h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৪ : দেবতা ও মানব– ইন্দ্র, বরুণ ও মরুৎগণ|

Posted on: 07/07/2015


Perseus

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৪ : দেবতা ও মানব– ইন্দ্র, বরুণ ও মরুৎগণ |
রণদীপম বসু

৩.৪ : দেবতা ও মানব– ইন্দ্র, বরুণ ও মরুৎগণ

ঋগ্বেদের প্রধান দেবতা বলতে অবশ্যই বরুণ ও ইন্দ্র। এবং প্রধানতম বলেই, বিদ্বান গবেষকদের মতে, এঁদের সূত্র অনুসরণ করে বৈদিক সমাজ ও বৈদিক চিন্তার অত্যন্ত মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং বিবর্তন বোঝবার সুযোগ হতে পারে। তবে বর্তমান আলোচনার প্রাসঙ্গিক হিসেবে বৈদিক দেবতাদের প্রকৃতি বোঝার আশায় কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিচার করা যেতে পারে। এবং পর্যালোচনার সুবিধার্থে এক্ষেত্রে আমরা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থের আলোচনা-রীতির অনুসরণ করতে পারি।


ঋগ্বেদে মরুৎগণের প্রচুর উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈদিক কবিদের বর্ণনায় এঁদের একটি প্রধান কীর্তি বলতে যুদ্ধে ইন্দ্রের সহায়তা। সেসব বর্ণনায়– মরুৎগণ যুদ্ধে ইন্দ্রকে বর্ধিত করেন এবং তাঁর সহায় হন, বৃত্র-সংহারে সাধারণত তাঁরাই ইন্দ্রের সহচর, শম্বর প্রমুখের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁরাই ইন্দ্রের সহায়ক। বস্তুত ইন্দ্রের প্রায় সমস্ত যুদ্ধমূলক কীর্তিতে মরুৎগণের সাহচর্য বর্ণিত হয়েছে। যেমন–

যা আভজো মরুত ইন্দ্র সোমে যে ত্বামবর্ধন্নভবন্ গণস্তে।
তেভিরেতং সজোষা বাবশানোহগ্নেঃ পিব জিহ্বয়া সোমমিন্দ্র।। (ঋগ্বেদ-৩/৩৫/৯)।
উত ঋতুভির্ঋতুপাঃ পাহি সোমমিন্দ্র দেবেভিঃ সখিভিঃ সুতং নঃ।
যা আভজো মরূতো যে ত্বাম্বহন্বৃত্র মদধূস্তুভ্যমোজঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/৪৭/৩)।
যে ত্বাহিহত্যে মঘবন্নবর্ধন্যে শাম্বরে হরিবো যে গবিষ্টৌ।
যে ত্বা নূনমনুমদন্তি বিপ্রাঃ পিবেন্দ্র সোমং সগণো মরুদ্ভিঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/৪৭/৪)।
বৃত্রেণ যদহিনা বিভ্রদায়ুধা সমস্থিথা যুধয়ে শংসমাবিদে।
বিশ্বে তে অত্র মরুতঃ সহ ত্মনাবর্ধন্নুগ্র মহিমানমিন্দ্রিয়ম্ ।। (ঋগ্বেদ-১০/১১৩/৩)।
অর্থাৎ :
হে ইন্দ্র! সোমপান কালে যে মরুৎগণকে সম্ভাবিত কর, যারা যুদ্ধে তোমাকে বর্ধিত করে ও তোমার সহায় হয়, সে সকল মরুৎগণের সাথে মিলিত হয়ে সোমপানাভিলাষী হয়ে অগ্নির জিহ্বা দ্বারা পান কর। (ঋক-৩/৩৫/৯)।।  হে ঋতুপা ইন্দ্র! তুমি সখিভূত মরুৎগণের সাথে আমাদের অভিষুত সোম পান কর। তুমি যাদের যুদ্ধে সাহায্যার্থে গ্রহণ করেছিলে যাঁরা তোমাকে আনুকূল্য করায় তুমি বৃত্রকে বধ করেছিলে, সে মরুৎগণ তোমাকে পরাক্রম প্রদান করেছিলেন। (ঋক-৩/৪৭/৩)।।  হে মঘবন ইন্দ্র! যাঁরা বৃত্র বধে তোমাকে প্রোৎসাহিত করেছিলেন, হে অশ্ববান! যাঁরা শম্বর বধে তোমাকে প্রোৎসাহিত করেছিলেন, যাঁরা ধেনুগণের জন্য যুদ্ধে তোমাকে প্রোৎসাহিত করেছিলেন, যাঁরা অদ্যাপি তোমাকে হৃষ্ট করেন, সে মরুৎগণের সাথে সোম পান কর। (ঋক-৩/৪৭/৪)।।  হে উগ্রতেজা ইন্দ্র! যখন তুমি স্তবের বাসনাতে অস্ত্রশস্ত্র ধারণপূর্বক দুর্ধর্ষ বৃত্রের সাথে যুদ্ধ করবার জন্য অগ্রসর হলে তখন সমস্ত মরুৎগণ তোমার মহিমা বাড়িয়ে দিলে, নিজেও তারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হলেন। (ঋক-১০/১১৩/৩)।।


কিন্তু একটি ঋকে ঠিক একই প্রসঙ্গে মরুৎগণের পরিবর্তে নরগণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে–

স শ্রুধি যঃ স্মা পাতনাসু কাসু চিদ্দক্ষায্য
ইন্দ্র ভরহূতয়ে নৃভিরসি প্রতূর্তয়ে নৃভিঃ।
যং শূরৈঃ স্বঃ সনিতা যো বিপ্রের্বাজং তরুতা।
তমীশানাস ইরধন্ত বাজিনং পৃক্ষমত্যং ন বাজিনম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১২৯/২)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! তুমি যুদ্ধের নেতা, তুমি নরগণের সাথে প্রধান প্রধান যুদ্ধে স্পর্ধাপূর্বক শত্রুসংহারে সমর্থ, তুমি শূরগণের সাথে স্বয়ং সংগ্রাম সুখ অনুভব কর। ঋত্বিকগণ স্তব করলে তুমি তাদের অন্ন প্রদান কর, আমাদের স্তুতি শ্রবণ কর। অভ্যর্থনা সমর্থ ঋত্বিকগণ গমনশীল অন্নবান ইন্দ্রকে অশ্বের ন্যায় সেবা করে। (ঋক-১/১২৯/২)।।


প্রশ্ন হলো, এখানে নর বা মানবগণের সঙ্গে মিলিত হবার তাৎপর্য কী? উত্তরে টীকাকার সায়ণ বলছেন, ‘নরগণের সাথে’ অর্থে ‘মরুৎগণের সাথে’ বোঝায়, কেননা–

‘নৃভিঃ মনুষ্যৈরেব সদ্ভিঃ পশ্চাদ্দেবত্বমাপন্নৈর্মরুদ্ভিঃ’। (সায়ণভাষ্য)
অর্থাৎ : এই মরুৎগণ আগে মানুষই ছিলেন এবং পরে তাঁরা দেবতাদের পর্যায়ে ওঠেন।


সায়ণের এই ব্যাখ্যাকে যদি প্রকৃত বৈদিক ঐহিত্য-প্রতিষ্ঠিত বলে গ্রহণ করা হয় তাহলে বৈদিক দেবতা হিসেবে মরুৎগণের একটি চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্য স্বীকার করতে হবে যে– মরুৎগণ বলতে আগে কোনো এক মানবদল বোঝাতো, ক্রমশ তাঁরাই দেবত্বগৌরবে বিভূষিত হন। বস্তুত, মর্ত্যের মানবদের পক্ষেই দেবত্ব-গৌরবে উন্নীত হবার কথা। শুধুমাত্র মরুৎপণ প্রসঙ্গেই নয়, ঋভুগণ নামের আর এক দেবগোষ্ঠি সম্বন্ধেও সায়ণ মন্তব্য করেছেন–

‘ঋভবো হি মনুষ্যাঃ সন্ত স্তপসা দেবত্বং প্রাপ্তঃ’। (সায়ণভাষ্য)
অর্থাৎ : ঋভুগণ মানুষ ছিলেন, তপস্যা দ্বারা তাঁরা দেবত্ব প্রাপ্ত হন।


সায়ণের এ-জাতীয় ব্যাখ্যাকে বৈদিক ঐতিহ্যসম্মত বলে স্বীকার করতে হলে ঋগ্বেদের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যর মধ্যে সমতুল্য দৃষ্টান্ত থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে অন্তত ঋভুগণের দৃষ্টান্তে ঋগ্বেদের সাক্ষ্য বিরল নয়। যেমন–

আভোগয়ং প্র যদিচ্ছন্ত ঐতনাপাকাঃ প্রাঞ্চো মম কে চিদাপয়ঃ।
সৌধন্বনাসশ্চরিতস্য ভূমনাগচ্ছত সবিতুর্দাশুষো গৃহম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১১০/২)।
তৎ সবিতা বোহমৃতত্বমাসুবদগোহ্যং যচ্ছ্রবয়ন্ত ঐতেন।
তাং চিচ্চমসমসুরস্য ভক্ষণমেকং সন্তমকৃণুতা চতুর্বয়ম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১১০/৩)।
বিষ্ট্বী শমী তরণিত্বেন বাঘতো মর্তাসঃ সন্তো অমৃতত্বমানশুঃ।
সৌধন্বনা ঋভবঃ সূরচক্ষসঃ সম্বৎসরে সমপৃচ্যন্ত ধীতিভিঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১১০/৪)।
অর্থাৎ :
হে ঋভুগণ! তোমরা আমার জ্ঞাতি, তোমাদের জ্ঞান যখন অপরিপক্ক ছিল, সেই পূর্বকালে তোমরা উপভোগ্য সোমরস ইচ্ছা করে গিয়েছিলে। হে সুধন্বার পুত্রগণ! তখন তোমাদের কর্মের মহত্ত্ব দ্বারা দানশীল সবিতার গৃহে এসেছিলে। (ঋক-১/১১০/২)।।  যখন তোমরা প্রকাশমান সবিতাকে তোমাদের (সোমপানের) ইচ্ছা জানিয়ে এসেছিলে এবং অসুর ত্বষ্টার নির্মিত সেই একটি সোমপাত্রকে চারখানা করেছিলে, তখন সবিতা তোমাদের অমরত্ব দান করেছিলেন। (ঋক-১/১১০/৩)।।  তাঁরা শীঘ্র কর্ম সাধন করেছেন বলে এবং ঋত্বিকদের সাথে মিলিত হয়েছিলেন বলে মানুষ হয়েও অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তখন সুধন্বার পুত্র ঋভুগণ সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান হয়ে সাংবৎসরিক যজ্ঞসমূহের হব্যভাজন হলেন। (ঋক-১/১১০/৪)।।


এখানে বেদের কবি জ্ঞাতি ঋভুগণকে সুধন্বার পুত্রগণ বলে সম্বোধন করছেন। নিরুক্তমতে (নিরুক্ত-১১/১৬) ঋভু, বিভু এবং বাজ– এই তিনজন ছিলেন সুধন্ব নামের জনৈক অঙ্গিরার পুত্র। অতএব ঋভুদের পূর্বপুরুষ বলতে অঙ্গিরস্গণ। এবং ঋগ্বেদের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য বিচার করলে দেখা যায়, এই অঙ্গিরস্গণও ঋভুগণের মতোই আদিতে মানবমাত্র ছিলেন এবং ক্রমশ তাঁরা দেবত্ব-গৌরবে উন্নীত হন। উইন্টারনিটস্ প্রমুখ আধুনিক বিদ্বান গবেষকদের মতে অঙ্গিরস্গণ ছিলেন প্রাচীনকালের পুরোহিত, বা পুরোহিত-জাদুকর। ঋগ্বেদের কবিরা তাঁদের বারবার প্রাচীন পিতৃগণ বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন–

য উদাজন্-পিতরো গোময়ং বস্বৃতেনাভিন্দন্ পরিবৎসরে বলম্ ।
দীর্ঘায়ুত্বমঙ্গিরসো বো অস্তু প্রতি গৃভ্ণীত মানবং সুমেধসঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/২)।
বীলু চিন্দৃড়্হা পিতরো ন উকথৈরদ্রিং রজন্নঙ্গিরসো রবেণ।
চক্রুর্দিবো বৃহতো গাতৃমস্মে অহঃ স্বর্বিবিদুঃ কেতুমুস্রাঃ।। (ঋগ্বেদ-১/৭১/২)।
অর্থাৎ :
হে অঙ্গিরাগণ ! তোমরা আমাদের পিতাস্বরূপ, তোমরা গোধন তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলে। তোমরা এক বৎসরকাল যজ্ঞ করে গোধনের অপহরণকারী বল নামক শত্রুকে নিধন করেছিলে। তোমরা দীর্ঘায়ু হও। আমি মানব এসেছি, আমাকে তোমরা যজ্ঞ সমাপনের জন্য নিযুক্ত কর। (ঋক-১০/৬২/২)।।  অঙ্গিরা নামক আমাদের পিতৃগণ মন্ত্র দ্বারা অগ্নির স্তুতি করে বলবান ও দৃঢ়াঙ্গ পণি (নামক অসুরকে) স্তুতি-শব্দ দ্বারাই বিনাশ করেছিলেন এবং আমাদের নিমিত্ত মহৎ দ্যুলোকের পথ করেছিলেন। পরে তাঁরা সুখকর দিবস, আদিত্য ও গো-সমূহ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। (ঋক-১/৭১/২)।।


এবং অন্যত্রও তাঁরা প্রাচীন কবি এবং সুস্পষ্টভাবেই মানব হিসেবে সম্বোধিত হয়েছেন–

দধ্যঙ্ হ মে জন্ষং পূর্বো অঙ্গিরাঃ প্রিয়মেধঃ কন্বো অত্রির্মনুবিদুস্তে
মে পূর্বে মনু র্বিদু। তেষাং দেবেষ্বায়তিরম্মাকং তেষু নাভয়ঃ।
তেষাং পদেন মহ্যা গিরেন্দ্রাগ্নী আ নমে গিরা।। (ঋগ্বেদ-১/১৩৯/৯)।
অর্থাৎ : প্রাচীন দধীচি, অঙ্গিরা, প্রিয়মেধ, কন্ব, অত্রি এবং মনু আমার জন্ম কথা জানেন। এ পূর্বকালীন ঋষিগণ ও মনু আমার পূর্বপুরুষগণকে জানেন। কারণ মহর্ষিগণের মধ্যে তাঁরা দীর্ঘায়ু এবং আমার জীবনের সাথে তাঁদের সম্বন্ধ আছে। আমি তাঁদের মহৎপদ হেতু তাঁদের স্তুতি করি ও নমস্কার করি। আমি ইন্দ্র ও অগ্নিকে স্তুতি করি ও নমস্কার করি। (ঋক-১/১৩৯/৯)।।


কিন্তু মানব হলেও ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ এবং নিবিড় সহযোগিতার বিবরণ অবশ্যই চিত্তাকর্ষক। যেমন–

অস্য সুবনস্য মন্দিনস্ত্রিতস্য ন্যর্বুদং বাবৃধানো অস্তঃ।
অবর্তয়ৎ সূর্যো ন চক্রং ভিনদ্বলমিন্দ্রো অঙ্গিরস্বান্ ।। (ঋগ্বেদ-২/১১/২০)।
তব ক্রত্বা তব তদ্দংসানাভিরামাসু পক্বং শচ্যা নিদীধঃ।
ঔর্ণোর্দুর উস্রিয়াভ্যো বি দৃড়হোদুর্বাদ্গা অসৃজো অঙ্গিরস্বান্ ।। (ঋগ্বেদ-৬/১৭/৬)।
ভিনদ্বলমঙ্গিরোভির্গৃণানো বি পর্বতস্য দৃংহিতান্যৈরৎ।
রিণগ্রোধাংসি কৃত্রিমাণ্যেষাং সোকস্য তা মদ ইন্দ্রশ্চকার।। (ঋগ্বেদ-২/১৫/৮)।
অর্থাৎ :
এ হর্ষযুক্ত সুরান ত্রিতদ্বারা বর্ধিত হয়ে ইন্দ্র অর্বুদকে বিনাশ করেছিলেন। সূর্য যেরূপ রথচক্র ঘূর্ণিত করেন, সেরূপ ইন্দ্র অঙ্গিরাগণের সাহায্য লাভ করে বজ্র ঘূর্ণিত করেছিলেন এবং বলকে বিনাশ করেছিলেন। (ঋক-২/১১/২০)।।  হে ইন্দ্র! তুমি নিজ জ্ঞান, কার্য ও শক্তি দ্বারা অপরিণত গোসমূহে পরিণত দুগ্ধ অর্পণ করেছ। তুমি অঙ্গিরাগণের সাথে সমবেত হয়ে গোষ্ঠ হতে ধেনুবৃন্দ উন্মুক্ত করেছ। (ঋক-৬/১৭/৬)।।  অঙ্গিরসগণের সহায়তায় ইন্দ্র বলকে বিদীর্ণ করেছিলেন, পর্বতের দৃঢ়ীকৃত দ্বার উদ্ঘাটিত করেছিলেন, কৃত্রিম রোধসকলও উদ্ঘাটিত করেছিলেন। ইন্দ্র সোমজনিত হর্ষ উৎপন্ন হলে এ সকল কর্ম করেছিলেন। (ঋক-২/১৫/৮)।।

এবং এমনকি ইন্দ্র অঙ্গিরসগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা অগ্রগণ্য হিসেবে ‘অঙ্গিরস্তমঃ’ বলেও বর্ণিত হয়েছেন। যেমন–

অবিন্দদ্দিবো নিহিতং গুহা নিধিং বের্ন গর্ভং পরিবীতমশ্মন্যনন্তে অন্তরশ্মনি।
ব্রজং বজ্রী গবামিব সিষাসন্-অঙ্গিরস্তমঃ।
অপ্মবৃণোদিষ ইন্দ্রঃ পরীবৃতা দ্বার ইষঃ পরীবৃতাঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৩০/৩)।
অর্থাৎ : পক্ষীগণ যেরূপ (দুর্গম স্থানে শাবক রক্ষা করে) তা প্রাপ্ত হয়, সেরূপ ইন্দ্র অতি গোপনীয় স্থানে স্থাপিত এবং অনন্ত ও অতিমহান প্রস্তর রাশিতে পরিবেষ্টিত সোমরস স্বর্গ হতে লাভ করলেন। অঙ্গিরাগণের অগ্রগণ্য বজ্রধারী ইন্দ্র সোমপানের অভিলাষে পূর্বে যেরূপ গোব্রজকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সেরূপ সোমরস প্রাপ্ত হলেন। (ঋক-১/১৩০/৩)।।


আরো মজার বিষয় হলো, ঋগ্বেদের অন্যান্য দৃষ্টান্তে দেখা যায়, গো-ধন লাভ বা গো-ধন অপহরণ সংক্রান্ত কীর্তির গৌরব অঙ্গিরসদের উপরই অর্পিত হচ্ছে, ইন্দ্র যেন তখন তাঁদের সহচরমাত্র। যেমন–

ইন্দ্রেণ যুজা নিঃ সৃজন্ত বাঘতো ব্রজং গোমন্তমশ্বিনম্ ।
সহস্রং মে দদতো অষ্টকর্ণ্যঃ শ্রবো দেবেষ্বকৃত।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/৭)।
অর্থাৎ : তাঁরা (অঙ্গিরাগণ) ইন্দ্রের সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে কর্মানুষ্ঠান করতে করতে অশ্বযুক্ত ও গোধনযুক্ত গোষ্ঠ উদ্ধার করেছেন, তাঁরা বিস্তীর্ণ কর্ণযুক্ত একসহস্র গাভী আমাকে দান করে দেবতাদের উদ্দেশে যজ্ঞীয় অন্ন উৎসর্গ করেছেন। (ঋক-১০/৬২/৭)।।


দেবীপ্রসাদের মন্তব্য অনুযায়ী, প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ ‘ম্যাকডোনেল’-এর মতে, ইন্দ্রের বিশিষ্ট গৌরব অঙ্গিরসগণের উপর সরে আসবার একটা মাঝামাঝি অবস্থার পরিচয় এই দৃষ্টান্তে পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য দৃষ্টান্তে দেখা যায়, গৌরবটি সরাসরি অঙ্গিরসগণের উপরই অর্পিত। অঙ্গিরাগণ গো-ধন তাড়িয়ে আনছেন ও বলকে নিধন করছেন, যজ্ঞপ্রভাবে তাঁরা এমনকি সূর্যকে আকাশে আরোহণ করিয়েছেন এবং সকলের জননীভূতা পৃথিবীকে সুবিস্তীর্ণ করেছেন। যেমন–

য উদাজন্-পিতরো গোময়ং বস্বৃতেনাভিন্দন্ পরিবৎসরে বলম্ ।
দীর্ঘায়ুত্বমঙ্গিরসো বো অস্তু প্রতি গৃভ্ণীত মানবং সুমেধসঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/২)।
য ঋতেন সূর্যমারোহয়ন্ দিব্যপ্রথয়ন্ পৃথিবীং মাতরং বি।
সুপ্রজাস্ত্বমঙ্গিরসো বা অস্তু প্রতি গৃভণীত মানবং সুমেধসঃ।।  (ঋগ্বেদ-১০/৬২/৩)।
অর্থাৎ :
হে অঙ্গিরাগণ! তোমরা আমাদের পিতাস্বরূপ, তোমরা গোধন তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলে। তোমরা এক বৎসরকাল যজ্ঞ করে গোধনের অপহরণকারী বল নামক শত্রুকে নিধন করেছিলে। তোমরা দীর্ঘায়ু হও। আমি মানব এসেছি, আমাকে তোমরা যজ্ঞ সমাপনের জন্য নিযুক্ত কর। (ঋক-১০/৬২/২)।। যে তোমরা যজ্ঞ প্রভাবে আকাশে সূর্যকে আরোহণ করিয়েছ এবং সকলের জননীভূতা পৃথিবীকে সুবিস্তীর্ণ করেছ, সে তোমরা উৎকৃষ্ট সন্তানসন্ততি সম্পন্ন হও। আমি মানব এসেছি, আমাকে তোমরা যজ্ঞ সমাপনের জন্য নিযুক্ত কর। (ঋক-১০/৬২/৩)।।


স্বভাবতই এ-ক্ষেত্রে অঙ্গিরস্গণকে আর শুধু মানুষ বলা যায় না; ঋগ্বেদের কবি তাই বলছেন–

বিরূপাস ইদৃষয়স্ত ইদ্গম্ভীরবেপসঃ।
তে অঙ্গিরসঃ সূনবস্তে অগ্নেঃ পরি জজ্ঞিরে।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/৫)।
যে অগ্নেঃ পরি জজ্ঞিরে বিরূপাসো দিবস্পরি।
নবগ্বো নু দশগ্বো অঙ্গিরস্তমঃ সচা দেবেষু মংহতে।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/৬)।
অর্থাৎ :
সে সমস্ত অঙ্গিরা ভিন্ন ভিন্ন মূর্তিধারী, তাঁদের ক্রিয়াকলাপ গম্ভীর, অর্থাৎ কেউ সন্ধান পায় না। সে অঙ্গিরাগণ অগ্নির পুত্র, তাঁরা চতুর্দিকে আবির্ভূত হলেন। (ঋক-১০/৬২/৫)।।  তাঁরা অগ্নির চতুর্দিকে আবির্ভূত হলেন, নানা মূর্তিতে গগনের চতুর্দিকে উদয় হলেন। কেউ নবগ্ব অর্থাৎ নয় মাস যজ্ঞের পর গো-ধন পেয়েছেন, কেউ দশগ্ব অর্থাৎ দশ মাস যজ্ঞ করে গো-ধন পেয়েছেন। যিনি অঙ্গিরাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি দেবতাদের সাথে একত্র অবস্থিতি করে আমাকে ধনদান করছেন। (ঋক-১০/৬২/৬)।।


কিন্তু শুধুমাত্র দেবতাদের সঙ্গে একত্র অবস্থিতি করার কথাই নয়; বস্তুত অঙ্গিরস্গণ দেবত্বগৌরবেই উন্নীত হয়েছিলেন। তাই ঋগ্বেদের কবির উক্তি–

যে যজ্ঞেন দক্ষিণয়া সমক্তা ইন্দ্রস্য সখ্যমমৃতত্বমানশ।
তেভ্যো ভদ্রমঙ্গিরসো বো অস্তু প্রতি গৃভ্ণীত মানবং সুমেধসঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/১)।
অর্থাৎ : হে অঙ্গিরাগণ! তোমরা যজ্ঞীয়দ্রব্য ও দক্ষিণা সংগ্রহ করে ইন্দ্রের বন্ধুত্ব ও অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছ। অতএব তোমাদের মঙ্গল হোক। হে মেধাবিগণ ! আমি মানব এসেছি, আমাকে তোমরা যজ্ঞ সমাপনের জন্য নিযুক্ত কর। (ঋক-১০/৬২/১)।।


আর দেবমাহাত্ম্যে অন্যদের সঙ্গে তাঁর সমতুল্য হয়েছিলেন বলেই বৈদিক কবিদের পক্ষে বারবার বৃহস্পতি, অগ্নি প্রভৃতি প্রধান বৈদিক দেবতাদেরও অঙ্গিরস্ আখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো। যেমন–

যো অদ্রিভিৎপ্রথমজা ঋতাবা বৃহস্পতিরাঙ্গিরসো হবিষ্মান্ ।
দ্বিবর্হজ্মা প্রাঘর্মসৎপিতা ন আ রোদসী বৃষভো রোরবীতি।। (ঋগ্বেদ-৬/৭৩/১)।
ত্বমগ্নে প্রথমো অঙ্গিরা ঋষি র্দেবো দেবানামভবঃ শিবঃ সখা।
তব ব্রতে কবয়ো বিদ্মনাপসোহজায়স্ত মরুতো ভ্রাজদৃষ্টয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-১/৩১/১)।
অর্থাৎ :
যে বৃহস্পতি অদ্রি ভেদ করেন, যিনি প্রথমে জাত হয়েছেন, যিনি সত্যবান, অঙ্গিরস ও যজ্ঞভাগী, যিনি লোকদ্বয়ে সুন্দররূপে গমন করেন, যিনি দীপ্তস্থানে বর্তমান এবং যিনি আমাদের পিতা, সে বৃহস্পতি বর্ষক হয়ে দ্যাবাপৃথিবীতে গর্জন করেন। (ঋক-৬/৭৩/১)।।  হে অগ্নি! তুমি অঙ্গিরা ঋষিদের আদি ঋষি ছিলে, দেব হয়ে দেবগণের মঙ্গলময় সখা হয়েছ; তোমার কর্মে মেধাবী, জ্ঞাতকর্মা ও উজ্জ্বলাযুধ মরুৎগণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (ঋক-১/৩১/১)।।


বৈদিক সংস্কৃতিতে যজ্ঞে সোমরস আহুতি দেয়া হয় দেবতার উদ্দেশ্যেই কেবল। সেক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, দৃষ্টান্ত-বিশেষে অঙ্গিরসগণের উদ্দেশে এমনকি সোম আহুতি দেবার কথাও ঋগ্বেদে পাওয়া যায়–

অঙ্গিরসো নঃ পিতরো নবগ্বা অথর্বাণো ভৃগবঃ সোম্যাসঃ।
তেষাং বয়ং সুমতৌ যজ্ঞিয়ানামপি ভদ্রে সৌমনসে স্যাম।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/৬)।
অর্থাৎ : অঙ্গিরা নামক অথর্বন নামক এবং ভৃগু নামক আমাদের পিতৃলোকগণ এ মাত্র এসেছেন, তাঁরা সোমরস পাবার অধিকারী, সে যজ্ঞভোক্তা পিতৃলোকগণ যেন আমাদের শুভানুধ্যান করেন, যেন আমরা তাদের প্রসন্নতা লাভ করে কল্যাণভাগী হই। (ঋক-১০/১৪/৬)।।


অতএব অনুমান করতে হয় যে, মরুৎগণ ও ঋভুগণের মতোই এই অঙ্গিরস্গণও আসলে মানবমাত্রই ছিলেন এবং তাঁদের গৌরব-কীর্তনের উৎসাহে বৈদিক কবিরা তাঁদের দেবতা আখ্যা দিয়েছেন।
এ-প্রসঙ্গে আরো একটি দৃষ্টান্ত দেখা যায়। আগেই দেখেছি, দ্যুলোকের দুটি বিখ্যাত যমজ দেবতার নাম অশ্বিদ্বয়। ঋগ্বেদে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, মনোহর কর্মদ্বারা তাঁরা ইন্দ্রলোকে দেবতা হয়ে উঠেছিলেন–

মহত্তদ্বঃ কবয়ঃ চারু নাম যদ্ধ দেবা ভবথ বিশ্বে ইন্দ্রে।
সখ ঋৃভুভিঃ পুরুহূত প্রিয়েভিরিমাং ধিয়ং সাতয়েতক্ষতা নঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/৫৪/১৭)।
অর্থাৎ : হে নাসত্যদ্বয় কবি দেবগণ! তোমাদের সে মহৎ কর্ম মনোহর, যে কর্ম দ্বারা তোমরা সকলে ইন্দ্রলোকে দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছ। হে পুরুহূত ইন্দ্র! তুমি ঋভুগণের সাথে সখ্য ভাবাপন্ন। তোমরা এ স্তুতি আমাদের ধন লাভের জন্য স্বীকার কর। (ঋক-৩/৫৪/১৭)।।


তাঁদের এই দেবত্বপদে উন্নীত হবার কল্পনা থেকে স্বভাবতই অনুমান হয়, শুরুতে তাঁরা দেবতা ছিলেন না। কোন কবি তাই এই দেবদ্বয়কে সম্বোধন করে বলেছেন–

আ নো দেবেভিরূপ যাতমর্বাক্সজোষসা নাসত্যা রথেন।
যুবোর্হি নঃ সখ্যা পিত্র্যাণি সমানো বন্ধুরুত তস্য বিত্তম্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/৭২/২)।
অর্থাৎ : হে নাসত্যদ্বয়! তোমরা দেবগণের সাথে প্রীতিযুক্ত হয়ে রথারোহণে আমাদের নিকট উপস্থিত হও। তোমাদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব পিতৃক্রমাগত, বন্ধুত্ব সম্পর্কে তোমরা আমাদের সমান। তোমাদের এবং আমাদের পিতৃগণকে এক বলে জেনো, ধনও এক। (ঋক-৭/৭২/২)।।


অতএব, স্বীকার করতে হবে,– ‘উত্তরকালে দেবতা বলতে আমরা যা বুঝতে অভ্যস্ত হয়েছি প্রাচীন কালের কবিরা ঠিক তা বুঝতেন না। বস্তুত, মহান মানব এবং দেবতার মধ্যে প্রভেদ তাঁদের কাছে সবসময় সুস্পষ্ট নয়। তাই একদিকে যেমন মানবদের পক্ষে দেবত্ব-গৌরবে উন্নীত হবার কথা অপরদিকে আবার ঋগ্বেদের প্রধানতম দেবতাদেরও বারবার সুস্পষ্টভাবেই নর বা নরশ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করবার অভ্যাস দেখা যায়।’- (ভারতীয় দর্শন, দেবীপ্রসাদ, পৃষ্ঠা-১৬১)

ঋগ্বেদে এরকম প্রচুর নজির রয়েছে যেখনে ইন্দ্রকে সরাসরি নর বা মানব বলা হয়েছে, কোথাও তিনি নরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নর ইত্যাদি, যেমন–

অনু প্রত্নস্যৌকসো হুবে তুবিপ্রতিং নরং।
ষং তে পূর্বং পিতা হুবে।। (ঋগ্বেদ-১/৩০/৯)।
সমিন্দ্রো গা অজয়ৎ সং হিরণ্যা সমশ্বিয়া মঘবা যো হ পূর্বীঃ।
এভি র্নৃভি নৃতমো অস্য শাকৈ রায়ো বিভক্তা সম্ভরশ্চ বস্বঃ।। (ঋগ্বেদ-৪/১৭/১১)।
নৃণামু ত্বা নৃতমং গীর্ভিরুকথৈরভি প্র বীরমর্চতা সবাধঃ।
সং সহসে পুরুমায়ো জিহীতে নমো অস্য প্রদিব এক ঈশে।। (ঋগ্বেদ-৩/৫১/৪)।
অর্থাৎ :
ইন্দ্র বহুলোকের নিকট গমন করেন, পুরাতন আবাস হতে আমি সে মানবকে আহ্বান করি, যাঁকে পিতা পূর্বে আহ্বান করেছিলেন। (ঋক-১/৩০/৯)।।  যে ধনবান ইন্দ্র গাভী জয় করেছিলেন, হিরণ্য জয় করেছিলেন, অশ্ব সমুদয় জয় করেছিলেন, বহুতর শত্রুসেনা জয় করেছিলেন; সামর্থ্য দ্বারা নরশ্রেষ্ঠ সে নেতা এ স্তোতৃগণ কর্তৃক স্তুত হয়ে মানবগণের সঙ্গে মিলে তিনি ধন-বিভাগে রত হোন। (ঋক-৪/১৭/১১)।।  হে ইন্দ্র ! তুমি মনুষ্যগণের নেতা ও বীর, বাধাপ্রাপ্ত ঋত্বিকগণ তোমাকে স্তুতিদ্বারা ও উকথদ্বারা বিশেষরূপে অর্চনা করে। বহু কর্মবিশিষ্ট ইন্দ্র বলের জন্য গমনোদ্যম করেন, পুরাতন একমাত্র ইন্দ্র এ অন্নের ঈশ্বর, তাঁকে নমস্কার। (ঋক-৩/৫১/৪)।।

ইন্দ্রকে উদ্দেশ করে ঋগ্বেদে বলা হয়েছে–

প্রতি ধানা ভরত তুয়মস্মৈ পুরোলাশং বীরতমায় নৃণাম্ ।
দিবোদিবো সদৃশীরিন্দ্র তুভ্যং বর্ধন্তু ত্বা সোমপেয়ায় ধৃষ্ণো।। (ঋগ্বেদ-৩/৫২/৮)।
ত্বং তা ইন্দ্রোভয়া অমিত্রান্দাসা বৃত্রাণ্যার্যা চ শূর।
বধী র্বনেব সুধিতেভিরৎকৈরা পৃৎসু দর্ষি নৃণাং নৃতম।। (ঋগ্বেদ-৬/৩৩/৩)।
অর্থাৎ :
এঁকে শীঘ্র ভৃষ্ট যব প্রদান কর। ইনি মানবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠবীর, এঁকে পুরোডাশ প্রদান করা। হে অভিভবিতা ইন্দ্র! তোমার উদ্দেশে প্রত্যহ একবিধ স্তুতি করা হয়ে থাকে, এ সোম পানের জন্য তোমাকে প্রোৎসাহিত করুক। (ঋক-৩/৫২/৮)।।  হে বীর ইন্দ্র! তুমি কি দস্যু, কি আর্য, উভয়বিধ শত্রুই সংহার করেছ। হে নরশ্রেষ্ঠ! কাষ্ঠছেদক যেরূপ বৃক্ষসকল ছেদন করে সেরূপ তুমি সংগ্রামে সুনিক্ষিপ্ত অস্ত্রসমূহদ্বারা শত্রুগণকে বিদারিত কর। (ঋক-৬/৩৩/৩)।।


ঋগ্বেদের আরও বহু দৃষ্টান্তে ইন্দ্রকে শ্রেষ্ঠ নর– নৃতমঃ– বা নরদিগের শ্রেষ্ঠ নর– নৃণাং নৃতমঃ– বলে উল্লেখ করবার পরিচয় পাওয়া যায়।
কিন্তু শুধু ইন্দ্র নন। ঋগ্বেদে অগ্নিকেও নৃতমঃ, নৃণাং নৃতমঃ, নৃণাং নৃপতে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন–

স নো নৃণাং নৃতমো রিশাদা অগ্নির্গিরোহবসা বেতু ধীতিম্ ।
তনা চ যে মঘবানঃ শবিষ্ঠা বাজপ্রসূতা ইষয়ন্ত মন্ম।। (ঋগ্বেদ-১/৭৭/৪)।
অর্থাৎ : অগ্নি মানবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নেতা ও শত্রুগণের বিনাশকারী। অগ্নি আমাদের স্তুতি ও অন্নযুক্ত যজ্ঞ কামনা করুন এবং যে ধনশালী ও বলশালী যজমানগণ অন্ন প্রদান করে অগ্নির মননীয় স্তোত্র ইচ্ছা করে, অগ্নি তাঁদেরও স্তুতি কামনা করুন। (ঋক-১/৭৭/৪)।।


এভাবে আরো অন্যান্য দেবতাকেও কখনো নরশ্রেষ্ঠ, কখনো বা মানবদলের সাথে মিলিত হয়ে সোমরস পানের জন্য আহ্বান জানানোর দৃষ্টান্ত ঋগ্বেদে অনেক আছে। বৈদিক দেবতারা প্রায়ই এইভাবে মানব বা মানব-শ্রেষ্ঠ হিসেবে পরিকল্পিত বলেই বৈদিক মানুষদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও প্রায়ই একান্ত সহযোগিতা ও সখ্যের সম্পর্ক। এ বিষয়েও অজস্র নজির রয়েছে ঋগ্বেদে। যেমন–

দুরো অশ্বস্য দুর ইন্দ্র গোরসি দুরো যবস্য বসুন ইনস্পতিঃ।
শিক্ষানরঃ প্রদিবো অকামকর্শণঃ সখা সখিভ্যস্তমিদং গৃণীমসি।। (ঋগ্বেদ-১/৫৩/২)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! তুমি অশ্ব দান কর, গো দান কর, যবাদি ধান্য দান কর এবং তুমি নিবাস হেতুভূত ধনের প্রভু ও পালক। তুমি শিক্ষার নেতা, তুমি বহুদিনের পুরাতন দেব, তুমি কামনা ব্যর্থ কর না, তুমি সখাদের মধ্যে সখা। তাঁরই উদ্দেশে আমরা এ স্তুতি পাঠ করি। (ঋক-১/৫৩/২)।।


এইভাবে বহুবার অগ্নিকেও সখা হিসেবে উল্লেখ করতে দেখা যায়। তাছাড়া অন্যান্য দেবতাদের সম্পর্কেও অনুরূপ বন্ধুত্ব সম্পর্কের নজির চোখে পড়ে। অশ্বিদ্বয় প্রসঙ্গেও একই কথা। তেমনি সোম, ব্রহ্মণস্পতি, সবিতৃ, বরুণ, মিত্র অর্যমন্ প্রমুখ দেবতাদের সঙ্গেও বৈদিক কবি ও তাঁদের জ্ঞাতিদের প্রগাঢ় বন্ধুত্বের উল্লেখ ঋগ্বেদে বিরল নয়। তাই আধুনিক বিদ্বান গবেষকেরা মন্তব্য করেন যে, স্বভাবতই এই একান্ত সৌহার্দ-পূর্ণ বৈদিক দেবতাগুলির উপর আধুনিক অর্থে আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আরোপ করা যুক্তিযুক্ত হবে না। এ-প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন–
বৈদিক দেবতাদের নজির দেখিয়ে ঋগ্বেদে আধ্যাত্মিক চেতনার পরিচয় অন্বেষণ করার বিরুদ্ধে আরও একটি যুক্তি এখানে উল্লেখ করা যায়।… এই প্রাচীন সাহিত্যটির প্রধানতম বিষয়বস্তু বলতে পার্থিব সম্পদের কামনাই, যদিচ ওই অনুন্নত পর্যায়ে পার্থিব সম্পদ বলতে নেহাতই অন্ন, গো, স্বাস্থ্য, সন্তান, নিরাপত্তা, ইত্যাদিই। অতএব, বৈদিক কবিদের কাছে পুরুষার্থ বলতে এ-জাতীয় সম্পদ উপভোগই; অন্তত পরবর্তী কালে প্রকৃত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে যা পরম পুরুষার্থ বলে স্বীকৃত– অর্থাৎ মোক্ষ– ঋগ্বেদে সে-বিষয়ে চেতনার ঐকান্তিক অভাব অবশ্য স্বীকার্য। বৈদিক দেবতাদের প্রসঙ্গেও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ওই পার্থিব সম্পদের কামনাই ঋগ্বেদের দেবকল্পনার একটি প্রধানতম উপাদান।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৬৩)

প্রসঙ্গত, ঋগ্বেদের একটি ঋকে ইন্দ্রকে ‘কৌশিক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেমন–

আ তু ন ইন্দ্র কৌশিক মন্দসানঃ সুতং পিব।
নব্যমায়ুঃ প্র সূ তির কৃধী সহস্রসামৃষিম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১০/১১)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! শীঘ্র আমাদের নিকট এস; হে কৌশিক! হৃষ্ট হয়ে অভিষুত সোম পান কর; নব্য আয়ুঃ সম্যকরূপে বর্ধন কর, এ ঋষিকে সহস্রধনোপেত কর। (ঋক-১/১০/১১)।।


টীকাকার সায়ণ এই ‘কৌশিক’ অর্থের ব্যাখ্যায় বলেছেন ‘কুশিকস্য পুত্র ইন্দ্র’। কিন্তু তিনি হয়তো স্পষ্টই অনুভব করেছেন, এই সরল ব্যাখ্যাকে এমন সহজে গ্রহণ করায় বাধা ওঠে। কেননা, ঋগ্বেদে ‘কৌশিক’ বা কুশিক-পুত্র হিসেবে বিখ্যাত বলতে ঋষি বা কবি বিশ্বামিত্র। অতএব সায়ণ বলছেন–

‘যদ্যপি বিশ্বামিত্রঃ কুশিকস্য পুত্রস্তথাপি তদ্রূপেন ইন্দ্রস্যৈবোৎপন্নত্বাৎ কুশিকপুত্রত্বমবিরুদ্ধম্’। (সায়ণভাষ্য)
অর্থাৎ : যদিও বিশ্বামিত্রই কুশিকের পুত্র তবুও সেইরূপ ইন্দ্রের উৎপন্নত্ব-হেতু কুশিক-পুত্রত্বও অবিরুদ্ধ।


নজির হিসেবে সায়ণ সর্বানুক্রমণী উদ্ধৃত করে বলছেন,– ইন্দ্রতুল্য পুত্রলাভের জন্য কুশিক ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন, তাই তিনি যজ্ঞে ইন্দ্রকেই পুত্ররূপে লাভ করেন। কিন্তু সহজেই বোঝা যায়, এ-জাতীয় কাহিনী কোন এক সুপ্রাচীন স্মৃতির ব্যাখ্যায় উদ্ভাবন করা হয়েছিলো। কেননা–
কৌশিক’ আসলে একটি সুপ্রাচীন গোত্র-নাম এবং ঋগ্বেদের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকেই (ঋক-৩/৩৩/৫) বোঝা যায়, সেই গোত্রেই বিশ্বামিত্র (বা বিশ্বামিত্রদের) জন্ম। কিন্তু ‘কুশিক’ মানে ‘পেঁচা’; অতএব অনুমান হয়, এই গোত্রটির পিছনে কোন-এক আদিম টোটেম-ক্লানের ইতিহাস প্রচ্ছন্ন আছে। এই ঋগ্বেদের সাক্ষ্য অনুসারে ইন্দ্র যদি ‘কৌশিক’ হন তাহলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, এই সুপ্রসিদ্ধ বৈদিক দেবতাটিরও আসলে মানব-বংশেই জন্ম; অতএব আদিতে তিনি মানব-মাত্রই ছিলেন।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৬২)

ঋগ্বেদের আরেকটি চিত্তাকর্ষক বিষয় হলো বিভিন্ন দেবতাদের পক্ষে বিশেষণ প্রয়োগ। যেমন, সরস্বতীর দেহ রত্ন-দাতা (রত্নধা) এবং রত্নজ্ঞ (বসুবিৎ) (ঋক-১/১৬৪/৪৯) ঋভুগণ রত্নদাতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ– রত্নধাতমঃ (ঋক-১/২০/১)। অগ্নি প্রসঙ্গেও একই কথা (ঋক-১/১/১)। ইন্দ্র অন্নদাতা বা বাজদা (ঋক-৩/৩৬/৫), উষস্ বাজ-প্রসূতা (ঋক-১/৯২/৮)। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ জাতীয় বর্ণনা দেবতা ও মানব প্রসঙ্গে প্রায় নির্বিশেষে ব্যবহৃত। নরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নর অগ্নি তাদের ধনবান (মঘবানঃ) অন্ন-উৎপাদক (বাজপ্রসূতাঃ) এবং অন্ন-কারী (ইষয়ন্ত) করেন (ঋক-১/৭৭/৪)। অগ্নি নিজেও ধনের পতি (রয়ীণাম্ পতিঃ) এবং অন্নের ভর্তাঃ (বাজম্ভরঃ) (ঋক-১/৬০/৫)। অগ্নি অন্ন তৈরি করেন (বাজয়তে) (ঋক-৪/৭/১১) এবং ইন্দ্র অন্ন-উৎপাদকদের বন্ধু (শ্রবয়ৎ সখা) (ঋক-৮/৪৬/১২)। ইন্দ্র (ঋক-৩/৬০/৬) ও অশ্বিদ্বয় (ঋক-৮/৩৫/১৫) অন্নপূর্ণ (বাজবান, বাজবন্ত)। অগ্নি রত্নগুলির মধ্যে (রয়িপতিঃ রয়ীণাম্) রত্ন-পতি (ঋক-১/৬০/৪)। অগ্নি অন্ন বর্ধন করেন (অন্ন-বৃধঃ) এবং অন্নের সাথে (প্রতি চরন্তি অন্নৈঃ) সঞ্চরণ করেন (ঋক-১০/১/৪)।

তবে এ-জাতীয় বর্ণনার মধ্যে বৈদিক কবিরা যেগুলি তাঁদের দেবতা ও তাঁদের জ্ঞাতি উভয়ের প্রসঙ্গেই নির্বিচারে ব্যবহার করেছেন, সেগুলিই সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক। যেমন একটি শব্দ ‘অর্কিন্– অন্নবান বা অন্নযুক্ত। মরুৎগণকে (ঋক-১/৩৮/১৫) অর্কিন্ বলে সম্বোধন করা হয়েছে এবং মানবগোষ্ঠির বর্ণনাতেও অর্কিন্ (ঋক-১/৭/১, ১/১০/১) শব্দ ব্যবহৃত।
এ-জাতীয় আর একটি শব্দ ‘বাজরত্ন’– অন্নে রমণীয় বা রমণীয় অন্নযুক্ত। অশ্বিদ্বয় (ঋক-৪/৪৩/৭) ও ঋভুগণ (ঋক-৪/৩৪/২, ৪/৩৫/৫) বাজরত্না- বিশেষণে বিভূষিত; বৈদিক কবিরা আবার সেই সঙ্গেই বলছেন, ‘আমরা যেন অন্নযুক্ত হয়ে বাজরত্নাঃ হতে পারি’ (ঋক-৫/৪৯/৪)। ‘ইন্দ্র যেন আমাদের জ্ঞানগুলিকে (বা কর্মগুলি– ধিয়ঃ) বাজরত্ন করেন’ (ঋক-৬/৩৫/১)–

কদা ভুবনথ্রক্ষয়াণি ব্রহ্ম কদা স্তোত্রে সহস্রপোষ্যং দাঃ।
কদা স্তোমং বাসয়োহস্য কদা ধিয়ঃ করসি বাজরত্নাঃ।। (ঋগ্বেদ-৬/৩৫/১)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! আমার স্তোত্র সকল কবে রথারূঢ় তোমার নিকট উপস্থিত হবে? কবে তুমি তোমার উপাসক আমাকে সহস্র পোষ্য পোষণ করবার উপায় প্রদান করবে? কবে তুমি এ স্তবকারী আমার স্তোত্র ধনদ্বারা পুরস্কৃত করবে? কবেই বা তুমি যজ্ঞীয় কার্যে সকলকে অন্নোৎপাদক (বাতরত্নাঃ) করবে?


এরকম আর একটি চিত্তাকর্ষক দৃষ্টান্ত ‘বাজয়ন্’ অর্থাৎ অন্ন তৈরি করতে বা উৎপাদন করতে করতে। দেব-প্রসঙ্গে এই শব্দের ব্যবহার বিরল নয়। যেমন, বলাভিলাষী ইন্দ্রের উদ্দেশে ‘বাজয়ন্তম্’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে (ঋক-৮/৯৮/১২), সোম-এর বর্ণনায় বাজয়ন্ শব্দ পাওয়া যায় (ঋক-৯/৬৮/৪); অন্নযুক্ত ঋভুদের সঙ্গে বাজয়ন্ ইন্দ্রকে যজ্ঞাভিমুখে যাবার অনুরোধ করা হয়েছে (ঋক-৩/৬০/৭)। ‘অন্ন উৎপাদন করতে করতে (বাজয়ন্ত) আমরা, হে ইন্দ্র, তোমাকে সোম দ্বারা সেচন করি (ঋক-১/৩০/১); ‘যজ্ঞে অন্ন উৎপাদন করতে করতে আমরা ইন্দ্রকে আহ্বান করি (ঋক-১/১৩২/১)। অনেক দৃষ্টান্তে দেখা যায়, অন্ন-উৎপাদন করবার সময় ইন্দ্রের স্তুতি করা হয়েছে। যেমন– ‘হে ইন্দ্র, অন্ন-উৎপাদন কালে আমরা তোমার স্তুতি করি’ (ঋক-৬/১৯/৪), ‘অন্ন উৎপাদন করতে করতে অন্ন-লাভের জন্য আমরা ইন্দ্র ও বায়ুকে আহ্বান করি’ (ঋক-৭/৯০/৭), ‘ইন্দ্রের প্রতি অন্ন-উৎপাদক শব্দগুলি প্রেরণ করা হয়’ (ঋক-৮/৩/১৫), ‘হে ইন্দ্র, অন্ন-উপৎপাদ আমাদের রক্ষা কর’ (ঋক-৫/৩৫/৭)।
কিন্তু বিশেষ চিত্তাকর্ষক কথা হলো, এমনকি ঋগ্বেদের যুগেও কোনো কবির মনে হয়েছে, অন্ন-উৎপাদনের জন্য জনগণের প্রচেষ্টাই পর্যাপ্ত, অতএব এই প্রসঙ্গে ইন্দ্রের স্তুতি অবান্তর মাত্র–

‘প্র সু স্তোমং ভরত বাজয়ন্ত ইন্দ্রায় সত্যং যদি সত্যমস্তি।
নেন্দ্রো অস্তীতি নেম উ ত্ব আহ ক ঈং দদর্শকমভিষ্টবাম।।’ (ঋগ্বেদ-৮/১০০/৩)।
অর্থাৎ : হে সংগ্রামেচ্ছুগণ! অন্ন-উৎপাদনরত (বাজয়ন্তঃ) তোমরা ইন্দ্রকে স্তুতিপূর্ণ কর, যেন ইন্দ্র সত্যিই বর্তমান আছেন; (কিন্তু) নেম ঋষি বলেন ইন্দ্র বলে কেউ নেই; কে তাকে দেখেছে? অতএব আমরা কার স্তুতি করবো? (ঋক-৮/১০০/৩)।।


এই সূক্তটি ভৃগুগোত্রীয় নেম ঋষির রচনা। পরবর্তী ঋক-এ অবশ্য ইন্দ্র নেম-এর সামনে অভির্ভূত হয়ে তাঁর সংশয় দূর করেছেন–

অয়মস্মি জরিতঃ পশ্য মেহ বিশ্বা জাতন্যাভ্যস্মি মহ্না।
ঋতস্য মা প্রদিশো বর্ধয়ন্ত্যাদর্দিরো ভুবনা দর্দরীমি।। (ঋগ্বেদ-৮/১০০/৪)।
অর্থাৎ : হে স্তোতা! এ আমি তোমার নিকট এসেছি, আমাকে দর্শন কর, সমস্ত ভুবনকে আমি মহিমাদ্বারা অভিভূত করি। যজ্ঞের প্রদেষ্টৃগণ আমাকে বর্ধিত করে, আমি বিদারণশীল, আমি ভুবন বিদীর্ণ করি। (ঋক-৮/১০০/৪)।।


এ-জাতীয় আরও অজস্র দৃষ্টান্ত ঋগ্বেদের প্রায় সর্বত্রই ছড়ানো রয়েছে। বস্তুত, এ-কথা বললে অতিশয়োক্তির আশঙ্কা থাকে না যে ধন, অন্ন প্রভৃতি পার্থিব সম্পদের কামনা চরিতার্থতাই যেহেতু কবিদের কাছে প্রায় এক এবং অদ্বিতীয় পুরুষার্থ ছিলো সেই হেতু তাঁদের কল্পনায় এমন কোনো দেবতার স্থানই হয়নি যিনি কিনা অত্যন্ত নিবিড় এবং প্রত্যক্ষভাবে সে-কামনার সঙ্গে জড়িত নন। এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটি এক্ষেত্রে অবশ্যই উদ্ধৃতিযোগ্য–

বৈদিক কবিদের উপর আমরা পাছে অসতর্কভাবে পরবর্তী কালের আধ্যাত্মিক চেতনা আরোপ করে বসি তাই জন্য এখানে একটি কথা পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন। শব্দার্থের তুলনায় শব্দ-পরিবর্তন অনেক মন্থর; নতুন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থ বোঝাবার জন্য প্রায়ই পুরনো কালে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত শব্দ সংরক্ষিত হয়ে থাকে। ঋগ্বেদ যে প্রকৃতপক্ষে অধ্যাত্ম জ্ঞানের আধার– এ-জাতীয় সংস্কারের মূলে উক্ত ঘটনার প্রভাব যে বাস্তবিকই কতখানি তা বিচার করা প্রয়োজন। কেননা, ঋগ্বেদে এমন বহু শব্দ পাওয়া যায় পরবর্তীকালে যেগুলির তাৎপর্য সুস্পষ্টভাবেই আধ্যাত্মিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ঋগ্বেদে সেগুলির তাৎপর্য আদপেও আধ্যাত্মিক নয়। এক কথায়, শব্দগুলির আদি-তাৎপর্য কালক্রমে বিপরীতে পর্যবসিত হয়েছে।
সবচেয়ে সহজ দৃষ্টান্ত ‘ভগবান’ শব্দ। ঋগ্বেদে ‘ভগ’ মানে পার্থিব সম্পদ (ধন) বা তার অংশ (ভাগ); ভগবান মানে ধনবান বা অংশবান। শব্দটির বৈদিক প্রয়োগের মধ্যে তাই উত্তরকালের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অন্বেষণ করা অবান্তর হবে।
আর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত ‘ঈশ্বর’ শব্দ। নিঘণ্টু-মতে (নিঘণ্টু-২/২২) তার চারটি প্রতিশব্দ আছে: রাষ্ট্রী, অর্য, নিযুত্বৎ এবং ইন। কিন্তু কোনটিরই আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নেই। বিস্তার বা বৃদ্ধি-কর্ম-পরায়ণ অর্থে এগুলি ব্যবহৃত। কিসের বিস্তার বা বৃদ্ধি? যে-প্রসঙ্গে শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়েছে তা বিচার করলে সংশয়ের অবকাশ থাকে না যে তা প্রধানতই ধন, অন্ন প্রভৃতি পার্থিব সম্পদেরই বিস্তার বা বৃদ্ধি। এ-বিষয়ে অনেক নজির উদ্ধৃত করা যায়, কিন্তু তার তালিকা ক্লান্তিকর হবে। পাদ-টীকায় (ঋক-১/৩৩/৩; ১/৫৩/২; ১/৭০/১-২; ১/৭১/৩; ১/৮১/৬; ১/১৩৫/৪; ১/১৪৯/১; ইত্যাদি ইত্যাদি) মাত্র কয়েকটি নিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া গেল।
কিন্তু সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দৃষ্টান্ত ‘ব্রহ্মন্’ শব্দ। বেদান্ত বা উত্তর-মীমাংসা দর্শনে ব্রহ্মন্ মানে চিন্ময় পরমসত্তা। কিন্তু ঋগ্বেদে এ-তাৎপর্যের ঐকান্তিক অভাব লক্ষণীয়। শব্দটির আদি-অর্থ অন্ন বা ধন। ব্রহ্মন্ শব্দের এই অর্থ-বিপর্যয়ের ইতিহাস পরে বিচার করতে হবে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৬৪-৫)

বৈদিক দেবতাদের নজির দেখিয়ে ঋগ্বেদে অধ্যাত্মবাদী চেতনা প্রমাণ করা যায় কিনা, এ-বিষয়ে আর একটি যুক্তি উল্লেখ করে দেবীপ্রসাদ বলেন–
ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায়গুলির মধ্যে পূর্ব-মীমাংসাকে নিঃসংশয়ে আস্তিক বা বেদপন্থী বলে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই পূর্ব-মীমাংসায় শুধুই যে জগৎ-স্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্ব-সম্ভাবনা সুবিস্তৃত যুক্তি-তর্কের সাহায্যে খণ্ডিত হয়েছে তাই নয়, এমনকি ঋগ্বেদের সুবিখ্যাত দেবতাগুলির গৌরবও সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়েছে। মীমাংসকেরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, বৈদিক যজ্ঞে এমনকি যজ্ঞ-ফল উৎপাদনের ব্যাপারেও বৈদিক দেবতাদের কোনো কর্তৃত্ব বা প্রাধান্য নেই; যজ্ঞফলের জন্য প্রধান বা প্রায়োজক বলতে আসলে যজ্ঞকর্মই (মীমাংসাসূত্র-৯/১/৯-১০, বিশেষত শবরভাষ্য দ্রষ্টব্য)।… মীমাংসকাচার্যদের মতো একান্ত বেদপন্থী দার্শনিকেরাও ঋগ্বেদের দেবগরিমাকে এই অর্থে গ্রহণ করেননি যে বৈদিক কবিদের বিশ্বাস অনুসারে ওই দেবতাগুলির উপাসনা করে তাঁদের দয়া বা দান হিসেবে কামনার সাফল্য লাভ করা যায়, বা কামনার সাফল্য এই দেবতাদের ইচ্ছাধীন। পূর্ব-মীমাংসা দর্শনের ব্যাখ্যায় প্রভাকর ও কুমারিল প্রবর্তিত দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে নানা মৌলিক বিষয়ে গভীর পার্থক্য সত্ত্বেও এই নির্দিষ্ট বিষয়টিতে উভয়ে সম্পূর্ণ একমত।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৬৫)

পূর্ব-মীমাংসার এই চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্য পরবর্তীতে মীমাংসা-দর্শনের আলোচনায় প্রয়াস করা যাবে। তবে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ বৈদিক দেবতা ‘বরুণ’-এর কিছুটা পরিচিতি দেয়া না-হলে বৈদিক দেবতার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

.
দেবতা বরুণের ইতিবৃত্ত :

ঋগ্বেদের ঋষিদের কাছে বরুণ হলেন স্বর্গস্থানের দেবতা। আধুনিক বিদ্বান ও বেদ-গবেষকেরা অনুমান করেন, আদিপর্বে এই বরুণই ছিলেন বৈদিক দেবলোকের মধ্যে প্রধান; কালক্রমে তাঁর গৌরব ইন্দ্রের গৌরবের নিচে চাপা পড়েছিলো।
ঋগ্বেদে দেখা যায় এই বরুণই দ্যাবা-পৃথিবীকে পরস্পর থেকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন করেছিলেন–

ঘৃতবতী ভুবনানামভিশ্রিয়োর্বী পৃথ্বী মধুদুঘে সুপেশসা।
দ্যাবাপৃথিবী বরুণস্য ধর্মণা বিষ্কভিতে অজরে ভূরিরেতসা।। (ঋগ্বেদ-৬/৭০/১)।
ধীরা ত্বস্য মহিনা জনূংষি বি যস্তস্তম্ভ রোদসী চিদুর্বী।
প্র নাকমৃষ্বং নুনূদে বৃহন্তং দ্বিতা নক্ষত্রং পপ্রথচ্চ ভূম।। (ঋগ্বেদ-৭/৮৬/১)।
যঃ শ্বেতা অধিনির্ণিজশ্চক্রে কৃষ্ণা অনুব্রতা।
স ধাম পূর্ব্যং মমে যঃ স্কন্তেন বি রোদসী
অজো ন দ্যামধারয়ৎ নভ্যন্তামন্যকে সমে।। (ঋগ্বেদ-৮/৪১/১০)।
অর্থাৎ :
হে দ্যাবাপৃথিবী! তোমরা উদকবতী, ভূতসমূহের আশ্রয়ণীয়া, বিস্তীর্ণা, প্রথিতা, মধুদুঘা, স্বরূপবিশিষ্টা। দৌ ও পৃথিবী বরুণের ধর্মদ্বারা এবং প্রভূত বলের দ্বারা চিরকাল পৃথক হয়ে আছে। (ঋক-৬/৭০/১)।।  তাঁর (বরুণের) জন্ম মহান এবং ধীর, ইনি পৃথিবী ও স্বর্গকে নিজ নিজ স্থানে স্থাপিত করেছিলেন। ইনি বৃহৎ আকাশ ও দর্শনীয় নক্ষত্রকে দ্বিধা প্রেরণ করেন। ইনি ভূমিকেও বিস্তীর্ণ করেছেন। (ঋক-৭/৮৬/১)।।  যিনি (বরুণ) নিজ রশ্মিসমূহকে শ্বেতবর্ণ করেন এবং কৃষ্ণবর্ণ করেন, তাঁর কর্মের উদ্দেশে দ্যুলোক ও অন্তরীক্ষলোক নির্মিত হয়েছে। আদিত্য যেরূপ দ্যৌ বা দ্যুলোক ধারণ করেন, সেরূপ তিনি (বরুণ) দ্যৌ ও পৃথিবীকে পৃথকরূপে ধারণ করেছিলেন। (ঋক-৮/৪১/১০)।।

এবং ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশে ঋষিদের যে পার্থিব কামনা তা বরুণের উদ্দেশে স্তুতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশিত–

ইরাবতীর্বরুণ ধেনবো বাং মধুমদ্বাং সিন্ধবো মিত্র দুহ্রে।
ত্রয়ন্তস্থুর্বৃষভাসস্তিসৃণাং ধিষণানাং রেতোধা বি দ্যুমন্তঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৬৯/২)।
বৃষ্টিদ্যাবা রীত্যাপেষস্পতী দানুমত্যাঃ। বৃহন্তং গর্তমাশাতে।। (ঋগ্বেদ-৫/৬৮/৫)।
আ নো মিত্রাবরুণা ঘৃতৈর্গব্যূতিমুক্ষতম্ । মধ্বা রজাংসি সক্রতূ।। (ঋগ্বেদ-৩/৬২/১৬)।
সং যা দানূনি যেমথুর্দিব্যাঃ পার্থিবীরিয়ঃ। নভস্বতীরা বাং চরন্তু বৃষ্টয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/২৫/৬)।
অর্থাৎ :
হে মিত্র ও বরুণ! তোমাদের আজ্ঞাক্রমে ধেনুগণ দুগ্ধবতী হয়, নদী সকল সুমধুর বারি প্রদান করে এবং দীপ্তিমান তিনটি বারিবাহক ও বারিবর্ষক অর্থাৎ অগ্নি, বায়ু ও আদিত্য স্ব স্ব উচিত তিন স্থানে অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দ্যুলোকে অবস্থান করে। (ঋক-৫/৬৯/২)।।  বারিবর্ষণকারী যে গতিযুক্ত দ্যুলোক, হে অন্নের অধিপতি, তোমাদের (মিত্র ও বরুণ) দানশীলতার জন্যই তাহা শ্রেষ্ঠ; তোমরা মহৎ গর্তকে আশ্রয় কর। (ঋক-৫/৬৮/৫)।।  হে শোভনকর্মকারী মিত্রাবরুণ! আমাদের গোষ্ঠ ঘৃতপূর্ণ কর, আমাদের বাসস্থান মধুর রসপূর্ণ কর। (ঋক-৩/৬২/১৬)।।  হে মিত্রাবরুণ! তোমরা আমাদেরকে দানের উপযোগী ধন এবং পার্থিব অন্ন দান কর; তোমাদের জলবতী বৃষ্টি আমাদের মধ্যে সঞ্চরণ করুক। (ঋক-৮/২৫/৬)।।


উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অন্যান্য বৈদিক দেবতাদের ক্ষেত্রে কবিদের মধ্যে যেভাবে জ্ঞাতি বা সখার পরিকল্পনা দেখা যায়, বরুণের ক্ষেত্রে ঠিক সেরকমটা চোখে পড়ে না। তবে ঋগ্বেদে বরুণের চরিত্রে যে সবচেয়ে মহান ঐশ্বর্যময় দিক সেটি হলো তাঁর নৈতিক গৌরবের দিক। ঋগ্বেদের প্রাচীন অংশে দেখা যায় নৈতিক নিয়মের চূড়ান্ত দায়িত্ব বরুণেরই উপর। যেমন–

পরি স্পশো বরুণস্য স্মদিষ্টা উভে পশ্যন্তি রোদসী সুমেকে।
ঋৃতাবানঃ কবয়ো যজ্ঞধীরাঃ প্রচেতসো য ইষয়ন্ত মন্ম।। (ঋগ্বেদ-৭/৮৭/৩)।
অর্থাৎ : বরুণের অনুচরগণ মঙ্গল-উদ্দেশ্যে স্বর্গ ও পৃথিবী পরিদর্শন করে, তাঁরই ভয়ে ঋতযুক্ত, ক্রান্তদর্শী যজ্ঞধীর বিজ্ঞগণ তাঁর উদ্দেশে স্তুতি প্রেরণ করেন। (ঋক-৭/৮৭/৩)।।


অনৃত বা মিথ্যার বিরুদ্ধে বরুণের কঠোর বিধান ঋগ্বেদে দেখা যায়–

যুবং বস্ত্রাণি পীবসা বসাথে যুবোরচ্ছিদ্রা মন্তবো হ সর্গাঃ।
অবাতিরতমনৃতানি বিশ্ব ঋতেন মিত্রাবরুণা সচেথে।। (ঋগ্বেদ-১/১৫২/১)।
ইমে চেতারো অনৃতস্য ভুরের্মিত্রো অর্যমা বরুণো হি সন্তি।
ইম ঋৃতস্য বাবৃধূর্দুরোণে শগ্মাসঃ পুত্রা অদিতেরদব্ধাঃ।। (ঋগ্বেদ-৭/৬০/৫)।
অর্থাৎ :
হে মিত্রাবরুণ! তোমরা (তেজরূপ) স্থূল বস্ত্রদ্বারা আচ্ছন্ন কর; তোমাদের সৃষ্টি ছিদ্রহীন ও মননযুক্ত। তোমরা সমস্ত অনৃত বিনাশ করে বিশ্বকে ঋতের সাথে যুক্ত করেছিলে। (ঋক-১/১৫২/১)।।  মিত্র, অর্যমা ও বরুণ প্রভূত অনৃত বা পাপের হন্তা; অদিতির অহিংসিত সুখকর পুত্রগণ গৃহে ঋতকে বর্ধিত করেছিলেন। (ঋক-৭/৬০/৫)।।


বরুণ শুধু অনৃত-হন্তা নন, ঋতের পালক, ঋতের বর্ধক। বস্তুত ঋতের সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্কের দিক থেকেই বরুণের নৈতিক গৌরবের সবচেয়ে বড়ো পরিচয়। তাই তাঁর কাছে বৈদিক কবিদের আর্তি–

শতং তে রাজন্ ভিষজঃ সহস্রমুর্বী গভীরা সুমতিষ্টে অস্তু।
বাধস্য দূরে নির্ঋতিং পরাচৈঃ কৃতং চিদেনঃ প্র মুমৃগ্ধ্যস্মৎ।। (ঋগ্বেদ-১/২৪/৯)।
ঋতেন যাবতাবৃধাবৃতস্য জ্যোতিষস্পতী। তা মিত্রাবরুণা হুবে।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/৫)।
অর্থাৎ :
হে বরুণরাজ! তোমার শত ও সহস্র ঔষধি আছে, তোমার সুমতি বিস্তীর্ণ ও গভীর হোক। নির্ঋতিকে পরাঙ্মুখ করে আমাদের থেকে দূরে রাখ, কৃত পাপের মোহ থেকে আমাদেরকে মুক্ত করো। (ঋক-১/২৪/৯)।।  যাঁরা ঋত দ্বারা ঋতকে বর্ধিত করেন, যাঁরা ঋতের প্রকাশকর্তা, সেই মিত্রাবরুণকে আহ্বান করি। (ঋক-১/২৩/৫)।।


ঋতের যা বিপরীত তারই নাম নিঃঋতি বা নির্ঋতি। মানে ঋতহীনত্ব। যখনি ঋতহীনতার আশঙ্কা জাগে তখন মনে পড়ে অতীতের এই বরুণই ছিলেন ঋতের পালক, ঋতের রক্ষক। ঋতের প্রসঙ্গে পরবর্তীতে আলোকপাতের চেষ্টা করা হবে। তবে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে দেবীপ্রসাদের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে–
অধ্যাপক রথ্ অনুমান করছেন যে, ঋগ্বেদ রচিত হবার যুগেই বৈদিক কবিদের কল্পনায় ইন্দ্রের গৌরব বরুণের চেয়ে অনেক বড়ো হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ আগে বরুণই ছিলেন বৈদিক মানুষদের প্রধানতম দেবতা এবং তাঁরই গৌরব সর্বাধিক। যতোই দিন গিয়েছে ততোই বরুণের গৌরব ম্লান হয়েছে এবং তারই জায়গায় ইন্দ্রের গৌরব চূড়ান্ত হয়ে উঠেছে– এ-পরিবর্তন ঋগ্বেদ রচিত হবার সুদীর্ঘ যুগটির মধ্যেই সাধিত হয়েছে। এই মতের পক্ষে একটি প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে যে, ঋগ্বেদের সবচেয়ে অর্বাচীন অংশে– দশম মণ্ডলে– বরুণের গৌরব-বর্ণনায় একটিও সূক্ত নেই; অপরপক্ষে পঁয়তাল্লিশটি সূক্ত ইন্দ্রের মহিমায় মুখর। কিন্তু অথ্যাপক ম্যাকডোন্যাল বলছেন, সূক্তসংখ্যা-নির্ভর এ-জাতীয় যুক্তির মূল্য খুব বেশি নয়। কেননা সামগ্রিকভাবে ঋগ্বেদে বরুণের তুলনায় ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে রচিত সূক্ত অনেক বেশি : তৃতীয় মণ্ডলেও বরুণের উদ্দেশ্যে কোনো সূক্ত নেই, কিন্তু ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে বাইশটি সূক্ত আছে; দ্বিতীয় মণ্ডলে ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে তেইশটি সূক্ত, তুলনায় বরুণের উদ্দেশ্যে মাত্র একটি।
অধ্যাপক ম্যাকডোন্যাল-এর এ-যুক্তি নিশ্চয়ই স্বীকার্য : সূক্তসংখ্যার দিক থেকে বৈদিক দেবতাদের আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ণয় করবার প্রচেষ্টা নির্ভরযোগ্য নয়। তবুও আমরা বৈদিক সাহিত্যের আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকেই অধ্যাপক রথ্-এর এই মতবাদটির পক্ষেই কিছু সমর্থন পেতে পারি।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৬১৬-৭)

এই আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যটা কী? ঋগ্বেদে বলা হয়েছে–

তং ব ইন্দ্রং ন সুক্রতুং বরুণমিব মায়িনম্ ।
অর্যমণং ন মন্দ্রং সৃপ্রভোজসং বিষ্ণুং ন স্তষ আদিশে।। (ঋগ্বেদ-৫/৪৮/১৪)।
অর্থাৎ : (হে মরুৎগণ), তোমরা ইন্দ্রকে শোভন যজ্ঞ বিশিষ্ট মায়াযুক্ত বরুণের ন্যায় (দেখবে), স্তুতি করবে; তিনি অর্যমার ন্যায় বুদ্ধিমান ও বিষ্ণুর ন্যায় দানশীল। (ঋক-৫/৪৮/১৪)।।


এখানে ‘মায়া’র প্রসঙ্গ এসেছে, তা পরে আলোচনা করা যাবে। দেবীপ্রসাদ বলেন, আপাতত প্রশ্ন হলো, উপরের উদ্ধৃতি থেকে কি এই কথাই অনুমান করা যায় না যে, ইতিপূর্বে বরুণকে যে-চোখে দেখা হতো ইন্দ্রকেও সেই চোখে দেখবার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে– অর্থাৎ বরুণের অতীত গৌরবই ইন্দ্রের উপর আরোপ করার আয়োজন হচ্ছে? অন্যত্রও এ-জাতীয় আভাস পাওয়া যায়–

ত্বং শর্ধায় মহিনা গৃণান উরু কৃধি মঘবঞ্ছগ্ধি রায়ঃ।
ত্বং নো মিত্রা বরুণো ন মায়ী পিত্বো ন দস্ম দয়সে বিভক্তা।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪৭/৫)।
অর্থাৎ : (হে ইন্দ্র!) বল পাবার জন্য তোমাকে বিশিষ্টরূপে স্তব করা হয়; তুমি বিপুল বল প্রদান কর, ধনও দাও। হে প্রিয়দর্শন! মিত্র ও বরুণের ন্যায় মায়াযুক্ত হয়ে তুমি আমাদের অন্নের বিভক্তা ও দাতা হও। (ঋক-১০/১৪৭/৫)।।


এর থেকে অনুমান করা যায় যে, এককালে মিত্র ও বরুণই মায়াযুক্ত হয়ে অন্নের দাতা ও বিভক্তা ছিলেন; এই ঋকটির রচনাকালে ইন্দ্রকেও সেই গৌরবে গৌরবান্বিত করে তোলবার আয়োজন হচ্ছে। কিন্তু কেন এ আয়োজন? এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে?
ইন্দ্রের পক্ষে এইভাবে বরুণের গৌরবময় স্থান অধিকার করবার পিছনে একটা ঐতিহাসিক কারণও থাকা স্বাভাবিক বা সম্ভব। কেননা, পশুপালন-নির্ভর ট্রাইবের পক্ষে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের দিকে যে-অগ্রগতি, তার একটি প্রধানতম অঙ্গ হলো যুদ্ধের উৎসাহ-বৃদ্ধি। প্রাচীন গোষ্ঠিগত সমষ্টির কামনা পরিবর্তিত হয়ে ব্যষ্টিস্বার্থের আবির্ভাবে লুণ্ঠন ও লোভের প্রভাবে সে-সমাজে ভাঙন ধরবার আভাস ঋগ্বেদেই পরিলক্ষিত হয়–

ঋৃষভং মা সমানানাং সপত্নানাং বিষাসহিম্ ।
হন্তারং শত্রূণাং কৃধি বিরাজং গোপতিং গবাম্ ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৬৬/১)।
অভিভূরহমাগমং বিশ্বকর্মেণ ধাম্না।
আ বশ্চিত্তমা বো ব্রতমা বোহহং সমিতিং দদে।। (ঋগ্বেদ-১০/১৬৬/৪)।
যোগক্ষেমং ব আদায়াহং ভূয়াসমুত্তম আ বো মূর্ধানমক্রমীম্ ।
অধস্পদান্ম উদ্বদত মন্ডূকা ইবোদকান্মন্ডূকা উদকাদিব।। (ঋগ্বেদ-১০/১৬৬/৫)।
অর্থাৎ :
(হে ইন্দ্র!) আমাকে সমানদের বা সমকক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কর, শত্রুদের পরাজয়িতা কর, শত্রুদের হন্তা এবং সর্বোপরিবর্তী করে গরুদের মধ্যে গোপতি কর। (ঋক-১০/১৬৬/১)।।  আমার তেজ সকল কর্মের জন্যই উপযুক্ত। সে তেজ দিয়ে আমি শত্রুদের অভিভূত করতে এসেছি; তোমাদের সমস্ত চিত্ত, কর্ম এবং সমিতিকে আমি অপহরণ করলাম। (ঋক-১০/১৬৬/৪)।।  তোমাদের (সপত্নদের) প্রাপ্ত ধনের অধিকারী হয়ে এবং আত্মসাৎ করে আমি তোমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়েছি এবং তোমাদের মস্তকে উঠেছি। পদতল হতে তোমরা ভেকের ন্যায় চিৎকার করতে থাকো। (ঋক-১০/১৬৬/৫)।।


এখানে শুধুই যে শত্রুদের পদদলিত করবার কামনা ফুটে উঠেছে তাই নয়,– ‘আমাদের’ কথাকে পদদলিত করে ‘আমাকে’, সামগ্রিক স্বার্থকে ধূলিসাৎ করে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চূড়ান্ত মর্যাদা দেওয়ার পরিচয়ও অস্পষ্ট নয়। কেননা, শত্রুজয় এবং শত্রুধন অপহরণ করবার প্রসঙ্গ ঋগ্বেদে বিরল নয়; কিন্তু আমরা ইতঃপূর্বে দেখেছি, যেখানে প্রাচীন পর্যায়ের সমান-জীবনের স্মৃতি ম্লান হয়নি সেখানে ইন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে, অগ্নিকে উদ্দেশ্য করে সেই জিত-ধনের অংশ বণ্টন করে দেবার কামনাই জানানো হয়েছে।

তাই ইন্দ্রের পক্ষে বরুণের গৌরবময় স্থান অধিকার করবার পিছনের ঐতিহাসিক কারণ ব্যাখ্যায় যুক্তি দেখাতে গিয়ে দেবীপ্রসাদ বলেন–
বৈদিক মানুষদের জীবনে যতোই লুণ্ঠন ও লোভের প্রভাব বর্ধিত হয়েছে,– যতোই বর্ধিত হয়েছে যুদ্ধের উদ্দীপনা– ততোই তাদের দেবলোকেও ওই যুদ্ধের দেবতা, লুণ্ঠনের দেবতা, বীর ইন্দ্রের গৌরব বেড়ে চলা স্বাভাবিক। এই ইন্দ্রের গৌরবই যদি সামগ্রিকভাবে ঋগ্বেদ-সংহিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে তাহলে অনুমান করতে হবে পশুপালনমূলক অর্থনীতির বিকাশের ওই পর্যায়টির বৈশিষ্ট্যই সামগ্রিকভাবে ঋগ্বেদ সংহিতার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
কিন্তু অতীতের স্মৃতি হিসেবেই হোক বা বাস্তবিক পক্ষে প্রাচীন রচনার পরিচায়ক হিসেবেই হোক, ঋগ্বেদ সংহিতাতেই এমন একটি দেবতার অতীত গৌরবের আভাস পাওয়া যাচ্ছে যাঁর মহিমার প্রধান কথা ওই লুণ্ঠন-অপহরণ-মূলক যুদ্ধ নয়– তার বদলে যিনি ছিলেন অন্নের বিভক্তা, অনৃতের হন্তা, ঋতের পালক। তাঁর নাম বরুণ। এবং কালক্রমে, বৈদিক ঋষিরা যতোই যুদ্ধকে মহত্তম যুক্তি বলে সম্মান করতে শিখেছিলেন ততোই তাঁদের সাহিত্যে বরুণের মহিমাকে অবদমিত করে ইন্দ্রের মহিমা প্রধান হয়ে উঠেছে।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৬১৮)

বৈদিক মানবদের এই মানসিক পরিবর্তনের আশ্চর্য দৃষ্টান্তও ঋগ্বেদে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এভাবে–

এভির্ন ইন্দ্রাহভির্দশস্য দুর্মিত্রাসো হি ক্ষিতয়ঃ পবন্তে।
প্রতি যচ্চষ্টে অনৃতমনেনা অব দ্বিতা বরুণো মায়ী নঃ সাৎ।। (ঋগ্বেদ-৭/২৮/৪)।
অর্থাৎ : হে ইন্দ্র! দুষ্ট মিত্ররূপী বাধাদানকারী মানবদল আসছে; তাদের কাছ থেকে ধন কেড়ে নিয়ে আমাদেরকে এই পুণ্য দিনে দান কর। মায়াবী বরুণ আমাদের মধ্যে যে অনৃত দেখেন তুমি তা দ্বিধাবিভক্ত করে অপনোদন কর। (ঋক-৭/২৮/৪)।।


এই লোভ, এই লুণ্ঠন, এই যুদ্ধকে বরুণ তখনো অসত্য বা অনৃত হিসেবেই দেখছেন। অর্থাৎ অমোঘ ন্যায়ের পালক বরুণের স্মৃতির সঙ্গে এই লোভ ও লুণ্ঠনের সামঞ্জস্য থাকছে না। তাই লুণ্ঠনের নেতা ইন্দ্রের কাছে কামনা জানানো হচ্ছে, অতীতকালের অমোঘ ন্যায়ের মানদণ্ডে যা আজ অন্যায়, অনৃত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে সেই অনৃতবোধকে দ্বিধাবিভক্ত করো, অপনোদন করো।

অতএব, দেবীপ্রসাদ বলছেন,– ‘বৈদিক মানুষেরা যখন এই কামনা করতে শিখেছেন তখন তাঁরা শ্রেণী সমাজের কতোখানি কাছাকাছি এসে পড়েছেন বেদবিদেরা তার আলোচনা করবেন। আপাতত আমাদের দ্রষ্টব্য হলো, বৈদিক সমাজের এই পরিবর্তনটির ফলে শুধুই যে অতীত দেবতার স্থানে নতুন দেবতার গৌরব ফুটে উঠছে তাই নয়, অতীতের দেবতার চরিত্রেরও বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে।
কেননা, মানব-ইতিহাসের অমোঘ নিয়মের সামনে এমনকি বৈদিক দেবতারাও অসহায়ের মতো। তাঁদের চরিত্রের প্রধানতম উপকরণ বলতে এই মরলোকের মানুষদেরই ধ্যানধারণা, আশা-আকাঙ্ক্ষা– শেষ পর্যন্ত যার উৎস হলো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। অতএব, ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফলে মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন দেখা দিলে, তাদের ধ্যানধারণা ও আশা-আকাঙ্ক্ষায় বিপর্যয় ঘটলে, দেবতার চরিত্রেও বিপর্যয় ঘটা অসম্ভব নয়।’- (লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা-৬১৯)।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : পৃথিবী স্থানের দেবতা] [*] [পরের পর্ব : ঋত ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 188,777 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: