h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৬ : যজ্ঞ|

Posted on: 08/07/2015


BLACK_FOREST

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৬ : যজ্ঞ |
রণদীপম বসু

৩.৬ : যজ্ঞ

ঋগ্বেদে অবশ্যই যজ্ঞ, যজমান, ঋত্বিক প্রভৃতির প্রচুর উল্লেখ রয়েছে; এমন কি এতে উত্তর-সাহিত্যে– যজুর্বেদ এবং ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে– বর্ণিত কোনো কোনো বিশিষ্ট যজ্ঞের পরিচয়ও পাওয়া যায়। যেমন, অধ্যাপক কীথ্ বলছেন– ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের ১৬২ ও ১৬৩ সূক্ত অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই অশ্বমেধ যজ্ঞের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। মূলত ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের উল্লিখিত সূক্তগুলিরই পুনরাবৃত্তি পাওয়া যায় তৈত্তিরীয়-সংহিতা বা কৃষ্ণযজুর্বেদের চতুর্থ কাণ্ডের ষষ্ঠ প্রপাঠকের মন্ত্রগুলিতে, যেগুলি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে পঠিত হয়। কিন্তু উত্তর-সাহিত্যে অর্থাৎ যজুর্বেদ ও ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে বৈদিক যজ্ঞকে যে-জটিল ও পল্লবিতরূপে দেখা যায় ঋগ্বেদে নিশ্চয়ই তার পরিচয় নেই। এর থেকে অনুমান করা হয় যে, ঋগ্বেদের যুগে যজ্ঞ পরবর্তীকালের মতো ছিলো না। তার মানে, বিদ্বান গবেষকদের দৃষ্টিতে, যজ্ঞের আদি-রূপ ও উত্তর-রূপ এক নয়। অর্থাৎ, পরবর্তী কালে যজ্ঞ বলতে আমরা যা বুঝতে অভ্যস্ত হয়েছি আদিতে যজ্ঞ বলতে ঠিক তা বোঝাতো না।


তাহলে আমাদের অভ্যস্ততায় পরবর্তীকালের যজ্ঞ কী রকম? তা হলো– যজমানের কোনো কামনা সফল করবার উদ্দেশ্যেই যজ্ঞ, কিন্তু এই যজ্ঞকর্ম সম্পাদনের ভার যজমানের উপর নয়। তার জন্য যজমান ঋত্বিক, হোতা, অধর্যু প্রভৃতি পুরোহিত নিযুক্ত করবেন, তাঁর স্বার্থে যজ্ঞকর্ম করে দেবার জন্য পুরোহিতদের উপযুক্ত দক্ষিণা দেবেন এবং অবশ্যই যজ্ঞকর্মের যাবতীয় ব্যয়ভার তিনিই বহন করবেন। বলা বাহুল্য, উপনিষদ্ প্রভৃতিতে যজমানের এই চিত্রই পাওয়া যায়। যেমন, (ইতঃপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে) ছান্দোগ্য-উপনিষদের একটি উপাখ্যান এরকম (ছান্দোগ্য-১/১০/১–১/১১/৩)–

‘মটচীহতেষু কুরুষ্বাটিক্যা সহ জায়য়োষস্তির্হ চাক্রায়ণ ইভ্যগ্রামে প্রদাণক উবাস। (ছান্দোগ্য-১/১০/১)।।…… স হ প্রাতঃ সঞ্জিহান উবাচ যদ্বতান্নস্য লভেমহি লভেমহি ধনমাত্রাং রাজাহসৌ যক্ষ্যতে স মা সর্বৈরার্ত্বিজ্যৈর্বৃণীতেতি। (ছান্দোগ্য-১/১০/৬)।।…… ভগবাংস্ত্বেব মে সর্বৈরার্ত্বিজ্যৈরিতি তথেত্যথ তর্হ্যতে এব সমতিসৃষ্টাঃ স্তুবতাং যাবত্ত্বেভ্যো ধনং দদ্যান্তাবন্মম দদ্যা ইতি তথেতি হ যজমান উবাচ’। (ছান্দোগ্য-১/১১/৩)।।
আখ্যানটির অংশ-বিশেষের সংক্ষিপ্ত তর্জমা :
‘একবার কুরুদেশ যখন শিলাবৃষ্টিতে বিধ্বস্ত হয়েছিলো তখন উষস্তি চাক্রায়ণ (জনৈক পুরোহিত) ‘ইভ্য’-গ্রামে আপন পত্নীকে নিয়ে অত্যন্ত দুর্দশায় পড়েছিলেন।’ ভিক্ষালব্ধ উচ্ছিষ্ট মাষকলাই খেয়ে তিনি রাত কাটালেন; পরদিন সকালে স্ত্রীকে বললেন, ‘হায়, যদি কিঞ্চিৎ অন্ন পেতাম তাহলে কিছু অর্থলাভ হতো। ঐ রাজা যজ্ঞ করবেন; ঋত্বিকগণের সমুদয় কার্য-সম্পাদনের জন্য তিনি আমাকে বরণ করতেন।’ স্ত্রী পূর্ব-দিবসের ভিক্ষালব্ধ মাষকলাই সঞ্চয় করে রেখেছিলেন, স্বামীকে খেতে দিলেন। তাই খেয়ে তিনি প্রারব্ধ যজ্ঞে গমন করলেন এবং ইতোমধ্যে রাজা যে পুরোহিতদের যজ্ঞকর্মে নিযুক্ত করেছিলেন উষস্তি তাঁদের প্রত্যেককে জ্ঞান-দ্বন্দ্বে আহ্বান করলেন। অনন্তর যজমান তাঁকে বললেন, ‘আমি আপনাকে জানতে ইচ্ছা করি।’ উষস্তি বললেন, ‘আমি উষস্তি চাক্রায়ণ।’ যজমান বললেন, ‘এই সমুদয় ঋত্বিক-কর্মের জন্য আমি সর্বত্র আপনার অন্বেষণ করেছিলাম; আপনার সন্ধান পাই নি বলেই অন্য সমুদয় লোককে বরণ করেছিলাম। আপনিই আমার সমস্ত ঋত্বিক-কার্যের ভার গ্রহণ করুন। উষস্তি বললেন, ‘তাই হোক। এখন এরাই আমার অনুমতিতে স্তুতিগান করুক। আপনি এদের যে-পরিমাণ অর্থ দেবেন আমাকেও সেই পরিমাণ অর্থ দেবেন।’ যজমান বললেন, ‘তাই দেব।’


কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, যজমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের সঙ্গে এই চিত্রের সঙ্গতি নেই। যজ + শানচ্ = যজমান। এখানে আত্মনেপদ (শানচ্) ব্যবহৃত হয়েছে। এই আত্মনেপদ (শানচ্) ব্যবহারের ইঙ্গিত কী? ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে–

‘স্বরিতঞিতঃ কর্ত্রভিপ্রায়ে ক্রিয়াফলে’। (পাণিনি-সূত্র-১/৩/৭২)
অর্থাৎ : ক্রিয়ার ফল যখন কর্তার অভিপ্রায় সিদ্ধ করে তখন ধাতুর আত্মনেপদ হয় এবং অতএব আত্মনেপদ (শানচ্) ব্যবহৃত হয়।


অতএব, যজমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো, যিনি নিজের উদ্দেশ্য-সিদ্ধির জন্য যজ্ঞকর্ম করেন। তাহলে যজমান শব্দটিকে আমরা বাস্তবভাবে যে অর্থে নিযুক্ত হতে দেখি তার সঙ্গে এর তফাত কোথায়? সেখানেও অর্থাৎ উত্তরকালেও যজমানই যজ্ঞ-ফলভোগী; কিন্তু তিনি যজ্ঞ-সম্পাদনায় অংশগ্রহণ করছেন না– তার পরিবর্তে অর্থব্যয় করে পেশাদার যজ্ঞ-সম্পাদনকারী পুরোহিত নিযুক্ত করছেন। স্বভাবতই অনুমান হয়, যজমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থটির মধ্যে সেই সুপ্রাচীন কালের স্মৃতি টিকে থেকেছে, যখন যজমান অর্থব্যয় করে পুরোহিত নিয়োগের পরিবর্তে নিজেই যজ্ঞকর্ম সম্পাদন করতেন। কিন্তু এ-অনুমানের সমর্থনে বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য পাওয়া যায় কি?

ঋগ্বেদের বহু দৃষ্টান্তে দেখা যায়, সোমসবন, হবিঃ-প্রদান প্রভৃতি যজ্ঞকর্মের নানা সুবিখ্যাত অঙ্গ যজমানের উপরই ন্যস্ত হয়েছে। যজমান হবিসমূহের দ্বারা (আয়ু) শাসন করেন (ঋক-১/২৪/১১); কর্মনির্বাহক নররূপ যজমানগণ কর্তৃক প্রদত্ত হবিযুক্ত অন্ন শোভন অন্নের ইচ্ছায় ইন্দ্র ভক্ষণ করেন (ঋক-১/১৩৮/৪); হে ইন্দ্র, তুমি সোমসবনকারী যজমানকে তোমার প্রভূত ধন সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়ে থাকো (ঋক-১/৮১/২); ইত্যাদি ইত্যাদি। যেমন–

ঈলে চ ত্বা যজমানো হবির্ভিরীলে সখিত্বং সুমতিং নিকামঃ।
দেবৈরবো মিমীহি সংজরিত্রে রক্ষা চ নো দম্যেভিরনীকৈঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/১/১৫)।
অধি দ্বয়োরদধা উক্থ্যং বচো যতস্রুচা মিথুনা যা সপর্যতঃ।
অসংযত্তো ব্রতে তে ক্ষেতি পুষ্যতি ভদ্রা শক্তি র্যজমানায় সুন্বতে।। (ঋগ্বেদ-১/৮৩/৩)।
তত্ত্বা যামি ব্রহ্মণা বন্দমানস্তদা শাস্তে যজমানো হবির্ভিঃ।
অহেলমানো বরুণেহ বোধ্যুরূশংস মা ন আয়ুঃ প্র মোষীঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৪/১১)।
অর্থাৎ :
(হে অগ্নি!) যজমান আমরা হব্যদ্বারা তোমার স্তুতি করছি, সম্যক্ বুদ্ধি লাভ করবার অভিলাষে তোমার সাথে বন্ধুত্ব প্রার্থনা করছি। তুমি দেবতাগণের সাথে স্তুতিকারী আমাদের পশু প্রভৃতি রক্ষা কর ও দুর্দমনীয় তেজদ্বারা আমাদেরর রক্ষা কর। (ঋক-৩/১/১৫)।।  যে হব্য ও ধান্য যজ্ঞপাত্রে তোমাকে অর্পিত হয়েছে, হে ইন্দ্র! তুমি তাতে মন্ত্রবচন সংযুক্ত করেছ। যজমান যুদ্ধে গমন না করে তোমার কার্যে রত থাকে এবং পুষ্টিলাভ করে, কেননা সোমাভিষবদাতা উৎকৃষ্ট বল লাভ করে। (ঋক-১/৮৩/৩)।।  আমি স্তোত্র দ্বারা স্তব করে তোমার নিকট সে পরমায়ু যাচ্ঞা করি, যজমান হব্যদ্বারা তাই প্রার্থনা করে। হে বরুণ! তুমি এ বিষয়ে অনাদর না করে মনোযোগ কর, তুমি বহুলোকের স্তুতিভাজন, আমার আয়ু নিও না। (ঋক-১/২৪/১১)।।


কিন্তু তার মানে এই নয় যে ঋগ্বেদের সর্বত্রই যজমান এইভাবে যজ্ঞকর্মে অংশগ্রহণকারী বলে বর্ণিত। নানান দৃষ্টান্তে যজমান এবং যজ্ঞ-সম্পাদনকারী পুরোহিতদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যের সূচনাও দেখা যায়। যেমন–

বি জানীহ্যার্যানো চ দস্যবো বর্হিষ্মতে রন্ধয়া শাসদব্রতান্ ।
শাকী ভব যজমানস্য চোদিতা বিশ্বেত্তা তে সধমাদেষু চাকন।। (ঋগ্বেদ-১/৫১/৮)।
শংসাবাধ্বর্যো প্রতি মে গৃণীহীন্দ্রায় বাহঃ কৃণবাব জুষ্টম্ ।
এদং বহি য জমানস্য সীদাথা চ ভূদুক্থমিন্দ্রায় শস্তম্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/৫৩/৩)।
সুতম্ভরো যজমানস্য সৎপতির্বিশ্বাসামুধঃ স ধিয়ামুদঞ্চনঃ।
ভরদ্ধেনূ রসবচ্ছিশ্রিয়ে পয়োহনুব্রুবাণো অধ্যেতি ন স্বপন্ ।। (ঋগ্বেদ-৫/৪৪/১৩)।
অর্থাৎ :
হে ইন্দ্র! কারা আর্য এবং কারা দস্যু তা অবগত হও। কুশযুক্ত যজ্ঞের বিরোধীদের শাসন করে বশীভূত কর। তুমি শক্তিমান, অতএব যজ্ঞ-সম্পাদকদের সহায় হও। আমি তোমার হর্ষজনক যজ্ঞে তোমার সেই কর্ম প্রশংসা করতে ইচ্ছা করি। (ঋক-১/৫১/৮)।।  হে অধ্বর্যু ! আমরা দুজনে স্তুতি করবো, তুমি আমাকে উত্তর দান কর। তুমি যজমানের কুশের উপর উপবেশন কর। ইন্দ্রের উদ্দেশে উক্থ প্রশস্ত হোক। (ঋক-৩/৫৩/৩)।।  সন্তম্ভর যজ্ঞের হোতা হয়ে সমস্ত যজ্ঞকার্য উর্ধ্বে উন্নীত করছেন। ধেনু সুরস দুগ্ধ প্রদান করছে, ঐ দুগ্ধ বিতরিত হচ্ছে, এ সমস্ত ক্রমানুসারে ঘোষণা করে অবৎসার নিদ্রা পরিত্যাগ পূর্বক অধ্যয়ন করছেন। (ঋক-৫/৪৪/১৩)।।


এ-জাতীয় আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যায়। কিন্তু আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ঋগ্বেদের এক জায়গায় দেখা যাচ্ছে জনৈক কবি বলছেন, অসিক্লী-তীরে যজমানই যেন হোতা–

অসিক্ল্যাং যজমানো ন হোতা।। (ঋগ্বেদ-৪/১৭/১৫)।
অর্থাৎ : অসিক্লী-তীরে যজমানই যেন হোতা।


এখানে ‘ন’ বা যেন শব্দের ব্যবহার চিত্তাকর্ষক। এতে বেদবিদ গবেষকরা অনুমান করেন, বৈদিক মানুষদের মধ্যেও সর্বত্রই যজমান এবং পুরোহিতের পার্থক্য একই সঙ্গে সমান প্রকট হয়নি। কবির নিজের অভিজ্ঞতায় যজমান এবং হোতার মধ্যে প্রভেদ সুস্পষ্ট হলেও অসিক্লী (বা চেনাব্ নদীর) তীরবর্তীদের মধ্যে তখনো প্রাচীন প্রথাটি টিকে থেকেছে। যজমান এবং পুরোহিতের মধ্যে এইভাবে পার্থক্য ওঠার ফলে যজ্ঞকর্মের বাস্তব দায়িত্বমুক্ত যজমানটিকে শেষ পর্যন্ত শুধু নিশ্চেষ্টই নয়, সম্বিৎহীন বা চেতনাহীন ব্যক্তিমাত্রে পরিণত হতে দেখা যায়। ঋগ্বেদে বলা হচ্ছে–

যমৃত্বিজো বহুধা কল্পয়ন্তঃ সচেতসো যজ্ঞমিমং বহন্তি।
যো অনূচানো ব্রাহ্মণো যুক্ত আসীৎকা স্বিত্তত্র যজমানস্য সম্বিৎ।। (ঋগ্বেদ-৮/৫৮/১)।
অর্থাৎ :
যাঁকে বহুরূপে কল্পনা করে ঋত্বিকগণ এই যজ্ঞকে সচেতনভাবে বহন করে থাকেন বা সম্পাদন করেন এবং যিনি বেদবিদ্যাপারঙ্গম ব্রাহ্মণ দ্বারা যুক্ত– সেখানে আর যজমানের জ্ঞান বা চেতনার কী প্রয়োজন? (ঋক-৮/৫৮/১)।।


এই ঋকটি ঋগ্বেদের বালখিল্য সূক্তের অন্তর্গত। এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন,– ‘অষ্টম মণ্ডলের কয়েকটি সূক্তকে বালখিল্য আখ্যা দেওয়া হয়; এগুলি এমনই অর্বাচীন যে সায়ণাচার্যও ঋগ্বেদ-ভাষ্যে এগুলিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু অমন অর্বাচীন বলেই এই ঋকটির সাক্ষ্য আমাদের বর্তমান যুক্তির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ : এখানে যজমানকে যে-ভাবে যজ্ঞ-ব্যাপারে অজ্ঞ ও সম্বিতহীন বলে কল্পনা করা হয়েছে তার সঙ্গে পূর্বোক্ত ঋকগুলির তুলনা করলে বোঝা যায় যে, যজমানের ভূমিকায় ইতিমধ্যে অনেক তফাত হয়ে গিয়েছে।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৬০০)
এবং আমাদেরকে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, উত্তরকালের সাহিত্যে আমরা বৈদিক যজ্ঞের যে-রূপ দেখছি, তা-ই যজ্ঞের আদিরূপ নয় এবং এই রূপ-পরিবর্তন বলতে শুধুমাত্র এটুকু বোঝায় না যে, কালক্রমে যজ্ঞ অত্যন্ত জটিল ও পল্লবিত হয়েছিলো; তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, পরবর্তীকালে যজ্ঞের উদ্দেশ্য এবং চরিত্রও মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। যজমান শব্দটির উপরিউল্লিখিত বিভিন্ন দৃষ্টান্ত ও সাক্ষ্য থেকে প্রাপ্ত– যজমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এবং বাস্তব অর্থের মধ্যে যে-বিরোধ– তার ইঙ্গিত থেকে এটা অনুমান করা অযৌক্তিক হবে না যে, অধ্যাত্মবাদের আবির্ভাব এই মৌলিক পরিবর্তনেরই পরিণাম।

.
এই যে বৈদিক ইতিহাসে কালক্রমে যজমানের ভূমিকায় ব্যাপক পরিবর্তন, সেই পরিবর্তনের আর একটি দিক বিচার করা যেতে পারে। যেমন, ঋগ্বেদের নানা জায়গায় শুধু যজমান শব্দ বহুবচনে প্রযুক্ত তাই নয়, এই যজমানগণ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভেদ সুস্পষ্ট নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ–

যজিষ্ঠং ত্বা যজমানা হুবেম জ্যেষ্ঠমঙ্গিরসাং
বিপ্র মন্মাভির্বিপ্রেভিঃ শুক্র মন্মভিঃ।
পরিজমানমিব দ্যাং হোতারং চর্ষণীনাম্ ।
শোচিষ্কেশং বৃষণং যমিমা বিশঃ প্রাবন্তু জুতয়ে বিশঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১২৭/২)।
মা তে হরী বৃষণা বীতপৃষ্ঠা নি রীরমন্ যজমানাসো অন্যে।
অত্যায়াহি শশ্বতো বয়ং তে অরং সুতেভিঃ কৃণবাম সোমৈঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/৩৫/৫)।।
অর্থাৎ :
হে অগ্নি! যজনীয়দের শ্রেষ্ঠ তোমাকে আমরা যজমানগণ আহ্বান করি। হে অঙ্গিরাগণের জ্যেষ্ঠ বিপ্র! জ্বালাময় জনন ও মন্ত্রসমূহের দ্বারা, সূর্যের ন্যায় চতুর্দিকে গমনকারী, হে মনুষ্যগণের মুখপাত্র, তোমাকে সেই স্বর্গে প্রবেশকামী যজমানগণ প্রীত করুক; হে জ্বালাময় কেশযুক্ত অগ্নি, তুমি অভীষ্টবর্ষী। (ঋক-১/১২৭/২)।।  হে ইন্দ্র! তোমার কোমল পৃষ্ঠযুক্ত অশ্ব দুটি অন্য যজমানদের প্রীতির কারণ যেন না হয়; তাদের অতিক্রম করে তুমি এস, আমরা তোমার রথের অরদণ্ডগুলিকে অভিষুত সোমের দ্বারা মসৃণ করে দেবো। (ঋক-৩/৩৫/৫)।।


দ্রষ্টব্য হলো, যজমান এখানে ব্যক্তিবিশেষ নন; মিত্রযুক্ত ও বহু। তাঁরা নিজেরাই সমবেতভাবে হবিযুক্ত অন্ন প্রদান করছেন– যজ্ঞফল অভিলাষী কোনো এক যজমানের দ্বারা অর্থবিনিময়ে নিযুক্ত হয়ে ঋত্বিকেরা যজ্ঞ করে দিচ্ছেন না। ঋগ্বেদে বহুবচনে এবং নিজেরাই যজ্ঞ-সম্পাদনকারী অর্থে যজমান শব্দের ব্যবহার বিরল নয়; এবং এমন দৃষ্টান্ত প্রচুর রয়েছে। যজমান শব্দের এ-ধরনের ব্যবহার থেকে কি অনুমান করা যায় যে যজ্ঞ বলতে এককালে যৌথ-অনুষ্ঠান বোঝাতো যদিও উত্তরকালে তা বোঝায়নি? উত্তরকালের বৈদিক সাহিত্যের– যজুর্বেদ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থাদির– সাক্ষ্য বিচার করে প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

.
উত্তরকালের বৈদিক-সাহিত্যের সাক্ষ্য :

যজুর্বেদ নামটির মধ্যে অতীত এবং যৌথ-সম্পাদন– উভয়েরই ইঙ্গিত আছে বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন।
যজুঃ + বেদ। যজুঃ = যজ্ + লিট্ উস্, অর্থাৎ, যজ্ঞ করিয়াছিল (বহুবচনে)। এবং আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে যাঁরা বৈদিক যজ্ঞের শুধুমাত্র পরবর্তী রূপটির উপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত করছেন যে যজমান বলতে ধনী ব্যক্তি-বিশেষ ছাড়া কিছুই বোঝা উচিত নয়, এমনকি তাঁরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে সত্র নামের যজ্ঞ এ-কথার ব্যতিক্রম এবং সম্ভবত এই সত্র-যাগের মধ্যে প্রাচীনকালের যৌথ-সম্পাদন প্রথার পরিচয় টিকে থেকেছে। অতএব এখানে এই সত্রযাগের বৈশিষ্ট্য বিচার করা প্রাসঙ্গিক হবে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৬৭)

এই সত্র-যজ্ঞের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য কী? বলা হচ্ছে–

‘সত্রে কর্তা অর্থাৎ যজমান একজন নহে, কিন্তু বহুলোকেই উহার কর্তা। কারণ, ‘আসীরন্, উপেয়ুঃ’ ইত্যাদি পদ সত্রের বিধায়ক। আর উহাতে বহুবচনের প্রয়োগ রহিয়াছে বলিয়া ঐ বিধির দ্বারা যে কর্ম বিহিত হইতেছে তাহার বহুকর্তৃকত্ব একপদশ্রুতি দ্বারা বোধিত হয়।’- (জৈমিনি-সূত্র-১০/৬/৪৬-এর শবরভাষ্য। তর্জমা ভূতনাথ সপ্ততীর্থ)।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বহুবচনের ব্যবহার থেকে বহুব্যক্তির পক্ষে স্বতন্ত্রভাবে সম্পাদনের তাৎপর্য অসম্ভব নয়। উত্তরে বলা হয়েছে,–

‘সত্রে যে কর্তার বহুত্ব অপেক্ষিক, তাহা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির অগ্নিসকলের সন্নিবাপ অর্থাৎ একত্র সমাবেশ হইতেও অবগত হওয়া যায়। …যদি বহু ব্যক্তি সঙ্ঘবদ্ধভাবে অনুষ্ঠান করে তবেই এই প্রকারের সন্নিবাপ-বচন সঙ্গত হয়। ইহা হইতেও জানা যায় যে, সত্রে বহুব্যক্তিরই মিলিতভাবে অধিকার।’- (শবরভাষ্য-১০/৬/৪৯)।

তাছাড়া,–

‘সত্রে যজমান যদি একজনমাত্রই হইত তাহা হইলে শ্রুতি মধ্যে সত্রপ্রকরণে ‘যো বৈ বহুনাং যজমানানাং গৃহপতিঃ’ এইভাবে যজমানের যে বহুত্ব নির্দেশ করা হয়েছে তাহা ব্যর্থ হইয়া পড়িত। …অতএব বহুব্যক্তি সঙ্ঘবদ্ধভাবে সত্রের অধিকারী…।’- (শবরভাষ্য-১০/৬/৫০)।

কিন্তু যজমান-বহুত্ব প্রতিপাদনের পরও প্রশ্ন ওঠে,–

‘সত্রে যজমান ছাড়া অন্য ব্যক্তিরা কি ঋত্বিক (পুরোহিত) হইবে, অথবা, যজমানেরাই ঋত্বিক হইবে?’- (শবরভাষ্য-১০/৬/৫১)।

সিদ্ধান্ত করা হয়েছে,–

‘সত্রে যাহারা যজমান, তাহারাই ঋত্বিক হইবে। কারণ সত্রে ঋত্বিকদিগকে দীক্ষিত করিবার বিধি আছে। আর দীক্ষাপদের অর্থ যজমানের সংস্কার।’- (শবরভাষ্য-১০/৬/৫২)। সংক্ষেপে, ‘সত্রে যাহারা যজমান তাহারাই ঋত্বিক।’- (শবরভাষ্য-১০/৬/৫৩)।


স্বভাবতই এই সত্রযাগে ‘বরণ’ এবং ‘ক্রয় বা পরিক্রয়ের’ প্রশ্ন ওঠে না। ঋত্বিক নিয়োগ করাবার সময়ে তাঁর কাছে যজমানের যে প্রার্থনা তারই নাম ‘বরণ’ : যেমন বরণীয় ভাবী পুরোহিতের কাছে যজমান বলবেন, আমি অমুক যজ্ঞ করবো, তাতে এতো দক্ষিণা দেব, আপনি পুরোহিত হতে সম্মত হোন। এবং–

‘সেই যজ্ঞে দেয় দক্ষিণা নিরূপিত হইলে ব্রাহ্মণ সেই যজ্ঞের কর্মশেষে নিযুক্ত হইবার যোগ্য হন। ইহাকেই ক্রয় বা পরিক্রয় বলা হয়।’। কিন্তু সত্রযাগে ‘বরণ’ বা ‘ক্রয়ের’ কথা ওঠে না। ‘কারণ, সত্রে যাঁহারা যজমান তাঁহারাই ঋত্বিক বলিয়া সত্রের ফল অন্যগামী নহে। আর নিজেকে নিজের কাজে দক্ষিণা দিয়া পরিক্রয় করিতে কাহাকেও কোথাও দেখা যায় না। অতএব সত্রে যেরূপ বরণ করণীয় নহে সেইরূপ পরিক্রয়ও কর্তব্য নহে।’- (শবরভাষ্য-১০/২/৩৫। তর্জমা ভূতনাথ সপ্ততীর্থ)


এখানে দ্রষ্টব্য হলো, ‘যজমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের মধ্যেই বৈদিক যজ্ঞের প্রাক্-ইতিহাস সংক্রান্ত যে-ইঙ্গিত পাওয়া যায়– এবং ঋগ্বেদের নানা দৃষ্টান্তে যে-ইঙ্গিতের সুস্পষ্ট সমর্থন বর্তমান– সত্রযাগের মধ্যেও তারই স্মারক অনুমান করা অসম্ভব নয়; সুদূর অতীতে যজমানগণই যজ্ঞকর্মে অংশগ্রহণ করতেন, তাই যজমান বলতে তখনো ধনী ব্যক্তিবিশেষ নয়, যিনি কিনা অর্থাদি দান করে যজ্ঞসম্পাদনার্থে পেশাদার পুরোহিত নিয়োগ করবেন। বস্তুত, বৈদিক যজ্ঞ অত্যন্ত সুপ্রাচীন,– যদিও যজ্ঞের সেই আদিরূপ ও উত্তররূপ এক নয়।’- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-১৬৮)

যজ্ঞের আদিরূপ ও উত্তররূপ যে এক নয়– একথা আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যেও স্বীকৃত। তাছাড়া এ-বিষয়ে উত্তরকালের বৈদিক ব্রাহ্মণ-সাহিত্যেরই অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য আছে। এক্ষেত্রে আমরা ‘ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে’র সহায়তা নিতে পারি। ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে বারবার কিন্তু একটি কথা পাওয়া যায়, যেমন, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর তর্জমায়–

‘যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন; (দেবগণ) তাঁহাকে ইষ্টিসমূহ দ্বারা অন্বেষণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। যে-হেতু ইষ্টি দ্বারা অন্বেষণ ইচ্ছা করিয়াছিলেন, তজ্জন্যই ইষ্টির ইষ্টিত্ব। (পরে দেবগণ) যজ্ঞকে পাইয়াছিলেন।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-১/২)।।
.
‘যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন; (তখন) সেই দেবগণ কোনও (যজ্ঞাদি) করিতে পারিতেন না এবং জানিতে পারিতেন না। (তৎপরে) তাঁহারা অদিতিকে বলিলেন, তোমার প্রসাদে আমরা এই যজ্ঞকে প্রকৃষ্টরূপে জানিব; তিনি (অদিতি) বলিলেন, তাহাই হউক; (কিন্তু) সেই (আমি অদিতি) তোমাদের নিকট বরপ্রার্থনা করিতেছি। (দেবগণ কহিলেন) প্রার্থনা কর; তিনি (অদিতি) এই বর চাহিলেন– যজ্ঞসকল মৎপ্রায়ণ (আমাকে লইয়া আরব্ধ) হউক এবং মদুদয়ন (আমাকে লইয়া অবসান) হউক। (দেবগণ কহিলেন) তাহাই হইবে।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-১/৭)।।
.
‘যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহারা প্রৈষদ্বারা সেই যজ্ঞকে প্রৈষ (আহ্বান) করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন, তাহাই প্রৈষের প্রৈষত্ব। দেবগণ পুরোরুক্-সমূহ দ্বারা সেই যজ্ঞকে রুচিসম্পন্ন করিয়াছিলেন; পুরোরুক্দ্বারা যজ্ঞের রুচি সম্পাদন করিয়াছিলেন, উহাই পুরোরুকের পুরোরুকত্ব। সেই যজ্ঞকে বেদিতে অনুবেদন (অনুকূল ভাবে লাভ) করিয়াছিলেন; বেদিতে যে অনুবেদন করিয়াছিলেন, তাহাই বেদির বেদিত্ব। সেই যজ্ঞ (বেদিতে) লব্ধ হইলে পর উহাকে গ্রহ দ্বারা (উপাংশু প্রভৃতি দ্বারা) গ্রহণ করিয়াছিলেন; লব্ধ হইলে পর গ্রহ দ্বারা যে গ্রহণ করিয়াছিলেন, উহাই গ্রহ সকলের গ্রহত্ব। তাহাকে লাভ করিয়া নিবিৎসমূহের দ্বারা নিবেদন করিয়ছিলেন; লাভের পর নিবিৎসমূহ দ্বারা নিবেদন করিয়াছিলেন, ইহাই নিবিৎসমূহের নিবিৎত্ব।
নষ্ট দ্রব্য পাইতে ইচ্ছা করিয়া, কেহ বা অধিক পাইতে ইচ্ছা করে, কেহ বা অল্প পাইতে ইচ্ছা করে। উভয়ের মধ্যে যে অধিক পাইতে ইচ্ছা করে, সেই ব্যক্তি উভয়ের মধ্যে ভাল ইচ্ছা করে। সেইরূপ যে-ব্যক্তি এই প্রৈষমন্ত্রসকলকে দীর্ঘ বলিয়া জানে, সেই ব্যক্তি তাহা ভাল জানে; কেননা, এই যে এতদ্বারাই নষ্টযজ্ঞের অন্বেষণ হয়। সেইজন্য (মৈত্রাবরুণ) মাথা নোয়াইয়া দাঁড়াইয়া প্রৈষমন্ত্র পাঠ করিবেন।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-৩/৯)।।


এ-জাতীয় ব্যাখ্যায় এখানে প্রকট কৃত্রিমতা অবশ্যই লক্ষণীয়। তবে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন,– ‘বস্তুত, সমগ্র ব্রাহ্মণ সাহিত্যেই ব্যাখ্যা-প্রচেষ্টা মাত্রই সমজাতীয় কৃত্রিমতার পরিচায়ক। কিন্তু সমস্ত কৃত্রিমতার পিছনের একটি মূল ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তার তাৎপর্য উপেক্ষণীয় নয়। বৈদিক ঐতিহ্যেই কালক্রমে যজ্ঞের আদি রূপটি বিস্মৃত হয়েছিল: ‘যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন’। কিন্তু যজ্ঞের আদি রূপটি বিস্মৃত হলেও তার নানা বৈশিষ্ট্য, নানা আচরণ, উত্তরকালেও প্রথাগতভাবে টিকে থাকাই স্বাভাবিক; স্বভাবতই ব্রাহ্মণ গ্রন্থকারেরা নিজেদের ধ্যানধারণার উপর নির্ভর করে এই বৈশিষ্ট্যগুলিরই ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করবার প্রয়াস করেছিলেন।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৬৯)

তবে এই ব্যাখ্যায় এখানে একটা বিষয় হয়তো স্পষ্ট বোঝানো হচ্ছে যে, যজ্ঞ চলে যাবার ফলে দেবতারা বিচলিত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেবতারা কেন অমন বিচলিত হয়েছিলেন? কেন তাঁরা ফিরে পেতে চেয়েছিলেন সেই অতীত যজ্ঞকে?
‘ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে’রই নানা উক্তি থেকে এ-প্রশ্নের একটি চিত্তাকর্ষক উত্তর পাওয়া যায়– অতীতে যজ্ঞই ছিলো ভক্ষ্য-অন্ন-লাভের উপায়, অতএব যজ্ঞ অন্তর্হিত হওয়া মানেই ভক্ষ্য-অন্ন লাভের সংকট উপস্থিত হওয়া। যেমন ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে আছে–

‘যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে, “আমি তোমাদের অন্ন হইব না”, ইহা বলিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। দেবতারা বলিলেন, “না, তুমি আমাদের অন্নই হইবে”। দেবতারা তাঁহাকে (যজ্ঞকে) হিংসা করিয়াছিলেন। হিংসিত হইয়াও তিনি দেবগণের নিকট (অন্নরূপ) প্রভূত হন নাই। তখন দেবগণ বলিলেন, “এইরূপ হিংসিত হইয়াও ইনি যখন আমাদের অন্ন হইলেন না, অহো, তখন আমরা এই (প্রবর্গ্য) যজ্ঞের সম্ভার (আয়োজন) করিব।” “তাহাই হউক”, বলিয়া তাঁহারা যজ্ঞের সম্ভার করিয়াছিলেন।
সেই যজ্ঞের সম্ভাব করিয়া (দেবতারা) বলিলেন, “হে অশ্বিদ্বয়, (আমাদের কর্তৃক পীড়িত) এই যজ্ঞের চিকিৎসা কর। (কেননা) অশ্বিদ্বয়ই দেবগণের ভিষক্ । (আবার) অশ্বিদ্বয়ই অধ্বর্য্যু; সেইজন্য অধ্বর্য্যুদ্বয় ঘর্মের (প্রবর্গের) সম্ভার আয়োজন করেন।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-১/১৮)।।
.
‘একদা যজ্ঞ ভক্ষ্য-অন্ন সমেত দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন। দেবগণ বলিলেন, “যজ্ঞ ভক্ষ্য-অন্ন সমেত আমাদের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছেন, এই যজ্ঞের অনুসরণ করিয়া আমরা অন্নেরও অন্বেষণ করিব”। তাঁহারা বলিলেন, “কীরূপে অন্বেষণ করিব? ব্রাহ্মণ-দ্বারা ও ছন্দোদ্বারা (অন্বেষণ) করিব”। এই বলিয়া তাঁহারা (যজমানরূপী) ব্রাহ্মণকে ছন্দোদ্বারা দীক্ষিত করিয়াছিলেন ও তাঁহার (দীক্ষণীয়েষ্টি) যজ্ঞকে সমাপ্তি পর্যন্ত বিস্তৃত করিয়াছিলেন; অপিচ (দেব) পত্নীগণের সংযোগ করিয়াছিলেন। সেইহেতু এখনও দীক্ষণীয়া ইষ্টিতে যজ্ঞকে সমাপ্তি পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় ও (দেব-) পত্নীগণেরও সংযোগ করা হয়। (দেবগণ কৃত) সেই কর্মের অনুসরণ করিয়া (মনুষ্যেরাও) তদ্রূপ করিয়া থাকে।
তারপর তাঁহারা প্রায়ণীয় কর্মের বিস্তার করিয়াছিলেন।… (তৎপরে) তাঁহারা আতিথ্য কর্মের বিস্তার করিয়াছিলেন; আতিথ্য দ্বারা তাঁহারা যজ্ঞকে অত্যন্ত নিকটে আনিয়া তাহা অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন।… (তৎপরে) তাঁহারা উপসৎ-সমূহের বিস্তার করিয়াছিলেন; উপসৎসকল দ্বারা সেই যজ্ঞকে অত্যন্ত নিকটে আনিয়া অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন।… এইরূপে উত্তরোত্তর সারবান্ কর্মের অনুষ্ঠান দ্বারা দেবগণ সেই যজ্ঞকে পাইয়াছিলেন…
সেই যজ্ঞকে পাইয়া দেবগণ বলিলেন, “(অহে যজ্ঞ), তুমি আমাদের ভক্ষণীয় অন্নের জন্য অবস্থান কর”। যজ্ঞ বলিলেন, “না। কেন আমি তোমাদের জন্য অবস্থান করিব?” এই বলিয়া যজ্ঞ দেবগণের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করিলেন। দেবগণ তাঁহাকে বলিলেন, “ব্রাহ্মণদ্বারা ও ছন্দোদ্বারা সংযুক্ত হইয়া তুমি ভক্ষণীয় অন্নের জন্য অবস্থিতি কর”। (যজ্ঞ বলিলেন), “তাহাই হইবে”। সেইহেতু অদ্যপি যজ্ঞ ব্রাহ্মণদ্বারা ও ছন্দোদ্বারা সংযুক্ত হইয়া দেবগণের নিকট হব্য বহন করিয়া থাকেন।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-৩/৪৫)।।


উপরিউক্ত উদ্ধৃতিগুলির মধ্যে অন্তত দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট বলে দেবীপ্রসাদ মনে করেন। তাঁর মতে,– ‘প্রথমত, বৈদিক ঐতিহ্যেই কালক্রমে সুপ্রাচীন যজ্ঞের রূপটি বিস্মৃত হয়েছিল এবং উত্তরকালে তারই পুনর্গঠন প্রয়াস দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, যজ্ঞের আদি রূপটিও ভক্ষ্য অন্ন লাভের উপায় বলেই বিবেচিত ছিল : যা চলে গেলে ভক্ষ্য অন্নও চলে যায়, যাকে ফিরে পাবার মধ্যেই ভক্ষ্য অন্নকে ফিরে পাবার পরিকল্পনা, তাকে অন্ন লাভের কোন এক উপায় ছাড়া আর কী মনে করা যেতে পারে? প্রসঙ্গত, উদ্ধৃত উক্তিগুলিতে যজ্ঞের আদি-রূপ সংক্রান্ত যেটুকু আভাস পাওয়া যায় তার মধ্যে এ-ইঙ্গিতও নেই যে যজ্ঞ জনৈক ধনী যজমানের ব্যক্তি-স্বার্থ চরিতার্থতার উদ্দেশে অনুষ্ঠিত এবং এ-অনুষ্ঠানের বাস্তব দায়িত্ব পেশাদার পুরোহিত শ্রেণীর উপর। বস্তুত, এই পুরোহিত শ্রেণীর সঙ্গে যজ্ঞের সম্পর্ক যে উত্তরকালেই উদ্ভাবন সে-বিষয়েও ঐতরেয় ব্রাহ্মণেই সুস্পষ্ট স্বীকৃতি চোখে পড়ে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৭০)

এই স্বীকৃতি কীরকম? ঐতরেয় ব্রাহ্মণেই বলা হচ্ছে (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর তর্জমায়)–

‘প্রজাপতি যজ্ঞের সৃষ্টি করিয়াছিলেন; যজ্ঞ সৃষ্টির পর ব্রহ্ম ও ক্ষত্রের সৃষ্টি করিলেন এবং ব্রহ্মক্ষত্রের পর এই দ্বিবিধ প্রজার সৃষ্টি করিলেন। ব্রহ্মের অনুরূপ হুতাদ এবং ক্ষত্রের অনুরূপ অহুতাদ সৃষ্টি করিলেন। এই যে ব্রাহ্মণগণ, ইঁহারাই হুতাদ (হুতশেষভোজী) প্রজা; আর রাজন্য, বৈশ্য ও শূদ্র, ইঁহারাই অহুতাদ। যজ্ঞ তাঁহাদের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিল; ব্রহ্ম ও ক্ষত্র যজ্ঞের অনুগমন করিয়াছিলেন। ব্রহ্মের যেসকল আয়ুধ, তাহার সহিত ব্রহ্ম এবং ক্ষত্রের যেসকল আয়ুধ তাহার সহিত ক্ষত্র,– তাহার অনুগমন করিয়াছিলেন। যজ্ঞের যে-সকল আয়ুধ– তাহাই ব্রহ্মের আয়ুধ; আর অশ্বযুক্ত রথ, কবচ ও বাণযুক্ত ধনু,– ইহাই ক্ষত্রের আয়ুধ। ক্ষত্রের আয়ুধে ভয় পাইয়া যজ্ঞ না ফিরিয়া পালাইতে লাগিল; ক্ষত্র তাহাকে ধরিতে না পাইয়া ফিরিয়া আসিলেন। ব্রহ্ম তাহার অনুসরণ করিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন ও তৎপরে তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া তাহার গতি (পথ) রোধ করিলেন। এইরূপে (পথ) রুদ্ধ হইলে যজ্ঞ দাঁড়াইল এবং ব্রহ্মের নিকট আপনারই আয়ুধসকল দেখিয়া তাঁহার নিকট উপস্থিত হইল। সেই হেতু অদ্যপি যজ্ঞ ব্রহ্মস্বরূপ ব্রাহ্মণেই প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে।
তখন ক্ষত্র সেই ব্রহ্মের অনুগমন করিয়া তাহাকে বলিলেন, “ আমাকে এই যজ্ঞে আহ্বান কর”। ব্রহ্ম বলিলেন, “আচ্ছা, তাহাই হইবে; কিন্তু তুমি আপনার আয়ুধসকল ফেলিয়া দিয়া ব্রহ্মের আয়ুধ লইয়া ব্রহ্মের রূপ ধরিয়া ব্রহ্মসদৃশ হইয়া যজ্ঞের নিকট উপস্থিত হও”। “তাহাই হউক”, বলিয়া ক্ষত্র আপন আয়ুধ ফেলিয়া ব্রহ্মের আয়ুধ গ্রহণ করিয়া ব্রহ্মের রূপ ধরিয়া ব্রহ্মসদৃশ হইয়া যজ্ঞের নিকট উপস্থিত হইলেন। সেই হেতু অদ্যপি ক্ষত্রিয় যজমান আপন আয়ুধ ফেলিয়া ব্রহ্মের আয়ুধ গ্রহণ করিয়া ব্রহ্মের রূপ ধরিয়া ব্রহ্মসদৃশ হইয়া যজ্ঞের নিকট উপস্থিত হন।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-৭/১৯)


মনে রাখা দরকার, পরবর্তী কালের ব্যক্তি-যজমান বলতে ক্ষত্রিয়ই। উপনিষদেই এ-কথার বহু নজির আছে, এবং আমরা ইতঃপূর্বে তা কিছু কিছু দৃষ্টান্তে দেখেছিও। কিন্তু ঐতরেয় ব্রাহ্মণের উপরোদ্ধৃত উক্তি থেকে স্পষ্টই অনুমান হয়, ব্রাহ্মণের পৌরোহিত্যের মতোই ক্ষত্রিয়ের যজমানত্ব বৈদিক যজ্ঞের আদি পর্যায়ের পরিচায়ক নয়। বস্তুত, বৈদিক সমাজে সুস্পষ্ট রাজশক্তির– এবং অতএব রাজশক্তির অধিকারী ক্ষত্রিয়শ্রেণীর– আবির্ভাব ‘ব্রাহ্মণে’র যুগেই প্রকট হয়েছে; এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বান গবেষকেরা বিভিন্নভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
তবে পরবর্তী যুগে পুনর্গঠিত ওই যজ্ঞের সঙ্গে শ্রেণীসমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ‘ঐরতেয়-ব্রাহ্মণে’র সামাজিক পটভূমিতে কীভাবে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র প্রভৃতি বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিভেদাদি প্রকট হয়ে পড়েছিলো তারও কিছু দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা বোধকরি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যেমন, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর তর্জমায়)–

‘ব্রহ্ম ক্ষত্রের পূর্ববর্তী; ব্রহ্ম পূর্ববর্তী থাকিলে ক্ষত্রিয় যজমানের রাষ্ট্রও উগ্র হইয়া অন্যের নিকট ব্যথা পায় না।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ, ৪৬৭)
‘ক্ষত্র নিশ্চয়ই ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত এবং ব্রহ্মও ক্ষত্রে প্রতিষ্ঠিত।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ, ৪৬৯)
‘ব্রহ্ম ক্ষত্রের পূর্ববর্তী; ব্রহ্ম পূর্বে থাকিলে যজমানের রাষ্ট্র উগ্র হইবে না এবং অপরের নিকট ব্যথা পাইবে না। সপ্তদশ স্তোম বৈশ্যস্বরূপ এবং একবিংশ স্তোম শূদ্রবর্ণের অনুরূপ। এতদ্বারা বৈশ্যকে ও শূদ্রবর্ণকে ক্ষত্রিয়ের বর্ত্মানুগামী করা হয়।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ, ৪৭০-১)


ঐতরেয় ব্রাহ্মণের যুগে যে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেছিলো, এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানেরা অবশ্যই নিঃসন্দেহ বলেই মনে হয়, যদিও সেগুলি খণ্ড ও সীমাবদ্ধ রাষ্ট্রমাত্র। কিন্তু এই রাষ্ট্রশক্তি যে প্রাক্-বিভক্ত প্রাচীন সমাজের ধ্বংসস্তুপের উপরই আবির্ভূত হয়– এ-বিষয়টি স্বীকার না করলে বৈদিক যজ্ঞের ইতিহাসটুকুও আমাদের কাছে অস্পষ্টই থেকে যাবে। তাই দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘আমাদের যুক্তি অনুসারে, বৈদিক সমাজে রাষ্ট্রশক্তির এই আবির্ভাব এবং বৈদিক যজ্ঞের উপরোক্ত রূপান্তর, উভয়ই হলো বৈদিক মানুষদের জীবনে একটি মূল পরিবর্তনের দ্বিবিধ পরিণাম। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের রচনাকালে এই মূল পরিবর্তনটি প্রকট হয়েছিলো, কেননা ঐতরেয় ব্রাহ্মণে আমরা ওই দ্বিবিধ পরিণামেরই সুস্পষ্ট পরিচয় পাই।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৬০৫)

দেবীপ্রসাদের প্রতিধ্বনি করেই বলতে পারি, ঋগ্বেদের সাক্ষ্য অনুসারে অনুমান করা যায়, অতীতে বৈদিক মানুষেরাও সমাজ-বিকাশের প্রাক্-বিভক্ত পর্যায়ে– আদিম সাম্যাবস্থায়– জীবন-যাপন করতেন। তখনো তাঁরা লেখার হরফ আবিষ্কার করেননি; মুখেমুখে গান রচনা করতেন। পার্থিব সুখ-সম্পদের কামনাই সে-গানের প্রাণবস্তু। এ-সম্পদ কিন্তু একার জন্য নয়– সকলের জন্য, সমষ্টির জন্য– ‘আমার’ নিজের জন্য চাওয়া নয়, ‘আমাদের’ সকলের জন্য চাওয়া। এবং এ-সম্পদ কারুর একার নয় বলেই তাতে সকলের সমান অধিকার– সমান অংশ, সমান ভাগ, সমান ভগ। অতএব এ-পর্যায়ে সমবণ্টন বা অংশবণ্টনের প্রসঙ্গও স্বাভাবিক। কোথাও কোথাও দেখা যায় মানুষেরা নিজেরাই অংশবণ্টনের কাজে ব্যাপৃত হয়েছেন; কিন্তু প্রধানত দেবতাদের উপরই তার দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু বৈদিক দেবতাদের তখনো আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে দেবত্বপ্রাপ্তি ঘটেনি। তাই প্রায়ই তাঁদের ‘সখা’ বলে এবং কখনো বা ‘নরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং আদিম সাম্যসমাজের পরিচায়ক হিসেবে শুধুই যে ঋগ্বেদের মানুষেরাই পরস্পরের সঙ্গে সমান তাই নয়, দেবতারাও পরস্পরের সঙ্গে সমান; এমনকি অতীতে দেবতারাও যে মানুষের সঙ্গে সমান ছিলেন বা মানুষেরাও দেবতাদের সঙ্গে সমান হয়েছিলেন– তার স্মৃতিটুকুও ঋগ্বেদ থেকে বিলুপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, দেবতারাও মানুষের মতো সচেতনভাবে একত্র তাঁদের ভাগ গ্রহণ করতেন এবং সভায় গমন করতেন। কিন্তু এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, এই সভা বা বিদথই ছিলো ধন-বিভাগ বা অংশ-বণ্টনের স্থান। অতএব ঋগ্বেদের অন্তত প্রাচীনতর অংশগুলিতে রাষ্ট্রশাসনের উল্লেখ অস্বাভাবিক হবে। এবং সে-উল্লেখ দেখা যায় না।
অন্যদিকে, ঋগ্বেদোত্তর সাহিত্যে সভা, সমিতি ও বিদথের এই অতীত গৌরব ম্লান হয়েছে এবং মহাভারত ইত্যাদি পুরাণে তা বিলুপ্ত। কিন্তু তার মাঝামাঝি ঐতরেয় ব্রাহ্মণে দেখা যায়, সভা-সমিতির মহিমার পরিবর্তে জেগে উঠছে ব্রহ্ম-সমর্থিত ও ক্ষত্র-শাসিত রাষ্ট্রশক্তির মহিমা। এ-রাষ্ট্রের উদ্ভব হলো কী করে? ঐতিহাসিক বিবর্তনের সাধারণ নিয়ম হিসেবে আমরা জানি, জ্ঞাতিভিত্তিক প্রাক্-বিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তুপের উপরই রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। এই নিয়মে বৈদিক মানুষদেরও প্রাক্-বিভক্ত প্রাচীন জ্ঞাতিভিত্তিক সমাজ কালক্রমে ভেঙে গিয়েছিলো এবং তারই ধ্বংসস্তুপের উপর আবির্ভূত হয়েছিলো শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। ‘ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে’র পরিভাষায় নবপর্যায়ের শাসক-শ্রেণী বলতে প্রধানতই ক্ষত্র এবং শাসন-যন্ত্রের নাম রাষ্ট্র– যদিও ওই ক্ষত্র ব্রহ্ম-সমর্থিত বা ব্রাহ্মণ-সমর্থিত।

বৈদিক মানুষদের জীবনে এই মৌলিক পরিবর্তনটিরই আর-এক পরিণাম হলো বৈদিক যজ্ঞের রূপান্তর। সে-রূপান্তরের মূল কথা কী? সংক্ষেপে, অতীতে অনুষ্ঠান-নির্ভরতা সত্ত্বেও যা ছিলো লোকায়তিক কামনা-চরিতার্থতার– অন্ন-লাভের– যৌথ পদ্ধতি, কালক্রমে তা শুধুই যে লোকোত্তরের কল্পনায় অনুষ্ঠান-মাত্রে পরিণত হলো তাই নয়, সামগ্রিক স্বার্থ থেকে বিচ্যুত হয়ে ব্যক্তি-বিশেষের স্বার্থে নিযুক্ত বলেও কল্পিত হলো। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, ব্রাহ্মণ-সাহিত্য রচনার যুগেই ক্ষত্রিয়শ্রেণীর এই রাজশক্তির বা রাষ্ট্রশক্তির পাশাপাশিই ব্রাহ্মণশ্রেণীর অধ্যাত্মশক্তি বা পৌরোহিত্য শক্তি সুস্পষ্টভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এবং উত্তরকালের বৈদিক সমাজের শাসন-শক্তি বলতে এই দ্বিবিধ শক্তির মধ্যে আপোসও, অর্থাৎ পরস্পর-সমর্থিত। এ-বিষয়ে ঐতরেয় ব্রাহ্মণেরই ইঙ্গিত উদ্ধৃত করা যেতে পারে। বিনষ্ট বা বিস্মৃত (অতীত) যজ্ঞের পুনঃপ্রাপ্তি প্রসঙ্গেই ‘ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে’ উক্ত হয়েছে (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর তর্জমায়)–

‘এবিষয়ে আরাঢ়ের পুত্র সৌজাত বলিয়াছিলেন, এই যে দুই আহুতির বিষয় বলিতেছি, ইহা অজিতপুনর্বণ্য, অর্থাৎ নষ্ট বস্তুর প্রাপ্তিহেতু। যে যজমান সেই সৌজাতের কথিত অনুশাসন পালন করিতে চাহেন, তিনি যাহা কামনা করেন তদুদ্দেশে ঐরূপ করিবেন। তিনি এই দুই আহুতি দিবেন:– “ব্রহ্ম প্রপদ্যে ব্রহ্ম মা ক্ষত্রাদ্ গোপায়তু ব্রহ্মণে স্বাহা”– এই হোমমন্ত্রের তাৎপর্য এই যে, যে যজমান যজ্ঞ আরম্ভ করে সে ব্রহ্মেরই শরণ লয়; কেননা যজ্ঞ ব্রহ্মস্বরূপ; যে দীক্ষিত হয় সে যজ্ঞ হইতেই পুনর্জন্ম গ্রহণ করে; ব্রহ্মের শরণাপন্ন সেই যজমানকে ক্ষত্র হিংসা করিতে পারে না। আর “ব্রহ্ম মা ক্ষত্রাদ্ গোপায়তু”– এই মন্ত্রাংশ বলিলে ব্রহ্ম সেই যজমানকে ক্ষত্র হইতে রক্ষা করেন। “ব্রহ্মণে স্বাহা”– বলিলে ব্রহ্মকে প্রীত করা হয়; ব্রহ্ম প্রীত হইয়া তাহাকে ক্ষত্র হইতে রক্ষা করেন।
অপিচ অনুবন্ধ্য পশুর সমিষ্ঠযজুর্মন্ত্রপাঠের পর “ক্ষত্রং প্রপদ্যে ক্ষত্রং মা ব্রহ্মণো গোপায়তু ক্ষত্রায় স্বাহা”– এই মন্ত্রে আহুতি দিবে। ইহার তাৎপর্য এই যে, যে ব্যক্তি রাষ্ট্র লাভ করে, সে ক্ষত্রে শরণ লয়; রাষ্ট্রই ক্ষত্রস্বরূপ; ক্ষত্রের শরণাপন্ন সেই যজমানকে ব্রহ্ম হিংসা করিতে পারেন না। আর ক্ষত্র তাহাকে ব্রহ্ম হইতে রক্ষা করিবে, এই উদ্দেশে “ক্ষত্রং মা ব্রহ্মণো গোপায়তু”– বলা হয়; আর “ক্ষত্রায় স্বাহা”– বলিলে ক্ষত্রকে প্রীত করা হয়; ক্ষত্র প্রীত হইয়া তাহাকে ব্রহ্ম হইতে রক্ষা করেন।
এই যে আহুতিদ্বয়, ইহাই ক্ষত্রিয় যজমানের পক্ষে ইষ্টপূর্তের অবিনাশহেতু; অতএব এই দুই আহুতিই হোম করিবে।’- (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-৭/২২)।।


নষ্ট বা বিস্মৃত যজ্ঞের পুনঃপ্রাপ্তি বা পুনর্গঠন প্রসঙ্গে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের এই উক্তিগুলির মধ্যে বৈদিক যজ্ঞের উত্তররূপ বা রূপান্তর বোঝবার মূল-সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন। ‘ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের– ব্রহ্মশক্তির ও ক্ষত্রশক্তির– এক সুস্পষ্ট আপোসের উপরই যজ্ঞের উত্তর-রূপটি প্রতিষ্ঠিত। তাই উত্তরকালের যজ্ঞে যজমান বলতে সাধারণত জনৈক ধনী ক্ষত্রিয় বা রাজাই; যজ্ঞ ফলের অধিকারী বলতে তিনিই, কিন্তু যজ্ঞকর্ম সম্পাদনার বাস্তব দায়িত্ব তাঁর নয়; এই উদ্দেশে যজমান ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের ‘বরণ’ করবেন এবং সেই যজ্ঞে দেয় দক্ষিণা নিরূপিত করবেন বা ‘ক্রয়’ করবেন। কিন্তু ঐতরেয় ব্রাহ্মণের স্বীকৃতি অনুসারেই যজ্ঞের আদিরূপটি বৈদিক সমাজে ব্রহ্মশক্তি ও ক্ষত্রশক্তি আবির্ভাবের চেয়েও অনেক প্রাচীন– ‘প্রজাপতি যজ্ঞের সৃষ্টি করিয়াছিলেন, যজ্ঞসৃষ্টির পর ব্রহ্ম ও ক্ষত্রের সৃষ্টি করিলেন।… যজ্ঞ তাঁহাদের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিল; ব্রহ্ম ও ক্ষত্র যজ্ঞের অনুসরণ করিয়াছিলেন।’ ইত্যাদি। এবং শেষপর্যন্ত লুপ্ত যজ্ঞের যে-রূপটি পুনর্গঠিত হলো তা সুস্পষ্টভাবেই ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়-শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এইভাবে শ্রেণী-স্বার্থ জড়িত হয়ে উত্তরকালে যজ্ঞের প্রকৃতিতে নানা পরিবর্তন ঘটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো,– যজ্ঞের সেই অতীত বা আদি-রূপ বলতে কী ছিলো এবং কেমন করেই বা আমরা তার সাধারণ পরিচয় জানতে পারি? এর উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে হয়তো আদিম-পর্যায়ের মানুষদের জাদু-বিশ্বাসের আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

.
বৈদিক যজ্ঞকর্ম ও মানুষের আদিম জাদু-অনুষ্ঠান :

বৈদিক যজ্ঞের উত্তর-রূপে পরিবর্তনের পর্যায়ের আগে যে যজ্ঞের একটি আদিরূপ ছিলো সে সম্বন্ধে ঋগ্বেদের উত্তরকালের যজুর্বেদ ও ব্রাহ্মণ-সাহিত্য থেকে একটা মোটামুটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু সেই আদি-রূপ বলতে কী ছিলো তার সাধারণ পরিচয় জানতে হলে আমাদেরকে বৈদিক মানুষদের সমাজ ও নৃতাত্ত্বিক পরিক্রমণের বিষয়টিকে স্বীকার করতে হবে। সেটি কী? তার প্রতিপাদ্য হলো, অন্যান্য আদিম মানুষের মতোই বৈদিক মানুষেরাও আদিম পর্যায়ে ম্যাজিক বা জাদুর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপণ করতেন এবং বৈদিক যজ্ঞের আদি-রূপ বলতে তাঁদের সুপ্রাচীন জাদু-অনুষ্ঠানই।

ইতঃপূর্বে বৈদিক সাহিত্যের সাধারণ পরিচয়ে আমরা দেখেছি যে, বৈদিক সাহিত্যে আদিম জাদু-র বহু স্মৃতি টিকে থেকেছে; এবং বৈদিক যজ্ঞ আদিতে জাদু-অনুষ্ঠানই ছিলো কিনা এ-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানদেরও বেশ কিছু মতামতও রয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে আদিম জাদুর বৈশিষ্ট্য কী তার সুস্পষ্টতার প্রয়োজনে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের প্রাসঙ্গিক বক্তব্যটি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। তিনি বলছেন–
প্রথমত, জাদু আর ধর্ম এক নয়। ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য, ঈশ্বরে বা দেবতায় বিশ্বাস এবং প্রার্থনা-উপাসনা ইত্যাদি। এই প্রার্থনা-উপাসনার সাহায্যে ঈশ্বরকে তুষ্ট করা যাবে এবং তাঁরই ইচ্ছায় বা চেষ্টায় প্রার্থিত বস্তু লাভ করা যাবে। যথা : আকাশে বৃষ্টি নেই, ঈশ্বর বা দেবতার কাছে বৃষ্টির প্রার্থনা জানানো হলো, পুজো-উপচার প্রভৃতির সাহায্যে তাঁকে সন্তুষ্ট করা হলো, সন্তুষ্ট হয়ে তিনি বৃষ্টি দান করলেন। অতএব, ধর্ম-বিশ্বাসের মূল কথা হলো, প্রাকৃতিক ঘটনাবলী ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন বা আয়ত্তাধীন : ধর্ম-বিশ্বাসের উচ্চতর পর্যায়ে তাই ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, ইত্যাদি রূপে পূজিত। জাদু-বিশ্বাসের মূল কথা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাকৃতিক ঘটনার কারণ হিসেবে কোনো ঈশ্বর বা দেবতার কর্তৃত্ব বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রশ্ন ওঠে না; তার বদলে জাদু-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মানুষেরই কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠানকে প্রাকৃতিক ঘটনার একমাত্র কারণ বলে বিবেচনা করবার পরিচয়; অর্থাৎ অমুক অনুষ্ঠানটি নির্ভুলভাবে করতে পারলে অমুক ঘটনা প্রকৃতিতে অনিবার্যভাবেই ঘটবে। এ-জাতীয় অনুষ্ঠান সাধারণত অনুকরণ মূলক। যথা : আকাশে বৃষ্টি নেই; আদিম মানুষেরা এমন একটি অনুষ্ঠান করল যা আসলে মেঘ-বৃষ্টির অনুকরণ মাত্র– হয়তো মেঘ ঘনিয়ে আসার নকল, মেঘের ডাকের নকল, আকাশে জলের ছিটে ছড়িয়ে বৃষ্টিপাতের নকল, ইত্যাদি। এবং তাদের বিশ্বাস, এই অনুষ্ঠান নির্ভুলভাবে করতে পারলেই বৃষ্টিপাত হবে। অতএব বৃষ্টিপাত নামের প্রাকৃতিক ঘটনাটি কোনো ঈশ্বর বা দেবতার বা কারুরই ইচ্ছাধীন নয়; তার পরিবর্তে একান্তভাবেই মানবীয় অনুষ্ঠানেরই অধীন। আদিম জাদুর দৃষ্টান্তে অনেক সময় অনুষ্ঠানের সঙ্গে মন্ত্রের (Spell) সম্পর্ক থাকে; কিন্তু এই মন্ত্র বা ‘Spell’ প্রার্থনা-উপাসনা জাতীয় নয়, তার বদলে আদেশমাত্র– মন্ত্রের সাহায্যে যেন প্রকৃতিকে আদেশ করা হলো, বাঞ্ছিত ঘটনাটি ঘটাতে প্রকৃতি বাধ্য হবে। সংক্ষেপে, জাদু-বিশ্বাসের মূল কথা হলো অনুষ্ঠানটি নির্ভুলভাবে সম্পাদিত হলে, আদেশমূলক মন্ত্র নির্ভুলভাবে উচ্চারিত হলে বাঞ্ছিত ফল অনিবার্যভাবে ফলবে। অতএব জাদু-বিশ্বাসের মূলে প্রাকৃতিক কার্যকারণ সম্পর্ক সংক্রান্ত একটি আদিম ও অস্ফুট বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায় এবং এইদিক থেকেই মন্তব্য করা হয়েছে যে আদিম জাদু-বিশ্বাসের সঙ্গে ধর্মের বদলে বরং বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসেরই সাদৃশ্য অনুমেয়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৭৩)

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, নিরীশ্বর মীমাংসা দর্শনে এই আদিম জাদু বিশ্বাসের অন্তর্নিহিত মূল সূত্রগুলিরই এমনভাবে দার্শনিক রূপ দেবার আয়োজন করা হয়েছে যে, সেই কারণে পূর্বমীমাংসকাচার্যেরা বেদপন্থী চূড়ান্ত আস্তিক হয়েও এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছেন যাকে চূড়ান্ত অর্থেই অধ্যাত্মবাদ-বিরোধী এবং ভাববাদ-বিরোধী আখ্যা দিতে হবে। প্রসঙ্গত, পূর্ব-মীমাংসার নামান্তর কর্ম-মীমাংসা; কেননা ক্রিয়াকর্ম বা যাগযজ্ঞই তার মূল আলোচ্য। অতএব, এক্ষেত্রে দেবীপ্রসাদের মন্তব্য হলো, ‘মীমাংসকেরা যদি যজ্ঞ-প্রসঙ্গে আদিম জাদুর অন্তর্নিহিত মূল সূত্রগুলিরই দার্শনিক রূপ দেবার প্রয়াস করে থাকেন তাহলে অনুমানের অবকাশ হয় যে অন্তত তাঁরা জাদু অর্থেই যজ্ঞকে বুঝতে চেয়েছিলেন।

সে যাক, আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘অতি-প্রাকৃত বা আধ্যাত্মিক শক্তিতে বিশ্বাসের অভাব এবং প্রাকৃতিক কার্য-কারণ সম্পর্কের উপর সহজাত ও অস্ফুট আস্থা সত্ত্বেও জাদুবিশ্বাস আদিম অজ্ঞতারও পরিচায়ক। যে-সাদৃশ্যমূলকতা জাদুর ভিত্তি তা সুদূরপরাহত হতে পারে; বস্তু বহু ক্ষেত্রে তা এমনই সুদূরপরাহত যে আধুনিক মনের কাছে একান্তই অবাস্তব ও আজগুবি বলে প্রতীত হবার কথা। যেমন, বৃষ্টি-জাদুর ক্ষেত্রে হয়তো গাছের উপর এক টুকরো কালো চামড়া টাঙিয়ে তার দিকে তীর ছোঁড়বার আয়োজন : চামড়ার টুকরোটা মেঘের মতো, বাণবিদ্ধ মেঘ বৃষ্টি দিতে বাধ্য হবে। বলাই বাহুল্য, অন্তর্নিহিত মূলসূত্রের দিক থেকে বিজ্ঞানের সঙ্গে সাদৃশ্য সত্ত্বেও আদিম জাদু অবশ্যই বিজ্ঞান নয় এবং এ-জাতীয় কাল্পনিক অনুষ্ঠানের সাহায্যে প্রকৃতিকে সরাসরি বশ করবার বা বাধ্য করবার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নিশ্চয়ই নেই। তবুও আদিম মানুষের জীবন-সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষায় এই জাদু সম্পূর্ণ নিরর্থক বা নিষ্ফলও নয়।’ তাই প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ টমসন (Thomson) বলেছেন– ‘It is an illusory technique complementary to the deficiencies of the real technique.’ অর্থাৎ, জাদু হলো– বাস্তব কলাকৌশলের অসম্পূর্ণতার পরিপূরক কাল্পনিক কলা-কৌশল।

এ-প্রেক্ষিতে টমসন্ বলতে চেয়েছেন যে, ‘আদিম মানুষের বাস্তব কলাকৌশল অত্যন্ত অনুন্নত; প্রকৃতির উপর তার দখল যৎসামান্য, প্রকৃতি সংক্রান্ত তার জ্ঞানও সেই অনুপাতে নগণ্য। অতএব, এই অবস্থায় প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে উৎসাহ-উদ্দীপনার প্রয়োজনও অনেক বেশি; তারই অন্তত কিছুটা জোগান জাদুর মধ্যে। কেননা, একমাত্র আদিম যৌথ-জীবনের পটভূমিতেই আদিম জাদুর আদি-তাৎপর্য বুঝতে পারা যাবে : এ-অনুষ্ঠান ব্যক্তি স্বার্থ-প্রণোদিত হতে পারে না, কেননা আদিম সমাজে তার সুযোগ নেই। এবং জাদুর সাহায্যে কামনা সফল হবার– প্রকৃতিকে জয় করবার– যে চিত্র ফুটিয়ে তোলবার আয়োজন তা দলের মধ্যে সঞ্চারিত হলে পুরো দলটির পক্ষে মেতে ওঠবার– অনুপ্রাণিত হবার কথা : শিকারে বেরুবার আগে আদিম শিকারীর দল শিকার-নৃত্যের মাধ্যমে শিকার সফল হবার একটি নকল বা অনুকরণ সৃষ্টি করতে পারলে শিকারী হিসেবে অনেক বেশি দৃঢ়চিত্ত– অতএব সার্থক– হতে পারে। তাই প্রকৃতিকে জয় করবার কৌশল হিসেবে আদিম জাদু একান্ত কাল্পনিক হলেও সম্পূর্ণ নিষ্ফল নয়। এবং তার মূল কারণ হলো, আদিম মানুষের যৌথ-জীবন।
কিন্তু উৎপাদন-কৌশলের অগ্রগতির ফলে আদিম যৌথ জীবনের অবসান হলেও জাদু-বিশ্বাসের রেশ সম্পূর্ণভাবে মুছে যায় না; কিন্তু তখন তার আদি-তাৎপর্য বিপরীতে পর্যবসিত। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে আদিম জাদু-বিদ্যা ক্রমশই শ্রেণী-স্বার্থ প্রণোদিত শাসক-শ্রেণীর গুহ্য-বিদ্যায় রূপান্তরিত হয় এবং ক্রমশই তা পুরোহিত শ্রেণীর অলৌকিক শক্তি বলে প্রচারিত হয়। এইভাবে প্রাচীন ধর্ম-বিশ্বাসের ও ধর্মানুষ্ঠানের মধ্যে আদিম জাদু-বিশ্বাস ও জাদু-অনুষ্ঠানের বহু পরিচয় টিকে থাকে; কিন্তু ধর্মের অঙ্গ হিসেবে তা একান্তভাবেই অলৌকিক, অতিপ্রাকৃত এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে জীর্ণ আদিম জাদুর স্মারকমাত্র।

জাদু সংক্রান্ত এই সাধারণ আলোচনাটুকু বিবেচনায় রেখেই যজ্ঞ-প্রসঙ্গে বৈদিক যজ্ঞের কিছু কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিচার করা যায়।
ইতঃপূর্বে সত্রযাগের কতা উল্লিখিত হয়েছে। এ-অনুষ্ঠান হয় দীর্ঘদিন-ব্যাপী; শেষদিনের আগের দিনটিতে মহাব্রত করা হয়। শান্ত্রমতে মহাব্রত মানে ‘অন্ন’; অতএব অনুমান হয়, অনুষ্ঠানটি প্রধানতই অন্নকামনা-মূলক ছিলো। মহামহোপাধ্যায় কানে (Kane) এই মহাব্রতের এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। তবে আমাদের এ বর্ণনায় যাবার দরকার নেই। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, মহাব্রতর বৈশিষ্ট্য বলতে কয়েকটি অত্যদ্ভূত এবং সুস্পষ্টভাবেই আদিম অনুষ্ঠান। বর্তমানকালের বিবেচনায় কোন কোন অংশকে– নারী-পুরুষের যৌন-সঙ্গম জনিত অনুষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিতে– চূড়ান্ত পর্যায়ের আদিরসাত্মক বলেও ভ্রম হতে পারে। কিন্তু বৈদিক যজ্ঞে এ-জাতীয় আপাত-অদ্ভূত অনুষ্ঠান কেন? মহামহোপাধ্যায় কানে মন্তব্য করেছেন,– ‘মহাব্রতর এই বৈশিষ্ট্যগুলি থেকেই বোঝা যায়, এটি ছিল আদিম অতীতে কোন এক গণ-উৎসব এবং যজ্ঞের ক্লান্তিকর দিনগুলি বা মাসগুলির শেষে শ্রান্তি-বিনোদনের উদ্দেশ্যে পবিত্র বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের সঙ্গে এটিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এ-জাতীয় যুক্তির সঙ্গে না আছে প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গতি, না আধুনিক নৃতত্ত্বের। কেননা, দেবীপ্রসাদ এ-প্রসঙ্গে বলেন,– ‘ব্রাহ্মণ-সাহিত্য ও সূত্র-সাহিত্য থেকে শুরু করে সুবিশাল মীমাংসা-সাহিত্যের কোথাওই এমন ইঙ্গিতটুকুও নেই যে যজ্ঞানুষ্ঠানের শেষে নাচ-গান জাতীয় কোনো রকম শ্রান্তি-বিনোদনমূলক আয়োজনের অবকাশ থাকতে পারে। বরং যজ্ঞ-প্রসঙ্গে বৈদিক সাহিত্যের মূল কথাই হলো, অনুষ্ঠানের প্রতিটি খুঁটিনাটিরও বিশেষ তাৎপর্য আছে উদ্দেশ্য আছে, গুরুত্ব আছে। পক্ষান্তরে এ-বিষয়েও সন্দেহ নেই যে মহাব্রতর আলোচ্য বৈশিষ্ট্যগুলিকে কোনো আদিম অতীতের স্মারক বলেই গ্রহণ করতে হবে। এবং যদি তাই হয় তাহলে আদিম মানুষ বা মানুষের আদিম পর্যায় সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে পারা তথ্যের পটভূমিতেই– অর্থাৎ নৃতত্ত্বের আলোতেই– এগুলি ব্যাখ্যা অন্বেষণ করতে হবে। এবং এই অনুষ্ঠানগুলির প্রায় প্রত্যেকটিই যে আদিম জাদু-অনুষ্ঠানের সুপরিচিত অঙ্গ হওয়াই স্বাভাবিক– আধুনিক নৃতত্ত্ববিদেরা সে-বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন না।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৭৬-৭)

এ-ক্ষেত্রে একটি সহজ কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, বৈদিক মানুষেরাও অন্যান্য মানুষদের মতোই আদিম অবস্থার নিম্নতম স্তর থেকে শুরু করে ক্রমশ সভ্যতার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং বৈদিক সাহিত্য অমন সুপ্রাচীন বলেই তাঁদের সেই আদিম অবস্থার বহু স্মারক এ-সাহিত্যে টিকে থেকেছে। আধুনিক পৃথিবীতেও যে-সব মানবদল সমতুল্য আদিম অবস্থায় আটকে আছে তাদের সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা তথ্যের আলোতেই এই স্মারকগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্ভব বলে নৃতাত্ত্বিকেরা মনে করেন।
সেক্ষেত্রে অবশ্যই মহাব্রত আদিম জাদু-অনুষ্ঠান নয়। কিন্তু তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য যদি আদিম অতীতের স্মারক বলেই বিবেচিত হয় এবং সেগুলিকে যদি নৃতত্ত্বে সুবিদিত আদিম জাদু-অনুষ্ঠান বলেই সনাক্ত করা যায় তাহলে যজ্ঞটির প্রাক্-ইতিহাস হিসেবে আদিম জাদুই অনুমিত হওয়া স্বাভাবিক– পরবর্তী সাহিত্যে তার রূপ যতই পল্লবিত হোক না কেন এবং যতই পরিবর্তিত হোক না কেন তার আদি-তাৎপর্য।

অন্যান্য বৈদিক যজ্ঞের বেলাতেও যে একই কথা প্রযোজ্য তা কয়েকটি সুবিখ্যাত ও সুপ্রাচীন যজ্ঞকে বিচার করলেই বোঝা যায়।
যেমন, প্রাচীনতম একটি যজ্ঞের নাম অশ্বমেধ। মহামহোপাধ্যায় কানের রচনাতে এই যজ্ঞটির একটি সাধারণ বিবরণী জানা যায়। তবে ঋগ্বেদের রচনাকালেই  তা অতীতের অনুষ্ঠান বলে বিবেচিত হয়েছে (ঋগ্বেদ-১/১৬২ ও ১/১৬৩)। পরবর্তীকালের সাহিত্যে (ঐতরেয়-ব্রাহ্মণ-৮/২১-২৩ এবং শতপথ-ব্রাহ্মণ-১৩/৫/৪) ঘোষিত হয়েছে, একমাত্র সার্বভৌম সম্রাটই এ যজ্ঞ সম্পাদন করতে পারবেন এবং অবশ্যই যজ্ঞটির আয়োজনের জন্য এমন বিরাট বিশাল ব্যবস্থাদি উল্লিখিত হয়েছে যে রাজরাজড়া ছাড়া কারুর পক্ষে তা সম্ভব নয়। এই যজ্ঞ সম্পাদনে হাতি থেকে শুরু করে মৌমাছি পর্যন্ত মোট ৬০৯-টি গৃহপালিত ও বন্য পশু বধের নির্দেশও আছে। কিন্তু এই যজ্ঞানুষ্ঠানেরই কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্টভাবে আদিম অতীতের পরিচায়ক। অধ্যায়ান্তরে প্রাসঙ্গিকভাবে এই যজ্ঞের সেরূপ অনুষ্ঠানের কিছু দৃষ্টান্তের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, যা অবশ্যই অনেকটা পূর্বোক্ত মহাব্রত অনুষ্ঠানের মতোই।
কিন্তু অনুষ্ঠানগুলিকে যদি প্রকৃতপক্ষে কোন এক আদিম অতীতের স্মারক বলেই স্বীকার করা হয় তাহলে একমাত্র আদিম মানুষ বা মানুষের আদিম অবস্থা সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে পারা তথ্যের ভিত্তিতেই– অর্থাৎ তুলনামূলক নৃতত্ত্বের পটভূমিতেই– এগুলির ব্যাখ্যা অন্বেষণ করা সম্ভব হতে পারে। অনেক বিদ্বান গবেষকই এরকম প্রচেষ্টা থেকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে চেয়েছেন যে পরবর্তীকালের ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে যজ্ঞটির রূপান্তর যেমন হোক না কেন, তার পিছনে নৃতত্ত্বে সুবিদিত জাদু-অনুষ্ঠানের পরিচয়ই পাওয়া যায়।

আর একটি সুপ্রাচীন বৈদিক যজ্ঞের নাম বাজপেয়। যদিও পরবর্তী কালের ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থ অনুসারে সাম্রাজ্য-কামনায় রাজরাজড়াদের পক্ষেই এই যজ্ঞের আয়োজন, তবুও যজ্ঞটির নামেই প্রকাশ যে অন্ন-কামনাই তার আদি-উদ্দেশ্য হওয়া সম্ভব। বাজপেয় মানে অন্ন ও পানীয়। এবং দেবীপ্রসাদ বলেন,– ‘যজ্ঞটির নানা বৈশিষ্ট্য থেকে সহজেই অনুমান হয় যে আদিতে তা জনসাধারণেরই অনুষ্ঠান ছিলো। অন্যান্য সুপ্রাচীন ও সুবিখ্যাত বৈদিক যজ্ঞকে বিচার করলেও দেখা যায় যে ব্রাহ্মণাদি পরবর্তী সাহিত্যে সেগুলির রূপান্তর যেমনই হোক না কেন, তা থেকে আদিম জাদুর স্মৃতি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি। বস্তুত, ব্রাহ্মণ সাহিত্যেও যজ্ঞের যে-রূপ সংরক্ষিত হয়েছে তা প্রায়ই আদিম জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৭৯)

.
যজ্ঞের প্রসঙ্গে বিদ্বানদের মধ্যে আরেকটি বিতর্ক হলো– বৈদিক সাহিত্যে আগে জাদু না আগে ধর্ম? সংক্ষেপে কীথ্, ম্যাকডোনেল প্রমুখরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, যজ্ঞের আদি-রূপ ছিলো উপহার-উপচার মূলক, কালক্রমে তা জাদু অনুষ্ঠান মাত্রে পরিণত হয় এবং ব্রাহ্মণ-সাহিত্যই এ-পরিণতির চূড়ান্ত পরিচায়ক। অর্থাৎ ভারতবর্ষের ইতিহাসে আগে ধর্ম, পরে জাদু– ধর্মেরই অবনতি ঘটতে ঘটতে ক্রমশ তা জাদুমাত্রে পরিণত হয়।
স্বভাবতই এখানে নৃতত্ত্ব-স্বীকৃত একটি সাধারণ সত্যকে বর্জন করবার আয়োজন দেখা যায়। দেবীপ্রসাদ এই প্রবণতার প্রতিবাদ করে বলছেন,– ‘পৃথিবীর সর্বত্রই যদি ধর্মচেতনা অনিবার্যভাবেই জাদুর পরবর্তী হয় তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে তার কোনো এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রমকে– শুধু ব্যতিক্রম নয়, সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা– সাধারণ মূলসূত্র হিসেবে গ্রহণ করে বৈদিক চিন্তা-চেতনার ইতিহাসকে বোঝবার আশা অবশ্যই ক্ষীণ।

আমরা বরং বৈদিক চিন্তা-চেতনার ইতিহাস প্রসঙ্গে শেষপর্যন্ত যে যৌক্তিক সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচ্য বলে মনে করি তা হলো,– ‘ধর্ম ও জাদু এক নয়। জাদু-বিশ্বাস প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী চেতনারই পরিচায়ক; তার মূল উদ্দেশ্য প্রকৃতিকে আয়ত্তে আনা এবং যত অস্ফুট ও অচেতনভাবেই হোক না কেন তার অন্তর্নিহিত বিশ্বাস প্রকৃতির অমোঘ নিয়মানুবর্তিতাই। জাদুর ক্ষেত্রে ঈশ্বরের পরিকল্পনা নেই, প্রকৃতির উপর অলৌকিক শক্তিশালী দেবতাদের কোনো কর্তৃত্ব স্বীকৃত নয়, স্বীকৃত নয় লোকোত্তরের পরিকল্পনা। যজ্ঞের নজির থেকেও বৈদিক চিন্তা-চেতনার আদি-পর্যায়কে অধ্যাত্মবাদী আখ্যা দেবার সুযোগ নেই।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : ঋত] [*] [পরের পর্ব : ব্রহ্মণ্ ও মায়া]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 188,772 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: