h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৮ : ঋগ্বেদের সমাজ|

Posted on: 05/07/2015


1908473_744382928977158_9020559613900978247_n

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৮ : ঋগ্বেদের সমাজ |
রণদীপম বসু

৩.১ : ঋগ্বেদের সমাজ

যে-কোনো সমাজ-সংগঠনের পরিপ্রেক্ষিতেই সেই সমাজের চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, সভ্যতার বিবর্তন ধারায় সব দেশে সব মানুষের উন্নতি সমান তালে ঘটেনি। আধুনিক সভ্য মানুষের পূর্বপুরুষেরা বহু যুগ আগে যে-অবস্থায় বাস করতো কোনো কোনো পিছিয়ে পড়া মানবগোষ্ঠী সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সেই অবস্থায় আটকে থেকেছে। আর এই কারণেই আধুনিক পৃথিবীর ওই পিছিয়ে-পড়ে থাকা মানুষদের পরীক্ষা করে নৃতত্ত্ববিদরা প্রাগৈতিহাসিক অতীতের কথা অন্তত আংশিকভাবে অনুমান করে থাকেন। সে-বিচারে নৃ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে-কোনো আদিম পর্যায়ের সমাজ-সংগঠনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এক স্বতঃস্ফূর্ত গোষ্ঠীগত ঐক্য। এ-ঐক্য এমনই গভীর যে তাদের মধ্যে ব্যক্তি-স্বার্থ ও ব্যক্তি-বোধেরও ঐকান্তিক অভাব পরিলক্ষিত হয়। গোষ্ঠীর সামগ্রিক স্বার্থই প্রত্যেকের নিজস্ব স্বার্থ, প্রত্যেকের সম্পদই গোষ্ঠির সামগ্রিক সম্পদ। প্রাচীন বৈদিক মানুষদের ক্ষেত্রে এরকম কোনো পর্যায় অনুমান করতে হলে এ-ক্ষেত্রেও অনুমানের অবকাশ থাকে যে, বৈদিক সমাজ-বিবর্তনের কোনো-এক পর্যায়েও এ-জাতীয় গোষ্ঠী-চেতনা ও সাম্য-ব্যবস্থার পরিচয় থাকা স্বাভাবিক। তার মানে অবশ্য এই নয় যে বৈদিক সাহিত্য রচনার সমগ্র যুগ ধরে আগাগোড়াই ওই আদিম সাম্য-সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিলো। উপনিষদের সমাজ, ব্রাহ্মণের সমাজ, এমনকি ঋগ্বেদে সংকলিত অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন অংশে প্রতিফলিত সমাজও নিশ্চয়ই আদিম সাম্য-সমাজ নয়। বস্তুত–


সমাজ-তত্ত্বের সিদ্ধান্ত অনুসারে আদিম সাম্য-সমাজে ভাঙন ধরবার দুটি প্রধান কারণের মধ্যে একটি হলো, পশুপালন-মূলক অর্থনীতির ক্রমবিকাশ। অর্থাৎ, পশুপালনমূলক অর্থনীতির পিছনে আদিম সাম্য-সমাজের স্মৃতি, সামনে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের আভাস। বৈদিক মানুষদের ইতিহাসেও এই অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশের ফলে ক্রমশ-সুস্পষ্ট শ্রেণীবিভাগের আবির্ভাব ঘটে থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে-কথা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ– এবং আধুনিক বিদ্বানদের রচনায় যে-কথা সাধারণত উপেক্ষিত– তা হলো, ঋগ্বেদের নানা জায়গায় ওই আদিম সাম্য-জীবন ও গোষ্ঠী-চেতনার সুস্পষ্ট স্মারক চোখে পড়ে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় / ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৩০)

এ-প্রেক্ষিতে ঋগ্বেদের কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন–

‘ত ইন্দেবানাং সধমাদ আসন্নৃতাবানঃ কবয়ঃ পূর্ব্যাসঃ।
গূড়্হং জ্যোতিঃ পিতরো অন্ববিন্দন্ত্সত্যমন্ত্রা অজনয়ন্নুষাসম্’।। (ঋগ্বেদ-৭/৭৬/৪)।
‘সমান ঊর্বে অধি সঙ্গতাসঃ সং জানতে ন যতন্তে মিথস্তে।
তে দেবানাং ন মিনন্তি ব্রতান্যমর্ধন্তো বসুভির্যাদমানাঃ’।। (ঋগ্বেদ-৭/৭৬/৫)।
অর্থাৎ :
সেই ঋতযুক্ত প্রাচীন সত্যবান, কবি, পূর্বকালীন পিতা অঙ্গিরাগণ গূঢ় জ্যোতি লাভ করেছিলেন এবং অবিতথ সত্যমন্ত্রদ্বারা ঊষাকে প্রাদুর্ভূত করেছিলেন, তাঁরাই দেবগণের সঙ্গে একত্রে প্রমত্ত হতেন। (ঋক্-৭/৭৬/৪)।।  তাঁরা সাধারণ গো-সমূহের জন্য সঙ্গত হয়ে একবুদ্ধি সম্পন্ন হয়েছিলেন; তাঁরা যেন পরস্পরের সাথে যৌথ কর্মপ্রচেষ্টা করেন; ধনসমূহের সাথে গমন করতে করতে হিংসাবিহীন তাঁরা দেবতাদের ব্রতগুলিকে হিংসা করেন না। (ঋক্-৭/৭৬/৫)।।


ঋক্-দুটি শুধুই যে ঋগ্বেদের প্রাচীনতর অংশের অন্তর্ভুক্ত তাই নয়, এখানে আরও প্রাচীনকালের স্মৃতি উদ্ধৃত করবার পরিচয়ও সুস্পষ্ট। এবং সেই সুপ্রাচীন অতীতের কবিরা (অঙ্গিরস্-গণ) ‘সাধারণ গো-সমূহের’ অধিকারী, ‘একবুদ্ধিসম্পন্ন’ এবং ‘যৌথ কর্মপ্রচেষ্টায়’ নিরত। অতএব, কোনো কোনো বিষয়ে ঋক-দুটির তাৎপর্য দুর্বোধ্য হলেও এখানে আদিম সাম্য-জীবনের ইঙ্গিত উপেক্ষণীয় নয় বলেই গবেষকরা মনে করেন। ঋগ্বেদের অন্যান্য ঋকেও ওই সাধারণ ধন এবং সমাজ জীবনের স্মারক লক্ষণীয়–

‘বৈশ্বানরঃ প্রত্নথা নাকমারুহদ্দিবস্পৃষ্ঠং ভন্দমানঃ সুমন্মভিঃ।
স পূর্ববজ্জনয়ঞ্জন্তবে ধনং সমানমজ্মং পর্ষেতি জাগৃবিঃ’।। (ঋগ্বেদ-৩/২/১২)।
‘বপুর্নু তচ্চিকিতুুষো চিদস্তু সমানং নাম ধেনু পত্যমানম্’। (ঋগ্বেদ-৬/৬৬/১)।
অর্থাৎ :
স্তোতৃগণ কর্তৃক স্তূয়মান বৈশ্বানর অগ্নি চিরন্তনের ন্যায় অন্তরিক্ষের পৃষ্ঠভূতে (স্বর্গে) আরোহণ করেন। পুরাকালের ন্যায় তিনি (অগ্নি) প্রাণীগণের জন্য সাধারণ ধন সৃষ্টি করেছিলেন; সেইরূপ যজমানগণকেও ধন দান করে জাগ্রত হয়ে ভ্রমণ করেন। (ঋক-৩/২/১২)।।  সেই প্রীতিকর এবং বপুবান সাধারণ ধেনুগুলি দ্রুত গমন করতে থাকুক। (ঋক-৬/৬৬/১)।।

এমনকি দেবতাদের মধ্যেও সমান সম্পর্কের ইঙ্গিত ঋগ্বেদে বহুক্ষেত্রেই চোখে পড়ে। যেমন–

‘তদিৎসমানমাশাতে বেনস্তা ন প্র যুচ্ছতঃ। ধৃতব্রতায় দাশুষে’।। (ঋগ্বেদ-১/২৫/৬)।
অর্থাৎ : যজ্ঞানুষ্ঠাতা হব্যদাতার প্রতি প্রসন্ন হয়ে (মিত্র ও বরুণ) এ সাধারণ হব্য গ্রহণ করছেন, অগ্রাহ্য করেন না। (ঋক-১/২৫/৬)।।


তবে পর্যাপ্ত বিবেচনায় ঋগ্বেদের সর্বশেষ সূক্তে যৌথ-জীবন ও সমষ্টিচেতনার অন্যতম চিত্তাকর্ষক স্মারক উদ্ধতিটি হলো–

‘সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্ ।
দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে।। (ঋগ্বেদ-১০/১৯১/২)।
সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্ ।
সমানং মন্ত্রমভি মন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হবিষা জুহোমি।। (ঋগ্বেদ-১০/১৯১/৩)।
সমানী ব আকূতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।
সমানমস্তু বো মনো যথা বঃ সুসহাসতি’।। (ঋগ্বেদ-১০/১৯১/৪)।
অর্থাৎ :
তোমরা একত্রে মিলিত হও, এক কণ্ঠে ঘোষণা করো, একত্রে মন বিনিময় করো; যেভাবে অতীতের দেবতাগণ সচেতনভাবে একত্র বসে তাঁদের ভাগ গ্রহণ করতেন। (ঋক-১০/১৯১/২)।।  মন্ত্র সমান হোক, সমিতি সমান হোক, মন সমান হোক, সকলি একরূপ হোক। তোমাদের সাথে একই মন্ত্রে আমি মন্ত্রণা করি, তোমাদের সাথে একই হবি দ্বারা আমি হোম করি। (ঋক-১০/১৯১/৩)।।  তোমাদের প্রচেষ্টা এক হোক, অন্তঃকরণ এক হোক, মন এক হোক, তোমরা যেন সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে একমত হও। (ঋক-১০/১৯১/৪)।।


এগুলি হলো ঋগ্বেদের সর্বশেষ সূক্তের শেষ তিনটি ঋক। রচনাকালের দিক থেকেও সূক্তটি অর্বাচীনতম অংশেরই অন্তর্ভুক্ত। এখানে সমান-জীবনের জন্য গভীর আকুতি থেকে অনায়াসেই অনুমান হয়, বৈদিক মানুষদের সুপ্রাচীন সাম্যজীবন এ-যুগে বিধ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐক্য-কামনায় অতীতের স্মৃতি উদ্বুদ্ধ করবার আয়োজন ‘দেবা ভাগং যথাপূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে’– যেভাবে অতীতের দেবতাগণ সচেতনভাবে একত্র বসে তাঁদের ভাগ গ্রহণ করতেন। এতেই বোঝা যায়, অতীতেই এই ব্যবস্থায় ভাঙন ধরেছে; কেননা ইতোমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে, জিতধনে ইন্দ্রের অংশ (বা ভাগ) অপরের চেয়ে বেশি–

‘উদিনন্বস্য রিচ্যতেহংশো ধনং ন জিগ্যুষঃ।
য ইন্দ্রো হরিবান্ন দভন্তি তং রিপো দক্ষং দধাতি সোমিনি’।। (ঋগ্বেদ-৭/৩২/১২)।
অর্থাৎ : যে হরিবান ইন্দ্র সোমযুক্ত ব্যক্তিকে বল প্রদান করেন এবং শত্রুরা যাকে হিংসা করতে পারে না, সে ইন্দ্রের ভাগ জয়শীল ব্যক্তির ভাগের ন্যায় সর্বাপেক্ষা অধিক।


কিন্তু ‘ভাগ’ বা ‘অংশ’ মানে কী? দেবতাদের পক্ষে অতীতে একত্রভাগে ‘ভাগ’ গ্রহণ করবার তাৎপর্যই বা কী? এ-প্রশ্নের উত্তর থেকে বৈদিক সাহিত্যে আদিম সাম্য সম্পর্কের আর একটি প্রাচীন স্মারক চিহ্নিত করা যায় বলে গবেষকেরা মনে করেন। কেননা, ঋগ্বেদে বারবার ‘ভাগ’, ‘অংশ’ ও সমবণ্টনের উল্লেখ দেখা যায়। আদিম সাম্য-সমাজের এই ভাগ বা বণ্টনের নিয়মটির সবচেয়ে প্রত্যক্ষ পরিচয় শিকারজীবী পর্যায়ের সমাজে স্বীকৃত। তাই ঋগ্বেদে এগুলিকে সুপ্রাচীন নিয়মের স্মারক বলে গ্রহণ করলে বৈদিক মানুষদের সমাজ-ইতিহাস বোঝা সহায়ক হবে বলে মনে হয়। এ-পর্যায়ে মানুষের ধনস্বরূপ বলতে যেহেতু প্রধানতই খাদ্য-দ্রব্য তাই সমবণ্টনও মূলত ওই খাদ্য-দ্রব্যের বণ্টন– অন্ন-বিভাগ। যদিও ঋগ্বেদের রচনাকালে বৈদিক মানুষেরা অবশ্যই শিকারজীবী পর্যায়ে ছিলো না; ধনসম্পদ বলতে তাদের কাছে প্রধানতই পশু, এবং পরে যুদ্ধে জিত ধন। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই পর্যায়েও বৈদিক কবিদের স্মৃতি থেকে ওই সুপ্রাচীন নিয়মের প্রভাব বিলুপ্ত হয়নি। এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য–

ঋগ্বেদে ধনবাচক একটি শব্দ হলো ‘বার্য’। প্রায়ই বহুবচন ‘বার্ষানাম্’ (ঋগ্বেদ-১/৫/২, ১/২৪/৩, ৬/৫/৩ ইত্যাদি) ‘বার্ষাণি’ (ঋগ্বেদ-১/৩৫/৮, ১/১১৩/১৫, ১/১১৪/৫, ১/১৪৯/৫, ১/১৫৯/১ ইত্যাদি) এ-শব্দের প্রয়োগ চোখে পড়ে। এবং তার ব্যাখ্যায় সায়ণ কোথাও বা ‘গবাদি ধন’ (ঋগ্বেদ-৮/৭১/১১) কোথাও বা ‘ব্রীহি যবাদীনাম্’ (ঋগ্বেদ-১০/৯/৫) আবার কোথাও শুধু ‘বরণীয়ানাং ধানানাম্’ (ঋগ্বেদ-১/২৪/৩) অর্থ করেছেন; তাই অনুমান হয় ঋগ্বেদে এই শব্দ সাধারণভাবে সমস্ত রকম ধনসম্পদ বুঝিয়েছে। চিত্তাকর্ষক কথা হলো, শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ। ঋগ্বেদ-ভাষ্যে (ঋগ্বেদ-১/৫/২) সায়ণ দেখাচ্ছেন, ‘বৃঙ্’ ধাতু থেকে এই শব্দের উৎপত্তি : বৃঙ্ + ণ্যৎ– বার্য। এবং ‘বৃঙ্’ মানে ভাগ করা বা বিভাগ করা : বৃঙ্ সংভক্তৌ। অতএব, ধনবাচক ওই শব্দটির পিছনেই সুপ্রাচীন সমবণ্টনের নিয়মটির ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়– ধনসম্পদ মানেই হলো এমন জিনিস যার বিভাগ করা হবে।
অবশ্য ঋগ্বেদে প্রায়ই সাধারণভাবে ধনসম্পদের কামনা প্রসঙ্গে শব্দটির প্রয়োগ চোখে পড়ে। কিন্তু যে-সুপ্রাচীন সমবণ্টনের নিয়ম থেকে শব্দটির উদ্ভব, অন্তত কোনো কোনো দৃষ্টান্তে উক্ত  ধনসম্পদের উপর তার প্রয়োগ কামনা করা হয়েছে। দেবতা সবিতৃকে উদ্দেশ করে কবি শুণঃশেপ বলছেন, “হে সবিতা, তুমি আমাদের ধনসমূহের চিরন্তন বর্ধন ও রক্ষক; আমরা বিশেষভাবে তোমার নিকট হইতে আমাদের ভাগ চাইতেছি (অভি ত্বা দেব সবিতঃ ঈশানং বার্ষাণাং সদা ভাগম্ ঈমহে)” (ঋগ্বেদ-১/২৪/৩)। এখানে ‘ভাগ’ শব্দের সুস্পষ্ট সাক্ষ্য অবশ্যই উপেক্ষণীয় নয়। অন্যত্রও দেবতা সবিতৃ প্রসঙ্গে ‘ভগ-ভক্তস্য’ (ঋগ্বেদ-১/২৪/৫) বিশেষণের প্রয়োগ দেখা যায়। বিশেষণটি চিত্তাকর্ষক : কেননা ঋগ্বেদে ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ‘ধনসম্পদ’ (নিঘণ্টু-২/১০), এবং ভাগ বা-অংশ দুইই। অতএব ‘ভগ-ভক্ত’ অর্থে ‘যিনি ধন বিতরণ করেন’ বা ‘যিনি অংশ বণ্টন করেন’– দুইই। এবং ‘ভগ’ বলতে যদি ‘ধন’ এবং ‘অংশ’ দুইই বুঝিয়ে থাকে তাহলে কি অনুমান করা যায় না যে ধনবাচক এই বৈদিক শব্দটির পিছনেও সুপ্রাচীন সমবণ্টন-মূলক নিয়মের ইংগিত থেকে গিয়েছে?’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৩৩)

মূলত শুধুমাত্র শব্দতত্ত্ব-গত ইংগিতই নয়, ঋগ্বেদের বহু দৃষ্টান্তে প্রাচীন পৌরাণিক কল্পনা ভেদ করে সমবণ্টনের কামনাও ফুটে উঠতে দেখা যায়। যেমন–

‘স্বন্তয়ে বাজিভিশ্চ প্রণেতঃ সং যন্মহীরিষ আসৎসি পূর্বীঃ।
রায়ো বস্তারো বৃহতঃ স্যামাস্মে অস্তু ভগ ইন্দ্র প্রজাবান্’।। (ঋগ্বেদ-৩/৩০/১৮)।
‘ব্রহ্মণস্পতেরভবদ্যথাবশং সত্যো মন্যুর্মহিত কর্মা করিষ্যতঃ।
যো গো উদাজৎস দিবে বি চাভজন্মহীব রীতিঃ শবসাসরৎপৃথক্’।। (ঋগ্বেদ-২/২৪/১৪)।
‘ভূরিকর্মণে বৃষভায় বৃষ্ণে সত্যশুষ্মায় সুনবাম সোমম্ ।
য আদৃত্যা পরিপন্থীব শূরোহষজ্বনো বিভজন্নেতি বেদঃ’।। (ঋগ্বেদ-১/১০৩/৬)।
‘দেবো ভগঃ সবিতা রায়ো অংশ ইন্দ্রো বৃত্রস্য সঞ্জিতো ধনানাম্ ।
ঋৃভুক্ষা বাজ উত বা পুরন্ধিরবন্তু নো অমৃতাসস্তুরাসঃ’।। (ঋগ্বেদ-৫/৪২/৫)।
অর্থাৎ :
হে জগতের নির্বাহক ইন্দ্র! আমাদের অশ্বযুক্ত করো ও অবিনাশী করো। আমরা ধনের বণ্টনকর্তা হয়ে মহান হবো; তুমি আমাদেরকে প্রজাযুক্ত ভগ দাও। (ঋক-৩/৩০/১৮)।।  ব্রহ্মণস্পতি যখন কোন মহৎকর্মে প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর মন্ত্র তাঁর অভিলাষানুসারে সফল হয়। যিনি গরুগুলিকে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন, তিনিই নিজবলের দ্বারা মহাস্রোতের ন্যায় সেই গরুগুলিকে দ্যুলোকের জন্য দেবতাদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। (ঋক-২/২৪/১৪)।।  ভূরিকর্মা, দেবশ্রেষ্ঠ, অভীষ্টদাতা, সত্যবল, ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে আমরা সোম অভিষব করি; পথনিরোধক চোর যেরূপ পথিকের নিকট হতে ধন কেড়ে নেয়, শূর ইন্দ্র সেরূপ সমাদরে পরিপন্থী যজ্ঞবিহীন ব্যক্তিদের ধন অপহরণপূর্বক যজ্ঞপরায়ণদের নিকট ভাগ করতে করতে গমন করেন। (ঋক-১/১০৩/৬)।।  দীপ্তিমান ভগ, ধনাধিপতি সূর্য ও বৃত্রনাশক ইন্দ্র, সমস্ত ধনবিজয়ী ঋভুক্ষা, বাজ ও পুরন্ধি, জিতধনের অংশ আমাদেরকে দাও। (ঋক-৫/৪২/৫)।।


এ-জাতীয় বহু বহু দৃষ্টান্ত ঋগ্বেদ জুড়ে রয়েছে। দৃষ্টান্তগুলি অনিবার্যভাবেই পৌরাণিক কল্পনায় আচ্ছন্ন হলেও এখানে সুপ্রাচীন সমবণ্টনের নিয়ম– বা এ-নিয়মের প্রয়োগ-মূলক কামনা– অস্পষ্ট নয় বলেই গবেষকেরা মনে করেন। অতএব এগুলিকে আদিম সাম্য-সমাজের স্মারক হিসেবে গ্রহণ করা যায় এবং তার ফলে বৈদিক সমাজ সংক্রান্ত প্রচলিত বদ্ধ সংস্কারগত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। তবে বৈদিক সাহিত্যে আদিম সাম্য-সমাজের স্মারক বলতে শুধু ওই সমবণ্টন-মূলক নিয়মের ইঙ্গিতই নয়, সমাজ-পরিচালন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সমজাতীয় স্মারক অনুমান করা যেতে পারে। কী সেই স্মারক?
ঋগ্বেদে ‘সভা’, ‘বিদথ’ ও ‘সমিতি’-র বহু নজির দেখা যায়। এগুলি যে পঞ্চায়েৎ-জাতীয়ই কিছু ছিলো সে-বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ অল্প। তবে এ-বিষয়ে সংশয়ের অববকাশ নেই যে, প্রাচীন বৈদিক সমাজ-গঠনে এগুলির বিশেষ গুরুত্ব ছিলো। এ-প্রেক্ষিতে প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ জে পি মর্গানের নৃতাত্ত্বিক গবেষণালব্ধ মতামত স্মরণে রাখা আবশ্যক। তাঁর মতে,– ‘প্রাচীন সমাজের শাসন-ব্যবস্থায় রাষ্ট্রশক্তির পরিচয় নেই। মর্গান তাই রাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক সমাজের আখ্যা দিয়েছিলেন ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’ বলে। তুলনায় প্রাচীন সমাজের আধুনিক আখ্যায় বলা হয় ‘ট্রাইবাল সোসাইটি’। এই ট্রাইবাল সমাজের শাসন-পরিচালন প্রতি স্তরে সভা বা পঞ্চায়েতের উপর নির্ভরশীল। প্রতি ট্রাইবের অন্তর্গত যে কয়েকটি অপেক্ষাকৃত ছোট মানবগোষ্ঠি, সেগুলির নাম হলো ‘ক্লান’ বা ‘গেন্স্’। ক্লানের শাসন-পরিচালনার চূড়ান্ত দায়িত্ব যে-সভার উপর তার সভ্য বলতে ক্লানের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী-পুরুষ। এই সভা থেকে মোড়ল, যুদ্ধ-সর্দার প্রভৃতি নির্বাচন করবার ব্যবস্থা। তেমনি, পুরো ট্রাইবের শাসন পরিচালনার দায়িত্ব একটি সভার উপর, তার সভ্য বলতে বিভিন্ন ক্লানের নির্বাচিত প্রতিনিধি। আবার যে-কয়েকটি ক্ষেত্রে ট্রাইব উচ্চতর সংগঠনে সংগঠিত সে-ক্ষেত্রেও– এই উচ্চতর সংগঠনেরও– শাসন-পরিচালনের দায়িত্ব একটি উচ্চতর সভার উপর। ইত্যাদি, ইত্যাদি।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৩৫)

প্রাচীন সমাজ সংক্রান্ত এই সাধারণ তথ্যের ভিত্তিতে প্রাচীন বৈদিক সমাজ সম্বন্ধে কিছু স্মারকের বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে। বৈদিক কবি বা ঋষিদের রচনায় সভা, সমিতি ও বিদথর গুরুত্ব যে কতটুকু সে-বিষয়ে ঋগ্বেদের কিছু নিদর্শন দেখা যাক। যেমন–

‘সং যন্মহী মিথতী স্পর্ধমানে তনূরুচা শূরসাতা যতৈতে।
অদেবয়ুং বিদথে দেবয়ুভিঃ সত্রা হতং সোমসুতা জনেন’।। (ঋগ্বেদ-৭/৯৩/৫)।
‘যূয়ং গাবো মেদয়থা কৃশং চিদশ্রীরং চিৎকৃণুথা সুপ্রতীকম্ ।
ভদ্রং গৃহং কৃণুথ ভদ্রবাচো বৃহদ্বো বয় উচ্যতে সভাসু’।। (ঋগ্বেদ-৬/২৮/৬)।
‘কৃতং নো যজ্ঞং বিদথেষু চারুং কৃতং ব্রহ্মাণি সুরিষূ প্রশস্তা।
উপো রয়ির্দেবজুতো ন এতু প্র ণঃ স্পার্হাভিরূতিভিস্তিরেতম্’।। (ঋগ্বেদ-৭/৮৪/৩)।
অর্থাৎ :
যে দুইজন পরস্পর অত্যন্ত হিংসাযুক্ত এবং স্পর্ধিত হয়ে দৈহিক বল ও শৌর্য প্রদর্শন করে হিংসা করতে সচেষ্ট, সোমসেবনকারী দেবতার অনুমোদিত জনসমূহ কর্তৃক সেই দেবতাবিহীন নরগণ বিদথে নিহত হলো। (ঋক-৭/৯৩/৫)।।  হে ধেনুগণ! তোমরা মেদযুক্ত হও এবং ক্ষীণ অথবা বিকৃত অঙ্গবিশিষ্ট হয়েও শোভন লক্ষণযুক্ত হও। গৃহকে সমৃদ্ধিময় করো, বাক্যকে ভদ্র করো, সভায় তোমাদের প্রদত্ত প্রচুর অন্নই সম্যক রূপে কীর্তিত হয়। (ঋক-৬/২৮/৬)।।  হে ইন্দ্র ও বরুণ, আমাদের যজ্ঞ সমাপ্ত হয়েছে, বিদথসমূহে বীরগণের মধ্যে সুন্দর প্রশস্তি সমাপ্ত হয়েছে; দেবতাদের প্রেরিত ধন আমাদের নিকট আসুক এবং স্পৃহণীয় রক্ষার দ্বারা আমাদেরকে তোমরা বর্ধিত করো। (ঋক-৭/৮৪/৩)।।


ঋগ্বেদে এ-জাতীয় বহু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা গেলেও বলা বাহুল্য, বৈদিক সমাজে সভা বা বিদথের কর্মসূচি ঠিক কী ছিলো তা ব্যাখ্যা করবার উদ্দেশ্যে যে বৈদিক কবিরা এ-জাতীয় কবিতা বা গান রচনা করেননি। কেননা ঋগ্বেদে সংকলিত কাব্যের উদ্দেশ্য আর যাই হোক সমাজ সংগঠন বর্ণনা করা নয়। কিন্তু যে-উদ্দেশ্যেই এ-সাহিত্য রচিত হোক না কেন– এরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিত থেকে বৈদিক সমাজের স্বরূপ অনুমান করতে হবে। তবে সায়ণ প্রমুখ ভাষ্যকাররা ঋগ্বেদে উদ্ধৃত ‘সভা’ ‘বিদথ’ শব্দগুলিকে মূলত সচেতনভাবে যজ্ঞ-কর্মের পরিভাষায় রূপান্তর করে শ্লোকগুলির প্রতীকী অর্থ তৈরি করায় মনে হতে পারে সেকালের কবিরা বুঝি এরকম চিন্তা থেকেই গানগুলি রচনা করেছেন। কিন্তু সত্যি কি তাই? একালের উন্নত চিন্তা ও ভাব দিয়ে সেকালের ভাবনাকে আরোপ করা কতোটা যুক্তিযুক্ত তা প্রশ্নসাপেক্ষ বৈকি।

মূলত গবেষকদের স্বীকৃতি অনুসারে বৈদিক সভাই ছিলো বৈদিক সমাজের রাজনৈতিক কার্যনির্বাহক সংগঠন। ট্রাইবাল সমাজ সংক্রান্ত সাধারণ তথ্যানুযায়ী বোঝা যায় ট্রাইবাল সমাজের রাজনৈতিক কাজ বলতে একটি প্রধান কাজ অবশ্যই সর্দার, মোড়ল প্রভৃতি নির্বাচন। বৈদিক সমাজে এই নির্বাচিত প্রতিনিধিকে কী বলতো? কোনো কোনো বেদবাদীর মতে বৈদিক সমাজে যে রাজশাসন ছিলো এ-বিষয়ে প্রধান প্রমাণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেন ঋগ্বেদে ‘রাজা’ বা ‘রাজন্’ শব্দের বহুল উল্লেখ। তার মানে আধুনিক গবেষকেরা বৈদিক মানুষদের প্রসঙ্গে ‘ট্রাইব’ শব্দ যত অনায়াসেই ব্যবহার করুন না কেন বেদবাদীরা বারবার এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে চেয়েছেন যে বৈদিক ট্রাইবগুলি আধুনিক অর্থে রাজা বা সম্রাট-শাসিত ছিলো। কিন্তু বৈদিক সমাজ-বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে– উপনিষদের যুগে, ব্রাহ্মণের যুগে, এমনকি ঋগ্বেদ রচনার শেষাশেষি পর্যায়েও– আধুনিক অর্থে রাজশক্তির সুস্পষ্ট আবির্ভাব সত্ত্বেও এ-কথা কল্পনা করার কোনো কারণ নেই যে বৈদিক সমাজ-ইতিহাসের আগাগোড়াই রাজ-শাসন বা সম্রাটশাসনের নজির আছে। বস্তুত, বৈদিক সমাজের প্রাচীনতর পর্যায়কে প্রকৃত ট্রাইব্যাল সংগঠন আখ্যাই দিতে হবে। আধুনিক অর্থে রাজ-শাসন রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিচায়ক এবং ট্রাইব্যাল সমাজের ধ্বংসস্তুপের উপরই তার আবির্ভাব সম্ভব। অতএব বৈদিক যুগে রাজ-শাসিত বা সম্রাট-শাসিত ট্রাইব্যাল-সমাজের কথা বললে বৈদিক সমাজ সংক্রান্ত ধারণা সুস্পষ্ট হয় না। এখন প্রশ্ন হলো, ঋগ্বেদে ‘রাজা’ শব্দের অর্থ কী? এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদের বক্তব্য অনুসরণ করা যেতে পারে–

এ-কথা অবশ্যই সুবিদিত যে শব্দার্থের তুলনায় শব্দের পরিবর্তন অনেক মন্থর; শব্দের অর্থ-পরিবর্তন সত্ত্বেও শব্দটি অক্ষুণ্ন বা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তাই সমাজ পরিবর্তনের ফলে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি বা ঘটনার উদ্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন শব্দের সৃষ্টি হয় না– পুরানো কালের ভিন্ন অর্থের ব্যবহৃত শব্দের অর্থ-পরিবর্তন করে এই নতুন পরিস্থিতি বা ঘটনা বোঝবার আয়োজন করা হয়। অনুমান হয়, বৈদিক সাহিত্যে ‘রাজা’ শব্দটির ক্ষেত্রেও এ-জাতীয় ঘটনাই ঘটেছিল।
উত্তরকালে রাজা বলতে অবশ্যই আধুনিক অর্থে রাষ্ট্র-অধিপতিই…বুঝিয়েছেন। কিন্তু ঋগ্বেদের সাক্ষ্য বিচার করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে আদিতে শব্দটির অর্থান্তর ছিল। দশম মণ্ডলের বিখ্যাত অক্ষ-সূক্ত থেকে এ-বিষয়ে একটি চিত্তাকর্ষক নজির উদ্ধৃত করা যায়। “যো বঃ সেনানীর্মহতো গণস্য, রাজা ব্রাতস্য প্রথমো বভুব”…: যিনি তোমাদের মহৎ গণের সেনানী (দলপতি?) এবং ব্রাতের শ্রেষ্ঠ রাজা হইলেন… (ঋগ্বেদ-১০/৩৪/১২)। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে ‘গণে’র সেনানী এবং ‘ব্রাতে’র রাজা একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষ্যে সায়ণ বলছেন, ‘গণ’ এবং ‘ব্রাত’-র মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই এবং এ-বিষয়েও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না যে আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে উভয় শব্দই ট্রাইব বা ট্রাইব-গত যৌথ জীবন– বুঝিয়েছে। অতএব এ-ক্ষেত্রে গণের সেনানী বা ব্রাতর রাজা বলতে ট্রাইবের সর্দার ছাড়া অন্য কিছু বোঝার অবকাশ স্বল্পই।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৩৭)

ঋগ্বেদে এই ‘রাজা’র বৈশিষ্ট্য বুঝতে ঋগ্বেদেরই অন্য একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। ওষধিগণের একত্রিত হবার বর্ণনায় জনৈক কবি একটি চিত্তাকর্ষক উপমা ব্যবহার করেছেন, যেমন–

‘যত্রৌষধীঃ সমগ্মত রাজানঃ সমিতাবিব।
বিপ্রঃ স উচ্যতে ভিষগ্রক্ষোহামীবচাতনঃ’।। (ঋগ্বেদ-১০/৯৭/৬)।
অর্থাৎ : রাজাগণ যেমন সমিতিতে একত্রিত হন সেরূপ যে ব্যক্তির নিকট ওষধিগণ মিলিত হয় অর্থাৎ যে ওষধী জানে সে বুদ্ধিমান ভিষক ব্যক্তিকে চিকিৎসক বলে, সে রোগদের ধ্বংস করে।


এখানে রাজা শব্দের বহুবচন-ব্যবহার নিশ্চয়ই তাৎপর্যপূর্ণ– সমিতিতে সমাগত রাজা বলতে এক নয়, বহু। স্বভাবতই এখানে ‘রাজা’-কে আধুনিক অর্থে রাষ্ট্র-অধিপতি অর্থে গ্রহণে বাধা ওঠে। কিন্তু সমিতিতে বহু রাজার পক্ষে সমবেত হবার তাৎপর্যই বা কী? এর উত্তর ট্রাইব্যাল সমাজের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে। ট্রাইব্যাল সংগঠনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ট্রাইবের অন্তর্গত বিভিন্ন ক্লান থেকে নির্বাচিত যুদ্ধ-সর্দারদের একটি উচ্চতর পঞ্চায়েৎ থাকে এবং তার প্রধানতম কাজ যুদ্ধবিষয়ক। অতএব, বৈদিক সমিতির সঙ্গে যুদ্ধ-পরিচালনামূলক কাজের সম্পর্ক থাকলে এই অনুমানই স্বাভাবিক হবে যে উক্ত সমিতিও যুদ্ধ-সর্দারদের পঞ্চায়েৎ জাতীয় কোনো সংগঠন ছিলো। এবং, দেবীপ্রসাদের মতে, এ-জাতীয় সম্পর্কের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত সত্যিই পাওয়া যায়। নিঘণ্টু-মতে (নিঘণ্টু-২/১৭) সমিতি শব্দ একটি সংগ্রাম-নাম বা যুদ্ধ-বাচক শব্দ। বেদের ভাষ্যকার সায়ণও বহু দৃষ্টান্তে ‘সমিতি’ শব্দের অর্থ করেছেন ‘যুদ্ধ’। আর সমিতি যদি যুদ্ধ-পরিচালনার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ-সর্দারদের সংগঠন না হয়, তাহলে সমিতি মানেই যুদ্ধ কী করে হতে পারে?

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সমিতি শব্দটির ব্যবহার প্রধানতই ঋগ্বেদের অর্বাচীন অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ-বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে গবেষক জয়সওয়াল অনুমান করতে চেয়েছেন, বৈদিক সমাজ-বিবর্তনের উচ্চতর পর্যায়েই এ-জাতীয় সংগঠন গড়ে ওঠা স্বাভাবিক; কেননা সমিতি যে-গণতান্ত্রিক চেতনার পরিচায়ক তা সমাজ-বিবর্তনের উচ্চতর পর্যায়েই সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা বিপরীত বলেই মনে হয়, কেননা–
প্রাচীন ইতিহাসে চূড়ান্ত গণতন্ত্রের পরিচয় প্রকৃত ট্রাইব্যাল সমাজেই। অপরপক্ষে, অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে– বিশেষত পশুপালনমূলক অর্থনীতির বিকাশের ফলে– ট্রাইবগুলি যতই যুদ্ধ-পরায়ণ হয়ে ওঠে ততই ধ্বংস পায় ওই প্রাচীন ট্রাইব্যাল গণতন্ত্র এবং তারই ধ্বংসস্তুপের উপর আবির্ভাব হয় রাজশক্তির, তথা রাষ্ট্রশক্তির। বৈদিক ট্রাইবগুলি যে ক্রমশই একান্ত যুদ্ধ-পরায়ণ হয়ে উঠেছিল এ-কথা সুবিদিত; তারই ফলে ঋগ্বেদে অন্য সব দেবতার গৌরব ম্লান করে ক্রমশ যুদ্ধ-দেবতা ইন্দ্রের প্রায় ঐকান্তিক গৌরব কীর্তিত হয়েছে। এবং এই দিক থেকে ঋগ্বেদের শেষ পর্যায়ে সমিতির ওই গুরুত্ব প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন গণতন্ত্রের– তথা আদিম সাম্যজীবনের– অবসানই সূচনা করেছে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৩৯)

এই পরিণতির ফলে বৈদিক সমাজ-বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে আর্যদের প্রাচীনতম সংগঠন সেই ‘সভা’, ‘বিদথ’ ও এমনকি ‘সমিতি’রও গুরুত্ব প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হতে দেখা যায়। অনেককাল পরের মহাভারতেও সভার উল্লেখ আছে; কিন্তু সভা বলতে তখন প্রায় যে-কোনো রকম সম্মেলন। জনসাধারণের সভা তখন আর জনসাধারণের নেই– অভিজাতদের সভা। জনসাধারণের সামরিক ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে তখন রাজার করায়ত্ত। মহাভারতের প্রকৃত আখ্যানভাগে সমস্ত সর্বজনীন ব্যাপারেই পুরোহিতেরা প্রায় নীরব, এবং জনসাধারণ সম্পূর্ণ অবদমিত।
তবে মনে রাখতে হবে, জনসাধারণের সভা-সমিতিকে– তথা রাজনৈতিক অধিকারকে– সম্পূর্ণভাবে অবদমিত করে রাজ-শক্তির এই যে চূড়ান্ত বিকাশ মহাভারতে প্রকট হয়েছে, এর সূত্রপাত কিন্তু মহাভারতের যুগে নয়। ঋগ্বেদেই দেখা যায়, যুদ্ধ-নায়ক ইন্দ্রের বাধাবন্ধনহীন স্বৈরাচারী শক্তির স্তুতিতে বৈদিক কবিরা ক্রমশই মুখর হয়ে উঠেছেন। আধুনিক গবেষকরা দেখিয়েছেন, ইন্দ্রের এ-গৌরব ঋগ্বেদের প্রাচীন পর্যায়ের পরিচায়ক নয়; প্রকৃত প্রাচীন পর্যায়ে মহত্তম বৈদিক দেবতা বলতে বরুণ; এবং এই বরুণ সখ্যের প্রতীক, ন্যায়ের প্রতীক, সাম্যের প্রতীক; এবং কালক্রমে ঋগ্বেদে এই বরুণের গৌরবকেই ধূলিসাৎ করে ইন্দ্রের গৌরব প্রবল হয়ে উঠেছে।

বৈদিক কবিদের কল্পনায় দেবতা-জগতের এই বিপর্যয়ের মধ্যে এক গভীর সমাজ-বিবর্তন প্রতিফলিত হয়েছে এবং তার মূল কথা হলো, প্রাচীন যৌথজীবনের ধ্বংসস্তুপের উপর ক্ষাত্র-শক্তি শাসিত ও ব্রাহ্মণ-শক্তি সমর্থিত সুস্পষ্ট শ্রেণী-সমাজের আবির্ভাব। পরবর্তী কালের শ্রেণী-শাসিত– প্রধানত ক্ষত্রিয়-শ্রেণী শাসিত– বৈদিক সমাজের পরিচয় অবশ্যই সুবিদিত। ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্যে (যেমন ঐতরেয় ব্রাহ্মণ) এ-সমাজের রূপ অত্যন্ত প্রকট হয়েছে; এমনকি ঋগ্বেদের শেষ পর্যায়েই (যেমন অর্বাচীন দশম মণ্ডলের সুবিখ্যাত ‘পুরুষ-সূক্তে’ বর্ণ-ভেদের উদ্ভব) ক্ষাত্র-শক্তি ও ব্রাহ্মণ-শক্তির প্রাদুর্ভাব সুস্পষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত হয়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১৪১)

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : বৈদিক সাহিত্যে সমাজ ও তার চিন্তাধারা] [*] [পরের পর্ব : বৈদিক সাহিত্যে পার্থিব সম্পদের কামনা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৮ : ঋগ্বেদের সমাজ|"

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 176,747 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: