h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৫ : ঋত|

Posted on: 07/07/2015


daynight

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৫ : ঋত |
রণদীপম বসু

৩.৫ : ঋত

অথর্বন্-দের সঙ্গে যে-অঙ্গিরস্-দের নাম থেকে অথর্ববেদের আদি-নামকরণ, ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশের কবিরাও তাঁদের সুদূর অতীতের অসীম শক্তিশালী জাদুকর বলে স্মরণ করেছেন এবং সেই সঙ্গেই স্মরণ করেছেন যে তাঁরা ছিলেন ঋত-বান বা ঋত-যুক্ত। যেমন–

ত ইন্দেবানাং সধমাদ আসন্নৃতাবানঃ কবয়ঃ পূর্ব্যাসঃ।
গূড়্হং জ্যোতিঃ পিতরো অন্ববিন্দন্ত্সত্যমন্ত্রা অজনয়ন্নুষাসম্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/৭৬/৪)।
সমান ঊর্বে অধি সঙ্গতাসঃ সং জাততে ন যতন্তে মিথস্তে।
তো দেবানাং ন মিনন্তি ব্রতান্যমর্ধন্তো বসুভির্যাদমানাঃ।। (ঋগ্বেদ-৭/৭৬/৫)।
অর্থাৎ :
যে ঋতবান অঙ্গিরাগণ কবি, পূর্বকালীন পিতা ও যাঁরা গূঢ় জ্যোতি লাভ করেছিলেন এবং অবিতথ মন্ত্রদ্বারা ঊষাকে প্রাদুর্ভূত করেছিলেন, তাঁরাই দেবগণের সঙ্গে একত্রে প্রমত্ত হতেন। (ঋক-৭/৭৬/৪)।।  তাঁরা সাধারণ গো-সমূহের জন্য সঙ্গত হয়ে একবুদ্ধি (পরস্পর সমান) হয়ে ছিলেন। তাঁরা কি পরস্পর যত্ন করেন নি? তাঁরা দেবগণের কর্ম হিংসা করেন না। তাঁরা হিংসারহিত বাসপ্রদ কিরণের দ্বারা গমন করেন। (ঋক-৭/৭৬/৫)।।


এখন প্রশ্ন হলো, ঋত মানে কী? এ-প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া কঠিন। কোন এক আদিম ধ্যানধারণার পরিচায়ক বলেই আধুনিক প্রতিশব্দের সাহায্যে ঋত-র সম্যক পরিচয় সম্ভব নয় বলে বিদ্বানেরা মনে করেন। তবুও বৈদিক চিন্তা-চেতনার ইতিহাসে ধারণাটির গুরুত্ব প্রায় অপরিসীম। কেননা ঋগ্বেদের কবিদের কাছে এই ঋতই ছিলো সেই প্রাচীন অবিভক্ত সমাজের আদিম নীতিবোধ। নীতিবোধের চেতনার দিক থেকে প্রাচীন সমাজের সঙ্গে আধুনিক সমাজের অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আমাদের আধুনিক চেতনায় প্রাকৃতিক নিয়ম, জীবন সংগ্রাম, কর্তব্য, দায়িত্ব প্রভৃতির ধারণা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে; আদিম সমাজে তা ছিলো না। নৈতিক জীবনের নিয়মও প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই অমোঘ। এ-প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন–
আগেই দেখেছি, প্রাচীন বৈদিক কবিরা মূলতই পার্থিব সম্পদের কামনায় বিভোর; কিন্তু তা সত্ত্বেও যদি তাঁরা কোনো অমূর্ত চেতনায় একান্তই উপনীত হতে পেরে থাকেন, যদি তাঁরা বিশ্বের সামগ্রিক রহস্য উপলব্ধির একান্তই কোনো পরিচয় দিয়ে থাকেন, যদি তাঁদের রচনায় বিশ্বসংসারের সঙ্গে মানবসত্তার সম্পর্কমূলক কোনো বোধ একান্তই প্রতিফলিত হয়ে থাকে, –সংক্ষেপে, ঋগ্বেদের প্রাচীন পর্যায়ে প্রকৃত দার্শনিক চেতনার কোনো আভাস যদি সত্যিই স্বীকৃত হয়– তাহলে তার মূলসূত্র এই ঋত-র মধ্যেই সন্ধান করতে হবে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৮৫)

প্রাচীন সমাজের এই আদিম অখণ্ড নৈতিক চেতনার দিক থেকে ঋগ্বেদের ঋত বলতে অনেক কিছুই বোঝায়– ঋত মানে সত্য, ঋত মানে যজ্ঞ, ঋত মানে প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম, ঋত মানে অমোঘ নৈতিক নিয়ম– আরো অনেক কিছু। ঋত-র বর্ণনায় অধ্যাপক কীথ্ (Keith) বলছেন (দেবীপ্রসাদের তর্জমায়),–
(ঋগ্বেদে) বারবার প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার নাম ঋত।… বৈদিক ভারতে শব্দটি ত্রি-অর্থবাচক : বিশ্বের নিয়মানুবর্তিতা, যজ্ঞের বিধি, পৃথিবীতে নৈতিক জীবনের নিয়মানুবর্তিতা।… ঋত অনুসারেই প্রভাতে উষাদের আবির্ভাব হয় : ঋত অনুসারেই পিতৃগণ আকাশে সূর্যকে স্থাপন করেছেন, সূর্য ওই ঋতেরই উজ্জ্বল মুখ এবং গ্রহণের অন্ধকার সেই ঋতেরই বিপরীত। সংবৎসর হলো দ্বাদশ অর-বিশিষ্ট ঋতের রথচক্র। নব-গাভীর ধারোষ্ণ দুগ্ধ হলো ঋতের দ্বারা বর্ধিত গাভীর ঋত। জল ও ওষধির মধ্যে লুকোনো আগুন (অগ্নি) অরণি কাষ্ঠের ঘর্ষণে ঋতজাত ও ঋতের অঙ্কুর। ঋতের আদেশ অনুসারেই নদীগুলি প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক স্তর থেকে সহজেই ঋতের ধারণা নৈতিক ও যজ্ঞ-সম্পর্কীয় ধারণায় পর্যবসিত হয়।’- (সূত্র: লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৬২৩)


এগুলি যে কোন এক আদিম পর্যায়ের চিন্তাধারা, সন্দেহ নেই। তাই তার সঙ্গে নানা রকম পৌরাণিক কল্পনারও সংমিশ্রণ। কিন্তু এ-বিষয়েও সন্দেহ নেই যে ঋত প্রসঙ্গে বৈদিক কবিদের এ-জাতীয় উচ্ছ্বাসের মূলে প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতার পর্যবেক্ষণ এবং হয়তো বা প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতার বোধ-জনিত এক আদিম বিস্ময়। তবে এটা মনে করা বোধকরি সঙ্গত হবে যে, বৈদিক কবিদের কাছে ঋতর পরিকল্পনা কোনো নির্লিপ্ত জ্ঞান-আহরণের পরিচায়ক নয়; প্রাচীন পৌরাণিক কল্পনার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই জড়িত হলেও আসলে তা জীবন-সংগ্রামের মূল সমস্যা ও তৎসংশ্লিষ্ট নানাবিধ পার্থিব কামনার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। ঋগ্বেদের কয়েকটি দৃষ্টান্ত থেকেই তা বোঝা যাবে, যেমন–

প্র সা ক্ষিতিরসুর যা মহি প্রিয় ঋতাবানাবৃতমা ঘোষথো বৃহৎ।
যুবং দিবো বৃহতো দক্ষমাভুবং গাং ন ধূর্ষুপ যুঞ্জাথে অপঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৫১/৪)।
যুবাং যজ্ঞৈঃ প্রথমা গোভিরঞ্জত ঋতাবানা মনসো ন প্রযুক্তিষু।
ভরন্তি বাং মন্বনা সংযতা গিরোহদৃপ্যতা মনসা রেবদাশাথে।। (ঋগ্বেদ-১/১৫১/৮)।
উরো মহা অনিবাধে ববর্ধাপো অগ্নিং যশসঃ সং হি পূর্বীঃ।
ঋতস্য যোনাবশয়দ্দমূনা জামীনামগ্নিরপসি স্বসৃণাম্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/১/১১)।
অগ্নি র্নেতা ভগ ইব ক্ষিতীনাং দেব ঋতুপা ঋৃতাবা।
স বৃত্রহাসনয়ো বিশ্ববেদাঃ পর্ষদ্বিশ্বাতি দুরতা গৃণস্তম্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/২১/৪)।
যুবোর্ঋৃতং রোদসী স্যমস্তু মহে ষুণং সুবিতায় প্র ভূতম্ ।
ইদং দিবে নমো অগ্নে পৃথিব্যৈ সপর্যামি প্রয়সা যামি রত্নম্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/৫৪/৩)।
অর্থাৎ :
হে মিত্রাবরুণ! হে অসুরদ্বয়! তোমরা ঋতযুক্ত, তোমরা উচ্চস্বরে ঋত ঘোষণা কর এবং আমাদের গো ও জলযুক্ত কর। বৃহৎ দ্যুলোকের অগ্রভাগে দেবতাগণের আনন্দোৎপাদনে সমর্থ তোমাদের প্রিয়তর যজ্ঞভূমি উত্তমরূপে সম্পাদিত হয়েছে। (ঋক-১/১৫১/৪)।।  হে মিত্রাবরুণ ! তোমরা দুজনে ঋতযুক্ত, এবং তোমরা যজ্ঞকে গো-সমৃদ্ধ করায় অগ্রণী; যজমানেরা তোমাদের আসক্ত চিত্তে স্তুতি করছে, তোমরা মনে দর্প না করে আমাদের সমৃদ্ধ কার্যে উপস্থিত হও। (ঋক-১/১৫১/৮)।।  মহান অগ্নি অসম্বাধ ও বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষে বর্ধিত হন, কারণ বহু অন্নবান জল অগ্নিকে সম্যকরূপে বর্ধিত করে এবং ঋত-র জন্মস্থানে তিনি ভগিনী স্থানিয়া স্রোতস্বিনীগণের সখা হন। (ঋক-৩/১/১১)।।  ঋত-র পালক এবং ঋতযুক্ত অগ্নি ভগর ন্যায় মনুষ্যগণের নেতা। তিনি বৃহহন্তা, সনাতন, সর্বজ্ঞ ও দ্যুতিমান, তিনি স্তুতিকারীকে সমস্ত দুরিত অতিক্রম করিয়ে পারে নিয়ে যান। (ঋক-৩/২১/৪)।।  হে দ্যাবাপৃথিবী! তোমাদের ঋত যথার্থ হোক যেন আমরা অন্নযুক্ত ধন লাভ করতে পারি। হে অগ্নি! দ্যুলোক ও পৃথিবীকে নমস্কার। তোমরা আমাদের মহৎ যজ্ঞসমাপ্তি কার্যে সমর্থ হও। (ঋক-৩/৫৪/৩)।।


এরকম আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যায়, যেমন–

আমাদের শ্রেষ্ঠ, পুরাতন পিতৃগণ (অঙ্গিরসগণ) যেমন ঋতকে বিস্তৃত করেছিলেন সেইরূপ তাঁরা অরুণবর্ণা গো-সমূহকে অপাবৃত করেছিলেন (ঋক-৪/২/১৬)। পুরাকাল থেকে ঋত-র অনেক জল আছে, ঋত-র ধী-সমূহ বর্জনীয় পাপগুলিকে বিনাশ করে; ঋত-র শ্লোকসমূহ বধিরদের কর্ণ উন্মোচন করেছিল (ঋক-৪/২৩/৮)। ঋত’র ধারণাগুলি দৃঢ়, ঋত-র রূপগুলি মনোহর; স্তোতাগণ ঋত-র নিকট প্রভূত অন্ন কামনা করে এবং ঋত-র দরুন গাভীগুলি সংগৃহীত হয় এবং গাভীগুলি ঋততে প্রবেশ করে (ঋক-৪/২৩/৯)।  পুরাকালে ঊষাগণ ঋতজাত সত্য ছিলেন, যাঁদের নিকট গমনমাত্রই ধনদান করতেন এবং উক্থ্য দ্বারা স্তুতি করলে তাঁদের কাছ থেকে অচিরে ধনলাভ ঘটতো (ঋক-৪/৫১/৭)। তোমরা (বরুণ প্রভৃতিরা) ঋত-র সংরক্ষক, ঋত হতে তোমাদের জন্ম এবং তোমরা ঋত-র বর্ধক, অনৃতের প্রবল শত্রু; আমরা এবং অন্যান্য বীরেরা যেন তোমাদের আবাসস্থলে অন্নযুক্ত হয়ে সুখে থাকতে পারি (ঋক-৭/৬৬/১৩)। ইত্যাদি, ইত্যাদি।


এগুলিকে অবশ্যই দার্শনিক চিন্তার নমুনা বলা যাবে না। তবে এগুলি যে সুস্পষ্টভাবেই ঋত-র গরিমা সংক্রান্ত প্রাচীন কবিদের উচ্ছ্বাসমাত্র তা বোধকরি অস্বীকার করা যাবে না। এবং এই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে আদিম জীবন-সংগ্রামের সম্পর্ক সুস্পষ্ট। প্রাচীন কবিরা হয়তো মনে করেছিলেন, বিশ্বব্যাপী এই অমোঘ নিয়মানুবর্তিতার প্রভাবেই তাঁদের পক্ষে জল, অন্ন, পশু প্রভৃতি জীবন ধারণের পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুগুলি লাভ করা সম্ভব। অতএব এই ঋত-র পরিকল্পনার মধ্যে কোনো অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী চিন্তার বীজ আবিষ্কার করা যুক্তিসঙ্গত হবে না বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন।

বৈদিক কবিরা অবশ্যই তাঁদের দেবতাদের গরিমা-বর্ণনায় বহু উচ্ছ্বাস ও অতিশয়োক্তি করেছেন এবং এগুলি থেকে আপাত-দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তাঁদের ধারণায় প্রাকৃতিক ঘটনাবলী বুঝি এই দেবতাদেরই ইচ্ছাধীন। কিন্তু যে-দেবতা প্রসঙ্গে এ-জাতীয় অতিশয়োক্তি সর্বাধিক– সেই দেবতা বরুণের দৃষ্টান্তে দেখা যায়, বরুণের শক্তি এমনই অপরিসীম যে উড্ডীয়মান পক্ষিগণ তাঁর বল, তাঁর পরিক্রম, তাঁর ক্রোধ স্পর্শ করতে পারে না; জল ও বায়ুর গতি তাঁর বেগ অতিক্রম করতে পারে না–

নহি তে ক্ষত্রং ন সহো ন মন্যুং বয়শ্চনামী পতয়ন্ত আপুঃ।
নেমা আপো অনিমিষং চরস্তী র্ন যে বাতস্য প্রমিনন্ত্যভ্-বম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/২৪/৬)।
অর্থাৎ : হে বরুণ! এ উড্ডীয়মান পক্ষিগণ তোমার ন্যায় বল, তোমার ন্যায় পরাক্রম, তোমার ন্যায় ক্রোধ প্রাপ্ত হয় নি; এ অনিমিষ-বিচারী জল ও বায়ুর গতি তোমার বেগ অতিক্রম করে না। (ঋক-১/২৪/৬)।।


বরুণ বলবান, নেতা ও বহু লোককে পরিদর্শন করেন (ঋক-১/২৫/৫); তিনি অন্তরীক্ষগামী পক্ষিদের পথ জানেন, তিনি সমুদ্রে নৌকাসমূহের পথ জানেন (ঋক-১/২৫/৭); তিনি বিস্তীর্ণ, কমনীয় ও মহৎ বায়ুর পথ জানেন (ঋক-১/২৫/৯); জ্ঞানবান লোক তাঁর প্রসাদে সকল অদ্ভুত ঘটনা, যা সম্পাদিত হয়েছে বা হবে, সমস্তই দেখতে পান (ঋক-১/২৫/১১)। জগতের ধারক অদিতির পুত্র (বরুণ) প্রকৃষ্টরূপে জল সৃষ্টি করেছেন; বরুণের মহিমায় নদীসকল প্রবাহিত হয়, তারা বিশ্রাম করে না, নিবৃত্ত হয় না; তারা পক্ষিদের ন্যায় বেগে ভূমিতে গমন করে (ঋক-২/২৮/৪)। এমনকি সকলের চোখের প্রতিটি পলকই বরুণের নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (অথর্ববেদ-৪/১৬/২,৫) এবং সে-নিয়ম দেবতাগণও অতিক্রম করতে পারেন না (ঋক-৫/৬৩/৭, ৫/৬৯/৪ ইত্যাদি)। স্বভাবতই বরুণকে বারবার রাজা ও সম্রাট বলে উল্লেখ করা হয়েছে–

ত্বং বিশ্বেষাং বরুণাসি রাজা যে চ দেবা অসুর যে চ মর্তাঃ।
শতং নো রাস্ব শরদো বিচক্ষেহশ্যামায়ংষি সুধিতানি পূর্বাঃ।। (ঋগ্বেদ-২/২৭/১০)।
অর্থাৎ : হে অসুর বরুণ! তুমি, দেবতাই হোক বা মানুষই হোক, তুমি সকলের রাজা। আমাদের শতবর্ষ অবলোকন করতে দাও যেন আমরা প্রাচীনদের উপভুক্ত আয়ু লাভ করতে পারি। (ঋক-২/২৭/১০)।।


এখানে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি– বরুণকে অসুর সম্বোধন করা– এ-বিষয়ে পরে আলোকপাত করা যাবে। বস্তুত ঋগ্বেদে ইন্দ্রাদি দেবতাদের গৌরব-প্রসঙ্গে বহু পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া গেলেও বরুণের দৃষ্টান্তে তা পাওয়া যায় না– বরং তাঁর গৌরব-বর্ণনায় বৈদিক কবিরা প্রধানতই জাগতিক ও নৈতিক নিয়মের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। উপরিউক্ত দৃষ্টান্তগুলি থেকে আপাত-দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, প্রাকৃতিক ঘটনাবলী ওই অসীম শক্তিশালী দেবতাটিরই আজ্ঞাধীন বা ইচ্ছাধীন বলে পরিকল্পিত হয়েছিলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। মনে রাখা দরকার, সমগ্র বৈদিক দেবলোকে ঋত-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক বলতে বরুণেরই, যদিও অবশ্যই বরুণের সঙ্গে প্রায়ই মিত্রও উল্লেখিত। এবং ঋত নামে বিশ্বব্যাপী এক অমোঘ নিয়মানুবর্তিতা, এই ঋত কি বরুণের ইচ্ছাধীন বা আজ্ঞাধীন? মোটেও তা নয়। বস্তুত রাজা বরুণ যে অমন অসীম শক্তিশালী তার কারণ তিনি ঋত-র পালক, ঋত-র ধারক, অনুগামী। (মিত্র ও) বরুণ ঋত-র প্রকাশক, ঋত-র বর্ধক; কিন্তু ঋত-র সাহায্যেই তাঁদের পক্ষে উক্ত কার্যাবলী সম্ভব–

ঋতেন যাবতাবৃধাবৃতস্য জ্যোতিষস্পতী। তা মিত্রাবরুণা হুবে।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/৫)।
ঋৃতেন ঋৃতমপিহিতং ধ্রুবং বাং সূর্যস্য যত্র বিমুচন্ত্যশ্বান্ ।
দশ শতা সহ তস্থুস্তদেবং দেবানাং শ্রেষ্ঠং বপুষামপশ্যম্ ।। (ঋগ্বেদ-৫/৬২/১)।
অর্থাৎ :
যাঁরা ঋত দ্বারা ঋতকে বর্ধিত করেন, যাঁরা ঋতের প্রকাশকর্তা, সেই মিত্রাবরুণকে আহ্বান করি। (ঋক-১/২৩/৫)।।  হে মিত্র ও বরুণ! আমি ঋতদ্বারা আচ্ছাদিত তোমাদের আবাসভূত ধ্রুব ও ঋত সূর্যমণ্ডল দর্শন করেছি। সে স্থানে অবস্থিত অশ্বগণকে উপাসকগণ স্তোত্রদ্বারা বিমুক্ত করেন। সে স্থানে সহস্র সংখ্যক রশ্মি সমবেত হয়ে অবস্থিতি করে। দেবমূর্তিসমূহের মধ্যে সে এক শ্রেষ্ঠ মূর্তি আমি দেখেছি। (ঋক-৫/৬২/১)।।


এবং শুধু বরুণই নন। অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গেও ঋত-র যে-সম্পর্ক পরিকল্পিত হয়েছে তা থেকেও স্পষ্টই বোঝা যায় যে ঋত তাঁদের আজ্ঞাধীন বা আয়ত্তাধীন নয়, বরং তাঁরাই ঋত-র উপর নানাভাবে নির্ভরশীল। যেমন–

সহস্রধারং বৃষভং পরোবৃধং প্রিয়ং দেবায় জন্মনে।
ঋৃতেন য ঋৃতজাতো বিবাবৃধে রাজা দেব ঋৃতং বৃহৎ।। (ঋগ্বেদ-৯/১০৮/৮)।
অশ্বিনা পরি বামিষঃ পুরূচীরীষূর্গীভি র্যতমানা অমৃধ্রাঃ।
রথো হ বাম্ ঋতজা অদ্রিজূতঃ পরি দ্যাবাপৃথিবী যাতি সদ্যঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/৫৮/৮)।
অগ্নে ত্রী তে বাজিনা ত্রী ষধস্থা তিস্রস্তে জিহ্বা ঋতজাত পূর্বীঃ।
তিস্র উ তে তশ্বো দেববাস্তাভির্নঃ পাহি গিরো অপ্রযুচ্ছন্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/২০/২)।
কো বেদ নূনমেষাং যত্রা মদন্তি ধূতয়ঃ। ঋৃতজাতা অরেপসঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৬১/১৪)।
ঋৃতধীতয় আ গত সত্যধর্মাণো অধ্বরং। অগ্নেঃ পিবত জিহ্বয়া।। (ঋগ্বেদ-৫/৫১/২)।
অর্থাৎ :
যিনি (সোম) রসসেচনকারী এবং সহস্রধারায় ক্ষরিত হয়ে থাকেন, যিনি জলের সহযোগে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে দেবতামাত্রের প্রীতিপ্রদ হন, সেই রাজা ও দেবতা (সোম) ঋত হতে জাত, তিনি ঋতের দ্বারা ঋতকে বৃহৎরূপে বর্ধিত করেন। (ঋক-৯/১০৮/৮)।।  হে অশ্বিদ্বয়! প্রচুর হবি তোমাদের নিকট গমন করছে, দোষশূন্য কর্মকুশল স্তোতৃগণ স্তুতিদ্বারা তোমাদের পরিচর্যা করছে। তোমরা ঋত হতে জাত, তোমাদের জলপ্রদ-রথ সদ্য দ্যাবাপৃথিবীর অভিমুখে যাচ্ছে। (ঋক-৩/৫৮/৮)।।  হে অগ্নি! তোমার অন্ন তিন প্রকার, তোমার স্থান তিন প্রকার, তোমার দেবতাদের উদর পূরক তিনটি জিহ্বা, পূর্বকালে তুমি ঋত হতে জাত হয়েছিলে। তোমার তিন প্রকার শরীর দেবতাগণের অভিলষিত; তুমি প্রমাদরহিত হয়ে সে তিন শরীর দ্বারা আমাদের স্তুতি পালন কর। (ঋক-৩/২০/২)।।  তাঁদের (মরুৎগণের) বাসস্থান কেই বা জানে? সেখানে শত্রুদের ত্রাসকারীগণ আনন্দে থাকেন, তাঁরা ঋত হতে জাত বলেই নিষ্পাপ। (ঋক-৫/৬১/১৪)।।  হে ঋতকর্মযুক্ত সত্যধর্মা বিশ্বদেবগণ! তোমরা যজ্ঞে এসেছো, অগ্নির জিহ্বাদ্বারা তোমরা পান কর। (ঋক-৫/৫১/২)।।


এ-জাতীয় উদ্ধৃতিযোগ্য আরো বহু দৃষ্টান্ত আছে; তবে এগুলি থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে ঋত– বা বিশ্বব্যাপী ওই অমোঘ নিয়মানুবর্তিতা– দেবতাদের আজ্ঞাধীন বা আয়ত্তাধীন নয়। বরং দেবতারাই ঋত-র উপর নির্ভরশীল এবং ঋত-র অনুগামী। কিন্তু এবার যে মৌলিক প্রশ্নটির অবতারণা হয় তা হলো, এই ঋত-র পরিকল্পনার উৎস কী? এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ বলেন–
এমনকি ভাববাদী ব্যাখ্যাকারদের পক্ষেও এ-কথা অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি যে প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতার পর্যবেক্ষণ থেকে বৈদিক কবিরা ঋত-র পরিকল্পনায় উপনীত হয়েছিলেন। কিন্তু শুধু এটুকু বললেই সমস্যাটির সমাধান হয় না। কেননা আমরা আগেই দেখেছি, ঋত-র অর্থ শুধু প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতাই নয়; কোনো এক অমোঘ নৈতিক নিয়মানুবর্তিতাও। এই নৈতিক নিয়মানুবর্তিতার বোধকে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায় না।
ঋত-র এই নৈতিক তাৎপর্য সংক্রান্ত বহু নজিরের প্রয়োজন নেই। আধুনিক বিদ্বানেরা প্রায় সকলেই তার ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সাধারণত তাঁদের সিদ্ধান্ত এই যে, ঋত-র পরিকল্পনায় ওই প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতামূলক উপাদানটিই আদিম; তার থেকেই কবিরা ক্রমশ নৈতিক নিয়মানুবর্তিতার চেতনাতেও উপনীত হয়েছিলেন।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৮৯-৯০)

তবে এ-জাতীয় সিদ্ধান্তের পক্ষে বৈদিক সাহিত্যের কোনো অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য উদ্ধৃত করা কারুর পক্ষেই সম্ভব হয়নি। হয়তো বৈদিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যই এমন যে এ-জাতীয় কোনো সুস্পষ্ট সাক্ষ্য সংগ্রহের সুযোগ নেই। অতএব অনুমান হয়, আধুনিক বিদ্বানেরা একটি সাধারণ প্রকল্পের উপর নির্ভর করেই এ-সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছেন। এই সাধারণ প্রকল্পটি কী? তা হলো– বিচার-বিশ্লেষণের দিক থেকে নৈতিক নিয়মের চেতনা জাগতিক নিয়মের চেতনার পরবর্তী হতে বাধ্য; অতএব ঋত-র পরিকল্পনাতেও উভয় উপাদানের মধ্যে নৈতিক নিয়মের চেতনাই পরবর্তী।

ঋগ্বেদে আদিম যৌথজীবনের নানা স্মারক থেকে যেহেতু অনুমান হয় বৈদিক মানুষেরাও প্রাচীন পর্যায়ে এই যৌথ-জীবন যাপন করতেন সেই হেতু তাঁদের চেতনাতেও ওই আদিম যৌথ-জীবনের এক আদিম অলঙ্ঘনীয় স্বতঃস্ফূর্ত ও অমোঘ নৈতিক বোধ– তথা ঋত-র ধারণা– অনুমিত হতে পারে। তা নাহয় মানা গেলো। তাহলে প্রশ্ন হলো, ঋত-র মূলে যদি আদিম যৌথ-জীবনের সরল ও স্বতঃস্ফূর্ত নীতিবোধই অনুমিত হয় তাহলে সেই যৌথ-জীবন ধূলিসাৎ হবার ফলে বৈদিক কবিদের চেতনা থেকেও ঋত-র কথা ক্রমশই বিলীন হওয়াই স্বাভাবিক। ঋগ্বেদের অন্তর্গত সাক্ষ্য কি তার স্বীকৃতি দেয়?
এর উত্তরে দেবীপ্রসাদের একটি নাতিদীর্ঘ মন্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে–

বৈদিক সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য হলো, বৈদিক কবিদের চেতনা থেকে ঋত-র পরিকল্পনা ক্রমশ মুছে যায়। ঋত-র দেবতা বরুণের সুপ্রাচীন গৌরবও। কেননা, আগেই দেখেছি, বৈদিক দেবতাদের মধ্যে বরুণের সঙ্গেই ঋত-র সম্পর্ক মুখ্য বা প্রধান। ঋত-র এই ক্রম-বিলুপ্তি এবং তারই সঙ্গে বরুণের মহিমা হ্রাস অবশ্যই আকস্মিক বা অকারণ ঘটনা হতে পারে না। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই বৈদিক চিন্তা-চেতনার এই উল্লেখযোগ্য বিবর্তনটিকে প্রায় উপেক্ষাই করেছেন। কীথ্-ই বোধহয় একমাত্র লেখক যিনি এই ঘটনার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবার প্রয়াস করেছেন।
ঋত-র ধারণা যে বাস্তবিকই কত প্রাচীন তা দেখাবার জন্য কীথ্ ঋগ্বেদের সঙ্গে প্রাচীন ইরাণীয় সাহিত্য আবেস্তার তুলনা করেছেন : আবেস্তা-তেও বিশ্বব্যাপী অমোঘ নিয়মানুবর্তিতার পরিকল্পনা পাওয়া যায় এবং সেই পরিকল্পনা-বাচক শব্দটির সঙ্গে বৈদিক শব্দ-ব্যবহারের নিকট-সাদৃশ্য থেকে অবশ্যই অনুমান হয় সুদূর ইন্দো-ইরাণীয় যুগেই পরিকল্পনাটির সূত্রপাত :
In the physical world there rules a regular order, `rita’, which is observed respectedly, and which is clearly an inheritance from the Indo-Iranian period, since the term `asa’(urta) is found in the `Avesta’, and has there the same triple sense as in Vedic India, the physical order of the universe, the due order of the sacrifice, and the moral law in the world……the identity of the Vedic and Avestan expressions is proved beyond possibility of doubt by the expression `spring of rita’, whick is verbally identical in the `Avesta’ and the `Rigveda’.
শুধু ঋত-র পরিকল্পনাই নয়। কীথ্ আরও বলেছেন, “বৈদিক বরুণ এবং আবেস্তার অহুর মাস্দা– এই দুটি দেবপরিকল্পনার মধ্যেও পার্থক্য করা যায় না; ঋগ্বেদেও বরুণকে অসুর বলা হয়েছে, যদিও পরবর্তী সংহিতায় অসুর শব্দটি দেবতাদের শত্রুবাচক এবং নিন্দাসূচক; অহুরের মতোই বরুণও ঋত-র পালক এবং অহুরের সঙ্গে মিথ্রর যেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বরুণের সঙ্গেও সেই রকম মিত্রর সম্পর্ক। কিন্তু এ-জাতীয় সাদৃশ্যের কথা ছাড়াও উভয় দেবতারই অমন নৈতিক গরিমার একমাত্র ব্যাখ্যা এই যে উভয়েই এক আদি-পরিকল্পনার পরিণাম। কিন্তু ভারতবর্ষীয় সাহিত্যে বরুণের ইতিহাস বলতে এই নৈতিক গরিমার ক্রম-বিলোপ। এ-ঘটনর একমাত্র ব্যাখ্যা এই যে দেবতা হিসেবে তাঁর পরিকল্পনা ভারতবর্ষের বাইরে থেকে ভারতবর্ষে এসেছিল এবং এখানের প্রতিকূল পরিবেশে তাঁর নৈতিক বৈশিষ্ট্য ক্রমশই বিলীন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে জরথুস্ট্রীয় বিশ্বাসে অহুরই ক্রমশ মহান এবং অদ্বিতীয় দেবতারূপে পরিণত হন; এ থেকেই বোঝা যায় ইরাণীয় জনসাধারণের মধ্যে পরিকল্পনাটি আগে থেকেই প্রচলিত ছিল এবং তাই-ই সংস্কৃত রূপ লাভ করে।”
অতএব কীথ্ সংক্ষেপে মন্তব্য করেন, …“ভারতবর্ষীয় ইতিহাসে বরুণের নৈতিক গরিমার মতোই ঋত-র ধারণারও কোন ভবিষ্যৎ নেই; এ থেকে অনিবার্যভাবেই বোঝা যায় ধারণাটি ভারতবর্ষীয় সৃষ্টি নয়, তার বদলে এটি একটি উত্তরাধিকার মাত্র এবং নতুন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ধারণাটি টিকে থাকতে পারে নি।”
কিন্তু ঋত এবং বরুণের এই ইন্দো-ইরাণীয় উৎস স্বীকার করলেও প্রশ্ন থাকে, ভারতবর্ষে– অর্থাৎ ওই তথাকথিত নতুন পরিস্থিতিতে– দেবতাটির নৈতিক গরিমা এবং ঋত-র ধারণা টিকতে পারল না কেন? ভারতবর্ষীয় পরিবেশে এমন কী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে যা অনিবার্যভাবেই নৈতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী? বৈদিক মানুষদের চিন্তা-চেতনায় এমন প্রকাণ্ড পরিবর্তনকে দেশের জল-হাওয়া ভৌগোলিক লক্ষণের দিক থেকে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা নেহাত স্থূল বস্তুবাদের পরিচায়ক হবে। কিন্তু বিস্ময়ের কথা, সাধারণভাবে বস্তুবাদী ব্যাখ্যার প্রতি তীব্র বিমুখতা সত্ত্বেও কীথ্ এ-জাতীয় একটি ব্যাখ্যাই উদ্ভাবন করেছেন। সংক্ষেপে তাঁর মত : ইরাণের জীবন-সংগ্রাম সমস্যা সুকঠিন; কৃষিকাজ অবিরাম শ্রমের উপর নির্ভরশীল, তাছাড়া সর্বদাই ভ্রাম্যমান মানব-দলের আক্রমণ-সম্ভাবনাও। কিন্তু ভারতবর্ষের “জল-হাওয়া, জীবনধারণ এবং জাতি-সংমিশ্রণমূলক” ভিন্ন পরিস্থিতিতে জীবনকে ভাল-মন্দের সংগ্রাম হিসেবে না দেখে চিন্তাধারা কর্ম-বিমুখ ও বিশুদ্ধ জ্ঞানাভিলাষী হয়েছে এবং অগ্রসর হয়েছে অদ্বৈত ব্রহ্মের পরিকল্পনায় উপনীত হওয়া– ভাল-মন্দ, চেতন-অচেতন সবই তার অন্তর্ভুক্ত। এই বিকাশেরই সমান্তরালভাবে ম্লান হয়েছে বরুণের শক্তি; যোদ্ধা ও জনসাধারণের দেবতা ইন্দ্রই শক্তিশালী ও জনপ্রিয় দেবতা হয়ে থেকেছেন। এবং একইভাবে ব্রহ্মন্ পরিকল্পনার সামনে মুছে গিয়েছে ঋত-র চেতন।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৯২-৩)

এ বিষয়ে অবশ্যই সন্দেহ নেই যে বৈদিক চিন্তাবিবর্তনের পরিণাম হিসেবে দেখা যায় নীতি ও ন্যায়ের প্রতীক প্রাচীন দেবতা বরুণের পরিবর্তে যুদ্ধ ও লুণ্ঠনের দেবতা ইন্দ্রের গরিমা প্রবল হয়ে উঠেছে, ক্রমশই লুপ্ত হয়েছে ঋত-র চেতনা, ক্রমশই নিন্দিত হয়েছে কর্ম এবং প্রশংসিত হয়েছে জ্ঞান এবং এ-সমস্তরই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে শেষ পর্যন্ত বৈদিক চিন্তাশীলেরা এক অদ্বিতীয় পরব্রহ্মের পরিকল্পনায় উপনীত হয়েছেন। ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি পশুপালন-মূলক অর্থনীতির ক্রম-বিকাশের ফলে সমষ্টিস্বার্থের বদলে ব্যাষ্টিস্বার্থের প্রবণতা বেড়ে কীভাবে বৈদিক মানুষদের মধ্যে যুদ্ধ ও লুণ্ঠনের তাগিদ ক্রমশই বেড়ে যায় এবং তারই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অবসান ঘটে আদিম যৌথ-জীবনের। এই নতুন পরিস্থিতির মধ্যেই ঋত-র বিলোপ সংক্রান্ত সমস্যার মূলসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। আর নতুন ঋত-হীন পরিস্থিতির শ্রেষ্ঠ দেবতা ইন্দ্রের অনেক কীর্তি ইতঃপূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। অন্য কীর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য–

কস্তে মাতরং বিধবামচক্রচ্ছয়ুং কস্তামজিঘাং সচ্চরন্তম্ ।
কস্তে দেবো অধি মার্ডীক আসীদ্যৎপ্রাক্ষিণাঃ পিতরং পাদগৃহ্য।। (ঋগ্বেদ-৪/১৮/১২)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! তুমি ভিন্ন কে আপন মাতাকে বিধবা করেছে? তুমি যখন শয়ান থাকো অথবা সঞ্চরণ করতে থাকো, তখন কে তোমাকে বধ করতে ইচ্ছা করেছে? কোন্ দেবতা সুখদান বিষয়ে তোমার থেকে বড়? যেহেতু তুমি তোমার পিতার পদদ্বয় গ্রহণ করে পিতাকে বধ করেছো।


ইন্দ্র দ্বারা তাঁর পিতার হত্যা সম্বন্ধে টীকাকার সায়ণ কোন বিবরণ দেন নি, তবে তৈত্তিরীয় সংহিতার (তৈত্তিরীয়-৬/১/৩/৬) বিবরণ থেকে অনুমান হয়, ইন্দ্র যে স্বীয় পিতাকে এইভাবে আছাড় মেরে হত্যা করেন তার কারণ সোমরস লাভের আকাঙ্ক্ষাই। ঊষাকে ধর্ষণের বিষয় আগে বলা হয়েছে। এমনকি ঋষি-পত্নী অহল্যাকে প্রতারণা করে ব্যভিচারে লিপ্ত হতেও দেবতাটির কোন দ্বিধা নেই। বিভিন্ন পুরাণ-শাস্ত্রে এসব ব্যাপারে দেবরাজ ইন্দ্রের যে প্রচুর নামডাক রয়েছে সে-ব্যাপারও অবিদিত নয়।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, বৈদিক যুগের কোনো কোনো কবি নতুন ঋতহীন পরিস্থিতিকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তাঁরা নবজন্মের জন্য আকুতি প্রকাশ করেছেন। এ-জাতীয় জনৈক কবির নাম কুৎস। বৈদিক সাহিত্যে তাঁর সম্বন্ধে নানা রকম পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া যায় এবং ঋগ্বেদের একটি ঋক থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তিনি ইন্দ্রকে বেঁধে রেখেছিলেন–

স্ববৃজং হি ত্বামহমিন্দ্র শুশ্রবানানুদং বৃষভ রধ্রচোদনম্ ।
প্র মুঞ্চস্ব পরি কুৎসাদিহা গহি কিমু ত্বাবান্মুষ্কয়োর্বদ্ধ আসতে।। (ঋগ্বেদ-১০/৩৮/৫)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! তুমিই তোমার ভক্তদের উৎসাহযুক্ত কর, তোমাকে আবার কে উৎসাহিত করবে? আমরা জানি, তুমি আপনিই আপনার বন্ধন ছেদন করতে সমর্থ। অতএব কুৎসের হস্ত হতে আত্মমোচন করো এবং এ স্থানে এসো। তোমার মতো ব্যক্তি কেন মুষ্কদ্বয়ের বন্ধন সহ্য করছে।


এই ঘটনাটির থেকেই অনুমান হয়, নতুন পরিস্থিতির ওই শ্রেষ্ঠ দেবতাটির বিরুদ্ধে– তার মানে নতুন পরিস্থিতির বিরুদ্ধেও– তাঁর বিক্ষোভ ছিলো। সে বিক্ষোভেরই সুস্পষ্ট পরিচয় ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলে সংকলিত তাঁরই (কুৎসের) রচনায়–

যজ্ঞং পৃচ্ছাম্যবমং স তদ্দূতো বি বোচতি।
ক্ব ঋতং পূর্ব্যং গতং কস্তদ্বিভর্তি নূতনো বিত্তং মে অস্য রোদসী।। (ঋগ্বেদ-১/১০৫/৪)।
অমী যে দেবাঃ স্থন ত্রিষ্বা রোচনে দিবঃ।
কদ্ব ঋতং কদনৃতং ক্ব প্রত্বা ব আহুতির্বিত্তং মে অস্য রোদসী।। (ঋগ্বেদ-১/১০৫/৫)।
কদ্ব ঋতস্য ধর্ণসি কদ্বরুণস্য চক্ষণম্ ।
কদর্যম্নো মহস্পথাতি ক্রামেম দূঢ্যো বিত্তং মে অস্য রোদসী।। (ঋগ্বেদ-১/১০৫/৬)।
ত্রিতঃ কূপেহবহিতো দেবান্ হবত ঊতয়ে।
তচ্ছুশ্রাব বৃহস্পতিঃ কৃণ্বন্নংহূরণাদুরূ বিত্তং মে অস্য রোদসী।। (ঋগ্বেদ-১/১০৫/১৭)।
অর্থাৎ :
সর্বদেবের আদিভূত সেই যজ্ঞকে আমি প্রশ্ন করছি। তার দূতেরা সঠিকভাবে কথা বলুক। অতীতের সেই ঋত কোথায় গমন করেছে? কে সেই ‘নূতন’ যিনি তাকে ধারণ করেন? আমার এই কথা অবগত হও, হে দ্যাবাপৃথিবী। (ঋক-১/১০৫/৪)।।  ত্রিলোকে অবস্থানকারী দেবগণ, তোমাদের ঋত কোথায় অবস্থান করে? অনৃতই বা কেন? অতীতের মতো তোমাদের আহুতিই বা কোথায়? আমার এই কথা অবগত হও, হে দ্যাবাপৃথিবী। (ঋক-১/১০৫/৫)।।  দেবগণ, কোথায় গেলো ঋত-র সেই ধারণ? কোথায় গেলো বরুণের রাগ? কোথায় গেলো অর্যমার ইচ্ছাপূরক কর্মের পথ? অতএব আমরা দুঃখে পতিত হয়েছি। আমার এই কথা অবগত হও, হে দ্যাবাপৃথিবী। (ঋক-১/১০৫/৬)।।  দুঃখ-নিবারক অন্ন-কারী বরুণকে আমি বলছি– আমি দৃঢ় হৃদয়ে বলছি– নূতন করে ঋত-র জন্ম হোক। আমার এই কথা অবগত হও, হে দ্যাবাপৃথিবী। (ঋক-১/১০৫/১৭)।।


ঋত-কে ফিরে পাবার এই আকুতি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কেননা যৌথ-জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত নিয়মানুবর্তিতার চেতনাতেই বৈদিক ঋত-র উৎস।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : দেবতা ও মানব- ইন্দ্র, বরুণ ও মরুৎগণ] [*] [পরের পর্ব : যজ্ঞ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

2 Responses to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৫ : ঋত|"

darun laglo eto bistarito gyan labh kore vedic ‘rito’-r byapare

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,064 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: