h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৩ : পৃথিবী স্থানের দেবতা|

Posted on: 07/07/2015


shadowknight_coverart

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১৩ : পৃথিবী স্থানের দেবতা |
রণদীপম বসু

(গ) পৃথিবী স্থানের দেবতা

ঋগ্বেদে পৃথিবী স্থানের প্রধান দেবতারা হলেন অগ্নি, সোম, বৃহস্পতি এবং পৃথিবী। বৈদিক কবিদের কল্পনায় তাঁদের বর্ণনা নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। এ-প্রেক্ষিতে এই দেবতাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেখা যাক।


.
অগ্নি দেবতা :

পৃথিবীর দেবতাদের মধ্যে প্রধানতম বলতে এই অগ্নি। ঋগ্বেদে শুধু তাঁর স্তুতিতেই দুইশত পূর্ণাঙ্গ সূক্ত রচিত হয়েছে। এছাড়াও বহু সূক্তে অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে অজস্র পরিমাণে অগ্নির স্তুতি রয়েছে। বৈদিক কবিদের বর্ণনায় অগ্নি যজ্ঞের অবলম্বন; সেজন্য অগ্নিকে ঋত্বিক, পুরোহিত ও হোতা বলা হয়েছে। যেমন–

অগ্নিং বো দেবমগ্নিভিঃ সজোষা যজিষ্ঠং দূতমধ্বরে কৃণুধ্বম্ ।
যো মর্ত্যষেু নিধ্রুবির্ঋতাবা তপুর্মূর্ধা ঘৃতান্নঃ পাবকঃ।। (ঋগ্বেদ-৭/৩/১)।
হোতাজনিষ্ট চেতনঃ পিতা পিতৃভ্য ঊতয়ে।
প্রযক্ষঞ্জেন্যং বসু শকেম বাজিনো যমম্ ।। (ঋগ্বেদ-২/৫/১)।
স্বঃ স্বায় ধায়সে কৃণুতামৃত্বিগৃত্বিজম্ ।
স্তোমং যজ্ঞং চাদরং বনেমা ররিমা বয়ম্ ।। (ঋগ্বেদ-২/৫/৭)।
তবাগ্নে হোত্রং তব পোত্রমৃত্বিয়ং তব নেষ্ট্রং ত্বমগ্নিদৃতায়তঃ।
তব প্রশাস্ত্রং ত্বমধ্বরীয়সি ব্রহ্মা চাসি গৃহপতিশ্চ নো দমে।। (ঋগ্বেদ-২/১/২)।
অর্থাৎ :
হে দেবগণ ! যিনি মর্তগণের মধ্যে অত্যন্ত স্থিরভাবে অবস্থান করেন, যিনি যজ্ঞবান তাপক, তেজবিশিষ্ট, ঘৃতান্নযুক্ত ও পাবক, যিনি যাজ্ঞিকশ্রেষ্ঠ ও অন্য অগ্নিসমূহের সাথে মিলিত, সে অগ্নিদেবকে তোমরা যজ্ঞে দূত করো। (ঋক-৭/৩/১)।।  চৈতন্য স্বরূপ, পিতা স্বরূপ, হোতা অগ্নি পিতৃদের রক্ষার্থে উৎপন্ন হলেন। আমরা হব্যবিশিষ্ট হয়ে অত্যন্ত পূজনীয়, জেতব্য ও রক্ষিতব্য ধন লাভ করতে সমর্থ হব। (ঋক-২/৫/১)।।  হে ঋত্বিকরূপ অগ্নি আপনার কর্মের জন্য ঋত্বিকের কর্ম সমাধান করুন। আমরাও তদনন্তর স্তোম ও যজ্ঞ করব এবং হব্য প্রদান করব। (ঋক-২/৫/৭)।।  হে অগ্নি ! হোতার কর্ম তোমারই, পোতার কর্ম তোমারই, ঋত্বিকের কর্ম তোমারই, নেষ্টার কর্ম তোমারই। তুমি অগ্নীধ্র, তুমি যখন যজ্ঞ কামনা কর, তখন প্রশস্তার কর্ম তোমারই। তুমিই অধ্বর্যু, তুমিই ব্রহ্মানামক ঋত্বিক এবং তুমি আমাদের গৃহে গৃহপতি। (ঋক-২/১/২)।।


তবে এই বৈদিক দেবতাটির সাথে মূর্ত বা পার্থিব আগুনের মধ্যে প্রভেদও সর্বত্র সুস্পষ্ট নয়। অগ্নিই তাঁর রথে করে দেবতাদের যজ্ঞে আনয়ন করেন। ঘৃত এবং সমিৎ বা কাষ্ঠ তাঁর অন্ন বা আহার্য। তরল হব্য তাঁর পানীয়। তিনি মেদ ও ঘৃতের বিন্দুসমূহ বিশেষরূপে ভক্ষণ করেন, তীক্ষ্ণীভূত দন্ত দ্বারা তিনি বনসমূহকে দহন করেন, তাঁর জিহ্বা-স্পর্শে বনানী অঙ্গার-রূপ প্রাপ্ত হয়, তিনি সর্ব-ভক্ষক। যেমন–

দ্ব্রন্ন সর্পিরাসুতিঃ প্রত্নো হোতা বরেণ্যঃ। সহসম্পুত্রো অদ্ভুতঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৭/৬)।
বি যস্য তে পৃথিব্যাং পাজো অশ্রেত্তৃষু যদন্না সমবৃক্ত জম্ভৈঃ।
সেনেব সৃষ্টা প্রসিতিষ্ট এতি যবং ন দস্ম জুহ্বা বিবেক্ষি।। (ঋগ্বেদ-৭/৩/৪)।
ঘৃতমগ্নের্বধ্ন্যশ্বস্য বর্ধনং ঘৃতমন্নং ঘৃতম্বস্য মেদনম্ ।
ঘৃতেনাহুত উর্বিয়া বি পপ্রথে সূর্য ইব রোচতে সর্পিরাসুতিঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৬৯/২)।
ইমং নো যজ্ঞমমৃতেষু ধেহীমা হব্যা জাতবেদো জূষস্ব।
স্তোকানামগ্নে মেদসো ঘৃতস্য হোতঃ প্রাশান প্রথমো নিষদ্য।। (ঋগ্বেদ-৩/২১/১)।
ন যো বরায় মরুতামিব স্বনঃ সেনেব সৃষ্টা দিব্যা যথাশনিঃ।
অগ্নির্জভৈস্তিগিতৈরত্তি র্ভবতি যোধো ন শক্রন্ত্স বনা ন্যৃঞ্জতে।। (ঋগ্বেদ-১/১৪৩/৫)।
তমীলিষ্ব যো অর্চিষা বনা বিশ্বা পরিষ্বজৎ। কৃষ্ণা কৃণোতি জিহ্বয়া।। (ঋগ্বেদ-৬/৬০/১০)।
যুবানং বিশ্পতিং কবিং বিশ্বাদং পুরুবেপসম্ । অগ্নিং শুম্ভামি মন্মভিঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৪/২৬)।
অর্থাৎ :
সমিৎ যার অন্ন, যাতে সর্পিঃসিক্ত হয়, সে পুরাতন, হোমনিষ্পাদক, বরণীয়, বলের পুত্র অগ্নি অতি রমণীয়। (ঋক-২/৭/৬)।।  যখন তুমি দন্তদ্বারা কাষ্ঠাদিরূপ অন্ন ভক্ষণ কর, তোমার তেজ পৃথিবীতে বিমিশ্রিত হয়। তোমার শিখা সোনার ন্যায় বিসৃষ্ট হয়ে গমন করে, হে দর্শনীয় অগ্নি ! তুমি শিখাদ্বারা যবের ন্যায় কাষ্ঠাদি ভক্ষণ কর। (ঋক-৭/৩/৪)।।  বধ্রিঅশ্বের (সুমিত্রের পিতার) অগ্নি ঘৃতদ্বারাই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হন, ঘৃতই তাঁর আহার, ঘৃতই তাঁকে স্নিগ্ধ করে। ঘৃতাহুতি প্রাপ্ত হয়ে তিনি বিশিষ্টরূপে বিস্তৃত হলেন। ঘৃত ঢেলে দেওয়াতে সূর্যের ন্যায় দীপ্তি পাচ্ছেন। (ঋক-১০/৬৯/২)।।  হে জাতবেদা অগ্নি ! আমাদের এ যজ্ঞ অমরগণের নিকট সমর্পণ কর, আমাদের হব্য সেবা কর। হে হোতা ! উপবিষ্ট হয়ে সকলের প্রথমে মেদ ও ঘৃতের বিন্দুসমূহ বিশেষরূপে ভক্ষণ কর। (ঋক-৩/২১/১)।।  যেমন বায়ুর শব্দ, প্রবল রাজার সেনা এবং দ্যুলোকোৎপন্ন অশনি কেউ নিবারণ করতে পারে না, সেরূপ যে অগ্নিকে কেউ নিবারণ করতে পারে না সে অগ্নি যোধদের ন্যায় তীক্ষ্ণীভূত দন্তদ্বারা শত্রুদের ভক্ষণ ও বিনাশ করেন এবং বনসমূহকে দহন করেন। (ঋক-১/১৪৩/৫)।।  হে স্তবকারী ! যিনি শিখাদ্বারা সমগ্র বনসমূহকে আচ্ছন্ন করেন এবং জ্বালারূপ জিহ্বাদ্বারা তাদের কৃষ্ণবর্ণ করেন, তুমি সে অগ্নির স্তব কর। (ঋক-৬/৬০/১০)।।   অগ্নি যুবা, লোকপতি, কবি, সর্বভক্ষক ও বহুকর্মা; তাঁকে স্তোত্রদ্বারা শোভিত করছি। (ঋক-৮/৪৪/২৬)।।


অগ্নি প্রতিদিন দুটি অরণি কাষ্ঠের সংঘর্ষে প্রজ্জ্বলিত হন। তারাই তাঁর পিতামাতা। জন্মের পর তিনি তাদের খেয়ে ফেলেন। এই অগ্নির নানা রূপ। কখনও তিনি জাতবেদ্য, কখনও রক্ষোহা, কখনও দ্রবিণোদা, কখনও তনূনপাৎ, কখনও নরাশংস, কখনও অপাংনপাৎ, এবং কখনও তিনি মাতরিশ্বন্ । যেমন–

তদ্বামৃতং রোদসী প্র ব্রবীমি জায়মানো মাতরা গর্ভো অত্তি।
নাহং দেবস্য মর্ত্যশ্চিকেতাগ্নিরঙ্গ বিচেতাঃ স প্রচেতাঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭৯/৪)।
অরণ্যোর্নিহিতো জাতবেদা গর্ভ ইব সুধিতো গর্ভিণীষু।
দিবেদিব ঈড্যে জাগৃবদ্ভির্হবিষ্মদ্ভিঃ মনুষ্যেভিরগ্নিঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/২৯/২)।
তনূনপাদুচ্যতে গর্ভ আসুরো নরাশংসো ভবতি যদ্বিজায়তে !
মাতরিশ্বা যদমিমীত মাতরি বাতস্য সর্গো অভবৎসরীমণি।। (ঋগ্বেদ-৩/২৯/১১)।
অর্থাৎ :
হে দ্যাবাপৃথিবী ! আমি তোমাদের এ কথা সত্য বলছি, এ বালক জাতমাত্র আপনার দু মাতাকে গ্রাস করে অর্থাৎ অরণিদ্বয় হতে জন্মে তাদেরই দগ্ধ করে। আমি মনুষ্য, অগ্নি দেবতা এঁর বিষয়ে আমি অনভিজ্ঞ, তিনি উৎকৃষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন কি জ্ঞানহীন, তা আমি জানি না। (ঋক-১০/৭৯/৪)।।  গর্ভিণীতে সুসংস্থাপিত গর্ভের ন্যায় জাতবেদা অগ্নি অরণিদ্বয়ে নিহিত আছেন। অগ্নি স্বকর্মে জাগরূক হর্বিযুক্ত মানুষদের প্রতিদিন পূজনীয়। (ঋক-৩/২৯/২)।।  গর্ভস্থ অগ্নিকে তনূনপাৎ বলে। অগ্নি যখন প্রত্যক্ষ হন তখন তিনি আসুর নরাশংস হন। যখন অন্তরীক্ষে তেজবিকাশ করেন তখন মাতরিশ্বা হন। অগ্নি প্রসৃত হলে বায়ুর উৎপত্তি হয়। (ঋক-৩/২৯/১১)।।


স্বভাবতই, অগ্নির দীপ্তি এবং উজ্জ্বল শিখার প্রশংসায় বৈদিক কবিদের কল্পনা বিভোর হয়েছিলো, এবং এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে সে-কল্পনা প্রায়ই পরমাশ্চর্য কবিত্বে পরিণত হয়েছিলো। যেমন–

শ্রূয়া অগ্নিশ্চিত্রভানুর্হবং মে বিশ্বাভির্গীর্ভিরমৃতো বিচেতাঃ।
শ্যাবা রথং বহতো রোহিতা বোতারুষাহ চক্রে বিভৃত্রঃ।। (ঋগ্বেদ-২/১০/২)।
অর্থাৎ :
মরণরহিত, বিশিষ্ট প্রজ্ঞাযুক্ত, বিচিত্র দীপ্তিযুক্ত সে অগ্নি আমার সমস্ত স্তুতিযুক্ত আহ্বান শুনুন। শ্যামবর্ণ বা রোহিত অথবা অরুণ অশ্বদ্বয় অগ্নির রথ বহন করছে, তিনি নানা স্থানে নীত হচ্ছেন। (ঋক-২/১০/২)।।


এই পরমাশ্চর্য ও পরম সুখপ্রদ বস্তুটির জন্ম নিয়েও বৈদিক কবিদের কল্পনার অন্ত নেই। কোথাও তাঁকে দ্যাবা-পৃথিবীর পুত্র বলা হয়েছে, কোথাও বা সেই সঙ্গেই বলা হয়েছে জল থেকে তাঁর জন্ম, ত্বষ্টা তাঁর জন্ম দিয়েছেন, এবং কোথাও বা বলা হয়েছে শুধু ত্বষ্টাই তাঁর গর্ভ থেকে অগ্নির জন্ম দিয়েছেন। অন্যদিকে কোন কবির কল্পনায় ইন্দ্র মেঘদ্বয়ের মধ্যে অগ্নির জন্ম দিয়েছেন, কোন কবির কল্পনায় দেবতাগণ অগ্নির জন্ম দিয়েছেন, আবার অন্য কবির কল্পনায় যেন দেবতাগণ অগ্নি থেকেই জাত হয়েছেন। যেমন–

অহগ্ন দিবঃ সূনুরসি প্রচেতাস্তনা পৃথিব্যা ।
ঊত বিশ্ববেদা ঋধগ্দেবা ইহ যজা চিকিত্বঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/২৫/১)।
যং ত্বা দ্যাবাপৃথিবী যং ত্বাপস্ত¡ষ্টা যং ত্বা সুজনিমা জজান।
পন্থামনু প্রবিদ্বাৎ পিতৃয়াণং দ্যুমদগ্নে সমিধানো বি ভাহি।। (ঋগ্বেদ-১০/২/৭)।
দশেমং ত্বষ্টুর্জনয়ন্ত গর্ভমতন্দ্রাসো যুবতয়ো বিভৃত্রম্ ।
তিপ্মানীকং স্বযশসং জনেষু বিরোচমানং পরি ষীং নয়ন্তি।। (ঋগ্বেদ-১/৯৫/২)।
যো হত্বাহিমরিণাৎ সপ্ত সিন্ধূন্যো গা উদাজদপধা বলস্য।
যো অশ্ননোরন্তরগ্নিং জজান সম্বৃক্ সমৎসু স জনাস ইন্দ্রঃ।। (ঋগ্বেদ-২/১২/৩)।
মূর্ধানং দিবো অরতিং পৃথিব্যা বৈশ্বানরমৃত আ জাতমগ্নিম্ ।
কবিং সম্রাজমতিথিং জনানামাসন্না পাত্রং জনয়ন্ত দেবাঃ।। (ঋগ্বেদ-৬/৭/১)।
শুক্রঃ শুশুক্বা উষো ন জারঃ পপ্রা সমীচী দিবো ন জ্যোতিঃ।
পরি প্রজাতঃ ক্রত্বা বভুথ ভুর্বো দেবানাং পিতা পুত্রঃ সন্ ।। (ঋগ্বেদ-১/৬৯/১)।
অর্থাৎ :
হে অগ্নি ! তুমি সর্বজ্ঞ ও চিত্তবান, তুমি দ্যুদেবতার পুত্র ও পৃথিবীর তনয়। হে চেতনাবান অগ্নি ! তুমি দেবগণের এ যজ্ঞে পৃথক পৃথক যাগ কর। (ঋক-৩/২৫/১)।।  দ্যাবাপৃথিবী হতে তোমার জন্ম, জল হতে তুমি জন্মেছ, যিনি উত্তম নির্মাণ করতে পারেন, সে ত্বষ্টা তোমাকে জন্ম দিয়েছেন। পিতৃলোকে যাবার কোন পথ তা তুমি জান; অতএব তুমি এরূপ ঔজ্জ্বল্য ধারণ কর যাতে ঐ পথ আলোকময় হয়ে উঠে। (ঋক-১০/২/৭)।।  দশ অঙ্গুলি একত্র হয়ে অবিরত কাষ্ঠ ঘর্ষণ করে ত্বষ্টার গর্ভস্বরূপ ও সর্বভূতে বর্তমান অগ্নিকে উৎপন্ন করে। সে অগ্নি তীক্ষ্ণতেজা, যশস্বী ও সকল জনপদে দীপ্যমান। এ অগ্নিকে সকল স্থানে নিয়ে যায়। (ঋক-১/৯৫/২)।।  হে মনুষ্যগণ ! যিনি অহিকে বিনাশ করে সপ্তসংখ্যক নদী প্রবাহিত করেছিলেন, যিনি বল কর্তৃক নিরুদ্ধ গোসমূহকে উদ্ধার করেছিলেন, যিনি মেঘদ্বয়ের মধ্যে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং যুদ্ধকালে শত্রুগণকে বিনাশ করেন, তিনিই ইন্দ্র। (ঋক-২/১২/৩)।।  বৈশ্বানর অগ্নি স্বর্গের শিরোভূত, পৃথিবীর ব্যাপক যজ্ঞার্থ জাত, জ্ঞানসম্পন্ন, সম্যক দীপ্তিসম্পন্ন, মানবগণের অতিথিভূত, দেবগণের মুখস্বরূপ ও রক্ষাকারী। দেবগণ তাকে উৎপাদিত করেছেন। (ঋক-৬/৭/১)।।  শুভ্রবর্ণ অগ্নি ঊষার প্রণয়ী সূর্যের ন্যায় সকল পদার্থে প্রকাশক এবং দ্যুতিমান সূর্যের জ্যোতির ন্যায় স্বতেজে (দ্যাবা পৃথিবী) একত্রে পরিপূরিত করেন। হে অগ্নি ! তুমি প্রাদুর্ভূত হয়ে কর্ম দ্বারা সমস্ত জগত পরিব্যাপ্ত কর; তুমি দেবগণের পুত্র হয়েও তাদে পিতা। (ঋক-১/৬৯/১)।।


তবে ঋগ্বেদে অন্য অনেক কবি কিন্তু এই প্রসঙ্গে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। পাষাণ ও অরণি কাষ্ঠ বলপূর্বক ঘর্ষণ করে অগ্নির জন্ম দেওয়া হয়, এবং দুটি অরণি কাষ্ঠ ঘর্ষণ করে অগ্নি মথিত করবার কথা প্রায়ই পাওয়া যায়। যেমন–

যমাপো অদ্রয়ো বনা গর্ভমৃতস্য পিপ্রতি।
সহসা যো মথিতো জায়তে নৃভিঃ পৃথিব্যা অধি সানবি।। (ঋগ্বেদ-৬/৪৮/৫)।
অগ্নিং নরো দীধিতিভিরঃ অরণ্যোর্হস্তচ্যুতী জনরন্ত প্রশস্তম্ ।
দূরেদৃশং গৃহপতিমথর্যুম্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/১/১)।
অমন্থিষ্টাং ভারতা রেবদগ্নিং দেবশ্রবা দেববাতঃ সুদক্ষম্ ।
অগ্নে বি পশ্য বৃহতাভি রায়েষাং নো নেতা ভরতাদনু দ্যূন্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/২৩/২)।
অস্তীদমধিমন্থনমস্তি প্রজননং কৃতম্ ।
এতাং বিশ্পত্নীমা ভরাগ্নিং মন্থাম্ পূর্বথা।। (ঋগ্বেদ-৩/২৯/১)।
ষদী মন্থন্তি বাহুভির্বি রোচতেহশ্বো ন বাজ্যরুষো বনেষ্বা।
চিত্রো ন যামন্নশ্বিনোরনিবৃতঃ পরি বৃণক্ত্যশ্মনস্তৃণা দহন্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/২৯/৬)।
অর্থাৎ :
তুমি যজ্ঞের গর্ভভূত। তোমাকে বসতীবরী অর্থাৎ সোমমিশ্রণার্থে জল, অভিষব পাষাণ ও অরণি কাষ্ঠ পোষণ করে। তুমি ঋত্বিকগণ কর্তৃক বলপূর্বক মথিত হয়ে পৃথিবীর অত্যুন্নত স্থানে অর্থাৎ দেবযজন দেশে প্রাদুর্ভূত হও। (ঋক-৬/৪৮/৫)।।  প্রশস্ত, দূরে দৃশ্যমান, গৃহপতি ও গমনবিশিষ্ট অগ্নিকে নেতাগণ অরণিদ্বয়ে হস্তগতি ও অঙ্গুলিদ্বারা উৎপাদন করেন। (ঋক-৭/১/১)।।  ভরতের পুত্র দেবশ্রবা ও দেবরাত সুদক্ষ ও ধনবান অগ্নিকে মন্থন দ্বারা উৎপন্ন করেছে। হে অগ্নি ! তুমি প্রভূত ধনের সাথে আমাদের দিকে দেখ এবং প্রত্যহ আমাদের অন্ন আন। (ঋক-৩/২৩/২)।।  এ মন্থনের উপকরণ, এ অগ্নি উৎপত্তির উপকরণ, লোকের পালয়িত্রী অরণিকে আহরণ কর। আমরা পূর্বকালের ন্যায় অগ্নিকে মন্থন করব। (ঋক-৩/২৯/১)।।  যখন হস্তদ্বারা মন্থন করা যায়, তখন কাষ্ঠ হতে অগ্নি অশ্বের ন্যায় শোভমান হয়ে ও দ্রুতগামী অশ্বিদ্বয়ের বিচিত্র রথের ন্যায় শীঘ্র গমনশীল হয়ে শোভা পান। কেউ তার গমনরোধ করতে পারে না। তিনি তৃণ ও উপল দগ্ধ করে সে স্থান পরিত্যাগ করেন। (ঋক-৩/২৯/৬)।।


এই অরণি বা কাষ্ঠের ঘর্ষণে অগ্নির উৎপত্তির এ-জাতীয় অভিজ্ঞতা এবং বনে-জঙ্গলে দাবনলের অভিজ্ঞতা থেকেও হয়তো বৈদিক কবিরা প্রায়ই কল্পনা করেছেন যে, কাষ্ঠ, ওষধি– এবং অতএব অরণ্যও– অগ্নির জনক। যেমন–

সূরো ন যস্য দৃশতিররেপা ভীমা যদেতি শুচতস্তে আ ধীঃ।
হেষস্বতঃ শুরুধো নায়মক্তোঃ কুত্রা চিদ্রন্বো বসতি র্বনেজাঃ।। (ঋগ্বেদ-৬/৩/৩)।
বিষূচো অশ্বান্যুযুজে বনেজা ঋজীতিভী রশনাভির্গৃভীতান্ ।
চক্ষদে মিত্রো বসুভিঃ সুজাতঃ সমানৃধে পর্বভির্বাবৃধানঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭৯/৭)।
অর্থাৎ :
সূর্যের ন্যায় যাঁর দর্শন নিষ্পাপ, যে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির জ্বালাসমূহ রাত্রির শব্দায়মান ধেনুগণের ন্যায় চতুর্দিকে বিস্তৃত হয়, সকলের আবাসভূত, বনজাত সে অগ্নি সর্বত্র মনোজ্ঞ মূর্তি হয়ে দৃষ্ট হন। (ঋক-৬/৩/৩)।।  এ অগ্নি বনে জন্মে এত দ্রুতবেগে অগ্রসর হচ্ছেন যেন সরল রজ্জুদ্বারা বন্ধনপূর্বক দ্রুতগামী কতকগুলি ঘোটক রথে যোজনা করেছেন, এ বন্ধু কাষ্ঠস্বরূপ ধন পেয়ে বৃহৎ হয়ে উঠেছেন এবং সকলি চূর্ণ করছেন, ইনি বৃক্ষ গ্রাস করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে বিপুলমূর্তি হয়েছেন। (ঋক-১০/৭৯/৭)।।


কোথাও আবার অগ্নিকে ওষধির ভ্রূণ বলেও কল্পনা করা হয়েছে। যেমন–

ত্বমগ্নে দ্যুভিস্ত্বমাশুশুক্ষণিস্ত্বমদ্ ভস্ত্বমশ্মনস্পরি।
ত্বং বনেভ্যস্ত্বমোষধীভ্যস্ত্বং নৃণাং নৃপতে জায়সে শুচিঃ।। (ঋগ্বেদ-২/১/১)।
অপাং গর্ভং দর্শতমোষধীনাং বনা জজান সুভ্গা বিরূপম্ ।
দেবাসশ্চিন্মনসা সং হি জগ্মুঃ পনিষ্ঠং জাতং তবসং দুবস্যন্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/১/১৩)।
স জাতো গর্ভো অসি রোদস্যোরগ্নে চারুর্বিভৃত ওষধীষু।
চিত্রঃ শিশুঃ পরি তমাংস্যক্তূৎপ্র মাতৃভ্যো অধি কনিক্রদদ্গাঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/১/২)।
অর্থাৎ :
হে মনুষ্যদের নরপতি অগ্নি ! তুমি যজ্ঞদিনে উৎপন্ন হও, তুমি দীপ্তিশালী হয়ে উৎপন্ন হও, তুমি শুচি হয়ে উৎপন্ন হও, তুমি জল হতে উৎপন্ন হও, তুমি প্রস্তর হতে উৎপন্ন হও, তুমি বন হতে উৎপন্ন হও, তুমি ওষধি হতে উৎপন্ন হও। (ঋক-২/১/১)।।  সৌভাগ্যযুক্ত অরণি, দর্শনীয়, নানারূপবিশিষ্ট এবং জল ও ওষধি সকলের গর্ভভূত অগ্নিকে উৎপাদন করেছেন। সমুদয় দেবগণও স্তবনীয়, প্রবৃদ্ধ, সদ্যজাত অগ্নির নিকট স্তুতিযুক্ত হয়ে গমন করেছিলেন ও তাঁর পরিচর্যা করেছিলেন। (ঋক-৩/১/১৩)।।  হে অগ্নি ! তুমি দ্যুলোক ও ভূলোকের সুশ্রী সন্তানস্বরূপ, তাঁদের হতেই তোমার উৎপত্তি, তুমি ওষধি অর্থাৎ কাষ্ঠের মধ্যে সঞ্চিত থাক। তুমি আশ্চর্য বালক, তোমার শত্রুস্বরূপ অন্ধকারকে দূর করে থাক, ওষধি অর্থাৎ কাষ্ঠ তোমার মাতা, তুমি শব্দ করতে করতে তোমার সে মাতৃবর্গের দিকে ধাবিত হও। (ঋক-১০/১/২)।।


এইভাবে ঋগ্বেদে বারবার কাষ্ঠ, ওষধি, বনস্পতি, অরণ্য প্রভৃতির সঙ্গে অগ্নির সম্পর্ক কল্পিত হতে দেখা যায়। বলাই বাহুল্য, এ-জাতীয় কল্পনার মূলে জাগতিক অভিজ্ঞতার এবং অবশ্যই কবি-কল্পনার পরিচয় থাকলেও এখানে কোনো সুস্পষ্ট অধ্যাত্মবাদী চেতনার নিদর্শন অনুমান করা নিষ্ফল হবে বলা যায়। বরং বৈদিক কবিরা এই যে এতোভাবে অগ্নির স্তুতি করেছেন, তার মূলেও প্রধানতম কারণ কিন্তু নানা প্রকার পার্থিব সম্পদ ও নিরাপত্তার কামনাই। যেমন–

অগ্নে জুষস্ব প্রতি হর্ষ তদ্বচো মন্দ্র স্বধাব ঋৃতজাত সুক্রতো।
যো বিশ্বতঃ প্রতাঙ্ঙসি দর্শতো রণ্বঃ সন্দৃষ্টৌ পিতুমা ইব ক্ষয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৪৪/৭)।
ত্বং দূতস্ত্বমু নঃ পরস্পাস্ত্বং বস্য আ বৃষভ প্রণেতা।
অগ্নে তোকস্য নস্তনে তনূনামপ্রযুচ্ছন্দীদ্যদ্বোধি গোপাঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৯/২)।
যস্ত্বা হৃদা কীরিণা মনামানোহমর্ত্যং মর্ত্যাে জোহবীমি।
জাতবেদা যশো অস্মাসু ধেহি প্রজাভিরগ্নে অমৃতত্বমশ্যাম্ ।। (ঋগ্বেদ-৫/৪/১০)।
ত্বয়া বয়ং সধন্যস্তোতাস্তব প্রণীত্যশ্যাম বাজান্ ।
উভা শংসা সূদয় সত্যতাতেহহষ্টুয়া কৃণুহ্যহ্নয়াণ।। (ঋগ্বেদ-৪/৪/১৪)।
ইমং যজ্ঞং সহসাবন্ ত্বং নো দেবত্রা ধেহি সুক্রতো ররাণঃ।
প্র যংসি হোতর্বৃহতীরিষো নোহগ্নে মহি দ্রবিণমা যজস্ব।। (ঋগ্বেদ-৩/১/২২)।
অস্মে রায়ো দিবেদিবে সঙ্করন্তু পুরুস্পৃহঃ। অস্মে বাজাস ঈরত্যম্ ।। (ঋগ্বেদ-৪/৮/৭)।
অর্থাৎ :
হে অগ্নি ! তুমি হব্য সেবা কর, তোমার স্তোত্র শ্রবণ করতে ইচ্ছা কর। হে স্তুত্য, অন্নবান যজ্ঞার্থ উৎপন্ন, সুক্রতু অগ্নি ! তুমি সমস্ত জগতের অনুকূল সকলের দর্শনীয়, তুমি আনন্দোৎপাদক এবং প্রভূত অন্নবান ব্যক্তির ন্যায় সকলের আশ্রয় স্থান। (ঋক-১/১৪৪/৭)।।  হে অভীষ্টবর্ষী অগ্নি ! তুমি আমাদের দূত হও। আমাদের আপদ হতে রক্ষা কর। আমাদের নিকট ধন প্রেরণ কর। তুমি প্রমাদরহিত ও দীপ্তিবিশিষ্ট হয়ে আমাদের ও আমাদের পুত্রের রক্ষক হও ও জাগরিত হও। (ঋক-২/৯/২)।।  হে অগ্নি ! আমি মর্ত্য, তুমি অমর্ত্য। আমি স্তুতিযুক্ত হৃদয়ে স্তব করে তোমাকে বারবার আহ্বান করছি। হে জাতবেদা ! আমাদের সন্তান দান কর। হে অগ্নি ! আমি যেন সন্তানসমূহদ্বারা অমরত্ব লাভ করতে পারি। (ঋক-৫/৪/১০)।।  হে অগ্নি ! তুমি গমনে লজ্জাশূন্য। আমরা তোমার অনুগ্রহে সমান ধনবিশিষ্ট ও তোমা কর্তৃক রক্ষিত হয়ে তোমার অনুজ্ঞায় অন্ন লাভ করি। হে সত্য বিস্তারক পাপ নাশক ! উভয়বিধ শত্রুকে বিনাশ কর, যথাক্রমে সমস্ত কার্য কর। (ঋক-৪/৪/১৪)।।  হে বলবান শোভনকর্মবিশিষ্ট অগ্নি ! তুমি সর্বদা বিহার করতে করতে আমাদের যজ্ঞ দেবগণের নিকট বহন কর। হে দেবগণের আহ্বানকারী ! তুমি আমাদের অন্ন দান কর। হে অগ্নি ! তুমি আমাদের মহৎধন দান কর। (ঋক-৩/১/২২)।।  হে অগ্নি ! অতিশয় কাম্য ধনসমূহ আমাদের নিকট প্রতিদিন আসুক; অন্নসমূহ আমাদের কর্মের প্রেরণা দিক। (ঋক-৪/৮/৭)।।


এই অগ্নিকে উদ্দেশ্য করে ঋগ্বেদে এ-জাতীয় পার্থিব সম্পদের কামনা এতো অজস্রবার ব্যক্ত হয়েছে যে তার সংখ্যা নির্ণয় করাও দুরূহ শ্রমসাধ্য। এবং আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই অজস্র দৈনন্দিন কল্যাণের সাথে সংযুক্ত বলেই হয়তো বহু দৃষ্টান্তে অগ্নিকে নিকট আত্মীয়ের মতো, বন্ধুর মতো, ভ্রাতার মতো ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতায় বিভূষিত হতে দেখা যায়। কখনো কখনো অগ্নিকে ভ্রাতা বলে সম্বোধন করা হয়েছে, কখনো পিতা বলে, কখনো মাতা বলে, এমনকি পুত্র বলেও সম্বোধন করবার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেমন–

উপসদ্যায় মীড়্হুষ আস্যে জুহুতা হবিঃ। যো নো নেদিষ্ঠমাপ্যম্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/১৫/১)।
আ হি ষ্মা সূনবে পিতাপির্যত্যাপয়ে। সখা সখে বরেণ্যঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৬/৩)।
অগ্নে ভ্রাতঃ সহস্কৃত রোহিদশ্ব শুচিব্রত। ইমং স্তোমং জুষস্ব মে।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৩/১৬)।
অগ্নিং মন্যে পিতরমগ্নিমাপিমগ্নিং ভ্রাত রং সদমিৎসখায়ম্ ।
অগ্নেরনীকং বৃহঃ সপর্যং দিবি শুক্রং যজতং সূর্যস্য।। (ঋগ্বেদ-১০/৭/৩)।
ত্বাং বর্ধন্তি ক্ষিতয়ঃ পৃথিব্যাং ত্বাং রায় উভয়াসো জনানাম্ ।
ত্বং ত্রাতা তরণে চেত্যো ভূঃ পিতা মাতা সদমিন্মানুষাণাম্ ।। (ঋগ্বেদ-৬/১/৫)।
ত্বামগ্নে পিতরমিষ্টিভির্নরস্ত্বাং ভ্রাত্রায় শম্যা তনূরুচম্ ।
ত্বং পুত্রো ভবসি যস্তেহবিধত্ত্বং সখা সুশেবঃ পাস্যাধৃষঃ।। (ঋগ্বেদ-২/১/৯)।
অর্থাৎ :
যিনি আমাদের আসন্নতম জ্ঞাতি বন্ধু, সে উপসদনীয়, অভীষ্টবর্ষী অগ্নির জন্য তাঁর মুখে হব্য প্রদান কর। (ঋক-৭/১৫/১)।।  হে বরণীয় অগ্নি ! পিতা পুত্রের প্রতি যেরূপ, বন্ধু বন্ধুর প্রতি যেরূপ, সখা সখার প্রতি যেরূপ, তুমি আমার প্রতি সেরূপ দানশীল হও। (ঋক-১/২৬/৩)।।  হে ভ্রাত অগ্নি ! হে বলের দ্বারা উৎপাদিত ! হে রোহিত নামক অশ্বযুক্ত ! হে শুদ্ধকর্মা ! আমার স্তোত্র সেবা কর। (ঋক-৮/৪৩/১৬)।।  অগ্নিকে আমি পিতা ও আত্মীয় জ্ঞান করি, অগ্নিই ভ্রাতা, অগ্নিই চিরকালের বন্ধু। যেমন আকাশস্থ শুভ্রবর্ণ সূর্যমণ্ডলকে লোকে আরাধনা করে সেরূপ আমি প্রকান্ড অগ্নির মূর্তিকেই সেবা করে থাকি। (ঋক-১০/৭/৩)।।  হে অগ্নি ! পৃথিবীতে মনুষ্যগণ তোমাকে বর্ধিত করে। তুমি উভয়বিধ ধন মনুষ্যগণকে প্রদান কর, সেজন্য তারা তোমাকে বর্ধিত করে। হে দুঃখবিমোচনকারী অগ্নি ! তুমি স্তুতিভাজন হয়ে মানবগণের রক্ষক ও পিতৃমাতৃ স্থানীয় হও। (ঋক-৬/১/৫)।।  হে অগ্নি ! লোকে যজ্ঞদ্বারা তোমাকে তৃপ্ত করে, যেহেতু তুমি পিতা। তোমার সৌভাত্র লাভের জন্য কর্মদ্বারা তোমাকে তৃপ্ত করে, তুমি তাদের শরীর দীপ্ত করে দাও। যে তোমার পরিচর্যা করে তুমি তার পুত্র হও। তুমি সখা, শুভকারী ও শত্রুনিবারক হয়ে পালন কর। (ঋক-২/১/৯)।।


অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই নিকটাত্মীয় সুলভ এ-জাতীয় দৃষ্টান্তে অগ্নির যে-ঘরোয়া কল্যাণময় মূর্তির পরিচয় পাওয়া যায় তার ব্যাখ্যায় কোন সুদূর ঐশী শক্তির আধার তথা আধুনিক অর্থে দেবতার মাতাত্ম্য আরোপ করা মনে হয় কষ্টকল্পনারই পরিচায়ক হবে।

.
সোম দেবতা :

পৃথিবীস্থানের দেবতা হিসেবে সোম-এর প্রাধান্যও কম নয়। ঋগ্বেদের সমগ্র নবম মণ্ডলের ১১৪টি সূক্ত ছাড়াও অন্যান্য মণ্ডলে ৬টি সূক্ত পবমান সোমের স্তুতিতে বিরচিত। পবমান অর্থ ক্ষরণশীল। অর্থাৎ সোমরসই এখানে দেবতা। এ-ছাড়াও সমগ্র ঋগ্বেদে অজস্রবার সোমের উল্লেখ ও প্রশংসা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু অগ্নির মতোই তথা অগ্নির তুলনায় আরো স্পষ্টতরভাবে এই বৈদিক দেবতাটি মূর্ত পার্থিব বস্তুমাত্র।

সোম নামে এক শ্রেণীর লতা ছিলো, যা পার্বত্য-অঞ্চলে জন্মাতো। বৈদিক কবিরা সোম-লতার পার্বত্য আবাস ও মর্ত্যে আগমন নিয়ে, সোম-লতা সংগ্রহ করা, জল দিয়ে ধোয়ে পাথরের সাহায্যে তা নিষ্কাশন করা, নিষ্কাশিত হরিৎবর্ণের রস ভেড়ার লোমের ছাঁকনীতে ছেঁকে কাঠের কলসে ভরা, তাকে দুধের সঙ্গে মেশানো, দেবতাদের উদ্দেশে তার আহুতি দেওয়া এবং অবশ্যই তা নিজেরা পান করা– ইত্যাদি বিষয়ে ঋগ্বেদে এমন অসম্ভব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, প্রক্রিয়াগুলির খুঁটিনাটি নিয়ে আদিম কল্পনার এমন জটিল জাল বুনেছেন যে বর্তমান সময়ে তার সমস্ত তাৎপর্য স্পষ্টভাবে বোঝা হয়তো সম্ভব নয়। এই সোমলতার কোনও সন্ধান এখন পাওয়া যায় না। সরস্বতী নদীর মতো তা হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেবল তার স্মৃতি এবং অশেষ গুণের কথা ঋগ্বেদের সূক্তগুলিতে রক্ষিত হয়ে আছে।
ঋগ্বেদের দৃষ্টান্তে দেখা যায়, অনেক সময় সোমকে অন্ন বলা হতো, কখনো পিতু, অন্ধস্ প্রভৃতি অন্ন-বাচক শব্দও সোম সম্বন্ধে প্রযুক্ত হতো। যেমন–

যদ্দধিষে প্রদিবি চার্বন্নং দিবেদিবে পীতিমিদস্য বক্ষি।
উত হৃদোত মনসা জুষাণ উশন্নিন্দ্র প্রন্থিতান্ পাহি সোমান্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/৯৮/২)।
তং ত্বা বয়ং পিতো বচোভির্গাবো ন হব্যা সুষুদিম।
দেবেভ্যস্ত্বা সধমাদমস্মভ্যং ত্বা সধমাদম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১৮৭/১১)।
তে অদ্রয়ো দশযন্ত্রাস আশবস্তেষামাধানং পর্ষেতি হর্ষতম্ ।
ত ঊ সুতস্য সোম্যস্য অন্ধসোংহশোঃ পীয়ুষং প্রথমস্য ভেজিরে।। (ঋগ্বেদ-১০/৯৪/৮)।
সং মাতৃভির্ন শিশুর্বাবশানো বৃষা দধন্বে পুরুবারো অদ্ভিঃ।
মর্যো ন যোষামভি নিষ্কৃতং যন্ত্সং গচ্ছতে কলশ উস্রিয়াভিঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/৯৩/২)।
অর্থাৎ :
হে ইন্দ্র ! পূর্বকালে যে চারু অন্ন ধারণ করতে, এখনও প্রত্যহ সে সোমপানের কামনা কর। হৃদয় ও মনে আমাদের কামনা করে হে ইন্দ্র ! সম্মুখে আনীত সোম পান কর। (ঋক-৭/৯৮/২)।।  হে পিতু ! ধেনুগণের নিকট যেরূপ হব্য গৃহীত হয়, সেরূপ তোমার নিকট আমরা স্তুতিদ্বারা রস গ্রহণ করি। ঐ রস কেবল দেবতাগণের নয় আমাদেরও হৃষ্ট করে। (ঋক-১/১৮৭/১১)।।  সে প্রস্তরগুলি দশটি অঙ্গুলিকে বন্ধ রজ্জুস্বরূপ পেয়ে শীঘ্র শীঘ্র কার্য করছে। তাদের উৎপাদিত সোমরস হরিদ্বর্ণ হয়ে আসছে। সোমের অংশু ডাঁটা নিষ্পীড়িত হয়ে অন্নরূপ ধারণপূর্বক অমৃত রস নির্গত করে, তার প্রথম যে অংশ এরাই পেয়ে থাকে। (ঋক-১০/৯৪/৮)।।  যেমন মাতৃবৎসল শিশুকে জননীরা ধারণ করেন সেরূপ সর্বজনের রসবর্ষণকারী এ সোমরস জল দ্বারা ধাবিত হচ্ছেন। যেমন পুরুষ যুবতীর দিকে গমন করেন ইনি সেরূপ আপন স্থানে যাচ্ছেন, গিয়ে কলসের মধ্যে দুগ্ধের সাথে মিশ্রিত হচ্ছেন। (ঋক-৯/৯৩/২)।।


তবে সোম সম্বন্ধে এসব অন্নবাচক শব্দ প্রযুক্ত হলেও এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, মৃদু-মাদকত্বের গুণেই বৈদিক কবিদের মুখে সোমের এমন অসম্ভব প্রশংসা বা উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে; সোম স্বর্গের শিশু এবং মাদকত্ব-দায়ী এ-জাতীয় বর্ণনা ঋগ্বেদে বারবার পাওয়া যায়। যেমন–

এষ স্য মদ্যো রসোহব চষ্টে দিবঃ শিশুঃ। য ইন্দুর্বারমাবিশৎ।। (ঋগ্বেদ-৯/৩৮/৫)।
ইযমূর্জং পবমানাভ্যর্ষসি শ্যেনো ন বংসু কলশেষু সীদসি।
ইন্দ্রায় মদ্বা মদ্যো মদঃ সুতো দিবো বিষ্টম্ভ উপমো বিচক্ষণঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/৮৬/৩৫)।
পিবা সোমমিন্দ্র মন্দতু ত্বা যং তে সুষাব হর্যশ্বাদ্রিঃ।
সোতুর্বাহুভ্যাং সুয়তো নার্বা।। (ঋগ্বেদ-৭/২২/১)।
অর্থাৎ :
এ মদ্যরস সকল পদার্থ দর্শন করছে। তিনি স্বর্গের শিশু, এ সোম দশাপবিত্রে প্রবেশ করছেন। (ঋক-৯/৩৮/৫)।।  হে সোম ! তুমি অন্ন ও পরাক্রম উৎপাদন কর। শ্যেনপক্ষী যেমন আপনার বাসায় বসে, তেমনি তুমি কলসের মধ্যে উপবেশন কর। তুমি নিষ্পীড়িত হয়ে ইন্দ্রের আনন্দ ও মত্ততা উপস্থিত কর, যেহেতু তুমি মাদকতাশক্তিসম্পন্ন। তুমি দ্যুলোকের সমযোগ্য স্তম্ভস্বরূপ, তুমি চতুর্দিক দৃষ্টি কর। (ঋক-৯/৮৬/৩৫)।।  হে ইন্দ্র ! সোম পান কর, সোম তোমায় মত্ত করুক। হে হরি-নামক অশ্ববিশিষ্ট ইন্দ্র ! রশ্মিদ্বারা সংযত অশ্বের ন্যায় অভিষব-কর্তার হস্তদ্বয়ে পরিগৃহীত প্রস্তর, এ সোম অভিষব করছে। (ঋক-৭/২২/১)।।


সোমের এই মদশক্তির মহিমা বৈদিক কবিরা নানা ভাবে বর্ণনা করেছেন, এ নিয়ে তাঁদের কল্পনার আর উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই। যেমন–

আ প্যায়স্ব মদিন্তম সোম বিশ্বেভিরংশুভিঃ। ভবা নঃ সুশ্রবন্তমঃ সখা বৃধে।। (ঋগ্বেদ-১/৯১/১৭)।।
ত্বং সোম নৃমাদনঃ পবস্ব চর্ষণীসহে। সস্নির্যো অনুমাদ্যঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/২৪/৪)।
শুচিঃ পাবক উচ্যতে সোম সুতসা মধ্বঃ। দেবাবীরঘশংসহা।। (ঋগ্বেদ-৯/২৪/৭)।
নূ নো রয়িমুপ মাস্ব নৃবন্তং পুনানো বাতাপ্যং বিশ্বশ্চন্দ্রম্ ।
প্র বন্দিতুরিন্দো তার্যায়ু প্রাতর্মক্ষূ ধিয়াবসুর্জগম্যাৎ।। (ঋগ্বেদ-৯/৯৩/৫)।
কনিক্রদদনু পন্থামৃতস্য শুক্রো বি ভাস্যমৃতস্য ধাম।
স ইন্দ্রায় পবসে মৎসরবান্ হিন্বানো বাচং মতিভিঃ কবীনাম্ ।। (ঋগ্বেদ-৯/৯৭/৩২)।
ত্বয়া হি নঃ পিতরঃ সোম পূর্বে কর্মাণি চক্রুঃ পবমান ধীরাঃ।
বন্বন্নবাতঃ পরিধীরপোর্ণু বীরেভিরশ্বৈর্মঘবা ভবা নঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/৯৬/১১)।
যথাপবথা মনবে বয়োধা অমিত্রহা বরিবোবিদ্ধবিষ্মান্ ।
এবা পবস্ব দ্রবিণং দধান ইন্দ্রে সং তিষ্ঠ জনয়ায়ুধানি।। (ঋগ্বেদ-৯/৯৬/১২)।
অর্থাৎ :
অত্যন্ত মদযুক্ত, হে সোম ! সমস্ত লতাবয়ব দ্বারা বর্ধিত হও, শোভন অন্নযুক্ত হয়ে তুমি আমাদের সখা হও। (ঋক-১/৯১/১৭)।।  হে সোম ! তুমি মনুষ্যগণের মদকর। হে শত্রুগণের অভিভবকারী সোম ! তুমি ইন্দ্রের উদ্দেশে ক্ষরিত হও। তুমিও স্তুতিযোগ্য। (ঋক-৯/২৪/৪)।।  অভিষুত মদকর সোম শুদ্ধ ও শোধক বলে উক্ত হন, তিনি দেবগণের প্রীতিকর এবং শত্রুগণের বিনাশক। (ঋক-৯/২৪/৭)।।  হে সোম ! তুমি শোধিত হচ্ছ, আমাদের লোকবল করে দাও এবং ধন মেপে দাও, সকলের আহ্লাদ উৎপাদন করে এরূপ জল আমাদের দাও। তোমাকে যে স্তব করে যেন তার পরমায়ু বৃদ্ধি হয়, তিনি যেন প্রাতঃকালে ধন দেবার অভিপ্রায়ে উপস্থিত হন। (ঋক-৯/৯৩/৫)।।  হে শুভ্রবর্ণ সোম ! তুমি যজ্ঞের পথে শব্দ করতে করতে অমৃতের আধারের ন্যায় শোভা পাচ্ছ। তুমি মত্ততার জন্য ইন্দ্রের উদ্দেশে ক্ষরিত হচ্ছ। তোমার স্তবের জন্য কবিদের বাক্য স্ফূর্তি হচ্ছে। (ঋক-৯/৯৭/৩২)।।  হে ক্ষরণশীল সোম ! আমাদের সুবোধ পূর্বপুরুষেরা তোমাকে আশ্রয় করে পুণ্য কার্যের অনুষ্ঠান করতেন। তুমি দুর্ধর্ষভাবে বিপক্ষদের হিংসা করতে করতে রাক্ষসদের তাড়িয়ে দাও, আমাদের ঘোটক ও সৈন্য ও ধন প্রদান কর। (ঋক-৯/৯৬/১১)।।  যেরূপ তুমি মনুর জন্য ক্ষরিত হয়েছিলে, অন্ন দিয়েছিলে, বিপক্ষ সংহার করেছিলে, অশেষ প্রকার কাম্যবস্তু দিয়েছিলে এবং হোমের দ্রব্য পেয়েছিলে, সেরূপ এখন ক্ষরিত হও, ধন দান কর, ইন্দ্রকে আশ্রয় কর, যুদ্ধে অস্ত্রসমূহ উৎপাদন কর। (ঋক-৯/৯৬/১২)।।


ঋগ্বেদের সমগ্র নবম মণ্ডল জুড়ে বারবার এ-জাতীয় কথার অভাব নেই। এই মদশক্তির গুণেই সোম অমৃত বলে স্তুত হয়েছে এবং বৈদিক কবিরা বারবার কল্পনা করেছেন যে সোমপান করে অমরত্ব লাভ করা যায়, মৃত্যুকে উত্তীর্ণ হওয়া যায়। যেমন–

এষ দেবো অমর্ত্যঃ পর্ণবীরিব দীয়তি। অভি দ্রোণান্যাসদম্ ।। (ঋগ্বেদ-৯/৩/১)।
যো ন ইন্দুঃ পিতরো হৃত্সু পীতোহমর্ত্যাে মর্ত্যা আবিবেশ।
তস্মৈ সোমায় হবিষা বিধেম মৃলীকে অস্য সুমতৌ স্যাম।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৮/১২)।
যাস্তে প্রজা অমৃতস্য পরস্মিন্ধামন্নৃতস্য।
মূর্ধা নাভা সোম বেন আভূষন্তীঃ সোমঃ বেদঃ।। (ঋগ্বেদ-১/৪৩/৯)।
ইমমিন্দ্র সুতং পিব জ্যেষ্ঠমমর্ত্যং মদম্ ।
শুক্রস্য ত্বাভ্যক্ষরন্ধারা ঋতস্য সাদনে।। (ঋগ্বেদ-১/৮৪/৪)।
অর্থাৎ :
মরণরহিত এ সোমদেব দ্রোণকলসাভিমুখে উপবিষ্ট হবার জন্য পক্ষীর ন্যায় গমন করছেন। (ঋক-৯/৩/১)।।  হে পিতৃগণ ! যে সোম পীত হলে মরণরহিত হয়ে, আমরা মর্ত্য, আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করে, হব্যদ্বারা সে সোমের পরিচর্যা করব, অতএব এর অনুগ্রহ বুদ্ধিতে অনুগ্রহ লাভ করে সুখী হব। (ঋক-৮/৪৮/১২)।।  হে সোম ! তুমি অমর ও উত্তম স্থান প্রাপ্ত, তুমি শিরঃস্থানীয় হয়ে যজ্ঞগৃহে তোমার প্রজাদের কামনা কর; যে প্রজাগণ তোমাকে বিভূষিত করে, তুমি তাদের জান। (ঋক-১/৪৩/৯)।।  হে ইন্দ্র ! তুমি এ অতিশয় প্রশংসনীয় হর্ষকর ও অমর সোমপান কর। যজ্ঞগৃহে এ দীপ্তিমান সোমধারা তোমারই দিকে বয়ে যাচ্ছে। (ঋক-১/৮৪/৪)।।


যে অমৃতধারা পান করে অমর হওয়া যায়, স্বভাবতই, দেবগণ এই অমর পানীয়টি পান করে অমরত্ব লাভ করেছিলেন; ঋগ্বেদে বৈদিক কবিদের এ-জাতীয় কল্পনারও ঘাটতি নেই। যেমন–

ত্বং হ্যঙ্গ দৈব্যা পবমান জনিমানি দ্যুমত্তমঃ। অমৃতত্বায় ঘোষয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/১০৮/৩)।
তব দ্রপ্সা উদপ্রুত ইন্দ্রং মদায় বাবৃধুঃ। ত্বা দেবাসো অমৃতায় কং পপুঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/১০৬/৮)।
অর্থাৎ :
হে সোম ! তোমার ন্যায় উজ্জ্বল কিছুই নেই। তুমি যখন ক্ষরিত হও তখন দেবতাবংশজাত সকল ব্যক্তিকে অমরত্ব দেবার নিমিত্ত আহ্বান করতে থাক। (ঋক-৯/১০৮/৩)।।  হে সোম ! তোমার রসগুলি জলের সাথে মিশ্রিত হয়ে ইন্দ্রের মত্ততা উৎপাদন করবার জন্য তাঁকে গিয়ে সম্ভাষণ করছে। দেবতাবর্গ অমরত্ব পাবার জন্য তোমার সুখকর রস পান করলেন। (ঋক-৯/১০৬/৮)।।


অতএব শুধু দেবতারাই নন, মানুষেরাও এই অত্যাশ্চর্য পানীয়টি পান করে অমরত্ব লাভ করবে, এ-জাতীয় কামনাও ঋগ্বেদে বিভিন্নভাবে বিধৃত হয়েছে। যেমন–

অপাম সোমমমৃতা অভূমাগন্ম জ্যোতিরবিদাম দেবান্ ।
কিং নূনমস্মান্ কৃণবদরাতিঃ কিমু ধূর্তিরমৃত মর্ত্যস্য।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৮/৩)।
শং নো ভব হৃদ আ পীত ইন্দ্রো পিতেব সোম সূনবে সুশেবঃ।
সখেব সখ্য উরুশংস ধীরঃ প্র ণ আয়ুর্জীবসে সোম তারীঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৮/৪)।
যত্রানন্দাশ্চ মোদাশ্চ মুদঃ প্রমুদ আসতে।
কামস্য যত্রাপ্তাঃ কামাস্তত্র মামমৃতং কৃধীন্দ্রায়েন্দো পরি স্রব।। (ঋগ্বেদ-৯/১১৩/১১)।
অর্থাৎ :
হে অমৃত সোম ! আমরা তোমাকে পান করব ও অমর হব, পরে দ্যুতিমান স্বর্গে গমন করব ও দেবগণকে অবগত হব। শত্রু আমাদের কী করবে? আমি মনুষ্য, হিংসাকারী আমার কী করবে? (ঋক-৮/৪৮/৩)।।  হে সোম ! পিতা যেমন পুত্রের সখা, সেরূপ আমরা তোমায় পান করলে তুমি হৃদয়ের সুখকর হও। হে অনেকের প্রশংসিত সোম ! তুমি বুদ্ধিমান, তুমি আমাদের জীবনার্থে আয়ু প্রবর্ধিত কর। (ঋক-৮/৪৮/৪)।। যেখানে বিবিধ প্রকার আমোদ আহ্লাদ আনন্দ বিরাজ করছে, যেখানে অভিলাষী ব্যক্তির সকল কামনা পূর্ণ হয় সেখানে আমাকে অমর কর। ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত হও। (ঋক-৯/১১৩/১১)।।


এই অত্যন্ত মদশক্তিযুক্ত সোমের প্রশংসায় বৈদিক কবিদের এমন উচ্ছ্বসিত হবার একটি প্রধান কারণ তাঁদের কল্পনায় যুদ্ধদেবতা ইন্দ্র সোমপান করে নেশায় উন্মত্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর বলবীর্য প্রদর্শন করেন। ঋগ্বেদে এ-জাতীয় দৃষ্টান্তের অভাব নেই। যেমন–

অস্যেদিন্দ্রো মদেষ্বা বিশ্বা বৃত্রাণি জিঘ্নতে। শূরো মঘা চ মংহতে।। (ঋগ্বেদ-৯/১/১০)।
স্বাদুষ্কিলায়ং মথুমা উতায়ং তীব্রঃ কিলায়ং রসবা উতায়ম্ ।
উত্যেন্বস্য পপিবাংসমিন্দ্রং ন কশ্চন সহত আহবেষু।। (ঋগ্বেদ-৬/৪৭/১)।
যস্তে মদো যুজ্যশ্চারুরস্তি যেন বৃত্রাণি হর্যশ্ব হংসি।
স ত্বামিন্দ্র প্রভূবসো মমত্তু।। (ঋগ্বেদ-৭/২২/২)।
আ পাক্থাসো ভলানসো ভনন্তালিনাসো বিষাণিনঃ শিবাসঃ।
আ যোহনয়ৎ সধমা আর্যস্য গব্যা তৃৎসুভ্যো অজগন্যুধা নৃন্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/১৮/৭)।
অর্থাৎ :
শূর ইন্দ্র এ সোমপানে মত্ত হয়ে সমস্ত শত্রু বিনাশ করেন এবং যজমানগণকে ধনদান করেন। (ঋক-৯/১/১০)।।  এ অভিষুত সোম সুস্বাদু, মধুর, তীব্র ও সারবান। ইন্দ্র এ সোমরস পান করলে কেউই রণস্থলে তাঁকে সহ্য করতে সমর্থ হয় না। (ঋক-৬/৪৭/১)।।  হে হরিনামক অশ্বযুক্ত, প্রভূত ধনবান ইন্দ্র ! তোমার উপযুক্ত ও সম্যক প্রস্তুত সোম আছে; যা দিয়ে তুমি বৃত্রগণকে হনন করেছ, সে সোম তোমায় প্রমত্ত করুক। (ঋক-৭/২২/২)।।  হব্যসমূহের পাচক, ভদ্রমুখ, অপ্রবৃদ্ধ ও বিষাণহস্ত মঙ্গলকর ব্যক্তিগণ ইন্দ্রের স্তুতি করে। ইন্দ্র সোমপানে মত্ত হয়ে আর্যের গাভীসমূহ হিংসকগণ হতে এনেছেন, স্বয়ং লাভ করেছেন এবং যুদ্ধে মনুষ্যগণকে বধ করেছেন। (ঋক-৭/১৮/৭)।।


ঋগ্বেদের প্রায় সর্বত্রই ইন্দ্রের বলবীর্যের প্রশস্তি দেখা যায়। ইন্দ্রের এই বলবীর্য প্রদর্শন সোমপান-জনিত বলেই হয়তো ঋগ্বেদে কোথাও কোথাও সোমকে বলা হয়েছে, ‘তুমিও যে, ইন্দ্রও সে’। যেমন–

অদদ্ধ ইন্দ্রো পবসে মদিন্তম আত্মেন্দ্রস্য ভবসি ধাসিরুত্তমঃ।
অভি স্বরন্তি বহবো মণীষিণো রাজানমস্য ভুবনস্য নিংসতে।। (ঋগ্বেদ-৯/৮৫/৩)।
অর্থাৎ :
হে সোম ! তুমি বিনা বাধায় ক্ষরিত হচ্ছ। তোমার তুল্য আনন্দবিধাতা কেউ নেই। তুমিও যে, ইন্দ্রও সে। তোমার মত আহার আর নেই। বিস্তর বিদ্বান লোক তোমাকে স্তব করছেন। তুমি এ ভুবনের রাজা। তাঁরা তোমার নিকটবর্তী হচ্ছেন। (ঋক-৯/৮৫/৩)।।


কোথাও বা সোমকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরম সহায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এবং ঋগ্বেদে অজস্রবার এই কথা পাওয়া যায় যে, বৃত্রকে ধ্বংস করার কাজে সোমই ইন্দ্রকে সাহায্য করেছিলেন, উদ্দীপিত করেছিলেন। যেমন–

ত্বং নো বৃত্রহন্তমেন্দ্রস্যেন্দো শিবঃ সখা।
যৎসীং হবন্তে সমিথে বি বো মদে যুধ্যমানাস্তোকসাতৌ বিবক্ষসে।। (ঋগ্বেদ-১০/২৫/৯)।
স পবস্ব য আবিথেন্দ্রং বৃত্রায় হন্তবে। বব্রিবাংসং মহীরপঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/৬১/২২)।
‘আ প্র দ্রব পরাবতোহর্বাবতশ্চ বৃত্রহন্ । মধ্বঃ প্রতি প্রভর্মণি।।
তীব্রাঃ সোমাস আ গহি সুতাসো মাদয়িষ্ণবঃ। পিবা দধৃগ্যথোচিষে।।
ইষা মন্দস্বাদু তেহরং বরায় মন্যবে। ভুবত্ত ইন্দ্র শং হৃদে।।’ (ঋগ্বেদ-৮/৮২/১-৩)।
অর্থাৎ :
যখন ভয়ানক যুদ্ধ উপস্থিত হয় এবং আমাদের সন্তানদের সে যুদ্ধে বলিদান দিতে হয়, যখন যুদ্ধকারী শত্রুগণ চতুর্দিক হতে আমাদের যুদ্ধার্থে আহ্বান করতে থাকে তখন, হে সোম ! তুমি ইন্দ্রের সহায় হও। তাঁর আপদ বিপদ রক্ষা কর, কারণ তোমার মত শত্রুসংহারকারী কেউ নেই। বিপদের প্রতি লক্ষ্য করে তুমি বৃদ্ধি পাচ্ছ। (ঋক-১০/২৫/৯)।।  হে সোম ! যখন বৃত্র তাবৎ জলভাণ্ডার রোধ করে রেখেছিল সে সময়ে ইন্দ্রের বৃত্রসংহারস্বরূপ ব্যাপারের সময় তুমি ইন্দ্রকে রক্ষা করেছিলে। সেই তুমি এক্ষণে ক্ষরিত হও। (ঋক-৯/৬১/২২)।।
হে বৃত্রহন্ (ইন্দ্র) ! যজ্ঞস্থ মধুর জন্য দূরদেশ হতে ও সমীপদেশ হতে এস।। তীব্র মদকর সোম অভিষুত হয়েছে, এস, পান কর এবং মত্ত হয়ে তার সেবা কর।। সোমরূপ অন্নদ্বারা মত্ত হও। এ তোমার শত্রুনিবারক ক্রোধের জন্য পর্যাপ্ত হোক। তোমার হৃদয়ে সোম সুখকর হোক। (ঋক-৮/৮২/১-৩)।।


বৃত্র-বধের উদ্দীপনা লাভের উদ্দেশ্যে ইন্দ্র কী অসম্ভব পরিমাণ সোমপানে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন সে-বিষয়ে বৈদিক কবিদের কল্পনা ও অতিরঞ্জনের যেন অন্ত নেই। যেমন–

‘সখা সখ্যে অপচত্তূয়মগ্নিরস্য ক্রত্বা মহিষা ত্রী শতানি।
ত্রী সাকমিন্দ্রো মনুষঃ সারাংসি সুতং পিবদ্বৃত্রহত্যায় সোমম্ ।।
ত্রী যচ্ছতা মহিষানামঘো মাস্ত্রী সরাংসি মঘবা সোম্যাপাঃ।
কারং ন বিশ্বে অহ্বন্ত দেবা ভরমিন্দ্রায় যদহিং জঘান।।’ (ঋগ্বেদ-৫/২৯/৭-৮)।
বর্ধান্যং বিশ্বে মরুতঃ সজোষাঃ পচ্ছতং মহিষা ইন্দ্র তুভ্যম্ ।
পূষা বিষ্ণুস্ত্রীণি সরাংসি ধাবন্ বৃত্রহণং মদিরমংশুমস্মৈ।। (ঋগ্বেদ-৬/১৭/১১)।
অর্থাৎ :
ইন্দ্রের মিত্রভূত অগ্নি স্বীয়মিত্র ইন্দ্রের কার্যে সহায়তা করবার জন্য সত্বর তিনশত মহিষ পাক করলেন; এবং ইন্দ্র বৃত্রবধের জন্য মনুপ্রদত্ত তিন পাত্র সোমরস এককালে পান করলেন।।  হে ইন্দ্র! যখন তুমি তিনশত মহিষের মাংস ভক্ষণ করেছিলে, যখন ঐশ্বর্যসম্পন্ন তুমি তিন পাত্র সোমরস পান করেছিলে; তখন তিনি বৃত্র সংহার করেছিলেন, তখন সমস্ত দেবতা সোমপানকারী ইন্দ্রকে ভৃত্যবৎ যুদ্ধস্থলে আহ্বান করেছিলেন। (ঋক-৫/২৯/৭-৮)।।  হে ইন্দ্র! অখিল মরুৎগণ সম্প্রীতিভাজন হয়ে তোমাকে স্তোত্র দ্বারা বর্ধিত করে, তোমার জন্য পূষা ও বিষ্ণু শত মহিষ পাক করুন এবং মদকর শত্রুনাশক সোমপূর্ণ তিনটি নদী প্রবাহিত হোক। (ঋক-৬/১৭/১১)।।


আবার ঋগ্বেদের দৃষ্টান্তে অন্যান্য বৈদিক কবির কল্পনা অনুসারে জন্মগ্রহণের পর থেকেই ইন্দ্রকে তাঁর মাতা সোমপান করাতেন বলে বর্ণিত হয়েছে। যেমন–

জজ্ঞানঃ সোমং সহসে পপাথ প্র তে মাতা মহিমানমুবাচ।
এন্দ্র পপ্রাথোর্বন্তরিক্ষং যুধা দেবেভো বরিবশ্চকর্থ।। (ঋগ্বেদ-৭/৯৮/৩)।
অস্য পিব যস্য জজ্ঞান ইন্দ্র মদায় ক্রত্বে অপিবো বিরপ্-শিন্ ।
তমু তে গাবো নর আপ্যে অদ্রিরিন্দুং সমহ্যৎপীতয়ে সমস্মৈ।। (ঋগ্বেদ-৬/৪০/২)।
অদ্রোঘ সত্যং তব তন্মহিত্বং সদ্যো যজ্জাতো অপিবো হ সোমম্ ।
ন দ্যাব ইন্দ্র তবসস্তু ওজো নাহা ন মাসাঃ শরদো বরন্ত।। (ঋগ্বেদ-৩/৩২/৯)।
ত্বং সদ্যো অপিবো জাত ইন্দ্র মদায় সোমং পরমে ব্যোমন্ ।
যদ্ধ দ্যাবাপৃথিবী অবিবেশীরথাভবঃ পূর্ব্যঃ কারুধায়াঃ।। (ঋগ্বেদ-৩/৩২/১০)।
যজ্জায়থাস্তদহরস্য কামেহংশোঃ পীয়ূষমপিবো গিরিষ্ঠাম্ ।
তং তে মাতা পরি যোষা জনিত্রী মহঃ পিতুর্দম অ্যসিঞ্চদগ্রে।। (ঋগ্বেদ-৩/৪৮/২)।
অর্থাৎ :
হে ইন্দ্র! তুমি জন্ম গ্রহণ করেই বলের জন্য সোম পান করেছিলে। মাতা তোমার মহিমা বলেছেন। তুমি বিস্তীর্ণ অন্তরীক্ষ পূর্ণ করেছ এবং দুগ্ধার্থে স্তোতৃগণের জন্যই ধন উৎপাদন করেছ। (ঋক-৭/৯৮/৩)।।  হে মহেন্দ্র! তুমি উল্লাস ও বীরত্ব প্রকাশের নিমিত্ত জন্মগ্রহণ মাত্রেই যে সোম পান করেছিলে, সে সোম পান কর। গোগণ, ঋত্বিগ্বর্গ বারিরাশি ও পাষাণ সকলে তোমার পানার্থে এ সোম প্রস্তুত করতে সমবেত হয়। (ঋক-৬/৪০/২)।।  হে দৌরাত্মরহিত ইন্দ্র! তোমার মহিমাই যথার্থ মহিমা। যেহেতু তুমি উৎপন্ন হয়েই সোম পান কর। তুমি বলবান, স্বর্গাদিলোক তোমার তেজ নিবারণ করতে পারে না। দিন, মাস ও বৎসরও নিবারণ করতে পারে না। (ঋক-৩/৩২/৯)।।  হে ইন্দ্র! তুমি জাতমাত্র সর্বোচ্চ স্বর্গ প্রদেশে থেকেই সদ্য আনন্দের জন্য সোম পান করেছ, যখন তুমি দ্যাবাপৃথিবীতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছ তখনই তুমি পুরাতন সৃষ্টি বিধাতা হয়েছ। (ঋক-৩/৩২/১০)।।  যে দিন (ইন্দ্র) তুমি জন্মগ্রহণ করেছ, সে দিনেই সোম পানের ইচ্ছা হলে তুমি পর্বতস্থ সোমলতার রস পান করেছিলে! যেহেতু তোমার মাতা যুবতী অদিতি তোমার প্রসিদ্ধ পিতার গৃহে স্তন্যদানের পূর্বে তোমায় সোম দান করেছিলেন। (ঋক-৩/৪৮/২)।।


মোটকথা, সোম-পানের মাদকত্ব ছাড়া ইন্দ্রের কথা যেন ভাবাই যায় না। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের গায়ত্রী ছন্দে রচিত একটি সমগ্র সূক্তেই ইন্দ্র স্বয়ং সোমপান-জনিত হর্ষে যেন স্বগতোক্তি করে চলেছেন, যেমন (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১০/১১৯)–

ইতি বা ইতি মে মনো গামশ্বং সনুয়ামিতি।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ১
প্র বাতা ইব দোধত উন্মা পীতা অযংসত।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ২
উন্না পীতা অযংসত রথমশ্বা ইবাশবঃ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৩
উপমা মতিরস্থিত বাশ্রা পুত্রমিব প্রিয়ম্ ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৪
অহং তষ্টেব বন্ধুরং পর্যচামি হৃদা মতিম্ ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৫
নহি মে অক্ষিপচ্চনাচ্ছাংৎসুঃ পঞ্চ কৃষ্টয়ঃ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৬
নহি মে রোদসী উভে অন্যং পক্ষং চন প্রতি।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৭
অভি দ্যাং মহিনা ভুবমভী মাং পৃথিবীং মহীম্ ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৮
হন্তাহং পৃথিবামিনাং নি দধানীহ বেহ বা।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ৯
ওষমিৎ পৃথিবীমহং জঙ্ঘনানীহ বেহ বা।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ১০
দিবি মে অন্যঃ পক্ষো ধো অন্যমতীকৃষম্ ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ১১
অহমস্মি মহামহোহভিনভ্যমুদীষিতঃ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ১২
গৃহো যাম্যরংকৃতো দেবেভ্যো হব্যবাহনঃ।   কুবিৎসোমস্যাপামিতি।। ১৩
অর্থাৎ :
আমার মানসই এই যে, গো অশ্ব দান করি। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ১।।  যেমন বায়ু বৃক্ষকে কম্পিত ও উন্নমিত করে সেরূপ সোমরস আমাকর্তৃক পীত হয়ে আমাকে উন্নমিত করেছে। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ২।।  যেরূপ শীঘ্রগামী ঘোটকেরা রথকে উন্নমিত করে রাখে সেরূপ সোমরসগুলি আমা কর্তৃক পীত হয়ে আমাকে উন্নমিত করে রেখেছে। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৩।।  যেরূপ গাভী হাম্বারবে বৎসের প্রতি যায় সেরূপ স্তব আমার দিকে আসছে। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৪।।  যেরূপ ত্বষ্টা (ছুতার) রথের উপরিভাগ নির্মাণ করে সেরূপ আমি মনে মনে স্তব রচনা করেছি অর্থাৎ স্তোতার মনে স্তব উদয় করে দিই। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৫।।  পঞ্চ জনপদের যে মনুষ্য আছে, তারা কেউ কখন আমার দৃষ্টি অতিক্রম করতে পারে না। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৬।।  দুই দ্যাবাপৃথিবী মিলিত হয়ে আমার এক পার্শ্বেরও সমান হবে না। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৭।।  আমার মহিমা স্বর্গলোককে এবং এ বিস্তীর্ণ পৃথিবীকে অতিক্রম করে। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৮।।  আমার এরূপ ক্ষমতা যে যদি বল, তবে এ পৃথিবীকে একস্থান হতে অন্য স্থানে সরিয়ে রাখতে পারি। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ৯।।  এ পৃথিবীকে আমি দগ্ধ করতে পারি। যে স্থান বল সে স্থান ধ্বংস করতে পারি। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ১০।।  আমার এক পার্শ্বদেশ আকাশে আছে আর এক পার্শ্বদেশ নীচের দিকে অর্থাৎ পৃথিবীতে রেখেছি। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ১১।।  আমি মহতেরও মহৎ, আমি আকাশের দিকে উঠছি। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ১২।।  আমাকে স্তব করে, আমি দেবতাদের নিকট হব্য বহন করি এবং আমি হব্য গ্রহণপূর্বক চলে যাই। আমি অনেকবার সোম পান করেছি। ১৩।।


এ জাতীয় দৃষ্টান্তে আদিম কাব্যশক্তির পরিচয় অবশ্যই উপেক্ষণীয় নয়। এবং সোমরসের হর্ষদায়ী মাদকত্ব গুণের পরিচয়ও নিশ্চয়ই সুস্পষ্ট। কিন্তু সোম নামের এই বৈদিক দেবতাটির মধ্যে কোনো লোকোত্তর আধ্যাত্মিক লক্ষণ অন্বেষণ করা অবান্তর নয় কি ?

.
দেবতা বৃহস্পতি :

পৃথিবীস্থানের আর একটি উল্লেখযোগ্য দেবতা হলেন বৃহস্পতি। পরবর্তীকালের দার্শনিক প্রস্থানে চার্বাক আলোচনায় এই বৃহস্পতি নামটি নিশ্চয়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধানতম বিষয় হিসেবেই চিহ্নিত করা হলেও ঋগ্বেদে বৃহস্পতির কল্পিত দেবগরিমা সেমত মুখ্য নয়।

মনে হয় বৃহস্পতির সঙ্গে ব্রহ্মণস্পতির খুব ঘনিষ্ঠ সংযোগ আছে, এবং উভয়েই একই দেবতা। ঋগ্বেদের সূক্ত-বিশেষে (ঋগ্বেদ-সূক্ত-২/২৩) উভয় নামই সমভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব ব্রহ্মন্ শব্দটির অর্থ-বিশ্লেষণ এই দেবনামের উপর আলোকপাতে সহায়ক হতে পারে। যদিও উপনিষদে ‘ব্রহ্মণ’ শব্দের অর্থ পরমসত্তা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু ঋগ্বেদে মোটেও তা নয়। নিঘণ্টু-মতে জানা যায়, ব্রহ্মন্ মানে অন্ন (নিঘণ্টু-২/৭) বা ধন (নিঘণ্টু-২/১০)। হয়তো বা শব্দটির প্রাক্-ইতিহাস এমন এক আদিম পর্যায়ের পরিচায়ক যখন মানুষের ধনসম্পদ বলতে প্রধানতই অন্ন বা খাদ্যদ্রব্য। সেক্ষেত্রে প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে ব্রহ্মণ্ শব্দের অন্নবাচকত্ব অবশ্য-স্বীকার্য। নিঘণ্টুর ব্যাখ্যায় নিরুক্তকার যাস্কও এ-শব্দের অন্নবাচকত্ব নিষ্পন্ন করবার উদ্দেশ্যে তৈত্তিরীয় উপনিষদ থেকে ‘জাতানি অন্নেন বর্ধন্তে’ ইত্যাদি বাক্য উদ্ধৃত করেছেন। তৈত্তিরীয় উপনিষদের সংশ্লিষ্ট শ্রুতিতে বলা হয়েছে–

‘অন্নাদ্বৈ প্রজাঃ প্রজায়ন্তে। যাঃ কাশ্চ পৃথিবীংশ্রিতাঃ। অথো অন্নেনৈব জীবন্তি। অথৈনদপি যন্ত্যন্ততঃ। অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম্ । তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। সর্বং বৈ তেহন্নমাপ্লুবন্তি। যেহন্নং ব্রহ্মোপাসতে। অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম্ । তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। অন্নাদ্ ভূতানি জায়ন্তে। জাতান্যন্নেন বর্ধন্তে। অদ্যতেহত্তি চ ভূতানি। তস্মাদন্নং তদুচ্যত ইতি।’- (তৈত্তিরীয়-২/২/১)
অর্থাৎ :
এই জগতে যত প্রজা (প্রাণী) আছে সব অন্ন থেকে উৎপন্ন। অন্নেই জীবন ধারণ করে। আবার জীবন শেষে ঐ অন্নেই বিলীন হয়। কারণ অন্নই হল সবার বড়। বস্তুর মধ্যে সর্বপ্রথম অন্নের জন্ম। তাই অন্নই হল সর্বৌষধি। যাঁরা অন্নকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করে তাঁরা যাবতীয় অন্নই প্রাপ্ত হয়। অন্ন থেকেই যাবতীয় ভূতের জন্ম। অন্নের জন্ম তারও আগে। অন্ন দ্বারাই জীব পুষ্ট হয়। অন্ন যেমন প্রাণীদের খাদ্য তেমনি প্রাণীরাও অন্নের অন্ন। সেজন্যই অন্নকে (খাদ্যকে) বলা হয় অন্ন। (তৈত্তিরীয়-২/২/১)


অন্নকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করার– স্তুতি করার– উপনিষদীয় ভাবনাটির উৎসে যে ব্রহ্মন্ শব্দের আদি-তাৎপর্যই প্রতিফলিত তা অনস্বীকার্য। তাই স্বীকার করতেই হয় যে প্রকৃত বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে শব্দটির প্রাথমিক অর্থ অন্ন। বেদ-ভাষ্যকার সায়ণাচার্যও বহু দৃষ্টান্তে ব্রহ্মন্ শব্দকে ‘স্তোত্র’ অর্থে ব্যবহার করলেও সুপ্রাচীন অন্নবাচক অর্থ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে পারেননি। অতএব এই দেবতাটির নামকরণের মূলে সুস্পষ্ট পার্থিব সম্পদের কামনাই অনুমেয়।

বৃহস্পতির জন্মবৃত্তান্ত, বর্ণনা, কীর্তিকলাপ এবং অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিবিধ পৌরাণিক ও কবিত্বময় কল্পনার নিদর্শন পাওয়া যায় এবং তাঁর প্রশংসায় বৈদিক কবিরা প্রায়ই এমন বিশেষণ ব্যবহার করেছেন যার বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই– অর্থাৎ প্রায় সমস্ত প্রধান-প্রধান বৈদিক দেবতাদের প্রসঙ্গে একই বিশেষণ প্রযুক্ত। এবং বলাই বাহুল্য, অন্যান্য বৈদিক দেবতাদের মতোই এই বৃহস্পতিকে উদ্দেশ্য করে বারবার বিবিধ পার্থিব সম্পদের কামনাই ব্যক্ত হয়েছে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৫৭)। যেমন–

ত্রাতারং ত্বা তনূনাং হবামহেহবস্পর্তরধিবক্তারমস্ময়ুম্ ।
বৃহস্পতে দেবনিদো নি বর্হয় মা দুরেবা ঊত্তরং সুম্নমুন্নশন্ ।। (ঋগ্বেদ-২/২৩/৮)।
ত্বা বয়ং সুবৃধা ব্রহ্মণস্পতে স্পার্হা বসু মনুষ্যা দদীমহি।
যা নো দূরে তলিতো যা অরাতয়োহভি সন্তি জম্ভয়া তা অনপ্নসঃ।। (ঋগ্বেদ-২/২৩/৯)।
ত্বয়া বয়মুক্তমং ধীমহে বয়ো বৃহস্পতে পপ্রিণা সস্নিনা যুজা।
মা নো দুঃশংসো অভিদিপ্সুরীশত প্র সুশংসা মতিভিস্তারিষীমহি।। (ঋগ্বেদ-২/২৩/১০)।
অনানুদো বৃষভো জগ্মিরাহবং নিষ্টপ্তা শত্রু পৃতনাসু সাসহিঃ।
অতি সত্য ঋণয়া ব্রহ্মণস্পত উগ্রস্য চিন্দমিতা বীলুহর্ষিণঃ।। (ঋগ্বেদ-২/২৩/১১)।
স সন্নয়ঃ স বিনয়ঃ পুরোহিতঃ স সুষ্টুতঃ স ষুধি ব্রহ্মণস্পতিঃ।
চাক্ষ্মো যদ্বাজং ভরতে মতী ধনাদিৎসূর্যস্তপতি তপ্যতুর্বথা।। (ঋগ্বেদ-২/২৪/৯)।
জনায় চিদ্য ঈবত উ লোকং বৃহস্পতির্দেবহূতৌ চকার।
ঘ্নন্ বৃত্রাণি বি পুরো দর্দরীতি জয়ঞ্ছত্রূঁরমিত্রাৎ পৃৎসু সাহন্ ।। (ঋগ্বেদ-৬/৭৩/২)।
অর্থাৎ :
হে বৃহস্পতি! তুমি লোক সকলকে উপদ্রব হতে রক্ষা কর, তুমি আমাদের পুত্রাদিকে পালন কর, আমাদের প্রতি মিষ্টবাক্য প্রয়োগ কর এবং আমাদের প্রতি প্রসন্ন হও। আমরা তোমাকে আহ্বান করি। তুমি দেবনিন্দুকদের বিনাশ কর, দুর্বুদ্ধিগণ যেন উৎকৃষ্ট সুখ লাভ করতে না পারে। (ঋক-২/২৩/৮)।।  হে ব্রহ্মণস্পতি! তুমি আমাদের বর্ধিত করলে আমরা যেন মনুষ্যগণের নিকট হতে স্পৃহণীয় ধন প্রাপ্ত হই। দূরে বা নিকটে যে সকল শত্রু আমাদের অভিভব করে সেই যজ্ঞহীন শত্রুদের বিনাশ কর। (ঋক-২/২৩/৯)।।  হে বৃহস্পতি! তুমি অভিলাষ পুরক ও পবিত্র, আমরা তোমার সহায়তা লাভ করে উৎকৃষ্ট অন্ন লাভ করব। যে দুরাত্মা আমাদের পরাভব করতে ইচ্ছা করে, সে যেন আমাদের অধিপতি না হয়, আমরা উৎকৃষ্ট স্তুতিদ্বারা পুণ্যবান হয়ে যেন উন্নতি লাভ করি। (ঋক-২/২৩/১০)।।  হে ব্রহ্মণস্পতি! তোমার দানের উপমা নেই, তুমি অভীষ্টবর্ষী, তুমি যুদ্ধে গমন করে শত্রুদের সন্তাপ প্রদান কর এবং সংগ্রামে তাদের বিনাশ কর। তোমার পরাক্রমই সত্য, তুমি ঋণ পরিশোধ কর, তুমি উগ্র এবং মদোন্মত্ত ব্যক্তিদের দমন কর। (ঋক-২/২৩/১১)।।  ব্রহ্মণস্পতি পুরোহিত, তিনি পদার্থ সকল একত্রিত ও পৃথককৃত করেন, তাঁকে সকলে স্তব করে, তিনি যুদ্ধে আবির্ভূত হন। সর্বদর্শী ব্রহ্মণস্পতি যখন অন্ন ও ধন ধারণ করেন তখনই সূর্য অনায়াসে দীপ্ত হন। (ঋক-২/২৪/৯)।।  যে বৃহস্পতি যজ্ঞে স্তুতিকারী লোককে স্থান প্রদান করেন, তিনি বৃত্রগণকে বধ করেন, যুদ্ধে শত্রুগণকে জয় করেন, অমিত্রসমূহকে অভিভূত করেন এবং পুরী সকল বিশেষরূপে বিদীর্ণ করেন। (ঋক-৬/৭৩/২)।।


এখানে বৃহস্পতি কর্তৃক বৃত্রবধ, অমিত্রসমূহকে অভিভূত করা এবং পুরী সকল বিশেষরূপে বিদীর্ণ করার বর্ণনা থেকে মনে হয় তিনি ইন্দ্রের অনুরূপ আচরণ করেন। এখানে আরও উল্লেখ্য, বৃহস্পতি শুধুই যে এইভাবে স্তুত হয়েছেন তাই নয়, তিনি নিজেও স্তুতি রচনা করেছেন এবং স্তোত্র গান করেছেন। যেমন–

প্র নূনং ব্রহ্মণস্পতি র্মন্ত্রং বদত্যুক্থ্যম্ ।
যস্মিন্নিন্দ্রো বরুণো মিত্রো অর্যমা দেবা ওকাংসি চক্রিরে।। (ঋগ্বেদ-১/৪০/৫)।
দেবাশ্চিত্তে অসূর্য প্রচেতসো বৃহস্পতে যজ্ঞিয়ং ভাগমানশুঃ।
উস্রা ইব সূর্যো জ্যোতিষ্য মহো বিশ্বেষামিজ্জনিতা ব্রহ্মণামসি।। (ঋগ্বেদ-২/২৩/২)।
এন্দ্রো বর্হিঃ সীদতু পিন্বতামিলা বৃহস্পতিঃ সামভির্ঋক্বো অর্চতু।
সুপ্রকেতং জীবসে মন্ম ধীমহি তদ্দেবানামবো অদ্যা বৃণীমহে।। (ঋগ্বেদ-১০/৩৬/৫)।
অস্য শ্লোকো দিবীয়তে পৃথিব্যামত্যো ন যংসদ্যক্ষভৃদ্বিচেতাঃ।
মৃগাণাং ন হেতয়ো যন্তি চেমা বৃহস্পতেরহিমায়া অভি দ্যূন্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১৯০/৪)।
হংসৈরিব সখিতির্বাবদদ্ভিরশ্মন্ময়ানি নহনা ব্যস্যন্ ।
বৃহস্পতিরভিকনিক্রদদ্গা উত প্রাস্তেঃদুচ্চ বিদ্বা অগায়ৎ।। (ঋগ্বেদ-১০/৬৭/৩)।
স সুষ্টূভা স ঋক্বতা গণেন বলং রুরোজ ফলিগং রবেণ।
বৃহস্পতিরুস্রিয়া হব্যসূদঃ কনিক্রদদ্বাবশতীরুদাজৎ।। (ঋগ্বেদ-৪/৫০/৫)।
অর্থাৎ :
ব্রহ্মণস্পতি নিঃসন্দেহই উক্থ্য (স্তুতি)-রূপ পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করেন। সে মন্ত্রে ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও অর্যমা দেবগণ অবস্থিতি করেন। (ঋক-১/৪০/৫)।।  হে অসূর্য প্রকৃষ্ট জ্ঞান সম্পন্ন বৃহস্পতি! দেবগণ তোমার যজ্ঞীয় ভাগ প্রাপ্ত হয়েছেন। জ্যোতি দ্বারা পূজনীয় সূর্য যেরূপ কিরণ উৎপাদন করেন, সেরূপ তুমি সমস্ত মন্ত্র উৎপাদন কর। (ঋগ্বেদ-২/২৩/২)।।  ইন্দ্র এসে কুশের উপর উপবেশন করুন, স্তুতিবাক্য বিশেষরূপে উচ্চারিত হোক, বৃহস্পতি ঋক ও সামের দ্বারা অর্চনা করুন, আমরা যেন উত্তম উত্তম কাম্যবস্তু লাভ করে দীর্ঘজীবী হই। দেবতাদের নিকট বিশিষ্ট রক্ষা ভিক্ষা করি। (ঋক-১০/৩৬/৫)।।  বৃহস্পতির শ্লোক দ্যুলোক ও ভূলোক ব্যাপ্ত হচ্ছে। বৃহস্পতি সূর্যের ন্যায় পূজিত হব্য ধারণ করেন, প্রাণীদের চৈতন্য সমুৎপাদন করেন ও ফল প্রদান করেন। বৃহস্পতির আয়ুধ মৃগয়াশীলগণের আয়ুধের ন্যায় গমন করে ও মায়াচারীদের অভিমুখে প্রত্যহ ধাবিত হয়। (ঋক-১/১৯০/৪)।।  বৃহস্পতির সহায়কগণ হংসের ন্যায় কোলাহল করতে লাগল, তাদের সাহায্যে তিনি প্রস্তরময় দ্বার খুলে দিলেন। অভ্যন্তরে রুদ্ধ গাভীগণ চিৎকার করে উঠল। তিনি উৎকৃষ্টরূপে স্তব ও উচ্চৈস্বরে গান করে উঠলেন। (ঋক-১০/৬৭/৩)।।  বৃহস্পতি স্তুতিযুক্ত ও দীপ্তিশালী গণের সাথে শব্দদ্বারা বলকে নাশ করেছিলেন। তিনি শব্দ করে ভোগপ্রদাত্রী ও হব্যপ্রেরিকা গাভীগণকে বার করেছিলেন। (ঋক-৪/৫০/৫)।।


এখানে ‘গণ’ শব্দটির উল্লেখ থেকে প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে, সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ঋগ্বেদে ‘গণ’ শব্দের অর্থ ট্রাইব বা ট্রাইবের যৌথ-জীবন। এ-প্রেক্ষিতে দেখা যায়, ঋগ্বেদের অন্যত্রও ব্রহ্মণস্পতিকে একাধারে গণপতি, শ্রেষ্ঠ কবি এবং শ্রেষ্ঠ অন্ন বলে প্রশংসা করা হয়েছে। যেমন–

গণানাং ত্বাং গণপতিং হবামহে কবিং কবীনামুপমশ্রবস্তমম্ ।
জ্যেষ্ঠরাজং ব্রহ্মণাং ব্রহ্মণস্পত আ নঃ শৃণ্বন্নূতিভিঃ সীদ সাদনম্ ।। (ঋগ্বেদ-২/২৩/১)।
অর্থাৎ :
হে ব্রহ্মণস্পতি! তুমি দেবগণের মধ্যে গণপতি, কবিগণের মধ্যে কবি, তোমার অন্ন সর্বোৎকৃষ্ট ও উপমানভূত। তুমি ব্রহ্মনদের (অন্নগুলির) মধ্যে জ্যেষ্ঠ রাজা। আমরা তোমাকে আহ্বান করি, তুমি আমাদের স্তুতি শ্রবণ করে রক্ষাগুলির সাথে আমাদের গৃহে উপবেশন কর। (ঋক-২/২৩/১)।।


এ-জাতীয় দৃষ্টান্তে স্তুত দেবতা এবং স্তোতা মানবদের সম্পর্ক এমনই ঘরোয়া ও ঘনিষ্ঠ যে, বৈদিক কবিদের অজস্র অতিশয়োক্তি সত্ত্বেও বৃহস্পতির পরিকল্পনায় আধুনিক অর্থে অধ্যাত্মবাদী চেতনা অন্বেষণ করা বাস্তবিকই দুরুহ প্রতীয়মান হয়।

.
পৃথিবী দেবতা :

পৃথিবীস্থানের আর একটি দেবতা বলতে পৃথিবীই। পৃথিবী এখানে মাতৃদেবী, এবং মাতৃদেবী হিসেবে বৈদিক সাহিত্যে তাঁর স্বাতন্ত্র্য যেমন খুবই স্বল্প, গৌরবও অতি গৌণ। ঋগ্বেদে প্রধানতই স্বর্গের দেবতা দ্যৌ-এর সঙ্গে সংযুক্তভাবে দ্যাবাপৃথিবী হিসেবে তিনি স্তুত হয়েছেন। নয়তো তাঁর স্বতন্ত্র স্তুতি বলতে মাত্র একটি ছোট্ট সূক্ত (ঋগ্বেদ-সূক্ত-৫/৮৪), যেমন–

‘বলিত্থা পর্বতানাং খিদ্রং বিভর্ষি পৃথিবি।
প্র যা ভূমিং প্রবত্বতি মহ্না জিনোষি মহিনি।। ১
স্তোমাসস্ত্বা বিচারিণি প্রতি ষ্টোভন্ত্যক্তুভিঃ।
প্র যা বাজং ন হেষন্তং পেরুমস্যস্যর্জুনি।। ২
দৃড়্হা চিদ্যা বনস্পতীন্ ক্ষয়া দর্ধর্য্যােজসা।
যত্তে অভ্রস্য বিদ্যুতো দিবি বর্ষন্তি বৃষ্টয়ঃ’।। ৩
অর্থাৎ :
হে পৃথিবী! ফলতঃ এস্থলে তুমি পর্বত সকলের খণ্ড ধারণ করছ। তুমি বলশালী ও শ্রেষ্ঠ কারণ তুমি মাহাত্ম্যদ্বারা পৃথিবীর প্রীতি বিধান কর। ১।।  হে বিচিত্রগমনশালিনী পৃথিবী! স্তোতৃবর্গ গমনশীল স্তোত্রদ্বারা তোমার স্তব করেন। হে অর্জুনি! তুমি শব্দায়মান অশ্বের ন্যায় বারিপূর্ণ মেঘকে উৎক্ষিপ্ত কর। ২।।  যে সময় দীপ্তিশালী অন্তরীক্ষ হতে তোমার মেঘের বৃষ্টি পতিত হয়, সে সময় তুমি দৃঢ় পৃথিবীর সাথে বৃক্ষ সকলকে বলপূর্বক ধারণ করে রাখ। ৩।।


এখানে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, পৃথিবীর এই স্তুতি বহুলাংশেই মূর্ত পৃথিবীর প্রশংসামাত্র। এখানে কোনরূপ অধ্যাত্ম খোঁজা নিরর্থক মাত্র।

এ-ছাড়া পৃথিবীস্থানের উল্লেখযোগ্য আর অন্যান্য দেবতা বলতে কয়েকটি নদী এবং প্রধানতই সরস্বতী। যেমন–

পাবকা নঃ সরস্বতী বাজেভির্বাজিনীবতী।  যজ্ঞং বষ্টু ধিয়াবসুঃ।। (ঋগ্বেদ-১/৩/১০)।।
মহো অর্ণঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি কেতুনা।  ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি।। (ঋগ্বেদ-১/৩/১২)।।
শুচির্দেবেষ্বর্পিতা হোত্রা মরূৎসু ভারতী।  ইলা সরস্বতী মহী বর্হিঃ সীদন্তু যজ্ঞিয়াঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৪২/৯)।
অর্থাৎ :
পবিত্রা, অন্নযুক্তযজ্ঞবিশিষ্টা ও যজ্ঞফলরূপধনদাত্রী সরস্বতী আমাদের অন্নবিশিষ্ট যজ্ঞ কামনা করুন। (ঋক-১/৩/১০)।।  সরস্বতী প্রবাহিত হয়ে প্রভূত জল সৃজন করেছেন, এবং সকল জ্ঞান উদ্দীপন করেছেন। (ঋক-১/৩/১২)।।  শুচি এবং দেবগণের মধ্যস্থা, হোমনিষ্পাদিকা ভারতী, ইলা এবং সরস্বতী যজ্ঞের উপযুক্তা হয়ে কুশের উপর উপবেশন করুন। (ঋক-১/১৪২/৯)।।


উল্লিখিত নদীগুলির স্তুতি যেরূপই হোক না কেন, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে দেবী হিসেবে নদীগুলির স্থান ঋগ্বেদে একেবারেই গৌণ এবং এগুলি মূলতই মূর্ত ও পার্থিব নদী হিসেবেই স্তুত।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : অন্তরীক্ষ বা আকাশের দেবতা] [*] [পরের পর্ব : দেবতা ও মানব- ইন্দ্র, বরুণ ও মরুৎগণ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 313,270 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 110 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: