h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০২ : বৈদিক সাহিত্য– সংহিতা|

Posted on: 04/07/2015


upanishad

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০২ : বৈদিক সাহিত্য– সংহিতা |
রণদীপম বসু

২.০ : বৈদিক সাহিত্য

ব্রহ্মবিদদের কাছে ‘বেদ’ মানে যদিও পবিত্র ও পরম জ্ঞান, তবুও পরবর্তীকালে ‘বেদ’ বলতে এক নির্দিষ্ট সাহিত্যই বোঝায়– ভারতবর্ষীয়, তথা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সর্বপ্রাচীন সাহিত্য। তবে এই সাহিত্য অর্থে ‘বেদ’ বলতে কোনো একটি গ্রন্থ বিশেষ বোঝায় না– প্রায় শতাধিক গ্রন্থের সমষ্টি বোঝায়। যদিও চলতি কথায় আমরা শুধুমাত্র একধরনের রচনা ‘সংহিতা’কেই  ‘বেদ’ আখ্যা দিয়ে থাকি, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই শতাধিক গ্রন্থের সমষ্টিকেই ‘বৈদিক সাহিত্য’ বলা হয়।

মুণ্ডক-উপনিষদের শ্রুতিতে আছে-

‘দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে ইতি হ স্ম যদ্ ব্রহ্মবিদো বদন্তি–পরা চৈবাপরা চ’। (মুণ্ডক-১/১/৪)।।
‘তত্রাপরা–ঋগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোহথর্ববেদঃ শিক্ষা কল্পোব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দো জ্যোতিষমিতি। অথ পরা–যয়া তদক্ষরষধিগম্যতে। (মুণ্ডক-১/১/৫)।।
অর্থাৎ :
ব্রহ্মবিদরা বলেন, দুটি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে। একটির নাম পরাবিদ্যা, অপরটির নাম অপরাবিদ্যা। (মুণ্ডক-১/১/৪)।।  ঋক্, যজুঃ, সাম, অথর্ব– এই চার বেদ এবং শিক্ষা (উচ্চারণ), কল্প (আচার-অনুষ্ঠান), ব্যাকরণ, নিরুক্ত (শব্দার্থবিদ্যা), ছন্দ ও জ্যোতিষ (জ্যোতির্বিজ্ঞান) নিয়ে যে ছয় বেদাঙ্গ– এগুলি হলো অপরাবিদ্যা। আর যে বিদ্যাবলে অক্ষরব্রহ্মকে জানা যায়– তা হলো পরাবিদ্যা। (মুন্ডক-১/১/৫)।।


এই শ্রুতির মধ্যেই বৈদিক সাহিত্যের একটি সম্পূর্ণ তালিকা পাওয়া যায়। এখানে বৈদিক সাহিত্যকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে আছে ব্রহ্মবিদ্যা বা অধ্যাত্মবিদ্যার উৎস পরাবিদ্যা, যার আশ্রয় বেদেরই অঙ্গীভূত এক শ্রেণীর রচনা যাকে আমরা উপনিষদ বলি এবং অন্য ভাগে যাবতীয় জাগতিক জ্ঞানের উৎস অপরাবিদ্যা, যেখানে প্রথমেই আছে চারটি বেদ– ঋক্, সাম, যজু এবং অথর্ব। তারপর রয়েছে ছয়টি বেদাঙ্গ– শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ।

এছাড়া খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রচিত কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে’ও বলা হচ্ছে-

‘সামর্গ্যজুর্বেদা-স্ত্রয়স্ত্রয়ী। অথর্ববেদেতিহাসবেদৌ চ বেদাঃ। শিক্ষা কল্পো ব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দোবিচিতির্জোতিষমিতি চাঙ্গানি।
এষ ত্রয়ীধর্মশ্চতুর্ণাং বর্ণানামাশ্রমাণাং চ স্বধর্মস্থাপনাদৌপকারিকঃ।’ (অর্থশাস্ত্র-১/৩/১)।।
অর্থাৎ :
সামবেদ, ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদ– এই তিনটি ‘ত্রয়ী’ নামে পরিচিত। অথর্ববেদ এবং ইতিহাসবেদও (যথা, মহাভারত-পুরাণাদি) বেদ-শব্দবাচ্য। শিক্ষা (বর্ণাদির উচ্চারণস্থানের উপদেশবিষয়ক শাস্ত্র), কল্প (যজ্ঞাদির অনুষ্ঠানের উপদেশবিষয়ক আশ্বলায়নাদি-প্রণীত শাস্ত্র), ব্যাকরণ (শব্দের শুদ্ধ্যশুদ্ধির উপদেশবিষয়ক এবং পাণিনিপ্রভৃতির দ্বারা প্রণীত শাস্ত্র), নিরুক্ত (যাস্কপ্রণীত শব্দনির্বচনবিষয়ক শাস্ত্র), ছন্দোবিচিতি (ছন্দোনিরূপণ-বিষয়ক পিঙ্গলাদিপ্রণীত শাস্ত্র) ও জ্যোতিষ (সূর্যাদির অবস্থান ও গতিপ্রভৃতির প্রতিপাদক শাস্ত্র)– এই ছয়টি (বেদের) অঙ্গ (তাই বলা হয়– যড়ঙ্গো বেদঃ)।
এই ত্রয়ীতে (ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র–) চার বর্ণের এবং (ব্রহ্মচর্য-গার্হস্থ্য-বানপ্রস্থ-সন্ন্যাস–) চার আশ্রমের নিজ নিজ ধর্ম বা কর্তব্য ব্যবস্থাপিত হওয়ার জন্য এই শাস্ত্র সকলের উপকার সাধন করে থাকে। (অর্থশাস্ত্র-১/৩/১)।।


এখানে দুটি বাক্যে বৈদিক সাহিত্যের পরিচয় পাওয়া গেলেও বৈদিক সাহিত্যের সাধারণপরিচয়টুকু স্পষ্ট করতে হলে আমাদেরকে একটু ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় আলোচনা করতে হবে। সেক্ষেত্রে ‘বৈদিক সাহিত্য’ অর্থে এই ‘বেদ’-কে প্রধানত চারটি শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেমন-

ক)    ‘সংহিতা’ বা সংগ্রহ– গান, স্তোত্র, মন্ত্র প্রভৃতির সংকলন।
খ)    ‘ব্রাহ্মণ’–  গদ্যে রচিত একজাতীয় যাগযজ্ঞ-বিষয়ক সুবিশাল সাহিত্য।
গ)    ‘আরণ্যক’– অরণ্যে রচিত একজাতীয় সাহিত্য, বিশ্ব-রহস্যের সমাধান অন্বেষণই তার প্রধান উদ্দেশ্য।
ঘ)    ‘উপনিষদ’– আক্ষরিক অর্থে গুহ্য-জ্ঞান, দার্শনিক তত্ত্বের বিচারই এর প্রধান বিষয়বস্তু। এই উপনিষদকে ‘বেদান্ত’ সাহিত্যও বলা হয়। যদিও ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদের’ মধ্যে বিষয়বস্তুর দিক থেকে পার্থক্য সুস্পষ্ট নয়, কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক না কেন, বেদান্ত-সম্প্রদায়ের পরবর্তী দার্শনিকেরা ‘আরণ্যকে’র বদলে ‘উপনিষদ’ বাক্যের উপরই অনেক বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

এই বিভাগ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার যে,–
‘ব্রাহ্মণ’, ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদ’-এর মধ্যে সীমারেখাগুলি সব সময় সুস্পষ্ট নয়। অর্থাৎ, যদিও রচনাকালের দিক থেকে ‘ব্রাহ্মণে’র পর ‘আরণ্যক’ এবং ‘আরণ্যকে’র পর ‘উপনিষদে’র সৃষ্টি, তাছাড়া যদিও ‘ব্রাহ্মণে’র মূল আলোচ্য-বিষয়ের সঙ্গে ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদে’র আলোচ্য বিষয়ের মৌলিক প্রভেদ সুস্পষ্ট, তবুও ‘আরণ্যক’-গুলি অনেকাংশেই ‘ব্রাহ্মণে’র অন্তর্ভুক্ত এবং ‘উপনিষদ’গুলি অনেকাংশেই ‘আরণ্যকে’র অন্তর্ভুক্ত। এই কারণেই ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদ’কেও ‘ব্রাহ্মণে’র অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গ্রহণ করবার প্রথা আছে এবং এই অর্থেই ‘বেদ’-এর দুটি ভাগ– ‘মন্ত্র’ বা ‘সংহিতা’ এবং ‘ব্রাহ্মণ’।
দ্বিতীয়ত, রচনাকাল ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে ‘সংহিতা’, ‘ব্রাহ্মণ’, ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদে’র মধ্যে পার্থক্য যতখানিই হোক না কেন, অন্তত পরবর্তী কালে এগুলির মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা স্বীকার করা হয়েছে; প্রত্যেকটি ‘ব্রাহ্মণ’, ‘আরণ্যক’ ও ‘উপনিষদ’ কোনো না কোনো ‘সংহিতা’র সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে এবং উক্ত ‘সংহিতা’-রই ক্রম-পরবর্তী অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ‘সংহিতা’ থেকে ‘উপনিষদ’ পর্যন্ত সাহিত্যকে ‘বেদ’ আখ্যা দেওয়া হয় বলেই- এবং এই অর্থে ‘বেদ’-এর সর্বশেষ ভাগ বলতে যে-হেতু ‘উপনিষদ’ই-সেই-হেতু ‘উপনিষদ’কে ‘বেদান্ত’ও বলা হয়। স্বভাবতই, পরবর্তী কালের যে-দার্শনিক সম্প্রদায় প্রধানত এই ‘উপনিষদে’র উপরই নির্ভরশীল তাকেও ‘বেদান্ত-দর্শন’ বা অনেক সময় শুধু ‘বেদান্ত’–আখ্যা দেওয়া হয়।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-৯৮)

গবেষক ম্যাক্স মুলারের মতে বৈদিক সাহিত্য খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিলো বলে অনুমান করা হয়। পণ্ডিতদের মধ্যে বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম সংহিতা ঋগ্বেদের রচনাকাল ১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। পরবর্তী সংহিতা ও প্রাচীন ব্রাহ্মণগুলির রচনাকাল ১০০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। পরবর্তী ব্রাহ্মণ ও প্রাচীন আরণ্যক উপনিষদগুলির রচনাকাল ৮০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। এবং পরবর্তী উপনিষদ ও বেদাঙ্গের প্রধান গ্রন্থগুলির রচনাকাল ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর থেকে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ঐতিহাসিক যুগে উত্তরণের এক স্পষ্ট ছবি বৈদিক সাহিত্যে পাওয়া যায় বলে বিদ্বানদের অভিমত। যদিও ঋগ্বেদ রচনার সময়কাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

বৈদিক সাহিত্যের বহু প্রাচীন অংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও আজও যা টিকে আছে আকারে তা সুবিশাল। তার কিছু সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেখা যাক।

.
২.১ : সংহিতা

প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ‘সংহিতা’ বা সংকলন প্রধানত চারটি–
ক। ঋগ্বেদ-সংহিতা
খ। সামবেদ-সংহিতা
গ। যজুর্বেদ-সংহিতা
ঘ। অথর্ববেদ-সংহিতা।

সাধারণত ‘সংহিতা’ শব্দটি বাদ দিয়ে এগুলিকে ‘ঋগ্বেদ’, ‘যজুর্বেদ’ ইত্যাদি নামেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। সংহিতা হলো মন্ত্র। যা থেকে কর্ম ও অনুষ্ঠানের উপকরণাদির জ্ঞান হয় তাকে মন্ত্র বলে। সংহিতা ভাগের মন্ত্রগুলো সাধারণত পদ্যে রচিত।

.
ক। ঋগ্বেদ-সংহিতা :

ঋগ্বেদ-সংহিতা হলো প্রাচীনতম সংহিতা। বিদ্বান-পণ্ডিতেরা ঋক্ শব্দের অর্থ করেছেন স্তুতি-গান। অতএব ঋগ্বেদ মানে ‘স্তুতি-গানের জ্ঞান’, এবং তারই সংকলন হলো ‘ঋগ্বেদ-সংহিতা’। এক কালে ঋগ্বেদের নানান শাখা ছিলো। এরকম পাঁচটি শাখার নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হলো– শাকল, বাষ্কল, আশ্বলায়ন, সাঙ্খ্যায়ন এবং মাণ্ডুক। কিন্তু বর্তমানে শুধু শাকল শাখাটিই টিকে আছে, অন্যগুলি বিলীন হয়ে গেছে। তাই ঋগ্বেদ বলতে আজকাল আমরা ঋগ্বেদের শাকল শাখাটিই বুঝে থাকি।

ঋক্-সংহিতায় দুই প্রকার বিভাগ দেখা যায়। প্রথম বিভাগ অনুযায়ী ঋক্-সংহিতা মণ্ডল, অনুবাক, সূক্ত ও ঋক্ এই চার ভাগে বিভক্ত। ঋগ্বেদের মন্ত্রের স্তবককে বলে ঋক্ । কয়েকটি ঋক্ নিয়ে গঠিত হয় সূক্ত। কয়েকটি সূক্ত নিয়ে গঠিত হয় অনুবাক, এবং কয়েকটি অনুবাক নিয়ে গঠিত হয় মণ্ডল। সমগ্র ঋগ্বেদ-সংহিতায় ১০টি মণ্ডল, ৮৫টি অনুবাক, ১০২৮টি সূক্ত এবং ১০৪৬২টি ঋক্ স্তবক রয়েছে।
দ্বিতীয় বিভাগ অনুযায়ী ঋক্-সংহিতার ৮টি অষ্টক, ৬৪টি অধ্যায় এবং ২০০৬টি বর্গ রয়েছে। তবে ‘মণ্ডল’ অনুসারে বিভাগই বর্তমানে সুপ্রচলিত। এখানে উল্লেখ্য, ১০২৮টি সূক্তের মধ্যে ১১টি সূক্তকে ‘বালখিল্য’ বলা হয়; ঋগ্বেদের অষ্টম মণ্ডলের মধ্যে প্রক্ষিপ্ত হলেও এগুলি এমনই অর্বাচীন যে মধ্যযুগীয় ভাষ্যকার সায়ণাচার্যও এগুলিকে উপেক্ষা করেছেন বলে জানা যায়। সে-প্রেক্ষিতে ঋগ্বেদের সূক্তের সংখ্যা মতান্তরে ১০১৭টি।

সমগ্র বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে এই ঋগ্বেদ অবশ্যই সুপ্রাচীন। বেদের সূক্তগুলি রচিত হয়েছে প্রাচীন ভাষায়। বেদে তা ব্যবহৃত হয়েছে বলে আমরা তাকে বৈদিক ভাষা বলি। শুধু যে তার ভাষা ও ছন্দ সবচেয়ে আদিম তাই নয়, বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত সমস্ত রচনাই ঋগ্বেদ-কে মেনে নিয়েছে, কিন্তু ঋগ্বেদে অন্য কোনো রচনার স্বীকৃতি নেই। আর তা থাকার কথাও নয়। কেননা ঋগ্বেদ সহস্রাধিক গান বা কবিতার একটি সংকলন-গ্রন্থ। যাঁরা এই গান বা কবিতা রচনা করেছিলেন তাঁদের লিপি-পরিচিতি ছিলো না– গানগুলি মুখে-মুখে রচিত হয়েছিলো এবং বংশানুক্রমে মুখে-মুখেই চলে এসেছিলো। এই মুখে মুখে রচিত হবার অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য হিসেবে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ঋগ্বেদের প্রথম-মণ্ডলের আটত্রিশ-সূক্তের চৌদ্দ-সংখ্যক ঋকের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। এই ঋকটি হলো-

‘মিমীহি শ্লোকমাস্যে পর্জন্য ইব ততনঃ। গায় গায়ত্রমুক্থ্যম্’।। (ঋগ্বেদ-১/৩৮/১৪)।
অর্থাৎ : মুখে শ্লোক রচনা কর, পর্জন্যের ন্যায় তা বিস্তার কর; উক্থস্তুতি বিশিষ্ট গায়ত্রীচ্ছন্দে রচিত (সূক্ত) পাঠ কর।


এইভাবে মুখে মুখে চলতে চলতে কোন-এক পরবর্তী যুগে এগুলি সংহিতা আকারে সংকলিত হয়। অতএব ঋগ্বেদের সংকলন-কাল ও রচনা-কাল এক নয় এবং ওই সহস্রাধিক সূক্তের রচনাকালও এক হতে পারে না। দশ হাজারেরও বেশি ঋক্ বা শ্লোকের এতো বিপুল সংখ্যা থেকে অনুমান করা হয় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রচয়িতার মাধ্যমেই সমুদয় ঋগ্বেদ সংকলিত হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন বলেন-
সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বেদ হলো ঋগ্বেদ মন্ত্রসংহিতা। ঋগ্বেদের মন্ত্রস্রষ্টা সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ঋষিগণ হলেন বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, ভরদ্বাজ, গৌতম, অত্রি প্রভৃতি। এঁদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠের সমকালীন। অঙ্গিরার পৌত্র এবং বৃহস্পতির পুত্র ভরদ্বাজ ছিলেন ১৫০০ খৃষ্টপূর্বের লোক, উত্তর পাঞ্চালের (বর্তমান রোহিলাখণ্ড) রাজা দিবোদাসের রাজপুরোহিত। বিশ্বামিত্র ছিলেন দক্ষিণ পাঞ্চালের (বর্তমান আগ্রার অধিকাংশ অঞ্চল) সঙ্গে যুক্ত। বশিষ্ঠ ছিলেন কুরু (মীরাট এবং আম্বালার অধিকাংশ) রাজের পুরোহিত। সমস্ত ঋগ্বেদ ছিল ছয়-সাত পর্যায়ক্রমে ঋষিগণের রচনাকীর্তি। যেমন বৃহস্পতির বংশানুক্রমে–
অঙ্গিরা–> বৃহস্পতি (১৫২০ খৃঃ.পূঃ) –> ভরদ্বাজ (১৫০০ খৃঃ.পূঃ) –> বিদথী –> নর (১৪৬০ খৃঃ.পূঃ) –> সংকৃতি (১৪৪০ খৃঃ.পূঃ) –> গৌরবীতি (১৪২০ খৃঃ.পূঃ) ও রন্তিদেব।
এদের মধ্যে বৃহস্পতি, ভরদ্বাজ, নর, গৌরবীতি ছিলেন ঋগ্বেদের ঋষি। বৃহস্পতি থেকে গৌরবীতি পর্যন্ত (সাংকৃত্যায়নের আদি পুরুষ) বংশধারার ব্যবধান ছয় পুরুষের। ১৫০০ খৃষ্টপূর্বে ভরদ্বাজের যুগ থেকে প্রতি পুরুষের আবির্ভাব হয়েছে ২০ বছর অন্তর। এইভাবে বংশগতির ধারা হিসেব করে আমি দেখেছি যে, বৃহস্পতি থেকে গৌরবীতির একশত বছরের মধ্যেই ঋষিগণ সর্বাধিক রচনা করেন এবং ঋগ্বেদের সর্বাধিক অংশ এই সময়ের মধ্যেই রচিত হয়েছিল। এরপর ব্রাহ্মণ এবং আরণ্যকের রচনাকাল খৃষ্টপূর্ব সপ্তম-ষষ্ঠ শতাব্দীতে চলে আসছে। প্রাচীন উপনিষদের মন্ত্রসংহিতার (শুক্ল যজুর্বেদের) মাত্র একটি (ঈশ) অংশ, অন্তিম চল্লিশটি অধ্যায় পাওয়া যায়, বাকি সাতভাগ ব্রাহ্মণ এবং আরণ্যকের।’- (দর্শন-দিগদর্শন দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৯)

অতএব, সংকলন-কালের কথা বাদ দিয়েও ঋগ্বেদের প্রাচীনতর রচনা এবং অর্বাচীনতর রচনার মধ্যে বহু যুগের ব্যবধান স্বীকৃত হতে বাধ্য। বস্তুত বহু যুগ ধরে এই ঋক্-স্তুতিগুলি রচিত হয়েছে। ঋগ্বেদের সাক্ষ্যেই দেখা যায় প্রাচীনতর অংশের কোনো কোনো কবি সুদূর অতীতে ‘পিতাগণ’ রচিত মন্ত্রের উল্লেখ করেছেন, যেমন-

‘প্র বো মহে মহি নমো ভরধ্বমাংগূষ্যং শবসানায় সাম।
যেনা নঃ পূর্বে পিতরঃ পদজ্ঞা অর্চন্তো অঙ্গিরসো গা অবিন্দন্’।। (ঋগ্বেদ-১/৬২/২)।
‘আ রোদসী বৃহতী বেবিদানাঃ প্র রূদিয়া জভ্রিরে যজ্ঞিয়াসঃ।
বিদন্মর্তো নেমধিতা চিকিত্বানগ্নিং পদে পরমে তস্থিবাংসম্’।। (ঋগ্বেদ-১/৭২/৪)।
‘ত ইন্দেবানাং সধমাদ আসন্নৃতাবানঃ কবয়ঃ পূর্ব্যাসঃ।
গূড়্হং জ্যোতিঃ পিতরো অন্ববিন্দন্ত্সত্যমন্ত্রা অজনয়ন্নুষাসম্’।। (ঋগ্বেদ-৭/৭৬/৪)।
‘য উদাজন্-পিতরো গোময়ং বস্বৃতেনাভিন্দন্পরিবৎসরে বলম্ ।
দীর্ঘায়ুত্বমঙ্গিরসো বো অস্তু প্রতি গৃভ্ণীত মানবং সুমেধসঃ’।। (ঋগ্বেদ-১০/৬২/২)।
অর্থাৎ :
যে স্তোত্র উচ্চৈঃস্বরে গীত হতে পারে এরূপ মহৎ স্তোত্র তোমরা সে মহান বলবান ইন্দ্রের উদ্দেশে অর্পণ কর। তাঁর সহায়তায় আমাদের পূর্বপুরুষ অঙ্গিরাগণ, পদচিহ্ন দেখে পূজা করতঃ পণি অসুর দ্বারা অপহৃত গাভী উদ্ধার করেছিলেন। (ঋক্-১/৬২/২)।।  যজ্ঞার্হ দেবগণ বৃহৎ দ্যুলোকে ও পৃথিবীতে বর্তমান থেকে রুদ্রের উপযুক্ত স্তোত্র করেছিলেন; মরুৎগণ ইন্দ্রের সাথে উত্তম স্থানে নিহিত অগ্নিকে জেনে তাঁকে লাভ করেছিলেন। (ঋক্-১/৭২/৪)।।  যে অঙ্গিরাগণ সত্যবান, কবি, পূর্বকালীন পিতা ও যাঁরা গূঢ় জ্যোতি লাভ করেছিলেন এবং অবিতথ মন্ত্রদ্বারা ঊষাকে প্রাদুর্ভূত করেছিলেন, তাঁরাই দেবগণের সঙ্গে একত্রে প্রমত্ত হতেন। (ঋক্-৭/৭৬/৪)।।  হে অঙ্গিরাগণ! তোমরা আমাদের পিতাস্বরূপ, তোমরা গোধন তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলে। তোমরা এক বৎসরকাল যজ্ঞ করে গোধনের অপহরণকারী বল নামক শত্রুকে নিধন করেছিলে। তোমরা দীর্ঘায়ু হও। আমি মানব এসেছি, আমাকে তোমরা যজ্ঞ সমাপনের জন্য নিযুক্ত কর। (ঋক্-১০/৬২/২)।।


আবার ঋগ্বেদে সুপ্রাচীন অতীতের স্মৃতি উদ্ধৃত করবার দৃষ্টান্তও বিরল নয়, যেমন-

‘কৃত্যানি সখ্যা বভূবূঃ সচাবহে যদবৃকং পুরা চিৎ।
বৃহন্তং মানং বরুণ স্বধাবঃ সহস্রদ্বারং জগমা গৃহং তে’।। (ঋগে¦দ-৭/৮৮/৫)।
‘সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্ ।
দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে’।। (ঋগে¦দ-১০/১৯১/২)।
অর্থাৎ :
হে বরুণ! আমাদের সে সখ্য কোথায় হয়েছিল? পূর্বকালে যে হিংসারহিত সখ্য ছিল তাই সেবা করছি। হে অন্নবান বরুণ! তোমার মহান ভূতগণের বিচ্ছেদকারী সহস্রদ্বারবিশিষ্ট গৃহে যাব। (ঋক্-৭/৮৮/৫)।।  হে স্তবকর্তাগণ! তোমরা মিলিত হও, একত্রে স্তব উচ্চারণ করা, তোমাদের মন পরস্পর একমত হোক। অধুনাতন দেবতাগণ প্রাচীন দেবতাদের ন্যায় একমত হয়ে যজ্ঞ ভাগ গ্রহণ করছেন। (ঋক্-১০/১৯১/২)।।


আধুনিক বেদবিদেরা ঋগ্বেদে সংকলিত বিভিন্ন স্তরের রচনার পারম্পর্য নির্ণয় করবার নানা রকম প্রচেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে দশম মণ্ডলে সংকলিত সূক্তগুলি যে অন্যগুলির তুলনায় অনেক পরবর্তীকালের রচনা এ-বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত। ঋগ্বেদের দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডলের সূক্তগুলিকে সর্বপ্রাচীন বলে গণ্য করা হয়। প্রথম ও অষ্টম মণ্ডল সম্ভবত এই দুইয়ের মধ্যবর্তীকালে রচিত হয়েছিলো। নবম মণ্ডলটি ছিলো একটি পৃথক সংকলন বিশেষ; যা পরবর্তীকালে ঋগ্বেদে সংযোজন করা হয়। এই মণ্ডলে সোম সংক্রান্ত সূক্তগুলি স্বতন্ত্রভাবে সংকলিত হয়েছে। তবে এ-কথাও মনে রাখা আবশ্যক যে, ঋগ্বেদের এই স্তর-বিভাগ মোটের উপর নির্ভরযোগ্য হলেও তার উপর যন্ত্রের মতো নির্বিচারে নির্ভর করা যায় না বলে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন। কেননা, দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডলের মধ্যে সংকলিত হলেও কোনো কোনো সূক্ত ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতির বিচারে অনেক অর্বাচীন বলেই প্রতিপন্ন হয়েছে।

ঋগ্বেদে সংকলিত সহস্রাধিক সূক্তগুলি যে স্বভাবতই এক-আধজনের রচনা হতে পারে না তা আগেই বলা হয়েছে। বহু কবি বা ঋষি সুদীর্ঘ যুগ ধরে এগুলি রচনা করেছিলেন। ‘ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থগুলি ছাড়াও পরবর্তীকালে রচিত ‘অনুক্রমণী’ নামের একজাতীয় গ্রন্থে ঋগ্বেদের প্রতিটি সূক্তের কবি বা ঋষির নামের তালিকা বা সূচীপত্র, দেবতা, ছন্দ– এবং এঁদের সম্বন্ধে নানা পৌরাণিক উপাখ্যানও– পাওয়া যায়। ঋগ্বেদের ‘অনুক্রমণী’ রচনা করেছিলেন শৌনক এবং ‘সর্বানুক্রমণী’ রচনা করেছিলেন কাত্যায়ন। কিন্তু ঋষি বা কবিদের ওই নাম এবং তাঁদের সম্বন্ধে পৌরাণিক কাহিনী থেকে কোনো প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না বলে ঋগ্বেদ যাঁরা রচনা করেছিলেন তাঁরা প্রকৃতপক্ষে আমাদের কাছে অজ্ঞাত। তবে এখানে কৌতুহলোদ্দীপক বৈশিষ্ট্য হলো-
প্রথম, নবম ও দশম মণ্ডলের অধিকাংশ সূক্তের কবি বা ঋষি হিসেবে প্রায়ই এক-একটি স্বতন্ত্র নাম পাওয়া যায়; কিন্তু দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডলের কবি হিসেবে পাওয়া যায় ছয়টি গোত্রের নাম– গৃৎসমদ, বিশ্বামিত্র, বামদেব, অত্রি, ভরদ্বাজ এবং বশিষ্ঠ। অর্থাৎ, দ্বিতীয় মণ্ডলের সমস্ত সূক্তই গৃৎসমদ-গোত্রীয় কবির রচনা, তৃতীয় মণ্ডলের সমস্ত সূক্তই বিশ্বামিত্র-গোত্রীয় কবি বা ঋষির রচনা, ইত্যাদি। অতএব ঋগ্বেদের প্রাচীনতর অংশগুলি যাঁরা রচনা করেছিলেন গোত্র-পরিচয়েই তাঁদের পরিচয়। এই কারণে দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডলকে সাধারণত ইংরেজীতে ‘Family Books’ বলা হয়, যদিও অবশ্যই ‘গোত্র’ আর ‘Family’ এক কথা নয় এবং এই কারণে ‘Family Books’ নামটি কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০০)

আদিতে ঋগ্বেদের সূক্তগুলি ঠিক কী উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিলো এ-বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, প্রতিটি বৈদিক মন্ত্রেরই কোনো-না-কোনো যজ্ঞে প্রয়োগ বা বিনিয়োগ ছিলো। কিন্তু পরবর্তী কালে যে-মন্ত্রকে যে-যজ্ঞে যে-ভাবে ব্যবহার করবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আদিতেও অনুরূপ উদ্দেশ্যেই মন্ত্রগুলি রচিত হয়েছিলো এমন মনে হয় না। কেননা, বৈদিক সূক্তগুলি রচিত হবার সময় থেকেই বৈদিক মানুষদের মধ্যে নানা রকম যাগ-যজ্ঞের প্রচলন থাকলেও বৈদিক যজ্ঞের আদি-রূপ এবং পরবর্তী-রূপ এক নয়। পরবর্তী কালে বৈদিক যজ্ঞ অত্যন্ত জটিল ও পল্লবিত রূপ ধারণ করেছিলো, এমনকি যজ্ঞের আদি-উদ্দেশ্যও অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছিলো।
আবার সূক্তগুলি আধুনিক অর্থে বিশুদ্ধ গান বা কবিতা ধরনের কিছু ছিলো মনে করাও সঙ্গত হবে না, কেননা অমন প্রাচীন পর্যায়ের সাহিত্য আধুনিক অর্থে বিশুদ্ধ গান বা কবিতা হতেই পারে না। অর্থাৎ যে-উদ্দেশ্যেই এগুলি রচিত হোক না কেন এগুলির কোনো-না-কোনো ব্যবহারিক বা প্রয়োগের দিক নিশ্চয়ই ছিলো, যদিও আজ তার সুনিশ্চিত ধারণা পাওয়া সম্ভব নয় হয়তো।

পণ্ডিতদের আরও অভিমত হলো, সমস্ত সূক্তের সম্পূর্ণ অর্থও আজ আমাদের কাছে সুস্পষ্ট নয়। তার কারণ, ঋগ্বেদের ভাষা ও ভাব অত্যন্ত প্রাচীন– এমনকি অনেক সময় আদিম পর্যায়ের। ঋগ্বেদের যে-সব ভাষ্যকারের রচনা এখনও টিকে আছে তার মধ্যে সর্বপ্রাচীন বলতে যাস্ক-এর ‘নিরুক্ত’ নামক গ্রন্থ। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকের মধ্যে যাস্কের কাল-নির্ণয় করা হয়। ‘নিরুক্ত’ গ্রন্থে তিনি ঋগ্বেদের বহু অংশের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু স্বয়ং যাস্ক অন্তত সতেরো জন পূর্বাচার্যের কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়, ঋগ্বেদের ব্যাখ্যায় যাঁরা সকলে একমত নন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলিকে অর্থহীন ও পরস্পরবিরোধী বলেও প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিলেন। তার মানে সেই সুদূর প্রাচীন কালেই ঋগ্বেদের অর্থ অনেকাংশে বিতর্ক-সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে সায়ণাচার্য ঋগ্বেদের একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য রচনা করেছেন। কিন্তু ঋগ্বেদের রচনাকাল এবং সায়ণ-ভাষ্যের মধ্যে সময়ের ব্যবধান অত্যন্ত সুদীর্ঘ বলেই কোনো বিদ্বান-পণ্ডিত এই ভাষ্যকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে প্রধানত তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ভিত্তিতে নতুন করে ঋগ্বেদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভব করেছেন। কিন্তু অন্যান্য পণ্ডিতদের অভিমত হলো, সায়ণের ভাষ্য অনেক ক্ষেত্রে অবশ্যই কষ্টকল্পিত; তবুও তিনি অনেকাংশেই সুপ্রাচীন ঐহিহ্যের উপর নির্ভর করেছেন– তাই এ-ভাষ্যকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করবার প্রস্তাব যুক্তিসঙ্গত নয়।

অতএব বুঝাই যাচ্ছে, ঋগ্বেদ নিয়ে আলোচনায় অনেক জটিল সমস্যা রয়েছে যা অগ্রাহ্য করা উচিত হবে না। কিন্তু একই-সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে, ঋগ্বেদের অনেক অংশ দুর্বোধ্য হলেও আবার বেশির ভাগ অংশেরই অর্থ সুস্পষ্ট ও সুনিশ্চিত। এবং তার উপর নির্ভর করেই সামগ্রিকভাবে বৈদিক সমাজ ও বৈদিক চিন্তাধারা সম্বন্ধে একটা নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া অসম্ভব নয়। এর গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেবীপ্রসাদ বলেন-
সুদীর্ঘ যুগ ধরে আমাদের দেশে এই বেদ নিয়ে নানা রহস্যজাল বিস্তার করা হয়েছে : বেদই চরম জ্ঞানের চূড়ান্ত আকর, বেদের তত্ত্ব নাকি এমনই গূঢ় ও গভীর যে জন্মজন্মান্তরের সংস্কার ছাড়া তাতে অধিকারই জন্মায় না। বলাই বাহুল্য, এ-জাতীয় কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বেদের ব্যাখ্যা নিয়ে বিদ্বানমহলের সমস্ত সমস্যা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে সন্দেহ নেই : যাঁরা ঋগ্বেদ রচনা করেছিলেন তাঁরা এমন কিছু উন্নত বা সুসভ্য পর্যায়ে জীবন যাপন করতেন না। চাষবাস এবং কারিগরির কাজ সামান্য শিখলেও তাঁরা প্রধানতই পশুপালক ছিলেন এবং তাঁদের রচিত এই সাহিত্যের প্রধানতম বিষয়বস্তু বলতে এই পশুর– এবং সেই সঙ্গে অন্ন, ধন, সন্তান ও নিরাপত্তার– কামনাই। অতএব এ-সাহিত্যে খুব বেশি গূঢ় ও গভীর আধ্যাত্মিক তত্ত্বের অন্বেষণই অবান্তর ও কষ্টকল্পনার পরিচায়ক। অবশ্য ঋগ্বেদের প্রায় সমস্ত সূক্তেই কোনো-না-কোনো বৈদিক দেবতার স্তুতি বা প্রশস্তি করা হয়েছে। কিন্তু তারও উদ্দেশ্য হলো, দেবতারা যেন পার্থিব সম্পদের সহায়ক হন। দ্বিতীয়ত, …বৈদিক কবিদের কল্পনায় এই দেবতাদের সত্যিই কতখানি আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে দেবত্ব-প্রাপ্তি হয়েছিল তাও খুবই সংশয়ের বিষয়। তাই তত্ত্ব-জিজ্ঞাসা ঋগ্বেদের বৈশিষ্ট্য নয়; প্রধানত বৈশিষ্ট্য বলতে পার্থিব সম্পদের কামনা। তত্ত্ব-জিজ্ঞাসার যেটুকু পরিচয় তা প্রধানত কয়েকটি অর্বাচীন সূক্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এই তত্ত্ব-জিজ্ঞাসাও বহুলাংশে আদিম পৌরাণিক কল্পনার সঙ্গে জড়িত। তাই ঋগ্বেদকে খুব একটা গূঢ় জ্ঞানের আকর মনে করবার সত্যিই কোনো কারণ নেই, যদিও তার ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য কোনো অর্থেই তুচ্ছ নয়। বস্তুত আদিম কাব্য হিসেবে– নির্ভীক ও বলিষ্ঠ কল্পনার সম্পদে– এই ঋগ্বেদ বিশ্বসাহিত্যের এক বিরাট গৌরব।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০১)

.
খ। সামবেদ-সংহিতা :

এক কালে সামবেদ-সংহিতার নাকি বহু শাখা ছিলো। কিন্তু বর্তমানে টিকে থাকা মাত্র তিনটি শাখার নাম জানা যায়– কৌথুম, রাণায়নীয় এবং জৈমিনীয় বা তালবকার। এর মধ্যে প্রথমটি অর্থাৎ কৌথুম শাখাই জীবন্ত বা সবচেয়ে প্রচলিত।
সামবেদের ঋক্ বা স্তবক (সূক্ত নয়) সংখ্যা ১৮১০টি। এর মধ্যে কিছু পুনরুক্তি আছে। পুররুক্তিগুলি বাদ দিলে সামবেদ-এ মোট ১৫৪৯টি ঋক্ বা স্তবক সংকলিত হয়েছে। তার মধ্যে ৭৫ ছাড়া বাকি সবই ঋগ্বেদের অষ্টম ও নবম মণ্ডল থেকে সংগৃহীত। অতএব স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংকলন হিসেবে সামবেদের বিশেষ কোন মূল্যই নেই বলা যায়। তাহলে সামবেদের প্রকৃত মূল্য কোথায়?

সাম বা সামন্ মানেই হলো সুরঝংকার বা মেলোডি। সুর দিয়ে গাইবার কথা মনে রেখেই যে ঋগ্বেদ থেকে এই ঋক্-গুলি সংকলিত হয়েছে তা এগুলির ছন্দ-বৈশিষ্ট থেকেই অনুমান করা যায়। এগুলির ছন্দ হয় ‘গায়ত্রী’ না-হয় ‘প্রগাথ’। এতে বোঝা যায়, উভয় ছন্দে রচিত সমস্ত ঋকই গান হিসেবে গাইবার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিলো। শুধু তাই নয়, যাতে আরও সার্থকভাবে সুর দিয়ে গান হিসেবে গাইবার সুবিধে হয় এই উদ্দেশ্যে সামবেদে সংকলন করবার সময় ঋক্-গুলিতে সচেতনভাবেই কখনো কখনো সামান্য কিছু কিছু অদল-বদল করে নেওয়া হয়েছে। তাই সামবেদের প্রধান কথা গান, সাহিত্য নয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘আধুনিককালে আমরা গানের বেলায় কথা বা রচনাভাগের সঙ্গে সুরের যে-রকম সম্পর্ক স্বীকার করি প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্যে তা করা হয়নি। আমরা বলি, ‘সুর দেওয়া’– অর্থাৎ কোনো রচনার সঙ্গে কোনো সুর সংযোজিত করা। কিন্তু প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে, ঋক্ বা রচনা থেকে সুর যেন স্বভাবতই প্রসূত হয়। এই কারণেই ঋক্-কে বলা হয়েছে ‘যোনি’– এই যোনি থেকেই যেমন সামন্ প্রসূত হয়। এ-জাতীয় ধারণার মূলে খুব আদিম পর্যায়ের স্মৃতি টিকে থাকা অসম্ভব নয়। কেননা নৃতত্ত্ববিদদের মতে আদিম মানুষদের মধ্যে ভাষা-ব্যবহারের সঙ্গে সুরের সম্পর্ক অনেকটা এই রকমই।… এইখানে আরও একটি কথা মনে রাখা যায়। আদিম সমাজে গান বলতে আধুনিক অর্থে বিশুদ্ধ কণ্ঠ-সঙ্গীত নয়; তার সঙ্গে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক চোখে পড়ে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০২)

সামবেদ গানেরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো, গান গাইবার সময় পুরোহিতেরা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে হাত এবং আঙুল নাড়বেন। তবে সামগানের পিছনে যত আদিম পর্যায়েরই স্মৃতি টিকে থাকুক না কেন, সংকলন হিসেবে আমরা সামবেদ-সংহিতাকে যেভাবে পাই তা অবশ্যই আদিম সমাজের পরিচায়ক নয়। পরবর্তী কালে বৈদিক যজ্ঞে নানা ধরনের পুরোহিত নিযুক্ত হতেন; তার মধ্যে এক ধরনের পুরোহিতের নাম ‘উদ্গাতা’। যজ্ঞের সময় তাঁদের উপর সামবেদ গান করবার ভার থাকতো। বিশেষ করে তাঁদের ব্যবহার উদ্দেশ্যেই সামবেদ-সংহিতা সংকলিত।
সামবেদ-সংহিতার প্রধানত দুটি ভাগ– আর্চিক এবং গান। আর্চিকের আবার দুইভাগ– পূর্বার্চিক ও উত্তরার্চিক। উদ্গাতা প্রথমে পূর্বার্চিক ভাগের সাহায্যে সুরগুলি আয়ত্ত করবেন– পূর্বার্চিক অংশ যেন সুর মনে রাখবার জন্য গানের প্রথম স্তবকগুলির সংকলন-বিশেষ। তারপর উত্তরার্চিক ভাগের সাহায্যে তিনি বৈদিক স্তোত্রগুলি সুর করে গাইবেন। উত্তরার্চিক ভাগ হলো স্তোত্র সংকলন, প্রতি স্তোত্রে সাধারণত তিনটি করে ঋক্ বা স্তবক। অর্থাৎ, পূর্বার্চিক ভাগে স্তোত্রর প্রথম ঋক্ বা স্তবক অবলম্বনে যে-সব সুর লেখা হয়েছে, উত্তরার্চিকের স্তোত্রগুলি সেই সুরেই গাওয়া হবে।

আর সামবেদের ‘গান’ অংশে সংকলিত গানগুলিতে সাংখ্য-চিহ্ন ব্যবহার করে– এবং পদের অক্ষরগুলির পুনরাবৃত্তি করে– সুরের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বর্তমান কালে সংগীতের স্বরলিপি যাকে বলা হয়। ‘গান’গুলির একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, পদের শব্দগুলি ভেঙে ভেঙে সাজাবার সময় মাঝে মাঝে এরকম অর্থহীন উল্লাসব্যঞ্জক শব্দও বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার নাম ‘স্তোভ’। গান গাইবার সময় ফাঁকে ফাঁকে এ-জাতীয় চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করা হতো– পিছিয়ে-পড়ে-থাকা মানুষদের মধ্যে এখনো যে-রকম দেখা যায়। অতএব, দেবীপ্রসাদ মন্তব্য করেন-
উত্তরকালের বৈদিক যজ্ঞ এবং সে-যজ্ঞে নিযুক্ত উদ্গাতা-পুরোহিতদের সামগান সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়েরই পরিচায়ক হোক না কেন, স্তোভগুলি থেকেই অনুমান করা যায় আদিম বা প্রায় আদিম সমাজেই এ-গানের উৎস। এ-বিষয়ে আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
‘গান’ নামের অংশে সঙ্কলিত কতকগুলি সঙ্গীতকে বলা হয়েছে ‘গ্রামগেয়-গান’, আর এক অংশকে বলা হয়েছে ‘অরণ্যগেয়-গান’। নাম থেকেই বোঝা যায়, এক-ধরনের গান গাওয়া হতো গ্রামে আর এক ধরনের গান গাইবার জন্য যেতে হতো বনে। কিন্তু ওই গান গাইবার জন্যে বনে যাবার প্রস্তাব কেন? কেননা বিশ্বাস ছিল, এই গানগুলি প্রচণ্ড জাদুশক্তির আধার; তাই সকলের কানে গেলে বিপদের আশঙ্কা আছে। অতএব বনে গিয়ে গানগুলি শিখতে হবে এবং অবশ্যই গুহ্যভাবে এগুলির প্রয়োগ করা হবে। গানের সঙ্গে এ-জাতীয় যাদুশক্তির সম্পর্ক কল্পনাও অবশ্যই আদিম পর্যায়েরই পরিচায়ক। ‘গান’ নামক এই সঙ্কলনটির আরও দুটি ভাগ আছে– ‘উহগান’ এবং ‘উহ্যগান’। প্রথমটি ‘গ্রামগেয়-গানে’র সঙ্গে সংযুক্ত, দ্বিতীয়টি সংযুক্ত ‘অরণ্যগেয়-গানে’র সঙ্গে।’- (ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০৩-৪)

.
গ। যজুর্বেদ-সংহিতা :

‘যজুস্’ শব্দের অর্থ হলো যজ্ঞের মন্ত্র। তারই জ্ঞান হলো যজুর্বেদ, এবং এই জ্ঞানের সংকলন যজুর্বেদ-সংহিতা। উত্তরকালের বৈদিক যজ্ঞে সামবেদ যেমন উদ্গাতা নামের পুরোহিতদের বেদ, তেমনি যজুর্বেদ-এর মন্ত্রগুলি উচ্চারণ করবার ভাব ‘অধ্বর্যু’ নামের পুরোহিতদের উপর। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি যজুর্বেদ-সংহিতার ১০১টি শাখার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু বর্তমানে মাত্র পাঁচটি শাখা টিকে আছে। এই পাঁচটি শাখা প্রধানত দুইভাগে বিভক্ত– কৃষ্ণ-যজুর্বেদ এবং শুক্ল-যজুর্বেদ।
শুক্ল-যজুর্বেদ শুধুমাত্র বিশুদ্ধ মন্ত্রের সংকলন; কিন্তু কৃষ্ণ-যজুর্বেদে মন্ত্রের সঙ্গে ব্রাহ্মণ অর্থাৎ কিছুটা ভাষ্য বা ব্যাখ্যা ধরনের রচনারও সংমিশ্রণ রয়েছে। তাই সাধারণভাবে নাম দুটির ব্যাখ্যা করা হয়, ‘শুক্ল’ বলতে বিশুদ্ধ এবং ‘কৃষ্ণ’ বলতে অবিশুদ্ধ বা মিশ্রিত মন্ত্রসংকলন।

এছাড়াও যজুর্বেদের এই পক্ষভেদের সম্পর্কে একটি আকর্ষণীয় পৌরাণিক আখ্যায়িকাও প্রচলিত আছে। আখ্যায়িকাটি এরকম-

কথিত আছে, বেদব্যাস বেদমন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ করেন। এই শ্রেণিবিভাগ শেষ হবার পরে, তিনি তাঁর চারজন প্রধান শিষ্যের প্রত্যেককে, এক-একটি বিশেষ বেদে ব্যুৎপন্ন করে, যার যার অধিগত বিদ্যা প্রচারের আদেশ দেন। শিষ্য বৈশম্পায়নের উপর ন্যস্ত হয় যজুর্বেদ প্রচারের ভার। বৈশম্পায়ন স্বনামখ্যাত যাজ্ঞবল্ক্যের গুরু; তিনি বিশেষ যত্ন করে শিক্ষা দেন তাঁর প্রিয়শিষ্য যাজ্ঞবল্ক্যকে। কিন্তু বিদ্যার ভারে যাজ্ঞবল্ক্য বিনীত না হয়ে, হয়ে পড়েন ক্রমে উদ্ধত। ফলে, বৈশম্প্যায়ন তাঁকে বেদচর্চার অনুপযুক্ত বলে মনে করে তাঁর অধীত বিদ্যা উদ্গিরণ করে দিতে বলেন।
অধিগত বিদ্যা উগরিয়ে ফেলে দিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য পাণ্ডিত্য-হীন হলেন বটে, কিন্তু বমির সঙ্গে যে-জ্ঞান বাইরে এসে পড়লো, তা এতো মূল্যবান যে তাকে চিরবর্জন করা অসংগত ও অবিধেয় বলে বিবেচিত হলো। কিন্তু এমন মানুষ কে আছে যে এ ক্লেদ গলাধঃকরণ করে তা রক্ষা করবে? তা নেই। কাজেই বৈশম্পায়নের অন্যান্য শিষ্যেরা তিতির পাখির রূপ ধরে এই ক্লেদাক্ত বিদ্যা পুনর্গ্রহণ করলেন। ফলে, তা যথাযথ সংরক্ষিত হলো বটে, কিন্তু ক্লেদাক্ত বিদ্যাকে আর পূর্ব-গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করা চললো না। তাই তাকে বলা হলো কৃষ্ণ-যজুর্বেদ বা ক্লেদাক্ত-যজুর্বেদ। আর তিতির পাখির রূপ ধরে এই বিদ্যা সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে কৃষ্ণ-যজুর্বেদকে নামান্তরে তৈত্তিরীয়-সংহিতাও বলা হয়।
এদিকে যাজ্ঞবল্ক্যের কী হলো? পাণ্ডিত্য-হীন হয়ে তিনি যজুর্বেদ শিক্ষার জন্য বহুদিন সূর্যের তপস্যা করলেন; বেদে সূর্যের দক্ষতা ছিলো অসাধারণ। তাঁর তপস্যায় সিদ্ধ হয়ে যাজ্ঞবল্ক্যের আবার যজুর্বেদে পূর্ণজ্ঞান লাভ হলো। সূর্য বাজী রূপ ধরে তাঁকে এ জ্ঞান দান করেছিলেন। সূর্য থেকে সরাসরি এ জ্ঞানকে বলা হলো শুক্ল বা নির্মল যজুর্বেদ। আবার বাজী রূপ ধরে সূর্য এই বেদজ্ঞান দিয়েছিলেন বলে শুক্ল-যজুর্বেদকে নামান্তরে বাজসনেয়ী-সংহিতাও বলা হয়।


শুক্ল-যজুর্বেদের একটিমাত্র শাখা পাওয়া যায়, যার নাম ‘বাজসনেয়ী-সংহিতা’। অন্যদিকে কৃষ্ণ-যজুর্বেদের চারটি শাখা পাওয়া যায়, এগুলির নাম– ‘কাঠক-সংহিতা’, ‘কপিষ্ঠল-কঠ-সংহিতা’, ‘মৈত্রায়ণী-সংহিতা’ এবং ‘তৈত্তিরীয়-সংহিতা’ বা ‘আপস্তম্ব-সংহিতা’। তবে বর্তমানে যজুর্বেদ-সংহিতা সংকলনে শুক্ল-যজুর্বেদ হলো বাজসনেয়ী-সংহিতা এবং কৃষ্ণ-যজুর্বেদ হলো তৈত্তিরীয়-সংহিতা। বাজসনেয়ী-সংহিতার ৪০টি অধ্যায়, ৩০৩টি অনুবাক এবং ১৯১৫টি কণ্ডিকা রয়েছে। অন্যদিকে তৈত্তিরীয়-সংহিতায় ৭টি কাণ্ড, ৪৪টি প্রশ্ন বা প্রপাঠক, ৬৪৪টি অনুবাক এবং ২১৮৪টি কণ্ডিকা বা মন্ত্র রয়েছে।
প্রাচীনকালে যজ্ঞ করবার সময় বৈদিক পুরোহিতদের কাছে এই শাখাগুলির মধ্যে পার্থক্য নিশ্চয়ই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তবে সাধারণভাবে যজুর্বেদ-সংহিতার কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যেতে পারে।

যজুর্বেদ-সংহিতায় বিভিন্ন রকমের বৈদিক যজ্ঞের পরিচয় পাওয়া যায়, যেমন– অশ্বমেধ, পুরুষমেধ, রাজসূয়, ইত্যাদি। এইসব বিভিন্ন যজ্ঞে যে-মন্ত্র উচ্চারণ করবার বিধি ছিলো যজুর্বেদ মূলত তারই সংকলন। মন্ত্রগুলির মধ্যে কিছু কিছু ছন্দোবদ্ধ কাব্য, বাকি সব গদ্য। ছন্দোবদ্ধ মন্ত্র বলতে বেশির ভাগই ঋগ্বেদ-সংহিতা থেকে সংগৃহীত। ঋগ্বেদের বিভিন্ন সূক্ত থেকে বিভিন্ন ঋক্ বিভিন্ন যজ্ঞে প্রয়োগ করবার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু ‘যজুস্’ বলতে প্রকৃতপক্ষে বোঝাতো গদ্যে রচিত মন্ত্রই, এবং এ-জাতীয় মন্ত্রই যজুর্বেদের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। তবে সাহিত্য-রচনা বা চিন্তার বিকাশ– কোনোদিক থেকেই এই মন্ত্রগুলির বিশেষ কোনো মূল্য নেই বলেই পণ্ডিতদের অভিমত।
যজুর্বেদের কতকগুলি মন্ত্র খুবই ছোটো ছোটো। যেমন আগুনে আহুতি দেবার সময় ‘ইন্দ্রায় ত্বা’, বা ‘অগ্নায় ত্বা’ ধরনের মন্ত্র। আবার কতকগুলি মন্ত্রে সরল গদ্যে নানা রকম পার্থিব সম্পদের কামনা ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন-

‘তনুপা অগ্নেহসি তন্বং মে পাহ্যায়ুর্দা অগ্নেহস্যয়ুর্মে দেহি বর্চোদা অগ্নেহসি বর্চো মে দেহি। অগ্নে যন্মে তন্বা ঊনং তন্ম আপৃণ’।। (শুক্লযজুর্বেদ-৩/১৭)।।
অর্থাৎ : হে অগ্নি, তুমি দেহের পালক, আমার এ শরীর তুমি রক্ষা কর। হে অগ্নি, তুমি আয়ুর দাতা, অকাল মৃত্যু পরিহার করে আমাকে পূর্ণ আয়ুষ্কাল দাও। হে অগ্নি, তুমি তেজের দাতা, আমায় তেজ প্রদান কর। হে অগ্নি, আমার দেহের যে অঙ্গ অপটু, তুমি তার পুষ্টিদান কর।


কিন্তু অনেক মন্ত্রেই এমন বস্তুকে উদ্দেশ্য করে এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা হয় যে আমাদের কাছে তা প্রায় অর্থহীন মনে হয়। যেমন, আগুনের উপর রন্ধন-পাত্র স্থাপন করবার সময় মন্ত্র পড়া হবে-

‘বসোঃ পবিত্রমসি। দ্যৌরসি পৃথিব্যসি। মাতরিশ্বনো ঘর্মোহসি বিশ্বধা অসি। পরমেণ ধাম্না দৃংহস্ব মা হ্বার্মা তে যজ্ঞপতি র্হ্বার্ষীৎ’।। (শুক্লযজুর্বেদ-১/২)।।
অর্থাৎ : হে যজ্ঞাদি কর্মের পবিত্রতা-সম্পাদক, তুমিই হলে আকাশ, তুমিই পৃথিবী, তুমি হলে মাতরিশ্বার কড়াই। আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দর্শনে বিরূপ হয়ো না; তোমার যজ্ঞকারক যেন কুটিল না হয়।


আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রগুলি এমনই অর্থহীন ও অসংলগ্ন শব্দরাশির মতো যে আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে কেউ কেউ এগুলিকে উন্মাদের প্রলাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু যজুর্বেদে এমন অর্থহীন মন্ত্র কেন?–
ভিনটারনিথ্স্ বলছেন, ভুললে চলবে না যে এগুলি অথর্ববেদ বা এমনকি যজুর্বেদের অন্যান্য অংশে সংরক্ষিত সুপ্রাচীন জনপ্রিয় মন্ত্র নয়; তার বদলে এগুলি হলো উত্তরকালের পুরোহিতদের উদ্ভাবন– যজ্ঞের অসংখ্য অনুষ্ঠানের জন্যে তাঁরা অসংখ্য মন্ত্রও আবিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং সেগুলির অর্থসম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান নি।
এ-মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এর থেকেই বোঝা যায়, বৈদিক যজ্ঞের আদি-রূপ এবং উত্তর-রূপ এক নয়। পরবর্তী কালে– যজুর্বেদের যুগেই– প্রধানত পুরোহিত শ্রেণীর প্রভাবে বৈদিক যজ্ঞ জটিল অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়েছিল; কিন্তু আদি-পর্বে তা নয়।… আপাতত শুধু একটি কথা বলে রাখা যায় : বৈদিক যজ্ঞের যজুর্বেদে সংরক্ষিত রূপের মধ্যেই অনেক সময় ইঙ্গিত থেকেছে যে এগুলির পিছনে আদিম মানুষদের জাদু-বিশ্বাস ও জাদু-অনুষ্ঠানের স্মৃতি টিকে আছে।’- (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০৫)

উল্লেখ্য, নৃতাত্ত্বিকদের মতে, ‘জাদু-বিশ্বাস এবং ধর্ম-বিশ্বাসের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, ধর্ম-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দেবতা বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে, তাঁর উপাসনা করে, তাঁর কাছে মানত করে, তাঁর পূজা করে, তাঁরই করুণায় সিদ্ধি-লাভ করবার কল্পনা। কিন্তু জাদু-বিশ্বাসের অন্তর্নিহিত মূল কথা হলো একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট ফল পাওয়া যাবে এরকম বিশ্বাস– যেমন অনাবৃষ্টির সময় আকাশে বৃষ্টির একটা নকল তুলতে পারলেই বৃষ্টি হবে। নৃতত্ত্ববিদেরা তাই বলছেন, জাদু-বিশ্বাসের মূল কথা প্রার্থনা-উপাসনা নয়, ভগবানের কাছে আবেদন-নিবেদন করা নয়; তার বদলে নানা রকম আচার-অনুষ্ঠানের সাহায্যে প্রকৃতিকে বশে আনবার– আয়ত্ত করবার– কল্পনাই। নৃতত্ত্বের দৃষ্টিতে, ধর্ম-বিশ্বাসের চেয়ে জাদু-বিশ্বাস অনেক পুরনো। কেননা আদিম মানুষদের মধ্যে সর্বত্রই জাদু-বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়, ধর্ম-বিশ্বাসের নয়।

তাই যজুর্বেদে যে বহু বৈদিক দেবতার নাম পাওয়া যায় এবং তাঁদেরই উদ্দেশ্যে মন্ত্র পড়ে নানা রকম আহুতি দেবারও ব্যবস্থা, এগুলিকে পরবর্তী অর্থে পূজা বা উপাসনা মনে করা ভুল হবে। কেননা এই মন্ত্র-উচ্চারণ বা আহুতি প্রভৃতির মূল উদ্দেশ্য দেবতাদের সন্তুষ্ট করা নয়; তার বদলে দেবতাদের বশীভূত করা, বাধ্য করা, আয়ত্তে আনা। বেদ-মীমাংসক অর্থাৎ প্রাচীন মীমাংসা দর্শনেও দেখা যায় যে তাঁরা বিভিন্ন যজ্ঞকে পূজা নয় বরং যজ্ঞের নিজস্ব জাদু-শক্তি তথা অপূর্বের মাধ্যমে কাম্যফল লাভের উপায় হিসেবেই যজ্ঞের তাৎপর্য বর্ণনা করেছেন। এর থেকেই অনুমান হয়, যজুর্বেদের যুগে পুরোহিত শ্রেণী বৈদিক যজ্ঞ প্রসঙ্গে যত রকম জটিলতারই উদ্ভাবন করুন না কেন– এবং যজ্ঞগুলি তাঁদের প্রভাবে যতই রূপান্তরিত হোক না কেন– এগুলি থেকে আদিম পর্যায়ের জাদু-বিশ্বাসের স্মৃতি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি।

.
ঘ। অথর্ববেদ-সংহিতা :

বেদভক্তরা ‘অথর্ব’ বলতে ভেষজবিদ্যা এবং মাঙ্গলিক ক্রিয়াকে বুঝিয়ে থাকেন। এই বেদে যেমন মাঙ্গলিক মন্ত্র আছে তেমনি আবার অমঙ্গলজনক মন্ত্রও আছে। তবে আধুনিক বিদ্বান-গবেষকরা অথর্ববেদ-কে ‘Knowledge of Magic Formulas’ অর্থাৎ জাদু-মন্ত্রের বেদ বা জ্ঞান আখ্যা দিয়েছেন। চলতি কথায় যাকে বলা হয় ঝাড়-ফুঁক বা তুক্-তাক্– অথর্ববেদ আসলে তারই সংকলন।

অথর্ববেদের মাত্র দুটি শাখা টিকে আছে– ‘শৌনক’ এবং ‘পৈপ্পলাদ’। পণ্ডিতেরা প্রথমটিকেই অনেক নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করেছেন। অথর্ববেদ-সংহিতা ২০টি কাণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটি কাণ্ড কয়েকটি প্রপাঠকে, প্রতিটি প্রপাঠক কয়েকটি অনুবাকে, প্রতিটি অনুবাক কয়েকটি সূক্তে এবং প্রতিটি সূক্ত কয়েকটি স্তবক বা মন্ত্রে বিভক্ত। মন্ত্রগুলি পদ্য ও গদ্য উভয়রূপেই দৃষ্ট হয়, তবে পদ্যেরই আধিক্য।
এই বেদ-সংহিতায় ২০টি কাণ্ড, ৩৮টি প্রপাঠক, ৯০টি অনুবাক, ৭৩১টি সূক্ত এবং প্রায় ৬০০০ মন্ত্র বা স্তবক রয়েছে। তার মধ্যে বিংশ কাণ্ড বা অধ্যায় অত্যন্ত অর্বাচীন এবং এ অধ্যায়ের প্রায় সবটুকুই ঋগ্বেদেরই সূক্তর সংকলন। এছাড়াও অথর্ববেদের প্রায় এক-সপ্তমাংশ ঋগ্বেদ থেকেই গৃহীত। এবং লক্ষণীয় বিষয় হলো, অথর্ববেদে সংকলিত ঋগ্বেদের সূক্তগুলির প্রায় অর্ধেকই ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের অন্তর্গত; বাকি অর্ধেক প্রধানতই ঋগ্বেদের প্রথম ও অষ্টম মণ্ডল থেকে সংগৃহীত।

আর এ-কারণেই অনুমান হয়, অন্তত সংকলন-কালের দিক থেকে অথর্ববেদ ঋগ্বেদের অনেক পরবর্তী। এ-বিষয়ে গবেষকরা কিছু নজিরও দেখিয়েছেন। যেমন, ঋগ্বেদের প্রকৃত প্রাচীন অংশে বৈদিক সমাজে জাতি-ভেদ বা বর্ণাশ্রম-বিভাগের পরিচয় নেই; কিন্তু অথর্ববেদে শুধুই যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র নামের চারটি সুস্পষ্ট বিভাগের উল্লেখ আছে তাই নয়, এর মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেণীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করবার– এমনকি ব্রাহ্মণদের ‘দেবতা’ বলে উল্লেখ করবারও– পরিচয় সুস্পষ্ট। অথর্ববেদেও ইন্দ্র, বরুণ প্রভৃতি ঋগ্বেদের দেবতাদের নাম বারবার পাওয়া যায়; কিন্তু এঁদের বৈশিষ্ট্য অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, নামে বিভিন্ন হলেও তাঁদের পরস্পরের মধ্যে আর বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। তাছাড়া, অথর্ববেদের কয়েকটি সূক্তে বিশ্ব-সৃষ্টির রহস্য অনুসন্ধান করা হয়েছে; এগুলি অবশ্যই অনেক উন্নত পর্যায়ের চিন্তার পরিচায়ক– এমনকি কখনও কখনও ঔপনিষদিক চিন্তার সঙ্গে এই চিন্তার সাদৃশ্য দেখা যায়। অতএব স্বীকার করতেই হবে, অথর্ববেদে সংকলিত অনেক সূক্তই পরবর্তী কালের রচনা; অর্থাৎ, অন্তত সংকলন-কালের দিক থেকে অথর্ববেদ অনেক অর্বাচীন।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০৭)

তবে সামগ্রিকভাবে অথর্ববেদকে অর্বাচীন বা পরবর্তী কালের মনে করা সঠিক হবে না। কেননা অথর্ববেদ-সংহিতাও একটি সংকলন-গ্রন্থ এবং এই সংকলনের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত সূক্তেরই রচনাকাল এক নয়। ঋগ্বেদের মতোই অথর্ববেদেও প্রাচীনতম এবং অর্বাচীনতম অংশের মধ্যে বহু যুগের ব্যবধান রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। অথর্ববেদের সংকলন-কাল যে অনেক পরবর্তী– তা থেকে এটা মনে করা যায় যে অথর্ববেদে সংকলিত সবচেয়ে অর্বাচীন সূক্তগুলি হয়তো ঋগ্বেদের সবচেয়ে অর্বাচীন সূক্তের চেয়েও পরবর্তী। কিন্তু অথর্ববেদের সর্বপ্রাচীন সূক্তগুলি ঋগ্বেদের প্রাচীনতম সূক্তগুলির সমসাময়িক– বা এমনকি তার চেয়েও প্রাচীনতর– হওয়া অসম্ভব নয় বলেই গবেষকেরা মনে করেন। কেননা এ-বিষয়ে বেশ চিত্তাকর্ষক প্রমাণ রয়েছে।
ভারতীয় সাহিত্যে অথর্ববেদের প্রাচীনতম নাম হলো ‘অথর্বাঙ্গিরসঃ’– অর্থাৎ, ‘অথর্বন্ এবং অঙ্গিরস্’। অথর্বন্ ও অঙ্গিরস্-দের এই বেদ বা জ্ঞানকেই পরবর্তীকালে সংক্ষেপে শুধু অথর্ববেদ বলে উল্লেখ করবার প্রথা হয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঋগ্বেদের প্রাচীনতম অংশের কবি বা ঋষিরাও এই দুটি নামের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন; শুধু তাই নয়, তাঁরা ওই অথর্বন্– এবং বিশেষ করে অঙ্গিরস্-দের– সুপ্রাচীন অতীতের বিরাট শক্তিশালী জাদু-বিদ্যাবিৎ হিসেবেই স্মরণ করতেন।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০৭)
যেমন, অঙ্গিরস্-দের প্রসঙ্গে ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলে বলা হয়েছে-

‘ত ইন্দেবানাং সধমাদ আসন্নৃতাবানঃ কবয়ঃ পূর্ব্যাসঃ।
গূড়্হং জ্যোতিঃ পিতরো অন্ববিন্দন্ত্সত্যমন্ত্রা অজনয়ন্নুষাসম্’।। (ঋগে¦দ-৭/৭৬/৪)।
অর্থাৎ : যে অঙ্গিরাগণ সত্যবান, কবি, পূর্বকালীন পিতা ও যাঁরা গূঢ় জ্যোতি লাভ করেছিলেন এবং অবিতথ মন্ত্রদ্বারা ঊষাকে প্রাদুর্ভূত করেছিলেন, তাঁরাই দেবগণের সঙ্গে একত্রে প্রমত্ত হতেন। (ঋক্-৭/৭৬/৪)।।


ঋগ্বেদে বারবার এই অঙ্গিরসদের বলা হয়েছে, ‘পিতরঃ নঃ’ অর্থাৎ ‘আমাদের পিতাগণ’ (ঋক্-১/৭১/২), ‘নঃ পূর্বে পিতরঃ’ অর্থাৎ ‘আমাদের প্রাচীন পিতাগণ’ (ঋক্-১/৬২/২), ‘পূর্বঃ অঙ্গিরাঃ’ অর্থাৎ ‘প্রাচীন অঙ্গিরস্-গণ’, ইত্যাদি। আবার ভৃগুগণ এবং অথর্বন্-গণের সঙ্গে অঙ্গিরসদেরও ‘নঃ পিতরঃ’ অর্থাৎ ‘আমাদের পিতাগণ’ বলে উল্লেখ আছে, যেমন-

‘অঙ্গিরসো নঃ পিতরো নবগ্বা অথর্বাণো ভৃগবঃ সোম্যাসঃ।
তেষাং বয়ং সুমতৌ যজ্ঞিয়ানামপি ভদ্রে সৌমনসে স্যাম’।। (ঋগ্বেদ-১০/১৪/৬)।
অর্থাৎ : অঙ্গিরা নামক অথর্বন নামক এবং ভৃগু নামক আমাদের পিতৃলোকগণ এ মাত্র এসেছেন, তাঁরা সোমরস পাবার অধিকারী, সে যজ্ঞভোক্তা পিতৃলোকগণ যেন আমাদের শুভানুধ্যান করেন, যেন আমরা তাদের প্রসন্নতা লাভ করে কল্যাণভাগী হই। (ঋক্-১০/১৪/৬)।।

তেমনি, অথর্বন্-দের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-

‘যজ্ঞৈরথর্বা প্রথম পথস্ততে ততঃ সূর্যো ব্রতপা বেন আজনি।
আ গা আজদুশনা কাব্যঃ সচা যমস্য জাতমমৃতং যজামহে’।। (ঋগ্বেদ-১/৮৩/৫)।
অর্থাৎ : অথর্বন-ঋষিগণ যজ্ঞ দ্বারা প্রথমে অপহৃত গাভীগণের পথ বার করেছিলেন, পরে ব্রতপালনকারী কমনীয় সূর্যরূপ ইন্দ্র দৃষ্ট হলে অথর্বগণ ঐ গাভী সকল প্রাপ্ত হলেন; কবির পুত্র উশনা ইন্দ্রের সহায় হয়েছিলেন। আমরা শত্রু দমনের নিমিত্ত সমুৎপন্ন এবং অমর ইন্দ্রের আহ্বান করি। (ঋক্-১/৮৩/৫)।।


অতএব স্বয়ং ঋগ্বেদের কবিরা যে অথর্বন্-অঙ্গিরসদের প্রাচীন পিতাগণ হিসেবে বারবার স্মরণ করছেন তাঁদেরই বেদ বা জ্ঞান ওই অথর্ববেদ-কে সামগ্রিকভাবে ঋগ্বেদের পরবর্তী মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়। বৈদিক চিন্তাধারার বিকাশ পর্যালোচনা প্রসঙ্গে এ-বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ববহ। কেননা-
আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে কেউ কেউ তর্ক তুলেছেন, যেহেতু ঋগ্বেদের পরে অথর্ববেদ– এবং যেহেতু ঋগ্বেদের সূক্তগুলি মূলতই প্রার্থনা-উপাসনা জাতীয় ও অথর্ববেদের সূক্তগুলি মূলতই জাদু-বিশ্বাসগত,– সেইহেতু স্বীকার করা প্রয়োজন যে বৈদিক সাহিত্যে পূজা-উপাসনা ক্রমশই জাদুবিশ্বাসমূলক মন্ত্রের রূপে অধঃপতিত হয়েছিল। অর্থাৎ এঁদের যুক্তি অনুসারে বৈদিক সাহিত্যের নজির হলো আগে ধর্মবিশ্বাস পরে জাদুবিশ্বাস; অতএব নৃতত্ত্ববিদেরা যে মনে করেন, ধর্মবিশ্বাসের তুলনায় জাদুবিশ্বাস অনিবার্যভাবেই প্রাচীনতর এ-কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম, অথর্ববেদের সংকলন পরবর্তী কালের হলেও এবং অথর্ববেদে সংকলিত অংশবিশেষ অত্যন্ত অর্বাচীন হলেও, সামগ্রিকভাবে অথর্ববেদকে ঋগ্বেদের পরবর্তী বলা সত্যিই অর্থহীন; এছাড়া ঋগ্বেদের সমস্ত মন্ত্রই যে আদিতে প্রার্থনা-উপাসনামূলক ছিল– এ-কথাও জোর করে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
অবশ্যই এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, অথর্ববেদের প্রধানতম বিষয়বস্তু বলতে আদিম জাদুবিশ্বাস– ঝাড়ফুঁক্, তুক্-তাক্ ইত্যাদিই। শত্রুদমন, রোগনিরসন, বশীকরণ– ইত্যাদি নানা উদ্দেশ্যে মন্ত্রগুলি প্রয়োগ করা হতো। এদিক থেকে বলা যায়, অথর্ববেদে বৈদিক মানুষদের অত্যন্ত আদিম পর্যায়ের বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানাদির পরিচয় স্পষ্টতরভাবে টিকে আছে। এবং দ্রষ্টব্য হলো, অন্তর্নিহিত বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের দিক থেকে সে-পর্যায়ের বৈদিক মানুষদের সঙ্গে আধুনিক পৃথিবীর নানা উপজাতির আশ্চর্য সাদৃশ্য চোখে পড়ে। ভিনটারনিথ্স্ তাই বলছেন, ‘বস্তুত ওই জাদু-সংগীত ও জাদু অনুষ্ঠান যে-ধ্যানধারণার পরিচায়ক, সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মানবজাতির মধ্যে তার নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতীয়দের অথর্ববেদের জাদু-সংগীত ও জাদু-অনুষ্ঠানে যে অত্যদ্ভুত চিন্তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় হুবহু তারই নিদর্শন চোখে পড়ে উত্তর-আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে, আফ্রিকার নিগ্রোদের মধ্যে, মালয়বাসী ও মোঙ্গলদের মধ্যে, প্রাচীন গ্রীক ও রোমানদের মধ্যে এবং অনেক সময় আধুনিক ইউরোপের কৃষকদের মধ্যেও। এ-বিসয়ে ভিনটারনিথ্স্ অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করেছেন।’- (দেবীপ্রসাদ/ ভারতীয় দর্শন, পৃষ্ঠা-১০৮)

তাই দেবীপ্রসাদ বলেন, এদিক থেকে অথর্ববেদের প্রধানতম মূল্য অবশ্যই নৃতত্ত্বমূলক। কেননা অমন আদিম পর্যায়ের ধ্যানধারণা ও আচার-অনুষ্ঠান সংক্রান্ত সাহিত্যগত নিদর্শন অন্তত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় আর নেই। কিন্তু এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, ওই আদিম পর্যায়ের বৈদিক মানুষদের কাছে চিকিৎসাশাস্ত্র বলতে যেটুকু তাও একান্তভাবেই এ-জাতীয় ঝাড়ফুঁক্ ও তুক্-তাক প্রভৃতিই– অর্থাৎ, ওই আদিম জাদুবিশ্বাসের সঙ্গেই জড়িত। জাদুবিশ্বাস-গত ওই প্রাচীন চিকিৎসা-পদ্ধতির বৈদিক নাম ছিলো ‘ভৈষজ্যানি’। অতএব, অন্তত বৈদিক মানুষদের ইতিহাসে চিকিৎসা-বিদ্যার এবং তারই আনুষঙ্গিক উদ্ভিদ-বিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা প্রভৃতিরও– প্রাচীনতম পরিচায়ক ওই অথর্ববেদ। অবশ্য বলাই বাহুল্য, চিকিৎসাবিদ্যার এই প্রাথমিক নিদর্শনকে আধুনিক অর্থে চিকিৎসা-বিজ্ঞান কল্পনা করবার কোনো কারণ নেই।

প্রসঙ্গক্রমে ছোট্ট যে প্রশ্নটি থেকে যায়, প্রাচীন পুঁথিপত্রের নানান জায়গায় ‘ত্রয়ী বিদ্যা’ নামে তিনটি বেদ অর্থাৎ ঋগ্বেদ, সামবেদ ও যজুর্বেদের উল্লেখ রয়েছে। অথর্ববেদের সুপ্রাচীন অবস্থিতি স্বীকার করলে সেসব প্রাচীন পুঁথিপত্রে অথর্ববেদের স্বীকৃতি নেই কেন?
এ-প্রেক্ষিতে দেবীপ্রসাদ বলেন, ‘অথর্ববেদে সংকলিত আদিম জাদুমন্ত্রগুলি অত্যন্ত সুপ্রাচীন হলেও সংকলনকালের দিক থেকে অথর্ববেদ খুবই অর্বাচীন। স্বভাবতই, জাদুমন্ত্রগুলি যখন সংহিতা-রূপে সংকলিত হয়েছে তখন বৈদিক মানুষদের সমাজ আর আদিম সমাজ নয়; বৈদিক সমাজে তখন ক্ষত্রিয়-বর্ণ ও ব্রাহ্মণ-বর্ণের প্রতিপত্তি সুস্পষ্ট হয়েছে। তাই অনেক সময়েই দেখা যায়, সংকলন-কর্তারা ওই আদিম জাদু-মন্ত্রগুলির সঙ্গে ক্ষত্রিয়শ্রেণী ও ব্রাহ্মণ-শ্রেণীর স্বার্থ সংযোজিত করেছেন এবং মন্ত্রগুলিকে এই দুই শ্রেণীর স্বার্থে নিয়োগ করবার কল্পনা করেছেন। তবুও মন্ত্রগুলির আদিম জাদুবিশ্বাসমূলক রূপ সম্পূর্ণভাবে ঢাকা পড়েনি এবং আধুনিক বিদ্বানেরা অনুমান করছেন যে এই কারণেই পরবর্তী কালের পুরোহিতশ্রেণী দীর্ঘ দিন ধরে অথর্ববেদ-সংহিতাকে খুব বেশি মর্যাদা দিতে চাননি।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের পর্ব :  প্রাচীন আর্য সমাজ ও সংস্কৃতি] [*] [পরের পর্ব : বৈদিক সাহিত্য- ব্রাহ্মণ]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০২ : বৈদিক সাহিত্য– সংহিতা|"

আহা্। আপ্লুত হলাম। সমৃদ্ধ হলাম।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 182,433 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 72 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: