h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা

|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০১ : প্রাচীন আর্য সমাজ ও সংস্কৃতি|

Posted on: 04/07/2015


314762_501240416556847_1950408058_n

| আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০১ : প্রাচীন আর্য সমাজ ও সংস্কৃতি |
রণদীপম বসু

বৈদিক-যুগ এবং তার সাহিত্য, সমাজ ও চিন্তাধারা

ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে দুইটি ধারা প্রবাহিত– বৈদিক ও অবৈদিক– ভারতীয় পণ্ডিতদের গভীর সংস্কার ও সনাতনপন্থী ধারণায় অবৈদিক ধারাটির বিশেষ কোনো গুরুত্ব স্বীকার করা হয়নি প্রত্নখননের মাধ্যমে সিন্ধু-সভ্যতা আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত। উত্তরকালের এতদঞ্চলীয় ধর্মীয় চিন্তা ও ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে এই প্রাক্-আর্য সিন্ধু-যুগীয় অবৈদিক উপাদানের ব্যাপক প্রভাবের গুরুত্ব যতোই থাকুক না কেন, এ-সংস্কৃতির অপর যে বৈদিক-উপাদান তার গুরুত্বও কোন অংশে কম নয়। বরং পরবর্তীকালের চিন্তা-জগতে যে ধর্ম ও দার্শনিক ভাবনার বৈপ্লবিক উন্মেষ ঘটে তার অবদান মূলত আর্য-সভ্যতার বৈদিক-সংস্কৃতিকে ঘিরেই। এই বৈদিক-সংস্কৃতির বিকাশ এবং তার প্রভাব ও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই  পরবর্তীকালে অন্যান্য মত-গোষ্ঠির মতোই লোকায়ত-চার্বাক মত-গোষ্ঠিরও জন্ম অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো বললে হয়তো বা অত্যুক্তি হবে না। তাই ভারতীয় দর্শন-চিন্তার তথা চার্বাকী-ভাবনার সুলুক-সন্ধান করতে হলে বৈদিক সাহিত্যের মাধ্যমে আর্য-সভ্যতার বিশ্লেষণ নির্দ্বিধায় আবশ্যক বলা চলে। এ-প্রেক্ষিতে আমরা খানিকটা সে-প্রয়াস নিতে পারি।


.
১.০ : বৈদিক সভ্যতা

সিন্ধু-সভ্যতা পতনের পর ধীরে ধীরে যে জাতিটি ভারতের ইতিহাসে প্রবেশ করে এরাই ‘আর্য’ নামে পরিচিত। আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বা সংস্কৃতির ধারক হচ্ছে বেদ। বেদের মধ্য দিয়েই আর্যদের সংস্কৃতি ভারতে ছড়ায় বলে বেদের নামানুসারে এই সভ্যতাকে ‘বৈদিক সভ্যতা’ও বলা হয়। আর্য-সংস্কৃতি ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রত্নখননের মাধ্যমে সামান্য কিছু সহায়তা মিললেও আর্য সভ্যতার প্রথম দিকে জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার প্রধান সূত্রই হলো বেদ বা বৈদিক সাহিত্য।

.
আর্য-ঠিঁকুজি :

সিন্ধু-সভ্যতা পতনের পর ভারতে অভিযানকারীরা নিজেদেরকে ‘আর্য’ বলতো। সংস্কৃতে ‘আর্য’ (Arya) শব্দটিকে প্রাচীন পার্সীয়দের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় ‘আইর্য’ (Airya) আর প্রাচীন পার্সীয় সাধারণ ভাষায় ‘আরীয়’ (Ariya) বলা হতো। আর্য শব্দের সাধারণ অর্থ হলো ‘বিশ্বস্ত মানুষ’ বা ‘একই জাতির মানুষ’। তবে বেদের অনুসারী বা বেদ রচনাকারীরা নিজেদেরকে ভারতের প্রাচীন অধিবাসীদের থেকে আলাদা ও উন্নত জাতি মনে করে পার্থক্য বোঝাতে তারা নিজেদের ‘আর্য’ এবং ভারতের আদি অধিবাসীদের ‘অনার্য’ বলতো। অনার্যদেরকে আর্যরা শত্রু মনে করতো বলে আর্য-গ্রন্থে তাদেরকে দাস বা দস্যু হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ অনার্য মানেই দাস বা দস্যু।

তবে আর্য শব্দের উৎস অনুসন্ধানে উনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা যথেষ্ট গবেষণা চালিয়েছেন। এরকম একজন জে. সি. পিচার্ড ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে এ-বিষয়ে উপসংহারে পৌঁছতে গিয়ে এমন একটি মানবগোষ্ঠির উল্লেখ করেছেন যারা সংস্কৃত, জার্মান, গথিক প্রভৃতি ভাষাভাষী মানুষের পূর্বপুরুষ ছিলেন এবং এই জাতিগোষ্ঠির মানুষেরা স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে গঙ্গা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। আরেকজন গবেষক সি. ল্যাসেন সিদ্ধান্ত করেছেন যে, আর্যরা হচ্ছে সবচেয়ে সংগঠিত উদ্যমী ও সৃজনশীল জাতি। তাঁর মতে, ভারতের উচ্চবর্ণের লোকেরা যাঁরা নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে গৌড় বর্ণের তারাই আর্যগোষ্ঠিভুক্ত।

আবার কোন কোন ঐতিহাসিক শুধুমাত্র ভাষা বিচারেই আর্যদের চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তাঁদের মতে, জাতিগত অর্থে আর্য শব্দটি ব্যবহৃত হবে না– এটি ব্যবহৃত হবে ভাষাগত অর্থে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই তাঁরা আর্যদের আদিবাস খোঁজার চেষ্টা করেছেন। মূলত আর্যদের উৎস নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বহু বিতর্ক ও মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন অন্য কোথাও নয় ভারতেই আর্যদের আদি নিবাস ছিলো। কোন এককালে ভারত থেকেই তারা পারস্য ও ইউরোপে যায়। এই যুক্তির পক্ষে তাঁদের বক্তব্য হলো, আর্যদের আদিগ্রন্থ ‘বেদ’ ভারতবর্ষেই রচিত হয়েছিলো কেননা বেদের কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় না যে, আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে এ দেশে এসেছে। ঋগ্বেদের ভৌগোলিক বিবরণ পাঠ করে কেউ কেউ বলেন ভারতের উত্তর-পশ্চিমে ব্রহ্মর্ষি দেশ বলে একটি প্রাচীন অঞ্চলের কথা জানা যায়, এ অঞ্চল ছিলো আর্যদের আদিবাসস্থল। আবার কারো মতে, মুলতানের দেবীকা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে আর্যদের আদি বাসভূমি ছিলো। কেউ আবার এতে দ্বিমত করে বলেন, কাশ্মীর এবং হিমালয়ের সংলগ্ন অঞ্চলে আর্য বসতির সূচনা হয়েছিলো। কেউ আবার মন্তব্য করেন, পঞ্চনদের নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোতেই আর্যদের আদি আবাস ছিলো। মোটকথা এফ. ই. পার্জিটার, মহামহোপাধ্যায় গঙ্গানাথ ঝাঁ, ডি এস ত্রিবেদ, এল ডি কল্প, শ্রীকণ্ঠ শাস্ত্রী প্রমুখ সনাতনপন্থী পণ্ডিতদের কেউই স্বীকার করতে সম্মত নন যে আর্যরা বাইরে থেকে এসেছে। তাঁদের আরো যুক্তি হলো বৈদিক আর্যরা ‘সপ্তসিন্ধু’কে তাদের আদি বাসভূমি হিসেবে বলতে চেয়েছে।

এ ব্যাপারে সমাধানে পৌঁছার জন্য ভাষাতত্ত্ববিদেরাও ভাষার নিদর্শনের সাহায্যে চেষ্টা করেছেন প্রাচীন আর্য সংস্কৃতি খুঁজে পেতে। কিন্তু এ সংস্কৃতির উৎস হিসেবে কোন অঞ্চলকে তাঁরা নির্দিষ্ট করতে পারেননি। বৈদিক সাহিত্য থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বৈদিক আর্যদের ভাষা ছিলো সংস্কৃত। সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করা যায়নি বলে সিন্ধু সভ্যতার ভাষা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদি প্রমাণ করা যেতো যে সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের আদি ভাষা সংস্কৃত ছিলো তবে ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আর্যদের আদিবাস হিসেবে ভারতভূমিকে নির্দিষ্ট করা সহজ হতো। সেই সূত্রে আর্যরা হতো সিন্ধু-সংস্কৃতির উত্তরসূরী। তাই ভাষা-পণ্ডিতেরা মনে করেন সংস্কৃত ভাষার উৎস অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই সম্ভব আর্যদের আদি বাসস্থান নিশ্চিত করা।
অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ দিকে এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন দু’জন ইউরোপীয়– ফরাসি মিশনারী কোরদু (Coeurdoux) এবং কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের ইংরেজ বিচারপতি ও এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্স। তাঁরা সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষার মিল খুঁজে পান। তাঁদের ধারণা এই ভাষাগুলির উৎস একই অঞ্চলে এবং কোন এক সময় এই অঞ্চলের মানুষেরা পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়েছিলো। একই উৎস থেকে উদ্ভব বলে এই উৎসের ভাষার শাখাসমূহকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বলা হয়। তাঁদের মতে ইন্দো-ইউরোপীয়দের বাসস্থানের উৎস থেকে তাই আর্যদের উৎস অনুসন্ধান করার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার প্রাচীনতম উৎস নিয়েও বিতর্ক আছে। অনেকের মতে ইউরোপে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছে লিথুয়ানীয় ভাষা। এই লিথুয়ানীয় ভাষার সূত্র ধরে রাশিয়ার নিকটবর্তী লিথুয়ানিয়াকে আর্য ভাষাভাষীদের আদি বাসস্থান বলা হয়ে থাকে। আবার সব দিক বিবেচনা করে জার্মান পণ্ডিত কোসিনা (Kossina) মনে করেন, ইন্দো-ইউরোপীয়দের আদি বাসস্থান ছিলো উত্তর ইউরোপীয় সমভূমিতে। অধ্যাপক গাইলস (Giles) বলেন, হাঙ্গেরীয় সমভূমি ছিলো তাদের বাসস্থান। এছাড়া অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন মধ্য এশিয়া ছিলো আর্যদের আদি বাসস্থান।

তবে আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মত অনুযায়ী পোল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ শুষ্ক ও তৃণময় প্রান্তরে আধা যাযাবর এক গোষ্ঠী বসবাস করতো। এই জাতির গড়ন ছিল লম্বা, নাক ছিল উন্নত, গায়ের রঙ ফর্সা আর মাথা লম্বাটে। তারা ঘোড়াকে বশ মানায় এবং চাকাওয়ালা রথ ব্যবহার করে। তারা প্রধানত মেষপালক হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করতো। সামান্য কৃষিকাজেও অভ্যস্ত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের প্রথম দিকে জনসংখ্যা প্রচুর বৃদ্ধি পায় আর খরায় পশুচারণভূমির ঘাস পুড়ে যায়। ফলে বাঁচার তাগিদে এ সমস্ত অঞ্চলের লোকেরা স্থান ত্যাগ করতে থাকে। দলবদ্ধভাবে তারা সরে যেতে থাকে পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে। তারা যে সমস্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে সেখানে শুরু হয় পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থা। তাদের উপাসনায় স্থান পায় আকাশের দেবতা, ঘোড়া ও রথ। এই গোষ্ঠীর একটি শাখা চলে যায় ইউরোপে; এরাই হলো গ্রিক, ল্যাটিন, কেলট এবং টিউটন জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ। অন্য একটি শাখা চলে যায় আনাতোলিয়া অঞ্চলে। তাদের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের মিশ্রণে স্থাপিত হয় হিট্টাইটদের বিশাল সাম্রাজ্য। এর একটি শাখা তাদের পুরাতন বাসস্থানেই রয়ে যায়। এরাই পরবর্তীকালে বাল্টিক ও স্লাভোনিক জাতি গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হিসাবে চিহ্নিত হয়। একটি শাখা চলে যায় দক্ষিণ দিকে ককেশাস এবং ইরানের সমতল মালভূমিতে। যে ক্যাসাইট বংশ ব্যাবিলন দখল করেছিল এরা এই শাখারই লোক। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে উত্তর-পূর্ব সিরিয়াতে মিতান্নি নামের লোকদের আবির্ভাব ঘটে। এদের দেবতাদের সঙ্গে ভারতীয় দেবতাদের মিল রয়েছে। যেমন- ইন্দর অর্থাৎ ইন্দ্র, উরুভন অর্থাৎ বৈদিক দেবতা বরুণ ইত্যাদি।’ (এ কে এম শাহনাওয়াজ/ ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৫৬)

বেশিরভাগ গবেষকদের অভিমত হলো, ভারতে আর্যদের আগমন ঘটে ইরানের মালভূমি থেকে। ভারতে আর্যদের আগমন ও অভিযান চলতে থাকে ধীরে ধীরে– শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে। এই আগমনের সূচনা ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। প্রথম দিকে আর্যবসতি গড়ে ওঠে পূর্ব পাঞ্জাবে এবং শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এই অঞ্চলই আর্যাবর্ত নামে পরিচিত। ক্রমে ক্রমে আর্যরা স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিশ্রিত হতে থাকে। এ-প্রক্রিয়ায় দৈহিক দিক থেকে তাদের অনেক পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং এই মিশ্রণের মধ্য দিয়ে ক্রমে ভারতে একটি উচ্চতর সভ্যতার উন্মেষ ঘটে।

.
আর্য-আগমন কাল :

আর্যদের আদিবাসস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক গবেষক ও ইতিহাসবিদেরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, আর্যরা আদি-ভারতীয় নয়– বহিরাগত।  তবে ভারতে আর্যদের আগমন ঠিক কখন হয়েছিলো তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে আর্য-আগমনের কাল নির্ণয় প্রসঙ্গ আরেক ধরনের সমস্যায় আবর্তিত হয়েছে। এ সমস্যার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভারতবর্ষে আর্যরা একটি বিশেষ সময়ে এবং একই ধারায় প্রবেশ করেনি বরং দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগতভাবে তারা এদেশে প্রবেশ করেছিলো বলে মনে করা হয়। সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে-
সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে আর্যরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে দু-তিনবার দু-তিন দলে ভারতবর্ষে আসে। যারা বেদ নিয়ে এসেছিল তারা হয়তো খ্রীষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের কাছাকাছি কোনো সময়ে এখানে পৌঁছয়, তবে তাদের আগেও এখানে অন্য আর্য দল এসেছিল। আর্যরা যখন মধ্যপ্রাচ্য বা ইরান থেকে আসে তখন চাষের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ পরিচয় থাকলেও ঐ দীর্ঘ পথ তারা পশুচারী যাযাবর হিসেবেই আসে। ঐ পথে বহু মানুষ গরু-মোষ ভেড়া-ছাগল নিয়ে তারা আসছিল। তখন তাদের খাদ্য ছিল মাংস, দুধ, দই, ঘি, ছানা, ছাতু, মধু ইত্যাদি। ভারতবর্ষে পৌঁছতে তাদের অনেক সময় লেগেছিল এবং সে সময়টা কাটে যাযাবর ভাবেই। পথের মধ্যে কোথাও কোথাও কিছুদিন ধরে বাস করলেও স্থায়ী জীবনযাত্রার সুযোগ তো ছিল না, ফলে বীজ বুনে ফসল তোলবার মতো সময় তাদের হাতে থাকত না।’- (প্রাচীন ভারত, পৃষ্ঠা-১১)

মূলত আর্যদের ভারতবর্ষে আগমনের কাল নির্ণয়ের প্রয়োজনে প্রথম দৃষ্টি দেয়া হয়েছিলো বৈদিক সাহিত্যের প্রতি। বৈদিক সাহিত্যের সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ঋগ্বেদের রচনাকাল জানা-ই এক্ষেত্রে গবেষকদের জন্য বিশেষ জরুরি ছিলো। কিন্তু এ-বিষয়ে সবচাইতে সমস্যার বিষয় হলো ঋগ্বেদ শুরুতেই লিখিত রূপ পায়নি। অনেককাল পর্যন্ত তা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিলো। এই সংকট উত্তরণের চেষ্টা প্রথম করেন জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলার (Friedrich Max Muller, 1823-1909 A.D.)। এ কে এম শাহনাওয়াজ-এর ‘ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়-
তিনি (ম্যাক্স মুলার) একটি গণনা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন যাকে বলা হয় ‘Date reckon backward’ বা পেছন দিকে গণনার পদ্ধতি। এর মূল কথা হচ্ছে কোন একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে শুরু করে পেছনের দিকে গুনে যাওয়া এবং এভাবে প্রাচীন কোন ঘটনার সময় নির্ধারণ করা। ‘ম্যাক্স মুলার’ এ পদ্ধতির গবেষণা করতে গিয়ে বৈদিক সাহিত্যসমূহকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি এসব সাহিত্যের ভাষাগত, ভাবগত ক্রমবিবর্তনের দিকে লক্ষ দেন। এভাবে তিনি বৈদিক সাহিত্যকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেন। প্রথম পর্যায়ে রচিত হয় ঋগ্বেদ এবং তার পরে সাম, যজু ও অথর্ববেদ। দ্বিতীয় পর্যায়ে রচিত হয় ‘ব্রাহ্মণ’। আর শেষ পর্যায়ের রচনা ছিল ‘উপনিষদ’। ম্যাক্স মুলার উপনিষদের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের আদি রূপের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। এ কারণে তিনি মন্তব্য করতে পেরেছেন যে, উপনিষদের বিন্যাস ঘটানো হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। ১০৮টি উপনিষদ তৈরিতে সময় লেগেছিল কমপক্ষে দু’শো বছর। সে কারণে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে শুরু হয় উপনিষদের গঠন এবং তা শেষ হয় খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে।
এই গণনা পদ্ধতির পথ ধরে ম্যাক্স মুলারের পক্ষে মন্তব্য করা সম্ভব হয়েছে যে, ঋগ্বেদের গঠনকাল ছিল ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ম্যাক্স মুলারের এ সিদ্ধান্ত বিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তুরস্কের বোঘাজকুই (Boghajkay) অঞ্চলে পাওয়া যায় একটি শিলালিপি। এটি ছিল দুই রাজার সন্ধি চুক্তি। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। চুক্তির সাক্ষী হিসাবে চার জন দেবতার নাম লেখা হয়েছে। এঁদের দু’জন হচ্ছেন ইন্দ্র ও বরুণ। ঋগ্বেদ থেকে জানা যায় ইন্দ্র ও বরুণ বৈদিক আর্যদের দেবতা। ম্যাক্স মুলারের বক্তব্যের সমর্থনে এই শিলালিপি ভাষ্য থেকেও মনে করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের দিকে ঋগ্বেদের বিন্যাস ঘটানো হয়েছিল। ফলে আর্যদের ভারতে আগমন এরও শতাধিক বৎসর পূর্বে ঘটে থাকবে।

.
ভারতে আর্য-আগমনের কারণ ও স্থায়ী অবস্থান :

বৈদিক সাহিত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে আর্যদের নতুন ভূমির সন্ধানে বের হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হয় যে, মূলত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন আর্যদের আদি বাসভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলো। অনুমান করা হয় আর্যদের প্রথম দল ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ দিয়ে উত্তর ভারতে প্রবেশ করেছিলো। ঋগ্বেদের বর্ণনায় আর্যদের বসতি স্থাপনকারী অঞ্চলের কয়েকটি নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি কাবুলের কাছে ‘কুভা’ নদী, একটি কর্রম অঞ্চলে ‘ক্রুমু’ নদী এবং আরেকটি গোমাল অঞ্চলে ‘গোমতী’ নদী। এ থেকে ধারণা করা হয় আর্যরা প্রথমে উত্তর পশ্চিম ভারতের আফগানিস্তানে বসতি গড়ে তোলে। এ অঞ্চল থেকেই পরে আর্যরা সিন্ধুর উপত্যকায় বসবাস শুরু করে। বৈদিক সাহিত্যে বিশেষ করে ঋগ্বেদে তাদের বসতি স্থাপনকারী অঞ্চলকে সপ্তসিন্ধু বা সাত নদীর দেশ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর এই বর্ণনা থেকে বোঝা গেছে যে, আর্যরা দ্বিতীয় পর্যায়ে আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবের মধ্যবর্তী ভূ-ভাগে বাস করতো। কেননা এ-অঞ্চলে যে সাতটি নদীর অস্তিত্বের কথা জানা যায় সেগুলো হচ্ছে- বিপাশা, রাভি, বিতস্তা (ঝিলাম), চিনাব, শতদ্রু, সরস্বতী ও দৃশদ্বতী।

সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে আর্যদের অবস্থানকালীন সময়ের তেমন উল্লেখযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায় না। এতে ধারণা করা হয় এসময়ে আর্যরা তাদের যাযাবরবৃত্তি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে পারেনি। তাদের মূল পেশা হিসেবে পশুপালন অব্যাহত থাকায় তাদের পক্ষে তখনও স্থায়ী বসতি গড়া সম্ভব হয়নি। এ-কারণে তাদের এসময়কার জীবনব্যবস্থা সম্বন্ধে জানার মতো প্রয়োজনীয় প্রত্ন-নিদর্শন নির্দিষ্ট কোথাও পাওয়া সম্ভব হয়নি। পাঞ্জাবের সমভূমিতে আর্যদের ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয় পশুচারণভূমির আকর্ষণ। বৈদিক সাহিত্য থেকে বুঝা যায় এর পরে আর্যরা স্থানীয় অনার্য অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের বিভিন্ন বর্ণনা ঋগ্বেদের বিভিন্ন মণ্ডলে রয়েছে, যেখানে স্থানীয়দেরকে দাস বা দস্যু আখ্যা দেয়া হয়েছে। এবং ঋগ্বেদের এ জাতীয় বর্ণনা থেকে বোঝা যায় স্থানীয় অনার্যরা সহজেই আর্যদের হাতে পরাস্ত হয়েছিলো।

পন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে,- ‘ঋগ্বেদের রচনাক্ষেত্র ছিল প্রধানত কুরু, উত্তর-দক্ষিণ পাঞ্চাল দেশ অর্থাৎ বর্তমানের পশ্চিম যুক্তপ্রদেশ যা ছিল আর্যগণের ভারত আগমনের পর তৃতীয় আবাসভূমি। আর্যগণের প্রথম আবাসভূমি ছিল কাবুল ও স্বাত নদীর উপত্যকা (আফগানিস্তান)। দ্বিতীয় অস্থায়ী আবাস তারা নির্বাচন করেন সপ্তসিন্ধুতে (পাঞ্জাব), এবং তৃতীয় স্থান হলো গঙ্গা-যমুনা অধ্যুষিত উর্বর উপত্যকায়। এই আলোচনা থেকেই বোঝা যায় যে, কেন এই গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী পূতভূমি তীর্থক্ষেত্রকে আর্যাবর্ত বলা হয়।’- (দর্শন-দিগদর্শন দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০)

আর্যরা বরাবরই যোদ্ধা জাতি হিসেবে পরিচিত। ঘোড়সওয়ার আর্যদের মাধ্যমেই ভারতবাসীরা প্রথম ঘোড়ার সঙ্গে পরিচিত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে পাওয়া আর্যদের ব্যবহৃত লোহা ও ব্রোঞ্জে নির্মিত কুঠার, তলোয়ার, তীর-ধনুক প্রভৃতি থেকে জানা যায় তারা লোহার ব্যবহার জানতো। স্থানীয় অনার্য অধিবাসীদের পরাজিত করার পর নিজেদের ভেতর অন্তর্কলহ শুরু হয়ে যায় বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এরকম নৈরাজ্য। এ-প্রসঙ্গে এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন-
বৈদিক সাহিত্য সূত্র থেকে জানা যায় শুরুর দিকে ভারতে প্রবেশকারী আর্যরা পাঁচটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত লেগেই থাকতো। এ সময় কোন কোন গোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অনার্যদের সহায়তা নিতো। এই পাঁচ গোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান গোষ্ঠীর নাম ছিল ‘ভরত’। অনেকের মতে এ নাম থেকেই ‘ভারতবর্ষ’ নামটির সৃষ্টি হয়েছে। ভরত গোষ্ঠীর প্রধানের নাম ছিল ‘দিবদাস’। তাঁর পুত্র সুদাস ‘পুরু’ নামে অন্য এক আর্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এ যুদ্ধে তাঁদের সাহায্য করেছিলেন স্থানীয় অধিবাসীরা। ‘দশরাজার যুদ্ধে’ জয়লাভের খ্যাতি ছিল সুদাসের, পুরাণে উল্লিখিত ‘কুরু’ জাতির সৃষ্টি হয়েছিল ভরত ও পুরু গোষ্ঠী একত্রিত রূপ থেকে। মূলত আর্যরা সপ্তসিন্ধু অঞ্চল থেকে তৃতীয় পর্যায়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। পরবর্তী বৈদিক যুগে এরা গঙ্গা ও যমুনার উপত্যকায় বসতি বিস্তার করে। এর পর তারা এগিয়ে যায় অযোধ্যার দিকে। সরযু নদীর তীরে বসতি স্থাপন করে। ‘মধ্যদেশ’ বলে চিহ্নিত একটি অঞ্চলেও আর্যবসতি গড়ে উঠেছিল। এর অবস্থান পূর্ব পাঞ্জাবের সরস্বতী নদী থেকে এলাহাবাদের মধ্যবর্তী অঞ্চলের মধ্যে ছিল বলে মনে করা হয়।’- (ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৫৮)

আর্যরা এরপর মধ্যদেশ ত্যাগ করে আরও পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। বারাণসী, বিহার, বাংলা প্রভৃতি অঞ্চলের দিকে তারা অগ্রসর হয়। বৈদিক যুগে এ অঞ্চলসমূহকে বলা হতো ‘প্রাচী’ দেশ। এসব অঞ্চলের শক্তিশালী স্থানীয় অধিবাসীরা দীর্ঘদিন আর্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ও উন্নত অস্ত্রের ধারক আর্যদের হাতে তাদের পরাজয় ঘটে। তবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত আর্যরা ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বে অবস্থিত আসাম রাজ্য অধিকার করতে পারেনি বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।
আর্যদের আরেক ধারা মধ্যদেশের পশ্চিমে অবস্থিত মালব, সৌরাষ্ট্র, গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলে বসতি বিস্তার করে। ফলে স্থানীয় লোকদের উপর আর্য সভ্যতার প্রভাব প্রতিফলিত হতে থাকে। এই অঞ্চলকে বলা হতো ‘প্রতীচ্য’ বা ‘পাশ্চাত্য’ দেশ। তবে এ সমস্ত অঞ্চলের মানুষের ওপর সম্পূর্ণরূপে আর্যপ্রভাব প্রতিফলিত করা যায়নি। আর্য সাফল্য সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় পরবর্তী বৈদিক যুগে। এ সময়ে পশ্চিম ভারতকে আর্যাবর্তের অংশ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্যাবর্ত অর্থাৎ আর্যদের বসতিস্থানের সীমা উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত এবং পূর্বে বঙ্গোপসাগর থেকে পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো।

শুরুর দিকে উত্তর ভারতে যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে আর্যদের অবস্থান তৈরি করে নিতে হলেও কিন্তু দক্ষিণ ভারতে আর্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক পরে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে। এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন,- ‘দু’টো কারণে দক্ষিণ ভারতে আর্যরা বিলম্বে প্রবেশ করেছে। প্রথমত, ছোটনাগপুর ও মধ্য প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ের বাধা অতিক্রম করা সহজ ছিল না, দ্বিতীয়ত, দ্রাবিড় জাতির কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করাটাও খুব সুবিধাজনক হবে বলে আর্যরা বিবেচনা করেনি। রামায়ণ ও মহাভারতের সূত্র থেকে জানা যায়, পববর্তী বৈদিক যুগে আর্য ঋষিদের প্রভাবে দক্ষিণ ভারতে আর্য আগমন সহজ হয়েছিল। এই ঋষিরাই দক্ষিণ ভারতে আর্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেন। মহাকাব্যের বর্ণনা অনুযায়ী রামচন্দ্র দক্ষিণ ভারতের বনে অর্থাৎ বিন্ধ্য পর্বতে বনবাসী হয়েছিলেন। সেখানে তাঁর দেখা হয়েছিল আর্য মুনি ‘অগস্ত্যর’ সঙ্গে। এভাবেই ধীরে ধীরে দক্ষিণ ভারতে আর্য প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।’- (ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা-৫৯)

.
আর্যদের সমাজ-জীবন :

আর্যদের সমাজ-জীবন বা তাদের সম্পর্কে যা-কিছু ধারণা তার প্রায় সবকিছুরই জানার উৎস হলো বৈদিক সাহিত্য ভাণ্ডার। এক্ষেত্রে আর্যদের সম্পর্কে প্রথম ধারণা স্পষ্ট হয় প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ থেকে। আর্যদের সমাজ ছিলো মূলত পুরুষতান্ত্রিক। সমাজে পুরুষেরই প্রাধান্য ছিলো। পশুপালন, শিকার– এসবে পুরুষের কাজই বেশি ছিলো। চাষ শেখবার পরে মেয়েরা খেত পাহারা দেওয়া, কাপড় বোনা, রান্না, শিশু, বৃদ্ধ ও পুরুষদের সেবায় দিন কাটাতো; হয়তো কিছু সবজি ও ফসলের চাষও করতো। সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর ‘প্রাচীন ভারত’ গ্রন্থে বলেন,- ‘খুব অল্পকালের মধ্যেই আর্যরা দক্ষিণপূর্ব দিকে এগোতে লাগল, নতুন নতুন অঞ্চলের লোকের সংস্পর্শে এসে তাদের জীবনযাত্রা, ধর্মবিশ্বাস, ধর্মাচরণ, সামাজিক রীতিনীতিতে কিছু কিছু পরিবর্তন দেখা দিল; যজুর্বেদের যুগ থেকেই এই পরিবর্তন চোখে পড়ে। বীজ বোনা থেকে ফসল তোলার মধ্যে সময়টাতে কিছু শিল্পকর্ম, ধাতুর, মাটির, কাঠের, চামড়ার, পুঁতির কাজ চালু হলো। পেশার সংখ্যা বাড়তে লাগলো, বেশবাসে পরিবর্তন এল, নারীর স্বাধীনতা কমতে লাগল ক্রমে। পরাজিত আদিবাসীরা দাসে পরিণত হলো; ভারী কাজের বোঝা এবং যজুর্বেদের যুগে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্যের দাসত্ব তার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেল। যেমন নারীর কাজ ঠিক হয়ে গেল স্বামী সন্তান ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের সেবা এবং বাড়ির কাজ।

পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর ‘দর্শন-দিগদর্শন’ গ্রন্থে বলেন,- ‘ঋগ্বেদের বর্ণনানুযায়ী আর্যাবর্তের অধিবাসীগণের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি ও পশুপালন। সে যুগের প্রদেশ গভীর অরণ্যে আবৃত থাকায় তাঁদের সুবিধাও হয়েছিল প্রচুর। আর্যগণের প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, রুটি, দুধ, ঘি এবং মাংস– বিশেষত গরু ও বাছুরের। এখনকার মতো মশলার প্রচলন না থাকায় সিদ্ধ মাংসের ঝোল-ই– যা ছিল হিন্দী-ইউরোপীয় জাতির একত্রে বাসকালে প্রধান খাদ্য– খুব প্রিয় ছিল। সোমরস ছিল তাঁদের প্রিয় পানীয় এবং চিত্ত বিনোদনের বিষয় ছিল নৃত্যগীত। দেশের অধিবাসী কামার-কুমোরগণ তাদের জাত-ব্যবসা করত। সুতাকাটা ও বয়নশিল্প প্রত্যেক আর্যগৃহেই প্রচলিত ছিল, সুতীবস্ত্র ছাড়া চামড়ার পোশাকও ব্যবহৃত হতো। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতায় মিশর ও মেসোপটেমিয়ার মতো মূর্তিপূজাও হতো; কিন্তু আর্যগণ তা অপছন্দ করতেন, বিশেষত প্রতিযোগী সিন্ধুবাসীগণের লিঙ্গ পূজাকে তাঁরা ঘৃণার দৃষ্টিতেই দেখতেন, একে বলতেন, ‘শিশ্নদেবাঃ’। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে আর্যাবর্তের আর্যগণ দেবতাজ্ঞানে পূজা করতেন– যেমন ইন্দ্র, বরুণ, সোম, পর্জন্য প্রভৃতি। কোনো কোনো স্তোত্র বা শ্লোকে আমরা যেমন কাব্যকলার সুন্দর নিদর্শন পাই, তেমনই পাই ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ের পরিচয়।

বৈদিক সাহিত্যের বিশ্লেষণের মধ্যেই বৈদিক সমাজ ও সংস্কৃতির সার্বিক অবস্থা ও চিন্তাধারার সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যাবে।

.
বৈদিক সভ্যতার লিপি :

বৈদিক সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসমনষ্ক গবেষকদের কৌতুহলি করে তুলে যে, এমন সাহিত্য যারা সৃষ্টি করেছে তাদের লিখন পদ্ধতি কেমন। যেহেতু অনুমান করা হয় যে ঋগ্বেদ সৃষ্টির শুরুতেই আর্যদের কোন লিপি ছিলো না, তাই ম্যাক্স মুলার অনেক বিচার-বিশ্লেষণের পর বলতে চেয়েছেন যে, আর্যরা লিখতে শিখেছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর পর। কিন্তু অনেকেই এ মত গ্রহণ করেননি। তাঁদের বিচারে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতেই আর্যরা লিখন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পেরেছিলো। বৈদিক ভারতীয়দের প্রাচীনতম লিপিকে বলা হয় ‘ব্রাহ্মীলিপি’। ফিনিশীয় বর্ণমালার সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়।

পণ্ডিতেরা অনুমান করেন, নবম খ্রিস্টপূর্বাব্দেই ভারতের আর্যরা ফিনিশীয় বর্ণমালা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো। কিন্তু এই মতামত ভান্ডারকার প্রমুখ ভারতীয় পণ্ডিত গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁরা মনে করেন, ভারতবাসী লিখন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পেরেছিলো ঋগ্বেদের সময়কাল থেকেই। ভান্ডারকার বিশ্বাস করেন, প্রাচীন ভারতীয় চিত্র বা বর্ণলিপির ধারণা থেকেই ব্রাহ্মীলিপির উদ্ভব ঘটেছিলো। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সিন্ধু সভ্যতায় যে চিত্রলিপি পাওয়া গেছে এই চিত্রলিপি প্রমাণ করেছে প্রাচীন ভারতীয় বর্ণমালার উৎস ছিলো এই সিন্ধুলিপি। গবেষকদের মতে, ব্রাহ্মীলিপির উৎস সিন্ধুলিপির ভেতরেই খুঁজে পাওয়া যাবে। আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন ব্রাহ্মীলিপি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে উৎকীর্ণ হয়েছিলো বলে জানা যায়।

(চলবে…)
[ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]

[আগের অধ্যায় : প্রাক্-বৈদিক সিন্ধু-যুগ] [×] [পরের পর্ব : বৈদিক সাহিত্য- সংহিতা]

[ চার্বাকের খোঁজে অধ্যায়সূচি ]

Advertisements

1 Response to "|আর্য-সংস্কৃতি ও বৈদিক-যুগ-০১ : প্রাচীন আর্য সমাজ ও সংস্কৃতি|"

অসাধারণ বললেও বিশেষণটা নেহাতি খুব কম হয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

রণদীপম বসু


‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।...’
.
.
.
(C) Ranadipam Basu

Blog Stats

  • 193,445 hits

Enter your email address to subscribe to this blog and receive notifications of new posts by email.

Join 77 other followers

Follow h-o-r-o-p-p-a-হ-র-প্পা on WordPress.com

কৃতকর্ম

সিঁড়িঘর

দিনপঞ্জি

জুলাই 2015
রবি সোম বুধ বৃহ. শু. শনি
« জুন   আগস্ট »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Bangladesh Genocide

1971 Bangladesh Genocide Archive

War Crimes Strategy Forum

লাইভ ট্রাফিক

ক’জন দেখছেন ?

bob-contest

Blogbox
Average rating:

Create your own Blogbox!

হরপ্পা কাউন্টার

Add to Technorati Favorites

গুগল-সূচক

টুইট

Protected by Copyscape Web Plagiarism Check
%d bloggers like this: