h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৭ : বৈদিক সাহিত্যে সমাজ ও তার চিন্তাধারা|

Posted on: 05/07/2015


su_blackwell

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৭ : বৈদিক সাহিত্যে সমাজ ও তার চিন্তাধারা |
রণদীপম বসু

৩.০ : বৈদিক সাহিত্যে সমাজ ও তার চিন্তাধারা

বৈদিক-যুগের সমাজ-সংস্কৃতির রূপটি কেমন ছিলো তা নিরূপণের প্রধানতম মাধ্যম হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবেই গবেষকরা ঋগ্বেদের উপরই নির্ভর করেছেন বেশি। এক্ষেত্রে সমগ্র ঋগ্বেদ জুড়েই যে সমর্থনটির দিকে গবেষকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তা হলো– যাঁরা বেদ রচনা করেছিলেন তাঁরা ছিলেন মূলতই পশুপালক। এমনকি তাঁরা ভালো করে কৃষিকাজও শেখেন নি; ধনসম্পদ বলতে তাঁদের কাছে প্রধানতই পশু। এ প্রেক্ষিতে খুবই উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, গোটা ঋগ্বেদ জুড়ে পশু হিসেবে ‘গো’ বা গরুর প্রাধান্য একচ্ছত্র। তবে বৈদিক মানুষদের কাছে ‘গো’ কেবল গরুই নয়, অনেক কিছুই।


বৈদিক শব্দকোষ বলে স্বীকৃত ‘নিঘণ্টু’-মতে (নিঘণ্টু-১/১) পৃথিবী-বাচক একটি শব্দ হলো ‘গো’ বা গরু। ভাষ্যকার সায়ণও ঋগ্বেদে স্থান-বিশেষে ‘গো’ শব্দ পৃথিবী অর্থে গ্রহণ করেছেন, যেমন–

‘স্তরীর্যৎসুত সদ্যো অজ্যমানা ব্যাথরব্যথীঃ কৃণুত স্বগোপা।
পুত্রো যৎপূর্বঃ পিত্রোর্জনিষ্ট শম্যাং গৌর্জগার যদ্ধ পৃচ্ছান্’।। (ঋগ্বেদ-১০/৩১/১০)।
অর্থাৎ : রেতসেক প্রাপ্ত হয়ে বৃদ্ধা গাভী প্রসব করলে যেরূপ হয়, অরণি অর্থাৎ অগ্নিমন্থনকাষ্ঠ সেরূপ অগ্নিকে প্রসব করে। সে অরণি লোকের ক্লেশ দূর করে, যারা অরণিকে রক্ষা করেন সেরূপ ব্যক্তিদের ব্যথা পেতে হয় না। অগ্নি অরণিদ্বয়ের পুত্রস্বরূপ, তিনি পূর্বকালে দু অরণিস্বরূপ মাতা পিতা হতে জন্ম গ্রহণ করেছেন। এ যে অরণিস্বরূপ গাভী, সে শমী বৃক্ষে জন্ম গ্রহণ করে, তারই অন্বেষণ করা হয়ে থাকে।


‘নিঘণ্টু’-মতে আবার ‘অদিতি’ শব্দও পৃথিবী-বাচক (নিঘণ্টু-১/১) এবং গো-বাচক (নিঘণ্টু-২/১১), দুইই। তেমনি ‘ইলা’ মানে পৃথিবী (নিঘণ্টু-১/১), গো (নিঘণ্টু-২/১১), বাক্ এবং অন্ন (নিঘণ্টু-১/১১)। তাই দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন–
এ-জাতীয় শব্দ ব্যবহার থেকেই অনুমান হয়, বৈদিক কবিদের কল্পনা ছিল একান্তই গো-বিভোর বা গো-ময়। গোরুই তাঁদের কাছে সব-কিছু, যেন পুরো পৃথিবী।… জনৈক কবি এমনকি বৈদিক দেবতাদেরও “গো-জাতঃ” বলে বর্ণনা করতে দ্বিধা বোধ করেন নি। এবং স্বর্গ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব নিরূপণের উদ্দেশ্যেও সহস্র গোরুকেই উপর উপর দাঁড় করাবার পরিকল্পনা দেখা যায়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১২৫)

অতএব বৈদিক সমাজ ও তার চিন্তাধারায় বৈদিক অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে পশুপালন-নির্ভরতা। পশুপালক ছিলেন বলেই বৈদিক কবিদের রচনায় পশু নিয়ে অসম্ভব উচ্ছ্বাস। এবং এই বৈশিষ্ট্যটি নানা কারণেই উল্লেখযোগ্য। কেননা আমরা আগেই দেখেছি যে, প্রাক্-বৈদিক– বিশেষত সিন্ধু-সভ্যতার– চিন্তাধারার সঙ্গে বৈদিক চিন্তাধারার একটি প্রধান পার্থক্য বলতে পুরুষ-প্রাধান্য। এর কারণ হিসেবেও জেনেছি যে, পশুপালন-নির্ভর সমাজ পুরুষ-প্রধান, ফলে পশুপালকদের চিন্তা-চেতনাতেও এই পুরুষ-প্রাধান্যের পরিচয় স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে, কৃষি-প্রধান অর্থনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজ-ব্যবস্থা মাতৃ-প্রধান; তাই এ-পর্যায়ের চিন্তাক্ষেত্রেও মাতৃ-প্রাধান্য অনিবার্য এবং কৃষি-ভিত্তিক সিন্ধু-সভ্যতার ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারই রেশ টিকে থেকেছে। আর তাই ভারতীয় দর্শনের– তথা সমগ্রভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির– ইতিহাসে বৈদিক ও প্রাক্-বৈদিক চিন্তাধারার এই মৌলিক পার্থক্যটুকু মনে রাখা আবশ্যক।

বেদোক্ত সমাজ ও চিন্তাধারা নিয়ে নির্মোহ আলোচনার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যার কথাও মনে রাখা দরকার যে, বেদ সম্বন্ধে সুদীর্ঘ যুগ ধরে একটা অন্ধ শ্রদ্ধার ভাব প্রচারিত হয়েছে; এমনকি মৌখিকভাবে বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করে নানা সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা এর প্রতি সবার আস্তিক্যাভিমানও প্রত্যাশা করেছেন। অন্যদিকে, বেদের বাস্তব চর্চা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ; এবং বস্তুত বিভিন্ন-প্রকারের বিধি-নিষেধের সাহায্যে সচেতনভাবে এ-চর্চা সীমাবদ্ধ রাখবার আয়োজনও বেশ প্রখর ছিলো। ফলে এই পরিস্থিতিতে বেদ সংক্রান্ত সংস্কারগত নানান ধারণার উদ্ভবই স্বাভাবিক, যার সুযোগে ‘বৈদিক সভ্যতা’ ও ‘বৈদিক আধ্যাত্মিকতা’ নামে নানা অবাস্তব কল্পনার প্রশ্রয় ঘটেছে। আর এগুলির আড়ালে ঢাকা পড়েছে বৈদিক সমাজ ও বৈদিক চিন্তা-চেতনার চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্যগুলি।

ঋগ্বেদ আজ অনেকাংশেই দুর্বোধ্য। এই দুর্বোধ্যতার কারণ কিন্তু দার্শনিক তত্ত্বের সূক্ষ্মতা বা গভীরতা নয়, বরং ঋগ্বেদের ভাষা এমনই প্রাচীন এবং সে-ভাষায় প্রকাশিত ভাবধারাও প্রায়ক্ষেত্রেই এমনই আদিম যে তার সুনিশ্চিত অর্থ-নির্ণয় অনেক ক্ষেত্রেই সুকঠিন। ম্যাক্স মূলার, ভিনটারনিথ্স্ প্রমুখ গবেষকদের মতে, ‘ব্রাহ্মণ প্রভৃতি বৈদিক সাহিত্যের উত্তরাংশে কোনো কোনো প্রাচীন রচনার কাল্পনিক অর্থ-নির্ণয় এবং সে-সংক্রান্ত মতবিরোধ থেকে অনুমিত হয় যে, সুদূর অতীতেই এবং বৈদিক ঐতিহ্যেই ঋগ্বেদ অংশ-বিশেষে দুর্বোধ্য হয়েছিলো।’ কিন্তু ভাষা ও ভাবের প্রাচীনত্ব-জনিত এ-দুর্বোধ্যতা সত্ত্বেও ঋগ্বেদকে অজ্ঞাত বা অজ্ঞেয় মনে করার কোনো কারণ নেই। কেননা, প্রাচীন মধ্যযুগীয় ও আধুনিক বিদ্বান ও গবেষকদের বহুমুখী প্রচেষ্টায় তার প্রধানতম অংশই সুব্যাখ্যাত হয়েছে। এবং তারই উপর নির্ভর করে বৈদিক ভাবধারার নির্ভরযোগ্য পরিচয় পাওয়া এখন আর অসম্ভব নয়। বলা বাহুল্য, তার সঙ্গে বেদ সংক্রান্ত সংস্কারগত ধারণাগুলির খুব একটা মিল হয় না বললেই চলে।
এ-প্রেক্ষিতে বেদ-পরিচয়ের বস্তুনিষ্ঠতার প্রয়োজনে আমাদের ভুলে গেলে চলে না যে, শুধুমাত্র ঋগ্বেদে সংকলিত প্রাচীন এবং অর্বাচীন অংশের রচনাকালের মধ্যেই সুদীর্ঘ ব্যবধান রয়েছে এবং সংহিতা থেকে উপনিষদ পর্যন্ত সুবিশাল সাহিত্য রচিত হতে অন্তত কয়েক হাজার বছর সময় লেগেছিলো। ফলে স্বভাবতই পুরো সময় বা যুগটি ধরে বৈদিক সমাজ যে অপরিবর্তিত থাকেনি তা বলার অপেক্ষা রাখে না; বৈদিক ভাবধারায়ও ঘটেছে ক্রম-বিবর্তন।

এখানে আরও উল্লেখ্য, বৈদিক সাহিত্যের সর্বশেষ অংশের নাম হলো উপনিষদ; তাই তাকে বেদান্ত বলা হয়। এই উপনিষদে অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী চিন্তার সুস্পষ্ট বিকাশ অনস্বীকার্য, যদিও এই ভাববাদের পক্ষে যুক্তি-তর্ক প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত দার্শনিক রূপ দেবার আয়োজন উপনিষদে চোখে পড়ে না। পরবর্তীকালে সচেতনভাবে সে-আয়োজন করেছিলেন উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্ত সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা। এই বৈদান্তিক আচার্যদের মধ্যেও পারস্পরিক মতপার্থক্য ও মতবিরোধ থাকলেও একটি বিষয়ে সকলেই সম্পূর্ণ একমত ছিলেন যে,– উপনিষদের তত্ত্বই পরম তত্ত্ব, অতএব বৈদান্তিক-মাত্রেরই আদর্শ হলো ঔপনিষদিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা, এবং অবশ্যই উপনিষদ-বিরোধী তত্ত্বের খণ্ডনও। তাই বৈদিক ঐতিহ্যে অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী চিন্তাধারা শুধুমাত্র বৈদিক সাহিত্যের অন্তিম পর্যায়েরই পরিচায়ক, সমগ্র বৈদিক সাহিত্যের নয়। ফলে ঔপনিষদিক অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদের আলোচনা উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্ত দর্শনের প্রসঙ্গেই প্রাসঙ্গিক হবে। তবে বৈদিক সাহিত্যের উপনিষদ-পূর্ব অংশ এবং ওই ঔপনিষদিক ভাববাদের প্রাক্-ইতিহাস জানতে আমাদেরকে ঋগ্বেদের আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক বেদবাদী বিদ্বানদের মধ্যে সমগ্র বৈদিক সাহিত্যকে এক অভিন্ন চিন্তাধারার– একই অধ্যাত্মবাদের– নিদর্শক বলে ব্যাখ্যা করার যে প্রবণতা দেখা গিয়েছে, বস্তুনিষ্ঠ বিচারে ঋগ্বেদে তার সমর্থন নেই বললেই চলে। কেননা বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন অংশে– বস্তুত ঋগ্বেদের প্রধানতম অংশে– যে ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায় তাকে অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী আখ্যা দেবার সুযোগ অল্পই। এবং সে-ভাবধারা এমনই আদিম ও প্রাচীন যে তার আধুনিক সংজ্ঞা খোঁজাও নিষ্ফল বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন। তিনি এটিকে প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ভাবধারা হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে–
বৈদিক ঐতিহ্যে ওই প্রাক্-অধ্যত্মবাদী ভাবধারার ধ্বংসস্তুপের উপরই কালক্রমে অধ্যাত্মবাদী ভাবধারার আবির্ভাব ঘটেছিল; ঋগ্বেদ থেকে উপনিষদ্ পর্যন্ত বিশাল সাহিত্যে এই চিন্তাবিবর্তনের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে এবং এমনকি উপনিষদের মধ্যেও ওই প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ভাবধারার বহু স্মারক টিকে থেকেছে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১২৭)

স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, ওই প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ভাবধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী? উত্তরে দেবীপ্রসাদ বলেন–
অন্যান্য আদিম ও অনুন্নত মানুষদের মতো বৈদিক মানুষদেরও আদি-পর্যায়ে জীবন-সংগ্রামের সমস্যা এমনই কঠিন ও ঐকান্তিক যে তদুপরি কোনো অমূর্ত দার্শনিক সমস্যার প্রতি আকৃষ্ট হবার সুযোগ-সম্ভাবনা থাকা স্বাভাবিক নয়। এবং তা ছিলও না। অন্ন-চিন্তাই যেন বৈদিক কবিদের পরম চিন্তা; তত্ত্ব-জিজ্ঞাসা তাঁদের রচনার বৈশিষ্ট্য নয়। সমগ্র ঋগ্বেদ জুড়ে তাই কয়েকটি নেহাতই পার্থিব কামনার যেন অন্তহীন পুনরুক্তি এবং কামনাগুলিও ওই অনুন্নত পর্যাযের অনুরূপ : অন্নের কামনা, পশুর কামনা, সন্তানের কামনা, ইত্যাদি। উত্তরকালের অধ্যাত্মবাদী দর্শনে যে-মোক্ষের আদর্শ পরম পুরুষার্থ বলে স্বীকৃত ঋগ্বেদে তার ঐকান্তিক অভাব উপেক্ষণীয় নয়, এবং আমরা…দেখব, অন্তত পূর্ব-মীমাংসকেরা স্বর্গ সংক্রন্ত বৈদিক ধারণার ব্যাখ্যায় লোকোত্তর পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন : নিরতিশয় সুখ বা প্রীতিই স্বর্গ এবং তা ইহলোকেই ভোগ্য। অনুমানের প্রলোভন হয় যে এমনকি উপনিষদের ঋষিদের স্মৃতি থেকেও সেই আদিম যুগের নির্মম প্রাণ-ধারণের সমস্যার কথা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১২৭)

এ-প্রেক্ষিতে ছান্দোগ্য উপনিষদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে। ছান্দোগ্যে বলা হয়েছে–

‘দেবা বৈ মৃত্যোর্বিভ্যতস্ত্রয়ীং বিদ্যাং প্রাবিশংন্তে ছন্দোভিরচ্ছাদয়ন্যৎ এভিঃ অচ্ছাদয়ংস্তচ্ছন্দসাং ছন্দস্ত্বম্’।। (ছান্দোগ্য-১/৪/২)।।
অর্থাৎ : দেবতারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে ত্রয়ী বিদ্যায় (তিনটি বেদ-এ) প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। তাঁরা ছন্দদ্বারা (নিজেদের) আচ্ছাদিত করেছিলেন। যেহেতু এই সমুদয় দ্বারা আচ্ছাদিত করেছিলেন তাই ছন্দসমূহের নাম ছন্দ।

কিন্তু এই মৃত্যুভয়ের কারণ কী? বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে–

‘নৈবেহ কিংচনাগ্র আসীৎ মৃত্যুনৈব ইদম্ আবৃতমাসীৎ। অশনায়য়া অশনায়া হি মৃত্যুঃ।’- (বৃহদারণ্যক-১/২/১)।
অর্থাৎ : পূর্বে এখানে কিছুই ছিলো না। এই জগৎ মৃত্যুর দ্বারা আবৃত ছিলো। ‘অশনায়া’-রূপ মৃত্যু। ‘অশনায়া’ হলো ভোগেচ্ছা-বুভুক্ষা-ক্ষুধার দাহ। কারণ বুবুক্ষাই হলো– মৃত্যু।


উপনিষদ্-বাক্যের এ-জাতীয় অর্থ আধুনিক অধ্যাত্মবাদীদের বিরক্তি সঞ্চার করলেও, দেখা যায় যে, ঋগ্বেদের ঋষিরা তো ননই– এমনকি উপনিষদের ঋষিরাও সর্বত্র সমানভাবে ক্ষুধা-তৃষ্ণার বাস্তবতা এবং অন্নের গরিমা উপেক্ষা করেননি। অবশ্যই বিশ্বের অন্যান্য আদিম ও অনুন্নত মানুষদের মতোই বৈদিক মানুষদের মনেও পৌরাণিক বিশ্বাস ছিলো। ঋগ্বেদ তাই বহু দেবতার কথায় ভরপুর। কিন্তু এই দেবতাদের নজির থেকেও ঋগ্বেদে প্রকৃত অধ্যাত্মবাদ প্রমাণিত হয় না। কেননা পার্থিব কামনাই এই দেবকল্পনার প্রধানতম উপাদান এবং ঋগ্বেদে বৈদিক দেবতা ও বৈদিক মানুষদের মধ্যে পার্থক্য সবসময় সুস্পষ্ট নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মীমাংসা-দর্শনের আলোচনায় দেখা যাবে যে, বেদের যথার্থ ব্যাখ্যাকার হিসেবে স্বীকৃত পূর্ব-মীমাংসকরা– তথা বেদের উপনিষদ-পূর্ব অংশের উপর একান্ত নির্ভরশীল আচার্যরাও ঈশ্বরের অস্তিত্ব-সম্ভাবনা খণ্ডন করেছেন এবং তাঁদের ব্যাখ্যা অনুসারেও বৈদিক দেবতাদের ঐকান্তিক গৌণত্বই প্রতিপাদিত হয়। অতএব এই দেবতাদের উপর দৃষ্টি আবদ্ধ রেখে ঋগ্বেদে কোনো আধ্যাত্মিক– তথা দার্শনিক– তত্ত্ব অন্বেষণ করা আদৌ যুক্তিযুক্ত হবে না। তবে বিদ্বান গবেষকদের মতে, প্রাচীন কবিদের রচনায় যদি বাস্তবিকই কোনো অস্ফুট দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির আভাস থাকে তা হলে তার পরিচয় ‘ঋত’-র তত্ত্বে। ‘ঋত’-র কোনো আধুনিক প্রতিশব্দ সম্ভব নয়। ধারণাটিকে বিশ্লেষণ করে প্রাকৃতিক নিয়মানুবর্তিতা এবং নৈতিক নিয়মানুবর্তিতার কোনো এক আদিম সমন্বয় অনুমিত হয়। তবে এ নিয়মানুবর্তিতা কিন্তু দেবতাদের ইচ্ছাধীন বা আওতাধীন নয়; বরং দেবতারা ঋত-র অনুগামী এবং মানবদের মতোই ঋতযুক্ত। তাই ঋতকেও অধ্যাত্মবাদরে নজির বলা যায় না বলে দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেছেন।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঋগ্বেদের রচনাকালেই ঋত-র চেতনা ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যায়; এমনকি কোনো কোনো কবি ঋত-হীন নতুন পরিস্থিতিকে অভিসম্পাত দিয়েছেন এবং অতীতের স্মৃতি উদ্বুদ্ধ করে নতুনভাবে ঋত-র জন্ম আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। প্রশ্ন হলো, ঋগ্বেদের এই অস্ফুট দার্শনিক চেতনার উৎসে কী ছিলো এবং কালক্রমে কেনই বা তা বিলীন হয়ে গেলো? এ প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য–
মানব-চেতনা সমাজ-নিরপেক্ষ নয়– বৈদিক কবিদের চেতনাও নয়। এই মূল-সূত্র অনুসারে অগ্রসর হয়ে বৈদিক সমাজ-ইতিহাসের মধ্যেই উক্ত প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করেছি এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে অন্যান্য আদিম মানুষদের মতোই বৈদিক কবিরাও আদিতে যৌথ-জীবন যাপন করতেন; তখন তাঁদের সমাজ-সংগঠন প্রাক্-বিভক্ত বা আদিম সাম্যসমাজ। এই পর্যায়ের চেতনাই ঋত-র পরিকল্পনায় প্রতিফলিত। কিন্তু কালক্রমে– বিশেষত যুদ্ধ ও লুণ্ঠন-মূলক কীর্তির প্রাধান্য-ফলে– সেই আদিম সাম্য-সংগঠন ধূলিসাৎ হয় এবং তারই ধ্বংসস্তূপের উপর আবির্ভূত হয় ব্রাহ্মণ-সমর্থিত ক্ষত্রিয়-শাসিত সুস্পষ্ট শ্রেণী-বিভক্ত সমাজ। স্বভাবতই ঋত-র চেতনাও ক্রমশ বিলীন হয়ে যায়।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১২৮)

মোটকথা, সুবিশাল বৈদিক সাহিত্য রচিত হবার সুদীর্ঘ যুগ ধরে বৈদিক মানুষেরা ক্রমশই আদিম প্রাক্-বিভক্ত সমাজ পিছনে ফেলে শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের দিকে অগ্রসর হয়েছে। বৈদিক সমাজ-ইতিহাসের এই মৌলিক পরিবর্তনের মধ্যেই বৈদিক চিন্তা-ইতিহাসের মূল পরিবর্তনটি বোঝার মূলমূত্র পাওয়া যায়। আর চিন্তা-ইতিহাসের মূল পরিবর্তন বলতে প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী চেতনার ধ্বংসস্তূপের উপর অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী চেতনার আবির্ভাব। এ-প্রেক্ষিতে আমরা ঋগ্বেদ-সাহিত্যে প্রাক্-অধ্যাত্মবাদের বৈশিষ্ট্যগুলির অনুসন্ধান ও তার তাৎপর্য পর্যালোচনা করার চেষ্টা করতে পারি। তবে ঋগ্বেদের সমাজ-পরিবর্তন ও চিন্তা-চেতনা পরিবর্তনের মধ্যে কার্য-কারণ সম্বন্ধ অনুমানের ক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আদিম যৌথ-জীবন যৌথ-শ্রমের উপরই প্রতিষ্ঠিত। এবং এই পর্যায়ে তাই চিন্তার দায়িত্ব ও শ্রমের দায়িত্ব– তথা জ্ঞানের দায়িত্ব ও কর্মের দায়িত্ব– দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য বা বিরোধ নেই। বৈদিক শব্দ-ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য থেকেই অনুমান হয়, বৈদিক সাহিত্য রচনার কোনো এক পর্যায়ে জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে এ-জাতীয় অবিচ্ছিন্ন সম্বন্ধ বর্তমান ছিলো। কিন্তু বহু পরবর্তীকালে সমাজ-সংগঠন যতো সুস্পষ্টভাবে শ্রেণীবিভক্ত হতে থাকে ততই নিন্দিত হতে থাকে কায়িক শ্রম, গৌরবান্বিত হতে থাকে শ্রম-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ জ্ঞান; এবং তারই চরম পরিণাম অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী চিন্তা-চেতনা। তাই দেখা যায় বেদান্ত বা উপনিষদে কর্ম নিন্দিত ও বিশুদ্ধ জ্ঞান প্রশংসিত। কিন্তু প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ঋগ্বেদ পর্যায়ে যৌথ-জীবন ও যৌথ-শ্রমের স্মারক খুঁজে পাওয়া অমূলক নয়।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : বৈদিক সাহিত্য- ভাষ্য] [*] [পরের পর্ব : ঋগ্বেদের সমাজ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৭ : বৈদিক সাহিত্যে সমাজ ও তার চিন্তাধারা|"

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,672 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: