h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১২ : অন্তরীক্ষ বা আকাশের দেবতা|

Posted on: 07/07/2015


2012

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১২ : অন্তরীক্ষ বা আকাশের দেবতা |
রণদীপম বসু

(খ) অন্তরীক্ষ বা আকাশের দেবতা

বৈদিক সাহিত্য তথা ঋগ্বেদে অন্তরীক্ষের প্রধান দেবতারা হলেন ইন্দ্র, ত্রিত আপ্ত্য, অপাং নপাৎ, মাতরিশ্বা, অহিবুধ্ন্য, অজ একপাদ, রুদ্র, মরুৎগণ, বায়ু, বাত, পর্জন্য, আপঃ। তাঁদের মধ্যে ইন্দ্রের গৌরব অবশ্যই প্রধানতম। তবে ইন্দ্রের কথা পরে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা আবশ্যক বিধায় বাকিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জেনে নেয়া যাক।


বৈদিক জল-দেবতা ত্রিত আপ্ত্য, অপাং নপাৎ ও আপঃ :

ঋগ্বেদে এই তিন দেবতাই জলের সাথে সম্পর্কিত বা জল-দেবতা। তবে ত্রিত আপ্ত্য নামে দেবতাটির বৈশিষ্ট্য ঋগ্বেদে অস্পষ্ট। আপ্ত্য শব্দের ব্যাখ্যায় টীকাকার সায়ণ বলেছেন, অপাং পুত্র– অর্থাৎ জলের পুত্র। এ-থেকে কোনো সুপ্রাচীন পৌরাণিক কল্পনা অনুমিত হয়। যেমন–

যচ্চ গোষু দুঃষ্বপ্ন্যং যচ্চাস্মে দুহিতর্দিবঃ।
ত্রিতায় তদ্বিভাবর্ষাপ্ত্যায় পরা বহানেহসো ব ঊতয়ঃ সুঊতয়ো বা ঊতয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৭/১৪)।
যথা কলাং যথা শফং যথ ঋৃণং সংনয়ামসি।
এবা দুঃষ্বপ্ন্যং সর্বমাপ্ত্যে সং নয়ামস্যনেহসো ব ঊতয়ঃ সুঊতয়ো ব ঊতয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৭/১৭)।
অর্থাৎ :
হে স্বর্গের দুহিতা ঊষা ! আমাদের গোসমূহে যে দুঃস্বপ্ন আছে ও আমাদের যে দুঃস্বপ্ন হয়েছে, হে বিভাবরি ! আপ্ত্য ত্রিতের জন্য তা দূর করে দাও। তোমরা রক্ষা করলে উপদ্রব থাকে না, তোমাদের রক্ষাই সুরক্ষা। (ঋক-৮/৪৭/১৪)।।  (হে ঊষাদেবী !) যে প্রকারে যজ্ঞার্থ পশুর হৃদয়াদি এবং তার শৃঙ্গাদি ক্রমে ক্রমে বিলুপ্ত হয়, ঋণ যেমন ক্রমে ক্রমে শোধ করতে হয়, সেরূপ আপ্ত্য ত্রিতের সমস্ত দুঃস্বপ্ন ক্রমে ক্রমে দূর করব। তোমরা রক্ষা করলে উপদ্রব থাকে না, তোমাদের রক্ষাই সুরক্ষা। (ঋক-৮/৪৭/১৭)।।


অন্যান্য দৃষ্টান্তে আপ্ত্য ত্রিত দেবতাটির প্রধান কীর্তি বৃত্র-ধ্বংস। কোথাও বা ত্রিত আপ্ত্য নিজেই বৃত্রকে ধ্বংস করছেন, কোথাও বা ইন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতায় তিনি এই কীর্তি সম্পাদন করছেন, কোথাও বা মরুৎগণ তাঁকে এ-কাজে সহায়তা করছেন। অবশ্যই ঋগ্বেদে বৃত্র-ধ্বংস মূলতই ইন্দ্রের কীর্তি; কিন্তু তারই সঙ্গে ত্রিত আপ্ত্যর সম্পর্ক থেকে অনুমান হয় এই অস্পষ্ট দেবতাটিও যুদ্ধ-দেবতা বলেই কল্পিত– যদিও যুদ্ধ-দেবতা হিসেবে ইন্দ্রের তুলনায় তাঁর স্থান অত্যন্ত গৌণ।

অপাং নপাৎ জল-দেবতা, ফলে জল এবং জল-নির্ভর উর্বরতার কামনাই তাঁর স্তুতির মূল উপাদান। যেমন–

উপেমসৃক্ষি বাজযুর্বচস্যাং চনো দধীত নাদ্যো গিরো মে।
অপাং নপাদাশুহেমা কুৎবিৎস সুপেশসস্করতি জ্যোষিষদ্ধি।। (ঋগ্বেদ-২/৩৫/১)।
সমন্যা যন্ত্যুপ যন্ত্যন্যাঃ সমানমুর্বং নদ্য পৃণন্তি।
তমু শুচিং শুচয়ো দীদিবাংসমপাং নপাতং পরি তস্থূরাপঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৫/৩)।
অস্মৈ তিস্রো অব্যথ্যায় নারীর্দেবায় দেবী র্দিধিষন্ত্যন্নম্ ।
কৃতা ইবোপ হি প্রসর্স্রে অপ্সু স পীযুষং ধয়তি পূর্বসূনাম্ ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৫/৫)।
স ঈং বৃষাজনয়ত্তাসু গর্ভস ঈং শিশুর্ধয়তি তং রিহন্তি।
সো অপাং নপাদনভিন্লাতবর্ণোহন্যস্যেবেহ তন্বা বিবেষ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৫/১৩)।
অর্থাৎ :
আমি অন্নাভিলাষে এ স্তুতি উচ্চারণ করছি। শব্দকারী শীঘ্রগামী অপাং নপাৎ নামক দেবতা আমাদের প্রচুর অন্ন দান করুন ও সুন্দররূপবিশিষ্ট করুন, আমি তাঁর স্তুতি করছি, তিনি স্তুতি ভালবাসেন। (ঋক-২/৩৫/১)।।  কোন কোন জল একত্র মিলিত হয়, অন্য জল তাদের সাথে মিলিত হয়; ওরা সকলে নদী হয়ে অনলকে প্রীত করে। বিশুদ্ধ জলসমূহ নির্মল দীপ্তিমান অপাং নপাৎ নামক দেবতার চারদিকে বেষ্টন করে থাকে। (ঋক-২/৩৫/৩)।।  ইলা, সরস্বতী ও ভারতী নামক দেবীত্রয়, দুঃখরহিত অপাং নপাৎ দেবতার জন্য অন্ন ধারণ করেন। তাঁরা জলমধ্যে উৎপন্ন পদার্থের ন্যায় প্রসারিত হন। সেই অপাং নপাৎ নামক দেবতা সর্বাগ্রে উৎপন্ন জলের সারভূত সোম পান করেন। (ঋক-২/৩৫/৫)।।  সেচনসমর্থ সে অপাং নপাৎ ঐ সমস্ত জলমধ্যে গর্ভ উৎপন্ন করেছেন। তিনিই আবার পুত্রস্বরূপ হয়ে জল পান করেন, জলসমূহ তাঁকেই লেহন করে। দীপ্তিযুক্ত সে অপাং নপাৎ এ পৃথিবীতে অন্য শরীরে ব্যাপ্ত হয়েছেন। (ঋক-২/৩৫/১৩)।।

.
তবে ঋগ্বেদে জল এবং জল-নির্ভর উর্বরতার কামনা আরও সুস্পষ্ট হয়েছে দেবতা আপঃ-র কল্পনায়। আপঃ বা জলগণ ঋগ্বেদে মূলতই মাতৃরূপে স্তুত হয়েছেন। যেমন–

আপো অস্মান্মাতরঃ শুন্ধয়ন্তু ঘৃতেন নো ঘৃতপ্বঃ পুনতু।
বিশ্বং হি রিপ্রং প্রবহন্তি দেবীরুদিদাভ্যঃ শুচিরা পূত এমি।। (ঋগ্বেদ-১০/১৭/১০)।
অন্বযো যন্ত্যধ্বভির্জাময়ো অধ্বরীয়তাং। পৃঞ্চতীর্মধুনা পয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/১৬)।
অমূর্যা উপ সূর্যে যাভি র্বা সূর্যঃ সহ। তা নো হিন্বন্ত্বধ্বরম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/১৭)।
অপো দেবীরূপ হ্বয়ে যত্র গাবঃ পিবন্তি নঃ। সিন্ধুভ্যঃ কর্ত্বং হবিঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/১৮)।
অপ্ স্বন্তরমৃতমপ্সু ভেষজমপামুত প্রশস্তয়ে। দেবা ভবত বাজিনঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/১৯)।
অপ্সু মে সোমো অব্রবীদন্তর্বিশ্বানি ভেষজা।
অগ্নিং চ বিশ্বশংভুবমাপশ্চ বিশ্বভেষজীঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/২০)।
আপঃ পৃণীত ভেষজং বরূথং তন্বে মম। জ্যোক্ চ সূর্য্যং দৃশে।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/২১)।
যা আপো দিব্যা উত বা স্রবন্তি খনিত্রিমা উত বা যাঃ স্বয়ংজাঃ।
সমুদ্রার্থা যাঃ শুচয়ঃ পাবকাস্তা আপো দেবীরিহ মামবন্তু।। (ঋগ্বেদ-৭/৪৯/২)।
অর্থাৎ :
জলগণ আমাদের জননীস্বরূপ, আমাদের শোধন করুন, এঁরা যেন ঘৃত প্রবাহে প্রবহমান হচ্ছেন, সে ঘৃতের দ্বারা আমাদের মলাপনয়ন করুন। এ দেবীরা সকল পাপকে স্রোতে বয়ে নিয়ে যান। এদের মধ্য হতে আমি শুচি ও পবিত্র হয়ে আসছি। (ঋক-১০/১৭/১০)।।  আমরা যজ্ঞ কামনা করি, আমাদের মাতৃস্থানীয় জল যজ্ঞ পথ দিয়ে যাচ্ছে; সে জল আমাদের হিতকারী বন্ধু এবং দুগ্ধকে মিষ্ট করছে। (ঋক-১/২৩/১৬)।।  এই যে সমস্ত জল সূর্যের সমীপে আছে, অথবা সূর্য যে সমস্ত জলের সাথে আছেন, সে সমস্ত জল আমাদের যজ্ঞ প্রীতিকর করুক। (ঋক-১/২৩/১৭)।।  যে জল আমাদের গাভীসকল পান করে, সে জলদেবীকে আহ্বান করি। যে জল নদীরূপে বয়ে যাচ্ছে, তাদের হব্য দেওয়া কর্তব্য। (ঋক-১/২৩/১৮)।।  জলের ভিতর অমৃত আছে, জলে ঔষধ আছে, হে ঋষিগণ ! সে জলের প্রশংসায় উৎসাহী হও। (ঋক-১/২৩/১৯)।।  সোম আমাকে বলেছেন জলের মধ্যে সকল ঔষধি আছে এবং জগতের সুখকর অগ্নি আছে, এবং সকল প্রকার ভেষজ আছে। (ঋক-১/২৩/২০)।।  হে জল ! আমার শরীরের জন্য রোগ-নিবারক ঔষধি পরিপুষ্ট কর, যেন আমরা বহুকাল সূর্যকে দেখতে পাই। (ঋক-১/২৩/২১)।।  যে আপসমূহ অন্তরিক্ষে উৎপন্ন হয়, অথবা যা প্রবাহিত হয়ে খননদ্বারা যাদের লাভ করা যায়, যা স্বয়ং উৎপন্ন হয়ে সমুদ্রাভিমুখে গমন করে, দীপ্তিযুক্ত পবিত্রকর সে আপদেবীসমূহ আমায় রক্ষা করুন। (ঋক-৭/৪৯/২)।।


কিন্তু এখানে একটি বিষয় স্মর্তব্য যে, বৈদিক দেবলোক মূলতই পুরুষ-প্রধান; তাই দেবী ও জননীরূপে পরিকল্পিতা এই জল শেষতক পুরুষ দেবতাদেরই আজ্ঞাধীন। যেমন–

আবর্বৃততীরধ নু দ্বিধারা গোষুযুধো ন নিয়বং চরন্তীঃ।
ঋৃষে জনিত্রীর্ভুবনস্য পত্নীরপো বন্দস্ব সবৃধঃ সযোনীঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৩০/১০)।
শতপবিত্রাঃ স্বধয়া মদন্তীর্দেবীর্দেবানামপি যন্তি পাথঃ।
তা ইন্দ্রস্য ন মিনন্তি ব্রতানি সিন্ধুভ্যো হব্যং ঘৃতবজ্জুহোত।। (ঋগ্বেদ-৭/৪৭/৩)।
অর্থাৎ :
যে ইন্দ্র জলের নিমিত্ত যুদ্ধ করেন, তাঁর আজ্ঞায় জলগণ দু ধারায় অর্থাৎ নানা ধারায় বার বার পতিত হয়ে সোমের সাথে মিশ্রিত হয়, তারা ভুবনের জননীস্বরূপ, ভুবনের রক্ষাকর্ত্রীস্বরূপ। তারা সোমের সঙ্গে একত্রে স্ফীত হয়, তারা আত্মীয়স্বরূপ। হে ঋষি ! এতাদৃশ জলগণকে বন্দনা কর। (ঋক-১০/৩০/১০)।।  বহু পবিত্র রূপবিশিষ্ট অশ্বদ্বারা লোকের হর্ষ উৎপাদক ও দ্যোতমান জল দেবগণের স্থানে প্রবেশ করেন। তাঁরা ইন্দ্রের কর্ম হিংসা করেন না। তোমরা সিন্ধুগণের উদ্দেশে ঘৃতযুক্ত হব্য হোম কর। (ঋক-৭/৪৭/৩)।।


.
মেঘ-দেবতা পর্জন্য :

জল-কামনার সঙ্গে সংযুক্ত আর একটি বৈদিক দেবতার নাম পর্জন্য। ঋগ্বেদে পর্জন্যের উদ্দেশ্যে মাত্র তিনটি সূক্ত রচিত হয়েছে। তিনি অন্তরীক্ষের পুত্ররূপে পরিকল্পিত। জলভরা মেঘকেই প্রাচীন কবিরা এই দেবতারূপে কল্পনা করেছিলেন। যেমন–

পর্জন্যায় প্র গায়ত দিবস্পুত্রায় মীড়্হুষে। স নো যবসমিচ্ছতু।। (ঋগ্বেদ-৭/১০২/১)।
প্র বাতা বান্তি পতয়ন্তি বিদ্যুত উদোষধী র্জিহতে পিন্বতে স্বঃ।
ইরা বিশ্বস্মৈ ভুবনায় জায়তে যৎ পর্জন্যঃ পৃথিবী রেতসাবতি।। (ঋগ্বেদ-৫/৮৩/৪)।
যস্য ব্রতে পৃথিবী নন্নমীতি যস্য ব্রতে শফবজ্জর্ভুরীতি।
যস্য ব্রত ওষধীর্বিশ্বরূপাঃ স নঃ পর্জন্য মহি শর্ম যচ্ছ।। (ঋগ্বেদ-৫/৮৩/৫)।
অর্থাৎ :
অন্তরীক্ষের পুত্র সেচনসমর্থ পর্জন্যদেবের উদ্দেশে স্তোত্র উচ্চারণ কর। তিনি আমাদের অন্ন ইচ্ছা করুন। (ঋক-৭/১০২/১)।।  যেকালে পর্জন্য বৃষ্টিদ্বারা পৃথিবী রক্ষা করেন তখন প্রবল বায়ু বইতে থাকে, চারদিকে বিদ্যুৎ স্ফুরণ হয়, ওষধিসমূহ অঙ্কুরিত হয়, অন্তরীক্ষ বিগলিত হয় এবং পৃথিবী সমস্ত জীবের হিত সাধনে সমর্থ হয়। (ঋক-৫/৮৩/৪)।।  হে পর্জন্য ! তোমারই কার্যবশত পৃথিবী অবনত হয়, খুরবিশিষ্ট গবাদি পুষ্টিলাভ করে এবং ওষধি সকল বিবিধরূপ ধারণ করে। তুমি আমাদের বিপুল সুখ প্রদান কর। (ঋক-৫/৮৩/৫)।।


এই বৃষ্টির মেঘ নিয়ে বৈদিক কবিদের উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই। তবে সমস্ত উচ্ছ্বাসের পিছনে একটি কথাই বার বার সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে– এই মেঘ এই বৃষ্টি পৃথিবীতে উদ্ভিদের জন্ম দেয়, পুষ্টিসাধন করে ইত্যাদি। যেমন–

অভি ক্রন্দ স্তনয় গর্ভমা ধা উদন্বতা পরি দীয়া রথেন।
দৃতিং সু কর্ষ বিষিতং ন্যঞ্চং সমা ভবন্তূদ্বতো নিপাদাঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৮৩/৭)।
মহান্তং কোশমুদচা নিযিঞ্চ স্যন্দন্তাং কূল্যা বিষিতাঃ পূরস্তাৎ।
ঘৃতেন দ্যাবাপৃথিবী ব্যুন্ধি সুপ্রপাণং ভবদ্বঘ্ন্যাভ্যঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৮৩/৮)।
তিস্রো বাচঃ প্র বদ জ্যোতিরগ্রা যা এতদ্দুহ্রে মধুদোঘমূধঃ।
স বৎসং কৃণ্বন্গর্ভমোষধীনাং সদ্যো জাতো বৃষভো রোরবীতি।। (ঋগ্বেদ-৭/১০১/১)।
ইদং বচঃ পর্জন্যায় স্বরাজে হৃদো অস্ত্বন্তরং তজ্জুজোষৎ।
ময়োভুবো বৃষ্টয়ঃ সন্ত্বস্মে সুপিপ্পলা ওষধীর্দেবগোপাঃ।। (ঋগ্বেদ-৭/১০১/৫)।
স রেতোধা বৃষভঃ শশ্বতীনাং তস্মিন্নাত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ।
তন্ম ঋৃতং পাতু শতসারদায় যূয়ং পাত স্বস্তিভিঃ সদা নঃ।। (ঋগ্বেদ-৭/১০১/৬)।
যো গর্ভমোষধীনাং গবাং কৃণোত্যর্বতাঃ। পর্জন্যঃ পুরুষীণাম্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/১০২/২)।
তস্মা ইদাস্যে হবির্জুহোতা মধুমত্তমং। ইলাং নঃ সংযতং করৎ।। (ঋগ্বেদ-৭/১০২/৩)।
অর্থাৎ :
তুমি পৃথিবীর উপর শব্দ কর, গর্জন কর, বারিদ্বারা ওষধিসমূহের গর্ভবিধান কর, বারিপূর্ণ রথদ্বারা অন্তরীক্ষে পরিভ্রমণ কর, দৃঢ়বদ্ধ নিম্নমুখ ভস্ত্রা বারিপূর্ণ মেঘকে উন্মুক্ত কর। উচ্চ ও নিম্ন স্থান সকল যেন সমতল হয়। (ঋক-৫/৮৩/৭)।।  হে পর্জন্য ! তুমি বিপুল কোশবৎ মেঘকে উর্ধ্বে উত্তোলন করা, এ হতে বারিবর্ষণ কর, নদীসকল অপ্রতিহত বেগে সম্মুখে প্রবাহিত হোক। বারিদ্বারা স্বর্গ ও পৃথিবীকে আর্দ্র কর এবং ধেনুগণের জন্য প্রচুর পানীয় উৎপন্ন হোক। (ঋক-৫/৮৩/৮)।।  অগ্রভাগে জ্যোতিবিশিষ্ট যে তিন প্রকার বাক্য উদক উৎপাদক মেঘকে দোহন করে, সে বাক্য উচ্চারণ কর। তিনিও সহবাসী বৈদ্যুতাগ্নি প্রাদুর্ভুত করে এবং ওষধিসমূহের গর্ভ উৎপাদন করে সদ্য উৎপন্ন হয়ে বৃষভের ন্যায় শব্দ করছেন। (ঋক-১/১০১/১)।।  স্বায়ত্তদীপ্তিবিশিষ্ট সে পর্জন্যের উদ্দেশে এ স্তোত্র করছি। তিনি এ গ্রহণ করুন। এ তাঁর হৃদয়গ্রাহী হোক। আমাদের জন্য সুখকর বৃষ্টি পতিত হোক। পর্জন্য যাদের রক্ষক, সে ওষধিসমূহ সুফলযুক্ত হোক। (ঋক-৭/১০১/৫)।।  সে পর্জন্য বৃষভের ন্যায় বহুতর ওষধিসমূহের প্রতি তেজ আধান করেন। স্থাবর ও জঙ্গমের আত্মা তাঁতেই বাস করে। তৎপ্রদত্ত জল শতবৎসরব্যাপী জীবনের জন্য আমাকে রক্ষা করুন। তোমরা সর্বদা আমাদের স্বস্তিদ্বারা পালন কর। (ঋক-৭/১০১/৬)।।  যে পর্জন্যদেব ওষধিসমূহের, গোসমূহের, অশ্বসমূহের ও নারীগণের গর্ভ উৎপাদন করেন। (ঋক-৭/১০২/২)।। তাঁরই উদ্দেশে দেবগণের আর্যর্ভূত অগ্নিতে অতিশয় রসবান হব্য হোম কর। তিনি আমাদের উদ্দেশে অন্ন নিশ্চিত করে দেন। (ঋক-৭/১০২/৩)।।


.
বায়ু-দেবতা বায়ু, বাত ও মাতরিশ্বা :

শুধু মেঘ আর জলই নয়, পার্থিব সম্পদের কামনায় বৈদিক কবিরা বাতাসেরও নানাভাবে স্তুতি করেছেন। ঋগ্বেদে প্রধানত যে তিনটি বায়ুদেবতার উল্লেখ রয়েছে, তাঁরা হলেন– বায়ু, বাত এবং মাতরিশ্বা।
বায়ু এবং বাত বৈদিক দেবতা হলেও ঋগ্বেদে তাঁদের বর্ণনা প্রায়শই মূর্ত প্রাকৃতিক বাতাসেরই বর্ণনা। যেমন ঋগ্বেদের একটি বায়ু-স্তুতিমূলক সূক্তে, যার কবি অনিল ঋষি, বলা হচ্ছে (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১০/১৬৮)–

বাতস্য নু মহিমানং রথস্য রুজন্নেতি স্তনয়ন্নস্য ষোষঃ।
দিবিস্পৃগ্যাত্যরুণানি কৃণ্বন্নুতো এতি পৃথিব্যা রেণুমস্যন্ ।। ১।
সং প্রেরতে অনু বাতস্য বিষ্টা ঐনং গচ্ছন্তি সমনং ন যোষাঃ।
তাভিঃ সযুক্সরথং দেব ঈয়তেহস্য বিশ্বস্য ভুবনস্য রাজা।। ২।
অন্তরিক্ষে পথিভিরীয়মানো ন নি বিশতে কতমচ্চনাহঃ।
অপাং সখা প্রথমজা ঋতাবা ক্ব স্বিজ্জাতঃ কুত আ বভূব।। ৩।
আত্মা দেবানাং ভুবনস্য গর্ভো যথাবশং চরতি দেব এষঃ।
ঘোষা ইদস্য শৃণ্বিরে ন রূপং তস্মৈ বাতায় হবিষা বিধেম।। ৪।
অর্থাৎ :
যে বায়ু রথের ন্যায় বেগে ধাবিত হন, তাঁকে আমি বর্ণনা করব। এঁর শব্দ বজ্রের শব্দের ন্যায়, ইনি বৃক্ষাদি ভঙ্গ করতে করতে আসেন। ইনি চতুর্দিক রক্তবর্ণ করতে করতে আকাশ পথ অবলম্বনপূর্বক গমন করেন। এবং পৃথিবীর ধূলি বিকীরণ করতে করতে চলে যান। ১।।  সুস্থির পদার্থ অর্থাৎ পর্বতাদি পর্যন্ত বায়ুর গতিবশে কম্পমান হতে থাকে। ঘোটকীরা যেমন যুদ্ধে যায় সেরূপ এ বায়ুর দিকে গমন করে। তিনি সে ঘোটকীদের সহায় পেয়ে রথে আরোহণপূর্বক এ সমস্ত ভুবনের রাজার ন্যায় চলে যান। ২।।  ইনি আকাশপথে গতিবিধি করবার সময় কোন দিনই স্থির হয়ে বসে থাকেন না। ইনি জলের বন্ধু, জলের অগ্রে উৎপন্ন হন, (অগ্রে বায়ু, পরে বৃষ্টি)। ইনি সত্যস্বভাব। বল দেখি, ইনি কোথায় জন্মেছেন? কোথা হতে এসেছেন? ৩।।  এ বায়ুদেব দেবতাদের আত্মাস্বরূপ, ভুবনের সন্তানস্বরূপ, যথা ইচ্ছা বিহার করেন। এঁর শব্দই অনেক প্রকার শোনা যায়, এঁর রূপ প্রত্যক্ষ হয় না। এস, হবি দিয়ে সে বায়ুর পূজা করি। ৪।।


তবে ঋগ্বেদের অন্যত্র আবার এই বায়ু-দেবতারা অপরাপর দেবতাদের সঙ্গেও একত্রে স্তুত হয়েছেন। যেমন–

তে নো রুদ্রঃ সরস্বতী সজোষা মীড়্হুষ্মন্তো বিষ্ণুমৃলন্তু বায়ুঃ।
ঋভুক্ষা বাজো দৈব্যো বিধাতা পর্জন্যাবাতা পিপ্যতামিষং নঃ।। (ঋগ্বেদ-৬/৫০/১২)।
পর্জন্যবাতা বৃষভা পৃথিব্যাঃ পুরীষাণি জিন্বতমপ্যানি।
সত্যাশ্রুতঃ কবয়ো যস্য গীর্ভির্জগতঃ স্থাতর্জগদা কৃণুধ্বম্ ।। (ঋগ্বেদ-৬/৪৯/৬)।
অর্থাৎ :
রুদ্র ও সরস্বতী, বিষ্ণু ও বায়ু, ঋভুক্ষা, বাজ ও দেব বিধাতা যেন তুল্যরূপ প্রসন্ন হয়ে আমাদের সুখী করেন। পর্জন্য ও বায়ু যেন আমাদের অন্ন বর্ধিত করেন। (ঋক-৬/৫০/১২)।।  হে বর্ষণকারী পর্জন্য ও বাত ! তোমরা অন্তরীক্ষ হতে প্রাপ্য জল প্রেরণ কর। হে জ্ঞানসম্পন্ন, স্তোত্রশ্রবণকারী, জগৎ সংস্থাপক মরুৎগণ ! তোমরা যার স্তোত্রদ্বারা প্রসন্ন হও তার সমস্ত প্রাণিজাত সমৃদ্ধ কর। (ঋক-৬/৪৯/৬)।।


‘নিরুক্ত’কার যাস্ক-মতে ‘মাতরিশ্বা’ শব্দের অর্থও বায়ু; মাতরিশ্বন্ বায়ু-দেবতাই। কিন্তু ঋগ্বেদের অনেক জায়গায়ই দেখা যায় অগ্নিরই নাম মাতরিশ্বা। যেমন–

স মাতরিশ্বা পুরুবারপুষ্টির্বিদদ্গাতুং তনয়ায় শ্বর্বিৎ।
বিশাং গোপা জনিতা রোদস্যোর্দেবা অগ্নিং ধারয়ন্দ্রবিণোদাম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/৯৬/৪)।
উদু ষ্টুতঃ সমিধা যহেবা অদ্যৌদ্বর্ষ্মন্দিবো অধি নাভা পৃথিব্যাঃ।
মিত্রো অগ্নিরীড্যো মাতরিশ্বা দূতো বক্ষদ্যজথায় দেবান্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/৫/৯)।
তং শুভ্রমগ্নিমবসে হবামহে বৈশ্বানরং মাতরিশ্বানমুক্থ্যম্ ।
বৃহস্পতিং মনুষো দেবতাতয়ে বিপ্রং শ্রোতারমতিথিং রঘূষ্যদম্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/২৬/২)।
অর্থাৎ :
সে অন্তরীক্ষস্থ মাতরিশ্বা অনেক বরণীয় পুষ্টি দান করেন। তিনি স্বর্গদাতা, সকল লোকের রক্ষক এবং দ্যাবাপৃথিবীর উৎপাদক। এ অগ্নি আমার তনয়কে গমনের পথ দেখিয়ে দিন। দেবগণ সে ধনদাতা অগ্নিকে দূতরূপে নিয়োগ করেছেন। (ঋক-১/৯৬/৪)।।  আমাদের দ্বারা স্তুত ও দীপ্তিদ্বারা মহান অগ্নি পৃথিবীর নাভিতে অর্থাৎ বেদিতে অবস্থান করে অন্তরীক্ষ বিদ্যোতিত করেছেন। সকলের মিত্র, স্তুতিযোগ্য মাতরিশ্বা দেবগণের দূত হয়ে যজ্ঞে দেবগণকে আনুন। (ঋক-৩/৫/৯)।।  আমরা আশ্রয় প্রাপ্তির জন্য এবং যজমানের যজ্ঞের জন্য সেই শুভ্র, বৈশ্বানর, মাতরিশ্বা, উকথযোগ্য, যজ্ঞপতি, মেধাবী, শ্রোতা, অতিথি ও ক্ষিপ্রগামী অগ্নিকে আহ্বান করি। (ঋক-৩/২৬/২)।।


বেদ-টীকাকার সায়ণের ব্যাখ্যায় অন্তরীক্ষরূপ মাতৃক্রোড়ে বিদ্যুৎরূপে গমনাগমন করেন বলে অগ্নির আর একটি নাম মাতরিশ্বা। ঋগ্বেদে কোথাও মাতরিশ্বাকে অগ্নি আবার কোথাও ঘর্ষণের সাহায্যে অগ্নির উৎপাদক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। ঝড় উঠলে গাছে-গাছে লেগে দাবানল জ্বলে ওঠে– হয়তো এ জাতীয় ঘটনা লক্ষ্য করতে করতেই বৈদিক কবিরা মাতরিশ্বার সঙ্গে অগ্নির ঘনিষ্ট সম্পর্ক কল্পনা করেছিলেন। যেমন–

মসৃবাংসমিব ত্মনাগ্নিমিত্থা তিরোহিতম্ ।
ঐনং নয়ন্মাতরিশ্বা পরাবতো দেবেভ্যো মথিতং পরি।। (ঋগ্বেদ-৩/৯/৫)।
নির্ষদীং বুধ্নান্মহিষস্য বর্পস ঈশানাসঃ শবসা ক্রশ্ত সূরয়ঃ।
যদীমনু প্রদিবো মধ্ব আধবে গুহা সন্তং মাতরিশ্বা মথায়তি।। (ঋগ্বেদ-১/১৪১/৩)।
মথীদ্যদীং বিষ্টো মাতরিশ্বা হোতারং বিশ্বাপ্সুং বিশ্বদেব্যম্ ।
নি য়ং দধুর্মনূষ্যাসু বিক্ষু স্বর্ণ চিত্রং বপুষে বিভাবম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১৪৮/১)।
মথীদ্যদীং বিভৃতো মাতরিশ্বা গৃহেগৃহে শ্যেতো জেন্যো ভূৎ।
আদীং রাজ্ঞে ন সহীয়সে সচা সন্না দূত্যং ভৃগবাণো বিবায়।। (ঋগ্বেদ-১/৭১/৪)।
অর্থাৎ :
পিতা যেরূপ স্বচ্ছন্দগামী পুত্রকে বলপূর্বক আনয়ন করেন, সেরূপ মাতরিশ্বা স্বেচ্ছাপূর্বক তিরোহিত ও মন্থনদ্বারা নিষ্পাদিত এ অগ্নিকে দেবতাগণের জন্য আনয়ন করেছিলেন। (ঋক-৩/৯/৫)।।  যেহেতু মহাযজ্ঞের মূল হতে যজ্ঞের রূপসিদ্ধি করণে সমর্থ ঋত্বিকগণ বলপ্রয়োগ দ্বারা অগ্নিকে উৎপন্ন করছেন এবং অনাদিকাল হতে সুন্দররূপে প্রক্ষেপ করবার নিমিত্ত গুহাস্থিত অগ্নিকে মাতরিশ্বা চালন করছেন। (ঋক-১/১৪১/৩)।।  মাতরিশ্বা প্রবেশ করে নানা রূপবিশিষ্ট সর্বদেবকার্যকুশল দেবগণের আহ্বানকর্তা অগ্নিকে প্রবুদ্ধ করেছেন। পূর্বে দেবগণ একে বিচিত্র দ্যুতিমান সূর্যের ন্যায় মানুষ ও ঋত্বিকগণের যজ্ঞ সমাধার জন্য স্থাপন করেছিলেন। (ঋক-১/১৪৮/১)।।  মাতরিশ্বা মথিত অগ্নি শুভ্রবর্ণ হয়ে সকল যজ্ঞগৃহে প্রাদুর্ভূত হন; তখন সুহৃৎ রাজা প্রবল রাজার নিকটে যেরূপ স্বীয় লোককে দূত কর্মে নিযুক্ত করে, সেরূপ ভৃগু ঋষির ন্যায় যজ্ঞসম্পাদক যজমান অগ্নিকে দূত কর্মে নিযুক্ত করেন। (ঋক-১/৭১/৪)।।


ঋগ্বেদের দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায়, অগ্নি দুটি কাষ্ঠের ঘর্ষণে জাত এবং মাতরিশ্বা মূলত বায়ু-দেবতা হলেও বৈদিক কবিদের কল্পনা অনুসারে তিনিই দেবতা ও মানবদের জন্য অগ্নি আনয়ন করেছিলেন। যেমন–

ঋতা বানং যজ্ঞিয়ং বিপ্রমুক্য্যমা যং দধে মাতরিশ্বা দিবি ক্ষয়ম্ ।
তং চিত্রযামং হরিকেশমীমহে সুদীতিমগ্নিং সুবিতায় নব্যসে।। (ঋগ্বেদ-৩/২/১৩)।
বহ্নিং যশসং বিদথস্য কেতুং সুপ্রাব্যং দূতং সদ্যোঅর্থম্ ।
দ্বিজন্মানং রয়িমিব প্রশস্তং রাতিং ভরদ্ভৃগবে মাতরিশ্বা।। (ঋগ্বেদ-১/৬০/১)।
অর্থাৎ :
বলবান যজ্ঞার্হ মেধাবী, স্তুতিযোগ্য, দ্যুলোকবাসী যে অগ্নিকে মাতরিশ্বা দ্যুলোক হতে এনে পৃথিবীতে সংস্থাপিত করেছেন আমরা সে নানাবিধ গমনবিশিষ্ট, পিঙ্গলবর্ণ কিরণযুক্ত, দীপ্তিমান, অগ্নির নিকট নূতন ধন যাচ্ঞা করি। (ঋক-৩/২/১৩)।।  অগ্নি হব্যবাহক ও যশস্বী, যজ্ঞপ্রকাশক এবং সম্যক রক্ষণশীল; তিনি দেবগণের দূত এবং সদাই দেবগণের নিকট হব্য নিয়ে গমন করেন, তিনি দুটি কাষ্ঠ হতে জাত এবং ধনের ন্যায় প্রশংসিত; মাতরিশ্বা এ অগ্নিকে মিত্রের ন্যায় ভৃগুবংশীয়দের নিকট আনলেন। (ঋক-১/৬০/১)।।


এই পৌরাণিক কল্পনায় ভৃগুবংশীয়দের নিকট মাতরিশ্বা অগ্নিকে এনে দিয়েছিলেন এরই বা অর্থ কী? পণ্ডিত মিউয়’র বিবেচনায় ভারতবর্ষে ভৃগু, মনু, অঙ্গিরা প্রভৃতি কয়েকটি ঋষিবংশদ্বারা অগ্নির পূজা প্রচার হয়েছিলো।

.
অহি-বুধ্ন্য ও অজ-একপাদ :

অন্তরীক্ষের আরও দুই দেবতা হলেন অহি-বুধ্ন্য এবং অজ-একপাদ। কিন্তু এই দুই দেবতার প্রকৃতি ও পরিকল্পনা খুব স্পষ্ট নয়। ঋগ্বেদের কয়েকটি দৃষ্টান্তে উভয়েই একত্রে এবং প্রায় অভিন্নভাবে স্তুত হয়েছেন। তবে উভয়ের কল্পনাকে কেন্দ্র করেই বৈদিক কবিরা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে পার্থিব-সম্পদের কামনাই ব্যক্ত করেছেন। যেমন–

উত নো নক্তমপাং বৃষণ্বসূ সূর্যামাসা সদনায় সধন্যা।
সচা যৎসাদ্যেষাম্ অহির্বুধ্নেষু বুধ্ন্যঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৯৩/৫)।
উত নোহহির্বুধ্ন্যঃ শৃণোত্বজ একপাৎ পৃথিবী সমুদ্রঃ।
বিশ্বে দেবা ঋতাবৃধো হুবানাঃ স্তুতা মন্ত্রাঃ কবিশস্তা অবন্তু।। (ঋগ্বেদ-৬/৫০/১৪)।
অর্থাৎ :
যখন অহির্বুধ্ন্য জলের সাথে একত্র হয়ে উপবেশন করেন, তখন সূর্য ও চন্দ্র একত্র উপবেশনপূর্বক দিবারাত্র জলস্বরূপ ধন বর্ষণ করেন। (ঋক-১০/৯৩/৫)।।  অহির্বুধ্ন্য, অজ-একপাদ, পৃথিবী ও সমুদ্র আমাদের স্তোত্র শ্রবণ করুন। যজ্ঞের সমৃদ্ধি বিধায়ক, আমাদের দ্বারা আহূত ও স্তুত, মন্ত্রপ্রতিপাদ্য ও মেধাবী ঋষিগণ কর্তৃক স্তূয়মান বিশ্বদেবগণ আমাদের রক্ষা করুন। (ঋক-৬/৫০/১৪)।।


.
রুদ্র দেবতা :

রুদ্রও অন্তরীক্ষের দেবতা। রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে ঋগ্বেদে মাত্র তিনটি স্বতন্ত্র সূক্ত রয়েছে। দেবতা হিসেবে ঋগ্বেদে তাঁর বিশেষ প্রাধান্য না থাকলেও রুদ্রের পরিকল্পনায় বিবিধ বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। কোথাও তিনি উগ্র, ক্রোধপরায়ণ ও পশুর ন্যায় ভয়ঙ্কর, এবং এই রূপেই বিস্তীর্ণ জগতের রক্ষাকর্তা। যেমন–

হবীমভি র্র্হভতে যো হবির্ভিরব স্তোমেভী রুদ্রং দিষীয়।
ঋদূদরঃ সুহবো মা নো অস্যৈ বভ্রুঃ সুশিপ্রো রীরধন্মনায়ৈ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/৫)।
স্থিরেভিরঙ্গৈঃ পুরুরূপ উগ্রো বভ্রুঃ শুক্রেভিঃ পিপিশে হিরণ্যৈঃ।
ঈশানাদস্য ভুবনস্য ভুরে র্ন বা উ যোষদ্রুদ্রাদসূর্যম্ ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/৯)।
অর্হন্ বিভর্ষি সায়কানি ধন্বার্হন্নিষ্কং যজতং বিশ্বরূপম্ ।
অর্হন্নিদং দয়সে বিশ্বমভ্বং ন বা ওজীয়ো রুদ্রত্বদস্তি।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/১০)।
স্তুহি শ্রতং গর্তসদং যুবানং মৃগং ন ভীমমুপহত্নুমুগ্রম্ ।
মৃলা জরিত্রে রুদ্র স্তবানোহন্যং তে অস্মন্নি বপন্তু সেনাঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/১১)।
অর্থাৎ :
যে রুদ্র হব্য সম্বলিত আহ্বানদ্বারা আহুত হন, আমি স্তোত্রদ্বারা তাঁকে অপগত-ক্রোধ করব। কোমলোদর, শোভন আহ্বানবিশিষ্ট বভ্রূবর্ণ ও সুনাসিক রুদ্র আমাদের যেন তাঁর জিঘাংসাবৃত্তির বিষয়ীভূত না করেন। (ঋক-২/৩৩/৫)।।  দৃঢ়াঙ্গ, বহুরূপ, উগ্র ও বভ্রূবর্ণ রুদ্র দীপ্ত হিরণ্ময় অলঙ্কারে শোভিত হচ্ছেন। রুদ্র সমস্ত ভুবনের অধিপতি এবং ভর্তা, তাঁর বল পৃথককৃত হয় না। (ঋক-২/৩৩/৯)।।  হে অর্চনার্হ ! তুমি ধনুর্বাণধারী; হে অর্চনার্হ ! তুমি নানারূপবিশিষ্ট ও পূজনীয় নিষ্ক ধারণ করেছ; হে অর্চনার্হ ! তুমি সমস্ত বিস্তীর্ণ জগৎকে রক্ষা করছ, তোমা অপেক্ষা অধিক বলবান আর কেউ নেই। (ঋক-২/৩৩/১০)।।  হে স্তোতা ! প্রখ্যাত রথস্থিত, যুবা, পশুর ন্যায় ভয়ঙ্কর ও শত্রুদের বিনাশক, উগ্র রুদ্রকে স্তব কর। হে রুদ্র ! আমরা স্তব করলে তুমি আমাদের সুখী কর, তোমার সেনা শত্রুকে বিনাশ করুক। (ঋক-২/৩৩/১১)।।


আবার কোন কোন দৃষ্টান্তে রুদ্রের স্তুতি সুস্পষ্ট আতঙ্কজনিত বলেই প্রতীয়মান হয়। যেমন–

মা নো মহান্তমুত মা নো অর্ভকং মা ন উক্ষন্তমুত মা না উক্ষিতম্ ।
মা নো বধীঃ পিতরং মোত মাতরং মা নঃ প্রিয়াস্তন্বো রুদ্র রীরিষঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১১৪/৭)।
মা নস্তোকে তনয়ে মা ন আয়ৌ মা নো গোষু মা নো অন্বেষু রীরিষঃ।
বীরাদ্মা নো রুদ্রং ভামিতো বধী র্হবিষ্মন্তঃ সর্দামত্ত্বা হবামহে।। (ঋগ্বেদ-১/১১৪/৮)।
আরে তে গোঘ্নমুত পুরুষঘ্নং ক্ষয়দ্বীর সুম্নমস্মে তে অস্তু।
মৃলা চ নো অধি চ ব্রুহি দেবাধা চ নঃ শর্ম যচ্ছ দ্বিবর্হাঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১১৪/১০)।
অর্থাৎ :
হে রুদ্র ! আমাদের মধ্যে বৃদ্ধকে বধ করো না, বালককে বধ করো না, সন্তান জনয়িতাকে বধ করো না, গর্ভস্থ সন্তানকে বধ করো না, আমাদের পিতাকে বধ করো না, মাতাকে বধ করো না, আমাদের শরীরে আঘাত করো না। (ঋক-১/১১৪/৭)।।  হে রুদ্র ! আমাদের পুত্রকে হিংসা করো না; তার পুত্রকে হিংসা করো না, আমাদের অন্য মানুষকে হিংসা করো না, আমাদের গো ও অশ্ব হিংসা করো না। হে রুদ্র ! ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের বীরদের হিংসা করো না, কেননা আমরা হব্য নিয়ে সর্বদাই তোমাকে আহ্বান করি। (ঋক-১/১১৪/৮)।।  হে বীরগণের ক্ষয়কারক ! তোমার কৃত গোহত্যা ও মানুষহত্যা দূরে থাকুক, আমরা যেন তোমার দত্ত সুখ পাই। আমাদের সুখী কর, হে দীপ্তিমান রুদ্র ! আমাদের পক্ষ হয়ে কথা বলো, তুমি উভয় পৃথিবীর স্বামী, আমাদের সুখ দাও। (ঋক-১/১১৪/১০)।।


তবে রুদ্রের একটি কল্যাণের দিকও আছে। ঋগ্বেদে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ভিষক রূপে খ্যাত। তাই তিনি শুধুই আতঙ্ক-নিরসনের আশায় নয়, পার্থিব কল্যাণ-কামনায়, বিশেষ করে রোগ-নিরাময়কারক ওষধি প্রভৃতির কামনায়ও স্তুত হয়েছেন। যেমন–

মূলা নো রুদ্রোত নো ময়ষ্কৃধি ক্ষয়দ্বীরায় নমসা বিধেম তে।
যচ্ছং চ যোশ্চ মনুরায়েজে পিতা তদশ্যাম তব রুদ্র প্রণীতিষু।। (ঋগ্বেদ-১/১১৪/২)।
কুমারশ্চিৎ পিতরং বন্দমানং প্রতি নানাম রুদ্রোপয়ন্তম্ ।
ভূরে র্দাতারং সৎপতি গৃণীষে স্তুভস্ত্বং ভেষজা রাস্যস্মে।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/১২)।
যা বো ভেষজা মরুতঃ শুচীনি যা শন্তমা বৃষণো যা ময়োভু।
যানি মনুরবৃণীতা পিতা নস্তা শঞ্চ যোশ্চ রুদ্রস্য রশ্মি।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/১৩)।
ত্বাদত্তেভি রুদ্র শন্তমেভিঃ শতং হিমা অশীয় ভেষজেভিঃ।
ব্যস্মদ্দ্বেষো বিতরং ব্যংহো ব্যমীবাশ্চাতয়স্বা বিষূচীঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/২)।
অর্থাৎ :
হে রুদ্র ! তুমি সুখী হও, আমাদের সুখী কর; তুমি বীরদের ক্ষয়কারী, আমরা নমস্কারের সাথে তোমার পরিচর্যা করি। পিতা মনু যে রোগসমূহ হতে উপশম ও ভয়সমূহ হতে উদ্ধার পেয়েছিলেন, হে রুদ্র ! তোমার উপদেশ হতে যেন আমরা তা পাই। (ঋক-১/১১৪/২)।।  পিতা আশির্বাদ করবার সময় পুত্র যেরূপ তাঁকে নমস্কার করে, সেরূপ হে রুদ্র ! তুমি আসবার সময় আমরা তোমাকে নমস্কার করছি। হে রুদ্র ! তুমি বহুধনদাতা এবং সাধুলোকের পালক, আমরা স্তব করলে আমাদের ঔষধ প্রদান কর। (ঋক-২/৩৩/১২)।।  হে মরুৎগণ ! তোমাদের যে নির্মল ঔষধ আছে, হে অভীষ্টবর্ষিগণ, তোমাদের যে ঔষধ অত্যন্ত সুখকর ও সুখপ্রদ, যে ঔষধ আমাদের পিতা মনু মনোনীত করেছিলেন, রুদ্রের সে সুখকর ভয়হারী ঔষধ আমরা কামনা করছি। (ঋক-২/৩৩/১৩)।।  হে রুদ্র ! আমরা যেন তোমার দত্ত সুখকর ওষধিদ্বারা শতবর্ষ জীবিত থাকতে পারি। তুমি আমাদের শত্রুগণকে বিনাশ কর, আমার পাপ একেবারে বিদূরিত কর এবং সর্বশরীরব্যাপী ব্যাধিপুঞ্জকে বিদূরিত কর। (ঋক-২/৩৩/২)।।


ঋগ্বেদের নানা জায়গায় রুদ্রের সঙ্গে মরুৎগণের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় ব্রুদের সঙ্গে মরুৎগণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মরুৎগণও অন্তরীক্ষের দেবতা, তবে একটি দেবতা নন– একদল দেবতা, এবং সর্বত্রই দল হিসেবে তাঁদের উল্লেখ। এই কারণে তাঁদের নামের সঙ্গে ‘গণ’ শব্দ সংযুক্ত। বিভিন্ন সূক্তে রুদ্রকে মরুৎগণের পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং এই পৌরাণিক কল্পনার মূলে যাই থাকুক না কেন, লক্ষণীয় বিষয় হলো পার্থিব সম্পদের কামনাই তাঁদের স্তুতির মূল উপাদান। যেমন–

উপ তে স্তোমান্ পশুপা ইবাকরং রাস্বা পিতর্মরুতাং সুম্মমস্মে।
ভদ্রা হি তে সুমতি র্মৃলয়ত্তমাথা বয়মব ইত্তে বৃণীমহে।। (ঋগ্বেদ-১/১১৪/৯)।
আ তে পিতর্মরুতাং সুম্নমেতু মা নঃ সূর্যস্য সন্দৃশো যুযোথাঃ।
অভি নো বীরো অর্বতি ক্ষমেত প্র জায়েমহি রুদ্র প্রজাভিঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৩/১)।
ইদং পিত্রে মরূতামুচ্যতে বচঃ স্বাদোঃ স্বাদীয়ো রুদ্রায় বর্ধনম্ ।
রাস্বা নো অমৃত মর্তভোজনং ত্বনে তোকায় তনয়ায় মৃল।। (ঋগ্বেদ-১/১১৪/৬)।
অর্থাৎ :
পশুপালক যেরূপ সায়ংকালে পশুস্বামীদের তাদের পশু ফিরিয়ে দেয়, হে রুদ্র ! আমি সেরূপ তোমার স্তোত্র তোমাকে অর্পণ করছি। হে মরুৎগণের পিতা ! আমাদের সুখ দান কর, তোমার অনুগ্রহ অতিশয় সুখকর এবং কল্যাণকর, আমরা তোমার ক্ষণ প্রার্থনা করি। (ঋক-১/১১৪/৯)।।  হে মরুৎগণের পিতা (রুদ্র) ! তোমার প্রদত্ত সুখ আমাদের নিকট আসুক, তুমি সূর্য দর্শন হতে আমাদের পৃথক করো না, আমাদের বীর পুত্রগণ শত্রুদের অভিভূত করুক। হে রুদ্র ! আমরা যেন পুত্র পৌত্রাদিতে অনেক হয়ে উঠি। (ঋক-২/৩৩/১)।।  মধু হতেও অধিক মধুর এ স্তুতি বাক্য মরুৎগণের পিতা রুদ্রের উদ্দেশে উচ্চারিত হচ্ছে, এতে (স্তোতার) বৃদ্ধি সাধন হয়। হে মরণরহিত রুদ্র ! মনুষ্যদের ভোজনরূপ অন্ন আমাদের প্রদান কর এবং আমাকে আমার পুত্রকে ও তার তনয়কে সুখ দান কর। (ঋক-১/১১৪/৬)।।


ঋগ্বেদের অন্যত্র রুদ্র-পুত্র অর্থে মরুৎগণকে ‘রুদ্রাসঃ’ বলা হয়েছে এবং কোথাও আবার ‘রুদ্রিয়গণ’ হিসেবে স্তুত হয়েছে। যেমন–

নহি বঃ শত্রু র্বিবিদে অধি দ্যবি ন ভূম্যাং রিশাদসঃ।
যুষ্মাকমস্তু তবিষী তনা যুজা রুদ্রাশো নু চিদাধৃষে।। (ঋগ্বেদ-১/৩৯/৪)।
সত্যং ত্বেষা অমবস্তো ধন্বঞ্চিদা রুদ্রিয়াসঃ। মিহং কৃণ্বস্ত্যবাতাম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/৩৮/৭)।
চিত্রং তদ্বো মরুতো ষাম চেকিতে পৃশ্ন্যা যদুধরপ্যাপয়ো দুহুঃ।
যদ্বা নিদে নবমানস্য রুদ্রিয়াস্ত্রিতং জরায় জুরতামদাভ্যাঃ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৪/১০)।
অর্থাৎ :
হে শত্রুহিংসক মরুৎগণ ! দ্যুলোকে তোমাদের শত্রু নেই, পৃথিবীতেও নেই। হে রুদ্রপুত্রগণ ! তোমরা একত্রিত হও, (শত্রুদের) ধর্ষণার্থে তোমাদের বল শীঘ্র বিস্তৃত হোক। (ঋক-১/৩৯/৪)।।  দীপ্তিমান ও বলবান রুদ্রীয়গণ সত্যই মরুভূমিতেও বায়ুরহিত বৃষ্টি দান করেন। (ঋক-১/৩৮/৭)।।  হে মরুৎগণ; তোমরা যখন পৃশ্নির উধঃ দোহন করেছিলে, যখন স্তুতিকারীর নিন্দুককে হিংসা করেছিলে এবং ত্রিতের শত্রুদের বধ করেছিলে, হে অহিংসনীয় রুদ্রপুত্রগণ ! সে সময়ে তোমাদের বিচিত্র ক্ষমতা সকলেই জেনেছিল। (ঋক-২/৩৪/১০)।।


আবার ঋগ্বেদের অন্যত্র এই মরুৎগণকে ‘পৃশ্নিমাতরঃ’ অর্থাৎ পৃশ্নি মাতার সন্তান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং কোথাও কোথাও মরুৎগণের মাতা পৃশ্নি উল্লেখও রয়েছে। যেমন–

বিশ্বান্দেবান্ হবামহে মরুতঃ সোমপীতয়ে। উগ্রা হি পৃশ্নিমাতরঃ।। (ঋগ্বেদ-১/২৩/১০)।
দ্যাবো ন স্তৃভিশ্চিতয়ন্ত খাদিনো ব্যভ্রিয়া ন দ্যূতয়ন্ত বৃষ্টয়ঃ।
রুদ্রো যদ্বো মরুতো রুক্মবক্ষসো বৃষাজনি পৃশ্ন্যাঃ শক্র ঊধনি।। (ঋগ্বেদ-২/৩৪/২)।
প্র যে মে বংধ্বেষে গাং বোচন্ত সূরয়ঃ পৃশ্নিং বোচন্তে মাতরম্ ।
অধা পিতরমিষ্মিণং রুদ্রং বোচন্ত শিক্বসঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৫২/১৬)।
অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাস এতে সংভ্রাতরো বাবৃধূঃ সৌভগায়।
যুবা পিতা স্বপা রুদ্র এষাং সুদুঘা পৃশ্নিঃ সুদিনা মরুদ্ভ্যঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৬০/৫)।
অর্থাৎ :
সমস্ত মরুৎ দেবগণকে সোমপানার্থে আহ্বান করি, তাঁরা উগ্র ও পৃশ্নির সন্তান। (ঋক-১/২৩/১০)।।  হে সুবর্ণবক্ষ মরুৎগণ ! যেহেতু সেচন সমর্থ রুদ্র পৃশ্নির নির্মল উদরে তোমাদের উৎপন্ন করেছেন; অতএব আকাশ যেরূপ নক্ষত্রে শোভিত হয়, তোমরা সেরূপ স্বীয় আভরণে শোভিত হও। তোমরা শত্রভক্ষক ও জলপ্রেরক, তোমরা মেঘস্থ বিদ্যুতের ন্যায় শোভিত হও। (ঋক-২/৩৪/২)।।  আমি তাদের উৎপত্তিক্রম অনুসন্ধান করায়, জ্ঞানী মরুৎগণ আমাকে এ উত্তর দিয়েছেন; তাঁরা বলেছেন পৃশ্নি তাদের জননী, বলশালী মরুৎগণ বলেছেন অন্নদাতা রুদ্র তাঁদের জনক। (ঋক-৫/৫২/১৬)।।  এ সমস্ত মরুৎ এক সময়ে উৎপন্ন, সুতরাং পরস্পর জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠভাব বর্জিত হয়ে ভ্রাতৃভাবে ও সমৃদ্ধি সহকারে বর্ধিত হয়েছেন। নিত্যতরুণ, সৎকর্মের অনুষ্ঠানকারী মরুৎগণের পিতা রুদ্র ও জননী দোহনযোগ্যা পৃশ্নি মরুৎগণের নিমিত্ত দিন সকল অনুকুল করুন। (ঋক-৫/৬০/৫)।।


আবার ঋগ্বেদ অনুসারে পৃশ্নি একটি গরুর নাম। ফলে মরুৎগণকে ‘গোমাতরঃ’ বলেও বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন–

স বহ্নিঃ পুত্রঃ পিত্রোঃ পবিত্রবান্ পুনাতি ধীরো ভুবনানি মায়য়া।
ধেনুঞ্চ পৃশ্নিং বৃষভঃ সুরেতসং বিশ্বাহা শুক্রং পয়ো অস্য দুক্ষত।। (ঋগ্বেদ-১/১৬০/৩)।
গোভির্বাণো অজ্যতে সোভরীণাং রথে কোশে হিরণ্যয়ে।
গোবন্ধবঃ সুজাতাস ইষে ভুজে মহান্তো নঃ স্পরসে নু।। (ঋগ্বেদ-৮/২০/৮)।
অর্থাৎ :
আদিত্য পিতা মাতা স্বরূপ দ্যাবাপৃথিবীর পুত্র। তিনি ধীর এবং ফলপ্রদায়ী তিনি স্বীয় প্রজ্ঞাদ্বারা সমস্ত ভূতগণকে প্রকাশ করছেন। তিনি পৃশ্নি ধেনু ও সেচন সমর্থ বৃষকে প্রকাশ করছেন ও দ্যুলোক হতে নির্মল জল দোহন করছেন। (ঋক-১/১৬০/৩)।।  সোভরি ঋষিগণের শব্দদ্বারা হিরণ্ময় রথের মধ্যদেশে মরুৎগণের বাণ ব্যক্ত হচ্ছে। গোমাতৃক সুজন্মা, মহানুভব মরুৎগণ আমাদের অন্ন ভোগ ও প্রীতিপ্রদ হোন। (ঋক-৮/২০/৮)।।


কিন্তু মরুৎগণকে গোমাতৃক জাতীয় পৌরাণিক কল্পনার কারণ কী হতে পারে? ‘পৃশ্নি’ অর্থ হলো নানা বর্ণযুক্ত। তাহলে নানা বর্ণযুক্তা মরুৎগণের এই মাতা কে? বেদ-টীকাকার সায়ণের পৃশ্নি অর্থ পৃথিবী। আবার কোথাও তিনি ‘পৃশ্নি’ শব্দের অর্থ শুক্লবর্ণ করেছেন। কিন্তু প্রাচীন সংস্কৃত অভিধান ‘নিঘণ্টু’ অনুযায়ী পৃশ্নি অর্থে আকাশ। তবে আধুনিক পণ্ডিত গবেষকরা অনুমান করতে চেয়েছেন, বৈদিক কবিরা এখানে আকাশের বৃষ্টিদায়িনী মেঘকে দুগ্ধদায়িনী গরুর সঙ্গে তুলনা করেছেন, অতএব গোমাতৃক অর্থে মরুৎগণ প্রকৃতপক্ষে মেঘতনয় বলেই কল্পিত। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, সুবিশাল ঋগ্বেদ সাহিত্যে বহু কবি বহুভাবে এই দেবতাদের নিয়ে বহু কল্পনা করেছেন; তাই মরুৎগণের উৎপত্তি-প্রসঙ্গে কোন এক অদ্বিতীয় সিদ্ধান্তের সাহায্যে সমস্ত নজিরের পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা পাওয়া সুকঠিন। কেননা, এই মরুৎগণই কোথাও ‘সিন্ধু-মাতরঃ’ বলে কল্পিত, আবার বর্ণনা-বিশেষে তাঁরা কোথাও ‘স্বয়ং-উৎপন্ন’ কিংবা কোথাও ‘স্বর্গ-তনয়’ হিসেবেও কল্পিত হয়েছেন। যেমন–

গ্রাবাণো ন সূরয়ঃ সিন্ধুমাতর আদর্দিরাসো অদ্রয়ো ন বিশ্বহা।
শিশুলা ন ক্রীলয়ঃ সুমাতরো মহাগ্রামো ন যামন্নুত ত্বিষা।। (ঋগ্বেদ-১০/৭৮/৬)।
বব্রাসো ন যে স্বজাঃ স্বতবস ইষং স্বরভিজায়ন্ত ধূতয়ঃ।
সহস্রিয়াসো অপাং নোর্ময় আসা গাবো বন্দ্যাসো নোক্ষশঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৬৮/২)।
শ্রিয়ে মর্যাসো অঞ্জীরকৃণ্বত সুমারুতং ন পূর্বীরতি ক্ষপঃ।
দিবস্পুত্রাস এতা ন যেতির আদিত্যাসস্তে অক্রা ন বাবৃধুঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭৭/২)।
অর্থাৎ :
জল প্রেরণকারী মেঘের ন্যায় সিন্ধুমাতার সন্তানেরা (মরুৎগণ) নদী নির্মাণ করেন। বিদীর্ণকারী অস্ত্রশস্ত্রের ন্যায় সকলি তাঁরা ধ্বংস করেন। বৎসল মাতার শিশুদের ন্যায় তাঁরা ক্রীড়া করেন। বহুলোকসমূহের ন্যায় তাঁরা দীপ্তিসহকারে গমন করেন। (ঋক-১০/৭৮/৬)।।  স্বয়ং-উৎপন্ন, স্বাধীনবল, কম্পনশীল মরুৎগণ যে মূর্তিমান হয়ে অন্ন ও স্বর্গের জন্য প্রাদুর্ভূত হচ্ছেন। অসংখ্য এবং প্রশংসনীয় ধেনু যেরূপ দুগ্ধদান করে, জলোর্মির ন্যায় তাঁরা সেরূপ হয়ে জলদান করেন। (ঋক-১/১৬৮/২)।।  এ মরুৎগণ পূর্বে মনুষ্য ছিলেন, পুণ্যদ্বারা দেবতা হয়েছেন, এরা শরীর শোভার্থে অলঙ্কার ধারণ করেন। বিস্তর সৈন্য একত্র হয়েও মরুৎগণকে অতিক্রম করতে পারে না। আমরা এখনও স্তব করি নি বলে এ সকল দ্যুলোকের পুত্রগণ অর্থাৎ মরুৎগণ এখনও দেখা দেন নি, মহাবল পরাক্রান্ত এ সকল অদিতি সন্তানগণ এখনও বৃদ্ধিযুক্ত হন নি। (ঋক-১০/৭৭/২)।।


তবে বৈদিক কবিদের এই কল্পনা যত বিচিত্রই হোক না কেন, এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে এ-ক্ষেত্রে তাঁদের স্তুতিতে নানা পার্থিব সম্পদের কামনার মধ্যে জল-কামনা বা বৃষ্টি-কামনার প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : দ্যুলোক বা স্বর্গের দেবতা] [*] [পরের পর্ব : পৃথিবী স্থানের দেবতা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,433 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: