h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১১ : দ্যুলোক বা স্বর্গের দেবতা|

Posted on: 06/07/2015


kirsi_Handling-Chaos

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-১১ : দ্যুলোক বা স্বর্গের দেবতা |
রণদীপম বসু

(ক) দ্যুলোক বা স্বর্গের দেবতা

দ্যুলোকের প্রাচীনতম দেবতা বলতে যাঁর নাম আসে তিনি হলেন দ্যু বা দ্যৌস্, অর্থাৎ আকাশ। তাঁর সম্বন্ধে ঋগ্বেদে কোন পৃথক সূক্ত নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি পিতা হিসেবে দ্যৌস্পিতা বলে স্তুত। এবং তাঁর সঙ্গে মাতা পৃথিবীকে যুক্ত করে গুটি দুয়েক সূক্ত পাওয়া যায়। তাতে উভয়ে একত্রে দ্যাবাপৃথিবী বলে উল্লিখিত। যেমন–

উভ মন্যে পিতুরদ্রুহো মনো মাতুর্মহি স্বতবস্তদ্ধবীমভিঃ।
সুরেতসা পিতরা ভূম চক্রতুরুরু প্রজায়া অমৃতং বরীমভিঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৫৯/২)।
তে সূনবঃ স্বপসঃ সুদংসসো মহী যজ্ঞুর্মাতরা পূর্বচিত্তয়ে।
স্থাতুশ্চ সত্যং জগতশ্চ ধর্মণি পুত্রস্য পাথঃ পদমদ্বয়াবিনঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৫৯/৩)।
অর্থাৎ :
আমি দ্রোহ রহিত পিতৃস্থানীয় দ্যুলোকের উদার এবং সদয় মন আহ্বান মন্ত্রদ্বারা জেনেছি। মাতৃস্থানীয় পৃথিবীর মনও জেনেছি। পিতামাতা দ্যাবাপৃথিবী নিজ সামর্থ্য দ্বারা পুত্রগণকে বিশেষরূপে রক্ষা করে প্রভূত, বিস্তীর্ণ অমৃত প্রদান করুন। (ঋক-১/১৫৯/২)।।  তোমাদের পুত্র, সুকর্মা, সুদর্শন প্রজাগণ, তোমাদের পূর্ব অনুগ্রহ স্মরণ করে, তোমাদের মহৎ ও মাতা বলে জানেন; পুত্রভূত স্থাবর ও জঙ্গমগণ দ্যাবাপৃথিবী ভিন্ন আর কাকেও জানে না, তোমরা তাদের রক্ষার নিমিত্ত অবাধ স্থান প্রদান কর। (ঋক-১/১৫৯/৩)।।


অর্থাৎ, আকাশই আদি-পিতা, পৃথিবীই আদি-জননী; উভয়ের মিলনেই সমস্ত কিছুর জন্ম। বিশ্বের পিতামাতা হিসেবে তাঁদের যুক্তভাবে গুণকীর্তন এবং তাঁদের কাছে অনেক ধরনের স্তুতি নিবেদিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, আকাশ ও পৃথিবীর মিলন থেকেই যে বিশ্ব-সংসারের জন্ম এ-জাতীয় পৌরাণিক কল্পনা শুধুমাত্র বৈদিক ঋষি বা কবিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য নানা দেশে নানা মানবদলের মধ্যেও একই ধারণার পরিচয় পাওয়া যায় বলে গবেষকেরা মন্তব্য করেছেন।
দ্যুলোকের অন্যান্য প্রসিদ্ধ দেবতারা হলেন– বরুণ, মিত্র, সবিতা, পূষা, বিষ্ণু, বিবস্বৎ, আদিত্য-গণ, ঊষা ও অশ্বিদ্বয়। এঁদের মধ্যে বরুণই প্রধান এবং প্রাচীনতম দেবতা। অনুষঙ্গ বিবেচনায় বরুণ প্রসঙ্গে পরে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনার দাবি রাখে। বাকিদের পরিচয় দেখা যাক।

.
মিত্র দেবতা :

দেবতা হিসেবে ঋগ্বেদে মিত্রের উল্লেখ প্রায় ক্ষেত্রেই বরুণের সঙ্গে সংযুক্ত; এমনকি বহু দৃষ্টান্তে উভয়ে একত্রে মিত্রাবরুণ বলে স্তুত। এই মিত্রের বৈশিষ্ট্য কী? তিনি পৃথিবী ও দ্যুলোককে ধারণ করে আছেন। তিনি অনিমেষ নেত্রে সকলের দিকে চেয়ে আছেন (ঋগ্বেদ-৩/৫৯/১)। তিনি নিজ মহিমায় দ্যুলোক অভিভূত করেছেন (ঋগ্বেদ-৩/৫৯/৭)। প্রত্যুষে সূর্যোদয় হলে মিত্র লৌহকীলক সমন্বিত সুবর্ণ নির্মিত রথে আরোহণ করেন (ঋগ্বেদ-৫/৬২/৮)। দ্যুতিমান সূর্য মিত্র ও বরুণের চক্ষুস্বরূপ (ঋগ্বেদ-৭/৬৩/১) ইত্যাদি। যেমন–

হিরণ্যরূপমুষসো ব্যুষ্টাবয়ঃস্থূণমুদিতা সূর্যস্য।
আ রোহথো বরুণ মিত্র গর্তমতশ্চক্ষাথে অদিতিং দিতিং চ।। (ঋগ্বেদ-৫/৬২/৮)।
উদ্বেতি সুভগো বিশ্বচক্ষাঃ সাধারণঃ সূর্যো মানুষাণাম্ ।
চক্ষুর্মিত্রস্য বরুণস্য দেবশ্চর্মেব যঃ সমবিব্যক্তমাংসি।। (ঋগ্বেদ-৭/৬৩/১)।
অর্থাৎ :
হে মিত্র ও বরুণ ! তোমরা প্রত্যুষে সূর্যোদয় হলে লৌহকীলক সমন্বিত সুবর্ণ ঘটিত রথে আরোহণ করো এবং সেখান হতে অদিতি ও দিতিকে অবলোকন করো। (ঋক-৫/৬২/৮)।।  সুভগ, সর্বদর্শী, মনুষ্যগণের সাধারণ, মিত্র ও বরুণের চক্ষুস্বরূপ, দ্যুতিমান সূর্য উদিত হচ্ছেন। ইনি চর্মের ন্যায় তমোরাশি সংবেষ্টিত করেন। (ঋক-৭/৬৩/১)।।


তবে সমগ্র ঋগ্বেদে স্বতন্ত্রভাবে মিত্রের স্তুতি মাত্র একটি সূক্তে (ঋগ্বেদ-৩/৫৯) পাওয়া যায়। উদ্ধৃতিযোগ্য এই সূক্তটি থেকেই বোঝা যায় অন্যান্য বৈদিক দেবতার মতোই ঋগ্বেদের নানা জায়গায় এই বৈদিক দেবতাটিকে কেন্দ্র করে বিচিত্র পৌরাণিক কল্পনার সমাবেশ হলেও মূলত পার্থিব কামনা সফল করবার আশাতেই বৈদিক কবিরা মিত্রের স্তুতি করেছিলেন। ত্রিষ্টুপ্ গায়ত্রী ছন্দে রচিত সূক্তটির কবি হিসেবে বিশ্বামিত্র ঋষি’র নাম উল্লিখিত হয়েছে (ঋগ্বেদ-সূক্ত-৩/৫৯)–

মিত্রো জনান্যাতয়তি ব্রুবাণো মিত্রো দাধার পৃথিবীমুত দ্যাম্ ।
মিত্রঃ কৃষ্টীরনিমিষাভি চষ্টে মিত্রায় হব্যং ঘৃতবজ্জুহোত।। ১
প্র স মিত্র মর্তো অস্তু প্রযস্বান্যস্ত আদিত্য শিক্ষতি ব্রতেন।
ন হন্যতে ন জীয়তে ত্বোতো নৈনমংহো অশ্নোতান্তিতো ন দূরাৎ।। ২
অনমীবাস ইলয়া মদন্তো মিতজ্ঞবো বরিমন্না পৃথিব্যাঃ।
আদিত্যস্য ব্রতমুপক্ষিয়ন্তো বয়ং মিত্রস্য সুমতৌ স্যাম।। ৩
অয়ং মিত্রো নমস্যঃ সুশেবো রাজা সুক্ষত্রো অজনিষ্ট বেধাঃ।
তস্য বরং সুমতৌ যজ্ঞিয়স্যাপি ভদ্রে সৌমনসে স্যাম।। ৪
মহা আদিত্যো নমসোপসদ্যো যাতযজ্জনো গৃণতে সুশেবঃ।
তস্মা এতৎ পন্যতমায় জুষ্টমগ্নৌ মিত্রায় হবিরা জুহোত।। ৫
মিত্রস্য চর্ষনীধৃতোহবো দেবস্য সাননি। দ্যুম্নং চিত্রশ্রবস্তমম্ ।। ৬
অভি যো মহিনা দিবং মিত্রো বভূব সপ্রথাঃ। অভি শ্রবোভিঃ পৃথিবীম্ ।। ৭
মিত্রায় পঞ্চ যেমিরে জনা অভিষ্টিশবসে। স দেবান্বিশ্বান্ বিভর্তি।। ৮
মিত্রো দেবেষ্বায়ুষু জনায় বৃক্তবর্হিষে। ইষ ইষ্টব্রতা অকঃ।। ৯
অর্থাৎ :
মিত্র স্তুত হয়ে লোক সকলকে কার্যে প্রবর্তিত করছেন। মিত্র পৃথিবী এবং দ্যুলোক ধারণ করে আছেন; মিত্র অনিমেষনেত্রে লোক সকলের দিকে চেয়ে আছেন। মিত্রের উদ্দেশে ঘৃতবিশিষ্ট হব্য প্রদান কর। ১।।  হে আদিত্য মিত্র ! যে মনুষ্য ব্রতানুসারে তোমাকে হব্য প্রদান করে, সে অন্নবান হোক। তুমি যাকে রক্ষা কর, তাকে কেউ বিনাশ করতে বা অভিভব করতে পারে না। পাপ দূর হতে অথবা নিকট হতে সে ব্যক্তিকে স্পর্শ করতে পারে না। ২।।  আমরা রোগবর্জিত ও অন্নলাভে হৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ প্রদেশে জানু পেতে সর্বত্রগামী আদিত্যের ব্রতের নিকট অবস্থিতি করছি। মিত্র যেন আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। ৩।।  এ মিত্র প্রাদুর্ভূত হয়েছেন, ইনি নমস্কারযোগ্য সুন্দর মুখবিশিষ্ট রাজা ও অত্যন্ত বলবিশিষ্ট এবং সকলের বিধাতা। ইনি যজ্ঞার্হ; আমরা যেন এর অনুগ্রহ ও কল্যাণকর বাৎসল্য লাভ করতে পারি। ৪।।  আদিত্য মহান, তিনি সকল লোকের প্রবর্তক, নমস্কার দ্বারা তাঁর উপাসনা করা উচিত। তিনি স্তুতিকারীর প্রতি প্রসন্নমুখ। স্তুতিযোগ্য মিত্রের প্রীতিকর এ হব্য অগ্নিতে অর্পণ কর। ৫।।  মনুষ্যগণের পালক মিত্রদেবের অন্ন ও ভজনীয় ধন অত্যন্ত কীর্তিযুক্ত। ৬।।  যে মিত্র নিজ মহিমায় দ্যুলোক অভিভূত করছেন, তিনি কীর্তিযুক্ত হয়ে পৃথিবীকে প্রচুর অন্নবিশিষ্টা করেছেন। ৭।।  পঞ্চজন, শত্রুজয়ক্ষম বলবিশিষ্ট মিত্রের উদ্দেশে হব্য প্রদান করেছেন, তিনি সমস্ত দেবগণকে ধারণ করছেন। ৮।।  মিত্র, দেব ও মনুষ্যদিগের মধ্যে যে ব্যক্তি কৃশচ্ছেদ করেছে, তাকে কল্যাণকর অন্ন প্রদান করেন। ৯।।


ঋগ্বেদের অন্যান্য নজির থেকে কোনো কোনো বিদ্বান গবেষক অনুমান করতে চেয়েছেন যে, বৈদিক কবিদের কল্পনায় মিত্র আসলে সৌরদেবতা– মিত্রের স্তুতি আসলে সূর্যেরই স্তুতি। যদিও মূর্ততম সূর্যদেবতা হিসেবে ঋগ্বেদের দশটি পূর্ণাঙ্গ সূক্তে সূর্যেরই স্তুতি আছে, তা ছাড়াও বহু জায়গায় সূর্যের স্তুতি দেখা যায়, তবুও এটা উল্লেখ্য যে, ঋগ্বেদের সর্বত্রই সূর্য প্রকৃত দেবতা বলে কল্পিত নয়; বরং বহু দৃষ্টান্তেই বৈদিক কবিরা আকাশের মূর্ত সূর্যটিকে নিয়েই বহু উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। যেমন–

ন তে অদেবঃ প্রদিবৌ নি বাসতে যদেতশেভিঃ পতরৈ রথর্যসি।
প্রাচীনমন্যদনু বর্ততে রজ উদন্যেন জ্যোতিষা যাসি সূর্য।। (ঋগ্বেদ-সূর্যসূক্ত-১০/৩৭/৩)।
যেন সূর্য জ্যোতিষা বাধসে তমো জগচ্চ বিশ্বমুদিয়র্ষি ভানুনা।
তেনাস্মদ্বিশ্বামনিরামনাহুতিমপামীবামপ দুঃস্বপ্ন্যাং সুব।। (ঋগ্বেদ-১০/৩৭/৪)।
দিবো রুক্ম উরুচক্ষা উদেতি দূরে অর্থস্তরণির্ভ্রাজমানঃ।
নূনং জনাঃ সূর্যেণ প্রসূতা অয়ন্নর্থানি কৃণবন্নপাংসি।। (ঋগ্বেদ-৭/৬৩/৪)।
অর্থাৎ :
হে সূর্যদেব ! যখন তুমি বেগবান ঘোটক রথে যোজনাপূর্বক আকাশ পথে গমন কর তখন কোনও দেবরহিত জীব তোমার নিকটে আসতে পায় না। তোমার সে চিরপরিচিত অসাধারণ জ্যোতি তোমার সঙ্গে সঙ্গে যায়, সে অসাধারণ জ্যোতি ধারণপূর্বক তুমি উদয় হও। (ঋক-১০/৩৭/৩)।।  হে সূর্যদেব ! যে জ্যোতির দ্বারা তুমি অন্ধকার নষ্ট কর এবং যে কিরণের দ্বারা সমস্ত বিশ্বজগৎ প্রকাশ কর, তার দ্বারা আমাদের সর্বপ্রকার দারিদ্র্য নষ্ট কর; আমাদের পাপ ও রোগ ও দুঃস্বপ্ন দূর কর। (ঋক-১০/৩৭/৪)।।  এই দূরগামী, ত্রাণকর্তা, দীপ্তিমান সূর্য শোভমান ও প্রভূত তেজবিশিষ্ট হয়ে অন্তরিক্ষ হতে উদিত হচ্ছেন। প্রাণিগণ নিশ্চয়ই সূর্যকর্তৃক প্রসূত হয়ে অনুষ্ঠেয় কর্ম করে থাকে। (ঋক-৭/৬৩/৪)।।


সূর্যের কিরণ বিস্তার নিয়ে নানা রকম উচ্ছ্বসিত বর্ণনা ঋগ্বেদে দেখা যায়, সূর্যের প্রভাবে অন্ধকার কীভাবে বিদূরিত হয় সে বিষয়েও নানা উপমা চোখে পড়ে। যেমন–

বহিষ্ঠেভি র্বিহরন্যাসি তন্তুমবব্যয়ন্নসিতং দেব বস্ম।
দবিধুতো রশ্ময়ঃ সূর্যস্য চর্মেবাবাধুস্তমো অপ্স্বন্তঃ।। (ঋগ্বেদ-৪/১৩/৪)।
উদু ত্যচ্চক্ষুর্মহি মিত্রয়োরা এতি প্রিয়ং বরুণয়োরদব্ধম্ ।
ঋতস্য শুচি দর্শতমনীকং রুক্মো ন দিব উদিতা ব্যদ্যৌৎ।। (ঋগ্বেদ-৬/৫১/১)।
অর্থাৎ :
হে দ্যুতিমান সূর্য ! তুমি তন্তুরূপরশ্মি সমূহ বিস্তার করে কৃষ্ণবর্ণা রাত্রিকে তিরোহিত করে অত্যন্ত বহন সমর্থ অশ্বে আরোহণ পূর্বক গমন করছ। কম্পনযুক্ত সূর্যরশ্মিসমূহ অন্তরীক্ষ মধ্যে চর্মের ন্যায় স্থিত অন্ধকার দূর করে। (ঋক-৪/১৩/৪)।।  সূর্যের প্রসিদ্ধ, প্রকাশক, বিস্তৃত, মিত্র ও বরুণের প্রিয়, অপ্রতিহত, নির্মল ও মনোজ্ঞ দীপ্তি প্রকাশিত হয়ে অন্তরীক্ষের ভূষণবৎ শোভা পাচ্ছে। (ঋক-৬/৫১/১)।।


সূর্যকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত এ-জাতীয় কবিত্বের মধ্যে সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিকতার পরিচয় অন্বেষণ করা নিশ্চয়ই অবান্তর। এবং বলা বাহুল্য, আকাশের ওই পরমাশ্চর্য তেজোময় বস্তুটির প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি প্রাচীন বৈদিক কবিদের কাছে প্রত্যাশাও করা যায় না; অতএব তাঁরা সূর্য নিয়ে অনেক রকম কল্পনা করেছেন, যার সবই পৌরাণিক কাহিনী মাত্র। যেমন–

যত্রা চক্রুরমৃতা গাতুমস্মৈ শ্যেনো ন দীয়ন্নন্বেতি পাথঃ।
প্রতি বাং সূর উদিতে বিধেম নমোভির্মিত্রাবরুণোত হব্যৈঃ।। (ঋগ্বেদ-৭/৬৩/৫)।
উদপপ্তদসৌ সূর্যঃ পুরু বিশ্বানি জুর্বন্ ।
আদিত্যঃ পর্বতেভ্যো বিশ্বদৃষ্টো অদৃষ্টহা।। (ঋগ্বেদ-১/১৯১/৯)।।
বিভ্রাড়বৃহৎ পিবতু সোমং মধ্বায়ুর্দধদ্যজ্ঞপতাববিহ্রুতম্ ।
বাতজূতো যো অভিরক্ষতি ত্বনা প্রজাঃ পুপোষ পুরুধা বি রাজতি।। (ঋগ্বেদ-১০/১৭০/১)।
বিভ্রাড়বৃহৎসুভতং বাজসাতমং ধর্মন্দিবো ধরুণে সত্যমর্পিতম্ ।
অমিত্রহা বৃত্রহা দস্যুহন্তমং জ্যোতির্জজ্ঞে অসুরহা সপত্নহা।। (ঋগ্বেদ-১০/১৭০/২)।
অর্থাৎ :
মরণরহিত দেবগণ যে স্থলে এ সূর্যের জন্য পথ করেছিলেন, উড়ন্ত ক্ষীপ্রগামী শ্যেন পক্ষি বা গৃধ্রের ন্যায় সে পথ অন্তরীক্ষকে অনুগমন করে। হে মিত্র ও বরুণ ! সূর্য উদিত হলে নমস্কার ও হব্যদ্বারা তোমাদের পরিচর্যা করবো। (ঋক-৭/৬৩/৫)।।  সূর্য প্রচুর পরিমাণে সমস্ত বিষ নাশ করে উদয় হচ্ছেন। সর্বদর্শী, অদৃষ্টদের বিনাশক আদিত্য জীবলোকের মঙ্গলের জন্য উদিত হচ্ছেন। (ঋক-১/১৯১/৯)।।  অতি দীপ্তিশালী সূর্যদেব মধুতুল্য সোমরস পান করুন, যজ্ঞানুষ্ঠানকারী ব্যক্তির প্রকৃষ্ট পরমায়ু বিধান করুন। তিনি বায়ু দ্বারা প্রেরিত হয়ে প্রজাদের স্বয়ং রক্ষা করেন, প্রজাবর্গের পুষ্টি বিধান করেন এবং অশেষ প্রকারে শোভা পান। (ঋক-১০/১৭০/১)।।  সূর্যরূপ আলোকময় পদার্থ উদয় হচ্ছে; এই প্রকাণ্ড অতিদীপ্তিশালী, উত্তমরূপে সংস্থাপিত, এর মত অন্নদান কেউ করে না; এ আকাশের অবলম্বনের উপর যথাযোগ্যরূপে সংস্থাপিত হয়ে আকাশকে আশ্রয় করে আছে। এ শত্রুনিধন করে, বৃত্রকে বধ করে, দস্যুদের প্রধান নিধনকারী, অসুরদের বধকারী, বিপক্ষদের সংহারকারী। (ঋক-১০/১৭০/২)।।


সূর্যের জন্ম নিয়েও বৈদিক কবিদের অনেক রকম জল্পনা-কল্পনা রয়েছে; কিন্তু তাও সবই পৌরাণিক কাহিনীই।

.
সবিতৃ দেবতা :

ঋগ্বেদের আর একটি সৌর-দেবতার নাম সবিতৃ বা সবিতা। এগারোটি পূর্ণাঙ্গ সূক্তে তাঁর স্তুতি দেখা যায়। বৈদিক কবিদের বর্ণনায় তাঁর প্রধানতম বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল বা সুবর্ণময়ত্ব– অর্থাৎ তাঁর বাহু সুবর্ণময়, জিহ্বা সুবর্ণময়, চক্ষু সুবর্ণময়, এমনকি তাঁর রথও সুবর্ণময়। ঋগ্বেদের কোন ঋকে বলা হয়েছে সবিতা সূর্যের কিরণে কিরণযুক্ত এবং উজ্জ্বল কেশবিশিষ্ট। যেমন–

সূর্যরশ্মির্হরিকেশঃ পুরস্তাৎ সবিতা জ্যোতিরুদয়া অজস্রম্ ।
তস্য পূষা প্রসবে যাতি বিদ্বান্ত্ সম্পশ্যন্বিশ্বা ভুবনানি গোপাঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৩৯/১)।
উত যাসি সবিতস্ত্রীণি রোচনোত সূর্যস্য রশ্মিভিঃ সমুচ্যসি।
উত রাত্রীমুভয়তঃ পরীয়স উত মিত্রো ভবসি দেব ধর্মভিঃ।। (ঋগ্বেদ-৫/৮১/৪)।
অর্থাৎ :
দেবসবিতা সূর্যের কিরণে কিরণযুক্ত, উজ্জ্বল কেশবিশিষ্ট, তিনি পূর্বদিকে ক্রমাগত আলোকের উদয় করতে থাকেন। তাঁর জন্ম হলে পূষাদেব অগ্রসর হন, ইনি জ্ঞানী, সমস্ত ভুবন দর্শন ও রক্ষা করেন। (ঋক-১০/১৩৯/১)।।  হে সবিতা ! তুমি তিন দীপ্ত ভুবন পরিভ্রমণ কর। অথবা সূর্যের রশ্মিদ্বারা সঙ্গত হও। কিংবা তুমি উভয় পার্শ্বের রাত্রির মধ্য দিয়ে যাও। অথবা হে দেব ! তুমি তোমার কার্যদ্বারা মিত্র হও। (ঋক-৫/৮১/৪)।।


সূর্যের সঙ্গে সবিতার পার্থক্য বর্ণনা করে ভাষ্যকার সায়ণ (ঋক-৫/৮১/৪) ভাষ্যে বলেন, উদয়ের পূর্বে যে মূর্তি তাই সবিতা, আর উদয় হতে অস্তগমন পর্যন্ত যে মূর্তি তাই সূর্য। আবার ঋগ্বেদের একটি সূক্তে (ঋগ্বেদ-সূক্ত-২/৩৮) অস্তমান সূর্যই সবিতা বলে স্তুত হয়েছে, এবং এই সূক্তেই সবিতার কর্মের বর্ণনাও দেয়া হয়েছে–

উদু ষ্য দেবঃ সবিতা সবায় শশ্বত্তমং তদপা বহ্নিরস্থাৎ।
নূনং দেবেভ্যো বি হি ধাতি রত্নমথাভজদ্বীতিহোত্রং স্বস্তৌ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৮/১)।
বিশ্বস্য হি শ্রুষ্টয়ে দেব ঊর্ধ্বঃ প্র বাহবা পৃথুপাণিঃ সিসর্তি।
আপশ্চিদস্য ব্রত আ নিমৃগ্রা অয়ং চিদ্বাতো রমতে পরিজ্মন্ ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৮/২)।
আশুভিশ্চিদ্যান্বি মুচাতি নূনমরীরমদতমানং চিদেতোঃ।
অহ্যর্ষূণাং চিন্ন্যয়া অবিষ্যামনু ব্রতং সবিতু র্মোক্যাগাৎ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৮/৩)।
পুনঃ সমব্যদ্বিততং বয়ন্তী মধ্যা কর্তো র্ন্যধাচ্ছক্ম ধীরঃ।
উৎসংহায়াস্থাদ্ব্যৃতূ রদর্ধররমতিঃ সবিতা দেব আগাৎ।। (ঋগ্বেদ-২/৩৮/৪)।
অর্থাৎ :
দ্যুতিমান জগৎবাহক সবিতা জগৎ প্রসবের জন্য প্রতিদিন উদয় হন; এটাই তাঁর কর্ম। তিনি স্তোতাগণকে রত্ন প্রদান করেন এবং সুন্দর যজ্ঞবিশিষ্ট যজমানকে মঙ্গলভাগী করেন। (ঋক-২/৩৮/১)।।  বিস্তীর্ণ হস্তবিশিষ্ট দ্যুতিমান সবিতা জগতের আনন্দের জন্য উদিত হয়ে বাহু প্রসারিত করেন। তাঁর কর্মের জন্য অত্যন্ত পাবন জলসমূহ প্রবাহিত হয় এবং এ বায়ুও সর্বতোব্যাপী অন্তরীক্ষে বিহার করে। (ঋক-২/৩৮/২)।।  গমন করতে করতে সবিতা যখন শীঘ্রগামী রশ্মি কর্তৃক বিমুক্ত হন, তখন তিনি নিরন্তর পথগামী ব্যক্তিকেও গমন হতে বিরত করেন। যারা শত্রুর বিরুদ্ধে যায় তাদেরও গমনেচ্ছা নিবৃত্ত করেন। সবিতার কর্মের পর রাত্রি আসেন। (ঋক-২/৩৮/৩)।।  বস্ত্রবয়নকারিণী রমণীর ন্যায় রাত্রি পুনর্বার আলোককে সম্যকরূপে বেষ্টন করছেন, প্রজ্ঞাবান লোক যে কর্ম করছিল, তা করতে সক্ষম হলেও মধ্যস্থলে রেখে দিচ্ছে। বিরামরহিত ও ঋতুর বিভাগকর্তা দ্যোতমান সবিতা যখন পুনরায় উদিত হন, তখন লোক শয্যা ত্যাগ করে ওঠে। (ঋক-২/৩৮/৪)।।


আরেকটি ঋকে বলা হচ্ছে, সবিতা প্রতিদিবসে জগৎকে স্ব স্ব কার্যে স্থাপন করেন। যেমন–

আপ্রা রজাংসি দিব্যানি পার্থিবা শ্লোকং দেবঃ কৃণুতে স্বায় ধর্মণে।
প্র বাহু অস্রাক্-সবিতা সবীমনি নিবেশয়ন্ প্রসুবন্নক্তুভির্জগৎ।। (ঋগ্বেদ-৪/৫৩/৩)।
অর্থাৎ :
সবিতাদেব তেজদ্বারা দ্যুলোক ও পৃথিবী লোককে পরিপূর্ণ করেন এবং স্বীয় কার্যের প্রশংসা করেন। তিনি প্রতিদিবস জগৎকে স্ব স্ব কার্যে স্থাপন ও প্রেরণ করে সৃজনকার্যে বাহু প্রসারিত করেন।


এবং ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের সূর্য-স্তুতিমূলক একটি সূক্তে (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১০/১৫৮) দেখা যায়, সূর্যদেবতাকে কখনও সূর্য বলা হয়েছে, কখনও সবিতা বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এই সূক্তের কবি হলেন চক্ষু ঋষি। যেমন–

সূর্যো নো দিবস্পাতু বাতো অন্তরিক্ষাৎ। অগ্নির্নঃ পার্থিবেভ্যঃ।। ১
জোষা সবিতর্ষস্য তে হরঃ শতং সবা অর্হতি। পাহি নো দিদ্যুতঃ পতন্ত্যাঃ।। ২
সুসন্দৃশং ত্বা বয়ং প্রতি পশ্যেম সূর্য। বি পশ্যেম নৃচক্ষসঃ।। ৫
অর্থাৎ :
সূর্য আমাদের স্বর্গের উপদ্রব হতে, বায়ু আকাশের উপদ্রব হতে এবং অগ্নি পৃথিবীর উপদ্রব হতে রক্ষা করুন। ১।।  হে সবিতা ! আমাদের পূজা গ্রহণ কর। তোমার যে তেজ, তার উদ্দেশে একশত যজ্ঞ অনুষ্ঠান করা উচিত, শত্রুদের যে সকল উজ্জ্বল অস্ত্র এসে পড়ছে, তা হতে আমাদের রক্ষা কর। ২।।  হে সূর্য ! তোমাকে যেন আমরা অতি উৎকৃষ্টরূপে দর্শন করতে পারি আর মনুষ্যগণ যা দেখতে পায়, তা যেন আমরা বিশেষ ভাবে দর্শন করতে পারি। ৫।।


.
পূষা দেবতা :

পূষন্ বা পূষাকেও বিদ্বান গবেষকরা সৌরদেবতা বলেই বিবেচনা করেন। দৃষ্টান্ত বিশেষে তাঁর বর্ণনায় যে-সব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, সূর্যের বর্ণনাতেও প্রায় হুবহু সেই শব্দগুলি পাওয়া যায়। যেমন–

শুক্রং তে অন্যদ্যজতং তে অন্যদ্বিষুরূপে অহনী দ্যৌরিবাসি।
বিশ্বা হি মায়া অবসি স্বধাবো ভদ্রা তে পুষণ্নিহ রাতিরস্তু।। (ঋগ্বেদ-৬/৫৮/১)।
অজাশ্বঃ পশুপা বাজপস্ত্যো ধিয়ংজিন্বো ভুবনে বিশ্বে অর্পিতঃ।
অষ্ট্রাং পূষা শিথিরামুদ্বরীবৃজৎসংচক্ষাণো ভুবনা দেব ঈয়তে।। (ঋগ্বেদ-৬/৫৮/২)।
অর্থাৎ :
হে পূষা ! তোমার এরূপ দিবা শুক্লবর্ণ ও অন্যরূপ রাত্রি কেবল যজনীয়। এরূপে দিবা ও রাত্রির রূপ বিভিন্ন প্রকার। তুমি সূর্যের ন্যায় প্রকাশক, কারণ তুমি অন্নদাতা ও সর্বপ্রকার জ্ঞান ধারণ কর, সম্প্রতি তোমার কল্যাণকর দান প্রকাশিত হোক। (ঋক-৬/৫৮/১)।।  যিনি ছাগবাহন ও পশুপালক, যাঁর গৃহ অন্নপূর্ণ, তিনি স্তোতৃবর্গের প্রীতিপ্রদ। যিনি অখিল ভুবনের উপর স্থাপিত, সে দেব পূষা সূর্যরূপে ভূতজাতকে প্রকাশিত করে নিজহস্তে প্রতোদ উত্তোলন করে নভোমণ্ডলে গমন করছেন। (ঋক-৬/৫৮/২)।।


এখানে দেখা যাচ্ছে, পূষার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁর রথে অশ্বের পরিবর্তে অজ বা ছাগল নিযুক্ত; অর্থাৎ তিনি ছাগবাহন। একটি ঋকে পূষার সঙ্গে সূর্য্যার (সূর্য-পত্নীর?) বিবাহ কাহিনী পাওয়া যায়। যেমন–

পূষা সুবন্ধুর্দিব আ পৃথিব্যা ইলস্পতির্মঘবা দস্মবর্চাঃ।
যং দেবাসো অদদুঃ সূর্যায়ৈ কামেন কৃতং তবসং স্বঞ্চম্ ।। (ঋগ্বেদ-৬/৫৮/৪)।
অর্থাৎ :
পূষা স্বর্গ ও পৃথিবীর শোভন বন্ধুস্বরূপ, অন্নের অধিপতি, ঐশ্বর্যশালী ও মনোজ্ঞ মূর্তি। তিনি বলশালী, স্বেচ্ছাপ্রদত্ত পশ্বাদি দ্বারা প্রসাদযোগ্য ও শোভন গমনকারী তাঁকে দেবগণ সূর্য পত্নীর নিকট সমর্পণ করেছিলেন।


অন্যত্র আবার পূষার সঙ্গে স্বীয় মাতার এবং স্বীয় ভগিনীরও এ-জাতীয় প্রণয়ী সম্পর্ক পরিকল্পিত হতে দেখা যায়। যেমন–

পূষণং ন্বজাশ্বমুপ স্তোষাম বাজিনং। স্বসুর্যো জার উচ্যতে।। (ঋগ্বেদ-৬/৫৫/৪)।
মাতুর্দিধিষুমব্রবং স্বসুর্জারঃ শৃণোতু নঃ ! ভ্রাতেন্দ্রস্য সখা মম।। (ঋগ্বেদ-৬/৫৫/৫)।
অর্থাৎ :
অদ্য আমরা ছাগবাহন, অন্নসম্পন্ন সে পূষার স্তব করছি, যাঁকে লোকে তাঁর ভগিনী অর্থাৎ ঊষার জার বা প্রণয়ী বলে থাকে। (ঋক-৬/৫৫/৪)।।  রাত্রিরূপ মাতার পতিদেব পূষার স্তব করছি। তাঁর ভগিনীর জার (প্রণয়ী বা উপপতি) পূষা আমাদের স্ত্রোত্র শুনুন। ইন্দ্রের সহোদর পূষা যেন আমাদের মিত্র হন। (ঋক-৬/৫৫/৫)।।


স্বীয় মাতা ও ভগিনীর সাথে পতি বা প্রণয়ীর সম্পর্ক-জাতীয় অজাচার-মূলক কল্পনা বৈদিক কবিদের আদিম অবস্থারই পরিচয় বহন করে। অবশ্য ঋগ্বেদে অগ্নি এবং সূর্য প্রসঙ্গেও এ-জাতীয় কল্পনার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন–

কৃষ্ণাং যদেনীমভি বর্পসা ভূজ্জনয়ন্যোষাং বৃহতঃ পিতুর্জাম্ ।
উর্ধ্বং ভানুং সূর্যস্য স্তভায়ন্ দিবো বসুভিররতির্বি ভাতি।। (ঋগ্বেদ-১০/৩/২)।
ভদ্রো ভদ্রয়া সচমান আগাৎ স্বসারং জারো অভ্যেতি পশ্চাৎ।
সুপ্রকেতৈর্দ্যুভিরগ্নির্বিতষ্ঠন্রুশদ্ভির্বর্ণৈরভি রামমস্থাৎ।। (ঋগ্বেদ-১০/৩/৩)।
সূর্যো দেবীমুষসং রোমোনাং মর্যো ন ষোষামভ্যেতি পাচাৎ।
যত্রা নরো দেবয়ন্তো যুগানি বিতন্বতে প্রতি ভদ্রায় ভদ্রম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১১৫/২)।
অর্থাৎ :
এ অগ্নি পলায়নোদ্যত কৃষ্ণবর্ণ রাত্রিকে পরাভব করলেন, সেই বৃহৎ পিতা অর্থাৎ সূর্যের পত্নী উষাদেবীকে জন্ম দান করলেন। তিনি উর্ধ্বে আলোক বিস্তার করে সূর্যের কিরণ আচ্ছাদনপূর্বক গগনবিসারী নিজ তেজের দ্বারা সুশোভিত হয়েছেন। (ঋক-১০/৩/২)।।  অগ্নি নিজে সুরূপ, সুরূপা দীপ্তির সাথে সমাগত হয়ে আসছেন, তিনি উপপতির ন্যায় ঊষার পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাচ্ছেন। উজ্জ্বল আলোকে পরিপূর্ণ হয়ে তিনি আপনার শ্বেতবর্ণ কিরণসহকারে কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকারকে পরাভব করছেন। (ঋক-১০/৩/৩)।।  মানুষ যেরূপ নারীর পশ্চাৎ গমন করে, সূর্য সেরূপ দীপ্তিমান ঊষার পশ্চাতে আসছেন; এ সময়ে দেবতাকাঙ্ক্ষী মানুষগণ বহুযুগ প্রচলিত যজ্ঞকর্ম বিস্তার করেন, সুফলার্থে কল্যাণ কর্ম সম্পন্ন করেন। (ঋক-১/১১৫/২)।।


আবার একটি ঋক-স্তুতিতে পূষার কাছে সুশ্রী নারী পাবার কামনাও ব্যক্ত হয়েছে। যেমন–

অবিতা নো অজাশ্বঃ পূষা যামনিয়ামনি। আ ভক্ষৎকন্যাসু নঃ।। (ঋগ্বেদ-৯/৬৭/১০)।
অর্থাৎ :
পূষা নামক যে দেবতা যিনি ছাগ বাহনে গমন করেন, তিনি যেন, যখন যখন আমরা যাত্রা করি তখনই আমাদের রক্ষা করেন। তাঁর প্রসাদে যেন আমরা সুশ্রী নারী প্রাপ্ত হই।


তবে পূষার উদ্দেশে বৈদিক ঋষিরা যে-সব কামনা ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যে একটি প্রধানতম কামনা হলো যাত্রাপথের নিরাপত্তা। এ-প্রেক্ষিতে পূষা-স্তুতিমূলক একটি স্বতন্ত্র সূক্ত উদ্ধৃত করা যেতে পারে। এ-সূক্তের কবি হলেন ঘোর-পুত্র কন্ব ঋষি (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১/৪২)–

সং পূষণ্নধ্বনস্তির ব্যংহো বিমুচো নপাৎ। সক্ষ্বা দেব প্র ণস্পূরঃ।। ১
যো নঃ পূষণ্নবো বৃকো দুঃশেব আদিদেশতি। অপ স্ম তং পথো জহি।। ২
অপ ত্যং পরিপন্থিনং মুষীবাণং হুরশ্চিতং। দূরমধি স্রুতেরজ।। ৩
ত্বং অস্য দ্বয়াবিনোহঘশংসস্য কস্য চিৎ। পদাভি তিষ্ঠ তপুষিম্ ।। ৪
আ তত্তে দস্র মন্তুমঃ পূষণ্নবো বৃণীমহে। যেন পিতৃনৃচোদয়ঃ।। ৫
অধা নো বিশ্বসৌভগ হিরণ্যবাশীমত্তম। ধনানি সুষণা কৃষি।। ৬
অতি নঃ সশ্চতো নয় সুগা নঃ সুপথা কৃণু। পূষণ্নিহ ক্রতুং বিদঃ।। ৭
অভি সূযবসং নয় ন নবজ্বারো অধ্বনে। পূষণ্নিহ ক্রতুং বিদঃ।। ৮
শগ্ধি পূর্ধি প্র যংসি চ শিশীহি প্রাস্যুদরম্ । পূষণ্নিহ ক্রতুং বিদঃ।। ৯
ন পূষণং মেথামসি সূক্তৈরভি গৃণীমসি। বসুণি দসামীমহে।। ১০
অর্থাৎ :
হে পূষা ! পথ পার করিয়ে দাও, (বিঘ্নহেতু) পাপ বিনাশ কর; হে মেঘপুত্র দেব ! আমাদের অগ্রে যাও। ১।।  হে পূষা ! আঘাতকারী, অপহরণকারী ও দুষ্টাচারী যে কেউ আমাদের (বিপরীত পথ) দেখিয়ে দেয়, তাকে পথ হতে দূর করে দাও। ২।।  সেই মার্গ প্রতিবন্ধক তস্কর কুটিলাচারীকে পথ হতে দূরে তাড়িয়ে দাও। ৩।।  যে কেউ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ই হরণ করে এবং অনিষ্টসাধন ইচ্ছা করে, হে পূষা ! তার পরসন্তাপক দেহ তোমার পদের দ্বারা দলিত কর। ৪।।  হে শত্রুবিনাশী ও জ্ঞানবান পূষা ! যেরূপ রক্ষণাদ্বারা পিতৃগণকে উৎসাহিত করেছিলে, তোমার সে রক্ষণা প্রার্থনা করছি। ৫।।  হে সর্বধনসম্পন্ন, অনেক সুবর্ণায়ুধযুক্ত লোকগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পূষা ! তুমি অনন্তর ধনসমূহ দানে পরিণত কর। ৬।।  বিঘ্নকারী শত্রুদের অতিক্রম করে আমাদের নিয়ে যাও, সুখগম্য শোভনীয় পথদ্বারা আমাদের নিয়ে যাও; হে পূষা ! তুমি এ পথে আমাদের রক্ষণের উপায় কর। ৭।।  শোভনীয় তৃণযুক্ত দেশে আমাদের নিয়ে যাও, পথে যেন নতুন সন্তাপ না হয়। হে পূষা ! তুমি এ (পথে) আমাদের রক্ষণের উপায় কর। ৮।।  (আমাদের অনুগ্রহ করতে) সক্ষম হও, আমাদের গৃহ ধনে পরিপূর্ণ কর, অভীষ্টবস্তু দান কর; আমাদের তীক্ষ্ণতেজা কর, আমাদের উদর পূরণ কর; হে পূষা ! তুমি এ পথে আমাদের রক্ষণের উপায় কর। ৯।।  আমরা পূষাকে নিন্দা করি না, সূক্ত দ্বারা স্তুতি করি, আমরা দর্শনীয় পূষার নিকট ধন যাচ্ঞা করি। ১০।।


.
বিষ্ণু দেবতা :

দ্যুলোকের আর একটি দেবতার নাম বিষ্ণু। পরবর্তীকালে এই দেবতাটি বিশেষ প্রাধান্য লাভ করলেও ঋগ্বেদে তাঁর স্থান কিন্তু অবশ্যই গৌণ। তবে বিষ্ণু প্রসঙ্গে বৈদিক কবিদের প্রধানতম কল্পনা হলো তাঁর পদক্ষেপ। যেমন–

দ্বে ইদস্য ক্রমণেস্বর্দৃশোহভিখ্যায় মর্ত্যাে ভুরণ্যতি।
তৃতীয়মস্য নকিরা দধর্ষতি ধয়শ্চন পতয়ন্তঃ পতত্রিণঃ।। (ঋগ্বেদ-১/১৫৫/৫)।
ইদং বিষ্ণুর্বি চক্রমে ত্রেধা নিদধে পদং। সমুলহমস্য পাংসুরে।। (ঋগ্বেদ-১/২২/১৭)।
ত্রীণি পদা বি চক্রমে বিষ্ণু র্গোপা অদাভ্যঃ। অতো ধর্মাণি ধারয়ন্ ।। (ঋগ্বেদ-১/২২/১৮)।
প্র তদ্বিষ্ণুঃ স্তবতে বীর্যেণ মৃগো ন ভীমঃ কুচরোগিরিষ্ঠাঃ।
যস্যোরুষু ত্রিষু বিক্রমণেষ্বধিক্ষিয়ন্তি ভুবনানি বিশ্বা।। (ঋগ্বেদ-১/১৫৪/২)।
অর্থাৎ :
মনুষ্যগণ স্বর্গদর্শী বিষ্ণুর দুই পাদক্ষেপ কীর্তন করে প্রাপ্ত হয়। তাঁর তৃতীয় পাদক্ষেপ মনুষ্যগণ ধারণা করতে পারে না, উড্ডীয়মান পক্ষবিশিষ্ট পক্ষীগণও প্রাপ্ত হয় না। (ঋক-১/১৫৫/৫)।।  বিষ্ণু এ জগৎ পরিক্রমা করেছিলেন, তিন প্রকার পদবিক্ষেপ করেছিলেন, তাঁর ধূলিযুক্ত পদে জগৎ আবৃত হয়েছিল। (ঋক-১/২২/১৭)।।  বিষ্ণু রক্ষক, তাঁকে কেহ আঘাত করতে পারে না, তিনি ধর্ম সমুদয় ধারণ করে তিন পদ পরিক্রমা করেছিলেন। (ঋক-১/২২/১৮)।।  যেহেতু বিষ্ণু তিন পদক্ষেপে সমস্ত ভুবন অবস্থিতি করে অতএব ভয়ঙ্কর, হিংস্র, গিরিশায়ী আরণ্য জন্তুর ন্যায় বিষ্ণুর বিক্রম লোকে প্রশংসা করে। (ঋক-১/১৫৪/২)।।


বেদে বিষ্ণুর এই তিন প্রকার পদবিক্ষেপ কী? এ-প্রেক্ষিতে প্রায় সকল বিদ্বান ও গবেষকেরা অনুমান করতে চেয়েছেন, বৈদিক কবিরা সূর্যের গতিকেই এইভাবে বিষ্ণুর পদক্ষেপ বা ত্রিপাদগমন বলে কল্পনা করেছেন। এই ত্রিপাদ অর্থে সম্ভবত সূর্যের উদয়গিরিতে আরোহণ অর্থাৎ সূর্যের উদয়, মধ্য আকাশে স্থিতি অর্থাৎ মধ্যাহ্নপ্রখরতা এবং অস্তাচলে অস্তগমন। যদিও অন্যরা অনুমান করেন কবিরা এইভাবে সূর্যের ত্রিলোক-ভ্রমন কল্পনা করেছিলেন। পরবর্তীকালের ব্রাহ্মণ, মহাভারত ও পুরাণ গ্রন্থে বিষ্ণুর এই ত্রিপাদ-ভ্রমণ সংক্রান্ত প্রাচীন কল্পনা নানা আখ্যায়িকা ও অনুষ্ঠানের সংযুক্ত হয়ে পল্লবিত ও জটিল রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু বিষ্ণু যে সূর্যেরই সমস্থানীয় দেবতা কিংবা ঋতুর নিয়ামক দেবতা সূর্যই, তা ঋগ্বেদের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত থেকে অনুমিত হয়–

চতুর্ভিঃ সাকং নবতিং চ নামভিশ্চক্রং ন বৃত্তং ব্যতীরবীবিপৎ।
বৃহচ্ছরীরো বিমিমান ঋক্কভিষুর্বাকুমারঃ প্রত্যেত্যাহবম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১৫৫/৬)।
অর্থাৎ :
বিষ্ণু গতিবিশেষ দ্বারা বৎসরের চতুর্নবতি দিবস চক্রের ন্যায় বৃত্তাকারে চালিত করেছেন। বিষ্ণু বৃহৎ শরীর বিশিষ্ট ও স্তুতিদ্বারা পরিমেয়, তিনি নিত্য তরুণ ও অকুমার, তিনি আহবে গমন করেন।


পণ্ডিতেরা ‘চতুর্ভিঃ নবতিং’ অর্থে চারগুণ নব্বই অর্থাৎ বৎসরের ৩৬০ দিন করেছেন। অর্থাৎ বিষ্ণু বৎসরের চারটি নবতি বা নব্বই দিবস সমষ্টিকে বৃত্তাকারে পরিচালিত করেন। সম্ভবত তখন চারটি ঋতু স্বীকার করা হতো। প্রতি ঋতুর স্থায়িত্ব নব্বই দিবস করে। এরকম চারটি নব্বই দিবসের সমষ্টি নিয়ে বৎসরের চক্র। কাজেই বিষ্ণু ঋতুর নিয়ামক দেবতা। এদিক থেকে দেখলে তিনি সূর্য কিংবা সূর্যেরই সমস্থানীয় হয়ে দাঁড়ান। তাই পরবর্তীকালের বিষ্ণুকে নিয়ে যতো পৌরাণিক কল্পনাই পল্লবিত হোক না কেন, মনে রাখা দরকার, সূর্যের গতি বহুবিধ পার্থিব কামনা সফল করে এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই প্রকৃত প্রাচীন কবিরা বিষ্ণুর ওই পদক্ষেপ সংক্রান্ত অমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। যেমন–

যো রজাংসি বিমমে পার্থিবানি ত্রিশ্চিদ্বিষ্ণুর্মনবে বাধিতায়।
তস্য তে শর্মন্নুপদদ্যমানে রায়া মদেম তন্বাহতনা চ।। (ঋগ্বেদ-৬/৪৯/১৩)।
তত্তদিদস্য পৌংস্যং গৃণীমসীনস্য ত্রাতুরবৃকস্য মীড়্হুষঃ।
য পার্থিবানি ত্রিভিরিদ্বিগামভিরুক্রমিষ্টোরুগায়ায় জীবসে।। (ঋগ্বেদ-১/১৫৫/৪)।
ইন্দ্রাবিষ্ণু তৎপনয়ায্যং বাং সোমস্য মদ উরূ চক্রমাথে।
অকৃণুতমন্তরিক্ষং বরীয়োহপ্রথতং জীবসে নো রজাংসি।। (ঋগ্বেদ-৬/৬৯/৫)।
ইন্দ্রাবিষ্ণু হবিষা বাবৃধানাগ্রাদ্বানা নমসা রাতহব্যা।
ঘৃতাসুতী দ্রবিণং ধত্তমস্মে সমুদ্রঃ স্থুঃ কলশঃ সোমধানঃ।। (ঋগ্বেদ-৬/৬৯/৬)।
অর্থাৎ :
যে বিষ্ণু উপদ্রুত মনুর নিমিত্ত ত্রিপাদ বিক্রম দ্বারা পার্থিব লোক পরিমাণ করেছিলেন, সে তোমার দেওয়া গৃহে অবস্থানপূর্বক আমরা যেন ধন, দেহ ও পুত্রদ্বারা আনন্দ অনুভব করি। (ঋক-৬/৪৯/১৩)।।  আমরা সকলের স্বামী, পালন কর্তা, শত্রু রহিত ও সেচন সমর্থ বিষ্ণুর পৌরুষের স্তুতি করি। তিনি প্রশংসনীয় লোক রক্ষার নিমিত্ত ত্রিসংখ্যক পদবিক্ষেপদ্বারা পার্থিব লোক সকল বিস্তীর্ণরূপে পরিক্রম করেছিলেন। (ঋক-১/১৫৫/৪)।।  হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু ! সোমজনিত হর্ষ উৎপন্ন হলে তোমরা বিস্তীর্ণরূপে পরিক্রমণ কর, তোমরা অন্তরীক্ষকে অত্যন্ত বিস্তীর্ণ করেছ এবং লোকসমূহকে আমাদের জীবনের জন্য প্রথিত করেছ। তোমাদের সে কর্মসমূহ স্তুতিযোগ্য। (ঋক-৬/৬৯/৫)।।  হে ঘৃতান্নবিশিষ্ট ইন্দ্র ও বিষ্ণু ! তোমরা সোমদ্বারা বর্ধিত হয়ে থাক এবং সোমাগ্র ভোজন করে থাক; যজমানগণ নমস্কার পূর্বক তোমাদের হব্য দান করে, তোমরা আমাদের ধন দান করা। তোমরা উদধির ন্যায়, তোমরা সোমনিধান কলস স্বরূপ। (ঋক-৬/৬৯/৬)।।


.
দেবতা আদিত্যগণ :

বৈদিক সাহিত্যে তথা ঋগ্বেদে আদিত্যগণের পরিকল্পনা বেশ চিত্তাকর্ষক। প্রথমত, একটি দেবতা নয়– একাধিক দেবতার সমষ্টিকে এই নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কবির কল্পনায় তাঁদের সংখ্যা ছয় (ঋগ্বেদ-২/২৭/১), কোনো কবির কল্পনায় সাত (ঋগ্বেদ-৯/১১৪/৩), আবার কারো কল্পনায় আট (ঋগ্বেদ-১০/৭২/৮)। যেমন–

ইমা গির আদিত্যেভ্যো ঘৃতস্নুঃ সনাদ্রাজভ্যো জুহ্বা জুহোমি।
শৃণোতু মিত্রো অর্যমা ভগো নস্তুবিজাতো বরূণো দক্ষো অংশঃ।। (ঋগ্বেদ-২/২৭/১)।
সপ্ত দিশো নানাসূর্যাঃ সপ্ত হোতার ঋত্বিজঃ।
দেবা আদিত্য যে সপ্ত তেভিঃ সোভাভি রক্ষ ন ইন্দ্রায়েন্দো পরি স্রব।। (ঋগ্বেদ-৯/১১৪/৩)।
অষ্টৌ পুত্রাসো অদিতের্যে জাতাস্তন্ব স্পরি।
দেবা উপ প্রৈৎসপ্তভিঃ পুরা মার্তান্ডমাস্যৎ।। (ঋগ্বেদ-১০/৭২/৮)।।
অর্থাৎ :
আমি জুহুদ্বারা সর্বদা শোভমান আদিত্যগণের উদ্দেশে ঘৃতস্রাবী স্তুতি অর্পণ করছি। মিত্র, অর্যমা, ভগ, বহুব্যাপী বরুণ, দক্ষ ও অংশ আমার স্তুতি শুনুন। (ঋক-২/২৭/১)।।  অনেক সূর্যের অধিষ্ঠানস্বরূপ যে সাত দিক আছে এবং হোমকর্তা যে সাতজন পুরোহিত আছেন এবং সাতজন যে আদিত্যগণ আছেন, হে সোম ! তাদের সাথে আমাদের রক্ষা কর। ইন্দ্রের জন্য ক্ষরিত হও। (ঋক-৯/১১৪/৩)।।  অদিতির দেহ হতে আট পুত্র জন্মেছিলেন, তিনি তন্মধ্যে সাতটি নিয়ে দেবলোকে গেলেন কিন্তু মার্তণ্ড নামক পুত্রকে দূরে নিক্ষেপ করলেন। (ঋগ্বেদ-১০/৭২/৮)।।


অদিতির সন্তান হিসেবে এই দেবগণের নাম হয়েছে আদিত্য। কিন্তু বৈদিক সাহিত্যে আদিত্যগণের সংখ্যা নিয়ে যেমন ভিন্নতা দেখা যায়, তেমনি এই দেবগোষ্ঠির অন্তর্গত দেবতাদের নামের তালিকাও সর্বত্র সমান নয়। শতপথ ব্রাহ্মণে এবং পুরাণ ও মহাভারতে দ্বাদশ আদিত্যের নাম আছে। ঋগ্বেদের উপরে উল্লিখিত ঋকে (ঋক-২/২৭/১) তালিকায় আদিত্যগণের নাম হলো- মিত্র, অর্যমা, ভগ, বরুণ, দক্ষ ও অংশ। কিন্তু অথর্ববেদে (অথর্ব-৮/৯/২১) আটজন আদিত্যের নাম উল্লিখিত হয়েছে– মিত্র, বরুণ, অর্যমা, অংশ, ভগ, ধাতৃ, ইন্দ্র ও বিবস্বৎ। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে আটজন আদিত্যের উল্লেখ রয়েছে, যথা– ধাতা, অর্যমা, বরুণ, অংশ, ভগ, ইন্দ্র ও বিবস্বান্ । আবার শতপথ ব্রাহ্মণে দ্বাদশ আদিত্যের কথা উল্লেখ রয়েছে, এবং সেই দ্বাদশ মাস, যেমন–

‘কতমে আদিত্যা ইতি। দ্বাদশ মাসাঃ সম্বৎসরস্য এতে আদিত্যাঃ।’ (শতপথ ব্রাহ্মণ-১১/৬/৩/৮)
অর্থাৎ : আদিত্য কারা? সংবৎসরের দ্বাদশ মাস হলো দ্বাদশ আদিত্য (মুক্ত-তর্জমা)।


ঋগ্বেদে ছয় বা সাতজন আদিত্যের নাম উল্লেখ করা হলেও অবশ্য ঋগ্বেদের অন্যত্র সূর্য (ঋগ্বেদ-১০/৮৮/১১), সবিতৃ (ঋগ্বেদ-৮/১৮/৩), ইন্দ্র (ঋগ্বেদ-৭/৮৫/৪) প্রভৃতিকেও আদিত্য বলা হয়েছে। যেমন–

যদেদেনমদধুর্ষজ্ঞিয়াসো দিবি দেবাঃ সূর্যমাদিতেয়ম্ ।
যদা চরিষ্ণু মিথুনাবভূতামাদিৎ প্রাপশ্যন্ ভুবনানি বিশ্বা।। (ঋগ্বেদ-১০/৮৮/১১)।
তৎসু নঃ সবিতা ভগো বরুণো মিত্রো অর্যমা।
শর্ম যচ্ছন্তু সপ্রথো যদীমহে।। (ঋগ্বেদ-৮/১৮/৩)।
স সুক্রতুর্ঋতচিদস্তু হোতা য আদিত্য শবসা বাং নমস্বান্ ।
আববর্তদবসে বাং হবিষ্মানসদিৎস সুবিতায় প্রযস্বান্ ।। (ঋগ্বেদ-৭/৮৫/৪)।
অর্থাৎ :
যজ্ঞভাগগ্রাহী দেবতারা যখন এ অগ্নিকে আর অদিতি-পুত্র সূর্যকে আকাশে স্থাপন করলেন, যখন তাঁরা উভয়ে যুগ্মরূপী হয়ে বিচরণ করতে লাগলেন তখন সকল প্রাণিবর্গ তাঁদের দেখতে পেল। (ঋক-১০/৮৮/১১)।।  আমরা যে বিস্তীর্ণ সুখ যাচ্ঞা করি, সবিতা, ভগ, মিত্র, বরুণ ও অর্যমা (এই আদিত্যগণ) আমাদের সে সুখ প্রদান করুন। (ঋগ্বেদ-৮/১৮/৩)।।  হে আদিত্যদ্বয় (ইন্দ্র ও বরুণ) ! তোমরা বলশালী, যে নমস্কারযুক্ত হয়ে তোমাদের পরিচর্যা করে, সে শোভনকর্মবিশিষ্ট হোতা ঋতজ্ঞ হোন। যে হব্যযুক্ত ব্যক্তি তৃপ্তির জন্য তোমাদের আবর্তিত করে, সে অন্নবান হয়ে একান্ত প্রাপ্তব্য ফল লাভ করে। (ঋক-৭/৮৫/৪)।।


পরবর্তীকালে যদিও আদিত্য বলতে প্রধানতই সূর্য; কিন্তু ঋগ্বেদে আদিত্য মানে অদিতির পুত্র। মিত্র ও বরুণের মতো প্রাচীন এবং ইন্দ্রের মতো প্রধান বৈদিক দেবতাও তাঁরই পুত্র হিসেবে কল্পিত হয়েছেন দেখে অনুমান হয় এই অদিতি কোনো সুপ্রাচীন পর্যায়ের প্রধানা দেবী ছিলেন, যদিও ঋগ্বেদ রচনার কালে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও গরিমা বহুলাংশে ম্লান হয়েছে দেখা যায়।
এখানে উল্লেখ্য, ব্যুৎপত্তিগতভাবে অদিতির অর্থ হলো, যা অখণ্ড, অচ্ছিন্ন, অসীম, তাই অদিতি। অতএব অদিতি অর্থে অনন্ত আকাশ বা অনন্ত প্রকৃতি, সুতরাং অদিতি সকল দেবের জনয়িত্রী এবং নিরুক্তকার যাস্ক তাঁকে ‘আদিমা দেবমাতা’ বলেছেন। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে তাঁর উল্লেখ খুব একটা চোখে পড়ে না; পুত্র আদিত্যগণের সঙ্গেই তিনি প্রধানত উল্লিখিত হয়েছেন এবং এই উল্লেখের মধ্যে তাঁর মাতৃত্বই প্রধানতম বৈশিষ্ট্য বলে অনুমিত হয়– যেমন তিনি মিত্র ও বরুণের জননী, এবং অর্যমারও জননী, রাজাদের জননী, অভিলষিত পুত্রদের জননী, বীর পুত্রদের জননী, ইত্যাদি ইত্যাদি–

তা মাতা বিশ্ববেদসাসূর্যায় প্রমহসা। মহী জজনাদিতির্ঋৃতাবরী।। (ঋগ্বেদ-৮/২৫/৩)।
অদিতির্ন উরুষাত্বদিতিঃ শর্ম যচ্ছতু।
মাতা মিত্রস্য রেবতোহর্যমণো বরুণস্য চানেহসো ব ঊতয়ঃ সুঊতয়ো ব ঊতয়ঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/৪৭/৯)।
পিপর্তু অদিতী রাজপুত্রাতি দ্বেষাংস্যর্যমা সুগেভিঃ।
বৃহন্মিত্রস্য বরুণস্য শর্মোপ স্যাম পুরুবীরা অরিষ্টাঃ।। (ঋগ্বেদ-২/২৭/৭)।
আ যাহ্যগ্নে সমিধানো অর্বাঙিন্দ্রেণ দেবৈঃ সরথং তুরেভিঃ।
বর্হি র্ন আস্তামদিতিঃ সুপুত্রা স্বাহা দেবা অমৃতা মাদয়স্তাম্ ।। (ঋগ্বেদ-৩/৪/১১)।
যুবোর্হি মাতাদিতির্বিচেতসা দ্যৌর্ন ভূমিঃ পয়সা পুপূতনি।
অব প্রিয়া দিদিষ্টন সূরো নিনিক্ত রশ্মিভিঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৩২/৬)।
অর্থাৎ :
মহতী সত্যবতী অদিতি, সর্বধনবিশিষ্ট ও তেজস্বী, সে মিত্র ও বরুণকে অসূর্য তেজের জন্য উৎপাদন করেছেন। (ঋক-৮/২৫/৩)।।  অদিতি আমাদের রক্ষা করুন, অদিতি আমাদের সুখ প্রদান করুন। তিনি ধনবান, মিত্র, বরুণ ও অর্যমার মাতা। তোমরা রক্ষা করলে উপদ্রব থাকে না, তোমাদের রক্ষাই সুরক্ষা। (ঋক-৮/৪৭/৯)।।  রাজমাতা অদিতি শত্রুগণকে অতিক্রম করে আমাদের অন্য দেশে নিয়ে যান, অর্যমা সুগমপথে আমাদের নিয়ে যান। আমরা বহুবীরবিশিষ্ট এবং হিংসারহিত হয়ে মিত্র ও বরুণের সুখ লাভ করব। (ঋক-২/২৭/৭)।।  হে অগ্নি ! তুমি দীপ্তিযুক্ত হয়ে ইন্দ্র ও ত্বরান্বিত দেবগণের সাথে একরথে আমাদের অভিমুখে এস। সুপুত্রবিশিষ্টা অদিতি আমাদের কুশে উপবেশন করুন। নিত্য দেবগণ অগ্নিরূপ স্বাহাকারযুক্ত হয়ে তৃপ্তিলাভ করুন। (ঋক-৩/৪/১১)।।  হে বিশিষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন মিত্র ও বরুণ ! অদিতিই তোমাদের মাতা, দ্যুলোক ও ভূলোককে জলের দ্বারা পরিষ্কার কর, এ নিম্নলোকে উত্তম উত্তম সামগ্রী দাও, সূর্যকিরণদ্বারা সমস্ত ভুবন পবিত্র কর। (ঋক-১০/১৩২/৬)।।


আদিত্যদের মধ্যে বৈদিক দেবতা হিসেবে মিত্র, বরুণ প্রমুখের প্রাধান্য সুস্পষ্ট। ইতঃপূর্বেই মিত্র দেবতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বরুণ দেবতাকে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবেই আলোচনা করা যাবে। অপেক্ষাকৃত গৌণ কিন্তু বেশ চিত্তাকর্ষক অন্য আদিত্যদের পরিচয় দেখা যাক।
অর্যমা মানে বন্ধু, সখা; এবং এই সখ্যভাবই দেবতাটির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। আর আদিত্যদের মধ্যে আরও চিত্তাকর্ষক দেবতা বলতে অবশ্যই ভগ এবং অংশ। ইতঃপূর্বেই দেখেছি, এগুলির পিছনে সুপ্রাচীন সমবণ্টন-প্রথার স্মৃতি খুঁজে পাওয়া যায় এই দুটি দেবতার কল্পনার পিছনে। এবং বৈদিক কবিদের পার্থিব সম্পদ-কামনা যে কতো তীব্র সে-বিষয়ে গুটিকয় নজির উদ্ধৃত করা যেতে পারে। যেমন–

ভগ প্রণেতর্ভগ সত্যরাধো ভগেমাং ধিয়মুদবা দদন্নঃ।
ভগ প্র ষো জনয় গোভিরশ্বৈর্ভগ প্র নৃভির্নৃবন্তঃ স্যাম।। (ঋগ্বেদ-৭/৪১/৩)।
উতেদানীং ভগবন্তঃ স্যামোত প্রপিত্ব উত মধ্যে অহ্নাম্ ।
উতোদিতা মঘবন্ত্সূর্যস্য বয়ং দেবানাং সুমতৌ স্যাম।। (ঋগ্বেদ-৭/৪১/৪)।
ভগ এব ভগবা অস্তু দেবাস্তেন বয়ং ভগবন্তঃ স্যাম।
তং ত্বা ভগ সর্ব ইজ্জোহবীতি স নো ভগ পুরএতা ভবেহ।। (ঋগ্বেদ-৭/৪১/৫)।
প্রাতর্জিতং ভগমুগ্রং হুবেম বয়ং পুত্রমদিতের্ষো বিধর্তা।
আধ্রশ্চিদ্যং মন্যমানস্তুরশ্চিদ্রাজা চিদ্যং ভগং ভক্ষীত্যাহ।। (ঋগ্বেদ-৭/৪১/২)।
অর্থাৎ :
হে ভগ ! তুমি প্রকৃষ্ট নেতা। হে ভগ ! তুমি সত্যধন। তুমি আমাদের অভিলষিত বস্তু প্রদান করে আমাদের স্তুতি সফল কর। হে ভগ ! তুমি আমাদের গো ও অশ্বদ্বারা প্রবৃদ্ধ কর। হে ভগ ! আমরা নেতাগণদ্বারা মনুষ্যবান হব। (ঋক-৭/৪১/৩)।।  আরও আমরা যেন ইদানিং ভগবান হতে পারি, দিবসের প্রারম্ভে ও মধ্যেও যেন ভগবান হতে পারি। আরও হে মঘবন ! সূর্যের উদয়ে আমরা যেন ইন্দ্রাদির অনুগ্রহ লাভ করতে পারি। (ঋক-৭/৪১/৪)।।  হে দেবগণ ! ভগবান হোন। আমরা ভগের অনুগ্রহেই ভগবান হব। হে ভগ ! সকলেই তোমায় বার বার আহ্বান করেন। হে ভগ ! তুমি এ যজ্ঞে আমাদের অগ্রগামী হও। (ঋক-৭/৪১/৫)।।  যিনি জগতের ধারক, জয়শীল উগ্র অদিতির পুত্র সে ভগ-দেবতাকে প্রাতকালেই আহ্বান করব। দরিদ্র স্তোতা এবং ধনশালী রাজা উভয়েই ভগদেবকে স্তুতি করে, ‘আমায় ভজনীয় ধন দাও’ বলে যাচ্ঞা করে। (ঋক-৭/৪১/২)।।


এখানে ভগবান শব্দের ব্যবহার অবশ্যই লক্ষণীয় যে, ঋগ্বেদে ভগ মানে ধন বা ধনের অংশ; এবং ভগবান মানে ধনবান বা অংশবান, কোনভাবেই ঈশ্বর জাতীয় কিছু নয়।

.
দেবতা অশ্বিদ্বয় :

ঋগ্বেদে দুটি যমজ (ঋগ্বেদ-৩/৩৯/৩) ও নিত্যসহচর (ঋগ্বেদ-৫/৭৮/১-২) দেবতা অশ্বিদ্বয় দেববৈদ্য (ঋগ্বেদ-৮/১৮/৮) রূপেই পরিকল্পিত। যেমন–

যমা চিদত্র ষমসূরসূত জিহ্বায়া অগ্রং পতদা হ্যস্থাৎ।
বপুংষি জাতা মিথুনা সচেতে তমোহনা তপুষো বুধ্ন এতা।। (ঋগ্বেদ-৩/৩৯/৩)।
অশ্বিনাবেহ গচ্ছতং নাসত্যা মা বি বেনতম্ । হংসাবিব পততমা সুতা উপ।। (ঋগ্বেদ-৫/৭৮/১)।
অশ্বিনা হরিণাবিব গৌরারিবানু যবসম্ । হংসাবিব পততমা সুতা উপ।। (ঋগ্বেদ-৫/৭৮/২)।
হারিদ্রবেব পতথো বনেদুপ সোমং সুতং মহিষেবাব গচ্ছথঃ।
সজোষসা ঊষসা সূর্যেণ চ ত্রির্বর্তির্যাতমশ্বিনা।। (ঋগ্বেদ-৮/৩৫/৭)।
উত ত্যা দৈব্যা ভিষজা শং নঃ করতো অশ্বিনা। যুযুযাতামিতো রপো অপ স্রিধঃ।। (ঋগ্বেদ-৮/১৮/৮)।
অর্থাৎ :
যমক পুত্রের মাতা যমক পুত্রদ্বয় অশ্বিদ্বয়কে প্রস্রব করল, তাদের প্রশংসা করবার জন্য আমার জিহ্বার অগ্রভাগ চঞ্চল হয়েছে। অন্ধকারনাশক দিবসের আদিতে আগত মিথুন জন্মিবামাত্র স্তোত্রে মিলিত হচ্ছে। (ঋক-৩/৩৯/৩)।।  হে অশ্বিদয় ! তোমরা এ যজ্ঞে এস। হে নাসত্যদ্বয় ! তোমরা স্পৃহাশূন্য হয়ো না, হংসদ্বয়ের ন্যায় তোমরা অভিষুত সোমরসের উপর অবতরণ কর। (ঋক-৫/৭৮/১)।।  হে অশ্বিদ্বয় ! হরিণদ্বয় ও গৌরমৃগদ্বয় যেরূপ ঘাসের উপর পতিত হয়, সেরূপ তোমরা হংসদ্বয়ের ন্যায় অভিষুত সোমরসের উপর অবতরণ কর। (ঋক-৫/৭৮/২)।।  যেমন হারিদ্রব পক্ষিদ্বয় বনে পতিত হয়, হে অশ্বিদ্বয় ! সেরূপ তোমরা অভিষুত সোমাভিমুখে পতিত হও। মহিষদ্বয়ের ন্যায় তা অবগত হও, ঊষা ও সূর্যের সাথে মিলিত হয়ে ত্রিমার্গে গমন কর। (ঋক-৮/৩৫/৭)।।  প্রসিদ্ধ দেবচিকিৎসক অশ্বিদ্বয় আমাদের সুখ বিধান করুন, আমাদের পাপ হতে পৃথক করুন এবং শত্রুগণকে দূরীভূত করুন। (ঋক-৮/১৮/৮)।।


অশ্বিদ্বয়ের স্তুতির মূল উপাদানও পার্থিব সম্পদের কামনাই। যেহেতু এই যমজ দেবতাদ্বয় দেববৈদ্য রূপে কল্পিত, তাই তাঁদের কাছে রোগ-নিরাময়, জরা-অপসারণ ও যৌবনলাভ প্রভৃতির কামনা প্রকাশ করাই স্বাভাবিক। ফলে দেখা যায়, অশ্বিদ্বয় আতুরের চিকিৎসা করেন (ঋগ্বেদ-৮/২২/১০), অন্ধকে দৃষ্টিদান করেন (ঋগ্বেদ-১/১১৬/১৬), মৃত্যুকে দূরে রাখেন (অথর্ববেদ-৭/৫৩/১), প্রসব-রহিত গাভীকে দুগ্ধবতী করেন (ঋগ্বেদ-১/১১২/৩), ইত্যাদি (ঋগ্বেদ-১০/৩৯/৩-৪)। যেমন–

যাভিঃ পক্থমবথো যাভিরধ্রিগুং যাভির্বভ্রুং বিজোষসম্ ।
তাভির্নো মক্ষু তুয়মশ্বিনা গতং ভিষজ্যতং যদাতুরম্ ।। (ঋগ্বেদ-৮/২২/১০)।
শতং মেষাদ্বৃক্যে চক্ষদানমৃজ্রাশ্বং তং পিতান্ধং চকার।
তস্মা অক্ষী নাসত্যা বিচক্ষ আধত্তং দস্রা ভিষজাবনর্বনূ।। (ঋগ্বেদ-১/১১৬/১৬)।
যুবং তাসাং দিব্যস্য প্রশাসনে বিশাং ক্ষয়থো অমৃতস্য মক্সমনা।
যাভির্ধেনুমস্বং পিন্বথো নরা তাভিরূ ষু ঊতিভিরশ্বিনা গতম্ ।। (ঋগ্বেদ-১/১১২/৩)।
অমাজুরশ্চিদ্ভবথো যুবং ভবোহনাশোশ্চিদবিতারাপমস্য চিৎ।
অন্ধস্য চিন্নাসত্যা কৃশস্য চিদ্যুবামিদাহুর্ভিষজা রুতস্য চিৎ।। (ঋগ্বেদ-১০/৩৯/৩)।
যুবং চ্যবানং সনয়ং যথা রথং পুনর্যুবানং চরথায় তক্ষথুঃ।
নিষ্টৌগ্রমূহথুরদ্ভ্যস্পরি বিশ্বেত্তা বাং সবনেষু প্রবাচ্যা।। (ঋগ্বেদ-১০/৩৯/৪)।
কুহ স্বিদ্দোষা কুহ বস্তোরশ্বিনা কুহাভিপিত্বং করতঃ কুহোষতুঃ।
কো বাং শযুত্রা বিধবেব দেবরং মর্যং ন যোষা কৃণুতে সধস্থ আ।। (ঋগ্বেদ-১০/৪০/২)।
অর্থাৎ :
হে অশ্বিদ্বয় ! যা দিয়ে পকথকে রক্ষা করেছিলে, যা দিয়ে অধ্রিগুকে রক্ষা করেছিলে, যা দিয়ে বভ্রু রাজাকে সোমপানে প্রীত করেছিলে, সে সমস্ত রক্ষার সাথে শীঘ্র ও সত্বর আমাদের নিকট এস। আর আতুরের চিকিৎসা কর। (ঋক-৮/২২/১০)।।  যে ঋজ্রাশ্ব বৃকীকে শত মেষ খণ্ড খণ্ড করে দিয়েছিলেন, তাকে তার পিতা দৃষ্টিহীন করেছিল; হে ভিষজ দস্র নাসত্যদ্বয় ! তার চক্ষুদ্বয় দর্শনে অসমর্থ হয়েছিল, তোমরা তার সে চক্ষুদ্বয় দর্শনসমর্থ করেছিলে। (ঋক-১/১১৬/১৬)।।  হে নেতৃদ্বয় ! তোমরা স্বর্গীয় অমৃতলব্ধ বলদ্বারা সে ত্রিভুবননিবাসী সকল লোককে শাসন করতে সমর্থ। যে সকল উপায় দ্বারা তোমরা প্রসব রহিত গাভীকে দুগ্ধবতী করেছিলে, হে অশ্বিদ্বয় ! সে সকল উপায়ের সাথে এস। (ঋক-১/১১২/৩)।।  পিতৃভবনে একটি স্ত্রীলোক বৃদ্ধাবস্থা প্রাপ্ত হচ্ছিল, তোমরা তার সৌভাগ্যস্বরূপ তার বর এনে দিলে। যার চলৎশক্তি নেই অথবা যে অতি নীচ, তোমরা তারও আশ্রয়স্বরূপ, তোমাদেরই অন্ধের ও দুর্বলের ও রোগের জ্বালায় রোরুদ্যমান ব্যক্তির চিকিৎসক বলে লোকে উল্লেখ করে। (ঋক-১০/৩৯/৩)।।  যেমন পুরাতন রথকে কেউ নূতন করে নির্মাণপূর্বক তা দিয়ে গতিবিধি করে, সেরূপ তোমরা জরাজীর্ণ চ্যবন ঋষিকে পুনর্বার যুবা বরে দিয়েছিলে। তোমরাই তুগ্রপুত্রকে জলে উপর নিরুপদ্রবে বহন করে তীরে উত্তীর্ণ করে দিয়েছিলে। যজ্ঞের সময় তোমাদের দুজনের সে সমস্ত কার্য বিশেষরূপে বর্ণনা করবার যোগ্য। (ঋক-১০/৩৯/৪)।।  হে অশ্বিদ্বয় ! তোমরা দিবাভাগে, কি রাত্রিকালে কোথায় গতিবিধি কর? কোথায় বা কালযাপন কর? যেরূপ বিধবা রমণী শয়নকালে দেবরকে সমাদর করে, অথবা কামিনী নিজ কান্তকে সমাদর করে, যজ্ঞস্থলে সেরূপ সমাদরের সাথে কে তোমাদের আহ্বান করে? (ঋক-১০/৪০/২)।।


পার্থিব কামনার আতিশয্যে দেববৈদ্য হিসেবে অশ্বিদ্বয়ের স্তুতিতে প্রচুর পৌরাণিক কল্পনার সমাবেশ ঘটলেও একটি অর্বাচীন কিন্তু আকর্ষণীয় ঋকে (ঋক-১০/৪০/২) বিধবা রমণী কর্তৃক শয়নকালে দেবরকে সমাদর করার নজির থেকে বৈদিক যুগের কোন এক পর্যায়ে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্বামীর ভ্রাতা বা দেবরকে বিবাহ করবার প্রচলিত প্রথাই এ ঋকে পরিলক্ষিত হয়।

.
দ্যুলোকের অন্যান্য দেবতারা :

দ্যুলোকের অন্যান্য গৌণ দেবতাদের মধ্যে রয়েছে ঊষা, রাত্রি, বিবস্বান্, ও যমও। ইতঃপূর্বে ঊষা ও রাত্রির কথা পূর্বতন অধ্যায়ে (সিন্ধু-সভ্যতা অধ্যায়ের বৈদিক-সাহিত্যের দেবীস্তুতি দ্রষ্টব্য) আলোচিত হয়েছে। রাত্রি একান্তই গৌণ দেবী। আর উষা প্রসঙ্গে আমরা দেখেছি যে অন্তত ঋগ্বেদের স্থান-বিশেষে ঊষার উপর ইন্দ্রের আক্রমণ-কাহিনী থেকে অনুমান হয়, এই ঊষা ছিলেন সিন্ধু-সভ্যতার পূজনীয়া প্রাচীন মাতৃদেবী। বিবস্বান্ বহু দৃষ্টান্তে মানবজাতির আদি-জনক বলে কল্পিত, কিন্তু বৈদিক দেবতা হিসেবে তাঁর গৌরব অবশ্যই গৌণ।

.
যম দেবতা :

যম সম্বন্ধে ঋগ্বেদে মাত্র দুটি সূক্ত রয়েছে। দুটিই অতি অর্বাচীন দশম মণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত। প্রথমটি (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১০/১০) যম ও যমীর কথোপকথন। যম ও যমী’র সম্বন্ধ ভ্রাতা ও ভগিনী। এখানে যমী যমের সাথে সহবাস কামনা করেছেন। কিন্তু যম প্রত্যাখ্যান করছেন এই বলে যে, সহোদরা ভগিনী অগম্যা, ভগিনীতে যে উপগত হয় সে পাপী। বৈদিক যুগের পূর্বাপর সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনার গুরুত্ব বিবেচনায় বৈদিক কবি-কল্পনাপ্রসূত এই আকর্ষণীয় সূক্তটি উদ্ধৃতিযোগ্য বলে মনে হয়। ত্রিষ্টুপ্ ছন্দে রচিত এই সূক্তের (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১০/১০) দেবতা হলেন যম ও যমী এবং ঋষি বা কবি হিসেবে তাঁরাই উল্লিখিত–

ও চিৎসখায়ং সখ্যা ববৃত্যাং তিরঃ পুরূ চিদর্ণবং জগন্বান্ ।
পিতুর্নপাতমা দধীত বেধা অধি ক্ষমি প্রতরং দীধ্যানঃ।। ১।
ন তে সখা সখ্যং বষ্ট্যেতৎসলক্ষ্মা যদ্বিষুরূপা ভবাতি।
মহস্পুত্রাসো অসুরস্য বীরা দিবো ধর্তার উর্বিয়া পরি খ্যন্ ।। ২।
উশন্তি ঘা তে অমৃতাস এতদেকস্য চিত্ত্যজসং মর্তস্য।
নি তে মনো মনসি ধায্যস্মে জন্যুঃ পিতস্তন্ব মা বিবিশ্যাঃ।। ৩।
ন যৎপুরা চকৃমা বদ্ধ নূনমৃতা বদন্তো অনৃতং রপেম।
গন্ধর্বো অপ্স্বপ্যা চ যোষা সা নো নাভিঃ পরমং জামি তন্নৌ।। ৪।
গর্ভে নু নৌ জনিতা দম্পতী কর্দেবস্ত্বষ্টা সবিতা বিশ্বরূপঃ।
নকিরস্য প্র মিনন্তি ব্রতানি বেদ নাবস্য পৃথিবী উত দ্যৌঃ।। ৫।
কোন অস্য বেদ প্রথমস্যাহ্নঃ ক ঈং দদর্শ ক ইহ প্র বোচৎ।
বৃহন্মিত্রস্য বরুণস্য ধাম কদ্ ব্রব আহনো বীচ্যা নৃন্ ।। ৬।
যমস্য মা যম্যং কাম আগন্ত্সমানে যোন্নৌ সহশেয্যায়।
জায়েব পত্যে তন্বং রিরিচ্যাং বি চিদ্বৃহেব রথ্যেব চক্রা।। ৭।
ন তিষ্ঠন্তি ন নি মিষন্ত্যেতে দেবানাং স্পশ ইহ যে চরন্তি।
অন্যেন মদাহনো যাহি তূয়ং তে বি বৃহ রথ্যেব চক্রা।। ৮।
রাত্রীভিরস্মা অহভির্দশস্যেৎ সূর্যস্য চক্ষুর্মুহুন্মিমীয়াৎ।
দিবা পৃথিব্যা মিথুনা সবন্ধূ যমীর্যমস্য বিতৃয়াদজামি।। ৯।
আ ঘা তা গচ্ছানুত্তরা যুগানি যত্র জাময়ঃ কৃণবন্নজামি।
উপ বর্বৃহি বৃষভায় বাহুমন্যমিচ্ছস্ব সুভগে পতিং মৎ।। ১০।
কিং ভ্রাতাসদ্যদনাথং ভবাতি কিমু স্বসা যন্নির্ঋৃতির্নিগচ্ছাৎ।
কামমূতা বহ্বে তদ্রপামি তন্বা মে তন্বং সং পিপৃগ্ধি।। ১১।
ন বা উ তে তন্বা তন্বং সং পপৃচ্যাং পাপামহুর্যঃ স্বসারং নিগচ্ছাৎ।
অন্যেন মৎপ্রমুদঃ কল্পয়স্ব ন তে ভ্রাতা সুভগে বষ্ট্যেতৎ।। ১২।
বতো বতাসি যম নৈব তে মনো হৃদয়ং চাবিদাম।
অন্যা কিল ত্বাং কক্ষ্যেব যুক্তং পরি ষ্বজাতে লিবুজেব বৃক্ষম্ ।। ১৩।
অন্যমূ ষু ত্বং যম্যন্য উ ত্বাং পরি ষ্বজাতে লিবুজেব বৃক্ষম্ ।
তস্য বা ত্বং মন ইচ্ছা স বা তবাধা কৃণুষ্ব সংবিদং সুভদ্রাম্ ।। ১৪।
অর্থাৎ :
[যমী ও যম যমজ ভ্রাতৃভগিনী, তন্মধ্যে যমী যমকে বলছেন]– বিস্তীর্ণ সমুদ্রমধ্যবর্তী এ দ্বীপে এসে এ নির্জন প্রদেশে তোমার সহবাসের জন্য আমি অভিলাষিণী, কারণ গর্ভাবস্থা অবধি তুমি আমার সহচর। বিধাতা মনে মনে চিন্তা করে রেখেছেন, যে তোমার ঔরসে আমার গর্ভে আমাদের পিতার এক সুন্দরনপ্তা (নাতি) জন্মিবে। ১।।  [যমের উত্তর]– তোমার গর্ভসহচর তোমার সাথে এ প্রকার সম্পর্ক কামনা করেন না। যেহেতু তুমি সহোদরা ভগিনী অগম্যা। আর এস্থান নির্জন নহে, যেহেতু সে মহান অসুরের স্বর্গধারণকারী বীরপুত্রগণ পৃথিবীর সর্বভাগ দেখছেন। ২।।  [যমীর উক্তি]– যদিচ কেবল মনুষ্যের পক্ষে এপ্রকার সংসর্গ নিষিদ্ধ তথাপি দেবতারা এরূপ সংসর্গ ইচ্ছাপূর্বক করে থাকেন। অতএব আমার যেরূপ ইচ্ছা হচ্ছে, তুমিও তদ্রূপ ইচ্ছা কর। তুমি পুত্রজন্মদাতা পতির ন্যায় আমার শরীরে প্রবেশ কর। ৩।।  [যমের উত্তর]– এ কার্য পূর্বে কখন আমরা করিনি। আমরা সত্যবাদী, কখন মিথ্যা বলিনি। গন্ধর্ব আমাদের পিতা, আর আপ্যা ঘোষা আমাদের উভয়ের মাতা; সুতরাং আমাদের উভয়ের অতি নিকট সম্পর্ক। ৪।।  [যমীর উক্তি]– নির্মাণকর্তা ও প্রসবিতা ও বিশ্বরূপ দেবত্বষ্টা, আমাদের গর্ভাবস্থাতেই বিবাহিত স্ত্রীপুরুষবৎ করেছেন। তাঁর অভিপ্রায় অন্যথা করতে কারও সাধ্য নাই। আমাদের এ সম্পর্ক পৃথিবী ও আকাশ উভয়েই জানেন। ৫।।  [যমের উক্তি]– এই প্রথম দিন কে জানে? কে বা দেখেছে? কেই বা প্রকাশ করেছে? মিত্র ও বরুণের আবাসভূত এ বিশ্বজগৎ অতি প্রকাণ্ড। অতএব হে আহন ! তুমি নরদের এর কি বল? ৬।।  [যমীর উক্তি]– তুমি যম, আমি যমী, তুমি আমার প্রতি অভিলাষযুক্ত হও, এস একস্থানে উভয়ে শয়ন করি। পত্নী যেমন পতির নিকট তদ্রূপ আমি তোমার নিকট নিজ দেহ সমর্পণ করে দিই। রথ ধারণকারী চক্রদ্বয়ের ন্যায় এস আমরা এক কার্যে প্রবৃত্ত হই। ৭।।  [যমের উক্তি]– এ যে সকল দেবতাদের গুপ্তচর, এদের সর্বত্র গতিবিধি, এরা চক্ষুঃ নির্মীলন করে না। হে ব্যথাদায়িনি যাও, শীঘ্র অন্যের নিকট গমন কর, রথধারণকারী চক্রদ্বয়ের ন্যায় তার সাথে এক কার্য কর। ৮।।  [যমীর উক্তি]– কি দিবসে, কি রাত্রিতে, যজ্ঞের ভাগ যেন যমকে দান করা হয়, সূর্যের তেজ যেন পর পর আবির্ভূত হয়। দ্যুলোক ও ভূলোক স্ত্রীপুরুষবৎ সম্বন্ধ। যমী গিয়ে ভ্রাতা যমের আশ্রয় গ্রহণ করুক। ৯।।  [যমের উক্তি]– ভবিষ্যতে এমন যুগ হবে যখন ভ্রাতা ভগ্নীর সাথে সহবাস করবে। হে সুন্দরি ! এক্ষণে আমা ভিন্ন অন্য পুরুষকে পতিত্বে বরণ কর। তিনি যখন তোমাকে গ্রহণ করবেন তখন তাঁকে বাহুদ্বারা আলিঙ্গন কর। ১০।।  [যমীর উক্তি]– সে কিসের ভ্রাতা, যদি সে থাকতেও ভগিনী অন্যথা হয়? সে কিসের ভগিনী, যদি সেই ভগিনী সত্ত্বেও ভ্রাতার দুঃখ দূর না হয়? আমি অভিলাষে মূর্ছিতা হয়ে এত করে বলছি, তোমার শরীরে আমার শরীর মিলিয়ে দাও। ১১।।  [যমের উক্তি]– তোমার শরীরের সাথে আমার শরীর মিলাতে ইচ্ছা নেই। ভগিনীতে যে ব্যক্তি উপগত হয়, তাকে পাপী বলে। আমি ভিন্ন অন্য পুরুষের সাথে সুখ-সম্ভোগের চেষ্টা দেখ। হে সুন্দরি ! তোমার ভ্রাতার এরূপ অভিলাষ নেই। ১২।।  [যমীর উক্তি]– হায় ! যম ! তুমি নিতান্ত দুর্বল পুরুষ দেখছি ! এ তোমার কি প্রকার মন, কি প্রকার অন্তঃকরণ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। রজ্জু যেরূপ ঘোটককে বেষ্টন করে কিংবা যেরূপ লতা বৃক্ষকে আলিঙ্গন করে, সেরূপ অন্য নারী অনায়াসেই তোমাকে আলিঙ্গন করে, অথচ তুমি আমার প্রতি বিমুখ। ১৩।।  [যমের উত্তর]– হে যমি ! তুমিও অন্য পুরুষকে আলিঙ্গন কর। যেরূপ লতা বৃক্ষকে, তদ্রূপ অন্য পুরুষই তোমাকে আলিঙ্গন করুক। তারই মন তুমি হরণ কর, সেও তোমার মন হরণ করুক। তারই সহবাসের ব্যবস্থা স্থির কর, তাতেই মঙ্গল হবে। ১৪।।


সূক্তটি বৈদিক কবির অপূর্ব কাব্যসৃষ্টি নিঃসন্দেহে। তবে অপর সূক্তটিতে (ঋগ্বেদ-সূক্ত-১০/১৪) যম সম্বন্ধে কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। যম পিতৃলোকের রাজা, তা স্বর্গে অবস্থিত। প্রেতাত্মাদের যমই পথ দেখিয়ে যেখানে নিয়ে যান, সে স্থান আলোকোজ্জ্বল। পিতৃলোকের দ্বারের পাহারা দিচ্ছে দুটি কুকুর। তাদের বর্ণ বিচিত্র এবং চারটি করে চক্ষু। যেমন–

পরেয়িবাংসং প্রবতো মহীরনু বহুভ্যঃ পন্থামনুপস্পশানম্ ।
বৈবস্বতং সঙ্গমনং জনানাং যমং রাজানং হবিষা দুবস্য।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/১)।
যমো নো গাতুং প্রথমো বিবেদ নৈষা গব্যুতিরপভর্তবা উ।
যত্রা নঃ পূর্বে পিতরঃ পরেয়ুরেনা জজ্ঞানাঃ পথ্যা অনু স্বাঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/২)।
সং গচ্ছস্ব পিতৃভিঃ সং যমেনেষ্টাপূর্তেন পরমে ব্যোমন্ ।
হিত্বায়াবদ্যং পুনরস্তমেহি সং গচ্ছস্ব তন্বা সুবর্চাঃ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/৮)।
অপেত বীত বি চ সর্পতাতোহস্মা এতং পিতরো লোকমক্রন্ ।
অহোভিরদ্ভিরক্তুভির্ব্যক্তং যমো দদাত্যবসানমস্মৈ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪
অপেত বীত বি চ সর্পতাতোহস্মা এতং পিতরো লোকমক্রন্ ।
অহোভিরদ্ভিরক্তুভির্ব্যক্তং যমো দদাত্যবসানমস্মৈ।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/৯)।
অতি দ্রব সারমেয়ৌ শ্বানৌ চতুরক্ষৌ শবলৌ সাধুনা পথা।
অথা পিতৃন্ত্সুবিদত্রা উপেহি যমেন যে সাধমাদং মদন্তি।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/১০)।
যৌ তে শ্বানৌ যম রক্ষিতারৌ চতুরক্ষৌ পথিরক্ষৌ নৃচক্ষসৌ।
তাভ্যামেনং পরি দেহি রাজন্ত্স্বস্তি চাস্মা অনমীবং চ ধেহি।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/১১)।
অর্থাৎ :
হে অন্তঃকরণ ! তুমি বিবস্বানের পুত্র যমকে হোমের দ্রব্য দিয়ে সেবা কর। তিনি সৎকর্মান্বিত ব্যক্তিদের সুখের দেশে নিয়ে যান, তিনি অনেকের পথ পরিষ্কার করে দেন, তাঁর নিকটই সকল লোকে গমন করে। (ঋক-১০/১৪/১)।।  আমরা কোন পথে যাব, তা যমই প্রথমে দেখিয়ে দেন। সে পথ আর বিনষ্ট হবে না। যে পথে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা গিয়েছেন, সকল জীবই নিজ নিজ কর্ম অনুসারে সে পথে যাবেন। (ঋক-১০/১৪/২)।।  [যজ্ঞকর্তাব্যক্তির মৃত্যু হলে তাকে সম্বোধন করে উক্তি]– সেই চমৎকার স্বর্গধামে পিতৃলোকদের সঙ্গে মিলিত হও, যমের সঙ্গে ও তোমার ধর্মানুষ্ঠানের ফলের সাথে মিলিত হও। পাপ পরিত্যাগপূর্বক অস্ত নামক গৃহে প্রবেশ কর এবং উজ্জ্বল দেহ গ্রহণ কর। (ঋক-১০/১৪/৮)।।  [শ্মশানে দাহকালে উক্তি]– হে ভূতপ্রেতগণ ! দূর হও, চলে যাও সরে যাও, সরে যাও, পিতৃলোকেরা তাঁর জন্য এ স্থান প্রস্তুত করেছেন। এ স্থান দিবাদ্বারা, জলদ্বারা ও আলোকদ্বারা শোভিত, যম এ স্থান মৃতব্যক্তিকে দিয়ে থাকেন। (ঋক-১০/১৪/৯)।।  [যমদ্বারবর্তী দুই কুক্কুরের বিষয়ে উক্তি]– হে মৃত ! এ যে দুই কুক্কুর, যাদের চার চার চক্ষু ও বর্ণ বিচিত্র এদের নিকট দিয়ে শীঘ্র চলে যাও। তারপরে যে সকল সুবিজ্ঞ পিতৃলোক যমের সাথে সর্বদা আমোদ আহ্লাদে কালক্ষেপ করেন, তুমি উত্তম পথ দিয়ে তাদের নিকট গমন কর। (ঋক-১০/১৪/১০)।।  হে যম ! তোমার প্রহরীস্বরূপ যে দুই কুক্কুর আছে যাদের চার চার চক্ষু, যারা পথ রক্ষা করে এবং যাদের দৃষ্টিপথে সকল মনুষ্যকেই পতিত হতে হয় তাদের কোপ হতে এ মৃতব্যক্তিকে রক্ষা কর। হে রাজন ! একে কল্যাণভাগী ও নিরোগী কর। (ঋক-১০/১৪/১১)।।


ঋগ্বেদের এই যম পরবর্তীকালের পৌরাণিক যম নয়, কারণ ঋগ্বেদের যম পরকালের সুখের বিধাতা। যদিও যমের প্রহরী কুকুর মনুষ্যের ভয়ের পদার্থ, তবু পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষগণ স্বর্গলোকে যমের সাথে আমোদ আহ্লাদে বাস করেন এবং দেবগণের সঙ্গে যজ্ঞের ভাগী এরূপ বিশ্বাস ঋগ্বেদের অর্বাচীন অংশ রচনাকালে প্রচলিত ছিলো বলেই ধারণা করা যায়।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : বৈদিক দেবতা] [*] [পরের পর্ব : অন্তরীক্ষ বা আকাশের দেবতা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 188,604 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: