h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|ভারতীয় দর্শনের বিকাশ-০৪ : পরমার্থ মোক্ষ|

Posted on: 09/07/2015


552603_502923003058623_1256239778_n

| ভারতীয় দর্শনের বিকাশ-০৪ : পরমার্থ মোক্ষ |
রণদীপম বসু

২.১ : পরমার্থ মোক্ষ

যেহেতু বৈদিক ষড়দর্শনগুলির নিজস্ব স্বীকৃতি অনুযায়ী এগুলি উপনিষদের অনুগামী, তাই ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনের মূলগত ঐক্যের বীজের সন্ধানও প্রকৃতপক্ষে উপনিষদেই করা চলে। এবং আরও দেখা যায়, ‘নাস্তিক’ সংজ্ঞায় চিহ্নিত বৌদ্ধ এবং জৈন দর্শন দুটির মধ্যেও একই উপনিষদীয় চিন্তার প্রবাহ দুটি পৃথক ধারায় প্রবহমান। যেমন উপনিষদের অনুগামী সাংখ্যদর্শনের মধ্যে জাগতিক সব রকম দুঃখের কবল থেকে অব্যাহতির জন্য তীব্র ব্যাকুলতার প্রকাশ দেখা যায়–

দুঃখত্রয়াভিঘাতাজ্জিজ্ঞাসা তদপঘাতকে হেতৌ।
দৃষ্টে সাহপার্থা চেন্নৈকান্তাত্যন্ততোহভাবাৎ।। (সাংখ্যকারিকা-১)
অর্থাৎ : ত্রিবিধ দুঃখের অভিঘাতের ফলে তার (অর্থাৎ সেই ত্রিবিধ দুঃখের) নিবৃত্তির (সাংখ্যশাস্ত্রীয়) উপায় বিষয়ে জিজ্ঞাসার উদয় হয়। লৌকিক উপায়ে দুঃখের অবশ্যম্ভাবী চিরনিবৃত্তি হয় না বলে (দুঃখ নিবৃত্তির) সেই (সাংখ্যশাস্ত্রীয়) উপায় বিষয়ে জিজ্ঞাসা ব্যর্থ হয় না।
.
‘দুঃখানাং ত্রয়ং দুঃখত্রয়ং। তৎ খলু আধ্যাত্মিকং আধিভৌতিকং আধিদৈবিকং চঃ।’ (সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী)
অর্থাৎ : দুঃখসমূহের ত্রয় দুঃখত্রয় বা ত্রিবিধ দুঃখ। এই ত্রিবিধ দুঃখ হলো আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক।
.
অথ ত্রিবিধদুঃখাত্যন্তনিবৃত্তিরত্যন্ত পুরুষার্থঃ। (সাংখ্যপ্রবচনসূত্র-১/১)
অর্থাৎ : এই ত্রিবিধ দুঃখের অত্যন্ত নিবৃত্তি বা অবসানই হলো চরম পুরুষার্থ।


দুঃখ থেকে অব্যাহতির জন্য এই ব্যাকুলতারই ভিন্নরূপে অভিব্যক্তি দেখা যায় বৌদ্ধদর্শনে। সাংসারিক ভোগের মধ্যে বুদ্ধ সুখের সন্ধান পাননি। তাই রাজপুত্র হয়েও তিনি সংসারত্যাগী হয়ে সেই পথেরই অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন যার অনুসরণে মানুষ এই দুঃখবহুল সংসারের বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে সক্ষম। যদি ভারতীয় দর্শনগুলির একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে চিহ্নিত করা হয় তাহলে সাধারণভাবে বলা যেতে পারে যে, সাংসারিক দুঃখের তীব্র জ্বালার অবসানকে কেন্দ্র করেই চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শনগুলি রূপায়িত। নির্বাণের মধ্যে বুদ্ধ এই দুঃখের অবসান দেখেছিলেন। অন্যান্য দর্শনগুলির মতে মোক্ষ বা মুক্তিতেই এর পরিসমাপ্তি। মোক্ষের স্বরূপ সম্বন্ধে ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন বর্ণনা আছে। এমনকি তথাকথিত নাস্তিক জৈন দার্শনিক চিন্তাতেও মোক্ষের স্বীকৃতি আছে এবং এই মত অনুসারে মুক্ত পুরুষ নিজের পৃথক সত্তা রক্ষা করে অনন্তকাল ধরে অসীম শান্তি ভোগ করেন। যেমন–

‘সংসারবীজভূতানাং কর্মণাং জরণাদিহ।
নির্জরা সম্মতা দ্বেধা সকামাকামনির্জরা।।
স্মৃতা সকামা যমিনামকামা ত্বন্যদেহিনাম্ ।’
অর্থাৎ : সংসারের সমস্ত কর্মের বিনাশ হতে নির্জরা লাভ হয়। তা দুই প্রকার- সকাম (ঔপক্রমিক) ও অকাম (যথাকাল)। যারা যম প্রভৃতি অভ্যাস করে তাদের সকাম নির্জরা এবং অন্য প্রাণীদের অকাম নির্জরা লাভ হয়।
.
‘বন্ধহেত্বভাবনির্জরাভ্যাং কৃৎস্নকর্মবিপ্রমোক্ষণং মোক্ষঃ’। (তত্ত্বার্থাধিগমসূত্র-১০/২)
‘তদনন্তরমূর্ধ্বং গচ্ছত্যালোকান্তাৎ’। (তত্ত্বার্থাধিগমসূত্র-১০/৫)
অর্থাৎ :
বন্ধের কারণের অভাব ও নির্জরার দ্বারা কর্মের নাশ ঘটে মোক্ষ লাভ হয় (তত্ত্বা-১০/২)।  তারপর নিরন্তর উর্ধ্বগমন হয় (তত্ত্বা-১০/৫)।


সাংখ্য, যোগ এবং বেদান্ত দর্শন মুক্তিকালে চৈতন্যরূপী আত্মার শুদ্ধ স্বরূপে অবস্থিতিকে স্বীকার করে। বেদান্ত দর্শনের বহু স্থলে এই স্বরূপের সঙ্গে আনন্দরূপকে একাত্ম করা হয়েছে, কিন্তু এ ধরনের কোন উল্লেখ সাংখ্য ও যোগ দর্শনে নেই। বরং সেখানে দুঃখভোগের পরিসমাপ্তি কামনায় যে কৈবল্য বা মোক্ষকে লক্ষ্য হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে সেই মোক্ষের অবস্থাতে কেবল যে দুঃখই অনুপস্থিত তা নয়, ব্যবহারিক সংজ্ঞায় চিহ্নিত সুখেরও একান্ত অভাব। তা কেবলি এক শুদ্ধ অবস্থা। যেমন যোগসূত্রে বলা হয়েছে–

‘পুরুষার্থশূন্যানাং গুণানাং প্রতিপ্রসবঃ কৈবল্যং স্বরূপপ্রতিষ্ঠা বা চিতিশক্তিরিতি’- (যোগসূত্র : ৪/৩৩)
অর্থাৎ : কৈবল্যে পুরুষের কিছু অবস্থান্তর হয় না, স্বরূপে অবস্থান হয় মাত্র, কিন্তু বুদ্ধি তথা গুণত্রয়ের প্রলয় হয়।


এখানে উল্লেখ্য, ‘যে মুক্তির মধ্যে জাগতিক সব রকম দুঃখের নিবৃত্তি রূপায়িত, সেই মুক্তি বা মোক্ষ ভারতীয় দার্শনিকদের বিচারে পরম পুরুষার্থ বা মানুষের বহু-আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হিসেবে গণ্য। সাধারণ মানুষ তার কাম্য বস্তুকে নেতিবাচক রূপে কখনই দেখতে চায় না। দুঃখের উৎপীড়ন থেকে মুক্তি সে স্বাভাবিকভাবেই কামনা করে, এবং তার পরিবর্তে সে চায় জাগতিক সুখের আস্বাদন। কাজেই সাংখ্য ও যোগ যখন মোক্ষকে সুখ এবং দুঃখ উভয়েরই অভাবরূপে বর্ণনা করে তখন মোক্ষকে পরম পুরুষার্থ বলে স্বীকার করতে অনেকেরই আপত্তি থাকতে পারে। সাংখ্যাচার্য বিজ্ঞানভিক্ষু তাঁর সাংখ্যপ্রবচনভাষ্যে এই ধরনের আপত্তির সম্ভাবনাকে পরিহার করার চেষ্টা করেছেন। মানুষের মধ্যে তিনি শ্রেণীভেদ দেখিয়েছেন। জাগতিক সুখে একশ্রেণী মগ্ন থাকতে অভিলাষী। আবার অপর শ্রেণীর লোকেদের কাছে দুঃখের চরম নিবৃত্তিই পরম পুরুষার্থ। মুক্তি লক্ষ্য হিসেবে নির্দেশিত কেবল এই দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষের কাছে। সাধারণ বা প্রথম শ্রেণীর লোকের কাছে এর কোন আকর্ষণ নেই।’- (লতিকা চট্টোপাধ্যায়, চার্বাক দর্শন, পৃষ্ঠা-৪৭)

নৈয়ায়িকরাও দুঃখের চরম অবসানকে মুক্তির মধ্যে রূপায়িত করতে চেয়েছেন। কিন্তু সাংখ্য, যোগ বা বেদান্ত মতের সঙ্গে তাঁদের মতের মূলগত পার্থক্য রয়েছে। মুক্ত অবস্থায় আত্মার যে চৈতন্যময় সত্তা সাংখ্য যোগ বা বেদান্তমতে স্বীকৃত, ন্যায়মতে মোক্ষে তার অস্তিত্ব নেই, এবং এইজন্যই মুক্তি সম্বন্ধে নৈয়ায়িকদের ধারণাকে খুব স্পষ্ট বলা চলে না। ন্যায়সূত্র অনুসারে মুক্তির শব্দের অর্থ দুঃখের আত্যন্তিক উচ্ছেদ। যেমন–

দুঃখ-জন্ম-প্রবৃত্তি-দোষ-মিথ্যাজ্ঞানা-
নামুত্তরোত্তরাপায়ে তদন্তরাপায়াপবর্গঃ। (ন্যায়সূত্র-১/১/২)।।
অর্থাৎ : দুঃখ, জন্ম, প্রবৃত্তি (ধর্ম ও অধর্ম), দোষ (রাগ ও দ্বেষ) এবং মিথ্যাজ্ঞানের (অর্থাৎ আত্মাদি প্রমেয় পদার্থ বিষয়ে নানাপ্রকার ভ্রম জ্ঞানের) উত্তরোত্তর অপায় (অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে নিবৃত্তি) হলে তদনন্তর পদার্থের (অর্থাৎ উক্ত মিথ্যাজ্ঞান প্রভৃতি পর পর পদার্থের অব্যবহিত পূর্বোক্ত দুঃখ পর্যন্ত পদার্থের) নিবৃত্তিপ্রযুক্ত অপবর্গ (নির্বাণ) হয়।

কিংবা–

‘বাধনালক্ষণং দুঃখম্’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২১)
‘তদত্যন্তবিমোক্ষোহপবর্গঃ’। (ন্যায়সূত্র-১/১/২২)
অর্থাৎ :
শরীর থেকে ফল পর্যন্ত সমস্ত প্রমেয়ই বাধনালক্ষণ অর্থাৎ দুঃখানুষক্ত দুঃখ (ন্যায়সূত্র-১/১/২১)।  তার সাথে (পূর্বোক্ত মুখ্য গৌণ সবধরনের দুঃখের সাথে) অত্যন্ত মুক্তি হচ্ছে মোক্ষ বা অপবর্গ (ন্যায়সূত্র-১/১/২২)।


ন্যায়সূত্রের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে ন্যায়ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন মোক্ষাবস্থায় সুখের অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন–

‘অপবর্গে–ভীষ্মং খল্বয়ং সর্ব্বকার্য্যােপরমঃ, সর্ব্ব বিপ্রয়োগেহপবর্গে বহু ভদ্রকং লুপ্যত ইতি কথং বুদ্ধিমান্ সর্ব্বসুখোচ্ছেদম্ অচৈতন্যমমুম্ অপবর্গং রোচয়েদিতি।’ (ন্যায়ভাষ্য-১/১/২)
অর্থাৎ :
অপবর্গ বিষয়ে যাতে–সর্বকার্যের নিবৃত্তি হয়, এমন এই অপবর্গ ভীষ্মই অর্থাৎ ভয়ানকই। যাতে সমস্ত অভীষ্ট পদার্থের বিয়োগ হয়, এমন অপবর্গ হলে বহু শুভ নষ্ট হয়– এজন্য কিভাবে বুদ্ধিমান মানব সর্বসুখের উচ্ছেদকর চৈতন্যহীন এই অপবর্গকে ভালো বোধ করবে?


তার মানে, চৈতন্যের অভাবের পটভূমিতে দুঃখ, সুখ ইত্যাদি সব কিছুরই অনুপস্থিতিতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় মূর্ছাবস্থার সঙ্গে তার সাদৃশ্য কল্পনীয়। এই অবস্থার অনুরূপ মুক্তি কোন ব্যক্তির কাম্য হতে পারে না। তাই ন্যায়সূত্রানুসারী মুক্তি সম্বন্ধে এ ধরনের আশঙ্কার নিরসনকল্পে ন্যায়ভাষ্যকার মুক্তিকে পরম শান্তির অবস্থা রূপে বর্ণনা করে আরো বলেন–

‘অপবর্গে–শান্তঃ খল্বয়ং সর্ব্ববিপ্রয়োগঃ সর্ব্বোপরমোহপবর্গঃ, বহু চ কৃচ্ছ্রং ঘোরং পাপকং লুপ্যত ইতি কথং বুদ্ধিমান্ সর্ব্বদুঃখোচ্ছেদং সর্ব্বদুঃখাসংবিদম্ অপবর্গং ন রোচয়েদিতি।’ (ন্যায়ভাষ্য-১/১/২)
অর্থাৎ :
অপবর্গ বিষয়ে– যাতে সকল পদার্থের সাথে বিয়োগ হয়, যাতে সর্বকার্যের নিবৃত্তি হয়, এমন এই অপবর্গ শান্ত অর্থাৎ ভয়ানক নয় এবং এতে বহু কষ্টকর ঘোর পাপ নষ্ট হয়, সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তি সর্বদুঃখের উচ্ছেদকর, সর্বদুঃখের জ্ঞানরহিত অপবর্গকে কেন ভালবাসবে না।


অর্থাৎ দুঃখের চরম অভাবের মধ্যেই এই শান্তির বীজ নিহিত বলে তাঁর অভিমত। অবশ্য কোন কোন নৈয়ায়িকের মতে মুক্তিতে জীবের আনন্দানুভূতি থাকে। তবে সে যাই হোক, দুঃখের আত্যন্তিক অবসানকে লক্ষ্য করেই যে ভারতীয় দর্শনে মুক্তি বা নির্বাণের পরিকল্পনা, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে সুখের অভিলাষী। এই সুখের পথের প্রতিবন্ধক তার কাছে দুঃখ, এবং এই দুঃখের প্রতিকারের জন্য সে চেষ্টা করে সর্বজনস্বীকৃত লৌকিক পথকে অবলম্বন করে। কিন্তু এ দুঃখনিবৃত্তি এবং তার পরিণতিতে পাওয়া সুখ সাময়িক এবং সামগ্রিকভাবে বিচার করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৃহত্তর দুঃখের প্রস্তুতি হিসেবে গণ্য হতে পারে। যেমন পতঞ্জলির যোগসূত্রে বলা হয়েছে–

পরিণামতাপসংস্কার দুঃখৈর্গুণবৃত্তি
বিরোধাচ্চ সর্ব্বমেব দুঃখং বিবেকিনঃ। (যোগসূত্র-২/১৫)।।
অর্থাৎ : বর্তমান পরিতাপরূপ দুঃখ ভবিষ্যৎ সংস্কাররূপ দুঃখে পরিণত হয় দেখে, ত্রিগুণের পরস্পর বিরোধভাব দেখে, সুখের পরিণাম দুঃখ এবং দুঃখের পরিণাম সুখ দেখে বিবেকী মহাপুরুষেরা সমস্তই দুঃখ এবং দুঃখের কারণ বলে বিবেচনা করেন। কিন্তু নিদারুণ মোহবশতঃ অবিবেকী ব্যক্তিদের ঐ প্রকার ধারণা হয় না।


এ-কারণেই ভারতীয় দার্শনিকেরা ক্ষণস্থায়ী সুখের প্রতি উদাসীন থেকে সংসারের দুঃখবহুলতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নির্বাণ বা মুক্তির মধ্যে সংসারবন্ধনের সমাপ্তি নির্দেশ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্তু দুঃখের এই চরম নিবৃত্তি লাভ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না দুঃখের মূল এবং সেই মূলোচ্ছেদের সঠিক উপায় অবধারণ করা যায়। কাজেই জাগতিক দুঃখের চরম নিবৃত্তির সম্ভাব্যতার ধারণার সঙ্গে আনুষঙ্গিকভাবেই জড়িত হয়ে পড়ে আরও কয়েকটি ধারণার স্বীকৃতি। বস্তুত এই স্বীকৃতিগুলিরই রূপায়ণ ঘটে বুদ্ধবর্ণিত চারটি আর্য-সত্যের মাধ্যমে– জগৎ দুঃখময়, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ থেকে পরিত্রাণ এবং এই পরিত্রাণের উপায়ও আছে।

ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন শাখায় নানা বিষয় নিয়ে নানারকম বিরোধ দেখা যায়। কিন্তু এই সব বিরোধের অন্তরালবর্তী কাঠামোটা যে বুদ্ধস্বীকৃত ‘চত্বারি আর্যসত্যানি’ বা এই আর্য-সত্যচতুষ্টয়ের ভাবনা দিয়ে গড়া, তা স্বীকার করাটা বোধ করি দোষণীয় হবে না। আর এই ভাবনার ভিত্তি হিসেবেই কতকগুলি সাধারণ ধারণা চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শনের সব শাখাতেই অনুমোদন লাভ করেছে। এবং এই ধারণাগুলিই প্রতিটি দর্শন-শাখার নিজস্ব যুক্তি ও ব্যাখ্যার আলোকে সংবদ্ধ হয়ে পরিপুষ্ট করেছে প্রতিটি মতবাদকে। এক্ষেত্রে প্রথম ধারণাটি হলো দেহাতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আত্মার ধারণা বস্তুত ঔপনিষদিক চিন্তাধারারই উত্তরাধিকার। ইতঃপূর্বেই এই আত্মা-বিষয়ক ঔপনিষদিক-ধারণার উদ্ভব প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বস্তুত ভারতীয় দর্শনচিন্তার মূল এই আত্মার স্বরূপ নির্ণয়ে বা অধ্যাত্মবাদেই নিহিত।

ইতোমধ্যেই আলোচিত দুঃখময় সংসারবন্ধনের পরিসমাপ্তি হিসেবে মোক্ষ বা নির্বাণ সম্বন্ধীয় ধারণার যে দার্শনিক-ভাবনার বহমানতা, মৃত্যুর পর দেহনাশের সঙ্গে জীবের অস্তিত্বের অবসান কল্পনা করলে এই আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে উপনীত হবার কোন সম্ভাবনাই থাকে না। কাজেই দেহসীমার বাইরেও দেহাতীত রূপে জীবের বর্তমানতা স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিবাদের সমর্থকদের স্বীকৃতি লাভ করেছে। ‘আমি’ এই অনুভূতিই আত্মার অস্তিত্বের সব চেয়ে বড় প্রমাণ বলে তাঁরা মনে করেন। মানুষের জীবিতকালে এই আত্মা তার দেহের মাধ্যমে অভিব্যক্ত হয় এবং স্থূল বিচারে আত্মাকে সে সময় দেহের অঙ্গীভূত বলে মনে হয়। কিন্তু আত্মা দেহ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক– ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনের এটাই অভিমত। যদিও দেহাতিরিক্ত আত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে বিভিন্ন মতবাদের প্রচলন রয়েছে।

তবে চার্বাকেতর অন্যান্য দর্শনের সমধর্মী হয়েও বৌদ্ধ ধারণা এ ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য বহন করে। বৌদ্ধ দর্শনে অবিকারী স্থায়ী আত্মার কোন কল্পনা নেই। ‘আত্মা’ শব্দটি বৌদ্ধ বিজ্ঞানবাদী দর্শনে কোন কোন ক্ষেত্রে স্থান লাভ করলেও শব্দটি সেখানে ভিন্ন অর্থের পরিচায়ক। বিজ্ঞানবাদীরা ‘আত্মা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন সংসারদশায় বদ্ধ জীবের বিপর্যস্ত বিজ্ঞানকে বোঝাতে এবং ‘নৈরাত্ম্য’ তাঁদের কাছে এর বিপরীত অর্থের দ্যোতক। বৌদ্ধমতে সর্বজ্ঞ এই নৈরাত্ম্যের সাধনাতে নিজেকে মগ্ন করেন। বৌদ্ধমতে সুখ দুঃখের অনুভূতি, জ্ঞান ইত্যাদি সব কিছু ক্ষণিক ও প্রতীত্যসমুৎপন্ন। এই ক্ষণিক অনুভূতির প্রবাহে তাঁরা একধরনের জ্ঞাতৃত্ব আরোপ করেন, বৌদ্ধ পরিভাষায় যাকে বলা হয় বিজ্ঞান-প্রবাহ।

মানবমনে উদ্ভূত জ্ঞানের বিভিন্ন বিচিত্র প্রবাহে আত্মবাদী আচার্যেরা স্থির আত্মস্বরূপের বিভিন্ন ভাবের প্রকাশ বলে মনে করেন। অন্যদিকে বৌদ্ধরা আত্মার অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না। মানবমনের নিত্য পরিবর্তনশীল বিচিত্র অনুভূতির ব্যষ্টিরূপ তাঁদের কাছে ভোক্তৃত্বের মহিমায় মণ্ডিত। তবে কি নিত্য চৈতন্যের স্বীকৃতিতে উভয় পক্ষই এখানে সমধর্মী, পার্থক্য কেবল দৃষ্টিভঙ্গিতে? হয়তোবা। লতিকা চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়– ‘বিভিন্নধর্মী পুষ্পের সমবায়ে গ্রথিত মালার অন্তর্গত কুসুমগুলিকে যেখানে বৌদ্ধরা পৃথকভাবে প্রাধান্য দেন, আত্মবাদী দার্শনিকদের কাছে সেখানে মালাটি তার অখণ্ড অস্তিত্বে প্রকাশমান। কাজেই দৃশ্যমান পার্থক্য সত্ত্বেও সামগ্রিক মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বৌদ্ধ দর্শনকেও আমরা ভারতীয় অধ্যাত্মদর্শনের সমধর্মী বলে ধরে নিতে পারি।’ (চার্বাক দর্শন, পৃষ্ঠা-৫০)

ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন বিভাগে অনুমোদিত আরেকটি সাধারণ ধারণা হলো জন্মান্তরবাদ বা দেহাতিরিক্ত আত্মার দেহ থেকে দেহান্তরে পরিক্রমা।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : উপনিষদীয় চিন্তাভূমি] [*] [পরের পর্ব : কর্মফল ও জন্মান্তরবাদ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 204,511 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 85 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: