h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৬ : বৈদিক সাহিত্য- ভাষ্য|

Posted on: 05/07/2015


book art

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৬ : বৈদিক সাহিত্য- ভাষ্য |
রণদীপম বসু

২.৫ : ভাষ্য

ভাষ্য হলো ক্রমান্বয়ে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠা প্রাচীন সাহিত্যের একজাতীয় বোধগম্য ব্যাখ্যা। বৈদিক-সাহিত্যের আলোচনা প্রসঙ্গে এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আধুনিক বিদ্বান গবেষকেরা অনুমান করেছেন, সংহিতা-যুগের অনেক পরে পুরোহিতেরা যখন ‘ব্রাহ্মণ’-গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন তখনই তাঁদের কাছে প্রাচীন সংহিতায় সংকলিত রচনাবলীর অর্থ অনেকাংশেই অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হয়ে গেছে। কেননা ওই পুরোহিত শ্রেণীর স্মৃতিতেই প্রাচীন রচনাবলী সংরক্ষিত হলেও– এবং এই রচনাবলীকে পরবর্তীকালে পুরোহিতেরা পবিত্রতম বলে গ্রহণ করলেও– ইতোমধ্যে বৈদিক মানুষদের ভাষায় সুগভীর পরিবর্তন ঘটেছে; ফলে প্রাচীন ভাষার পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য ‘ব্রাহ্মণ’-কারদের কাছে সুস্পষ্ট নয়। তাছাড়া ‘ব্রাহ্মণে’র যুগে আরও একটি যে উৎসাহ সুস্পষ্ট হয়েছে, তা হলো, ঋগ্বেদ-সংহিতায় সংকলিত সূক্তগুলি আদিতে যে-উদ্দেশ্যেই রচিত হোক না কেন, ‘ব্রাহ্মণে’র যুগে এগুলিকে– বা এগুলির অংশবিশেষকে– নানান যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রয়োগ করবার প্রচেষ্টা পরিস্ফুট হয়েছে। আর এ-কারণে ‘ব্রাহ্মণ’-গ্রন্থে প্রায়ই দেখা যায়, প্রাচীন ঋক্-গুলির– বা এমনকি অনেক সময় প্রাচীন শব্দগুলিরও– নতুন নতুন অর্থ উদ্ভাবন করবার প্রচেষ্টা চলেছে।


অতএব,– ‘পরবর্তীকালে প্রাচীন বৈদিক রচনাবলীর অর্থনির্ণয় প্রসঙ্গে নানা রকম মতান্তর দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। স্পষ্টই বোঝা যায়, ‘নিরুক্ত’ রচনার যুগেই বেদবিদদের মধ্যে বেদার্থ-নিরূপণ প্রসঙ্গে নানা রকম গভীর ও মৌলিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। কেননা, বেদ-ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ‘নিরুক্ত’-কার স্বয়ং যাস্ক অন্তত সতেরোজন পূর্বানুগামী বিদ্বানের উল্লেখ করেছেন এবং যাস্কের রচনা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় এঁদের মতামত বা ব্যাখ্যা বহুলাংশেই পরস্পরবিরোধী ছিল। এমনকি তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এমন মতবাদ প্রকাশ করেছিলেন যে বৈদিক সূক্তগুলি দুর্বোধ্য অর্থহীন ও পরস্পরবিরোধী, অতএব বেদ-ব্যাখ্যা পণ্ডশ্রম মাত্র। উত্তরে অবশ্য যাস্ক বলছেন, অন্ধ যদি স্তম্ভ দেখতে না পায় তাহলে অপরাধটা স্তম্ভের নয়। কিন্তু এ-বিষয়েও সন্দেহ নেই যে স্বয়ং যাস্ক অনেক সময় একই বৈদিক শব্দের একাধিক অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। অতএব বোঝা যায়, যাস্কের সময় পর্যন্তও প্রাচীন বৈদিক শব্দ ও বাক্যের অর্থনির্ণয় সংক্রান্ত ঐতিহ্যের কোনো অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা বর্তমান ছিল না। কিন্তু যাস্কের পূর্ববর্তী বেদ-ব্যাখ্যাকারদের রচনার মতোই তাঁর পরবর্তী ব্যাখ্যাকারদের রচনাও বিলুপ্ত হয়েছে। ঋগ্বেদের সামগ্রিক ভাষ্য বলতে আমরা যা পাই তা হলো খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে সায়ণাচার্যের রচনা; এই সায়ণভাষ্যে ঋগ্বেদের প্রতিটি ঋকের প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রট্ প্রভৃতি কোনো কোনো আধুনিক ইউরোপীয় বিদ্বান ঋগ্বেদের ব্যাখ্যায় সায়ণের এই ভাষ্যকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করবার প্রস্তাব করেছেন। তাঁদের যুক্তি অনুসারে ঋগ্বেদ রচনার অন্তত দু’তিন হাজার বছর পরে সায়ণ ঋগ্বেদের যে-ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা মূলতই সায়ণের নিজস্ব উদ্ভাবন হতে বাধ্য; তাই এর উপর নির্ভর না করে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতি আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে ঋগ্বেদের প্রকৃত অর্থ নির্ণয় করা বাঞ্ছনীয়। রট্ প্রমুখ বিদ্বানেরা সেই চেষ্টাই করেছেন।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১২২)

কিন্তু অন্য বিদ্বানেরা অবশ্যই এইভাবে সায়ণ-ভাষ্যকে সম্পূর্ণ বর্জন করতে সম্মত নন। তাঁদের মতে সায়ণকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা সায়ণের উপর একান্তভাবে নির্ভর করবার মতোই ভুল। কেননা, যদিও এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে অনেক সময় সায়ণের ব্যাখ্যা তাঁরই উদ্ভাবন তবুও সায়ণ যে একেবারেই কোনো রকম প্রাচীন ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করেন নি তাও মনে করা ঠিক নয়। অতএব বেদার্থ-বিচারে আধুনিক ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতির উপযোগিতা স্বীকার করে অনেকাংশে সায়ণের অনুসরণও বাঞ্ছনীয়। বেদের আলোচনায় মোটের উপর এই মতটিই গ্রহণ করা যেতে পারে।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : বৈদিক সাহিত্য- বেদাঙ্গ] [*] [পরের পর্ব : বৈদিক সাহিত্যে সমাজ ও তার চিন্তাধারা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৬ : বৈদিক সাহিত্য- ভাষ্য|"

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 440,961 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 124 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

  • গ্রন্থ : ইয়োগা (স্বাস্থ্য ও যৌগিক ব্যায়াম, রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৯)... https://t.co/SpIL5tcLTi 4 months ago
  • ছবি : একান্নবর্তী সংসারের নতুন-পুরনো সদস্যরা... https://t.co/7HJBdUekkd 1 year ago
  • গ্রন্থ : টিপলু (কিশোর গল্প, দ্যু প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/zID65r8q97 1 year ago
  • গ্রন্থ : ছড়া-কবিতার ঝুল-বারান্দায় (ছোট কবিতা প্রকাশন, জানুয়ারি-২০১৮) https://t.co/Goy6tNtWr0 1 year ago
  • গ্রন্থ : নাস্তিক্য ও বিবিধ প্রসঙ্গ (রোদেলা প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি-২০১৮) https://t.co/ECvpDneHSe 1 year ago
Protected by Copyscape Web Plagiarism Check

Flickr Photos

Advertisements
%d bloggers like this: