিরিক্ত অন্য করণ। অনুমানসিদ্ধ মনের অস্তিত্ব সাধনে ন্যায়সূত্র-এ বলা হয়েছে–

‘যুগপৎ জ্ঞানানুৎপত্তিঃ মনসো লিঙ্গম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/১৬))।
অর্থাৎ : যুগপৎ বা একই সময়ে দুটি বিষয়ের জ্ঞানের উৎপত্তি না হওয়ায় মনের অস্তিত্ব অনুমিত হয়।

আর অন্নংভট্ট তর্কসংগ্রহদীপিকা টীকায়  মন-এর লক্ষণ দিয়েছেন–

‘স্পর্শরহিতত্বে সতি ক্রিয়াবত্ত্বং মনসো লক্ষণম্’। (তর্কসংগ্রহদীপিকা)।
অর্থাৎ : যা স্পর্শশূন্য, কিন্তু ক্রিয়াবান, তাই মন।


এই মনকে আন্তর-ইন্দ্রিয় হিসেবে গণ্য করে মনের বিভিন্ন অনুভূতিকে প্রত্যক্ষজ জ্ঞানের অন্তর্গত করা যেতে পারে। এই প্রত্যক্ষজ জ্ঞানেরই ভিত্তিতে উপযুক্ত মানসিক বিচারের সাহায্যে আমাদের জ্ঞানের রাজ্য আরও প্রসারিত হতে পারে এবং এক্ষেত্রে অনুমানের ভূমিকা স্বীকার্য। যুক্তি বা তর্ক এই অনুমানের আশ্রয়। আমাদের জ্ঞানের রাজ্যের অধিকাংশ উপাদানেরই সরবরাহের ব্যাপারে ‘প্রত্যক্ষ’ এবং ‘অনুমান’ এই প্রমাণ দুটির উপযোগিতার বিষয়ে সাধারণভাবে সকলেরই মতৈক্য দেখা যায়।

কিন্তু ‘শব্দ’ নামে অতিরিক্ত আর একটি প্রমাণ ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঞ্চার করেছে। ‘শব্দ’ বৈদিক বচনের অর্থে ব্যবহৃত হলেও ‘শব্দ’ এই সংজ্ঞার দ্বারা আপ্তবাক্যকে অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য পুরুষের মুখনিঃসৃত শব্দকে সাধারণভাবে প্রামাণ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। ন্যায়সূত্র-এ মহর্ষি গৌতম শব্দের লক্ষণে বলেছেন–

‘আপ্তোপদেশঃ শব্দঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/৭)
অর্থাৎ : আপ্তব্যক্তির উপদেশবাক্যই শব্দ প্রমাণ।


ন্যায়মতে, ভ্রম (একটি বস্তুকে অন্যরূপে জানা), প্রমাদ (অসাবধানতা), বিপ্রলিপ্সা (বঞ্চনা করার ইচ্ছা) ও করণাপাটব (ইন্দ্রিয়ের ত্রুটি)– এই চারটি দোষশূন্য যথার্থ বক্তাই আপ্তব্যক্তি। অন্নংভট্টে মতে–

‘আপ্তঃ তু যথার্থবক্তা’। (তর্কসংগ্রহ)।
অর্থাৎ : আপ্তব্যক্তি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি যথার্থ বক্তা।

অদ্বৈত বেদান্তের প্রবক্তা শঙ্করাচার্য মনে করেন যে–

‘পুরুষোৎপ্রেক্ষামাত্রনিবন্ধনাস্তর্কা অপ্রতিষ্ঠিতাঃ’। (শাঙ্করভাষ্য-২/১/১১)।
অর্থাৎ : যুক্তি বা তর্কের মাধ্যমে কোন প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান লাভ করা সম্ভব নয় বলে তর্ক অপ্রতিষ্ঠিত। আপ্তপুরুষোক্তি প্রামাণ্য। (মুক্ততর্জমা)


তার মানে হলো, ‘যুক্তি বা তর্কের মূল মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তাধারার ভিতর। ব্যক্তিনিষ্ঠ এই প্রমাণ বিভিন্নমুখী হতে বাধ্য এবং এই বিভিন্নমুখী ভাবনাকে কোন নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে ধরা যায় না। সেই কারণেই এর সাহায্যে চিরন্তন বা শাশ্বত কোন সত্যের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবিশেষ অতিমানস প্রত্যক্ষের দ্বারা যে সত্যের সন্ধান লাভ করেছেন, পরম্পরালব্ধ সেই জ্ঞান আপ্তবাক্যের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়। ‘শব্দ’ বা ‘শ্রুতি’ এই সংজ্ঞাগুলি একই মাধ্যমের পরিচিতি বহন করে। জ্ঞানের এই মাধ্যম বা প্রমাণের প্রবেশপথ দিয়ে মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডারে যে বিশেষ সম্পদের সঞ্চয় হয়, ইন্দ্রিয় বা বুদ্ধির দ্বারপথে তা কোনক্রমে সম্ভব নয়।

‘শব্দ’ বা ‘শ্রুতি’ সাধারণভাবে বেদের অর্থই প্রযোজ্য। সুতরাং এই দৃষ্টিকোণের বিচারে বৌদ্ধ এবং জৈন দর্শনে এই প্রমাণের অন্তর্ভুক্তি না থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ বেদবিরোধিতাকে কেন্দ্র করেই নাস্তিক হিসেবে প্রধানতঃ এদের পরিচিতি। কিন্তু বিশেষভাবে বৈদিক বচনের অনুগামী না হয়েও মহামানব বুদ্ধ বা জৈন তীর্থঙ্করদের বচনের অনুসরণ করে বৌদ্ধ এবং জৈনরা আপ্তবচনকে অন্যভাবে তাঁদের প্রমাণের অন্তর্গত করেছেন।
জৈনমতে প্রমাণ দুরকম– প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। তাই বলা হয়েছে–

‘বিজ্ঞানং স্বপরাভাসি প্রমাণং বাধবর্জিতম্ ।
প্রত্যক্ষং চ পরোক্ষং চ দ্বিধা মেয়বিনিশ্চয়াৎ।।’
অর্থাৎ : বিজ্ঞান নিজেকে ও অন্য বস্তুকে প্রকাশ করে। তা যখন সমস্ত বাধারহিতভাবে উৎপন্ন হয় তখন তা নিশ্চিত জ্ঞান। এই নিশ্চিত জ্ঞানকেই প্রমাণ বলে। এবং প্রমেয় বিষয় যে প্রকারে জ্ঞানে প্রকাশিত হয় সে অনুসারে জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বলা হয়।

অনুমান এবং ‘শ্রুত’ শেষোক্ত পরোক্ষ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার্য। এই ‘শ্রুত’ জ্ঞানকেই ক্ষেত্রবিশেষে শব্দ বা ‘আগম’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন, জৈন দার্শনিক মানিক্যনন্দীর ‘পরীক্ষামুখসূত্রে’ বলা হয়েছে–

‘আপ্তবচনাদিনিবন্ধম্ অর্থজ্ঞানম্ আগমঃ’।- (পরীক্ষামুখসূত্র-৩/৯৯)
অর্থাৎ : আপ্তবাক্য হস্তসঙ্কেত প্রভৃতি হতে উৎপন্ন বিষয়ের জ্ঞান হচ্ছে আগম।


আস্তিক দর্শনের ‘শ্রুতি’ বা বেদের মতো ‘শ্রুতি’ বা অঙ্গাদি শাস্ত্রকে জৈনরা বিশেষ প্রমাণের মর্যাদা দিয়ে থাকেন। তবে বৌদ্ধ দর্শনে বুদ্ধের বাণী এভাবে ‘শ্রুত’ নামে পরিচিত না হলেও কার্যক্ষেত্রে কিন্তু এই বাণীই বৌদ্ধদের কাছে চরম প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। কাজেই আপ্তবাক্য অধ্যাত্মবাদীদের কাছে জ্ঞানের একটি প্রধান মাধ্যম।
কিন্তু নাস্তিক বৌদ্ধ এবং জৈনদের বাদ দিয়ে আস্তিকতার পঙক্তিতে যাদের স্থায়ী আসন সাধারণভাবে স্বীকৃত কেবল তাদের বেছে নিলেও ‘শব্দ’ বা বেদকে প্রমাণ হিসেবে প্রাধান্য দানের ব্যাপারে প্রচুর তারতম্যের সন্ধান পাওয়া যায়।

বেদের প্রামাণ্য বিষয়ে বোধ হয় মীমাংসা-দর্শনই অগ্রণীর ভূমিকা দাবি করতে পারে। মীমাংসা মনে করে যে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের পথে বেদের প্রামাণ্যই একমাত্র বিচার্য। অর্থাৎ মীমাংসার মূল সুর হলো ধর্ম বা বেদার্থের বিচার। এ-প্রেক্ষিতে জৈমিনির দ্বিতীয় সূত্রটিই হলো–

‘চোদনালক্ষণোহর্থো ধর্ম’।- (মীমাংসাসূত্র : ১/১/২)
অর্থাৎ : চোদনা লক্ষণ অর্থাৎ চিহ্ন বা জ্ঞাপক যার সেই বিষয়ই ধর্ম।


‘চোদনা’ শব্দের মীমাংসাসম্মত অবিসংবাদিত অর্থ হলো প্রবর্তক বাক্য। তবে যে কোন প্রবর্তক বাক্য নয়, প্রবর্তক বেদবাক্য দ্বারা সূচিত বিষয়ই ধর্ম। যদিও মীমাংসাদর্শনে প্রত্যক্ষ, অনুমান এবং অপর কয়েকটি প্রমাণ সম্বন্ধে আলোচনা আছে, এ আলোচনার উদ্দেশ্য এই শাস্ত্র মতে প্রধানতঃ নেতিবাচক-লক্ষ্যসিদ্ধির ক্ষেত্রে এদের প্রয়োজনীয়তার অভাব প্রদর্শন। এক্ষেত্রে মীমাংসক শবরস্বামীর দ্বিধাহীন ভাষ্য–

‘প্রত্যক্ষপূর্বকত্বাচ্চানুমানোপমানার্থাপত্তীনামপ্যকারণত্বম্’।- (শাবরভাষ্য)
অর্থাৎ : প্রত্যক্ষাতিরিক্ত অনুমান, উপমান এবং অর্থাপত্তিও অনিমিত্ত, অর্থাৎ ধর্মকে জানাতে অপারগ, যেহেতু তারা সকলেই প্রত্যক্ষপূর্বক। প্রত্যক্ষ যার নাগাল পায় না তারাও সেখানে ব্যর্থ।


ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের ক্ষেত্রে অবশ্য এই প্রমাণগুলির উপযোগিতা দেখানো হয়েছে; কিন্তু সেটা নেহাতই গৌণ, মুখ্য ভূমিকা এ বিষয়ে শব্দ প্রমাণের বা বেদের, মীমাংসাদর্শনে যা শাস্ত্র বা আগম বলেও পরিচিত। এবং এই বেদকে আশ্রয় করেই মীমাংসকরা তাঁদের চিন্তার প্রসারে উদ্যোগী। শব্দপ্রাধান্যবাদের এই অন্যতম উৎস হলো মীমাংসক শবরস্বামীর ভাষ্য–

‘চোদনা হি ভূতং ভবন্তং ভবিষ্যন্তং সূক্ষ্মং ব্যবহিতং বিপ্রকৃষ্টমিত্যেবংজাতীয়কম্ অর্থং শক্লোত্যবগময়িতুম্, নান্যত্ কিঞ্চন, নেন্দ্রিয়ম্’। (শাবরভাষ্য)
অর্থাৎ : চোদনা অর্থাৎ প্রবর্তক বা বিধায়ক বাক্য অতীত, বর্তমান, ভাবী, সূক্ষ্ম অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের অগম্য, ব্যবহিত অর্থাৎ স্থান এবং কালের দিক থেকে যার সঙ্গে ব্যবধান, দূরবর্তী এবং এজাতীয় অন্য অর্থকেও জানাতে পারে; যা অন্য কিছু করতে পারে না; এমনকি ইন্দ্রিয়ও নয়।


‘শব্দ’ বা বেদের প্রাধান্য ন্যায় এবং বৈশেষিক দর্শনেও অনুমোদিত। কিন্তু প্রমাণের আসরে বৈদিক বচনের একক ভূমিকা মীমাংসার মতো এই দর্শনদ্বয়ের সমর্থন লাভ করেনি। বৈশেষিক দর্শনে শব্দের প্রামাণ্য স্বতন্ত্র রূপে গ্রাহ্য নয়। এটি অনুমানেরই এক অঙ্গ হিসেবে স্বীকার্য।
আর বৈদিক কর্মকাণ্ডের উপর সাংখ্য এবং যোগের বিরাগ নানাভাবেই লক্ষণীয়। আমরা ইতঃপূর্বেই দেখেছি ঈশ্বরকৃষ্ণের ‘সাংখ্যকারিকা’র দ্বিতীয় কারিকায় বলা হয়েছে–

‘দৃষ্টবদানুশ্রবিকঃ স হ্যবিশুদ্ধিক্ষয়াতিশয়যুক্তঃ।
তদ্বিপরীতঃ শ্রেয়ান্ ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞানাৎ।।’- (সাংখ্যকারিকা-২)
অর্থাৎ : বৈদিক যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াকলাপও লৌকিক উপায়ের মতো ত্রিবিধ দুঃখের ঐকান্তিক ও আত্যন্তিক নিবৃত্তি সাধনে অসমর্থ। সেই যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াকলাপ যেহেতু অবিশুদ্ধি, ক্ষয় ও অতিশয়যুক্ত, সেহেতু যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াকলাপের বিপরীত দুঃখ নিবৃত্তির সেই সাংখ্যশাস্ত্রীয় উপায় ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞান-ই শ্রেয়। কারণ ব্যক্ত, অব্যক্ত ও জ্ঞ-এর বিবেকজ্ঞান থেকে দুঃখের অবশ্যম্ভাবী ও চির নিবৃত্তি হয়।


স্থানবিশেষে বেদের মহিমাকীর্তনের মাধ্যমে আস্তিক দর্শনগুলির সঙ্গে ক্ষীণ সংযোগসূত্র রক্ষা করতে সচেষ্ট হলেও এই দর্শন দুটি প্রধানত যুক্তিবাদী এবং ‘শব্দ’ বা বেদের তুলনায় প্রত্যক্ষ বা অনুমানই এখানে অধিকতর মর্যাদার অধিকারী। যেমন এ প্রেক্ষিতে সাংখ্যকারিকাকার ঈশ্বরকৃষ্ণের ষষ্ঠ কারিকার বক্তব্যটিতে তা অপ্রকাশ্য নয়–

‘সামান্যতস্তু দৃষ্টাৎ অতীন্দ্রিয়াণাং প্রতীতিরনুমানাৎ।
তস্মাদপি চ অসিদ্ধং পরোক্ষম্ আপ্তাগমাৎ সিদ্ধম্ ।।’- (সাংখ্যকারিকা-৬)
অর্থাৎ : সামান্যতোদৃষ্ট অনুমানের দ্বারা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের অতীত (প্রকৃতি, পুরুষাদি) তত্ত্বের জ্ঞান হয়। সামান্যতোদৃষ্ট এবং শেষবৎ অনুমানের দ্বারা অতীন্দ্রিয় কোন তত্ত্ব অসিদ্ধ হলে সেই অতীন্দ্রিয় তত্ত্ব আপ্তবচনরূপ আগম বা শব্দ প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধ হয়।


‘শ্রুতি’র প্রতি সাংখ্য ও যোগের আনুগত্য উপনিষদীয় বচনের মারফৎ; বৈদিক মন্ত্রের মাধ্যমে নয়। তাই হয়তো বৈদিক প্রভাবপুষ্ট মীমাংসাদর্শনের অনুগামী কুমারিল ভট্টের কাছে (তন্ত্রবার্ত্তিক-১/৩/৪) সাংখ্য এবং যোগ বেদবিরোধিতার ক্ষেত্রে বৌদ্ধ দর্শনের সমপর্যায়ভুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে। এমনকি বেদান্তবাদীরাও সাংখ্যকে বেদবিরোধী আখ্যায়িত করে বেদান্তদর্শনে সাংখ্যমত খণ্ডনেই প্রচুর শ্রম ব্যয় করেছেন। যেমন শঙ্করাচার্য্যরে ভাষ্যে মহর্ষি বাদরায়ণের ব্রহ্মসূত্রে বলা হয়েছে–

‘বিপ্রতিষেধাৎ চ অসমঞ্জসম্’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/২/১০)।।
ভাবার্থ : শ্রুতি-স্মৃতির সাথে সাংখ্যের বহু বিরোধ আছে এবং সাংখ্যদর্শনের নিজের চিন্তার মধ্যেও স্ববিরুদ্ধভাব আছে। সুতরাং সাংখ্যের প্রধান গ্রহণযোগ্য নন।

এবং যোগদর্শনকে খণ্ডন করতে গিয়ে বেদান্তসূত্রে বাদরায়ণ বলেন–

‘এতেন যোগঃ প্রত্যুক্তঃ’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩)।।
ভাবার্থ : একই যুক্তিতে সাংখ্য মতানুসারী যোগ স্মৃতি-শাস্ত্রের প্রামাণ্যকেও খণ্ডন করা হলো (ব্রঃ-২/১/৩)।


যাই হোক, ‘শব্দ’, ‘শ্রুত’ বা ‘আপ্তবাক্য’ যে নামেই অভিহিত হোক না কেন– প্রত্যক্ষ এবং অনুমানের অতিরিক্ত এই বিশেষ প্রমাণটি যে ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনে বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয়ের সীমাবহির্ভূত এক বিশেষ জগতের পরিচয় এনে দিতে সাহায্য করেছে এতে সন্দেহ নেই। ভারতীয় চিন্তাধারায় এই আপ্তবাক্যের অন্তর্ভুক্তি থেকে যুক্তিতর্কবিহীন অন্ধ বিশ্বাসের প্রতি ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনের সমর্থনের ইঙ্গিত আবিষ্কার করা অস্বাভাবিক নয়। ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শন এভাবে প্রতিপক্ষের সমালোচনার বিষয়বস্তু হতেই পারে। কিন্তু ভারতীয় দার্শনিকেরা বিভিন্ন সিদ্ধান্তে যেভাবে উপনীত হয়েছে সেগুলি ভালোভাবে পর্যালোচনা করলে তাঁদের অভূতপূর্ব বুদ্ধিদীপ্ততার দৃষ্টান্তই ভেসে উঠে।

যুক্তির প্রতি কোন কোন দর্শনের অনুরক্তি আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি। আপ্তবচনমাত্রই ভারতীয় দর্শনে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। বিভিন্ন আপ্তবচনের মধ্যে কোনগুলি গ্রাহ্য তা বিচার করার ক্ষেত্রে যুক্তিই বহুলাংশে পদপ্রদর্শকের ভূমিকা রেখেছে। তবে যুক্তি বা অনুমানের সমর্থন ছাড়াও আপ্তবচনের গ্রহণযোগ্যতার বিচারে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির সাক্ষ্য ভারতীয় দর্শনে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে। এটা বোধকরি বলা অসঙ্গত হবে না যে, ভারতীয় দর্শন প্রধানতঃ ব্যবহারিক দর্শন। ব্যবহারিকতার মাপকাঠির বিচারে যারা ছাড়পত্র পেয়েছে, একমাত্র সেই মতগুলিরই গ্রহণযোগ্যতা ভারতীয় দর্শনে সুনির্দিষ্ট। আপ্তবাক্য লব্ধ জ্ঞানকে ভারতীয় দার্শনিক অন্ধভাবে বিশ্বাস করে নিশ্চিন্ত থাকেননি। সাক্ষাৎ উপলব্ধির ভিত্তিতে তার উপযুক্ত মান নির্ধারণ করে তবেই তাকে জ্ঞান সংজ্ঞায় চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। এ নিয়েও ভারতীয় দর্শন জগতে মতান্তরের শেষ নেই। তবে একাগ্রতা ও অধ্যবসায়ের সাহায্যে যে এ জ্ঞান প্রকৃতই উপলব্ধিগম্য দৃঢ় প্রত্যয়ে তা ব্যক্ত করতে তাঁরা কুণ্ঠা বোধ করেননি। এই জ্ঞানলাভের পথেরও সঠিক নির্দেশ করতে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ, অনুমান এবং আপ্তবাক্য– এই তিনটির অতিরিক্ত উপমান, অর্থাপত্তি ইত্যাদিকে প্রমাণের পর্যায়ে অনেকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। যেমন নৈয়ায়িকেরা উপমানকে এই তিন প্রমাণের অতিরিক্ত অপর একটি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ন্যায়সূত্রে বলা হয়েছে–

‘প্রত্যক্ষানুমানোপমানশব্দাঃ প্রমাণানি’।। (ন্যায়সূত্র-১/১/৩)
অর্থাৎ : প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ নামে প্রমাণপদার্থ চতুর্বিধ।


আবার উপমানের সঙ্গে অর্থাপত্তিকে যুক্ত করে মীমাংসকাচার্য প্রভাকর মিশ্র প্রমাণের সংখ্যা পাঁচ বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে এই পঞ্চবিধ প্রমাণের সাথে কৌমারিল বা ভাট্ট-মীমাংসকেরা ষষ্ঠ প্রমাণ হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন অনুপলব্ধি বা অভাবপ্রমাণকে। অর্থাৎ ভাট্টমীমাংসক মতে প্রমাণ ছয় প্রকার- প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান, শব্দ, অর্থাপত্তি এবং অনুপলব্ধি। সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে হয়তো এই অতিরিক্ত প্রমাণগুলির মধ্যে অনুমানকে খুঁজে নিতে অসুবিধা হয় না। তবে আলোচিত প্রত্যক্ষ, অনুমান, শব্দ– এই তিনটিই প্রমাণই সাধারণভাবে ভারতীয় অধ্যাত্মবাদী দার্শনিকমহলে প্রামাণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : অবিদ্যা] [*] [পরের পর্ব : ঈশ্বরবাদ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,433 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: