h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৭ : ব্রহ্মন্ ও মায়া|

Posted on: 08/07/2015


flyingmachine3negative

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৭ : ব্রহ্মন্ ও মায়া |
রণদীপম বসু

৩.৭ : ব্রহ্মন্ ও মায়া

ঋত-র আলোচনায় আমরা দেখেছি, ঋগ্বেদের প্রাচীন দেবতা বরুণ হলেন ঋত বা সত্য ও ন্যায়ের রক্ষক। কিন্তু প্রাচীন বৈদিক কবিদের রচনায় বরুণ শুধু ঋত-যুক্ত ও ঋত-র পালকই নন, তিনি মায়া-যুক্ত বা মায়াবীও। স্বভাবতই, এই মায়ার সঙ্গে ঋত-র সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় বলেই অনুমান হয়। ঋগ্বেদে বলা হচ্ছে, চন্দ্রালোকের ঔজ্জ্বল্য যেমন দ্যাবাপৃথিবীর সর্বত্র প্রবেশ করে মিত্রাবরুণের মায়াও সেইরূপ ঋত-র মূলে প্রবেশ করে। যেমন–

ঋৃতস্য বুধ্নঃ ঊষসামিষণ্যন্বৃষা মহী রোদসী আ বিবেশ।
মহীমিত্রস্য বরুণস্য মায়া চন্দ্রেব ভানুং বি দথে পুরুত্রা।। (ঋগ্বেদ-৩/৬১/৭)।
ধর্মণা মিত্রাবরুণা বিপশ্চিতা ব্রতা রক্ষেথে অসুরস্য মায়য়া।
ঋতেন বিশ্বং ভুবনং বি রাজথঃ সূর্যমা ধত্থো দিবি চিত্র্যং রথম্ ।। (ঋগ্বেদ-৫/৬৩/৭)।
অর্থাৎ :
ঊষাগুলিকে প্রেরণ করতে ইচ্ছুক হয়ে ঋতের মূল বৃষ্টির সাহায্যে স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে প্রবেশ করেছিল; মিত্র ও বরুণের মহতী মায়া চন্দ্রের ন্যায় নিজপ্রভা বহুলভাবে প্রসারিত করেছিল। (ঋক-৩/৬১/৭)।।  হে প্রাজ্ঞ মিত্রাবরুণ! তোমরা ধর্মদ্বারা ও অসুরের মায়াদ্বারা যজ্ঞসমূহ রক্ষা কর, ঋতদ্বারা এই বিশ্বভুবনকে দীপ্যমান কর; সুর্যকে তার বিচিত্র রথসহ ধারণ করে থাক। (ঋক-৫/৬৩/৭)।।


এমনকি ইন্দ্রের প্রসঙ্গেও ঋগ্বেদে ঋত-র সঙ্গে মায়ার নিকট সম্পর্ক উল্লিখিত, ঋতবা বা ঋত-যুক্ত ইন্দ্র বারবার মায়া প্রয়োগ করেন–

রূপং রূপং মঘবা বোভবীতি মায়াঃ কৃণ্বানস্তন্বং পরি স্বাম্ ।
ত্রির্যদ্দিবঃ পরি মুহূর্তমাগাৎ স্বৈর্মন্ত্রৈরনৃতুপা ঋৃতাবা।। (ঋগ্বেদ-৩/৫৩/৮)।
অর্থাৎ :
মঘবা (ইন্দ্র) স্বকীয় শরীর হতে মায়ার দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেন। তিনি ঋতবান হলেও অঋতুতে সোম পান করেন। তিনি স্বকীয় স্তুতি দ্বারা আহূত হয়ে স্বর্গলোক হতে মুহূর্তমধ্যে সবনত্রয়ে যান। (ঋক-৩/৫৩/৮)।।


তবে অবশ্যই ইন্দ্রের এই গরিমা-বর্ণন যে প্রাচীন বরুণের অনুকরণমাত্র, ঋগ্বেদের অন্যত্র তা স্পষ্টই উক্ত হয়েছে–

ত্বং শর্ধায় মহিনা গৃণান উরু কৃধি মঘবঞ্ছগ্ধি রায়ঃ।
ত্বং নো মিত্রো বরুণো ন মায়ী পিত্বো ন দস্ম দয়সে বিভক্তা।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪৭/৫)।
অর্থাৎ :
বল পাবার জন্য তোমাকে বিশিষ্টরূপে স্তব করা হয়, তুমি বিপুল বল প্রদান কর; হে প্রিয়দর্শন ইন্দ্র! মিত্রাবরুণের ন্যায় মায়া-যুক্ত হয়ে তুমি আমাদের ধন দাও, আমাদের অন্নদাতা ও অন্নের বিভাগকর্তা হও। (ঋক-১০/১৪৭/৫)।।


ঋত ও বরুণের সঙ্গে মায়ার এ-জাতীয় সম্পর্ক থেকে স্বভাবতই অনুমান করা হয়, ঋত-হীন নতুন পরিস্থিতিতে বরুণের গরিমা-অবসানের সঙ্গে মায়ারও অর্থবনতি ও নিন্দা সুপরিস্ফুট হওয়াই স্বাভাবিক। এবং এই যুক্তিতে, বৈদিক সমাজ-ইতিহাসে যে-মৌলিক পরিবর্তনের পরিণামে বৈদিক চিন্তাক্ষেত্রে এই পরিবর্তন, তারই মধ্যে বৈদিক ঐতিহ্যে ভাববাদের উৎস খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, বস্তুত ঋগ্বেদে মায়ার এই ইতিহাসকে অনুসরণ করেই বৈদিক ঐতিহ্যে ভাববাদের আবির্ভাব অনুধাবন করা যেতে পারে। তবে এ-ইতিহাস বোঝবার পক্ষে প্রথমে ঔপনিষদিক বা বৈদান্তিক চিন্তাক্ষেত্রে খুব সংক্ষেপে মায়ার তাৎপর্য বিচার করে পরে ঋগ্বেদের সাক্ষ্যগুলিতে প্রত্যাবর্তন করলে আলোচনাটা সুবিধাজনক হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা-রীতি অনুসরণ করতে পারি।

.
মায়া :

উপনিষদ্ বা বেদান্তর উপর একান্ত নির্ভরশীল দার্শনিক সম্প্রদায়ের নাম বেদান্ত বা উত্তর-মীমাংসা। উত্তর-মীমাংসার নানা উপসম্প্রদায়ের মধ্যে অদ্বৈত-বেদান্তই সর্ব-বিখ্যাত এবং শঙ্করাচার্যই তার প্রকৃষ্টতম ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে তাকে প্রায়ই শঙ্কর-মত নামে উল্লেখ করা হয়। এই শঙ্কর-মতের সর্ববিদিত নামান্তর হলো ‘মায়া-বাদ’। শঙ্কর-মতের মূল বক্তব্যটা হচ্ছে–

‘ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ’।। (শাঙ্করভাষ্য)।
অর্থাৎ : ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা এবং জীব ব্রহ্মস্বরূপ।


এ-মতবাদের প্রধানতম প্রতিপাদ্য হলো, এক অদ্বিতীয় পরব্রহ্মই একমাত্র সত্য এবং এই ব্রহ্মণ্ বিশুদ্ধ ‘অহং’ বা আত্মনের সঙ্গে অভিন্ন। স্বভাবতই, সাধারণ অভিজ্ঞতায় জানা পরিদৃশ্যমান জগৎ সত্য হতে পারে না। অতএব শঙ্কর-মতে তা অবিদ্যা বা অজ্ঞানেরই ফল– রজ্জুতে সর্পভ্রমের মতো বা শুক্তিতে রজতভ্রমের মতো অজ্ঞানের ফলেই আত্মান্ বা ব্রহ্মন্-এ জগৎ-ভ্রম হয়। অবিদ্যা বা অজ্ঞানেরই নামান্তর মায়া।

যদিও শঙ্কর-সম্প্রদায়ের সমস্ত দার্শনিক দাবি করেন, উক্ত মত একান্তভাবেই উপনিষদ-প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু আধুনিক বিদ্বানেরা প্রশ্ন তুলেছেন, এ-দাবি কি সত্যিই বস্তুনিষ্ঠ? উপনিষদ্-গুলিতে কি বাস্তবিকই এই মায়া-বাদই প্রস্তাবিত হয়েছে?
এই প্রশ্ন উত্থাপনের কারণ হলো, উপনিষদ্-গুলি আধুনিক অর্থে দার্শনিক রচনা নয়; নানা প্রসঙ্গে নানা রকম দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা থাকলেও সে আলোচনাকে সুসংবদ্ধ যুক্তি-তর্ক প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক রূপ দেবার পরিচয় নেই। বিভিন্ন উপনিষদে– এমনকি একই উপনিষদে সংকলিত বিভিন্ন অংশে– সে যুগের বিভিন্ন চিন্তাশীল প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন তত্ত্বই ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু এইসঙ্গেই মনে রাখা দরকার, সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এ-জাতীয় সমস্ত তত্ত্বের উপরই সমান গুরুত্ব আরোপিত হয়নি। অর্থাৎ, ওই বহুবিধ এবং বিচিত্র তত্ত্বের মধ্যে তত্ত্ব-বিশেষের উপরই বারবার এবং নানাভাবে গুরুত্ব আরোপণের পরিচয় পাওয়া যায়। এবং এ-জাতীয় তত্ত্ব-বিশেষ বলতে প্রধানতই ব্রহ্মন্ ও আত্মন্-এর অভিন্নত্ব।

কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক না কেন, উত্তর-মীমাংসা সম্প্রদায়ের প্রত্যেক দার্শনিকই সামগ্রিক বা অখণ্ডভাবে উপনিষদ্-সাহিত্যকে অপৌরুষেয় ও অভ্রান্ত বলে দাবি করেছেন এবং প্রমাণ করতে চেয়েছেন তাঁর নিজস্ব প্রতিপাদ্য তত্ত্বই প্রকৃতপক্ষে ঔপনিষদিত তত্ত্ব। অর্থাৎ, উপনিষদের কোথাও তত্ত্বান্তরের স্থান নেই। বলা বাহুল্য, এ-রকম দাবি অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়; কেননা– বিনা ব্যতিক্রমে সমস্ত উপনিষদ্-বাক্যকেই এক অভিন্ন দার্শনিক তত্ত্বের প্রতিপাদক বলে প্রমাণ করবার দাবি– বাস্তবিকই অসম্ভব।
থিব (Thibaut) প্রমুখ কারও কারও মতে, বড় জোর দু’একটি উপনিষদ্-বাক্যের সংশয়মূলক ব্যাখ্যার মধ্যে এই মায়াবাদের আভাস আবিষ্কার করা সম্ভব, যদিও জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার চূড়ান্ত অদ্বৈতমূলক তত্ত্ব উপনিষদে সরল, সুস্পষ্ট ও অবধারিতভাবেই ব্যাখ্যাত হয়েছে। তার মানে, তাঁরা বলতে চান, উপনিষদে মায়াবাদের পরিচয় নেই, কিন্তু অবধারিতভাবেই দেখানো হয়েছে জীবাত্মা ও পরমাত্মার– বা, আত্মন্ ও ব্রহ্মন্-এর– অদ্বৈত। কিন্তু এ-রকম মন্তব্য দার্শনিক বিচারে স্বীকারযোগ্য হতে পারে না। কেননা, উক্ত আত্মন্-ব্রহ্মন্ এর অদ্বৈতমূলক তত্ত্বের অনিবার্য অনুসিদ্ধান্ত আলোচ্য মায়াবাদই।

অতএব, দেবীপ্রসাদের মতে,– ‘যদি স্বীকার করা হয় উপনিষদে ব্রহ্মন্-আত্মন্-এর অদ্বৈতমূলক তত্ত্ব অবধারিত ভাবেই প্রতিপাদিত হয়েছে তাহলে একথাও স্বীকার করতে হবে যে শঙ্করাচার্য উক্ত তত্ত্বের অনিবার্য অনুসিদ্ধান্তটির– অর্থাৎ, মায়াবাদের– ব্যাখ্যা করে উপনিষদ্-প্রতিপাদ্য প্রধানতম দার্শনিক তত্ত্বরই পূর্ণাঙ্গ পরিণতি দিয়েছিলেন। অর্থাৎ উপনিষদে মায়াবাদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলেও অন্তত মায়াবাদের মূল দার্শনিক শর্ত– মায়াবাদের বীজ– অবশ্য স্বীকার্য। তাই উপনিষদে মায়াবাদ নেই, এ-জাতীয় মন্তব্য অতিসারল্যেরই পরিচায়ক হবে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৯৮)

প্রাসঙ্গিকভাবেই এবার ঋগ্বেদে এই মায়া’র প্রাক্-ইতিহাসটুকু পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

প্রাচীন বৈদিক কবিরা যে অবশ্যই মায়া শব্দটির সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু, বলা বাহুল্য, বৈদান্তিক অর্থে মায়াবাদ তাঁদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। বস্তুত,– ‘মায়া শব্দটির প্রাক্-ইতিহাস বিচার করলে দেখা যায় যে তা জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়-মূলক কোনো সুপ্রাচীন ধারণারই পরিচায়ক। শব্দটির আদি-অর্থ বিচারে অবশ্যই আমাদের প্রধান সহায় নিঘণ্টু। নিঘণ্টু-মতে (নিঘণ্টু-৩/৯) মায়া একটি প্রজ্ঞা-বাচক শব্দ; মায়া মানে প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি জ্ঞান। কিন্তু এ-বিষয়ে নিঘণ্টু থেকে আরও কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেননা নিঘণ্টু-মতে প্রজ্ঞার আর একটি প্রতিশব্দ বলতে ধী (নিঘণ্টু-৩/৯) এবং এই ধী শব্দটি কর্মনামেরও অন্তর্গত (নিঘণ্টু-২/১); ধী মানে কর্মও। স্বভাবতই অনুমান হয়, প্রাচীন বৈদিক কবিরা আধুনিক অর্থে কর্ম-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ জ্ঞানবলে কোনো কিছুর প্রশংসা শেখেননি; কঠোর জীবন-সংগ্রামের সম্মুখীন এই কবিদের কাছে সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান যা কিনা কর্মনির্বাহর বা কর্মপরিচালনার সহায়ক। নিঘণ্টু-তেই এ-অনুমানের আরো সমর্থন পাওয়া সম্ভব। কর্মের আর একটি প্রতিশব্দ ক্রতু (নিঘণ্টু-২/১); এই শব্দটিই আবার প্রজ্ঞা-নাম তালিকার অন্তর্ভুক্ত (নিঘণ্টু-৩/৯)। তেমনি শচী শব্দটি প্রজ্ঞা-নাম (নিঘণ্টু-৩/৯) এবং কর্ম-নাম (নিঘণ্টু-২/১) উভয়ই। শব্দ-ব্যবহারের এ-জাতীয় বৈশিষ্ট্য উপেক্ষণীয় নয়; প্রাচীন কবিদের চেতনায় জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়নি; অতএব প্রজ্ঞা-বাচক মায়া শব্দটির মধ্যেও জ্ঞান ও কর্মের কোনো আদিম সমন্বয় অনুমেয়। এবং জ্ঞান ও কর্মের আদিম সমন্বয়-মূলক বলেই মায়া শব্দের মধ্যে আদিম জাদুর ইঙ্গিত থাকাও স্বাভাবিক।’- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-১৯৮)

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ঋগ্বেদেই ‘মায়া’ শব্দের একটি ইতিহাস চোখে পড়ে এবং সে-ইতিহাসের মূলকথা হলো একদা-গরিমা-মণ্ডিত প্রজ্ঞা-কর্ম সূচক ওই প্রাচীন ধারণার ক্রমাধঃপতন। এই ইতিহাসটি বিশেষ চিত্তাকর্ষক। কীরকম?
নিঘণ্টুর ব্যাখ্যায় নিরুক্তে (নিরুক্ত-৩/৯) বলা হয়েছে, মান বা পরিমাণ করা অর্থে মাঙ্ ধাতু থেকে মায়া শব্দের নিষ্পত্তি; এবং–

‘মীয়ন্তে পরিচ্ছিদ্যন্তে অনয়া পদার্থাঃ’। (নিরুক্ত-৩/৯)
অর্থাৎ : যার সাহায্যে পদার্থদের পরিচ্ছন্ন রূপদান করা হয় তাইই মায়া।

এবং এই অর্থে মায়ার ব্যবহার হিসেবে নিরুক্তকার ঋগ্বেদের নিম্নোক্ত নজির উদ্ধৃত করেছেন–

‘মায়াভিরিন্দ্র মায়িনং ত্বং শুষ্ণমবাতিঃ।’
বিদুষ্টে তস্য মেধিরাস্তেষাং শ্রবাংস্যুত্তির।।- (ঋগ্বেদ-১/১১/৭)।
‘ইমামূ নু কবিতমস্য মায়াং মহীং দেবস্য নকিরা দধর্ষ।’
একং যদুদ্না ন পৃণস্ত্যেনীরাসিঞ্চন্তীরবনয়ঃ সমুদ্রম্ ।।- (ঋগ্বেদ-৫/৮৫/৬)।
অর্থাৎ :
‘হে ইন্দ্র, তুমি তোমার মায়াসকলের দ্বারা মায়াবী শুষ্ম-কে হত্যা করেছিলে।’ মেধাবীগণ তোমার মহিমা জানে, তাদের অন্ন বর্ধন কর। (ঋক-১/১১/৭)।।  ‘কবিশ্রেষ্ঠ (কবিতমঃ) বরুণের মহান মায়াকে কেউ হিংসা বা খণ্ডন করতে পারে না।’ তাঁরই কারণে শুভ্র, বারিমোক্ষণকারী নদীসমূহ বারিদ্বারা একমাত্র সমুদ্রকে পরিপূর্ণ করতে পারে না। (ঋক-৫/৮৫/৬)।।


ঋক্-দুটিতে উদ্ধৃতি-চিহ্নর মাধ্যমে নিরুক্তকারের উদ্ধৃতি চিহ্নিত করা হয়েছে। ঋক্-দুটির পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য যাই হোক না কেন, এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় এখানে মায়া শব্দ ব্যবহারের মধ্যে পরবর্তীকালের অবিদ্যা বা অজ্ঞান অর্থে নিন্দিত তাৎপর্যের আভাসও নেই। এভাবে অন্যান্য বহু দৃষ্টান্তেও দেখা যায় বৈদিক কবিদের সমস্ত পৌরাণিক কল্পনা সত্ত্বেও ওই প্রাচীন প্রজ্ঞা-কর্মবাচক ধারণাটি নিয়ে করিরা কতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। যেমন–

অগ্নে ভূরীণি তব জাতবেদা দেব স্বধাবোহমৃতস্য নাম।
যাশ্চ মায়া মায়িনাং বিশ্বমিন্ব তে পূর্বীঃ সন্দধুঃ পৃষ্টবন্ধো।। (ঋগ্বেদ-৩/২০/৩)।
স প্রাচীনান্ পর্বতা দৃংহদোজসাধরাচীনম্ অকৃণোদপামপঃ।
অধারয়ৎ পৃথিবীং বিশ্বধায়সমস্তভ্নান্ মায়য়া দ্যামবস্রসঃ।। (ঋগ্বেদ-২/১৭/৫)।
যো বো মায়া অভিদ্রুহে যজত্রাচ পাশা আদিত্যা রিপবে বিচৃত্তাঃ।
অশ্বীব তা অতি যেষং রথেনারিষ্টা উরাবা শর্মন্তৃস্যাম।। (ঋগ্বেদ-২/২৭/১৬)।
স বহ্নিঃ পুত্রঃ পিত্রোঃ পবিত্রবান্ পুনাতি ধীরো ভুবনানি মায়য়া।
ধেনুঞ্চ পৃশ্নিং বৃষভং সুরেতসং বিশ্বাহা শুক্রং পয়ো অস্য দুক্ষত।। (ঋগ্বেদ-১/১৬০/৩)।
হোতা দেবো অমর্ত্যঃ পুরস্তাদেতি মায়য়া। বিদথানি প্রচোদয়ন্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/২৭/৭)।
অর্থাৎ :
হে দ্যোতমান, জাতবেদা, মরণরহিত, অন্নবান অগ্নি! দেবতাগণ তোমাকে অনেক তেজ প্রদান করেছেন। হে বিশ্বের তৃপ্তিকারী, প্রার্থিত ফলদায়ী অগ্নি! মায়াবীগণের প্রাচীন মায়া সমস্ত তোমাতেই আছে। (ঋক-৩/২০/৩)।।  ইন্দ্র মায়াবলে ইতস্তত গমনকারী পর্বতসমূহকে অচল করেছেন, মেঘস্থিত জলরাশি অধোমুখে প্রেরণ করেছেন, বিশ্বধাত্রী পৃথিবীকে ধারণ করেছেন এবং দ্যুলোককে পতন হতে রক্ষা করেছেন। (ঋক-২/১৭/৫)।।  আদিত্যগণের মায়া তাঁদের পাশকে দ্রোহকারী শত্রুদের প্রতি প্রসারিত করে; আমি যেন অশ্বারোহী পুরুষের ন্যায় তা অনায়াসে অতিক্রম করে যেতে পারি। (ঋক-২/২৭/১৬)।।  (দ্যাবাপৃথিবী স্বরূপ) পিতামাতার পুত্র বহ্নি (অগ্নি) পবিত্র, ধীর; তিনি মায়ার দ্বারা ভুবনসমূহকে পবিত্র করেন; তিনি চিরকাল ধরে শুক্লবর্ণ গাভী এবং শোভন রেতঃযুক্ত বৃষভ হতে শুক্র এবং দুগ্ধ দোহন করেন। (ঋক-১/১৬০/৩)।।  দেবতা অগ্নি, যিনি হোতা ও অমর, তিনি মায়াগুলির সাথে বিচরণ করেন এবং বিদথগুলিকে অনুপ্রাণিত করেন। (ঋক-৩/২৭/৭)।।


শুধু দেবতাই নয়, পার্থিব বস্তুর প্রসঙ্গেও ঋগ্বেদে এই মায়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন–

ন যে দিবঃ পৃথিব্যা অন্তমাপু র্ন মায়াভি র্ধনদাং পর্ষভূবন্ ।
যুজং বজ্রং বষৃভশ্চক্র ইন্দো নির্জ্যিেতষা তমসো গা অদুক্ষৎ।। (ঋগ্বেদ-১/৩৩/১০)।
অর্থাৎ :
যখন জল মায়াগণের সাহায্যে (মায়াভিঃ) পৃথিবীর অন্ত প্রাপ্ত হলো না এবং ধনপ্রদ ভূমির উপর বিস্তৃত হলো না তখন বর্ষণকারী ইন্দ্র হস্তে বজ্র ধারণ করলেন এবং দ্যুতিমান (বজ্র) দ্বারা অন্ধকার রূপ (মেঘ) হতে পতনশীল (জল) নিঃশেষিতরূপে দোহন করলেন। (ঋক-১/৩৩/১০)।।


এই ঋকের ‘ভাষ্যে টীকাকার সায়ণ বলছেন, “ধনদাম্” মানে “ধনপ্রদাং ভূমিং”; স্বভাবতই এখানে আকাশের জলে জমির উর্বরতা-প্রাপ্তি উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, বৈদিক কবিদের কল্পনায় জলের এই উর্বরতা-দায়িনী শক্তিও আসলে জলের মায়া। সায়ণ তাই এখানে ‘মায়াভিঃ’ শব্দের অর্থ করেছেন– ‘শস্যোপকারাদিভিঃ কর্মভিঃ’, শস্যের উপকারী কর্মসমূহের দ্বারা। অতএব এই দৃষ্টান্তটি থেকেই অনুমান হয় প্রাচীন কবিরা মায়া বলতে এমনকি প্রাকৃতিক কর্মশক্তিকেও বুঝতে দ্বিধা করেন নি; সর্বকর্মের মূলেই মায়া, অতএব জলের ওই উর্বরতা-দায়িনী শক্তিও জলের মায়া বলে বিবেচিত।’- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-১৯৯)

কিন্তু আগেও বলা হয়েছে, ঋগ্বেদে এ-জাতীয় নানা প্রসঙ্গে মায়ার প্রশংসা পাওয়া গেলেও এই মায়া মূলতই বরুণ– বা মিত্রাবরুণের– বিশেষ শক্তি বলেই কল্পিত। যেমন–

ইমামূ ষ্বাসুরস্য শ্রুতস্য মহীং মায়াং বরুণস্য প্র বোচম্ ।
মানেনেব তস্থিবা অন্তরীক্ষে বি যো মমে পৃথিবীং সূর্যেণ।। (ঋগ্বেদ-৫/৮৫/৫)।
মায়া বাং মিত্রাবরুণা দিবি শ্রিতা সূর্যো জ্যোতিশ্চরতি চিত্রামায়ুধম্ ।
তমভ্রেণ বৃষ্ট্ব্যা গূহথো দিবি পর্জন্য দ্রপ্সা মধুমন্ত ঈরতে।। (ঋগ্বেদ-৫/৬৩/৪)।
রেবদ্বয়ো দধাথে বেবদাশাথে নরা মায়াভিরিত উতি মাহিনম্ ।
ন বাং দ্যাবো হভির্নোত সিন্ধবো ন দেবত্বং পণয়ো নানাশুর্মঘম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১৫১/৯)।
অর্থাৎ :
প্রসিদ্ধ অসুর বরুণের সেই সুমহতী মায়ার কথা বলছি, যার সাহায্যে তিনি সূর্যদ্বারা অন্তরীক্ষের পরিমাণ করেছিলেন। (ঋক-৫/৮৫/৫)।।  হে মিত্রাবরুণ, তোমদের মায়া স্বর্গকে আশ্রয় করেছে এবং সূর্যরূপে বিচিত্র আয়ুধ হয়ে তা অন্তরীক্ষে পরিভ্রমণ করছে। তোমাদের ইচ্ছাক্রমে মেঘ ও বৃষ্টিদ্বারা সুমধুর বারিবিন্দু সকল পতিত হয়। (ঋক-৫/৬৩/৪)।।  হে ধনবিশিষ্ট অন্নপ্রদানকারী মিত্রাবরুণ, তোমাদের ধনবিশিষ্ট অন্ন প্রচুর এবং তা মায়া দ্বারা রক্ষিত। দিবস বা রাত্রি তোমার দেবত্ব প্রাপ্ত হয়নি, নদীগণও তোমার দেবত্ব প্রাপ্ত হয়নি, পণিরাও প্রাপ্ত হয়নি; তারা তোমার দানও প্রাপ্ত হয়নি। (ঋক-১/১৫১/৯)।।


এমন দৃষ্টান্ত ঋগ্বেদে আরও প্রচুর আছে। বৈদিক কবিরা যে কোন-এক কালে জ্ঞান-কর্মের সমন্বয়মূলক ওই আদিম ধারণাটির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপণ করেছিলেন, উপরোদ্ধৃত দৃষ্টান্তগুলিই তার প্রমাণ হিসেবে পর্যাপ্ত। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, বৈদিক ঐতিহ্যেই এই মায়ার গৌরব ক্রমশ ম্লান হতে দেখা যায় এবং এমনকি ঋগ্বেদের রচনাকালেই মায়া শেষ পর্যন্ত বন্ধ্যা ও নিষ্ফল বলে নিন্দিত হয়েছে! ঋগ্বেদের দর্শম মণ্ডলেই দেখা যায় মায়া যেন বন্ধ্যাত্ব প্রাপ্ত হচ্ছে– যে-মায়া দেবতাদের প্রধানতম কর্ম-কৌশল ছিলো, সেই মায়াই নিষ্ফল ও বন্ধ্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেমন–

উত ত্বং সখ্যে স্থিরপীতমাহুর্নৈনং হিন্বন্ত্যপি বাজিনেষু।
অধেন্বা চরতি মায়য়ৈষ বাচং শুশ্রুবা অফলামপুষ্পাম্ ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭১/৫)।
অর্থাৎ :
(হে বৃহস্পতি) তুমি এই সখ্যে স্থির নিশ্চয় হয়েছো, কেউ আর সংগ্রামে তার অনুগমন করে না।  সে ব্যক্তি ধেনুহীন হয়ে মায়ার দ্বারা বিচরণ করে, সে নিষ্ফল পুষ্পবিহীন বাক্য শ্রবণ করে। (ঋক-১০/৭১/৫)।।


এই ঋকটি ঋগ্বেদের একটি অতি অর্বাচীন সূক্তের অন্তর্গত এবং এতোটা অর্বাচীন বলেই আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তও বটে। কেননা এর সাহায্যে বৈদিক চিন্তা-বিবর্তনের প্রসঙ্গে মায়ার যে ইতিহাস উপেক্ষিত তা গ্রন্থিত হতে পারে। এ-প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘আমাদের যুক্তি হলো, যে-মূল সমাজ-বিবর্তনের পটভূমিতে আমরা বৈদিক চিন্তা-বিবর্তন বোঝবার প্রস্তাব করেছি তারই মধ্যে মায়ার এই অত্যাশ্চর্য ইতিহাসটিকেও বোঝবার মূলসূত্র পাওয়া যাবে এবং সেই মূলসূত্র অনুসারেই বৈদিক ঐতিহ্যে ভাববাদের আবির্ভাব ব্যাখ্যাত হতে পারে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-২০০)

.
ভাববাদের আবির্ভাব :

ভাববাদ হলো চেতনকারণ-বাদ। এই ভাববাদ বা চেতনকারণবাদের মূল কথা কী? চিন্তা বা ধারণা বা জ্ঞান– বা সংক্ষেপে, কোনো এক চেতন-পদার্থই– পরম সত্য বা চরম সত্তা। যা কিছু বাস্তব তা এই চেতনার উপর নির্ভরশীল হিসেবে,– চেতনার দাবি মিটিয়ে– তবেই বাস্তব; চেতন-নিরপেক্ষ অর্থে কিছুই সত্য নয়। যদিও অবশ্যই দর্শনের ইতিহাসে ভাববাদ বা চেতনকারণবাদের রূপ সর্বত্র এক নয়, কিন্তু আলোচ্য যুক্তি চেতনকারণবাদী মাত্রেরই সাধারণ স্বীকৃতি; তারই কাঠামোর ভিতর বিভিন্ন ভাববাদী বিভিন্নভাবে তাঁদের মতবাদ ব্যাখ্যা করেছেন।

বোঝাই যায়, এই মতবাদ অনুসারে চেতনাই সর্বশক্তিমান, স্রষ্টার মতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের মাথায় বা চিন্তায় এ-জাতীয় ধারণার উদ্ভবের বাস্তব শর্ত কী? দেবীপ্রসাদ বলছেন–
জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে সম্পর্ক বিচ্ছেদ বিশুদ্ধ জ্ঞানের প্রশংসা ও কর্ম বা শ্রমের নিন্দা। কেননা কর্ম বস্তুতন্ত্র; কর্মের মধ্যে বহির্বাস্তবের অবধারিত যাথার্থ্যের অনিবার্য স্বীকৃতি। তাই কর্ম-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ জ্ঞান বহির্জগতের যথার্থ্য– স্বীকৃতির– দায়মুক্ত; তার কাছে চেতনাই সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্তা, চরম সত্য।
আদিম যৌথ-জীবনের পর্যায়ে এ-জাতীয় ধ্যানধারণার আবির্ভাব সম্ভব নয়। কেননা তার মূলে উৎপাদন-শক্তির দৈন্য, সকলের মিলিত প্রচেষ্টাতেই সমগ্র গোষ্ঠীর জীবন-ধারণ সম্ভব। সংক্ষেপে, সকলে অনিবার্যভাবেই যৌথ শ্রমের অংশীদার। তাই এ-অবস্থায় কারুর পক্ষেই শ্রম-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ চিন্তার বা জ্ঞানের সুযোগ নেই; বস্তুত জ্ঞান বলতে যেটুকু তাও জীবন-সংগ্রামেরই অঙ্গ। কিন্তু উৎপাদন-শক্তির ক্রমোন্নতির ফলে ক্রমশ সুস্পষ্ট হয় শ্রম-বিভাগ এবং শ্রম-বিভাগ বিকাশের একটি পর্যায়ে মানসিক শ্রম ও কায়িক শ্রমের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা দেয়। কেননা মানবসমাজ ক্রমশ শাসনভুক্ত হয় এক উদ্ধৃত্তজীবী শ্রেণীর– কায়িক শ্রমের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব তার উপর নেই; কিন্তু তারই পরিকল্পনা– চিন্তা-চেতনা– অনুসারে সমগ্র সমাজ পরিচালিত। পক্ষান্তরে কায়িক শ্রমের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব যে শ্রেণীর উপর সে-শ্রেণী সামাজিকভাবে মর্যাদা-শূন্য,– দাস বা ক্রীতদাস বা শূদ্র। অতএব এই পর্যায়ে শুধু যে জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে বিভেদ সুস্পষ্ট হয় তাই নয়– সুপরিস্ফুট হয় জ্ঞানের গৌরব ও কর্মের নিন্দা; সংক্ষেপে ভাববাদ আবির্ভাবের শর্ত।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-২০০)

ভাববাদ প্রসঙ্গে এই মূলগুলি মনে রেখে এবার বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য বিচারে প্রত্যাবর্তন করা যেতে পারে।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে একটি অর্বাচীন সূক্ত (ঋগ্বেদ-১০/৭১) সংকলিত হয়েছে। এর রচয়িতা হিসেবে উল্লেখ আছে বৃহস্পতি ঋষি। কিন্তু সূক্তটি কোন্ দেবতার স্তুতিতে রচিত? সূক্তটির দেবতা ব্যাখ্যায় টীকাকার সায়ণাচার্য বলছেন, এই সূক্তের সাহায্যে ঋষি পরমপুরুষার্থ সাধক পরব্রহ্মজ্ঞানের স্তুতি করেছেন। এই ব্যাখ্যার সমর্থনে তিনি ‘বৃহদ্দেবতা’ উদ্ধৃত করে বলছেন, এই সূক্তে বৃহস্পতি সেই জ্ঞানের স্তুতি করেছেন যা সুজ্যোতি : পরব্রহ্মের ন্যায় যোগের সাহায্যে সর্ব-উদ্ভাসক। এবং সর্বানুক্রমণীতেও উক্ত হয়েছে, বৃহস্পতি নয়টি ঋকের এই সূক্তে বৃহস্পতির জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন। স্বভাবতই, আধুনিক বিদ্বানেরা ‘জ্ঞান’-কেই এ-সূক্তের দেবতা বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ, সমগ্র সূক্তটিই জ্ঞানেরই স্তুতিমাত্র। তাই হয়তো ঋগ্বেদ-সংহিতার মুদ্রিত গ্রন্থে এই সূক্তটির শীর্ষে স্তুত দেবতার নাম হিসেবে লেখা রয়েছে ব্রহ্মজ্ঞান দেবতা।

বলাই বাহুল্য, দেবতা হিসেবে এ-জাতীয় অমূর্ত ধারণার পরিকল্পনা থেকেই প্রমাণ হয় সূক্তটি কতো অর্বাচীন। দেবীপ্রসাদ বলছেন,– ‘নিঘণ্টুর দেবতালিকায় এ-হেন কোনো অর্বাচীন দেব-পরিকল্পনার স্থান প্রত্যাশা করা যায় না এবং তা নেইও। অতএব সিদ্ধান্ত হয়, ঋগ্বেদে সংকলিত হলেও বিশুদ্ধ জ্ঞানের এই প্রশস্তি পরবর্তী কালের চিন্তারই পরিচায়ক। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, সেই কালের কবিরা সুপ্রাচীন মায়া-র প্রতি কোন্ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন? নিম্নোক্ত ঋক্-টি থেকে এ-প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে’, যা ইতঃপূর্বেই উদ্ধৃত হয়েছে–

উত ত্বং সখ্যে স্থিরপীতমাহুর্নৈনং হিন্বন্ত্যপি বাজিনেষু।
অধেন্বা চরতি মায়য়ৈষ বাচং শুশ্রুবা অফলামপুষ্পাম্ ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭১/৫)।
অর্থাৎ :
(হে বৃহস্পতি) তুমি এই সখ্যে স্থির নিশ্চয় হয়েছো, কেউ আর সংগ্রামে তার অনুগমন করে না।  সে ব্যক্তি ধেনুহীন হয়ে মায়ার দ্বারা বিচরণ করে, সে নিষ্ফল পুষ্পবিহীন বাক্য শ্রবণ করে। (ঋক-১০/৭১/৫)।।

তবে অন্য কোন উৎস হতেই হয়তো দেবীপ্রসাদ উক্ত ঋক্-টির যে তর্জমা উপস্থাপন করেছেন, তা হলো–

‘তুমি (হে জ্ঞান) অন্নসমূহে স্থিরসখ্য (লাভ করিয়াছ) এবং তোমাকে কেন হিংসা করে না। অন্যে (জ্ঞানহীন পুরুষ) ধেনুবিহীন এবং নিষ্ফল ও নিষ্পুষ্প (“অফলাম্ অপুষ্পাম”) বচন শ্রবণ করিতে করিতে মায়ার সহিত বিচরণ করে।’- (ঋগে¦দ-১০/৭১/৫)।।


কিন্তু দুটি ভিন্ন ভিন্ন তর্জমা হলেও তর্জমাগুলিতে ঋকটি সম্বন্ধে কোন অর্থগত বিরোধ তৈরি হয়নি, বরং বোঝবার জন্য সুবিধাই হয়েছে বলা যায়। সেক্ষেত্রে জ্ঞান ও মায়ার মধ্যে প্রভেদ– এমনকি বিরোধও– এই ঋকের বক্তব্যে সুস্পষ্ট। এবং জ্ঞানই সুপ্রতিষ্ঠিত, মায়া বৃথা ও বন্ধ্যা বলে নিন্দিত। এই ঋক্-এর ‘অফলাম্ অপুষ্পাম্’-এর ব্যাখ্যায় টীকাকার সায়ণ বলছেন–

‘যথা বন্ধ্যা পীনা গৌঃ কিং দ্রোণমাত্রং ক্ষীরং দোগ্ধীতি মায়ামুৎপাদয়ন্তী চরতি যথা বন্ধ্যো বৃক্ষোহকালে পল্লবাদিযুক্তঃ সন্ পুষ্প্যতি ফলতীতি ভ্রান্তিমুৎপাদয়ং-স্তিষ্ঠতি তথা’- (সায়ণভাষ্য-ঋগ্বেদ-১০/৭১/৫)
অর্থাৎ :
যেমন পীন বা স্থূল কিন্তু বন্ধ্যা গাভী এই ভ্রান্তি উদ্রেক করে যে তা থেকে অন্তত কিছু দুধ পাওয়া যাবে, কিংবা, কখনও পল্লব-সঞ্চার হয় বলে বন্ধ্যা বৃক্ষ এই ভ্রান্তি উদ্রেক করে যে তা পুষ্পিত হয়ে উঠবে,– সেইভাবেই উক্ত ব্যক্তি (বন্ধ্যা মায়ার সঙ্গে) বচন উচ্চারণ করতে করতে বিচরণ করে।


অতএব জ্ঞান-প্রশস্তির এই পটভূমিতে মায়া শুধু বন্ধ্যা নয়, ভ্রান্ত-সঞ্চারকও। এটুকু বিবেচনা করলে বলা যেতেই পারে, অদ্বৈত-বেদান্তের অনির্বচনীয় অবিদ্যার পরিকল্পনা হয়তো আর সুদূরপরাহত নয়। তবে অন্তত একটা বিষয় মনে হয় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘উপনিষদ্’-এর শব্দার্থ গোপন বা গুহ্য জ্ঞান এবং ঋগ্বেদের আলোচ্য সূক্তে যে-জ্ঞানের প্রশস্তি তা ব্রাহ্মণ-শ্রেণীর গোপন জ্ঞান বলেই ঘোষিত। যেমন এই সূক্তেরই একটি ঋক-এ বলা হচ্ছে–

হৃদা তষ্টেষু মনসো জবেষু যদ্-ব্রাহ্মণাঃ সংর্যজন্তে সখায়ঃ।
অত্রাহ ত্বং বি জহুর্বেদ্যাভিরোহব্রহ্মাণো বি চরন্তু ত্বে।। (ঋগ্বেদ-১০/৭১/৮)।
অর্থাৎ :
সখ্যভাবসম্পন্ন ব্রাহ্মণগণ যখন তীক্ষ্ণ মনে (‘মনসো জবেষু’) পরিতুষ্ট আলোচনার্থে সমবেত হন (তখন তাঁহার) সেই (অজ্ঞ) ব্যক্তিকে বেদি হইতে বহিষ্কার করেন এবং তাঁহারা বেদঞ্জন বলিতে বলিতে বিচরণ করেন। (ঋক-১০/৭১/৮)।।


তার মানে, এখানে গুহ্য-জ্ঞানের সংরক্ষক ব্রাহ্মণ-শ্রেণীর আবির্ভাব সুস্পষ্ট। এবং মনে রাখা প্রয়োজন, ঋগ্বেদের প্রাচীনতম অংশে তার পরিচয় নেই। কিন্তু, দেবীপ্রসাদ বলেন, আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বেদজ্ঞান আলোচনার জন্য সমবেত ওই ব্রাহ্মণেরা যে ব্যক্তিকে বেদি থেকে দূর করে দিলেন সেই ব্যক্তিটির পরিচয় কী বা অপসৃত হয়ে লোকটি কোথায় গেলো? যদি দেখা যায়, জ্ঞান-চর্চার পরিবেশ থেকে বহিষ্কৃত এই ব্যক্তিটি যাদের উপর কায়িক শ্রমের দায়িত্ব তাদেরই দলভুক্ত হচ্ছে তাহলে স্বীকার করতে হবে ঋগ্বেদের এই অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকে আমাদের মূল যুক্তির অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক সমর্থন পাওয়া সম্ভব। অতএব অব্যবহিত পরবর্তী ঋক্-টি বিচার করা যাক :

ইমে যে নার্বাঙ্ ন পরশ্চরন্তি ন ব্রাহ্মণাসো ন সুতেকরাসঃ।
ত এতে বাচমভিপদ্য পাপয়া সিরীঃ তন্ত্রং তন্বতে অপ্রজজ্ঞয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭১/৯)।
অর্থাৎ :
সেই অজ্ঞরা– যারা ব্রাহ্মণদের সঙ্গে পরিচরণ করে না, দেবতাদের সঙ্গে নয়, সোমসেবনকারীদের সঙ্গেও নয়– জ্ঞান-বিহীন তারা পাপময় বাক্য সৃষ্টি করে এবং ‘সিরীঃ’ হয়ে তন্ত্র বিস্তার করে (‘তন্ত্রং তন্বতে’)। (ঋক-১০/৭১/৯)।।


সমগ্র ঋগ্বেদে এই একবার মাত্র “সিরীঃ” শব্দ পাওয়া যায় এবং এর অর্থ সুস্পষ্ট নয়। মনিয়ার-উইলিয়াম্স্ এবং ম্যাকডোনেল মনে করেন, শব্দটির অর্থ তন্তুবায় হতে পারে, যদিও অবশ্য তাঁরা এ-বিষয়ে সুনিশ্চিত নন। কিন্তু উইল্সন্ “সিরীঃ”-র তর্জমা করেছেন, কৃষক। অনুমান হয়, তিনি এখানে সায়ণেরই অনুসরণ করেছেন : কেননা সায়ণ অর্থ করেছেন, “সীরিণো ভুত্বা”। এবং এই অর্থের সঙ্গেই “তন্ত্রং তন্বতে”-র সঙ্গতি পাওয়া যায়। কেননা, সায়ণমতে ‘তন্ত্রং’ কৃষিলক্ষণং ‘তন্বতে’ বিস্তারয়ন্তি কুর্বন্তি ইত্যর্থঃ। সোজা কথায়, তারা চাষ করে। ব্যাখ্যান্তরের দিক থেকেও অবশ্য এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে তারা কায়িক শ্রমে অংশগ্রহণ করে।’- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-২০২)।
আর এজন্যেই হয়তো হরফ প্রকাশনী কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ঋগ্বেদ-সংহিতা’ গ্রন্থটিতে রমেশচন্দ্র দত্তের তর্জমা-কৃত এই ঋক্-এ বলা হচ্ছে–

‘এ যে সকল ব্যক্তি যারা ইহকাল বা পরকাল কিছুই পর্যালোচনা করে না, যারা স্তুতি প্রয়োগ বা সোমযাগ কিছুই করে না, তারা পাপযুক্ত অর্থাৎ দোষাশ্রিত ভাষা শিক্ষা করে নির্বোধ ব্যক্তির ন্যায় কেবল লাঙ্গল চালনা করবার উপযুক্ত হয় অথবা তন্তুবায়ের কার্য করবার উপযুক্ত হয়।’- (ঋগ্বেদ-১০/৭১/৯)।।


অতএব, নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, জ্ঞান-প্রশস্তিমূলক এই অর্বাচীন-সূক্তে জ্ঞান ও কর্মের প্রভেদ– এবং বিরোধও– সুস্পষ্ট হয়েছে। ফলে, জ্ঞান প্রশংসিত, কর্ম নিন্দিত– সংক্ষেপে, ভাববাদী ধ্যানধারণা আবির্ভাবের শর্ত সুস্পষ্টভাবেই চোখে পড়ে বৈকি।
উপনিষদ্-সাহিত্যে এ-শর্ত আরও প্রকট, যে-কারণে উপনিষদের নামান্তর ‘জ্ঞান-কাণ্ড’ এবং যাগযজ্ঞমূলক ব্রাহ্মণ বা ‘কর্মকাণ্ডে’র সঙ্গে তার বিরোধ। স্বভাবতই উপনিষদে বিশুদ্ধ জ্ঞানের চরম প্রশংসা এবং ভাববাদী চিন্তারও সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি। কেবল মনে রাখা দরকার বৈদিক সাহিত্যে প্রাচীনতর পর্যায়ে তা নয়। কেননা কর্মের নিন্দার উপর প্রতিষ্ঠিত বিশুদ্ধ জ্ঞানের গরিমা সেখানে নেই; পক্ষান্তরে, বরুণের সুপ্রাচীন শক্তি হিসেবে যে-মায়ার গরিমা তা একাধারে প্রজ্ঞাবাচক ও কর্মবাচক, দুইই; যদিচ উত্তরকালের জ্ঞান-প্রশস্তি প্রসঙ্গে এই মায়া বন্ধ্যা ও মিথ্যা বলে নিন্দিত।’- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-২০৩)

উপনিষদে এই ভাববাদের বিকাশ কীভাবে ঘটেছিলো, আধুনিক বিদ্বানেরা সে-বিষয়ে বহু আলোচনা করেছেন। সেগুলিতে না গিয়ে বরং এই ভাববাদী চিন্তার প্রাক্-ইতিহাসটুকুই বিচার্য হিসেবে বর্তমান আলোচনায় আমাদের প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এ-ক্ষেত্রে যুক্তি হলো, কোন এক আদিম প্রাক্-ভাববাদী চিন্তার ধ্বংস-স্তুপের উপরই কালক্রমে এই ভাববাদের আবির্ভাব ঘটেছিলো। এবং আর একটি বৈদিক ধারণার ইতিহাস থেকে এ-যুক্তির সমর্থন পাওয়া যেতে পারে।

.
ব্রহ্মন্ :

ঔপনিষদিক ভাববাদের নামান্তর হচ্ছে ব্রহ্মবাদ। যার মূল বক্তব্য হলো, এক চিন্ময় ব্রহ্মই চরম সত্য বা পরম সত্তা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঋগ্বেদেও ব্রহ্মন্ শব্দ বিরল নয়– বরং ব্রহ্মন্ ও তৎজাত শব্দ মোট ২৩২ বার উল্লিখিত হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু তার পরও ঋগ্বেদে ব্রহ্মবাদের পরিচয় নেই; ঋগ্বেদের ব্রহ্মন্ মানে কোন চিন্ময় পরম তত্ত্ব নয়।

আধুনিক বিদ্বানেরা ব্রহ্মন্ শব্দের আদি-তাৎপর্য বিচারে নানা চিত্তাকর্ষক মতবাদে উপনীত হয়েছেন। এবং মতবাদগুলির মূলে প্রধানত তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতি আধুনিক বিজ্ঞানের বিচার। বলাই বাহুল্য, সে-বিচারের গুরুত্ব উপেক্ষণীয় নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যায় না– প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারেই ব্রহ্মন্ শব্দের আদি অর্থ কী? উত্তর পাবার জন্য–
আমাদের পক্ষে অবশ্যই নিঘণ্টুর উপর নির্ভর করতে হবে। এবং নিঘণ্টু-মতে ব্রহ্মন্ মানে হয় অন্ন (নিঘণ্টু-২/৭) না হয় ধন (নিঘণ্টু-২/১০)। প্রথম অর্থটির ব্যাখ্যায় নিরুক্তকার বলছেন, “বুদ্ধি অর্থে বৃহ্ (বৃংহি) ধাতুর উপর মনিন্ প্রত্যয় করে ব্রহ্ম শব্দের নিষ্পত্তি হয়েছে। (অতএব ব্রহ্ম মানে), সমস্ত প্রাণী যাহা দ্বারা বৃদ্ধি পায়, সর্বদা ভক্ষিত হয়েও যা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় না, যা স্বভাবতই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে সমগ্র জগৎকে ভরণ করে, বা, যার সাহায্যে সর্বভূতের বৃদ্ধি হয়। ‘জাতানি অন্নেন বর্ধন্তে (তৈত্তিরীয় উপনিষদ্-২/২) ইতি শ্রুতিঃ।”- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-২০৩)

তৈত্তিরীয় উপনিষদের এই উদ্ধৃতিটি নিরুক্তকারের ব্যাখ্যার পক্ষে চূড়ান্ত বিবেচিত হতে পারে। কেননা উপনিষদের এই স্থানে সুস্পষ্টভাবেই অন্নের প্রশংসা পাওয়া যায়। যেমন–

‘অন্নাদ্বৈ প্রজাঃ প্রজায়ন্তে। যাঃ কাশ্চ পৃথিবীং শ্রিতাঃ। অথো অন্নেনৈব জীবন্তি। অথৈনদপি যন্ত্যন্ততঃ। অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম। তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। সর্বং বৈ তেহন্নমাপ্নুবন্তি। যেহন্নং ব্রহ্মোপাসতে। অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্টম্ । তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। অন্নাদ্ভূতানি জায়ন্তে। জাতানি অন্নেন বর্ধন্তে। অদ্যতেহত্তি চ ভূতানি। তস্মাদন্নং তদুচ্যতে। ইতি।’ (তৈত্তিরীয়-উপনিষদ-২/২/১)।।
অর্থাৎ :
পৃথিবীকে আশ্রয় করে আছে যত প্রজা (প্রাণী) সবার জন্ম অন্ন থেকে। অন্নেই জীবন ধারণ করে। আবার জীবন শেষে ঐ অন্নের মধ্যেই ফিরে যায়। কারণ অন্নই হলো সবার বা সকল ভূতের জ্যেষ্ঠ। বস্তুর মধ্যে সর্বপ্রথম অন্নের জন্ম। তাই (অন্নময় এই জীবনের) অন্নই হলো সর্বৌষধি (ক্ষয়, ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটাবার একমাত্র মাধ্যম)। অন্ন থেকে সকল প্রাণী জন্মে। জন্ম নিয়ে তারা অন্নদ্বারাই বর্ধিত হয়। যে অন্নকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করে সে কাম্য বস্তু অন্ন বা দেহের উপভোগের যাবতীয় বস্তুই পায়। তা প্রাণীগণ কর্তৃক ভক্ষিত হয় এবং তা প্রাণীদিগকে ভক্ষণ করে। সেইজন্য অন্নকে অন্ন বলে; ইতি। (তৈত্তিরীয়-২/২/১)।।


উপনিষদের মধ্যে এ-জাতীয় ভাবধারার পরিচয় অবশ্যই অতি-অদ্ভূত মনে হতে পারে। কিন্তু দেখা যায়, উপনিষদ্-সাহিত্যে বাস্তবিকই এ-জাতীয় এক আদিম বস্তুবাদের স্মারক টিকে থেকেছে; সেই বস্তুবাদ অনুসারে অন্নই চরম সত্য, পরম সত্তা। বস্তুত উপনিষদের দার্শনিকেরা সচেতনভাবেই সেই বস্তুবাদ উত্তীর্ণ হয়ে সুস্পষ্ট-ভাববাদে উপনীত হবার আয়োজন করেছিলেন। অতএব তৈত্তিরীয় উপনিষদ্ থেকে আলোচ্য উদ্ধৃতি অবধারিতভাবেই প্রমাণ করে যে, নিরুক্তকারের মতে ঋগ্বেদের ব্রহ্ম শব্দ অন্নবাচকই। এবং এই অর্থে ব্রহ্ম শব্দ ব্যবহারের দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি নিম্নোক্ত ঋক্-টি উল্লেখকরেছেন :

ইন্দ্রা যাহি ধিয়েষিতো বিপ্রজূতঃ সুতাবতঃ। উপ ব্রহ্মাণি বাঘতঃ।। (ঋগ্বেদ-১/৩/৫)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র, যজমানগণের ধী এবং সোমযুক্ত ঋত্বিকের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে অন্নসমূহের (ব্রহ্মাণি) নিকট আগমন কর। (ঋক-১/৩/৫)।।


আমরা আগেই দেখেছি, ঋগ্বেদের বিশেষত প্রাচীনতর অংশ এমন এক পর্যায়ের রচনা যখন মানুষের ধনসম্পদ বলতে প্রধানতই অন্ন বা খাদ্যদ্রব্য। হয়তো এই কারণেই নিঘণ্টুমতে ব্রহ্ম শুধু অন্নবাচক নয়, ধনবাচকও। এই অর্থটির ব্যাখ্যাতেও নিরুক্তে বৃদ্ধিমূলক ধারণার উপরই গুরুত্ব আরোপণ করে বলা হয়েছে : ‘ভোগানাং বৃংহকম্’, ভোগসমূহের বর্ধনকারী। এবং ঋগ্বেদে এই অর্থে ব্যবহৃত শব্দের দৃষ্টান্ত হিসেবে নিরুক্তকার নিম্নোক্ত ঋক্ উদ্ধৃত করেছেন :

আ বাং মিত্রাবরুণা হব্যজুষ্টিং নমসা দেবাববসা ববৃত্যাম্ ।
অস্মাকং ব্রহ্ম পৃতনাসু সহ্যা অস্মাকং বৃষ্টির্দিব্যা সূপারা।। (ঋগ্বেদ-১/১৫২/৭)।
অর্থাৎ : রক্ষানিমিত্ত, হে মিত্রাবরুণ, তোমাদেরকে প্রশংসা-যুক্ত হবি প্রদান করা হচ্ছে; সংগ্রামে আমাদের ধন (ব্রহ্ম) যেন অভিভূত করে, আকাশের বৃষ্টি যেন আমাদের পারয়িত্রী হয়। (ঋক-১/১৫২/৭)।।


এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘নিঘণ্টু এবং নিরুক্তর সাক্ষ্য নিশ্চয়ই সহজে উপেক্ষা করা যাবে না। অতএব, নিঘণ্টু-মতে যদি ব্রহ্ম শব্দ অন্নবাচক বা ধনবাচক হয় এবং নিরুক্ত-মতে যদি উপরোদ্ধৃত ঋক্-দুটিতে তারই নিদর্শন পাওয়া যায় তাহলে ঋগ্বেদের অন্যত্রও শব্দটির অর্থান্তর নির্ণয় করা যুক্তিসঙ্গত হবে না, যদি না অবশ্য ঋগ্বেদের এমন কোন অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থাকে যার ফলে অর্থান্তর-পরিকল্পনা অনিবার্য হয়। সায়ণ কিন্তু তবুও বার বার ব্রহ্ম শব্দের অর্থ করেছেন স্তোত্র। তিনি কোনো প্রাচীন ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করেছেন বলে জানা নেই; স্বভাবতই অনুমান হয় নিজে বৈদান্তিক সম্প্রদায়ের দার্শনিক ছিলেন বলেই ব্রহ্ম শব্দকে অন্ন বা ধনের মতো স্থূল অর্থে গ্রহণ করতে তাঁর দ্বিধা হয়েছে। অর্থাৎ, এই অর্থান্তর-নির্ণয়ে প্রাচীন ঐতিহ্যের পরিবর্তে তাঁর উপর সমসাময়িক ধ্যানধারণার প্রভাবই প্রবলতর। তবুও অন্তত কয়েকটি দৃষ্টান্তে তাঁর পক্ষেও ওই সুপ্রাচীন অর্থ পরিহার করা সম্ভব হয়নি। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, ব্রহ্মণস্পতি নামের ব্যাখ্যায় তিনি ব্রহ্মন্ শব্দকে অন্ন অর্থেই গ্রহণ করেছেন এবং অন্যত্রও তাঁর রচনায় এই অর্থস্বীকৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি “ব্রহ্মচোদনীং”-এর অর্থ করেছেন ‘ব্রহ্মণোহন্নস্য প্রেরয়িত্রী’ (ঋক-৬/৫৩/৮), “ব্রহ্মকারাঃ”-র অর্থ করেছেন ‘ব্রহ্মণঃ অন্নস্য হবির্লক্ষণস্য কর্তারঃ’ (ঋক-৬/২৯/৪), ইত্যাদি। দ্বিতীয়, ব্রহ্ম শব্দ ব্যাখ্যায় যাস্ক বৃদ্ধি-র উপর বিশেষ গুরুত্ব অর্পণ করেছেন। অন্ন বা ধনের বৃদ্ধি– বা বৃদ্ধিমূলক কামনা– সহজে বোঝা যায়, বিশেষত যখন প্রায় সমগ্র ঋগ্বেদ জুড়ে এই কামনাই পায় অসংখ্য ও বিচিত্র প্রকাশ। কিন্তু স্তোত্র-বৃদ্ধি তাৎপর্য সুস্পষ্ট নয়– ঋগ্বেদে বারবার ব্রহ্মেরই বৃদ্ধি কামনা করা হয়েছে। প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে এ-জাতীয় দৃষ্টান্তগুলিকে অন্ন বা ধনবৃদ্ধির কামনামূলক বলেই গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত।
‘ইন্দ্র পথ নির্মাণ করতে করতে ব্রহ্ম বৃদ্ধি করেছিলেন’ (ব্রহ্ম তূতোৎ ইন্দ্রঃ গাতুম্ ইষ্ণান্)- (ঋক-২/২০/৫), ‘যাহার ব্রহ্ম এবং যাহার সোম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়’ (যস্য ব্রহ্ম বর্ধনম্ যস্য সোমঃ)- (ঋক-২/১২/১৪), ‘মরুৎগণ যেন আমাদের অন্নযুক্ত সেই বস্তু দেন যা প্রতিদিন ব্রহ্ম বৃদ্ধি করে’ (ব্রহ্মচিতয়ৎ)- (ঋক-২/৩৪/৭), ‘অগ্নি বৃদ্ধি করুন’ (ব্রহ্ম জোষি)- (ঋক-২/৩৭/৬), ‘গৃৎসমদদের স্তোম ব্রহ্ম বর্ধন করে’ (বর্ধনানি ব্রহ্ম)- (ঋক-২/৩৯/৮), ‘ইন্দ্র ব্রহ্ম বর্ধন করিতে করিতে’ (ব্রহ্ম জুষাণঃ) আমাদের দিকে আগমন করুন’ (ঋক-৭/২৪/৪), ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সমস্ত দৃষ্টান্তে সায়ণ ব্রহ্ম শব্দের অর্থ করেছেন স্তোত্র; কিন্তু নিঘণ্টু ও নিরুক্তর প্রাচীন নির্দেশ মেনে এখানে ব্রহ্ম অর্থে অন্ন বা ধন গ্রহণ করলেই ঋক্গুলির তাৎপর্য সুস্পষ্ট হয় এবং ঋগ্বেদের প্রধানতম বিষয়বস্তুর সঙ্গেও এগুলির সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়, কেননা দেখেছি, এই বিষয়বস্তু বলতে পার্থিব সম্পদের কামনাই।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-২০৪-৫)

অতএব দেখাই যাচ্ছে, ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশে ব্রহ্মের গরিমা বিরল নয়, কিন্তু তার মধ্যে ঔপনিষদিক ব্রহ্মবাদের আভাসও নেই। কেননা সেখানে ব্রহ্ম বলতে মূলতই অন্ন বা ধন, ব্রহ্ম-গরিমার অর্থ অন্ন-গরিমা বা ধন-গরিমা। বস্তুত অন্ন-গরিমা যে ঋগ্বেদের একটি প্রধান বিষয়বস্তু এ-বিষয়ে ইতঃপূর্বে পার্থিব সম্পদের কামনা প্রসঙ্গে বৈদিক পিতু-দেবতার স্তুতিমূলক একটি সূক্ত (ঋগ্বেদ-১/১৮৭) উদ্ধৃত করে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছিলো– যার মূল বক্তব্য ছিলো– সুস্বাদু এবং সুগন্ধি দেবতা পিতু শরীরকে স্থূল করেন, তাঁর মহিমার যেন অন্ত নেই। বলাই বাহুল্য, যে-দৃষ্টিভঙ্গির উপর এই অন্ন-গরিমা প্রতিষ্ঠিত, তাকে ভাববাদী আখ্যা দেবার সুযোগ নেই। বরং ওই প্রাক্-ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির যদি কোনো দার্শনিক বর্ণনা একান্তই সম্ভব হয় তাহলে তাকে আদিম বস্তুবাদই বলা যেতে পারে বলে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এমনকি উপনিষদের যুগেও এই আদিম বস্তুবাদের স্মৃতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। কেননা মূলত ভাববাদের পরিচায়ক হলেও উপনিষদের স্থান-বিশেষে এই আদিম বস্তুবাদের স্মারক টিকে থেকেছে এবং উপনিষদের দার্শনিকেরা প্রায়ই সচেতনভাবে তা উত্তীর্ণ হতে চেয়েছেন। এ-ক্ষেত্রেও কিছু বৈদিক তথা ঔপনিষদিক দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা যেতে পারে।

নিরুক্তে তৈত্তিরীয় উপনিষদের যে বাক্যটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছিলো– ‘অন্নাদ্ভূতানি জায়ন্তে। জাতানি অন্নেন বর্ধন্তে।…’– অর্থাৎ, ‘অন্ন থেকে সকল প্রাণী জন্মে। জন্ম নিয়ে তারা অন্নদ্বারাই বর্ধিত হয়।…’ এ-জাতীয় মতবাদ স্বভাবতই কোনো আদিম দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক, এবং উপনিষদের ঋষি অন্নরসময় কোশ-এর ব্যাখ্যা থেকে শুরু করে আত্মার ক্রমশ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপটি উদ্ঘাটন করবার আয়োজন করেছেন তৈত্তিরীয় উপনিষদের ব্রহ্মানন্দবল্লীতে : অন্নরসময় কোশের পর প্রাণময় কোশ, প্রাণময় কোশের পর মনোময় কোশ, মনোময় কোশের পর বিজ্ঞানময় কোশ, এবং এই বিজ্ঞানময় কোশের পর আনন্দময় আত্মার স্বরূপ- আনন্দই আত্মা।
অধ্যায়ান্তরে চার্বাকী বস্তুবাদ প্রসঙ্গে এ-বিষয়টি আরো বিস্তৃত আলোচনা করা যাবে। তবে তৈত্তিরীয় উপনিষদের ভৃগুবল্লীতেও মোটের উপর একই দার্শনিক পদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্য নজির হিসেবে এই উপনিষদীয় আখ্যানটির প্রয়োজনীয় অংশ উদ্ধৃত করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বোধকরি।

‘ভৃগুর্বৈ বারুণিঃ। বরুণং পিতরমুপসসার। অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। তস্মা এতৎ প্রোবাচ। অন্নং প্রাণং চক্ষুঃ শ্রোত্রং মনো বাচমিতি। তং হোবাচ। যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে। যেন জাতানি জীবন্তি। যৎ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি। তদ্বিজিজ্ঞাসস্ব। তদ্ ব্রহ্মেতি। স তপোহতপ্যত। স তপস্তপ্ত্বা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/১)।।  ‘অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। অন্নাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। অন্নেন জাতানি জীবন্তি। অন্নং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনরেব বরুণং পিতরমুপসসার। অধীহি ভগবো ব্রহ্মেতি। তং হোবাচ। তপসা ব্রহ্ম বিজিজ্ঞাসস্ব। তপো ব্রহ্মেতি। স তপোহতপ্যত। স তপস্তপ্ত্বা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/২)।।  ‘প্রাণো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। প্রাণাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। প্রাণেন জাতানি জীবন্তি। প্রাণং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনরেব বরুণং……স তপস্তপ্ত্বা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৩)।।  মনো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। মনসো হ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। মনসা জাতানি জীবন্তি। মনঃ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনরেব বরুণং……স তপস্তপ্ত্বা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৪)।।  ‘বিজ্ঞানং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। বিজ্ঞানাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। বিজ্ঞানেন জাতানি জীবন্তি। বিজ্ঞানং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। তদ্বিজ্ঞায়। পুনরেব বরুণং……স তপস্তপ্ত্বা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৫)।।  ‘আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তি। আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি। সৈষা ভার্গবী বারুণী বিদ্যা। পরমে ব্যোমন্প্রতিষ্ঠিতা। স য এবং বেদ প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবানন্নাদো ভবতি। মহান্ভবতি প্রজয়া পশুভির্ব্রহ্মবর্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৬)।।
অর্থাৎ :
বরুণের পুত্র ভৃগু একবার তাঁর পিতার কাছে গিয়ে বললেন, ‘ভগবন্, আমাকে ব্রহ্ম বিষয়ে শিক্ষা দিন।’ পিতা পুত্রকে অন্ন, প্রাণ, চোখ, কান, মন এবং বাগিন্দ্রিয়ের কথা বললেন। তারপর বললেন, ‘যা থেকে এই প্রাণীসমূহ জন্মে, জন্মের পর যাদ্বারা জীবনধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত যার মধ্যে ফিরে যায়, তাকে বিশেষভাবে জানবার চেষ্টা কর; তা-ই ব্রহ্ম।’ এই উপদেশের উপর নির্ভর করে ভৃগু তপস্যা শুরু করলেন। তপস্যা করে–। (তৈত্তিরীয়-৩/১)।।  তপস্যা করে ভৃগুর মনে হলো, অন্নই ব্রহ্ম। কেননা, অন্ন থেকে সকল প্রাণী জন্মে, অন্নের দ্বারাই জীবনধারণ করে আবার মৃত্যুর পরে অন্নেই ফিরে যায়। কিন্তু এ-উপলব্ধি পিতার কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি, পুত্রকে বললেন, ‘পুনরায় তপস্যা করো, তপস্যার দ্বারাই ব্রহ্মকে জানবে।’ দ্বিতীয়বার তপস্যা করে–। (তৈত্তিরীয়-৩/২)।।  ভৃগু উপলব্ধি করলেন, প্রাণই ব্রহ্ম। প্রাণ থেকেই সকল ভূতবর্গ জন্মায়, প্রাণই তাদের ধারণ করে রাখে আবার মৃত্যুর পর প্রাণেই তাদের লয় হয়। কিন্তু এ-উপলব্ধিও পিতার কাছে অসন্তোষজনক প্রতিপন্ন হলো। ভৃগু বললেন, ‘ভগবন্, ব্রহ্ম বিষয়ে আমাকে আরও উপদেশ দিন।’ পিতা বললেন, ‘পুনরায় তপস্যা করো।’ তৃতীয়বার তপস্যার পর–। (তৈত্তিরীয়-৩/৩)।।  ভৃগুর মনে হলো, মনই ব্রহ্ম। কারণ মন থেকেই সব বস্তুর উদ্ভব, মনই তাদের আশ্রয় এবং মৃত্যুর পর মনেই তাদের লয় হয়। এবারও এ-উপলব্ধি পিতার কাছে সন্তোষজনক প্রতীতি না হওয়ায় ভৃগু বললেন, ‘ভগবন্, আমাকে ব্রহ্মতত্ত্ব শিক্ষা দিন।’ পিতা বললেন, ‘আবার তপস্যা করো, তপস্যাতেই জানতে পারবে।’ চতুর্থবার তপস্যা করে–। (তৈত্তিরীয়-৩/৪)।।  ভৃগুর মনে হলো, বিজ্ঞানই ব্রহ্ম। জগতে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে সব বিজ্ঞান থেকে জন্মায়, জন্মাবার পর বিজ্ঞানই তাদের ধারণ করে রাখে এবং মৃত্যুর পর তারা বিজ্ঞানেই লয়প্রাপ্ত হয়। কিন্তু পুত্রের এই উপলব্ধিও পিতার কাছে অসন্তোষজনক প্রতিপন্ন হলে ভৃগু বললেন, ‘ভগবন্, আপনিই আমাকে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা দিন।’ পিতা বললেন, ‘পুনরায় তপস্যা করো। ঠিকই জানতে পারবে।’ পুনর্বার তপস্যার পর–। (তৈত্তিরীয়-৩/৫)।।  ভৃগুর উপলব্ধি হলো যে, আনন্দই ব্রহ্ম। কেননা আনন্দ থেকেই সকল প্রাণীর জন্ম হয়। জন্মের পর তারা আনন্দের দ্বারাই বর্ধিত হয় এবং যখন তার ধ্বংস হয়ে যায় তখন আনন্দেই ফিরে যায় এবং তাতেই লীন হয়। এই জ্ঞান ভৃগু লাভ করেছিলেন বরুণের কাছ থেকে এবং বরুণ তাঁকে এই শিক্ষা দিয়েছিলেন। যিনি এইরূপে ব্রহ্মকে জানেন তিনি ব্রহ্মানন্দে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি প্রভূত অন্ন, প্রজাসন্ততি এবং অনেক পশুধনের অধিকারী ও ভোগের সামর্থ্য অর্জন করেন। (তৈত্তিরীয়-৩/৬)।।


এই দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, আত্মন্ বা ব্রহ্মন্-এর স্বরূপ উপলব্ধির জন্য সর্বপ্রথম যে দৃষ্টিভঙ্গি উত্তীর্ণ হওয়া প্রয়োজন তা হলো অন্নই আত্মন্ বা অন্নই ব্রহ্মন্ । উপনিষদের যুগেও যে বাস্তবিকই এ জাতীয় একটি আদিম বস্তুবাদ প্রচলিত ছিলো– যে বস্তুবাদ অনুসারে অন্নই পরম সত্তা বা চরম সত্য– এবং উপনিদের ভাববাদী দার্শনিকেরা যে সচেতনভাবেই মতবাদটি প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিলেন, বৃহদারণ্যক এবং ছান্দোগ্য উপনিষদ্ থেকেও তার অনুমান করতে কষ্ট হয় না।

যেমন বৃহদারণ্যক-উপনিষদ্-এ উক্ত হয়েছে,–

“কেহ কেহ বলেন, অন্নই ব্রহ্ম। উহা ঠিক নহে। কারণ প্রাণ না থাকলে অন্ন পচিয়া যায়। কেহ বলেন, প্রাণই ব্রহ্ম। উহাও ঠিক নহে। কারণ অন্নের অভাবে প্রাণ শুকাইয়া যায়। ‘পরন্তু এই দুই (অন্ন ও প্রাণ) একীভূত হইয়া ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়’– ইহা বিচার করিয়া প্রাতৃদ পিতাকে বলিয়াছিলেন, ‘যিনি এরূপ জানেন আমি তাঁহার প্রতি কোন্ শুভকার্য করিতে পারি আর কোন্ অশুভকার্যই বা করিতে পারি?’ পিতা তাঁহাকে হস্তদ্বারা ধারণ করিয়া বলিলেন, “না প্রাতৃদ, ইহাদের সহিত একীভূত হইয়া কে আবার ব্রহ্মত্ব লাভ করে?”- (বৃহদারণ্যক-৫/১২)।।


এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অন্নই যে ব্রহ্ম এ জাতীয় একটি মতবাদ উপনিষদের যুগে অবশ্যই প্রচলিত ছিলো। যেমন, ছান্দোগ্য উপনিষদে বিখ্যাত নারদ-সনৎকুমার সংবাদেও এ-বিষয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখানে দার্শনিক সনৎকুমার নারদের কাছে ব্রহ্মতত্ত্ব ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে পরপর ব্রহ্ম বিষয়ে কয়েকটি ভ্রান্ত ধারণা বা নিম্নস্তরের জ্ঞান নিরসন করেছিলেন; তার মধ্যে একটি হলো অন্নই ব্রহ্ম :

‘অন্নং বাব বলাদ্ভূয়স্তস্মাদ্ যদ্যপি দশ রাত্রীর্নাশ্নীয়াদ্ যদ্যু হ জীবেদথবাঃ অদ্রষ্টাঃ অশ্রোতাঃ অমন্তাঃ অবোদ্ধাঃ অকর্তাঃ অবিজ্ঞাতা ভবত্যথাঃ অন্নস্যায়ৈ দ্রষ্টা ভবতি শ্রোতা ভবতি মন্তা ভবতি বোদ্ধা ভবতি কর্তা ভবতি বিজ্ঞাতা ভবতি অন্নম্ উপাস্স্ব ইতি।’ (ছান্দোগ্য-৭/৯/১)।।
‘সঃ যঃ অন্নম্ ব্রহ্মেতি উপাস্তেঃ অন্নবতো বৈ স লোকান্ পানবতো অভিসিধ্যতি যাবদন্নস্য গতং তত্রাস্য যথাকামচারো ভবতি যঃ অন্নং ব্রহ্মেতি উপাস্তেহস্তি ভগবো অন্নাদ্ভূয় ইত্যন্নাদ্বাব ভূয়োহস্তীতি তন্মে ভগবান্ ব্রবীত্বিতি। (ছান্দোগ্য-৭/৯/২)।।
অর্থাৎ :
বল অপেক্ষা অন্ন অবশ্যই শ্রেষ্ঠ। সেইজন্য যদি কেউ দশ দিন দশ রাত অন্নগ্রহণ না করে, সে যদি জীবিতও থাকে তাহলেও সে দেখতে পায় না, শুনতে পায় না, চিন্তা করতে পারে না, বুঝতে পারে না, কাজ করতে পারে না বা কোন কিছুর অর্থ ধারণা করতে পারে না। কিন্তু অন্ন গ্রহণ করলে সে দর্শন করতে পারে, শ্রবণ করতে পারে, মনন করতে পারে, বুঝতে পারে, কাজ করতে পারে এবং জ্ঞানলাভ করতে পারে। অতএব অন্নের উপাসনা কর। (ছান্দোগ্য-৭/৯/১)।।  যিনি অন্নকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করেন, তিনি অন্নযুক্ত ও পানযুক্ত লোকসমূহ লাভ করেন। যিনি অন্নকে ব্রহ্ম বলে উপাসনা করেন, অন্নের গতি যতদূর, ততদূর তাঁর কামচরণ হয়ে থাকে। নারদ বললেন, ‘ভগবন্, অন্ন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কি কিছু আছে?’ সনৎকুমার বললেন, ‘অবশ্যই অন্ন অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ কিছু আছে।’ নারদ বললেন, ‘ভগবন্, তা আমাকে বলুন।’ (ছান্দোগ্য-৭/৯/২)।।


তার মানে, উপনিষদের দার্শনিকেরা বারবার এইভাবে আদিম অন্ন-দর্শনটি প্রত্যাখ্যান করলেও উপনিষদ্-সাহিত্যেই মাঝে মাঝে তার অক্ষুণ্ন প্রভাব টিকে থেকেছে। যেমন, তৈত্তিরীয় উপনিষদে ইতোমধ্যে ভৃগু-বরুণ সংবাদে অন্ন-ব্রহ্ম মতবাদ খণ্ডন করে আনন্দ-ব্রহ্ম প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই– এবং সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবেই– উক্ত হয়েছে–

‘অন্নং ন নিন্দ্যাৎ। তদ্ ব্রতম্ । প্রাণো বা অন্নম্ । শরীরম্ অন্নাদম্ । প্রাণে শরীরং প্রতিষ্ঠিতম্ । শরীরে প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিতঃ। তদেতং অন্নম্ অন্নে প্রতিষ্ঠিতম্ । স য এতদ্ অন্নম্ অন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবান্ অন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি প্রজয়া পশুভির্ব্রহ্মবর্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৭/১)।।
‘অন্নং ন পরিচক্ষীত। তদ্-ব্রতম্ । আপো বা অন্নম্ । জ্যোতিরন্নাদম্ । অপ্সু জ্যোতিঃ প্রতিষ্ঠিতম্ । জ্যোতিষ্যাপঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ। তদেতদন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতম্ । স য এতদন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবানন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি প্রজয়া পশুভিঃ ব্রহ্মবর্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৮/১)।।
‘অন্নং বহু কুর্বীত। তদ্-ব্রতম্ । পৃথিবী বা অন্নম্ । আকাশো অন্নাদঃ। পৃথিব্যামাকাশঃ প্রতিষ্ঠিতঃ। আকাশে পৃথিবী প্রতিষ্ঠিতা। তদেতদ্ অন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতম্ । স য এতদন্নমন্নে প্রতিষ্ঠিতং বেদ প্রতিতিষ্ঠতি। অন্নবানন্নাদো ভবতি। মহান্ ভবতি প্রজয়া পশুভির্ব্রহ্মবর্চসেন। মহান্ কীর্ত্যা।’ (তৈত্তিরীয়-৩/৯/১)।।
অর্থাৎ :
অন্নকে কখনও নিন্দা করবে না। এটা তোমার ব্রত,– তোমার কর্তব্য-কর্ম। প্রাণই অন্ন আর শরীর অন্নভোক্তা। প্রাণে শরীর প্রতিষ্ঠিত। শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত। এই অন্ন এভাবে আরেক অন্নে প্রতিষ্ঠিত। যিনি এভাবে অন্নকে অন্নে প্রতিষ্ঠিত বলে জানেন, তিনিই ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হন। সুপ্রচুর অন্নের মালিক হয়ে অন্নভোক্তা তো হনই, এমনকি পুত্রাদি, পশু, ব্রহ্মতেজ এবং কীর্তিতেও মহান হন। (তৈত্তিরীয়-৩/৭/১)।।  অন্নকে পরিত্যাগ করবে না। তা ব্রত। জল অন্ন। জ্যোতিঃ অন্নভোক্তা। জলে জ্যোতিঃ প্রতিষ্ঠিত। জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠিত। এই অন্ন অন্নে প্রতিষ্ঠিত। যিনি এই অন্নকে অন্নে প্রতিষ্ঠিত বলে জানেন তিনি ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হন, অন্নবান ও অন্নভোক্তা এবং পুত্রাদি, পশু ব্রহ্মতেজ ও কীর্তি বিষয়ে মহান্ হন। (তৈত্তিরীয়-৩/৮/১)।।  অন্নকে বহু করবে। তা ব্রত। পৃথিবী অন্ন। আকাশ অন্ন-ভোক্তা। আকাশে পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত। এই অন্নে অন্ন প্রতিষ্ঠিত। যিনি এই অন্নকে অন্নে প্রতিষ্ঠিত বলে জানেন তিনি ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হন, অন্নবান ও অন্নভোক্তা এবং পুত্রাদি, পশু, ব্রহ্মতেজ ও কীর্তি বিষয়ে মহান হন। (তৈত্তিরীয়-৩/৯/১)।।


যুক্তি বা বিচারে সামান্য পরিচয় থাকলেও অন্ন-গরিমা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কামনার দিক থেকে উপনিষদের এই অংশটি প্রাচীন বৈদিক কবিদের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। বস্তুত সেই আদিম কবিদের একটি গানেই– মূলত একটি সামগানেই– তৈত্তিরীয় উপনিষদের পরিসমাপ্তি টানা হয়েছে। এবং চিত্তাকর্ষক বিষয় হলো, অন্ন নিয়ে এক আদিম উচ্ছ্বাসই এ গানের মূল বিষয়বস্তু–

‘অহমন্নম্-অহমন্নম্-অহমন্নম্ । অহমন্নাদো ৩ হহমন্নাদো ৩ হহমন্নাদঃ। অহং শ্লোককৃদহং শ্লোককৃদহং শ্লোককৃৎ। অহমস্মি প্রথমজা ঋতা ৩ স্য। পূর্বং দেবেভ্যোহমৃতস্য না ৩ ভায়ি। যো মা দদাতি স ইদেব মা ৩ বাঃ। অহমন্নমন্নমদন্তম ৩ স্মি। অহং বিশ্বং ভুবনমভ্যভবা ৩ ম্ । সুবঃ ন জ্যোতীঃ। য এবং বেদ। ইত্যুপনিষৎ। (তৈত্তিরীয়-৩/১০/৬)।।
অর্থাৎ :
আমি অন্ন… আমি অন্ন… আমি অন্ন। আমিই অন্ন গ্রহণ করি… আমিই অন্ন গ্রহণ করি। আমিই শ্লোক রচনা করি… আমিই শ্লোক রচনা করি… আমিই শ্লোক রচনা করি। এই মূর্ত-অমূর্ত জগতে আমিই সবার আগে প্রথম উৎপন্ন হয়েছি। দেবতাদেরও পূর্বে আমি জন্মেছি। আমিই অমৃতের অধিষ্ঠান। যে অন্নস্বরূপ আমাকে অন্নপ্রার্থীর হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দেয়, দান করে, সে সেভাবেই আমাকে রক্ষা করে। আর অন্নার্থ যাকে বিমুখ করে অন্নদান না করে নিজের উদরপূর্তি করে, সেই অসদাচারীকে আমিই ভক্ষণ করি। সূর্যের মতোই আমি স্বপ্রকাশ জ্যোতির্ময়। আমারই অভিব্যক্তি, আমারই প্রকাশ লোকালোক নিয়ে এই ভুবন। এই জ্ঞান যার আয়ত্তে, সবকিছুই তার আয়ত্তে। এই রহস্য যে জেনেছে, তার সবই জানা হয়েছে। এই হলো উপনিষদ্ অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা। (তৈত্তিরীয়-৩/১০/৬)।।


দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘অন্ন-প্রশস্তিতে এ-ভাবে প্রায় মূর্ছা যাবার উপক্রম অবশ্যই অত্যন্ত আদিম পর্যায়ের পরিচায়ক। কিন্তু যে-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই প্রশস্তি তাকে আর যাই হোক অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী আখ্যা দেওয়া যায় না। বরং যদি তার কোনো ব্যাখ্যা একান্তই সম্ভব হয় তাহলে তাকে আদিম ও প্রকৃত বস্তুবাদই বলা যেতে পারে। প্রাচীন বৈদিক কবিদের দৃষ্টিভঙ্গি বলতে মূলতই তাই। এবং তারই ধবংসস্তুপের উপর বৈদিক ঐতিহ্যে কালক্রমে ভাববাদী চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে– উপনিষদ্-সাহিত্যে সে-ভাববাদ সুস্পষ্টরূপ গ্রহণ করেছে।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : যজ্ঞ] [*] [পরের পর্ব : উপসংহার]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৭ : ব্রহ্মন্ ও মায়া|"

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 346,257 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 113 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: