h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৩ : বৈদিক সাহিত্য- ব্রাহ্মণ|

Posted on: 04/07/2015


Chanakya-quotes

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৩ : বৈদিক সাহিত্য- ব্রাহ্মণ |
রণদীপম বসু

২.২ : ব্রাহ্মণ

মীমাংসা-সূত্রকার মহর্ষি জৈমিনি বেদকে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ– এই দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন। মন্ত্র হচ্ছে সর্বপ্রাচীন ভাগ। মন্ত্রের ব্যাখ্যা করা হলো ব্রাহ্মণের কর্ম এবং যজ্ঞের বিধিবিধানে তার প্রয়োগ করা। মূলত যাগ-যজ্ঞ সম্বন্ধে নানা প্রকার আচার-অনুষ্ঠান ও বিধি-নিষেধমূলক নির্দেশিত গদ্যে রচিত সাহিত্যই ‘ব্রাহ্মণ’। কোন্ যজ্ঞ করলে কী ফল পাওয়া যাবে, কোন্ যজ্ঞে কোন্ পুরোহিতকে কত দক্ষিণা দিতে হবে, কোন্ যজ্ঞকর্মের খুঁটিনাটি প্রক্রিয়া ঠিক কেমনভাবে সাধন করতে হবে, কোন্ যজ্ঞের ঠিক কোথায় কীভাবে কোন্ মন্ত্র প্রয়োগ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদিই ‘ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিত গ্রন্থগুলির প্রধানতম আলোচ্য-বিষয়। অনেক সময় এতে যজ্ঞকর্ম ছাড়াও খুঁটিনাটি অনুষ্ঠানেরও গূঢ় আধ্যাত্মিক তাৎপর্য উদ্ভাবন করবার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।


‘কৃষ্ণ-যজুর্বেদ সংহিতা’য় মন্ত্র ছাড়াও নানা জায়গায় যজ্ঞের উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যাসংক্রান্ত আলোচনা এবং বিভিন্ন মতবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়; ধারণা করা হয়, এই অংশগুলি থেকেই পরবর্তী কালের ‘ব্রাহ্মণ-সাহিত্যে’র সূত্রপাত হতে পারে। কোনো কোনো ‘ব্রাহ্মণে’র স্থানবিশেষে কিছু কিছু প্রাচীন আখ্যায়িকাও সংযোজিত হয়েছে দেখা যায়; কিন্তু এ-জাতীয় আখ্যায়িকাকে ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য মনে করা যায় না। তাহলে ‘ব্রাহ্মণ’ সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য কী? এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেন-
পৃথিবীর ইতিহাসে যাগযজ্ঞমূলক ক্রিয়াকাণ্ডের এমন জটিল ও বিশাল সাহিত্য কোথাও নেই। কিন্তু এ-সাহিত্য সুখপাঠ্যও নয়, চিন্তার গভীরতার পরিচায়কও নয়। ‘ব্রাহ্মণ’গুলি গদ্যে রচিত। সে-গদ্য এলোমেলো, খাপছাড়া, জটিল ও একান্তই কৃত্রিম। প্রাচীন বৈদিক গানে যে সৃজনী শক্তির পরিচয়, ‘ব্রাহ্মণ’গুলির মধ্যে তার যেন কিছুই অবশিষ্ট নেই। চিন্তাধারার দিক থেকেও আধুনিক পাঠকের কাছে এই ‘ব্রাহ্মণ’গুলি উদ্ভট– এমনকি অবান্তর ও অসম্ভব– মনে হবে। কেননা যাগযজ্ঞের নানান খুঁটিনাটির নানা রকম ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করবার প্রচেষ্টায় গ্রন্থকারেরা যে-সব কথা বলবার চেষ্টা করেছেন প্রায়ই সেগুলির বিশেষ কোনো সুসঙ্গত অর্থ হয় না। প্রায়ই দেখা যায়, প্রাচীন মন্ত্রগুলিকে– বা অনেকসময় মন্ত্রগুলির খণ্ড-বিক্ষিপ্ত অংশমাত্রকে– বিভিন্ন যজ্ঞের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করাবার সময় গ্রন্থকারেরা মন্ত্রগুলির আদি ও অকৃত্রিম তাৎপর্যের প্রতি মোটের উপর ঔদাসীন্যই প্রকাশ করেছেন, কিংবা যেন-তেন প্রকারে ওই প্রাচীন গানগুলিকে বিভিন্ন যজ্ঞানুষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিতে চেয়েছেন।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০৯)

এ থেকেই বোঝা যায়, সংহিতায়– বিশেষ করে ঋগ্বেদ-সংহিতায়– সংকলিত প্রাচীন স্তুতিগুলি যে পরিস্থিতিতে রচিত হয়েছিলো, ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্যে তার পরিচয় আর নেই। তার মানে, যাঁরা এই ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্য রচনা করেছিলেন তাঁদের কাছে হয়তোবা যাগযজ্ঞের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। পূর্বপুরুষদের রচিত প্রাচীন স্তোত্র বা গানগুলি অবশ্যই তাঁদের ধারণায় অতীব পবিত্র, এবং এই কারণেই তাঁরা হয়তো যাগযজ্ঞ সংক্রান্ত নিজেদের উৎসাহের সঙ্গে কোনোমতে প্রাচীন গানগুলিকে সংযোজিত করতে চেয়েছিলেন। ফলে– ‘বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাসে একদিক থেকে যে-রকম ‘সংহিতা’ ও ‘ব্রাহ্মণে’র মধ্যে রচনাকৌশল ও বিষয়বস্তু উভয়েরই অত্যন্ত সুস্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে, অপর দিক থেকে আবার দেখা যায়, যত কৃত্রিমভাবেই হোক না কেন ‘ব্রাহ্মণ’-প্রণেতারা প্রাচীন ‘সংহিতা’র সঙ্গে কোনো একটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখবার প্রয়াস করেছিলেন। এই প্রয়াসের ফলেই প্রত্যেক ‘ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থকে কোনো-না-কোনো সংহিতার সঙ্গে জুড়ে দেবার আয়োজনও করা হয়েছিল।

এককালে ‘ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থ অনেক ছিলো; তার মধ্যে বহু গ্রন্থ বিলুপ্ত হয়েছে। তবু ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্য হিসেবে আজও যা টিকে আছে তার মোট কলেবরও সুবিশাল। যেমন ঋগ্বেদের দুটি ব্রাহ্মণের কথা জানা যায়। একটি ঐতরেয় এবং অন্যটি কৌষীতকি। ঐতরেয় ব্রাহ্মণকে ভাগ করা হয়েছে চল্লিশটি অধ্যায়ে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সংকলক ছিলেন মহীদাস। এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু ছিলো সোমযাগ, অগ্নিহোত্র ও রাজসূয়যজ্ঞ। কৌষীতকি ব্রাহ্মণ বিভক্ত ছিলো ত্রিশটি অধ্যায়ে। এর বিষয়বস্তু ঐতরেয় ব্রাহ্মণের মতো হলেও এখানে সাধারণ গার্হস্থ্য জীবন সম্পর্কেও বক্তব্য রয়েছে। সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদেরও বেশ কিছু ‘ব্রাহ্মণ’ রয়েছে। ‘সংহিতা’ গ্রন্থের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান প্রধান ‘ব্রাহ্মণ’গুলির তালিকা এরকম–
ক। ঋগ্বেদ-সংহিতার সঙ্গে সংযুক্ত–

    ১। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ

    ২। কৌষীতকি বা সাংখ্যায়ন ব্রাহ্মণ
খ। সামবেদ-সংহিতার সঙ্গে সংযুক্ত–

    ১। তাণ্ড্যমহাব্রাহ্মণ বা পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণ

    ২। ষড়বিংশ ব্রাহ্মণ

    ৩। জৈমিনীয় বা তলবকার ব্রাহ্মণ
গ। কৃষ্ণ-যজুর্বেদ-সংহিতার সঙ্গে সংযুক্ত–

    ১। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ

    ২। কঠ ব্রাহ্মণ
ঘ। শুক্ল-যজুর্বেদ-সংহিতার সঙ্গে সংযুক্ত–

    ১। শতপথ ব্রাহ্মণ
ঙ। অথর্ববেদ-সংহিতার সঙ্গে সংযুক্ত–

    ১। গোপথ ব্রাহ্মণ।

বিভিন্ন সংহিতার সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন ‘ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থের মধ্যে মূল পার্থক্য আসলে কী? পরবর্তী কালের বৈদিক যজ্ঞে যেমন বিভিন্ন পুরাহিত নিযুক্ত করবার ব্যবস্থা ছিলো, যেমন– ঋত্বিক বা হোতা ঋগ্বেদের সুক্ত উচ্চারণ করবেন, উদ্গাতা সামবেদের গান করবেন, অধ্বর্যু যজুর্বেদের মন্ত্র পাঠ করবেন এবং অগ্নিতে আহুতি দেবেন; তেমনি ঋগ্বেদের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্রাহ্মণে’ ঋত্বিক-এর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে, সামবেদের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্রাহ্মণে’ উদ্গাতার উপর, যজুর্বেদের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ব্রাহ্মণে’ অধ্বর্যুর উপর। কিন্তু বিভিন্ন ‘ব্রাহ্মণে’র মধ্যে এই পার্থক্যের চেয়ে বড় কথা হলো এর সাদৃশ্যের দিকটা। আর এই সাদৃশ্য বলতে যজ্ঞানুষ্ঠানের নানা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জটিল ও সুদীর্ঘ আলোচনা।
মোট  কথা, ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্যে যজ্ঞানুষ্ঠানের চেয়ে বড় আর কিছুই নেই। এমনকি প্রাচীন বৈদিক দেবতারাও নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্য যজ্ঞানুষ্ঠান করতে বাধ্য। স্রষ্টা প্রজাপতির কথা আছে; কিন্তু ওই প্রজাপতি ও যজ্ঞ অভিন্ন। এক কথায়, যজ্ঞই সব, যজ্ঞ ছাড়া কিছু নেই; যজ্ঞই একমাত্র সত্য, একমাত্র পুরুষার্থ। এই যজ্ঞের কথা– যজ্ঞানুষ্ঠান-পদ্ধতি ও তার গূঢ় গোপন রহস্য– একমাত্র ব্রাহ্মণ-শ্রেণীরই জানা আছে। স্বভাবতই এই ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্যে যজ্ঞবিদ্ ব্রাহ্মণ-শ্রেণীর  চেয়ে বড় আর কিছুই হতে পারে না। কোনো কোনো ‘ব্রাহ্মণে’ এই ব্রাহ্মণ-শ্রেণীকে দেবতাদের সঙ্গে সমান প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং অবশ্যই বারবার বিধান দেওয়া হয়েছে যাতে ব্রাহ্মণ-শ্রেণীর স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে।

স্বভাবতই এ-জাতীয় সাহিত্যে নীতিবোধের স্থান থাকবার কথা নয়, ‘ব্রাহ্মণ’-সাহিত্যেও তা নেই। এ-প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদের মন্তব্য হলো-
ব্রাহ্মণ’-গ্রন্থ-কর্তাদের সামনে একমাত্র আদর্শ হলো, যজমান– এবং অবশ্যই পুরোহিতদের– ঐহিক সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করা। এবং এই সুখ-সমৃদ্ধির জন্য দেবতাদের অনুকম্পা জাগানো বা ওই ধরনের কোনো উপায় অবলম্বন করবার প্রশ্ন ওঠে না; নির্ভুল পদ্ধতিতে যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পাদন করতে পারলে যন্ত্রের মতো অবধারিতভাবেই ওই ঐহিক সুখ-ভোগ সম্ভব হবে। স্বভাবতই এ-জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বিদ্বানদের কাছে অত্যদ্ভূত বলে প্রতীত হয়েছে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১১১)

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব : বৈদিক সাহিত্য– সংহিতা] [*] [পরের পর্ব : বৈদিক সাহিত্য- আরণ্যক ও উপনিষদ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০৩ : বৈদিক সাহিত্য- ব্রাহ্মণ|"

খুব তথ্য সমৃদ্ধ। দারুণ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 176,747 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: